লিটল ম্যাগ : অংশী হাসপাতাল সংখ্যা পাঠ : শাহাদুল করিম

মানবকল্যাণের অংশীদারিত্বের নিমিত্তে গড়া সাহিত্য পত্রিকা অংশী ইতিমধ্যে সমঝদার ব্যক্তিবর্গের হৃদয়ে আসন গড়তে পেরেছে। বরাবরই সমাজের গুরুত্বপূর্ণ নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পত্রিকাটি তাৎপর্যপূর্ণ লেখা প্রকাশ করে থাকে। চলমান সংখ্যাটির বিষয় ছিল ‘হাসপাতাল’। হাসপাতাল প্রতিটি মানুষের জীবনে নিবিড়ভাবে জড়িত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। জগতে মানুষ রয়েছে সুস্থ, অসুস্থ আর মৃত। সুস্থ মানুষের গল্প আছে, মৃত মানুষের ইতিহাস আছে আর অসুস্থ মানুষের আছে করুণ অসহায়ত্ব। হাসপাতালে গেলে রোগীদের আহাজারি দেখলে সে অসহায়ত্বের নির্মমতা সরেজমিনে লক্ষ করা যায়। লেখক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যকদের জীবনেও রয়েছে হাসপাতাল নিয়ে স্মৃতিযোগ্য ঘটনা। কেউ নিজে রোগী বা আপনজন রোগী অথবা নার্স বা ডাক্তার যুগপৎভাবে একজন প্রথিতযশা লেখক। রোগের অভিজ্ঞতা এবং লেখনীর পারদর্শিতার মিশ্রণে প্রায় প্রতিজন লেখক লিখেছেন অত্যন্ত সমৃদ্ধ লেখা যা অকৃত্রিম, বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যপূর্ণ এবং হৃদয়স্পর্শী। এমন মূল্যবান লেখা দিয়ে পত্রিকাটি ঢেলে সাজানো হয়েছে। যে লেখা পাঠকের চিন্তার জগৎকে আলোড়িত করবে।
একটি হাসপাতাল শুধুই রোগ আর রোগীর গল্প দিয়ে জড়ানো নয়, বরং সেখানে ডাক্তার, নার্স, বয়, ওয়ার্ড বয়, আয়া, বুয়া, পিয়ন, প্রশাসন, কেরানি, সিকিউরিটি, ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিসহ হরেক রকম মানুষ রয়েছে এবং যে মানুষগুলোর প্রেম, ভালোবাসা, ক্ষুধা, যৌনতার মতো মৌলিক ও স্বতন্ত্র গল্পও রয়েছে। যে গল্প কোনও মানদণ্ডেই কম মূল্যমানের নয়। লেখকরা তাদের সাবলীল ভাষায় সে সমস্ত গল্প নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। পত্রিকাটিতে রয়েছে ২৫টি গল্প এবং ১৭টি প্রবন্ধ। যেখানে উঠে এসেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাচীন ইতিহাস, সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসার চালচিত্র এবং হাসপাতাল আঙিনার কর্মযজ্ঞ।
‘দেবভূমিতে কয়েকজন মানবী’ গল্পে লেখক নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন একজন ডাক্তারের শিকড় থেকে শিখর পর্যন্ত গড়ে উঠার অনবদ্য কাহিনি। যেখানে আলোকপাত হয়েছে মেডিকেল শিক্ষার্থীর গল্প, শিক্ষানবিশ ডাক্তারের গল্প, মা ডাক্তারের গল্প, সিনিয়র ডাক্তারের গল্প, ডাক্তার যখন রোগী তার গল্প, ডাক্তার রোগীর প্রতি কতটা যত্নশীল সে গল্প, দিবানিশি অবিরাম চিকিৎসার বহমান গল্প। যা পাঠ করে একজন পাঠক মেডিকেল বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবে। ‘ওম’ গল্পটিতে আপনজনকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার অবর্ণনীয় কষ্টের কথা এবং খুব কাছে থেকে মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণা অবলোকন করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। যা পাঠকের মনকে নাড়া দেবে। ‘হাসপাতালটি ঘুমিয়ে পড়েছে’ গল্পে অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে রম্য বাক্যালাপের মধ্যে দিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসারত রোগীর অতি কষ্টের কথা তুলে ধরা হয়েছে। যা পাঠ করে পাঠক বিব্রতকরভাবে সুখ এবং শোক উপলব্ধি করতে পারবে। বারোবিলাসী নারীর শারীরিক জটিলতা, হিজরা সম্প্রদায়ের নিদারুণ মনোকষ্টের কথা, গ্রাম থেকে শহরে বা দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা সেবার অচেনা দৃশ্যপট, রোগ নির্ণয় নিয়ে বিড়ম্বনা, মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে সুস্থ হওয়ার আনন্দের কথা উঠে এসেছে আলোচিত হাসপাতাল সংখ্যায়।
কয়েক দশকে দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এমআরআই, সিটি স্ক্যান, আইসিইউ, এইচডিইউ, এনজিওগ্রাম, ডায়ালাইসিস, কেমোথেরাপি, ফিজিওথেরাপিসহ জটিল চিকিৎসাব্যবস্থা দেশেই চালু হয়েছে, এ কথা যেমন সত্য আবার দেশের জনসংখ্যার তুলনায় তা অপ্রতুল, ব্যয়বহুল এবং শহরকেন্দ্রিক যা এখনও সাধারণ মানুষদের নাগালের বাইরে এ কথাও মিথ্যা নয়। বলা বাহুল্য দেশের ৬৮ শতাংশ লোক গ্রামে বাস করে অথচ ৭৫ শতাংশ ডাক্তার শহরে বাস করে এবং প্রতি ১০ হাজার লোকের বিপরীতে রয়েছে মাত্র সাত জন ডাক্তার। এ সমস্ত কারণে এ দেশে অসম চিকিৎসাব্যবস্থা বিরাজমান রয়েছে। দেশে চিকিৎসা আছে কিন্তু দেশবাসীর সে চিকিৎসা গ্রহণের সামর্থ্য নেই, সুযোগ নেই, ভুল চিকিৎসা, দালাল দ্বারা হয়রানির সে সমস্ত জটিলতার কথা ভুক্তভোগী জীবনের এক মহা আখ্যান সুদক্ষ লেখকের লেখনীতে শিহরণ জাগানো গল্প হয়ে ফুটে উঠেছে উল্লিখিত সংখ্যায়।
শুধু রোগীর আর্তনাদের গল্প ছাড়াও পেশাদার বেশ কয়েকজন ডাক্তার চিকিৎসাশাস্ত্রের বিভিন্ন টেকনিক্যাল বিষয়, রোগ ও রোগী নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা সাহিত্যের ভাষায় বর্ণনা করেছেন। যার মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে পত্রিকাটির বিশেষ মাত্রা।
মরার পরে স্বর্গ আছে। তারপরও মানুষ বাঁচার জন্য শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করে যায়। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচার জটিল গল্প সহজ করে ফুটিয়ে তুলেছেন দক্ষ লেখকবৃন্দ। গল্পগুলো এতটাই বাস্তবভিত্তিক এবং তাৎপর্যমণ্ডিত যে প্রতিটি গল্প নিয়ে আরেকটা গল্পের সমান পাঠ পর্যালোচনা লেখা সম্ভব। তাই হাসপাতাল সংখ্যা পাঠ করার মাধ্যমে একজন পাঠক যেমন সাহিত্যের রূপরস আস্বাদন করতে পারবে তেমনই সুস্থ থাকার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারবে এবং অংশী পত্রিকাটি ক্রয় করার মাধ্যমে একটি গঠনমূলক কল্যাণকর কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারবে। কারণ পত্রিকাটির বিক্রয়লব্ধ অর্থ সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার সংগুইপাড়া গ্রামে অংশী স্বপ্নজয়ী পাঠশালার আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করা হবে। সুতরাং সৎ উদ্দেশ প্রণোদিত পত্রিকাটির প্রচার প্রসার এবং সমৃদ্ধি গভীরভাবে কামনা করি। সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সমস্যাগুলোকে সাহিত্যের রং দিয়ে সাজিয়ে পাঠক সমাজে তুলে ধরার মাধ্যমে কল্যাণকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সম্মানিত সম্পাদক শ্যামলী খান, নির্বাহী সম্পাদক জনাব মনি হায়দারসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিবর্গের দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক



