আর্কাইভগল্প

গল্প : প্রত্যাবর্তন : সাঈদ আজাদ

মাছের ব্যাগ রেখেই জালাল চলে যায়। যমুনা ব্যাগ উপুড় করে মাছগুলো ঢালে। দ্রুত হাতে মাছগুলোর উপরে ছাই ছিটায়।

গায়ে ছাই পড়তেই রোদরঙা ট্যাংরাগুলো লাফাতে শুরু করে। জোছনারঙা পুঁটিগুলো অবশ্য নিথরই থাকে। শিং, বাইম আর টাকি কটা একেবেঁকে চলা শুরু করে, যেন কানকোয় ভর করে চলা কইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাদের মাঝে রয়না আর বেলেগুলো একটু বেমানানই লাগে। ওরা একটু ফ্যাকাসে আর সব মাছেদের মাঝে। মাছগুলোকে একপলক দেখেই দ্রুত হাতে পুঁটির আঁশ ছাড়াতে শুরু করে যমুনা। পুঁটিগুলোই আগে নরম হতে শুরু করে, তাই এগুলো আগে কুটতে হয়।

পাশে শান্তি বটির গোড়া দিয়ে শিংমাছের কাঁটা ভাঙতে ভাঙতে বলে, অত তাড়াহুড়ার কী আছে ? আস্তে ধীরে কাজ করো না ভাবি।

মাছ বেশি জমা থাকলে যদি আবার মাছ না পাই।

কী যে কও না ভাবি! জালাল ভাই তোমারে মাছ না দিয়া অন্য কাউরে দিব না, তা তুমি ভালো কইরাই জানো।

কওয়া যায় নাকি! শুক্রবার না আজ, কাজ এমনিই বেশি। সে কি সব মাছ আমারে দিব নাকি ?

হউক বেশি। তা হইলেও জালাল ভাই তোমারে ছাড়া কাউরে মাছ দিছে কোনও দিন ? …আচ্ছা ভাবি, একটা কথা কও তো, ভালোবাসা জিনিসটা কী ? প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে শান্তি আচমকা প্রশ্নটা করে।

ওমা, হঠাৎ এই জিজ্ঞাসা ? যমুনার হাত থেমে যায়।

না তুমি তো ভালোবাসার লাইগ্যা বাপ-মা-গ্রাম সব ছাড়ছো, তাই তোমারে কথাটা জিগাইতাছি।

ভালোবাসা কী, কে জানে! কিছুটা আনমনা হয়ে যমুনা সামনের দিকে তাকায়। বাজারে আজ খুব ভিড়, সে শুক্রবার বলেই। লোকজন মাছ দেখছে, দরাদরি করছে, মাছ কিনছে। … দেখতে দেখতে তার দৃষ্টি কোথায় যেন চলে যায়। সেও এমন একটা বাজারই। সেই বাজার শুরু হয় দিনের আলো ফোটার আরও আগে। সেখানে মণকে মণ মাছ আসে। বড় বড় গলদা, বাগদা, ভেটকি। বিশাল বিশাল রুই, কাতল, গ্রাসকার্প। … যমুনার সামনে স্তূপ করা আছে বড় বড় গলদা চিংড়ি। সে আর কনিকা মিলে টপাটপ মাছের মাথা থেকে ময়লা ফেলে মগজটুকু আলাদা করে রাখছে একপাশে। দেখতে দেখতে মাছের পরিমাণ কমছে। মগজের পরিমাণ বাড়ছে। অইদিকে ট্রাক ট্রাক মাছের পর মাছ আসছে। সেগুলো বরফসহ ককশিটের ভেতরে প্যাকেট হচ্ছে। লোকজন জোরে জোরে কথা বলছে, চিৎকার গালিগালাজ করছে, হাসাহাসি করছে। মাছের আঁশটে গন্ধ, প্যাচপ্যাচে কাদা, লোকজনের ঠেলাঠেলি, হঠাৎ হঠাৎ শীতল বাতাস―সব কোথায় যে হারিয়ে গেল।  

এই যে তুমি এত ত্যাগ করলা ভালোবাসার লাইগ্যা, তাও কও ভালোবাসা কী জানো না! বিশ্বাসের কথা কইলা ?

শান্তির কথায় ফের খিলগাঁও রেলগেইট বাজারে ফিরে আসে যমুনা। বলে, ভালোবাসা কী সবাই জানে। এখন এত প্যাঁচাল বাদ দিয়া হাত চালা তো। … শিং, কই রাইখ্যা রয়নাডি কুট আগে। রয়না নরম হয় তাড়াতাড়ি।

তুমি চিন্তা কইরো না। হাত তো আমার বন্ধ নাই। রয়না আমিই কুটমু।…তা বড় অবাক করলা তুমি ভাবি। একবার কও ভালোবাসা কী কে জানে, আবার কও ভালোবাসা কী সবাই জানে।

দেখ ছেড়ি, আজ শুক্রবার। কাজ বেশিই পাওয়া যাইব আজকে। আমগে কাছে আকুটা মাছ বেশি দেখলে জালাল আবার আমিনার কাছে মাছ লইয়্যা যাইব। তুই আগডুম-বাগডুম ছাইড়া মন দিয়া মাছ কুট।

তুমি যতদিন এই বাজারে আছ, ততদিন জালাল ভাইয়ের মাছ আর কাউরে দিব না। অই যে জালাল ভাই আবার আইছে। দেখছ, কইছিলাম না… মুখ নিচু করে হাসে শান্তি।

জালাল ফের পলিথিন ভর্তি মাছ নিয়ে আসে। হাসতে হাসতে যমুনাকে উদ্দেশ করে বলে, আজ তোমার রোজগার হাজার ছাড়াইব।

এত মাছ পেয়েও যমুনা কোনও প্রতিক্রিয়া দেখায় না। জালালের হাসির বদলেও তার কোনও নড়চড় হয় না। সে নতমুখে মাছ কাটাতেই মগ্ন।

জালাল একটু নিভে যায় ঠিকই কিন্তু হাল ছাড়ে না। সে শান্তির দিকে তাকিয়ে বলে, কীরে শান্তি, পারবি তো সব মাছ কুইট্যা শেষ করতে ?

শান্তি জালালের কথার জবাব না দিয়ে হাসে।

ব্যাপার কী যমুনা, শান্তি খালি খালি হাসে কা ? জালাল যমুনাকে জিজ্ঞেস করে।

কে জানে! শান্তি ছেড়িডা পাগল। তার হাসন-কাঁদনের কোনও ইস্টিশন নাই। তা রোজগার আমগের ভালো হইতেছে সত্য, আপনের যে সব মাছ বেচা শেষ হইতেছে সে হিসাবও আমগের আছে।

মাছ আমার এমনিই অন্যগর চেয়ে বেশি বেচা হয়। আমার সব মাছ দেশি। তাজা। লাফায়। দেখ মাটিতে পইড়াও কেমন লাফাইতেছে। কাস্টোমার মাছের লাফানি দেইখ্যাই মাছ কিনে। তবে এইটাও ঠিক, তুমি কুইট্টা দাও বইল্লাই কাস্টোমাররা এইসব মাছ কিনে বেশি। কুটার সুবিধা না থাকলে সবাই কিনত না।… হাত চালাইয়্যা কাজ করো তোমরা। আরও কেজি চারেক মাছ আছে। যাই আমি, কাস্টোমার অপেক্ষা করে।

জানস শান্তি, এত ছোট মাছ আমি জীবনেও কুটি নাই। জালাল চলে যেতেই যমুনা বলে, জন্মের পর থাইক্যাই বড় বড় গলদা-বাগদা চিংড়ি পরিষ্কার করছি। কাজ করতাম মাছের ঘেরে। মাছের জন্য শামুক কাটা…এক হাত লম্বা লম্বা চিংড়ির মাথা ছাড়ানো, বিশাল সাইজের সাদা-লাল রুই, মৃগেল, পাঙাশ জাল থাইক্যা তোলা। ঝুড়িতে সাজানো।… সেইসব মাছের কাছে এই এক আঙুল এক আঙুল মাছ! কাজ করি ঠিকই কিন্তু তাতে আগের মতো আর মন ভরে নারে শান্তি। বলতে বলতে ফের হাত থেমে যায় যমুনার।

তোমগ বাড়ি কই ভাবি ? কতদিন শুধাইলাম, এখন এই বস্তিটাই আমার বাড়ি ঘর, সব। যমুনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাছ কুটায় মন দেয়।

আসলে যমুনারা যেখানে থাকে সেটা ঠিক বস্তি নয়। বাজারের পেছনে দেয়াল ঘেরা জায়গাটায় দশ বারোটা ঝুপড়ি। গায়ে গায়ে লাগানো। তার একটাতে থাকে যমুনারা। এখানে থাকাতে ভাড়া যেমন কিছুটা কম পড়ে, তেমনি কাজে আসার সময়ও বাঁচে। কদিন আগেও সবুজবাগের দিকে থাকত তারা। তাতে আসা-যাওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকাও খরচ হতো। এখন দুটোই বেঁচে যাচ্ছে। বেঁচে যাওয়া টাকার সঙ্গে প্রতিদিনের রোজগার থেকে আরও কিছু টাকা আলাদা করে রাখছে যমুনা। স্বামীর জন্য রিকশা কিনবে। তারপরই তার হয়তো মুক্তি।

খানিকক্ষণ আগে বিদ্যুৎ চলে গেছে। ইদানীং প্রায় রাতেই বিদ্যুৎ থাকে না। তাতে যে যমুনাদের খুব একটা সমস্যা হয় তা অবশ্য না। বাজারে রাতভর লাইট জ¦লে বলে ঘরে আবছা আলো তো থাকেই। তাছাড়া ওরা দুইটা মাত্র প্রাণি ঘরে। সন্ধ্যার পর তেমন কাজকর্মও থাকে না ওদের। শুয়ে বসে থাকা। তাতে বিদ্যুৎ থাকা না থাকা সমান কথাই। তবু বিদ্যুৎ চলে গেলে, তীব্র আলোর ঘরটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেলে সূক্ষ্ম একটা মন খারাপ ভাব হয় যমুনার। আজকেও তাই হলো। সে বাইরে এসে দাঁড়ায়। তাদের ঘরটা রেললাইন ঘেঁষে। রেলগাড়ি না গেলে ঘরের পেছনের অংশ ফাঁকা পাওয়া যায়। এটা একটা বাড়তি সুবিধা, যা অন্য ভাড়াটিয়ারা পায় না।

 মাঝে-সাঝে ঘরের পেছনের চিপা পথটা দিয়ে বের হয়ে রেললাইনে গিয়ে বসে যমুনা। অকারণেই যখন খারাপ লাগে তার, তখন সে রেললাইনে গিয়ে বসে থাকে। একটু রাত বাড়লেই রেললাইনে লোক চলাচল কমে যায়। তাতে জায়গাটা অনেকটাই নির্জন আর শান্ত শান্ত লাগে। একটু বায়ে গেলেই অবশ্য পাকা রাস্তা। তাতে গাড়ি-রিকশা চলে দিনরাত। কিন্তু তবু ঠিক রেললাইনটাতে একটু নির্জনতা, একটু নিস্তব্ধতা থাকেই। জায়গাটার সঙ্গে নিজের মনের মিল পায় যমুনা। চারপাশের কোলাহলের মাঝেও যেমন জায়গাটায় খানিকটা নির্জনতা আছে, তেমনি এত শত মানুষের মাঝে থেকেও যমুনার বুকের মাঝে অনেকটাই একাকিত্ব আছে।

যদিও এ জায়গায় বসাটা খুব সুখকর না। তাতে অনেকেই তাকে নিশিকন্যা মনে করে খারাপ ইঙ্গিত করে। ঘরে যেতে আহ্বান করে। খারাপ অভিজ্ঞতা আছেও যমুনার। তাদের অবশ্য দোষও দেওয়া যায় না। রেললাইনের ওপর সন্ধ্যার পর থেকে ‘তারাও’ তো থাকে। চাহিদা যার থাকে সে বুঝবে কী করে কে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বসে আছে! অবশ্য প্রায় রাতেই রেললাইন ঘেঁষে বসে বলে অনেকের কাছে সে চেনাও হয়ে গেছে। এখন আর তারা তাকে আগের মতো শুধায় না।

বাইরে যে খুব একটা অন্ধকার তা না। আকাশে চাঁদ আছে। তাতে সবই পষ্ট দেখা যায়। রেললাইন বলতে গেলে ফাঁকাই। একজন মেয়ে শুধু যমুনার পাশ দিয়ে অলস পায়ে হেঁটে যায়। আর দেখা যায়, দূর থেকে একটা লোক হেঁটে আসছে। আরেকটু কাছাকাছি হতেই লোকটার হাঁটা দেখে যমুনা বুঝতে পারে, সে জালাল। তাকে উদ্দেশ্য করেই আসছে বোধহয়। যমুনার একবার ইচ্ছে হয় ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকতে। পরক্ষণেই সে মন পালটায়। গরম পড়েছে বেশ। ঘরে গেলে কষ্ট হবে। বিদ্যুৎ তো নেই যে ফ্যান চালাবে। তারচেয়ে এখানে বসে থাকাটাই শ্রেয়। জালাল যে লোক খারাপ তা না। আকারে-ইঙ্গিতে তাকে ভালোবাসার কথাই বলতে চায়। মনে কোনও বদ মতলব থাকলেও আচরণে তেমন কিছু এখনও দেখেনি যমুনা। তবে এখন আর তার ভালোবাসার কথা-টথা শুনতে ভালো লাগে না। ভালোবাসার জন্যই তো সে জীবনে সব ছেড়েছে, এখন ভালোবাসাটাকে ছাড়তে পারলেই জীবনটা তার ঝরঝরে হয়।

যমুনার আন্দাজ সত্যি। লোকটা জালালই। যমুনার কাছাকাছি এসে সে হঠাৎ যেন ভূত দেখেছে এমনভাবে থমকে দাঁড়ায়।

যমুনা! তুমি এইখানে একা একা বইসা আছো। বলতে বলতে সে ধপ করে যমুনার পাশে বসে পড়ে।

জালাল চমকানোর অভিনয় করছে, যমুনা জানে। সে তাকে দেখেছে আগেই।

বসেই জালাল জোর গলায় বলে, জগতের নিয়ম কেমন জানি উলটা-পালটা। যার কাছে থাকলে মনে শান্তি পাওয়া যায়, তার কাছেই কম থাকতে পারে মানুষ। …তোমার নামটা কেমন হিন্দু হিন্দু লাগে যমুনা। এমন নাম ক্যা ?

আমি আগে হিন্দুই আছিলাম।

কী কও! এবার সত্যি চমকায় জালাল।

চমকানোর মতো তথ্যই। যমুনা যাদের সঙ্গে চলাফেরা করে, কাজ করে, তাদের কেউই জানে না সে আগে অন্য ধর্মের ছিল। আসলে গত সাত বছরেও নিজের অতীত সম্পর্কে কারও সঙ্গেই কখনও কোনও কথা বলেনি সে। শান্তি তো প্রায়ই তাকে খোঁচায়। এটা ওটা জানতে চায়। যমুনা বোবা হয়ে থাকে। এখন আচমকা কেন যে জালালের প্রশ্নে সে মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেলল!

হিন্দু আছিলা! জালাল ফের বলে।

যমুনা কথা বলে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

কী হইল, কিছু কইবা না ? চুপ কইরা আকাশে কী দেখো ?

যমুনা তাকায় জালালের দিকে। উজ্জ্বল শ্যামলা, ধারালো চেহারা, মাঝারি স্বাস্থ্যের লোকটা দেখতে খারাপ না। আয় রোজগার ভালো। বয়সেও তার সঙ্গে মানানসই। আজকে, এখনই জালালের হাত ধরে এই রেললাইনের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে অন্য কোথাও চলে গেলে তার জীবনটা বদলে যাবে। মাটিতে শুয়ে থাকা রেললাইন, আকাশের অই চাঁদ, মৃদু হাওয়া―সবাই যেন তাকে বলছে চলে যা যমুনা। চলে যা। স্বার্থপর হ। স্বার্থপর না হলে জীবনে সুখ পাওয়া যায় না। কী দরকার অমন স্বামীর সেবা করার ? কী দরকার খেটে খেটে তার মদের পয়সা জোগানোর ? কী দরকার আশায় আশায় থাকার, যে আবার আগের মতো হয়ে তোকে ভালোবাসবে সে। ভালোবাসা তো একজন সাধছে দিনরাত! জীবনে বর্তমানটাই সব। অতীত কিছু না। ভবিষ্যৎও কেউ জানে না। 

এমন কইরা তাকাইয়্যা আছ যে যমুনা! কিছু কও।

যমুনা লজ্জা পায়। আসলেই সে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছে জালালের দিকে। মুখ ফিরিয়ে সে বলে, কী কমু জালাল ভাই। আমার কোনও কথা নাই যে!

আবারও ভাই।

আপনারে ভাইয়ের নজরে দেখি, ভাই ছাড়া আর কী কমু।

ভালোবাসা যায় না আমারে ? আমি মানুষটা এতই খারাপ ?

মানুষ খারাপ মানুষেরেও ভালোবাসে। ভালোবাসাটা তো ফাঁদ একটা। ভালোবাসলে ভালো-মন্দর জ্ঞান লোপ পায়। সেই ফাঁদে পড়ছিলাম বইল্যাই তো আমি… বলতে বলতে চুপ হয়ে যায় যমুনা।

একজন চাওয়ালা আসে ফ্লাস্কে করে চা নিয়ে। জালাল বলে, চা খাও যমুনা। আদা দিয়া, লেবু দিয়া চা খাইতে ভালো লাগব।

যমুনা কিছু বলে না। জালাল নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে দুই কাপ চা দিতে বলে চাওয়ালাকে।

চাওয়ালা চা দিয়ে চলে গেলে জালাল চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, আজকের বাতাসটা কেমন ঠান্ডা না ?

গরমের কারণেই যমুনা রেললাইনে এসে বসে ছিল। তবে ঠিকই বলেছে জালাল, গরমটা এখন কমই।

কথা শুরু কইরা তো শেষ করলা না যমুনা ? নিজের সম্পর্কে একটা বাড়তি লাইনও কও না কোনওদিন ? … আমার কোনও বদ মতলব নাই। তবে মিথ্যা বলব না, আমি যে মানুষটা ফেরেশতা তাও না। দোষ আমারও আছে। মাঝে-মধ্যে আমি নেশা-পানিও করি। ভালো-মন্দ মিলাইয়্যাই তো মানুষ, কও। তয় আমার মনে কোনও বদ ইচ্ছা নাই। তোমার লগে সংসারই করতাম চাই।… যাইবা আমার লগে যমুনা ? চলো, অন্য বাজারে গিয়া কাজ করি। আমি মাছ বেচমু, তুমি মাছ কুটবা। চাইলে কাজ না করলেও পারো। আমার রোজগার তো খারাপ না। মাসে কমছে কম পঞ্চাশ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া, খাওয়ার পরও অনেক টাকা জমে। সেই টাকা জমাইয়্যা জমাইয়্যা গ্রামে জমি কিনমু। তারপর গ্রামে গিয়া দুইজনে নতুন কইরা জীবন সাজামু।

জালালের কথা মন দিয়েই শুনে যমুনা, তবে তার ভেতরে কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। গ্রাম থেকে পালিয়ে আসার আগে রুহুলও এমন স্বপ্নই দেখিয়েছিল। এমন সব কথাই বলেছিল। জালাল চাচ্ছে শহর ছেড়ে গ্রামে যেতে। আর রুহুল তাকে গ্রাম থেকে এনেছে শহরে। পার্থক্য বলতে এইটুকু।

যমুনা নির্লিপ্ত স্বরে বলে, আপনে আমার মধ্যে কী দেখছেন যে এত কিছু কইতাছেন ? আমি বিয়াইত্যা, দেখতে কালা। বয়সও কম হইছে না। ছেলে-মেয়ে নাই বইল্যা বুঝা যায় না।

মাছ কুটার সময় তোমার চঞ্চল হাত, তোমার কোমল চেহারা, নত দৃষ্টি―সবটা মিলাইয়্যা তোমারে ভালো লাগে। আর খুঁজলে কমতি কার নাই। কোনও মানুষই কি পূর্ণ ? খোদা কোনও মানুষরেই পূর্ণ কইরা বানায় নাই যমুনা। আমার তো মনে হয়, আমিই তোমার যোগ্য না। তবু সাহস কইরা ভালোবাসার কথা কই।

খুব কথা শিখছেন। এসব হইল নয়নের নেশা। নেশা বেশিদিন থাকে না। শরীর পাইলে নেশা ছাড়তে সময় লাগে না। জানি আমি, আমার শরীরের প্রতি লোভ আছে পুরুষের।

তুমি আমারে আর সবার মতোই ভাবলা যমুনা!

যমুনা হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠে। ক্যান, আপনি পুরুষমানুষ না ? পুরুষমানুষ কী চায় সেইটা খুব ভালো কইরাই জানি।

জালাল যেন একটু দমে যায়। তা তোমার কথা অসত্যও না। আমারও মনে হয়, পুরুষমানুষের চাহিদা কম বেশি এক রকমই থাকে। …কিন্তু পুরুষের মনে ভালোবাসাও তো থাকে যমুনা। থাকে না ?

ওমা, তা থাকব না ক্যান। ভালোবাসা না থাকলে জগৎ ক্যামনে চলতাছে ?

আমার ভালোবাসায় তোমার বিশ্বাস নাই যমুনা, তাই না ?

ভালোবাসা!… আচ্ছা আপনি কন তো ভালোবাসা জিনিসটা কী ?

মানে!

মানে, এই যে দেখা হইলেই খালি ভালোবাসার কথা কইতে চান, আপনি কন তো আমারে, ভালোবাসা বলতে আপনি কী বুঝেন ?

তোমার মতো অত শত বুঝি না আমি। মন থাইক্যা টের পাই যে তোমারে আমি ভালোবাসি। …তোমার জামাই কী দেয় তোমারে, সারাদিন মদ খাইয়্যা পইড়া থাকে। রোজগার করে না, তোমার রোজগারে চলে। তোমারে গালি-গালাজ করে। মারে।

যমুনা সহসা কথা বলে না। একটু চুপ থেকে বলে, দেখেন জালাল ভাই, আপনি যা কইতাছেন সবই সত্যি। আর আমি জানি, আপনি ভালো মানুষই। আপনার সঙ্গে যে মেয়ে সংসার করব তার জীবন সুখেরই হইব। …কিন্তু একটা ব্যাপার কী জানেন, আমার মনে হয় জগতে এক এক মানুষ এক এক জন মানুষের জন্য জন্মায়। আমি জন্মাইছি আরেক জনের জন্য। আপনার জন্য না। কোনও দোষ না থাকলেও, কমতি না থাকলেও একজন মানুষরে আরেক জন মানুষের পছন্দ না হইতে পারে। এই রেললাইনটারে দেখেন, সারা পথ দুইটা লোহার পাত পাশাপাশি চলে, কিন্তু কোনওদিন তারা এক হইতে পারব ? পারব না। এইটাই তাগ নিয়তি। মানুষেরও এমন নিয়তি থাকে। মানুষ দুঃখ কইরা কয় না, আমি তারে এত ভালোবাসি তাও সে কেন আমারে একটু ভালোবাসে না। বাসে না তা না, আসলে সেই মানুষের প্রতি তার মনে ভালোবাসা আসে না। আর ভালোবাসা কিন্তু মনের উপ্রে জোর কইরা হয়ও না। আপনি একজন মানুষের লগে দশ বিশ ত্রিশ চল্লিশ বছর সংসারও করতে পারবেন তারে ভালো না বাইস্যাও।…আর আমি নিজের জীবন দিয়া একটা ব্যাপার বুঝছি ভালো মতো, কাউরে ভালোবাসলে তার দোষরেও ভালোবাসতে হয়। তারে দোষমুক্ত করতে চাইলে, শোধরাইতে চাইলে সে আর আমারে পছন্দ করব না। তার নজর তখন আমার উপর থাইক্যা তার ইচ্ছার ওপরই থাকব বেশি। যদি সে বদলাইতে চায় নিজেরে, নিজেই বদলাইব। সে যদি না বদলায়, সে কারণে আমি তারে ভালোবাসা বাদ দিতে পারতাম না। আমার ভালোবাসা আমার সুখের লাইগ্যা। তার সুখের লাইগ্যা তার পছন্দটা। আমি তো তারে ভালোবাইস্যা ঠিকই সুখ পাইতাছি। মানুষ তো আসলে নিজের সুখের লাইগ্যাই সব কিছু করে। আমি যারে ভালোবাইস্যা সব ছাড়ছি, তারেই বাকি জীবন ভালোবাইস্যা যাইতে চাই। সে আমারে ভালো না বাসলে না বাসুক। অনাদর করলে করুক।

বাপরে, এত কথা জানো তুমি যমুনা! কী সব কইলা, সব মাথার উপ্রে দিয়া গেল।

কী আর এমন কথা কইছি। একলা একলা থাকলে, মাছ কুটার সময় এইসব আবোল-তাবোল কথা মাথায় আসে আমার। আজকে মুখ ফসকাইয়্যা কইয়্যা ফেললাম আর কি। আসলে এইসব কথা আপনিও জানেন। জানে সব মানুষই। হয়তো আর সবাই আমার মতো কইরা এইসব নিয়া ভাবে না আর কি।

তুমি যাই কও, কথাডি বড় দামি কইছ। তবে আমিও একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি যমুনা। কাউরে জীবন দিয়া ভালোবাসলেই সে বুঝাইয়্যা দেয়, কেন ভালোবাসা ভালো না। মনে কারও প্রতি ভালোবাসা না আসলে সে একরকম জীবন। সে জীবন তেমন মন্দও না। কিন্তু একবার কাউরে ভালোবাসলে বুঝা যায়, ভালোবাসা ব্যাপারটা কত খারাপ। তারে পামু না জাইন্যাও ভালোবাসতে ইচ্ছা করে। রোজ তার মুখ দেখতে মন চায়। তার কথা শুনতে, তার হাতটা একটু ধরতে মন চায়। তারে না দেখলে, তার মুখের দুইটা কথা না শুনলে জীবনটা ব্যর্থ মনে হয়। বলতে বলতে চুপ হয়ে যায় জালাল।

যমুনা কিছু বলে না। জালাল মিথ্যে কিছু বলেনি। নতুন কিছুও বলেনি। সেও এসব জানে, অনুভব করে।

রাত বাড়ে। চাঁদ নিজের অবস্থান বদলাতে থাকে। দুজনে আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। একসময় জালাল উঠে দাঁড়ায়। যমুনাকে কিছু না বলে, রেললাইন ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে যায়। জালাল দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে যমুনা উঠে দাঁড়ায়।

দরজা ভেজানো ছিল। যমুনা আনমনে ঘরে ঢুকে। বাইরে বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু ঘরের ভেতরে আলো নেই। হয়তো বিদ্যুৎ আসার পর বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে রুহুল। ঘুমের মাঝে তার শরীর উঠানামা করছে বুঝা যায়। তাদের খাটটা জানালা ঘেঁষে পাতা। ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যমুনা খাটে উঠে জানালার কাছে গিয়ে বসে। রাত অনেক হয়েছে। কিন্তু কেন জানি ঘুম আসছে না তার। আজকে কি জালালের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারই করল সে ? কিছুই না বলে জালালের চলে যাওয়ার দৃশ্যটা এখনও চোখে ভাসছে তার। 

চৌকিতে শব্দ হয়। রুহুল উঠে বসেছে বিছানায়।

বাথরুমে যাইবা ? যমুনা জিজ্ঞেস করে।

না।

তাইলে উঠেছ কেন ? কয়দিন ধইরা জ¦র তোমার। শরীর দুর্বল। ঘুমাও। নাকি খিদা লাগছে ? সন্ধ্যায় তো খাও নাই ভালো মতো।

আমি তোমারে অনেক অবহেলা করি তাই না যমুনা ?

যমুনা ক্লান্ত স্বরে বলে, এখন আর কথা কইতে ইচ্ছা করতেছে না। ঘুমামু আমি।

বুঝছি। এতক্ষণ কথা কইয়্যা এখন আর কথা কইতে ভালো লাগতাছে না। আমি একটা কথা কইতে চাই যমুনা। শোনো।

কইলাম না, ঘুমে ধরছে। এখন তোমার কোনও কথা শুনতে পারতাম না। আর আমার হাতে জমানো টাকা পয়সা নাই। তুমি যদি টাকা পয়সা চাও দিতে পারতাম না। যা ছিল সব দিয়া তোমার লাইগ্যা রিকশা কিনতাছি। তুমি না কও নিজের রিকশা থাকলে সবটা রোজগারই নিজের।

টাকা পয়সা! নাহ সেসব নিয়া কোনও কথা নাই। একটু আগে আমি তোমার খোঁজে গেছিলাম রেললাইনে। দেখলাম, জালালের লগে বইস্যা কথা কইতাছ আর চা খাইতাছ। দূর থাইক্যা দেইখ্যাই ফিরা আইছি। জালাল মানুষ খারাপ না। আমার চেয়ে অনেক ভালো মানুষ সে। আমি চাই তার কাছে থাকো তুমি। মানে তারে বিয়া করো। আমি তোমারে তালাক দিতে রাজি আছি।

রাতবিরাতে আবোল-তাবোল কথা কইয়্যা সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার নাই। ঘুমাও।

তাইলে আমারে আরেকটা বার সুযোগ দেও যমুনা। দিবা! কাঙ্গালের মতো বলে রুহুল। মানুষই তো ভুল করে। ভুলের ঊর্র্ধ্বে কিডা না, কও তো।… তুমি আমারে ছাইড়া যাইয়ো না যমুনা। তুমি আছো বইলাই আমিও বাঁইচে আছি।

আগে এসব কথা শুনলে বুকে উথাল-পাতাল ঢেউ উঠত যমুনার। সারা শরীরে অন্যরকম একটা অনুভূতি হতো। কিন্তু এখন রুহুলের কথায় তার তনু-মনে কোনও প্রতিক্রিয়াই হয় না। শান্ত স্বরে যমুনা বলে―দেখো, একটা সত্যি কথা কই তোমারে। তোমার প্রতি আমার আর ভালোবাসা নাই, যা আছে তারে বড়জোর মায়া কইতে পারো। কইতে পারো, এখনও ক্যান তোমার কাছে আছি ? আছি অই মায়ার জন্য। তোমার সঙ্গে জীবন জড়িয়ে আমি বুঝছি, কারও জন্য মন থেকে ভালোবাসা একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। মরা গাছে পাতা গজায় দেখছো কখনও ?

মানুষ তো আর গাছ না যমুনা! মানুষ কি গাছ ? চাইলে সে তার মনডা পরিবর্তন করতে পারে। পারে না, এই কথা আমি বিশ্বাস করি না। …এক কাজ করি চলো যমুনা। চলো আমরা গেরামে ফিরা যাই। দুইজনে কোনও একটা ঘেরে কাজ নিলাম। ঘেরের মাঝেই টংঘর তুইলে থাকব আমরা। রাত্তিরবেলা চারপাশে যখন কালো আন্ধার নামবে তুমি চুলার আগুনে রান্না করবা। আমি পাশে বইসা থাইক্যা তোমারে গল্প শোনাব। সকালবেলা মণকে মণ মাছ ধরবে জেলেরা। জালের ভিতর চিংড়ি মাছ ছটফট করবে, রুই-কাতল-পাঙাশ মাছ লাফাবে। আমরা সেই মাছ ধরে ধরে ড্রামে ভরে দিব। … চলো যাই যমুনা, গেরামে ফিরা যাই। এইখানে… এই শহরে আমি হারায়ে যাই। খেই হারায়ে ফেলি। তোমার থাইকে মনডা অন্যদিকে চলে যায়।  

যমুনা কথা বলে না। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, রুহুল ঠিকই বলেছে, মানুষ গাছ না। আসলেই হয়তো হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা আবার ফিরে আসে। আর তার মনে তো ভালোবাসাটা এখনও আছেই। এই ভালোবাসার কারণেই তো জালালকে উপেক্ষা করতে পারে সে।

মনের ভাবনা যমুনা প্রকাশ করে না। চুপ করেই থাকে। রুহুলও আর কিছু বলে না।

রাত বাড়তে থাকে। এক সময় জানালার কাছেই কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে যমুনা। রুহুল যমুনার মাথার কাছে বসে থাকে। আর অপেক্ষা করতে থাকে কখন সকাল হবে। কখন যমুনার ঘুম ভাঙবে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button