
দশ-বারো দিন আগের এক বিকালে পাকিস্তান গণপরিষদের সাবেক সদস্য মিয়া মোহাম্মদ মোহসিন আলি খানের সিদ্ধেশ্বরী রোডের বাসার বৈঠকখানায় এলাকার ছজন বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা গোমড়া মুখে বসেছিল। তখন সন্ধ্যা হই হই করছে। আর এই মুহূর্তে, ১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহের কোনও একদিনে, নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলের আধো অন্ধকার একটা ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে তারা। পাঞ্জাবি জল্লাদদের মারের চোটে হাত-পা বাঁধা আহত মানুষগুলো কাতরাচ্ছে ব্যথায়। পাকসেনা আর রাজাকারেরা যখন জামে মসজিদের পশ্চিমে ঢুকে পড়া সিদ্ধেশ্বরী রোডের অংশটায় রেইড দেয় তখন একজন ক্যাপ্টেন তাদেরকে প্রশ্ন করছিল বারবার―কোথায় গেছে তোমাদের ছেলেরা ? লুকিয়েছে কোন গ্রামে ? নাকি তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে গেছে আগরতলায় ? বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দলে নাম লিখিয়েছে তোমাদের কুপুত্ররা ? এসব প্রশ্নের কোনও জবাব ছিল না সিদ্ধেশ্বরী রোডের এই মুরুব্বিদের কাছে। বাসা ছেড়ে যাওয়ার সময় ছেলেরা তো আর তাদের ইজাজত নেয়নি বা তাদেরকে কিছু জানিয়েও যায়নি। কে বুঝবে সে কথা ? মাঝখান থেকে পুরোনো এমপি হোস্টেলের পাঞ্জাবি জল্লাদেরা মোটা বেতের লাঠি, লোহার রড আর রাইফেলের বাটের বাড়িতে তাদের হাড়হাড্ডি সব ভেঙে দিল। ঘরটার এবড়োখেবড়ো মেঝেতে এখন তাদেরকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে।
জুন মাসের মাঝামাঝি এক বিকালে মোহসিন খানের বৈঠকখানাতে জবুথবু হয়ে বসেছিল সিদ্ধেশ্বরী এলাকার যে কজন মুরুব্বি তারা কোনও কথা তোলার সাহস সঞ্চয় করতে পারছিল না মোটেই। তাদের ভেতরে ছিল কাস্টমস ইন্সপেক্টর আব্দুল বাসেত, ওয়াপদার ইঞ্জিনিয়ার মকবুল আহমেদ, এলএমএফ ডাক্তার দবির উদ্দিন, জগন্নাথ কলেজের ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক আসগর আলি খান, কোর্টকাচারির ফৌজদারি কার্যবিধির উকিল বাচ্চু চৌধুরী এবং হাবিব ব্যাংকের মতিঝিল শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার রবিউল ইসলাম। তাদের শুকনো মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন মস্ত বড় পাপটাপ কিছু করে এসে দাঁড়িয়ে আছে আসামির কাঠগড়ায়। বৈঠকখানার নিভু নিভু আলোয় আরও খানিকটা কালিতে ডুবে যাচ্ছিল সন্ত্রস্ত এই ছজন বয়োজ্যেষ্ঠর মলিন মুখমণ্ডল। এমনটাই মনে পড়ছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার আসগরের। পাইপে এরিনমোর কোম্পানির আলগা তামাক ভরে টানতে টানতে কেন্দ্রীয় নাগরিক শান্তিকমিটির প্রচার-সম্পাদক টিকাটুলির জহির পাটোয়ারির সঙ্গে তখন কথা বলছিল মোহসিন খান। এ দুজন রাজাকারের কথোপকথনের সারাংশটা হলো এমন: ১৯৭১ সালের মার্চ মাস জুড়ে আইন অমান্যের ভেতর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিকল্প একটা সরকার তৈরি করে নিয়েছিল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান। কত্ত বড় সাহস তার, দেখ! শেখ মুজিবুর রহমান তার ছয়-দফা কর্মসূচিতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের যে কথা তুলেছিল তা পুণ্যভূমি পাকিস্তানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলার মতলব ছাড়া আর কী হতে পারে ? মোহসিন খানের এসব জ্বালাময়ী কথায় মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছিল জহির পাটোয়ারি। তারপর জহির পাটোয়ারিকে মোহসিন খান তার নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে একটা ধারণা দিচ্ছিল―শেখ মুজিবুর রহমানের এই বিশ্বাসঘাতকতার কথা ছড়িয়ে দিতে হবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি জেলায়, মহকুমায়, গ্রামে গ্রামে। তার জন্য সর্বত্র মিছিল আর প্রচারপত্র বিলির ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে। মোহসিন খান আর জহির পাটোয়ারির মাঝের এইসব কথপোকথন মাথা নিচু করে শুনছিল সিদ্ধেশ্বরী রোডের ছজন মুরুব্বি; নিজেদের দিক থেকে কথা শুরু করতে তারা ব্যর্থ হচ্ছিল বারবার। ঢাকা শহরের সন্ত্রাসের ভেতরে অনিচ্ছাতে আটকে যাওয়া এসব বাসিন্দার মনে মৃত্যুভয় ছিল। সেসব আশঙ্কার কথাগুলো তারা বলতে চাচ্ছিল ক্ষমতাসীন কাউকে, যদি কোনও আনুকূল্য মিলে যায়। কিন্তু মাথা হেঁট করে বসে থাকা ছজন মানুষ মোহসিন খানের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারছিল না। তাদের ভয় হচ্ছিল, সেটা করতে গেলেই ‘এই ছাগলডা আবার কী কয়!’ জাতীয় নেতিবাচক কোনও মনোভাব নগ্নভাবে তাদের চেহারাতে ফুটে উঠতে পারে। সেটা কি আর সহ্য করবে মোহসিন খান ?
এখন পুরোনো এমপি হোস্টেলের বদ্ধ ঘরটার জানলার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে পড়া এক চিলতে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এই দুদিন আগের স্বাধীন জীবনের কথা ভাবছে আসগর। তার মনে পড়ছে, মধ্যজুনের সেই বিকালে দীর্ঘক্ষণ ধরে জহির পাটোয়ারির সঙ্গে কাজের কথা সেরেটেরে তাদের দিকে একসময় মনোযোগ দিয়েছিল মোহসিন খান। সারা মুখে চরম বিরক্তি নিয়েও বেশ নরম করেই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিল মোহসিন খান, ‘কিছু বলবেন আপনারা ?’ মার্চের শেষ থেকে মানুষের মনে জমাট বেঁধে ওঠা আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দেয়ার জন্য মোহসিন খানের সেই অভিব্যক্তিটা যথেষ্টই ছিল।
চোখ না তুলেই ঘামতে ঘামতে উত্তর দিয়েছিল গাজীপুরের বাসেত, ‘না স্যার। কিছু বলতে আসিনি আমি। একটু নেশেস্তার হালুয়া এনেছিলাম। আমার স্ত্রী বানিয়েছে। যদি গ্রহণ করতেন।’
‘ছি! ছি! হালুয়া এনেছেন কেন ? বাসায় ফেরত নিয়ে যান দয়া করে। আপনারাই খেয়ে নেবেন।’ এই বলে তখন তার সৎ-প্রতিক্রিয়া জানায় মোহসিন খান। তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে মৃদু কৌতুকের চিহ্ন। হয়তো সে ব্যাপারটাতে মজা পাচ্ছিল। কেননা সেদিন তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করছিল বাসেত; কদিন আগেও তো এই বাসেত বা এখানে যারা জমায়েত হয়েছে তারা তাকে ‘ভাই’ বলেই সম্বোধন করেছে, সে পাকিস্তানপন্থি বলে আড়ালে তো তখন তারা তাকে গাল দিয়েছে ‘শালা’ বলেই!
তারপর মৃদু হাসিতে একগাদা অবিশ্বাস নিয়েই মকবুলের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল মোহাসিন খান, ‘কী ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, চান্দিনায় আপনাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে চান নাকি ?’
এ কথায় শশব্যস্ত হয়ে, চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উত্তর দিয়েছেল মকবুল, ‘না, না স্যার! মে মাসের পয়লা সপ্তাহেই তো আমি কাজে যোগ দিয়েছি। কাজ ফেলে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না এখন।’
আসলে ব্যাপারটা তো অন্য―ভয়ঙ্কর একটা প্যাঁচে পড়ে গিয়ে তারা রয়ে গেছে এ দম বন্ধ হয়ে যাওয়া শহরে। গুলিস্তান, পোস্তগোলা, বাবুবাজার, সদরঘাট, আমিনবাজার, টঙ্গী, বাড্ডা, মহাখালী, কাঁচপুর―ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন দিকে যাওয়ার এসব পয়েন্টে পাহারা বসিয়েছে পাকসেনা, মিলিশিয়া আর রাজাকারেরা। মার্চের শেষ থেকে এ শহর ছেড়ে পালাতে থাকা মানুষজন দেদারসে খুন হয়ে যাচ্ছে তাদের হাতে। তো সে ঝুঁকি নেবে কেন সিদ্ধেশ্বরী অথবা এ শহরের অন্য কোনও এলাকার অবরুদ্ধ মানুষজন ? এ সত্য কথাটা তো আর মোহসিন খানকে স্মরণ করিয়ে দেয়া যাচ্ছে না; বলাও যাচ্ছে না―‘কুত্তার বাচ্চা! তোকে দেখে নেব।’
‘গ্রিন রোডের ওয়াপদা-অফিসে পোস্টিং আপনার―তাই না ?’
‘জি স্যার।’ এই বলে দাঁড়িয়েই ছিল মকবুল।
আসগর লক্ষ করেছিল, মকবুলকে মোহসিন খান বসতে বললেও মকবুল বসছে না।
মকবুলকে অগ্রাহ্য করে তখন দবিরের দিকে তাকিয়েছে মোহসিন খান। দবিরকে সে বলেছিল, ‘দবির! শোনো, তুমি ছাগলনাইয়া যেও না। দেখো, ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর মাধ্যমে পাকিস্তান-সরকার পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। অন্তরীণ করা হয়েছে ভারতের চর শেখ মুজিবুর রহমানকে। আর দেখো, ধাপে ধাপে শিথিল করা হচ্ছে কারফিউ। তাহলে তোমার আর ভয় কী ? ভয় তাদের যারা দেশের যোগাযোগ-ব্যবস্থা আর সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করতে নেমেছে বা প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদেরকে! আর দেখো, এ মাসের নয় তারিখে মুক্তিরা হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বোম মেরে দিল!’
‘ঠিক বলেছেন স্যার। আমাদের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে ভাল কাজ করেছেন। তা না হলে কি আর দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরত নাকি ?’ আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করেছিল টিকাটুলির জহির পাটোয়ারি।
এক গাদা অস্থিরতা নিয়ে, ডান হাতের তর্জনি দিয়ে বুড়ো আঙুলের চামড়া খুঁটতে খুঁটতে দবির কেবল ছোট করে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল তখন, ‘না, না স্যার। ছাগলনাইয়া যাচ্ছি না আমি। পাগল নাকি ?’ নিকটতম প্রতিবেশী মোহসিন খানকে সেও ‘ভাই’ বলে সম্বোধন না করে ‘স্যার’ই বলেছিল। তাতে অবশ্য মোহসিন খানের ভেতরে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
ব্যাপারটা চোখ এড়ায় না দবিরের। মনে মনে সে গালিগালাজ করে যাচ্ছিল মোহসিন খানকে―শালা! তুমি এই দোজখখানায় আমাদেরকে আটকে রেখেছো। দেশটা আগে স্বাধীন হোক না। তারপর তোমার গুর্দা খুলে নেব। মোহসিন খানের গুর্দা কীভাবে খুলে নেওয়া যাবে―সেসব নিয়ে পরিকল্পনা করতে করতে দবিরের মনে পড়ে গিয়েছিল, বাজারের ব্যাগে সে একটা চালকুমড়া নিয়ে এসেছে মোহসিন খানকে উপঢৌকন দেবে বলে। তাদের বাসার চালে অনেক চালকুমড়া ধরেছে এবার। তা দিয়ে কেবল মোরব্বা বানানোই নয়, কারফিউয়ের ভেতরে সবজি রান্নাও চলছে। মোহসিন খান হয়তো সেই উপহার ফিরিয়েই দিতে পারে যেমন করে সে ফিরিয়ে দিয়েছে বাসেতের আনা নেশেস্তার হালুয়া। তবু তো চালকুমড়াটা মোহসিন খানের হাতে তুলে দেওয়া জন্য চেষ্টা করা যায়। এমন তো হতেই পারে, চালকুমড়া খেতে পছন্দই করে মোহসিন খান। কিন্তু কীভাবে কাজটা করা যাবে ? এসব উপঢৌকন দেওয়ার ব্যাপারটা লজ্জার নয় কি, তাও আবার একহাট মানুষজনের ভেতরে ?
নেত্রকোনার রবিউলের দিকে তাকিয়ে মোহসিন খান তখন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল: মনে আছে তো, সিদ্ধেশ্বরী রোডের কোনও তরুণ বা কিশোর এলাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে বা কাজে যেতে পারবে না। সমস্যা যেটা হয়েছে―ঢাকা শহরের কিছু বিপথগামী তরুণ আর কিশোর আখাউড়া-সীমান্ত পার হয়ে ভারতে গিয়ে হাত মেলাচ্ছে এই পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে। এটা তো ভালো কথা নয়। পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ভারতের চর ছাড়া আর কি ? পূর্ব পাকিস্তানে অনুপ্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এরাই। এপ্রিলের শেষে এদেরই সাতজনকে মোকাবিলা করা হয়েছে মিরপুর আর মোহাম্মদপুরে। তারা টহলদার সৈনিকদের ওপরে গুলি ছুড়েছিল। এ বাদে সপ্তাহ দুয়েক আগে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বোম মারার যে ঘটনা ঘটেছিল তার পেছনেও এই অনুপ্রবেশকারীরাই দায়ী। এ ব্যাপারে জড়িত দশ জনকে অবশ্য এর ভেতরেই গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ভারতীয় চরদের আর কতজন যে নাশকতা সৃষ্টির জন্য এ শহরে ঘাপটি মেরে বসে আছে তা কে বলবে ? কাজেই সিদ্ধেশ্বরী-এলাকার শান্তিকামী অভিভাবকদের এখন সজাগ থাকতে হবে যাতে করে তাদের ছেলেরা ভারতীয় দালালদের খপ্পরে না পড়ে যায়। বলা তো যায় না। সিদ্ধেশ্বরী-এলাকার এসব ছেলেরা তো আসলে স্বভাবে কোমলমতি।
মোহসিন খান তার দীর্ঘ বক্তৃতা থামালে জোর গলায় প্রত্যয় জানিয়েছিল রবিউল, ‘কী যে বলেন স্যার! আর কোনও এলাকার কথা জানি না, তবে এটা বলতে পারি, আমাদের ছেলেরা কেউই এলাকা ছেড়ে যায়নি, যাবেও না। কখনও কখনও পড়াশোনা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তারা আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের বাসায় বেড়াতে যায় মাত্র; মাঝে মাঝে রাতেও থেকে যায় সেখানে। এর বেশি কিছু নয়। তারা পাকিস্তানের সাচ্চা সিটিজেন স্যার। আমাদের বাসাগুলোর ছাদে পাকিস্তানের পতাকা তো উড়িয়েছে এরাই।’
আসলে সবাই জানে, সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িগুলোতে পাকিস্তানের পতাকা তুলেছে এলাকার বাপেরা মিলে। রবিউল ডাহা একটা গুল মেরে দিল দেখে আতঙ্কে মোহসিন খানের দিকে তাকায় আসগর। আসগরের মনে পড়ছে তখন যেন মোহসিন খানের ঠোঁটে খেলে গিয়েছিল কৌতুকের হাসি। অবশ্য এমনও হতে পারে, পাঞ্জাবি জল্লাদদের হাতে মার খেয়ে এই মুহূর্তে তাদের কাছাকাছি অতীতের কিছু কিছু স্মৃতি এলোমেলো হয়ে গেছে। তবে এটা সে ভোলেনি, সেদিনের বাতচিতের এক পর্যায়ে পাবনার বাচ্চু চৌধুরী আর তার দিকে তাকিয়ে মোহসিন খান ক্রূরতা নিয়ে বলেছিল, ‘আমি আবারও আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে আমার সম্মানেই কিন্তু সিদ্ধেশ্বরী রোডে ঢোকেনি পাকিস্তানের বিপ্লবী সেনাবাহিনী।’ মোহসিন খান দাবি করেছিল, তেজগাঁর সরকারি প্রেসের ক্যাম্পে নিজে গিয়ে সে পাকসেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেনকে আশ্বস্ত করে এসেছে এই বলে যে সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় কোনও দুষ্কৃতকারী নেই। তা না হলে জনসন রোড, নওয়াবপুর, ঠাঁটারি বাজার, শাঁখারিপট্টি, সদরঘাট―এসব এলাকার মতো করে সিদ্ধেশ্বরীতেও কড়া আর্মড অ্যাকশন ঘটে যেতে পারত। তাই এলাকার মুরুব্বিরা যেন কোনওভাবেই সামরিক বাহিনীর কাছে মোহসিন খানের মুখ নিচু না করে। নিজেদের বাসার কিশোর, তরুণ আর যুবকদের এলাকায় ধরে রাখার দায়িত্ব তো মুরুব্বিদেরই নেওয়া উচিত।
মোহসিন খানের কথাতে এক যোগে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়েছিল আসগরেরা সকলেই। কেন্দ্রীয় নাগরিক শান্তিকমিটির প্রচার-সম্পাদক জহির পাটোয়ারি তখন এপ্রিলের মাঝামাঝি জারি হওয়া একটা সামরিক নির্দেশনা নিয়ে কথা তুলেছিল―এই পূর্ব পাকিস্তানে যে দুষ্কৃতকারীদের প্রশ্রয় দেবে, আশ্রয় দেবে তার বিরুদ্ধে নিঃসন্দেহে গ্রহণ করা হবে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা। সিদ্ধেশ্বরীর অভিভাবকেরা সেই নির্দেশনার কথা ভুলে যাবে না নিশ্চয়ই।
আসগরসহ বাকি পাঁচজনে ফের সমান তালে মাথা নেড়ে ‘না-না’ করে ওঠে। জহির পাটোয়ারিকে তখন বাসেত এমনটা বলে: এই পাড়ার ছেলেরা সবাই পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই যে দেখেন, তারা বয়েজ স্কুলের মাঠে আর খেলতে যায় না; মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেয় না―তারা কেবল যার যার বাড়িতে বসে পড়াশোনা করছে। স্কুল-কলেজ তো আর এক মাসের ভেতরেই খুলে যাবে বলে আশা করা যায়। তখন তারা ক্লাস করবে; পরীক্ষা দেবে; নিজেদের গড়ে তুলবে পাকিস্তানের সুনাগরিক হিসেবে। এমন সন্তানদের জন্য তো গর্ব হওয়ারই কথা!
বাসেতের দীর্ঘ বাক্যে গম্ভীরই হয়ে গিয়েছিল মোহসিন খান। নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলের আধো অন্ধকার ঘরের মেঝেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থাতে পড়ে থাকতে থাকতে তেমনটাই আসগরের ধারণা হয়। মোহসিন খান হয়তো ভাবছিল―কী আশ্চর্য! এতক্ষণ ধরে ডাহা গুল মেরে গেল বাসেত নামের মানুষটা! এর আগে রবিউলও বাসায় বাসায় পাকিস্তানের পতাকা তোলা নিয়ে একটা মিথ্যা কথা বলেছে। কত বড় নাফরমান এই মানুষগুলো! আসগর মনে করে, সে ভুল কিছু ভাবেনি―এ কথাটা তার পাশে মেঝেতে বেকায়দায় শুয়ে গোঙাতে থাকা বাচ্চু চৌধুরীর কানে ফিসফিস করে সে বলে। আহত বাচ্চু চৌধুরীরও হাত-পা রশি দিয়ে বাঁধা। তার মতো দিলখোলা, আমুদে মানুষ চুপসে গেছে কেমন! ফিসফিসিয়ে আসগরকে সে বলে, ‘চুপ করেন তো ভাই! কী কইরা মউতের হাত থিকা বাঁচবেন তা নিয়া এখন ভাবতে থাকেন মিয়া!’ আসগর মর্মাহত হয় বাচ্চু চৌধুরীর রূঢ় কথা শুনে। তার মনে পড়ে, তার চাইতে বয়সে ছোট বাচ্চু চৌধুরী তো এমন বেয়াদবি করেনি কোনওদিন।
মোহসিন খানের বৈঠকখানাতে সেদিন সিগারেট টানছিল জহির পাটোয়ারি। আর তখন বেড়ে গিয়েছিল আসগরের সিগারেট টানার তেষ্টা। জায়গাটা থেকে জলদি ভেগে যাওয়ার জন্যে উসখুস করছিল সে। জহির পাটোয়ারি বাসেতকে মনে করিয়ে দিয়েছিল―স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে এমন মেয়েরাও কিন্তু কোনও অজুহাতেই এলাকা ছাড়তে পারবে না, বলে দিলাম! দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মকবুল জানিয়েছিল, স্কুল-কলেজ এখনও খোলেনি বলে মেয়েরা বাইরে যাচ্ছে না; ঘরে বসে বসে তারা পড়াশোনা করছে। মাঝে সাঝে তারা গ্রামের বাড়িতে বা আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে টেড়াতে যায়, গিয়ে অবশ্য বেশি দিন থাকে না―জলদিই ফিরে আসে বাসায়। পড়াশোনা ফেলে যেখানে-সেখানে রয়ে যাওয়ার সময় আছে নাকি তাদের ? কী যে বলেন আপনি! স্কুল-কলেজ খুললেই তো পরীক্ষা আরম্ভ হয়ে যাবে।
জহির পাটোয়ারি আর বাসেতের মাঝে যখন এসব আলাপ চলছে তখন ‘দৈনিক পাকিস্তান’ সামনে মেলে খবর পড়ছিল মোহসিন খান। বাসেতের কথা শেষ হলে সে সমবেত মানুষদের জানিয়েছিল―তাকে উঠতে হবে এখনই; যেতে হবে নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলের আর্মি-ক্যাম্পে। এই বলে বৈঠকখানার সোফা থেকে উঠে পড়েছিল মোহসিন খান; এগিয়ে গিয়েছিল তার ডুপ্লেক্সের সিঁড়ির দিকে। তার পিছু পিছু অগ্রসর হয়েছিল জহির পাটোয়ারি।
সিদ্ধেশ্বরী রোডের ছজন মুরুব্বি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কাঁহাতক আর সরাসরি ও প্রচ্ছন্ন হুমকির ভেতরে আতঙ্কে ঘামতে ঘামতে শত্রুর সামনে বসে থাকা যায়! মোহসিন খানের বৈঠকখানার সোফা থেকে তারা উঠে পড়েছিল। খুন আর সন্ত্রাসের কালিমায় ঢাকা এ শহরে সন্ধ্যা নামছে তখন।
সেখান থেকে বাইরে বের হয়ে দবিরের হাতে পাটের ব্যাগ দেখে অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠেছিল বাসেত। সে দবিরকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘শান্তিনগরে সদাই করতে গেছিলেন ভাই ? কারফিউ তো আবারও শুরু হয়ে গেল! এখন তো আর বাজারেও যাওয়ার টাইম নাই! বেকার বসে থাকলাম এই শালার মোহসিন মিয়ার সামনে!’
‘হ্যাঁ! এউগ্গা চালকুমড়া পেয়ে গেলাম আর কি! যা দাম হাঁকাচ্ছে সবকিছুর! কোনও কিছু কেনার জো আছে নাকি ?’ উত্তর দিয়েছিল দবির। বাসেতকে সে আর বলে না, মোহসিন খানকে ঘুষ দেওয়ার জন্য নিজের বাড়ির চাল থেকে সে ছিঁড়ে এনেছিল কুমড়াটা। দবিরের এমন পরিকল্পনার পেছনের কারণটা হলো এই যে দবিরের বাড়িতে স্কুল-কলেজে পড়ছে এমন তিনজন ছেলেমেয়ে আছে―লাকি, পিন্টু আর কেয়া। রাজাকার বাহিনীর সদস্য আর পাকিস্তান সরকারের তাঁবেদার রাজনৈতিক দলগুলোর তরুণদের নজরদারির মুখে তারাও পড়েছে। এসব নজরদারির কারণে ঢাকা শহর ছেড়ে ফেনী জেলার নিরাপদ কোনও জায়গায় পালিয়ে যেতে পারছে না দবিরের ছেলেমেয়েরা। তো নিজের শহরের মৃত্যুকূপে আটকে পড়া সন্তানদের নিরাপত্তা বিধান নিয়ে তো ভাবতেই হয়! কাজেই মোহসিন খানকে তোয়াজ না করে উপায় আছে নাকি কোনও ?
এদিকে বাসেত দবিরকে বলছিল, এরপরে দবির যদি শান্তিনগরে বাজার সারতে যায় তবে সে যেন বাসেতকে সঙ্গে নিতে না ভোলে। আজকাল রাস্তাতে একা বের হতে খুব ভয় করছে বাসেতের। সিদ্ধেশ্বরী রোডের দু মাথা আর শান্তিনগর মোড়ে চেক পোস্ট বসিয়েছে দখলদার পাকসেনা আর মিলিশিয়ারা। তারা সারাটাক্ষণ টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে আউটার সার্কুলার রোড, বেইলি রোড, কাকরাইল রোড, টোয়েনবি সার্কুলার রোড―এসব বড় রাস্তাতে। এদিকে অলিতে গলিতে দাঁড়িয়ে মানুষজনদের গতিবিধি লক্ষ করছে রাজাকারেরা। তাদের সবার সামনে দিয়ে শান্তিনগর বাজারে যেতে শরীরের রক্ত সব হিম হয়ে যায় বাসেতের, এমনকি নামাজ আদায় করতে মসজিদে যেতেও। পকেটে রাখা ডান্ডি কার্ডটা তাকে সাহস জোগাতে পারে না কিছুতেই। এমন কত ডান্ডি কার্ডধারীকে কোনও কারণ ছাড়াই তুলে নিয়ে গেছে পাকসেনা আর রাজাকারেরা। তারা আর বাসায় ফেরেনি কেউই। তাই বাসেতের মনে হয়, পথেঘাটে চলাফেরার সময় সঙ্গে একজন মানুষ থাকলে হয়তো অস্থিরতা কমতে পারে তার। সেই ভয় তো দবিরের নিজেরও লাগে। সত্য এই যে পাকসেনাদের দেখলে ভয়ে কাঁপছে অবরুদ্ধ এই দেশের সব মানুষই। দবিরও তার ব্যতিক্রম নয়। তবু সে বাসেতকে আশ্বস্ত করেছিল এই বলে, ‘বেশ! পরশু তবে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে বাজার করতে যাব।’ তারপরে চালকুমড়া ভরা পাটের ব্যাগটা নিয়ে আর সবার সঙ্গে সিদ্ধেশ্বরী জামে মসজিদে মাগরেবের নামাজ পড়তে গিয়েছিল দবির।
এই নিয়ে তিন দিন হলো সিদ্ধেশ্বরীর মুরব্বিদের ধরে পুরোনো এমপি হোস্টেলে নিয়ে এসেছে পাক-আর্মিরা। পয়লা রাত থেকেই তাদের ওপরে শুরু হয়ে গেছে শারীরিক অত্যাচার। এখন হোস্টেলের স্যাঁতসেতে ঘরটার মেঝেতে ডান কাঁধে পড়ে আছে আহত আসগর। পাটের মোটা রশি দিয়ে পিছমোড়া করে হাত বেঁধে রাখা হয়েছে তার, দু পাও মুক্ত নয়। তীব্র গরমে সে ঘামছে ভীষণ। চুলকাচ্ছে তার পিঠের মাঝখানটায়। কিন্তু দু হাতই বাঁধা অবস্থাতে থাকার কারণে সে নিজের পিঠ নিজে চুলকে নিতে পারছে না। এমন একটা অস্বস্তি চলতে চলতে রাত আটটা পার হয়ে গেছে। এমপি হোস্টেলে যে ঘণ্টাটা বাজে নিয়মিত সেটার আওয়াজ শুনে সময় আন্দাজ করে নিতে কষ্ট হয় না তেমনটা। বেজায় ক্ষুধাও লেগেছে আসগরের, নিশ্চয়ই আর সবারও। রাজাকার বাহিনীর একজন সদস্য একটু আগে তাদেরকে বলে গেছে―শালা! তোদেরে খাওন দিমু না আইজ। আহত-অবসন্ন শরীর নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রোডের বাসিন্দারা ক্ষুধানিবৃত্তি নিয়ে কথা বলছে, ফিসফিসিয়ে―খানা দেবে না ? এটা কেমন কথা ভাই! তখন আসগরের মনে পড়ে যায় দশ-বারো দিন আগের কিছু কথা―সন্ধ্যা হয়ে এলে মোহসিন খানের বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে সিদ্ধেশ্বরী জামে মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়েছিল তারা ছজন মিলে। মসজিদ থেকে বাসায় ফিরে আসগর তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুমি কি নেশেস্তার হালুয়া বানাতে পারো ?’
আসগরের স্ত্রী জুলেখা তাকে জানিয়েছিল যে নেশেস্তার হালুয়া তার হাতে আসে না। নেশেস্তার হালুয়া কেবল বানাতে পারে পুরোনো ঢাকার মানুষজন। তখন আসগর জুলেখাকে বলেছিল, ‘আচ্ছা! ঠিক আছে। তবে বুটের ডালের হালুয়াই বানাও।’
কিন্তু তাদের বাসাতে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে বুটের ডালও ছিল না। জুলেখা ঠিক বুঝতে পারছিল না, যুদ্ধজনিত দুমূর্ল্যের বাজারে কেন আসগরকে কষ্ট করে বুটের ডাল কিনে আনতে হবে শান্তিনগর বাজার থেকে, আর কেনইবা জুলেখাকে কসরৎ করে বানাতে হবে বুটের ডালের হালুয়া। এটা কি কোনও বিলাসিতার সময় ? জুলেখার এসব কথা শোনার পরে অসহিষ্ণু কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিল আসগর, ‘মোহসিন সাহেবের বাসায় একটু বুটের ডালের হালুয়া দিয়ে আসি।’ সে কী ? হালুয়া কেন ? আসগর যুক্তি দিয়েছিল, এতে করে তাদের পরিবার মোহসিন খানের নেক নজরে আসতে পারে। চার-চারটা ছেলেমেয়ে তাদের―সবাই সোমত্ত। রাজাকার বা পাকিস্তানি সৈন্যরা ‘দুষ্কৃতকারী’ নাম বসিয়ে বা কোনও কারণ ছাড়াই তাদেরকে তুলে নিয়ে যেতেই পারে! ১৯৭১ সালের মার্চের ২৫ তারিখের ক্র্যাক ডাউনের পর থেকে সারা দেশে তো ঘটছে এটাই। রাজাকার বা পাকিস্তানি সৈন্যরা যাদেরকে ধরে নিয়ে গেছে তারা কি আর বাসায় ফিরেছে কেউ ? বুটের ডালের খানিকটা হালুয়া নজরানা হিসেবে মোহসিন খানকে গেলাতে পারলে যদি কমে আসে সেই সম্ভাবনাটা। এই আর কি।
আসগরের দেওয়া এত সব যুক্তি শোনার পরে জুলেখা আসগরের অভিপ্রায়টা বুঝল ঠিকই কিন্তু সে বেঁকেও বসল; বলল, ‘কুত্তার বাচ্চা রাজাকারদেরকে একদানা মুড়িও তুলে দেওয়ার জন্যে টাঙ্গাইলের মাইয়াদের জন্ম হয় নাই―জেনে রেখো।’ স্ত্রীর এই বিরোধিতার পরে আর কিছুই করার ছিল না আসগরের। একগাদা বিরক্তি নিয়ে সে কেবল ভেবে রেখেছিল, জুলেখাকে লাগবে না―সে নিজেই এবার বুটের ডালের হালুয়া বানানোটা শিখে নেবে।
পারিবারিকভাবে মোহসিন খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাচ্চু চৌধুরী তার পরদিন মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করার পরে আসগরকে নিয়ে বসেছিল সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ স্কুলের মাঠে। বাচ্চু চৌধুরী শলা-পরামর্শ করছিল আসগরের সঙ্গে; বলছিল, ‘আসগর ভাই! শোনেন, আমি ভাবছি মোহসিন ভাইয়ের বাসায় আগামীকাল কাচ্চি বিরিয়ানি দিয়ে আসব। আমার বউ খুব ভালো কাচ্চি রান্না করে। কী বলেন আপনি ?’ উত্তর দিয়েছিল আসগর, ‘আপনার প্ল্যানটা কিন্তু মন্দ নয়। আমার স্ত্রী তো এসবে রাজিই হলেন না। আপনার ছেলেপুলে না থাকলেও ঘরে তো কলেজ পর্যায়ের একজন ছোট বোন আছে। কখন কী হয়! কাচ্চি দিয়ে আসাটাই ভালো।’ তাই পরদিন বিকালে মোহসিন খানের বাসায় বড় এক হাঁড়ি কাচ্চি বিরিয়ানি দিয়ে এসেছিল বাচ্চু, সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল আসগরকে। পড়শি হিসাবে দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠতার কারণে মোহসিন খান আর বাচ্চুকে নিরস্ত করতে বসেনি তখন। রাতের বেলায় চুপি চুপি সেই সুসংবাদটা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্যাঙ্কার রবিউলকে জানিয়ে দিয়েছিল বাচ্চু চৌধুরী। মনে পড়ছে, তখন আক্ষেপ করেছিল রবিউল, ‘কেন যে ধর্মীয় মৌলবাদী বলে এমএনএ সাহেবকে এতদিন গুনিনি! সত্তরের নির্বাচনের আগে বেশ কবার তার সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছিল―মনে আছে না তোমার ? পয়লাতে সে আমাকেই কচুকাটা করবে। করুকগা! আমি ঐখানে কিছুতা নিয়া যাইবাম না।’
মার্চের ২৫ তারিখের পর থেকে জুন মাসের শেষ দিক পর্যন্ত ঢাকা শহরে যে নির্যাতন আর খুন চালিয়েছে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা, মিলিশিয়া আর রাজাকারেরা তা নজিরবিহীন। এতে করে সারা শহরের অবরুদ্ধ মানুষজনের ভেতরে আতঙ্ক জমাট বেঁধে আছে। কেউ জানে না যে কখন গুলিতে জানটা চলে যাবে, কখন আমদানি হবে শারীরিক অত্যাচারের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা, কখন জ¦ালিয়ে দেওয়া হবে ঘরবাড়ি, কখন তুলে নিয়ে যাওয়া হবে ঘরের মেয়েদের, কখন লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হবে কিশোর আর তরুণদের। এদিকে দখলদার সৈন্য আর তাদের পোষ্যরা চারদিকে জেঁকে বসে আছে বলে ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে গ্রামের বাড়িতেও পালিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া বলতেই হবে, আতঙ্কে কাঠ হয়ে যাওয়া সিদ্ধেশ্বরী রোডের মানুষজনদের ভেতরে বিভিন্ন কারণে অস্বস্তিও বাড়ছিল―তারা পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করছিল যে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর দমনমূলক সামরিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, পুলিশ আর ইপিআরের বাঙালি সদস্য এবং জনসাধারণের প্রতিরোধ সংকুচিত হয়ে পড়ছে ক্রমশ; কমতে কমতে তা কেবল সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে গিয়ে ঠেকেছে, দেশের বাকি অংশে কার্যত দখল নিয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, মিলিশিয়া আর রাজাকারেরা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত আসনগুলোর সিংহভাগে বিজয়ী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং দলটার সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা-কামনার বিরুদ্ধে এদিকে উত্তরোত্তর বিষোদ্গার করে চলেছে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। পাকিস্তানি ডিপ্লোম্যাটরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ নামের আলাদা একটা রাষ্ট্রের দাবির বিরুদ্ধে নানান প্রশ্ন তুলছে; পাকিস্তান সরকারকে সরাসরি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে গণচীন, তারা বলছে―বর্তমানে পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে তা একান্তই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের একটা অংশ বলে চলেছে―চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব ট্যাঙ্ক ও বিমান দিয়েছে সেগুলো পাকিস্তান-সরকার তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবহার করতেই পারে। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের বলার কিছুই নেই। মার্কিন প্রশাসনের সেই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করছেন এডওয়ার্ড কেনেডিসহ অন্ততপক্ষে তিনজন মার্কিন সিনেটর। আরও দেখা যাচ্ছে, একের পর এক বিভিন্ন দমনমূলক আদেশ-অধ্যাদেশ জারি করে চলেছে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার। এসব অত্যাচার আর গণহত্যার তো একটা প্রতিকার চাই! কিন্তু যেসব কিশোর আর তরুণেরা মার্চের শেষে আর এপ্রিলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেছে, গেরিলা-প্রশিক্ষণ শেষ করে কবে যে তারা দেশে ঢুকবে, যুদ্ধ করবে দখলদার পাক সেনাবাহিনী আর রাজাকারদের বিরুদ্ধে সেটাও সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর যা শোনা যাচ্ছে, তাতে এটা পরিষ্কার, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে পাক সেনাবাহিনী আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে চলছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। সিদ্ধেশ্বরী রোডের মুরুব্বিরা এসব খবর জানতে পেরেছিল বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, আকাশবাণী আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত খবর থেকে। ঢাকার দৈনিক খবরের কাগজগুলোতেও ছাপা হচ্ছিল ছাকনি মারা কিছু কিছু আন্তর্জাতিক খবরাখবর। সেগুলো অবশ্য দমননীতির কারণে সারা দেশের গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং অত্যাচারের খবর ছাপতে ভয় পাচ্ছিল।
এতগুলো দুঃসংবাদের ভেতরে সুখের বিষয়গুলোও কম ছিল না। এই যেমন, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে; বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থন দিয়েছে ভারত সরকার; এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ঢুকে পড়ছে মুক্তিকামী গেরিলারা আর তারা দুর্দান্ত সব অপারেশন চালাচ্ছে, পাকিস্তান-পক্ষের লোকক্ষয়ও কম হচ্ছে বলে মনে হয় না। এসব খবরসবর নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রোডের মুরুব্বিরা আর তরুণেরা ফিসফিসিয়ে আড়ালে আবডালে আলোচনা করছিল। নামাজ শেষে দোয়ায় বসে মুরুব্বিরা মনে মনে কামনা করছিল, দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সব অফিসার আর সৈনিকেরা মুক্তিবাহিনীর হাতে জলদিই খতম হয়ে যাক এবং স্বাধীন হোক অভাগা বাংলাদেশ।
পাঁচ দিন আগের একটা ঘটনার প্রসঙ্গে এবার আসা যাক। আসরের নামাজের পরে বাসেত, মকবুল, আসগর আর বাচ্চু চৌধুরী বসে ছিল আসগরের বাসার সামনের সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠে। তারা পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বিভিন্ন জায়গাতে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের সমস্যা নিয়ে আলাপ করছিল নিচু স্বরেই। বিবিসির বরাতে বাসেত বলছিল, মার্চের শেষ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতের মাটিতে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থী-সংখ্যা চব্বিশ লক্ষ পেরিয়ে গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলছেন, পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ডকে অত্যাচার, খুন আর সন্ত্রাসের রাজত্ব না বানালে তো আর ভারতের ওপরে বাঙালি শরণার্থীদের এই চাপটা পড়ত না। প্রায় চব্বিশ লক্ষ মানুষকে আশ্রয় দিতে গিয়ে, খাওয়াতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারতের অর্থনীতি। এ কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপরে পাকিস্তান-সরকারের দমনমূলক আচরণ কোনও যুক্তিতেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে থাকছে না। মকবুল আর সবার প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল তখন―তাহলে এখন কী পদক্ষেপ নেবে ভারত ? পাকিস্তানের সঙ্গে তারা কীভাবে টক্কর দেবে এবার ? আবারও পাক-ভারত যুদ্ধ হবে নাকি ? ভারত মাঠে নামলে তো পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা আলাদা একটা দেশ পেয়ে যায়, বেঁচে যায়! এসব নিয়ে আলোচনা আর বাদানুবাদ চলার সময় দেখা যায়, মাঠের ভেতর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে দবির আর রবিউল। আসগরেরা ভাবে―যাক। চান্দুদেরকে তবে দেখা গেল। সিদ্ধেশ্বরীর ভেতরের দিককার অলিতে গলিতে বৈকালিক হাঁটাহাঁটিতে তারা যোগ দেয়নি গেল দুদিন ধরে, এমনকি তারা জামে মসজিদেও নামাজ আদায় করতে যায়নি। রবিউলের বাসা থেকে আসগররা জেনেছিল, হঠাৎ করেই মৌসুমী জ¦রে আক্রান্ত হয়েছে রবিউল। চামেলিবাগের এল.এম.এফ. ডাক্তার হুদা সাহেব জ্বর নামার জন্যে সিরাপ দিয়েছেন রবিউলকে। একই কথা বলা হয়েছিল দবিরের বাসা থেকেও। দবির যেহেতু নিজেই একজন এল.এম.এফ. ডাক্তার কাজেই নিজের চিকিৎসা সে নিজেই করছে―তার ঘরেই নোভালজিন ট্যাবলেট জমানো ছিল, সেগুলো থেকে সে খেয়েছে কটা। এতদিনে নিশ্চয় সুস্থ হয়ে উঠেছে তারা দুজনই। দবির আর রবিউলকে মাঠ ভেঙে আসতে দেখে আসগররা খুশিই হয়েছিল। অবরুদ্ধ এই শহরে আতঙ্ক, অস্থিরতা আর বিষাদ ভাগজোগ করে নেওয়ার জন্য তো আশপাশে সমমনা কিছু মানুষ থাকা চাই।
আসগরদের খুশি খুশি ভাবটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। দবির আর রবিউলের মুখে ছাই লেপে দেওয়া হয়েছে যেন। অস্থির দবির তাদেরকে জানাল, তেজগাঁও কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র তার বড় ছেলে লাকি গেল দুদিন ধরে বাড়িতে ফেরেনি! একই ধরনের দুঃসংবাদ দিয়েছিল রবিউল―তার বড় ছেলে তারিকও একই সময় থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। কবি নজরুল কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছিল তারিক। দবিরের ধারণা, লাকি আর তারিক―এই দুই বন্ধুর অন্তর্ধানের ভেতরে যোগসূত্র রয়েছে কোনও একটা। এই শহরের অনেক তরুণই তো লুকিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় চলে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্যে। হয়তো তেমনই একটা কাজ করে বসেছে লাকি এবং তারিক।
এতে অবশ্য দোষের কিছু দেখেনি আসগর। কেননা অবরুদ্ধ এই শহরে রয়ে যাওয়া তরুণেরা কোনও না কোনও দিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বা রাজাকারবাহিনীর সদস্যদের হাতে খুন হয়ে যাবেই যাবে। কাজেই মরতেই যদি হয় তবে দু-দশটা পাঞ্জাবি, পাঠান আর বালুচ খতম করে মরাটাই শ্রেয়। তাই নয় কি ?
আসগরের কথা শেষ হওয়ার আগেই আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠেছিল মকবুল, ‘আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন ? বুঝতে পারছেন না যে এইবার পাকসেনারা সিদ্ধেশ্বরীতে ঢুকবেই; খুন করবে আমাদের সব্বাইকে! হায় আল্লাহ! কী হবে এখন ?’ এটুকু বলে মাঠের ঘাস থেকে উঠে, পেছনে হাত বেঁধে দ্রুত গতিতে পায়চারি করতে থাকে মকবুল।
মুহূর্তের ভেতরে মকবুলের আতঙ্ক গ্রাস করে ফেলেছিল আসগর, বাসেত এবং বাচ্চু চৌধুরীকেও। নিজেদের সুস্থির করার জন্যে সিগারেট ধরায় আসগর আর বাসেত। তাদের পাশে মাঠে বসে থাকা কালেভদ্রে ধূমপায়ী বাচ্চু চৌধুরী বাসেতকে বলেছিল, ‘ভাই! আমাকে একটা সিগারেট দেন, খাই! টেনশন লাগতেছে খুব।’ মকবুল যখন ঝড়ের বেগে পায়চারি করছে আর বাকিরা থম মেরে সিগারেট টানছে তখন আতঙ্কিত, দিশেহারা দবির আর রবিউল ঘুরেফিরে তাদেরকে একই ধরনের প্রশ্ন করে চলেছিল―‘তাহলে আমরা এখন কী করব ?’, ‘মাথা কাজ করছে না কেন ?’, ‘এই মুশকিলের আসান হবে কীভাবে ?’
আসগরই প্রথম ক মিনিটের ভেতরে মাথা ঠান্ডা করে নিজেকে গুছিয়ে নিতে পেরেছিল তখন; সে দবির আর রবিউলকে পরামর্শ দিয়েছিল―চুপচাপ থাকতে হবে এখন। কোনওভাবেই যেন সিদ্ধেশ্বরীর মানুষজন লাকি আর তারিকের অন্তর্ধানের খবরটা না জানে। কাউকেই তো এখন বিশ্বাস করা চলছে না। আশপাশেই ফরফর করছে, লুকিয়ে আছে পাকিস্তান-প্রেমীরা। এসব কথা রাজাকারদের কানে যেতে তখন কি আর খুব বেশি সময় লাগবে ? আর তখন তেজগাঁর ক্যাম্প থেকে এলাকাতে ছুটে আসবে পাকিস্তানি আর্মি।
বাসেত তাদেরকে বলছিল, এ বাদে মানতেই হবে, এলাকার ছেলেদের অন্তর্ধানের কথাটা আগ বাড়িয়ে মোহসিন খানকে জানাতে যাওয়াটা বা তার কাছে মাফি মাঙতে চাওয়াটা মোটেই উচিত হবে না। সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা পাগলকে নৌকা নাড়াতে না-করার মতো চরম এক মূর্খতায় পর্যবসিত হয়ে যেতে পারে।
মকবুল বুদ্ধি বের করেছিল একটা: মোহসিন খানের কানে যদি লাকি আর তারিকের অন্তর্ধানের ব্যাপারটা একান্ত চলেই যায় তবে তার পা ধরে পড়ে থাকতে হবে সবাই মিলে। তাকে তখন অনুনয় করে বলা যেতে পারে, এমন তো নয় যে লাকি আর তারিক একবারে হাওয়া হয়ে গেছে―তারা দুজনে একসঙ্গে বাসাবো আর মুগদায় লাকির মার কুলের আত্মীয়দের বাসায় বেড়াতে গেছে কদিনের জন্যে, জলদিই বাসায় ফিরে আসবে তারা। আসলে বাসায় থাকতে থাকতে একঘেয়েমি ধরেছে তাদেরকে। বোঝেনই তো স্যার।
মকবুলের পরামর্শের ভেতরে বাচ্চু চৌধুরী অবশ্য একটা গলদ দেখেছিল। বাচ্চু চৌধুরী বলেছিল: হ্যাঁ! এটা কোনও কথা হলো ? তখন যদি লাকি আর তারিককে সিদ্ধেশ্বরীতে হাজির করতে হুকুম দেয় মোহসিন খান ? তারা দুজন যদি সত্যিই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় গিয়ে থাকে তবে তো আর তাদেরকে বাসাবো-মুগদায় ঢুঁড়েও পাবে না কেউই। তখন তো গজব নামবে এলাকায়। আসগরের মনে পড়ছে, বাচ্চু চৌধুরীর এই যুক্তির পরে তারা সবাই তখন আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল; তারা সমস্বরে এমন কথা বলছিল―এইবার আর বাঁচন নাই! পাক-আর্মিরা এবার সিদ্ধেশ্বরীতে ঢুকবে; জানে মেরে ফেলবে আমাদের সবাইকে! তাই তারা ঠিক করেছিল, জোয়ান ছেলেমেয়ে যারা এখনও মহল্লাতে রয়ে গেছে তাদেরকে আজ-কালের ভেতরে, রাতের অন্ধকারে অন্য কোথাও চালান করে দিতে হবে। আর শিশুরা ? আস্তে আস্তে তাদেরকেও মহল্লা থেকে সরিয়ে ফেলা প্রয়োজন। পাকসেনারা তো বয়স বাছবিচার করে না।
জুন শেষের এই রাতে নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলের অন্ধকার, স্যাঁতসেতে ঘরটার মেঝেতেই পড়ে আছে আসগর। এক সময় হাত-পা বাঁধা অবস্থাতেই ঘষটাতে ঘষটাতে দেয়ালের কাছে যেতে পেরেছিল সে এবং অনেক কষ্টে নিজের শরীরটাকে তুলে সে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছে। তার দেখাদেখি কোনও মতে উঠে বসে হেলান দিয়েছে দেয়ালে মেঝেতে পড়ে গোঙাতে থাকা বাচ্চু চৌধুরীও। দেয়ালটাতে পিঠ ঠেকিয়ে আগে থেকেই বসেছিল রক্তাক্ত, নির্জীব মকবুল।
বেতের মোটা লাঠি, লোহার রড আর রাইফেলের কুঁদোর আঘাতে ভেঙে গেছে আসগরের পাঁজরের কটা হাড় আর মচকে গেছে তার বাম হাত। তাই তার সারা শরীরে জেগে আছে তীব্র ব্যথা। আসগরের নাকও ভেঙে গেছে লোহার পাইপের আঘাতে। পয়লাতে যখন নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত নামছিল তখন সে ভীষণ ভড়কে গিয়েছিল। এখন রক্ত বন্ধ হয়েছে কিছুটা, ভাঙা নাক থেকে এই মুহূর্তে রক্ত গড়াচ্ছে সরু ধারায়। সে কারণে তার নাকের ভেতরটায় সুড়সুড়ি লেগেই আছে সারাক্ষণ। পিছমোড়া করে তার হাত বাঁধা আছে বলে সে আর নিজের হাতের পিঠে মুছে নিতে পারছে না নাক থেকে নেমে আসতে থাকা রক্তটুকু। তাই ব্যথার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়ানক এক অস্বস্তি। আর গরমে ঘাম হচ্ছে প্রচুর।
আসগরের পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকা বাচ্চু চৌধুরী আর মকবুল তীব্র ব্যথায় গোঙাচ্ছে। জানালার কাঠের পাল্লার ফাঁক গলে আসা কোনও বাতির সামান্য আলোতে দেখা যাচ্ছে, আবছা হয়ে গেছে তাদের মুখমণ্ডল। আসগরের মনে পড়ছে, গেল রাতের টর্চারের সময় পাঞ্জাবি জল্লাদ ছিল দুজন। তাদের মাঝে এক চোখ কানা জল্লাদের লোহার রডের আঘাতে ভেঙে পড়ে গেছে বাচ্চু চৌধুরীর ওপর আর নিচের মাড়ির পাঁচ-ছটা দাঁত, তাই রক্তাক্ত হয়ে আছে তার মুখমণ্ডল। রাইফেলের কুঁদোর বাড়িতে চুরচুর হয়ে গেছে মকবুলের ডান পার মালাইচাকির নিচের অংশটুকু। লোহার রডের বাড়িতে ফেটে গেছে তার বাম গণ্ড আর কপালের বাম দিকটা। এদিকে মাথায় লম্বু জল্লাদের বেতের লাঠির বেমক্কা বাড়ি খেয়েছে বাসেত। মাথা ফেটে গিয়ে রক্ত জমে খরখরে হয়ে আছে তার চুল। আজ দিনের বেলায় জানালা দিয়ে এ বদ্ধ ঘরে ঢুকে পড়া আলোতে এসবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল আসগর। হয়তোবা বাসেতের বাম কান থেকে রক্ত ঝরছে এখনও। হাত পিছমোড়া অবস্থাতে কংক্রিটের মেঝেতে এলিয়ে পড়ে আছে সে―স্বল্প আলোতে এটুকুই কেবল চোখে পড়ছে। কোনও সাড়াশব্দ নেই বাসেতের। আসগরের ভয় হচ্ছে―মরেটরে গেল না তো বাসেত ? মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত দবির আর রবিউলও নড়ছে না। কী হলো তাদের ? গেল রাতে দবির আর রবিউলকে পাঞ্জাবি জল্লাদরা নিয়ে গিয়েছিল অন্য টর্চার চেম্বারে। দিনের আলো ফুটলে এটুকু বোঝা গিয়েছিল, বাঁশের ডলাতে থেঁতলে গেছে তাদের গোটা শরীর, ফেটে গেছে তাদের মাথা। একেবারে নিথর হয়ে পড়েছে তাদের শরীর। আহত বাসেত, দবির আর রবিউলের দিকে তাকিয়ে স্বগোতক্তি করছে বাচ্চু চৌধুরী―এরা বাঁচবে তো ? বাচ্চু চৌধুরীর কানের কাছে ফিসফিস করে মকবুল বলছে, ‘আসলে আমরা কেউই বাঁচব না।’ সে কথা শুনে তাদেরকে সাহস দিতে চায় আসগর। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে―দেখাই যাক না। মকবুল তীক্ষè কণ্ঠে উচ্চারণ করে―আর কী দেখবেন আপনি ?
আসগরের বাম পাশে মেঝেতে পড়ে আছে নাক-মুখ থ্যাবড়ানো, হাড়হাড্ডি গুঁড়িয়ে যাওয়া দুজন তরুণ। তারা দুই নম্বর সেক্টরের গেরিলা। গত পরশুর আগের দিনের সন্ধ্যায় তারা পাঁচজন অংশ নিয়েছিল রামপুরা বাজারের অপারেশনে। রামপুরা বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা পিক-আপ ভ্যানে দুটো হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ করেছিল তারা। স্পটেই নিহত হয়েছিল একজন পাকিস্তানি হাবিলদার আর তিনজন সৈনিক। অক্ষত চারজন পাকিস্তানি সৈনিক তখন চাইনিজ এসএমজি আর ৭.৬২ মিলিমিটার চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি ছুড়ছিল গেরিলাদের লক্ষ করে। হাতিয়ার বলতে গেরিলাদের কাছে ছিল একটা ৯ মিলিমিটার স্টেনগান আর সঙ্গে একটা সেমি-অটোমেটিক ব্রাউনিং পিস্তল আর একটা গ্রেনেড। এগুলো সবই অনেক পুরোনো হাতিয়ার―দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল। গেরিলাদের একজন একটা ইলেকট্রিক পোলের আড়ালে হাঁটু মুড়ে বসে স্টেনগান থেকে কাভার ফায়ার করছিল। সেই ফাঁকে পূর্ব রামপুরা হাই স্কুলের দিকে দৌড়ে পালাচ্ছিল বাকি চারজন গেরিলা। রাজাকারেরা ধাওয়া করছিল তাদেরকে। কিন্তু এলাকাটা জনাকীর্ণ বলে তারা রাজাকারদের লক্ষ করে ব্রাউনিং পিস্তলটা থেকে গুলি ছুড়তে পারছিল না; গ্রেনেডটাও ফাটাতে পারছিল না। এক সময় রাজাকাররা দলবদ্ধভাবে দৌড়ে গিয়ে দুজন গেরিলাকে ধরে ফেলে, জামতলা পানির পাম্পের দিকে পালিয়ে যেতে পারে বাকি দুজন। স্টেনগানের বত্রিশ রাউন্ড গুলি ফটাফট শেষ হয়ে গেলে রামপুরা বাজারেই নিহত হয় একা লড়াই করতে থাকা গেরিলা। সে আর পিছিয়ে গিয়ে পালাবার সুযোগ পায়নি। রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যাওয়া গেরিলা দুজনকে গত পরশু নিয়ে আসা হয়েছে এখানে। গত পরশু রাতেই পিটিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে তাদের কণ্ঠাস্থি, হাত-পা আর বুকের পাঁজর; ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের নাক, মুখমণ্ডল, কপাল, মাথা। গতকাল সারাদিন আর আজ দুপুর পর্যন্ত বেধড়ক মারপিট করা হয়েছে তাদেরকে। তবু তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বা রাজাকারদেরকে তাদের সহযোদ্ধাদের অবস্থান আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনও তথ্যই দেয়নি। তাদের একজন, যার নাম পলাশ, নূরের চালায় বাড়ি, ফ্যাঁসফ্যাসে কণ্ঠে আসগরকে বলছে, ‘বুঝলেন আঙ্কেল! এই টর্চার সেলে যে মোচওয়ালা, বেঁটে আর গালকাটা পাঞ্জাবি জল্লাদ আছে তারা খুব হারামি, তাদের শরীরে কোনও দয়ামায়া নাই।’
‘হুম! মেরে ফেলবে, জানি। গতকাল রাতে আমাদেরকে পিটিয়েছে দুজন―তাদের একজনের বাম চোখ নষ্ট, লম্বুর সামনের পাটির কটা দাঁত নাই। তারাও তো কম নিষ্ঠুর বলে মনে হলো না। এই যে আমাদের বাসেত আর নড়তেই পারছে না―দেখেছ ? হেমোরেজ মনে হয়।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হতাশা নিয়ে মন্তব্য করছে আসগর।
একটু ছেদ নিয়ে ফিসফিসিয়ে পলাশ বলে, ‘তবে তার আগে জল্লাদরা আমার আর মোস্তফার হাত-পার নখ উপড়ে ফেলবে, নখের নিচে সুই ঢোকাবে; প্লায়ার্স দিয়ে আঙুল টাঙুল কেটে নিতেও পারে। হয়তোবা আজকে রাতেই ঘটবে এসব। আমাদের কাছ থেকে মুক্তিদের কোনও খবর তো পায়নি তারা।’
আতঙ্কে গায়ের ভেতরে শিরশির করে ওঠে আসগরের। সে তাকায় বাচ্চু চৌধুরীর চোখে। অত অল্প আলোতে কি আর দেখা যায় মানুষের চোখ ?
পলাশ আসগরকে আরও জানায়, গত পরশু সকালে শান্তিবাগের একজন কিশোরের বাম চোখে গরম তেল ঢেলে দিয়েছিল জল্লাদেরা। তারপর সন্ধ্যাবেলাতে তাকে এ ঘর থেকে নিয়ে গেছে রাজাকারেরা। ছেলেটা মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। রাজাকারেরা তেজকুনিবাজার থেকে ধরে নিয়ে এসেছিল তাকে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি বিক্রি করছিল সে। গেল সন্ধ্যার পর থেকে সেই কিশোরকে আর দেখা যায়নি।
‘এমনই নাকি হয়―অত্যাচার করে শেষে বধ্যভূমিতে নিয়ে যায় বন্দিদেরকে!’
‘বেশি দিন ধরে এই অত্যাচার সহ্য করতে হবে বলে মনে হয় না। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে আমাদের কাছ থেকে কোনও খবর বের করতে না পারলে তারা আমাদের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। যা ঘটার আজ রাতেই ঘটে যাবে বলে আমার মনে হয়।’
‘তা ঠিক!’
‘গত পরশু রাতে আমার সামনেই এই ঘর থেকে বন্দিদের এক ব্যাচকে ট্রাকে তুলে নিয়ে গেল রাজাকারেরা। তাদের সঙ্গে মিরপুর এলাকার কজন বিহারি কসাইও ছিল বলে মনে হয়। উর্দুতে কথা বলছিল তারা। আমার মনে হয়, ব্যাচটাকে মিরপুরের পাম্প হাউসের জল্লাদখানায় নিয়ে গিয়ে খতম করে দেওয়া হয়েছে। বিহারি কসাইরা বাঙালিদের গলা কাটে সেখানে।’
‘ও! তার মানে ফেরেনি তারা!’ নিজের সঙ্গে কথা বলে মকবুল।
‘এমপি হোস্টেল থেকে একবার যাকে ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সে আর ফেরে না―এটা জানেন না আপনারা ?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে পলাশ।
‘হায় আল্লাহ! এখন আমি বাঁচব কীভাবে!’ এই বলে কেঁদে ফেলে মকবুল।
তরুণ গেরিলা পলাশ আর কোনও কথা বলে না। আসগরও বলে না কিছু। কথা বলে আর কী হবে ?
তখন পলাশের সঙ্গের আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা, মোস্তফা যার নাম, সে চিৎকার করে কাউকে অনুরোধ করে, ‘আমার জন্যে একটু খাবার পানির ব্যবস্থা করা যাবে আঙ্কেল ? পিপাসায় মারা যাচ্ছি আমি!’
পানি ? ও! হ্যাঁ! গলা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে সবারই। রাজাকারেরা তো বলেছেই যে আজ রাতে খাবার দেবে না। তো পানিও দেবে না নির্ঘাৎ।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে বাচ্চু চৌধুরী। নিচু স্বরে সে বিড়বিড় করছে; ‘আমাকে কেন ধরে নিয়ে আসল এরা ? আমার তো ছেলেমেয়ে জন্মায়নি! তো আমার বাসা থেকে মুক্তিযুদ্ধে যাবে কে ?’
তেড়ে উঠে উত্তর দেয় মকবুল। ‘সে কথা আপনার পেয়ারের প্রতিবেশী কুলাঙ্গার মোহসিনকে জিজ্ঞাসা করেন গিয়া!’
মকবুলের দাবড়ানি খেয়ে চুপ হয়ে যায় বাচ্চু চৌধুরী।
আসগর ভাবছে অন্য কথা: ধরা যাক যে লাকি আর তারিক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সত্যিই গেরিলাযুদ্ধের ট্রেইনিং নিতে চলে গেছে। তো সেই অপরাধে দুই প্লাটুন পাকিস্তানি সৈন্য আর এক প্লাটুন রাজাকার এসে সিদ্ধেশ্বরী রোডের বাসায় বাসায় আগুন দেবে কেন ? কেন তারা ডজ কোম্পানির পাঁচ টনি একটা ট্রাকে করে তুলে নিয়ে যাবে লাকির বোন কেয়া আর তারিকের বোন সুইটিকে ? সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে কেয়া আর সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে সুইটি। কতইবা বয়স তাদের ? চৌদ্দ বছরের বেশি তো আর নয়। তারা কি আর গণধর্ষণ সহ্য করতে পারবে কিংবা অন্য কোনও শারীরিক অত্যাচার ? মনে তো হয় না! এত নিষ্ঠুর কেন এমএনএ মোহসিন খান ? নিজের এলাকার চার-চারটা বাসা সে জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিল ? এদিকে এলাকাতে রয়ে যাওয়া কোনও কিশোর বা তরুণ খুঁজে পাওয়া গেল না। পরিস্থিতি খারাপ দেখে তারা চলে গেছে অন্য কোথাও। দু-এক ঘর হিন্দু পরিবার যাও ছিল তারাও সরে পড়েছে। তাই রেগে গিয়ে এলাকার মুরুব্বিদের ওপরে চড়াও হয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর; চিৎকার করে বলেছিল, ‘সালে! তুমলোগ সব কুছ জানতা হ্যায়। মুক্তি কাঁহাপে চুপা রাখ্খা হ্যায় ? আওর হিন্দুলোগ ? বোল সালে!’ আসগররা কী বলবে ? তারা তো কিছুই জানে না।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা পিক-আপ ভ্যানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তোলা হয়েছিল সিদ্ধেশ্বরী রোডের ছজন মুরুব্বিকে। আসগরের চোখে তাকিয়ে তখন কী ভীষণ নিষ্ঠুরতা নিয়ে মোহসিন খান বলেছিল : ‘মাস্টার সাহেব শোনেন, আপনাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে ঠিকই, ভারতের চরদের পরিবারের দুজন মেয়েকে তুলেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে―মানছি। মনে করতে পারেন কি না, আগেই আপনাদেরকে আমি আপনাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের গতিবিধির ওপরে নজর রাখতে বলেছিলাম। আপনারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে একটা ব্যাপারে আমি আত্মতৃপ্তি বোধ করি, আমার নিজের মহল্লায় আমি কোনও কিলিং হতে দেইনি। এটা কিন্তু কম কথা নয়।’ তারপরই আসগর, মকবুল, বাসেত, দবির, বাচ্চু চৌধুরী আর রবিউলকে নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী রোড থেকে আউটার সার্কুলার রোডের দিকে রওয়ানা দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পিকআপ ভ্যান। তার পেছন পেছন চলছিল সৈন্য বোঝাই পাঁচ টনি ডজ ট্রাকটা।
রাত বাড়লে বাতি জ¦লে ওঠে পুরোনো এমপি হোস্টেলের ক্যাম্পাসে, পাকিস্তানি সৈন্য এবং রাজাকারদের বিস্তর হাঁকডাক শোনা যায়। আসগররা যে ঘরে বন্দি হয়ে আছে একটু বাদেই সে ঘরের দরজায় তালা খোলার ভোঁতা একটা আওয়াজ ওঠে। ঘরটায় চল্লিশ ওয়াটের বাতি জ¦ালিয়ে দেয় কেউ। দেখা যায়, সকালের অত্যাচারের পরে টর্চার সেল থেকে যে দুজন রাজাকার আহত আসগরদের এ ঘরটায় ফেলে রেখে গিয়েছিল তারাই ঘরে ঢুকেছে আবার। মোটা রাজাকারটা তাদেরকে উদ্দেশ করে বলছে, ‘এই যে নবাবের পুতেরা! হোগা তুলেন অহন। জল্লাদ সাবেরা আপনাগো ডাকতাছে, তেহারি খিলাইব।’ এই বলে মোটা খি-খি করে হাসতে থাকে। তার সঙ্গে তাল মেলায় ঢ্যাঙা রাজাকারটাও। তারপর রাজাকার দুজন পলাশ, তার সহযোদ্ধা মোস্তফা, দবির এবং রবিউল―এই চারজন গুরুতর আহতের দু হাত ধরে মেঝের ওপর দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যায় ঘরের বাইরে। বন্ধ হয়ে যায় দরজাটা। মিনিট পাঁচেক পরেই পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে পাঞ্জাবি জল্লাদ দুজনের কণ্ঠে উর্দু গালিগালাজ এবং সেই সঙ্গে বন্দিদের অমানুষিক চিৎকার। তাই হাতের পিঠে কান ঢাকতে চায় আসগরসহ বাকি বন্দিরা। তারা তা পারে না, কেননা তাদের দু হাত পিছমোড়া করে বাঁধাই আছে। আতঙ্কে উঁচু স্বরে দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করে মকবুল। তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় বাচ্চু চৌধুরী আর আসগর নিজেও। এক পর্যায়ে আতঙ্কে কাঁদতে শুরু করে আসগর। এদিকে মেঝেতে পড়ে আছে নির্জীব বাসেত। নড়াচড়ার শক্তি অবশিষ্ট নেই তার শরীরে।
একসময় পাশের টর্চার সেল থেকে ধেয়ে আসা আর্তচিৎকার গা সওয়া হয়ে আসে আসগর, মকবুল আর বাচ্চু চৌধুরীর। ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় অবসন্ন আসগরদের শরীরে পাকিয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য ঝিমানি। দরজার শেকল খোলার ঝটাং আওয়াজ উঠলে ঝিমানি ছুটে যায় তাদের। বৈদ্যুতিক বাতির আলোতে আসগর দেখতে পায়, বারান্দার কংক্রিটের মেঝের ওপর দিয়ে টানতে টানতে ঘরে ঢোকানো হচ্ছে পলাশ, মোস্তফা, দবির আর রবিউলের রক্তাক্ত শরীর। আসগরদের কানে এসে আঘাত করতে থাকে দবির, রবিউল আর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফার আর্তচিৎকার। কেটে নেওয়া হয়েছে তাদের তিনজনেরই হাত-পার কটা আঙুল, কারও বাম কান, কারও ডান কান। রক্তে ভেসে যাচ্ছে আঘাতে আঘাতে পাঁশুটে হয়ে যাওয়া তাদের জবুথবু শরীর। নিজের রক্তে ভাসতে থাকা গেরিলা পলাশ আর নড়ছে না, ব্যথায় চিৎকার করছে না সে। তার জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না। অস্বস্তিতে তাদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয় আসগর, মকবুল আর বাচ্চু চৌধুরী। আতঙ্কের ঘোরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তারা তিনজনই উঁচু স্বরে কলেমা পড়তে থাকে―লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। তারপর খি-খি করে হাসতে হাসতে আসগরদেরকে টেনেহিঁচড়ে পাশের টর্চার সেলে নিয়ে যায় মটু আর ঢ্যাঙা রাজাকার।
পাশের টর্চার সেলটার বৈদ্যুতিক বাতির উজ্জ্বল আলোতে ঝলসে যায় আসগরের চোখ। রাজাকারেরা খুলে দেয় আসগরের হাত-পার রশি। অবসন্ন শরীর নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে সে। পেটানো শরীরের তিনজন পাঞ্জাবি জল্লাদের দিকে তাকিয়ে রীতিমতো ভড়কে যায় আসগর। বোঝা যায়, এদের কথাই বলছিল পলাশ। দীর্ঘকায় মচুয়া জল্লাদের চড়-ঘুষির পরে এক দেয়াল থেকে ছিটকে গিয়ে আরেক দেয়ালে গোত্তা খায় আসগর; দেয়ালে জোরসে বাড়ি খায় তার মাথা; তারপর লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে। আসগরের শঙ্কা হয়, হয়তো ফেটে গেছে তার মাথাটা! নইলে তার মাথার চুল ভিজে উঠবে কেন ? তার দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে মেঝেতে লেপ্টে থাকা হাত-পা বাঁধা মকবুল, বাচ্চু চৌধুরী আর বাসেতের শরীরে বুট দিয়ে, রাইফেলের কুঁদো দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে চলে মচুয়া জল্লাদ। আর সে বাজখাঁই কণ্ঠে চিৎকার করে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করছে―বোল সালে! মুক্তি কাঁহা হ্যায় ? জীবনে সেই প্রথম মটমট করে মানুষের শরীরের অনেকগুলো হাড়হাড্ডি একসঙ্গে ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ পায় আসগর। ব্যথায় আর্তনাদ করতে করতে মেঝেতে আরও মিশে যায় আহত বাচ্চু চৌধুরী, মকবুল আর বাসেত। এবার দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে ধুঁকতে থাকা আসগরকে কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে ফের দাঁড় করিয়ে দেয় বেঁটে জল্লাদ। তারপর ছোট একটা ধারালো চাকুর পোঁচ দিয়ে বেঁটে জল্লাদ ফালা ফালা করে দেয় তার আহত বুক আর পিঠ। তার সারা শরীর থেকে অজস্র ধারায় দরদর করে ঝরতে থাকে রক্ত। স্বাভাবিকভাবেই খুব তেষ্টা পায় তার। ‘পানি! পানি!’―বলে সে চিৎকার করতে থাকে। পানি না দিয়ে তখন লোহার একটা মুগুর চালিয়ে তাকে এলোপাথাড়ি পেটাতে থাকে বেঁটে জল্লাদ। আঘাতের তীব্রতায় মাটিতে ঢলে পড়ে যায় আসগর। ঘোলা হয়ে আসা চোখ দিয়ে সে দেখতে পায়, বাচ্চু চৌধুরী, মকবুল আর বাসেতের হাতের আঙুলগুলো একটা কাঠের গুঁড়ির ওপরে বসাচ্ছে গালকাটা জল্লাদ, তারপর একটা টাঙ্গির কোপে কেটে নিচ্ছে তাদের বাম আর ডান হাতের তর্জনী, বুড়ো আঙুল, কনিষ্ঠা। কাঠের গুঁড়িটা থেকে রক্তের ধারা নেমে ভিজিয়ে দিচ্ছে কংক্রিটের মেঝে, রক্ত গড়াতে গড়াতে পৌঁছে যাচ্ছে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে থাকা আসগরের পাঁজর পর্যন্ত। পিটপিট করে তাকিয়ে আসগর বুঝতে পারে, ব্যথায় আর্তনাদ করতে করতে জ্ঞান হারিয়েছে মকবুল, বাসেত আর বাচ্চু চৌধুরী―তিনজনই। আসগরের তেষ্টা আরও বেড়ে যায়। এক সময় তার খুলির ভেতরে নেমে আসে নীরেট অন্ধকার। সে কেবল টের পায়, কে যেন বুট দিয়ে ক্রমাগত লাথি মারছে তার শরীরে আর সে উথালপাথাল দুলছে ঘূর্ণিস্রোতের ভেতরে পড়ে যাওয়া কোনও নৌকার মতো।
কাছের কোথাও থেকে ভেসে আসছে আজান। আসগরের কানে গিয়ে গুনগুন করতে থাকে একটা লাইন―আস্সালাতু খাইরুম মিনান নাউম! ও তাই তো! তবে ফজরের নামাজটা আদায় করে নেওয়া যাক। কিন্তু উঠতে গিয়ে সে মেঝে থেকে তার শরীরটাকে জাগাতে পারে না। মনে হয় যেন পেরেক মেরে শরীরটা কেউ গেঁথে রেখেছে কংক্রিটের মেঝেতে। তাই মেঝে থেকে উঠতে বেজায় কষ্ট হচ্ছে তার। তখনই আসগরের শরীরে এসে লাগে একগাদা পানির ঝাপটা। চোখ মেলে সে দেখে, মোটু রাজাকার বালতি হাতে দাঁড়িয়ে গালিগালাজ করছে তাকে, ‘বাইনচোত! উইঠা খাড়া কইলাম। তা না হইলে তর হোগার ভিতরে কিরিচ ভরুম আইজকা।’ এ কথা শোনার পরে ব্যথায় টনটন করতে থাকা শরীরটাকে টেনে তুলে দেয়াল ধরে সে দাঁড়িয়ে থাকতে জোর চেষ্টা চালায়। প্রতিবারই ব্যর্থই হতে হয় তাকে। ঢ্যাঙা রাজাকারের লাথি খেয়ে এদিকে ঝটিতি উঠে দাঁড়িয়ে দেয়াল ধরে টিকটিক করে কাঁপছে মকবুল, বাচ্চু চৌধুরী আর গেরিলা মোস্তফা। কিন্তু লাথির পরে লাথি খেয়েও নড়ছে না বাসেত। তার নাকের কাছে হাতের আঙুল ঠেসে ধরে জীবনের চিহ্ন পরখ করে দেখে ঢ্যাঙা রাজাকার; নিশ্চিত হয়ে সঙ্গীকে বলে―‘এখনও এই হালার দম বাইর হয়া যায় নাইরে! কই মাছ নাকিরে এইডা!’
মেঝেতে পড়ে থাকা দবির, রবিউল আর পলাশের পেটে বারবার লাথি মারলে কোঁক করে নড়ে উঠছে তারা। কিন্তু মেঝে থেকে ওঠার বেলাতে নির্জীব বাসেতের মতো করে তাদের ভেতরেও নড়াচড়ার কোনও স্পৃহা নেই। তা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে যায় মোটু রাজাকার, ‘এই হালার চার মাদারচোত তো শুয়া থিকা উঠতাছেই নারে! কী গ্যানজাম―ক তো দেহি! এই হালাগো নিয়া মিরপুরে যাইতে হইব অহন। তারপর ঘুমামু বাসায় গিয়া। টাইম নাই! টাইম নাই!’
ঢ্যাঙা রাজাকার বলে, ‘ঠিকই কইছেন ওস্তাদ। এত্ত মানুষ ধরা পড়তাছে। খালাস করতেও তো টাইম লাগে।’
‘এরই মইধ্যে খানকির পোলাগুলারে দুই চালানে মিরপুরে নামায়া আসছি। এই শেষ টিরিপ যে কেমনে মারুম। সকাল তো হইয়া যাইতেছে। আজকাইল আবার রাস্তায় নামতাছে বিদিশি সাংবাদিকগুলা। দেশের পাগলে ভাত পাইতাছে না। অহন আইছেন তেনারা।’
‘চিন্তা কইরেন না ওস্তাদ। ইট-বালুর টেরাকের দিক কি আর সাংবাদিকরা তাকাইব ? তাও টেরাক তেরপল দিয়া ঢাইকা দিমুনে। কেউ টের পাইব না। আর মিরপুরে গিয়া সেকেন্ডের ভিতরে ফাজিলগুলারে টেরাক থিকা নামায়া ফেলমুনে। কসাইগুলার লোকজন তো ঐহানে থাকবই।’
তারপর মোটু রাজাকার ঢ্যাঙা রাজাকারটাকে নির্দেশ দেয়, ‘এক কাম কর তো―মিরপুরের কসাইগুলারে ডাক। এই মাঙ্গের পোগুলারে হ্যারাই টাইনা ঠেইলা টেরাকে তুলুক গা। প্রত্যেক রাতে এইসব ধ্বজভঙ্গগুলারে নিয়া মিরপুর যাইতে আর ভাল্লাগে না।’
মোটু রাজাকারের অভিপ্রায় মতো পুরোনো এমপি হোস্টেলের ঘরটায় ঢোকে চারজন কসাই। সব শুনে তাদের একজন মোটু রাজাকারকে আশ্বস্ত করে এই বলে ‘আরাম কি জিয়ে ভাইয়া। ইয়ে তো হামারা বাম হাতকা মামলা হ্যায়।’ তারপর তারা প্রায়-নিথর দবির, বাসেত, রবিউল আর পলাশকে পালাক্রমে চ্যাংদোলা করে বাইরে নিয়ে গিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয় ইট-বালু টানার পাঁচ টনি ট্রাকের পেটের ভেতরে। আসগরসহ বাকিরা একে অপরের কাঁধ আর হাত অবলম্বন করে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ট্রাকের পেছনে গিয়ে পৌঁছায়। তাদেরকে শূন্যে তুলে ঠেলেঠুলে অজস্র আহত বন্দিদের ভেতরে ট্রাকের ভেতরে গুঁজে দেয় কসাইরা। ট্রাকের মেঝেতে কোনও রকমে বসার জায়গা পায় তারা। রাজাকারেরা তাদের ওপরে ফেলে দেয় মোটা তেরপল। তারপর কজন রাজাকার আর কসাই তাদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে লাফিয়ে উঠে পড়ে ট্রাকের পেছনে।
নাখালপাড়া থেকে বেরিয়ে কচুক্ষেতের ভেতর দিয়ে ট্রাকটা মিরপুরে ঢোকে। পয়লাতে আসগর ভেবেছিল, রাজাকারদের সঙ্গে যেহেতু মিরপুরের কসাইরা রয়েছে কাজেই তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে মিরপুর দশের পাম্প হাউসের জল্লাদখানায়। কসাইরা ওখানে বাঙালিদের জবাই করে; তারপরে ছোট একটা কুয়ায় ফেলে রাখে মৃতদের মুণ্ডুগুলো; তাদের ধড়গুলো ফেলে দেওয়া হয় বড় একটা কুয়ায়, নইলে একটা সেফটি ট্যাংকে। মিরপুরে এমন আরও অনেক জল্লাদখানা আছে। সেগুলোতে যে ভয়াবহভাবে বাঙালিদের খুন করা হয়, সে কথা জানে না এমন মানুষ এ শহরে আর মিলবে না এখন। কিন্তু জল্লাদখানায় ট্রাকটা থামল না। সেখান থেকে আরও উত্তরে ট্রাকটা এগিয়ে যায়; থামে গিয়ে মাটিকাটা এলাকার একটা ঝিলের ধারে। জায়গাটা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মোটেই দূরে নয়। সেটা পড়েছে ক্যান্টনমেন্ট থেকে দক্ষিণে―নামাপাড়া আর মানিকদি বাজারের কাছাকাছি। এদিকে এক শীতে পাখি শিকার করতে এসেছিল আসগর আর মকবুল। তখন থেকেই তারা জানে, এ ঝিলের কোনও নাম নেই।
ঝিলের ধারে ট্রাক থেকে নামানো হয় বন্দিদের। দবির, রবিউল, বাসেত আর পলাশের মতো গুরুতর আহতদের চ্যাংদোলা করে ঝিলের ঠিক কিনারায় ফেলে দেয় মিরপুরের কসাইদের চেলাচামুণ্ডারা। এদেরকে কীভাবে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হবে তা ঠিক বুঝতে পারে না আসগর। এমন হতে পারে যে তরোয়াল বা কিরিচ বা ছুরি মারা হবে তাদেরকে। আর আসগর, মকবুল, বাচ্চু চৌধুরী আর মোস্তফার মতো যারা চলতে টলতে পারছে তাদেরকে লাঠি দিয়ে মারতে মারতে রাজাকার আর কসাইরা ঝিলপাড়ে নিয়ে যায়। মার খেতে খেতে বন্দিরা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। কেউ কেউ আবার দুর্বল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ঢলে পড়ে একে অপরের গায়। ভোরের আলোতে আসগর দেখতে পায়, তারা পৌঁছানোর আগেই জনা চল্লিশেক নারী-পুরুষকে ঝিলের ঠিক কিনারায় জড়ো করা হয়েছে। তাদের পেছনে আসগরদেরকে জুড়ে দেওয়া হয়। এবার চারদিকে তাকায় আসগর। ঢাকা শহরের উত্তরে দিগন্ত বিস্তৃত এ জলাভূমির আশপাশে কোথাও জনবসতি দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিমে ধাবমান সরু মাটির পথের দু পাশে কেবল পানি আর পানি।
লাইনের সামনের প্রথম দশজন বন্দিকে বেছে নেয় রাজাকার আর মিরপুরের কসাইরা। ঝিলের ঠিক কিনারায় পূর্ব-পশ্চিমে এক সারে দাঁড় করানো হয় বন্দিদের। গুরুতর যেসব আহত বন্দি একান্তই দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না তাদেরকে রাজাকারদের কেউ একজন চিৎকার করে বলে―তর পাশের লোকটার কাঁধ খামচায়া ধইরা কোনও মতে খাড়ায়া থাক ব্যাটা! সেই চেষ্টাই করে টলতে থাকা বন্দিরা। বন্দিদের ভেতর থেকে কোনও একজন যুবক সর্বশক্তি দিয়ে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে ওঠে। তার সঙ্গে গলা মেলায় আরও দু-একজন বন্দি। তারপরই তাদের সবার বুক বরাবর দু রাউন্ড করে থ্রি নট থ্রির গুলি চালায় বন্দিদের বিপরীতে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাজাকার এবং মিরপুরের কসাইরা। বন্দিদের বেশির ভাগই গুলির আঘাতে কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ে ঝিলের পানিতে, কেউবা আবার চিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই পানিতে উল্টে পড়ে যায়। যারা গুলি খেয়ে ঝিলের কিনারার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তাদের পেট বড় বড় ছুড়ি দিয়ে চিরে দেয় মিরপুরের কসাইরা। তারপর লাথি মেরে, ঠেলেঠুলে গুলি খাওয়া মানুষদের তারা ভাসিয়ে দেয় ঝিলের পানিতে। এভাবে আরও তিনটা ব্যাচে হত্যাযজ্ঞ চালায় রাজাকার আর কসাইরা মিলে। জনা চল্লিশেক নারী-পুরুষের রক্তে লাল হয়ে ওঠে ঝিলের ঠিক কিনারার দিকটার পানি।
ঝিলপাড়ের একটা কড়ুইগাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আসগর-মকবুলরা। ক্ষতবিক্ষত, বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না তারা কেউই। তাদের ভেতরে সব চাইতে বেশি আহত দবির, রবিউল, বাসেত আর পলাশ তো পড়েই আছে ঝিলপাড়ের মাটিতে, উঠছে না। শেষ ব্যাচে আসগরদের যখন ঝিলের ঠিক কিনারায় নিয়ে যাওয়া হয় তখন আসগর লক্ষ করে দেখে, সেই ঝিলটার পানি রামপুরা-বাড্ডার ঝিলের পানির মতো মোটেই টলটলে নয়। ব্যাপারটা তবে কী ? আসগর বুঝতে পারে, মার্চ মাসের শেষ থেকে মিরপুরের এই ঝিলের পানিতে জমা হচ্ছে ঢাকা শহরের হাজার হাজার মানুষের রক্ত। রক্ত পচতে পচতে পানি আর লাল থাকছে না―ক্রমশ কালো হয়ে উঠছে। এভাবে দিনে দিনে ঘোরতর কালো রঙ ধারণ করেছে পুরো ঝিলটার পানি। আসগর যখন এসব লক্ষ করছে তখন আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে উঁচু স্বরে কলেমা তাইয়্যেবা পড়ে বাসেত―লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। কান্নার হেঁচকিতে অস্পষ্ট হয়ে যায় শব্দগুলো। তাকে অনুসরণ করে কলেমা পড়তে থাকে জনা তিরিশেক আহত, রক্তাক্ত মানুষ। তাদের সামনে রাইফেল তাক করে দাঁড়ায় রাজাকার আর কসাইরা। তার সেকেন্ড দশেক পরে রাইফেলের গুলি খেয়ে ঝিলের কালো পানিতে খসে পড়ে সেদিনের শেষ ব্যাচের বন্দিরাও।
সচিত্রকরণ : রজত



