বইকথা : কান্নাটা ভায়োলিনের : শামীম রফিকের সনেট বিশ্লেষণ, রিফরমেশন, গাঠনিক ও প্রায়োগিক বিতর্ক : ড. বোরহান বুলবুল


অত্যন্ত চমৎকার প্রচ্ছদে মোড়া ২০২০ সালে প্রকাশিত নব্বইয়ের অন্যতম কবি শামীম রফিকের লেখা সনেটের বইটা আমার চোখে পড়ল ২০২৬ সালে। এত চমৎকার গাঁথুনি এবং বিশ্লেষণে এতগুলো সনেটের আয়োজনে রচিত বইটা দেখে পড়বার এবং কিছু লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমার মতে বাংলা ভাষায় এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় একক সনেটগ্রন্থ। প্রাক-কথনে কবি নিজেই অনেক বিতর্ক তৈরি করেছেন এবং সেসবের জবাব দিয়ে গেছেন। কবির লেখা বিতর্ক শুনে বোঝা যায় তাঁর মাঝে সনেট সম্পর্কে অনেক ওভার-কনফিডেন্স গড়ে উঠেছে। তিনি বলছেন, আমি যা লিখছি তার পেছনে তো অসংখ্য যুক্তি রয়েছে। শিল্পের আবার সীমাবদ্ধতা কী? শিল্পকে শিল্পিত করাই তো শিল্প-শ্রমিকের কাজ। সনেট নিজেই তো শিল্পিত, তাকে শিল্পিত করতে গিয়ে কবি আরও শিল্প সৃষ্টি করেছেন। বইটি সবার হাতে পৌঁছালে অনেক রকম সমালোচনা আসতে পারে কিন্তু তাতে কবি ভীত নন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ় চিত্তে সকল প্রশ্নের ও সমালোচনার জবাব দিতে প্রস্তুত ও সক্ষম। তিনি বলেছেন আমি অনেক রকম সনেট লিখেছি : পদ বা পঙ্ক্তি মেনে ও পদবিচ্যুতি করে, মাত্রা বা অক্ষর মেনে ও না মেনে, অন্তমিল মেনে ও না মেনে, ছন্দ মেনে ও না মেনে, অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বা অমিত্রাক্ষর ছন্দ মেনে, সবচেয়ে ছোট মাত্রার পঙ্ক্তি ও সবচেয়ে বড় মাত্রার পঙ্ক্তি মেনে, পয়ার ও মহাপয়ার মেনে, নিয়মিত ও অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষরের রীতি মেনে, মিশ্র পদ্ধতির রীতি মেনে, জোড় বা বিজোড় মাত্রা বা অক্ষরের রীতি মেনে।
কবি শামীম রফিক অনেক রকম সনেট লিখেছেন। তিনি নিজেই প্রশ্ন করেছেন, যদি শুদ্ধ সনেট লেখার ক্ষমতা আমার থাকে তো অশুদ্ধ সনেট কেন লিখলাম? তিনি কোনটাকে অশুদ্ধ সনেট বলছেন? যে সনেট তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছেন? তিনি তো ইচ্ছে করেই ব্যতিক্রমী সনেট রচনা করেছেন। যেহেতু অন্য কবিরা সনেটের নিয়মচ্যুত হয়েছেন, তাহলে তিনি কেন হতে পারবেন না? তিনি সৃষ্টি করে তিনিই আবার অশুদ্ধ বলছেন কেন? কবির বিশ্বাস এখানে সনেটের বিচিত্র অলঙ্করণ দেখে অনেকেই তা না বুঝে নানা মন্তব্য করবেন এবং এগুলো সনেট হয়নি পর্যন্ত বলতে পারেন। তিনি সনেট না বুঝে এবং সনেটের বিচিত্র অলঙ্করণ না বুঝে কাউকে মন্তব্য না করতে অনুরোধ করেছেন। কেউ যদি সনেট বুঝে এবং যুক্তি দিয়ে ভুল প্রমাণ করতে পারেন তবে কবি এগুলোকে সনেট থেকে সরিয়ে নেবেন এবং সাধারণ কবিতা বলে বলে মেনে নিবেন।
এরপর তিনি লিখেছেন, ‘সনেটবিষয়ক কথাগুচ্ছ’। এখানে তিনি লিখেছেন সনেট লেখা অত্যন্ত কষ্টকর, বোরিং এবং জঘন্য টাইপের কাজ। বাইরে থেকে কল্পনা করা বা দেখাটা যেমন সহজসাধ্য, কাজটা মোটেও তেমন নয়। সহজ চোখে তা বোঝা যাবে না। অনেকে সনেট পড়তে চান কিন্তু বুঝতে পারেন না, আবার অনেকে বুঝতে চান কিন্তু বুঝতে পারেন না। আসলে সনেটকে সহজবোধ্য করে তোলার জন্য কেউই চেষ্টা করেননি। তাই সনেটকে সহজবোধ্য করে তোলার জন্যও এ প্রয়াস। ভিন্নতর উপস্থাপনা। কবিরা সনেট বুঝুক, পাঠকরা বুঝুক, সমালোচকরা বুঝুক এবং অন্যরাও বুঝুক-এমনটি চাই। এই বইটি লেখার ব্যাপারে বিতর্ক হবে এবং অবশ্যই বিতর্ক প্রত্যাশা করি। কিন্তু সে রকম বিতর্ক প্রত্যাশা করব না, যিনি না বুঝে বিতর্ক করবেন। সনেটে ধ্রুপদী বা চিরন্তনী বলে কিছু নেই। সনেটের সকল বৈশিষ্ট্য নিয়েই কিছু না কিছু ভাঙচুর হয়েছে। কে ইচ্ছে করে করেছেন, কে করতে বাধ্য হয়েছেন তা বোঝা খুবই কঠিন কাজ। এই বইয়ে যে ভাঙচুরগুলো করা হয়েছে সেসব বুঝতে চাইলে আপনাকে বইখানি সংগ্রহ করতে হবে এবং পড়তে হবে। বইটির শুরুতে বিস্তারিত লেখা আছে। এই বইয়ে পেত্রার্কীয়, শেক্সপীরীয়, ফরাসি, এড্মান্ড স্পেনসার ও মিশ্র রীতির সনেটও লেখা হয়েছে। অন্ত্যমিলযুক্ত, অন্ত্যমিলবিহীন, বিচ্যুত পঙ্ক্তির সনেট লেখা হয়েছে। অন্ত্যমিল আছে কিন্তু মাত্রা বা অক্ষরবিন্যাসে অনিয়মিত সনেট লেখা হয়েছে। বিভিন্ন মাত্রা বা অক্ষরের সনেট লেখা হয়েছে। সনেটে সমান্তরতা, অনুপ্রাস, প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা, মিথ এবং আটপৌরে শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। এ সবের ব্যবহার এর আগে আর কোনো কবি করেননি। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার পঙ্ক্তিবিন্যাসের সনেট লেখা হয়েছে। তাও আগে কখনো করা হয়নি।
এছাড়া প্রতিটি সনেটের সঙ্গে রয়েছে সনেটের গাঠনিক বিন্যাস এবং ছন্দ বিশ্লেষণ। বইটা কবিতার বই নাকি গবেষণার বই সেটা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। পাঠকের বা গবেষকের নিজে থেকে বিশ্লেষণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু পড়লেই হবে, বুঝতে চেষ্টা করলেই হবে। সবকিছু ব্যাখ্যা করে বলে দেওয়া আছে। ‘অসময়’ সনেটের বিন্যাস কবি নিজেই ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। ছন্দের বিশদ বিশ্লেষণও তিনি করে দিয়েছেন। সনেটটি মিশ্র ও নিরীক্ষাধর্মী। তিনি লিখেছেন, বাক্সের মধ্যে ঘড়িটা, টিক্ টিক্ টিক্ কথা কয়/সময় ধরেছে মোরে, ঝির ঝির ঝির বায়ু বয়। কবিতাটিতে ছন্দের সঙ্গে ঘড়িটার টিক্ টিক্ টিক্ শব্দ যেন আমাদেরকে সময়ের নিরেট সত্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ‘কিছুটা বিষাদ’ কবিতায়, পৃথিবীতে বেদনার গানই সবচেয়ে মধুর কথাটি দিয়ে কবিতাটিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। যদিও লাইনটি কবিতার অংশ নয়, ভূমিকা মাত্র। কিন্তু কবি কবিতাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়ে সাজিয়েছেন। কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন, আমাকে বিষাদ দিবে? সারাদিন পথে পথে হেলা/ এখানে পথের শেষ। দাবিগুলো কেবলি অচেনা। মহাপয়ারের উপর সনেটটি প্রতিষ্ঠিত। শেক্সপীরীয় রীতির উপর প্রতিষ্ঠিত এই কবিতায় জীবনের বিষাদঘন আক্ষেপের কথাই অত্যন্ত সূক্ষ্ম অবয়বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কবিতার শুরুতে তিনি বিষাদ চাইছেন। কিন্তু কেন? কেউ তো ইচ্ছে করে বিষাদ চান না কিন্তু কবি কেন তা চান তাই কবিতাটিকে গভীর অর্থবহ করে তুলেছে। এইটুকু বুঝতে দেরি হয় না যখন দেখি তিনি বলছেন, জীবন জীবিকা চাই। তিনি আবার দুঃখ করে বলছেন, অকারণে কষ্ট দাও। আমরা তো জানি, সনেটে অর্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার কাঠামো ও গঠনবিন্যাস। কিন্তু কবি তারপরও অর্থের উপর দৃষ্টি রেখেছেন। অর্থের উপর দৃষ্টি রেখে কাঠামো, গঠনবিন্যাস এবং ছন্দ মিলানো কতটা কঠিন তা তারাই বুঝবেন, যারা সনেট বোঝেন এবং সনেট লেখেন। প্রতিটি সনেটের শুরুতে তিনি হয় নিজের লেখা অথবা অন্যের লেখা কয়েকটি চরণ ব্যবহার করেছেন, যা তার সনেটের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দিয়েছে। ‘প্রত্যাশা’ একটি ১৪ পঙ্ক্তির সনেট। তিনি কবিতাটির আঙ্গিক ব্যাখ্যাসহ ছন্দ বিশ্লেষণ করেছেন। এই সনেটটিতে অষ্টক ও ষটকের মধ্যে বিরতিকরণ বা ছেদ ছাড়া বাকি সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
‘দৃঢ়তা’ কবিতাটির পঙ্ক্তিবিন্যাস উল্টো হয়ে গেছে। অর্থাৎ অষ্টক ও ষটক উল্টে পাল্টে গেছে। ৮+৬-এর পরিবর্তে ৬+৮ হয়ে গেছে। এই রীতির পরিবর্তন রবীন্দ্রনাথ করেছেন। অর্র্থাৎ তিনি সনেটের একটি পরিবর্তন করেন। গোটা সনেটটির অবয়ব সমিল দ্বিপদিকা দিয়ে নির্মিত। এটা কবি শামীম রফিকের একটা নবতর গঠনবিন্যাস। ‘স্বপ্ন’ সনেটটি ১৭ মাত্রা বা অক্ষরের সনেট। এটা একটা বেজোড় মাত্রার সনেট। এই বেজোড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিভিন্ন বিচ্যুতিতে যদি সনেট হতে পারে, তবে বিজোড় মাত্রার সনেট হতে পারবে না কেন? তিনি লিখেছেন, তবে পরিচয় জানি না আমি, এসেছি অজানা দেশে/এখানে অচেনা মানুষ, পথ-ঘাট-মাঠ সব। সনেটের অষ্ট্ক ষট্কসহ রয়েছে তাদের মধ্যে বিরতি বা ছেদ। কবি এখানে পরিচয় জানেন না কিন্তু কার পরিচয় জানেন না। তিনি অজানা দেশে এসেছেন, যেখানে মানুষেরাও অচেনা। ‘না পাওয়ার ভুল’ সনেটটিতেও রয়েছে ১৭ মাত্রা বা অক্ষর। এছাড়া ‘মগ্নতার গান’ সনেটেও রয়েছে ২১ মাত্রা বা অক্ষর। সনেটটির মধ্যে তিনি নানাবিধ বিষয় সংযুক্ত করে সনেটটিকে রূপবতী করে তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, তোমাকে আমি চিনি-পথের কিনারে এই আরাধনা গড়ি/বেঁচে থেকে যতদিন পাই অন্তরে এই প্রান্তরের ঘ্রাণ। তিনি মনে করেন অলৌকিক সম্পদের লোভ দস্যুদের থাকে কিন্তু মানুষের থাকতে পারে না। ‘নিঃশর্ত বিনিময়’, ‘মধ্যরাতের শীতল’, ‘ক্ষণস্থায়ী প্রেম’, ‘মাতাল দারিদ্র্য’, ‘সমুদ্র আর সময়’ এবং ‘বিষাদে জ¦লছে মন’ সনেটগুলো অক্ষরবৃত্ত ছন্দে পয়ারের উপর রচিত। নিঃশর্ত বিনিময় সনেটে তিনি লিখেছেন, শুনেছি মানুষ আজ, মৃত্যু নয়-পাখি/এখানে দেখি না শীত, পাখিরা ভূলোকে। তিনি মনে করছেন মানুষেরা মরে না, বরং পাখি হয়ে যায়। কোনও কোনও সনেটে আবার অষ্টক ও ষটকের মধ্যে কোনও বিরতি বা ছেদ নেই। ‘জেনে গেছি’, ‘প্রাত্যহিক ভুল’, ‘ঈশ্বরের নেশা’, ‘মৃত্যু ও প্রেম আলাদা নয়’, ‘বিপরীত উত্তাপ’ প্রভৃতি সনেটে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। ‘প্রাত্যহিক ভুল’ সনেটে তিনি লিখেছেন, তুমিও জানো-পাইনি তোমায়/কথা ছিল-পাবার/অনেকেই পায়/আর হবে না সময় এখন-যাবার। ‘কিছু স্মৃতি’ ফরাসি রীতির সনেট। এই পদ্ধতিতে খুব বেশি সনেট রচিত হয়নি। ‘প্রত্যয়’, ‘মিসিং কিসিং গেম’, ‘কুয়াশার নারী’, ‘নিশ্চল প্রত্যাশা’ এবং ‘ঝড়ের পূর্বাভাস’ সনেটগুলোতে সমান্তরতার ব্যবহার করা হয়েছে। এই সমান্তরতার ব্যবহারের ফলে সনেটগুলো পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। সনেটে সমান্তরতার ব্যবহার এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। এটাও নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কিন্তু সনেটে সমান্তরতার ব্যবহার করা যাবে না কেন? অতীতে কেউ ব্যবহার করেনি বলে কি তা ব্যবহার করা যাবে না? কুয়াশার নারী সনেটে তিনি লিখেছেন, সময় গিয়েছে চলে, সত্যিকার পাখি/সময় গিয়ে চলে, অরণ্যেই ঘুরি/সময় গিয়েছে চলে, কবরই খুঁড়ি/সময় গিয়েছে চলে, পরিচয় রাখি। এই একই সনেটে তিনি মোট চারটি সমান্তরতার ব্যবহার করেছেন। ‘ঝড়ের পূর্বাভাস’ সনেটে তিনি মোট তিনটি সমান্তরতার ব্যবহার করেছেন। প্রতি চরণে ২৪ মাত্রা বা অক্ষরের এই সনেটের পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+৭+৩। এই সনেটে কবি লিখেছেন, আমি চলে গেলেও কি তোমরা হাসবে এমন সর্বনাশা হাসিতে/আমি চলে গেলেও কি ভাঙন থামবে না মরা নদীগুলোর পাড়ে/ আমি চলে গেলেও কি পবিত্র অক্ষরেরা কাঁদবে সকল রাত্রিতে/আমি চলে গেলেও কি ছড়াবেই না সৌরভ ঘন অন্ধকার ছেড়ে। সনেটের অনেক ভাংচুর এবং বিভাজন তো অনেকে করেছেন। সেসব করা গেলে এটা করা যাবে না কেন? সনেটগুলোতে শেষ ষটকে দুটি ত্রিকোণ সৃষ্টি করে পেত্রার্কীয় ও শেক্সপীরীয় রীতির বাইরে আরেকটি নতুন মাত্রা সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে অভিনবত্ব। সনেটে সমান্তরতার ব্যবহার এর আগে কখনও দেখা যায়নি। ‘ব্যতিক্রম’ সনেটটির পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+২+৪। এই সনেটের প্রতিটি চরণে রয়েছে ১৬ মাত্রা বা অক্ষর। এটি ১০ চরণের একটি ক্ষুদ্রাকৃতির সনেট। এর প্রচলিত নাম, ঈঁৎঃধষ ঝড়হহবঃ। এটি একটি ব্যতিক্রমী সনেট। এই সনেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো মিথের ব্যবহার। যেমন : নমরুদ ও হপকিন্স ইত্যাদি।
‘পাথরের নীড়’, ‘আত্মজের বাঁশি’ এবং ‘যন্ত্রণার বাতি’ সনেটের পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+৪+৪+২। পাথরের নীড় সনেটটি যেহেতু মিক্সড পদ্ধতির সনেট তাই তিনটি বিরতি বা ছেদ রাখা হয়েছে। এখানে তিনি লিখেছেন, যতবার ফিরে আসি, সূর্যমুখি ঝরে/সূর্যের চেয়েও দ্রুত, আকাশের পরে। তিনি বলতে চেয়েছেন তিনি পাথর নন। তার শরীরেও রক্তের ভিড়। চর্যাপদের পথ ধরে তার চোখেও রয়েছে জল। ‘যন্ত্রণার বাতি’ মহাপয়ারের উপর প্রতিষ্ঠিত সনেটের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে ১৯ মাত্রা বা অক্ষর। এই সনেটটিতে তিনি লিখেছেন, পাখির পাখার মতোই যদি সব বাতাসেরা বয়/কুয়াশার মতোই আমার ফেনায়িত কষ্টেরা রয়। আরও লিখেছেন, পৃথিবীর ভালোবাসা থেকে ছিটকে গিয়ে তার খুব কষ্ট হয়। এটি একটি ব্যতিক্রম পদ্ধতির সনেট। ‘বিভেদ মানুষের’ সনেটটিতে পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+৪+৬। এই সনেটের প্রতিটি চরণে রয়েছে ২১টি মাত্রা বা অক্ষর। অর্থাৎ বেজোড় সংখ্যক মাত্রা বা অক্ষর, যা একটি ব্যতিক্রম। যেহেতু এটি একটি মিশ্র পদ্ধতির সনেট তাই বিরতি বা ছেদ রাখা হয়েছে। ‘বাধ্যগত চিৎকার’ সনেটের শুরুতে তিনি লিখেছেন অবশেষে বুঝেছি-কবিতা ও সম্পদ পরস্পর সাংঘর্ষিক। কবিতা ও সম্পদ কখনো এক পথে হাঁটতে পারে না। এই সনেটের প্রতিটি চরণে রয়েছে ২৮টি মাত্রা বা অক্ষর। সনেটটির পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+৪+৩+৩। প্রতিটি পঙ্ক্তিতে অন্ত্যমিলবিন্যাস রয়েছে। এই সনেটটিতে তিনি লিখেছেন, তবে কি পৃথিবীতে আসাটা ভুল হয়েছে বলে ভেতরে উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি/প্রয়োজনেই কোন্ বস্ত্র বিসর্জন দেবো বলে ভেতরে উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি/ সকল পরিচয়েই ব্যর্থ হয়ে আজ আগ্নেয়গিরিতে দিব আত্ম-বিসর্জন। গবেষণায় যতটুকু জানা যায় তাতে এক চরণে এর চেয়ে বড় মাত্রা বা অক্ষরের সনেট আর পাওয়া যায়নি। এটা এখন পর্যন্ত সনেটের সর্বকালের সবচেয়ে দীর্ঘ মাত্রার সনেট। এটা একটা ভিন্ন পদ্ধতির অন্ত্যমিলবিন্যাস মেনে হয়েছে। সনেটটিতে সমান্তরতার ব্যবহারও রয়েছে। সমান্তরতাগুলোও চরণের শুরুতে না রেখে, রাখা হয়েছে চরণের শেষে, যা আরেকটি ব্যতিক্রম বিন্যাস। সনেটটিতে চারটি সমান্তরতার ব্যবহার করা হয়েছে। সনেটটিতে রাখা হয়েছে তিনটি বিরতি বা ছেদ।
‘ব্যতিক্রম’ সনেটটির পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+২+৪। এটি ১০ চরণের একটি ক্ষুদ্রাকৃতির সনেট। এটি বহুল প্রচলিত সনেট নয়। ‘শিখিনি যে গল্পটা’ সনেটে তিনি দুটো সমান্তরতার ব্যবহার করেছেন। প্রতিটি চরণে পঙ্ক্তিবিন্যাস ১৪। অষ্টক ও ষটকের মধ্যে কোনও বিরতি বা ছেদ নেই। সনেটটিতে তিনি লিখেছেন, তুমি তো জানই রূপো, চাদরে আদর/তুমি তো জানই রূপো, বলাকার প্রেম/তুমি তো জানই রূপো, আগুনে কদর/তুমি তো জানই রূপো, দেবতার গেম। কবির বলবার সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। তিনি চিলের মতো দ্রুত নন। মানুষ হয়েও তিনি মানুষের গল্পটা শিখতে পারেননি। ‘নদীর গল্প শিখি’ সনেটে পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+৪+৩+৩। সনেটটিতে তিনটি বিরতি বা ছেদ থাকলেও ষটকে রয়েছে তিনটি স্বমিল দ্বিপদিকা। সনেটটির গাঠনিক বিন্যাস যেমন ব্যতিক্রম, মাত্রা বা অক্ষরবিন্যাসও ব্যতিক্রম। সনেটটিতে কবি লিখেছেন, বিরহের ডানা খুলে-আমি নদীর গতিপথ দেখি/এই জল কতবার কতদিকেই ঘুরে ফিরে যায়/ তুমি কি আবার আসবে ফিরে সে গল্প্ই তবে শিখি/গাঢ় শাড়িতে তোমার লাল চুম্বনকে ডেকেছি-আয়। ‘ভুলের প্রমাণ’ সনেটে তিনি লিখেছেন, মাননীয় বিচারক, কিভাবে প্রমাণিত/হবে-স্পর্শহীন থেকে কত রাত উড়েছে/আকাশে -কি করে হবে সেগুলো প্রমাণিত/প্রকাশ্যে শুয়েই কি এই প্রমাণ বেড়েছে? সনেটটির ভুমিকায় তিনি লিখেছেন, ভেতরের শত্রুতা খুব সহজেই মারে। ভেতরের শত্রুতা বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন? তবে কি মানুষ নিজেই নিজের শত্রু? ‘না বলা কিছু কথা’ সনেটে তিনি লিখেছেন, তির আর ঢেউ চুমুতে পাগল : দেয়াল কি পারে/এখনো টেবিলে হয় অনেক স্বাদ অশ্বত্থের তলে/এ বুকে প্রেমের নুন অচেনা রমণীদের ভিড়ে/ আকাশ কুসুম ভেবে ডেকেছি সর্বদা অচেনারে। এই সনেটে প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন : আকাশ কুসুম। এটাও সনেটে ব্যতিক্রমী ব্যবহার। ‘রুগ্ন কবিতার দাস’ সনেটের পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+২+২+৪+২। রীতি-বর্জিতভাবে এতে রয়েছে বিরতি বা ছেদ। প্রতিটি চরণে রয়েছে ২১ টি মাত্রা বা অক্ষর। সনেটটিতে তিনি লিখেছেন, তবে যতবার ফাঁসি হলো : কিভাবে হয়েছে সব প্রমাণ/যতবার শিখেছি পাখিদের সুর; মধু-মাতালের মতো। একজনের আবার একাধিকবার ফাঁসি হয় কিভাবে? আর সেই ফাঁসির প্রমাণ কীভাবে হলো? তিনি এ কথা ভাবতে গিয়ে পাখিদের সুর শিখেছেন এবং নিজেকে মাতালের মতো অনুভব করেছেন। ‘মানবিক বিপ্লবী’ কবিতায় পঙ্ক্তিবিন্যাস এবং অক্ষরবিন্যাস ১৪। ফরাসি রীতির এই সনেটের অষ্ট্কে রয়েছে দুটি চতুষ্ক ও ষটকে রয়েছে দুটি ত্রিকোণ। সনেটের পদ্ধতিতে রয়েছে একটা স্বকীয়তা। অষ্টক ও ষটকে রয়েছে বিরতি বা ছেদ। সনেটের ভূমিকায় কবি লিখেছেন ক্ষুধা ছাড়া তার কোন বিলাসিতা নেই। তারপরও রয়েছে কঠোর নিয়মতান্ত্রিকতার নিজস্ব স্বাধীনতা। ‘অবিনাশী’ সনেটটিতে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো চতুর্দশপদী (১৪=৮+৬)-র সঙ্গে প্রতি পঙ্ক্তিতে রয়েছে ১৪ (৮+৬) মাত্রা বা অক্ষর। সনেটটিতে রয়েছে তিনটি বিরতি বা ছেদ। কবি এই সনেটে লিখেছেন, এ জীবন করতলে তুমি উড়ে যাবে/তবু তুমিই জোনাকি, অন্ধকার খাবে।
‘দুঃখই কঠিন’ সনেটে পঙ্ক্তিবিন্যাস ১৪ হলেও রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। সনেটের চরণে মাত্রা বা অক্ষরের কোনও মিল নেই। ‘চাষি ও কবির গল্প’ সনেটে পঙ্ক্তিবিন্যাস ৪+৪+৪+২। এটি একটি মিশ্র পদ্ধতির সনেট। এই সনেটে বিরতি বা ছেদগুলো রাখা হয়েছে চতুষ্ক ও সমিল দ্বিপদিকা সহজে চিহ্নিত করার জন্য। এটি একটি ব্যতিক্রমী বিন্যাসের সনেট। এই বইটিতে যত সনেট রয়েছে তার সবই কোনো না কোনোভাবে ব্যতিক্রমধর্মী সনেট। এ প্রসঙ্গে কবির ব্যাখ্যা ও দাবি রয়েছে। সনেটটির দ্বিপদিকাটি তিনি লিখেছেন, আকার যদি হয় উপ্ত স্বপ্নের ফল/বিফলেÑচাষি ও কবির চোখের জল। কবি ও চাষি উভয়েই স্বপ্নের ফল ফলান। সেই ফল যদি বিফলে যায় তবে তাদের দুজনের চোখেই অবশিষ্ট থাকে চোখের জল।
কবির সনেটের উপর এত বেশি আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে যে, তিনি লেখেন, ‘যে সনেট তোমরা লিখনি’। এই সনেটে তিনি লিখেছেন, সনেট হলো¬Ñগাঢ় সবুজ লকলকে সাপ/সনেট হলো-কঠিনতম প্রিয় অবিশ্বাস/বাঘ এসেছে বলে চিৎকার দেবো নাকি চুপচাপ/ কঠিনতম সত্যের মুখোমুখি এ নিঃশ্বাস। এই সনেটটিতে পঙ্ক্তিবিন্যাস : ৪+৮+২। সনেটের এই রকম পঙ্ক্তিবিন্যাস আগে কখনও দেখিনি। তিনি অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন তোমরা যারা এবং যা পারোনি আমি তা পেরেছি। এত আত্মবিশ্বাস সত্ত্বেও তিনি বিদায় নিচ্ছেন কবি ও প্রকাশকের দ্বন্দ্বে এবং কবিতা পাঠকের অনীহায়। ‘এই শিস পাখিদের’ সনেটে মহাপয়ারের উপর প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি চরণে রয়েছে ২০ মাত্রা বা অক্ষর। চতুর্দশপদী কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে সমান মাত্রা বা অক্ষর। এটি একটি অন্ত্যমিলবিহীন সনেট। শামসুর রাহমান ও সিকদার আমিনুল হকেরা এই পদ্ধতিতে অনেক সনেট রচনা করেছেন। এই সনেটে রয়েছে মিথের ব্যবহার। যেমন : মার্কেজ। এখানে কবি লিখেছেন, পেয়ে গেছি সেই মধুর উত্তাপ; চুপচাপ যন্ত্রণায়/সনেটের আগুনে পুড়ছে সবাই মধুর যন্ত্রণায়। ‘কবিতা হলো মৃত্যুর আর্তনাদ’ অন্ত্যমিলবিহীন সনেট। ‘প্রশ্নের তীর’ সনেটটির পঙ্ক্তিবিন্যাস ২+৪+৪+২+২। মহাপয়ারের উপর প্রতিষ্ঠিত এই সনেটে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। অষ্ট্ক ও ষটক বিদ্যমান থাকলেও, এখানে প্রথমে ষটক এবং শেষে রয়েছে অষ্টক। যা রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করতেন। সনেটটির শুরুতে রয়েছে সমিল দ্বিপদিকা এবং পরে একটি বিশেষ চতুষ্ক। আবার অষ্টকের প্রথমে রয়েছে একটি শেক্সপীরীয় চতুষ্ক এবং পরে রয়েছে দুটি সমিল দ্বিপদিকা। অন্ত্যমিল বিন্যাস রয়েছে। তবে তা প্রচলিত কোনও পদ্ধতি মেনে নয়। এখানে অন্ত্যমিল বিন্যাস হলোÑকক, খগঘখ, ঙচঙচ, ছছ এবং ঝঝ। সকল বৈশিষ্ট্য নিয়ে, এটি একটি বিশেষ পদ্ধতির সনেট, যা অতীতের কারও সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
‘ঈশ্বরকে বলেছি’ সনেটে পঙ্ক্তিবিন্যাস ৩+২+৩+৩+২+১। অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষরে নির্মিত। এই রকম বিন্যাসের সনেট আর নেই; বিষয়টা নিশ্চিত। এই সনেটটি নিয়ে বিতর্ক হবার সম্ভবনা বেশি। সনেটটিতে রয়েছে ৫টি বিরতি বা ছেদ। ‘বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে’ সনেটে অষ্টক : ৩+২+৩ এবং ষটক : ২+২+২। সনেটটিতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। কোনও অন্ত্যমিল নেই। তাই ছন্দও নেই। কবি সনেটটিতে লিখেছেন, নিজেকে নিজেই/তবে কে বাঁচাবে? মানুষ যদি নিজেই নিজেকে খায়, তবে তারচেয়ে ভয়াবহ আর কি হতে পারে? ‘মহুয়ার নেশায়’ সনেটে সমিল দ্বিপদিকার স্থান পরিবর্তন হয়েছে। সনেটে যদি এত ভাংচুর সম্ভব হয় তবে সমিল দ্বিপদিকার স্থান পরিবর্তন হতে পারবে না কেন? বিতর্ক হোক। যুক্তি থাকতে হবে। কবির মতে, সকল বিন্যাস ইচ্ছাকৃত অভিনবত্ব। ‘্সর্বদা মাথা নত নয়’ এবং ‘একটি প্রশ্নের ভিড়ে’ সনেটে পুরো বিন্যাসটাই সমিল দ্বিপদিকা। সনেটটিতে অন্ত্যমিল বিন্যাস রয়েছে। একটি প্রশ্নের ভিড়ে সনেটেও পুরো বিন্যাসটাই সমিল দ্বিপদিকা। এতে সমান্তরতার ব্যবহারও রয়েছে। এটিও একটি ব্যতিক্রমী সনেট। ‘দুঃখই মানুষের ফাঁদ’ সনেটে রয়েছে সাতটি সমিল দ্বিপদিকা। প্রতিটি চরণে রয়েছে ১৪ মাত্রা বা অক্ষর। সনেটটিতে কবি অনেক দার্শনিকতা করেছেন। তিনি লিখেছেন, জীবন ও জীবিকা মুখোমুখি ঘুমায়। আবার লিখেছেন, অর্থই যদি অনর্থ, কেন উড়ে খড়। তিনি আবার লিখেছেন, গল্প কবিতা প্রেম-অর্থহীন সবই। তিনি আবার লিখেছেন, অর্থ ছাড়া বাকি সব স্বপ্নমাখা বিষ। সবশেষে তিনি লিখেছেন, মাটি জানে, নদী জানে-ক্ষয়ে যায় দিন/অর্থ ছাড়া বুঝে না-পড়ে থাকে এ ঋণ। ‘মৃত্যু ও প্রেম আলাদা নয়’ সনেটে পঙ্ক্তিবিন্যাস ১+৭+৫+১। রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। সনেটটিতে রয়েছে তিনটি বিরতি বা ছেদ। প্রচলিত অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। কোনো সমিল দ্বিপদিকা নেই।
‘সবই শিল্প নয়’ সনেটের অষ্টকের তৃতীয় পঙ্ক্তিতে রয়েছে বিচ্যুতি। বিষ্ণু দে-র শ্রেষ্ঠ কবিতায় ‘চৌরঙ্গী’ কবিতায় এই রকম দেখা যায়। সনেটটির পঙ্ক্তিবিন্যাস ২+৬+৬। প্রতিটি চরণে রয়েছে ১৯ মাত্রা বা অক্ষর। এটি একটি ব্যতিক্রমী সনেট। ‘ঠাঁইটুকু নিজেই করব’ সনেটের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। কবি এখানে লিখেছেন, শুধু তো লিখছি-আর তো চাই না কিছু/ভালোবাসাহীন প্রস্তরফলক ছাড়ছে না পিছু। ‘জেনে গেছি অনেক’ সনেটে অষ্টক ও ষটকের মধ্যে কোনও বিরতি বা ছেদ নেই। অন্ত্যমিলবিন্যাস নেই। পঙ্ক্তিতে ব্যবহৃত মাত্রা ও অক্ষর অনিয়মিত। ‘প্রাত্যহিক ভুল’ সনেটে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। কবি সনেটটিতে লিখেছেন, বুঝনি কখনো ভুলগুলো-তুমি। নিরবে দ্বীপের বুকে জেগে উঠে ভূমি। ‘ভাবনার দায়’ সনেটে আধুনিক সনেটের আদলে রয়েছে গভীর মর্মার্থসহ নান্দনিক বিন্যাস, যা সনেটের নবতর রূপের প্রতিফলন। এই সনেটটির বিন্যাস ১+৪+২+৪+২+১। সনেটটিতে রয়েছে পাঁচটি বিরতি বা ছেদ। অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। ‘অত্যধিক কাজ’ সনেটে রয়েছে একটি ভূমিকা। সনেটের বিন্যাস ২+২+২+২+২+২+২। প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। এটি বিশেষ রীতিতে নির্মিত সনেট। যদি সাতটি স্তবক মনে করা হয়, তবে প্রত্যেক স্তবকের শেষে রয়েছে বিশেষ পদ্ধতির অন্তমিল বিন্যাস।
‘বিবর্ণ ঋণ’ সনেটে রয়েছে সাতটি সমিল দ্বিপদিকা। প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। আধুনিক নীতি মেনে সনেটটি নির্মিত। ‘কবিতার নির্দেশ’ সনেটে অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। আধুনিক নীতি মেনে সনেটটি রচিত। ‘নস্টালজিক প্রণাম’ সনেটটিতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। এখানে অন্ত্যমিল রয়েছে, যা প্রতি স্তবকের শেষ লাইনের অন্ত্যমিল দিয়ে বোঝা যায়। উল্কায়, ভাসায় এবং আশায় শব্দগুলোর মধ্যে অন্ত্যমিল রয়েছে। এটি একটি বিশেষ রীতির সনেট। সনেটটির বিন্যাস ১+৬+৬+১। ‘অসীমের জানালা’ সনেটটিতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। তিনটি বিরতি বা ছেদ রয়েছে। ‘নির্জন বেহালা’ সনেটের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। অমিল দ্বিপদিকা রয়েছে। ‘স্বভাব ও মেধার দূরত্ব’ সনেটের পঙ্ক্তিবিন্যাস ১+৩+৩+২+৪+১। সনেটটিতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। পাঁচটি বিরতি বা ছেদ রয়েছে। সনেটটিতে সমিল দ্বিপদিকা, দুটি ত্রিকোণ এবং চতুষ্ক রয়েছে। শেষ পঙ্ক্তিতে রয়েছে পদবিচ্যুতি। কবি সনেটটিতে লিখেছেন, মারণাস্ত্রগুলো কৃত্রিম সারল্য ফেলে/সকল শিল্প নিয়েছে গিলে। শেষ পঙ্ক্তিতে রয়েছে বিচ্যুতি। ‘মূর্তিমান অভিধান’ সনেটে অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। প্রতিটি চরণে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। অষ্টম ও চৌদ্দতম পঙ্ক্তি দুটি স্থানচ্যুত হয়েছে। এটি একটি ভিন্ন রকমের সনেট।
‘শেষ দিকেই’ সনেটে অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। প্রতিটি চরণে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। কোনও বিরতি বা ছেদ নেই। অষ্টক ও ষটক চিহ্নিত হয়নি। সনেটটিতে বিরতি বা ছেদ নেই। এটিও একটি ব্যতিক্রমী সনেট। ‘অন্যরকম সংলাপ’ সনেটে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। তবে তৃতীয় পঙ্ক্তিতে রয়েছে বিচ্যুতি। ‘খুব সহজ নয়’ সনেটে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। তবে পর পর পঙ্ক্তির স্থানচ্যুতি হয়েছে একই রীতি মেনে। এটিও একটি ব্যতিক্রমী সনেট। ‘কিছুটা সত্য’ একটি বিরতিহীন সনেট। এতে রয়েছে অনিয়মিত মাত্রা বা অক্ষর। অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। ‘পতনের গান’ সনেটটির সঙ্গে মধুসূদন দত্ত : শ্মশান সনেটটির মিল রয়েছে। তাছাড়া প্রথম স্তবকের প্রথম পঙ্ক্তিতে এবং দ্বিতীয় স্তবকের দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে রয়েছে বাক্য-বিচ্যুতি। দুটি বিরতি বা ছেদ রয়েছে। প্রতিটি চরণে রয়েছে ২০ মাত্রা বা অক্ষর। সনেটটিতে রয়েছে তিনটি সমিল দ্বিপদিকা। ‘অপরাহ্নের গান’ একটি ব্যতিক্রমী সনেট। ‘কান্নাটা ভায়োলিনের-২’ সনেটের শুরুতে রয়েছে বিশেষ ভূমিকা, যা সনেটটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সনেটের চতুর্থ ও দশম পঙ্ক্তিতে রয়েছে দুটি পঙ্ক্তি বিচ্যুতি। সনেটটিতে ছন্দ ও অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। এখানে কবি লিখেছেন, আমার কারাগারে থাকে অবসরের কবর/ওখানে মায়ের স্বপ্ন ছিল-রূঢ় প্রশ্নের ভারীতর চাপে/প্রেম তো ইতিহাসের উপাদান; চুম্বন দেয় অন্য গালে। ‘বিষণ্ন অভিজ্ঞতা’র ভূমিকা সনেটটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। অন্ত্যমিল ও ছন্দ উপেক্ষিত। বিন্যাস ৪+৪+৩+৩। প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে ২৮ মাত্রা বা অক্ষর। এত বেশি মাত্রার সনেট আগে আর লেখা হয়নি।
‘এখানে আমি একা’ সনেটটির বিন্যাস ৮+৬। পেত্রার্কীয় সনেটের রীতি মতে, অষ্টক ও ষটক স্পষ্ট। অন্ত্যমিল ও ছন্দ উপেক্ষিত। প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে ১২টি মাত্রা বা অক্ষর। এটি সনেটের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও অবাস্তব নয় বা সনেটকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না। চৌদ্দটি পঙ্ক্তি ছাড়া সনেটের সকল বৈশিষ্ট্যকে ভাঙচুর করা যায়। তবে এটা করা যাবে না কেন ? এটি অজানা বিন্যাস নয়, বরং সচেতনভাবেই করা হয়েছে। ‘অবশেষে পথ’ সনেটে জোড় সংখ্যক মাত্রা বা অক্ষর না থাকলেও এটি একটি সনেট এবং বিশেষ শিল্পসমৃদ্ধ। এই সনেটের প্রতিটি চরণে রয়েছে ২৭ মাত্রা বা অক্ষর। রয়েছে তিনটি বিরতি বা ছেদ। ‘মানি না’ এবং ‘মেনে নিতে হবে’ সনেট দুটিতে অন্ত্যমিল একই শব্দে ব্যবহার করা হয়েছে (মানি না)। সনেট দুটিতে রয়েছে মিথের ব্যবহার। যেমন : আইডা পর্বত, ফিবাস, রোডসের কলোসাস, এ্যাপোলো, ধর্ম ও পুরাণ, ডাফন, পাউন্ড ইত্যাদি। মিথের ব্যবহার সনেটে নতুনত্ব এনেছে। ‘ভুল’ সনেটটির ভূমিকা সনেটটিকে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। সনেটটির প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে ২০ মাত্রা বা অক্ষর। একটি শব্দ দিয়েই পুরো সনেটটির অন্ত্যমিল নির্মিত। অন্ত্যমিলের ‘ভুল’ শব্দটি অনুপ্রাস হিসেবে এই সনেটে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি অমিত্রাক্ষর ছন্দে নির্মিত একটি বিশেষ রীতির সনেট। সনেটটিতে কবি লিখেছেন, ভুল হয়েছে। এখন জেগে দেখি ভুল। চারিদিকে ভুল/ পেয়েছি যত প্রশ্ন সকলই ভুল। উত্তরগুলো ভুল/এত ভুলগুলো নিয়ে বেঁচে আছি ভুল। শেষটুকু ভুল/অপ্রিয় সবটুকু শ্রম ভুল হলে বিশ্বাসটুকু ভুল। ‘ধ্বংসের গল্প’ সনেটে রয়েছে ভূমিকা, যা দিয়েছে নতুন মাত্রা। এই সনেটে প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার রয়েছে। যেমন : অরণ্যে রোদন, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আষাঢ়ে গল্প ইত্যাদি। সনেটে প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার এর আগে কোথাও হয়নি। ‘মানি না’ সনেটটিতে রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। ভূমিকাটা সনেটটিকে বিশেষ অর্থবহ করেছে। সনেটটিতে দুটি সমান্তরতার ব্যবহার রয়েছে এবং শেষ পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তি বিচ্যুতি রয়েছে। সনেটটিতে ছন্দ ও অন্ত্যমিল উপেক্ষিত। কবি শামীম রফিক সনেটটিতে লিখেছেন, এতো ক্ষুধার কষ্ট মানি না/এতো যৌনতার কষ্ট মানি না/এতো তৃষ্ণার কষ্ট মানি না/এতো নিঃসঙ্গতার কষ্ট মানি না। তিনি এই অনিয়মগুলোকে মানেন না, এ কথা জোরালোভাবেই বলেছেন। ‘ব্যর্থতা’ সনেটটিতেও রয়েছে কবির বিশেষ ভূমিকা। এই সনেটে সমান্তরতার ব্যবহার রয়েছে। এই সনেটে কবি লিখেছেন, এ কোন অভিমান নয়, এটা ব্যর্থতা/সবদিক ফাঁকা হলে, সেটাই ব্যর্থতা/সব অর্জন মিছে হলে, সেটা ব্যর্থতা/এতগুলো হাহাকার, সেটাও ব্যর্থতা। প্রস্থান না হলেও, সেটাও তো বিচ্ছেদ/সকল অবহেলা, সেটাও তো বিচ্ছেদ/এসব অভিমান নয়, কিন্তু বিচ্ছেদ/এভাবে স্পর্শহীন থাকা, ওটা বিচ্ছেদ।/এভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা, খুব অবহেলা/এভাবে স্পর্শহীন থাকা, তো অবহেলা/সারাক্ষণ বিচ্ছিন্ন থাকা, তো অবহেলা/সব ব্যর্থতা নয়, সকল অবহেলা।/চলতে চলতে প্রস্থান নয়, বিচ্ছেদ/জ¦লছে জ¦লছে জ¦লছে শুধু, বিচ্ছেদ। তিনি ব্যর্থতা, অবহেলা আর বিচ্ছেদকে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। ‘বিদায়ের আগে’ সনেটে রয়েছে একটি অমিল দ্বিপদিকা। এটি একটি মিশ্র পদ্ধতির সনেটই নয়; বিশেষ রীতির সনেটও বটে। এই বইয়ের সনেটে বাগধারা ও আটপৌরে শব্দের ব্যবহারও রয়েছে।
সবকিছুর পরেও বইটিতে অনেক ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে, সীমাবদ্ধতা তো থাকবেই। আপনারা বইটি সংগ্রহ করবেন, পড়বেন এবং ভুল-ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিতে সহযোগিতা করবেন। এই বইখানি বহুল প্রচারিত হলে বাংলা ভাষা ও সনেট অনেকখানি উপকৃত হবে। এই সনেটগ্রন্থখানি কবি শামীম রফিকের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি শুধু সনেট লেখায়ই পারদর্শিতা দেখাননি, সনেটের নানান ব্যবহার ও ভাংচুর নিয়ে তার পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, হাজী সেলিম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা



