আর্কাইভগল্প

গল্প : ঈদের সাদাগোল্লা : আইয়ুব মুহাম্মদ খান

দিশা ও উষা, তারা দুই বোন। দিশা বড়, উষা ছোট। তাদের ভাই নেই। দিশার বিয়ে হয়েছে। বরের সঙ্গে কানাডা বাস করে। উষা এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। দিশার বাচ্চা হবে। এটিই তার প্রথম বাচ্চা হওয়া। নয় মাস শেষ হয়েছে। দশ মাসে পড়েছে। যে কোনও সময় নবজাতক পৃথিবী আলো করবে।

এই সময়ে দিশা একান্ত আপনজনকে কাছে পেতে চায়। তার একান্ত আপন বলতে আব্বু-আম্মু ও একমাত্র ছোটবোন উষা। আব্বু-আম্মু ও ছোট বোনটিকে খুব করে কাছে ডাকছে সে। তার শ্বশুর-শাশুড়ি বেঁচে নেই। বরও চাচ্ছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে তার পরিবারের তিনজন মানুষ কাছে থাকুক। বর শাশুড়িকে একাধিকবার ফোন দিয়েছে। উষাকেও নিয়ে যেতে বলেছে। উষা যেতে রাজি হয়নি। তার পড়ার ভীষণ ক্ষতি হবে―এই বলে যুক্তি দিয়েছে সে। তার যুক্তি ঠিক আছে। তাই তাকে রেখেই আব্বু-আম্মু কানাডাতে বড় মেয়ের কাছে চলে গিয়েছেন।

উষাদের যৌথ পরিবার। বাড়িতে দাদি, বড় ফুফু, ফুফাতো ভাই ও ফুফাতো বোন থাকে। তাদের কাছেই সে রয়েছে। বড় ফুফুর স্বামী বিদেশ থাকেন। ফুফাতো ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সে অসুস্থ। ডাক্তার দুই বছর পড়াশোনা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। বড় ফুফু ছেলে-মেয়ে নিয়ে সারা বছর বাবার বাড়িতেই থাকেন। ভাইয়ের ব্যবসায় তার স্বামীর বহু টাকা ইনভেস্ট করা রয়েছে। উষার আব্বু-আম্মু পরিবারের লোকজন নিয়ে একত্রে থাকতে পছন্দ করেন। পরিবারে তাদের শান্তির অভাব নেই। মিলেমিশে ভালো আছে সবাই। উষার আব্বু বলেন―

‘পরিবারের সবাই যেখানে, ধর্ম ও শান্তি সেখানে।’

কথাটি তিনি সচরাচর বলে থাকেন। যৌথ পরিবারকে তিনি খুব গুরুত্ব দেন। তার দুটি ভাই আছে। তারা পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থাকেন। তারা কেউ আলাদা হননি। পরিবারের সঙ্গে তাদের গভীর বন্ধন রয়েছে। যে যেখানেই থাকুক, সকলে  দিশার খবরাখবর রাখছে।

তিন সপ্তাহ আগে দিশার ফুটফুটে ছেলে বাবু হয়েছে। মোবাইলে পরিবারের নতুন অতিথি নিয়ে হইহই রইরই ব্যাপার চলছে। পুরো পরিবারে আনন্দের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। দেড় মাস হলো আব্বু-আম্মু কানাডা রয়েছেন। আগামী সাতদিন পর কুরবানির ঈদ। উষার ভেতরটা আব্বু-আম্মুর জন্য ছটফট করার কথা। তা একদমই করছে না। মন ছটফট করছে মামাতো ভাই রাফির জন্য। রাফি ভাইয়ার সঙ্গে কখন দেখা হবে। দুজন একত্রে সময় কাটাবে। এই বয়সে এটা মানায় না। কলিকাল বলে কথা। আবার প্রযুক্তির জমানার ছেলে-মেয়ে এরা!

রাফি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ইতিহাসের ছাত্র সে। দেখতে ভালো। ফুরফুরেও কম নয়। উষাকে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। এটা সে তার শরীর ছুঁয়ে বলেছে। সেও তাকে কথা দিয়েছে। তারা একে অপরকে খুব পছন্দ করে। ছেলেটি সিগারেট টানে। সিগারেট মুখে দিয়ে গোল গোল ধোঁয়া ছাড়ে। মুখের ভেতরে গুড়গুড় করে ধোঁয়া ছাড়ে। এইসব দৃশ্য উষাকে তার কাছে টানে। মনে রেখা এঁকে দেয়। হৃদয়ে গভীর ভালোবাসার বাসনা জাগায়।

মা কানাডা যাওয়ার সময় কঠিন প্রমিজ করিয়েছে তাকে। রাফির সঙ্গে সে দেখা করতে পারবে না। কথা বলতে পারবে না। মাকে সে মুখে মুখে কথা দিয়েছে কিন্তু মনের ভেতরে বলেছে কথা দিলাম না! কথা দিলাম না! এখন সময় পেলেই মোবাইলে কথা বলে। দাদি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে―তুই সারাদিন মোবাইলে কী কথা বলিস রে, উষা ?

দাদিকে সে জানায়, আব্বু-আম্মু ফোন দেয়। তার ভালো লাগছে না। কতদিন আব্বু-আম্মুকে দেখে না সে। মিথ্যা বলতে উষা বড় ওস্তাদ। কথাটি তার মা তাকে বলেছে। সেই ওস্তাদি এবার দাদিকে দেখাল। তার কথা দাদি বিশ্বাস করেছে। এটাই ভাবলো সে।

তার দাদি যৌবনের উষালগ্নেই চারটি প্রেম করা বালিকা! বিএ পাশের পর তার বিয়ে হয়েছে। ততদিনে প্রেমের সংখ্যা গণনায় উনিশটি। একই সময়ে চারটি ছেলেকে ভালোবেসেছেন তিনি। বড় কথা হলো সবকটি প্রেমেই ছক্কা মেরেছেন দাদি! কুড়িপ্রেম পূর্ণ হওয়ার আগেই বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করতে হয়। বিয়ের পর ছয়মাস স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মারামারি কাটাকাটি কম হয়েছে―এটা বলা যাবে না। হঠাৎ করে প্রথম বেবি কনসিভ হয়। এরপর উষার বড় ফুফুর জন্ম হয়। বড় ফুফুর জন্মই দুজনকে এক করে দেয়।

দাদা-দাদির সংসারের খবর উষা জানে না। জানবেই বা কী করে ? দাদি হাসি তামাশা করেও কখনও কাউকে তার জীবনের একান্ত কথা বলেনি। এমনকি তার মাকেও বলেনি। এখনও কাউকে বলে না। দাদি ঘটের জলে ধোয়া তুলসীপাতাই রয়ে গেছে! এখন অবশ্য জীবনের কথাগুলো মাঝেমধ্যেই তার মন ধরে ঝাঁকাঝাঁকি শুরু করে দেয়। তখন ভেতরে ঢাকঢাক গুড়গুড় করতে থাকে। দাদি ব্যালকনিতে চেয়ার পেতে বসে দুলছে, আর পেছনের জীবনের কথা ভাবছে। উষা কাছে গিয়ে বলে, দাদি আব্বু-আম্মু কবে আসবেন ?

তুই একটু আগে কথা বললি। তোকে বলেনি ?

আমতা আমতা করে বলে, কই তেমন কিছু তো বলল না।

দাদি ভেতরে ভেতরে হাসে। বলে―এজন্যই মনটা তোর খারাপ বুঝি ?

হ্যাঁ দাদি। বলো, আব্বু-আম্মুকে ছাড়া ঈদ করা যায় ?

না, না। আহারে কষ্ট তোর! দাদি মনে মনে বলে, এখনকার তরুণ-তরুণীরা কী যে পাষাণ হৃদয়ের! কী যে হারামি! তবু তাকে বলে, আব্বু-আম্মু ছাড়া একদম ভালো লাগছে না তোর, তাই না রে উষা ?

হ্যাঁ দাদি, ঠিক বলছো।

উষা মিথ্যা বলছে এটা সে জানে কিন্তু দাদিও যে মিথ্যা বলছে এটা উষা জানে না। সে আবার বলে―দাদি, আব্বু-আম্মু ছাড়া ঈদ কীভাবে কাটবে ? একদম বাজে লাগবে, তাই না ?

তুই আব্বু-আম্মু ছাড়া ঈদ করবি কেন ? দেখিস ওরা অবশ্যই আসবে। ওর আব্বু-আম্মু আসবে না―দাদি তা আগেই জানেন। মা উষাকে বিশ্বাস করে না। মেয়ে অতিরিক্ত চঞ্চল এবং অকালপক্ক। খুব মিথ্যা বলে। মুখ দিয়ে রাতকে দিন বানাতে পারে। দিনকে রাত বানাতে পারে। এজন্য মেয়েকে সে জানায়নি। তারা কানাডায় বড় মেয়ে দিশার বাসাতেই ঈদ করবে। করবে না, করতে হচ্ছে। নাতির ও মেয়ের শরীর ভালো না। তাদের যত্ন প্রয়োজন। এজন্য ঈদের পর এক মাস তাদের সেখানে থাকতে হবে।

কানাডা যাওয়ার আগে মা তার ছোট ভাইকে দায়িত্ব দিয়েছে উষাকে কলেজে আনা-নেওয়ার জন্য। প্রতিদিন ছোট মামা কলেজে নিয়ে যায়। ক্লাস-প্রাইভেট শেষ হলে বাড়ি দিয়ে যায়। বাড়িতে আসার পর দাদি-ফুফু-ফুফাতো বোন সবাই তাকে ঘিরে থাকে। এত চাপাচাপির মধ্যে সে বাস করে। তারপরও কাউকে কিছু বলতে পারে না। 

মা একদিন মামাবাড়ির কুয়াচালার পুকুরঘাটে যায়। ঝোপঝাড়ে ভরা পুকুরের চারপাশ। সেখানে সাধারণত কোনও মানুষজন যায় না। সেখানেই রাফি উষাকে জড়িয়ে ধরে গল্প করছে। তাকে দেখেই দুজন চোখের পলকে কেটে পড়ে। তার চোখ কপালে ওঠে যায়! রাগ সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরে এ নিয়ে বহু কিছু হয়েছে। রাফিকে তিনি আগে থেকেই পছন্দ করেন না। রাফির মা অসভ্য। তার কোনও আদর্শ নেই। চরিত্রহীন মহিলা। ছেলেও মায়ের চরিত্র পেয়েছে। রাফির মামা একটি মেয়েকে খুন করেছিল! ওর মায়েরও নানা কাহিনি আছে। এই পরিবারের বহু ভেলকিবাজি সে জীবনে দেখেছে।

এই জাতের ছেলে তার মেয়ের জীবনে আসতে পারে না। তিনি আরও ভাবেন, এই ছেলে তার মেয়ের জীবন নষ্ট করবে। তিনি বেঁচে থাকতে তা হতে দেবেন না। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই আদর্শ থাকা প্রয়োজন। আদর্শ না থাকলে সে মানুষ হয় কী করে! তার ইচ্ছে, মেয়েকে অনার্সে পড়া অবস্থায় ভালো ব্যাংকার ছেলের কাছে বিয়ে দেবেন। নিজের বড় বোনের স্বামী সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা। বোনের পরিবারের লাইফ ডিসিপ্লিন দেখলে তার হিংসে হয়। তাদের ছেলেমেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বিসিএস ক্যাডার। নিজের সংসারে ঐ রকম ডিসিপ্লিন তিনি আনতে পারলেন না। তার বাচ্চাও সেইভাবে গড়তে পারলেন না। বহু চেষ্টা করেছেন। তবু পারেননি। এটা তার মনের দুঃখ। উষার বড় ফুফু এটা জানেন।

বড় ফুফু বলেন―উষার মায়ের আদর্শ মানুষকে মুগ্ধ করে। শুরু থেকেই তিনি এমন। তবে ওর আব্বু মুখে হাজারবার বলে বেড়ায়, সমাজে দরিদ্র মানুষগুলো শুধু আদর্শ ও সততা নিয়ে টানাটানি করে। অর্থবিত্তে ভরপুর হয়ে জিন্দেগি পার করাই প্রতিটি মানুষের লক্ষ্য হওয়া উচিত। নীতিকথা তার ভালো লাগে না। উষার মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে তিনি হাসতে হাসতে এসব বলেন। উষা আব্বুকে সমর্থন করে। আব্বুর এইসব কথাকে সে সিরিয়াসলি নিয়েছে। আব্বুর কথার ঢং মেয়ে বুঝতে পারে না। তবে পরিবারে তার আম্মু ছাড়া কেউ তাকে এটা বুঝাতে চেষ্টাও করেনি। মায়ের কথা সে মন থেকে গ্রহণ করে না। উষার নানা কথায় কথায় নীতি শেখায়, চরিত্র শেখায়। এজন্য সে নানার কাছে চাপে না বললেই চলে। নানা একদিন উষাকে জিজ্ঞেস করেছিল―তুই কী হতে চাস ? সে বলেছিল―তাকে বলবে না।

বড় ফুফু বলেন―উষার আব্বু চান মেয়ে ডাক্তার হবে। বিসিএস দিয়ে চাকরি নেবে। তখন বিসিএস ডাক্তার দেখে বিয়ে দেবে। মেয়ে ছাত্রী ভালো। মিষ্টি চেহারা। টাকা-পয়সাও আল্লাহ কম দেননি। মেয়ের জন্য এটুকু প্রত্যাশা করাই যায়।

উষার কলেজ শনিবার বন্ধ থাকে। সারাদিন একটু পরপর ছাদে যায়। মোবাইলে কথা বলে। রাতে গরমের বাহানা ধরে ঘন ঘন ছাদে যায়। ফুফু অথবা ফুফাতো বোন তার পিছনে লেগে থাকে। ফুফু সঙ্গে থাকলে তার ভালো লাগে না কিন্তু মুখে কিছু বলতে সাহস পায় না। ভাবে, হয়তো আম্মুর কথায় আসে। এতে সে বিরক্তবোধ করে না। মনে মনে ডোন্ট ওরি ভাবে থাকে।

জোছনা রাত। আকাশে চকচকে সোনার থালার মতো চাঁদ উঠেছে। দক্ষিণ দিক থেকে পাতলা পাতলা বাতাস বইছে। উষা ও তার ফুফাতো বোন ছাদে পায়চারি করছে। রাত তখন বারোটা পঁয়তাল্লিশ বাজে। উষা দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছে। ফুফাতো বোন হাঁটতে হাঁটতে ছাদের দক্ষিণ পাশে হাসনাহেনার ঘ্রাণ নিচ্ছে। হঠাৎ মানুষের মতো একটা কিছু উষার চোখে পড়ে। বড় বড় পাখির ডানা মেলে ছাদের উত্তর পাশে উড়ছে। ফুফাতো বোনকে ছাদ থেকে নিয়ে যাচ্ছে! উষা জোরে চিৎকার দিতে চায় কিন্তু পারে না। সে একটি পা-ও নাড়াতে পারছে না।

ভীষণ বিপদ তাদের! সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। হাত থেকে মোবাইল পড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর চেতনা ফিরে আসে। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় নামে। ফুফাতো বোন দাদির রুমে এসেছে। সে কোনও ব্যথা পায়নি। তাকে শুধু নিচে নামিয়ে দিয়েছে। সব জায়গায় মিষ্টি ঘ্রাণ। উষা প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। সে দাদিকে সব বলে। ফুফাতো বোন হাসছে… হি হি হি! কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কথা বলতে পারছে না। দাদি ফুফাতো বোনের চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। পানি ছিটানোর কিছুক্ষণ পর সে কথা বলে।

পরদিন সকালে বড় মসজিদের ইমাম সাহেবকে বাড়ি ডেকে আনে। হুজুর দোয়া পড়ে দুই বোনকে ফুৎকার দেন। পানি পড়া খাওয়ান। পড়া পানি বিল্ডিং-এর চারপাশে ছিটিয়ে দিতে বলেন। দাদি ইমাম সাহেবকে খুব মহব্বত করেন। তার স্বামীকে রক্ত দিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন এই ইমাম সাহেব। তাঁকে নিজের ভাইয়ের মতো আদর করেন। তিনি বলেন―ওদের দুই বোনকে আপনি দুটো তাবিজ পড়ে দেন, ইমাম সাহেব।

আমি একটি তাবিজ পড়ে দিব, আপা। ওটা বিল্ডিংয়ের এক জায়গায় রেখে দিলেই হবে। এর ত্রিসীমানায় কিছু আসতে পারবে না। সবাই নড়েচড়ে বসে। তারা সাহস ও ভরসা পায়। পুনির পোলা গুতুড় গুতুড় করছে। মুখে শব্দ করে―হেঁ রে, হেঁ রে! পুনির স্বামী পোলারে গালি দেয়―চুপ কর শুয়ার! এই শুয়ারটা সব জাগায় এক রকম করে।

হুজুর বলেন―এমন করে গালিগালাজ দিবেন না। পরিবেশ নষ্ট করে তুলছেন আপনি।

পুনি রাগে মুখটা কচুপোড়ার মতো করে! মুখে কিছু বলতে সাহস করে না।

উষা জিজ্ঞেস করে―হুজুর এটা ভূত নাকি পেতনি ?

ভূত-পেতনির ভালো ঘ্রাণ হয় না। এটা ভালো কিছু। কারও ক্ষতি করবে না। তোমাদের বিল্ডিংয়ে এখনও আমি ঘ্রাণ পাচ্ছি। তোমরা ঘ্রাণ পাচ্ছো না ?

হ্যাঁ হুজুর, আমরাও ঘ্রাণ পাচ্ছি।

হুজুর, উত্তর পাড়ার বুচাই সাধু নাকি আল্লার নগে কথা কয় ? পুনি জিজ্ঞেস করে।

তওবা করেন। তওবা করেন!

হুজুর, তুবা করুম ক্যা ?

আসতাগফিরুল্লাহ্! আসতাগফিরুল্লাহ্! এসব নোংরা মানুষের সঙ্গে আল্লাহ পাক কথা বলবেন! সবসময় জীর্ণ পোশাক পরে থাকে। অপরিষ্কার! এগুলো ইবলিসের আত্মীয়স্বজন! আল্লাহর আর খেয়ে কাজ নেই। এদের সঙ্গে কথা বলবেন। নামাজ নেই, রোজা নেই। এরা নরপিশাচ! রোজ হাশরে এদের কঠিন শাস্তি হবে। জাহান্নামে যাবে, এরা জাহান্নামে যাবে।

হুজুর উনি রাইত ভইরা নমাজ পড়ে। ফজরের আজানের পরে ঘুম আহে, মন্টুর মা বলে।

পিশাচের সঙ্গে আপনারাও পিশাচ হয়েছেন!

এইড্যা কী কন হুজুর ?

কেন কী বললাম ? আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা কি এত সহজ! কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব নয়।

উনি আসমান থনে নামছে!

তওবা! তওবা! এরা কি মানুষ! এরা কি আখেরি নবির উম্মত! আহারে মুসলিম উম্মা! আপা, এগুলো কি ? 

হঁ, উনি আসমান থনে নামছে! আমার ম্যায়াডারে এলাকার কোনও হুজুর-ফকির-ডাক্তর ভালো করবার পারল না। ঢাকার ডাক্তররা ফিরিয়্যা দিল। তারা কইলো, তিন মাস পরে মইর‌্যা যাইবোগা। যা খাইব্যার চায় খাওয়াওগা। কানতে কানতে ম্যায়া বাইত্তে নিয়্যা আইল্যাম। এক হপ্তা পরে গুতুম বয়াতির বউ আমারে বুচাই সাধুর টান নিয়্যা গেল। তার পায়ে পইড়্যা একব্যালা কানলাম!

এক সমায় বুচাই সাধু নিজেও কানবার নইলো। পরের সোমবার রাইতে তিনড্যার পরে হ্যায় মরিচ বাটা দিয়্যা এক মুট ভাত খাওয়াইলো আমার ম্যায়ারে। নগে নগে ম্যায়া ঘুম আইলো। পরের দিন হন্ধ্যার পর ঘুমে থনে জাগলো। এই যে ম্যায়া আমার ভালো হইলো, তাওতো সাত বছর চলল। আপনেগো রহমতে আমার ম্যায়াডা খুব ভালো আছে।

আল্লার রহমতে কইব্যার পারছ না, পুনি বলে ?

ঐ তো হইল।

বছিরুদ্দি মুনশি বলে―বুচাই সাধু কুফুরি করছে। তোমরা ব্যাক্কল। তোমরা এইগুলা বুঝবার পারবা না। তখন হুজুরকে একটু শান্ত দেখায়।

ধরলাম হ্যায় কুফুরি করল। তার জইন্যে আমার কী ক্ষতিড্যা হইছে, কন দেহি হুজুর ?

কেউ কিছু বলে না। দাদি বলে, জয়নবের মা চুপ কর। তুই এগুলো বুঝতে পারবি না। তুই এখন বাড়ি যা। পরশু দিন ঈদ। ঈদের দিন আসিস। হুজুর ঈদের নামাজ পড়ে সবার আগে আমাদের গরুটা কুরবানি দিবেন।

হ্যাঁ আপা। আপনাদেরটা আগে দিব। আপনাদের গরু তো কিনে জিতেছেন, আপা। সবাই বলছে আজকে ওটার দাম দুই লক্ষ টাকা। আপনারা তো কিনেছেন এক লক্ষ সত্তর হাজার দিয়ে।

হুজুর জেতা হয়েছে ?

হ্যাঁ, সবাই তাই তো বলাবলি করছে। হাটে নিলে দুই লক্ষ বিক্রি হতো।

মাশাল্লাহ, হুজুর।

আমি এখন যাই আপা। একটু বাজারে যেতে হবে।

ঠিক আছে হুজুর। উষা বলে―হুজুর, তাবিজ কালকেই দিবেন কিন্তু।

ঠিক আছে কালকেই দেবো।

একদিন পর কুরবানির ঈদ। আব্বু-আম্মু কানাডাতে ঈদ করবেন। উষা বিষয়টি জেনে গেছে। খুশিতে মুখখানি চক চক করছে। তরতাজা যুবতীর মুখ বলে কথা! তুমুল আনন্দের আশায় মনটা বানের জলের মতো টলমল করছে। নানারকম ফন্দিফিকির শুরু হয়েছে তার মস্তিষ্কে। রাফিকে ফোন দেয়। সে নির্জন জায়গায় যেতে বলে। বড় মাঠের আমতলা। জায়গাটি সুনসান। সেখানেই যাবে সে। ভাবে, সে কলেজে পড়ে। দেখতে বড়সড়। একা যাওয়া ভালো দেখায় না। কয়েকজন শাগরেদ জোগাড় করতে হবে।

এ সমাজে ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না। তেমনি গুড়ের গন্ধে পিঁপড়ার দল পিলপিল করে কাছে আসে। মাত্র একশত টাকা খরচ করে উষা। মাঝারি ও ছোট সাইজের ছয়টি বাচ্চাকে নিয়ে বড় মাঠের আমতলায় যায়। রাফিকে ফোন দেয়। ঠান্ডা মাথায় আধঘণ্টা শলাপরামর্শ করে। বাতাসে ফাঁদ পাতলো। তারপর বাড়ি এল। দাদি বলে―এত তাড়াতাড়ি এলি যে ?

অল্প একটু কাজ ছিল তো দাদি ?

কাদের বাড়ি গিয়েছিলি ?

কুসুমদের বাড়ি।

পুনির ছোট মেয়ে মুনি বলে―ডাডি ঐ বাড়ি যায় নাই। বাকি পাঁচজন বলে―গেছে দাদি।

দাদি আর কিছু বলে না। পুনির ছোট মেয়েকে মিথ্যা কথা শেখাতে ভুলে গিয়েছিল উষা। বাচ্চাটি দলে যোগ দিয়েছিল পরে।

পরদিন ভোর থেকেই ঈদ উৎসব শুরু হয়। এই উৎসবে দাদি কোনও কিছুর ঘাটতি রাখেননি। ঈদের দিন আব্বু-আম্মু কানাডা থেকে ফোন করে। উষা-দাদি-ফুফুসহ সবার সঙ্গে কথা বলে। আনন্দেই কেটে গেল প্রথম দিন।

ঈদের পরের দিনের কথা। সকাল নয়টা বাজে। সবেমাত্র দাদি ঘুম থেকে উঠেছেন। ফ্রেশ হয়েই নাতনির রুমে এসেছেন। উষা গোসল সেরেছে। সেজেগুজে জানালার পাশে বই পড়ছে। উষাকে আগে সকালে পড়তে দেখেছেন। কখনও আজকের মতো দেখেননি। গোসল করেছে। শ্যাম্পু করে চুল উড়িয়েছে। জমকালো সাজুগুজো করেছে। এজন্য দাদির ভেতরে ক্রিং করে ওঠে! দাদি মনে মনে বলে―এই সময় মনে এত স্ফূর্তি ওর! এর হেতু কী ? এই স্ফূর্তির উৎস কী হতে পারে এটা তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

ঘড়িতে তখন সকাল দশটা দশ বাজে। রাফি, রাফির বোন এবং বোনের জামাই হাসতে হাসতে উষাদের বিল্ডিংয়ে ঢোকে। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের চিপাগলি বাজার। এই বাজারের বাংলাদেশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। প্রসিদ্ধ মিষ্টিঘর। দাদি সাদা রসগোল্লার খুবই ভক্ত। সেখান থেকে রাফি দাদির জন্য বড় বড় দুই প্যাকেট সাদাগোল্লা নিয়ে এসেছে। সে সরাসরি প্যাকেট দুটো দাদির হাতে দেয়। দাদির কুশলাদি জিজ্ঞেস করে।

রাফি ও তার বড় বোন সব সময় ঈদের তিন-চার দিন পর এই ফুফুর বাড়িতে আসে। ওর বোন জামাইকেও নিয়ে আসে। তবে অবশ্যই তা ঈদের তিন-চার দিন পর। রাফি বোনকে দিয়েই চলে যায়। কারণ, ফুফু তাকে ভালো চোখে দেখে না। এবার ঈদের পরদিন। এটাই দাদির প্রশ্ন।

তিনি বুঝতে পারেন ঘটনা উষার সাত-সতেরো দিয়ে গড়া। ভাবেন, এখনকার ছেলে-মেয়েরা যা খুশি তাই করতে পারে। মোবাইল নামের যন্ত্রটা ওদের অপসুযোগ তৈরি করে দেয়। দাদিকে মেহমানের ফাঁদে ফেলে নিজের সিদ্ধি হাসিল করবে উষা!

কিন্তু দাদি কি তা হতে দেবেন! তিনি যে নাটকের কাহিনি পুরোটাই বুঝে ফেলেছেন। নিজেও একটি নাটক সাজিয়েছেন।

সবাই মিলে দীর্ঘ সময় গল্পগুজব ও আনন্দ করে। দাদি দুপুরে খেয়ে একটু ভাত ঘুম দিয়েছেন। এটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। এই ভাত ঘুম না দিলে অনেক রাত পর্যন্ত তার মাথাব্যথা থাকে। এ সময় বাড়ির ছোট-বড় সবাইকে চুপ মেরে থাকতে হয়। কথায় আছে―

‘সুযোগ পেলে সাধুও চোর হয়।’

দাদির নাতনি উষা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহারের দৃশ্য নাটকের প্রথম অংকেই রেখেছে। এখানে সে ইতিমধ্যে সফলও হয়েছে।

রাত এসেছে। সবাই খাবার দাবার শেষ করেছে। উষার রুম দোতলায়। রাফির শোবার রুম তিনতলায়। রাতভর কতগুলো কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। দাদির রুমের নিচ বরাবর ভাঙাচোরা টিনের ঘর। সেখানে ঘুমায় ময়নার শতবর্ষী বাবা সোনামিয়া। কুকুড় কুকুড় করে কাশে! ঈদে গরুর গোস্ত খেয়ে কাশি বেড়ে গেছে। সোনামিয়ার কুকুড় কুকুড় কাশি এবং কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ দাদির রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। দাদি সারারাত জেগে থাকেন। তিনতলার সিঁড়ির কাছে বসে থাকেন। রাফি উষার রুমে যাওয়ার বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পরপর দুটি রাত এমনই হয়।

তৃতীয় রাতে রাফি যেভাবেই হোক উষার রুমে যাবেই। উষাও যেতে বলেছে। কুকুরের ঘেউ ঘেউ ও সোনামিয়ার কুকুড় কুকুড় কাশি দাদিকে চোখ বন্ধ করতে দেয়নি। সিঁড়ির কাছেই সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করছে। বিকেলে চটপটি ও ফুচকা খেয়েছিল। পরিমাণটা বেশি ছিল। তাতে নাতনি কোনও ভেজাল করেছে কি না বুঝতে পারেনি। হঠাৎ পেটে গুড় গুড়, গুড়ুম গুড়ুম ডাক শুরু হয়! একটু পরেই পেটে প্রচণ্ড মোচড় দিয়ে ওঠে। তিনি থাকতেই পারলেন না। দৌড়ে বাথরুমে ঢুকলেন।

সাধারণভাবেই বাথরুমে দাদির ঘণ্টা দেড়েক সময় ব্যয় হয়। নাতনি বিষয়টি ভালোভাবেই জানে। এ নিয়ে বাড়িতে সবাই মাঝেমধ্যে হাসাহাসিও করে। তার জন্য স্পেশাল একটি বাথরুম করা আছে। বাথরুম থেকে তিনি ইচ্ছে করলেও বের হতে পারছেন না। তার কান উষার রুমের দিকেই রয়েছে। কিন্তু তিনি বাথরুমে যাওয়ামাত্র রাফি উষার রুমে ঢুকে পড়েছে।

ঘণ্টা দুয়েক পর দাদি বাথরুম থেকে বের হন। বেরিয়েই সিঁড়ির কাছে আসেন। তখন রাত সোয়া তিনটা বাজে। জুতায় ফটাং ফটাং শব্দ করে রাফিকে দোতলা থেকে তিনতলায় যেতে দেখেন তিনি। দ্রুত উষার রুমের সামনে যান। দরজা ধরে ধাক্কাতে থাকেন। উষা গভীর ঘুমে। এটা যে বর্ণচোরার ঘুম তিনি তা বোঝেন। দরজায় চটাপট পটাপট শব্দ হতে থাকে। এক পর্যায়ে চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খোলে নাতনি। ঘুমে কিছুই চোখে দেখতে পাচ্ছে না যেন! দাদি জিজ্ঞেস করে―তোর রুম থেকে রাফি বের হলো কেন ?

উষা হতবাক! রাফি কে ? হোয়াট! রাফি কে ?

রাফি কে মানে ?

ও বিকেলে বাড়ি গেছে। ওনার বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেছে। ঘটর-মটর আওয়াজ শুনে তিনতলা থেকে রাফির বড় বোন আসে। সেও দাদিকে বলে, সে বেলা তিনটায় বাড়ি গেছে। বন্ধুর বোনের বিয়ে। দাদি তখন ঘুমে ছিলেন। তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। উষা ঘুম ভাঙাতে না করেছে।

দাদি ভাবছেন, তিনি কি ভূত-পেতনি দেখলেন নাকি অন্য কিছু! না পিশাচ দেখলেন!

উষা চোখ বড় বড় করে দাদির দিকে তাকায় এবং বলে―তুমি এগুলো কী করছো! আব্বু-আম্মু আসুক। তোমার নামে বিচার দেব। বাক্যহীন হয়ে চুপসে পড়েন তিনি! কিছুই বলতে পারেন না। নিজের রুমে যান।

উষা মামাতো বোনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে―ভাইয়াকে আজানের সময় বাড়ি পাঠিয়ে দিও। দু বোন হাসতে থাকে। কিছুক্ষণ পর উষা দরজা দিয়ে শুয়ে পড়ে।

মসজিদে ফজরের আজান পড়ে। দাদি আর জেগে থাকতে পারেন না। বিছানায় গিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন। দাদি স্বপ্নে দেখছেন, উষার আব্বু-আম্মু বাড়ি এসেছে। ওর আব্বু তাকে বলছে-তোমার ছোট নাতনি বড় হয়েছে। ওকে এসব বলা ঠিক হয়নি, মা।

দুপুর বারোটা উনষাট। দাদির ঘুম ভাঙে। হাত-মুখ ধুয়ে সোফায় বসেন। মনটা প্রচণ্ড খারাপ! অস্থির লাগছে। মা-বাবা ও স্বামীকে মনে পড়ছে তার। নিজেকে শক্তিহীন ও সামর্থ্যহীন মনে হচ্ছে! এই চ্যাংড়া ছিনাল মেয়েটির কাছে হেরে গেলেন! কোনও কিছুই ভালো লাগছে না তার। দিনকে রাত মনে হচ্ছে! তার পরাজিত ও বেদনার্ত ভাবনায় বার বার মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের ইংরেজি শিক্ষকের সেই কথাটি ভেসে ওঠছে―ঞৎধরহ ঁঢ় ধ পযরষফ রহ ঃযব ধিু যব ংযড়ঁষফ মড়. ‘অসময়ে পাকিয়া গেলে বাঁশকে নোয়ানো যায় না, নোয়াইতে গেলে কটকট শব্দ করে!’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button