Uncategorized

নজরুল ইসলামের লাঙল : শতবর্ষ পরে নিবিড় পাঠ : প্রথমা রায়মণ্ডল

প্রচ্ছদ রচনা : রবীন্দ্র-নজরুল স্মরণ

ধূমকেতুর পরে প্রকাশিত হলো লাঙল―নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা। লাঙল পত্রিকা প্রকাশের প্রারম্ভিককাল থেকেই নজরুলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন উগ্র-জাতীয়তাবাদী একটি গোষ্ঠী। পরে  ‘লাঙল’গোষ্ঠীর মধ্যে ঢুকে পড়েন মুজফ্ফর আহমদসহ একদল তরুণ কম্যুনিস্ট।

লাঙল পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর পত্রিকাটির শতবর্ষ পূর্ণ হলো। ধূমকেতু ছিল নজরুলের প্রথম স্বাধীন এবং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনায় লালিত পত্রিকা। কিন্তু দ্বিতীয়টি অর্থাৎ লাঙল ছিল একটি রাজনৈতিক দলের মুখপত্র―যেখানে ব্যক্তি নয়, সমষ্টিগত চিন্তা ও মতাদর্শকে মান্যতা দেওয়াই রীতি; তাই পরিচালক হলেও এক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা তেমন থাকে না।

লাঙল পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য :

‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ-স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজ্য লাভ।’ এই সংগঠনটি তৈরির উদ্যোক্তা স্বয়ং নজরুল ইসলাম। তখন তিনি থাকতেন গঙ্গা নদীর ওপারে, হুগলিতে। সেখান থেকেই যাতায়াত করতেন ৩৭ নং হ্যারিসন রোডের, পার্টি ও পত্রিকা অফিসে। তীব্র আর্থিক-সংকটে আক্রান্ত, অসুস্থ নজরুলের অনেক সময় ঘরে ফিরে যাওয়ার বাসভাড়াটুকুও থাকত না।

তখন নজরুলের সঙ্গে ছিলেন কুতুবউদ্দীন আহমদ, হেমন্তকুমার সরকার, শামসুদ্দীন হুসয়ন, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, অতুল গুপ্ত, আবদুল হালিম প্রমুখ। তাঁরা ছিলেন উগ্র-জাতীয়তাবাদী এবং স্বরাজপন্থি স্বাধীনতাকামী। দলটি গঠিত হয় ১৯২৫ সালের ১ নভেম্বর। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তথা শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়। এর প্রভাবে দেশে দেশে স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। ভারতেও তার প্রভাবের প্রতিফলন ঘটে। বিপ্লবী ক্রিয়াকর্মের পাশাপাশি তাই স্বল্প সংখ্যক হলেও কিছু নেতার মধ্যে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর, তাসখন্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। পরে ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর, ভারতের কানপুরে গঠিত হয় ‘Communist Party of India’.

ঘটনাটি কাকতালীয় মনে হলেও, লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে, লাঙল পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রকাশ এবং  কানপুরে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়েছে ঐ একই দিনে।

লাঙল-এ প্রকাশিত সংবাদ এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধ দেখে সহজেই অনুমিত হয় যে, পত্রিকায় একই সঙ্গে অবস্থান করছে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং মার্কসীয় মতাদর্শগত রচনা। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী: নজরুল ইসলাম হলেন পত্রিকার প্রধান পরিচালক; সম্পাদক হিসেবে রাখা হয় নজরুলের ফৌজি বন্ধু ও গায়ক মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে। তবে সবাই জানতেন যে, এটা নজরুলেরই পত্রিকা এবং বকলমে তিনিই সম্পাদক।

প্রথম সংখ্যায়, পত্রিকার পরিচয় সম্বন্ধে বিশেষভাবে উল্লিখিত ছিল :

এটি ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ের’ মুখপত্র। তবে উল্লেখযোগ্য যে, দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে সপ্তম সংখ্যা পর্যন্ত দেখা যায়, ‘সম্প্রদায়ের’ শব্দের পরিবর্তে সেখানে ‘দলের’ শব্দটি ব্যবহৃত হতে। আবার অষ্টম থেকে দশম সংখ্যা পর্যন্ত দলের নামের অগ্রভাগে সংযোজিত হয়েছে ‘বঙ্গীয়’ শব্দটি। ১৯২৬ সালের ৬ এবং ৭ ফেব্রুয়ারি, কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনে’ দলের নামটি বদলে রাখা হয় : ‘The Bengal Peasants and Workers Party’  বা ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল’ ; অতএব লাঙল হয়ে যায় এই নবগঠিত দলের মুখপত্র।

পত্রিকাটির মোট ১৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম সংখ্যা: ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ; আর শেষ মুদ্রিত সংখ্যার প্রকাশকাল ১৯২৬ সালের ১৫ এপ্রিল। পত্রিকার নগদ মূল্য ছিল এক আনা ; বার্ষিক মূল্য: তিন টাকা। পত্রিকাটি ছিল ট্যাবলয়েড সাইজের ১৬ পৃষ্ঠার। তবে দুটি সংখ্যা ছিল ২০ পৃষ্ঠার। প্রথম থেকে দ্বাদশ সংখ্যা পর্যন্ত, সম্পাদক হিসেবে নাম ছিল মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের। কিন্তু ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ সংখ্যার সম্পাদক পরিচয়ে, মুদ্রিত হতে দেখা যায়, গঙ্গাধর বিশ্বাসের নাম। ১৫টি সংখ্যার মধ্যে, বিশেষ সংখ্যা রূপে চিহ্নিত ছিল ৩টি সংখ্যা :

১. প্রথম সংখ্যা : নজরুলের ‘সাম্যবাদী’;

২. পঞ্চম সংখ্যা: সুভাষচন্দ্র বসু এবং

৩. ত্রয়োদশ সংখ্যা: মৎস্যজীবী সংখ্যা।

প্রথম সংখ্যা মুদ্রিত হয়েছিল ৫০০০ (পাঁচ হাজার) কপি। বিপুলসংখ্যক পাঠক চাহিদার কারণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত কপি নিঃশেষিত হয়ে যায়। ফলে নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতা পুস্তকাকারে প্রকাশ করে, তাৎক্ষণিকভাবে Damage Control করতে হয়। ব্যাপক-পাঠকচাহিদা অনুধাবন করে, বিশেষত মফসসলবাসীর অপ্রাপ্তিমোচনের কথা মাথায় রেখে, লাঙলের দ্বিতীয় সংখ্যাটি ছাপাতে হয়েছিল পাঁচ হাজারেরও বেশি কপি। প্রত্যেক সংখ্যারই শুরুতে শিরোভাগে মুদ্রিত ছিল―

১. চণ্ডীদাসের মানবতার বাণী :

‘শুনহ মানুষ ভাই,

সবার উপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই’;

এবং ২. লাঙল কাঁধে কৃষক এবং লাঙল দিয়ে কৃষকের জমি চাষ করার দুটো লোগো (Logo)।

তবে, Logo-তে শুধু কৃষক থাকায়, অর্থাৎ শ্রমিক অনুপস্থিত থাকায়, পত্রিকার দ্বাদশ সংখ্যা থেকে এই লোগোটি তুলে দেওয়া হয়। শেষ সংখ্যায় দেখা যায়, পরিবর্তিত লোগোতে যুক্ত হয়েছে ‘কাস্তে ও হাতুড়ি’। এর মধ্য দিয়ে, লাঙল পত্রিকায় মার্কসীয় মতাদর্শ ও দর্শনের সরাসরি প্রবেশ ঘটে। ততদিনে অবশ্য কম্যুনিস্ট মুজফ্ফর আহমদ এবং সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিষ্ঠরূপে নিজেদের সংযুক্ত করে নিয়েছেন। এবং একঝাঁক কমিউনিস্ট লেখক-পত্রিকায় প্রবন্ধ-নিবন্ধ-অনুবাদ-সংবাদভাষ্য ইত্যাদি প্রকাশ করে পত্রিকাটিতে ধীরে ধীরে বাম-রাজনীতির সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়েছেন। অধিকাংশ রচনাই সোভিয়েত রাশিয়ার কালজয়ী মার্কসীয় সাহিত্যের অনুবাদ এবং সোশালিজম ইত্যাদি বিষয়ক। নজরুল ইসলাম তখনও অসুস্থ অবস্থায়, সপরিবার হেমন্তকুমার সরকারের তত্ত্বাবধানে কৃষ্ণনগরে বসবাস করছেন। পত্রিকার শেষ তিনটি সংখ্যার প্রথম পাতায় মুদ্রিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আশীর্বচন’ :

‘জাগো, জাগো, বলরাম, ধরো তব মরুভাঙা হল,

বল দাও, ফল দাও, স্তব্ধ করো ব্যর্থ কোলাহল।’

পাঠান্তরে : ‘বল দাও, ফল দাও’-এর স্থানে হয়েছে : ‘প্রাণ দাও, শক্তি দাও’।

লাঙল-এর বিভিন্ন সংখ্যায় নজরুলের যাবতীয় লেখালিখির নামোল্লেখ-সূচক একটি পরিচিতি দেওয়া যেতে পারে, যেখানে দেখা যাবে ১৫টি সংখ্যার মধ্যে নজরুলের অস্বাক্ষরিত গদ্য রচনা ছাপা হয়েছে ৪টি ; বাকিগুলো কবিতা।

যথা :

প্রথম সংখ্যা:    ১.         সম্পাদকীয় : লাঙল;

             ২.         ‘সাম্যবাদী’ (কবিতা);

             ৩.        ‘ভারতীয় জাতীয় মহাসমিতির

                          ‘শ্রমিক-প্রজা-সম্প্রদায়ের’       

                          উদ্দেশ্য ও নিয়মাবলী’।

দ্বিতীয় সংখ্যা : ‘কৃষাণের গান’ (গান)

তৃতীয় সংখ্যা : ১.          ‘সব্যসাচী’ (কবিতা)

                 ২.     ‘পোলিটিকাল তুবড়ি বাজি’

চতুর্থ সংখ্যা :    দ্ধ   কোনও লেখা নেই।

পঞ্চম সংখ্যা :       ‘নজরুল ইসলামের পত্র’

ষষ্ঠ সংখ্যা  :     দ্ধ  কোনও লেখা নেই।

সপ্তম সংখ্যা :       ‘অশ্বিনীকুমার’ (কবিতা)

অষ্টম সংখ্যা  :   দ্ধ  কোনও লেখা নেই।

নবম সংখ্যা  :       ‘শ্রমিকের গান’ (গান)

দশম সংখ্যা :    দ্ধ   কোনও লেখা নেই।

একাদশ সংখ্যা : দ্ধ   কোনও লেখা নেই।

দ্বাদশ সংখ্যা :       ‘জেলেদের গান’ (পরে     

                        পরিবর্তিত নাম:

                         ‘ধীবরদের গান’)

ত্রয়োদশ সংখ্যা:  দ্ধ  কোনও লেখা নেই।

চতুর্দশ সংখ্যা  :      ‘সর্বহারা’ (কবিতা)

পঞ্চদশ সংখ্যা :   দ্ধ  কোনও লেখা নেই।

দেখা যাচ্ছে, লাঙল পত্রিকার চতুর্দশ সংখ্যায় (১৫ এপ্রিল, ১৯২৬) মুদ্রিত ‘সর্বহারা’ কবিতাটিই লাঙলের সঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের শেষ সংযোগ। তারপর আর তাঁর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোনও সম্পর্ক-সংযোগ চোখে পড়েনি। উপরন্তু বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো: ‘সর্বহারা’ কবিতাটিই কবির বিদ্রোহাত্মক কবিতা সিরিজের শেষ রচনা। কবির কোমল হৃদয়ের গভীরে এমন কোনও ব্যথার প্রতিক্রিয়া কি ঘটেছিল, যে কারণে তিনি এ ধরনের শাণিত-পাঠক উজ্জীবিত কবিতা রচনার দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে, সরাসরি রোমান্টিক কবিতা রচনায় আত্মনিয়োগ করলেন! একজন নিবিষ্ট নজরুল-অনুসন্ধিৎসু গবেষক হিসেবে এই জিজ্ঞাসা মনে উঁকি দেয় বৈকি! নজরুল কি অন্তরের গভীরে অনুভব করতে পারছিলেন তাঁর উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতার কারণে তাঁকে লাঙল থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে! কিংবা তাঁর অসুস্থতা ও দারিদ্র্যই কি তাঁর সচেষ্ট-নিমগ্ন-বহুকাক্সিক্ষত লাঙল থেকে, তাঁর ত্রস্থ-হৃদয় তাঁকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে! উহ্যই রয়ে গেল এর উত্তর।

লাঙল―পঞ্চদশ সংখ্যার পরে, পত্রিকা ছাপার নানাবিধ সমস্যা হেতু এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯২৬ সালের ১২ অক্টোবর, মুজফ্ফর আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় গণবাণী পত্রিকা। গণবাণীর প্রথম সংখ্যায় ‘আমাদের কথা’ শিরোনামে সম্পাদক জানিয়ে দিয়েছেন বটে যে : ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল গণবাণীর প্রকাশ ভার গ্রহণ করেছেন। এই দলের পূর্ব্ব-প্রকাশিত লাঙল গণবাণীর সহিত একীভূত হয়ে গেছে।’ তবে এ কথাও অস্বীকারের উপায় নেই যে, গণবাণী প্রকাশের মধ্যে দিয়েই লাঙল, এক প্রকার নিঃশব্দে নীরবে সমাহিত হয়ে গেল।

এবার, লাঙল-এর শতবর্ষ পরে, তার ১৫টি সংখ্যার সংক্ষিপ্ত নিবিড়-নিমগ্ন পাঠের মধ্য দিয়ে লাঙলের প্রাসঙ্গিকতা ও তার ‘অন্তর বাহির’-এর স্বরূপ বিশ্লেষণের চেষ্টা করব।

নিবিড় পাঠ : ১

‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ’ সম্প্রদায়ের সাপ্তাহিক মুখপত্র রূপে লাঙল পত্রিকা, ‘বিশেষ সংখ্যা’ হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বুধবার (১ পৌষ, ১৩৩২)। লাঙল-এর সামগ্রিক দায়-দায়িত্ব বর্তায় কাজী নজরুল ইসলামের উপর। তাঁকে বলা হতো পত্রিকার প্রধান পরিচালক; কিন্তু সম্পাদক হিসেবে মুদ্রিত হতো নজরুলের ফৌজী বন্ধু এবং গায়ক, মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের নাম।

তবে সম্পাদক হিসেবে বাহ্যত তাঁর নিজের নাম ব্যবহৃত বা উচ্চারিত না হলেও, নজরুল ইসলামই যে এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, তার একটি অকাট্য প্রমাণ মেলে, হুগলি থেকে ১৯২৫ সালের ২৫ নভেম্বর মুরলীধর বসুকে তাঁর লেখা এক পত্র থেকে। তাতে তিনি লিখেছেন :

  ১. লাঙলের ফাল আমার হাতে―লাঙল-এর

     শুধু বা কাঠেরটাই বেরোয় প্রথমবার। শুধু

      ‘কৃষাণের গান’ দিয়েছি।

   ২. ‘জ্বরে চিত। অফিসটা বোধহয় চিৎপুরে   

       উঠিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অফিসের দোরে

       একটা আস্ত লাঙল টাঙিয়ে দিতে বলেছি।

       ওই হবে সাইনবোর্ড।’

     ৩. ‘তোমাকে লিখতে হবে কিন্তু লাঙল-এ।

         প্রথমবারই দিতে হবে। সকলে মিলে কাঁধ

        দেওয়া যাক। শৈলজা, প্রেমেন, অচিন্ত্যকে

         তাড়া দিও লেখার জন্য।’

গোলাকৃতির ফ্রেমে, কাঠের ব্লকে ছিল, লাঙল কাঁধে এক কৃষকের প্রতিকৃতি। লাঙলে যেসব লেখা থাকবে, তার একটা সম্ভাব্য বিষয়-নির্দেশ মুদ্রিত ছিল প্রথম পৃষ্ঠাতেই। তাতে বলা হয় : ‘লাঙলে কি কি থাকিবে’― 

১. বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের কবিতা;

২. ম্যাক্সিম গোর্কির জগদ্বিখ্যাত রোমাঞ্চকর উপন্যাস মা-র ধারাবাহিক অনুবাদ;

৩. কার্ল মার্ক্সের জীবনী;

৪. প্রজাস্বত্ব আইনের ধারাবাহিক আলোচনা;

৫. গণ-আন্দোলন সম্বন্ধীয় পুস্তকের আলোচনা ও সংকলন;

৬. ‘প্রতি সংখ্যায় একখানি করিয়া ছবি।’

এই নির্দেশিকা দেখে অনুধাবন করা যায় যে, লাঙলের মধ্য দিয়ে বঙ্গীয় সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে মার্কসীয় দর্শনের অনুশীলন সূচিত হতে যাচ্ছে। প্রথম পৃষ্ঠায় জানানো হয় : “এই সংখ্যায় লাঙলের সর্বপ্রধান সম্পদ কবি নজরুল ইসলামের কবিতা ‘সাম্যবাদী’।” ছিল দুটি বিজ্ঞাপন :

১. দি কোহিনুর ডেকোরেটিং এণ্ড পেন্টিং ওয়ার্কস। এখানে ‘সস্তায় সুন্দর নূতন আর্ট ধরনের থিয়েটারের স্টেজ, ড্রেস, চুল ইত্যাদি ভাড়া পাওয়া যায় এবং তৈয়ারী করা ও বিক্রয় করা হয়।’ ঠিকানা : লাঙল পত্রিকা এবং ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ের অফিস, ৩৭নং হ্যারিসন রোড, দুইতলার উপরেই।’

২. বিশ্বভারতীর গ্রন্থাগারিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘ভারতে জাতীয় আন্দোলন’। পাওয়া যাবে কলেজ স্ট্রীট মার্কেটের বরদা এজেন্সীতে।

দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে তিনটি বিজ্ঞাপন :

১. সস্তায় লোহার বীম ও বরগা বিষয়ে;

২. কে.সি.বিশ্বাস এণ্ড কোং-এর প্রসিদ্ধ বন্দুক, রিভলবার, রাইফেল, টোটা বারুদ ক্যাপ এবং ছররা ইত্যাদি বিক্রির বিজ্ঞাপন; এবং

৩. লাঙল-এর পুস্তক বিভাগ থেকে মুদ্রিত (৩৭ নং হ্যারিসন রোড) হেমন্তবাবুর (হেমন্ত কুমার সরকার) বইয়ের বিজ্ঞাপন; কয়েকটি বিশিষ্ট গ্রন্থ :

ক. বন্দীর ডায়েরী :

‘অসহযোগ আন্দোলনের ফলে নেতাগণের কারাগারে গমন, তাঁহাদের জীবনযাত্রা ও ভলেন্টিয়ার আন্দোলনের ইতিহাস যদি উপন্যাসের মত চিত্তাকর্ষক ভাষায় জানিতে চান, তবে ১ টাকা দিয়া বইখানি কিনুন।’

খ. স্বাধীনতার সপ্তসূর্য :

    (সান-ইয়াত-সেন, জগলুল, ডি. ভেলেরা, লেনিন প্রভৃতির জীবনী)।

গ. বিপ্লবের পদধ্বনি :

(কার্ল মার্কস, রুসো, ম্যাটসিনি, বাকুনিন, টলস্টয়ের জীবনকথা ও উপদেশ)। সঙ্গে আছে একটি নতুন বইয়ের বিজ্ঞাপন :

 ‘নতুন বই ণড়ঁহম ইবহমধষ’

বিজ্ঞাপনে বলা হয় : ‘বারীন ঘোষ, উপেন বাঁড়ুয্যে, শৈলেন ঘোষ, মানবেন্দ্র রায়, সুভাষ বোস, নজরুল ইসলামের সচিত্র সংক্ষিপ্ত জীবনী ও কার্য প্রচেষ্টার বিবরণ। মূল্য ১ টাকা মাত্র, শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে। এখনই নাম রেজিস্ট্রী করিয়া রাখুন।’

এইসব বিজ্ঞাপন থেকে ঐ সময়ের (১৯২৫) বঙ্গদেশের রাজনৈতিক প্রতিবেশ সম্বন্ধে একটা ধারণা মেলে। অসহযোগ আন্দোলন, জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম, স্বাধীনতার লড়াই, বিপ্লবের অভিমুখ, মার্ক্সবাদের অঙ্কুরোদ্গম ইত্যাদি মিলিয়ে সমকালীন বঙ্গদেশের প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে।

  তৃতীয় পৃষ্ঠায়, লাঙল শীর্ষক সম্পাদকীয়র উপরে ব্যবহৃত হয়েছে গোলাকৃতি এক ফ্রেমের মধ্যে, জোড়া বলদ নিয়ে, টেকো মাথায় একজন চাষির জমি চাষের কাঠের ব্লক। তারই নিচে রয়েছে চণ্ডীদাসের মানবতাবাদের অবিস্মরণীয় মহার্ঘ বাণী :

        ‘শুনহ মানুষ ভাই,

         সবার উপরে মানুষ সত্য

         তাহার উপরে নাই।’

মানবতাবাদের স্বরূপ-সন্ধানে, মানুষে মানুষে এই সম্প্রীতির বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে লাঙল পত্রিকা। তিনের পৃষ্ঠায়, নজরুল ইসলামের অস্বাক্ষরিত সম্পাদকীয় লাঙল-এর মধ্য দিয়ে, লাঙল পত্রিকার উদ্দেশ্য ও বিধেয় প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। লাঙলের উদ্দেশ্য রূপকাশ্রিত; (লেখাটিতে নজর কাড়ে হিন্দু-মিথলোজির প্রাচুর্য) : “যেখানে দিন দুপুরে ফেরিওয়ালী মাথায় করে মাটি বিক্রী করে, সেই আজব শহর কলিকাতায় লাঙল চালাইবার দুঃসাহস যারা করে, তাদের সকলেই নিশ্চিত পাগল মনে করছেন। কিন্তু এই পাষাণ শহরেই আমরা লাঙল নিয়ে বেরুলাম। এই পাষাণের বুক চিরে আমরা সোনা ফলাতে চাই। ব্রহ্মপুত্র স্রোত হিমালয়ে আটকে গেলে, হরধর লাঙলের আঘাতে পাহাড় চিরে সেই স্রোতকে ধরায় নামিয়ে ছিলেন। সেই জল কত প্রান্তর শ্যামল ক’রে কত তৃষিত কণ্ঠের পিপাসা মিটিয়ে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ‘লাঙলবন্ধ’ আজ বাংলার তীর্থ। মহাত্মাগণের আন্দোলন আজ নেতাদের পাষাণ-পারি-পার্শ্বিকে আটকে গেছে―তাই আজ আবার হলধরের ডাক পড়েছে।”

  দেশের নিঃস্ব-দরিদ্র-মানুষের অবস্থা শোচনীয়: ‘নায়েব গোমস্তার অত্যাচারে প্রজার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মহাজনের হাতে জমির স্বত্ত্ব চ’লে যাচ্ছে। গৃহহীন ভূমিহীন লক্ষ লক্ষ লোক সমাজের অভিশাপ নিয়ে শহরের দিকে ছুটছে, কলকারখানায় কতক ঢুকে নিজেদের সর্বনাশ করছে―আর কতক নানা হীন উপায়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছে। দেশে চুরি ডাকাতি ও বলাৎকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।’ যখন ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’ গঠিত হয়; যখন লাঙল আত্মপ্রকাশ করে, তখন বাংলার অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর। ‘শহরে বেকার বাঙালির’ ভিড়। ‘নিরুপায় তাদের অবস্থা।’ জমিদারেরা ‘শহরে এসে বাস করে মদ-মাংস-মেয়েমানুষ-মোটর-মামলা এই পঞ্চ-মকারের সাধনায় নিযুক্ত আছেন।’ জিনিসপত্রের দাম বাড়-বাড়ন্ত। ‘জমিতে চাষির স্বত্ব নাই। যত্নের অভাবে ভূমির উৎপাদিকা শক্তি নষ্ট হয়েছে।’ স্বরাজের মাধ্যমেই আসতে পারে নিরন্ন মানুষের মুক্তি। এই বিষয়টি তাই জনগণকে নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। প্রসঙ্গটি এখানে বোঝানো হয়েছে মিথের উপমায় :

‘মথুরার লীলা ঢের দেখেছি―আমাদের দেবতা যিনি তাঁকে বৃন্দাবনের শ্যামল মাঠে ফিরিয়ে আনতে চলেছি, তিনি রাখাল-গণের সখা, তিনি গোধন চরাতে ভালবাসেন। তিনি বেণু বাজিয়ে সকলকে পাগল করেন। যদি সেই দেবতার আহ্বানে কেউ বাধা দেন, তবে আমাদের হলধর ঠাকুর তাকে রাখবেন না―লাঙলের আঘাতে তাকে মরতেই হবে।’ প্রাসঙ্গিকভাবে আরও বলা হয়েছে : ‘লাঙল চালিয়ে যিনি সীতাকে লাভ করেছিলেন, সেই জনক আমাদের গুরু। যিনি চৎড়ফঁপবৎ (জনক), তিনিই ঋষি। তিনিই সমাজের শ্রেষ্ঠ।’ এভাবেই লাঙলের ফালের উৎকর্ষ বিশ্লেষিত হয়েছে। সম্পাদকীয়র একেবারে শেষাংশে―বর্ণাশ্রম শাসিত সমাজের আগ্রাসনে, সর্বশেষ ধাপের দরিদ্র-নিঃস্ব-নিরন্ন-বঞ্চিত-নিপীড়িত সর্বহারাদের হাতেই যে ভবিষ্যতে লাঙল চালাবার ভার অর্পিত হবে, সেই স্বপ্নের কথাই পরিব্যক্ত হয়েছে : ‘ব্রাহ্মণ-পাদ্রীর রাজত্ব গিয়েছে। গুরু-পুরোহিত, খলিফা, পোপ, নির্বংশ প্রায়। ক্ষাত্র সম্রাট-সাম্রাজ্য সব ধসে পড়েছে। রাজা আছেন নামমাত্র। আমেরিকা ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশে এখন বৈশ্যের রাজত্ব। এবার শূদ্রের পালা। এবার সমাজের প্রয়োজনে শূদ্র নয়―শূদ্রের প্রয়োজনে সমাজ চলবে। হিন্দু-মুসলমান সমস্যা, ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সমস্যা সব লাঙলের ফালের মুখে লোপ পাবে। তাই আমরা লাঙলের জয়গান আরম্ভ করলাম। লাঙল নবযুগের নব দেবতা।’

এর মধ্য দিয়ে কৃষকশ্রেণির হাতে ক্ষমতা ন্যস্তের কথা বলা হয়েছে; শ্রমিকের কথা এখানে নেই। কৃষক ও শ্রমিকের যৌথ সংগ্রামের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি শোষণহীন বঞ্চনাহীন সমাজব্যবস্থা।

চতুর্থ পৃষ্ঠার প্রায় অর্ধাংশ জুড়ে রয়েছে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কিছু চিন্তাভাবনা। এখানেও বাংলার নিরন্ন চাষিদের মুক্তির কথা বলা হয়েছে : ‘মুসলমান হউক, শূদ্র হউক, চণ্ডাল হউক, উহারা প্রত্যেকেই সাক্ষাৎ নারায়ণ।’

পঞ্চম পৃষ্ঠা থেকে দশম পৃষ্ঠা পর্যন্ত মুদ্রিত হয়েছে বিজ্ঞাপন অনুযায়ী, নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ নামের, এগারোটি উপ-শিরোনামে বিভক্ত একটি দীর্ঘ কবিতা।

এর মধ্যে আছে : ‘১. সাম্যবাদী; ২. ঈশ্বর; ৩. মানুষ; ৪. পাপ; ৫. চোর ডাকাত; ৬. বারাঙ্গনা; ৭. মিথ্যাবাদী; ৮. নারী; ৯. রাজা-প্রজা; ১০. সাম্য; ১১. কুলি-মজুর।’ ‘ভারতীয় জাতীয় মহাসমিতির শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’ শীর্ষক দলের গঠনতন্ত্রও লিখেছিলেন স্বয়ং নজরুল ইসলাম; তা তাঁর স্বাক্ষরেই প্রচারিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বলা হয় : ‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ-স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজলাভই এই দলের উদ্দেশ্য।’ কোন পথে আসবে সেই স্বরাজ? উপায় সম্বন্ধে বলা হয়েছে: ‘নিরস্ত্র গণ-আন্দোলনের সমবেত শক্তি প্রয়োগ উপরি-উক্ত উদ্দেশ্য সাধনের মুখ্য উপায় হইবে।’ কোন কর্মনীতি ও সংকল্পের অবতারণা করবে এই দল―সেই সম্পর্কে গঠনতন্ত্রে কতগুলো কর্মপদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। যথা :

১. ‘এই দল শ্রমিক ও কৃষকগণের স্বার্থের জন্য যুঝিবেক।’

২. ‘জাতীয় কার্যে নিযুক্ত অন্যান্য দলের সহিত এই দল যতটা সম্ভব সহযোগিতা করিবেন।’

৩. ‘শ্রমিক ও কৃষকগণের’ স্বার্থরক্ষার জন্য ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ‘যুঝিবেন’, তাঁরাও ‘এই দলের প্রতিনিধি বলিয়া গণ্য হইবেন।’

দাবিগুলির মধ্য থেকে কয়েকটি বিশেষ দাবির উল্লেখ করা যেতে পারে :

১. ‘যতদিন না শ্রমিক ও কৃষকগণের অধিকার-সমূহ স্বীকার করিয়া শাসন-প্রণালী পরিবর্তিত না হয়, ততদিন টাকা মঞ্জুরি বাজেট না দেওয়া।’

২. ‘আমলা-তন্ত্র শাসন-প্রণালীর শক্তি ও প্রভাব করে এমন সমস্ত প্রস্তাবের বিরোধী হওয়া।’

৩. ‘জাতীয় জীবনের শক্তির বৃদ্ধির অনুকূল এবং সে কারণে আমলা-তন্ত্রের শক্তিবৃদ্ধির প্রতিকূল এমন সমস্ত প্রস্তাব আইনের প্রবর্ত্তক করা ও সমর্থন করা।’

 ৪. ‘ব্যবস্থা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের

সম্মিলিত সম্মতি বিনা গবর্মেন্টের অধীনে কোনও প্রতিনিধি কোনও চাকরি গ্রহণ করিতে পারিবেন না।’

তবে এই সঙ্গে দুটি চরম দাবিও জুড়ে দেওয়া হয় :

  ক. ‘আধুনিক কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্র্যামওয়ে, স্টীমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকারী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং এতৎ সংক্রান্ত কর্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তি রূপে পরিচালিত হইবে।’

খ. ‘ভূমির চরম স্বত্ত্ব আত্ম-অভাব-পূরণ-ক্ষম স্বায়ত্ত-শাসন -বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের উপর বর্তিবে―

এই পল্লী-তন্ত্র ভদ্র শূদ্র সকল শ্রেণির শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।’

সামগ্রিকভাবে কৃষক শ্রমিক এবং সকল শ্রেণির প্রজাদের জন্য সাধারণ দাবি দাওয়ার কথা বলা হলেও, শ্রমিক ও কৃষকগণের জন্য তাৎক্ষণিক দাবিসমূহ এই গঠনতন্ত্রে সূত্রাকারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে নবগঠিত দলের কর্মসূচি এবং নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক চিন্তাধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দাবিসমূহ নিম্নরূপ :

শ্রমিক

১. ‘জীবন-যাত্রার পক্ষে যথোপযুক্ত মজুরির একটা নিম্নতম হার আইনের দ্বারা বাঁধিয়া দেওয়া।’

২.  ‘প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শ্রমিকের পক্ষে সপ্তাহে সাড়ে পাঁচদিন খাটুনি চরম বলিয়া আইন করা;

নারী এবং অল্পবয়স্ক ছেলে-পিলের জন্য বিশেষ শর্ত নির্ধারণ করা।’

৩. ‘শ্রমিকগণের আবাস, কাজের শর্ত, চিকিৎসার বন্দোবস্ত প্রভৃতি বিষয়ে কতকগুলি দাবি মালিকগণকে আইন দ্বারা বাধ্য করিয়া পূরণ করানো।’

৪. ‘অসুখ, বিসুখ, দুর্ঘটনা, বেকার অবস্থা এবং বৃদ্ধ অবস্থায় শ্রমিকগণকে রক্ষা করিবার জন্য আইন প্রণয়ন।’

৫. ‘সমস্ত বড় কলকারখানায় লাভের ভাগে শ্রমিকগণকে অধিকারী করা।’

৬. ‘মালিকগণের খরচায় শ্রমজীবীগণের বাধ্যতামূলক শিক্ষা।’

৭. ‘কলকারখানার নিকট হইতে বেশ্যালয়, নেশার দোকান উঠাইয়া দেওয়া।’

৮. ‘শ্রমিকগণের আর্থিক উন্নতির জন্য কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা।’

৯. ‘শ্রমিক-সংঘ-গুলিকে আইনত মানিয়া লওয়া এবং শ্রমিকদের দাবি পূরণের জন্য ধর্মঘট করিবার অধিকার স্বীকার করা।’

ন্যূনতম মজুরি, শ্রমিক আবাস, কাজের শর্ত, চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা, অসুখ বিসুখ, দুর্ঘটনা, বেকার এবং বৃদ্ধাবস্থায় শ্রমিকদের জন্য আইনি সুরক্ষার বন্দোবস্ত, শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা, কো-অপারেটিভ ব্যবস্থার প্রচলন, কলকারখানায় লভ্যাংশের ভাগ শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টন করা, ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক-ধর্মঘটের দাবি অন্যতম ।

এবার উল্লেখ করছি, কৃষকের জন্য দাবিসমূহের তালিকা :

১ . ‘ভূমিকর সম্বন্ধে একটা ঊর্ধ্বতম হার বাঁধিয়া দেওয়া এবং বাকি খাজনার সুদ ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্কের হারের সহিত সমান নির্ধারণ করা’ ;

২ . ক)  ‘জমিতে কায়েমী স্বত্ত্ব’ ; খ) ‘উচ্ছেদ নিরোধ’ ; গ) ‘অন্যায় এবং বেআইনী বাজে আদায় বন্ধ’ ; ঘ) ‘স্বেচ্ছায় বিনা সেলামিতে হস্তান্তর করার অধিকার’; ঙ) ‘গাছ কাটা, কুয়ো খোঁড়া, পুকুর কাটা, পাকা বাড়ী করার বিনা সেলামিতে অধিকার।’

৩. ‘জল-করে মাছ ধরিবার নির্ধারিত শর্ত।’

৪. ‘মহাজনের সুদের চরম হার নির্ধারণ।’

৫. ‘কো-অপারেটিভ কৃষি-ব্যাংক স্থাপনের দ্বারা কৃষককে ঋণদান এবং মহাজন ও লোভী ব্যবসাদারগণের হাত হইতে কৃষককে উদ্ধার।’

৬. ‘চাষের জন্য যন্ত্রপাতি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের মারফৎ কৃষকের নিকট বিক্রয় অথবা ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া। মূল্য অথবা ভাড়ার টাকা কিস্তীবন্দী হিসাবে অল্প করিয়া লওয়ার বন্দোবস্ত।’

৭. ‘পাটের চাষের কৃষকের উপযুক্ত লাভের বন্দোবস্ত।’

কৃষকদের জমির ঊর্ধ্ব কর-সীমা নির্ধারণ, জমিতে কায়েমি স্বত্ব, উচ্ছেদ নিরোধ, সেলামি বন্ধ, জলকর নির্ধারণ, ব্যাঙ্কের সুদের সমহারে মহাজনী ও অন্যান্য সুদের হার নির্ধারণ, কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক স্থাপন এবং ঋণ দানের ব্যবস্থা এবং সহজ কিস্তিতে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দাবি ইত্যাদি রয়েছে এই দাবিসত্রে।

দাবিসমূহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বঙ্গীয় রাজনীতিতে সাম্যবাদী দর্শনের প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছায়ার ইঙ্গিত শুরু হয়েছে। শ্রমিক ও কৃষকদের স্বার্থে এই নতুন দল তাদের কর্মসূচি কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর।

এই নতুন দলে যোগ দেওয়ার জন্য, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে :

 ‘নজরুল ইসলাম, ৩৭ নং হ্যারিসন রোড, কলিকাতা।’ ত্রয়োদশ পৃষ্ঠায় এসে শেষ হয়েছে গঠনতন্ত্র। গঠনতন্ত্রের (পৃ.১১) উপরে একটি কার্টুন রয়েছে, যেখানে একজন মোটাতাজা শক্তিশালী ধনীব্যক্তি একজন রোগা-পটকা শ্রমিককে হাতের মুঠোয় ধরে টিপে মারছে।

এর সঙ্গে রয়েছে চার পঙ্ক্তির একটি কবিতা :

  ‘পেট-পোরা তার রাক্ষসী ক্ষুধা

    ধনিক সে নির্ম্মম,

    দীনের রক্ত নিঙাড়িয়া করে

    উদর ভূধর-সম।’

এই পৃষ্ঠার বাকি অর্ধাংশে রয়েছে ‘খবরদারী’ শিরোনাম পর্যায়ে, সমকালীন বঙ্গের টুকরো সংবাদ।

চতুর্দশ পৃষ্ঠায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছে, আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত, নৃপেন্দ্রচন্দ্র দত্ত লিখিত প্রবন্ধ : মনিব ও কর্ম্মচারী/বিদেশী কোম্পানীর নির্মম ব্যবস্থা।’

পঞ্চদশ ও ষোড়শ পৃষ্ঠা বিজ্ঞাপনে ঠাসা। ১৫ নং পৃষ্ঠায় আছে বহুবাজারের ‘মেসার্স ঘোষ দত্ত এণ্ড সন্স’-এর শীতবস্ত্রের বিজ্ঞাপন। ‘দেশবন্ধু হোমিওপ্যাথিক ফার্মেসী’; কলেজ স্কোয়ারের ‘মোহনতোষ ব্রাদার্স’-এর ‘ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন’ বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন। এছাড়া আছে, ডাকযোগে হোমিওপ্যাথী ডিগ্রির জন্য ‘কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স এণ্ড সার্জ্জন্স অব কলিকাতা’র বিজ্ঞাপন। আপার সার্কুলার রোডের চাল বিক্রেতা, মহেন্দ্র ঘোষ-এর বিজ্ঞাপনে রয়েছে : ‘সস্তা দরে ধান্য ও চাউল’ কেনার হদিস। বিজ্ঞাপনের বক্তব্য থেকে জানা যায় : ১৯২৫ সালে ‘অগ্রিমদাদনে প্রতিমণ ধানের দাম ৩ টাকা এবং চাউল ৬ টাকা।’ আরেকটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়: লাঙল অফিসে রাত ৯টা পর্যন্ত বসেন এম.এল.ঘোষ―যিনি বিজ্ঞাপন দিয়ে জানাচ্ছেন : ‘Wanted some live partners for a broker’s, 1850 sure income on a sum of Rs.500/.’

১৬ নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে লাঙল ও বইয়ের বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় : ‘লাঙল পত্রিকার বার্ষিক মূল্য ৩ টাকা; ভিপি যোগে ৩ টাকা চার আনা। প্রতি সংখ্যা: এক আনা। ঠিকানা : লাঙলের কর্মক্ষেত্র, ৩৭ নং হ্যারিসন রোড।’ রয়েছে লাঙল পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন ‘লাঙল বুক এজেন্সী’র বিজ্ঞাপন। ঠিকানা: ৩৭ নং হ্যারিসন রোড। এখানে বলা হয়েছে : ‘‘নতুন যুগের নবীন মন্ত্রের নবীন তন্ত্রের নব পুস্তকালয়। আমরা আমাদের লাঙল কেন্দ্র হইতে ‘লাঙল বুক এজেন্সী’ নাম দিয়া একটি পুস্তকালয়ও চালাইব। বর্ত্তমান যুগে যাঁহারা দেশে নব অভ্যুত্থানের বাণী বহন করিয়া আনিয়াছেন; দেশ, জাতি, রাষ্ট্র ও সমাজকে নূতন ছাঁচে গড়িয়া তুলিতেছেন―সেই সব নবীন শক্তিধরের জাগরণ-মন্ত্রে ঘরে ঘরে প্রাণের সাড়া জাগাইয়া তোলাই এই পুস্তকালয়ের শ্রেষ্ঠতম উদ্দেশ্য। নজরুল ইসলামের সকল পুস্তক এখান হইতে পাওয়া যাইবে। যাঁহারা নজরুল ইসলামের পুস্তকের জন্য অন্য লাইব্রেরীতে অর্ডার দিয়া পান না, অর্ডার দিয়া এখান হইতে তাহা পাইতে পারেন। তাঁহার বাজেয়াপ্ত পুস্তক তিনখানা ছাড়া আর সব পুস্তকই ছাপা আছে। এই পুস্তকালয়ের যাহা লাভ হইবে, তাহার কতকাংশ দুঃস্থ সাহিত্যিকগণের সাহায্যের জন্য ব্যয়িত হইবে।’’

এইসব ছাড়াও, এই বুক এজেন্সী থেকে ‘নবযুগের লেখকগণের সকল পুস্তক’ এবং ‘স্কুলপাঠ্য পুস্তকসমূহ’ও সরবরাহ করা হতো। নীচের দীর্ঘ বিজ্ঞাপনটিতে নজরুল ইসলামের পুস্তকসমূহের বিজ্ঞাপনই প্রাধান্য পেয়েছিল :

‘কাজী নজরুল ইসলামের নূতন কবিতার বই ক্রন্দন নীরতা ভারতমাতার ত্রিবর্ণ-রঞ্জিত অতুলনীয় প্রচ্ছদপট, দেশবন্ধুর সর্বাঙ্গসুন্দর ফটো ও কবির নিজের ফটোসহ।’

‘চিত্তনামা’ ১ টাকা

“পাঠক ইহারই মধ্যে অমর কবিতা ‘ইন্দ্রপতন’ ও ‘সান্ত্বনা’ পাইবেন। অন্যপরিচয় অনাবশ্যক।”

          ‘পুবের হাওয়া’ ১ টাকা চারআনা

          (কবির সুন্দর ছবিসহ বাঁধাই)’

            ‘অগ্নিবীণা’: ১ টাকা চারআনা

(তৃতীয় সংস্করণ, সংস্কৃত, পরিবর্দ্ধিত এবং কবির বর্ত্তমান ফটোসহ)’

        ‘রিক্তের বেদন’ (গদ্য কাব্য)

                ১ টাকা চারআনা’

         ‘ব্যথার দান’ (দ্বিতীয় সংস্করণ) ঐ

                 ১ টাকা চারআনা

            ‘(সৈনিকবেশী ফটোসহ)’

           ‘দোলনচাঁপা’ ১ টাকা চারআনা

       (যাহার পূজারিণী কবিতারাজ্যে চিরপূজ্য)

‘ইহা পাঠে পাঠক কবির নির্ভীকতার যথার্থ পরিচয় পাইবেন।’

বিজ্ঞাপন থেকে আরো জানা যায় যে, অচিরেই প্রকাশিত হচ্ছে কবির গ্রন্থত্রয় :

                ‘ঝিঙে ফুল’

                ‘বাঁধন-হারা’

                ‘ফণী মনসা’

সর্বশেষে লেখা প্রিন্টার্স লাইন :

  ‘১৫ নং নয়ানচাঁদ দত্ত স্ট্রীট―মেটকাফ প্রেসে মুদ্রিত এবং ৩৭ নং হ্যারিসন রোড হইতে প্রকাশিত। মুদ্রাকর ও প্রকাশক : শ্রী মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়।’

আর একটি ছোট্ট বিজ্ঞাপন মুদ্রিত হয়েছে, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীটের, গুপ্ত ব্রাদার্সের পক্ষ থেকে, নজরুল-বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের

 নীল পাখী নামের শিশুতোষ গ্রন্থ । মূল্য আট আনা।

   নজরুল ইসলামের, ৪৮৬ পঙ্ক্তি বিশিষ্ট দীর্ঘ ‘সাম্যবাদী’ কবিতা (বিভিন্ন পর্বে বিভক্ত) নিয়েই মূলত লাঙল-এর এই প্রথম বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। এই প্রথম সংখ্যার গুরুত্ব নিঃসন্দেহে অপরিসীম। সংখ্যাটির জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে উঠেছিল যে, পাঁচ হাজার কপি নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। অনেকেই কিনতে ব্যর্থ হওয়ায় সংখ্যাটির পুনর্মুদ্রণের দাবি ওঠে।

পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যার ‘খড়কুটো’ শিরোনামের টুকরো খবর থেকে এ প্রসঙ্গে জানা যায় : “গতবার আমরা ৫ হাজার লাঙল ছেপেছিলাম―কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত কাগজ ফুরিয়ে যাওয়াতে কলিকাতায় অনেকে কাগজ পাননি এবং মফস্বলে একেবারেই কাগজ পাঠানো হয়নি। ঐ সংখ্যার প্রধান সম্পদ কবি নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ গ্রাহকগণের আগ্রহাতিশয্যে পুস্তিকাকারে বের করা হ’ল, দাম করা হয়েছে মাত্র দু’আনা।”

পত্রিকায় কবিতাটি প্রকাশিত হয় ১৬ ডিসেম্বর (১৯২৫), আর এর মাত্র ৯ দিন পরেই অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর (১৯২৫) পুস্তিকাকারে সেটি মুদ্রণ করতে হয়। প্রকাশক : মৌলভী শামসুদ্দীন হুসেন, বেঙ্গল পাবলিশিং হোম। ৫ নং নূর মহম্মদ লেন, কলিকাতা। ১৫ নং নয়ানচাঁদ স্ট্রীট, কলিকাতা; মেটকাফ প্রেসে শ্রী মণিভূষণ মুখার্জী কর্তৃক মুদ্রিত। পৃষ্ঠা: ৩২, মূল্য: দুই আনা। ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি কবির সর্বহারা কাব্যগ্রন্থভুক্ত হয়। এই পুস্তকের সপ্তম কবিতা ‘সাম্যবাদী’। প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে (আশ্বিন-১৩৩৩)। প্রকাশক : ব্রজবিহারী বর্মণ রায়, বর্মণ পাবলিশিং হাউস, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, কলিকাতা।

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকালে নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যে এবং রাজনৈতিক জীবনে যে মতাদর্শের প্রবক্তা রূপে খ্যাত হন, তার নাম : গণতান্ত্রিক সমাজবাদ বা ডেমোক্রেটিক সোশালিজম। তাঁর এই মতাদর্শ কর্ষণের চারণভূমি হয়ে ওঠে লাঙল পত্রিকা ।

নজরুল রচিত দলের ইশতেহারেই এই মতাদর্শের বিভিন্ন ‘উদ্দেশ্য’, ‘সংকল্প’ ও ‘দাবি’র কথা বলা হয়েছে।

নিবিড় পাঠ : ২

লাঙল পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর, বুধবার (৮ পৌষ, ১৩৩২)। এই সংখ্যায় :

‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ের’-এর স্থলে ‘শ্রমিক-প্রজা- স্বরাজ-দল’-এর সাপ্তাহিক মুখপত্র মুদ্রিত হয়েছে।

প্রথম পৃষ্ঠাতেই ঘোষিত হয়েছে নজরুলের ‘কৃষাণের গান’-এর কথা। রয়েছে তিনটি বিজ্ঞাপন, ১. মানিকতলার ‘প্রবর্তক পাবলিশিং হাউসের’ প্রবর্তকের ‘বিবেকানন্দ সংখ্যা’ প্রকাশিত হবে পৌষ মাসের শেষে। ২. রয়েছে ৩৭ নং হ্যারিসন রোডের থিয়েটারের দ্রব্যাদির সরবরাহকারী ‘দি কোহিনুর ডেকোরেটিং এণ্ড পেন্টিং ওয়ার্কস’এর বিজ্ঞাপন ; এবং ৩. একটি ‘To Let’-এর ঠিকানাবিহীন বিজ্ঞাপন।

দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় রয়েছে, প্রথম সংখ্যার মতোই―ক) লোহার বীম ও বরগার এবং বন্দুক বিক্রির বিজ্ঞাপনদ্বয়। খ) রয়েছে প্রায় অর্ধপৃষ্ঠা জুড়ে, লাঙলের পুস্তক বিভাগ থেকে হেমন্তকুমার সরকারের বই; এবং ৮৬এ, লোয়ার সার্কুলার রোডের বাসিন্দা সুলেখিকা মিসেস আর. এস. হোসেন (রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন)-এর বইয়ের বিজ্ঞাপন। লেখিকার বাসস্থানের ঠিকানাকেই প্রাপ্তিস্থান বলা হয়েছে, তাঁর বই :

১. পদ্মরাগ (উপন্যাস) ১ টাকা ৮ আনা; ২. ক. মতিচুর ১ম খণ্ড-১ টাকা; এবং খ. মতিচুর ২য় খণ্ড-২ টাকা।

তৃতীয় পৃষ্ঠায়, প্রথম সংখ্যার মতোই মুদ্রিত হয়েছে: হালচাষরত চাষির লোগো এবং চণ্ডীদাসের মানবতার বাণী : ‘শুনহ মানুষ ভাই…।’ রয়েছে শ্রী গিরিজাকান্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ: ‘মাটীর মোহ’; শেষ প্যারায় তিনি লিখেছেন : ‘লাঙল ভারতের প্রাচীন কৃষক মজুরের বাহন ও বাহক তো বটেই, তাছাড়া আজ ভারতবর্ষের নিরন্ন দরিদ্রের মুখের গ্রাস সে-ই জুগিয়ে দিবে―এবং সেই সঙ্গে তার চিন্তার অন্ন, প্রাণের খোরাকও উৎপন্ন করিবে।’ এই পৃষ্ঠাতেই মুদ্রিত হয়েছে নজরুলের ‘কৃষাণের গান’ কবিতাটি। আদতে এটি মূলতই দীর্ঘ একটি গান। কবি নজরুলের প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতার কারণে, হেমন্তকুমার সরকার, কবিকে ও তাঁর পরিবার পরিজনকে হুগলি থেকে তাঁর কৃষ্ণনগরের বাসভবনে নিয়ে আসেন এবং কবির চিকিৎসাসহ তাঁদের সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন। ঐ সময়ে, ফেব্রুয়ারি মাসের ৬ এবং ৭ তারিখে, কৃষ্ণনগরের টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনের’ অধিবেশন। অনুষ্ঠানের  গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বর্তায় নজরুলের উপর। কলকাতা থেকে সম্মেলনে যোগ দেন মুজফ্ফর আহমদ, কুতুবউদ্দীন আহমদ, শামসুদ্দীন হুসয়ন , আব্দুল হালিম এবং সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। নজরুল ইসলাম ছিলেন অভ্যর্থনা সমিতির সর্বাধিনায়ক। অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশনের দায়িত্বও ছিল তাঁর।  হুগলিতে থাকার সময়ে তিনি ‘কৃষাণের গান’ শীর্ষক দীর্ঘ গানটি রচনা করেন (অগ্রহায়ণ ১৩৩২)। এবং এটি প্রকাশিত হয় লাঙলের দ্বিতীয় সংখ্যায় অর্থাৎ ১৯২৬ সালের ১ জানুয়ারি। (এই বিখ্যাত গানটিকে মুজফ্ফর আহমদ এবং অরুণকুমার বসু, তাঁদের গ্রন্থে, ভ্রমবশত ‘কৃষকের গান’ বলে উল্লেখ করেছেন।) সেই গানটিই, অধিবেশনের উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসেবে কবি পরিবেশন করেন। এই অনুষ্ঠানেই, এই ‘সম্মেলনী’ থেকে কংগ্রেসের সংশ্রব ছিন্ন করে, লেবার স্বরাজ পার্টি, আলাদা রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে―নাম দেওয়া হয় : ‘Bengal Peasants and Workers Party’ (বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল)। দলের সভাপতি হন : অতুলচন্দ্র গুপ্ত; সহসভাপতি নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত; সম্পাদক কুতুবউদ্দীন আহমদ। মজদুর শাখার দায়িত্বে থাকেন হেমন্তকুমার সরকার; কৃষক শাখার দায়িত্বে ছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। নজরুল ইসলামকে রাখা হয় একজন সদস্য হিসেবে।

২৬ পঙ্ক্তি বিশিষ্ট ঐ বিখ্যাত গানটির শেষ স্তবক ছিল এই রকম :

‘জাগ্ রে কৃষাণ সব ত গেছে কিসের বা’ আর ভয়    

ক্ষুধার জোরেই করব এবার সুধার জগৎ জয়

বল্ সবে ভাই, বল্ কৃষাণের বল্ লাঙলের জয়,

দেখবে এবার সভ্যজগৎ চাষার কত বল।।’

লাঙল-এর এই সংখ্যায়, মার্কসবাদী রাজনৈতিক লেখার সূচনা হয়, দুটি রচনা দিয়ে :

একটি প্রবন্ধ, অন্যটি অনুবাদ। ‘কার্ল মার্কস’ শীর্ষক প্রবন্ধটি লেখেন দেবব্রত বসু। প্রবন্ধটি জায়গা নিয়েছে পঞ্চম থেকে নবম পৃষ্ঠা পর্যন্ত। অষ্টম-নবম পৃষ্ঠায় রয়েছে: ঋষীকেশ সেন রচিত ‘বাংলার কৃষকের কথা’ থেকে সংকলিত অংশ ‘প্রজাস্বত্ব আইন’। দশম ও একাদশ পৃষ্ঠায় ‘খবরদারী’ পর্যায়ে মুদ্রিত হয়েছে দেশের নানা ধরনের খবরাখবর। একাদশ ও দ্বাদশ পৃষ্ঠায়, ‘খড়কুটো’ পর্যায় থেকে জানা যায় বেশ কয়েকটি চুম্বক সংবাদ :

১. ‘কংগ্রেস উপলক্ষে লাঙল এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ থাকবে। আগামী ৬ই জানুয়ারী কবি নজরুলের আর একটি অপূর্ব্ব কবিতা নিয়ে লাঙল আবার বেরুবে।’ (প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, লাঙলের তৃতীয় সংখ্যা বের হয় ৭ জানুয়ারি; ৬ জানুয়ারি নয়।)

২. ‘কবি নজরুল ইসলাম এখন অসুস্থ। তাঁর শরীরটা একটু সারলেই তিনি কাউন্সিলের প্রজাদলের সম্পাদক হেমন্তকুমার সরকারের সহযোগে প্রজা আন্দোলন উপলক্ষে মফস্বলে ঘুরবেন। যাঁরা তাঁদের চান, অনুগ্রহ করে এখনই পত্র দিবেন।’

৩. ‘জানুয়ারী মাস হতে কলিকাতার পার্কে পার্কে প্রজা-আন্দোলন সম্বন্ধে প্রতি রবিবারে সভা হবে। বিখ্যাত বক্তাগণ বক্তৃতা করবেন এবং কাজী নজরুল ও মণিবাবুর গান সকল সভাতেই হবে।’

৪. ‘প্রজার দুর্দশা ও প্রতিকারের উপায় দেখাবার জন্যে আমাদের আপিস হতে কতকগুলি ম্যাজিক লণ্ঠনের ছবি তৈরী করানো হচ্ছে। এইগুলি শেষ হ’লেই লাঙলের কর্মসচিব শ্যামসুদ্দীন হুসেন (বি:দ্র:/ শুদ্ধ নাম : শামসুদ্দীন হুসয়ন) সাহেব ম্যাজিক লণ্ঠন নিয়ে মফস্বলের ডাকে বেরোবেন।’

৫. ‘শ্রমিক ও প্রজা স্বরাজ দলের সাহায্যার্থ আগামী ৭ই জানুয়ারী বৃহস্পতিবার এলবার্ট হলে (বি:দ্র: বর্তমানে কফি হাউস/প্রবন্ধকার) একটি Variety Entertainment হবে। বাংলা, হিন্দী, উর্দু, ইংরাজী, ফরাসী, জার্মান, প্রভৃতি জগতের নানা ভাষায় গান গাওয়া হবে। কলিকাতার খ্যাতনামা কয়েকজন বিখ্যাত ভদ্র-মহিলা ও ভদ্র-মহোদয় অনুগ্রহপূর্বক তাঁদের সঙ্গীত কলাকৌশল প্রদর্শন করতে স্বীকৃত হয়েছেন। প্রত্যেক ইস্কুলে কলেজে ও আপিসে টিকিট বিক্রীর জন্য লোক চাই। সাহায্যকারীগণ অনুগ্রহ করে লাঙল অফিসে এসে দেখা করবেন।’

এই সংখ্যা থেকেই, স্বনামধন্য রুশ সাহিত্যিক, ম্যাক্সিম গোর্কির জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস Mother-এর বাংলা অনুবাদ মা প্রকাশের সূচনা হয়―অনুবাদক: নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। দ্বাদশ পৃষ্ঠায়, পাঠকদের জ্ঞাতার্থে, অনুবাদক মা উপন্যাসের একটি সংক্ষিপ্ত-মননশীল ভূমিকাও লিখে দিয়েছেন। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ পৃষ্ঠায় মূল কাহিনির ভাষান্তরের প্রথমাংশ মুদ্রিত হয়।

চতুর্দশ পৃষ্ঠার শেষের দিকে দুটি ছোট বিজ্ঞাপন আছে : প্রথমটি ‘পাত্র পাত্রী আবশ্যক’ এবং দ্বিতীয়টি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গ্রন্থ: ভারতে জাতীয় আন্দোলন-এর।

পঞ্চদশ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপনগুলো প্রথম সংখ্যারই পুনর্মুদ্রণ। ষোড়শ পৃষ্ঠায়ও বিজ্ঞাপন: লাঙল পত্রিকার বিজ্ঞাপনের হার, লাঙল বুক এজেন্সীর বইয়ের আনন্দ সংবাদ; লাঙল বুক এজেন্সীর বিজ্ঞাপনে যুক্ত হয়েছে নতুন বই―শৈলেশনাথ বিশী প্রণীত গ্রন্থত্রয় : ১. বোলশেভিকবাদ; ২. চিত্তকথা, ৩. নরনারী;  এবং পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের নীল পাখী শীর্ষক শিশুতোষ গ্রন্থের পূর্ববঙ্ বিজ্ঞাপন।

নিবিড় পাঠ : ৩

[লাঙলের জনপ্রিয়তা দিন দিন ব্যাপকভাবে বাড়তেই থাকে। তাই লাঙলের তৃতীয় সংখ্যায় মুদ্রিত ‘খড়কুটো’ পর্যায়ে (পৃ.১৪), সংক্ষিপ্ত সংবাদে বলা হয় : ‘প্রথম সংখ্যার ৫ হাজারের মত লাঙল দ্বিতীয় সপ্তাহে, বেরুতে না বেরুতে সমস্ত বিক্রী হয়ে যাওয়ায়, গ্রাহকগণের আগ্রহাতিশয্যে আমরা দ্বিতীয় সংখ্যার দ্বিতীয় সংস্করণ বাহির করি। কিন্তু তাতেও না কুলোনোতে মফঃস্বলের অনেক জায়গায় কাগজ পাঠান হয়নি। আশা করি বর্তমান সংখ্যা হ’তে নিয়মিতভাবে সর্বত্র কাগজ পাঠাতে পারব।’]

লাঙল-এর তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয়, দু সপ্তাহ পেরিয়ে ১৯২৬ সালের ৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার (২৩ পৌষ, ১৩৩২)।

প্রথম পৃষ্ঠাতেই জানানো হয় : ‘এই সংখ্যায় আছে কবি নজরুল ইসলামের ‘সব্যসাচী’। দুটি পুরোনো বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মুদ্রিত হয়েছে কবি নজরুলের সাম্যবাদীর বিজ্ঞাপন; তাতে বলা হয়েছে : ‘পুস্তকাকারে নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী বাহির হইয়াছে। দাম: মাত্র দুই আনা। প্রাপ্তিস্থান লাঙল কার্যালয়।’ দ্বিতীয় পৃষ্ঠায়ও পুরোনো তিনটি বিজ্ঞাপন মুদ্রিত হয়েছে।

তৃতীয় ও চতুর্থ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে নজরুলের বিখ্যাত কবিতা: ‘সব্যসাচী’।

কবিতাটিতে, নয়টি স্তবক রয়েছে। ‘সব্যসাচী’ রচিত হয় ১৩৩০ সালের কার্তিক মাসে। পরে এটি ১৯২৭ সালের জুলাই মাসে (শ্রাবণ ১৩৩৪) কবির ফণিমনসা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়।

কবিতাটির উল্লেখযোগ্য শেষাংশ :

“মশা মেরে ঐ গরজে কামান―‘বিপ্লব মারিয়াছি।

আমাদের ডানহাতে হাতকড়া, বাম হাতে মারি মাছি!’    

   মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি,

   টিকি দাড়ি নিয়ে আজো বেঁচে আছি!

বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী,

যাহোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার মরে বাঁচি!’’

পঞ্চম ও ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে নজরুলের অস্বাক্ষরিত রচনা: ‘পোলিটিক্যাল তুবড়ি বাজি’। এই প্রবন্ধটিকে, নজরুল ইসলামের ‘রাজনৈতিক বামপন্থী মতাদর্শ ও দুঃসাহসিক বিশ্লেষণের অন্যতম’ উদাহরণ বলা যায়। এটি, কানপুরে অনুষ্ঠিত, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৪১তম বার্ষিক অধিবেশন নিয়ে লিখিত কবির একটি বিদ্রƒপাত্মক রচনা। একে সম্পাদকীয় বলেই গণ্য করা যায়। এই সংখ্যাতেই, সম্মেলনের বিবরণ ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির গঠনতন্ত্র মুদ্রণ করে নজরুল ইসলাম এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করলেন; শিরোনাম : ‘ভারতীয় প্রথম কমিউনিস্ট কনফারেন্স, কানপুর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির গঠননীতি।’

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম পৃষ্ঠাব্যাপী মুদ্রিত হয়েছে, দেবব্রত বসুর ধারাবাহিক রচনা : ‘লেনিন ও সোভিয়েট রুষিয়া।’ নবম ও দশম পৃষ্ঠায় রয়েছে, নৃপেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনূদিত ধারাবাহিক উপন্যাস : মা। নবম পৃষ্ঠার উপরের দিকে রয়েছে, একটি কার্টুন, সঙ্গে ৮ পঙ্ক্তির একটি কবিতা :

    ‘তোমরা কাটো মাথায় টেরী

    মোদের রক্তে নেয়ে উঠে,

    তোমরা চড় জুড়িগাড়ী

    মোদের সকল লুটেপুটে,

    আমরা চষি তোমার জমি

    আমরা জোগাই তোমার ভাত,

    আমরা আজ খালি পেটে

    ভাবছি দিয়ে মাথায় হাত।’

একাদশ ও দ্বাদশ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে ইন্দ্রজিৎ শর্মার, শেকফের ভাবাবলম্বনে লিখিত গল্প : ‘নাগরিক’। ত্রয়োদশ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে, ঋষীকেশ সেনের ‘বাংলার কৃষকের কথা’ থেকে সংকলিত ‘প্রজাস্বত্ব আইন’/প্রজার কথা।’

‘খড়কুটো’ পর্যায়ের টুকরো খবর থেকে জানা যায় দলের নানা কথা। একটি সংবাদে বলা হয়েছে :

 ‘আগামী ১৭/১৮ই জানুয়ারী ময়মনসিংহ সহরে জিলা কৃষক ও শ্রমিক কনফারেন্স বসবে। এজন্য হিন্দু মুসলমান সকল সম্প্রদায়-ভুক্ত ব্যক্তিগণকে নিয়ে অভ্যর্থনা কমিটি গঠিত হয়েছে। সহস্র সহস্র প্রতিনিধি সভায় যোগদান করবেন বলে জানিয়েছেন।

কাজি নজরুল ইসলাম ও শ্রীযুত হেমন্তকুমার সরকার মহাশয়কে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। কাজি সাহেব সুস্থ থাকলে হেমন্তবাবুর সঙ্গে নিশ্চয়ই উপস্থিত হবেন।’

পঞ্চদশ পৃষ্ঠায় রয়েছে সাতটি বিজ্ঞাপন। নজরুল ইসলামের বইয়ের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে :

‘বাহির হইল/বাহির হইল/নজরুল ইসলামের ছায়ানট/ মূল্য মাত্র: পাঁচসিকা মাত্র।/ কবির অন্যান্য পুস্তক:  সাম্যবাদী: দুই আনা; রাজবন্দীর জবানবন্দী (যন্ত্রস্থ)।’

১৬ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে : লাঙলের বিজ্ঞাপনের হার, লাঙল বুক এজেন্সির এবং পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পের বই নীল পাখীর পুরোনো বিজ্ঞাপন। 

নিবিড় পাঠ : ৪

লাঙল-এর চতুর্থ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার (৩০ পৌষ, ১৩৩২)।

পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে তিনটি বিজ্ঞাপন ও দুটি নোটিশ। প্রথম নোটিশে জানানো হয়েছে : ‘আগামী বারে জনৈক কারারুদ্ধ আদর্শ দেশভক্তের পুণ্য-চরিত্র চিত্রণে লাঙলের বিশেষ সংখ্যা বাহির হইবে। এই নোটিশ থেকে জানা যায় : লাঙল পত্রিকার আগামি বিশেষ পঞ্চম সংখ্যা সাজানো হচ্ছে দেশভক্ত সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে।’

দ্বিতীয় নোটিশে জানানো হয়েছে, দলের আর্থিক সাহায্যার্থে এলবার্ট হলে যে বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজনের কথা ঘোষিত হয়েছিল, নজরুল ইসলামের অসুস্থতার কারণে সেই অনুষ্ঠান স্থগিত রাখার বিষয়ে―নোটিশে লেখা হয় : ‘কাজী সাহেবের অসুস্থতার জন্য এলবার্ট হলে ভ্যারাইটি এন্টারটেইনমেন্টস্ আপাতত স্থগিত রাখিতে হইল। যাঁহারা টিকিট কিনিয়াছেন, অনুগ্রহপর্বক বিক্রেতাগণের নিকট জমা দিলে টাকা ফেরৎ পাইবেন।’

 রয়েছে দুটি বিজ্ঞাপন; প্রথমটি : জে.এন. ঘোষের গ্রামোফোন ও হারমোনিয়াম বিক্রিবিষয়ক। দ্বিতীয়টি ‘সমগ্র বঙ্গ ও আসাম হিন্দু বিবাহ সমিতি’র―ঠিকানা: ৩৭ নং হ্যারিসন রোড (ম্যানেজার কে. সমাজপতি, বি.এ.)।

দ্বিতীয় পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে তিনটি পুরোনো বিজ্ঞাপনের পুনর্মুদ্রণ।

এছাড়া মুদ্রিত হয়েছে দেবব্রত বসুর ধারাবাহিক রচনা : ‘লেনিন ও সোভিয়েট রুষিয়া’ (পৃ:৬-৮)।

নিচে রয়েছে একটি কাঠের ব্লক; তার সঙ্গে কবিতার দুই পঙ্ক্তি :

‘শক্তি আছে সাহস আছে নাইকো জ্ঞান-দৃষ্টি ভাই,

অজ্ঞানের অন্ধকারে পথ-হারা আজ পান্থ তাই।’

নবম ও দশম পৃষ্ঠায় রয়েছে নৃপেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের অনূদিত ম্যাক্সিম গোর্কির ধারাবাহিক উপন্যাস মা। একাদশ পৃষ্ঠায় ‘খবরদারী’ পর্যায়ে রয়েছে চারটি টুকরো খবর।

দ্বাদশ পৃষ্ঠায় ‘খড়কুটো’র প্রথম সংবাদে বলা হয়েছে : ‘কবি নজরুল ইসলাম পীড়িত অবস্থায় কৃষ্ণনগরে আছেন। তাঁর ঠিকানা : নজরুল ইসলাম, কৃষ্ণনগর, নদীয়া।’

এই পৃষ্ঠাতেই মুদ্রিত হয়েছে ‘বীরভূম প্রজা-সম্মেলন /কীর্ণাহারের অধিবেশন’-এর বিস্তারিত সংবাদ। ১৩ নং পৃষ্ঠায় আছে : ‘হাওড়া জেলা প্রজা সম্মিলন’ এবং ‘ভারতীয় প্রথম কম্যুনিস্ট কনফারেন্স/কানপুর/ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির গঠননীতি’―১৪ নং পৃষ্ঠায় গিয়ে শেষ হয়েছে এই দীর্ঘ প্রতিবেদন। এই পৃষ্ঠার দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু হয়েছে : ‘বগুড়া জেলা প্রজা কনফারেন্স’-এর সংবাদ; শেষ হয়েছে ১৫ নং পৃষ্ঠায়। এই পাতাতেই মুদ্রিত হয়েছে দুটো পুরোনো বিজ্ঞাপন। আর ১৬ নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে লাঙল-এর বিজ্ঞাপনের হার ও লাঙল বুক এজেন্সীর বইয়ের বিজ্ঞাপন।

নিবিড় পাঠ : ৫

দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসুর ত্রিশতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে, লাঙলের পঞ্চম সংখ্যাটি ‘সুভাষ সংখ্যা’ রূপে প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ২১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার (৭ মাঘ, ১৩৩২)। এই বিশেষ সংখ্যায় অর্থাৎ ‘সুভাষ-সংখ্যা’য় মুদ্রিত হয়েছে, সুভাষচন্দ্রের ছবিসহ তাঁর ঊনত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনী, কর্মপন্থা নির্ধারণ ও চিঠিপত্র। এছাড়া রয়েছে কিছু অন্যান্য বিষয়ও। এই সংখ্যায় আছে : ‘জন্মোৎসবে’ (কবিতা), দেশভক্ত সুভাষচন্দ্র বসু, সুভাষচন্দ্রের পত্রাবলী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ সম্বন্ধে সুভাষচন্দ্রের চিঠি, নজরুল ইসলামের পত্র, সাম্যবাদী সম্মেলনের সভাপতির ভাষণ : ‘কমিউনিজম ও বলশেভিজম’, কমিউনিস্ট পার্টি গঠন, পুস্তক সমালোচনা, বাংলার কৃষকের কথা, রবীন্দ্র-উদ্ধৃতি। তৃতীয় ও চতুর্থ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে নরেন্দ্র দেবের ‘জন্মোৎসবে’ কবিতা। পঞ্চম থেকে সপ্তম পৃষ্ঠা অবধি রয়েছে সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মকুণ্ডলি, বাল্যকাল এবং কর্মপন্থা। অষ্টম থেকে দশম পৃষ্ঠা পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ৭ খানা চিঠি। দশম থেকে দ্বাদশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মুদ্রিত হয়েছে, দেশবন্ধু সম্পর্কে সুভাষচন্দ্রের একটি দীর্ঘ পত্র। এরপরেই রয়েছে একটি বক্স নোটিশ : ‘আগামী বারে সুভাষচন্দ্রের বিলাতের পত্র বাহির হইবে।’ ১৩ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে নজরুল ইসলামের একটি সংবেদনশীল পত্র। ১৭-১৮ জানুয়ারি, ময়মনসিংহের প্রজা ও শ্রমিক সম্মেলনে কবির যোগদানের কথা ছিল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি সম্মেলনে যেতে না পারায়, হেমন্তকুমার বসুর হাতে একটি লিখিত পত্র দেন, সেটা তাঁকে পাঠ করে শোনাবার জন্য। নজরুল তাঁর পত্রে লিখেছিলেন: ‘আপনারা আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আমার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল, আপনাদের এই নব জাগরিত প্রাণের স্পর্শে নিজেকে পবিত্র করিয়া লইব, ধন্য হইব। কিন্তু  দৈব প্রতিকূল হওয়ায় আমার সে আশা পূর্ণ হইল না। আমার শরীর আজও রীতিমত দুর্বল, একস্থান হইতে অন্যস্থানে যাইবার মত শক্তি আমার একেবারেই নাই। আশা করি আমার এই অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতা সকলে ক্ষমা করিবেন।’ এরপর ময়মনসিংহ সম্পর্কে তাঁর স্মৃতি ও স্মৃতিকাতরতার কথা উল্লেখ করেছেন কবি চিঠির শেষ অনুচ্ছেদে : ‘আজ কৃষাণের দুঃখে, শ্রমিকের কাৎরানীতে আল্লার আরশ কাঁপিয়া উঠিয়াছে। দিন আসিয়াছে, বহু যন্ত্রণা পাইয়াছ ভাই―এইবার তাহার প্রতিকারের ফেরেশতা দেবতা আসিতেছেন। তোমাদের লাঙল, তোমাদের শাবল তাঁহার অস্ত্র, তোমাদের কুটীর তাঁহার গৃহ! তোমাদের ছিন্ন মলিন বস্ত্র তাঁহার পতাকা, তোমরাই তাঁহার পিতা মাতা। আমি আপনাদের মাঝে সেই অনাগত মহাপুরুষের শুভ আগমন প্রতীক্ষা করিয়া আপনাদের নব জাগরণকে সালাম করিয়া নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকাইয়া আছি, ঐ বুঝি নব দিনমণির উদয় হইল! ইতি।’

এই পৃষ্ঠার শেষাংশে বক্স-আকারে আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদ্ধৃতি। ১৪ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে কানপুরে অনুষ্ঠিত সাম্যবাদী সম্মিলনে সভাপতির ভাষণ : ‘কমিউনিজম ও বলশেভিজম।’

১৫ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে নজরুল ইসলামের ছায়ানট কাব্যগ্রন্থের বিজ্ঞাপনসহ তিনটি বিজ্ঞাপন এবং ‘কম্যুনিস্ট পার্টি গঠন’ সংক্রান্ত একটি সংবাদ ও ঋষীকেশ সেনের বাঙলার কৃষকের কথা গ্রন্থের পাঠ-প্রতিক্রিয়া।

১৬ নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে পুরোনো বিজ্ঞাপন। ‘লাঙল বুক এজেন্সি’ থেকে নতুন দুটি পুস্তক প্রকাশের বিজ্ঞাপনও এবার যুক্ত হয়েছে : ১. ইউরোপের দর্পহারী মহাবীর গাজী আবদুল করিম; ২. মোস্তাফা কামাল পাশা।

১৫ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে : ৩৭ নং হ্যারিসন রোড-এর লাঙল কার্যালয়ে ‘কম্যুনিস্ট পার্টি গঠন’-এর সংবাদ। সংবাদটির গুরুত্ব বিবেচনা করে সেটি এখানে উদ্ধৃত করা হলো:

  ‘সকলেই জানেন ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কানপুরে ভারতীয় কম্যুনিস্টগণের প্রথম সম্মিলন হয়েছিল। স্থির হয়েছে বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই : প্রবন্ধকার) কম্যুনিস্ট পার্টির একটি কেন্দ্র কার্যালয়, আর কানপুর, কলিকাতা, লাহোর ও মাদ্রাজে পৃথক পৃথক শাখা কার্যালয় স্থাপন করা হবে। বাংলা দেশ হতে প্রতিনিধি হিসাবে একমাত্র রাধামোহন গোকুলজী উপস্থিত ছিলেন। আমিও উপস্থিত ছিলুম বটে কিন্তু, আমি গিয়েছিলুম আলমোড়া হতে। কলিকাতায় কার্যালয় স্থাপন করা ও বাংলা দেশে পার্টি গঠন করার ভার আমার ওপরে দেওয়া হয়েছে। আমার স্বাস্থ্য মোটেও ভাল নয়। সংযুক্ত প্রদেশের কারাগারে ক্ষয়রোগে ভুগে ভুগে যখন মরণাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছিলুম তখন ভারত গবর্ণমেন্ট আমায় মুক্তি দিয়েছেন। তারপরে কুর্মাচলের আলমোড়াতে তিন মাস থেকে যদিও চলা-ফেরার শক্তি কতকটা ফিরে পেয়েছি, তথাপি এই ঘৃণিত ব্যাধি হতে একেবারে মুক্ত হতে এখনো পারিনি এবং আর কখনো পারব কিনা তা-ও জানিনে। এ অবস্থায় কলিকাতায় থাকা আমার পক্ষে শ্রেয়ষ্কর ত নয়ই, পরন্তু সম্ভবপরও হয়তো হয়ে উঠবে না। তবে, আমার একার অভাবে বাংলা দেশে কম্যুনিস্ট পার্টির গঠন স্থগিত থাকা কিছুতেই উচিত হবে না। বাংলায় যাঁরা কম্যুনিস্ট আছেন তাঁরা সমবেত হয়ে পার্টি গঠন করুন, এই সনির্বন্ধ অনুরোধ আমি তাঁদের জানাচ্ছি। কম্যুনিস্ট হতে বলা এদেশের আইন অনুসারে অপরাধ নয়। বাংলা দেশের কম্যুনিস্টগণ পার্টি গঠন সম্বন্ধে কতদূর কি করতে রাজি আছেন তা আমায় জানালে আমি বড় বাধিত হব। মুজফ্ফর আহমদ, ৩৭ নং হ্যারিসন রোড, কলিকাতা।’

নিবিড় পাঠ : ৬

লাঙল-এর ষষ্ঠ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার (১৪ মাঘ, ১৩৩২)। পত্রিকার তৃতীয়-চতুর্থ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত, ৪২টি পঙ্ক্তিবিশিষ্ট একটি দীর্ঘ কবিতা : ‘গাড়োয়ানের গল্প’।

পূর্ব ঘোষণানুসারে, পঞ্চম-ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় রয়েছে : ‘সুভাষচন্দ্রের বিলাতের পত্রাবলী’। ঐ পাতার অবশিষ্টাংশে আছে বক্স-আকারে রবীন্দ্রনাথের, ৬ পঙ্ক্তির কবিতার উদ্ধৃতি। সপ্তম-অষ্টম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে দেবব্রত বসুর ধারাবাহিক রচনা : ‘লেনিন ও সোভিয়েট রুষিয়া’। পৃষ্ঠার অবশিষ্টাংশে রয়েছে, বক্স-আকারে রবীন্দ্রনাথের ৬পঙ্ক্তির কবিতার উদ্ধৃতি। নবম-দশম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে মুজফ্ফর আহমদের তাৎপর্যবহ প্রবন্ধ : ‘কোথায় প্রতিকার?’ উপসংহারে লেখক বলেছেন : ‘একটি মাত্র জিনিস― কম্যুনিজম― আজ ভারতবর্ষকে ধ্বংস হতে রক্ষা করতে পারে। কম্যুনিস্টরা মনুষ্যত্বটাকে বড় বলে মানে, সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধির প্রশ্রয় তারা একেবারেই দেয় না।’ পৃষ্ঠার শেষাংশে : ‘ময়মনসিংহ জেলা কৃষক শ্রমিক সম্মিলন’ শিরোনামে মুদ্রিত সংবাদে বলা হয়েছে : ‘গত ১৭/১৮ই জানুয়ারি তারিখে ময়মনসিংহ সহরে এক বিরাট কৃষক-শ্রমিক সম্মিলন হইয়া গিয়াছে। কলিকাতা হইতে শ্রীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকার, এম.এল.সি. ও মণিভূষণ মুখোপাধ্যায় মহাশয় নিমন্ত্রিত হইয়া সভায় যোগদান করেন। বঙ্গ ও আসাম প্রদেশী মৎস্যজীবী-সভার সম্পাদক শ্রীযুক্ত রমণীমোহন বিশ্বাস ও ম্যাজিক লণ্ঠনের প্রবক্তা, শ্রীযুক্ত জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগী মহাশয়ও সভায়  বক্তৃতা  করিয়াছেন। কিশোরগঞ্জের মৌলবী শাহ আবদুল হামিদ সভাপতির আসন গ্রহণ করেন।

‘মণিবাবু কাজী নজরুল ইসলামের কয়েকটি গান করিলেন, কাজী সাহেবের পত্র ও কবিতা হেমন্ত বাবু পাঠ করেন।’

১২ নং পৃষ্ঠায় আছে ‘খড়কুটো’। ১৩ থেকে ১৫ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে নৃপেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনূদিত ম্যাক্সিম গোর্কির ধারাবাহিক উপন্যাস: মা। ১৫ নং পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে তিনটি পুরোনো বিজ্ঞাপন। ১৬ নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে শুধুই বিজ্ঞাপন।

নিবিড় পাঠ : ৭

লাঙল-এর সপ্তম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়, ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৬, বৃহস্পতিবার (২১ মাঘ, ১৩৩২)। পত্রিকার তৃতীয় থেকে পঞ্চম পৃষ্ঠা অবধি ছাপা হয়েছে, বরিশালের অশ্বিনীকুমারকে নিয়ে লেখা নজরুল ইসলামের দীর্ঘ কবিতা : ‘অশ্বিনীকুমার’। কবিতাটি ১৩৩১ সালের মাঘ মাসে রচিত হয়। পরে কবিতাটি, ১৯২৭ সালের ২৯ জুলাই প্রকাশিত কবির ফণিমনসা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতার শেষ স্তবকটি প্রণিধানযোগ্য :

  ‘হে প্রেমিক, তব প্রেম বরিষায় দেশে

  এল ঢল বীর-ভূমি বরিশাল ভেসে।

  সেই ঢল সেই জল বিষম তৃষায়

  যাচিছে ঊষর বঙ্গ তব কাছে হায়!

  পীড়িত এ বঙ্গ পথ চাহিছে তোমার,

  অসুর নিধনে কবে আসিবে আবার!’

ষষ্ঠ এবং সপ্তম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে, নৃপেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় অনূদিত ম্যাক্সিম গোর্কির ধারাবাহিক উপন্যাস : মা। সপ্তম থেকে নবম পাতা অবধি রয়েছে ঋষীকেশ সেনের ধারাবাহিক রচনা: ‘বাংলার প্রজাস্বত্ব বিষয়ক বিধি’। পাতার শেষাংশে আছে একটি কার্টুন এবং বক্স-আকারে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের  ৪ পঙ্ক্তিবিশিষ্ট ব্যঙ্গ কবিতা।

১০-১১ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে দেবব্রত বসুর ধারাবাহিক রচনা : ‘লেনিন ও সোভিয়েট রুষিয়া’। ১১ নং পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে  কৃষ্ণনগরের টাউন হলে, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত, নিখিল বঙ্গীয় প্রজাসম্মিলনীর দ্বিতীয় অধিবেশনের কর্মসূচি। ১৯২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি, অভ্যর্থনা সমিতির সম্পাদক হেমন্তকুমার সরকার এই কর্মসূচির কথা জানিয়ে দেন। দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে (৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৬, রবিবার) বক্তাদের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছেন : কাজী নজরুল ইসলাম।

১১ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত ‘খড়কুটো’ থেকে জানা যায় : ‘বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় যাচ্ছেন। ঢাকা শহরে কবি-সংবর্ধনার জন্য যথেষ্ট আয়োজন হচ্ছে। ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনারদের এক বৈঠকে ঠিক হয়েছে যে, কবি সেখানে পৌঁছলে মিউনিসিপ্যালিটি থেকে তাঁকে অভিনন্দন-পত্র দেওয়া হবে।’

১২-১৩ নং পৃষ্ঠায় ‘খবরদারী’ পর্যায়ে রয়েছে সংবাদসমূহ। ১৩ নং পৃষ্ঠার শেষাংশ থেকে ১৫ নং পৃষ্ঠা পর্যন্ত মুদ্রিত হয়েছে, কুতুবদ্দীন আহমদের ‘কার্ল মার্কসের শিক্ষা’। এটি লেখকের ইংরেজি রচনার ভাষান্তর। এই পৃষ্ঠায়ই মুদ্রিত হয়েছে চারটি বিজ্ঞাপন। ১৬ নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে, লাঙল পত্রিকার এবং লাঙল বুক এজেন্সীর পুরোনো বিজ্ঞাপনসমূহ।

নিবিড় পাঠ : ৮

পত্রিকার অষ্টম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে ১৯২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার (২৮ মাঘ, ১৩৩২)।

প্রথম পৃষ্ঠায়ই নোটিশাকারে জানানো হয় : ‘এই সংখ্যায় ডাক্তার নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের সভাপতির অভিভাষণ’ মুদ্রিত হয়েছে। এছাড়া এ পৃষ্ঠায় আছে তিনটি বিজ্ঞাপন; রয়েছে বরেন্দ্র লাইব্রেরী প্রকাশিত এবং সতীশচন্দ্র সেন প্রণীত ‘বাংলার অভিনব নাটক কাদম্বরী’র প্রকাশ-সংবাদ। দ্বিতীয় পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে পুরোনো বিজ্ঞাপনসমূহ। ১১ নং পৃষ্ঠা জুড়ে মুদ্রিত হয়েছে, কৃষ্ণনগরে ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘নিখিল বঙ্গীয় প্রজা-সম্মিলনী’র দ্বিতীয় অধিবেশনের সভাপতি নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের ভাষণ। ১৪ নং পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে, সুকুমার চক্রবর্তী ও সুরেশ বিশ্বাসের : ‘চীনের নবজন্ম’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক অনূদিত রচনা; নিবন্ধটি শেষ হয়েছে ১৭ নং পৃষ্ঠায় গিয়ে। রচনাটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল ঋড়ৎধিৎফ পত্রিকায় ১৯২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর।

এই পৃষ্ঠার শেষাংশে মুদ্রিত হয়েছে দুটি পুরোনা বিজ্ঞাপন। ১৮ নং পাতায় আছে : দুটি পুরোনো এবং দুটি নতুন বিজ্ঞাপন।

নিবিড় পাঠ : ৯

লাঙল-এর নবম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার (৬ ফাল্গুন, ১৩৩২)। প্রথম পাতাতেই জানিয়ে দেওয়া হয় : ‘এই সংখ্যার বড়ো আকর্ষণ, নজরুল ইসলামের কবিতা ‘শ্রমিকের গান’। এছাড়া, প্রথম পৃষ্ঠায় আছে তিনটি পুরোনো বিজ্ঞাপন। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় পাতা জুড়ে রয়েছে বিজ্ঞাপন; নতুন বইয়ের বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় : মেটকাফ্ প্রেস থেকে বেরিয়েছে : মনীন্দ্রনাথ ঘোষের ‘নারীর দাবী’।

তৃতীয় ও চতুর্থ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে নজরুল ইসলামের ‘শ্রমিকের গান’। কৃষ্ণনগরে ১৯২৬ সালের ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনের (দ্বিতীয় অধিবেশনের?) দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে, কবি এই গানটি নিজেই সুরারোপ করে পরিবেশন করেন। গানটির নিচে রচনার তারিখ রয়েছে : ২০ মাঘ, ১৩৩২, কৃষ্ণনগর। পরে ১৯২৬ সালের ২৫ অক্টোবর (কার্তিক, ১৩৩৩) এই গান/কবিতাটি, বর্মণ পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত কবির সর্বহারা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। গানটির উল্লেখযোগ্য শেষাংশ :

  ‘আবার নূতন করে মল্লভূমে

   গর্জ্জাবে ভাই দল-মাদল।

   র্ধ হাতুড়ি, তোল্ কাঁধে শাবল

   ঐ শয়তানী চোখ কলের বাতি

   নিবিয়ে আয় রে ধ্বংস-সাথী!

   র্ধ হাতিয়ার সামনে প্রলয় রাতি রে!

   আয় আলোক-স্নানের যাত্রীরা আয়

   আঁধার নায়ে চড়বি চল্।

   র্ধ হাতুড়ি তোল্ কাঁধে শাবল।’

দায়বদ্ধতার সঙ্গে দরদ মিশিয়ে, শ্রমিক শক্তির রাজনৈতিক তৎপরতা ও তাৎপর্য ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। আর সে কারণেই গানটির এত গুরুত্ব।

পঞ্চম থেকে অষ্টম পৃষ্ঠা অবধি রয়েছে দেবব্রত বসুর ধারাবাহিক রচনা : ‘লেনিন ও সোভিয়েট রুষিয়া’। পৃষ্ঠার শেষাংশে আছে লাঙলের ম্যানেজারের একটি বিজ্ঞাপন। তাতে বলা হয়েছে, লাঙলের নিজস্ব ছাপার মেশিন কেনার কথা : ‘প্রিন্টিং মেশিন আবশ্যক/ পুরাতন, অথবা কার্যোপযোগী একটি ডবল ডিমাই বা ডবল ক্রাউন প্রিন্টিং মেশিন এবং হাফ-ক্রাউন সাইজ ট্রেডল মেশিন আবশ্যক।’

৯ থেকে ১৪ নং পৃষ্ঠা পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ঐ সম্মিলনের গঠন প্রণালী। সম্মিলনে গৃহীত, ৪ নং প্রস্তাবে বলা হয় : ‘কবি নজরুল ইসলাম পরিচালিত―লাঙল পত্রিকাকে, কৃষক ও শ্রমিক দলের মুখপত্র রূপে আপাতত গ্রহণ করা হউক।’

১৫ নং পৃষ্ঠায় ‘খড়কুটো’র সংবাদভাষ্যে জানানো হয় : ‘নজরুল ইসলাম/কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব কৃষ্ণনগরেই থাকেন। ব্যক্তিগতভাবে চিঠি-পত্র তাঁকে, পো: কৃষ্ণনগর, জিলা: নদীয়া ঠিকানাতেই লিখতে হবে। লাঙল অফিসের ঠিকানায় তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে পত্র লিখলে সে পত্র সময়মত তিনি পাবেন না।’ আর একটি সংবাদে, লাঙলের ৩৭ নং হ্যারিসন রোডে, বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের বৈঠকের কথা জানিয়ে বলা হয়েছে : ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল/বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের কার্যনির্বাহক সমিতির প্রথম বৈঠক আগামী ২১শে মার্চ তারিখে পূর্বাহ্ন ৮টা ৩০ মিনিটের সময় দলের অফিস ৩৭ নং হ্যারিসন রোড, কলিকাতায় বসবে/হেমন্তকুমার সরকার/ সম্পাদক/বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল।’

১৬ নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে অন্যান্য সংখ্যার মতোই পুরোনো বিজ্ঞাপন।

নিবিড় পাঠ : ১০

পত্রিকার দশম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার (১৩ ফাল্গুন, ১৩৩২)।

তৃতীয় পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে ম্যাক্স বিয়ার্-এর : ‘সোশালিজম কাকে বলে?’ চতুর্থ থেকে অষ্টম পৃষ্ঠা পর্যন্ত রয়েছে : ‘চীনের নবজন্ম’―এর প্রথমাংশ মুদ্রিত হয়েছিল পত্রিকার অষ্টম সংখ্যায়। অষ্টম পৃষ্ঠার বাকি অর্ধাংশ জুড়ে রয়েছে ‘খড়কুটো’।

নবম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে : ‘শচীন সান্যালের উপর আবার অর্ডিন্যান্স’ শীর্ষক একটি সংবাদ। নবম থেকে ১৩ নং পৃষ্ঠাতে মুদ্রিত হয়েছে ঋষীকেশ সেনের ধারাবাহিক প্রবন্ধ : ‘বাঙলার প্রজাস্বত্ব বিষয়ক বিধি’। ১৪ নং পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে মুজফ্ফর আহমদ লিখিত ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ শিরোনামে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংবাদ। ১৪ এবং ১৫ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে মুজফ্ফর আহমদের লেখা প্রবন্ধ : ‘শ্রেণি-সংগ্রাম’।

১৫ এবং ১৬ নং পৃষ্ঠাতে আছে পুরোনো ৮টি বিজ্ঞাপন। এই সংখ্যায় নজরুল ইসলামের কোনও রচনা বা সংবাদ নেই।

নিবিড় পাঠ : ১১

লাঙল একাদশ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ৪ মার্চ, বৃহস্পতিবার (২০ ফাল্গুন, ১৩৩২)। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ৩টি এবং ২য় পৃষ্ঠায় ৬টি পুরোনো বিজ্ঞাপন মুদ্রিত হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ পৃষ্ঠায় রয়েছে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কবিতা : ‘চাষার ব্যারিষ্টার’। পঞ্চম ও ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে, নৃপেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনূদিত ম্যাক্সিম গোর্কির ধারাবাহিক উপন্যাস মা।

সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধ ‘হিন্দু-মুসলমান’, রয়েছে সপ্তম ও অষ্টম পৃষ্ঠায়। প্রবন্ধের উপসংহারে লেখক বলেছেন : ‘আজকের দিনে পৃথিবীর সমস্যাই হচ্ছে উৎপাদন ও বণ্টনের সমস্যা, আর এই সমস্যার সমাধানের উপর হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান নির্ভর করে।’

নবম পৃষ্ঠায় রয়েছে, আর. নেফ্টের প্রবন্ধ : ‘সোশালিজম’। এছাড়া আছে অতুলকৃষ্ণ ঘোষ এবং উপেন্দ্রনাথের মুক্তির বিষয়ে দুটো সংবাদ। দশম ও একাদশ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে আলতাফ আলীর প্রবন্ধ ‘ভারত কি চায়?’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন : ‘শাসনতন্ত্র আমাদের হাতে না আসা পর্যন্ত আমাদের দুঃখ কষ্ট ও দুর্দশার অবসান হবে না।’ ১২ এবং ১৩ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে ঋষীকেশ সেনের ধারাবাহিক রচনা : ‘বাঙলার প্রজাস্বত্ব বিষয়ক বিধি’র ষষ্ঠতম পর্যায়। রয়েছে ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ শিরোনামে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দুটি সংবাদভাষ্য। ১৪ নং পৃষ্ঠার শুরুতে রয়েছে ‘খড়কুটো’। ১৪ এবং ১৫ নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ৭টি পুরোনো বিজ্ঞাপন।

শেষ পৃষ্ঠায় (১৬) রয়েছে পাতা জুড়ে একটি বিজ্ঞাপন : নজরুল ইসলামের অসুস্থতার কারণে এলবার্ট হলে আয়োজিত যে অনুষ্ঠান স্থগিত রাখা হয়েছিল, সেই অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হয়েছে : ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক-দলের সাহায্যের জন্য বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ১৯২৬ সালের ৬ই মার্চ (২২শে ফাল্গুন, শনিবার) সন্ধ্যা ছয়টায় কলেজ স্কোয়ারের এলবার্ট হলে। টিকিটের মূল্য তিন টাকা, দুই টাকা, এক টাকা।’

এই সংখ্যায় নজরুল ইসলামের কোনও লেখা নেই।

নিবিড় পাঠ : ১২

লাঙল-এর দ্বাদশ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে দু সপ্তাহ পার করে : ১৮ মার্চ, ১৯২৬, বৃহস্পতিবার (৪ চৈত্র, ১৩৩২)। এই সংখ্যা থেকেই লাঙলের লোগোটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।  লেখা হয় : ‘লাঙল বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক- দলের সাপ্তাহিক মুখপত্র।’

‘Langal : A Weekly organ of The Bengal Peasants and Workers Party’ নোটিশে জানানো হয় : ‘এই সংখ্যায় আছে কার্ল মার্কসের পত্র’। এছাড়া প্রথম পৃষ্ঠায় আছে তিনটি বিজ্ঞাপন। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় রয়েছে পাঁচটি বিজ্ঞাপন। লাঙল বুক এজেন্সী জানিয়েছে : ‘নজরুল ইসলামের নূতন কবিতার বই সাম্যবাদী দুই আনা, ছায়ানট পাঁচসিকা এবং রাজবন্দীর জবানবন্দী দুই আনা।’ এই সংখ্যার তিন থেকে পাঁচ পৃষ্ঠা জুড়ে ছাপা হয়েছে কবি নজরুলের ‘জেলেদের গান’।

গানটি রচিত হয়েছে কৃষ্ণনগরে, ১৯২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি (১৩৩২)। ১১ এবং ১২ মার্চ, মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত হয় ‘নিখিল বঙ্গীয় আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনী’র তৃতীয় অধিবেশন। ঐ অনুষ্ঠানের প্রথম দিনে, উদ্বোধন-সঙ্গীত হিসেবে কবি এই গান পরিবেশন করেন। গানটি ১৯২৬ সালের ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত কবির সর্বহারা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। এখানে ‘জেলেদের গান’ নামের পরিবর্তে নামকরণ করা হয়েছে ‘ধীবরদের গান’। গ্রন্থভুক্তিতে, গানটির মধ্যে প্রচুর পাঠান্তর পরিলক্ষিত হয়।

ষষ্ঠ ও সপ্তম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে মুজফ্ফর আহমদের প্রবন্ধ : ‘কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন’।

সপ্তম থেকে দশম পৃষ্ঠা অবধি বঙ্গানুবাদে প্রকাশিত হয়েছে, কার্ল মার্কসের ‘ইংরেজ অধিকৃত ভারতবর্ষের একটি চিত্র’। এরপরেই রয়েছে লাঙলের ম্যানেজারের ‘কৈফিয়ৎ’, তাতে বলা হয়েছে : ‘প্রেস পরিবর্তন করা হেতু গত সপ্তাহে লাঙল বের হয়নি অপ্রত্যাশিতভাবে আমাদিগকে হঠাৎ প্রেস বদলাতে হয়েছে।’ এই পৃষ্ঠাতেই ছাপা হয়েছে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্বরাজ্যদল’ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন। ১১ এবং ১২ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে, নৃপেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনূদিত ম্যাক্সিম গোর্কির ধারাবাহিক উপন্যাস মা।

১৩ নং পৃষ্ঠায়, ছাপা হয়েছে ‘ভূম্যধিকারিত্বের বিলোপ’ শিরোনামে একটি পুস্তক-পর্যালোচনা।

১৪ এবং ১৫ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে ‘খড়কুটো’ এবং ‘খবরদারী’। ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনী’ শিরোনামের সংবাদভাষ্য থেকে জানা যায় : ‘গত ১১ই ও ১২ই মার্চ তারিখে ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর সহরে মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশন হয়।

‘১০ই মার্চ সন্ধ্যায় সভাপতি শ্রীযুত হেমন্তকুমার সরকার মহাশয় স্টীমার যোগে আসেন। তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম, শ্রীযুত বসন্তকুমার মজুমদার ও শ্রীমতী হেমপ্রভা মজুমদার ছিলেন। কাজী সাহেবের গানে সকলেই মুগ্ধ হয়েছিলেন।’

১৫ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে ৪টি বিজ্ঞাপন। ১৬ নং পৃষ্ঠার সবটা জুড়ে রয়েছে বিজ্ঞাপন। রয়েছে, ডি.এম. লাইব্রেরী কর্তৃক প্রকাশিত নজরুল ইসলামের বইয়ের বিজ্ঞাপনও।

নিবিড় পাঠ : ১৩

দ্বাদশ সংখ্যা থেকেই (১৮ মার্চ) লাঙল পত্রিকা, ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলে’র মুখপত্ররূপে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে; এবং পুরোনো ‘কৃষক-লোগো’টিও তুলে দেওয়া হয়। এই সময়, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র এবং তরুণ রাজনৈতিক কর্মী সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দলে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন। মুজফ্ফর আহমদ তাঁকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ‘আশীর্বচন’ সংগ্রহ করতে বলেন। একদিন সকালে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে তিনি তা লিখিয়ে এনে দেন। লাঙল-এর ত্রয়োদশ সংখ্যা থেকে তা পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হতে শুরু করে। কবির অমূল্য ‘আশীর্বচন’টি  উল্লেখ করা হলো :

      ‘জাগো জাগো

      ধরো তব মরুভাঙা হল

      বল দাও ফল দাও

      স্তব্ধ কর ব্যর্থ কোলাহল।’

বিশ্বভারতীর গ্রন্থাগারিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এবং সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতিতে এর পাঠান্তর পরিলক্ষিত হয়। পাঠান্তরে, ‘বল দাও ফল দাও’-এর স্থানে ‘প্রাণ দাও শক্তি দাও’ রয়েছে।

ত্রয়োদশ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার (১১ চৈত্র, ১৩৩২)।

এই সংখ্যায় পত্রিকার প্রধান পরিচালকের নাম হিসেবে নজরুল ইসলামের উল্লেখ থাকে বটে, কিন্তু সম্পাদক হিসেবে মুদ্রিত হয় গঙ্গাধর বিশ্বাসের নাম। এই সংখ্যাটি বিশেষ মৎস্যজীবী সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়। প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয় দুটি বিজ্ঞাপন। দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতেও ছাপা হয় পুরোনো ৫টি বিজ্ঞাপন; এর মধ্যে ৪টি বইয়ের বিজ্ঞাপন, বাকিটি থিয়েটার সামগ্রী সংক্রান্ত।

তৃতীয় থেকে অষ্টম পৃষ্ঠায় রয়েছে,  মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত (১১ এবং ১২ মার্চ /২৭ ও ২৮ ফাল্গুন) ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনে’, সভাপতি হেমন্তকুমার সরকারের অভিভাষণ। অষ্টম ও নবম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে মুজফ্ফর আহমদের লেখা ‘কারাগার সম্বন্ধে দেশের ঔদাসীন্য’ শীর্ষক প্রতিবেদন।

নবম থেকে দ্বাদশ পৃষ্ঠায় বঙ্গানুবাদে প্রকাশিত হয়েছে কার্ল মার্কসের ধারাবাহিক : ‘ইংরেজ অধিকৃত ভারতবর্ষ’। দ্বাদশ সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছিল তাঁর প্রথম পত্রখানি। এটি তাঁর দ্বিতীয় পত্র―রচনাকাল ১৮৫৩ সাল। ১২ থেকে ১৪ নং পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে, নৃপেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনূদিত ম্যাক্সিম গোর্কির ধারাবাহিক উপন্যাস মা। ১৪ নং পৃষ্ঠায় আছে, ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ শিরোনামে মুজফ্ফর আহমদের লেখা বিভিন্ন সংবাদ। এরপর রয়েছে, কৃষক ও শ্রমিক সভার সংবাদ এবং ‘খড়কুটো’। শেষ দুটি পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে পুরোনো বিজ্ঞাপনসমূহ।

এই সংখ্যাতেও নজরুল ইসলামের কোনও লেখা নেই।

নিবিড় পাঠ : ১৪

লাঙল-এর চতুর্দশ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে দু সপ্তাহ পরে, ১৯২৬ সালের ৮ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার (২৫ চৈত্র, ১৩৩২)।

প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘আশীর্বচন’ এবং দুটি পুরোনো বিজ্ঞাপনের পুনর্মুদ্রণ। তৃতীয় থেকে পঞ্চম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে মুজফ্ফর আহমদের লেখা ‘খোলা চিঠি’। চিঠিটির শেষাংশে আছে : ‘আজকের দিনে দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সর্বপ্রধান কাজ হচ্ছে দেশকে মহাত্মা গান্ধীর সকল প্রকার প্রভাব হতে মুক্ত করা।’ পঞ্চম পৃষ্ঠার শেষাংশে মুদ্রিত হয়েছে : ‘ময়মনসিংহ কৃষক ও শ্রমিক-দল’-এর সংবাদ।

ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘কমনওয়েলথ অফ্ ইন্ডিয়া ও কমরেড সাকলাৎওয়ালা’ এবং ‘পুস্তক-পরিচিতি’। সপ্তম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে, লাঙল পত্রিকায় নজরুল ইসলামের শেষ কবিতা : ‘সর্বহারা’। পাঁচটি স্তবকে রচিত এই কবিতার, শেষ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পঙ্ক্তি দেওয়া হলো :

        ‘মাঝিরে, তোর নাও ভাসিয়ে

                    মাটির বুকে চল্!

          শক্ত মাটির ঘায়ে হউক

                   রক্ত পদতল।

          প্রলয়-পথিক চ’লবি  ফিরি

           দ’লবি পাহাড়-কানন-গিরি!

           হাঁকছে বাদল ঘিরি ঘিরি,

                  নাচছে সিন্ধুজল।

       চল্ রে জলের যাত্রী এবার

             মাটির বুকে চল্।।’

অষ্টম-নবম পৃষ্ঠায় ‘যুগ-সন্ধি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি লিখেছেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। দশম ও একাদশ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে নৃপেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনূদিত ম্যাক্সিম গোর্কির ধারাবাহিক উপন্যাস মা। দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ পৃষ্ঠা অবধি ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ লিখেছেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। চতুর্দশ থেকে পঞ্চদশ পৃষ্ঠায় ‘কলকাতায় দাঙ্গা’ শিরোনামে মুদ্রিত হয়েছে, কলকাতায় দাঙ্গার সংবাদ। সংবাদে বলা হয়েছে :

‘গত শুক্রবার হতে ধর্ম কলিকাতা শহরে আপনার স্বরূপ প্রকাশ করেছে, অর্থাৎ হিন্দু আর মুসলমানে মারামারি রক্তারক্তি খুবই হচ্ছে। হ্যারিসন রোডের কোনও মসজিদে মুসলমানরা যখন তাদের খোদার নামে নামাজ পড়ছিল তখন আর্য সমাজের একদল লোক সেই পথ দিয়ে তাদের  খোদার নামে বাজা ও শাঁখ বাজিয়ে যাচ্ছিল। তাতে তাঁদের ধর্মের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এই নিয়েই নাকি সর্বপ্রথমে মারামারির সূত্রপাত ঘটে। মুসলমান হিন্দুকে মারছে আর হিন্দুরা মারছে মুসলমানকে।’

‘২২শে চৈত্র সোমবার’ শীর্ষক শিরোনামে লেখা হয়েছে :

          ‘শ্রীযুত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ীতেও প্রায় ৫০জন মুসলমান আশ্রয় নিয়েছিল।

         এইজন্য অ-বাঙালী হিন্দুগণ ঠাকুর বাড়ী ঘেরাও করেছিল। তারা বলছিল যে,

       মুসলমানদের তাদের হাতে ছেড়ে না দিলে তারা ঠাকুর বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দেবে।

        পুলিশের নিকটে ফোন করাতে কনস্টবল ও গোরা পল্টন যখন আসে তখন এসকল

        লোক পালিয়ে যায়।’

১৫ এবং ১৬ নং পৃষ্ঠায় আছে সুরেশ বিশ্বাস সংকলিত ‘সোশালিজম কাহাকে বলে’ শিরোনামে কতগুলো উদ্ধৃতি। ১৬ এবং ১৭ নং পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে ‘খড়কুটো’ এবং পল্লী পত্রিকার আসন্ন প্রকাশের সংবাদ। ১৮ থেকে ২০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত, তিন পাতা জুড়ে রয়েছে নতুন ও পুরোনো বিজ্ঞাপন।

নিবিড় পাঠ : ১৫  

লাঙল পত্রিকার শেষ সংখ্যাটি (পঞ্চদশ সংখ্যা) প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ১৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার (২ বৈশাখ, ১৩৩৩)। প্রথম পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘রবীন্দ্রনাথের আশীর্বচন’। লাঙল লোগোর কাঠের ব্লকের অর্থাৎ বর্ণলিপির পরিবর্তন ঘটেছে; সঙ্গে রয়েছে কাস্তে ও হাতুড়ির সিম্বল। রয়েছে পুরোনো বিজ্ঞাপনের পুনর্মুদ্রণ। দ্বিতীয় পৃষ্ঠা জুড়ে ছাপা হয়েছে চারটি বিজ্ঞাপন। তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ পৃষ্ঠা অবধি মুদ্রিত হয়েছে ‘দেশের বাণী’ থেকে মুজফ্ফর আহমদের ‘ধর্ম ও রাষ্ট্র’ শীর্ষক নিবন্ধ। ষষ্ঠ ও সপ্তম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে দুটি সংবাদ : ১. নৈহাটি গৌরীপুর জুটমিলে নৃশংস কাণ্ড; ২. একটা কিছু কর (মিসেস এম. রহমান)।

অতি সম্প্রতি কলকাতায় ঘটে যাওয়া দাঙ্গা নিয়ে সপ্তম ও অষ্টম পৃষ্ঠায়, ‘ধর্ম রক্ষায় হিন্দু মুসলমান’ শীর্ষক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন লিখেছেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। অষ্টম থেকে দশম পৃষ্ঠা অবধি রয়েছে, দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত নিয়ে মুজফ্ফর আহমদ লিখিত ‘বিবাদ’ শীর্ষক একটি তাৎপর্যবহ বিশ্লেষণাত্মক রচনা। একাদশ পৃষ্ঠাতে মুদ্রিত হয়েছে দাঙ্গা নিয়ে ‘ধর্মবিভীষিকা’ শিরোনামে, স্বাক্ষরবিহীন একটি প্রতিবেদন। ১২ থেকে ১৫ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে, ‘বৃটিশ সোশ্যালিস্ট দল ও ভারতবর্ষ’ শিরোনামে স্বতন্ত্র শ্রমিক দলের অভিমত; সুকুমার চক্রবর্তী এবং সুরেশ বিশ্বাস লিখিত ‘নির্যাতন, বিপ্লব ও তাহার প্রতিক্রিয়া’ এবং শাহ্ লিখিত ‘একজন শ্রমিকের বৎসরে খাদ্যের পরিমাণ’।

১৭ এবং ১৮ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে : ১. ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’, ২. ‘ভারতীয় জাতীয় দল’ এবং ৩. ‘বলশেভিক ষড়যন্ত্রের অভিযুক্ত’ শীর্ষক তিনটি সংবাদ-ভাষ্য। ১৮ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে ‘খড়কুটো’। ১৯ ও ২০ নং পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে নতুন ও পুরোনো ৮টি বিজ্ঞাপন।

এই সংখ্যাতেও নজরুল ইসলামের কোনও লেখা ছাপা হয়নি।

লাঙল এবং গণবাণী একাকার

গণবাণীর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট, বৃহস্পতিবার (২৭ শ্রাবণ, ১৩৩৩)। পত্রিকার সম্পাদক হলেন মুজফ্ফর আহমদ। প্রথম পৃষ্ঠায় ‘আমাদের কথা’ শিরোনামে সম্পাদক লিখেছেন: ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল গণবাণীর প্রকাশ ভার গ্রহণ করেছেন। এই দলের পূর্ব-প্রকাশিত লাঙল, গণবাণীর সহিত একীভূত হয়ে গেছে। লাঙল-এর গ্রাহক যাঁরা হয়েছিলেন গণবাণী তাঁরা পাবেন। বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের নিজের ছাপাখানা ছিল না বলে লাঙল প্রকাশে অনেক অসুবিধে ভোগ করতে হচ্ছিল, অপরের ছাপাখানা হতে কিছুতেই ঠিক সময়ে কাগজ পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে বাধ্য হয়ে বিগত ১৫ই এপ্রিলের পর থেকে কাগজ বন্ধ করে দিতে হয়। দলের অন্যতম সদস্য ও সম্পাদক মৌলবী কুতবুদ্দীন আহমদ সাহেব নিজে একটি ছাপাখানা করেছেন। তাঁরি ছাপাখানা হতে গণবাণী ছাপা হয়ে বের হলো।’

গণবাণীর প্রথম সংখ্যাতেও নজরুল ইসলামের কোনও উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়নি।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১.         লাঙল ও গণবাণী : মুহম্মদ নূরুল হুদা। ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা; দ্বিতীয় সংস্করণ, আষাঢ়, ১৪২০ ; জুন, ২০১৩।

২.         নজরুল জীবনী : অরুণকুমার বসু, প্রথম সংস্করণ : জানুয়ারি ২০০০; প্রথম আনন্দ সংস্করণ, ডিসেম্বর, ২০১৬।

৩.        কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা : মুজফ্ফর আহমদ; মুক্তধারা, বাংলাদেশ প্রথম সংস্করণ, অক্টোবর, ১৯৭৩।

৪.         সমকালে নজরুল ইসলাম : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম; বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, অগ্রহায়ণ, ১৩৯০; নভেম্বর, ১৯৮৩।

৫.        সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। প্র. প্রকাশ : মাঘ, ১৩৮৩; ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭।

৬.        বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল জীবনী, গোলাম মুরশিদ; প্রথমা, প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি, ২০১৮। মাঘ, ১৪২৪। দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফাল্গুন, ১৪২৪; ফেব্রুয়ারি, ২০১৮।

৭.         নজরুল-গ্রন্থপঞ্জী ও নজরুল-বিষয়ক গ্রন্থাবলী; নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ: ভাদ্র, ১৪০১/আগস্ট, ১৯৯৪।

৮.        সাম্যবাদী : কাজী নজরুল ইসলাম; ১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর পুস্তিকা-আকারে প্রকাশিত; বেঙ্গল পাবলিশিং হোম, কলকাতা। পৃ. ২৭। মূল্য: দুইআনা।

৯.        নজরুল-রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত/প্রকাশিত, কেন্দ্রীয় বাংলা-উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ: ৯ পৌষ, ১৩৭৪; ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৭।

১০.       নজরুল অজানা কথা : জিয়াদ আলী; মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি, ২০০২; প্রথম মাওলা ব্রাদার্স সংস্করণ, ফাল্গুন, ১৪১৪; ফেব্রুয়ারি, ২০০৮।

১১.       জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ : কাজী নজরুল ইসলাম; পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা। প্রথম প্রকাশ ১২ ভাদ্র, ১৪০৭;  ১৯ আগস্ট, ২০০০।

১২.      তোরা সব জয়ধ্বনি কর : আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত; বাংলা একাডেমি, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ: ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৯৬/ মে, ১৯৬৯।

১৩.      কাজী নজরুল ইসলাম রচনাসমগ্র (তৃতীয় খণ্ড) : পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা। প্রথম  প্রকাশ: ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৭৯; ২৫ মে, ১৯৭২।

১৪.       নজরুল জীবনী : রফিকুল ইসলাম; বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম প্রকাশ : ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৭৯; ২৫ মে, ১৯৭২।

পত্রিকা

১.  পশ্চিমবঙ্গ : কাজী নজরুল, ইসলাম জন্মশতবর্ষ স্মরণ; ১৪০৬। পশ্চিমবঙ্গ সরকার,  বর্ষ ৩২; সংখ্যা: ১৩৭৯; ২৫ মে, ১৯৭২।

২.         নজরুল ইনস্টিটিউট পত্রিকা; নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। অষ্টম সংকলন, ভাদ্র, ১৩৯৫।

 লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button