
উনিশ শতকের রাশিয়ায় বিপ্লব প্রয়াস বলতে প্রথমে ১৯০৫-এর বিপ্লব, ডিসেম্ব্রিস্ট বিদ্রোহ, আর ১৮৭০-৮০র দশকে জার দ্বিতীয় নিকোলাসকে হত্যার ঘটনা এর অন্তর্গত। এ সময়ে রাশিয়া জুড়ে যেমন, দেশের বাইরেও তেমন সংস্কারকামী, র্যাডিকাল, নিহিলিস্ট, রেভলুশনারিরা অভিবাসী হিসেবে ছিল। অসংখ্য মানুষ এই সব উদ্যোগে কারাবরণ করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন, এর পরিকল্পনায় সংঘবদ্ধ হয়েছেন। সমকালীন সাহিত্যে তার চিত্র রয়েছে তুর্গেনেফ, চেরনিশেভস্কি ও দস্তইয়েফস্কির রচনায়। পপুলিস্ট ও নারোদনিক নামে দুই দলে বিভক্ত ছিলেন রুশ বুদ্ধিজীবীরা, প্রথাগত রাজনৈতিক দলের বাইরে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তাদের মূল প্রতিপক্ষ ছিলেন প্রাক সোভিয়েত রাশিয়ার সম্রাট জার দ্বিতীয় নিকোলাস ও তার সমর্থক প্রশাসনযন্ত্র হিসেবে আমলাতন্ত্র। তাদের শোষণের অধীনে থাকা দরিদ্র নিরন্ন মানুষদের বিপুল অংশ ভূমিদাস, যারা ছিল ভূমিব্যবস্থার অভিশাপের ফসল। অন্যান্য শোষণের দিকের সঙ্গে ভূমিকামি ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত থাকা পরিস্থিতি বদলাতে বদলাতে উনিশ শতকের রাশিয়ার বুদ্ধিজীবী, নিহিলিস্ট, শিক্ষার্থী, সাহিত্যকর্মী সবাই বিপ্লবী কাজকর্মে যুক্ত হয়। বিভিন্ন রকমে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে ওঠে। জারের পক্ষে বিভিন্ন সংস্কার প্রয়াস এই পরিস্থিতির উপশম ঘটাতে পারে না। এক পর্যায়ে গুপ্ত ঘাতকের হাতে জার নিহত হন। এই হত্যার সঙ্গে বিপ্লবীদের অন্যান্য সক্রিয় কর্মসূচি ধীরগতি হলেও প্রকৃত বিপ্লবের আকাক্সক্ষা রয়েই গিয়েছিল।
১.
এই উত্থানের সূচনা ডিসেম্ব্রিস্ট বিদ্রোহের দ্বারা, যা পরবর্তী সময়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়েছে; প্রকৃতপক্ষে এর সূচনা হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের দ্বারা, এই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সংগঠন গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ছিল উচ্চ শিক্ষিত যুবক ও অভিজাতদের ১৮২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর এক অসফল বিদ্রোহ সংগঠিত করা এবং তাদের প্রাণ উৎসর্গের মাধ্যমে পরের প্রজন্মগুলোকে প্রেরণাদান। এই অভিজাতদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ছিল; কেউ হয়তো নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পরে রাশিয়ার ফ্রান্স দখলে অংশ নেয় বা পশ্চিম ইউরোপে কোথাও নিযুক্ত ছিল। অথবা কেউ ফ্রিম্যাসন, বা রাশিয়ায় দেশপ্রেমিক (পরে বিপ্লবী) সংগঠনের সদস্য ছিল। এগুলোর নাম যেমন দ্য ইউনিয়ন অফ সালভেশন (১৮১৬), বা দ্য ইউনিয়ন অফ ওয়াফেয়ার (১৮১৮)। এরকম সংগঠনের একটি নর্দার্ন সোসাইটি জার প্রথম আলেকজান্ডার-এর মৃত্যুর পরে সাম্রাজ্যে অভিষেক হবার মীমাংসা হতে দেরি হওয়ার সুযোগে পিটার্সবার্গে থাকা সৈন্যদের এক অংশকে আস্থায় আনে ও প্রথম নিকোলাসের প্রতি শপথ নিতে অস্বীকার করে, তার ভাই কনস্তান্তিন-এর সিংহাসনে আরোহণ দাবি করে। এই বিদ্রোহ তত শক্তভাবে সংগঠিত হয়নি ও সহজেই পরাস্ত হয়: সাময়িক স্বৈরশাসক হবার জন্য নির্ধারিত কর্নেল প্রিন্স সের্গেই ত্রুবেৎস্কয় সাথে সাথে পালিয়ে যান। আরেকটি বিদ্রোহ ঘটে চেরনিগোভ রেজিমেন্টে ও সাথে সাথে পরাস্ত হয়। নিকোলাসের নিজে অংশ নেওয়া এক তদন্তে ২৮০ জন ডিসেম্ব্রিস্ট-এর বিচার হয়, পাঁচজনের প্রাণদণ্ড হয়, ৩১ জনের কারাবাস, এবং বাকিদের সাইবেরিয়াতে নির্বাসিত করা হয়।
এই ডিসেম্ব্রিস্ট বিদ্রোহকে দেখা যেতে পারে যুগপৎ রুশ ইতিহাসের এক পর্বের সমাপ্তি ও নতুন এক যুগের সূচনা হিসেবে; অসফল হলেও এটি ছিল ‘প্রাসাদ অভ্যুত্থান’ বলে কথিত এর শেষতম; আগের অভ্যুত্থানগুলো হয়েছে সিংহাসনের কোনও দাবিদার বা সামরিক কর্মকর্তাদের দ্বারা; ১৮২৫ সালের এই চেষ্টায় ডিসেম্ব্রিস্ট অফিসারদের সমর্থিত দাবিদার কনস্তান্তিন সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নিতে দ্বিধান্বিত ছিল ও ছোট ভাই নিকোলাসের পক্ষে ত্যাগ করেন। তাই বিদ্রোহী সামরিক বাহিনী অধিকাংশ রুশ অভিজাতের চোখে বৈধতা হারিয়ে ফেলে ও দ্রুতই পরাস্ত হয়।
এছাড়া, ডিসেম্ব্রিস্ট ছিল আগেকার প্রাসাদ অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীদের চেয়ে ভিন্ন; তারা তাদের নিজের এক রাজনৈতিক কর্মসূচি দাঁড় করায়। একটা মাঝারি ধরনের, নর্দার্ন সোসাইটির দ্বারা তৈরি করা, যেটি গঠিত হয় সেন্ট পিটাসবার্গ ও তার কাছাকাছি এলাকার উদারমনস্ক অফিসারদের দ্বারা; যারা আগামীর রাশিয়াকে ফ্রান্স বা ব্রিটেনের মতো সম্রাটের অধীনে সাংবিধানিক সাম্রাজ্য হিসেবে কল্পনা করত। আরেকটি রচিত হয় সাদার্ন সোসাইটি থেকে, যেটি চালিত হত ইউক্রেনে বাস করা সামরিক কর্মকর্তাদের দ্বারা, যারা রুশ সাম্রাজ্যকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের প্রস্তাব দেন ও তার রাজনৈতিক সিস্টেম ফ্রান্সের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পাল্টানো যাবে। এই দুটির কোনওটি বাস্তবায়িত হয়নি, তবে তা নতুন প্রজন্মের বিপ্লবীদের জন্য প্রেরণা হয়ে ওঠে, প্রথম নিকোলাসের মৃত্যুর পরে প্রভাব রাখে এবং তার পুত্র ও উত্তরসূরি দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের মুক্তকারী সংস্কারে প্রভাব রাখে; এসব কারণে সোভিয়েত পর্বে এসে ডিসেম্ব্রিস্টদের জারবিরোধী আন্দোলনের পূর্বপুরুষ ও প্রথম রুশ বিপ্লবী হিসেবে দেখা হয়।
এই সূত্রে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতি লক্ষ করা যায়; যেটি প্রধানত গড়ে উঠেছিল ভূমিকামিদাস প্রথার উপরে, জাতির জনশক্তিকে নিঃশেষে নিংড়ে অভিজাততন্ত্র পুষ্ট হচ্ছিল। জারতন্ত্র এর প্রতিনিধি হিসেবে কঠিন শাসনে মানুষের স্বাধীনতাকে দমিয়ে রাখছিল। রুদ্ধকণ্ঠ জাতি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে থাকে; এই চেষ্টায় কারও কারও সাইবেরিয়ায় নির্বাসনের পরিণতি জোটে। তারপরেও তাদের স্বপ্নের বীজ মানুষের বুকের মধ্যে থেকে যায়।
এই সঙ্গে যুক্ত হয় ইউরোপের অনুসরণ করার আকাক্সক্ষা; মনে রাখতে হবে রুশ অভিজাতদের একটা বড় অংশ নিয়মিত ইউরোপে বাস করতেন, বা যাতায়াতের মধ্যে থাকতেন; কিছু না হলেও ইউরোপের দেশগুলোতে উন্নয়নের, চিন্তার ধারা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতেন। ফলে রাশিয়ার অনুন্নত অবস্থা, অত্যাচার, শোষিত হওয়া, স্বাধীন মত প্রকাশের অন্তরায়ের তুলনায় ইউরোপীয় সমাজের অনুরাগী হয়ে পড়েন। এরা পরিচিত ছিল প্রতীচ্যপন্থি বা ওয়েস্টোফিল নামে; এদের বিপরীতে ছিল রাশিয়ার দুর্দশা অস্বীকার না করে স্লাভ জাতিগুলোর আদর্শের মধ্যেই রাশিয়ার দুর্দশা থেকে উদ্ধারের পথ খুঁজতে থাকা; যারা পরিচিত স্লাভোফিল নামে। এই দুই দলে নবীন যুবক, তরুণরা মস্কো, পিটার্সবার্গে নিজেদের মধ্যে তর্কে প্রবৃত্ত হতো। এর বাইরে ছিল বিভিন্ন নিহিলিস্ট সংগঠন, বিপ্লবী সংস্থা, চরমপন্থি সংগঠন; যাদের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন পাঠচক্র, সাহিত্যিক, সমালোচকবৃন্দ―নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এসব আলোচনা সারত; জারের শাসনে প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে তা করার উপায় ছিল না, যেমন সক্রিয় ছিল জারের গুপ্তচর বিভাগ তেমন কাজ করত সেন্সর ব্যবস্থা―প্রায় সমস্ত কিছু প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে ছিল। জারের স্বৈরাচারী শাসনই ছিল এই সমস্ত দলের কাজের অন্তরায়; তাই বিপ্লবী, সংস্কারপন্থি সকলেরই প্রতিপক্ষ ছিল জারের শাসন; পরিস্থিতির চাপে বিভিন্ন পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হলেও তা কার্যকর হিসেবে দেখা দেয়নি। বিভিন্ন রকম ভূমিকামি সংস্কার ভূমিকামিদাসদের শোষণের অবসান করেনি। এর সঙ্গে প্রেক্ষাপট হিসেবে ছিল রাশিয়ায় প্রচলিত অর্থডক্স খ্রিস্টান ধর্ম; রাশিয়ার চিরন্তন আধ্যাত্মিকতা হিসেবে কারও কারও আশ্রয় হয়ে দাঁড়াত ইউরোপীয় আধুনিকতার বিপরীতে। এই উনিশ শতকে তার মধ্যেও বিপ্লবী প্রয়াস অব্যাহত ছিল।
২.
এমনিভাবে রুশ সাহিত্য আলোচনার এক চক্রে পিটার্সবুর্গের বুকে প্রগতিমনস্ক তরুণ বুদ্ধিজীবীরা জড়ো হয় ১৮৪০-এর দশকের গোড়ায়; পেত্রোশেভস্কি চক্র নামে এই আড্ডাটি সংগঠিত করেন মিখাইল পেত্রোশেভস্কি, যিনি ফরাসি ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রী চার্লস ফুরিয়ার-এর অনুসারী; এই চক্রে এসে সদস্য হয় লেখক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ছোট খাট সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্য সেনা কর্মকর্তা। এরা সবাই একেক মতের ছিল, কেবল স্বৈরাচার জার এবং ভূমিকামিদাস প্রথার বিরোধিতার ক্ষেত্রে সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। গোষ্ঠীটি শুরু হয়েছিল পশ্চিমা দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে যা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন জার প্রথম নিকোলাস। এতে যুক্ত ছিলেন লেখক দস্তইয়েফস্কি ও সালতিয়াকভ শেচেদ্রিন ও কবি আলেক্সেই প্লেশ্চিয়েভ, অ্যাপল্লোন মেইকভ ও তারাস শেভচেঙ্কো।
এ ধরনের আড্ডাকে বিপদের হিসেবেই দেখছিলেন জার ১৮৪৮ সালের বিপ্লবসমূহের পরেই; এই সালে পেত্রোশেভস্কি চক্রের সদস্যদের বন্দি করা হয় ও কারাবাস করতে হয়; তাদের অন্যতম দস্তইয়েফস্কি যাকে সামোভনা প্রসাদে প্রাণদণ্ডের জন্য পাঠানো হয়। তার আগে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোটির পরিচয় দেওয়া দরকার; অভিজাততন্ত্র জাতির জনশক্তিকে নিংড়ে শোষণ করছে। জার তারই প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের প্রকাশকেও রুদ্ধ করে রেখেছিল; মুক্তির স্বপ্ন ব্যর্থ ক্রোধে মাথা কুটছিল মুক্তিপিপাসুর বুকের মধ্যে; তা ফুসে উঠলে জারের ক্রোধে সাইবেরিয়ায় বরফ ঢাকা দুর্গে পাঠানো হতো। সেখানে বন্দি থাকতে থাকতে অনেকে মরে যেত; তাদের বুকের মধ্যে থাকা মুক্তির স্বপ্ন আলোর মুখ দেখত না। ১৮৪৮ সালের ফরাসি বিপ্লবের সাফল্যে এই স্বপ্নের বীজ মহীরুহ হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি করল; ওদিকে জার আরও বেশি সতর্ক হলো, নিজের শাসনের বন্ধন আরও দৃঢ়তর করল; গুপ্তচর বাহিনী ছড়িয়ে পড়ল দেশজুড়ে। আমলাতন্ত্র প্রাণচাঞ্চল্যের সন্ধান পেলেই জারের গোচরে আনতে থাকে। এই বিপুল নির্যাতন চলতে থাকলেও জাতির মনোবীজে স্বপ্ন সঞ্চারিত হতে থাকে। তাই এই ১৮৪৮ সাল সন্ধিক্ষণ হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্যপন্থী ও স্লাভোফিল ছাড়াও মানুষকে তার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করাই যথেষ্ট মনে করা এক উদারপন্থি দল সক্রিয় ছিল রুশ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে।
এই তিন দলের মাঝামাঝি রয়েছেন কিছু মানুষ যাদের লক্ষ্য সৌভ্রাতৃত্ব ও স্বাধীনতার স্বপ্ন, যেমন দস্তইয়েফস্কি; নিয়মিত পেত্রাশেভস্কির ঠেকে এসে ঘাটি গাড়ছেন। প্রতি শুক্রবারে তর্ক-বিতর্ক, চা পান, রাত জাগা, বাড়ি ফেরা নিয়মিত কৃত্য। বন্ধুবান্ধব যেমন জুটছে, ধার পাবার জন্য নিরাপদ মানুষজনও জুটছে। সশস্ত্র বিপ্লব, গোপন ছাপাখানা, প্রচারপত্র ছেপে কৃষক মজদুরদের মাঝে বিলি করায় অ্যাডভেঞ্চার বোধ করেন দস্তইয়েফস্কি; এমনি করে পেত্রাশেভস্কি চক্রের আড্ডা শেষের আড্ডায় শরিক হয়ে ওঠেন। ততদিনে রুশ সমালোচনা জগতের অগ্রবর্তী সৈনিক ভিসারিও বেলিনস্কির সঙ্গে এক তরফা মনোমালিন্য ঘটে গেছে দস্তইয়েফস্কির, তবু বেলিনস্কির কাজকর্মের প্রতি তার শ্রদ্ধা কমেনি; নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন; ঝগড়া হওয়া সত্ত্বেও তার ভাবনার সঙ্গে মিলই খুঁজে পেতেন: দেশের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক কাঠামো মানুষকে বাধ্য হয়ে অপরাধ করায় বলে এই পাপচক্র ভাঙতে হবে; তাই এই সময়ে ফ্রান্স, নেপলস, তাস্কানি, অস্ট্রিয়ার গণজাগরণকে অভিনন্দন জানান।
৩.
বিপ্লবের সম্ভাবনার মতো মুক্ত প্রেমের মতো বিষয়ও পেত্রাশেভস্কি চক্রে আলোচনায় আসে; ওদিকে জার প্রথম নিকোলাসও ১৮৪৮ সালের বিপ্লব রাশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার আশংকায় সতর্ক; পেত্রাশেভস্কি চক্রের মতো সংগঠন স্থাপিত হওয়ায় এর কাজকর্মের উপরে নজর রাখতে গুপ্তচররা সক্রিয় হয়। চক্রের মধ্যেও আগ্রহী সদস্যরা জড়ো হতে থাকে; যারা প্রচলিত অবস্থা সম্পর্কে অসন্তুষ্টি ছড়িয়ে দিতে ও ইতিমধ্যে বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীগুলোর মাঝে যোগাযোগ স্থাপনে কাজ করে। এই কাজে উদ্যোগী ছিলেন স্পেশনেভ, তার গুপ্ত সমিতি কখনও আবিষ্কৃত হয়নি, যদিও অত্যাচারের মুখে পেত্রাশেভস্কি চক্রের মূল আলোচনা ফাঁস করে দেন।
এই চক্রে আরও যুক্ত ছিলেন ভালেরিয়ান মেকভ ও ভিসারিও বেল্লিনস্কি; মেকভ ছিলেন পেত্রাশেভস্কির ঘনিষ্ঠ, কিরিলভের রচনা ডিকশনারি অফ ফরেন ওয়ার্ডস সংকলনে বিরাট ভূমিকা রাখেন; যেটি হয়ে উঠবে বিচার প্রক্রিয়ার করপাস ডেলকটি। অপরাধ আর কিছুই না গোগোলকে উদ্দেশ্য করে ভর্ৎসনা করে লেখা বেল্লিনস্কির চিঠিটিকে ঘিরে এসব কাণ্ড হয়; পেত্রাশেভস্কি চক্রের কিছু সদস্য এই পাঠে অংশ নিয়েছেন, এর রচয়িতাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। দস্তইয়েফস্কির জীবনীতে পরিস্থিতিটি সংলাপের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। পেত্রাশেভস্কি, আখশারমফ ও দস্তইয়েফস্কি কথা বলছিলেন; পেত্রাশেভস্কি দস্তইয়েফস্কির মত জানতে চান।
আখশারমফের কথা না শুনলেও চলবে, ওর ইচ্ছে জার থাকবে, তবে তাকে শক্ত দড়িতে বেঁধে রাখতে হবে। যাকে আমরা উচ্ছেদ করতে চাই তাকে আমরা বেঁধে রাখব কোন দুঃখে। যাক ওসব কথা, এখন শোনো, আমাদের প্রথম আন্দোলন হবে ভূমিকামিদাস প্রথার বিরুদ্ধে। ভূমিকামিদাস প্রথার উচ্ছেদ চাই আমরা সর্বাগ্রে’, বললেন দ্যুরফ।
‘ভালো। কিন্তু আমার মনে হয় তার আগে সেনসরশিপ-এর বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন করা উচিত। আমরা সবাই জানি বেল্লিনস্কির ক্ষয় রোগ হয়েছিল। তিনি গত জুন মাসে মারা গেছেন। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কারণে মনোমালিন্য ছিল, তবু কিন্তু আমি তার বিপ্লবী চিন্তার একজন শরিক। জার সরকার তার অনেক রচনা বাজেয়াপ্ত করেছেন। বিশেষ করে গোগোলকে লেখা তার খোলা চিঠি যাতে জনসাধারণের হাতে না পৌঁছায় সে জন্য আমলারা তার শেষ কপি অব্দি নষ্ট করে দিয়েছে। আমরা সে চিঠিটাই ছাপব, ছেপে গোপনে বিলি করে শুরু করব আমাদের আন্দোলন’, প্রস্তাব রাখলেন।
‘কিন্তু সে চিঠি আমরা কোথায় পাব ?’ শুধোলেন স্পেশনিয়েফ।
‘আমার কাছে আছে’, দস্তইয়েফস্কি পকেটে হাত দিলেন।
‘পড়ে শোনাও তবে। শুনি আমরা সে চিঠিতে কী আছে ?’ দ্যুরফ কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। (যজ্ঞেশ্বর রায়, লেখকের লেখক দস্তয়েফস্কি)
বেল্লিনস্কি ছিলেন জ্যেষ্ঠ রুশ সমালোচক, তরুণ সাহিত্যকর্মীদের অভিভাবক গোছের; তরুণ গোগোলের রচনায় মহান সাহিত্যিকের সম্ভাবনা লক্ষ করে আশাবাদী হয়েছিলেন। সেই গোগোল ধর্মীয় মুক্তিকে গ্রহণ করে ঐহিকতাকে বর্জন করলে ইতালিতে থাকা লেখকের উদ্দেশ্যে মৃত্যুপথযাত্রী বেল্লিনস্কি জার সরকারের শোষণের বীভৎস চেহারা তুলে ধরেছেন; কীভাবে পুলিশ-পুরোহিত, ভূমিকামিদাসমালিক ও গুপ্তচরের মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতা ও মনুষ্যত্ব হরণ করেছেন তার চিত্র তুলে ধরেছেন। রাশিয়ার অর্থডক্স খ্রিষ্টান ধর্ম উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত যে মহিমায় বজায় ছিল অনেক রুশ সাহিত্যিকই সনাতন রুশ জীবনের ঐক্য হিসেবে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ার হাতছানি অনুভব করেছেন। গোগোলের সাম্প্রতিক এক রচনা তার ধর্মীয় পথ বেছে নেওয়ার উদাহরণ হিসেবে প্রকাশ পায়। তার ‘মৃত আত্মা’র দ্বিতীয় খণ্ডের কয়েকটি খসড়া রচনা করেও পুড়িয়ে ফেলেন। বেল্লিনস্কির চিঠিটির বয়ান এ রকম (যজ্ঞেশ্বর রায়ের অনুবাদে) :
রাশিয়া একটা দেশ, যেখানে আছে কেবল এক বিরাট পাপচক্র। আমলারা সব চোর-ডাকাত-খুনে। যিশু বলেছেন চাষিরা জমির মালিকদের ভাই। ভাই কী করে ভাইয়ের ভূমিকামিদাস হয় ? সুতরাং জমির মালিকের কী উচিত নয় চাষিকে তার শ্রমের ফল ভোগ করতে দেওয়া, তাকে দাসত্বের জোয়াল থেকে মুক্তি দেওয়া ? এ ন্যায্য অধিকার আদায় করে দেবার জন্য চার্চ কিছু করেছে কী ? না, রক্ষণশীল চার্চ কেবল স্বেচ্ছাচারিতারই পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, বল ও ভরসা হয়ে উঠছে মালিকশ্রেণির। … চার্চের পৃষ্ঠপোষকতায় ঔদরিক, গৃধ্রু চাটুকার লজ্জাহীনদের স্পর্ধা আজ সীমাহীন হয়ে উঠেছে… গোগোল আপনি কি জানেন না, চার্চের প্রতি রাশিয়ার মানুষের আজ কী নিদারুণ ঘৃণা।… এ ঘৃণা ক্রমশ সংঘবদ্ধ হচ্ছে, কথা বলতে চাইছে, পারছে না। অত্যাচারের দাপটে সংকুচিত হয়ে আছে। আত্মপ্রকাশের পথ পাচ্ছে না…
রাশিয়ার মানুষ জানে, কেবল সেই মানুষই জেরুজালেম যায়, যার মনের মধ্যে যিশু নেই, যে যিশুকে হারিয়ে বসে আছে। অন্যের দুঃখে যে দুঃখ পায়, অন্যের প্রতি অত্যাচার হলে যে ডুকরে কেঁদে ওঠে, তার বুকেই যিশুর বাস। সে মানুষকে যিশুর আশীর্বাদের আশায় তীর্থের পথে পরিব্রাজক হতে হয় না।’
এই চিঠি ছেপে বিলি করার সিদ্ধান্ত হয়। ফিলিপভ ও মমবেল্লি এর প্রতিলিপি তৈরি করেন ও সেসব বিক্রি করা শুরু করেন; কিন্তু পেত্রাশেভস্কি তাদেরকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন―কিষাণ কুলের উন্নতির জন্য বিচারিক সংস্কারই সেরা উপায়।
তবে এর সঙ্গে যুক্তদের গ্রেফতার করতে দেরি হয় না। ১৮৪৯ সালের ২৩ এপ্রিল রাতের শেষে এদের বাইশ জনকে গ্রেফতার করে। কাউকে চিঠি বিলি করার অপরাধে, কাউকে যথা সময়ে এর প্রকাশনায় যুক্তদের সম্পর্কে রিপোর্ট করতে না পারার দায়ে; বন্দি করার পরে তাদেরকে পিটার অ্যান্ড পল দুর্গে রাখা হয়; কমিশন বসে আন্তেনেল্লি নামে গুপ্তচরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। প্রত্যেককে আলাদা ভাবে জেরা করা হয়; তবে সিভিল আইনে নয় সামরিক আইনে তাদের বিচার হয়। পনেরো জনকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানোর শাস্তি দেওয়া হয়, বাকিদের নির্বাসন ও সশ্রম দণ্ড দেওয়া হয়; এই রায়কে পুনর্বিবেচনা করে বাকি বন্দিদেরকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়; সম্রাটের কাছে সেসব অনুমোদনের সময়ে ক্ষমার ও লঘু শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জার শাস্তি কমাতে সম্মত হন, তবে পুরো কৃতিত্ব সম্পন্ন হয়ে যাবার আগের মুহূর্তে তাদেরকে সম্রাটের কৃপার কথা জানাতে হবে। ২২ ডিসেম্বর বন্দিদের তাদের সেল থেকে বের করা হয় ও কোনও কথা না বলে সেমোনভস্কি স্কোয়ারে আনা হয়। ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুর দণ্ড পাঠ করে শোনানো হয়; প্রথম তিনজন পেত্রাশেভস্কি, মমবেল্লি এবং গ্রিগোরিয়েভকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে খুুঁটিতে বাঁধা হয়। এক মিনিট অতিবাহিত হয় সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা বোঝাতে ঢোলের আওয়াজে ও সৈনিকদের রাইফেল নামিয়ে রাখাতে। এই তালিকার পরেই ছিলেন দস্তইয়েফস্কি। বিভিন্ন রকমের শ্রম ও কারাবাসের পরে নির্বাসন ও সেনাবাহিনীতে কাজ করার শাস্তি দেওয়া হয় এদেরকে। এদের পরবর্তী সময়ের কর্মকাণ্ডে এই অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটে।
৪.
১৮৪৮ সাল বছরটি রুশ ইতিহাসে স্পষ্ট বাঁক নিয়ে এসেছিল। সেই বছরের বিপ্লব রুশ সাম্রাজ্যের সীমানায় পৌঁছতে পারেনি; বরং আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রকে প্রথম নিকোলাস আরও জোরদার করেন সফলভাবেই; কোথাও কার্যকর স্বাধীন চিন্তা বা ক্রিয়ার অস্তিত্ব দেখা গেল না; এর আগে প্যারিস, পোলান্ড বা স্পেনে বিদ্রোহের ঘটনা গণতন্ত্রের পক্ষের জন্য আশার বাণী হয়ে আসে; অথচ ১৮৪৮ সালে পিটাসবুর্গে এই ঘটনা নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হলো; স্বৈরশাসকের নিয়ন্ত্রণের কোনও ঘাটতি লক্ষ করা গেল না। তা ছাড়া ১৮৪৮ সালটি মার্ক্স ও এঙ্গেলস রচিত ইশতেহারটির জন্ম দিয়ে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে চিহ্নিত করে; আরও পরে রুশ জনমতের উপরে ইউরোপীয় বিপ্লবসমূহের ব্যর্থতার নিয়তিকৃত ফলের জন্য ও বিশেষ করে রুশ বিপ্লবী আন্দোলনের উপরে; সে সময়ে তা আন্দাজ করা যায়নি।
সে সময়ে রাশিয়ায় তখনতখনি বিপ্লবী সম্ভাবনার কথা বাকুনিনের মতো দৃঢ় চেতনার কেউ ও পেত্রাশেভস্কি চক্রের দু একজন ছাড়া কেউ গণ্য করেনি। ইতালি, প্রুশিয়া ও অস্ট্রিয় সাম্রাজ্যে বিপ্লবের সূচনা রাজনৈতিক দলের দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল; তা সমাজতন্ত্রী বা র্যাডিকাল বুদ্ধিজীবীদেরসহ পরিচিত রাজনৈতিক ও সোশ্যাল মতবাদ ও সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে চালিত, উদার বুর্জোয়াদের সমর্থনে, বা হতাশ জাতীয়তাবাদীদের থেকে সমর্থন নিয়ে চালিত হয়; সাথে অপ্রভাবিত কৃষক ও শ্রমিকদের থেকে বিরাট পরিমাণে শক্তি নেবার চেষ্টা করে। পশ্চিমের পরিস্থিতির সঙ্গে যার কোনওটির রাশিয়ায় অস্তিত্ব ছিল না। বুদ্ধিজীবীরা সেভাবে আলোচনা করলেও রাজনৈতিক বা সোশ্যাল কাঠামোর অধীনে আসেনি। এই সময়ের বুদ্ধিজীবীদের নির্ভর করার মতো মধ্যশ্রেণি বা সমর্থন পাবার মতো কৃষকেরা ছিল না। সে সময়ে বেলিনস্কি তার বন্ধুকে বলেন, ‘লোকের আলু প্রয়োজন, কিন্তু সংবিধান চাওয়ার মতো কেউ নয়―যা চাইত কেবল ক্ষমতাহীন শিক্ষিতরা’, এই কথারই প্রতিধ্বনি তেরো বছর পরে করবে চেরনিশিভেস্কি। সাধারণ জনগণের মধ্যে এ নিয়ে হেলদোল ছিল না। রাশিয়ায় শিল্প ও শ্রমিক সমস্যা ও তার সঙ্গে মধ্যশ্রেণি ও পশ্চিমা ধরনে সর্বহারা সৃষ্টি না করা পর্যন্ত গণতান্ত্রিক বিপ্লব স্বপ্নই ছিল; এটি গড়ে উঠল উনিশ শতকের শেষ দশকে, তারপরে বিপ্লব সংঘটনে দেরি হলো না।
তাই ১৮৪৮-এর পরের বছরগুলোতে সরকার রুশ সাম্রাজ্যে ‘বিপ্লবী অসুখ’ ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে নেওয়া ব্যবস্থায় এই সম্ভাবনা রোধ হয়, সেই সঙ্গে পশ্চিমি উদারতাবাদের প্রভাব লোপ পায় এবং রুশ বুদ্ধিজীবীরা বিষয়টি তাদের নিজেদের উপরে নিতে বাধ্য হয়। রুশ প্রগতিশীল আন্দোলন কঠোর হয়ে ওঠে ও ভেতরকার অবস্থার প্রতি সচেতন হয়ে ওঠে; বিপ্লবী ও সংস্কারবাদীরা, প্রগতিশীল পক্ষে কোনও ধস নামেনি আর। কিন্তু এতে করে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিভাজন নিয়ে আসে। চেরনিশিভেস্কি ও বামপন্থি পপুলিস্টরা আগের তুলনায় উদারবাদীদের চেয়ে দূরে সরে গেল। ১৮৪৮-৫৬ এই দমনের কালপর্বে দেখা গেল স্লাভোফিল ও পশ্চিমাপন্থিদের মধ্যে বিভাজন আগে সহজে অতিক্রম পুনঃঅতিক্রম করা গেলেও এখন স্পষ্ট সীমানা হয়ে দাঁড়াল। র্যাডিকাল ক্যাম্পের মধ্যেও মেরুকরণ ঘটল: দ্য বেল গোষ্ঠীর মধ্যপন্থি ও পিটাসবার্গের র্যাডিকালদের মধ্যে ’৬০র দশকে বিরোধ তিক্ততায় পর্যবসিত হলো; দুই পক্ষই অভিন্ন শত্রু রাষ্ট্রের পুলিশি ব্যবস্থাকে মোকাবিলা করলেও পুরোনো ঐক্য ভেঙ্গে গেল। বামপন্থি অংশ ও ডানপন্থি অংশ পরস্পর আরও বেশি দূরে সরে গেল; তার কারণ বামপন্থি অংশ পশ্চিমা আদর্শকে বেশি করে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখতে থাকল, এবং মুক্তির জন্য দেশি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ করতে থাকে; পশ্চিম আগত উদারবাদী বা সমাজতন্ত্রী মতবাদের বিশ্বজনীন সমাধানে আস্থা হারিয়ে বসে। এটি শেষবারের মতো দেখা যায় ১৮৯০র দশকে রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের অর্থডক্স মার্ক্সবাদে, যে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা ১৯৪৮-৫১-এর ইউরোপের আশাভঙ্গেও হতাশ হয়নি।
জার প্রথম নিকোলাস তার পুরো জীবনই ডিসেম্ব্রিস্ট অভ্যুত্থান দিয়ে অবসেসগ্রস্ত ছিলেন; নিজেকে দেখতেন আস্তিক্য, উদারতাবাদ ও বিপ্লবের বিপদ থেকে রাশিয়ার জনগণকে রক্ষাকারী শাসক হিসেবে; যে কোনও রাজনৈতিক ভিন্নমত বা বিরুদ্ধতা দমন করা তার লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। তারপরেও কঠোর সেন্সরশিপ সত্ত্বেও সতর্ক রাজনৈতিক পুলিশ ডিসেস্ব্রিস্ট আন্দোলন নিয়ে প্রহরায় শৈথিল্য দেখায়। এই দীর্ঘ নিরবতা কেবল পোলিশ বিদ্রোহ দিয়ে বিঘ্নিত হয়; তাতে সাম্রাজ্যের ভেতরে কোনও দ্রোহ ঘটে না, ছোটখাট স্থানিক কৃষক বিক্ষোভ ছাড়া, এদিক সেদিক দু-চারজন সমর্থক ছাড়া। তাতে সাহস পেয়ে পরোক্ষ বিষয়বস্তু নিয়ে রাশিয়ার বাইরের বিদ্রোহের সংবাদ প্রকাশ করতে থাকে। বাস্তবে সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদ কঠোর সেন্সরশিপ পার হয়ে ও রাজনৈতিক পুলিশ জেনারেল দুবেল্ট-এর দৃষ্টি এড়িয়ে প্রকাশ পাওয়া সম্ভব ছিল না। তার থেকেই রাশিয়ার শাসকদের সম্পর্কে ইশারা পাঠ করতে সমর্থ হয়েছে অভিজ্ঞরা; প্রগতিশীল শক্তির আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল প্যারিস যেখানে মুক্তিপ্রেমী, অভিবাসী ও নির্বাসিত সমাজতন্ত্রীদের আবাস, এবং বিপ্লবী শিল্প ও সাহিত্যের কেন্দ্র। বিভিন্ন উপলক্ষ্যে তা সক্রিয় প্রেরণাস্থল হয়েছে।
ওদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিপ্লবের ফল ছিল তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী; কৃষিভিত্তিক সংস্কার এবং সার্ফদের অবস্থার উন্নয়নের জন্য সমস্ত প্রস্তাবকে, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, আচমকাই বাদ দেওয়া হয়। গোগোলের বিতর্ক তোলা সিলেক্টেড এক্সট্রাক্টস ফ্রম এ করেসপন্ডেন্স উইথ ফ্রেন্ডস কয়েকটা স্কুলে পাঠক্রমে যুক্ত করা হয়; তাতে সার্ফডমকে স্বর্গীয়ভাবে অনুমোদন কৃত হিসেবে দেখানো হয়, যেভাবে জার নিজেও স্বর্গীয় নির্দেশ হিসেবে প্রতিভাত হন। বলা হয় ‘বিপ্লবের সাত মাথা হাইড্রা’ সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছিল, তাই ভেতরের শত্রুকে কঠোরতার সঙ্গে দমন করতে হবে।
আর ১৮৮০-র মাঝামাঝি ও শেষে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের গুপ্তহত্যার পরে রাশিয়ার ইতিহাসে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড নির্জীব হয়ে আসে; তা ছিল নারোদনিয়া ভোলিয়ার জন্য বিজয়, তবে এর পরে করার কোনও কর্মসূচি ছিল না গোষ্ঠীটির। জারের দমনে তারা ছোটখাট কিছু করতে থাকল। বিপ্লবী আন্দোলনে নতুন কোনও উদ্যোগ থাকল না। এই সময় দেশে কর্মকাণ্ড স্তিমিত হওয়ায় বিদেশের মাটিতে অভিবাসনকারীদের সাহিত্যিক প্রয়াস জোরদার হলো এবং উল্টোভাবেও। ১৮৯৫ সালে উল্লেখযোগ্য একটি বাঁক আসে বিপ্লবী আন্দোলনে, তা এর দোদুল্যমান স্তর ছেড়ে আসে: প্লেখানভের মার্কসীয় ধারণা বেশি করে সমর্থন লাভ করতে থাকে; ১৮৮৫-এর বসন্তে ভি আই লেনিন সুইজারল্যান্ডে আসেন তার সঙ্গে দেখা করতে; এর পরের শতকে বিপ্লবী আন্দোলন পরিবর্তিত হবে।
৫.
দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সংস্কার, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সেন্সর তুলে নেওয়া, রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাকে লালন করেছে; এই শাসনামলটি গার্হস্থ্য ও বিদেশ নীতির জন্য সমর্থন পাবার জন্য জার্নাল ও সংবাদপত্রের উপরে নির্ভর করত। কিন্তু উদার জাতীয়তাবাদী ও র্যাডিকাল লেখকরা জারের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠনে সাহায্য করত, ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিপক্ষে, এবং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের বিপরীতে। কারণ অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, কৃষকরা এই বিরুদ্ধ ভাবাবেগকে মেনে চলত, তাই জার এসব প্রকাশনা ও সংগঠনকে বিপজ্জনক বলে মনে করত। ১৮৬০-এর দশক থেকে ১৮৮০-এর দশক পর্যন্ত, রুশ র্যাডিকালরা সমষ্টিগতভাবে পপুলিস্ট (নারোদনিকি) নামে পরিচিত ছিল, যারা জনগণ (নারোদ) হিসেবে দেখা কিষানদের উপরে ফোকাস করত।
পপুলিস্ট আন্দোলনের নেতারা সন্ত্রাসবাদের প্রবক্তাসহ লেখক, আদর্শবাদীদের নিয়ে গঠিত ছিল। ১৮৬০-এর দশকে নিকোলাই চেরনিশেভস্কি ঐ পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ র্যাডিকাল লেখক, মনে করতেন রাশিয়া পুঁজিবাদ ছাড়িয়ে যেতে পারে ও সরাসরি সমাজতন্ত্রে পৌঁছতে পারে। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান ?’ (১৮৬৩) উন্নত স্বভাবের এক ব্যক্তির ভূমিকামিকা বর্ণনা করে এক নতুন বিপ্লবী প্রজন্মকে পথ দেখায়। এর বাইরে র্যাডিকাল ছিলেন আগ্নেয় নৈরাজ্যবাদী মিখাইল বাকুনিন (১৮১৪-৭৬) ও তার সন্ত্রাসবাদী সহযোগী সের্গেই নেচায়েভ (১৮৪৭-৮২) প্রত্যক্ষ ক্রিয়ার উপরে জোর দেন। শান্ততর পিতর তাচেভ (১৮৪৪-৮৬) মার্ক্সবাদের প্রবক্তাদের বিরুদ্ধে যুক্তি দেন, পুজিবাদ পুরোপুরি বিকশিত হবার আগে এক কেন্দ্রীয় বিপ্লবীকে ক্ষমতা দখল করতে হবে। তার মতের বিপক্ষে তর্ক তুলে নীতিবাদী ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী পিতর লাভ্রব (১৮২৩-১৯০০) জনগণের উদ্দেশ্যে এক আহ্বান করেন যার অনুসারে ১৮৭৩ ও ১৮৭৪ সালে শত আদর্শবাদী তাদের পথ ছেড়ে গ্রামের দিকে যান জনগণের মধ্যে গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে; কিষানরা শহুরে আদর্শবাদীদের প্রতি বৈরিতা দেখালে পপুলিস্ট আন্দোলন ব্যর্থ হয় ও সরকার জাতীয়তাবাদী পথকে আরও সিরিয়াসলি বিবেচনা করলে; র্যাডিকালরা তাদের পথকে ঢেলে সাজায় এবং ১৮৭৬ সালে তারা প্রচারপন্থি একটি সংগঠন দাঁড় করায় ল্যান্ড অ্যান্ড লিবার্টি নামে, যেটি সন্ত্রাসবাদের দিকে ঝুঁকে থাকে। এই প্রবণতা তিন বছর পরে আরও তীব্র হয় এর নামকরণ করা হয় পিপলস উইল নামে। এরই অধীনে র্যাডিকালরা দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে হত্যা করে। ১৮৭৯ সালে জর্জি প্লেখানভ প্রচারপন্থি ল্যান্ড অ্যান্ড লিভিং-এর এক শাখা খোলে ব্লাক রিপার্টিশন নামে যারা সমস্ত জমি কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করার দাবি তোলে। এরা মার্ক্সবাদ অধ্যয়ন করত; শহুরে শিল্প শ্রমিকদের নিয়ে তারা আগ্রহী ছিল; ‘পিপলস উইল’ অজ্ঞাতবাসে থেকে যায়।
৬.
জানা যায় গোগোলের ‘মৃত আত্মা’র প্রথম খণ্ড প্রকাশের পরে দ্বিতীয় খণ্ড রচনা চলতে থাকে; ১৮৪৫ সালে সেটি আগুনে পোড়ানোর আগের বছর বেলিনস্কি ও অন্যান্য অনুরাগীদের হাতে আসে ‘বন্ধুদের কাছে লেখা চিঠিপত্রের নির্বাচিত অংশ’, এই বইকে উপলক্ষ করেই তা রচিত হয়েছিল। এই চিঠিতে গোগোলকে যেভাবে গোঁড়ামি ও অপশাসনের প্রধান বৈরী মনে করা হয়, তার সম্পূর্ণ বিপরীত চেহারায় পাওয়া গেল; এর বক্তব্য: প্রভুর আদেশ পালন করাই মানুষের পবিত্রতম কর্তব্য, দরিদ্রদের বিনয়ই ভূমিকাষণ, অর্থডক্স চার্চই সঠিক পথ দেখাচ্ছে, প্রাচীন রাশিয়ার মহাশক্তির উৎস তার আধ্যাত্মিক সাধনাতেই নিহিত, সেই নিষ্ঠাকেই যে কোনওভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে। এমনকি ভূমিকামিদাসপ্রথা ও মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেও যুক্তি দেওয়া হয়েছে। বেলিনস্কিরা গোগোলের আধ্যাত্মিক সংকটের কথা না জেনেই প্রতিক্রিয়া দেখালে গোগোলও বিস্মিত হন; তার উত্তরে গোগোল চিঠি লিখলে এই খোলা চিঠি প্রকাশিত হয়। প্রকাশ মাত্রই এটিকে নিষিদ্ধ করা হয়; এর কয়েক মাস পরে বেলিনস্কি মারা যন। নিষিদ্ধ হলেও এই চিঠি গোপনে কপি হয়ে শিক্ষিত মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছায়। সেভাবেই আলোচনা চক্রে গিয়ে পড়ে। পেত্রাশেভস্কি চক্র ঐ স্ফুলিঙ্গের একটা উদাহরণ হয়ে থাকে।
বাস্তবে পেত্রাশেভস্কি চক্রের চিন্তা ভাবনাতে সংস্কারের পরিচয় স্পষ্ট, তারা কিন্তু সংস্কার চায়নি; উদ্দেশ্য ছিল এই শাসনকে উৎখাত করা, বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠিত করা। দস্তইয়েফস্কির এ রাইটার্স ডায়েরি ও অন্যখানে দেখান স্পেশনেভ স্বভাবে ও অভিপ্রায়ে একজন প্রকৃত বিপ্লবী এজিটেটর, তিনি অন্তত বাকুনিনের মতো ষড়যন্ত্রে সিরিয়াসভাবে বিশ্বাস করতেন, ও সেসব আলোচনায় বাস্তব উদ্দেশ্য নিয়ে যোগ দিতেন। স্ত্রাভোগিন হিসেবে দা পজেসড-এ তার প্রতিকৃতি এই দিকে জোর দেয়। দুরভ ও গ্রিগরিয়েভ ও আরও দু একজন বিশ্বাস করতেন যে কোনও সময়ে বিপ্লবের সূত্রপাত হতে পারে; অথচ একটা গণ আন্দোলন সংগঠিত করার অসম্ভাব্যতা উপলব্ধি করে এই মুহূর্তে প্রশিক্ষিত বিপ্লবীদের একটা ছোট দলের উপরে বিশ্বাস রাখে, এক পেশাদার এলিট যারা উপযুক্ত সময়ে কার্যকর ও নির্দয়ভাবে কাজ করতে পারে ও নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিতে পারে। যখন শোষিত সেনাবাহিনী রুশ জনগণ ও তাদের মুক্তির মাঝে দাঁড়ানো সভাসদ ও আমলাতন্ত্রের সৈন্যদেরকে রুখে দাঁড়াবে। রাশিয়ায় বিপ্লবী পরিস্থিতি নেই বলে এসব কথার ভিত্তি নেই। দস্তইয়েফস্কি যেভাবে অবজ্ঞার ধরনে সহষড়যন্ত্রীদের উল্লেখ করেছেন তার নিজেকে এসব থেকে মুক্ত করার জন্যই; এই চক্র তাদেরকে আকর্ষণ করার কারণ ছিল এর পরিবেশ তীব্র ও তীক্ষè, হাসিখুশি আড্ডার নয়, সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক গুজবের, সক্রিয় বৌদ্ধিক তর্কের। পেত্রাশেভস্কি নিজে আন্তরিক ছিলেন, তার গোষ্ঠী ও সহগামী বৃত্তও, যেমন একটিতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হিসেবে চেরনিশেভস্কি যুক্ত ছিলেন।
৭.
লেনিনের কী করতে হবে বইটির শিরোনাম লেখক, সমালোচক চেরনিশেভস্কির উপন্যাসের নাম থেকে নেওয়া। শেষেরটি উনিশ শতকের রাশিয়ার বুদ্ধিজীবীদের দিশেহারা অবস্থার পরিচয় বহন করছে। এবং উপরে দেখানো নিহিলিজমের এই বিশেষ প্রকৃতি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সমাজতন্ত্রকে প্রভাবিত করার পর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে সংক্রমণ করতে পারে। রুশ দেশে ১৮৮০ এর দশকে তা দেখা যায়। আলবেয়ার কাম্যুর কথায়, ‘নেচায়েভ ও মার্ক্সের মিলিত ঐতিহ্য বিংশ শতাব্দীতে সর্বগ্রাসী বিপ্লবের জন্ম দেবে।…ক্ষমতা দখলের ভাবনাটি লেনিন সত্যিসত্যিই সহযোদ্ধা ও তাত্ত্বিক সহোদর তাচেভের নিকট থেকে ধার করেন’। এই শতকটি তাই আগামীর পথচলার জন্য বীজতলা হয়ে ওঠে, সাহিত্য ও রাজনীতি উভয়েরই।
তথ্যসূত্র:
অরুণ সোম, রুশ সাহিত্যের ইতিহাস, ২০০৫
ইসাইয়াহ বার্লিন, রাশিয়ান থিংকার্স, ১৯৫১
দিলীপ ঘোষ সম্পাদিত, সমারূঢ় ব্যতিক্রম দস্তইয়েফস্কি চর্চা, ২০০৪
যজ্ঞেশ্বর রায়, লেখকের লেখক দস্তয়েফস্কি, ২০০৭
লেখক : প্রাবন্ধিক
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



