আর্কাইভগল্প

গল্প : হেমন্তের ধূসর কুয়াশায় : পলি শাহীনা

অগণিত নক্ষত্র ঘেরা গভীর হাওয়ার রাত। শোঁ শোঁ বাতাসের ধাক্কায় ঘরের দরজা খুলে যায়। আকাশে চৌকাঠে আয়েশ করে চাঁদ হাসছে খিলখিল। নির্জন রাত ভেসে যাচ্ছে আলোর বানে। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যাই মোহময় নীলাদ্রি আকাশের তলে খোলা মাঠে। কুসুম কুসুম আলোর রোশনাই, মনের উঠোনে শিউলি দুলছে। দূর কোথাও হতে মধুর সুর ভেসে আসছে বাঁশির। এলোমেলো আমি হন্যে হয়ে সুরের উৎসের দিকে যখন ছুটছি ঠিক তখনই আমার ছায়া ঘেঁষে একজোড়া রাতজাগা পাখি উড়ে যায়। আমি চমকে তাকাই, একটা টান অনুভব করি। পাখি জোড়া চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলে আমি নাকে বাবা-মার ঘ্রাণ পাই। এমন রাতদুপুরে বড় দোটানায় পড়ি, কে বাঁশি বাজায় এমন আকুল হয়ে, কোথায় গেল বাবা-মা, কার কাছে যাই! এমন সময় আমার চারপাশে ঝরাপাতা কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়তে থাকে, আমি দু হাতে তাদের দ্রুত সরাতে গিয়ে ঘুমন্ত অবস্থা হতে জেগে উঠি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে সব টালমাটাল লাগছে, বুঝতেই পারছি না আমি আসলে কোন জগতে আছি।

সময় একসময় মানুষের সবকিছু কেড়ে নেয়। গত অর্ধশত বছরের বেশি সময় ধরে নিজের জীবন, নিজের সমস্যা নিজেই সামলে নিয়েছি। নিজের ছাড়াও অন্যের সমস্যাও সাধ্যমতো হাসিমুখে সমাধান করার চেষ্টা করেছি। বিনিময়ে কারও কাছ হতে কোনও কিছু প্রত্যাশা রাখিনি। এজন্য, ছেলেমেয়ে বড় হয়ে আমাকে ‘দাতা শ্রেণির মানুষ’ বলে শব্দ করে হাসত। সেই আমিটাকে আজ আমার ভীষণ অকেজো মনে হচ্ছে। মানুষ বলে, বয়স কোনও বিষয় না। বাস্তবতা হলো, বয়স মানুষকে বড় অসহায় করে তোলে, স্বাধীন ইচ্ছার বিরুদ্ধে অপরের ইচ্ছায় পরিচালিত করে। আমার এই বাড়ি, এই ঘর ছেড়ে কোনওভাবেই অন্যত্র যেতে শরীর, মন চাইছে না। তবুও, যেতেই হবে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়সহ কত আনন্দময় সহজ দিন, দুঃসহ কঠিন দিন পার করেছি এই ঠিকানায়, সেসব দিনের হিসেব-নিকেশ আজ জানা না থাকলেও মুহূর্তগুলো খুব মনে পড়ছে। আমি কি আমাকে ভালো রাখতে পারব, মানিয়ে নিতে পারব নতুন ঠিকানায় ? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি, মনঃপূত কোনও উত্তর পাই না। ফেলে আসা চৌত্রিশ বছরের আমার শোবার ঘরের চারপাশে নির্বাক চেয়ে থেকে দাউদাউ মন পুড়ছে, চোখ জ্বলছে। ঘুমভাঙা চোখে বিছানায় শুয়ে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে বলতে যখন অস্থির হয়ে উঠি, তখন সবসময়ের মতো বই, ওয়াটার কালার অথবা বাঁশির কাছে ভারাক্রান্ত হৃদয়টা তুলে দিতে যাই। বই, রং, তুলি, ক্যানভাস কোথায় কোন বক্সের ভেতর রেখেছে আমার কন্যা তিতলী, জানা নেই। হাতের কাছে সহজে খুঁজে পাওয়া বাঁশিটা নিয়ে রুমের লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে বসি।

সকালে জানালার পাশে স্নিগ্ধ হেমন্তকাল অনুভব করা যায়। চারদিক বাতাসের হু হু আর হেমন্তের নরম কুয়াশা ঘিরে রেখেছে। ‘মা এমন সাত সকালে ফিনফিনে ঠান্ডা বাতাসে গরম কাপড় ছাড়া বসেছ, এটা কিন্তু একদম ঠিক না। এমন অনিয়মে শরীর খারাপ করবে তো’ বলে তিতলী আমার শরীরে উলের চাদর জড়িয়ে দেয়। তিতলীর উঁচু শব্দে মগ্ন সুর হতে আমি আর বাঁশি আলগোছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে মন কিছুটা খারাপ হয়। মন খারাপের বিষয়টা লুকিয়ে  মেয়েকে বলি, বাঁশিতে আজকাল ফুঁ দিই মাত্র, সুর বের হয় না, ভুলভাল একটা আওয়াজ বের হয়। জীবনের সোনালি সময়ের সঙ্গে সুরটাও বুঝি হারিয়ে ফেলেছি। যা করে অসীম আনন্দে ডুবে থাকতাম, সেটাই যদি আমার থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে বেঁচে থেকে হবে কী, বুঝি না। আমার মুখে এসব কথা শুনে তিতলী চেঁচিয়ে উঠে বলে, ‘জীবন, মৃত্যু প্রকৃতির এক স্বাভাবিক নিয়ম। এই নিয়মকে আমি, তুমি কেউ বাঁধতে পারব না। তুমি বর্তমানের চেয়ে রোজ অতীত-অতীত খেলায় ডুবে থাক, এবং এটাই তোমাকে বয়সের তুলনায় আরও বেশি অস্থির করে তুলেছে।’

আমাকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার তরে মেয়ের হৃদয়মথিত আর্তি ওর চোখেমুখে স্পষ্ট ভেসে ওঠে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা ধক করে উঠলে আনন্দে, আবেগে আমি অনেকক্ষণ ওকে জড়িয়ে রাখি, আদর করি। আদর করার সময় আমরা মা, মেয়ে কেউ কাউকে কিছু না বললেও দু জোড়া চোখ চাপা অশ্রুতে ভিজে ওঠে। তারপর, কিছু সময় আমার চুলে বিলি কেটে ও পুনরায় ঘরের বাকি জিনিসপত্র বাক্সবন্দির কাজে ফিরে যায়।

বেলা বাড়ছে প্রকৃতির অমোঘ আদেশে, নিঃশব্দে। যদিও সকাল, বিকেল, দিনরাত সবই এখন দেখতে আমার কাছে একইরকম লাগে। এমনকি মাস, বার, সপ্তাহের হিসেবও ঠিক থাকে না। বুদ্ধিরহিত মানুষের মতো আমি যেন রাত-দিন এবং মাস-বছরের মাঝখানে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করি। যেমন, কোনওদিন ঘুম ভেঙে ঘরের জানালা হতে আকাশ দেখতে দেখতে আমার গোটা দিন কেটে যায়। বাইরের হালকা ধূসর কুয়াশা প্রকৃতির বুকে এক অপার্থিব ভালোবাসার ছবির মতো ফুটে আছে, যা প্রবলভাবে আমার মনোযোগ কেড়ে নেয়। শনশন বাতাসে টুপটাপ ঝরে পড়ছে পাতারা। পাতার ওপর পাতা এমনভাবে ঝরছে, যেন এক ক্লান্ত পাতা আরেক ক্লান্ত পাতাকে কবরে শুইয়ে ঢেকে দিচ্ছে। নিউ ইয়র্কে এবার হেমন্তেই শীতের যন্ত্রণাময় সন্ত্রাস শুরু হয়েছে। সে যাই হোক, আর তো কয়েক ঘণ্টা, এরপর মেয়ের সঙ্গে চলে যাব ওর বাড়িতে, অন্য শহরে। এই খোলা বারান্দার আবছা হিমেল আদুরে আলো-বাতাসে আর কোনওদিন বসা হবে না। গত সপ্তাহে বাড়িটা বিক্রি হওয়ার পর হতে আমার শরীর, মন অবশ হয়ে পড়েছে। বাঘের নখের মতো হিংস্র হিম বাতাসের কাছে আত্মসমর্পণ না করে আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে একদৃষ্টে বাইরের চেনা দৃশ্যগুলো বারবার দেখছি প্রাণভরে। রাস্তায় আজ তেমন মানুষ নেই। যে কজন হেঁটে গেল তাদের বেশির ভাগই আমার চেনা জানা। মাঝবয়সী একটা লোক ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে চিনি না। অন্যমনস্ক, বিষাদগ্রস্ত, ড্যাবড্যাব চোখে চেয়ে রয়েছে নিঃসীম শূন্যে। দেখে মনে হয়, লোকটা মনে মনে কাঁদছে। সেও কি আমার মতো চেনা আপন ঠিকানা ছেড়ে চলে যাবে অচেনা, অজানা ঠিকানায়, কী জানি। লোকটাকে নিয়ে হযবরল ভাবনায় মজে থাকতেই দেখি কয়েকটা ছেলেমেয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে হৈ হৈ রৈ রৈ রব তুলে চলে যায়। বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে বুক কিছুটা উষ্ণ হয়ে ওঠে। মনের মধ্যে ওদের বয়সী আমার তিতলী ও তমালের ছোটবেলার দুরন্তপনার সুর বেজে ওঠে। ছোটবেলায় ওদের ঘোড়দৌড়, দুষ্টুমিতে সকাল হতে রাত অবধি পুরো বাড়িটা গমগম আওয়াজে ভরে থাকত। সকাল-বিকাল ওরা এই পথে সাইকেল চালাত। প্রথম সাইকেল চালানো শিখতে গিয়ে ধপাস করে পড়ে গিয়ে কান্নার বদলে খিলখিল হেসে উঠত। ওদের মতো আমার মাঝেও তখন রাতদিন কোনও ক্লান্তি ছিল না। ওরা রঙিন ঘুড়ির মতো উড়ে উড়ে আমার চারপাশে নানা ছবি আঁকতো, আমিও উচ্ছ্বাসে ডুবে থাকতাম ওদের মধ্যে। তিতলী, তমাল ওদের বাবাকে খুব একটা কাছে পেত না বলে আমাকে ঘিরেই ওদের পৃথিবী আবর্তিত হতো, এবং আমার পৃথিবীও গহিন আমোদে ভরে থাকত ওদের সীমাহীন প্রাণচঞ্চলতায়। তিতলী ও তমালের বাবা তানভীর, সে বাচ্চাদের সেসব হাসিখুশি দিনের অংশ হতে পারেনি। আফসোস হয় তানভীরের জন্য।

তানভীর একজন সফল চিকিৎসক ছিল। তার সাপ্তাহিক ছুটি ছিল না। চেম্বারে সে সপ্তাহের সাত দিনই কাটিয়ে দিত। অবশ্য, তার এছাড়া অন্য কোনও উপায়ও ছিল না। তার চেম্বারের ওয়েটিং রুমে সবসময় রোগীদের ভিড় লেগে থাকত। তানভীর আদৌ ছুটি চাইত কী না, সেটাও আমার জানা নেই। কারণ, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, জানি। কর্মক্ষেত্রে ও সফল হলেও ভুলে গিয়েছিল নিজেকে, পরিবারকে। পরিবার ওকে ছাড় দিয়েছে, ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু ওর নিজের শরীর ওকে ছাড় দেয়নি। রোগীর প্রেসক্রিপশনে সদা শরীরের যত্ন নিতে বললেও নিজের শরীরের যত্ন নেয়নি। রোগীর রক্তচাপ, রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলেও নিজের শরীরের খবর রাখেনি। নিজের ঘর ভুলে যে চেম্বারকে ঘর বানিয়েছিল, সে চেম্বারই তাকে গিলে খেয়েছিল। রোগী দেখা অবস্থায়ই একদিন চেয়ার থেকে হেলে পড়ে, আর চোখ মেলেনি। যখনই তানভীরকে আমি বিশ্রাম নিতে বলতাম, ও বলত, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যই তো এত পরিশ্রম করছি, অর্থ উপার্জন করছি। অথচ, ও নিজেও তার উপার্জিত আয়ে ভালোভাবে জীবন যাপন করতে পারেনি, সন্তানের জীবনেও ওর এত অর্থের তেমন প্রয়োজন পড়েনি। ফুল স্কলারশিপ নিয়ে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করেছে, ভালো ফলাফল করায় উপরন্তু কলেজ, ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন ফান্ড হতে বাড়তি অর্থ পেয়েছে। আজ ওদের আলাদা আলাদা বাড়ি রয়েছে। দূরের শহর হতে এসে এই বাড়িটার দেখাশোনা করা ওদের জন্য বাড়তি চাপ হচ্ছে বলে বেচে দিয়েছে। বয়সজনিত নানা রোগে, শোকে নিমজ্জিত আমি বাচ্চাদের কথা অগ্রাহ্য করে বাড়িটা আর ধরে রাখার সাহসও পাইনি।

ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তানভীরের কথা মনে পড়ছে, আবার অভিমানও হচ্ছে। এত বছর পর আজও ভেবে পাই না, মানুষ এত নির্বোধ হয় কেমন করে! আমাদের যথেষ্ট আছে, নিজেকে ভালোবাসো, এত পরিশ্রমের দরকার নেই, এমন অনেক কথা বলে কত বুঝিয়েছি, ওর ফেরার অপেক্ষায় থেকেছি। দিন, মাস গড়িয়ে বছরজুড়ে ওকে যত বুঝিয়েছি, আঁকড়ে ধরতে চেয়েছি, তত আমাকে ও প্রত্যাখ্যান করেছে। আমার ইচ্ছে, মতামতের কোনও গুরুত্ব দেয়নি যাপিত জীবনে। আমাকে ও জীবনসঙ্গী ভাবত কী না, তাও জানা হয়নি। তার কাছে সময় মানে ছিল টাকা, এবং টাকা। টাকাকে সে অভ্যাসে পরিণত করেছে, টাকা তার একমাত্র গন্তব্য হয়ে উঠেছিল। টাকাকে ঈশ্বর ভেবে বর্তমানকে ভুলে সে ভবিষ্যতে মজে ছিল। পরিবার এবং পেশা দুটোই যে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, মেধাবী হয়েও এটা সে উপলব্ধি করতে পারেনি, ঠিক নিজের শারীরিক সুস্থতার মতোই। লোভ, মোহ, উচ্চাকাক্সক্ষা যখন সীমা অতিক্রম করে তবে তা অনিবার্য পতন ঢেকে আনে। তার উদাসীনতা, নির্বুদ্ধিতা, স্বার্থপরতা, অপরিপক্কতায় আমিও অকালে জীবনের সকল রং হারিয়েছি। একজন নির্বোধ জীবনসঙ্গী একটা জীবনের ছন্দপতনের জন্য যথেষ্ট, হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। আজ সন্তানরা যে যার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত, নিজেদের সংসার জীবন নিয়ে ব্যস্ত, এবং এটাই জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সন্তানরা তাদের আকাশে উড়ছে, আপন পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছে, এটা অত্যন্ত আনন্দের, শুধু আমি নাবিকহীন একটি জাহাজ একাকী দাঁড়িয়ে আছি, যার নোঙর ফেলার স্থান থাকলেও স্বস্তি নেই। বুকের ভেতর হালকা ব্যথা হচ্ছে। আজ তানভীর বেঁচে থাকলে আমার এই বাড়ি, এই ঘর ছেড়ে অন্য বাড়ি যাওয়ার গল্প এই শেষ বয়সে এসে যুক্ত হতো না। এই বাড়ি, ঘরের পরতে পরতে আমার শ্রম, ঘাম মিশে আছে। তানভীর বেঁচে থাকাকালীন যেমন কষ্ট পেয়েছি, নিঃসঙ্গতায় ভুগেছি, ও মরে গিয়েও কষ্ট পাচ্ছি। নিয়তির কী পরিহাস! জানি, আমার জীবনের আর কোনও হিসেব মিলবে না, আমার জীবন আর কখনও সহজও হবে না। স্মৃতির ঝড় আমাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। এই নশ্বর জীবনের প্রতি আর কোনও টানও তেমন অনুভব করছি না।

সময় এত দ্রুত গড়িয়ে যেতে আগে কোনওদিন দেখিনি। অক্টোবরের আকাশ, এই মেঘ জমেছে তো এই রোদ উঠেছে। জানালা হতে দূর আকাশের দিকে তাকাই, কিছুই দেখি না কুয়াশার জাল ভেদ করে। এমতাবস্থায়, শরীরে কিছুটা কাঁপুনি বোধ হলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি। এ কী ? এত বেলা হয়েছে, এখনও খাবার খাইনি। ইতিমধ্যে, তিতলী বার কয়েক খাবার খেতে তাড়া দিয়ে গেছে। যাব, যাচ্ছি বলে ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। এখনও খাইনি শুনলে ও নিশ্চিত রাগ করবে। ওর অগোচরে পা টিপে টিপে রান্নাঘরে ঢুকি। পাউরুটি, কলা, দুধ, ওটমিল, সিরিয়াল, ইউগার্টসহ নানা ফল রাখা আছে কিচেন কাউন্টারে, ফ্রিজে। কোনও খাবারই আমার মুখে রুচল না। পানি দিয়ে কোনওমতে এক টুকরো গমের পাউরুটি গিলে ওষুধ খেলাম। মন চাইছে, আলমন্ড পেস্ট্রি, কিংবা ঘিয়ে ভাজা পরোটার সঙ্গে আলুভাজি খেতে। কিন্তু, আমার মতো সুগারের রোগীর জন্য এসব খাবার বিষবৎ বৈ অন্য কিছু নয়। আরও বেশিদিন বাঁচার আকাক্সক্ষা হতে খাবার নিয়ন্ত্রণ করছি বিষয়টি সেরকম নয়, বিষয়টা হলো আর যে কদিন বাঁচি যেন সুস্থভাবে বাঁচি, সৃষ্টিকর্তার কাছে এটাই এখন আমার একমাত্র ধ্যান। অসুস্থ হয়ে বাচ্চাদের অথবা অন্য কারও বোঝা হয়ে একদিনও বাঁচতে চাই না পৃথিবীতে।

টেক্সাস হতে তিতলী আসার পর ঘরের কোনও কাজে ও আমাকে হাত লাগাতে দেয়নি। মুভিং কোম্পানি ইউহলের সঙ্গে স্কাজুয়াল করে ঘরের সকল জিনিসপত্র গুছানোর দায়িত্ব একাই পালন করছে। অবশ্য, ঘরের বেশির ভাগ ফার্নিচারই পুরোনো, ফেলা দেওয়া হয়েছে। জীবন হতে মুহূর্তগুলো যখন হারিয়ে যায় স্মৃতি তখন গভীর চুম্বনের মতো মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে ধরে। খাওয়া শেষে এ রুম ও রুমে উদ্দেশ্যহীন পায়চারি করছি। কোথাও তেমন কিছু নেই তবুও অদৃশ্য কোথায় যেন আমার পা জড়িয়ে আসছে। পুরো ঘর প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। একসময়ের কোলাহলপূর্ণ ঘর এখন নিঃস্তব্ধ মরুভূমি। বুকের ভেতর মহা কালের একটা শূন্যতা ভর করেছে। ভাবি, ঘরের অথই শূন্যতাই কী আমার বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে! পাখির কিচকিচ শব্দ পেয়ে তাকিয়ে দেখি, জানালার শার্সিতে ধাক্কা খেয়ে আচমকা পড়ে গেল একটা ছোট পাখি। মুমূর্ষু পাখিটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে, পারছে না। আহত পাখিটা যতবার মাথা তুলে উঠার চেষ্টা করছে ততবারই ব্যথায় ছটফট করছে। পাখিটা পড়ে রইল পথে, আমি দূর হতে পাথর চোখে ওর চোখে চোখ রেখে আপনমনে বলি, এটাই জীবনচক্র, জন্ম, মাঝখানে কিছু আলো-ছায়া, উড়াউড়ি, অতঃপর, জীবন পূর্ণতা পায় মৃত্যুতে। পাখিটা হতে চোখ সরিয়ে স্মৃতির রঙিন কাচের ভেতর দিয়ে আমার ভালোবাসাময় ঘরটায় পুনরায় অগোছালো হাঁটতে থাকি। আগামীকাল ঠিক এই সময়, আমার ছাব্বিশ শত স্কয়ার ফিটের এই ঘর মুখর হয়ে উঠবে অন্য মানুষের পদচারণায়। আমার, আমাদের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না, আর কোনও স্মৃতি রচনা হবে না। এই ঘরের সর্বশেষ বাসিন্দা আমিও একটা ঝরাপাতার মতো উড়তে উড়তে চলে যাব দূরে, বহুদূরে।

তাপমাত্রা কি আরও কমেছে! ঠান্ডায় শরীরটা ফ্রিজে রাখা মাংসের মতো জলীয় কঠিন হয়ে গেছে। আয়না দেখি, বিস্ময় জাগে, নিজেকে চিনতে পারি না। আমি দেখতে অনেকটা বরফের মানুষের মতো হয়ে গেছি। আমি স্বাভাবিকভাবে আর হাঁটছি না, একটা বরফের বলের মতো গড়িয়ে যাচ্ছি। এমন হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, এমন স্যাঁতসেতে হাওয়া একটুও ভালো লাগছে না। ঘরের ভেতর যেন তুষারঝড় ঢুকে পড়েছে। মনটা বড় নিঃস্ব হয়ে গেছে। একটু উষ্ণতার জন্য কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লে পরে শীত হতে কিছুটা নিস্তার পেয়ে প্রাণে অদ্ভুত আরাম পাই। আহা, শান্তি!

তখনও ভালোভাবে আলো ফোটেনি। আধো আলো আধো অন্ধকারে হেমন্তের শীত ছোঁয়া ধূসর কুয়াশা ভেদ করে আমাদের গাড়ি হাইওয়ে ধরে দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে সম্মুখে। মাইলের পর মাইল আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি চলছে তো চলছেই, এই পথের কোনও শেষ নেই। পথের দু ধারে অসাধারণ সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিংড়ে নিংড়ে উপভোগ করছি। সবুজ পাতারা ঝলমলে রঙিন হয়ে উঠেছে। লাল, নীল, খয়েরি, হলুদ, কমলা রঙে ঢাকা অপরূপ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ভাবি, স্বর্গ কী এরচেয়েও সুন্দর! আহা, কী যে তুলতুলে ঘোর, কী যে নরম ভালোলাগা! এমন ঘোরলাগা ক্ষণে শুনি, অনেক দূর হতে আমার মা আমাকে ডাকছেন। ছোটবেলায় যেমন আদর করে ডাকতেন, সেরকম করে, ‘তামান্না ও তামান্না, কই যাস, মায়ের কাছে আয়।’ এবার তাঁর গলা এত কাছে চলে এসেছে যে, তাঁর নিঃশ্বাসের শব্দ এসে কানে লাগছে। আমি ছটফট করতে করতে পেছনে তাকিয়ে দেখি, আমার প্রিয় বেগুনি রঙের বুনোফুল হাতে মা হাসতে হাসতে আমার দিকে আসছেন। আমিও আনন্দিত চিত্তে মায়ের দিকে ছুটছি। ছুটতে ছুটতে খানিক আগের ওই পাখিটার মতো একটা বড় গাছের গুঁড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পথে পড়ে গেলে মা আমার হাত ধরে তুলে বুকে টেনে নেন। মাকে জড়িয়ে ধরে ব্যথায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলে তিনি বলেন, ‘দেখো, চারপাশে কত রং, কত আলো, বিশুদ্ধ বাতাস, প্রাণভরে শ্বাস নাও। মা চলে এসেছি, সব ব্যথা উবে যাবে। কত দীর্ঘ সময় ধরে তোমার জন্য আমি প্রতীক্ষা করেছি, চলো, আমার সঙ্গে ঘরে চলো।’

একটা বিশাল খোলা মাঠে ধূসর থেকে ধূসরতর ঝরাপাতারা উড়ছে, তাদের মাঝখান দিয়ে মা আমার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। মায়ের হাত ধরে যেতে যেতে ছোটবেলার মতো একটা শান্ত সমাহিত আনন্দ বোধ করছি আপাদমস্তকে। কান্নার শব্দ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি, তিতলী চিৎকার করে কাঁদছে, সঙ্গে ইউহল কর্মীটাও। উঠে বসতে পারছি না কেন আমি ? ভালোবাসার অধিক যাকে ভালোবেসেছি, সে আমার প্রথম সন্তান তিতলী, ও জ্ঞান হারালে বড় ইচ্ছে হয় সকাল বেলার মতো ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিই। না, শত চেষ্টা করেও আমি আর পেছনে যেতে পারছি না, আমার জীবনের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে, এই পৃথিবীর কক্ষ হতে আমি ছিটকে পড়েছি নির্ধারিত বৃত্তের বাইরে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button