
রাতে প্রচণ্ড ঝড় হয়েছে। দেওয়াল আর শক্ত মোটা কাচের জানালা ঘেরা আবদ্ধ ঘরের ভেতর থেকে ঝড়ের তীব্রতা অতটা আচ করতে পারেনি কেউ-ই। শুধু রাতের অন্ধকারে সোঁ সোঁ আওয়াজ ভেসে আসছিল। বৃষ্টির ঝাপটার মতো বাতাসের ঝাপটা এসে কাচের জানালায় ধাক্কা লেগে অদ্ভুত শব্দ তৈরি হয়েছে। অচেনা বিশালাকৃতির এক অজগর যেন এই শহরে তাণ্ডব চালাতে উদ্যত হয়েছে। লম্বা লাল টুকটুকে আগুনের একটা জিহ্বা বের করে হিসহিস শব্দে তাণ্ডব চালিয়েছে সারা শহর। অন্ধকারের গহ্বরে সামনে যা পাচ্ছে সব কিছুই যেন গ্রাস করে চলেছে সে। বাইরের এই দৃশ্য দেখা না গেলেও ঘর থেকে শোনা যায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানো আর মেঘের কড়কড় গর্জন। জানালার গ্লাস ভেদ করে ঠিকই সেই আলোর ঝলকানি ঘরে ঢুকেছে। এরপর ধীরে ধীরে সব কিছু কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। কোনও আওয়াজ নেই। শুনশান নীরবতা কাটিয়ে বৃষ্টি ভেজা একটা ভোর এল।
ফজরের নামাজ শেষে আনাস উদ্দিন প্রতিদিনের মতো আজও তার ঘরসংলগ্ন দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। আজকাল চোখে খুব কম দেখছেন। চশমাটা বদলানো দরকার। ডাক্তারকে চোখটা দেখাতে পারলে ভালো হতো। নিজেই নিজেকে এমন কথা আনাস উদ্দিন প্রতিদিনই বলেন। এভাবেই আপনা আপনি কথা বলেন। যখন কথা বলার মতো কেউ থাকে না, কিংবা তার কথা শোনার মতো কেউ থাকে না তখন বাতাসের সাথে কথা বলেন তিনি। পৃথিবীর সব মানুষই প্রতিনিয়ত নিজের সাথে কথা বলে। যখন সে একা থাকে বা নিজেকে একা মনে হয় ঠিক তখন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে। নিজে তার উত্তর নেয়। জীবনের পাওয়া, না পাওয়ার অঙ্কগুলো হিসেব কষতে থাকে। নিজেই প্রশ্নকর্তা আবার নিজেই উত্তরদাতা। কখনও কখনও কথা বলে যায় বিরামহীন। কখনও হাসে, কখনও কাঁদে। আবার কখনও নিজের গৌরবের কথা ভেবে মিটিমিটি হাসে। এই আনন্দটুকু আছে বলেই মানুষ বেঁচে আছে। কথোপকথন চলে শব্দ করে। আবার কেউ কেউ শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে বলে। অথবা কেউ কেউ চুপচাপ মনের গভীরে একটা জগৎ তৈরি করে। একলা কথা বলার জগৎটা সব মানুষেরই জন্মগত প্রবৃত্তি। বেঁচে থাকার জন্য এই জগৎটা খুব প্রয়োজন। আনাস উদ্দিন শব্দ করে কথা বলার দলে। হঠাৎ যে কেউ দেখলে ভাববে মানুষটা অদৃশ্য কারও সাথে কথা বলছে।
‘চোখের ছানিটা বড্ড কষ্ট দিচ্ছে। বয়স কতইবা হয়েছে ? এই বয়সে চোখের এই অবস্থা। হবেই বা না কেন। অফিসে কাজ-ই তো ছিল সারাক্ষণ কম্পিউটারের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা। কম্পিউটারের স্ক্রিনের আলো চোখ দুটোকে ইচ্ছেমতো খেয়ে ফেলেছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে পরনের পাঞ্জাবির কোনা দিয়ে চশমার কাচটা একবার মুছে নিয়ে আবার চোখে দিলেন। পায়ের তলায় ঝরাপাতা আর বৃষ্টি ধোঁয়া শীতল মেঝে। রুম থেকে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন বারান্দায়। বারান্দা থেকে দেখা যায় বড় রাস্তাটা। ঢাকা শহরের সব রাস্তা-ই এখন যানজটে পূর্ণ। রাত-দিন কোনও সময় ফারাক নেই। সব সময় লোকজনে গমগম করে। সকালের ভেজা রাস্তাটা দেখে মনে হয় যেন ব্যস্ত মানুষের পায়ে পিষ্ট হয়ে কাঁদছে। তারই ফলস্বরূপ ভিজে আছে আখি জলে। বৈদ্যুতিক তারে ক খানা কাক এসে বসল। খাবারের খোঁজে ক্ষুধার্ত চোখগুলো ক্যামেরার মতো ছবি তুলছে আশেপাশের জমে থাকা উচ্ছিষ্টের। কর্কশ স্বরে কা কা কা শব্দে মেতে উঠল কয়েকবার। বৃষ্টি ভেজা বৈদ্যুতিক তারে কাকেদের বসে থাকার দৃশ্য ঢাকা শহরে প্রকৃতির যেন নিত্য আয়োজন। আনাস উদ্দিন কাকগুলো দেখে আর ভাবনার জগতে বিচরণ করে। গ্রামে হাজারও পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙ্গত তার। টুনটুনির টুনটুন, চড়ুইয়ের ফুরৎ ফুরৎ, দোয়েলের শিস কতই না হৃদয় শীতল করা আর কান জুড়ানো গান। কতটা বছর পেরিয়ে গেছে সেই গান শোনা হয় না। এখানে রাস্তাঘাটে, পার্কে বাজে কলের গান। কাকের কর্কশ স্বরে কা কা কা ডাকে মাথা ধরে যায়।
ক্ষুধার্ত কাকগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে আনাস উদ্দিন। এক সময় নিজেকে কাকের সাথে তুলনা করে। সেও তো একদিন কাকেদের মতো এই শহরে এসেছিল খাবারের সন্ধানে। তখন আনাসের চোখে ক্ষুধা ছিল না বটে তবে ছিল চোখ ভরা স্বপ্ন। এই তো সেদিনের কথা, সদ্য কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পড়া শেষ করেছে। বাবা মায়ের একমাত্র আদরের ছেলে আনাস উদ্দিন। বড় তিন বোনের পর বাবা মায়ের একমাত্র অবলম্বন হয়ে জন্ম হয় আনাসের। গ্রামের মানুষের ধারণা, যে সংসারে ছেলেসন্তান নেই সে সংসার সাংসারই না। ভিটেবাড়িতে প্রদীপ জ¦ালানোর জন্য একটা ছেলেসন্তানের দরকার হয়। গ্রামের মানুষের ঘর সংসার বলা যায় এজন্যই। আনাসের বাবা ছিলেন চাষি মানুষ। তবে তিনি চাষ বুঝতেন না। বড্ড সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। নিজের জমিতে চাষ করলেও ফসলে তেমন ফলন হতো না। ফসলের পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাব ছিল। আনাসের পড়ালেখার খরচ জোগাতেই হিমশিম খেতে হতো। এর মধ্যে তিন মেয়ে-জামায়ের খাতির যত্ন। গ্রামের মানুষের কত রকমের প্রথা, কথা, গান। এগুলোর ব্যতিক্রম হলে জাত যাবে। মেয়েদের যাওয়া-আসা, নাতি-নাতনিদের দেওয়া-থোয়া দেখা-শোনা করতে গিয়ে বেচারার নাকের জলে চোখের জলে হাবুডুবু খাওয়া অবস্থা। নিয়ম রক্ষার্থে অর্থের চাহিদা মেটাতে গ্রামের লোকেদের কাছে ধানের উপর আর সুদের উপর টাকা নিয়েছে বছরের পর বছর। বছর ঘুরতেই সে-টাকা হয়ে গেছে সুদের উপর সুদ। এভাবে চলতে গিয়ে দেনা ঠেকে যায় কয়েক লাখে।
আনাস ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেই একটা চাকরির সন্ধান পেয়ে গেল। চাকরিটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনায় বেতন তিনগুণ বেশি। চাকরিটা জুটিয়ে দিল এক দূর সম্পর্কের মামা। মামা সাহেব তার এক সহকর্মীর এক শর্তে টাকা ছাড়াই চাকরিটা হাতিয়ে নিলেন বলা চলে। তবে মামা চেয়ে বসলেন সাত লক্ষ টাকা, সাহেবদের মিষ্টি খাওয়াতে হবে বললেন। আনাসের বাবা টাকা দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। এতগুলো টাকা এক সাথে দেওয়াটা তার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু আনাসের মা ছেলের জন্য এ সুযোগ ছাড়তে নারাজ। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘জমি-জিরাত থেইকি লাভ কী ? যে জমি থেইকি দুবেলা ডাল ভাতের বন্দোবস্ত করতে হিমশিম খেইতি হয় সেই জমি ঘুচিয়ে যদি ছেলেটার একটা স্থায়ী কিনারা করা যায় তাতে মন্দের কিছু দেখচিনি। ববং মাসে মাসে একটা মোটা অংকের ট্যাকা পাওয়া যাবে।’ শাশুড়ির এমন প্রস্তাবে আনাসের দুলাভাইয়েরা বাঁকা হয়ে বসলেন। তারাও অঙ্কে কাঁচা না। শ্বশুরের জমি কমে গেলে তাদের ভাগ কমে যাবে। মায়ের জোরাজুরিতে জমি বিক্রি করে টাকা দেওয়া হলো। চাকরির সময় দুলাভাইয়েরা এক জোট হয়ে ও-বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দিল। কিন্তু সেই মান-অভিমান বেশিদিন স্থায়ী হলো না। আনাস ঢাকায় এসে চাকরিতে যোগদানের পর প্রথম মাসেই যে বেতন পেয়েছিল তা থেকে সামান্য কিছু অংশ নিজের মেস খরচ আর পকেট খরচের জন্য রেখে বাকিটা পাঠিয়ে দিল গ্রামে। টাকা আসতে দেখে বোন দুলাভাইদের আসা-যাওয়া শুরু হলো। এর মধ্যে চাকরি শুরু হতে না হতেই বাবার ঋণের বোঝা এসে পড়ল আনাসের কাঁধে। বেতনের উপর ব্যক্তিগত লোন করে একে একে শোধ করল ঋণ। বাবার ঋণের টাকা শোধ হতে না হতেই মা প্রায় বলত, ‘বাপ, জমি বিক্রির জইন্নি তোর বুবু দুলাভাইয়েদের মান অভিমান। তোর জইন্ন্যি যে জমি বেইচি দিলাম সেই জমি একোনো রেস্ট্রি হয়নি। উয়ারা একোন টাকা নি-ই জমি ফেরত দিইতি চাইচি। জমিটা এবার তুই ঘুরা বাপ।’
মায়ের কথামতো আবারও বেতনের উপর ব্যক্তিগত লোন নিতে বাধ্য হয় আনাস। জমি ফেরত নিয়ে বাবার নামে দেওয়া হলো। মাস শেষে কিস্তির টাকা কর্তন করে বেতন যা হাতে পাওয়া যেত তা থেকে বাড়িতে টাকা পাঠালে নিজের চলার মতো যা থাকত তা নাম মাত্র। এর মধ্যে দুলাভাইদের নানা বায়না। শালাবাবু ভালো বেতনে চাকরি করে। সেই সুবাদে বোন দুলাভাইদের একেক জনের একেক রকম আবদার মেটাতে হতো আনাসকে।
এভাবে বছর দু-চার যাওয়ার পর আনাসের চাকরিদাতা মামা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির। মামার সেই সহকর্মীর মেয়ে। ব্যাপারখানা খুলেই বলি, মামার সহকর্মীর মেয়ের সাথে বিয়ে দেবে এই শর্তে আনাসের চাকরিটা দিয়েছে মামা। আর ওদিক থেকে আনাসের বাবার দেওয়া সাত লক্ষ টাকার খবর জানেন না মামার সহকর্মী। চার বছর থামিয়ে রেখেছেন নানা অজুহাতে। এখন আর থামিয়ে রাখা সম্ভব না। মামা উঠে পড়ে লাগলেন বিয়ের জন্য। বড় ঘরের মেয়ে। টাকা পয়সা ব্যাংক ব্যালেন্স আছে। ঢাকাতেই দুটো ফø্যাটবাড়ি। এসব শুনে আনাসের বাবা মা রাজি হলেন। আনাস কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। তার পছন্দ গ্রামের গৃহস্থ বাড়ির মেয়ে। শ্যামলা বরন গায়ের রং। মাথার চুল কোমর ছাড়িয়ে যাবে। শরীর দিয়ে বের হবে খাঁটি মাটির গন্ধ। কিন্তু বাবা মায়ের কাছে আনাসের সেই চাওয়ার কোনও মূল্য নেই। বাবা মা কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছে। ভালো একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এমন সব কত কথা শুনতে হয় তাকে। যা ইতিপূর্বে কতবার যে তাকে শুনতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বাবা মায়ের মুখ রক্ষা আর বাধ্য সন্তানের শেষ পরীক্ষাটা তাকে দিতে হয়।
বিয়ের পর বাবা মায়ের প্রতি আনাসের তেমন কোনও নজর দেওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। আনাসের স্ত্রী মৌরি কোনও রকম যোগাযোগ করতে দেয়নি তাকে। মৌরি মাঝে মাঝে এ নিয়ে ঝামেলা করে, ‘এতদিন যা দিয়েছো দিয়েছো এখন ওসব চলবে না।’ আনাস ভদ্রতা রক্ষার্থে কাউকে কিছু জানাত না। চুপচাপ মেনে নিত সব। এসবই তার ভাগ্যের ফের। মৌরি ঢাকাতেই বড় হয়েছে। নামি দামি স্কুল কলেজে পড়াশোনা তার। বড়লোক বন্ধুদের সাথে চলাফেরা। যখন ইচ্ছে বাইরে যাওয়া। যখন খুশি বাড়ি ফেরা। মাঝে মাঝে কী সব খেয়ে মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরা। আনাসকে বোঝায় সবাই, ‘এখনকার ছেলেমেয়েরা একটু আধটু এমন হয়।’ শ্বশুরের এক ছেলে এক মেয়ে। বাবা মায়ের আদরের মেয়ে। শ্বশুরমশাই আনাসের মতো ছেলের সন্ধানে ছিল, যে ছেলেকে চাকরি দিয়ে সংসার পাতিয়ে দিয়ে নিজের কাছে রাখবে। শ্বশুরমশাই যা চেয়েছে তা পেয়েছে। আনাসের শ্বশুর শাশুড়ি অন্য ফ্ল্যাটে থাকে ছেলে বৌ নিয়ে। মেয়েকে ফ্ল্যাট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে।
চাকরিতে যোগদানের পর একের পর এক বেতনের ওপর ব্যক্তিগত লোন নিতে হয়েছে। কখনও বাবার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। কখনও বা বিক্রি জমি উদ্ধার করা। যখন সংসার শুরু হলো তখন থেকে শুরু হলো লোনের দ্বিতীয় দফা। গ্রাম থেকে কিছুই আসে না। পুরো সংসার পেতেছে আনাস নিজেই। আসবাসপত্র কেনা থেকে শুরু করে বৌয়ের স্বর্ণালঙ্কার। মৌরির একটার পর একটা চাহিদা পূরণ করা। আনাস যেন ইচ্ছেপূরণের দৈত্য। হুকুম করার সাথে সাথে সব কিছু হাজির হতে হবে। বেতন থেকে লোনের টাকা কেটে যা হাতে আসে তা থেকে সংসার চালিয়ে অন্য কিছু ভাবা অসম্ভব। পরিশেষ আনাসের চাকরি জীবনে জমার খাতায় শূন্য।
ধীরে ধীরে সংসার বড় হয়। মেয়ের জন্মের পর আরও যেন নতুন খরচ যুক্ত হয়। মৌরি মেয়েকে বাবার মতো গেয়ো ক্ষ্যাত বানাতে নারাজ। মেয়েকে হতে হবে স্মার্ট। মৌরির কাছে স্মার্ট মানে বে-পরোয়া জীবন। নারীবাদী মৌরির কথা একটাই, ঘরবন্দি থেকে নিজেকে স্বামীর কাছে বিলিয়ে দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। আর তাই মেয়েকে বড় করেছে নিজের আদলে। আনাসের বিশ্বাস ছিল রক্ত কখনও বেইমানি করে না। কিন্তু আনাসের এই অতি পুরোনো ধারণা দিন দিন অবিশ্বাসে পরিণত হতে থাকে। যখন মেয়ে বড় হয়ে মায়ের দেখানো পথে হাঁটতে থাকে তখন আনাসের বিশ্বাসের মূল উপড়ে যায়।
জীবন অতি সামান্য সময়ের অতিথি মাত্র। ব্যস্ততার মধ্যে কখন যে জীবনের সূর্যটা আলোর রশ্মি কমিয়ে দিয়ে পশ্চিমে অস্ত যায় তা বুঝে উঠতে উঠতেই সূর্য ডুবে যায়। মৌরির সিদ্ধান্তে তার কোটিপতি বন্ধু রাহাত খানের ছেলের সাথে বিয়ে দেয় মেয়ের। বিয়েতে আনাসের কোনও মতামত নেওয়ার প্রয়োজনটুকু মনে করেনি মা কিংবা মেয়ে দুজনে। মেয়েও মায়ের মতের বিরুদ্ধে কথা বলেনি। ঐশ্বর্যর কাছে আনাস উদ্দিন খড়কুটো মাত্র।
মেয়ের বিয়ের পর মৌরির বেয়াড়াপনা আরও বেড়ে যায়। বেড়ে যায় আরও বাইরে রাত্রি যাপন। রাহাত খান এখন তার শুধু বন্ধুই নয় কাগজে কলমে তারা বেয়াই-বেয়ান সম্পর্ক। স্বামীর প্রতি মৌরির কোনও দিন কোনও দায় দায়িত্ব ছিল না, এখনও নেই। মৌরির অবসর কাটে বন্ধুদের সাথে ক্লাবে কিংবা রাহাত খানের সাথে কোনও অচেনা অথবা তাদের চির চেনাজানা পার্কে, রেস্টুরেন্টে অথবা হোটেল মোটেলে। যেখানে তারা দুজনে দিন-রাত্রি যাপন করেছে কত বার যার কোনও হিসাব নেই। আনাসের অবসর কাটে কখনও রমনা পার্কে, কখনও বা চন্দ্রিমা উদ্যানে একা একা বাদাম খেতে খেতে। ঢাকা শহরে এসে পাওয়া না-পাওয়ার জীবনে বড় প্রাপ্তি তার এটাই। মুক্ত বাতাসে খোলা আকাশের নিচে দু দণ্ড বিশ্রাম পায় সে। ঢাকা শহরে বসবাসরত মানুষেরা এই অবকাশ যাপনের সুযোগ পায় কজনে ?
বিদ্যুতের তারে বসে থাকা কাকগুলো কর্কশ স্বরে কা কা কা ডেকে উঠল। রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা খাবার মুখে তুলে উড়ে গেল কোথাও। এরই মধ্যে দিনের আলো বাড়তে শুরু করেছে। সেই সাথে বাড়তে থাকে পথচারিদের ভিড়। সূর্যের আলোর রেখা চশমার কাচ ভেদ করে চোখে এসে পড়ল আনাসের। চোখের কোনায় জমে থাকা দু ফোটা অশ্রুবিন্দু যেন সকালের দূর্বাঘাসের ওপর জমে থাকা শিশির বিন্দুর মতো জ¦লে উঠল। চমশার কাচটা আরও একবার মুছে নেয় আনাস। সদ্য মুছে নেওয়া চশমাটা চোখে পরে। ঝাপসা চোখের দৃষ্টি বহু দূর টেনে নিয়ে যায়। অথচ আনাসের মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। গ্রামের বন্ধুদের সাথে চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া। বিকেল হলে এক সাথে এ-পাড়া ও-পাড়া ঘুরে বেড়ানো। চাকরি পাওয়ার পরও মাস অন্তর না হলেও অন্তত দু’মাস পরপর বাড়ি যাওয়া। বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধুমহল, কত শত আবদার আনন্দ সুখ। জীবন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় কেন ? কল্পনার জগৎ থেকে ফিরে আসে আনাস। বাস্তব জীবনের চেয়ে কল্পনার জীবন কত রঙিন। যখন ইচ্ছে সুখের কাছে ঘুরে আসা যায়। যখনই জীবনকে অর্থহীন মনে হয় ঠিক তখনই মানুষ তার নিজের তৈরি কল্পনার জগতে ডুবে যায়। একটু সুখ অনুভব করে। তখন বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে হয়। কল্পনার এই জগৎটা যদি না থাকত তবে মানুষের হয় তো বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা মরে যেত।
সকাল থেকে মনটা ভালো নেই আনাস উদ্দিনের। বারবার মনে পড়ছে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। যখনই মনে পড়ছে তখনই চাপা কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকিয়ে আটকে যাচ্ছে। কান্নাটা বেরিয়ে গেলে একটু হালকা মনে হতো। কিন্তু চাপা কষ্ট তাকে হালকা হতে দিচ্ছে না। জোহরের নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে বিষণ্ন মনে আবারও বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আশ্রমের গেটের দিকে নজর যেতেই দেখতে পেল একটা চেনা মুখ এগিয়ে আসছে। কে আসছে ? চশমার কাচটা মুছে নিয়ে চোখে দিল আবার। চেনাচেনা লোকটা আরও এগিয়ে এল আশ্রমের দিকে। আনাসের বুকের ভিতর ধক করে উঠল। হ্যাঁ, তার পরিচিত মুখ। কিন্তু কে ? এই কে-র উত্তর পেতে সময় লাগেনি বেশিক্ষণ। তার বাল্যবন্ধু, কিশোর কালের বন্ধু হাসেম। প্রাণের বন্ধু হাসেম।
কতদিন পর দেখা হয় দুবন্ধুর। কত মান-অভিমানের গল্প। ফেলে আসা দিনের গল্প। দুজন দুজনাকে জড়িয়ে ধরে। শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে দুজন। হাসেম যেন ফিরে পেয়েছে তার রক্তের ভাইকে। হ্যাঁ ঠিক তাই, রক্তের ভাই। বন্ধু শুধু বন্ধু নয়। বন্ধু কখনও কখনও অভিভাবক হয়, কখনও বা ভাই। যাকে সব কথা বলা যায়। সব সময় পাশে পাওয়া যায়। সে-ই তো প্রকৃত বন্ধু। এমনই একজন বন্ধু হাসেম। হাসেম পকেট থেকে কাগজের একটা বান্ডিল বের করে আনাসের হাতে দেয়, ‘এটা তোর ভিটে বাড়ির জমির দলিল। চাচা এগুলো আমার কাছে গচ্ছিত রেখেছিল। তুই যখন টাকা দেওয়া বন্ধ করলি তখন চাচা তোর বোনদের নামে কিছু জমি লিখে দেয়। বাকি জমিগুলো বিক্রি করে নিজের সংসার চালিয়েছিল। মৃত্যুর আগে বাড়ির জমির দলিলটা তোর নামে লিখে দিয়েছে। চাচার মৃত্যুর পর সেই যে চলে এলি এরপর তোর আর কোনও খবর পাওয়া গেল না। না তুই গ্রামে এলি, না কোনও যোগাযোগ করলি। এক প্রকার বাধ্য হয়ে চলে এলাম তোর কাছে। তোর ফ্ল্যাটবাড়িতে গিয়েছিলাম। পরে খোঁজ পেলাম তুই এখানে।’
বাবার রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি নেড়েচেড়ে দেখে আনাস। মায়ের মৃত্যুর পর তার আপন বলতে বাবাকেই জানত। বাবা যেদিন চলে গেল সেদিন থেকেই আনাস একা হয়ে গেছে। এরপর আর গ্রামে যাওয়া হয়নি।
মানুষ যখন একা হয়ে পড়ে তখন তার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও মরে যায়। আনাসের ঠিক তেমনটা। বাবা মা নেই। পরিবার যেটা আছে সেটাকে পরিবার বলে না। যেখানে আনাসের ব্যক্তি জীবনের কোনও চাওয়া-পাওয়া নেই সেখানে আর নয়। চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেয় আনাস। অবসরের পুরো টাকা স্ত্রী ও মেয়ের হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘এই শেষ, দেওয়ার মতো আমার কাছে আর কিছু নেই। তোমরা তো সারা জীবন এগুলোই চেয়েছিলে। এবার আমায় মুক্তি দাও।’
সেদিনই বের হয়েছিল এক কাপড়ে। আর ফেরেনি। তাকে ফেরাবে এমন কেউ নেই এ শহরে।
‘আমার সাথে চল গ্রামের বাড়িতে। তোর নিজের বাড়িতে। আমার ছেলের বিয়ে দিয়েছি। একটা ব্যবসা পাতিয়ে দিয়েছি। তোর মতো আমিও অবসর জীবনে আছি। দুজন আবার ফিরে যাব সেই কিশোর কালে, ফিরে যাব সেই যৌবন কালে। টঙ দোকানে চা খাব আর আড্ডা দেব।’
আনাস যেতে না চাইলেও হাসেম নাছোড়বান্দা। প্রাণের বন্ধুকে কিছুতেই থাকতে দেবে না আশ্রমে।
গাড়ির জানালা খুলে আরও একবার তাকিয়ে দেখে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কেটে নেওয়া এই নিষ্ঠুর শহরটাকে। একদিন হাজারও স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল এই শহরে। শহর তাকে টাকা পয়সা সম্পদ সম্পত্তি ঠিকই দিয়েছিল। শুধু কেড়ে নিয়েছিল ভালোবাসাটুকু। এখানে ভালোবাসা নেই। আছে শুধু রঙিন বাতির মতো মরীচিকার ঝলকানি। হাসেমের প্রস্তাবে আনাস প্রথমে আপত্তি করলেও পরে বন্ধুত্বের কাছে হার মানতে হয়েছে তাকে। হার মানতে হয়েছে নিয়তির কাছে। খালি হাতে যেমন এসেছিল একদিন ঠিক আজও খালি হাতেই ফিরতে হবে তাকে। অর্থ আর ঐশ্বর্যকে পায়ে মাড়িয়ে শূন্য হাতে আজ তাকে ফিরতে হবে শিকড়ের টানে।
সচিত্রকরণ : রজত



