
সেসব কবেকার কথা। কথা পুরোনো যত হয় তা তত বেশি ধারালো হয় দিনের আলোর মতো।
নাপিত মনু ভাবছিল বসে।
সেই কবে এই বাজার বসিয়ে ছিলেন গোলাম হাজী। আজ তিনি বেঁচে নেই। মনুর বয়সই বা তখন কত হবে ? দশ কি বারো। বাবার কাছে বসে চুল কাটার পাঠ। কবরী বালা পাঠশালাতে পড়তে যাওয়া। বাবার কাজে হাত লাগানো। একদিন হঠাৎ ওদের বাড়িতে গোলাম হাজী এসে হাজির। খরির পাড়ে নতুন বাজার হবে। তাই একজন নাপিতের দোকানও থাকবে। হাজী সাহেব বসালেন বাজার। নৌকা পারাপারের মানুষজনও ভিড় করতে লাগল। বেচা কেনা ধীরে ধীরে জমে উঠল। বেশ দিন চলে যাচ্ছিল। এক সময় ওর বাবাও চলে গেল। মনু বে থা করে। দুটো বাল বাচ্চা। তাদের বে থা দিয়ে দেয়। কিন্তু সময় বদলায়। তার কাজ কাম আর তেমন হয় না। এখন বড় বড় চুল কাটার দোকান নগরে। সেখানে সব চলে যায়। মেয়েদের বিউটি পার্লার। এখন মনু হা করে বসে থাকে। তার বয়স যেন বেড়ে গেছে। খরির ঘাটের এক সময় কী রমরমা। তারও বহু বহু যুগ আগে আসত মহাজনী নৌকা। বজরা। চারপাশে মানুষের ভিড়। বিরাট জনপদ। মানুষের মুখে মুখে কত পুরোনো দিনের গল্প। এই ঘাটেই নাকি চাঁদ সওদাগরের বজরা এসে থেমে ছিল। আর তখন থেকেই নাকি চাঁদ সওদাগরের নামে এই ঘাট।
মনু নাপিত এসব গালগল্প শুনে আসছে। কত কী-ই সে দেখে আসছে। নদীর জলের মতোই সব আবার ভেসেও যায়। ওই যে মালার চায়ের দোকান। সবজির আড়ত। ফলের দোকান। সবার একটা করে গল্প চালু আছে এ বাজারে। সে কেচ্ছা শুনতে শুনতে মনুর কান পচে গেছে। মালা নাকি এক ফুলওয়ালার সঙ্গে থাকে। আরে বাবা যার যাকে ভালো লাগে তাতে লোকের কি ?
এসব আর মনুর ভালো লাগে না। মালা অবশ্য এসব গায়ে মাখে না। তার গা গতর পচে না মানুষের কথাতে। বেশি কিছু বললে ও বলে, ‘ওরে আমার নেকু, মুখে গরম চা ঢেলি দোব। আয় আমার সমনি। শালা শুয়ার।’
মনু মনে মনে বলে, ‘তার হাতের চা ভালো লাগে আর তার চলন ভালো না ? যত্ত সব ঢেমনা।’
মালা যাই হোক না কেন কিন্তু ওর মন ভালো। মনু একবার ছেলের অসুখে পয়সা জোগাড় করতে পারছিল না। মালা সে কথা শোনার পর ছুটে আসে কাছে, ‘মনুদা, আমি খারাপ লয় গো! এটুকু লিলে আমি খুশি হই।’
মনুর হাতে টাকা গুঁজে দেয়। মনুর চোখে জল চলে এসেছিল। সেবার ছেলেটি সেরে ওঠে। মালা বারবার খোঁজ নিয়েছে। কালু ঘোষের কাছ থেকে বোতল ভরে ছেলের জন্য দুধ পাঠাত। মনু পয়সা দিতে গেলে বলত, ‘ওর আমি ফুপু না!’
মনু আর কিছু বলতে পারত না। সময় চলে যায় কিন্তু কথা থেকে যায়। এ বাজারের আর তেমন রমরমা নেই। মরে আসছে এই নদীর মতোই। বালুর রাশি চারপাশে। ঢেকে ফেলছে সব। খরাতে মানুষ হেঁটে পারাপার করে। মনু দোকানে বসে এসব দেখে। কাজ তেমন না থাকায় ওর মন ভালো থাকে না। মালার চায়ের দোকান বেশ চলে। আজকাল ওর কাছে দুলাল ঘুর ঘুর করছে। দুলাল পকেটমার। ওকে পকেটমারা দুলাল নামেই চেনে মানুষজন। ওকে এ বাজারের কেউ পছন্দ করে না। মাঝে মধ্যে কোথায় যেন ও হারিয়ে যায়। আবার বহুদিন পর আবার ফিরে আসে। মালার কাছে সে ঠিক কোন মতলবে আসছে। মনু কি একবার ওকে সাবধান করবে ? অবশ্য মালা অমন মরদকে তোয়াক্কা করে না। দেবে একটা কানের নিচে। ও এ মুখো আর হবে না। দুলালের ফষ্টিনষ্টি বের করে দেবে। শালা মদখোর!
থু করে মনু থুতু ফেলল রাস্তায়। এমন সময় মালা ওকে এক পেয়ালি চা পাঠায় কাজের ছেলেটার হাত দিয়ে। চা-টা আসতেই ও বেশ একটু সুখ অনুভব করে। মালা ওর জন্য কত ভাবে। মেয়েটি সত্যি খাঁটি। কিন্তু আজ অবধি কেন যে বে থা করল না! খুব আফসোস লাগে মনুর। মেয়েটি সংসারের হাল ধরতে গিয়ে আর তেমন করে নিজেকে নিয়ে ভাবল না। এ এক অন্য জীবন! এখানে কত কিসিমের মানুষ দেখল মনু তার জীবনে। এই বাজারের কত মানুষের গল্প ও জানে। ওই যে ওই পাশে কেলু মদনের আলুর দোকান। সে সারাদিন বাজারে পড়ে থাকে। তারও একটা গল্প আছে। ওর বউ ওকে শান্তিতে রাখে না। অন্য জনের সঙ্গে তার বাস। ভাতারের খায় আর নাঙের গীত গায়। কথায় কথায় একদিন জেনেছিল মনু।
ও চায়ে মন দেয়। বেশ গরম চা-টা। একটু আয়েশ করে চায়ে চুমুক দেয়। আজ তার তেমন কাজ হয়নি। সংসারের অভাবটা ও দু হাত দিয়ে সরিয়ে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু ও পেরে ওঠে না। কাজের বাজার আর তেমন হয় না। পুজো পার্বণ এ দুটো পয়সার মুখ দেখে। অন্য সময় বসে থাকতে হয় মনুকে। একবার ভাবে বাইরে কোথাও চলে যাবে। কাজ কাম করবে। কিন্তু বাড়িতে ওকে ওর বউ বাধা দেয়। মনু আর যেতে পারে না। কিন্তু বাইরে গেলেও যে কাজ কাম পাবে তারও কোনও আশা নেই।
নানা ভাবনা ওকে কুরে কুরে খায়।
ও চা শেষ করে।
২.
‘মালা, তু কি মনে করিস, আমি কিছু জানি না ? তুর ফষ্টিনষ্টি বের করি দিবু।’
দুলাল বলে কথাটা।
মালা চা করছিল। গরম হয়ে উঠেছে জল। কেবল চা পাতা দিচ্ছে। এমন সময় দুলালের কথাটা শুনে ও রেগে ওঠে।
‘এই ঢেমনা, তু নিজেকে কি মনে করিসরে ? দেব গরম চা ঢেলি। যা এখান থেকি। শালা পকেটমার। ঢেমনা গিরি! শালা শুয়ার।’
মালা গরম চা মগে তুলে ওকে তেড়ে যায়। দুলাল বাজারের ভেতর দিয়ে জান নিয়ে কেটে পড়ে। মালা রাগে গিসগিস করে। আজ ওর খবর করে ছাড়বে ও। মালা কাজে মন বসাতে পারে না। এই সকাল টাইমে অনেক খদ্দের হয়। বেশ বেচাকেনা হয়। আজ দিল দিনটা নষ্ট করে। মালা কাজে মন বসাবার চেষ্টা করে। মনু দোকানে বসে না থেকে মালার কাছে আসে।
‘দুলাল, কী বলছিল ?’
‘ও আমার পিছু লেগেছি। ওকে আমি ছাড়বনি।’
‘বাজার কমিটিকে বলো মালা। ওরা এর বিচার করে দেবে।’
‘আমিই ঠিক করি দেব দাদা। ওর কত বড় কলজি আছে তা দেখি ছাড়ব।’
‘ওরা ভালো না মালা। কখন কী করে বসে! দুলালরা সব পারে।’
‘আমার কিচ্ছু পারবিনি গো মনু দাদা।’
‘সাবধানে থেকো।’
এসব কথার কোনও আমল দেয় না মালা। এ বাজারের কত রূপ সে এতদিন দেখে আসছে। ও আর ভয় পায় না কাউকে। বরং মালাকে অনেকে ভয় পায়। ওকে আর তেমন কেউ বিরক্ত করে না। দুলালটার কপালে খারাপি আছে এবার। ও মালার সঙ্গে লেগেছে। ও ওকে ছাড়বে না। বাজার ছাড়া করবে।
মনু এক পেয়ালি চা খেয়ে চলে আসে দোকানে। আজ সকালে দুটো ছেলে চুল কাটতে এসেছে। মনু একটা বিড়ি ধরিয়ে সুখ টান দিয়ে চুল কাটায় মন দেয়। সকালটা আজ তার কাছে খুব সুন্দর হয়ে ওঠে।
৩.
‘মালা, আমি ভুল করিছি। কিচ্ছু মনি করিসনে। মাঝে মাঝে ভেতরের খারাপ লোকটা বেরিয়ে পড়ে। তখন যা তা করি বসি। শালা আমি একটো বাজে লোক। সেদিন তুকে কি সব বলি বসলাম! ছিঃ! মালা, দে একটো চা দেনি।’
মালা ওর কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। দুলাল না অন্য কেউ। মালা ওকে ভালো করে পরখ করে। না সে সত্যি লজ্জিত। মালা যত্ন করে চা দেয়। কিছু বলে না। দুলাল আগে খারাপ মানুষ ছিল না। ও খুব ভালো ছিল। ওর মাকে পয়সার অভাবে নাকি চিকিৎসা করতে পারেনি। তারপর থেকে ও বদলে গেল। ওকে সমাজ আর নিল না।
‘চা নাও দুলাল।’
দুলাল হাত বাড়িয়ে চা নেয়। মালার দিকে তাকিয়ে থাকে। মালা ওকে আর কিছু বলে না।
‘মালা, আপন বলে আমার কেউ নেই। সংসার আর হলনি। তেমন করে আর ভাবি না। চলে গেল অনেকটা সময়! কী আর হবি!’
দুলালের চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। কথা বলতে পারে না। চা জুড়িয়ে যায়। মালা ওকে কী বলবে খুঁজে পায় না।
‘মালা, আর দেখা হবিনি। আজ চলে যাচ্ছি। কিছু মনে রাখিসনি। এবার সংসার পাত। এই বাজার থাকবি। শুধু আমি―!’
দুলাল নদীর পথ ধরে। রোদে মানুষটা মিশে যাচ্ছে একটু একটু করে।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



