Uncategorized

সাদাত হাসান মান্টোর অণুগল্প

অনূদিত অণুগল্প

(Black Borders, সিয়াহ হাশিয়ে গ্রন্থ থেকে)

বাংলা ভাষান্তর : মুম রহমান

[সাদাত হাসান মান্টো (১৯১২-১৯৫৫) উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক। তিনি ছোটগল্প, রেডিও নাটক, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও স্কেচ রচনায় অসামান্য অবদান রাখেন। ভারত বিভাগের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, যৌনতা, মানবিক ভণ্ডামি, প্রান্তিক মানুষের জীবন এবং ক্ষমতার নির্মমতা তাঁর সাহিত্যের প্রধান বিষয়। বাস্তবতাকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরার কারণে জীবদ্দশায় তাঁকে একাধিকবার অশ্লীলতার অভিযোগে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। টোবাটেক সিং, ঠান্ডা গোস্ত, কালো সালোয়ার-এর মতো বিস্ময়কর সব গল্প তিনি বিশ্বসাহিত্যকে উপহার দিয়েছেন। আজ তিনি শুধু উর্দু সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক হিসেবে নয়, বিশ্ব ছোটগল্পের একজন মহৎ কারিগর হিসেবেও পরিচিত।

মান্টোর ছোটগল্পের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত হলেও তার অণুগল্পের কথা অনেক পাঠকই জানেন না। অথচ এই ভারত উপমহাদেশে তিনিই প্রথম মাইক্রোফিকশন বা অণুগল্প রচনা করেছেন। সাদাত হাসান মান্টোর সিয়াহ হাশিয়ে মাইক্রোফিকশনের এক অনন্য সংকলন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়কার ভয়াবহ দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয় এই গ্রন্থের মূল বিষয়।

সংকলনের অধিকাংশ রচনাই মাত্র কয়েকটি বাক্য বা দুয়েকটি সংলাপের মাধ্যমে মানুষের নিষ্ঠুরতা, বিদ্রƒপ ও সভ্যতার ভঙ্গুর মুখোশ উন্মোচন করে। তীক্ষè ব্যঙ্গ, পরিমিতি বোধ এবং আকস্মিক সমাপ্তি এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সিয়াহ হাশিয়ে (কালো প্রান্ত) নামটি এসেছে সংবাদপত্রে মৃত্যুসংবাদ বা শোকবার্তার চারপাশে ব্যবহৃত কালো বর্ডারের প্রতীক থেকে; একই সঙ্গে এটি দেশভাগের

ফলে রক্তে রঞ্জিত নতুন ভৌগোলিক সীমারেখারও ইঙ্গিত বহন করে। কোনও নৈতিক ভাষণ নয়, বরং একটি দৃশ্য বা

সংলাপের মধ্য দিয়েই মান্টো পাঠকের বিবেককে আলোড়িত করেন। কালো প্রান্ত তাই শুধু দেশভাগের দলিল নয়,

মানবসভ্যতার অন্ধকারতম মুহূর্তগুলোর এক অসামান্য সাহিত্যিক স্মারক।]

লোকসানের হিসাব

শেষ পর্যন্ত দুই বন্ধু ডজনখানেক মেয়ে থেকে একজনকে বেছে নিল। তার দাম পড়ল বেয়াল্লিশ টাকা। তারা তাকে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে এল।

তাদের একজন তার সঙ্গে রাত কাটাল। তারপর জিজ্ঞেস করল,

তোমার নাম কী ?

মেয়েটি নাম বলতেই সে চমকে উঠল।

কিন্তু আমাদের তো বলা হয়েছিল, তুমি অন্য ধর্মের!

মেয়েটি  বলল, ওরা মিথ্যে বলেছে।

লোকটি ক্ষোভে চিৎকার করে উঠল, হারামজাদারা আমাদেরকে ঠকিয়েছে! নিজেদের ধর্মের একটা মেয়েকেই অন্য ধর্মের বলে বেচে দিয়েছে! আমি আমার টাকা ফেরত চাই!

কর্মের আহ্বান

পাড়াটি আগুনে ভস্মীভূত হলো। সবকিছু পুড়ে ছাই। কেবল একটি দোকান আর তার সাইনবোর্ড টিকে রইল।

সাইনবোর্ডে লেখা―

‘বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামগ্রী এখানে পাওয়া যায়।’

বেকুব

তার আত্মহত্যার খবর শুনে এক বন্ধু মন্তব্য করলÑবেকুব একটা! আমি তাকে কতবার বোঝালাম―জোর করে দাড়ি কামিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর লম্বা চুল কেটে ফেলা হয়েছে, তাই বলে কি সে আর শিখ থাকবে না, তা তো নয়।

আমি উপদেশ দিয়েছিলাম, প্রতিদিন মুখ আর মাথায় দই মালিশ করো। ভাইগুরুর আশীর্বাদে এক বছরের মধ্যেই চুল-দাড়ি আবার গজিয়ে উঠবে। তখন কেউ টেরই পাবে না যে কখনও সেগুলো কেটে ফেলা হয়েছিল।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা

প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল রাস্তার মোড়ের ছোট্ট হোটেলটির সামনে। সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে একজন প্রহরী মোতায়েন করা হলো।

পরের সন্ধ্যায় দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটল, কাছের মুদি দোকান থেকে খুব দূরে নয়। প্রহরীকে সরিয়ে নতুন ঘটনাস্থলে দাঁড় করানো হলো।

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটল মধ্যরাতে, ধোপার দোকানের ঠিক সামনে।

আদেশ এল―প্রহরী এবার সেখানেই পাহারা দেবে।

প্রহরী বলল, স্যার, আমাকে কি যেখানে পরের ঘটনাটা ঘটবে, সেখানেই আগে থেকে দাঁড় করানো যায় না ?

অকৃতজ্ঞের দল

‘কী অকৃতজ্ঞ জাতি! এত কষ্ট করে এই মসজিদের ভেতর পঞ্চাশটা শূকর জবাই করলাম―তারপরও শালার একটা ক্রেতাও এল না! আর শুনছ ? ওপারে নাকি প্রতিটি মন্দিরের বাইরে গরুর মাংস কিনতে মানুষের লাইন লেগে আছে!’

মিস্টেক

পেট ফাঁক করে দিয়ে নাভি পর্যন্ত নেমে এল ছুরি। পাজামার ফিতে কেটে গেল। ছুরি চালানো লোকটা সঙ্গে সঙ্গে আফসোস করে বললো, ছি ছি ছি ছি, মিস্টেক হয়ে গেছে।

বিশ্রাম দরকার

: মরেনি, দেখ, এখনও বেঁচে আছে।

: বাদ দাও বন্ধু, আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি।

কারচুপি

দেখো বন্ধু তুমি কালোবাজারের হিসেবে দাম নিলে, আর এমন ফালতু পেট্রোল দিলে যে একটা দোকানও জ্বলেনি!

দয়াপরবশ হয়ে

: আমার জোয়ান মেয়েটাকে আমার চোখের সামনে মেরো না।

: ঠিকাছে, ওকে বাকি মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে যাও।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button