Uncategorized

প্রবন্ধ : ভালোবাসায় বাড়ানো হাত ও  দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ : তুলনামূলক পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : মোস্তফা মোহাম্মদ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অ্যালেন গিন্সবার্গ, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান প্রমুখ জগদ্বিখ্যাত কবি-শিল্পীর অবদানের কথা স্বীকৃত সত্য। এই শিল্পসত্যের স্রোতোধারায় ভাসতে-ভাসতে, চলতে-চলতে প্রায় ষাট বছর বয়সে এসে এ কথা নির্দ্বিধায় বলতেই পারি যে, প্রকৃষ্টরূপে প্রমাণিত-অর্জিত মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা প্রাপ্তির সাফল্যের নেপথ্যে দৈশিক-আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহুরৈখিক মানবিক মানুষ, সংগঠন ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহায়তা ছিল; অনেকেই যুক্ত হয়েছিলেন পূর্ব-পাকিস্তান তথা সেই সময়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের সর্বৈব কল্যাণাকাক্সক্ষায়।

প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, পরোক্ষ প্রমাণ―সংবাদপত্র, বইপুস্তক, রেডিও-টিভি-ক্যাসেট, স্থিরচিত্র, নাটক, চলচ্চিত্র এবং গান-কবিতা-গবেষণা বিশেষত, ইতিহাস-আশ্রিত লেখা অথবা ঐতিহাসিক নিবন্ধ-প্রবন্ধ, পুস্তক-প্রকাশনা থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটা দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়। এই প্রমাণিত সত্যের মাহাত্ম্য তখনই বেড়ে যায়, যখন ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী-বন্ধু শিরোনামাঙ্কিত, মতিউর রহমান লিখিত বইটি আমার টেবিলে শোভা পায়। আমেরিকান শিল্পী জর্জ হ্যারিসন ও ভারতীয় পণ্ডিত রবিশঙ্করের যুগলবন্দি স্থিরচিত্র দিয়ে স্বনামখ্যাত প্রচ্ছদশিল্পী অশোক কর্মকার অঙ্কিত প্রচ্ছদের শিল্পমাহাত্ম্য ভারত-ভূমির শিল্পের সীমানাকে কলকাতা-টু-নিউইয়র্ক-টু-লন্ডন পর্যন্ত আমার মানসপটে বোধ জাগায়―চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে কলকাতা থেকে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সহযোগিতামূলক গানের অনুষ্ঠান।  অ্যালেন গিন্সবার্গের লেখায়, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, জোয়ান বায়েজের সুরমূর্ছনায় আন্দোলিত হয়ে ভারত-সীমান্তবর্তী বন্দর ওপারের পেট্রাপোল পেরিয়ে ইতিহাস-আশ্রিত ও মানবিকতার সুরমূর্ছনায় আন্দোলিত এপারের বেনাপোল বন্দর নগরীর হাল আমলের নবগঠিত সংগঠন ‘যশোর রোড ৭১’-এর ব্যানার হাতে ধরে লাখ লাখ শরণার্থী বাংলাদেশের সীমানা পাড়ি দিয়ে কোলকাতার দিকে এগিয়ে যায়―একাত্তরের স্মৃতিবহ শব্দের বার্তায়, মৌসুমী ভৌমিকের বাংলায় গাওয়া ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক গানটির অন্তর্নিহিত বেদনার জ্বালায় এখন বহুলভাবে আমরা আলোকিত হই।

দুই

কীর্তিমান কথাসাহিত্যিক-সম্পাদক মোহিত কামাল কর্তৃক প্রেরিত মুঠোফোনিক অনুষ্ঠানপত্রের ক্যারিশমায় গত ২৭ মার্চ, ২০২৬, শুক্রবার ‘আলাপে বিস্তারে’ শিরোনামের ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু গ্রন্থের উপর আয়োজিত আলোচনা, সঙ্গীত পরিবেশনা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্থিরচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে হাজির হই বেঙ্গল শিল্পালয়, ঢাকায়। মার্চের বিকেল গড়িয়ে আগত সন্ধ্যার সোনারোদ তথা বাঙালির চিরচেনা কনেদেখা আলোয় মুক্তিযুদ্ধের কর্মের উপর সাজানো স্থিরচিত্র-মালায় সাহসের বিভা ছড়িয়ে দিয়েছে আমার বাংলা মায়ের উজ্জ্বল মুখের আলোকচ্ছটা। আমার সাথে বন্ধু কবি আকমল হোসেন খোকন; কিছুক্ষণ পরে এসে যোগ দিলেন বগুড়ার বন্ধু গোলাম রব্বানী লিটন। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় বড়ভাই ‘বঙ্গীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ’র কর্ণধার কামরুল ইসলাম ও বিশিষ্ট কবি-সম্পাদক, বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক সাজ্জাদ আরেফিন তথা মোবারক ভাইকে পেয়ে কিঞ্চিৎ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলাম। অডিটোরিয়ামের বাইরে, উন্মুক্ত  ছাদের পুরোটা জুড়েই ঝুলছে শৈল্পিক স্থিরচিত্রকর্ম―বেদনার অন্তর্লীন সত্তায় খুঁজে পাই আশার আলো; বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে তাবৎ দুনিয়ার কবি-শিল্পীদের সহানুভূতির প্রাণোচ্ছল বহিঃপ্রকাশ। ছবিগুলোয় চোখ বুলাতেই পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়। অনুষ্ঠান শুরুর ঘোষণায় হলের ভেতরে প্রবেশের পর বসার আসন আর ফাঁকা নেই―সামনের সারিতে বসা আসিফ নজরুলের পাশের দুইটা সিট ব্যতীত―ওই সিটে বসার রুচি, যোগ্যতা, আসক্তি ও দুঃসাহস আমার নেই। ছাত্রবন্ধুতুল্য কেউ একজন অডিটোরিয়ামের ডান পাশের আড়াআড়ি সাইডলাইনের টুলে কিছুটা জায়গা করে দিলে আমি আর আকমল চাপাচাপি করে বসতেই ক্লাসমেট মাহমুদা পারভীনের চোখাচোখি হই। মূল অনুষ্ঠানের শুরুতেই ঘোষকের ঘোষণা অনুযায়ী গ্রন্থের লেখক মতিউর রহমান তাঁর বক্তব্যে এই বইটির সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দিলেন। বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত―গঠনগুণ সম্পর্কিত তাবৎ বিষয় তাঁর বক্তব্য থেকে জানা যায়। মতিউর রহমানের বক্তব্যের পর বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী এই গ্রন্থের আলোকে এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের স্ফূরণ ঘটান। সৈয়দ আব্দুল হাদীর আলোচনা থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকাসহ সর্বভারতীয় এবং সারা বিশ্বের কবি-শিল্পীদের অবদানবিষয়ক নতুন তথ্য-উপাত্তের সন্ধান লাভ করতে সক্ষম হই। প্রাসঙ্গিকতা বিচারে একটা কথা না বললেই নয়; ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা’ শীর্ষক একটা গবেষণাধর্মী গ্রন্থ লেখার অনুপ্রেরণায় স্বেচ্ছায় উদ্যোগী হয়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দুই বারে মাসাধিক সময় আমার কলকাতায় ‘স্টেট আর্কাইস কলকাতা’ এবং ‘পুলিশ আর্কাইভস কলকাতা’য়  ঋজু দেবনাথ নামের একজন স্কলারের সহায়তায় কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেই সময় কলকাতা স্টেট আর্কাইভের প্রধান ব্যক্তি শ্রীমতী মধুরিমা সেনের সহায়তা এবং আমার সহধর্মিণীর স্বাধীনতাকামী নারীযোদ্ধাদের ওপর গবেষণা-সহায়ক মধুরিমা সেন লিখিত WOMEN IN THE WAR OF FREEDOM UNVEILED BENGAL 1919―1947 গ্রন্থটি পেয়ে আমার গ্রন্থ রচনায় আরও প্রমাণাদি সংগ্রহের সহজতায় কাজে অধিকতর  মনোযোগী হই।

গবেষণাকালে এই বোধ জাগরিত হয় যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু অস্ত্রের বিপরীতে অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, যুদ্ধটা ছিল আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় অস্ত্র-শক্তি-সাহস এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনে জেগে ওঠা মানবমুক্তির মহাপ্লাবন। সাংস্কৃতিক জাগরণের জয়ধ্বনির পাশাপাশি নিরন্ন-ক্ষতিগ্রস্ত-লাঞ্ছিত-ধর্ষিত মানুষের গগনবিদারী কান্নার ধ্বনি বাংলার আকাশ-বাতাস অতিক্রম করে ভারত তথা সারা বিশ্বের মানুষকে বিবেক বোধের জায়গায় একত্র করতে পেরেছিল বলেই নয় মাসের প্রত্যক্ষ যুদ্ধে আমাদের দেশ হানাদার মুক্ত হয়েছিল―আমরা পেয়েছি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা, স্বীকৃতি ও পতাকা কলকাতায় অবস্থানকালে কলকাতা জাদুঘরের অডিটোরিয়ামে একটা অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে নাট্যশিল্পী রীতা ঘোষালের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সুবাদে অপ্রত্যাশিতভাবেই মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ (MAKAIAS)-এর পরিচালক ড. স্বরূপ প্রসাদ ঘোষের সাথে পরিচিত হবার সুবাদে পরেরদিন উনার আমন্ত্রণে উনার সল্ট লেকের প্রতিষ্ঠানে গেলে উনি সোসাইটির সিনিয়র আজাদ ফেলো ড. রূপেন্দ্র কুমার, সাবেক অধ্যাপক, প্রাচীন ভারত ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, কলকাতা ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়-এর সাথে ভাব বিনিময়ের সুযোগ করে দেন। চা-চক্রের ফাঁকে অধ্যাপক মহোদয় পরিচালক ড. স্বরূপ প্রসাদ ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক এই প্রস্তাব দেন যে, অতিথিকে দিয়ে ইন্সটিটিউটের বর্তমান গবেষণারত গবেষকদের মাঝে একটা বক্তৃতার ব্যবস্থা করা হোক। উনাদের প্রস্তাব আমি ফিরিয়ে দেইনি, দিতে পারি না―আমার স্বাধীন বাংলাদেশের অপমান হবে বিধায়। কর্তৃপক্ষীয় প্রধান পরিচালক স্বরূপ ঘোষ লাঞ্চের ব্যবস্থা করলেন। লাঞ্চের পর উপস্থিত ১৮ জন গবেষণা-ফেলো এবং পরিচালক ও বর্ষীয়ান  অধ্যাপক মহোদয়ের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টা ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ও বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত’―শীর্ষক তাৎক্ষণিক বক্তব্য দেওয়ার পর প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে দীর্ঘক্ষণ। ইন্সটিটিউটের ফেলোরা সর্বভারতীয় মেধাবী ছাত্র; স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ভালো ফলাফলের অধিকারী―এদের সকলের ভাষা বাংলা নয়, তবে বাংলা জানে; এরা বাংলা, হিন্দি, গুজরাটী, মারাঠী, তামিল, উড়িষ্যা, আসাম, ত্রিপুরা, শিলং ইত্যাদি স্থানের অধিবাসী। সকলেই আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষায় পারদর্শী। ইংরেজি, বাংলা, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতিবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, নাট্যকলা, চিত্রকলা ইত্যাদি বিষয়ের প্রথম শ্রেণি অর্জনকারী ভবিষ্যৎমুখী ছাত্রদেরকেই কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান সাপেক্ষে বৃত্তির আওতায় গবেষক বানানোর চেষ্টা চালায়। আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় কবি-শিল্পী বন্ধুদের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে কথা বলেছিলাম―তারা খুশি হয়েছিলেন; তাদের আচরণ এবং উচ্ছ্বাস দেখে আমি সেটা বুঝেছিলাম সেই দিন বক্তৃতার পর। সন্ধ্যায় আরেকবার কফির আড্ডা শেষে সেই দিনের সাংস্কৃতিক ভাব বিনিময়ের সমাপ্তি টেনে হোটেলে ফিরে এসে প্রশান্তির ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

তিন

১৫৩ থেকে ১৮৭ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪পৃষ্ঠার পরিচ্ছন্ন পরিশিষ্ট ব্যতীত বাদবাকি পাতা জুড়ে নয়টি অধ্যায়ে সূচিত ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু বইটির ‘লেখকের কথা: তাঁদের কথা মনে রাখব’ শিরোনামের নাতিদীর্ঘ ভূমিকা বইটির অভ্যন্তরে প্রবেশের চাবিকাঠিতে অবতীর্ণ হয়: ‘পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে, বিশেষ করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকেই দেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক আন্দোলনও একটি স্বতন্ত্র বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে, গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে সর্বস্তরের মানুষকে।’ (মতি, ভা. মু. ব, পৃ. ৯)―বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে শুরুতেই মতিউর রহমান জানান দিলেন। মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হান প্রমুখের সৃজনকর্মের নাম উল্লেখপূর্বক স্মরণ করলেন তাঁদের অবদান। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ―এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিকদের নামোচ্চারণের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতের কবি-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের নামোচ্চারণের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার বিশ্বখ্যাত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, ফ্রান্সের আঁদ্রে মালরো, ভারতের পণ্ডিত রবিশঙ্কর, বিটলস-এর গায়ক জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, নোবেল বিজয়ী গায়ক ও কবি বব ডিলান, মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ, রুশ কবি আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কি, অস্কার বিজয়ী যুক্তরাজ্যের অভিনেত্রী গ্লেন্ডা জ্যাকসন, মার্কিন গায়িকা জোয়ান বায়েজ প্রমুখের নামোচ্চারণপূর্বক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, মহারাষ্ট্রসহ সর্বভারতীয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিক- অভিনেতা―বুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘ তালিকার পাশাপাশি পেশাজীবীদের কথাও এসেছে প্রাসঙ্গিক কারণেই: সত্যজিৎ রায়, লতা মঙ্গেশকর, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, মুলুকরাজ আনন্দ, মকবুল ফিদা হুসেন, রাজ কাপুর, শচীন দেববর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, ভূপেন হাজারিকা, সলিল চৌধুরী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কাইফি আজমিসহ অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকের নাম তো আছেই; সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি ভারতীয় ক্রিকেটার নবাব মনসুর আলী খান পতৌদির মতো ব্যক্তিগণের মানবিক হাত। মতিউর রহমান স্মরণ করেন: “এখনো মনে পড়ে, একাত্তরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা থেকে বেরাইদ হয়ে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে নৌকায় ভাইবোন আর মা-বাবাকে নিয়ে নানাবাড়ি কাপাসিয়ায় যাচ্ছি। হঠাৎ কলকাতা রেডিওতে বেজে উঠলো দেবব্রত বিশ্বাসের সেই দারুণ প্রণোদনাময় গান, ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা, আমার প্রতিরোধের আগুন, জ্বলে দ্বিগুণ দারুণ প্রতিশোধে…’” (মতি, ভা. মু. বু, পৃ. ১২)। ‘কলকাতার লেখক-শিল্পীদের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী নারকীয় গণহত্যা শুরু করলে ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন রাজ্য যেমন: পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, ত্রিপুরা, আসামের শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জের দিকে আশ্রয় নেয়। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে ২৮ মার্চ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও সত্যজিৎ রায়ের নেতৃত্বে কোলকাতার বুদ্ধিজীবীগণ পূর্ব-বাংলার মানুষের উপর পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের আক্রমণাত্মক মানসিকতার এবং হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান ও নিন্দা জ্ঞাপন করেন। কোলকাতায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সাথে জড়িতদের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে নয়, ত্বরিত গতিতে গড়ে ওঠে ‘বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমিতি’―সংক্ষেপে ‘বুদ্ধিজীবী সমিতি’। এই সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন কংগ্রেসপন্থি কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনজন―কবি মণীন্দ্র রায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। সহ-সভাপতি ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়, অজিত দত্ত, উদয়শঙ্করসহ অন্যান্য বিদ্বজ্জন। এই সকল গুণী মানুষের কর্মপ্রয়াসের বর্ণনায় আমরা মুগ্ধ হই: ‘এককথায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কলকাতার লেখক-কবি, শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা সবাই তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে বহুমুখী কাজ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন।’ (মতি, ভা. মু. বু, পৃ. ৩০)।―কবি কবিতা লিখেছেন, শিল্পী গান গেয়েছেন, গীতিকার গান লিখেছেন, গল্পকার প্রতিবাদী গল্প লিখেছেন, কথাসাহিত্যিক উপন্যাস লিখেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাতা ছবি বানিয়েছেন, সাংবাদিক কলমে তুলেছেন প্রতিবাদের ঝড়―কংগ্রেসপন্থি, বামপন্থি, ধর্মধ্বজী বলে কারও কোনও বিভেদমূলক কথা নয়; বাংলাদেশের মানুষের দুর্দিনে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আক্রমণের ছোবলে আক্রান্ত ঘরবাড়ি-সহায়সম্বলহীন মানুষের আশ্রয়-খাদ্য-চিকিৎসা সহায়তার নিমিত্তে গড়ে ওঠা ধ্বনির বিপরীতে কোনও রাজনৈতিক মতবাদ ও মতবিরোধ দেখা দেয়নি; বরঞ্চ সর্বভারতীয় মানবিকতার সুর ধীরে ধীরে প্রচণ্ড ঝড়ের আকার ধারণ করে বলেই কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় সরকারের পক্ষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দাঁড়িয়ে সামরিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অন্যান্য সকল প্রকার সাহায্যের  বেলায় কাজ করা সহজ হয়।

কোলকাতার লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের সহানুভূতিশীল কাজের জোয়ার বোম্বের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে সেই সময়―‘বোম্বের শিল্পীদের স্মরণীয় অবদান’ শীর্ষক প্রবন্ধে মতিউর রহমান জানাচ্ছেন : ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু হয়। বোম্বের সব সংবাদপত্র এর সচিত্র সংবাদ প্রকাশ করে। এই গণহত্যার প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ হন বোম্বের সচেতন মানুষ।’ (মতি, ভা. মু. বি, পৃ. ৪৩)―২৩ এপ্রিল, ১৯৭১ মহারাষ্ট্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সহায়তা করার জন্য গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ সহায়ক কমিটি’ সংক্ষেপে ইঅঈ―বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শ্রীহরিশ মহীন্দ্র সভাপতি, ওয়াহিদা রহমান ও শর্মিলা ঠাকুর সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করলেন। আর সম্পাদক হলেন বেগম মাহবুব নসরুল্লাহ ও যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন সলিল ঘোষ। ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার ফিরোজ শাহ রোড বোম্বেতে BAC-এর কার্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন কমিটির সদস্যগণ। সকলের প্রচেষ্টায় ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল বোম্বের গোকুলদাস তেজপাল হলে প্রতাপ শর্মা রচিত ‘বাংলাদেশ’ নাটকে অভিনয় করেন প্রতাপ শর্মা, সলিল ঘোষ, শর্মিলা ঠাকুর ও শর্মিলা ঠাকুরের স্বামী ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি। বাংলাদেশ নাটকে পতৌদির অভিনয়ের নেপথ্যে মানুষের মধ্যে আলোড়ন তুলে মানবিক কাজে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধকরণ-কৌশল অথবা ঐকান্তিক অনুরাগ সৃষ্টির প্রয়াস হিসেবে পরিগণিত হয়। এছাড়া শচীন দেববর্মণের সঙ্গীত সন্ধ্যা, গ্রান্ড মুশায়েরায় স্বরচিত ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক কবিতা কাইফি আজমীর আবৃত্তির বিষয়টি মানুষের মধ্যে সহযোগিতার প্রণোদনা যোগায় শিল্পিত সাফল্যগাথায়। মহারাষ্ট্রের ‘বাংলাদেশ সহায়তা কমিটি’র মানবিক কাজে সন্তুষ্ট হয়ে জার্মানির বন থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই মর্মে চিঠির শেষ কথা লেখেন: ‘মহারাষ্ট্রের বাংলাদেশ এইড কমিটির জন্য আমার মঙ্গল কামনা রইল। ইন্দিরা গান্ধী, বন, পশ্চিম জার্মানি, ১১ নভেম্বর ১৯৭১’ (মতি, ভা. মু.ব, পৃ. ৫৩)―

বাংলাদেশ সহায়ক কমিটির লক্ষ্যার্জিত অনুদানের সিংহভাগ এসেছিল বোম্বের বিখ্যাত ব্রাবোর্ন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘স্ট্রিং অ্যান্ড স্টারস : ইন এইড অব রিফিউজিস ফ্রম বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের সাফল্যকথায়: এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন দিলীপ কুমার, নার্গিস, সুনীল দত্ত, মান্না দে থেকে জয়শ্রী ও হেলেনসহ নামিদামি-ছোটবড়মাঝারি বোম্বের সব ক্ষেত্রের সকল তারকারাই। প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের কথা বাদ দিলেও সেই সময়ে―১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মানুষের ভয়াবহতম দুর্দিনের কালে―ভারতীয় কবি; বাংলা ভাষায় লিখিত গীতাঞ্জলির কবি নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮১ বছর বয়সী আর্জেন্টিনার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ারসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি মিছিলের অগ্রভাগে থেকে সাহায্যের জন্য আবেদন জানান এবং বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সাফল্য অর্জন করেন। আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তাঁরা এক স্মারকলিপিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের অযাচিত-অমানবিক, নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদসহ নিপীড়িত মানুষের জন্য সাহায্য পাঠানোর অনুরোধ জানান। স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোসহ কবি-শিল্পী- সাহিত্যিক-ব্যবসায়ী এবং ধর্মীয় নেতাগণ। (মতি, ‘মিছিলের সামনে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো’, ভা. মু. ব, পৃ. ৬১-৬৬)।

চার

ভালোবাসায় বাড়ানো হাত ও দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ―চারজন লেখকের গ্রন্থ তিনটার একটা তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যায়, ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু বইয়ের “জোয়ান বায়েজের ‘সং অব বাংলাদেশ’ ”, ‘রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসন ও কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, “‘ওভালে গুডবাই সামার’ কনসার্ট”, “লন্ডনে ‘কনসার্ট ইন সিমপ্যাথি’ ”, ‘নিউইয়র্কে অ্যালেন গিন্সবার্গ ও আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কির কবিতাপাঠ’ শীর্ষক পাঁচটি প্রবন্ধের অন্তর্নিহিত সত্যালোকের সঙ্গে শামীম আল আমিন-এর দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এবং দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ : দুই বন্ধু এক দেশ-গ্রন্থের মালমশলা তথা উপাদানের সাযুজ্য লক্ষণীয়―ঐতিহাসিক সত্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ; মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের দেশের নিরীহ-নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানি সামরিক শাসক তথা সেনাবাহিনীর পাশবিক নির্যাতন―হত্যা-খুন-ধর্ষণ-লুণ্ঠন। এই অমানবিক নির্যাতনের শিকার মানুষজন―শিশু-কিশোর-নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা জীবন বাঁচানোর তাগিদে দলে দলে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গমন করেন। লক্ষ লক্ষ নিগৃহীত, নির্যাতিত, ক্ষুধার্ত-অসুস্থ মানুষের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন সীমান্তের প্রথমত, ওপারের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বন্ধুগণ এবং দ্বিতীয়ত, ভারতীয় সরকার―প্রাথমিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, সর্বৈবভাবে ইন্দিরা গান্ধীর কেন্দ্রীয় সরকার। প্রাথমিকভাবে কবি-শিল্পী-সাংবাদিক এবং ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি মানবিকতার হস্ত প্রদর্শন করে সর্বভারতীয় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণে সামর্থ্যের স্বাক্ষর রাখেন। সময়ের পরিক্রমায় ভারতীয় সরকার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন এবং ভারতের বাইরে সমগ্র পৃথিবীর রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর বিশ্বনন্দিত কবি-শিল্পীদেরকে বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান রক্ষায় এক কাতারে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। জোয়ান বায়েজের ‘দ্য স্টোরি অব বাংলাদেশ’ গানটি পরবর্তী সময়ে ‘সং অব বাংলাদেশ’ নামে একাধিক অ্যালবাম ও সিডিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রথম লাইনেই বায়েজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্মমভাবে গুলি চালানোর বর্ণনায় দক্ষতার পরিচয় পূর্বক লেখেন : ‘ছাত্রাবাসে সন্ত্রাস,/বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা খুন হচ্ছে সৈনিকের হাতে,/নিদ্রামগ্ন ছাত্ররা তাদের বিছানায় সৈনিকের গুলিতে,/ভয়ার্ত চিৎকার, হিমঠান্ডা পরিবেশ, রক্তাক্ত বিছানা বালিশ’,―এছাড়াও ‘জোয়ান বায়েজের গান : বাংলাদেশ’ শিরোনামে বায়েজের একাধিক গান সন্নিবেশিত হয়েছে মতিউর রহমানের গ্রন্থের পাতায়। (পূর্বোক্ত, মতি, পৃ. ৭১-৭৬)।―এই প্রসঙ্গ অবতারণার ক্ষেত্রে শামীম আল আমিন জোয়ান বায়েজ ও বব ডিলানের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের আদ্যোপান্ত এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর রচিত, সুরারোপিত গানের কলানৈপুণ্যের বর্ণনা, তুলনামূলক আলোচনায় মনোযোগী হওয়ায় এবং গবেষণায় বর্তমান এবং পরবর্তী প্রজন্মের বেলায় মতিউর রহমান, আবু সাঈদ এবং শামীম আল আমিন―একে অন্যের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়ে যান; অন্তত জ্ঞানসাধনা ও মানবিকতার শিল্প-আশ্রিত গ্রন্থ রচনার বেলায়; প্রাসঙ্গিকতার বিচারে আবু সাঈদ এসে দাঁড়িয়ে জানায়: ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর ছাড়াও প্রধান শিল্পীরা ছিলেন সাবেক বিটল রিঙ্গো স্টার, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টান, লিওন রাসেল এবং দ্য ব্যান্ডফিঙ্গার। এ ছাড়া, পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও আলী আকবর খান―যাদের দুজনেরই পৈতৃক শিকড় বাংলাদেশে―ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি উদ্বোধনী পরিবেশনা করেন।’ (আবু সাঈদ, দু. দে, পৃ. ৩৪)।―বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটা ঐতিহাসিক মহাসত্য। এই স্বীকৃত সত্য নিয়ে বিভিন্ন ধারার গ্রন্থ রচিত হতে পারে; রচিত হওয়াটাই স্বাভাবিক ও কালের দাবি―এক্ষেত্রে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, মনোগ্রাহী আলোচনা, শিশুতোষ শিক্ষণীয় গল্পালোচনা, দালিলিক বয়ান, কবিতা-গল্প-উপন্যাস―বিশেষত, মহাকাব্যিক উপন্যাস রচিত হওয়াটা যুগের দাবি। ফিকশন, নন-ফিকশন যাই বলি-না-কেন তা লিখিত হবার জন্য একটা সুনির্দিষ্ট জমিন চাই―একটা বিরাট ও বিশাল ব্যাপ্তি থাকা চাই; সেই ব্যাপ্তি-বিভাষ ও জমিনের উপর দাঁড়িয়েই লেখক তার পথ ও পাথেয় ঠিক করে নেবেন। সৃজনশক্তি বন্দুকের শক্তির চেয়েও তির্যক―বিশেষত, সাংস্কৃতিক শক্তি; নিহিতার্থক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের সংস্কৃতির লেনাদেনা অর্থাৎ, আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে হিতকারী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রণয়ন কিংবা নির্মাণের ক্ষেত্রভূমি তৈরির পথপ্রয়াস। রাশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান, পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং যাপিত জীবনের উদ্ভাস তলস্তয়ের জীবনে রেখাপাত করেছিল বলেই তিনি সৃষ্টি করেছেন আন্না কারেনিনার মতো মহাকাব্যিক উপন্যাস। শিল্পবিপ্লব পালটে দিয়েছিল গোটা ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি তথা জীবনের গতিপথ―ফরাসি চিত্রকলা, কবিতা, উপন্যাস কিংবা শোষণ-নিষ্পেষণে কুঁকড়ে থাকা আফ্রিকা মহাদেশের জীবন ও শিল্পের বিনির্মাণ। আমাদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও স্বাজাত্যবোধের পরিচয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে একদিন-না-একদিন, কোনও না-কোনও লেখক তার পূর্বপুরুষের জীবন-রক্ত-ইজ্জতের বিনিময়ে রেখে যাওয়া স্বাধীনতার ঋণ শোধ করবেনই; তিনি লিখবেন কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস―সেই দিন, সেই মেধাবী প্রজন্মের কাছে আলোচিত গ্রন্থ তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে―এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের সহায়তার তথ্য-উপাত্ত-উপাদান সংগ্রহ এবং গবেষণার প্রণোদনা খুঁজে দেখার ক্ষেত্রে মতিউর রহমানের বইটি সাজানো-গোছানো তো বটেই, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার পদ্ধতি ও প্রকরণ অনুসরণকৃত শতভাগ প্রায়। শামীম আল আমিনের বইটি পাঠকপ্রিয়তার জন্য বেশ উপাদেয়―ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে রচিত হলেও কবি-লেখক-শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবনের আবেগের দিকেও চোখ বোলাতে তিনি ভুল করেননি। আর আবু সাঈদ ও প্রিয়জিৎ দেবসরকার রচিত দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ : দুই বন্ধু এক দেশ বইটি মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের সহায়তার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠার ডিটেইলস বিন্যাসে ভরপুর।

একই বিষয় নিয়ে তিনটি নয়, শতাধিক বই রচিত হলেও লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। প্রাসঙ্গিকতার দিকে তাকিয়ে বলা যায়, একই বিষয় নিয়ে রচিত হলেও মতিউর রহমান রচিত ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু আমার কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং আদরণীয়।

সৈয়দ আব্দুল হাদীর বিশ্লেষণমূলক বক্তব্যের পর মঞ্চে এলেন সাজ্জাদ শরিফ। প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক, কবি সাজ্জাদ শরিফ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানলেন তাঁর জ্ঞান ও বাচনভঙ্গির মুন্সিয়ানায়। মতিউর রহমানের বইয়ে সাজ্জাদ শরিফ অনূদিত জোয়ান বায়েজের গান-কবিতার সুরমূর্ছনায় এবং শব্দের গীতলতায় তার প্রমাণ জাজ্বল্যমান। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে এসে ওয়ার্দা আশরাফের গাওয়া জোয়ান বায়েজের ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক গানের মর্মার্থ অনুধাবনের চেষ্টায় আমি যখন বাস্তবতাতিরিক্ত স্বপ্ন ও ঘোরের মধ্যে ১৯৭১ সালের কোনও এক সন্ধ্যায় ঘুরপাক খাচ্ছি রাস্তায়―আমি তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বুলেট-বেয়োনেটের খোঁচায় আর শব্দে বেনাপোল সীমান্ত পার হয়ে পেট্রাপোলের পথ ধরে ভারতে প্রবেশ করছিলাম, তখন হঠাৎ আমার ক্লাসমেট ড. মাহমুদা পারভীনের কিছু একটা বলার শব্দে তাকালাম―তাকিয়ে দেখি মতিউর রহমানের গ্রন্থবিষয়ক দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ঘোষকের মুখে সৈয়দ আব্দুল হাদীর নাম উচ্চারণের আগেই মঞ্চের সামনের সারির চেয়ার ছেড়ে আসিফ নজরুল আমার সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। সদ্য সাবেক উপদেষ্টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক কি শুনেছিলেন আমার ক্লাসমেট ড. মাহমুদা পারভীনের কথা? আমিও ঠিকঠাক বুঝিনি―কিশোরগঞ্জের নিকলির হাওরের বানভাসি মহুয়ার নদ্যার চাঁদকে না পাওয়ার অতৃপ্ত বেদনা, অথবা মরহুম মুক্তিযোদ্ধা বাবার ক্ষয়িষ্ণু স্বপ্নমন্দ্রিত ফণা, কিংবা হাজারো মুক্তিযোদ্ধাদের আকুতি বয়ে বেড়ানোর কষ্ট পারভীনের বাবার আকুতি হয়ে বেরিয়ে এসেছিল তাঁর কথায়!―পাশের কেউ-কি শুনেছিল তার কথা? অন্তত আমি শুনিনি; বুঝতে পারার প্রশ্নই ওঠে না―পারভীনদের কথা আমি বুঝি না বলেই আমার দুঃখে পরান কান্দে মুক্তিযুদ্ধে হারানো মানুষের জন্য।

তথ্যসূত্র

১.         মতিউর রহমান, ভালোবাসায় বাড়ানো হাত : মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি লেখক-শিল্পী বন্ধু, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০২২;

২.        শামীম আল আমিন, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০২১;

৩.        আবু সাঈদ ও প্রিয়জিৎ দেবসরকার, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ : দুই বন্ধু এক দেশ, স্বপ্ন ’৭১প্রকাশন, ঢাকা, ২০২৩;

(দ্রষ্টব্য : এই লেখার সমস্ত দায়ভার লেখকের নিজের। সম্পাদক ও অন্য কারও ওপর বর্তায় না।)

লেখক : গবেষক-সম্পাদক

সাবেক শিক্ষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

চেয়ারম্যান, FIITS FOUNDATION, Dhaka

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button