Uncategorized

পালিত কন্যা শান্তিলতা দেবীর চোখে নজরুল : শাহীনুর রেজা

প্রচ্ছদ রচনা : রবীন্দ্র-নজরুল স্মরণ

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর পালিত কন্যা শান্তিলতা দেবী সম্পর্কে স্নেহ জানিয়ে বলেছেন, ‘আমার যেখানে বাড়ি হবে আমার মেয়েরও সেখানে বাড়ি হবে।’ পালিত কন্যার প্রতি কতখানি স্নেহপরায়ণ হলে একজন পিতা এমন মন্তব্য করতে পারেন তা ভাববার বিষয়। মন্তব্যটির মধ্যে তিনটি বিষয় স্পষ্ট। এক. অন্যের সন্তানকে নিজের সন্তানরূপে দেখা, দুই. সন্তানের প্রতি পিতার গভীর মমত্ববোধ প্রকাশ ও তিন. দায়িত্বশীল পিতার কর্তব্যপরায়ণতা। পালিত সন্তানকে নিজের সন্তানরূপে মর্যাদা দিয়ে পিতা নজরুল মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। 

আগস্ট, ১৯৯৮ সালে নজরুল একাডেমি থেকে সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক শেখ দরবার আলম-এর নজরুল জীবন ও পালিত কন্যার স্মৃতিকথা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। মূলত নজরুলের পালিত কন্যা শান্তিলতা দেবীর সাক্ষাৎকার এ গ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছেন কবি কী খেতে ভালোবাসতেন, কী পরতেন, কেমন মানুষ ছিলেন, তাঁর পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি।

এ গ্রন্থ প্রকাশের আগে শান্তিলতা দেবী সম্পর্কে আমাদের জানা ছিল না। ১৯৮৫ সালে ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৯ বছরে ৪৩ খণ্ড পত্রিকায় প্রকাশিত ৬৩০টি লেখার কোথাও শান্তিলতার নাম নেই। এ থেকে আমাদের গবেষণার দুর্বলতা প্রকাশ পায়।

শান্তিলতা দরবার আলমের প্রশ্নের উত্তরে এবং স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কবির এমন অনেক বিষয় তুলে ধরেছেন যা একেবারেই নতুন। অন্য কারও গবেষণা বা গ্রন্থে স্থান পায়নি।

শান্তিলতা দেবী তাঁর বালিকা বয়স থেকে কবি পরিবারে ছিলেন একজন পালিত কন্যা হিসেবে। কবি আসল পিতার অভাব তাঁকে বুঝতে দেননি। অনুরূপভাবে খুকিও তাঁর পালক পিতাকে শ্রদ্ধা করেছেন। কবি তাঁকে ‘খুকি’ বলতেন এবং যতদিন সুস্থ ছিলেন তাঁকে পালিত কন্যা হিসেবে দেখেছেন। শান্তিলতা বলেছেন―‘ওঁনার কাছে বাবার স্নেহ পেয়েছি। ওঁনাকে দেবতা মনে করতাম। আমি ওঁনাকে মেসো বলতাম।’

শান্তিলতা দেবীর পুরো নাম শান্তিলতা সেনগুপ্তা, তাঁর ছোট ভাই বিজয় সেনগুপ্ত। এঁদের বাবার নাম নিবারণ সেনগুপ্ত ও মার নাম সুশীলা দেবী। শান্তিলতা সেনগুপ্তা হলেন নজরুল-পত্নী আশালতা সেনগুপ্তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। তিনি তাঁর বিধবা মায়ের সাথে ছয়/সাত বছর বয়সে কবি পরিবারে বেড়াতে এসেছিলেন। তারপর থেকেই থেকে যান। তাঁর মাকে কবিই রেখে যেতে বলেছিলেন।

শান্তিলতা দেবী যখন কবি পরিবারে আসেন তখন কবির দ্বিতীয় পুত্র বুলবুলের বয়স দুই-আড়াই বছর। তার মানে ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬ সালে বুলবুল জন্মগ্রহণ করলে তিনি আসেন ১৯২৮-২৯-এর দিকে। সে সময় কবি থাকতেন কৃষ্ণনগরে চাঁদ সড়কে গ্রেস কটেজ-এ। এ বাড়িতেই শান্তিলতা আসেন।

কবি পরিবারে শান্তিলতা দীর্ঘদিন ছিলেন। এমনকি তাঁর বিয়ের পরও ক্লাস নাইন পর্যন্ত কবির বাড়ি থেকে পড়েছেন। শ্বশুর বাড়িতে থেকেছেন মাঝে-মাঝে, মাত্র অল্প কিছুদিন। কবির অসুস্থতার পরও তিনি তাঁর ছেলে-মেয়ে নিয়ে প্রায় বছর দশেক কবি পরিবারে ছিলেন। কবি পরিবারে তিনি যে ছিলেন এর পেছনে ছিল তাঁর প্রতি কবির স্নেহের দিক। তাই আত্মীয়া, আশ্রিতা থেকে তিনি একবারে কন্যার মর্যাদা লাভ করেন। চার পুত্রসন্তানের পিতা নজরুলের একটি কন্যাসন্তানের আকাক্সক্ষা থেকেও শান্তিলতাকে কন্যা হিসেবে লালন-পালন করা অমূলক না।

‘কাজী নজরুল ইসলাম মানেই হাসি-ঠাট্টা গল্প-গান’―এমন প্রচলিত ধারণার বাইরে শান্তিলতা নজরুলের পারিবারিক জীবন সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন―

‘নিজ পরিবারে কবি খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কখনো চিৎকার করে কথা বলতেন না। কেবল পরিবারের লোকজনের প্রতি কেন, চাকর-বাকরদের সঙ্গেও তিনি কখনো চিৎকার করে কথা বলেননি। কাউকে কখনো তিরস্কার করেননি। ব্যক্তিগত জীবনে, ব্যবহারিক জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সহনশীল, সৌজন্যপরায়ণ এবং অধিকাংশ সময়েই সর্বংসহা। মানুষের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করাটা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। নিজের ব্যাপারে সব কিছু সহ্য করার মানসিকতা ছিল তাঁর। তিনি কখনো প্রতিবাদ করলে করতেন অন্যের ব্যাপারে। তবে অনেকটা নীরবে হলেও কবি তাঁর পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারটা ঠিকই জানিয়ে দিতেন এবং পরিবারের লোকেরা সেটা অবশ্যই মান্য করতেন বা গুরুত্ব দিতেন।’        

অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, ব্যবহারিক জীবনে ব্যক্তিত্ববান, ঋজু প্রকৃতির এই মানুষটার ঔদার্য্যরে, মহত্ত্বের এটা একটা বিশেষ দিক।

কবির সকালের প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে শান্তিলতা নিখুঁত বর্ণনা করেছেন―

‘নিয়মিত সকালে ঘুম থেকে উঠে কবি বাথরুমে যেতেন খবরের কাগজ হাতে নিয়ে। খবরের কাগজটা তিনি বাথরুমে বসেই পড়তেন।’

অতি ব্যস্ত কবি কাগজ পড়ার জন্য সম্ভবত ব্যয় করতে পারতেন এই একটা সময়ই। এই সময়টায় সারা দুনিয়ার ঘটনাবলির উপর তিনি চোখ বুলিয়ে নিতেন। বাসায় যে দু-তিনটে খবরের কাগজ নেওয়া হতো সেগুলো হলো আনন্দবাজার, যুগান্তর এবং দি স্টেটসম্যান। বাংলা কাগজ নেওয়া হতো মূলত বাড়ির মহিলাদের জন্য। কবি পড়তেন ইংরেজি দৈনিক স্টেটসম্যান। এ থেকে তাঁর রুচি, শিক্ষাদীক্ষা এবং দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

শান্তিলতা তাঁর সাক্ষাৎকারে কবির একটি মজার অভ্যাসের কথা বলেছেন, তা হলো প্রতি রাতে তাস খেলা। বাসায় ফিরতে তাঁর যত রাত হোক না কেন, ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রতি রাতে তিনি তাস খেলতেন। রাত দুটো, আড়াইটে, তিনটে পর্যন্ত; কখনও কখনও চারটে পর্যন্তও খেলতেন। প্রতি রাতে তাস খেলায় তাঁর সঙ্গী হতেন কবিপত্নী, কবির শাশুড়ি ও কন্যা শান্তিলতা। কবি এঁদের সবাইকে তাস খেলা শিখিয়ে নিয়েছেন। খেলা হতো স্ক্রু অথবা ব্রে। প্রমীলা ব্রে হলে কবি আনন্দে আত্মহারা হতেন। তাস খেলার সঙ্গী হিসেবে ক্বচিৎ কখনও বাইরের কেউ থাকতেন।

অত্যন্ত কর্মব্যস্তময় জীবনে তাঁর প্রতি রাতে তাস খেলার তাগিদ ছিল কেন ? যিনি সকালে উঠে নিয়মিত অফিসে যেতেন তিনি ঘুমাতেন কতক্ষণ ? আসলে পরিবারের মানুষজনের প্রতি মমত্ববোধ, তাঁদেরকে সঙ্গ দেওয়ার, সময় দেওয়ার গরজ থেকেই তিনি এটা করতেন বলে মনে হয়। আর ঘুমানোর পরে বাড়ির লোকজন কবিকে কখনও জাগাতেন না। ঘুম থেকে কবি নিজে যখন উঠতেন তখন উঠতেন। যতটুকু ঘুম তাঁর প্রয়োজন হতো ততটুকু ঠিকই ঘুমাতেন।

বাথরুম থেকে বের হয়ে―

‘ঘরের মেঝেতে সিঙ্গাপুরী মাদুর পাতা থাকতো, সেখানে গিয়েই দাঁড়াতেন তিনি। ধুতি, পাঞ্জাবি, স্নো, পাউডার সবকিছু গোছগাছ করে রাখা থাকতো। তিনি প্রসাধন করতেন। কবি পরতেন সাদা ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, উত্তরীয়, কখনো গেরুয়া রঙের কখনোবা ঘিয়ে রঙের। পায়ে নাগরা জুতো। কখনো কখনো পাম্প সু। তাঁর পোশাক পরতে যে সময়টুকু লাগে সেই সময়ের মধ্যে যদি খাবার তৈরি হতো তবে খেতেন, না হলে কেবল এক কাপ চা খেয়ে রওনা হতেন। মুখে কিছু বলতেন না। বাইরে সকাল ৯টার মধ্যে ঘর ভর্তি লোক তাঁর জন্যে অপেক্ষা করতেন। কবি নিচে নেমে বাইরের ঘরে এসে বলতেন, ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েসে চলুন’। সেই এক ঘর লোক, ঘরসুদ্ধ লোক তাঁর পেছন-পেছন যেতেন। প্রসঙ্গত বলা দরকার, কবি যখন বাড়িতে থাকতেন তখন পরতেন লুঙ্গির মতো করে ভাঁজ করা ধুতি আর গেঞ্জি।’

কবি সারাদিন কী খেতেন ? শান্তিলতা দেবী বলেন―

‘সকালে পরোটা, অমলেট। কিন্তু এই সামান্য নাস্তা সময়মতো না হলেও কোনো অনুযোগ না করে কবি এক কাপ চা খেয়ে গ্রামোফোন অফিসে চলে যেতেন।’

সকালে রান্না হলো, দুপুরে এলেন না। সন্ধ্যায়ও এলেন না। এলেন অনেক রাতে। আয়োজন যতই থাকুক, কবি পরিমাণে খুব কম খেতেন। কবি পছন্দ করতেন বড় বড় কই মাছ সরষে দিয়ে রান্না করা। ঝিঙে পোস্ত, ছাঁকা তেলে উচ্ছে ভাজা, চিংড়ি মাছের মালাইকারী, শুক্তো, ঝরঝরে খিচুড়ি। ঝিঙে পোস্ত প্রতিদিন করতে হতো। মাংসের চেয়ে কবি মাছ পছন্দ করতেন বেশি। বাড়িতে মুরগি এবং খাসির মাংস আসতো। গরুর মাংস কখনো আসতো না।

রান্নার ব্যাপারে কবির নিয়ম ছিল―রান্না ওঁনার স্ত্রী-কেই করতে হবে। কবি খেতেন তাঁর স্ত্রীর হাতে।

বাইরে যত সময় থাকতেন চা এবং পান-জর্দা ছাড়া আর কিছুই খেতেন না। পিওন-দারোয়ান কোনও খাবার এনে দিতে চাইলেও না। অন্তত ৫০/৬০টি খিলিপান বাড়ি থেকে বানিয়ে দেওয়া হতো।

বাইরে চা-পান-জর্দা কেমন খেতেন ?

শাহীনুর রেজার লেখা নজরুল জীবনে হাস্যরস গ্রন্থে উল্লেখ আছে―

‘নজরুলের গান রচনার আর রেকর্ডের আঁতুড় ঘর ছিল কলকাতার বিষ্ণুভবন। সেখানে রিহার্সেল রুমে চা সাপ্লাই করতেন সুধীর নামে এক ব্যক্তি। তার প্রতি হুকুম ছিল প্রতি আধঘণ্টা পর-পর কবির সামনে হাফ-কাপ চা রেখে দিতে। এই চায়ের রূপ দুধের স্বল্পতার কারণে কালচে-লাল রং ছিল, তাই কবি ঠাট্টা করে এর নাম দিয়েছিলেন―সুধীর বাবুর বদরক্ত।’

এই কড়া লিকারের দুধ-চা খেয়ে কবি ৪/৫টি খিলিপান একসাথে মুখে পুরতেন। এভাবেই চলত সারাদিন। বাইরে যতক্ষণ থাকতেন এই ছিল তাঁর খাবার অথবা নেশা।

নজরুল সান্নিধ্যধন্য অনেকের স্মৃতিকথায় কবির বাইরের খাবার নিয়ে আলোচনা আছে। হিজ মাস্টার্স ভয়েসের (ঐগঠ) দারোয়ান দশরথের কাছেও অনেকে শুনেছেন; বাইরে কবি স্রেফ চা, পান, জর্দা ছাড়া আর কিছু খেতেন না। দোকান থেকে কিছু এনে দিলেও না।

সারাদিন চিনিযুক্ত দুধ-চা আর পান-জর্দা খেলে মুখে কোনও স্বাদ থাকার কথা না। এর ফলেই বাড়িতে অনেক পদ রান্না হলেও তিনি খুব কম খেতেন। 

কবি-পত্নী প্রমিলা দেবী কেমন মানুষ ছিলেন ? সংসারে তাঁর ভূমিকা কেমন ছিল ? শান্তিলতা দেবী বলেন―

ধীরস্থির বিনম্র এবং অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মহিলা ছিলেন তিনি। নিচে রান্নাঘরে তিনি সারাদিনই কাজ করতেন। কবি-পত্নী সকালবেলা নিচে নামতেন। সব কাজ সেরে দুপুরে খেয়ে উপরে উঠতেন। তিনতলা বাড়ি ছিল। পতিব্রতা এই নারী মুখ বুজে সংসার করেছেন।

১৯৩৯ সালে কবি-পত্নী অসুস্থ হলে কবি তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সব ধরনের চিকিৎসা করিয়েছেন। টোটকা, অ্যালোপ্যাথি, কবিরাজি ইত্যাদি সব কিছুই। সমস্ত চিকিৎসা ব্যর্থ হলে বরোদা চরণ গুপ্তর পরামর্শে কবি তাঁর পত্নীর মাথার কাছে বসে ধ্যান করতেন। পত্নীর সব রকমের চিকিৎসা করে কবি যখন সর্বস্বান্ত তখন এই পথ বাতলে দিয়েছিলেন বরোদা গুপ্ত। অসহায় কবি প্রতি রাতে তাঁর পত্নীর মাথার কাছে বসে ধ্যান করতেন। এ সময় কবির চোখ-মুখের হাব-ভাব এমন হতো যে, চেহারাটাই পালটে যেত। কবি-পত্নী ভয় পেতেন। এজন্য শান্তিলতাকে পাশে বসিয়ে রাখতেন।

শান্তিলতা দেবীর প্রতি কবির স্নেহ-মমতা এত বেশি পরিমাণ ছিল যে, শান্তিলতার সংসারের খোঁজখবর রাখা এবং তাঁর সন্তানের নামও তিনি রেখেছিলেন। বড় মেয়ের নাম মালবিকা সেনগুপ্ত, দ্বিতীয় মেয়ের নাম বনশ্রী সেনগুপ্ত, কবি একে মৌরী বলে ডাকতেন। কবির অসুস্থ অবস্থায় তৃতীয় মেয়ে হলে তার নাম রাখলেন মীনাক্ষী। কিন্তু কবি ডাকতেন তানি বলে।

আলোচনায় রাখা ভালো, কবির সৃষ্ট একটি রাগের নাম ‘মীনাক্ষী’। ত্রিতালে নিবদ্ধ এ রাগে তিনি গান লিখেছেন―‘চপল আঁখির ভাষায়, হে মীনাক্ষী ক’য়ে যাও।’ ১৩.০১.১৯৪০ তারিখে বেতারের ‘নবরাগমালিকা’ অনুষ্ঠানে নজরুলের সুরে গানটি পরিবেশন করেন শৈল দেবী।

স্বগ্রাম চুরুলিয়ার সঙ্গে কবির যোগাযোগ প্রসঙ্গে শান্তিলতা জানান, কবির ছোট ভাই আলী হোসেন মাঝে-মধ্যে আসতেন। কবির নিজের বাড়ি যাওয়ার জন্য বা মায়ের জন্য কোনও ব্যাকুলতা ছিল না। 

কবির অসুস্থতা কখন দেখা দেয় ? এ প্রশ্নের জবাবে শান্তিলতা দেবী বলেন, ‘মহালয়ার দিন’ অর্থাৎ ৯ অক্টোবর ১৯৪২ তারিখে।

সব জীবনীকার ৯ জুলাই অসুস্থ হওয়ার কথা বললেও শান্তিলতা বলছেন ৯ অক্টোবর, অর্থাৎ তিন মাস পেছনের তারিখ। নজরুল অসুস্থ হবার তারিখ ‘৯ জুলাই’ না ‘৯ অক্টোবর’ তা নিয়ে আমি শেখ দরবার আলমের সাথে তাঁর উত্তর শাহজাহানপুরের বাসায় দীর্ঘ আলোচনা করেছি এবং তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি শান্তিলতাকৃত নজরুলের অসুস্থ হওয়ার তারিখ ভুল, আসল তারিখ হবে ‘৯ জুলাই’।

আমার রচিত নজরুল জীবন গ্রন্থের ‘নির্বাক নজরুল’ অধ্যায়ে বলেছি― 

‘আমার মতে ১৯৪২ সালে নজরুলের লিখিত পত্রের সূত্র ধরে এর সুরাহা সম্ভব। কারণ এ সময়ে লিখিত প্রত্যেকটি পত্রের মধ্যে কবির অসুস্থতা, ডাক্তার, বিশ্রাম, অসংলগ্ন বক্তব্য ইত্যাদি প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। অসুস্থতার সবচেয়ে বড় লক্ষণ প্রকাশ পায় নজরুলের হাতের লেখার মধ্যে। পত্রগুলোর উপর চোখ বুলালে নজরুলের অসুস্থতার বিষয়টি স্পষ্ট ধরা পড়ে।’

শান্তিলতা বলেন―‘মহালয়ার দিনে কবি বললেন, কাপড়-চোপড় কিনে আনো। আমি আগে থেকেই ছাপা শাড়ি চেয়েছিলাম। কবি বলেছিলেন, দেবেন। কবি দেবতুল্য ছিলেন। আমার পিতার মতো ছিলেন। তিনি আমার পিতার অভাব বুঝতে দেননি। সেবার আমি প্রথম ছাপা শাড়ি পরি। কেনা কাপড় তিনি কয়েকবার দেখলেন। কবি নিজের জন্য নতুন বালিশ দিতে বললেন। কলেজ স্ট্রিটের দোকান থেকে তাঁর জন্য নতুন বালিশ আনা হলো।’

নিজ পরিবারের সদস্যদের ভালো অবস্থায় রাখার ব্যাপারে কবি যে কতখানি দায়িত্ব সচেতন এবং সংবেদনশীল ছিলেন সে পরিচয় এখান থেকে পাওয়া যায়।

অসুস্থতার পরে দিল্লির লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালে পাঠানো সম্পর্কে শান্তিলতা জানান―‘নতুন বাড়ি দেখতে যাবো, এই কথা বলে কালীপদ গুহ রায়ের ব্যবস্থাক্রমে তাঁকে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়ি দেখতে যাওয়ার কথা বলায় কবি আপত্তি করেননি। উনি খুশি মনেই রওনা হয়েছিলেন।’

কবিকে অসুস্থতার কথা বুঝিয়ে না বলে ছলচাতুরির আশ্রয় কেন নিতে হলো তা আমাদের বোধগম্য হলো না।

লুম্বিনী পার্ক হাসপাতালে যাওয়ার আগে অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শে ও আর্থিক সহায়তায় কবি মধুপুরে হাওয়া বদল করতে যান। সেখানে কবির স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটেনি, বরং খানিকটা অবনতিই ঘটেছিল। মধুপুরের ভালো পাকা পেঁপে খেয়ে কবির কাশি হয় এবং তা উত্তরোত্তর বেড়ে যায়।

এই গল্প প্রায় সবার জানা এবং এই গল্প এখানেই শেষ বলে সবাই জানেন। কিন্তু শান্তিলতা দেবী এরপর থেকে গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করলেন―

‘মধুপুর থেকে অসুস্থ কবিকে নিয়ে চলে আসছি, সে সময় মধুপুরের স্টেশন মাস্টার রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় স্টেশনে আমাদেরকে বললেন, আপনারা সেকেন্ড ক্লাশ টিকিট হলেও ফার্স্ট ক্লাশে যান। কবি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফার্স্ট ক্লাশে উঠেছেন। ট্রেনে পথিমধ্যে একজন চেকার উঠলেন। কবি এমনিতেই ভয়ে ভয়ে ছিলেন। চেকার দেখে কবির মুখ শুকিয়ে গেছে। কবি তাঁর স্ত্রীকে টাকা বের করতে বললেন। কবির স্ত্রী আমাকে টাকা দিলেন কবির হাতে দেওয়ার জন্য। কবি টাকা দিতে যাবেন, এমন সময় চেকার হাত জোড় করলেন। হিন্দুস্থানী চেকার বললেন―আমি আপনাকেই দেখতে এসেছি। কবি ভয়ে ভয়ে থাকলে ঐ টি.টি হাওড়া স্টেশন পার করে দেওয়া পর্যন্ত সাথে ছিলেন।’

কাজী নজরুল ইসলামের চরিত্রের নৈতিকতার একটা দিক, আত্মমর্যাদার একটা দিক, আত্মসম্মানবোধের একটা দিক এই ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়। আর অবাঙালি একজন মানুষের কাছেও কবি কতখানি শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন, এই ঘটনা থেকে সেই প্রমাণ পাওয়া যায়।

কবি যখন হরিঘোষ স্ট্রিটের বাসায় থাকতেন সেই সময়কার একটি বিশেষ ঘটনার কথা শান্তিলতা দেবী উল্লেখ করেছেন তাঁর সাক্ষাৎকারে।

কবির অনুপস্থিতিতে একদিন দুজন লোক বাসায় হীরের গহনা রেখে গিয়েছিলেন। কবি দিয়ে পাঠিয়েছেন এ কথাই বলেছিলেন তাঁরা। কবি বাসায় এসে এই ঘটনা শুনে খুবই অস্বস্তি বোধ করেছিলেন। বলেছিলেন, অপরিচিত কেউ কোনও জিনিস দিয়ে গেলে আমরা যেন না রাখি।

কবির বিরুদ্ধে কেউ-কেউ বা কোনও-কোনও মহল যে ষড়যন্ত্র করতে পারে সেটা তিনি আগে থেকেই বুঝতেন। তিনি সহনশীল ছিলেন কিন্তু অসচেতন ছিলেন না।

এরপর ভবানীপুর থানা থেকে ওসি এসেছিলেন। ঘৃণায়, ক্ষোভে কবি কিছুতেই দারোগার সামনে যেতে, কথা বলতে চাইলেন না। বললেন, তোমরা রেখেছো তোমারই কথা বলো।

শান্তিলতা বললেন, এরপর ওসির সাথে কথা বলে জানলাম উনি আমাদের আত্মীয়। আমার বড় মামার ভগ্নিপতি। তিনি জানালেন, ঐ লোকদের তাঁরা ধরেছেন।

নজরুলকে নিয়ে এখন অনেক গবেষণা হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে, দুর্বোধ্য লেখা হচ্ছে। যার অনেকটা চর্বিতচর্বণ। কিন্তু নজরুল গবেষক ও জীবনীকার শেখ দরবার আলম শান্তিলতা দেবীর সাক্ষাৎকারে যা তুলে ধরেছেন তা পুনঃপুনঃ পাঠ হওয়া জরুরি। এগুলো আরও জনসম্মুখে আনা জরুরি। তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে নজরুলের জীবনযাত্রার সাথে বর্তমানে নজরুল চর্চার মিশেল আবশ্যিক। পূর্ণাঙ্গ নজরুল চর্চায় এর বিকল্প নেই।

এরকম আরও একটি ঘটনা―

কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে বৈকুণ্ঠ গুঁই নামে এক ব্যবসায়ীর কাপড়ের দোকান ছিলো। কবি এ দোকান থেকে নিয়মিত কাপড় কিনতেন। একবার দোকানদার খারাপ ব্যবহার করলে আমরা বাসা থেকে কবিকে ঐ দোকান থেকে কাপড় কিনতে নিষেধ করলাম।

এরপর একদিন দেখলাম, কবি বাচ্চাদের জন্য পোশাক এনেছেন। কোথা থেকে এনেছেন বলতে চান না। পীড়াপীড়ি করায় জানালেন, বৈষ্ণুণ্ঠের দোকান থেকেই এনেছেন। আমরা বললাম, এই রকম খারাপ ব্যবহার করেছেন, আবার তার দোকান থেকে কাপড় এনেছেন ? কবি বললেন, এসব কি মনে রাখলে চলে ?

এ থেকে কবির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব সম্পর্কে আমরা সম্যক ধারণা পাই। কবি কখনও ব্যক্তি মানুষকে শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে রাখতেন না। কারও খারাপ, দুর্ব্যবহার স্মরণ করে দূরত্ব তৈরি করতেন না। মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, গোলাম মোস্তফা বা দু-একজন প্রকাশক-সম্পাদকের সাথে নজরুলের সম্পর্ক থেকেও আমরা এ ধারণা পাই।

শান্তিলতাকে একটি কড়া প্রশ্ন করা হয়েছিল। কবির সৃষ্টি রেকর্ড, খাতা-ডায়েরি, চিঠি পত্রগুলো কোথায় ?

তিনি উত্তর দিয়েছিলেন―‘মোটা মোটা খাতা, চিঠি পত্র কত লেখা বই, আমার কাছে ছিলো; ভবিষ্যতে কাজে লাগবে সেটা ভাবতেও পারিনি। এসবের মূল্য বুঝিনি।’

‘ভবিষ্যতে কাজে লাগবে ভাবতেও পারিনি। এসবের মূল্য বুঝিনি’―কী ভয়ংকর কথা। নজরুল যাঁকে কন্যা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন, যিনি নজরুলকে পিতৃতুল্য-দেবতুল্য মনে করতেন, যাঁর বাড়িতে থেকে শৈশব-কৈশোর-শিক্ষালাভ-সংসার কর্ম করেছেন, তাঁর মহা-মহা মূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হলো না!

এখানে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, কবির সৃষ্টি অনুসন্ধান, উদ্ধার ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিষয়ে শান্তিলতা বা শাশুড়ি বা পত্নীর কোনও উদ্যোগ নেই, উদ্বেগ নেই, নেই উৎকণ্ঠা। এটা হয়েছে মূলত তাঁদের শিক্ষা-দীক্ষার অভাবের কারণে। কবি নজরুলকে তাঁরা একজন অপরাপর উপার্জনক্ষম, সহানুভূতিশীল ভালো মানুষ হিসেবে দেখেছেন। কবি হিসেবে বা সমাজের উঁচুস্তরের একজন মানুষ হিসেবে দেখেছেন।

আসলে গৃহমনস্ক, সম্পত্তিমনস্ক, সম্পদমনস্ক হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। শান্তিলতা নিজে তো এসবের মর্ম বোঝেনইনি, কবি-পত্নী বা কবির শাশুড়ির কাছ থেকেও কবির সৃষ্টি সম্পর্কে দরদী হওয়ার, সচেতন হওয়ার কোনও তালিম পাননি। তাঁরা মনে করেছেন, রোজগার করার মানুষটাই যখন অচল তখন এসব দিয়ে কী-ই বা আর হবে!

কবি পড়াশোনা বা লেখালেখি কী রকম পরিবেশে বা কোন সময় করতেন ? এরকম প্রশ্নের জবাবে শান্তিলতা বলেন, তাঁর পড়াশোনা বা লেখালেখির জন্য আলাদা কোনও জায়গা ছিলো না, আলাদা কোনও ব্যবস্থা ছিল না। যে কোনও পরিবেশে যে কোনও অবস্থায় যখন-তখন কবি লিখতেন। তাস খেলা হচ্ছে, পাশে কবি বসে লিখছেন।

শান্তিলতা দেবীর অনেক কথা সাংঘর্ষিক। তারপরেও নজরুল পরিবারের একজন হয়ে পিতৃতুল্য কবিকে যে চোখে দেখেছেন, মূলত আমরা তা-ই বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছি। তবে পূর্ণাঙ্গ নজরুলকে চিনতে হলে দেখতে হলে নজরুলের মতো চোখ আবশ্যক। 

লেখক : গবেষক, সাহিত্য ও সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব

সম্পাদক : দৈনিক সংবাদ সংযোগ

প্রতিকৃতি : শেখ আফজাল

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button