
কমলাপুর রেলস্টেশন রাত সাড়ে বারোটার দিকে যেন একটা ঘুমন্ত ষাঁড়ের মতো অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। কুলি হাঁকাহাঁকির সব শব্দ আছে তবে তেমন গর্জন নেই। মানুষের জুতার আওয়াজ নেই, কেবল ঝিমিয়ে পড়া চায়ের দোকানগুলো, সিগারেটের শেষ টান, আর দূরের ঘোষণা যেটা শুনলে মনে হয় ঘোষক নিজেই বুঝতে পারছেন না, তিনি কাকে বলছেন। রতন একটা ভাঙা বেঞ্চে বসে আছে। পাশে তার কালো ব্যাগটা রাখা, ব্যাগের হ্যান্ডেলে চটের ব্যাগ জড়ানো, যাতে কেউ তুলে না নেয়। সাদা শার্টের হাতা গুটানো, সিøম ঘড়ির কাচে ঘোলাটে আলোর প্রতিফলন। ঘড়ির স্ট্র্যাপ কিছুটা কালো হয়ে গেছে। কমলাপুর স্টেশনকে আর যাই হোক রাতে বিশ্বাস করা যায় না। বিভিন্ন রকম বিপদ রাতে ওত পেতে থাকে।
‘ট্রেন পাঁচটা ঘণ্টা দেরি করছে,’ লোকটা বলেছিল বুকিং কাউন্টারে, যেন এটা ঢাকার এক নিত্যদিনের জ্যাম আপডেট।
সে কিছু বলেনি, শুধু মুখ টিপে ঘড়ি দেখেছিল। এখন সময় রাত ১২টা ৪৩ মিনিট। তার ফোনের চার্জ ১৭%। ডেটা অফ। ভাবছিল ফোন করবে কিন্তু কাকে ফোন করবে ? যাকে ফোন দিলে কথার বদলে কেবল ‘আচ্ছা, আচ্ছা’ শোনা যায়, তাকে বারবার কল দিতে হয় না কিংবা ইচ্ছা থাকলে দেওয়া যায় না। প্ল্যাটফর্মে কেউ নেই বললেই চলে। দূরে এক দল কুলি গুটিয়ে বসেছে, কেউ খালি বোতলে পা দিয়ে বাজনা বাজাচ্ছে। কাছের দোকানের কাচের কাউন্টারে শাড়ি পরা একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে, খদ্দের নেই বলে পান চিবোচ্ছে। ঝুলে থাকা টিউবলাইটগুলো মাঝেমধ্যে ফ্লিকার করে যেন স্টেশনের পুরোনো নিঃশব্দ কান্না। আবার কয়েকজন পয়সা দিয়ে মোবাইল ফোনে লুডু খেলছে। এই খেলাটা বাস স্টেশন কিংবা ট্রেন স্টেশনে ব্যাপক দেখা যায়।
রতন চোখ তুলে স্টেশনের খোলা ছাদের দিকে তাকায়। ঘাম শুকিয়ে গা চিটচিট করছে, তবু সে উঠে দাঁড়ায় না। সিগারেট ধরায়নি আজ সারাদিন, ব্যাগে থাকলেও ইচ্ছে হয়নি। খালি লাগছে, কিন্তু ফাঁকা নয়। এটা এক ধরনের ক্লান্তি আর আত্মগ্লানির মাঝামাঝি এক অনুভূতি, এ ধরনের অবস্থাকে নাম দেওয়া যায় না। হঠাৎ পাশে ধপ করে বসে পড়ে কেউ। হালকা ধাক্কা লাগে তার কনুইয়ে। সে চমকে তাকায়, বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে, গায়ে ঘামের গন্ধ, পরনে ময়লা শার্ট, চোখে কেমন যেন একটা বিষণ্ন জেদ। লোকটা তার দিকে তাকালো না, বসে পড়ে, যেন এটাই তার ঠিকানা। একটা ছোট ব্যাগ তার হাতের কাছে রাখা। সে পকেট থেকে বের করে একটা ছোট কাগজ, সেটার ওপর চোখ রেখে একা একা বিড়বিড় করে কিছু বলে ভাঁজ করে পকেটে রেখে দেয়।
রতন কিছু না বলে সরে বসে একটু। লোকটা হঠাৎ বলল, ‘ভাই, এই ট্রেন কি রাজশাহী যাইব ?’
গ্রাম্য সহজ সরল কথার টান, কিন্তু কণ্ঠে এক ধরনের কষ্টের আভাস আছে।
রতন একটু বিরক্ত স্বরে বলল, ‘এই ট্রেন তো সিরাজগঞ্জ যাবে। রাজশাহীর জন্য ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
লোকটা মাথা নাড়ে।
‘ভোর মানে অনেক দেরি।’
তারপর সে চুপ। শুধু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস। লোকটা যেন কোথায় তাকিয়ে আছে। দেখলে মনে হয় যেন একটা জগদ্দল পাথর বয়ে বেড়াচ্ছে। রতন কাঁধ উঁচু করে ফের বসে থাকে, একটা বই বের করে। যেখানে সে বসেছে তাতে যে আলো আছে বই পড়া যায়। তার পাশে থাকা এই লোকটা যার গায়ে ঘামের গন্ধ, হঠাৎ সেই বেঞ্চটাকে যেন আরামদায়ক মনে হচ্ছে না। কেমন যেন একটা গুমোট গন্ধ নিশুতি রাতের সাথে একাকার হয়ে গেছে, তবু তার উঠতে ইচ্ছে করছে না। লোকটা এবার আবার বলল, ‘আপনার ফোনে সময় কত দেখাইতেছে ?’
‘বারোটা সাতচল্লিশ।’
‘মনে হইতেছে ঘড়ি থেমে গেছে। অনেকক্ষণ ধইরা বসা, কিন্তু মিনিট বাড়ে না যেন, মাঝে মাঝে সময় আমার সাথে আড়ি লাগে।’
রতন একটু তাকাল এবার লোকটার দিকে। তার চেহারায় কোনও প্রথাগত দুঃখ নেই, শুধু একটা অদ্ভুত ধৈর্য―যেটা নিজের জন্য নয়, কারও অপেক্ষায় থাকা কোনও প্রিয় মানুষের জন্য।
‘আপনি কোথা থেকে আসছেন ?’
লোকটা রতনের দিকে তাকায় না, শুধু বলে―
‘মাদারীপুর।’
‘এত রাতে ঢাকায় কেন ?’
এবার লোকটা তাকায়। মুখে কোনও জবাব নেই। শুধু বলে,
‘ছেলেকে খুঁজতেছি। তিন বছর হইল।’
তাতে পালটা প্রশ্ন করা যায় না। কেউ যদি হঠাৎ রাত বারোটায়, রেলস্টেশনের ভাঙা বেঞ্চে বসে বলে তিন বছর হইল ছেলেকে খুঁজতেছি তখন কথা নয়, শুধু তাকিয়ে থাকা যায়।
‘ছেলে কোথায় হারাইছে ?’ রতন অবশেষে জিজ্ঞেস করল কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে।
‘ঢাকায়।’
‘কিন্তু এতদিন পর ? এখনও খুঁজছেন ?’
লোকটা মাথা নাড়ল। ‘এখনও। খুঁজতেছি না। খুঁজা ছাড়তে পারতেছি না, তিন বছর ধইরা খুঁঁজতাছি।’
রতন এবার ভালো করে তাকাল। লোকটার চোখে রক্তিম ছাপ। গালের হাড় দুটি চামড়ায় ঠেকা, তবু চোখের ভেতরে কিছু আছে, একটা ক্লান্ত রকমের সতর্কতা।
‘ছেলে কী করত ?’
‘গার্মেন্টসে কাজ করত। তারপর একটা স্টলে। তারপর কইছে, নতুন চাকরি পাইছে। তখনই হইল সব গায়েব।’
‘কোন স্টলে ?’
‘জানি না। ঠিকানা রাখি নাই। একদিন ফোনে বলছিল মিরপুরে একটা কাপড়ের দোকানে।’
রতন তখন লোকটার কাঁধে হাত রাখল। অন্ধকারের এই সীমানায় দাঁড়িয়ে একটা লোক যখন এইভাবে কথা বলে তখন তার শব্দে কোনও মিথ্যে থাকতে পারে না, থাকে এক ধরনের অপ্রত্যাশিত হেরে যাওয়া।
‘তিন বছর অনেক সময়,’ সে আস্তে বলল, ‘জানি,’ রহিম মিয়া চোখ সরিয়ে বলল। ‘তয় পোলাপান তো চাইলেই ফেরানো যায় না। অনেক সময় লজ্জায়ও ফেরে না।’
তার চোখ জ্বলজ্বল করছিল। কোনও শিশির বা অশ্রু নয়, একটা অব্যক্ত যুক্তি। রতন গা এলিয়ে দিল বেঞ্চে। এই রাতটা ছিল তার বিরক্তিকর ভ্রমণের শুরু। অথচ এখন এই বেঞ্চের পাশে কেউ বসে এমন কিছু বলছে, যা কোনও কর্পোরেট প্রেজেন্টেশনে আসে না। কিস্তু মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক গভীর, যে গভীরতা সব সময় পার্থিব জীবনে মানুষ খুঁজে পায় না।
‘আপনি কখন আসছেন ঢাকা ?’
‘প্রথমে পাঁচবার আসছিলাম। এক মাস থাইকা গেলাম একবার। পরে শুধু ছবি নিয়া ঘুরি। এখন বছরে একবার আসি। না খুঁজলে মনে হয়, ও যদি ফিরে আসে তাইলে তো আমারে খুঁইজা পাবে না।’
লোকটা পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা ছবি বের করল, ছবিটা অনেক ভাঁজ পড়ে ছিঁড়ে গেছে তবে পলিথিনে মোড়া যাতে বৃষ্টিতে না ভেজে। ছবিটা তুলে ধরল রতনের দিকে। ছবিতে এক তরুণ, সাধারণ চেহারা, ফ্যাকাসে হাসি, ঢোলা গেঞ্জি পরা। ঠিক এমনই হাজার তরুণ ঢাকায় থাকে, চলে যায়, হারিয়ে যায়। কেউ তাদের খবর রাখে না, এইটাই এই মহনগরী ঢাকার সৌন্দর্য।
‘নাম কী ?’ রতন জিজ্ঞেস করল।
‘মাসুম। কিন্তু আমি ডাকতাম মাসুমিয়া।’
তার গলায় হঠাৎ একটু বুজে আসা কান্না উঠল, যেন শব্দটা কোথা থেকে বের হলো ঠিক বোঝা গেল না। রতন ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তার মনে হচ্ছিল এই মাসুম তার চেনা কেউ না, কিন্তু কোনও কারণে তার বুকের ভেতর একটা দায় জন্ম নিচ্ছে। লোকটা ছবিটা আবার পকেটে ভাঁজ করে রেখে দিল। এই প্রাণহীন শহরে কত বাবারা বুকে দুঃখ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর মাসুম তো হারিয়ে গেছে। কত বাবা-মা চোখে জল নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেছে, তারপরেও সর্বদাই সন্তানের মঙ্গল কামনা করে।
তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি আপনার বাবারে ফোন দেন ?’
প্রশ্নটা এমন ভাবে এসেছিল সিগন্যাল বাতির মতো আচমকা লাল হয়ে উঠল চারপাশ। রতন কাঁধ শক্ত করে বসল।
‘বাবা মারা গেছেন অনেক আগে।’ রহিম মিয়া আবার বলল, ‘তয় বুজত পারছিলেন আপনারে ভালোবাসে ?’
রতন এবার চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
‘তা বলা মুশকিল। আমরা তেমন কথা বলতাম না।’
লোকটা চুপ করল। যেন সেই উত্তর তার আগেই জানা ছিল।
‘আমার পোলারে আমি একবার মারছিলাম,’ রহিম বলল। ‘ওর দোষ আছিল না। আমি অফিসে কামাই দেছিলাম, বেতন কম দিছিল, রাগে আইসা ওর পইড়া থাকা স্কুল ড্রেসে পানি ঢালছিলাম। ওইদিন ও কইছিল, বাবা, তুমি কি আমারে ভালোবাসো না ?’
সে থামল। আর বলল না কিছু। রতন চোখ তুলে তাকাল। স্টেশনের আলো এখন কেমন হলুদ। শব্দগুলো ছড়িয়ে পড়ছে, দূরে কেউ হাসছে, খুব অল্প হাসি তবু কানে লাগছে। ঘণ্টাখানেক আগে কাউন্টারের সামনে শাড়ি পরা মেয়েটা ছিল, সে হয়তো একটা খদ্দের পেয়ে পাঁচ নম¦র লাইনের পিছনের অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে। খদ্দের মানে ছেলেটিকে দেখে বিশ বাইশ বছরের যুবক মনে হলো।
‘আমি কি ধূমপান করতে পারি ?’ সে জিজ্ঞেস করল।
‘করেন। আপনার মতো মানুষরে তো কেহ নিষেধ করে না। আর আমিই বা কোন লাট সাহেব আপনেরে নিষেধ করুম।’
এবার রতন আস্তে করে হেসে ফেলল। বহুদিন পর একটা ঝরঝরে হাসি। সে জানত না, কেন তার এই লোকটার পাশে বসে থাকা এত সহজ লাগছে, এক রকম বলতে গেলে ভালোই লাগছে। সিগারেটটা ধরাতে গিয়েও আবার থেমে গেল রতন। পকেট থেকে লাইটার বের করল, হাত একবার কাঁপল, ভিজে নাকি ক্লান্ত, বোঝা গেল না।
‘আপনার ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা কবে হয়েছিল ?’
প্রশ্নটা হঠাৎ এল, তার নিজের কণ্ঠেই যেন।
“ঐ বছরই, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ। আমি ফোনে কইছিলাম, বাড়ি আইসা যা, তোর মা কাঁদে। ও কইছিল ‘বাবা, একটু সময় দেন। কিছু টাকা কামাইয়া কিছু একটা দাঁড় করাই, তারপর যামু।’”
‘কিছু একটা দাঁড় করাই ?’
‘হ, মানে কিছু করে নিজের পায়ে দাঁড়াইতে চাইছিল। কেউ হয়তো ওরে বলছিল, শহরে কিছু না কইরা ফিরলে কেউ আর পুতে রাখবে না।’
‘আপনি কি মনে করেন সে তখন কিছু একটা খুঁজছিল ?’
‘হ, মানুষ যত খালি হয়, ততই খোঁজে।’
সিগারেটটা জ্বালিয়ে টান দিল রতন, বেনসন লাইট। ধোঁয়া একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে ধীর ধীরে উপরে উঠে যেতে লাগল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি মনে করেন, সবাই নিজের বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে চায় ?’
‘না,’ রহিম বলল, চোখ নামিয়ে। ‘অনেকেই চায় না। ফিরলে তাদের নিজের অপূর্ণতাগুলা বাবার চোখ দেইখ্যা ফেলবে।’
এইবার রতন মাথা তুলে তাকাল লোকটার দিকে। তার ভেতরে কোথাও কিছু কেঁপে উঠেছিল।
‘আপনি এতটা নিশ্চিত কেমন করে হন ?’
‘আমিও তো একদিন ফিরি নাই,’ রহিম বলল, গলা নিচু করে। ‘আমার বাবা মারা গেছিল জানতাম, কিন্তু আমি সময়মতো যাইনি। কারণ আমি ভয়ে আছিলাম আমার ওই চেহারা বাবাকে আবার দেখাব।’
রতন এক মুহূর্তে কথা হারিয়ে ফেলল। তার মনে পড়ল, মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে সে যে বিমানে ফিরছিল, তখন সে ঠিক জানত না, বেশি ভয় করছে কি মাকে শেষবার দেখতে যাওয়ার ভয়, নাকি বাবাকে না দেখার অবচেতন স্বস্তি।
‘আপনি যদি এখন জানেন, আপনার ছেলে বেঁচে নেই, কী করবেন ?’
প্রশ্নটা এবার সোজা এসে আঘাত করল। রহিম চুপ। দীর্ঘ সময় পরে বলল, ‘তাহলে অন্তত জানতাম, সে কোনও অন্ধকারে ঠান্ডা হয়ে পড়ে নাই। কিন্তু যখন জানি না, তখন ভয় হয়―কোনও গলিতে মরে পড়ে আছে, কোনও ডাক্তার ছাড়া মরছে, অথবা বাঁচছিল খুব কম জায়গা নিয়ে।’
একটা লোক পাশের বেঞ্চিতে পা দুলিয়ে বসে ছিল, এখন উঠে চলে গেল। ট্রেনের ঘোষণা এল না, তবু প্ল্যাটফর্মের ধারে বাতাস চলাচল বাড়ল। কেউ যেন আসছে, কিন্তু ধীর পায়ে।
‘আপনার কোনও মেয়ে আছে ?’ রতন হঠাৎ বলল।
‘না, মাসুম একাই আছিল।’
‘আপনি যদি আবার বাবার জায়গায় থাকতেন, কী করতেন ?’
‘একটু বেশি চুপ থাকতাম। বেশি বোঝার চেষ্টা করতাম। দুনিয়াটা বদলাইছে, কিন্তু আমরা বাবারা বদলায় নাই, আমরা এখনও ভাবি রাগ দেখালেই সন্তান ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু তা ভুল, রাগ দেখাইলে ক্ষতি হয়ে যায়।’
রতন সিগারেটের শেষটুকু পিষে ফেলল পায়ের নিচে। মুখে হালকা ধোঁয়া। কিন্তু চোখে একটুখানি ছায়া।
‘আপনি জানেন, আমি আসলে নিজেই ঠিক জানি না, আমি বাবাকে মিস করি কি না। আমি যেন একটা স্মৃতি মিস করি, লোকটাকে না।’
রহিম বলল না কিছু। শুধু মাথা নিচু করে শুনে গেল। এইবার রতনই প্রশ্ন করল, ‘আপনি নিজেকে দোষ দেন, তাই তো ?’
‘সব বাবা-মা দেয়। আমরা ভাবি, একটা দিন যদি অন্যরকম করতাম, একটা কথা যদি না বলতাম, একটা থাপ্পড় না মারতাম, তাহলে হয়তো কিছু বদলাত। অথচ আমরা জানি না, জীবন বদলানো যায় না সব সময়।’
স্টেশনের দূরের বাতিগুলো একটু নিভে গেল হঠাৎ। কয়েক সেকেন্ড অন্ধকার। তারপর আবার আলো ফিরল। যেন কেউ মুহূর্তের জন্য তাদের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল।
‘আপনি যদি মাসুমকে এখন দেখতে পান, কী বলবেন ?’ রতন বলল।
রহিম কাঁধ সোজা করল। তারপর বলল, ‘কিছু না। শুধু বলব, তুই চা খাস ? আমি আনতেছি।’
রতনের গলায় কিছু আটকে গেল। মনে হচ্ছিল, এই ‘তুই চা খাস ?’ কথাটার পেছনে গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ক্ষমা লুকিয়ে আছে। ঘড়িতে এখন রাত ১টা ৫৮ মিনিট। সময়কে মনে হচ্ছিল যেন ট্র্যাকে আটকে পড়া পুরোনো মালগাড়ি, সামনে এগোচ্ছে না, কিন্তু থামছেও না। প্ল্যাটফর্মের বাতিগুলোর নিচে একটা কুকুর গুটিয়ে শুয়ে আছে, মাঝে মাঝে মাথা তোলে, আবার চোখ বন্ধ করে। ট্রেনের গর্জন নেই, হুইসেল নেই, শুধু মানুষের নিঃশব্দ অপেক্ষা। রহিমের এখন মনে হচ্ছে যেন তার পুরো শরীরটাকে কিছু টানছে নিচের দিকে। কথা না বললেও বোঝা যাচ্ছে, কিছু একটা আসছে তার ভেতর থেকে।
‘আমি খুঁজছি এই শহরটারে,’ সে বলল, হঠাৎ।
“মিরপুর থাইকা শুরু করছি। বস্তি বস্তি ঘুরি। একদিন খিলগাঁওয়ের এক ফার্নিচারের দোকানে গিয়া ছবি দেখাইলাম। দোকানদার কইলো, ‘এই পোলারে আমি চিনি। আগেও আমাদের পিছে ঘুরত চাকরি পাইতে।’ আমি ভাবলাম, মিল পাইছি, এইবার হয়তো পোলাডার সন্ধান পামু কিন্তু পরে সে কইলো, এই পোলা দুই বছর আগেই ময়লার ট্রাকে উঠা শিখে ফেলছিল।”
সে থামল। মুখ নামিয়ে ফেলল যেন নিজেকেই লুকাতে চাইছে।
“আরেকদিন গেছি উত্তরায়। এক বৃদ্ধ মহিলা একটা এনজিও অফিসে চাকরি করে। বলল, এই ছবির মতো পোলাপান ওরা লিস্ট করে রাখে। আমি কইলাম, লিস্টটা কি আমারে দেহাতে পারেন ? উনি বললেন, ‘নিয়ম নাই।’ আমি কইলাম, মা, নিয়মের আগে আমি একটা বাপ।”
রতন কিছু বলছিল না। সে শুধু শুনছিল―যেভাবে কেউ নিজের অস্তিত্বের শিকড় বের করে আনছে মাটির নিচ থেকে।
‘তিন মাস আগে একবার পাইছিলাম একজনরে, মোহাম্মদপুর স্টেশন রোডে। লোকটা বলল, সে মাসুমকে দেখছে। এক সময় হিজড়া দলে মিশে গেছিল, পরে পালায়। আমি খুঁজতেছি, ওই দিকেও গেছি। তল্লাশি করি। একদিন ট্রেনের নিচে নামি, লোকাল লাইনের পিছ-পিছ হাঁটি, খালি একটা ছেলের পা দেখলে ভাবি, হেই তো!’
তার কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছিল না, কিন্তু শুকিয়ে যাচ্ছিল, শব্দগুলো যেন কেবল মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না, শরীর দিয়েও বের হচ্ছিল।
‘মাসুম যদি মরে গিয়া থাকে, আমি মরতে পারি। কিন্তু যদি না মরে থাকে, আর আমি খুঁজা থামাইয়া দিমু, তাইলে সে মরে যাবে একেবারেই।’
একটা অজানা শব্দ রতনের ভেতর দিয়ে গেল। ভয়ের মতো, দুঃখের মতো, না বলা কিছু।
‘আপনার স্ত্রী ?’
“মরছে। দুই বছর হইছে। ক্যানসার। শেষের দিকে ওর চোখ কইছিল, ‘ছেলেটারে পাইলে মরতে পারি।’ আমি প্রতিদিন বলতাম, ‘আজ হয়তো পামু।’ কিন্তু ও মরছে, আর মাসুম আসেনি। শেষ কয়দিন এমন হইছিল কোনও ছেলেমানুষ বাড়িতে আসলেই কইত মাসুম আইসো বাপ আমার।”
বাতাস যেন থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
‘আপনি যদি নিশ্চিত হতেন, আপনার ছেলে আসবে না, তবু কি খুঁজতেন ?’
‘হ্যাঁ। কারণ, আমি আর কিছু পারি না। আমি এখন শুধু একজন রিকশাচালক না আমি একজন বাবা, যার কাজ খুঁজে যাওয়া।’
রতন মাথা নিচু করে বসে রইল। তার ফোনটা টুং করে একটা নোটিফিকেশন দিল। সে দেখল না। তার মনে হচ্ছিল, এই লোকটা হয়তো কোনও গল্পের চরিত্র। কারণ বাস্তব পৃথিবীতে এতটা একাগ্রতা, এতটা সরল তৃষ্ণা নিয়ে কেউ বাঁচে না।
‘আপনি কি চান আপনার ছেলে আপনাকে ক্ষমা করুক ?’
রহিম হেসে উঠল। গলা কাঁপল না, কিন্তু দৃষ্টিতে জল এল।
এবার রতনের মুখ থেমে গেল। ঠিক এই কথাটাই সে হয়তো তার বাবাকে বলতে চেয়েছিল যেদিন বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছিল রাত দুটোয়, মা মারা যাওয়ার পর। তার ভেতরে সেই প্রশ্নটা গুমরে উঠল আমি কি বাবার মতো হব ? কিন্তু তার মুখ বলল না কিছু। স্টেশনের ঘোষক এবার একটু পরিষ্কার কণ্ঠে ঘোষণা করল, ‘সিরাজগঞ্জ অভিমুখী একতা এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্ম ৩-এ প্রবেশ করছে।’
লোকজন নড়েচড়ে উঠতে লাগল। যারা এতক্ষণ নিঃশব্দ ছিল, তারা এখন ব্যাগ গুছাচ্ছে, বাচ্চার হাত টেনে ধরছে, দরজার দিকে তাকাচ্ছে। কিছু মানুষ হালকা মেজাজে এগোচ্ছে ট্রেনের দিকে। রতন ব্যাগের চেইন টেনে বন্ধ করল। শার্টের হাতাটা টেনে নামিয়ে নিল কব্জি পর্যন্ত। তার ভিতরে একটা কিছু আটকে আছে অজানা, কিন্তু অদৃশ্য। রহিম তখনও বসে তাকিয়ে আছে রেললাইনের দিকে।
‘আপনার তো এখন কোথাও যাওয়ার কথা ছিল না, তাই না ?’ রতন বলল।
‘না,’ রহিম মাথা নাড়িয়ে বলল। ‘আমি তো শুধু দেখতেছিলাম। কেউ চেনা মুখ। কেউ মাসুমের মতো।’
‘আজ কোথায় যাবেন ?’
‘হাসপাতাল। পুরান ঢাকার ওখানে এক লোক বলছিল, নতুন পেট্রোল পাম্পের পেছনে হিজড়াদের ছোট ঘর আছে। আমি ভাবলাম, গিয়ে একবার খুঁজি।’
রতন এক মুহূর্তে থমকে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি একা খোঁজেন এত বছর ?’
‘আরে না বাপ। মাসুমের একটা স্কুলের ছবি আছে আমার কাছে ক্লাস থ্রির। ওখানে আমি একটা নম্বর খুঁজতেছি যেখানে ওর নামটা বড় করে লেখা ছিল। খালি ভাবি, হয়তো একটা নাম ধরে কেউ মনে রাখছে এখনও।’
রতন ব্যাগটা কাঁধে তুলল। ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে, দরজা খুলছে। ট্রেনের গার্ড হুইসেল দিচ্ছে কিন্তু তার পা এগোয় না।
‘আমি আপনার একটা ছবি তুলতে পারি ?’ সে বলল হঠাৎ।
রহিম তাকিয়ে হাসল। বিস্ময়ের হাসি, লাজুক।
‘আমার ?’
‘হ্যাঁ।’
‘এই পোশাকে ?’
‘আপনি যেমন আছেন, তেমনই। আমি শুধু রাখতে চাই।’ রহিম সোজা হয়ে বসে কাঁধ টান করে। মুখে কিছু নেই, হাসি না, দুঃখও না। কিন্তু চোখে এক ধরনের শান্তি। রতন ফোন তোলে, ক্লিক। ছবিটা সে না দেখে সরাসরি পকেটে রেখে দেয়। যেন একটা চিহ্ন সঙ্গে নেওয়া, ফিরে আসার দরজা না খোলা একটা জানালা হয়ে থাকে।
রহিম এবার দাঁড়িয়ে পেছন পেছন হাঁটছে। আসলে কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছে না। রহিম পেছন থেকে বলল, ‘আপনার সন্তান আছে ?’
রতন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘না। আসলে, আমি ঠিক জানি না আমি বাবা হতে চাই কি না।’
‘ভয় পান ?’
‘ভয় না, হয়তো ভয়কে পছন্দ করে ফেলেছি। কারণ সেটা পুরোনো। পরিচিত।’
রহিম এবার মাথা নিচু করে বলল, ‘আপনি যদি কখনও বাবা হন, তাহলে একটা কথা মনে রাখবেন, পোলাপান ঠিক থাকে না সব সময়। তারা পালায়, লুকায়, হারায়। কিন্তু আপনি যেন খুঁজা থাইকা বাদ দেন না। তাহলেই তারা আপনারে একদিন খুঁজে নেবে।’
ট্রেনের সিঁড়িতে পা রাখার আগে রতন থেমে গেল। একবার ফিরে তাকাল। রহিম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, আবার ছবি বের করছে পকেট থেকে। হয়তো কারও দেখানোর জন্য, হয়তো নিজেকেই মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।
ট্রেন আস্তে আস্তে ছাড়তে শুরু করল। ইঞ্জিনের ঘড়ঘড় শব্দে প্ল্যাটফর্মটা কাঁপল। রতন জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। ঢাকা শহর আস্তে আস্তে পেছনে পড়ছে, ট্রেনের গতি বাড়ছে। আর তার ফোনে, গ্যালারির এক কোণে, রাখা রইল সেই মুখটা যে মুখ হারায়নি, কেবল একটা ছেলের জন্য থেমে আছে।
লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেষ খুঁটি হঠাৎ আর লোহা মনে হলো না। সেটা যেন একজন দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দেখছে, হয়তো কেউ ফিরবে একদিন।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



