আর্কাইভসাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার : ‘যে জাতির ভাষায় শৃঙ্খলা নাই সে জাতির চিন্তাতেও শৃঙ্খলা নাই’ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

[বরেণ্য সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদক। তিনি দেশে-বিদেশে একাধারে কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, শিল্প-সমালোচক ও সমাজচিন্তক হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই : থাকা না-থাকার গল্প, প্রেম ও প্রার্থনার গল্প, একাত্তর ও অন্যান্য গল্প, কানাগলির মানুষেরা, তিন পর্বের জীবন, অলস দিনের হাওয়া, রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্পপ্রসঙ্গ ইত্যাদি।

২০১৮ সালের ১৭ মে দুপুর একটায় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের ক্যাম্পাসে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নিজস্ব কামরায় এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়। সাক্ষাৎকারটি লিখিত রূপ দেবার পর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নিজে তা সংশোধন করে পাঠান। এটি সেই সংশোধিত ও পরিমার্জিত রূপ। সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ওবায়েদ আকাশ।]

প্রশ্ন : আপনার একটি পছন্দের বিষয় দিয়ে শুরু করি। আপনি আপনার পিএইচডি থিসিসের জন্য বেছে নিয়েছিলেন ইয়েটসের কবিতায় ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের প্রভাব। ওই বয়সে এমন একটা বিষয় বেছে নেবার কারণ কী ছিল ?

উত্তর : এটা আমাকে বেছে নিতে হয়েছিল। আমি প্রথম চিন্তা করেছিলাম শেক্সপিয়র নিয়ে পিএইচডি করব। এরকমই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু যিনি আমাকে প্রায় দখল করে নিলেন, তিনি হলেন প্রফেসর নরম্যান ম্যাকেঞ্জি। ইয়েটসের ওপর বই লিখেছেন, হপকিন্সের ওপরও লিখেছেন। তিনি আধুনিক ইউরোপীয় কবিতা পড়াতেন। আমি তাঁর ক্লাসে খুব ভালো ফল করেছিলাম। হয়তো এ-কারণেই তিনি ভাবলেন, আমার যেহেতু উৎসাহ আছে ইয়েটসের কবিতায়, তাঁর সঙ্গে পিএইচডি করা যাবে। তাতে আমার কতগুলি লাভ হয়েছিল। যিনি শেক্সপিয়ার পড়াতেন, তিনি কিছুটা উড়নচণ্ডী মানুষ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে পিএইচডি করতে গিয়ে আমার এক বন্ধু তো প্রায় দুই বছর হারিয়ে ফেলল। আর আমি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি রেখে গিয়েছি; ফিরে যেতে হবে। ইয়েটসের কবিতা পড়ে, তাঁর দুটি উপন্যাস, আত্মস্মৃতি অন্যান্য লেখালেখি পড়ে, আর তাঁর দর্শনের বই, আ ভিশন পড়ে আমার মনে হলো, ইয়েটসের ওপর পিএইচডি করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ইয়েটসের কবিতা পড়েছি। আমার সুপারভাইজার বললেন, বিষয়টা হতে পারে ইয়েটস-এর কবিতার ওপর ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের প্রভাব। সুইডেনবার্গ সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। নিউ ইয়র্কে সুইডেনবার্গ সোসাইটি আছে। সেখানে গেলাম। আয়ারল্যান্ডে ইয়েটস সামার স্কুলে গেলাম। তাঁরই উদ্যোগে। সুইডেনবার্গ সোসাইটি আমাকে বইপত্র দিল, নানা সহযোগিতা করল।

প্রশ্ন : কাজ করতে গিয়ে আপনি কী দেখলেন ? আসলে কি ইয়েটসের কবিতায় ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের দর্শনের প্রভাব আছে ?

উত্তর : অবশ্যই। অনেক বড় প্রভাব পড়েছে। কারণ ইয়েটসের দর্শনের বইটা পড়ে এবং অন্যান্য কিছু লেখা পড়ে মনে হলো, তাঁর চিন্তাভাবনা অনেকটা সুইডেনবার্গ দ্বারা প্রভাবিত। তাঁর কবিতায় আধ্যাত্মিক নানা বিষয়কে তিনি তুলে ধরেছেন, এগুলোর উৎসটা অনেক সময় চিহ্নিত করা যায় না। আমি সেই উৎসগুলি চিহ্নিত করতে শুরু করি। ইয়েটস যে সব বই পড়েছেন, তার একটা তালিকা ড. ম্যাকেঞ্জি আমাকে দিলেন। তিনি সেসব বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠার ফ্যাক্সিমিলি কপিও জোগাড় করেছিলেন। যেগুলোর মার্জিনে ইয়েটস-এর মন্তব্য লেখা ছিল। জন্ম-পুনর্জন্মের বিষয়টি ইয়েটস সুইডেনবার্গ থেকে নিয়েছেন।

প্রশ্ন : আপনি বললেন যে, এই বিষয়টা আপনাকে নিতে হয়েছে, বা আপনি নিতে বাধ্য হয়েছেন। যদি আপনাকে স্বাধীনভাবে বিষয় নির্বাচনের কথা বলা হতো, তাহলে আপনি কোন বিষয়টা বেছে নিতেন ?

উত্তর : স্বাধীনভাবে বেছে নিতে বললে আমি শেক্সপিয়রকে নিতাম। আর যদি কোনও কবিকে বেছে নিতে বলা হতো তাহলে আমি টি এস এলিয়টকেই বেছে নিতাম।

প্রশ্ন : এলিয়ট কেন বেছে নিতেন ?

উত্তর : কারণ আমি তাঁর কবিতায় প্রাচ্যকে নিয়ে কিছু অতিরঞ্জন দেখতে পেয়েছি। তিনি তাঁর ওয়েস্ট ল্যান্ডে আত্মিক শুদ্ধতার জন্য প্রাচ্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। অথচ প্রাচ্য নিয়ে তাঁর ধারণাটা ছিল সীমাবদ্ধ। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড হলো যে বছর, যার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাইট উপাধি বিসর্জন দিলেন, ওই সময়ে ইংল্যান্ডের পত্রপত্রিকা ঘেঁটে আমি দেখেছি, বেশ লেখালেখি হয়েছে। প্রথম পৃষ্ঠাতেও খবরটি এসেছে। কিন্তু এলিয়ট অথবা ইয়েটস, এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেননি। তাঁরা পুবকে দেখেছেন পশ্চিমের কাচ দিয়ে। এডওয়ার্ড সাঈদ যে অরিয়েন্টালিজমের কথা বলেছেন, আমি সেরকম কিছু চিন্তা করেছি। কানাডা যাবার আগে আমার মনে হয়েছিল, এলিয়টের ফোর কোয়ার্টেটসের কিছু চিন্তা, ওয়েস্ট ল্যান্ডের কিছু চিন্তা নিয়ে আরও তদন্ত করা যায়। এগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়।

প্রশ্ন : আমাদের দেশের বাম ধারার অনেকেই কিন্তু এলিয়টকে খুব একটা পছন্দ করেন না।

উত্তর : আমি কোনও কবিকে পন্থা দিয়ে বিচার করি না। তাহলে তো এজরা পাউন্ড পড়ার কোনও কারণ নেই। তিনি তো ফ্যাসিবাদে বিশ্বাস করতেন। মুসোলিনিকে পছন্দ করতেন। তারপর যেমন আমাদের নকশালপন্থিরা রবীন্দ্রনাথকে সহ্য করতে পারতেন না। আমার কথা হলো আমার একটা রাজনৈতিক মতবাদ থাকতে পারে। কিন্তু অন্যান্য―এমনকি বিপরীত মতবাদকেও―খোলা মন নিয়ে দেখতে হবে। আর আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস যদি এতই দুর্বল হয় যে একজনের কবিতা পড়ে আমি প্রভাবিত হয়ে তা ভুলে যাব, তাহলে কী-ইবা বলা যায়! আমি অনেক বড় বড় মার্কসবাদী দেখেছি―আমার এক শিক্ষক ছিলেন কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে, অনেক বড় মার্কসবাদী―তাঁরা তো বিচিত্র ধরনের সব বই পড়তেন। পড়লেই কি বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হতে হবে ?

মার্কসবাদের একটা বড় চিন্তা হচ্ছে মানুষের বিবর্তন, অর্থনৈতিক বিবর্তন। সমাজ ব্যবস্থায় কীভাবে মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হলো, পুঁজিবাদ কীভাবে আমাদের চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করল―এই চিন্তাগুলি তো সবসময়ই সচল। এগুলো নিয়ে তো আমরা অনেকেই ভাবছি। মার্কসবাদ হচ্ছে সক্রিয়তার একটি তত্ত্ব। সেই তত্ত্ব যদি আমি গ্রহণ করি, তাহলে তো আমাকে সক্রিয় থাকতে হবে। তারপরও আমার চিন্তার জায়গায় আমি নানা কিছু গ্রহণ করব। আমি যদি একশটা বই পড়ে আমার মনটা তৈরি করি, পাঁচটা বই পড়ে যে তার মনটাকে তৈরি করেছে, তার চেয়ে নিশ্চয় তা কিছুটা বেশি সমৃদ্ধ হবে। সেই সমৃদ্ধি থাকলে মার্কসবাদকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারি আমরা। কারণ দুটো জিনিস সংক্ষেপে বলি―মার্কস যে-বেইজ বা অর্থনৈতিক ভিত্তির কথা বলেছেন, সেই ভিত্তিটাই তো এখন বদলে গেছে। এখন তো রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কারা এটা করছে আমরা জানি না। আমাদের দেশের কলকারখানার পুঁজি কোথা থেকে আসে, তাদের মালিক কোথায় থাকেন, তাদের আমরা সবসময় দেখতে পাই না, আমরা জানি না। তো এই যে ব্যক্তি, মালিক, পুঁজি―এদের সঙ্গে শ্রমের যে সম্পর্ক, সেটিই তো পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এখন পৃথিবীটা তথ্যের, এখন ক্ষমতার উৎস হচ্ছে তথ্য। মার্কসের সময় তো সেটা ছিল না। ফলে মার্কসবাদের যদি কোনও কিছু বিবর্তন হয়, তাহলে তার চলমান ইতিহাসটা আমাকে বুঝতে হবে।

প্রশ্ন : এটাকে মার্কসবাদের প্রতি এক ধরনের অবিচার বলা যায়।

উত্তর : এই যে আমি এলিয়টের কথা বললাম, জালিয়ানওয়ালাবাগ নিয়ে কেন ভাবেননি, কেন তিনি ঔপনিবেশিক চিন্তার মধ্যে নিজেকে স্থাপন করে চুপচাপ ছিলেন ? কারণটাই হচ্ছে পুঁজিবাদী সমাজের প্রভাব। ওই সমাজের প্রভাবে পড়ে তিনি ভুলে গেলেন, ভারতে যে অনেক মানুষকে মারা হলো, তার প্রতিবাদ করা তারও দায়িত্ব। আমি যদি মার্কস ভালোভাবে পড়ি, তাহলে তো আমি তাঁর চিন্তাগুলি এলিয়টকে বুঝতেও ব্যবহার করতে পারি। একটা ক্রিটিকও লিখতে পারি।

প্রশ্ন : আপনি প্রচুর কবিতা পড়েন এবং কবিতার প্রতি আপনার আগ্রহ প্রবল মনে হয়। অথচ আপনি লেখেন কথাসাহিত্য। আপনার শুরুটা কোন মাধ্যমের লেখালেখি দিয়ে ছিল ?

উত্তর : আমি কবিতা দিয়েই শুরু করেছিলাম। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, আমার বন্ধু হেলাল হাফিজ, মাহমুদ এবং আরও অনেকে কবিতা লিখতাম। তখন তো ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশ থেকে সংকলন বের হতো। তেমন একটা সংকলনে একটা কবিতা ছাপা হলে আমার বন্ধুরা বলল, বেশ ভালোই তো। আমার মনে হলো কবিতা লেখা যায়। এভাবে তিনটি কবিতা তিনটা বড় জার্নালে ছাপা হলো। এর একটি সমকাল-এ। দুটো কবিতা নিয়ে গিয়েছিলাম সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরের কাছে। একটি কবিতা তিনি ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিলেন। অন্য কবিতাটি রেখে দিলেন। তাঁর মুখ দেখে বোঝা গেল না তিনি সেটি ছাপবেন কি না। তারপর কবিতাটা সমকালে বেরুলো। আমি সম্মানী পেয়েছিলাম ৫ টাকা। এরপর কণ্ঠস্বর-এ একটা কবিতা ছেপে দিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এটি আবদুল মান্নান সৈয়দের পছন্দ হয়েছিল। ওটা ছিল এক বিরাট পাওনা। তৃতীয় একটি কবিতা বেরিয়েছিল ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সম্পাদনায় পরিক্রমা-তে। কিন্তু সেটি ছাপার অক্ষরে পড়ে আমার মনে হলো, অত্যন্ত জোলো; এবং আমার ভেতরের সমালোচক বলল, কবিতা তোমার কাজ নয়। তারচেয়ে বরং প্রবন্ধ-টবন্ধ লিখো। আমি কবিতা ছেড়ে দিলাম। হেলাল হাফিজ একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করল, কবিতা লিখিস না কেন ? আমি বললাম, ওসব কাজ তোমার, আমার না। আমার বন্ধু শান্তনু কায়সার ছোটগল্প লিখত। সে বলল, এবার তুমি ছোটগল্পে আসো। আমি বললাম, না, এর চেয়ে বরং প্রবন্ধ লিখব। তখন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে যোগ দিয়েছি। বিদেশে যাব, পিএইচডি করব, সৃষ্টিশীল কাজে আমার মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই।

প্রশ্ন : আপনার প্রথম বই কোনটা ছিল ?

উত্তর : প্রথম বই নন্দনতত্ত্ব―যেটা অনেকটা আদিষ্ট হয়ে লেখা। মনজুরে মওলা তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। একদিন সেলিনা হোসেন, যিনি সম্ভবত একুশে স্মরণে নানা বিষয়ে একশটি বই প্রকাশের একটি প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন, আমাকে ডেকে বললেন, বইটা লিখতে হবে। মনজুরে মওলা তো একশ বইয়ের একটি তালিকা তৈরি করে রেখেছিলেন। তাতে নন্দনতত্ত্বও একটি বিষয় ছিল। আমি কাজটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম। কারণ নন্দনতত্ত্ব নিয়ে লেখাটা কঠিন কাজ ছিল।

প্রশ্ন : এটা কত সালের কথা ?

উত্তর : ১৯৮৬ সালের।

প্রশ্ন : আপনার বইটাকে আর বড় করেননি পরবর্তী পর্যায়ে ?

উত্তর : না, আর বড় করিনি। আসলে আমি একটু অলস প্রকৃতির লোক। বইটা এখন কথাপ্রকাশ পুণর্মুদ্রণ করেছে। অনেক সস্তায় দিচ্ছে বইটা। আমি বলেছি, আমার কোনও রয়্যালটির দরকার নাই, শিক্ষার্থীরা যাতে কম দামে বইটি পায়, তা দেখলেই চলবে।

প্রশ্ন : আপনার গল্প লেখা শুরু কবে থেকে ?

উত্তর : প্রথম গল্প লিখি ১৯৭৩ সালে। বিচিত্রায় তখন রেজা-ই-করিম নামে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রদায়ক ছিল। সোনা চোরাচালান নিয়ে সে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন করেছিল। শাহাদত ভাই ছিলেন সম্পাদক। আমাদের জানাশোনা শাহরিয়ার কবির, শামীম আজাদসহ আরও অনেকে সে পত্রিকায় আছে। তো একদিন রেজাই এসে বলল, শাহাদত ভাই তাকে বলেছেন তিনটা গল্প নিয়ে যেতে। শান্তনু কায়সারের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল না, পরিচয়টা আমার মাধ্যমেই হয়েছিল। শান্তনু সম্ভবত একটি গল্প দিয়েছিল। আমার গল্পটা ছিল একটু ভিন্ন প্রকৃতির। আমার এক বন্ধুর বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। থাকতেন আজিমপুরে। তিনি মারা যাচ্ছিলেন। তাঁর ঘরে একটা ঘড়ি ছিল, সেটা অন্য কোথাও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হয়তো শব্দের জন্য। ঘড়ির জায়গায় দেয়ালে একটা গোল দাগ ছিল। দেখলাম তিনি বিছানায় শুয়ে একদৃষ্টে ওই দাগের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম তিনি কী দেখছেন ? তা নিয়ে আমি একটা গল্প লিখলাম ‘বিশাল মৃত্যু’ নামে। গল্পটা ছাপা হলো। অনেকে প্রশংসাও করলেন, কিন্তু আমার মনে হলো লেখাটা অনেকটা দায়সারা গোছের। রেজা-ই-করিম খুশি হলো। শাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। বললেন, লিখবেন। কিন্তু আমি আর লিখিনি। কারণ আমাকে অনেক পড়তে হতো। প্রথমে এমএ পরীক্ষা, এরপর শিক্ষকতায় ঢুকলে প্রস্তুতির পড়া। একটা ক্লাসের আগে অন্তত ৩/৪ ঘণ্টা পড়তে হতো। যখন শিক্ষকতা শুরু করি। দেখি অনেক ছাত্রছাত্রী আমার চেয়ে বয়সে বড়। শিক্ষকতার আনন্দটাও পেতে শুরু করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ’৭৪ সালের অক্টোবরে যোগ দিয়ে ’৭৬ সালে চলে গেলাম কানাডাতে, পিএইচডি করার জন্য। সেখানে শুধুই পড়াশোনা। কানাডায় তো আর বাংলা বই পাওয়া যেত না। ভালো ভালো বই পড়তে শুরু করে প্রবন্ধের প্রতি আমার ঝোঁক চলে আসে। ওখানে বসে আমি ল্যাটিন আমেরিকার কিছু বই পড়তাম, অনুবাদে। আমার এক বন্ধু ছিল মেক্সিকোর। একই দালানে আমরা বসতাম। মাঝে মাঝে এক সঙ্গে লাঞ্চ করতাম। আমাকে সে স্প্যানিশ ভাষা শিখতে উৎসাহ দিত। ভাষাটা শুনে বেশ ভালো লাগত। সেই সময় আমি মারিও ভার্গাস ইয়োসাকে আবিষ্কার করলাম। গার্সিয়া মার্কেসকে তো আগে থেকেই জানতাম, তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এভাবে অনেককে আবিষ্কার করার পর দেখলাম, এটা তো বিশাল একটা জগৎ। যে আগ্রহটা তখন তৈরি হয়েছিল, তা থেকে গেল। এজন্য ১০/১২ বছর আগে আমি আর আলী আহমদ―ভালো লেখক এবং অনুবাদক―স্প্যানিশ ভাষার ওপরে একটা কোর্স করলাম। এখন স্প্যানিশ বুঝতে পারি, কিছুটা লিখতে পারি, কিন্তু বলতে পারি না।

প্রশ্ন : গল্প ছাপা হওয়ার পরে কী হলো, সে বিষয়ে বলছিলেন…

উত্তর : বলছি। ওই যে সেলেব্রিটি হান্টিং বলে একটা কথা আছে না, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, এমনকি মাস্টারি শুরু করার পরও আমরা কয়েক বন্ধু মিলে তা করতাম। বিখ্যাতদের পেছন পেছন ঘুরতাম। শামসুর রাহমান, রশীদ করিম, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ―এরকম লেখক কবিদের খুঁজে খুঁজে বের করে কথা বলতাম। এদের সঙ্গে হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ইলিয়াস এবং শওকত আলী পড়াতেন জগন্নাথ কলেজে। জগন্নাথে আমরা মাঝে মাঝে যেতাম। তাঁদের ধারেকাছে থাকতাম। মান্নান সৈয়দ সিলেটে চাকরি করতেন কিছুদিন। ওই সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। তাঁরা ডাকতেন, বলতেন কাছে এসে বসো। আমরা তাদের কথা শুনতেই বেশি পছন্দ করতাম। একদিন ইলিয়াস ভাই বললেন, আপনি বিচিত্রায় একটা গল্প লিখেছেন ? আমি বললাম, লিখেছি। নামটাও বললাম। তিনি বললেন ভালো হয়নি। ইলিয়াস ভাই যখন বলেছেন ভালো হয়নি, আমার ধারণা হলো, গল্প লেখাও আমার কাজ না। কবিতা লেখা যেমন ছেড়ে দিয়েছিলাম, গল্প লেখাও তেমনি ছেড়ে দিলাম। আমার মনে কোনও কষ্ট হলো না। বরং ভালোই হলো যে, রেজা-ই-করিমকে বলতে পারলাম, ইলিয়াস ভাই বলেছেন, আমার গল্প ভালো না। তারপর অনেক দিন গেল। আমি কানাডা থেকে ফিরে আসার সময় অনেক বই-ম্যাগাজিন নিয়ে এসেছিলাম। আমার সুপারভাইজার আমাকে প্রচুর বই ও জার্নাল দিয়েছিলেন। সংবাদ-এর আবুল হাসনাত একদিন বললেন, তার সম্পাদিত সাহিত্য পাতায় বিশ্বসাহিত্য নিয়ে আমাকে লিখতে হবে। আমি ‘অলস দিনের হাওয়া’ নামে একটা কলাম লিখতে শুরু করলাম। কলামটা যখন পাঠকপ্রিয়তা পেতে শুরু করল, আমি বুঝলাম, আমি একজন প্রবন্ধকার। নানা জার্নালে―বাংলা বিভাগের সাহিত্য পত্রিকায়, বাংলা একাডেমির নানা প্রকাশনায় আমি প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলাম―সুধীন দত্তের ওপর, সমর সেনের ওপর―আরও কত লেখক কবি ঔপন্যাসিক আর অন্যান্য বিষয়ের ওপর। আর বাংলা ইংরেজিতে প্রবন্ধ লিখতে লিখতে প্রবন্ধকার হিসেবে আমার একটা পরিচিতি হয়ে গেল। ১৯৮৯ সালে আফসান চৌধুরী, তিনি নিজেও খুব বড় একজন সাহিত্যিক, আমাকে বিচিন্তা নামের একটা কাগজের জন্য একটা গল্প দিতে বললেন।

প্রশ্ন : মিনার মাহমুদ ছিলেন যে বিচিন্তা পত্রিকায় ?

উত্তর : হ্যাঁ, মিনার মাহমুদ। তো দেখলাম আফসান যখন বলছে, তখন একটা গল্প লিখেই ফেলি। গল্পটা লিখতে গিয়ে আমার স্প্যানিশ সাহিত্য পাঠ বলো, বাংলা সাহিত্য পাঠ বলো, আর আমি যে প্রচুর গল্প শুনেছি ছোটবেলায়, সবকিছুই বেশ কাজে লেগে গেল। আমি দেখলাম, আমার অজান্তে, ধীরে ধীরে দুজন মানুষ আমাকে গল্পের মুখটা তৈরি করে দিয়েছিলেন। একজন হচ্ছেন আমাদের পাড়ার এক বিধবা মহিলা। আমরা তাঁকে দিদা বলে ডাকতাম। গোল হয়ে বসে আমরা তাঁর গল্প শুনতাম। তাকে অবশ্য সবসময় পাওয়া যেত না। গল্প বলতে বলতে মাঝে মাঝে তিনি হারিয়ে যেতেন। এটা ওটা করতেন। সুপারি কাটতেন। আমরা তাকে তাড়া দিতাম, দিদা গল্প কই ? তিনি বলতেন, গল্প আছে, গল্প তো হারায় না রে। বিরাট দার্শনিক চিন্তা! আবার মাঝে মাঝে তিনি গল্পটা আমাদের শেষ করতে দিতেন। আমি দুষ্টুমি করে মাঝে মাঝে রাজাকে, রাজপুত্রকে মেরে ফেলতাম। আমার বন্ধুরা আমার ওপর খুব নাখোশ হতো। বেশির ভাগ গল্পেই তো রাজপুত্র ও রাজকন্যার মিলন ঘটানো হতো। কিন্তু আমার বিপরীত চিন্তা দিদা হাসতে হাসতে মেনে নিতেন। শৈশবে আর একজন ছিলেন, তিনি হাবিব ভাই। আমাদের বাড়িতে কাজ করতেন। আমাদের বাড়িতে কাজের মানুষেরা ছিলেন রাজা। হাবিব ভাই ছিলেন মজার মানুষ। আমার মা ছিলেন শিক্ষক। তিনি স্কুলে চলে যেতেন। বাবা কাজ করতেন ঢাকায় খুলনায় ময়মনসিংহে। হাবিব ভাই বলতে গেলে বাড়িতে আমাদের মানুষ করতেন।

প্রশ্ন : আপনার গল্পটা অনেকটা মার্কেসের দাদিমার কাছ থেকে শোনা গল্পের মতো।

উত্তর : হ্যাঁ, অনেকটা তাই। আমার নানা অসুস্থতার কারণে স্কুলে যেতে একটু দেরি হয়েছিল। একটু বেশি বয়সে আমি স্কুলে পড়তে শুরু করেছিলাম। তো হাবিব ভাই অনেক গান গাইতেন এবং গল্প করতেন। গল্প করতেন এবং সঙ্গে অভিনয়ও করতেন। হাছন রাজার গান আমি ওনার মুখেই প্রথম শুনেছিলাম। এই যে একটা মানুষ গান গাইছেন আবার গল্প করছেন, কখনও নানা ভাব করছেন, এর মধ্য দিয়েই তিনি একটি পুরোনো কাহিনিকে নতুন করে তুলতেন। হয়তো এসবই আমার ভেতরে কাজ করতে শুরু করল। এজন্য আমি কথ্য সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। আমাদের তো কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস মৌখিক সাহিত্যের। আর লিখিত তো মাত্র তিন-চারশ বছরের। আর লিখিত সাহিত্যের যেটা আমার অপছন্দ হতে শুরু করল, একটু বেশি শব্দের কারুকাজ, একটু বেশি শৈলী নিয়ে চিন্তা, পশ্চিম থেকে ধার করা বিমূর্তবাদ, পশ্চিমা চেতনাপ্রবাহ―এগুলো আমার কাছে অমৌলিক মনে হতে থাকল।

প্রশ্ন : আমরা কি পশ্চিমা সাহিত্যের অনুসরণে সাহিত্যচর্চা করছি ? কিংবা আমরা কি তাদের ছুঁতে চেষ্টা করছি ?

উত্তর : হ্যাঁ, কিন্তু অতিক্রম করতে পারছি না। যদি কেউ অসম্ভব মেধাবী না হয়। সেরকম মেধাবী কয়েকজন যে নেই, তা কিন্তু নয়। তাঁরা আছেন বলেই আমাদের সাহিত্য একটা বড় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে।

প্রশ্ন : আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির যে ধারা, লালন, হাছন, রাধারমণের যে ধারা―সেটাকে কেন আমরা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছি না ?

উত্তর : এর কারণ নিম্ন ও উচ্চ সংস্কৃতির একটা তৈরি করা বিভাজন। আমরা যখন শিক্ষিত হতে শুরু করলাম, গ্রাম আমাদের কাছ থেকে দূরে যেতে শুরু করল। দূরত্বের ফলে―যে দূরত্বটা যতটা প্রকৃত তার থেকে বেশি ভাবনাগত―শহরটা হয়ে গেল এলিটদের একটা জায়গা। এবং একটু শিক্ষিত হয়েই আমরা আমাদের আচার আচরণ-পরিবর্তন করে ফেললাম। আমরা যখনই ইংরেজি ভাষা শিখলাম, পশ্চিমকে অনুকরণ করতে শুরু করলাম। তা করতে গিয়ে আমাদের বৃহত্তর জীবন থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। ফলে আমাদের অনেক বামপন্থিরাও, যারা শহরে বসে বামপন্থার চর্চা করেন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতাটা বুঝতে পারেন না। আমি যখন লিখতে শুরু করলাম, ভাবলাম ওই অবহেলিত ধারাটাতে আমি ফিরে যাব। এখানে চারটা জিনিস খেয়াল করার মতো। প্রথমটা হচ্ছে কথ্যসাহিত্যের গল্পে গল্প আছে, যে গল্পটা অনেকেই জানে। গল্পটা নতুন হয় বলার গুণে। মানুষের মনে তা জায়গা করে নেয়। একটা গল্প আমাদের দিদা হয়তো তিনবার বলেছেন। তিনবার শুনতে তিন রকম লেগেছে। দ্বিতীয় হচ্ছে ভাষার সহজতা। ভাষার জটিলতা নেই বলে আমি গল্পের একেবারে ভেতরে ঢুকে যেতে পারি। যখন ইচ্ছা বেরিয়ে আসতেও পারি। ভাষার আরোপিত কারুকাজে আমি খেই হারিয়ে ফেলি। তৃতীয় হচ্ছে গল্পের কাঠামো। কাঠামোটা স্থিতিস্থাপক। ফলে প্রতিটি বলায় যতি-বিরতি, মোড় ফেরা বা চরিত্রের অদল-বদল অথবা পরিণতি নির্ধারিত হচ্ছে। গল্প নিজেই ঠিক করে নিচ্ছে, কোথায় বিচ্ছেদ টানতে হবে। যেমন আমাদের পুথিসাহিত্য। মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। একসময় পুথিসাহিত্য নিজেই প্রস্তাব করে কোথায় চড়াই উৎরাই থাকবে, কোথায় থামতে হবে, অথবা থেমে আবার শুরু করতে হবে। এই কাঠামোটা অত্যন্ত শক্তিশালী। নিজের মতো করে কাজ করা যায়।

প্রশ্ন : আমরা সকলে বুঝতে পারছি, আমরা সকলে জানি যে, এখনও যদি কোথাও বাউল গান, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া শুনি, আমাদের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ক্ষণিক থমকে দাঁড়াই। ভেতরটা হু হু করে ওঠে। সেই গ্রামীণ জীবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। এত কিছু জেনেও কেন আমরা আমাদের সাথে সম্পর্কহীন ইউরোপীয় ধারাটা ধরেই এগিয়ে যাচ্ছি ?

উত্তর : নগর সভ্যতার প্রভাব। আমাদের জীবন। আমাদের চাকরি বাকরি, জীবিকা। এখন আর আমাদের গ্রামে ফিরে যাবার উপায় নেই। আমাদের কোট-টাই-ঘড়ি পরে অফিসে যেতে হবে। আমাদের কৃষক কিন্তু ঘড়ি প’রে মাঠে যান না। তার সময় হচ্ছে ঋতুচক্রের। তিনি ছায়া দেখে বা সূর্য দেখে সময় মেপে নেন। কিন্তু যে মানুষ অফিসে যাচ্ছে তাকে সময় তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার সময় সংকীর্ণ হচ্ছে, পরিসর সংকীর্ণ হচ্ছে। মাঠে গিয়ে আকাশের দিকে তাকালে পরিসরটা বিশাল হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু ঘরের ভেতর তাকালে সেই পরিসরটা আর থাকে না। অনেক দেয়াল তৈরি হয়ে যায়। এই দেয়ালগুলি কখনওই আমাদের ছাঁচ থেকে বেরুতে দেয় না। আমাদের সামাজিকতা ছাঁচের ভেতর চলে এসেছে; আমাদের রাজনীতি, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সব ছাঁচের ভেতর চলে এসেছে। সেখানে উদারতা নেই। আমাদের সাহিত্যের ভেতর ঔদার্যটা নিয়ে আসতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র পড়লে বোঝা যায় তিনি যখন পূর্ব বাংলায় এলেন, তিনি কী পরিমাণ উদারতাকাক্সক্ষী ছিলেন। উদারতাটা পেয়ে তিনি বেঁচে গেলেন। তিনি প্রকৃত অর্থে বিশ্ব বাঙালি হয়েছেন বাংলাদেশে এসে। এখানে না এলে তিনি হয়তো পূর্ণাঙ্গ রবীন্দ্রনাথ হতে পারতেন না। চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথকেও তৈরি করেছে বাংলাদেশ। পদ্মার ওপর অন্ধকার নামলে তার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের অন্তহীন রূপ দেখে তিনি জীবনের আলো-আঁধারিকে চিনেছিলেন। এই অন্ধকারটাই তো একটা আলো। এজন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মপ্রতিকৃতিতে অন্ধকার ঢেলেছেন তার মুখে, অনেক ছবিতে।

প্রশ্ন : তাঁর বর্ষার গান ও অসংখ্য ছোটগল্প তো পূর্ববাংলাকে ধারণ করেই রচিত।

উত্তর : হ্যাঁ। তাঁর ছোটগল্পের অনেকগুলিই। তাঁর ছোটগল্পে কিন্তু পশ্চিমের তেমন কিছুই নিয়ে আসেননি, ‘ল্যাবরেটরি’র মতো দু-একটিতে ছাড়া। অনেক গল্পে তিনি পদ্মাপারের সাধারণ মানুষকে নিয়ে এসেছেন―সেই রাইচরণ, রতন, ‘একরাত্রি’র সুরবালা। এদের তিনি পূর্ববাংলায় দেখেছেন। তাঁর গল্প কঠিন নয়। তাঁর ভাষাটা সরল। সরল, কিন্তু একটা প্রসন্নতা, একটা অতলস্পর্শিতাও সে ভাষায় আছে। ওই যে বললাম তাঁর গল্পের কাঠামোটা নিজেই নিজেকে প্রস্তাব করছে। এটি আমাদের কথ্যসাহিত্যের একটা ঐতিহ্য। আর আমাদের লিখিত সাহিত্যটা চিন্তাকে জাগায়, নতুন নতুন কাঠামো চিন্তা উপহার দেয়। কিন্তু তা করতে গিয়ে অনেক সময় অনাবশ্যক জটিলতাও আসে, পশ্চিমা বিমূর্ততা আসে। একটা গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়তে হয় অনেক সময়। তবে যারা মেধাবী, তারা ঠিকই একটা পথ করে নেন, উতরে যান। বাকিরা ছায়াযুদ্ধ করে যান। সেই তুলনায় আমাদের কথ্য সাহিত্যটা হচ্ছে একটা উদার মাঠের মতো। মাঠ থেকে বেরোবার চিন্তা থাকে না। মাঠে আমরা শুয়ে থাকতে পারি, আকাশ দেখতে পারি, বৃষ্টিতে ভিজতে পারি। এ হচ্ছে কথ্য সাহিত্যের নিজস্বতা। আনন্দ।

প্রশ্ন : আপনার গল্পে এই স্বতঃস্ফূর্ততা দেখতে পাই।

উত্তর : সেটি আমার উত্তরাধিকার। আমার থেকে অনেকে অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত।

প্রশ্ন : অনেকের তো আবার শুধু ভাষার কারুকাজ করতে করতে সেখান থেকে গল্প উধাও হয়ে গেছে।

উত্তর : হ্যাঁ, দুঃখ সেটাই যে অনেকেই এই কারুকাজের বিষয়টাকে মৌলিকত্ব বলে ধরে নিচ্ছেন। মৌলিকত্ব তো আমাদের কথ্যসাহিত্যের ঐতিহ্যকে নতুন করে নির্মাণ করার মধ্যেও থাকতে পারে। গল্পে ধারণ করাও হতে পারে। গান থেকে উদাহরণ দিয়ে বলা যাক : আমাদের রাধারমণের বা হাছন রাজার গানে যে সুর আছে, তা সবসময় তো মৌলিক নয়। গানগুলি বলা যায়, আমাদের সমষ্টির গান। এই সমষ্টি একদিনের নয়, হাজার বছরের। এই সমষ্টি বিবর্তনের। এই বিবর্তনের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়গুলো যখন গানে শুনি, আমাদের মনে সেসব দোলা দিয়ে যায়। আমি যখন বাউল গান শুনি, আমার মনে হয় আমি পূর্বপুরুষদের সঙ্গে কথা বলছি। আমি যখন লিখিত সাহিত্যে যাই সবসময় আমার সমষ্টিকে পাই না। একটা খণ্ডিত চিন্তা আমার ওপর ভর করে। আধুনিক নগর জীবনের বিকার বিক্ষোভ ক্লান্তি আমি টের পাই বটে, কিন্তু গল্পের স্বস্তিটা পাই না। গল্পকার মেধাবী হলে ভিন্ন কথা।

প্রশ্ন : নগর জীবনের এত মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয়, তবু কেন যেন মনে হয়, কারও সঙ্গে কথা বলে আমাদের ক্ষুধা মেটে না।

উত্তর : এটা কি আসলেই ঠিক ? আমরা হয়তো চেষ্টাটা তেমন করি না। আমার তো মনে হয় পশ্চিমা আধুনিকতার প্রভাবে আমরা এরকম ধারণা করে নিতে পারি। সমর সেন যখন কবিতা লেখেন, কলকাতার নগরায়ণ প্রকট ছিল না। কবি হয়তো বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন বোনের বোতাম লাগানো শার্ট পরে, ঠাকুরমার আশীর্বাদ নিয়ে। কিন্তু তিনি রাস্তায় বেরিয়ে বালিয়াড়ি দেখলেন, ক্যাকটাস দেখলেন। এলিয়টের পোড়ো জমি দেখলেন। এটি প্রকৃত, না অনুমিত ? আমি ইচ্ছা করলে ঢাকা শহরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পঞ্চাশজন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারি। সেদিন আমি জুতা পালিশ করতে গিয়ে মানুষটার সঙ্গে দাঁড়িয়ে অনেক কথা বললাম। তার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, ভালো করেছে। তার সে কী আনন্দ! পশ্চিমে হয়তো সেই অবসর নেই, আমি কতটা অনিকেত হতে পারি ? আমাদের কথ্যসাহিত্যে প্রচুর কৌতুকরস আছে। পশ্চিমের কথ্যসাহিত্যেও আছে। গার্সিয়া মার্কেস পড়লে দেখা যায় তিনি অনেক সূক্ষ্ম টানে কৌতুককে হাজির করছেন। বাঁকে বাঁকে কৌতুক লুকিয়ে আছে। এই কৌতুক তো সমষ্টির উত্তরাধিকার।

প্রশ্ন : যেমন আমাদের শহীদুল জহিরের গল্পে সেটা প্রচুর আছে।

উত্তর : হ্যাঁ, আছে। শহীদুল জহির খুবই চিন্তাশীল লেখক। তিনি পশ্চিমের চেতনাপ্রবাহটা নিয়েছেন। কিন্তু নিজের মতো করে। আত্তীকরণ করে নিয়েছেন। ফলে তিনি কোনও অনুকরণকারী না। একজন উদ্ভাবনকারী হিসেবে তা নিজের করে নিয়েছেন।

প্রশ্ন : যে কাজটি করেছেন জীবনানন্দ দাশ একইভাবে।

উত্তর : যার কারণে জীবনানন্দ পড়লে আমার কাছে পশ্চিমের প্রভাবগুলি চোখেই পড়ে না। অথচ আমরা জানি তিনি ইয়েটস থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তাঁর কবিতা শেষ বিচারে ‘রূপসী বাংলা’র কবিতা। যেমন সৈয়দ শামসুল হকের বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা, পুরোটাই বাংলাদেশ। কিংবা কিবরিয়া যখন ছবি আঁকেন, বিমূর্ত ছবি, যার উৎস পশ্চিমে, তিনি কিন্তু সম্পূর্ণ বাংলাদেশের ছবিই আঁকেন। আমার সঙ্গে একবার কজন বিদেশি চিত্রশিল্পীর পরিচয় হয়েছিল, যারা এশিয়ান বিয়েনালে এসেছিলেন। আমি তখন কিবরিয়ার ওপর একটা বই লিখছিলাম। বিদেশি শিল্পীরা তাঁর ছবি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হু ইস দিস আর্টিস্ট ? ফ্যান্টাস্টিক! আমি জানতে চাইলাম কোন জিনিসটা তাদের বেশি ভালো লাগছে। তাঁরা বললেন, রং। এবং স্ট্রাকচার। একজন বললেন, তিনি এই শিল্পীর ছবি কিনতে চান। সুবীর চৌধুরী তখন বিয়েনালের দায়িত্বে। তিনিই কেনার ব্যবস্থা করে দিলেন। দেশে ফেরার আগে এক শিল্পী আমাকে বললেন টেলিফোনে, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। কিবরিয়া নোজ হাউ টু পেইন্ট এবস্ট্রাকশন ফুললি উইদিন আ কালচার।’ সম্পূর্ণ সংস্কৃতির ভেতর থেকে চিত্রকলা বা সাহিত্য রচনা করতে গেলে কিবরিয়া অথবা শহীদুল জহিরের মতো সংবেদী হতে হবে। জহিরের সঙ্গে আমার কোনওদিন পরিচয় হয়নি, শুধু টেলিফোনে কথা হয়েছে। তাঁর এক লেখায় আছে আমার ‘অলস দিনের হাওয়া’ পড়ে তিনি ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছেন।

প্রশ্ন : আপনাদের দুজনের ভাষা স্বতঃস্ফূর্ত… আপনার ভাষাটাও দারুণ সাবলীল।

উত্তর : হ্যাঁ, কিন্তু তাঁর ভাষাটা অনেক বেশি পরিমার্জিত। আমারটা হয়তো তোমার সাবলীল মনে হয়েছে কারণ আমি গল্প বলার চেষ্টা করি, সচেতন ভাষা প্রয়োগে লেখার নয়। তবে শহীদুল জহির জীবনটাকে অনেক গভীর থেকে দেখেছেন। এবং অনেকটা ভেতরে গিয়ে জীবনকে শুধু দেখেননি, পাঠককে সেখানে টেনে নিয়ে গিয়েছেন। ওইটা তার শক্তি। শহীদুল জহিরের মতো এখন কেউ কেউ লিখছেন। আমার প্রিয় লেখক যারা যেমন শাহাদুজ্জামান, একটু বেশি নিরীক্ষাধর্মী হয়ে গেছেন। মামুন হুসাইনের এখনকার লেখা একটু বেশি ক্লিনিক্যাল হয়ে যাচ্ছে। ইমতিয়ারের আগের ধারটা কেন জানি এখন দেখছি না। ইমতিয়ার, মামুন এবং শাহাদুজ্জামান খুবই মেধাবী তিনজন গল্পকার। তাঁরা এই সাক্ষাৎকার পড়লে হয়তো মন খারাপ করতে পারেন। মনে করতে পারেন মুরব্বিসুলভ কথাবার্তা বলছি। তাদের দেখার ক্ষমতা আছে একশ ভাগ। কিন্তু প্রকাশের সারল্যে আরও একটু গুরুত্ব দিতে পারেন। আমি দশজনকে টেনে আনিনি। এই তিনজনের কথা বলছি, কারণ এদের ওপর আমার আস্থাটা বেশি। তাঁরা পারবেন।

প্রশ্ন : এখনকার তরুণ কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে গল্পের চেয়ে ভাষা, ফর্ম এবং কাঠামো নিয়ে বেশি মাতামাতি দেখা যায়।…

উত্তর : ফর্মটা তো কান টানলে মাথা আসার মতো। আমি যেভাবেই লিখি না কেন একটা ফর্ম দাঁড়িয়ে যায়, নাকি ? মধুসূদন যখন প্রহসন লিখলেন, ফর্মটা পুব-পশ্চিম মিলিয়েই তৈরি করলেন, কিন্তু নাটকটা তো ফর্মকে ছাপিয়ে যায়। তিনি যখন মেঘনাদবধ কাব্য লিখলেন, ফর্মটা এপিকে রাখলেন, কিন্তু ওই এপিকে যশোর-চব্বিশ পরগনার কথ্য ভাষাও ঢুকিয়ে দিলেন। এটি মহাকাব্যের আদল নিল, কিন্তু পশ্চিমা মহাকাব্যের নয়, বাংলা মহাকাব্যের।

প্রশ্ন : আসলে কল্পনাই তো প্রধান…

উত্তর : হ্যাঁ, কল্পনা। আর একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, সেটি হচ্ছে ভাষা। আমাদের ভাষা ব্যবহার দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে। আমাদের সাহিত্য ভাষায় তৎসম শব্দের প্রতি অনেক দুর্বলতা। আমাদের ভাষা নিয়ে চিন্তাভাবনার কোনও অবকাশ আমরা না পরিবারে রেখেছি, না শ্রেণিকক্ষে রেখেছি। আমরা যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তাম, আমাদের পরীক্ষার তাড়া ছিল না। আমাদেরকে বই দেওয়া হতো, বলা হতো বইটা পড়ে একটা প্যারাগ্রাফ লিখে আনতে। আমাদের পাঠশালাটা ছিল বাজারের মাঝখানে। শিক্ষক বলতেন, আমি ঘুমাবো তোরা বাজার নিয়ে রচনা লিখবি। আমরা রচনা লিখছি আর স্যার ঘুমুচ্ছেন। আমাদের রচনা লেখা হয়ে গেল। তার ঘুমটাও শেষ হলো। তিনি আড়মোড়া ভেঙে উঠে আমাদের রচনা দেখতেন। নাম্বার দিতেন, ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতেন। আমাদের মনটা তিনি এবং তাঁর মতো শিক্ষকরা গড়ে দিয়েছেন, ভাষা ব্যবহারের একটা সক্ষমতা তারা তৈরি করে দিলেন। এখন তো এসব কোথাও নেই। এখন শুধু এমসিকিউ, কোচিং, জিপিএ ৫। এসব করতে গিয়ে মাথার ভেতরটা আমাদের পাথর হয়ে গেছে। একজন টেলিভিশনের প্রতিবেদককে যখন লাইভ কথা বলতে দেখি, তিনি শুধু ‘আসলে’ আর ‘কিন্তু’ দিয়ে কথা বলতে থাকেন, একটা সুন্দর বাক্য বলতে পারেন না, গুছিয়ে কথাই বলতে পারেন না। অর্থাৎ ভাষা নিয়ে একটা ভীষণ রকম অরাজকতা চলছে। আবার আইতাছি যাইতাছি-কেও সাহিত্যের বর্ণনার ভাষা করার দাবি তুলছেন কেউ কেউ। ভাষার এই যে দুর্বলতা, এর মধ্যে কারুকাজ করার জায়গাটাই বা কোথায় ?

প্রশ্ন : একটা জিনিস দেখি যে, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক থেকে শুরু করে হালের শহীদুল জহির পর্যন্ত―তারা দু-একটি কথ্য বা মুখের ভাষা সাহিত্যের মধ্যে নিয়ে আসছেন। যেমন ওয়ালীউল্লাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘নি’, ‘নেই’ না লিখে সবসময় ‘নাই’ লিখেছেন। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, হতেছে, ছড়াতেছে, দাঁড়ায়ে…। তবে তারা শব্দগুলো শুধু প্রয়োজনেই ব্যবহার করছেন। কিন্তু আজকাল দেখা যায় এগুলো অপ্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে।

উত্তর : হ্যাঁ, মুখের ভাষা তো সাহিত্যে থাকবেই। কিন্তু বর্ণনার ভাষাটা ? দর্শনের ভাষাটা ? জীবনানন্দ যা করেছেন, ছন্দের জন্য করেছেন। কী কথা তাহার সাথে, তার সাথে―ছন্দের প্রয়োজনেই এসেছে। এটা হতেই পারে। কিন্তু আমি একটি ভাষার বারোটা বাজিয়ে ভাঙাভাষা দিয়ে কী করে ভাষার বা চিন্তার উন্নতি ঘটাতে পারি ? প্রয়োজন হলে শব্দ রাস্তার ভাষা থেকেও নেওয়া যায়, যেমন নাটকে, উপন্যাসের কথোপকথনে, এমনকি কবিতায়― কিন্তু এই ভাষাতেই যদি আমি পুরো সাহিত্য লিখে ফেলি, তাহলে তো হবে না। সাহিত্যের তো একটা ভাষা আছে। সাহিত্যের কল্পনা আর একজন বিজ্ঞানীর কল্পনা এক নয়। সাহিত্যের কল্পনা একজন সাংবাদিকের কল্পনা নয়। সাহিত্যের কল্পনায় উদারতা, বিস্তৃতি, সমুন্নতি এসব থাকে।

প্রশ্ন : আপনার শিল্পসমালোচনার জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ লিখেছেন। পাশাপাশি লিখেছেন অনন্য সব শিল্পসমালোচনা। এই এলাকায় কাজ করার ব্যাপারটা আপনার মধ্যে কীভাবে ঢুকল। এবং একই সঙ্গে জানতে চাই বর্তমান বাংলাদেশের শিল্প সমালোচনার অবস্থানটা ঠিক কোথায় ?

উত্তর : অনেক কিছু লেখার আগে আমি শিল্প নিয়ে লিখেছি। ১৯৬৮ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, আমার সঙ্গে পরিচয় হলো মারুফ আহমেদের, যার বাবা বিখ্যাত খলনায়ক ইনাম আহমেদ। ইনাম আহমেদ সাহেবের ছোট ভাই নাসিরউদ্দিন আহমেদ স্কুলে আমাদের বাংলার শিক্ষক ছিলেন। উনি একটা বই লিখেছিলেন আটলান্টিকের ওপার হতে। ইনাম আহমেদও ছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্রের। মারুফের সঙ্গে চারুকলায় আড্ডা জমতো, আমার সঙ্গে পরিচয় হলো ইব্রাহিমের, ছবিঘরের প্রতিষ্ঠাতা। শাহাবুদ্দিনের সঙ্গেও পরিচয় হলো, তবে সেভাবে অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়নি। চারুকলায় গিয়ে আমার একটা লাভ হলো; চিত্রকলা বিষয়ে আকর্ষণ বেড়ে গেল। একদিন জয়নুল আবেদিনের ক্লাস হচ্ছে, আমি বাইরে চুপচাপ বসে আছি। উনি আমাকে বললেন, ভেতরে আসো। আমি বললাম, স্যার, আমি তো ইংরেজির ছাত্র। স্যার বললেন, ইংরেজির ছাত্র তো কী হয়েছে, ভেতরে আসো। সফিউদ্দিন আহমেদ স্যারের সঙ্গেও পরিচয় হলো। আমি ইংরেজি সাহিত্য পড়ি শুনে উনি বললেন, আপনি কি পাশ্চাত্যের ছবিটবি দেখেন ? আমি বললাম, স্যার, চেষ্টা করি, সাহিত্য বোঝার জন্য ছবির বিষয়টা জানতে হয়। এই দুই শিল্প ও শিক্ষাগুরুর স্নেহ পেলাম আমি। মূলত তাদের প্রশ্রয়েই চারুকলায় যেতাম। দেখতাম, কীভাবে এচিং হচ্ছে, কীভাবে লিথোগ্রাফ হচ্ছে, কীভাবে ওয়াশ হচ্ছে। এইসব আমি হাতে কলমে শিখলাম। এরপর আমি শিল্প জিনিসটা কী একটু একটু বুঝতে শুরু করলাম। আর আমাকে পশ্চিমের শিল্পকলা তো সব সময় আকর্ষণ করত।

১৯৭৩-এর এপ্রিলে যখন পিকাসো মারা যান, তার ওপর লেখার জন্য আমার খোঁজ পড়ল। বাংলাদেশ অবজারভার-এর যুগ্ম সম্পাদক তখন ছিলেন নজরুল ইসলাম। নিপাট একজন ভালো মানুষ, গুণী সাংবাদিক; উনিই আমাকে লোক পাঠিয়ে ডাকালেন, বললেন পিকাসোর ওপর লেখা চাই, একদিনের ভেতর। আমি লাইব্রেরিতে বসে বইটই ঘেঁটে একটা লেখা তৈরি করলাম, তাও আবার ইংরেজিতে। আমি হাতেই লিখে দিলাম। লেখাটা ছাপা হলো। শিল্পকলার ওপর সেই আমার প্রথম লেখা। শাহতাব নামে একজন শিল্পী ছিলেন, ময়মনসিংহে কাজ করতেন। খুব ভালো শিল্পী। তাঁর প্রদর্শনী হলো। তিনি আমাকে বললেন, আপনি তো পিকাসোর ওপর লিখেছেন, আমার ওপর একটা লেখা দিতে হবে ইংরেজিতে। লিখলাম। মারুফ, শাহাবুদ্দিন আর ইব্রাহিমের একটা প্রদর্শনী হলো শিল্পকলায়। আমি লিখলাম ওদের ব্রোশিউরে। তাদের ছবি বিক্রিতেও সাহায্য করলাম। অনেকে আসত, ছবি দেখত, তাদেরকে ছবি কিনতে উদ্বুদ্ধ করতাম।

প্রশ্ন : ছবি বোঝার জন্য পড়াশোনার কোনও ভূমিকা নেই তাহলে।

উত্তর : উল্টোটাই তো ঠিক। পড়াশোনার বিকল্প নেই। টেকনিকটা না জানলে ছবি বুঝতে কিছুটা সমস্যা হয়। কীভাবে ওয়াশ হচ্ছে, কীভাবে রঙের ব্যবহার হচ্ছে―এগুলো না দেখলে তো বোঝা যায় না। যেমন মোস্তফা মনোয়ারের ছবি আঁকা দেখতাম। জলরং ছবির হয়ে ওঠাটা বুঝতাম। বাংলাদেশের জলরং শিল্পীদের মধ্যে গুরুস্থানীয় হচ্ছেন মোস্তফা মনোয়ার।

প্রশ্ন : আপনি আর কার কার ছবি আঁকা দেখেছেন ?

উত্তর : অনেকের। ওই সময় বিখ্যাত-অবিখ্যাত অনেকের। তারপরে ১৯৭৫ সালে লিখলাম কামরুল হাসানের ছবির ওপর। একতা পত্রিকায়, আবুল হাসনাতের অনুরোধে। লেখাটা পড়ে কামরুল হাসান আমার পিঠে একটা চাপড় দিয়েছিলেন। এখনও মনে হয় ব্যথাটা আছে। বললেন, লেখাটা ভালো হয়েছে। কামরুল ভাই আমাকে ছবি দিতে চাইলেন। আমি তখন বাইরে যাবার জন্য চেষ্টা করছি। আমি বললাম কামরুল ভাই, আমি ছবি নিয়ে কী করব, আমার তো দেয়াল নেই। উনি খুব হাসলেন, দেয়াল নেই এটা কেমন কথা। অন্যের বাসায় থাকো বোধহয়। তুমি যখনই ফিরবে, ছবি থাকবে। আমার সুবিধা ছিল চারুকলা ছিল কলাভবন থেকে পায়ে হাঁটার দূরত্বে। কানাডা থেকে ফিরে এলে তাদের প্রি-ডিগ্রি প্রোগ্রামে ইংরেজি শেখাবার জন্য চারুকলা থেকে অনুরোধ এল। ফলে হলো কী, চারুকলায় আমার অনেক ছাত্র জুটে গেল। শিল্পকলার প্রতি আমার আগ্রহটা বাড়ল। তখন অবশ্য শিল্প সমালোচনার আলাদা একটা জায়গা ছিল। মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সুন্দরম-এ আমাকে শিল্পকলার উপর লিখতে বললেন স্যার। সংবাদ-এর সাহিত্য সাময়িকীতেও শিল্পের ওপর আমার লেখা ছাপা হতো। ‘অলস দিনের হাওয়া’য় অনেকগুলোই আমি শিল্পকলা নিয়ে লিখেছি। একটা জিনিস খেয়াল করো, আমরা যখন শিল্পসমালোচনা লিখছি, আমাদের অনেকের বয়স ত্রিশের নিচে ছিল। যেমন আমি, মুনতাসীর মামুন, রবিউল হুসাইন, শামসুল ওয়ারেস, আরও কিছু নাম হয়তো ভুলে যাচ্ছি―আমাদের সবার বয়স ত্রিশের নিচে ছিল। নজরুল ইসলাম, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ছিলেন আমাদের চেয়ে সিনিয়র, সন্তোষ গুপ্তও। মানে তখন বয়স বিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে অন্তত কুড়িজন শিল্প সমালোচক ছিলেন, যাদের অনেকে ইংরেজিতেও লিখতেন। এখন চল্লিশের নিচে একজন শিল্পসমালোচকও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এর কারণ হচ্ছে আমরা শিল্প সমালোচনার জন্য একটা ভূমি তৈরি করিনি। আর এটা তো প্রশিক্ষণের বিষয়। আমি যেমন হাতে-কলমে শিখেছি, সেটা এখন আর হচ্ছে না। আমাদের পত্রপত্রিকাগুলো শিল্প সমালোচনাকে তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। আর যাদের গ্যালারি আছে তাদের শুধু ছবি বিক্রির ধান্ধা। ব্রোশিউরগুলোতে কে কী লিখবে তারও কোনও নিশ্চয়তা বা শুদ্ধতা নেই। এত বড় বড় প্রদর্শনী হচ্ছে অথচ ব্রোশিউরে কে কী লিখছেন তার কোনও ঠিক ঠিকানা নেই।

প্রশ্ন : এটা কি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হচ্ছে ?

উত্তর : হ্যাঁ, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব তো আছেই, তবে শুধু সেজন্য নয়। একটা অনুকূল আবহের প্রয়োজন―শিল্পকলা নিয়ে কথাবার্তা বলা, শিল্পকলা নিয়ে আড্ডা, শিল্পীদের সামাজিক সক্রিয়তা। এগুলো এখন বিরল।

প্রশ্ন : কাইয়ুম চৌধুরীর স্ত্রী শিল্পী তাহেরা খানম ওই দিন কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, কাইয়ুম চৌধুরী মারা যাবার পরে শিল্পকলা নিয়ে আর আড্ডা হচ্ছে না।

উত্তর : হ্যাঁ, কাইয়ুম চৌধুরী এবং সুবীর চৌধুরী মারা যাবার পরে আর আড্ডা হচ্ছে না। আড্ডার কথায় মনে পড়ল, একদিন সফিউদ্দিন আহমেদ এক শিল্পীর আমন্ত্রণে কুমিল্লা যাবার সময় আমাকে সঙ্গে যেতে বললেন, যেহেতু আমি শিল্প নিয়ে লিখি। তাঁর হয়তো ধারণা ছিল টেক্সচার নিয়ে আমার চিন্তায় একটা ঘাটতি আছে। তিনি মাইক্রোবাসে বসে বিষয়টা নিয়ে এমন মনোগ্রাহী আলোচনা করলেন যে, টেক্সচার কী জিনিস আমি অনেকটাই বুঝে ফেললাম। তারপর শিল্পী কিবরিয়ার সঙ্গে যখন এবস্ট্রাকশন নিয়ে একদিন কথা বললাম, তিনি তা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। এই শিল্পগুরুরা এরকম আলোচনায় কখনও অনাগ্রহী ছিলেন না। তাঁরা ভাবতেন যে মানুষ ছবি নিয়ে কথাবার্তা বলুক। মুর্তজা বশীরের মতো কথাপাগল মানুষ খুব কম আছে। কজন বলতে পারে মুর্তজা বশীরের মতো কথা! তাঁর একটি ছবি দেখে তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, বশীর ভাই, আপনি এখানে মেয়ের শাড়ি এঁকেছেন নীল রঙের, পাড় দিয়েছেন কমলা রঙের। ম্যাচিং তো হলো না। তিনি বললেন, আরে রং ভাঙতে হবে না! আমি ইচ্ছা করলেই তো সুন্দর ম্যাচিং করে রঙ দিতে পারতাম। কিন্তু সেটা কেন আমি করতে যাব ? বিপ্লব করতে হবে না! আমার স্ত্রী বা মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেই তো ওরা বলে দিতে পারত কোন ম্যাচিংটা ভালো হয়। কিন্তু আমি তো তা করব না। এই কথা বলতে বলতে বশীর ভাই রং নিয়ে বিশাল এক বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন। এখন বশীর ভাইয়ের মতো কথকই তো নেই।

প্রশ্ন : একটা সময় আড্ডা হতো শরীফ মিয়ার চায়ের ক্যান্টিন, নিউ মার্কেট, বিউটি বোর্ডিং, শাহবাগে―এখন সে আড্ডাগুলো আর হয় না।

উত্তর : আড্ডা কমে যাওয়ার কারণ হলো মানুষের অবসর কমে গেছে। আগের মতো সময় আর তারা পায় না। তাছাড়া মানুষ অনেকটা লোভের মধ্যে পড়েছে। এখন একটা ফ্ল্যাট চাই, ঘরে ভালো টেলিভিশন চাই, সুন্দর সোফা চাই, এখন সামাজিকতার যে কত রকম উপায় বেরিয়েছে। আর আগে যেরকম মানুষ বই পড়ত, আলোচনার বিষয়টা ব্যাপকভিত্তিক ছিল, এখন তো তা নয়।

প্রশ্ন : একসময় মানুষের কিছু টাকাপয়সা হলে জমিজমা কিনত। এখন আগে সুন্দর করে একটা বাড়ি করে। সেটা দোতলা, তিনতলা যাই হোক।

উত্তর : হ্যাঁ, ফ্রিজ কেনে, নানা রকম বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র কেনে। সেদিন আমি কিশোরগঞ্জের এক গ্রামের এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তো অবাকই হয়ে গেলাম। ওই বাড়িতে আমি পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে তিনবার গিয়েছি। এবার গিয়ে দেখি বাড়িতে সিলিন্ডারের গ্যাসে রান্না হচ্ছে। আগে আমরা দেখেছি গোবর শুকিয়ে রান্না করতে। গাছের মরা ডাল, শুকনো ঝরাপাতা পুড়িয়ে রান্না হতো।

প্রশ্ন : এখন যে ফেসবুক অনলাইন বা অন্তর্জাল কেন্দ্রিক আড্ডাগুলো হচ্ছে এগুলোকে কী চোখে দেখেন ?

উত্তর : এগুলো তো ভার্চুয়াল আড্ডা। এগুলো তো প্রকৃত আড্ডা না। এবং সেখানে যিনি বলছেন, তিনি আবার শুনতে আগ্রহী নন। দ্বিতীয়ত, আগে সরাসরি যে আড্ডাটা হতো সেখানে একটা মার্জিত ভাব ছিল, এখন অনলাইনে সেটা আর নেই। আড্ডা কখনও ক্রোধ দেখাবার জায়গা হতে পারে না। রসিকতা, ঠাট্টা এসব শুনতাম―আড্ডাতে বিখ্যাতদের, যেমন একবার আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও হুমায়ুন আজাদের ভেতর একটা বুদ্ধিদীপ্ত, রসপূর্ণ আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ শুনেছিলাম। ওই মাপের কথাবার্তায় রসবোধ, বক্রোক্তি―এসবের যে চালাচালি হতো, তা কি আর ফেসবুকে হয় ? ফেসবুক মানুষকে দুর্বিনীত করে দিয়েছে। অসুখী করে দিয়েছে। আমি কাউকে পছন্দ করি না, তাকে বাপ মা তুলে গালি দিচ্ছি। এটা তো আর আড্ডায় সম্ভব না। ফলে শিষ্টাচার চলে গেছে। ঔদ্ধত্য বেড়েছে। বিনয়ের অভাব দেখা দিয়েছে। সৌজন্যবোধের দুর্ভিক্ষ চলছে। সবচেয়ে বড় হচ্ছে আত্মপ্রচার, আত্মরতি ও আত্মপ্রদর্শনীর একটা প্রতিযোগিতা। ফেসবুক এটাকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

প্রশ্ন : এসব সামাজিক মাধ্যম মানুষের গভীরতা কমিয়ে দিয়েছে, অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে। কোনও একটা কিছু লিখেই অনলাইনে ছেড়ে দিচ্ছে। অথচ শিল্প সবসময় স্থিরতা আশা করে।

উত্তর : হ্যাঁ, এবং একটা স্ট্যাটাস বা মন্তব্য লিখলে বা ছবি দিলে তাতে লাইক না পেলে মানুষের পেটের ভাত হজম হচ্ছে না। ফেসবুক সুস্থিরতার জায়গা না। আমি নিজে যতই অস্থিরতার মধ্যে থাকি না কেন, শিল্প যখন করব তখন আমার স্থিরতার প্রয়োজন। আমরা যখন হলে থাকতাম, সেই ষাটের দশকের শেষে, বুড়িগঙ্গায় যেতাম সাঁতার কাটতে। এত সুন্দর বুড়িগঙ্গা ছিল তখন। এক সারেং একদিন আমাদের বললেন, তোমরা শুধু এখানে সাঁতার কাটো, একদিন তো মেঘনায় যেতে পারো। সেখানে গিয়ে একদিন ঘূর্ণির মধ্যে পড়বে। তার জীবনে একদিন ঘূর্ণির মধ্যে পড়েছিলেন, ডুবতে ডুবতে বিশ ফুট পানির নিচে চলে গেলেন। উপরে যেটাকে ঘূর্ণি বলে সবাই আতঙ্কে থাকে, সেই ঘূর্ণির একেবারে তলদেশে কোনও ঘূর্ণি নেই, একেবারে শান্ত, স্থির। মনে হয় ওখানে শুয়ে থাকি। পানির নিচে তো আর শুয়ে থাকা যায় না। তিনি বললেন, পারলে সেখানটা একবার দেখে আসো। নাট্যজন ম. হামিদের একটা প্রিয় উক্তি: ‘কুত্তার কোনও কাম নাই/দৌড় ছাড়া চলন নাই।’ আমাদের এখন হয়েছে সেই অবস্থা, কোনও কাম নাই, খালি দৌড়াই। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিরতা নেই, শুধু আছে দৌড়ঝাঁপ। সুস্থিরতা যদি না থাকে শিল্পটাও অস্থির হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ বল, নজরুল বলো, এলিয়ট বল, জীবনানন্দ বলো সবাই তারা জীবনের প্রচণ্ড ঘূর্ণির মধ্যে ছিলেন। কিন্তু একটা সময়ে শিল্পের স্থির কেন্দ্রে পৌঁছেছেন। এলিয়টের ফোর কোয়ার্টেটস তো স্থির কেন্দ্র প্রত্যাশী এক কবির আত্মদর্শন।

প্রশ্ন : এ সময়ের তরুণদের জন্য আপনার বলার কী আছে ?

উত্তর : বলতে চাই যে, অস্থিরতা তো থাকবেই জীবনে। তার ভেতর থেকেও শান্ত থাকতে হবে। প্রযুক্তি আমাকে যা দিচ্ছে, তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের সুবিধা যেমন দিচ্ছে, তেমনি কিছু অসুবিধাও তৈরি করছে, এটা হচ্ছে বাজার সৃষ্টির জন্য। এই যে আমাদের ভাষা বিকৃতি ঘটছে, এটা ঐ প্রযুক্তির ঠাকুররাই ঘটাচ্ছে। যে জাতির ভাষায় শৃঙ্খলা নাই সে জাতির চিন্তাতেও শৃঙ্খলা নাই। সে জাতি নিজে কমই সৃষ্টি করতে পারে। এখনই আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের পাঁচ-ছয় বিলিয়ন ডলার ভারতীয় কোরিয়ান শ্রীলঙ্কান ব্যবস্থাপকরা নিয়ে যাচ্ছে; আমরা সেই মাপের ব্যবস্থাপক তৈরি করতে পারছি না। আমাদের চিন্তার সুস্থিরতা না থাকলে আমরা বড় কাজে মন বসাতে পারব না। আমরা নিজেরা কিছু না করে বাইরের ওপর নির্ভর করব। আমাদের উপার্জনের টাকা তাদের হাতে তুলে দেব। আর নিজের ভাষাতে নিজেদের মধ্যে আমি সারাক্ষণ গালিগালাজ দিব, খিস্তিখেউড় আওড়াব, কারণ আমি তো সুস্থির চিন্তার মানুষ না। সেই জন্য তরুণদের বলি, প্রযুক্তি ব্যবহার করো, প্রযুক্তিকে প্রশ্নও করো। ফেসবুকটা আমাদের কী দিচ্ছে ? যদি নেওয়ার পরিমাণ বেশি হয় এবং দেওয়ার পরিমাণ কম হয়, তাহলে ক্ষতিটা কার ? ফেসবুক যদি চমৎকার যোগাযোগ তৈরি করে, ভাবের আদান প্রদান বাড়ায়, তাহলে তো ভালোই। আর যদি অশ্লীল কথাবার্তা, অভব্যতা আর ঔদ্ধত্য প্রকাশের উপায় হয়, তাহলে তো সমস্যা। ফেসবুক থেকে ভালোটা গ্রহণ করার স্বাধীনতাটুকু বজায় রাখতে হবে।

প্রশ্ন : এই স্বাধীনতাটাকে পরিশীলিতভাবে ব্যবহার করার কথা বলছেন ?

উত্তর : হ্যাঁ, একটা চাকু তো একজন কসাই একভাবে ব্যবহার করেন, একজন শল্যবিদ অন্যভাবে করেন। প্রযুক্তি একটা চাকুই বটে।

প্রশ্ন : গত পঞ্চাশ বছরের সাহিত্যের, অর্থাৎ কবিতা গল্প উপন্যাস নাটক প্রবন্ধের বিবর্তনটা আপনি কীভাবে দেখেন ? সেই গত শতকের পঞ্চাশের বা ষাটের দশক থেকে এই একুশ শতকের প্রথম অবধি।

উত্তর : বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের ফর্মটা পাল্টায়, প্রকাশভঙ্গিটা পাল্টায়। চিন্তাগুলি পাল্টায়। সমাজের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কটা লেখক কবিদের প্রভাবিত করে। কিন্তু মৌলিক বিষয় তেমন পাল্টায় না। আর একটা চিন্তা সবসময়ই থেকে যায়, সেটি হলো― সৃষ্টিটা সৃষ্টি হচ্ছে কি না। যেমন গল্প গল্প হচ্ছে কি না, কবিতা কবিতা হচ্ছে কি না, উপন্যাস উপন্যাস হচ্ছে কি না। একটা সময়ে একটা গল্প যেভাবে দাঁড়িয়েছে, অন্য একটা সময়ে তা দাঁড়াতে নাও পারে। সময়ের সঙ্গে তাল রেখে, সাহিত্যের বিবর্তনের সঙ্গে গতি মিলিয়ে যারা একটা গল্পকে গল্প করে তুলতে পারেন, একটি কবিতাকে কবিতা―তারা টিকে থাকেন। আমাদের দেশে এরকম মেধাবী লেখক অনেকেই আছেন। আবার নতুন যুগে জন্ম নিয়ে শুধু তার যুগের প্রভাবটাকেই যিনি ফুটিয়ে তুলতে চান, তিনি মেধাবী হলে তা সহজেই পারেন। আমাদের তরুণদের মধ্যে এরকম প্রতিভাবান লেখকরা আছেন।

প্রশ্ন : শাশ্বত স্বরের কথা বলছেন ?

উত্তর : না না, শাশ্বত বলে কিছু এই উত্তরাধুনিক যুগে ধোপে টিকে না। আমি বলছি কিছু সুর মৌলিকভাবে বেজে যায়।

প্রশ্ন : আমিও সেটাই বলছি যে, রবীন্দ্রনাথের ভাষা এখন নেই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আছেন।

উত্তর : নজরুল যেভাবে ‘বিদ্রোহী’ লিখেছেন এখন তো আর কেউ সেভাবে আরেকটা ‘বিদ্রোহী’ লিখবেন না। নজরুলের বিদ্রোহী আমার কাছে নির্বিকল্প। মৌলিক, তুমি যাকে শাশ্বত বলো তা-ই। আবার এখন যিনি তার মতো করে আরেকটা ‘বিদ্রোহী’ লিখবেন, তিনি যদি মৌলিক একটি সুর বাজাতে পারেন, সেটিও দীর্ঘজীবন পাবে। পঞ্চাশ বছরের বিবর্তনে সেটি তাহলে হারিয়ে যাবে না। তবে কবিতার পাঠক এখন বদলেছে। মানুষ শিক্ষা পাচ্ছে, কিন্তু আমাদের ভেতর কিছু স্থূল চিন্তা ঢুকেছে। ফেসবুকের কথাই ধরো। মানুষের শোবার ঘরের দরজা দিয়ে উঁকি মারতে মারতে সুকুমার বোধটাই আমরা হারিয়ে ফেলছি। যে মানবিকতার চর্চা হতো একসময় তা কমে এসেছে। আর সাহিত্যের একটা মূল ভিত্তি হচ্ছে মানুষ এবং মানবিকতা। এই বিবর্তনে সেটা হারিয়ে যাচ্ছে কি না তা আমাকে ভাবায়। প্রান্তিক মানুষ নিয়ে বলতে গিয়ে অনেক কৃত্রিমতাও এসেছে। শহরে বসে আমরা গ্রামের মানুষ নিয়ে লিখছি। গ্রামে যাচ্ছি না কিন্তু প্রান্তিক মানুষ নিয়ে লিখছি। এতে লেখায় একটা ফাঁক থেকে যায়। ভাষার ক্ষেত্রে, দুই বাংলার কথাই বলছি, এই সময়ে অনেক দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছি। শক্তিশালী একটা ভাষা যেন তৈরি হচ্ছে না। আমাকে আবারও সেই সংস্কৃত-নির্ভর, তৎসম-নির্ভর ভাষায় যেতে হচ্ছে। এই সময়ের ভাষার একটা বলিষ্ঠ রূপ কোথায় ?

প্রশ্ন : এই যে তৎসম নির্ভরতার কথা বলছেন বা সাধু ভাষার ব্যবহার―এগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন।

উত্তর : নিরীক্ষার প্রবণতা সবসময় থাকবে, তাই বলে সকলেই এই কাজে নামলে তো মুশকিল। এজন্য প্রস্তুতির একটা ব্যাপার আছে। একটি পত্রিকার সম্পাদকীয় সাধু ভাষায় লেখা হতে পারে। কারণ যে ভাষাটা হারিয়ে যাচ্ছে তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে তা হতে পারে। কিন্তু সব পত্রিকা তা শুরু করলে এটি চমকে পরিণত হবে। জীবন থেকে যেমন সাহিত্য, সাহিত্য থেকেও জীবন তেমন আলাদা নয়, সেই অর্থে জীবনের ভাষা সাহিত্যে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু সাহিত্য তো সাংবাদিকতা নয়, সেখানে কল্পনার একটা জায়গা আছে, পরিশীলনের একটা জায়গা আছে। ভাষায় তার প্রতিফলন থাকতে হবে। জীবন থেকেও নিতে হবে, আবার কল্পনা থেকেও নিতে হবে। কিছুটা পরিচ্ছন্নতা থাকবে। আমি যদি শুধু সংস্কৃতনির্ভর ভাষার ব্যবহার করি, তাহলে তো আমি দূরেই চলে গেলাম। যে ভাষাটা মানুষ ব্যবহার করে না, তাতে সাহিত্য হলে তা মন কাড়বে না।

প্রশ্ন : যেসব ভাষা একবার ব্যবহৃত হয়ে গেছে। সেসব ভাষা এখন আর ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। যেমন এখন আর সাধু ভাষার ব্যবহারের প্রয়োজন নেই ?

উত্তর : হ্যাঁ, এসব ভাষা একবার ব্যবহার হয়ে গেছে। এগুলো এখন প্রতিদিনের ভাষা হতে পারে না। কোথাও কোথাও দু-এক জায়গায় ব্যবহৃত হতে পারে, অর্থাৎ মনে করিয়ে দেওয়া যে, সাধু কিংবা সংস্কৃতনির্ভর ভাষা একসময় ছিল। কমলকুমার মজুমদার একজনই হন। দ্বিতীয় একজন কমলকুমার মজুমদার হলে তার গুরুত্ব থাকবে না। তাই বলে তৎসম বা সাধুভাষাকে একেবারে বাদ দিতে বলব সেটাও না। প্রয়োজনে এর ব্যবহার হতেই পারে। অনুজপ্রতিম কথাটা যদি মাথায় আসে তো বলতে দ্বিধা কী ? একবার হতে পারে। এখন বারে বারে যদি আমি অনুজ অগ্রজ ব্যবহার করি, তাহলে তো মুশকিল। সেজন্য আমাকে হিসেব করে লিখতে হবে। যেহেতু সাহিত্য এটা চর্চার বিষয় লিখতে বসলে তা নিজ থেকেই এসে যায়। এটি এক ধরনের সৃষ্টিশীলতাও বটে। আমি এই সৃষ্টিশীলতার প্রশংসা করি। আমি যখন গার্সিয়া মার্কেস অথবা মিলান কুন্ডেরাকে পড়ি, দেখি, তাদের গল্প নিজেকেই প্রস্তাব করে বসছে। তখন তারা নিয়ন্ত্রণকারী নন, সহায়তাকারীর ভূমিকায় চলে যান। লেখক লিখছেন, গল্পটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ সহজ প্রকাশের ওপর জোর দিতেন। একজন গরিব মানুষের ওপর যখন আমি এলিটের ভাষা বসিয়ে দেব তখন গোলমাল হয়। উল্টোটা হলেও তা হয়। আমার বর্ণনার ভাষাটা সুঠাম হতে হবে, সেখানে গোলমাল থাকলে তা দুর্বল হয়।

প্রশ্ন : আপনি আপনার কয়েকজন পছন্দের লেখকের নাম বলুন―কথাসাহিত্য ও কবিতায়।

উত্তর : কবিতায় বাংলাদেশের আবুল হোসেন, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হক, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ। তালিকাটা আরও বড় করা যায় অনেক অনেক কবি আমার পছন্দের, সবার নাম বলা সম্ভব না। এই সময়ের অনেক তরুণ কবিও। তবে তালিকায় শুরুর দিকে যারা আছেন, তাদের প্রায় সব বই আমাদের পড়া হয়ে গেছে। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন পড়াটা একটা চর্চা ছিল। শান্তনু হয়তো একটা বই কিনল, আমি কিনলাম আরেকটা। আদান-প্রদান করে আমাদের পুরো গোত্র বই দুটো পড়ে ফেললাম। আবার বিল্লাহ কিনে এনেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর একটা উপন্যাস, সেটা গোত্রের সবাই কিছুদিনের মধ্যে পড়ে ফেললাম। ঘটনা হচ্ছে কী, তখন তো আর ফেসবুক ছিল না, টেলিভিশনও না, কম্পিউটারও না। পড়াটাই ছিল আনন্দ, পড়াটাই চর্চা। পড়াটাই বিনোদন, পড়াটাই প্রয়োজনীয়। ফলে অনেক সাহিত্য পড়া হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : অন্য দেশের কবিদের মধ্যে কারা কারা বেশি প্রিয় আপনার ?

উত্তর : অন্য দেশের কবিদের মধ্যে এলিয়ট, ইয়েটস, পাউন্ড, ডিলান টমাস, সিমাস হিনি এরকম অনেকে।

প্রশ্ন : কথাসাহিত্যে কার কার কথা বলবেন ?

উত্তর : কথাসাহিত্যে টমাস পিঞ্চনকে আমি পছন্দ করি। ফরাসি সাহিত্যিক রব গ্রিয়ে আমার পছন্দ। শওকত ওসমান আমাকে রব গ্রিয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। গার্সিয়া মার্কেস আছেন, কাফকা আছেন, আলবেয়ার কামু, গুন্টার গ্রাস, কুর্ট ভনেগুট আরও অনেকে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে কোন কোন কথাসাহিত্যিক আপনার প্রিয় ?

উত্তর : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস―এই সময়ের তিনজনের কথা বলেছি, আরও আছেন মঞ্জু সরকার, সুশান্ত মজুমদার, প্রশান্ত মৃধা, ওয়াসি আহমেদ, জাকির তালুকদার, মনিরা কায়েস। আরও অনেকে।

প্রশ্ন : একটা সময় ছিল ইংরেজি সাহিত্য এবং ফরাসি সাহিত্য ভীষণ প্রভাব বিস্তার করত। এখন দেখা যাচ্ছে পৃথিবীজুড়ে ল্যাটিন এবং আফ্রিকান সাহিত্যের প্রভাব। ফরাসি কবি বোদলেয়ার, র‌্যাবোঁ অসম্ভব প্রভাবিত করেছিল। এখন কিন্তু সেটা চোখে পড়ে না। এর কারণটা আপনার কাছে কী মনে হয় ?

উত্তর : পশ্চিমেও ব্যাপারটা লক্ষ করা গেছে। পশ্চিমে এখন যারা ভালো লিখছেন, তারা আসলে ঐভাবে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে পারছেন না। যুগটা এখন খণ্ডিত, অস্থির এবং চমকের। যুগের প্রতিভু হয়ে লেখার মতো মানুষ প্রায় নেই। যেমন দশক চিন্তাটা সাহিত্য বিবেচনায় একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শতাব্দী শেষের বা শুরুর সাহিত্যেরও। আমাদের দেশে দশকওয়ারি আলোচনা বেশ হয়। তাই বোদলেয়ারের কথা বললেই আমাদের একটা সময়ের কথা মনে পড়ে। সিম্বলিস্ট মুভমেন্টের কথা মনে আসে। আমি যদি অডেনের প্রসঙ্গ তুলি, একটা বিশেষ সময়ের কথা মনে আসে। এখন সময় বা কাল চিন্তাটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আর যোগাযোগ এত শক্তিশালী হয়ে গেছে, টেলিভিশন, ইন্টারনেট আজ কাল পরশুর পার্থক্য ভুলিয়ে দিচ্ছে। যুগটা এখন চলে পর্দার ছবির মতো। কোনও কবি বা সাহিত্যিক ঠিক কোন যুগের হয়ে লিখছেন তা ভাবতে পারছেন না। কারণ যুগটা খুব তাড়াতাড়ি পাল্টে যাচ্ছে। কম্পিউটারের যুগে এখন ফোর্থ বা ফিফথ্ জেনারেশন চলে আসছে। এখন চার বছরেই যদি একটা প্রজন্ম পাল্টে যায়, তাহলে স্থিতিটা কোথায় ? তাছাড়া কবির সংখ্যা এখন এত যে, কাকে ছেড়ে কাকে পড়ব এটা একটা মধুর বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার, বুকার পুরস্কার আরও কত কত পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে―কাকে আমি এগিয়ে রাখব, কেন এগিয়ে রাখব এই বিচারটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রশ্ন : আমার মনে হয় আফ্রিকান এবং ল্যাটিনরা তাদের সাহিত্যকে অনেক বেশি লোকালাইজড করতে পেরেছে। এ কারণে তাদের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।

উত্তর : তুমি ঠিকই বলেছো। এই গোলকায়িত বিশ্বে, অভিবাসন সংকটের বিশ্বে বৈশ্বিকতাটা স্থানীয়তাকে ছাপিয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মানুষ তার আদি ঠিকানার জন্য কাতর থাকে, স্থানীয় চিন্তা ও কল্পনাটা একটা মুক্তি হিসেবে দেখা দেয়। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকান সাহিত্যিকরা এই বিষয়টাতে জোর দিয়েছে। তাছাড়া এ দুই অঞ্চলের সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের কল্পনার যোগটা বেশি―এক তো এদের কথ্যসাহিত্যে ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য, এবং দুই, এদের উত্তর উপনিবেশী অবস্থানের জন্য।

প্রশ্ন : এটা ইংরেজি সাহিত্য ফরাসি সাহিত্য আমাদের দিতে পারছে না ?

উত্তর : না, সেটা ইংরেজি সাহিত্য আমাদের দিতে পারছে না। আর ফরাসি সাহিত্যের ভেতরে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাটা বেশি, স্টাইলাইজেশনটাও বেশি। অনুবাদ মাধ্যমে আমরা যারা ফরাসি সাহিত্য পড়ছি, তারা তো আর মূলটা বুঝতে পারছি না। মূল ফরাসি ভাষায় যারা পড়তে পারছেন তারা হয়তো আনন্দ পাচ্ছেন।

প্রশ্ন : আপনি তো প্রচুর বিদেশি সাহিত্য পড়েন। আবার বাংলায় সাহিত্য রচনা করেন। বিশ্বের উন্নত সাহিত্যের পাশাপাশি আমাদের বাংলা সাহিত্যকে কীভাবে বিবেচনা করা যায় ?

উত্তর : বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে এখন আর আমাদের সাহিত্যের তেমন কোনও বড় মৌলিক তফাত নেই। আমাদের কথাসাহিত্য তো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তফাতটা বড় করেছে বাজার, ভাষিক ঔপনিবেশিকতা। অনেকে পশ্চিমা লেখক নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন, এটা সেটা নানা পুরস্কার পাচ্ছেন, তাদের একটা বাজার সৃষ্টি হয়ে গেছে বলে। যেমন ঝুম্পা লাহিড়ী বিরাট মানের সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচিত কিন্তু তার অনেক গল্প খুবই সাদামাটা। তার দ্য ল-ল্যান্ড নামে একটা উপন্যাস বেশ নাম করেছে। তার প্রকাশক ভালো বাজার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটি পড়াতে গিয়ে দেখলাম, ছেলেমেয়েরা কেউ সেটি পছন্দ করেনি। আমাদের সাহিত্যের সেই প্রচার প্রসারটা নেই বলে এতটা পিছিয়ে আছে। কিন্তু এখন যে মানের সাহিত্য পশ্চিমে রচিত হচ্ছে তা থেকে আমাদের সাহিত্য তেমন পিছিয়ে নেই। আমাদের তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী যদি অনূদিত হতেন তাহলে বহু আগে বিশ্বসাহিত্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। সাহিত্যের বাজার একটা প্রাচ্যবাদ তৈরি করেছে। পশ্চিম একজন লেখকের বাজারটা তৈরি করে ফেললে, এমনকি এই উপমহাদেশের কোনও লেখকেরও, আমরা তাকে উঁচু একটা আসন দেই। ওরা ওপর থেকে চাপায় বলে আমরা মাথা তুলে তাকাই। কিন্তু এখন তো আমরা অনেকে সামনাসামনি তাকাই। কিছুদিন পর নিচের দিকেও তাকাতে পারব। এই আত্মবিশ্বাস আমাদের লেখকদের ভেতর আসছে, আমি দেখতে পাচ্ছি। তাদেরকে কতগুলি কাজ করতে হবে। ওই পশ্চিমা মাপটা ভুলে যেতে হবে। আমরা আমাদের মতো লিখব। আধুনিকতার উত্তরাধুনিকতার সংজ্ঞাটাও নিজেদের মতো করে দেব। আর পশ্চিমের সব কিছু অনুকরণ করতে যাব কেন ? ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য পড়ছি বলে আমাকে ওরকম লিখতে হবে ? আমাকে আমার মতো লিখতে হবে। একদিন সৈয়দ হকের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। উনি বললেন, আমাদের কি জাদুবাস্তবতা নেই ? লালনের গানে কি জাদুবাস্তবতা নেই ? আমি বললাম অবশ্যই আছে। উনি বললেন, আমরা পশ্চিমের সাহিত্য নিয়ে মাতামাতি করি কেন ? আমি বললাম এই সাহিত্য প্রথমত ভালো অনেক গল্প কবিতা উপন্যাস নাটক দিয়েছে সেজন্য। এবং দ্বিতীয়ত এই সাহিত্য ব্র্যান্ডেড হয়ে গেছে সেই জন্য। আমরা তাহলে কী করতে পারি ? আমি হেসে বললাম, আমরাও যেহেতু খারাপ লিখছি না, আমরাও তাহলে একটা ব্র্যান্ডিং অভিযানে নামি। আমাদের মতো করে। যেসব কাজ খুব ভালো সেগুলি নিয়ে নিজেরাই আমরা কেন নামি না! হক ভাই বললেন, সম্ভব ? আমি বললাম আর দুই দশকের মধ্যে সম্ভব। হক ভাইকে যেমন বলেছি, তোমাকেও বলি অর্থনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কটা গুরুত্বপূর্ণ। যেদিন আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে সেদিন আমাদের সাহিত্য পড়তে দুনিয়ার আগ্রহ জাগবে। আমাদের সাহিত্য আরও দূর যাবে। যেমন কোরিয়ার অর্থনীতি যতই এগোলো, কোরিয়ান সাহিত্যের দাম বেড়ে গেল। অথচ কোরিয়ান সাহিত্য আগেও যা ছিল এখনও তাই আছে। এখন কোরিয়ান সাহিত্য নানা জায়গায় পড়ানো হয়, কারণ তাদের অর্থনীতি অনেক বড়। তাদের স্যামসাং কোম্পানি যা উপার্জন করে, তা দিয়ে আমাদের দশ বছরের বাজেট চলে। আমাদের অর্থনীতিও একদিন সেরকম জায়গায় এলে আমাদের সাহিত্যেরও কদর বাড়বে। কোনও সমস্যা নেই। আমাদের যা করতে হবে, আমাদের সাহিত্যের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে হবে। আর ভালো লেখা লিখে যেতে হবে।

প্রশ্ন : মোট কথা আমাদের আত্মপরিচয়কে তুলে ধরতে হবে।

উত্তর : হ্যাঁ। আমরা অন্যের থেকে উৎসাহ নেব, কিন্তু তাদের অনুকরণ করব না। ভালো জিনিস তো আমরা সবখান থেকেই গ্রহণ করতে পারি। ভালো জিনিস তো গম্ভীরা থেকেও নিতে পারি। লালন থেকেও নিতে পারি, আবার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্য থেকেও নিতে পারি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তো তা করে দেখিয়েছেন। চেতনাপ্রবাহের একেবারে আত্তীকরণ ঘটিয়ে নিজের করে নিলেন। আমি যদি তাঁকে ভালো অনুবাদে ভালো বাজারের প্রশ্রয়ে অনুবাদ বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারতাম তখন সবাই বলত এই হচ্ছে বাংলাদেশি চেতনা প্রবাহের ঐতিহ্য। যদি শহীদুল জহিরকে ছড়িয়ে দিতে পারতাম, দুনিয়ার পাঠক বলত, এই রে, জাদুবাস্তবতা দেখি বাংলাদেশের ঐতিহ্য! যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, তখন আমাদের প্রচার এমনিতেই হবে। এমনিতেই আমাদের সাহিত্য বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।

প্রশ্ন : এই যে আমাদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী বা এন্টিস্টাবলিশমেন্টের যে চর্চা, লিটলম্যাগ কেন্দ্রিক যে আন্দোলন, সেটি তো একেবারে উঠেই যাচ্ছে। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন ?

উত্তর : আমরা যত যাই বলি লিটলম্যাগ প্রকাশের জন্য তো টাকা-পয়সা লাগে। এটা সাধারণত যোগাত ব্যাংক ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এখন বিজ্ঞাপন নিয়ে যাচ্ছে পার্টিবাজ আর মতলববাজরা। এখন যে লিটলম্যাগের চর্চা কমে যাচ্ছে তা খুবই হতাশার। আমি তো এখনও বলি লিটলম্যাগ হলো আমাদের সাহিত্যের বাতিঘর। লিটলম্যাগ থেকে আমি সাহিত্যের নাড়িটা বুঝতে পারি, আমাদের সাহিত্যের কোথায় কী ঘটছে তা জানতে পাারি। যখন চাঁদপুর বা নীলফামারী থেকে একটা লিটলম্যাগ বের হয়, আমি তা আগ্রহ নিয়ে সংগ্রহ করি। পড়ি। কারণ এগুলো থেকে সাহিত্যের হালচাল জানা যায়। এরা যদি মরে যায় তাহলে তো সবাই বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢুকে যাবে। সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান সরকার, সরকারের তো লিটলম্যাগকে সাহায্য করার কোনও কারণ নেই। আমি মনে করি বাংলা একাডেমির বইমেলাতে কলকাতার বইমেলার মতো মস্ত বড় লিটলম্যাগ কর্নার করতে হবে। তবে ওই কর্নারকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না, মূল মেলার সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে। মেলার ঠিক মাঝখানে বড় পরিসরে একটি চত্বর করে দিতে হবে। সেখানে ছোটবড় সব লেখকের মতবিনিময় হবে, আড্ডা দেবার সুযোগ তৈরি হবে। লিটলম্যাগ চত্বর প্রাণ ফিরে পাবে। প্রয়োজনে এবার মেলা কমিটিকে আমি প্রস্তাব করব। আগে যেমন আমরা লিটলম্যাগ চত্বরে আড্ডা দিতাম, আশা সেই দিন আবার ফিরবে। আর অনুপ্রেরণা পেলে লিটলম্যাগ চর্চা হয়তো আরও বেগবান হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button