উপন্যাসে ইতিহাস, ইতিহাসে উপন্যাস : রাহেল রাজিব

বিশেষ রচনা : ইতিহাস ও উপন্যাস : উপন্যাসে ইতিহাস
ইতিহাস, পুরোনোকে পুনরাবোলোকন-পুরোনো সবকিছুকেই নতুন করে দেখার আগ্রহ সকলেরই থাকে। বিশেষত আবেগের স্মৃতিকে পুনর্দর্শনের আকাক্সক্ষা অনিবার্য হয়ে ওঠে প্রায় সকলের জীবনে তবে প্রাজ্ঞ মন সবসময় ব্যক্তির চেয়ে বিষয়কে, বর্তমানের চেয়ে অতীতকে, সময়ের চেয়ে সময় কাঠামোকে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর বিবিধ বিষয়কে ব্যক্তিক অভিক্ষেপে পুনর্বিবেচনা করতে অপার আগ্রহী থাকে। তবে অতীতকে আয়নায় ফেলে চুলচেরা বিশ্লেষণ যেন মানুষের স্বভাবজাত, চায়ের আড্ডায় কিংবা সেমিনার-সিম্পোজিয়াম-কনফারেন্সের ভারী চিন্তায়, সবখানে ইতিহাসকে নতুন করে বিচার-বিবেচনার আগ্রহ সকল সময় ও সকল ব্যক্তির ভেতর জারণ-বিজারণে ক্রিয়াশীল। কথাসাহিত্য মূলত শিল্পের জনপ্রিয় ধারা, কাব্যের মুগ্ধতা ও নাটকের সংলাপনির্ভর গদ্যের পরবর্তী শিল্পকাঠামো হিসেবে উপন্যাসের যাত্রা ইউরোপ থেকে এশিয়ায় এবং বাংলা গদ্যের ইতিহাস ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের (১৮০১) [টীকা-১] প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে, ফলে প্রায় দুই শতকের বেশি সময় ধরে চর্চা করে আসা গদ্যের একটি শিল্পকাঠামোকে নাজুক বলার উপায় নেই, তবে দুর্বলতার চিহ্নগুলো সক্রিয় বলে সফল মাইলফলকগুলোকে সহসাই চেনা যায় এবং মহামহিম কথাচিত্রীবৃন্দ সে নান্দনিক শিল্পভাষ্যকে প্রতীয়মান করেছেন। ইতিহাসনির্ভর উপন্যাসচর্চা দিয়ে কথাসাহিত্যচর্চার শুরু―নকশাধর্মী রচনার [টীকা-২] শিল্পগুণ বিশ্লেষণ করলে সেটার সহজাত গুণটি স্পষ্ট ও তীব্র হয়ে ওঠে।
অনুরণন সাধারণত একটি প্রতিক্রিয়া এবং যখন ঐতিহাসিক কোনও বিষয় ব্যক্তির চেতনায় ক্রিয়াশীল থাকে তখন সেটা নানা মাত্রায় জারিত হয় এবং শিল্পীমন সে জারণ-বিজারণকে ধারণ করার তাড়না ও তাগিদ বোধ করতে থাকে এবং সফলভাবে সেটাকে শিল্পে উপস্থাপনের চেষ্টা করে থাকে। বিশেষত ব্যক্তিক জীবন পরিবার-সমাজ ও রাষ্ট্রের নানামাত্রিক অবকাঠামোভিত্তিক শিক্ষায় নির্মিত এবং সেখানে ইতিহাস সম্পর্কিত যাপনচিত্র যেমন সংশ্লিষ্টতা জরুরি ভিত্তি নির্মাণ করে তেমনি ইতিহাসের নিরন্তর পাঠসূত্র সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দৈনন্দিন বিভিন্ন মাত্রার ঘটনাবহুল বিষয়গুলো কখনওই ইতিহাস, নয়, বরং সময়ের আবর্তনে মৌলিক প্রেক্ষাপট নির্মাণ যে ইতিহাস চিহ্ন হয়ে ওঠে―সেটা ইতিহাস সচেতনতা নির্দেশ করে থাকে। ‘সমাজবদ্ধ মানুষের অতীত-আশ্রয়ী ও তথ্যনিষ্ঠ জীবনব্যাখ্যাই ইতিহাস।’ (অশীন দাশগুপ্ত, ১৯৮৯:১২)
একার্থে সমাজবদ্ধ মানুষের অতীত পর্যবেক্ষণই ইতিহাসের আলোক প্রক্ষেপ নজর এবং ইতিহাস সচেতনতার মাত্রিকতা ব্যক্তির শিল্পে ইতিহাসানুগ করে তোলে। কিন্তু এখানে স্মরণ রাখা জরুরি যে, Historical awareness is not the same thing as social memory. (John Tosh, 2002:2) ফলে ইতিহাস সচেতনতা বলতে শুধু সমাজের মনে রাখা বিষয়গুলোকে ধারণ করা নয়, বলা ভালো ইতিহাস সচেতনতা মূলত সামাজিক বোধের স্মরণীয়-বরণীয় নির্দিষ্টকরণ একটি মাইলফলক এবং এটি প্রতিদিন বা প্রতি মাস বা প্রতি বছর ঘটে না। Tradionalism is the crudest distortion of historical awareness, because it does away with the central nation of development overs time. (John Tosh, 2002:17) ইতিহাসের সচেতনতা তাই ইতিহাস নির্মাণের পথটিকেও নির্দেশ করে দেয়।
যাপিত জীবনের দৈনন্দিন অনুষঙ্গ ইতিহাস নয়, প্রাত্যহিক কর্মাদি জীবনের মাত্রাকে চিন্তনে ও মননে সাবলীল ও সহজ করে তোলে। কিন্তু ইতিহাস একটি নির্দিষ্ট সময়চিহ্ন নির্দেশক হয়ে ওঠে এবং সেটার ব্যবহার ব্যক্তিক জীবনে অনিবার্য এবং সেটা ব্যক্তির অভিপ্রায় কিংবা অনঅভিপ্রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ইতিহাসের উপাদান প্রতিনিয়ত পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ব্যবহার্যের অনিবার্য অংশ করে তোলে এবং ইতিহাসের ব্যবহার একার্থে ব্যক্তিক বোধকে সামষ্টিক করে তোলে। মূলত শিল্পে ইতিহাসের উপাদানের সংশ্লিষ্টতাই ইতিহাস নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠতার সমান্তরালে ইতিহাসের যথাযথ শৈল্পিক ও নান্দনিক ব্যবহার ইতিহাসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং কখনও কখনও ইতিহাসের সত্যাসত্য বিচারে ইতিহাস পুনর্লিখিতও হতে পারে। কথাসাহিত্যে মূলত উপন্যাস কাঠামোয় ইতিহাসের ব্যবহার লক্ষ্যণীয় এবং এ ব্যবহার সাধারণত বর্ণনরীতিতে ব্যবহারের মাত্রাই বেশি পরিলক্ষিত হয়। The Historical Narrative প্রবন্ধে ইতিহাসবিদ Peter Munz-এর বিখ্যাত লাইনটি স্মরণ করা যেতে পারে―‘…The Past as a jumble of events rather than a series of events. (Michael Bentley Ed. 2006:934) ফলে ইতিহাসের সত্যাসত্য উপাদানের নানাবিধ ঘটনার সমন্বিত রূপকে ঔপন্যাসিক শৈল্পিক ও নান্দনিক ভাষ্যে তুলে ধরেন।
চিন্তায় দূরদর্শিতা ব্যক্তিকে আক্ষরিক জগৎ থেকে ভাবজগতে নিয়ে যায় এবং কখনও কখনও ইতিহাসের নানাবিধ উপাদানকে প্রামাণ্য সহ্য বিবেচনা করা ইতিহাসের সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে থাকে। সাধারণত সময়ের নির্দিষ্ট ক্যানভাসে এবং নির্দিষ্ট সময় দূরত্বে ও পরিসর থেকে পরিমাপ ও পর্যবেক্ষণ না করলে ইতিহাসের উপাদানকেই ইতিহাসচিহ্ন বলে উপলব্ধ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখ এবং সময় উপযোগিতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সীমাবদ্ধতাকেই নির্দেশ করে। কারণ ব্যক্তিক চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও বর্তমানকেই প্রামাণ্য মনে করার আপামর যুক্তি প্রদান সে সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে। ঔপন্যাসিক ইতিহাসকে ধারণ করতে গেলে যেমন উপন্যাস হয়ে উঠবে না, আবার উপন্যাসে ইতিহাসের উপাদান যথাযথ, শৈল্পিক ও নান্দনিক না হয়ে উঠতে পারলে সেটি ব্যর্থ উপন্যাসে পর্যবসিত হয়। ঔপন্যাসিককে একই সাথে উপন্যাসে ইতিহাসের উপাদান ব্যবহারে গদ্যের বর্ণন ও প্রকৌশল… they would need to preserve at least some of the literary techniques that had made history a popular genre. the would need to remain adept at storytelling or, to use a somewhat fancier term, narrative. Sarah Maza (1996:1493) ফলে ঔপন্যাসিককে ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস রচনায় সব্যসাচী হয়ে উঠতে হয় গদ্যে ও বর্ণনে, নয়তো ইতিহাসের উপাদান ব্যবহারের সীমাবদ্ধতায় উপন্যাসটির শিল্পরূপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
পুরোনোকে পুনর্বিবেচনা করাই যদি ইতিহাস হয় সেখানে তত্ত্বই প্রামাণ্য হয়ে ওঠে। সাধারণত শিল্পে পুরোনো যে কোনও কিছুকে মূল্যায়নের প্রেক্ষাপট নির্মাণের ক্যানভাস হিসেবে গড়ে উঠতে দেখা যায়। ফলে সমসাময়িকতা শিল্পের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে এবং কখনও কখনও জনপ্রিয়তার শিখরেও পৌঁছায়। কিন্তু তত্ত্বাশ্রয়ী না হওয়ায় ইতিহাসকেন্দ্রিক বহু শিল্প বিলীন হয়ে গেছে―শুধু তত্ত্বই কি তবে চিরন্তন করে তোলে ? প্রশ্নটা তুললেই একার্থে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইতিহাসের উপাদানের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সাপেক্ষে সময়কে সুনির্দিষ্টকরণ এবং সেটার প্রয়োজনীয়তা যদি সার্বভৌম ও সর্বজনীন হয়ে ওঠে তখন সেটাই তত্ত্বাশ্রয়ে একটি মৌলিক নির্মাণ হয়ে ওঠে―শিল্প এবং ইতিহাসলগ্নতার যোগসূত্র এখানে নিহিত এবং তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা এবং তত্ত্বের গূঢ়ার্থ যেন নিহিতার্থের খোঁজে নতুন মাত্রা যুক্ত করে।
উপন্যাসের জন্ম মূলত নাটকগর্ভে এবং সংলাপনির্ভরতার মধ্য যে গল্প বলার শিল্পসূত্র লুকায়িত মূলত সেটার বিকাশে উপন্যাসের যাত্রা এবং কথাসাহিত্যের শাখা হিসেবে উপন্যাসের ইতিহাস প্রাচীন―যদিও বাংলা ভাষা উপন্যাসচর্চার ইতিহাস প্রায় সোয়া দুইশো বছরের (যদি ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে নিযুক্ত পণ্ডিতবৃন্দের [উইলিয়াম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪), মদনমোহন তর্কালঙ্কার (১৮১৭-১৮৫৮), গোলোকনাথ শর্মা] গদ্য বিকাশের ইতিহাসকে প্রামাণ্য মনে করলে)। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আধুনিক যুগ শুরু ১৮০১ সালে অন্যদিকে ইতিহাসচর্চায় আধুনিক যুগ ১৭৫৭ সালে। ইতিহাস ও সাহিত্য দুই চর্চার সময় পার্থক্যকে বিচার করা জরুরি। আবার মধ্যযুগের শেষ চল্লিশ বছর (১৭৬০-১৮০০) অন্ধকার যুগ বিবেচনাও অনেকটা একাডেমিক এপ্রোচ থেকে―যদিও এ বিতর্ক ভিন্ন বিষয়―কিন্তু এখানে এটা বিচার্য এ অর্থে যে ইতিহাসকেন্দ্রিক রচনা আধুনিক যুগে প্রবেশের দ্বার যেমন উন্মোচন করে তেমনি ইতিহাস চর্চার সাথে উপন্যাস চর্চার শিল্পসূত্রও নির্মাণ করে। উনিশ শতকের প্রথম ভাগে নকশাধর্মী রচনার প্রধান অনুষঙ্গ ইতিহাসচেতনা এবং বাস্তব সময়চিত্র নির্মাণে এসব নকশাধর্মী রচনাকেও তাত্ত্বিক দিক থেকে কাহিনিকাব্য-আখ্যান হিসেবে বাংলা উপন্যাসের প্রথম সূচনা হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। যেমন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) ও রমেশচন্দ্র দত্ত (১৮৪৮-১৯০৯); অধিকাংশ উপন্যাসের প্রধান বিষয় ইতিহাস নির্ভরতা। ‘বাংলা সাহিত্যের এক পর্বে ইতিহাস সংকলনের জন্য বঙ্কিমচন্দ্র যে প্রেরণা দিয়েছিলেন, তার পরবর্তী পরিবে তাতে শক্তি জোগালেন রবীন্দ্রনাথ।’ (প্রবোধচন্দ্র সেন, ১৩৬০: ৪০) ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা উপন্যাসের যাত্রা এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ অপরাপর ঔপন্যাসিকবৃন্দের অবদানে এ ধারাটি সমৃদ্ধ হয়েছে।
মুখের কথাই কি উপন্যাস নাকি লেখকের কথাই উপন্যাস
উইলিয়াম কেরিসহ অপরাপর পণ্ডিতগণ কথোপকথন (১৮০১) গ্রন্থে যেভাবে সংলাপনির্ভর চালচিত্র তুলে ধরেছেন এবং সেখান থেকে রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), কালীপ্রসন্ন সিংহসহ (১৮৪১-১৮৭০) অপরাপর লেখকবৃন্দ যেভাবে ইতিহাস নির্ভর সত্যাসত্য বাস্তবচিত্র উপস্থাপন করেছেন―নাটক গদ্য ও নকশায় সেটার শৈল্পিক ও নান্দনিক দিকটিকে বিবেচনায় রাখলে দ্বিতীয় ধাপের লেখকবৃন্দকে কথাচিত্রী দাবি করা যেতেই পারে, মতভেদে ঔপন্যাসিক। ফলে প্রথম ধাপের লেখকবৃন্দ মৌখিক সংলাপের চালচিত্র যা খণ্ডিত কিন্তু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রামাণ্য দলিল এবং বাংলা গদ্য বিকাশ ও নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের লেখকবৃন্দ ইতিহাসের উপাদান ব্যবহারে সচেষ্ট এবং তাঁরা ঔপন্যাসিক হিসেবে স্বীকৃত।
ইতিহাসনির্ভর যে কোনও রচনা পাঠকের মনকে আকৃষ্ট করে থাকে―মানুষ মাত্রই ধারাবাহিকতাপ্রিয়। একটার পর আরেকটা ঘটনার যোগসূত্র মিলিয়ে অবচেতন মন মূলত ঘটনা পরম্পরায় কাহিনির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত জানতে চায়―কিন্তু ইতিহাস এমন একটি আসপেক্ট যা স্পিন-অফস্পিন হয়ে রিভার্সও করে এবং এ কারণে হিস্ট্রি ‘রিপিটস ইটসেলফ’ যা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির যে তত্ত্ব সারা বিশ্বে জনপ্রিয় সেটাকেও সমর্থন করে। ফলে বাংলা উপন্যাসের ধারায় ঐতিহাসিক উপন্যাসের নির্মাণ কাঠামো ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নাকি কাহিনি কাঠামো দুটোর উপরই ভিত্তি এনেছে, বিশেষত উনিশ শতকের পুরোটা সময় ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে বজায় রেখেছে যেটি বিশ শতকের প্রথমার্ধে [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী (১৯১২-১৯৮২), সুবোধ ঘোষ (১৯০৯-১৯৮০), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), সতীনাথ ভাদুড়ি (১৯০৬-১৯৬৫), জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৯৭) সহ] অপরাপর ঔপন্যাসিকের উপন্যাসে বিদ্যমান এবং দ্বিতীয়ার্ধে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২), দেবেশ রায় (১৯৩৬-২০২০), মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬), কমলকুমার মজুমদার (১৯১৪-১৯৭৯), অমিয়ভূষণ মজুমদার (১৯১৮-২০০১)সহ অপরাপর ঔপন্যাসিকবৃন্দের রচনায় কাহিনি কাঠামোর ক্ষেত্রেও বিশেষ পরিচর্যার চিত্র উঠে এসেছে।
ইতিহাস সবসময় প্রমাণকে গুরুত্ব দেয়, বিস্ময়কে নয়। বিস্ময় মানুষকে মুগ্ধ করে―ইতিহাস মুগ্ধ করার বিষয় নয়, ইতিহাসবেত্তা নির্মোহ, ঔপন্যাসিক নির্মোহ নাও হতে পারেন। নির্মোহ হলে ইতিহাসের উপাদান যেমন সত্যাসত্যর নিরিখে নির্ণিত হয় তেমনি নির্মোহ ঔপন্যাসিক ইতিহাসের উপাদানকে যথাযথ ও শৈল্পিক করেই নির্মাণ করে থাকেন এবং সেটি নান্দনিক হয়ে উঠলে কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। উনিশ শতকের পূর্বে কবিতা ও প্রামাণ্য গদ্যে মতান্তরে কথাসাহিত্যে স্টোরি টেলিংই ভরসা ছিল―হিস্ট্রিওগ্রাফি ছিল না, ফলে ইতিহাস থাকলেও সে ইতিহাসের উপাদানকেন্দ্রিক শিল্পঋদ্ধতার প্রমাণ মেলে―কিন্তু উনিশ শতকের মধ্যভাগে ইউরোপের সাথে সাথে ভারতবর্ষে এবং বিশেষত বাংলা কথাসাহিত্যে উপন্যাস পূর্ব ঢংয়ে নকশায় ইতিহাসচর্চা শুরু হয়ে যায় এবং বিশ শতকে এটির পূর্ণতা পরিলক্ষিত হয়।
ঔপন্যাসিক কাহিনি ঘটনা প্লট চরিত্রের বর্গাকার এক ডাইমেনশন নির্মাণ করেন―বর্গক্ষেত্রর চারটি বিন্দুকে ছায়াবৃত্তের পরিধিস্থ মনে করলে―বর্গক্ষেত্রের অভ্যন্তরেও একটা ছায়াবৃত্ত নির্মাণ করা যায় এবং সেটার কেন্দ্রই মূলত বহিস্থ বৃত্তেরও কেন্দ্র―অপরদিকে বৃত্ত দুইটির পরিধির প্রথমটি উপন্যাসে ইতিহাসের অভ্যন্তরীণ নির্মাণকে নির্দেশ করে এবং বহিস্থ পরিধি ইতিহাসের বাহ্যিক রূপটি নির্মাণ করে―ব্যাসার্ধ এ দুই নির্মাণকে একত্র করে একটি ঐতিহাসিক বিন্দুতে পরিগণিত হয়―ইতিহাসে উপন্যাস এবং উপন্যাসে ইতিহাস শিরোনামের সাথে এ যুক্তি তর্কের সম্পূরক নির্মাণ ইতিহাস নির্ভরতাকে নির্দেশ করে―সেখানে নায়ক নির্মাণ থেকে অপরাপর চরিত্রের উপস্থিতি এবং কাহিনির ঋজুভাব, ঘটনার প্রক্ষেপণ এবং প্লটের বিন্যাস ইতিহাসের উপাদানগুলোকে সুসংহত করে তোলে।
বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের সূত্রপাত মূলত উনিশ শতকে। পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাব, জাতীয়তাবোধের উন্মেষ এবং অতীত ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ থেকে বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের ধারা গড়ে ওঠে এবং এ ধারার প্রধান উদ্দেশ্য মূলত ইতিহাসের ঘটনাকে কল্পনার শিল্পরূপে উপস্থাপন করা এবং জাতিসত্তার চেতনা জাগ্রত করা। বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসের সার্থক প্রবক্তা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত। তাঁর দুর্গেশনন্দিনী বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া রাজসিংহ, আনন্দমঠ ও সীতারাম-এ তিনি মুঘল যুগ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবোধকে শিল্পরূপ দিয়েছেন। তাঁর রচনায় ইতিহাস শুধু অতীতচর্চা হিসেবে না, বরং জাতীয় চেতনা নির্মাণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐতিহাসিক উপন্যাসকে ভিন্ন মাত্রা প্রদান করেন। তাঁর গোরা কিংবা ঘরে বাইরে-এ ইতিহাসের রাজনৈতিক ও মানবিক দিক গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষত স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রচেতনার দ্বন্দ্ব তিনি সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন। উপনিবেশের বাস্তব যে ছদ্মবাস্তব, রবীন্দ্রনাথের সংবেদনশীল কবিমন এই সত্য জেনেছিল বলেই স্বাধীন ও খণ্ডিত মানবসত্যের প্রকাশের তাগিদে তিনি উপন্যাসের নিহিত বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে দেখতে ও দেখাতে চেয়েছিলেন। (তপোধীর ভট্টাচার্য, ১৯৯৯: ১৮) শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসকে শিল্পসৌন্দর্য ও গবেষণামূলক গভীরতায় সমৃদ্ধ করেন। তাঁর তুঙ্গভদ্রার তীরে, কালের মন্দিরা ও গৌড়মল্লার-এ মধ্যযুগীয় ভারত ও বাংলার ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তিনি ইতিহাসের তথ্যনিষ্ঠতার সঙ্গে রোমান্স ও মানবিক আবেগের সমন্বয় ঘটান। বিশ শতকে এসে বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাস নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দেশভাগের বেদনা, উদ্বাস্তু জীবন এবং জাতিগত সংকটকে কেন্দ্র করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচনা করেন পূর্ব-পশ্চিম ও প্রথম আলো। এসব উপন্যাসে দেশভাগ, বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশি আন্দোলন এবং বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাস বহুমাত্রিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন ভাষা আন্দোলনের আবেগ, আত্মত্যাগ ও জাতীয় চেতনাকে শিল্পিতভাবে ধারণ করেছে। ভাষার অধিকারের সংগ্রাম এখান থেকে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করে। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড, হুমায়ূন আহমেদের জোছনা ও জননীর গল্প এবং জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি-এ মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, আত্মত্যাগ ও জাতীয় মুক্তির ইতিহাস গভীর মানবিকতায় চিত্রিত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবোধ, শরদিন্দুর ইতিহাসনিষ্ঠ শিল্পরূপ, দেশভাগের ট্র্যাজেডি, ভাষা আন্দোলনের আত্মপরিচয় এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা অতিক্রম করে এক সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক ধারায় পরিণত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক উপন্যাস: বিষয় ও যুগভিত্তিক তালিকা
১.ঔপনিবেশিক ও নবজাগরণভিত্তিক উপন্যাস
আনন্দমঠ―বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ও ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপট রচিত।)
রাজসিংহ―বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(মুঘল-রাজপুত দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে রচিত।)
সেই সময়―সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
(উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণ, বিদ্যাসাগর-রামমোহনের সময় নিয়ে রচিত।)
প্রথম আলো―সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
(বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশি আন্দোলন ও বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণ নিয়ে রচিত।)
২. মুঘল ও মধ্যযুগভিত্তিক ঐতিহাসিক উপন্যাস
তুঙ্গভদ্রার তীরে―শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
(বিজয়নগর সাম্রাজ্য ও দক্ষিণ ভারতের ইতিহাস নিয়ে রচিত।)
কালের মন্দিরা―শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
(প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ও রাজনীতি নিয়ে রচিত।)
গৌড়মল্লার―শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
(বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে রচিত।)
দুর্গেশনন্দিনী―বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(মুঘল-পাঠান সংঘাতের ঐতিহাসিক পটভূমি নিয়ে রচিত।)
৩. কৃষকবিদ্রোহ ও সমাজ-ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস
ইছামতী―বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
(নীলকর শোষণ ও গ্রামীণ বাংলার সমাজবাস্তবতা নিয়ে রচিত।)
নীল ভূঁইয়া―অমিয়ভূষণ মজুমদার
(ঔপনিবেশিক সমাজ ও কৃষকজীবনের সংকট।)
ঝাঁসির রাণী―মহাশ্বেতা দেবী
(১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ও রানি লক্ষ্মীবাইয়ের সংগ্রাম নিয়ে রচিত।)
৪. দেশভাগ ও রাজনৈতিক ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস
পূর্ব-পশ্চিম―সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
(দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে রচিত।)
খোয়াবনামা―আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
(তেভাগা আন্দোলন, কৃষকজীবন ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে রচিত।)
চিলেকোঠার সেপাই―আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
(১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও পূর্ববাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে রচিত।)
৫. ভাষা আন্দোলনভিত্তিক উপন্যাস
আরেক ফাল্গুন―জহির রায়হান
(১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আবহ, তরুণদের চেতনা ও রাজনৈতিক জাগরণ এ উপন্যাসের মূল বিষয়।)
চিলেকোঠার সেপাই―আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
(যদিও মূল প্রেক্ষাপট ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, তবু ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এতে গভীরভাবে উপস্থিত রয়েছে।)
সূর্য দীঘল বাড়ী―আবু ইসহাক
(দেশভাগ-উত্তর পূর্ববাংলার সামাজিক সংকটের মধ্যে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।)
৬. মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক উপন্যাস
একাত্তরের দিনগুলি―জাহানারা ইমাম
(মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপিনির্ভর ঐতিহাসিক দলিলধর্মী রচনা।)
হাঙর নদী গ্রেনেড―সেলিনা হোসেন
(মুক্তিযুদ্ধ ও আত্মত্যাগের কাহিনি নিয়ে রচিত)
জোছনা ও জননীর গল্প―হুমায়ূন আহমেদ
(মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।)
বাংলা কথাসাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস বা ইতিহাসনির্ভর উপন্যাসের তালিকা বর্তমান অবধি বেশ দীর্ঘ এবং সেটার মাত্রিকতা বিশ্লেষণের জন্যে যে সময়ের ক্যানভাস ও চিন্তার নিরপেক্ষতা এবং অভিজ্ঞতাজাত নানাবিধ অভিক্ষেপে সময়ের দূরত্ব নির্দেশ জরুরি―নয়তো ব্যক্তিক প্রভাব, পরিবেশ-প্রতিবেশের অনুঘটকে অনেক শিল্পকেই মহৎ ও উকৃষ্ট দাবি করার নিদর্শন যেমন অহরহ ঘটেছে তেমনি সময়ের আবর্তনে সে সব রচনার শিল্পগুণ বিচারে এবং সময়ের নির্মম মূল্যায়নে সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়েও গেছে। উপন্যাসে ইতিহাস প্রসঙ্গ যেমন উপাদানের মাত্রা ছাড়িয়ে উপন্যাসকে ঋদ্ধ করেছে তেমনি ইতিহাসের উপন্যাস কথাসাহিত্যের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং সম্পূরক বিষয়ে বৈপরীত্য নয় বরং শিল্পকাঠামো হিসেবে উপন্যাস যেমন জনপ্রিয় ধারা এবং এর প্রভাব সহসাই সমাজের নানা স্তরে স্পষ্ট ছাপ ফেলে এবং ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস পাঠককে আরও বেশি সমৃদ্ধতর পাঠের দিকে ধাবিত করে। নিমগ্ন ও নিভৃতচারী পাঠকের টেবিলে কিংবা ভ্রমণে হাতে উপন্যাস যেমন শোভা পায় তেমনি বাংলা কথাসাহিত্যে ইতিহাসনির্ভর উপন্যাসের ধারা বিশ্বসাহিত্যের ধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যে যোগসূত্র তৈরি করে সেটি হয়ে ওঠে আঞ্চলিক থেকে বৈশ্বিক।
টীকা:
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ:
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা ১৮০০ সালে ভারতের কলকাতায় লর্ড ওয়েলেসলির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নবনিযুক্ত কর্মচারীদের ভারতীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ কলেজকে কেন্দ্র করে বাংলা গদ্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ শুরু হয়। বাংলা ভাষাকে সহজ, প্রমিত ও শিক্ষাপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য এখানে বহু গ্রন্থ রচিত ও অনূদিত হয় এবং এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তÑউইলিয়াম কেরি, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু প্রমুখ পণ্ডিত ও সাহিত্যিক। তাঁদের রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ বাংলা গদ্যের বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। বাংলা নবজাগরণের প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণেও এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
নকশাধর্মী রচনা:
নকশাধর্মী রচনা বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ গদ্যধারা, যেখানে সমাজজীবনের অসঙ্গতি, কুসংস্কার, ভণ্ডামি, অনাচার কিংবা মানুষের দৈনন্দিন আচরণকে ব্যঙ্গ, কৌতুক ও তীক্ষè পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় এবং এ ধরনের রচনায় বাস্তব জীবনের চিত্রকে কখনও হাস্যরসাত্মক, কখনও বিদ্রƒপাত্মক এবং কখনও সমালোচনামূলক ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়। ‘নকশা’ শব্দের অর্থ রূপরেখা বা চিত্র। সাহিত্যিক অর্থে নকশাধর্মী রচনায় সমাজের কোনও বিশেষ দিকের সংক্ষিপ্ত অথচ জীবন্ত চিত্র অঙ্কিত হয়। এতে কাহিনির চেয়ে সমাজ-পর্যবেক্ষণ ও চরিত্রচিত্রণ বেশি গুরুত্ব পায়। ভাষা সাধারণত সহজ, প্রাঞ্জল ও রসময় হয়ে থাকে। বাংলা সাহিত্যে নকশাধর্মী রচনার বিকাশ ঘটে উনিশ শতকে। কালীপ্রসন্ন সিংহ রচিত হুতোম প্যাঁচার নকশা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নকশাধর্মী গ্রন্থ। এতে সমকালীন কলকাতার সমাজজীবন, বাবু সংস্কৃতি, সামাজিক অবক্ষয় ও নগরজীবনের বিচিত্র দিক ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে চিত্রিত হয়েছে। নকশাধর্মী রচনা যেমন সাহিত্যিক বিনোদনের মাধ্যম, তেমনি এটি সমাজসমালোচনা ও সময়চেতনারও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
রচনাপঞ্জি:
অশীন দাশগুপ্ত (১৯৮৯) ইতিহাস ও সাহিত্য, আনন্দ পাবলিশার্স লিমিটেড, কলকাতা
তপোধীর ভট্টাচার্য (১৯৯৯) উপন্যাসের প্রতিবেদন, র্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, কলকাতা
প্রবোধচন্দ্র সেন (১৩৬০), বাংলার ইতিহাস-সাধনা, জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাব্লিশার্স লিমিটেড, কলকাতা
দেবেশ রায় (২০০৯), উপন্যাস নিয়ে, দে’জ পাবলিশিং হাউজ, কলকাতা
John Tosh (2002) The Pursuits of History, Longman, London
Michael Bentley (Ed.) (2006) Companion to Historiography, Routledge, London & New York
Sarah Maza (1996) Stories in history: Cultural Narratives in Recent Works in European History, American Historical Review, Boston
Marnie Hughes-Warrington (2019) History as wonder: Beginning with Historiography, Routledge, London & New York
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



