
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনচিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী ধারা। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, নগরায়ণ, শ্রমসংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নিম্নবর্গের জীবনকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের সমকালীন গল্পকারদের সাহিত্যকর্মে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সমকালীন জীবিত গল্পকাররা নিম্নবিত্ত মানুষকে কেবল করুণার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং তাঁরা নিম্নবর্গের মানুষকে সচেতন, সংগ্রামী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন। ফলে আধুনিক ছোটগল্পে নিম্নবিত্ত জীবনকে নৈতিক সহানুভূতির গণ্ডি থেকে বের করে শ্রেণি, ক্ষমতা, প্রতিবাদ ও মানবিক মর্যাদার ভাষায় রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সমকালীন গল্পে নিম্নবিত্ত জীবন রূপায়িত হয়েছে এমন কজন গল্পকারের গল্প নিয়ে এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। এঁরা হলেন বিপ্রদাস বড়ুয়া, সেলিনা হোসেন, ইউসুফ শরীফ, হরিশংকর জলদাস, হুমায়ূন মালিক, মোহিত কামাল এবং মামুন হুসাইন।
১. প্রথমেই বিপ্রদাশ বড়ুয়ার গল্পসাহিত্য আলোচনার প্রসঙ্গ করা যাক। আঞ্চলিক জীবন তথা গ্রামীণ জীবন বিপ্রদাস বড়ুয়ার গল্পে বেশ উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষ, সমুদ্র উপকূলের জেলেদের বিচিত্র ও দুঃসাহসী জীবনকে তিনি তাঁর গল্পসাহিত্যের ভাষিক চিত্রে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছেন।
তাঁর ‘গাঙচিল’ গল্পে বঙ্গোপসাগরের জেলেদের কাহিনি নিয়ে চমৎকার কথার জাল বুনেছেন। বিপ্রদাশ বড়ুয়ার অভিজ্ঞতার নিবিড় পরিচয় পাওয়া যায় এ গল্পে। মণীন্দ্র, বাঁশি, বাতাসী―এদেরকে সাগরের বংশধর বলে মনে করা হয়। এদের জীবন যে সাগরের সঙ্গে বাঁধা, এমন একটি ভাবকল্প তৈরি করে লেখক তাদের জীবনের নানা প্রসঙ্গের চিত্র তুলে ধরেছেন। জীবন-জীবিকার দিক থেকে এরা আলাদা মানুষ। তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ বেদনাও পৃথক।
মণীন্দ্র সাগরের উত্তাল বুকে মাছ ধরার আদিম পেশায় নিয়োজিত থাকে। জাহাজ বা ভাসমান রেস্তোরাঁয় কাজ করার আহ্বান উপেক্ষা করে সাগরের দুঃসাহসী জীবনই তার কাছে আপন মনে হয়। বাতাসীর সাথে তার মধুর সম্পর্ক। ওরা এক সঙ্গে সাগরে যায়। লেখক এই গল্পের মাধ্যমে সাগরপাড়ের মানুষের দুর্ধর্ষ জীবন রূপায়িত করেছেন। এক পর্যায়ে সাগরের উত্তাল জোয়ারে ওরা ভেসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তবু সেই জীবনই তাদের আকর্ষণ করে।
‘বানভাসি’ গল্পে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। দুর্দশাগ্রস্ত লোকদের সহায়তায় ত্রাণকার্যের জন্য আসা লোকদের লম্ফজম্ফ ও হম্বিতম্বির বয়ান সরস ভাষায় গল্পে রূপায়িত হয়েছে। রহমত, সুন্দর আলী, হামিদারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে ত্রাণ গ্রহণ করতে যায়। এসব রিলিফ গ্রহণকারী মানুষের দুঃখ-দুর্দশার বয়ান যেমন মর্মান্তিকভাবে লেখক তুলে ধরেছেন, তেমনি ত্রাণদাতা ব্যক্তিবর্গের উন্নাসিক আচরণের চিত্রও দক্ষ শিল্পীর হাতে এঁকেছেন।
এসব গল্পের মাধ্যমে লেখক মানুষের জীবনকে কঠোর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নিঃস্ব মানুষের বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন।
২. সেলিনা হোসেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাশিল্পী। তাঁর ছোটগল্পে মানবজীবন যেন একগুচ্ছ তাজা গোলাপের মতো বিকাশ লাভ করেছে। জীবন নামক আশ্চর্য ব্যাপারটিকে ছোট করে দেখতে তিনি অভ্যস্ত নন। লোভে-ক্ষোভে, পাপে-তাপে এবং বেদনা-হতাশায় জীবনই যে সৃষ্টিকর্তার পরম রহস্যময় এক অভিব্যঞ্জনা, এই বোধটি তাঁর শিল্প-সাধনায় নীরবে কাজ করেছে। ফলে জীবনের ভেতরেই তিনি বিশুদ্ধ সাহিত্যের যাবতীয় উপাদান অন্বেষণ করেছেন।
গ্রাম ও শহর উভয় জীবনই তাঁর ছোটগল্পের উপজীব্য। নিম্নবিত্ত জীবন রূপায়ণে তিনি দক্ষ শিল্পী হয়ে উঠেছেন। এদিকটি বিবেচনায় উৎস থেকে নিরন্তর নামে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থের ‘গৈরিক বাসনা’ নামের প্রথম গল্পটি বর্তমান আলোচনার জন্য বিবেচনায় নেওয়া যায়। এ গল্পে সাবানী ও তার গনু ভাইয়ের হৃদয় দৌর্বল্যের বিষয় কেন্দ্র করে আখ্যানের প্লট পরিকল্পনা করা হয়েছে। সাবানীর সাথে গনুর গভীর প্রণয়। তার গনুভাই যখন নৌকা বেয়ে অনেক দূর চলে যায়, সাবানীর মনের নদীতে তখন দুর্ভাবনার চর জাগে। মনে মনে বলে, গনুভাই যদি আর ফিরে না আসে! পাথরে খোদাই করা গনুর জোয়ান দেহটা অপ্রত্যাশিতভাবে সাবানীর মনে দারুণ প্রভাব সঞ্চার করে। কিন্তু পেটে যদি ভাত না জোটে প্রণয়চিন্তা সাময়িকভাবে হলেও বাধাগ্রস্ত হয়।
তখন তাদের গ্রামে চরম দুঃসময়। ক্ষুধা-দারিদ্র্য আর মহামারীতে গ্রামের এক চতুর্থাংশ মানুষ মারা গিয়েছে। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় সাবানী আর গনু বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকার ঐ লড়াইয়ে ওরা পরস্পর পাশাপাশি থাকতে চায়। সাবানী যায় চাল কুড়াতে। ওদিকে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে গনু পাহারাদারের মাথা ফাটিয়ে তালুকদার বাড়ি থেকে এক বোঝা চাল চুরি করে আনে। দুর্ভিক্ষের মধ্যে সাবানীকে অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখার জন্য এভাবেই তার চাল চুরি করে আনা। এই অপরাধের পরিণতি যাই আসুক তা মেনেই সে এমন অন্যায় কাজ করে মনে তৃপ্তি পায়। এতে সফল হওয়ায় তার ক্লান্ত মুখে বিষণ্ন হাসি ফুটে। এভাবে নিম্নবিত্ত জীবনের এক কঠিন এবং রূঢ় বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে এই গল্পে।
তেমনই আর একটি গল্প ‘প্রান্তিক জীবনে জ্যোৎস্না’। এ গল্পে নগরে বসবাস করা দুর্দশাগ্রস্ত প্রান্তিক জীবনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। শাহজাহান নামের একজন কবর খননকারীর জীবনচিত্র রূপায়িত হয়েছে এই আখ্যানে। শাহজাহান আজিমপুর গোরস্তানে কবর খোঁড়ার কাজ করে। গোর খোঁড়াই তার জীবনের পরম সাধনা। এ কাজ তার স্ত্রীর পছন্দ না। এ নিয়ে স্ত্রীর মধ্যে এক ধরনের মানসিক সংকট দেখা দেয়। স্বামীকে সে ভূত বলে মনে করে। এ জন্য সংসারে দেখা দেয় অশান্তি। সন্তানহীন শূন্য ঘর তাদের। এক পর্যায়ে তাকে ফেলে স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে চলে যায়। ফলে শাহজাহানের জীবনে দেখা দেয় দুঃসহ একাকীত্ব। তবু সে কবর খোঁড়া থেকে মুক্তি নেয় না। এই জগতের অমোঘ নিয়মে এক সময়ে তার মা পরলোক গমন করেন। মায়ের জন্যও কবর খোঁড়ে। গর্ভধারিণী মাকে কবরে নামায় শাহজাহান।
এভাবে নিয়তির নির্মম ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত এবং বেদনাহত মানুষ যখন নীরবে কাঁদে, তার অকৃত্রিম উপস্থাপনায় শিল্পের যে মাহাত্ম ফুটে উঠে, সেলিনা হোসেনের ছোটগল্পে মানবজীবনের সেই স্পর্শকাতর অনুষঙ্গ অত্যুজ্জ্বল হয়ে ধরা দেয়।
৩. শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ইউসুফ শরীফের গল্পে অতল গভীরতা আঁচ করা যায়। ভাষার প্রসাদগুণ এবং বিষয়ের গভীরতায় তাঁর গল্প অনন্য হয়ে ওঠে। ইউসুফ শরীফ আমাদের সাহিত্যের একজন শক্তিমান কথাশিল্পী ও দক্ষ ছোটগল্প লেখক। সমগ্র বাংলা সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলেও, তাকে একজন দক্ষ ও শক্তিমান কথাশিল্পী তথা ছোট গল্পকার হিসেবে স্বীকৃতি ও সম্মান দিতে হয়।
চেনাঅচেনার মাঝখানের মানুষ নামের গল্পগ্রন্থটি অন্তত সে প্রমাণই বহন করে। মোট পনেরোটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ইউসুফ শরীফের এ গ্রন্থখানি। এটি তাঁর পঞ্চম গল্পগ্রন্থ। আমাদের চারপাশের মানুষেরাই কখনও চেনা, কখনও অচেনা মানুষ বনে যায়। এমন কি প্রতিটি মানুষের আপন সত্তাটি নিজের কাছে কখনও চেনা, কখনও অচেনা হয়ে ওঠে। ইতিবাচক চেতনায় সত্যাশ্রয়ী মানুষ নিজের কাছে খুব চেনা। কিন্তু কখনও যদি অন্যায়ের সাথে আপস করে, তাহলে তার বিবেকের কাছেই তো অচেনা হয়।
গল্পগ্রন্থের ‘নাম’ গল্পটি উত্তম পুরুষের বয়ানে এগোয়। গল্পের নায়ক এসেছে নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে। স্ত্রী নাজনীন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। তবে তার প্রধান বৈশিষ্ট্য সততা। স্বামীর কাছে কোনও অসঙ্গত টাকা থাকলে তার জন্য জবাবদিহি করতে হয় স্ত্রীর কাছে। যদিও চলমান এ সমাজে এমন গৃহিণী শুধু দুষ্প্রাপ্যই না, বিরলও বটে। চাকুরে স্বামীর কাছে অফিসে পাঁচশ টাকার চারটে বান্ডিল উৎকোচ হিসেবে রেখে যায় কোনও এক স্বার্থান্বেষী মহল। সততার কারণে এত টাকা কখনও হয়তো বা চোখে দেখেননি। কিন্তু এতগুলো টাকা হাতে পেয়ে তার অতৃপ্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এমন একটা সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে নিজের ভেতরে অবচেতনে পুষে রাখা অতৃপ্তিগুলো মিটানোর জন্য মনের আনন্দে কল্পযোগে চলে যান বিভিন্ন বিপণীতে। কিন্তু হায়! সেসব স্থানে চেনা মানুষগুলোর কাছেই তিনি অচেনা হয়ে যান। অচেনা হন স্বজনদের কাছেও। অফিস শেষে পিয়নের ডাকে সংবিৎ ফিরে পান। ফেরত দেওয়ার জন্য টাকাগুলো আলমারিতে রেখে গল্পের নায়ক বাড়ি ফেরেন। কিন্তু পাঠককুলকে আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়ে যান।
‘মিছিলের মানুষ’ নামের গল্পটির প্রধান চরিত্র সাদুল্লা। পেশায় হকার। ‘মধুপুরের বটিকা’ নামে নিজের তৈরি ভুয়া ওষুধ বিক্রি করে। বুট-কলাইয়ের সন্দেশের বটিকা বানায় নিজের আবাসস্থলেই। গ্রামের হাটে হাটে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে ওষুধ বিক্রি করে মানুষকে ধোঁকা দেয়। গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ক্যানভাসের ফাঁকাবুলিতে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাদের কাছে নকল ওষুধ বিক্রি করে মানুষ ঠকায়। প্রথমে সাদুল্লা সপরিবারে থাকে ঢাকার বস্তিতে। তার সহযোগী হিসেবে কাজে নেয় একই গ্রামের নকিবকে। তাকে শেখানো হয় চটকদার কথামালায় মানুষকে আকর্ষণ করার কৌশল। নকিব সে কৌশল রপ্ত করে মন দিয়ে। আর নকিবের মাধ্যমেই সাদুল্লার ব্যবসায় আশাতীত উন্নতি হয়। গল্পটিতে নিম্নবিত্ত জীবন যেমন প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনি ভাষা আন্দোলনের চেতনা যে একজন মূঢ়কেও জাগিয়ে তুলে মিছিলে অংশ গ্রহণের প্রেরণা জাগিয়ে তুলতে পারে―এ গল্পে তার যথার্থ চিত্র ফুটে উঠেছে। গল্পের প্রেক্ষাপট চিত্রনে সেই সময়ের পরিবেশ-প্রতিবেশ, কালিক এবং ভাষিক চিত্র অত্যন্ত বিশ্বস্ততা এবং দক্ষতার সাথে অঙ্কন করেছেন।
৪. হরিশংকর জলদাস বাংলা কথাসাহিত্যে উপকূলীয় মৎস্যজীবী ও সমুদ্রনির্ভর নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর কথাকার। তাঁর ভাবনা জুড়ে বিরাজ করে নদী-সমুদ্রলগ্ন মানুষজন। কৈবর্ত নামক ব্রাত্যপ্রান্তজনদের জীবনচর্যা, তাদের বিকাশ-বিদ্রোহ, হাহাকার- প্রাপ্তির কথা ক্রমাগত লিখেছেন হরিশংকর জলদাস। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পতেঙ্গার এক জেলে পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় পারিবারিক পেশা হিসেবে কিশোর বয়স থেকে পিতার সাথে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। পাশাপাশি চালিয়ে যান পড়াশোনাও। পরিণত বয়সে ছিলেন সরকারি কলেজে বাংলার অধ্যাপক।
তাঁর ছোটগল্পে যেসব চরিত্র উঠে আসে―তারা শহরের বস্তিবাসী নয়, আবার কৃষিজীবী গ্রামবাসীও নয়; তারা সমুদ্রের সন্তান, যাদের জীবনে দারিদ্র্য, ঋণ, প্রকৃতি ও মৃত্যুভয়ের সঙ্গে প্রতিদিনের বোঝাপড়া চলে।
জলদাসীর গল্প তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ। তাঁর এ গ্রন্থে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষের জীবন, বিশেষত জেলে- সম্প্রদায়ের দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সামাজিক অবদমন প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। জলদাস নিজে উপকূলীয় জেলে-জীবনের ভেতর থেকে উঠে আসা লেখক; ফলে তাঁর বয়ানে কেবল নিম্নবিত্ত জীবনই উঠে আসেনি, উঠে এসেছে অস্তিত্বের অভিজ্ঞতাও।
জেলে-দাম্পত্যজীবন সমবায়ী। এ জীবনে নারী-পুরুষের সমান অবদান। কিন্তু অন্যান্য সমাজের মতো জেলে নারীরাও বঞ্চিত এবং অবহেলিত। তাদের মর্মন্তুদ হাহাকার, বিপর্যয়-বিপন্নতার বেদনা জীর্ণ গৃহকোণে গুমরে গুমরে মরে। হরিশংকর জলদাস তাঁর গল্পে এসব নিম্নবিত্ত নারীজীবনের করুণ গাথা শুনিয়েছেন।
তার ‘মোহনা’ গল্পটি পাঠককে একাদশ শতাব্দীর কালিন্দিপাড়ের এক বেশ্যাপল্লিতে নিয়ে যায়। তেমনি তাঁর ‘কোটনা’ ও ‘চরণদাসী’ গল্পে রয়েছে জেলেনিদের বহুগামীতার কাহিনি। ‘টেণ্ডোরি’ গল্পে লেখক জেলে দাম্পত্য জীবনের অন্ধকার দিকটি তুলে ধরেছেন। ‘সুমিবল বাবু’ ও ‘দুখিনি’ গল্পে অনন্তবালা ও মালতি নামের দুজন জেলেনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তাঁর ‘প্রতিশোধ’, ‘একজন জলদাসীর গল্প’, ‘দুইজ্যা-বুইজ্যা’ প্রভৃতি গল্প পাঠককে নিরবচ্ছিন্ন এক আহাজারির সামনে নিয়ে দাঁড় করায়।
নদী, জোয়ার, ভাটা, ঝড়―এসব কেবল পটভূমি নয়, চরিত্রসম। প্রকৃতি যেমন জীবিকা দেয়, তেমনি কেড়ে নেয়। ঝড় মানে ঘরভাঙা, মৃত্যু, ঋণবৃদ্ধি। নদীর ভাঙন যেন জীবনের ভাঙন। এই প্রকৃতি-নির্ভর জীবন নিম্নবিত্ত মানুষের অসহায়তাকে তীব্র করে তোলে। তাদের অস্তিত্ব প্রকৃতির অনুকম্পার ওপর নির্ভরশীল।
দারিদ্র্যের মধ্যেও চরিত্রগুলো কেবল করুণার পাত্র নয়। তাদের স্বপ্ন আছে, প্রেম আছে, সম্মানের আকাক্সক্ষা আছে। জলদাস নিম্নবিত্ত মানুষকে ‘অবজেক্ট’ নয়, ‘সাবজেক্ট’ হিসেবে দেখান। তারা ভিক্ষুকসুলভ নয়; তারা সংগ্রামী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ।
হরিশংকর জলদাস শুধু কাহিনি লেখেন না, সমাজকেও লেখেন―তাঁর রচিত নিম্নবিত্তজীবনের গল্পগুলো তাঁর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
৫. সমকালীন কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম হুমায়ূন মালিক। বাংলা ছোটগল্পসাহিত্যে স্বতন্ত্র একটি অবস্থান করে নিয়েছেন তিনি। হুমায়ূন মালিক ছোটগল্পে প্রতীক ব্যবহারে যেমন দক্ষতা দেখিয়েছেন, তেমনি গল্পের বাক্যে বাক্যে বক্রোক্তি ব্যবহারে পাঠককে থমকে দেওয়ার মতো মুন্সিয়ানা প্রদর্শন করেছেন। এজন্য হয় পাঠককে সময় নিয়ে তাঁর গল্প পাঠ করতে হয়, নয়তো দ্বিতীয়বার বাড়তি মনোযোগ দিয়ে তাঁর গল্প পাঠে বুঁদ হতে হয়। তৃতীয়ত তাঁর কিছু গল্প আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।
পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতার মিশেলে চেতনাপ্রবাহরীতির একটি গল্প ‘দিগদর্শনহীন’। এ গল্পে গল্পকার একটি যুবতী মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু ও নির্মম পরিণতির এক মর্মান্তিক ভাষিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। লাশ কাটা ঘরের ডোম মোহনলালের অনুভূতির তীব্রতা ও মনোজাগতিক নানা বিশ্লেষণ অনুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লাশকাটা ঘরের যে টেবিলে যুবতীর মরদেহ ব্যবচ্ছেদের জন্য তোলা হয়েছে, অনুপম সুন্দরী সেই অপমৃত্যুর লাশ কাটতে গিয়ে ডোম মোহনলাল দ্বিধাগ্রস্ত। এ টেবিলের লাশ ঘিরে মৃত্যুর বিভীষিকার যে চিত্র উদ্ঘাটিত হয়েছে তা গল্পকারের দক্ষতার প্রমাণ বহন করে।
লাশটি ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে মোহনলাল অসহনীয় এক মানসিক বৈকল্যে আক্রান্ত হয়। হঠাৎ যেন নারী কণ্ঠে কে কথা বলে ওঠে, ‘আমার অস্তিত্বে কত সব যন্ত্রণা কী ভয়ানক রূপ নিয়ে ফুটে আছে, তুমি দেখলে না।’
হুমায়ূন মালিকের গল্পে নারী বা পুরুষের অঙ্গের প্রসঙ্গ এসেছে ঘটনা প্রবাহের প্রয়োজনে। এগুলো কখনও যৌন সুড়সুড়ির উপকরণ বা উপাদান হয়ে আসেনি। বরং অপরিহার্যভাবে এসেছে গল্পের দাবিতে। এটাই মালিকের মৌলিকত্ব।
গল্পে যুবতীর লাশ ঘিরে দুটি পক্ষের উপস্থিতি দেখা যায়। এক পক্ষের এক ভদ্রলোক পোস্টমর্টেম করার জন্য তাকে অনেকগুলো টাকা দিয়ে চলে যায়। অন্যপক্ষের একদল দুর্বৃত্ত এসে তাদের নির্দেশে কাজ করার আদেশ দেয়। সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় মোহন লাল। কিন্তু দুর্বৃত্তদের কাছে পরাস্ত ও ধরাশায়ী হলে প্রাণনাশের পর্যায়ে পড়ে। তার সামনেই মৃত যুবতীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে কয়েকজন। সে প্রত্যক্ষদর্শী। তাই তাকেও খুন করবে। তবে এখানে নয়। মোহনলালও মৃত্যুর প্রতীক্ষায়, তবু জীবনের আশা ছাড়ে না। নদীর কাছে নিয়ে তাকে টুকরো টুকরো করার কথা। আর সেই মুহূর্তেই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর পরিকল্পনা তার। গল্পে রহস্য বা ঘোর সৃষ্টির সুদক্ষ কারিগর হুমায়ূন মালিক। আলোচ্য গল্পে এমন একটি রহস্য সৃষ্টি করা হয়েছে যে, যুবতীটি মেডিকেলে পাঠরত একজন ছাত্রী, ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী মহলের কুচক্রে পড়ে জীবনাবসান হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ভোগবাদী মহল এতটাই প্রভাবশালী যে, হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, কর্মচারী সংগঠন কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও নিস্ক্রিয় থাকে। এসব ভাবনার ঘোর পাঠকের মনে দাগ কাটে।
‘গ্রাফোম্যানিয়া’য় জাদুবাস্তবতার ভাঁজে ভাঁজে উন্মোচিত হয় প্রজ্ঞার প্রতি এক যুবকের গভীর আকর্ষণ―যে আসলে বাস্তবে নেই। আমরা বুঝতে পারি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লাঞ্ছিত প্রজ্ঞা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। সে ছিল ‘সাঁওতাল, মাল-পাহাড়ি, ভূমিজ, বাগদি, বাউরির আত্মজা’র প্রতীক। কয়েক লাইনের মধ্যে নারীর লাঞ্ছনার দীর্ঘ ইতিহাসও তুলে ধরেন মালিক―‘একদিন আর্য যুবক এসে তোমার ওপর মোড়ল হয়ে বসল। তারপর আরব্য যুবক এল। তাদের নতুন মহিমার মাঝে তুমি অবরোধবাসিনী। ওরা আর তোমাকে মাঠে যেতে দেয় না। এরপর সেই সাদা চামড়ার বেনিয়া এবং শেষবার ভ্রাতৃবেশী বর্বর। তোমাকে ঘিরে সেই মধুর কীর্তন, কাঁসর ঘণ্টা থেমে গেল। তুমি মন্দিরের এক বিধ্বস্ত প্রতিমা।’
৬. মোহিত কামালের ছোটগল্পে নিম্নবিত্ত জীবনের রূপায়ণ একটি সুস্পষ্ট নান্দনিক ও মানবিক অবস্থান থেকে নির্মিত। তিনি দারিদ্র্যকে কেবল সামাজিক সমস্যার পরিসংখ্যান হিসেবে দেখেন না; বরং তা মানুষের দৈনন্দিন অস্তিত্ব, মানসিক টানাপোড়েন, আত্মমর্যাদা ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জটিল বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর গল্পে নিম্নবিত্ত মানুষ করুণা-নির্ভর চরিত্র নয়; তারা সংগ্রামী, সংবেদনশীল এবং আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন।
তাঁর চরিত্রদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে বর্তমানে টিকে থাকাই বড় বিষয়। ভাঙা ঘর, ছেঁড়া পোশাক, আহারের সংস্থান প্রভৃতি বাহ্যিক চিহ্ন হলেও লেখক মূলত দেখান মানসিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা।
নিম্নবিত্ত চরিত্ররা অভাবে জর্জরিত হলেও নৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে না। অনেক সময় তারা মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের তুলনায় অধিক মানবিক ও সততার পরিচয় দেয়। দারিদ্র্য এখানে নৈতিক অবক্ষয়ের সমার্থক নয়।
সামান্য প্রাপ্তিই তাদের কাছে বড় আনন্দ। একটি নতুন জামা, একটি মেলার দিন, একবেলার পেটভরা ভাত―এসবই তাদের জীবনে ‘বসন্ত’ হয়ে আসে। লেখক এই ক্ষুদ্র স্বপ্নগুলোকে মহৎ মানবিক আবেগে রূপ দেন।
গল্পের ভাষা সরল হলেও ভেতরে থাকে সামাজিক কাঠামোর প্রতি এক মৃদু প্রতিবাদ। নিম্নবিত্ত মানুষের অবহেলা, অদৃশ্যতা ও সামাজিক দূরত্ব লেখক সূক্ষ্মভাবে উন্মোচন করেন।
এই সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য গল্পে:
(ক) তাঁর ‘ভিখারি’ গল্পটি প্রথম দৃষ্টিতে নগর-প্রান্তিকতার বয়ান মনে হলেও গভীর পাঠে এটি অনুপস্থিতির মনস্তত্ত্ব, দানের নৈতিক রাজনীতি, মাতৃত্বের প্রতিস্থাপন এবং আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনের গল্প। গল্পের কেন্দ্রীয় টানাপোড়েন সামাজিক নয়, বরং অস্তিত্বগত।
এক ভিখারিকে কেন্দ্র করে সমাজের প্রান্তিক মানুষের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক অবহেলার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। চরিত্রটি কেবল ভিক্ষাপ্রার্থী নয়; সে এক নীরব পর্যবেক্ষক, যে সমাজের চোখে তুচ্ছ হলেও নিজের নৈতিক অবস্থানে অটল। এখানে দারিদ্র্য যেমন দৃশ্যমান, তেমনি মানবিক দৃঢ়তাও উজ্জ্বল।
হালিমা খাতুন, বৃদ্ধা চরিত্রটি বহুমাত্রিক―বাহ্যিকভাবে তিনি অন্ধপ্রায়, দরিদ্র, অসহায়। কিন্তু অন্তর্গতভাবে তিনি প্রজ্ঞাময়, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং মমতাময়ী। চশমার পুরু কাচ তাঁর শারীরিক দুর্বলতার প্রতীক, আর ‘মনের কাচে স্বচ্ছ দেখা’ তাঁর অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক। তিনি কেবল ভিক্ষুক নন; তিনি এক প্রাক্তন প্রাইমারি শিক্ষক, এক শহীদ সন্তানের মা, এক বিধবা নারী। অর্থাৎ তাঁর ভিক্ষাবৃত্তির পেছনে আছে ইতিহাস, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি।
অন্যদিকে হায়াত চরিত্রটি গল্পের কেন্দ্রীয় চেতনাপুরুষ। তাঁর ভেতরে রয়েছে―দানশীলতা, নৈতিক সংবেদন, সামাজিক সচেতনতা, আত্মিক অস্থিরতা। তিনি কেবল দান করেন না; তিনি পর্যবেক্ষক। নারীগার্ডের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করেন, আবার নিজের নৈতিক জটিলতা নিয়েও ভাবেন। তাঁর পকেট কাটা যাওয়ার ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে চুরি―এ যেন ধর্মীয় আবহের আড়ালে নৈতিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত।
আশ্চর্যের বিষয়―টাকা বা মোবাইল হারানোর কষ্ট তাঁর নেই; কষ্ট এই যে বৃদ্ধাকে টাকা দিতে পারবেন না। এখানেই চরিত্রের নৈতিক উচ্চতা প্রকাশিত। গল্পের দ্বিতীয় অংশে হায়াতের অস্থিরতা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বৃদ্ধাকে না দেখে তাঁর মনে যে উৎকণ্ঠা জন্মায়, তা কেবল সহানুভূতি নয়―এ যেন অবচেতনে মাতৃস্মৃতির টান। শেষে যখন বৃদ্ধার নাম ‘হালিমা খাতুন’ প্রকাশিত হয়, তখন গল্পটি এক মেটাফিজিক্যাল স্তরে পৌঁছে যায়। এখানে বাস্তব ও স্মৃতির সীমানা ভেঙে যায়। বৃদ্ধা যেন হয়ে ওঠেন হায়াতের মৃত মায়ের প্রতিরূপ―অথবা তাঁর আত্মিক প্রতিচ্ছবি।
গল্পটি মূলত ভিক্ষাবৃত্তিকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এটি কেবল দারিদ্র্য বা সামাজিক বৈষম্যের গল্প নয়; বরং এটি মানবিকতা, মাতৃত্ব, স্মৃতি, নৈতিক সংকট ও আত্মিক শুদ্ধতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অন্বেষণ। লেখক অত্যন্ত সংযত ভাষায়, কিন্তু প্রবল আবেগঘন প্রতীকের মাধ্যমে গল্পটিকে বহুমাত্রিক করে তুলেছেন।
(খ) ‘কার্তিকে বসন্তের ছোঁয়া’ গল্পটি গ্রামীণ নিম্নবিত্ত জীবনের বহুমাত্রিক রূপায়ইের এক শক্তিশালী উদাহরণ। এখানে অর্থনৈতিক অনটন, মৌসুমি দুর্দশা (মঙ্গা), কৃষিনির্ভরতা, শিক্ষাবঞ্চনা, বাল্যবিবাহ, নারী-নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ―এসব উপাদান একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। লেখক নিম্নবিত্ত জীবনের কেবল দুর্দশা দেখাননি; বরং সংগ্রামের মধ্যেই সম্ভাবনা, প্রেম, প্রতিবাদ ও স্বপ্নের অঙ্কুরোদ্গমকে প্রতীকী ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।
গল্পে কেন্দ্রীয় একটি চরিত্র চন্দা। চন্দা একাধারে শ্রমজীবী কন্যা, সচেতন শিক্ষার্থী, তেজস্বী প্রতিবাদী এবং স্বপ্নময় কিশোরী। নিম্নবিত্ত বাস্তবতার ভেতর দাঁড়িয়ে সে পরিবর্তনের প্রতীক― কার্তিকের মরা মাসে বসন্তের সম্ভাবনা যেমন, তেমনি অন্ধকার বাস্তবতায় আলোর অঙ্কুর।
অন্যদিকে রশিদ নিম্নবিত্ত জীবনের ট্র্যাজিক প্রতীক। একসময় সে স্কুলে যেত, ভালো ফুটবল খেলত, পড়াশোনায়ও ভালো ছিল। কিন্তু পিতার মৃত্যু তাকে স্কুল থেকে টেনে আনে শ্রমবাজারে। এখানে নিম্নবিত্ত জীবনের দুটি বাস্তবতা স্পষ্ট: পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারালে শিশুরাই শ্রমে নামতে বাধ্য হয়। শিক্ষা তাদের জন্য অধিকার নয়, বিলাসিতা। রশিদের শিল্পিতভাবে তৈরি করা আলুর নালাগুলোকে চন্দা ‘শিল্প’ হিসেবে দেখে। এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত―নিম্নবিত্ত শ্রমিকের কাজ কেবল ‘কামলার কাজ’ নয়; তাতে নন্দনবোধও আছে। লেখক এখানে শ্রমকে মর্যাদা দিয়েছেন।
শ্রেণি ও লিঙ্গ-রাজনীতির সংঘাতের আর একটি চরিত্র নরক আলি। নরক আলি চরিত্রটি নিম্নবিত্ত সমাজের আরেক বাস্তব রূপ: বেকার, ক্ষমতালিপ্সু, নারীবিদ্বেষী স্থানীয় মাস্তান। সে চন্দার চরিত্রহননের চেষ্টা করে।
নিম্নবিত্ত সমাজে নারীর সম্মান কতটা অনিশ্চিত, মিথ্যা অপবাদ যে সামাজিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় তা গল্পের ভাষিক চিত্রে ফুটে উঠে। নরক আলির বিরুদ্ধে রশিদের সহিংস প্রতিরোধ (চোখ উপড়ে ফেলা) এক তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি আইনসম্মত নয়, কিন্তু নিম্নবিত্ত বাস্তবতায় তা প্রতিরোধের এক আদিম রূপ।
সংক্ষেপে বলা যায়, মোহিত কামালের ছোটগল্পে নিম্নবিত্ত জীবন করুণার অবলম্বন নয়; বরং তা মানবিক মর্যাদা, সংগ্রাম ও আশার এক শিল্পিত রূপায়ণ। এছাড়া পিতা, মোড়া, কালো চাঁদের অন্য আলো, দান-প্রতিদান, লটারি, দাফন, মেধাস্বত্ব প্রভৃতি গল্পে নিম্নবিত্ত জীবন রূপায়িত হয়েছে।
৭. প্রাতিস্বিক গল্পকার মামুন হুসাইন। তাঁর গল্প নির্মাণের কলাকৌশল প্রথানুগ নয়, গল্পের ভাষা কনস্ট্রাকটিভ। গল্পের কাহিনি নির্মাণের চেয়ে থাকে বুদ্ধিদীপ্ত ভাষার প্রয়োগ। ঘটনার অন্তর্বয়নে থাকে কাব্যময়তার বিসর্পিল ঢং। গল্পের ভাষাকে এমনভবে বিন্যস্ত করেন, যা পাঠককে গল্পের দেহে হারিয়ে যেতে বাধ্য করে। তাঁর গল্প পাঠের সময় ক্রমাগত সামনে অগ্রসরমান বয়ন-প্রক্রিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে যেতে পারলে পাঠকের মনে ভিন্নতর উপলব্ধি সৃষ্টি হয়।
মামুন হুসাইন রচিত মানুষের মৃত্যু হলে গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্পের নাম ‘মৃত্যু পুরাণ’। এ গল্পে প্রান্তিক, নিরন্ন ও ঘোরগ্রস্ত এতিম কিশোর মোহাম্মদ আবুল কাশেমকে কেন্দ্র করে তার গ্রামে মৃত্যু উৎসব দেখানো হয়েছে। গল্পটির পাঠ ভ্রমণে দেখা যায়, মায়ের অকাল বৈধব্যের কারণে কিশোর ছেলে আবুলের দুধের বালতি নিয়ে শুয়ে থাকা, মাঠের বিভিন্ন স্থানে ঘাস কাটা, বাড়িতে বাড়িতে দুধ পৌঁছে দেওয়া এবং বোন উম্মে হাবিবার বড় খালার মেয়ের বাড়িতে বালতি বালতি গোবর এবং গোমূত্র পরিষ্কার করার ভাষিক চিত্র ফুটে উঠেছে। অত্যন্ত প্রান্তিক ও দারিদ্র্য পীড়িত একটি পরিবারের অসহায় আত্মসমর্পন ও বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গল্পে।
মামুন হুসাইনের ‘আমেরিগো দি এন্ডগেম’ নামে গল্পটির প্রেক্ষাপটে গ্রামের সহজ-সরল মানুষ এবং গ্রামের ঐতিহ্যপ্রীতি, তার প্রতি অসীম মমতা এবং স্মৃতিকাতরতার চিত্র ফুটে উঠেছে। এ গল্পে আবহমান বাংলার দুঃখ-দুর্দশার যে চিত্র আঁকা হয়েছে, তা অনেকটাই প্রকৃত ইতিহাসের সত্য। গল্পে নদী-ভাঙনের করাল গ্রাসের দৃশ্য অঙ্কনের পাশাপাশি উন্মূল মানুষের বেদনাচিত্র দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বলা যায়, গ্রাম জীবনের আদ্যোপান্ত প্রাণবন্তরূপে ফুটিয়ে তুলে পাঠকদেরও স্মৃতিকাতর করেন তিনি। মামুনের গল্পের এই আলাদা টেকনিকই তাকে স্বতন্ত্র স্বরের গল্পকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তথ্যসূত্র:
১। আজহার ইসলাম রচিত বাংলাদেশের ছোটগল্প।
২। মাহবুবুল আলম রচিত বাংলাদেশের সাহিত্য।
৩। সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকা ‘রাঢ়বঙ্গ ষষ্ঠ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, জানুয়ারি, ২০১৮।
৪। মোহিত কামালের শ্রেষ্ঠ গল্প।
লেখক : প্রাবন্ধিক
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



