Uncategorized

বইকথা : সুরঞ্জন মিদ্দের ব্যতিক্রমী মাইকেলচর্চা : সঞ্জীব মান্না

কলকাতার ‘দিয়া পাবলিকেশন’ থেকে প্রকাশিত সুরঞ্জন মিদ্দে সম্পাদিত একটি গ্রন্থ হাতে এসেছিল বেশ কিছু মাস আগে। বহু তথ্য ও ভাবনা সমৃদ্ধ গ্রন্থটি পড়ে শেষ করতে অনেকটা সময় লাগল। নাম―ব্যতিক্রমী মাইকেলচর্চা। ২০২৪-এর জানুয়ারি মাসে বইটি প্রকাশিত হয়। পনেরো ফর্মার কিছু বেশি পৃষ্ঠাযুক্ত এই গ্রন্থটির প্রচ্ছদে আছে পোস্টকার্ডের ফ্রেমে মধুসূদনের তরুণ বয়সের ছবি। আপনারা জানেন এই ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে মাইকেল মধুসূদনের জন্ম-দ্বিশতবর্ষ উদ্যাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। অন্তর্জালে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে সে খবর প্রায় সকলেরই জানা। মাইকেলকে নিয়ে অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সফল সেমিনারও হয়েছে। ফলে অধ্যাপক মিদ্দের এই গ্রন্থ সময়ানুসারী একটি স্বাভাবিক প্রয়াস। কিন্তু নামকরণ এরকম কেন ? ব্যতিক্রমী মাইকেলচর্চা। সে কথাই আলোচিত হবে প্রাসঙ্গিকভাবে।

সাহিত্যের সারস্বত সাধনায় অধ্যাপক মিদ্দে পরিচিত নাম। তিনি সাঁওতাল ও মিশনারি, ডেভিড ম্যাককাচ্চন চর্চা, ফাদার দ্যতিয়েন চর্চা, কেরী ও বঙ্গসংস্কৃতি, বাইবেল ও বাংলা সাহিত্য, দোম আন্তনিও ইত্যাদি বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। সেই সৃজন-পাখায় এই নতুন পালক ব্যতিক্রমী মাইকেলচর্চা।

অধ্যাপক মিদ্দে এই গ্রন্থে মাইকেলচর্চাকে পাঁচটি স্বতন্ত্র ভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হলো যথাক্রমে―‘মহাকবি ও মহাকাব্য’, ‘বহুমাত্রিক মাইকেল’, ‘মহাকবির সৃজনধারা’, ‘দুই বাংলার মধুচর্চা’ এবং ‘বিশেষ সংযোজন’। অর্থাৎ এই গ্রন্থে তিনি বহু দৃষ্টিকোণ থেকে মধুসূদনকে দেখেছেন। 

মাইকেলচর্চা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকে। সেই ধারা আজও প্রবহমান। এই গ্রন্থের সম্পাদক মধুসূদনের সেই বিস্তৃত সৃজনকে আলোচনায় ধরার চেষ্টা করেছেন। সেখানে প্রতিটি ধারায় ভারত ও বাংলাদেশের প্রবীণ থেকে নবীন আলোচকদের লেখাকে তিনি একত্রীভূত করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, কবি ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসু, মাইকেল জীবনী-প্রণেতা অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ, অধ্যাপক রামবহাল তেওয়ারী, অধ্যাপক ক্লিনটন বি. সিলি, অধ্যাপক উইলিয়াম রাদিচে, সাহিত্যিক মোবাশ্বের আলী, অধ্যাপক অলোক রায়, পত্রিকা-সম্পাদক সাগরময় ঘোষ, গবেষক ও গ্রন্থ-প্রণেতা সুশীল সাহা, অধ্যাপক সুরঞ্জন মিদ্দে, মধুসূদন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা খসরু পারভেজ প্রমুখ এই গ্রন্থের প্রবীণ প্রতিষ্ঠিত আলোচক। আর নবীন আলোচকদের মধ্যে আছেন―অধ্যাপক গণেশ হেমব্রম, অধ্যাপক সঞ্জীব হাসদা, অধ্যাপক সোনা মণ্ডল প্রমুখ। পাশাপাশি গবেষক হিসেবে লেখার সুযোগ পেয়েছেন―ইমদাদুল হক লায়েক, নীলাঞ্জন হালদার প্রমুখ। বিশেষভাবে নাম করতে হয় অনুবাদক সুহৃদ সরকার এবং রেজাউল হক রেজার। তাঁরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ মধুসূদন-বিষয়ক প্রবন্ধের বঙ্গানুবাদ করে দিয়ে বঙ্গভাষী পাঠকের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। প্রতিটি প্রবন্ধের শেষে প্রাবন্ধিকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছেন সম্পাদক। অধ্যাপক মিদ্দে তাঁর গ্রন্থে এভাবেই পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সঙ্গে নতুন লেখকদের প্রাবন্ধিক হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেন বারবার। এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফলে সামগ্রিক পরিকল্পনায় একটি ব্যতিক্রমী উপস্থাপনশৈলী দেখা গিয়েছে এই গ্রন্থে।

কেন ব্যতিক্রমী সে সম্পর্কে সম্পাদকের স্পষ্ট কৈফিয়ত, “সামনে আনা হয়েছে, ‘দেশি-বিদেশি’ মাইকেল প্রেমীদের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার আকর গ্রন্থ। সেই সঙ্গে মাইকেল জীবনীর প্রায় সব দিক―সাগরদাঁড়ি থেকে বিশপ কলেজ, মাদ্রাজ, ইউরোপসহ পুরুলিয়া পর্ব পর্যন্ত। সামনে আনা হয়েছে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে মাইকেলচর্চার দিগ¦লয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ― একেবারে নতুন মাইকেল সামনে এসেছে।

“আমরা ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ পুরো নামটাই ব্যবহারের পক্ষপাতী। সংক্ষেপে ‘মাইকেল’। দু-রকম বানান ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন বানান ও মাইকেল ব্যবহৃত পুরোনো বানান।”

প্রথম ভাগ ‘মহাকবি ও মহাকাব্য’। এখানে বিশ্বসাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ভাষায় মাইকেলচর্চাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সুবোধ সান্যালকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠি দিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা, যেখানে মেঘনাদবধ কাব্য-র বিরূপ সমালোচনার জন্য তিনি অনুতাপ প্রকাশ করেছিলেন। সমকালে বৃত্রসংহার কাব্য-র অত্যধিক জনপ্রিয়তাই এই বিরুদ্ধ সমালোচনার একটি অন্যতম কারণ বলে আমাদের মনে হয়। এই সংকলন-গ্রন্থের সম্পাদক সচেতনভাবেই সেই প্রবন্ধটি দেননি; পরিবর্তে তিনি রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের সমালোচনার মধ্যে প্রাসঙ্গিক মেঘনাদবধ কাব্য-এর সুখ্যাত সমালোচনাগুলোকে তুলে দিয়েছেন। সম্ভবত বহুচর্চিত নয় বলেই সম্পাদক এই ব্যতিক্রমী উদ্ধৃতিগুলো তুলে এনেছেন। বহু ধরনের প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মধুসূদন। সেই বহু কোণকে ছুঁতে চেয়েছেন এই গ্রন্থের সম্পাদক। ফলে বিশ্বসাহিত্যে ও প্রাদেশিক ভাবনায় মধুসূদনের অবস্থানকে দেখার চেষ্টা আছে ‘মহাকবি ও মহাকাব্য’ শীর্ষক অংশে।

‘বহুমাত্রিক মাইকেল’ নামের অংশটি বিশেষভাবে পাঠের দাবি রাখে। আলোচ্য বিষয়গুলি সবই প্রায় ব্যতিক্রমী। যেমন, ‘সাংবাদিক মাইকেল’, ‘মাইকেলের বিচিত্র ধারার গান’, ‘গ্রন্থোৎসর্গপত্র: মাইকেলই পথিকৃৎ’, ‘ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে ছিলেন মধুকবি’ ইত্যাদি। এইসব দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এতদিন মধুসূদনকে পাঠ করিনি। সম্পাদক এসব ভাবিয়েছেন আমাদের। কৃতী-গবেষকগণ অনুপুঙ্খ আলোচনা করে আমাদের শ্রদ্ধাভাজন হয়েছেন নিঃসন্দেহে। বিস্তৃত রচনার পরিচয় পাই ‘মহাকবির সৃজনধারা’ শীর্ষক আলোচনা অংশে। ব্যক্তি মধুসূদন সম্পর্কে দুটি আলোচনা বিশেষভাবে পাঠের দাবি রাখে, একটি ‘বিশপ কলেজ ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ এবং ‘মাইকেলের পুরুলিয়া পর্ব’। দুটি রচনাই অধ্যাপক মিদ্দের। তানভীর দুলালের ‘মধুসূদনের মানসকন্যারা’ এবং নীলিমা ইব্রাহিমের লেখা ‘রাবণ: মধুসূদনের মানসপুত্র’ দুটি প্রবন্ধই পাঠকের বিশেষ প্রাপ্তি হতে পারে।

চতুর্থ ভাগের নাম―‘দুই বাংলার মধুচর্চা’। দুটি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে এই অংশে। ভারত ও বাংলাদেশে যখন একযোগে মধু-স্মরণ করেছে এই দুশো বছরের সন্ধিক্ষণে, এই সময়পর্বে তাই মধুসূদনের জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে একাধিক উপন্যাস। মঞ্চনাটক ও শ্রুতিনাটকে কথার পাশাপাশি সুরও সংযোজিত হচ্ছে। পাঠক ও দর্শক একাত্ম হতে চাইছেন মধুসূদনের সঙ্গে। সেসব অনুপুঙ্খ তথ্যে সমৃদ্ধ এই অংশটি। পাশাপাশি বাংলাদেশের ‘মধুমেলা’ নামক একটি সাংস্কৃতিক মেলারও খবর দিয়েছেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মহাম্মদ বিলায়েত হোসেন। সম্পাদককে পাঠক হিসেবে ধন্যবাদ জানাতেই হবে, কারণ প্রয়োজন হলে আধিকারিককেও তিনি লেখক বানিয়ে তোলেন তাঁর অমোঘ আবদারে। 

গ্রন্থের শেষ ভাগের নাম ‘বিশেষ সংযোজন’। দুটি প্রবন্ধে সমৃদ্ধ এই অংশটি। দেশ পত্রিকার বিশিষ্ট সম্পাদক সাগরময় ঘোষ লিখেছেন মধুসূদনের বাসগৃহ ৬ নম্বর লোয়ার চিৎপুর রোডের বাড়িটি নিয়ে। এখানে বসে মধুসূদন তাঁর অমর কীর্তিগুলো রচনা করেছিলেন। সেই বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণের কথা উত্থাপন করেছেন প্রথম প্রাবন্ধিক। আর দ্বিতীয় প্রবন্ধে বাংলাদেশে বিশিষ্ট গবেষক খসরু পারভেজ মধুসূদনের পূর্বপুরুষের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন ইতিহাসকারের দৃষ্টিতে। 

সামগ্রিক গ্রন্থপাঠে আমাদের মনে হয় যে, এই গ্রন্থ যে-কোনও মধুসূদন-গবেষকের অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠবে অচিরেই। গ্রন্থপ্রণেতা অধ্যাপক মিদ্দে এভাবে আমাদের মিলিয়ে দিয়েছেন দুই দেশের মধ্যে। তবে দু একটি কথা না বললেই নয়।

এক. সম্পাদনা মাত্রেই বিড়ম্বনা। অনেকের লেখা একসঙ্গে করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশ করতে হয়।  অনেক প্রবন্ধ যথাসময়ে না পেলে বা যথাযথ লেখাটি না হলে প্রকাশের সময় মেনে সেইসব লেখা সম্পাদককে নিজেই লিখে দিতে হয়। এক্ষেত্রে অধ্যাপক মিদ্দে পাঁচটি প্রবন্ধ নিজেই লিখেছেন। বিষয়গুলো আলাদা হলেও আরও কিছুকাল পূর্বে গ্রন্থের উদ্যোগ নিলে নতুন গবেষকরা লেখার সুযোগ পেতেন। 

দুই. মধুসূদনের কবিপ্রতিভা নিয়ে আমাদের কোনও সংশয় নেই; কিন্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত-বাংলাদেশের সাহিত্যের পাঠক হিসেবে আমরা দেখতে পাই, মধুসূদনের রচনায় পাশ্চাত্যের অতি-অনুসরণ লক্ষ্যণীয়ভাবে উপস্থিত। তিনি পাশ্চাত্য-প্রকরণের অনুকরণ করতে গিয়ে আমাদের নিজস্ব দেশজ-প্রকরণকে যেভাবে নস্যাৎ করেছেন তা আমাদের ব্যথিত করে। ‘অলীক কুনাট্য’ শব্দবন্ধে উত্তর-আধুনিকতার তীব্র আপত্তি থাকবে। সময়ের দাবি সম্ভবত তা-ই ছিল। প্রতিভাবান মধুসূদন নিমিত্ত মাত্র। আশা করি এই বিষয়েও এই গ্রন্থের পরবর্তী সংস্করণে কিছু ভালো প্রবন্ধ সংযোজিত হবে।

অধ্যাপক সুরঞ্জন মিদ্দে ব্যতিক্রমী বিদ্যাসাগর নামেও একটি বই সদ্য সম্পাদনা করেছেন। পাঠের আশায় থাকল তাঁর পাঠক। দীর্ঘজীবী হোক সম্পাদকের কলম।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button