আর্কাইভগল্প

গল্প : বাঘ ও কুমিরের লড়াই : রেদোয়ান মাসুদ

চারদিকে সবুজের সমারোহ। বনের একদিক থেকে অন্য দিকে তাকালে মনে হয় যেন শেষ দিকে আকাশ নেমে এসেছে। বনের দক্ষিণ দিকে সাগর। বনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সাপের মতো আঁকাবাঁকা ছোট-বড় নদীগুলো এই সাগরে গিয়ে মিশেছে। নদীতে নানা প্রজাতির মাছের বিচরণ। কিন্তু মানুষের আনাগোনা নেই বলে এত মাছ এখানে, যেন জলের চেয়ে মাছই বেশি। 

বনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া সবচেয়ে বড় ও প্রশস্ত নদীটির নাম ‘ওয়াইডার’। এই নদীটি সবচেয়ে বেশি প্রশস্ত বলেই এর নাম হয়ে যায় ওয়াইডার নদী। তবে কবে ও কে এই নদীর নামকরণ করেছেন তা কেউ সঠিকভাবে জানে না। এই নদী নিয়ে অবশ্য একটি কথা প্রচলিত আছে। কোনও এক কালে এক বাঘশিকারি নাকি এই বনে শিকার করতে এলে অনেকগুলো নদীর সন্ধান পান। তখন তিনি এই নদীটির নাম দেন ওয়াইডার।

ওয়াইডার নদীর পাড়ে মাছ শিকার ও জল পান করতে আসে বনের বিভিন্ন হিংস্র প্রাণি ও পশুপাখি। নদীর কিনারে এত পশু-পাখিদের সমাগম দেখে লোভ সামলাতে পারে না সাগর ও নদীর বড় বড় মাছ ও হিংস্র জন্তুরাও। 

নদীর অদূরেই এক মস্ত বড় বাঘের বাস। যার ভয়ে বনের প্রাণিদের ঘুম হারাম। একদিন বাঘটির প্রচণ্ড ক্ষুধা পায়। কিন্তু বনের মধ্যে শিকার করার মতো কোনও পশু-পাখি খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই কোনও উপায় না পেয়ে সে ওয়াইডার নদীর তীরে আসে। 

এদিকে ওয়াইডার নদীতে এক মস্ত বড় কুমির বাস করে। বাঘের মতো কুমিরটিও খুব ভয়ংকর। তার ভয়ে নদীর বেশির ভাগ প্রাণিই দূরত্ব বজায় রেখে চলে। কারণ একবার তার সামনে পড়লে আর রেহাই নেই।

কুমিরটি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। নদীতে ছুটাছুটি করে যেই দুই একটা মাছ পেয়েছিল তাতে তার পেটের জ্বালা তো মিটেইনি, বরং আরও বেড়েছে। তাই বাঘের মতো তারও মেজাজ বিগড়ে আছে। রাগে এক সময় সে মনে মনে বলল, ‘আমাকে ফাঁকি দিয়ে সবাই পালিয়েছে। আমি তোদের খুঁজে বের করবই। যেখানেই লুকিয়ে থাকিস না কেন তাতে কোনও লাভ হবে না। আর যত বড় প্রাণিই হোক না কেন আজ আমি তাকে গিলে খাবই।’ এ সময় কুমিরের মনে পড়ল ওয়াইডার নদী ও সাগরের সংযোগস্থলের কথা। তাই সে আর দেরি না করে সেদিকে রওনা হলো।

কুমিরটি সংযোগস্থলের কাছাকাছি এসে সন্তর্পণে এগুতে লাগল। যাতে কেউ টের না পায়। মাঝে মাঝে অবশ্য মাথা উঁচু করে দেখে, তারপর আবার আগের মতোই চলতে থাকে। নদীর একেবারে কিনারে এসে সে আবারও মাথা জাগাল। কিন্তু সামনে যা দেখল তাতে সে প্রচণ্ড হতাশ হলো আর মনে মনে বলল, ‘যেদিন কপাল পোড়ে একেবারেই পোড়ে। আজ মনে হয়, না খেয়েই মরতে হবে। কিন্তু কী আর করার! অপেক্ষা করি দেখি কিছু একটা হয় কি না।’

ভেতরে তর সইছে না। কারণ ক্ষুধার জ্বালায় পেট যে প্রচণ্ড জ্বলছে। তাই সে একটু পর পর মাথা জাগিয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু এমন করলে যে পশুপাখিরা টের পেয়ে যাবে। তার ভয়ে আর নদীর ধারেকাছেও আসবে না। কী করা যায় এ নিয়ে ভাবতে লাগল। এমন সময় দেখল একপাশ দিয়ে কতগুলো লতাপাতা ভেসে যাচ্ছে। কুমিরটি সেগুলোর নিচে গিয়ে হালকা মাথা জাগিয়ে চুপ করে বসে রইল।   

বাঘটিও নদীর কিনারে এসে কোনও শিকার না পেয়ে জঙ্গলের মধ্যে একটি বড় পাতার আড়ালে মাথা লুকিয়ে রইল। মাঝে মাঝে পাতার এক কিনার দিয়ে তাকিয়ে দেখে কোনও প্রাণি আসছে কি না। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরেও কোনও শিকার না দেখে সে কুমিরের মতোই হতাশ হয়ে পড়ল। প্রচণ্ড রাগ লাগছে তার। কিন্তু সেই রাগ কার উপর ঢালবে ? রাগ ঝাড়ার মতো কাউকে পেলে তো সবকিছু মিটেই যেত।  

‘আজ বুঝি কিছুই পাব না। মনে হচ্ছে ক্ষুধায় মরতে হবে। প্রকৃতি এত নিষ্ঠুর কেন ? কেনই-বা মানুষের মতো আমাদের খাবার নেই। কেন আমাদের অন্য প্রাণিকে ধরে ধরে খেতে হয় ? কেন এভাবে প্রতিদিন খাবারের জন্য মাইলের পর মাইল দৌড়াতে হবে ? কেন দূর পাহাড়-পর্বত পাড়ি দিতে হবে ? প্রয়োজনে পরিশ্রম করব। খাবার ফলাব।’ এ কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বাঘের হঠাৎ চোখ পড়ল নদীর কিনারায় পানির দিকে। পানির মধ্যে হালকা ঢেউ। কী যেন নড়ছে। এ সময় আনন্দে বাঘটির মন ভরে উঠল। মনে মনে বলল, ‘নিশ্চয়ই এখানে কোনও শিকার আছে। কাছে গিয়ে দেখি কী আছে।’ এরপর খুব সতর্কতার সাথে বাঘটি জলের দিকে পা বাড়াল। 

অপরদিকে কুমিরটিরও একই অবস্থা। সেও ঝোপঝাড়ের মধ্যে পাতা নড়তে দেখছে। বাঘটির মতো কুমিরের মুখে হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে বলতে লাগল, ‘এবার হয়তো পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারব। ঝোপের ধারে কোনও জীব-জন্তু এসেছে। এটাকে আমার শিকার করতেই হবে।’ পানির আবরণ ছেড়ে কুমিরটিও ডাঙায় উঠতে শুরু করল। বাঘ আর কুমির এবার মুখোমুখি। দুজনই অস্থির। দুজনের চোখই জ্বলজ্বল করছে।

চোখের সামনে মস্ত বড় কুমির দেখে বাঘটি যেন আকাশ থেকে পড়ল। এত বড় কুমির সে কখনও দেখেছে কি না মনে করতে পারছে না। তাই মনে মনে বলল, ‘ওমা, এটা আবার কী ? এত বড় জলজ প্রাণি জীবনে কখনও দেখিনি। এতদিন কোথায় ছিল এটা ?’

বাঘটি ধীরে ধীরে এগোলেও মনে মনে ভয়ও কাজ করছে। কিন্তু পেটে তো অনেক জ্বালা। কুমিরটি যত বড় প্রাণিই হোক না কেন তাকে কুপোকাত করতেই হবে।

কুমিরটিরও একই অবস্থা। সেও কখনও এত বড় বাঘ দেখেনি। তাই একটু ভেবেচিন্তে সামনে পা বাড়াচ্ছে আর মনে মনে বলছে, ‘এত বড় স্থলের প্রাণি তো কখনও চোখে পড়েনি। আমার চেয়ে বাঘটিও শক্তিশালী কম নয়। তাই যা-ই করি সাবধানে করতে হবে।’ কিন্তু ভেবে আর কী হবে ? পেটের যন্ত্রণা তো আর সয় না। যেভাবেই হোক বাঘটিকে তার শিকার করতেই হবে। কুমিরটি তাই তার দু চোয়াল খুলে সামনের দিকে অগ্রসর হলো।

বাঘের মতো তার মনেও অনেক ভয় কাজ করছে। কিন্তু সেই ভয়কে তুচ্ছ করে কুমিরটি মনে মনে বলল, ‘না খেয়ে মরার চেয়ে যুদ্ধ করে মরাই ভালো। হয় জিতব, না হয় মরব। আর হেরে গেলেও চলবে না। আমার জিততেই হবে। বাঁচতেই হবে। যে কোনও মূল্যেই হোক বাঘটি আমার চাই-ই।’

যেই কথা, সেই কাজ! বাঘ ও কুমির দুজনই দুজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর জোর গলায় গর্জন করতে লাগল।

কেউ কারও চেয়ে কোনও দিক দিয়ে কম নয়। বাঘের রাজত্ব ডাঙায় আর কুমিরের জলে। দুজনই দুজনকে আঘাত করছে। কিন্তু কেউ কাউকে ঘায়েল করতে পারছে না। তবে এর মাঝেই বাঘটি কুমিরকে হুংকার দিল, ‘আজ তোকে খাবই খাব। তুই যত বড় শক্তিশালীই হোস না কেন। কোনও লাভ হবে না।’

কুমিরটিও বাঘের চেয়ে কম যায়নি। সেও চোখ রাঙিয়ে বলল, ‘আমিও তোকে ছাড়ব না। তোকে আজ কুপোকাত করবই করব।’ এই বলে কুমিরটি হঠাৎ করে বাঘের একটি পায়ে কামড় দিয়ে বসল আর বলতে লাগল, ‘এবার ধরেছি তোকে। যতই চেষ্টা করিস না কেন আর কাজ হবে না।’

বাঘটিও তো কম শক্তিশালী না। সেও কুমিরটিকে পালটা আঘাত করার জন্য শক্তি জোগাতে লাগল। যেই পাটি কুমির কামড়ে ধরেছে সেটি একটি ঝাড়া দিয়ে কুমিরকে ফেলে দিল। এরপর একটু কপট হাসি দিয়ে বলতে লাগল, ‘তুই কী করবি আমার ? এবার দেখ আমি তোকে কী করি।’ এ বলে বাঘটি কুমিরের চোয়ালের উপর কামড় দিয়ে বসল। কুমিরটি প্রথম দিকে একটু দুর্বল হলেও আবার শক্তি খাটাতে শুরু করল। ‘একটা কামড়ে আমার কিছু হবে না। কী করবি বাঘ ? আমি এই নদীর বিশাল প্রাণি। আমাকে ভয় পায় না এমন প্রাণি খুব কমই বাস করে এখানে।’ এই বলে কুমিরটি বাঘটিকে একটি ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল। কিন্তু তাতে বাঘের কিছু হলো না। সেও শরীরটি মোচড় দিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়ে কুমিরের দিকে চোখ রাঙাতে লাগল। 

বাঘ ও কুমিরের গর্জন জলে ও স্থলে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আশেপাশের সকল প্রাণি ছুটাছুটি করে ঘটনার স্থান খুঁজতে লাগল। অবশেষে জল ও স্থলের বেশিরভাগ প্রাণিই নদীর ঘাটে এসে হাজির হলো। স্থানটি সকল প্রাণির এক মিলনমেলায় পরিণত হলো। সবাই অবাক দৃষ্টিতে বাঘ ও কুমিরের যুদ্ধ দেখছে আর জোর গলায় আওয়াজ করছে। যেই বাঘ ও কুমিরের জন্য সকল প্রাণি ভয়ে পালাত আর আজ তারাই বাঘ ও কুমিরের যুদ্ধস্থল ঘিরে ধরে আছে।  

হঠাৎ করে বাঘের দৃষ্টি পড়ল চারদিকে। দেখেই অবাক, ‘এ কী অবস্থা! যে শিকারের জন্য আজ সারাদিন তন্নতন্ন করে খুঁজেছি অথচ তারাই আজ আমাদের চারদিকে ঘিরে রেখেছে। প্রকৃতির এ কেমন বিচার ?’

কিন্তু চোখের সামনে এত এত শিকার দেখেও আজ কেমন যেন রুচি হচ্ছে না। কারণ কুমিরটির উপর তার প্রচণ্ড ক্রোধ চেপে বসেছে। তাই মনস্থির করে ভাবল, ‘না আজ তাদের খাব না। যা হওয়ার এই কুমিরটির সাথে হবে। তাছাড়া আমি তো আর হেরে যাওয়ার মতো পাত্র নই। যদি কুমিরটির কাছে হেরে যাই তাতে বনের সব পশুপাখি আমাকে কী বলবে ?’

বাঘের পরে এবার কুমিরেরও দৃষ্টি পড়ল চারদিকে। বাঘের মতোই সে অবাক হয়ে গেল, ‘হায় হায়! চারদিকে এত শিকার! অথচ তাদের ধরতে পুরো নদী তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। তারাই আমার চারদিকে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে।’ পেটে অনেক ক্ষুধা থাকলেও কুমিরটি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। এরপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে মনে মনে বলল, ‘না, আজ তাদের খাবো না। যেভাবেই হোক আজ আমাকে বাঘটিকে খেতেই হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত জীবন থাকে লড়ে যাব।’

কুমিরটি বারবার বাঘের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙায়। সময় যত গড়াচ্ছে জল-স্থলের প্রাণিদের ভিড় ততই বাড়ছে। এমন দৃশ্য তো সে আগে কখনও দেখেনি। বিষয়টা তাকে ভাবিয়ে তুলছে। মাথা থেকে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সে বাঘটিকে বলতে লাগল, ‘এই যে বনের বাঘ, চারদিকে শুধু খাবার আর খাবার! তাজা মাংসের গন্ধ! কী সুন্দর পরিবেশ, তাই না ? তুই ভেবেছিস হয়তোবা আমি এদের শিকার করে পেটের জ্বালা মেটাব। কিন্তু তা আর আজ হবে না। আজ যদি পেটের জ্বালা মেটাতে হয় তবে তোকে দিয়েই মেটাব। কোনওভাবেই তোকে ছাড়ব না।’

বাঘটিও যে সেই একই প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ সেটা কি কুমির জানে ? বাঘটিও তো নাকে কাঁচা মাংসের গন্ধ পেয়েছে। কিন্তু এই খাবার দেখে তার জিহ্বায় এক বিন্দুও জল আসেনি। বরং কুমিরটিকে কুপোকাত করতেই তার জিহ্বা দিয়ে লালা ঝরছে।

এ যেন মল্লযুদ্ধ। দুই কুস্তিগীর লড়াই করছে আর দর্শকরা গ্যালারিতে বসে সেই দৃশ্য দেখছে। এই যুদ্ধের প্রতি তাদের একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। কারণ বাঘ ও কুমিরের কাছে সবাই অসহায়। তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কেউ কোনওদিন মাথা উঁচু করে প্রতিবাদ করতে পারেনি। তার চেয়েও বড় কথা হলো, জল ও স্থলের এই দুই রাজাকে তারা কখনও ভালো করে দেখতে পারেনি। সামনে পড়েছে তো হয় মরো অথবা পালাও। তাই আজ তারা অতি আগ্রহের সাথে এই দুই শক্তির যুদ্ধ দেখছে।

বাঘটি বারবার গর্জন করছে আর আঘাত করছে। কিন্তু কুমিরটিকে কিছুই করতে পারছে না। তাই রেগে এবার সে কুমিরটিকে জোরে একটি ধাক্কা মারে। তাতে কুমিরটি পানিতে পড়ে যায়। ফলে কিছুটা হলেও মনে মনে শান্তি পেল সে। অতঃপর বাঘটি কুমিরকে লক্ষ করে বলল, ‘এবার তোকে খাব। তুই হেরে গেছিস। তুই তো দাঁড়িয়েই থাকতে পারলি না।’

জলে পড়তেই কুমিরটি যেন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল। পুরো শরীরে বিদ্যুৎ চমকে গেল। মাথাটা উঁচু করে বাঘের দিকে ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল, ‘না, আমি হেরে যাওয়ার পাত্র নই। আমি তো ডাঙায় তোর সাথে যুদ্ধ করেছি। পারলে তুই জলের মধ্যে আয়। তারপর দেখি কত শক্তি আছে তোর।’

কুমিরের কথা শুনে বনের সব পশুপাখি হাততালি দিতে দিতে বলতে লাগল, ‘ঠিক বলেছ কুমির ভাই।’ পশুপাখিদের কণ্ঠে মুখর হয়ে উঠল চারদিক। বনের পশুপাখিরা বাঘটির প্রতি খুবই বিরক্ত। এতদিন মুখ বুজে বাঘের সব অত্যাচার সহ্য করে এসেছে। সামনেও যে সহ্য করতে হবে সেটাও জানে তারা। তারপরেও আজকে তারা সুযোগ পেয়ে কুমিরের পক্ষ নিয়ে বাঘের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাল।

চারদিকে পশুপাখিদের কণ্ঠ শুনে বাঘটি অবাক হয়ে গেল। যারা তাকে দেখলে দৌড়ে পালায় আর আজ তার সামনেই এত বড় স্পর্ধা! রাগে শরীরে আগুন জ্বলতে লাগল। তারপরেও কুমিরের প্রতি জেদের কারণে সুর নরম করে বলল, ‘তাই বলে তোমরা জলের প্রাণিদের পক্ষ নেবে ? ভালো করি মন্দ করি আমি তো তোমাদের ডাঙার প্রাণি।’

কথাটা শুনে চারদিকে হাসির রব উঠে গেল। স্থলের সব প্রাণি বলতে লাগল, ‘এতদিন এই কথা কোথায় ছিল ? এতদিন কি আমরা ডাঙার ছিলাম না ? আমাদের বাবা-মা, ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজনদের তুমি গিলে খেয়েছ। সেই কথা আমরা ভুলিনি, জীবনে ভুলবোও না।’

ডাঙার প্রাণিদের এই কথার কী জবাব দেবে তা ভেবে পাচ্ছে না বাঘটি। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তারপর বলল, ‘আমি যদি বেঁচে না থাকি তাহলে মনে করছ খুব শান্তিতে থাকবে, তাই না ? আমি যেদিন থাকব না সেদিন বুঝবে কুমিরের কত যন্ত্রণা!’

বাঘের এই কথা শুনে স্থলের পশুপাখির হাসি-ঠাট্টা আরও বেড়ে গেল। কিন্তু বাঘটি এবার সেগুলো না শোনার ভান করে কুমিরকে বলল,    

‘ডাঙায় আয়, আবার আমি তোকে মজা দেখাব।’ 

‘হ্যাঁ আসছি, দেখি তুই কী করতে পারিস।’  

‘আগে আয়, তারপরে দেখ।’  

বাঘের কথায় কুমিরটির জেদ আরও বেড়ে গেল। তাই আস্তে আস্তে সর্তকতার সাথে সে ডাঙায় উঠতে লাগল। উপরে এসে শক্ত করে পজিশন নিল। বাঘটিও তার পজিশন শক্ত করল। এবার হবে আসল যুদ্ধ।

বাঘ ও কুমিরের মুখোমুখি অবস্থান দেখে জল ও স্থলের সব প্রাণির আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। বনের সব পশুপাখি কুমিরটিকে উৎসাহ দিচ্ছে। অপরদিকে জলের সব প্রাণি বাঘটিকে উৎসাহ জোগাচ্ছে। কারণ তারা আবার কুমিরটির উপর প্রচণ্ড খেপে আছে। কুমিরের ভয়ে তাদের দূরে দূরে থাকতে হয়। 

শুরু হয়ে গেল বাঘ ও কুমিরের যুদ্ধ। দুজনই দুজনকে আঘাত করার চেষ্টা করছে। দশর্কদের মধ্যে চরম উত্তেজনা। কিন্তু সেই আগের মতোই কেউ কাউকে ঘায়েল করতে পারছে না। বাঘটির মাথায় নতুন একটি চিন্তা এল। নিশ্চয়ই এভাবে কুমিরটিকে পরাজিত করা যাবে না। কোনও নতুন কৌশলে এগোতে হবে। তাছাড়া কুমিরটির দেহ এতই বড় যে তাকে সহজে ঘায়েল করা যাবে না। কী করা যায় ? মাথায় তো আর কিছু আসছে না। কিন্তু পেট তো সয় না। ক্ষুধার জ্বালায় প্রাণ যাওয়ার মতো অবস্থা। হঠাৎ করে বাঘের মাথায় একটি বুদ্ধি খেলে গেল। সে বলে উঠল, ‘আজ আকাশটি কত সুন্দর! মন চায় বারবার আকাশের দিকেই তাকিয়ে থাকি। এত সুন্দর আকাশ জীবনে কখনও দেখেছি বলে মনে হয় না!’

কুমিরটির আবার আকাশ খুবই প্রিয়। মেঘবিহীন উজ্জ্বল আকাশ দেখলে তার প্রাণ জুড়িয়ে যায়। মাঝে মাঝে সে নদীর কিনারে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাই বাঘের কথাটা শুনে সে আর লোভ সামলাতে পারল না। সাথে সাথেই সে আকাশের দিকে তাকাল। আর এই সুযোগে বাঘটি খুব জোরে কুমিরটিকে আঘাত করে বসল।

ব্যথায় কাতরাচ্ছে কুমিরটি। জলের সকল প্রাণির চেঁচামেচিতে মুখর হয়ে উঠল চারদিক। তারা হাততালি দিয়ে বলতে লাগল ‘জয় হোক বাঘের, জয় হোক!’  

জলের প্রাণিদের এমন সমর্থন দেখে কুমিরটি অবাক হয়ে গেল। তাই বলে নিজ জাতির অসম্মান ? নিজ জাতিকে অপমান ? জলের প্রাণিরা এতই বেইমান ? কথাটা ভেবে কুমিরের বুকে যেন আগুন জ্বলতে লাগল। মনে মনে বলল, ‘আমি কি এতই দুর্বল ? আমার শরীরে কি রক্ত-মাংস নেই ? একটুখানি আঘাতেই বিগড়ে যাব ?’ শরীরটাকে একটি মোচড় দিয়ে সে এক লাফে বাঘটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাঘটিও পালটা আঘাত করতে লাগল। দুজনেরই শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে। তাতে কোনও ভ্রƒক্ষেপ নেই। দুজনই দুজনের দিক থেকে অবিচল। এবার আর কেউই থামছে না। 

দর্শকদের উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল। এ কী দেখছে তারা! জলের কুমির তো জলের আতঙ্ক আবার ডাঙার বাঘ তো ডাঙার আতঙ্ক। কিন্তু সেই দুই দানবের মল্লযুদ্ধ তাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

একটানা অনেকক্ষণ যুদ্ধ করে দুজনেই ক্লান্ত। শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। সাথে জখমের জায়গা দিয়ে রক্তও বের হচ্ছে। আর পারছে না। ক্ষুধার জ্বালায় জন্তু দুটির পেট দুটোও সরু হয়ে আসছে। কিন্তু হেরে যাওয়ার লজ্জা থেকে বাঁচতে দুজনই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

এমন সময় হঠাৎ করে এক টিয়া পাখির আগমন। সে বলল, ‘ওহে বাঘ, ওহে কুমির, তোমরা দুজনই বোকা। তোমাদের বুদ্ধি বলতে কিছুই নেই। তোমরা কেন যুদ্ধ করছ ? তোমরা দুজন দুই অঞ্চলের শক্তিধর প্রাণি। তোমরা এক হও। দুজনেই দুজনের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াও। দেখবে তোমাদের সামনে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।’

টিয়া পাখির কথা শুনে জল-স্থলের সব প্রাণি হতবাক। সবার মনে নানা প্রশ্ন জাগতে শুরু করল। কেউ বলতে লাগল, ‘বাঘ ও কুমির যদি এক হয় তাহলে আমাদের বারোটা বেজে যাবে। দুজন মিলে আমাদের ধরে ধরে খাবে। তখন আর প্রতিবাদ করার মতো কিছু থাকবে না। না এ হতে পারে না। আমরা টিয়া পাখির কথায় সমর্থন দিতে পারি না।’

আবার অনেকে বলতে লাগল, ‘ঠিক বলেছে টিয়া পাখি। বাঘ ও কুমিরের বন্ধুতের হাত বাড়ানোই ভালো। তবে সেটা হতে হবে জল-স্থলের সব প্রাণিকে নিয়ে। তাহলে আমাদের আর পালিয়ে থাকতে হবে না। স্বাধীনমতো ঘুরতে পারব, স্বাধীনমতো বসবাস করতে পারব।’

ভয় আর বন্ধুত্বের বেড়াজালে দ্বিধাদ্বন্দ্বে দর্শক গ্যালারি। দর্শকদের মাঝে দুই ধরনের মতবাদ নিয়ে এক ধরনের হইচই পড়ে গেল। যে যার যার মতো করে উচ্চস্বরে চেঁচামেচি করতে লাগল। টিয়া পাখিও হতবাক দুই ধরনের মতবাদের জন্য। কিন্তু কী করা যায়। কিছুই ভেবে পাচ্ছে না।

অপরদিকে বাঘ ও কুমির প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে গেছে। কারওরই শক্তিতে আর কুলাচ্ছে না। দুজনই জল ও স্থলের প্রাণিদের কথা শুনছে। কিন্তু কোনও জবাব দিচ্ছে না। টিয়া পাখির কথাও তারা দুজন ভালো করে ভাবছে। কিন্তু ক্ষুধার জ্বালায় কোনও কিছুই ঠিকমতো চিন্তা করতে পারছে না।

টিয়া পাখি চারদিকে ঘুরছে আর সকলের মতামত নিচ্ছে। যে যার মতো করে মতামত দিচ্ছে। কিন্তু এত মতামতের ভিড়ে টিয়া পাখিও এখন সিদ্ধান্তহীন। এমন সময় হঠাৎ উপর থেকে প্রতিধ্বনি শোনা গেল, ‘এভাবে বন্ধুত্ব হতে পারে না। না না না…।’ 

সবার দৃষ্টি এখন আকাশের দিকে। কে এল আবার ? যুদ্ধস্থলের উপর উড়তে উড়তে ময়না পাখি বলতে লাগল, ‘আমি একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। তোমরা আগে মনোযোগ দিয়ে শোনো, তারপর চিন্তা করে হ্যাঁ বা না বলো।’ ময়না পাখির কথায় সবাই সাড়া দিয়ে বলতে লাগল, ‘ঠিক আছে ময়না পাখি। আগে তোমার প্রস্তাব পেশ করো।’ 

টিয়া ও ময়না পাখির আগমনে বাঘ ও কুমির দুজনই প্রায় অবাক হয়ে গেল। কেউই ভাবেনি এ স্থান একটি মিলনমেলায় পরিণত হবে। যেই পেটের জ্বালায় তারা দুজন এখানে এসেছে, সেই কথা না ভেবে অন্য চিন্তা করছে। বাঘ আর কুমিরের প্রায় যায় যায় অবস্থা। ক্ষুধার জ্বালায় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। হঠাৎ করে দুজনই মটিতে লুটিয়ে পড়ল। অপরদিকে দশর্কদের কোনও নজর নেই তাদের দিকে। সবার দৃষ্টি এবার উপরের দিকে। কেননা টিয়া ও ময়না দুজনেই উপরে উড়ে উড়ে কথা বলছে। মনে হচ্ছে দর্শকেরা দুই কুস্তিগীরের কথা একেবারেই ভুলে গেছে।

টিয়া ও ময়না পাখি দেখতে পেল বাঘ ও কুমির মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তাই কথা বন্ধ করে নীরব হয়ে গেল। ফলে আবার বাঘ ও কুমিরের দিকে মনোযোগ দিল সবাই। চারদিক থেকে বলাবলি করতে লাগল, ‘বেশ হয়েছে, অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি যারা করে তাদের পরিণতি এমনই হয়। এতদিন আমাদের মাংস খেয়েছিস তোরা। আজ আমরা তোদের মাংস খাব।’

তাদের মৃত্যু হয়েছে মনে করে চারদিক থেকে সকল প্রাণি হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সবাই ঠোকাঠোকি করতে লাগল। এমন সময় বাঘ ও কুমির মোচড় দিয়ে লাফিয়ে উঠল। আসলে প্রাণিদের আঘাতেই তারা আবার বোধশক্তি ফিরে পেল। তবে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করল বাঘ ও কুমির। মুহূর্তের মধ্যেই কয়েকটি প্রাণি শিকার করে নিজেদের পেটের জ্বালা মেটাল। এটা দেখে অন্য সব প্রাণি ভয়ে দৌড়ে পালাল।

বাঘ ও কুমিরের এমন কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে যায় ময়না পাখি। সে আসলে বুঝতে পারছে না ব্যাপারটা। দুজনই একসাথে অজ্ঞান হয়ে গেল, আবার দুজনই একসাথে জ্ঞান ফিরে পেল! ময়না পাখি মনে মনে বলছে, ‘নিশ্চয়ই এটা কোনও ফাঁদ হবে। দুজন সন্ধি করে মরার ভান ধরেছিল। অন্য প্রাণিদের শিকার করার জন্যই তাদের এই নাটক।’  

টিয়া ও ময়না গাছের ডালে বৈঠকে বসল। সাথে নানা প্রজাতির পাখিও আছে। বাঘ ও কুমিরকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। কীভাবে কী করা যায় সেটা নিয়ে তারা ভাবতে লাগল। ময়নাটি অবশ্য একটি পোষা পাখি। বনের মধ্যে এক দস্যু তাকে পালন করে। তবে পোষ মানায় সে তাকে কখনও জোর করে খাঁচায় বন্দি রাখে না।

টিয়া পাখি হঠাৎ বলল, ‘বন্ধু আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।’

‘বুদ্ধির জন্যই তো আমরা এখানে বসেছি, বলেই ফেলো সেটা।’

‘তোমার যে মালিক সে তো পশু-পাখি শিকার করে তাই না ?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু তাকে দিয়ে কী হবে ?’

‘আমাকে সেখানে নিয়ে যাও। আর এখানে এত পাখির মাঝে এই কথা বলা যাবে না। 

‘ঠিক আছে তাহলে, চলো এক্ষুনি যাই।’

দুই বন্ধু একসাথে আকাশে উড়াল দিল। নিচে সবুজের বন ও নদী-খাল-বিল। উড়তে উড়তে একসময় তারা গন্তব্যে পৌঁছল।

ময়না পাখির জন্য সুন্দর একটি খাঁচা রয়েছে। দিনের বেলা সেটার দরজা খুলে বাইরে রাখা হয়। যাতে ময়না পাখিটি যখন খুশি ঘুরতে যেতে পারে। তবে রাতে বনের পশুপাখিদের থাবা থেকে রক্ষা করতে সেটি ঘরের মধ্যে রাখা হয়। দুই বন্ধু যখন ওই দস্যুর উঠানে পৌঁছল তখন সূর্যের আলো প্রায় নিভে আসছে। দস্যুর স্ত্রী খুব চিন্তায় ছিল। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে অথচ তাদের ময়না বাড়ি ফিরছে না। হঠাৎ ময়নার আগমনে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। তার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছে তার সাথে একটি টিয়া পাখি দেখে। মনে মনে বলল, ‘এইটারে কয়দিন বন্দি রাখতে হবে। পোষ না মানা পর্যন্ত ছাড়া যাবে না।’

ময়না পাখি তার বন্ধুকে নিয়ে খাঁচায় প্রবেশ করতেই দস্যুর স্ত্রী খাঁচার দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর খাঁচাটি ঘরে নিয়ে কিছু খাবার দিল। দস্যুর স্ত্রীর আপ্যায়নে টিয়া পাখির মুখটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু সূর্যের আলো যখন পশ্চিম আকাশ ঘিরে চারদিক আলোকিত করে তখন টিয়া পাখির মুখটি সন্ধ্যার আকাশের মতো বিবর্ণ হয়ে যায়। সকালে টিয়া পাখিটিকে খাঁচায় বন্দি রেখে ময়না পাখিটিকে মুক্ত করে দেওয়া হয়।

টিয়া পাখিটি কখনও এরকম বন্দি জীবন কাটায়নি। তবে দস্যুর স্ত্রীর আপ্যায়ন আর বন্ধুর সাথে গল্প-গুজবে তার কাছে সেরকম কিছু মনে হয়নি। কিন্তু ভুল ভাঙে ভোরবেলায়। ময়না পাখিটি অবশ্য খাঁচার চারদিক ঘুরে তাকে সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু তাতে তার মন মানে না। সেও চায় ময়নার মতো মুক্ত পরিবেশে ঘুরতে। 

রাগ আর শোকে টিয়া পাখিটি প্রায় ভেঙে পড়ল। তবে রাতের বেলা যখন দুজনকে আবার এক খাঁচায় দেওয়া হয় তখন কিছুটা স্বস্তি অনুভব করে সে। এভাবেই দিন যেতে লাগল। টিয়া পাখি যেই আশা নিয়ে এখানে এসেছিল তা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যেই বাড়ির মানুষ তাকে বন্দি করেছে তার কাছে সে কীভাবে সাহায্য চায় বাঘ ও কুমিরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ?

ময়না অবশ্য তাকে প্রায়ই কথাটা বলতে বলে। কিন্তু টিয়া রাজি হয় না। তার এক কথা, যতদিন পর্যন্ত সে মুক্ত না হবে ততদিন পর্যন্ত সে ওই ব্যাপারে কিছু বলবে না। এভাবে এক মাস চলে যায়। মনে ক্ষোভ থাকলেও টিয়া পাখিটি সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেয়। তাছাড়া দিনে একা একা বন্দি থাকলেও রাতে তো ঠিকই সে বন্ধুর সাথে একই খাঁচায় ঘুমাতে পারে।

দস্যুর স্ত্রী যখন মনে করল টিয়া পাখিটি পোষ মেনেছে তখন তাকে ময়না পাখির মতো মুক্ত করে দেওয়া হয়। মুক্ত হয়ে টিয়া পাখির এখন আর এই বাড়ি ছেড়ে পালাতে ইচ্ছে করে না। কারণ বাড়িটি যে তার কাছে আপন হয়ে গেছে। অতঃপর টিয়া পাখি ময়নাকে সব পরিকল্পনা খুলে বলে। ময়না সেটা শুনে খুব আগ্রহ দেখায় আর বলে, ‘আজ রাতে আমি মালিককে সবকিছু খুলে বলব।’

ওয়াইডার নদীর পাড়ে একটি বড় লোহার খাঁচা বানায় দস্যু। খাঁচাটির দুই দিক দিয়েই দরজা আছে। কেউ ইচ্ছে করলে বনের দিক দিয়েও প্রবেশ করতে পারবে আবার নদীর দিক দিয়েও প্রবেশ করতে পারবে। লোহার খাঁচার মধ্যে একটি মজবুত কাচের খাঁচাও বানানো হয়েছে। অবশ্য খাঁচার মধ্যে বাতাস চলাচলের জন্য ছোট ছোট ছিদ্রও রাখা হয়েছে, যাতে কেউ ভেতরে গেলে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা না হয়।

এদিকে টিয়া-ময়না দুই বন্ধু মিলে নদীর পাড়ে গিয়ে জলজ প্রাণিদের সাথেও কথা বলে এসেছে। তাদের বলে দেওয়া হয় ওমুক দিন ওমুক সময় সবাই যেন নদীর পাড়ে আসে। তাছাড়া বনের পশুপাখিদেরও তারা একই সময় নদীর পাড়ে আসার কথা জানিয়ে দেয়।

পরিকল্পনামতো জল ও স্থলের সব প্রাণি খাঁচার দুদিকে এসে হাজির হয়। তবে যেই দুই দিকে দরজা রাখা হয়েছে সেই দিকে খালি রাখা হয়েছে। জল-স্থলের সব প্রাণি চেঁচামেচিতে মুখরিত হয়ে উঠল চারদিক। কী ঘটতে যাচ্ছে এই অপেক্ষায় আছে তারা। তবে খাঁচার মধ্যে কাচের যে একটি ঘর বানানো হয়েছে সেটার মধ্যে দুটি প্রাণি ভরে দেওয়া হয়েছে। একটি জলের আরেকটি স্থলের। তারা সেখানে যুদ্ধ করছে। সেই যুদ্ধ দেখে সব প্রাণী হাততালি দিতে লাগল।

আজ অবশ্য দর্শকসারিতে সবাই যার যার দলের পক্ষে সমর্থন দিচ্ছে। জলের প্রাণিটি যখন বনের প্রাণিটিকে আঘাত করে তখন জলের সব প্রাণি হাততালি দেয়। আবার বনের প্রাণিটি যখন জলের প্রাণিটিকে আঘাত করে তখন বনের প্রাণিরা হাততালি দেয়। কারণ এখানের কেউই তাদের শত্রু না। বাঘ ও কুমিরের মতো এরা তাদের অত্যাচার করে না।

খাঁচার মধ্যে যে কাচের তৈরি ঘরে দুই কুস্তিগীরের লড়াই চলছে এটা বুঝতেই পারল না কোনও কোনও প্রাণি। কারণ স্বচ্ছ কাচের কারণে বোঝাই যাচ্ছে না যে এটাও একটি ঘর। তাছাড়া লোহার খাঁচার দুই দিকের দরজা খোলা। সবাই ভাবছে হয়তো বাঘ ও কুমিরের মতোই তাদের যুদ্ধ চলছে। পার্থক্য শুধু এতটুকুই, এখানে তারা নির্ভয়ে আছে। সেদিনের মতো আজ তাদের জীবন দিতে হবে না।

দুই কুস্তিগীরের লড়াইয়ে টান টান উত্তেজনা চলছে। দর্শকদের চেঁচামেচির শব্দ দূর-দূরান্তে পৌঁছে যায়। পৌঁছায় বাঘ ও কুমিরের কানেও। দুজনই নদীর ধারে এসে খুশিতে আত্মহারা। সেদিনের মতো আজও তারা মনের সুখে তাজা মাংস খেতে পারবে। তবে খাঁচার কাছে এসে দুজনই অবাক হয়ে যায়। সেদিন যে দুজন যুদ্ধ করেছিল এরকম যুদ্ধই হচ্ছে ভেতরে। আর গ্যালারিতে তো দর্শক আছেই।

তবে বাঘ ও কুমিরকে দেখে ভয়ে সব প্রাণির আত্মা শুকিয়ে গেল। সবাই দৌড়ে পালাতে লাগল। এই দৃশ্য দেখে বাঘ ও কুমিরের মন খারাপ হয়ে যায়। এত আশা করে তারা এখানে এসেছে আর তাদের দেখামাত্রই সবাই পালালো। রাগে দুজনেরই শরীর জ্বলতে লাগল। এতক্ষণ পেটে যতটুকু ক্ষুধাই থাকুক না কেন তা যেন আরও কয়েকশ গুণ বেড়ে গেল।

কী আর করা! দুজনে দুই দিক দিয়ে খাঁচার মধ্যে প্রবেশ করল যুদ্ধরত দুই প্রাণিকে খাওয়ার জন্য। কিন্তু ভেতরে গিয়ে দুজনই অবাক। একে অপরের শত্রুর মুখোমুখি তারা। ফলে দুজনই যুদ্ধরত প্রাণিদুটি শিকারের কথা ভুলে গেল। জেগে উঠল পুরোনো ব্যথা। দুজনই দুজনের উপর লাফিয়ে পড়ল। শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। তাছাড়া জল-স্থলের সব প্রাণি পালিয়েছে। তাই বাইরের কোনও সাড়াশব্দও নেই।

এমন সময় দস্যু ও তার দল এসে খাঁচার দরজা আটকে দেয়। কিন্তু তা খেয়াল করেনি বাঘ ও কুমির। তারা যুদ্ধ চালিয়েই যাচ্ছে। আর এই দৃশ্য দেখে উপর থেকে টিয়া-ময়না নাচতে লাগল। জোরে জোরে চিৎকার করে সব প্রাণিকে আবার ওয়াইডার নদীর ধারে আসতে বলল।

অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও জল-স্থলের প্রাণিদের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠল চারদিক। কিন্তু সেদিকে কোনও খেয়াল নেই বাঘ ও কুমিরের। যুদ্ধ করতে করতে যখন হাঁপিয়ে ওঠে তখন তারা চারদিকে প্রাণিদের হাসি-তামাশার শব্দ শুনতে পায়।

ততক্ষণে অবশ্য তাদের ক্ষুধাও বেড়ে গেছে। মনে পড়ে দুটি প্রাণীর যুদ্ধের কথা। কিন্তু তারা যখন প্রাণি দুটিকে খেতে যায় তখন কীসে যেন বাধা পায়। কারণ প্রাণি দুটি যে কাচের খাঁচায় আছে। বাঘ ও কুমির আরও খেপে ওঠে। জোরে জোরে লাফ দিয়ে প্রাণি দুটিকে আঘাত করতে থাকে। তাতে কাচ ভেঙে দুজনের চোখ-মুখ কেটে যায়। অন্ধ হয়ে দুজনই জোরে জোরে চিৎকার করে এদিক-ওদিক দৌড়াতে লাগল। কিন্তু তারা যে এখন খাঁচায় বন্দি সেদিকে কোনও খেয়াল নেই। ফলে তারা লোহার খাঁচাতেও প্রচণ্ড আঘাত পায় আর চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘বাঁচাও বাঁচাও।’

কথায় বলেÑকারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ। বাঘ ও কুমিরের সর্বনাশ হলেও চারদিকে উত্তেজিত প্রাণিদের মনে যে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। তারা জোর গলায় বলতে লাগল, ‘মর তোরা, মর।’ এ সময় টিয়া আর ময়না খাঁচার উপরে এসে বলতে লাগল, ‘অত্যাচারী আর বেইমানের শেষ পরিণতি এমনই হয়।’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button