বইকথা : সনজীদা খাতুনের স্মৃতিচারণ গ্রন্থ আমার বাবা : কাজী মোতাহার হোসেন


প্রখ্যাত লেখক, পরিসংখ্যানবিদ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের সুযোগ্যা কন্যা অধ্যাপক সন্জীদা খাতুনের ব্যতিক্রমধর্মী এক রচনা সংকলন আমার বাবা কাজী মোতাহার হোসেন।
গ্রন্থের সূচিপত্র সাজানো হয়েছে এভাবে―জীবন পথিক কাজী মোতাহার হোসেন, আমার বাবা, আব্বু কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী মোতাহারের শিক্ষাধারা, পিতা ও শিক্ষক, নজরুল ও তাঁর ‘মোতিহার’, আধুনিক চিন্তার সঞ্চরণ। পরিশিষ্টে সংযোজিত হয়েছে কাজী মোতাহার হোসেন জীবনালেখ্য। আমরা সূচিতে বর্ণিত প্রত্যেকটি বিষয়ের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রয়াস নেব।
জীবন পথিক কাজী মোতাহার হোসেন:
কাজী মোতাহার হোসেন ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। সেই আমলে জ্ঞান বুদ্ধির চর্চা খুবই কম ছিল। ১৯২৬ সালে সৈয়দ আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদসহ আরও কয়েকজন মিলে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ গঠন করেন। এদের মূল লক্ষ্য ছিল জনমানসে বুদ্ধির বিকাশ ঘটানো। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’র মুখপত্র ছিল শিখা। শিখার লক্ষ্য নিয়ে মোতাহার হোসেন মন্তব্য করেছেন―‘আমরা চাই জ্ঞান শিক্ষা দ্বারা কুসংস্কারকে ভস্মীভূত করিতে এবং সনাতন সত্যকে কুহেলিকামুক্ত করিয়া ভাস্কর ও দীপ্তিমান করিতে।’
মোতাহার হোসেন যখন বর্ধমান হাউসে বাস করতেন তখন কাজী নজরুল ইসলাম একাধিকবার তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেন। দুই কাজীর ঘনিষ্ঠতা আপনি থেকে দ্রুত তুমিতে পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁদের দুজনারই প্রেম ও সৌন্দর্যবোধের সাধনা ছিল বলে মোতাহার কাজী নজরুল ইসলামের কাছে ‘মোতিহার’ হয়ে উঠেছিলেন।
আলোচ্য প্রবন্ধে বিভিন্নভাবে নজরুলের প্রসঙ্গ এসেছে। জ্যোতিষশাস্ত্র, দাবা খেলা; মোতাহার হোসেনের প্রবন্ধ, গণিত ইত্যাদি নানা বিষয়। ছাত্রজীবনে বিভিন্ন ধরনের খেলার নেশায় মত্ত থাকলেও শেষকালে এসে মোতাহার দাবার নেশায় জগৎ-সংসার ভুলে থাকতেন। প্রথম বয়সের জীবনমনস্ক মানুষটা হয়ে পড়েছিলেন অন্যমনস্ক। রচনাটি সন্জীদা খাতুনের স্মৃতিপটে গুণীজন গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে, যা ২০১৭ সালে নবযুগ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
আমার বাবা :
এ অধ্যায়ে কাজী মোতাহার হোসেনের জন্ম, লেখাপড়া, বৃত্তিলাভ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা বিষয় ধারাবাহিকভাবে লেখিকা তুলে ধরেছেন। দরিদ্র ঘরে জন্মগ্রহণ করলেও মেধাবী মোতাহার বৃত্তি পাওয়ার টাকা থেকে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এমনকি ১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজে বিএ অনার্স পরীক্ষায় পূর্ববঙ্গ আর আসাম অঞ্চলে প্রথম হয়ে তিনি ৩০ টাকার বৃত্তি পান। এই টাকা থেকে তিনি গ্রামে বাবাকেও কিছু পাঠাতেন। ১৯২১ সালে মোতাহার পদার্থ বিজ্ঞানে সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবন শেষ করেন। শিক্ষা জীবনে তিনি জ্যোতিন্দ্রমোহন রায়, সুভাষ বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র, ড. এস এন রায়, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক সত্যেন বোস, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, কাজী আবদুল ওদুদ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী আকরম হোসেন প্রমুখ মনীষীর সাহচর্য পেয়েছেন।
১৬ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ অধ্যায়ে সন্জীদা খাতুন কাজী মোতাহার হোসেনের জন্ম-শিক্ষা-কর্ম-মৃত্যু নিয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়াস পেয়েছেন। এ রচনাটি সন্জীদা খাতুনের টুকরো কথার ঝাঁপি গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত আছে যা মার্চ ২০১২ সালে নবযুগ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
আব্বু কাজী মোতাহার হোসেন :
এ অধ্যায়ে লেখিকা তাঁর বাবা মোতাহার হোসেনের ৩০/৩১ সালের মূল নিবাস বর্ধমান হাউসের সাঙ্গীতিক আবহ স্পষ্ট করেছেন। এখানে আসতেন কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, দিলীপ রায়, আব্বাসউদ্দীন, কে. মল্লিক প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞ।
যদিও সন্জীদার জন্ম হয়নি তখন। মায়ের মুখে শোনা। পাঁচ বছরের রানুকে (যোবায়দা মীর্জা) কোলে বসিয়ে ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল’ গাইছিলেন এক আসরে নজরুল ইসলাম। সন্জীদার ভাষায়―নজরুলকে আম্মু খুব ভয় পেতেন। বলতেন, ওই বড় বড় চোখ, ওরে বাবা। গায়ের মধ্যে কাঁটা দেয়। সন্জীদা আরও বলেন, নজরুল বর্ধমান হাউসে আতিথ্য গ্রহণ করলে আব্বুর ঘর থেকে আম্মুর নির্বাসন হতো বলে নজরুল আম্মুকে ‘সতিন’ বলতেন।
এ অধ্যায়ে মোতাহার হোসেনের দাবা খেলার নানা অভিজ্ঞতা লেখক তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে চিঠিতে দাবা খেলার মতো এক অভিনব পদ্ধতি আমাদের অবাক করে দেয়। এ রচনাটি ‘আপনজনদের স্মৃতিকথা’ শিরোনামে ১৯৯৭ সালে কাজী মোতাহার হোসেন ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।
কাজী মোতাহারের শিক্ষাধারা :
‘কাজী মোতাহার হোসেনের প্রথম গ্রন্থ সঞ্চরণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। তখন আমার বয়স মাত্র ৪ বছর।’ এভাবে অধ্যায়টি শুরু হয়েছে। তারপর বাবার ছেলে-মেয়ে কী পড়বে, কীভাবে পড়বে, ডিকশনারি দেখে শব্দ খুঁজে বের করা, অঙ্ককে গুরুত্ব দেওয়া, অপাঠ্য বইয়ের প্রতি সন্তানদের আগ্রহ তৈরি করা, সন্তানদের সাথে দাবা খেলা ইত্যাদি শিক্ষামূলক বিষয় এ অধ্যায়ে বিধৃত হয়েছে। নিজের বড় মেয়ের সাথে চমৎকার ব্যাডমিন্টন দেখার প্রতিযোগিতার গল্প অত্যন্ত উপভোগ্য।
এ রচনাটি ২০১৭ সালে নবযুগ প্রকাশনী থেকে স্মৃতিপটে গুণীজন গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত আছে।
পিতা ও শিক্ষক :
ছোট এই অধ্যায়ে পিতা মোতাহার-শিক্ষক মোতাহার কীভাবে তাঁর সন্তানদের বড় করে তুলেছেন তার বর্ণনা করা হয়েছে। সেই শৈশব থেকে কৈশোর পেরিয়ে পরিণত বয়সের শিক্ষা কাঠামো এ রচনাতে বিধৃত হয়েছে। কেবল পাঠ্য বা অপাঠ্য বই পড়াই নয়, ঐতিহাসিক সব বিখ্যাত গল্পও তিনি সন্তানদের শোনাতেন।
সন্জীদা খাতুন অনার্সে পড়বার সময় সঙ্গীত সাধনায় মন দিয়ে নিয়মিত গলা সাধতেন। শুদ্ধ নিখাদের সুর লাগাবার কৌশলও তিনি মেয়েকে বলে দেন। গান গাইবার সময় মুখের বিকৃতি নিয়ে মোতাহার সন্তানদের পরামর্শ দেন।
নবযুগ প্রকাশনী থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত স্মৃতিপটে গুণীজন গ্রন্থে রচনাটি প্রকাশিত হয়েছে।
নজরুল ও তাঁর ‘মোতিহার ’ :
কাজী নজরুল ও কাজী মোতাহার, দুই কাজীর নাম বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। নজরুল জীবনী পাঠ করলে কাজী মোতাহারের নাম অবশ্যম্ভাবীরূপে চলে আসে। নজরুল দুই বছরের বড় হলেও তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ। নজরুল এ জন্যই প্রিয় বন্ধুর নাম মোতাহার থেকে মোতিহার দিয়েছিলেন। নজরুলের চিঠিপত্র পাঠ করলে আমরা সাতটি পত্র মোতাহারকে লিখতে দেখি।
বলা ভালো নজরুলের বেশির ভাগ পত্রের মধ্যে মিস ফজিলাতুন্নেসার খবরাখবর পাওয়া যায়। আর প্রতিভা বসু ওরফে রানু সোম, নোটন―এদেরকে নজরুল কীভাবে গান শিখিয়েছেন তার প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। এ অধ্যায়ে আমরা নজরুলে নিবেদিত কাজী মোতাহারকে পাই। যিনি রবীন্দ্রনাথকে পাত্তাই দিতেন না।
এ রচনাটি ২০১৮ সালে নবযুগ প্রকাশনী থেকে থেকে প্রকাশিত নজরুল-মানস গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
আধুনিক চিন্তার সঞ্চরণ :
১৯৩৭ সালে কাজী মোতাহার হোসেনের প্রথম প্রবন্ধ সংকলন সঞ্চরণ প্রকাশিত হয়েছিল। এর প্রবন্ধগুলো আগেই শিখা, সওগাত, মোহাম্মদী প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আনন্দ ও মুসলমান গৃহ, শিক্ষিত মুসলমানদের কর্তব্য, বাঙালির সামাজিক জীবন বা বাঙলা সাহিত্যের স্বরূপ ইত্যাদি প্রবন্ধের বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে এ অধ্যায়ে। ২০০৪ সালে জাতীর গ্রন্থ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত সংস্কৃতি কথা: সাহিত্য কথা গ্রন্থ থেকে এ রচনা সংকলন করা হয়েছে।
কাজী মোতাহার হোসেন জীবনালেখ্য :
এ অধ্যায়ের উপ-অধ্যায়গুলো হলো―ডানা মেলে ওড়া, জীবনে জীবন, সকল কাঁটা ধন্য করে, গুলবাগে ফুল চায় বিদায়। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে কাজী মোতাহার হোসেন জীবনী গ্রন্থ থেকে এ অধ্যায় নেওয়া হয়েছে।
মোতাহার হোসেন সম্পর্কে পূর্বাধ্যায়গুলোতে প্রায় যা-যা আলোচনা হয়েছে তার প্রায় সবকিছু এ অধ্যায়ে পুনরালোচিত হয়েছে। কিছু কিছু উদ্ধৃতি দুবার-তিনবার ব্যবহৃত হয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যায়, গ্রন্থের প্রত্যেকটি অধ্যায় কোনও না কোনও গ্রন্থে পূর্বেই মুদ্রিত হয়েছে। এতে সন্জীদা খাতুনের আমার বাবা কাজী মোতাহার হোসেন গ্রন্থটি মৌলিকত্ব হারিয়েছে। তবে মোতাহার হোসেন সম্পর্কে জানবার জন্য এ গ্রন্থটি অপরিহার্য।
লেখক: গবেষক, সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব



