জাপানিদের মননে রবীন্দ্রনাথ : প্রবীর বিকাশ সরকার

প্রচ্ছদ রচনা : রবীন্দ্র-নজরুল স্মরণ
জাপানের সঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক শতবর্ষ পুরোনো। ১৯০২ সালে কলিকাতায় এর সূচনা জাপানের অগ্রগণ্য মনীষী, শিল্পকলার ইতিহাসবিদ শিল্পাচার্য ওকাকুরা (কাকুজোও) তেনশিনের সঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ মোট পাঁচবার জাপান ভ্রমণ করেন ১৯১৬ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে। ওকাকুরা ১৯১২ সালেও কলিকাতায় গমন করেছিলেন। সাক্ষাৎ হয়েছিল বন্ধুবর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। ১৯১৩ সালে মৃত্যুর সাত মাস আগে ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখে আমেরিকার বোস্টন শহরে দুজনের শেষ সাক্ষাৎ ঘটে। আর এই সালেরই শেষদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।
১৯০২ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত আরও একাধিক বিশিষ্ট জাপানি নাগরিকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ ও বন্ধুত্ব হয় কলিকাতা ও শান্তিনিকেতনে। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরপরই জাপানে তাঁর জনপ্রিয়তা পর্বতসমান হয়ে ওঠে। ১৯১৪ সালেই তাঁর ইংরেজি গীতাঞ্জলি থেকে কবিতা জাপানি ভাষায় অনুবাদ হতে থাকে। ১৯১৫ সালে গীতাঞ্জলি অনুবাদ করেন তরুণ সাহিত্যিক মাশিনো সাবুরোও। ১৯১৬ সালে প্রথম জাপানে আগমন পর্যন্ত তাঁর একাধিক ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ও প্রবন্ধের জাপানি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। দ্রুতগতিতে তাঁর পাঠক ও ভক্তসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত প্রথম টেগোর বুম দেখা দেয় জাপানে। দ্বিতীয় বুম দেখা দেয় তাঁর শততম জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এখনও প্রচুর জাপানি রবীন্দ্রভক্তের সন্ধান মেলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ইন্টারনেটে। আজও তাঁর জীবন, শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকর্ম, প্রকৃতিপ্রেম, আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবাদ নিয়ে গবেষণা চলছে। অজস্র অনুবাদ ও গবেষণা কাজ সম্পাদিত হয়েছে রবীন্দ্রসাহিত্যের। জাপানি ভাষায় মুদ্রিত সুপ্রচুর দলিলপত্র, তথ্য-উপাত্ত, ইতিহাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জাপানের বিভিন্ন স্থানে।
১৯৫৯ সালে শততম জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে গঠিত হয় ‘তাগো-রু কিনেনকাই’ বা ‘টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন, জাপান’-এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের বন্ধু শিক্ষাবিদ, আধ্যাত্মিক-সংস্কৃতি গবেষক ও কাগজ ব্যবসায়ী আচার্য ড. ওওকুরা কুনিহিকো। তৎকালীন সর্বস্তরের প্রায় ৬০ জন বিশিষ্ট নাগরিককে নিয়ে গঠিত উক্ত অ্যাসোসিয়েশন বিপুল পরিকল্পনা ও প্রকল্পের বাস্তবায়ন করেছিল ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। এর অন্যতম প্রধান ছিল মুখপত্র মাসিক ‘সাচিয়া’ (সত্য) নামে একটি ৮ থেকে ১২ পৃষ্ঠার ট্যাবলয়েড বুলেটিন। সর্বমোট ২২টি সংখ্যা ছাড়াও প্রথম একটি গ্রন্থাকৃতি ইংরেজি ও জাপানি দ্বিভাষিক সংখ্যা ‘তাগো-রু সেইতান হিয়াকুনেনসাই কিনেন: তাগো-রু কিনেনকাই’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে। তাতে কতিপয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গবেষক ও সাংবাদিক রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন জাপানি ভাষায়। সেসব থেকে ১০টি নির্বাচিত নিবন্ধ বাংলা ভাষায় সরাসরি অনুবাদ করা গেল :
টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের মিশন
আরাই হিরোশি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের সাথে মানানসই উচ্চ আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এইবার টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের কাছে ‘প্রাচ্যের সত্য’ তুলে ধরার একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা এবং তাদের পারস্পরিক আদান-প্রদান ও মিলনকে আরও গভীর করবে। এই অর্থে এর গুরুত্ব অত্যন্ত অপরিসীম।
এখন রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষকে সামনে রেখে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু যদি তা কেবল সাময়িক উৎসাহে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা যথেষ্ট হবে না। বরং এই উদ্যোগকে স্থায়ী কার্যক্রম ও প্রকল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এ কাজের জন্য শুধু রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা করা মানুষ বা তাঁর ভক্তদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; বরং এমন অনেক মানুষকেও এতে যুক্ত করতে হবে যারা এখনও রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত মূল্য জানেন না। তাঁর শিল্প ও চিন্তার গভীর অনুপ্রেরণা ও সুন্দর আদর্শের মাধ্যমে মানুষকে মানবতার উচ্চ আদর্শ সম্পর্কে জানানোই আমাদের কাজ হওয়া উচিত। দূরবর্তী প্রতীচ্য সংস্কৃতির প্রভাবের তুলনায় জাপানিরা সাধারণত প্রাচ্য সাংস্কৃতিক প্রবাহের সাথে স্বাভাবিকভাবেই বেশি যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, চীন বা ভারতের মতো কাছের পূর্বদেশগুলোর প্রতি নিজেদের আগ্রহ ও সম্পর্ক খুবই কম।
এই কারণে এতদিন জাপানে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে গবেষণা বা পরিচিতি মূলত তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং তা সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট বিস্তার লাভ করেনি। তাঁর চিন্তা ও ধারণা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধিও খুব সীমিত। এই পরিস্থিতিতে টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম কাজ হওয়া উচিত তাঁর রচনাগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করা। যে-কাজ এতদিন যথাযথভাবে করা হয়নি, সেসব মৌলিক কাজ থেকেই আমাদের শুরু করা উচিত।
একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা ও আদর্শকে উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করে তাকে আরও বিকশিত করার জন্য অভ্যন্তরীণভাবে দৃঢ় গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজ চালাতে হবে। পাশাপাশি বাইরের জগতের প্রতি সক্রিয় উদ্যোগ, প্রকাশনা ও বক্তৃতার মাধ্যমে তা প্রচার করতে হবে, যাতে মানবতার শুষ্ক হয়ে যাওয়া আত্মাকে সমৃদ্ধ করে এমন শিল্প ও চিন্তার সৃজনশীল শক্তি জন্ম নিতে পারে এবং মানুষের মনে শান্তি ও সৌহার্দ্য আনতে পারে। এই কারণেই আমি মনে করি টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের অস্তিত্ব ও তার মিশনের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক এবং গভীর।

রবীন্দ্রনাথ ও চীন
সাকামোতো তোকুমাৎসু
রবীন্দ্রনাথ ১৯২৪ সালের শুরুতে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি লিয়াং চি-চাও-এর আমন্ত্রণে চীন সফরে যান। তিনি ১৭ মার্চ কলকাতা থেকে রওনা হয়ে মে মাসের শেষ পর্যন্ত চীনে অবস্থান করেন।
পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক বক্তৃতাও ছিল। এগুলো নোট আকারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল এবং পরে সেখান থেকে কিছু অংশ চীনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় বলে কথিত আছে। সেই লিপিবদ্ধ বক্তৃতার আরও কিছু অংশ আমি পড়েছি। সেসব অংশ থেকে বোঝা যায় যে রবীন্দ্রনাথ ভারত ও চীনের বন্ধুত্বের কথা জোর দিয়ে বলেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে দমিয়ে রাখা প্রাচ্যের এক নতুন যুগ আসতে চলেছে এই রকম এক ভবিষ্যদ্বাণীমূলক আবেগও সেখানে দেখা যায়।
পশ্চিম ও প্রাচ্যের সাক্ষাৎ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: ‘পশ্চিম কেবল নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি বাড়ানোর জন্য কাজ করেছে এমন নয়; আবার আমাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের সারমর্মকে একত্র করার কাজও তারা করেনি। বরং তারা বস্তুগত লাভ অর্জনের জন্যই কাজ করেছে।’ সেখানে শুধু প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতাবাদকে দেখা নয়, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভিত্তি খুঁজে বের করা বলা বাহুল্য মাত্র।
‘সকালের অন্ধকার কাটেনি, কিন্তু ছোট পাখিরা ইতিমধ্যেই ডাকতে শুরু করেছে এবং সূর্যোদয়ের আগমনের সংবাদ দিচ্ছে। আমার হৃদয় এক মহান নতুন ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে এগিয়ে আসার গান গাইছে। আমাদের সেই নতুন যুগকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হতে হবে।’ চীনের ছাত্রদের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ এ কথা বলেন।
‘যখন আমি শিশু ছিলাম, তখন চাঁদহীন রাতের অন্ধকারে আমি বুঝতেই পারতাম না যে, আমরা কী এক মহান যুগে জন্ম নিয়েছি। কিন্তু আজ সেই মহান যুগের অর্থ ও দায়িত্ব পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।’
ভারতের জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্রে রবীন্দ্রনাথের আগাম ধারণা ও ভবিষ্যষদ্বাণীর মধ্যে আজকের চীন ও ভারতের বিকাশের প্রেক্ষাপটে কিছুটা অস্পষ্ট মনে হতে পারে, কিন্তু তবু সেগুলোর সত্যতা আমরা খুব তাড়াতাড়িই উপলব্ধি করতে পারি।
রবীন্দ্রনাথ ও বৌদ্ধধর্ম
ইনাজু কিজোও
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে এবং কী রকম উপলক্ষ্যে বুদ্ধের (শাক্যমুনি) প্রতি গভীর মনোযোগী হয়েছিলেন, অথবা তিনি কোন কোন বৌদ্ধ গ্রন্থ পড়েছিলেন এসব বিষয়ে তিনি নিজে বিশেষ কিছু বলেননি, তাই তা স্পষ্টভাবে জানা কঠিন। তবে যদি আরও নির্দিষ্টভাবে বলা যায়, তাহলে দেখা যায় যে, চল্লিশ বছর আগের তাঁর রচনা বিশেষ করে, শান্তিনিকেতনে নতুন শিক্ষকের জীবন শুরু করার আগের সময়কার লেখাগুলোতে বুদ্ধের প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যদিও এটি কেবল হতে পারে অনুমান মাত্র। কারণ, তাঁর বাংলা ভাষায় লেখা অনেক রচনার মধ্যে তেমন কিছু থাকতে পারে। কিন্তু ইংরেজিতে অনূদিত রচনায় সেই সংযোগ আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। কাজেই মনে হয়, সেই সময়ে বুদ্ধের চিন্তার সঙ্গে তাঁর হৃদয়ের সংযোগ না থাকাই স্বাভাবিক।
রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় চেতনার জাগরণ খুবই অল্প বয়সে শুরু হয়েছিল। তাঁর জীবনস্মৃতির মধ্যে তিনি লিখেছেন যে, প্রায় বিশ বছর বয়সে এক সকালে তাঁর জীবনে এক ধরনের আত্মজাগরণের অভিজ্ঞতা ঘটে এবং তা ছিল বুদ্ধের জাগরণের সঙ্গে কোনওভাবে সম্পর্কিত গভীর অনুভূতি। এটিই যেন তাঁর এক নতুন জন্ম হয়ে উঠেছিল। এরপর মানুষের দুঃখকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ধর্মীয় চেতনা আরও গভীর হতে থাকে। চৌত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ বছর বয়সকালে লেখা তাঁর চিঠিগুলোতে আমরা দেখতে পাই তিনি যেন অনুভব করছিলেন যে, কেবল চিন্তা নয়, কোনও না কোনও কর্মের মাধ্যমে মানবতার জন্য কিছু করা জরুরি। এই চিন্তাধারাই কয়েক বছর পরে তাঁকে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যায়। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার পথপ্রদর্শক হন বুদ্ধের পরিবর্তে মহর্ষি হিসেবে অভিহিত তাঁর পিতা এবং পবিত্র উপনিষদ। বিশেষ করে, তাঁর পিতার প্রভাবই অপরিসীম।
এই আধ্যাত্মিক ভিত্তির ওপর ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা প্রবেশ করতে থাকে। সম্ভবত মানুষের হৃদয়ের বিকাশের স্বাভাবিক পথ হিসেবেই এটি ঘটেছিল। তিপ্পান্ন বছর বয়সে প্রকাশিত তাঁর রচনা he Realisation of life-এও আমরা দেখতে পাই বুদ্ধের শিক্ষাই তাঁর মানবতাবাদী চিন্তা ও আদর্শের গভীর ভিত্তি তৈরি করেছে। পরবর্তী প্রায় দশ বছরের লেখাগুলোতে মহাযান বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর উপলব্ধি ও সহানুভূতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদা ভারতেই জন্ম নেওয়া মহাযান বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্য এভাবে তাঁর জীবনে বারবার প্রকাশ পেতে থাকে। জীবনের শেষদিকে তিনি একজন বুদ্ধে প্রণত মানুষের প্রতিমূর্তি ধারণ করেছিলেন। বুদ্ধগয়ায় একজন জাপানি জেলের সঙ্গে কাটানো এক রাতের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন, সেই লেখাটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ।
রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবনের শেষার্ধে উপলব্ধ বিষয় ছিল ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ যা কি না আমার নিজের ভেতরে একই মননের জাগরণ। তবে না। বরং এটা জাপানের ভেতরে সুপ্তভাবে থাকা এমন কিছু, যা আমার ভেতরেও একই গভীর অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলবে নিশ্চিত। আমি সেটাই প্রত্যাশা করি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকটে পৌঁছানো
মোরিমোতো তাৎসুও
আমি এই মহান কবির নাম প্রথম জানতে পারি যুদ্ধোত্তর সময়ের চিন্তাগত বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিজের আত্মার দিক খুঁজতে থাকা এক তরুণ ছাত্র হিসেবে। সেটি ছিল আমার জীবনের এক স্মরণীয় ঘটনা। কিন্তু স্বীকার করতে হয়, পূর্বদেশে জন্ম নেওয়া এই বিরল কবির নাম ও রচনার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল মূলত পাশ্চাত্যের রোম্যাঁ রোলাঁর মাধ্যমে। সেই সময়ে জাপানের সাহিত্যজগতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। আজও মনে পড়ে একজন বিদেশি মিশনারির কাছ থেকে ধার নেওয়া গীতাঞ্জলি-র একটি ছোট নোটবুকে নকল করে লেখা পঙ্ক্তিগুলোর সেই শান্ত আবেগ আমি কখনও ভুলতে পারিনি। সেই অনুভূতি ছিল যেন হৃদয়ের গভীরে প্রথম উদিত হওয়া এক আলোকময় প্রেরণা। সেই দিন থেকে আমার কাছে এমন কোনও দিন নেই যেদিন আমি রবীন্দ্রনাথের নাম স্মরণ করিনি! তাঁর সেই মহিমাময় নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃদয় ভরে ওঠে নতুন অনুভূতিতে, মানবতার প্রতি অসীম বিশ্বাসে এবং মানুষের সঙ্গে বাঁচার গভীর আনন্দে।
রবীন্দ্রনাথের শিল্প ও ব্যক্তিত্ব মানবতার সর্বোচ্চ সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রকাশ। একই সঙ্গে, তাঁর রচনার মহানতা স্বীকার করার পাশাপাশি আমি তাঁর প্রতি একজন মানুষ হিসেবে গভীর আত্মীয়তা অনুভব করি। কারণ তিনি এমন এক কবি যিনি এক ফোঁটা শিশির বা একটি ফুলের মাঝেও অসীম অনন্তকে দেখতে পান এবং মানুষের আত্মার গভীরতম স্তর স্পর্শ করতে পারেন। আবার, তিনি সেই দয়ালু পিতা যিনি মাতৃহীন সন্তানের জন্য নিজের রচিত গান গেয়ে শোনান। এমনকি, মৃত্যুশয্যায় শুয়েও তিনি সেইসব ক্ষুধার্ত দেশবাসীর জন্য চিন্তিত থাকেন, যারা এক গ্লাস জলের আশায় কাদাজল হাতড়ে বেড়ায়। এই কারণেই তিনি প্রকৃত অর্থে একজন মানবতাবাদী।
আজকের ভারতবর্ষে তাঁকে ‘গুরুদেব’ বলে শ্রদ্ধার সঙ্গে সম্বোধন করা হয়। তবে তিনি কেবল ভারতবাসীরই গুরু নন, তিনি ভবিষ্যৎ মানবজাতিরও এক মহান শিক্ষক। এবং আজও, জাপানের কোনও ছোট শহরে বসবাসরত এক বিভ্রান্ত তরুণের ক্ষুদ্র জীবনকে সত্যিকার অর্থে বাঁচতে শেখানোর জন্য তিনি এক উত্তম পথপ্রদর্শক।
প্রচ্ছদ ও ছবি
কাৎসুতা শোওকিন
১৮৯৫ সালের শরৎকালের কথা মনে পড়ে। তেনশিন স্যারের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্রে সানো জিননোসুকে এবং আমি দুজন রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। সানো তখন জুডোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেই সূত্রেই তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে জুডো শেখাতেন। আমিও রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সূচনাকৃত শিল্পকলা বিদ্যালয়ে পাশ্চাত্য চিত্রকলা শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাঁর বাড়িতে প্রায় দু বছর বসবাস করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের বাড়ি ছিল একটি বড় পরিবারের মতো। বিশাল প্রাঙ্গণের মধ্যে ভাই-ভাইদের আলাদা-আলাদা বাসভবন ছিল এবং সবাই খুব আন্তরিকভাবে মিলেমিশে থাকতেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয় চালু করার পর চার-পাঁচ বছর চলছে। তিনি মাঝে মাঝে কলিকাতার বাড়িতে ফিরে আসতেন। প্রচ্ছদের ছবিটি তখনকার কোনও এক সময় গগনেন্দ্রনাথের বাড়ির বাগানে গৃহীত। এছাড়া আরও অনেকের সঙ্গে গৃহীত ছবির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথেরও একক ছবি তিনি সানো এবং আসাকে পাঠিয়েছিলেন। ভারতীয়দের কাছেও এটা বিরল ঘটনা বলে মনে করি। প্রসঙ্গত, তখন রুশ-জাপান যুদ্ধে জাপানের মহাজয়ের অব্যবহিত সময় ছিল বলে ভারতীয়রা আমাদেরকে অত্যন্ত উষ্ণভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। খুব সাধারণ ভাষায় বললে বলতে হয় আমরা তখন অত্যন্ত আনন্দময় দিন কাটিয়েছিলাম।
সেই সময় আমি মাঝে মাঝে স্কেচবুক নিয়ে ভ্রমণে বের হতাম। এখন, যখন প্রচ্ছদের* জন্য ছবির কথা উঠল, তখনকার স্কেচবুকটি বের করে কিছু উপযুক্ত বিষয় খুঁজতে লাগলাম। ভারত-জাপান বন্ধনের অর্থবোধ থেকে আমি বুদ্ধগয়ার বটগাছের একটি পাতা বের করলাম। এরপর শেষ প্রচ্ছদের জন্য সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে একদা গেলে প্রস্ফুটিত অশোক ফুলের গভীর ছাপ থেকে একটি ফুল এঁকে ফেললাম। এটাই শেষ প্রচ্ছদের জন্য দিলাম।
*প্রচ্ছদ বলতে এখানে তাগো-রু কিনেনকাই (টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন) এর কথা বলা হয়েছে।
ইজুরা ও রবীন্দ্রনাথ
ওকাকুরা কোশিরো
আমার দাদু তেনশিন জীবিত থাকাকালে হিতাচি প্রদেশের ইজুরা নামে পরিচিত যে জায়গাটি ছিল বর্তমানে সেটা ইবারাকি প্রিফেকচারের কিতা-ইবারাকি-শি ওৎসু-চোও শহরের অধীন ইজুরা। সেটা বলাই বাহুল্য, একসময় জাপান নিহোন বিজুৎসুইন (আর্ট ইনস্টিটিউট)-এর অবস্থানস্থল ছিল। একই সঙ্গে সেখানে ছিল তেনশিনের সমুদ্রতীরস্থ বাসভবনও। প্রশান্ত মহাসাগরের প্রচণ্ড ঢেউ যেখানে তীরে আছড়ে পড়ে, সেই সমুদ্রতীরের মাথায় অবস্থিত লাল রঙের রোক্কাকুদোও (ষড়ভুজাকৃতির কুঠুরি) ছিল তেনশিনের খুব প্রিয় জায়গা। তিনি সেখানে বসে প্রায়ই গভীর ধ্যান ও চিন্তায় মগ্ন থাকতেন।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই তেনশিনের সমুদ্রতীরের বাসভবনে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন তাইশোও পঞ্চম বছরে (১৯১৬ সালে), যখন তিনি প্রথমবার জাপান সফরে আসেন। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। কিন্তু কবি আমাকে কোলে তুলে নিয়ে সেই বাসভবনের বাগানের ঘাসের ওপর খেলেছিলেন এই স্মৃতিটা আজও আমার মনে স্পষ্টভাবে রয়ে গেছে।
তেনশিন তিন বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাই কবি তাঁর অন্তরের বন্ধু তেনশিনের সঙ্গে সরাসরি আলাপ করার সুযোগ পাননি। তবে তেনশিন যে এশিয়া ও ভারতের প্রতি গভীর আকর্ষণ ও ভাবনা পোষণ করতেন, সেই সমুদ্রতীরের এই বাসভবনটি কবির কাছেও নিশ্চয়ই এক ধরনের স্মৃতিময় অনুভূতি জাগিয়েছিল।
পরবর্তীকালে আমার দাদির কাছ থেকে প্রায়ই শুনেছি যে, কবির সেই অবস্থানকালটা দৃশ্যত খুব কঠিন ছিল। কারণ কবি সকালের প্রাতঃরাশে যে পাউরুটি খেতেন, তা ওৎসু শহরে পাওয়া যেত না। তাই টোকিও থেকে কেনা পাউরুটি গভীর রাতে নিকটবর্তী স্টেশনে পৌঁছানো হতো। তখনকার সেকিমোতো স্টেশন (বর্তমানে ওৎসুকো স্টেশন) দিয়ে যাওয়া একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের কন্ডাক্টর সেই পাউরুটি স্টেশনের কর্মচারীর কাছে ছুড়ে দিতেন এবং সেখান থেকে তা পৌঁছে দেওয়া হতো। এছাড়া সেখানে কোনও বিছানা না থাকায় গ্রামের একজন কাঠমিস্ত্রিকে দিয়ে একটি বড় কাঠের টেবিল বানানো হয়েছিল এবং সেটাকেই তড়িঘড়ি করে বিছানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এমন নানা গল্প শুনেছি।
সেই সময় কবি তেনশিনের সমাধির পাশে, যা তেনশিনের সমুদ্রতীরের বাসভবনের পেছনে অবস্থিত, স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তিনটি পাইন গাছের চারা রোপণ করেছিলেন। আজ সেই পাইন গাছগুলো প্রায় বারো-তেরো মিটার উঁচু হয়ে উঠেছে এবং তারা নীরবে তেনশিনের সমাধির ওপর ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে।

রবীন্দ্রনাথকে প্রেরিত সহমর্মিতা
কাতায়ামা তোশিহিকো
আজ থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে, আমি যখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন জাপানি ভাষার ক্লাসে প্রথম জানতে পারি যে আমেরিকার এমারসন ‘বেদ’কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তার দুই-তিন বছর পরে আমি এমারসনের ‘চক্র তত্ত্ব’ (Circles), ‘সাধারণ মানবাত্মা’ এবং কবিতা ‘ব্রহ্ম’ পড়ে অনুরণন অনুভব করি। এরপর অল্পদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি, সাধনা, পার্সোনালিটি ইত্যাদি রচনার সঙ্গে পরিচিত হই। সেখান থেকে যে সৃজনশীল, গভীর মানবিক এবং সমন্বিত সুরের শক্তি বিকিরিত হয়, তার অর্থ আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল। সেই সময় থেকেই আমার হৃদয়ের প্যান্থিয়নে আমি সেই ভারতীয় কবির প্রতিমাকে স্থান দিয়ে রেখেছি।
দীর্ঘ উপন্যাস গোরা, চার অধ্যায় (যা রোম্যাঁ রোলাঁর ছোট বোন ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন) প্রভৃতি রচনার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ তাঁর দেশের সমাজ, মানুষের জীবনযাত্রা এবং প্রকৃতিকে এক বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি নানা আকর্ষণীয় চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের চিত্র এঁকেছেন। এই সব সিম্ফনির মতো বিস্তৃত রচনা পড়ার পর হৃদয়ে যে অনুভূতি থেকে যায়, তা হলো গভীরতর উচ্চমানবতা এবং সৃজনশীল ঐক্যের এক নির্মল জ্যোতির স্বাদ।
বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ যে নারীরূপ এঁকেছেন, তা আমাদের মনে যে মহৎ ও অন্তর্লীন সুরেলা ছাপ রেখে যায়, তা আমি কখনও ভুলতে পারি না। এতে মনে হয় যেন ভারত মানবজাতির চিন্তার এক উৎস, এক ‘মাতা’।
আজকের এই পৃথিবীতে যখন অস্থিরতা, সন্দেহ এবং বিভাজন মানুষের জীবনকে অন্ধকার করে তুলছে, তখন রবীন্দ্রনাথের ‘Creative Unity’-এর উৎসধারা সর্বদা প্রবাহিত হচ্ছে এই ভাবনাটুকুও এক ধরনের সান্ত্বনা দেয়।
১৯৩০ সালে আমি প্যারিসে প্রবীণ রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির একটি একক প্রদর্শনী দেখেছিলাম। বৃদ্ধ বয়সে শুরু করা তাঁর চিত্রকর্মগুলো ছিল বিস্ময়করভাবে মৌলিক ও সতেজ। রং এবং আঙ্গিকের স্বাধীন কল্পনার মধ্য দিয়ে সেগুলো যেন সেই মহাকবির হৃদয়ের প্রকৃত রূপটিকে ব্যাখ্যা করছিল।
এই সব শিল্পকর্ম যেন সব ধরনের শিল্পধারা বা মতবাদকে অতিক্রম করে এক আনন্দময় প্রকাশে পৌঁছেছে। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, ‘টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন’ রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী কর্মের তাৎপর্য উন্মোচনের জন্য ভবিষ্যতের এক মূল্যবান উদ্যোগের সূচনা হয়ে উঠবে।
রবীন্দ্রনাথ থেকে আমরা যা
শিখতে চাই
আসানো য়ুকিহো
আসলে রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়া শুরু করার পর এখনও এক বছর পূর্ণ হয়নি, তাই তাঁকে নিয়ে বিস্তারিতভাবে বলার মতো যোগ্যতা আমার প্রায় নেই বললেই চলে। তবু কিছুটা সাহস করে আমার কিছু অনুভূতি জানাতে চাই।
আমি যখন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কথা বলতে চাই, তখন মূলত তাঁর চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আধুনিক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে কীভাবে ভাবা যায় এই বিষয়টিই সামনে আসে। সত্যি বলতে গেলে, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমার আগ্রহ খুব সামান্যই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার সামনে এমন কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে যা গবেষণার বিষয় হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ এবং যা কেবল তথ্য হিসেবে নয়, বরং নিজের চিন্তাধারাকে গভীরভাবে ভাবতে সাহায্য করে। এই ধরনের চিন্তাবিদদের সঙ্গে পরিচিত হতে পারা আমার কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞতার বিষয়।
যে সময়ে ভারতের বাস্তব অবস্থা ছিল অজ্ঞতা ও দারিদ্র্যে ভরা, সেই সময়েই শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে রবীন্দ্রনাথ এমন একটি শিক্ষার পথ দেখিয়েছিলেন যা দেশের নিজস্ব ঐতিহ্যের গভীর থেকে উৎস খুঁজে নিয়ে গড়ে উঠেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন মানুষ গড়ে তোলা যারা মানবতার বিকাশ ঘটাবে। এই শিক্ষা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে, পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং নানা সংকট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক নতুন মানবসমাজের সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে গেছে। সেই অর্থে এটি এমন এক বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিতে চেয়েছিল যা মানুষের মিলনের ক্ষেত্র হবে। এই আধুনিকতার পথে অগ্রসর হওয়ার প্রক্রিয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন জাতির কাছেও তা উৎসাহের উৎস হয়ে উঠেছিল। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি মূল্যবান অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে; কারণ, তিনি ঐতিহ্য ও মানবিকতার ধারাকে ধারণ করে শিক্ষাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে চেয়েছিলেন। আজকের কঠিন সময়ে রবীন্দ্রনাথের এই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিক্ষা নেওয়া আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। ভারতীয় জাতির গঠন ও বিকাশের ইতিহাস বোঝার জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর ভারতের ঐতিহ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার আরও গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে আমরা নিজেদের সংস্কৃতিকে কীভাবে নতুনভাবে উপলব্ধি করব সেই প্রশ্নও সামনে আসে। আমাদের ‘বিশ্ব ইতিহাস’ কেবল পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যাবে না। সত্যিকারের বিশ্বকে বোঝার জন্য এশিয়ার বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাসও জানতে হবে এবং একেবারে নতুনভাবে তা উপলব্ধি করতে হবে। এটি কেবল সাংস্কৃতিক শোভা বাড়ানোর জন্য নয়, বরং তার মহত্ত্ব ও গভীরতাকে সত্যিকারভাবে গ্রহণ করার জন্য। বর্তমান জাপানি সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিষয়গুলোকে নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে আমাদের জীবনযাত্রায় গ্রহণ করা দরকার। এইভাবেই যেন ‘স্মৃতি পরিষদ’-এর কাজও এগিয়ে যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ও আমি
ইয়ামাজাকি মাসাজো
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলতে গেলে, আমার মনে হয় যেন জীবনের প্রকৃত আনন্দ অনুভব করতে করতে আমি ধীরে ধীরে দেরিতে তাঁর কাছে পৌঁছেছি। যদিও আমি এখনও তাঁর বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি যখন তাঁকে অনুধাবনের চেষ্টা করি, তখন মনে হয় রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এমন কিছু রয়েছে যা পুরোপুরি বোঝা সত্যিই কঠিন। অনেক সময় মনে হয় তিনি যেন আমার নাগালের বাইরে অবস্থান করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে মনে হয়, তিনি আমার ভেতরেই কোথাও উপস্থিত আছেন। দূরে থেকেও যেন তিনি আমার মধ্যে সাহস জাগিয়ে দেন। এই কারণেই আমি মনে করি, তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি আমাদেরকে সত্যিকারের ‘মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার’ অর্থ অনুভব করতে সাহায্য করেন।

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমার ধারণা
কুসানো শিনপেই
আগে আমি ‘হংকংয়ে টেগোর’ নামে একটি লেখায় নিম্নরূপ একটি ঘটনা লিখেছিলাম।
‘আমি ঘাট থেকে সিঁড়ি বেয়ে জাহাজে উঠলাম এবং একজন বয়ের মাধ্যমে জানালাম যে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে দেখা করার সুযোগ দিলেন। তিনি ধূসর রঙের সুতির গাউনের মতো ভারতীয় পোশাক পরেছিলেন এবং পায়ে ছিল না কোনও জুতা। কেবল স্লিপারের মতো স্যান্ডেল পরেছিলেন। তাঁর দেহ ছিল লম্বা, আর তার উপর সেই পরিচিত সাদা চুলের মুখ যা আমরা ছবিতে দেখে চিনি। আমি মুহূর্তের মধ্যে শুধু ভাবলাম, কী অপূর্ব সুন্দর!
ভারতীয়রা মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এমন এক জাতি যাদের সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা যায়; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমার আগে দেখা সব ভারতীয়ের তুলনায় অনেক বেশি সুন্দর। এটা ছিল মাত্র এক মুহূর্তের ব্যাপার, কিন্তু আমি যেন স্থির হয়ে গিয়েছিলাম। তাঁর চোখ গভীর অতল গহ্বরের মতো শান্ত, স্নিগ্ধ আর্দ্রতায় ঝলমল করছিল। সেখানে ছিল প্রাচ্যের বেদনা ও প্রজ্ঞা। এসব কথা তো পরে নিজের স্বপক্ষীয় যুক্তি দিয়ে বলা। আসলে আমি কেবল তাঁর আকর্ষণে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।’
ওপরের লেখায় যে ঘাটের কথা বলা হয়েছে, সেটি ছিল কৌলুনের জেটি। সম্ভবত তাইশোও যুগের বারো বা তেরো সালের কথা (প্রায় ১৯২৩-২৪)। তখন রবীন্দ্রনাথ পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে যাওয়ার মাঝপথে ছিলেন। তাঁর জীবনী দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যাবে। সেই সময় আমার বয়স ছিল বাইশ বা তেইশ।
মলিন ধূসর পোশাক এবং স্যান্ডেল এখনও স্মরণ করলে মনে হয়, সেগুলো তাঁকে অসাধারণ মানিয়েছিল। পশ্চিমা পোশাক বা আঁটসাঁট সাদা প্যান্ট পরা রবীন্দ্রনাথকে কল্পনাই করা যায় না; তাঁর সেই পোশাক যেন তাঁর নিজের সত্তারই অংশ ছিল। রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি উচ্চারণ ছিল সত্যিই অত্যন্ত সুন্দর। তা ছিল বেস কণ্ঠ নয়, বরং স্বচ্ছ টেনর কণ্ঠের মতো। যদিও স্বচ্ছ, তবু তা তীক্ষè নয়; আবার জোরালোও নয়। বরং যেন কোমলভাবে সবকিছুকে আচ্ছাদন করে রাখে এমন শান্ত ও প্রবহমান এক কণ্ঠস্বর, যা সত্যিই অত্যন্ত সুন্দর ছিল।
লেখক পরিচিতি
আরাই হিরোশি শোওয়া যুগের (১৯২৬-১৯৮৯) প্রসিদ্ধ দাইতোও বুনকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক। একই সঙ্গে অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘নিহোন বুনগাকু বিজুৎসু কিয়োওকাই’ তথা ‘জাপান সাহিত্য-শিল্প সংস্থা’র অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। এই সংস্থার মুখপত্র তথা সাময়িকী ছিল হিয়োওশোও (প্রতিচ্ছবি)। এই সাময়িকীর প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি ১৯৫৮-৫৯ সালের দিকে। শিল্প-সাহিত্য-দর্শনবিষয়ক এই সাময়িকীটি ছিল বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের অনন্য এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের প্রতীক ও মিলনস্থল। এর দপ্তরে তৎকালীন প্রথম শ্রেণির কবি, সাহিত্যিক, গবেষকরা মিলিত হতেন এবং নিয়মিত লেখালেখি করতেন।
সাকামোতো তোকুমাৎসু (১৯০৮- ১৯৮৮) : জাপানের আইচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশারদ। ‘জাপান ভিয়েতনাম মৈত্রী সংস্থা’র সংগঠক, ‘আফ্রো-এশিয়ান পিপলস সলিডারিটি অরগানাইজেশন-জাপান’-এর কার্যকরী সদস্য এবং ‘জাপান-কম্বোডিয়া মৈত্রী সংস্থা’র প্রধান পরিচালক। মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, হো চি মিনকে নিয়ে লিখিত গ্রন্থ ছাড়া আরও একাধিক মূলবান গ্রন্থের রচয়িতা। বিশিষ্ট রবীন্দ্রভক্ত।
ইনাজু কিজোও (১৯০২-১৯৮৯) : বিখ্যাত তামাগাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক, বৌদ্ধধর্ম বিশেষজ্ঞ এবং রবীন্দ্ররচনার অনুবাদক। জাপানে শততম রবীন্দ্র জন্মোৎসবের অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা। তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ একাধিক গ্রন্থ বিদ্যমান। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি গীতিনাট্য দি সাইকল অব স্প্রিং বা হারু নো মেগুমি, মাহা-শি দে-ভেনদোরানা-তো তাগো-র বা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের Sādhanā et selected essays on religion and education, জাপান যাত্রীর জাপানি অনুবাদ সন্দীপ ঠাকুরের সঙ্গে যৌথভাবে তাগো-রু তো নিহোন নামে।
মোরিমোতো তাৎসুও (১৯২৮-২০১৬): নাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। প্রাক্তন অধ্যাপক বিশ্বভারতী। বিশিষ্ট ভারতবিশেষজ্ঞ এবং রবীন্দ্রগবেষক। গানদি বা গান্ধী, ইনদো নো দোকুরিৎসু শি বা ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস, হিনদুউকিয়োও: ইনদো নো সেই তো জোকু বা হিন্দুধর্ম: ভারতের পবিত্র এবং অপবিত্র, হিনদুউকিয়োও নো সেকাই বা হিন্দুধর্মের জগৎ, গেনতেন দে য়োমু তাগো-রু অর্থাৎ মূল রচনায় রবীন্দ্রপাঠ প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা। ইনদো নো উতা বা ভারতের গান, মহাত্মা গান্ধীর মাই নন ভায়োলেন্স বা ওয়াতাশি নো হিবোওরিয়োকু, কৃষ্ণ কৃপালনীর রবীন্দ্রনাথ টেগোর: এ বায়োগ্রাফি বা তাগো-রু নো শোওগাই, নীরদচন্দ্র চৌধুরীর হিন্দুইজম: এ রিলিজিয়ন টু লাইভ বাই বা হিনদুউকিয়োও প্রভৃতি অনুবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি, জীবন এবং মৃত্যুবিষয়ক কবিতার অনুবাদ বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।
কাৎসুতা শোওকিন (১৮৭৯-১৯৬৩): ওকাকুরাশিষ্য কাৎসুতা জাপানের খ্যাতিমান একজন চিত্রশিল্পী। ১৯০৫ সালে তিনি ভারতে যান এবং ১৯০৭ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। শিল্পাচার্য ওকাকুরার সুপারিশক্রমে জাপান সরকারের কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে তাঁকে ‘ডিজাইন’ শেখার জন্য ভারতে পাঠানো হয়, যদিও এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল জাপান-বাংলা শিক্ষা-সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কাৎসুতা তাই বেশির ভাগ সময় ঠাকুরবাড়ি ও শান্তিনিকেতনে অবস্থান করতেন। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আরও দুজন জাপানি শিল্পী য়োকোয়ামা তাইকান ও হিশিদা শুনসোওসহ অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ প্রমুখের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি কলকাতা আর্ট স্কুলেও জাপানি কলাকৌশল শিক্ষা দিতেন। উল্লেখ্য যে, জাপানি চিত্রশিল্পীদের মধ্যে তিনিই প্রথম চিত্রকলার শিক্ষক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৯০৭ সালে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘নিহোন গেইজুৎসুইন’ বা ‘জাপান আর্ট একাডেমি’ আয়োজিত প্রথম ‘বুনতেন’ বা ‘চিত্রশিল্প প্রদর্শনী’তে তাঁর অঙ্কিত ভারতীয় চিত্রগুলো প্রদর্শিত হলে পরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেকবার তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে যুদ্ধপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে।
ওকাকুরা কোশিরোও (১৯১২-২০০১): ওকাকুরা তেনশিনের প্রপৌত্র। আন্তর্জাতিক রাজনীতিগবেষক, অর্থনীতিবিশেষজ্ঞ, সায়েন্স কাউন্সিল অব জাপানের উপচেয়ারম্যান, জাপান কাউন্সিল এগেনস্ট এটমিক অ্যান্ড হাইড্রোজেন বোমস-এর বিশেষজ্ঞ-সদস্য, জাপান শান্তি কমিটির কার্যকরী সদস্য, জাপান এশিয়া-আফ্রিকা- লাতিন আমেরিকা সলিডারিটি কমিটির সম্মানিত স্থায়ী পরিচালক। বই মূল্যবান গ্রন্থের রচিয়তা এবং অনুবাদক।
কাতায়ামা তোশিহিকো (১৮৯৮-১৯৬১): কবি, সাহিত্য সমালোচক, জার্মানভাষা ও সাহিত্য এবং ফরাসি সাহিত্যবিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক। বিভিন্ন সময় তিনি ফ্রান্সের নোবেলবিজয়ী বিশ্বখ্যাত লেখক এবং চিন্তক রোম্যাঁ রোলাঁ (১৮৬৬-১৯৪৪), নোবেলবিজয়ী জার্মান লেখক হারম্যান হেস (১৮৭৭-১৯৬২), জার্মান কবি, লেখক, সমালোচক, সাংবাদিক জন হাইনরিখ হাইনে (১৭৯৭-১৮৫৬), বিশ্বখ্যাত জার্মান কবি, লেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রকৃতিবিজ্ঞানী এবং আইনবিদ জন ইয়োহান ভল্ফগাং ফন গ্যোটে (১৭৪৯-১৮৩২) প্রমুখের রচনাসমগ্রের অনুবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট ভক্ত। বহু গ্রন্থ প্রণেতা।
আসানো য়ুকিহো (১৯৩৭-২০০০), লেখক ও এশিয়াবিষয়ক গবেষক। তিনি জাপানের ‘ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপিং ইকোনমিক্স’ (IDE-JETRO) প্রতিষ্ঠানে একজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষক এবং এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণার একটি বড় অংশ ফিলিপাইনের রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে রচিত।
ইয়ামাজাকি মাসাজো (১৯২৮-২০০৬) : তিনি জাপানের অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রকাশনা সংস্থা ‘শিনচোওশা’র অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৫০ সালে গেইজুৎসু শিনচোও (Geijutsu Shincho) নামক একটি বিখ্যাত শিল্পকলাবিষয়ক ম্যাগাজিন যাত্রা শুরু করে, তখন তিনি এর সম্পাদনা বিভাগে যোগ দেন। পরবর্তীকালে তিনি এই ম্যাগাজিনটির সম্পাদক-প্রধান (Editor-in-Chief) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর একাধিক বিখ্যাত গ্রন্থ রয়েছে।
কুসানো শিনপেই (১৯০৩-১৯৮৮) : বিংশ শতাব্দীর জাপানের অন্যতম প্রভাবশালী এবং আধুনিকতাবাদী কবি। তিনি মূলত তার ‘ব্যাঙ’ (Frogs) সংক্রান্ত কবিতার জন্য বিশ্বজুড়ে সমধিক পরিচিত। তাকে জাপানে আদর করে ‘ব্যাঙের কবি’ বলা হয়। তার জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে চীনে। তিনি চীনের গুয়াংজু (Canton) শহরের লিংনান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। এই চীনা অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী কাব্যচেতনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
কবি কুসানো বিশ্বাস করতেন ব্যাঙ হলো প্রকৃতির পবিত্র প্রতিনিধি। তার কবিতায় ব্যাঙ কোনও তুচ্ছ প্রাণী নয়, বরং তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আনন্দ, দুঃখ, সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার প্রতীক। তার জনপ্রিয় একটি কাব্যগ্রন্থ গেক্কো (ব্যাঙের ডাক)। তিনি জাপানি আধুনিক কবিতার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৮ সালে তিনি রেইতেকি (Chronicle) নামক একটি কাব্য পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন, যা জাপানের সমসাময়িক কবিদের জন্য একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জাপানি সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন, তার মধ্যে রাষ্ট্রীয় পদক ‘Order of Culture’ (১৯৮৭) অন্যতম। কবি কুসানো শিনপেই শান্তিনিকেতনে ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শনে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা করতেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক



