ক্ষরব্রহ্মের কবিয়াল : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার
সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন : দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য
‘এ যেন গুল্মের ডাল, আর আমি একটি বউল,/তার বেশি নই’―যৌবন বাউল কাব্যগ্রন্থের এই স্নিগ্ধ উচ্চারণ পেরিয়ে একদিন জায়গা করে নিল ‘পথে পড়ে থাকে শ্মশান, কুকুর, মানুষ ও বসুমতী/ছুঁয়ে উড়ে যায় একফোঁটা প্রজাপতি’ তাঁর গিলোটিনে আলপনা-র ‘ভিয়েৎনাম্নী’ কবিতাটিতে। পরে আরও-আরও পথ খরায়-বন্যায় হেঁটে তাঁকে বলতে শোনা গেল, ‘সদ্যমৃত সমূহ সৈন্যের/পা থেকে জুতো সরায় সারে-সারে/অন্য যারা এখনও বেঁচে আছে/প্রলয়শীতে, রাতের কান্দাহারে।’ তবে কি রুক্ষ ক্রমশ আরও রুক্ষ বাস্তব-প্রতিম আর নিরুপায় দিগ্দর্শী হয়ে উঠবে তাঁর কণ্ঠস্বর ? কোনও শিথিলতাই তাঁর কবিতায় প্রশ্রয় পাবে না আর! আমাদের নিজের সঙ্গে নিচু স্বরে বলা কথাগুলোও কী করে পৌঁছে যায় তার প্রাণে আর আমরা পেয়ে যাই ‘তোমার নামে নক্ষত্রের বৃক্ষ ভরে শুধু’ বা, ‘ধীমান মুখের পাশে জড়ো করে আনি অভিমানও’―তাঁর এই আর্দ্র রাগমালা। তিনি যখন বলে ওঠেন, ‘ক্ষুধিত মুখের সঙ্গে নগ্নতার তফাৎ কোথাও নেই’―তখন আমাদের ঘুমন্ত সাজগোজ-পরা রূপবান নাগরিক অস্তিত্ব যেন আভূমি কেঁপে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ‘গোপন কান্নার মতো ঘুণাক্ষরে আমার ভিতরে বুদ্ধ বাড়ে’ এমন সব গভীর, বিবেক মথিত-করে-তোলা উচ্চারণে পেয়ে যাই আমরা।
তিনি সমন্বয়ের কবি। দুটো আলাদা দেশ, মহাসময়ের দুটো প্রান্ত ঈশ্বরচেতনা এবং মানবচেতনার দুই ভিন্ন অভিমুখ অন্য এক বোধের ধারকে মিশে যেতে পারে তাঁর মধ্যে―ব্রেশট এবং সুরদাস একই সময় মাথা তোলেন তাঁর বিশ্বে, খ্রিষ্টপূর্বাব্দের রচনার সঙ্গেই সহবাস করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ক্ষতবিক্ষত দিনগুলোর স্মৃতিবিদ্ধ জার্মান কবি পাউল সেলানের রচনা এবং আজকের দিনে বসেই অনায়াসে তিনি অপৌরুষেয় সৃষ্টির দায় বহন করার কথাও ভাবেন।
‘সমস্ত দিন প্রতিবাদ রেখে ফেরার প্রহরে/এ-কী বিস্ময়, কার প্রশাসন তারায় তারায়!’―এই বিস্মিত-দেখা তাঁর চেতনার দীপ্তি মেখে নেয় যখন অথর্বসংহিতার পুরুষসুক্তের ‘ঈশ’ যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো প্রশাসক―খুব আলতোভাবে সেই ঐতিহ্যের দিকে আমাদের জানতে না দিয়ে তুলে নিয়ে যান তিনি। তেমনই একই সঙ্গে একই কাব্যগ্রন্থে বলে উঠতে পারেন ‘গালফের পর/কবিতা আর আগের মতো নয় প্রগলভা/তাকে এখন ভাবতে হবে ভ্রূকুঞ্চনে।’ এমনকি ‘পাড়ার ছেলেমেয়েরা হ্যারি পটারের গল্পে মশগুল হতে হতে তরণী ছাড়াই নদী পার হয়ে গেল’ তা-ও তিনি দেখতে ভোলেন না ।
যে-কোনও বিশিষ্ট কবির সাক্ষাৎকার পল্লবগ্রাহী হতে বাধ্য এবং সেই কবির নাম যদি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত হয়, পাঁচ দশকেরও বেশি যিনি বাংলা কবিতার মেঠো-পথটিতে তাঁর ইথার-মণ্ডিত জামা গায়ে নিয়ে ধুলো উড়িয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং স্বয়ং শক্তি চট্টোপাধ্যায় যাকে তার ‘ছন্দ, বাক-চাতুর্য ও আপাত-সরল বাংলাভাষার’ শিক্ষক হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন, তখন তা আরও প্রশ্নাতীতভাবে সত্যি হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে ওঁর বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তেরোটি সাক্ষাৎকারের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে―‘নিজেকেই যেন দিয়েছি শ্রুতিলিখন’। এই সাক্ষাৎকারটিকে ধরলে ওঁর কথোপকথনের ভুবন নিয়ে একটি চতুর্দশপদী যেন সম্পূর্ণ হলো। একটু খেয়াল করলেই আগের কাজগুলোতে ছন্দ নিয়ে এবং ওঁর অসাধারণ কবিতাগুলোর কবোষ্ণ মুহূর্তের নির্দিষ্ট দায় এবং দাবি নিয়ে জানতে-চাওয়া প্রশ্নের স্বল্পতা লক্ষ করা যাবে। সেই দিক থেকে এই কাজটিকে তাদের পরিপূরক স্বর হিসেবে ভাবা যেতে পারে।
তাঁর ‘বাকরীতির নিসর্গের দিকে’ আমাদের তাকিয়ে থাকতে হয়, যে ছন্দ তাঁর ‘বাল্যবন্ধু’ আমাদেরও তা দু-হাত বাড়িয়ে আহ্বান করে, তবু নিশ্চিন্ত সেই বলয় ছেড়ে অ-সময়ের যে ছন্দ পারার মতো টলমল করছে তাঁর সাম্প্রতিক কবিতায়, যে স্পন্দ কথা-ভাষা আর পড়া-ভাষার মধ্যে দুলে-দুলে উঠছে, তাকে বুঝতে হবে পথে নেমে মিছিলে হেঁটে বিক্ষোভ সমাবেশের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কিংবা হয়তো শ্রী-বিস্মৃত পাগলের বুকে কান পেতেও।
কোনটি পরমার্থ তাঁর―দিন না রাত ? পূর্ণতা না শূন্যতা ? এককভাবে কোনওটাই নয় মনে হয়। তাঁর তো সমতলে পথ-চলা নয়, প্যারাবোলার মতো বাঁক নিতে নিতে তা উঠে যায় এবং নেমেও আসে। অম্লান মেধার হতাশ তীক্ষè অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে তিনি বোধহয় মিশিয়ে দিতে পারেন আশা আর বিরল-পলাশের লাল রং এবং তিনি বলেন, ‘রাত্রি আর দিন/ওতপ্রোত হয়ে আজ কবিতার চলেছে প্রস্তুতি।’ ক্ষর-অক্ষর দুদিকেই তাঁর নিমন্ত্রণ, তবু বিনীতভাবে তিনি যেন ‘দুঃখ তাপের উপত্যকায়’ নেমে এসেছেন অধিকতর আগ্রহে―‘কতোটা জগৎ বুকে নিতে পারে তার সেদিকেই মন’ তখন তাঁকে ক্ষরব্রহ্মের কবিয়াল বলে চিনতে কোথাও ভুল হয় না আমাদের।
(সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সকাল দশ-টা থেকে তিনটের মধ্যে, ১৫/২/৪৯ ঝিল রোড ব্যাঙ্ক প্লট যাদবপুর-এ। সঙ্গী ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী শুচিশ্রী রায়।)
দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য : আজ ২০১২-র প্রথম ভাগে এসে আপনার সুদীর্ঘ কবিজীবনের সার্থকতা সম্বন্ধে আপনার আত্মমূল্যায়ন কী ? গতকালের শিশিরমঞ্চের বক্তব্য এবং কবিতা-পাঠ থেকে (২১শের অনুষ্ঠান) একটা বিষাদের সুর উঠে আসছিল আপনার বলায়।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত : সার্থকতা শব্দটা আমি ব্যবহার করব না, এমনকি মহতী ব্যর্থতা, সেটাও বলব না। একটি কবিতার থেকে আর একটি কবিতায় যাওয়া, সেটা সবসময় কিন্তু একটা নিরন্ধ্র পরম্পরা নয়। একটি কবিতার যে বৃত্ত সেটা সম্পূর্ণ করে আর একটি কবিতার বৃত্তে প্রবেশ করার মধ্যে কবিরও একটা transmigration, একটা জন্মান্তর হয়ে যায় এবং আমি যদি এভাবে বলি, ‘আমার সুন্দর/এই জীবনে ঘটাল মোর জন্ম-জন্মান্তর’ সেইটা যদি হয়, তাহলে আমার মনে হয় যে প্রতিটি কবিতার যে স্বয়ম্পূর্ণ বিশ্ব সেই বিশ্বকে নতুন করে স্পর্শ করার একটা কামনা আমার মধ্যে বোধহয় জন্মাবধি রয়ে গেছে। এই সঙ্গে এই কথাটা আমি যোগ করব যে সম্ভবত আমার যে প্রাক-জন্মের সংস্কার (সেটাকে যদি ভরীব fixe idée বলি, ইংরেজিতে যেটাকে ভরীবফ fixed idea বলা হয়) যে আমার ভাষা যেটা, অর্থাৎ আমার মাতৃভাষা, সেই মাতৃভাষাকে তার সম্পূর্ণ বলয়ের মধ্য থেকে আমি ধরব, সেটা ‘যৌবন বাউল’-এও ছিল এবং আমার সদ্যতন বই, ‘সে কি খুঁজে পেল ঈশ্বরকণা’ তার মধ্যেও রয়েছে। এই দিক থেকে বলতে পারো, আমি আত্মখণ্ডন করে বলছি, প্রথমে যেটা আমার ছিল ‘যা পেয়েছি প্রথম দিনে সেই যেন পাই শেষে,/ দু-হাত দিয়ে বিশ্বেরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে’-এর মধ্যে আশাবাদের সঙ্গে একটা বিষাদও মিশে গেছে, যেটা নশ্বর মানুষের উত্তরাধিকার। একটা খুব সুন্দর কথা বলেছিলেন Leslie Stephen যিনি রবীন্দ্রনাথ-কেও আদি পর্বে বিভাবিত করেছিলেন―nothing is less poetical than optimism, অর্থাৎ আশাবাদের মতো অ-কাব্যিক আর কিছু হতে পারে না। সেই আত্মতৃপ্তির অভাব যখন একজন কবিয়ালের মধ্যে ফুরিয়ে যায়, তার আর কবি হিসেবে বেঁচে থাকার কোনও সার্থকতা নেই। এবং আমি এই সূত্রে আরও বলব, একদিক থেকে বললাম একটা কবিতা থেকে আর একটা কবিতায় যাওয়া, এর মধ্যে যেরকম ভুবন-ভুবন বিসারিত হয়ে যায় তেমনি আবার এটাও ঠিক যে যদি কবি-চারিত্র্য বলে কিছু থাকে তার কাজ হবে সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়ে অন্তত একটা প্রাতিভাসিক সঙ্গতি রচনা করা। অর্থাৎ কবির একটা লক্ষ্য থাকে, পাঠকের কাছে তার যে অঙ্গীকার বা commitment, সেই দায়ভাগের কাছে সত্যকাম থাকা, যদিও তিনি সংস্কারক নন। সেদিক থেকে বলতে পারো, আমি আবারও ফিরে আসি, সার্থকতার আমি কিছুই দাবি করব না, সেই দাবির মূল্যায়ন নিশ্চয়ই মহাকাল করবে, তবে এইটুকু আমি বলব যে আমি আমার আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াই করে গেছি। এই কথাটুকু যদি আমার সমাধি বেদিতে উৎকীর্ণ থাকে তাহলে আমি নিজেকে ধন্য বলে মানব।
প্রশ্ন : আশাবাদ প্রসঙ্গে বলছি, ১৯৩৭-এ যখন রবীন্দ্রনাথের অসুখ করল, দুটো দিন সম্পূর্ণ চেতনাহীন অবস্থায় কাটালেন এবং প্রায় মৃত্যুকেই প্রত্যক্ষ করলেন, তার পরের লেখাগুলোতেও এমনকি অন্য পর্যায়ের আর এক আশাবাদের কথা আমরা পাই। প্রান্তিক-এর লেখাগুলোতেও দেখতে পাচ্ছি…
উত্তর : এই খানে যেটা বলছ সেটা এক ধরনের রাবীন্দ্রিক নির্মিতি বা construct. একেবারের শেষ দিকের কবিতাগুলো যদি দেখো, ‘মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে’ অথবা রানী চন্দ-কে যখন তিনি শ্রুতিলিখন দিচ্ছেন তাঁর কবিতা ‘কে তুমি ?/মেলেনি উত্তর’ যার শেষ কথা ‘কে তুমি ?/পেলনা উত্তর’। আমি আজকে রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাগুলোই আমার রক্তমনের হার করে রেখে দিয়েছি যে সব কবিতার মধ্যে কোনও আরোপিত আশাবাদ নেই এবং সেই সব কবিতাই আমি বরণ করে নিয়েছি, বিশেষ করে তাঁর শেষ পর্বের কবিতা―শেষ পর্বের কবিতার মধ্যে একটা অনির্ণেয়তার টঙ্কার… মনে আছে ? দুই বন্ধু মিলিত হয়েছে। তারা যাচ্ছে। একজন সদ্য বিবাহিত। তার মিলনের সমাচার বন্ধুকে নিবেদন করছে। শেষ ষরহবগুলো দেখ―‘টেলিগ্রাম এল সেই ক্ষণে/ফিন্ল্যান্ড্ চূর্ণ হলো সোভিয়েট বোমার বর্ষণে’।

প্রশ্ন : ‘অপঘাত’।
উত্তর : এই যে রবীন্দ্রনাথ যিনি তাঁর গীতাঞ্জলির মূর্তিটাকে অনায়াসে দলে দিয়ে চলে যাচ্ছেন, আত্ম-দেবায়নের যে গরিমা তাকে ভেঙেচুরে দিয়ে মানুষের অবচেতন অস্তিত্বের ছবি আঁকছেন, সে সব ছবি এখনও বাঙালির অন্তর্জীবনে প্রবেশ করেনি। সেই রবীন্দ্রনাথকে আমার অত্যন্ত বড় বলে মনে হয়… ইন্দিরা গান্ধীর প্রযোজিত emergency-র সময় আমাদের উনি নিমন্ত্রণ করেছিলেন রাজভবনে। তিনি বললেন ‘আপনি শান্তিনিকেতনের ছেলে হয়ে এসব বলছেন! রবীন্দ্রনাথের আশাবাদের উপর নির্ভর করেই তো আমরা এগিয়ে চলেছি, নতুন ভারতবর্ষ এগিয়ে চলেছে। আমি বলেছিলাম ওই Leslie Stephen-এর কথা―আপনি হয়তো জানতেন না কিন্তু আপনার পিতৃদেব জানতেন যে nothing is less poetical than optimism’
প্রশ্ন : তার মানে আপনি বলতে চাইছেন বেদান্তের যে কথা, অর্থাৎ আনন্দকে নির্মাণ করে নিতে হবে, সেই দিকে…
উত্তর : খুব সুন্দর বলেছ। এই যে কথাটা দেখ, এটা Eliot-ও বলেছেন, ‘..to construct something/Upon which to rejoice’. … আজকের সকালটা দেখে ভালো লাগছে। এই যে তুমি আর আমি বসেছি, একটা অপূর্ব পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে। একটু আগেই আমাদের এক বন্ধুর সঙ্গে দোতলায় দেখা করে এলাম। চারদিকে ভেবে দেখো আলোক-বসন্ত এল, এখানে নতুন সরকার বদল হলো। এইগুলোকে দেখেই যে আমরা জীবন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি তা তো নয়। আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি একটা অনপনেয় ভরসার উপর ভিত্তি করে ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস, ওরে মন, হবেই হবে’। স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার দেবার ব্যাপারটা থেকে যাচ্ছে। পদ্ম তুলতে গিয়ে কতবার শাপলা নিয়ে বেরিয়ে আসছি। একটা কবির দুর্ঘট হচ্ছে, যখন তিনি প্রকাশ করতে আরম্ভ করলেন তখন তিনি পাঠকের কাছে উন্মোচিত, বলা যেতে পারে নগ্ন। তার জন্য একজন লিরিক কবি যখন কবিতা লেখেন দেহলিতে দাঁড়িয়ে, তার অর্ধেক ঘর অর্ধেক বাহির। অর্ধেক তার সাজঘরের প্রস্তুতি আর অর্ধেক তার বাইরের দিক থেকে যে জীবন এসে প্রবেশ করছে, পাঠকের প্রত্যাশা এসে প্রবেশ করছে, সেইটা। এর শামিল হতে হয়। পাঠক এবং কবি যখন মেলে কোনও এক লছমন ঝুলার সেতুর মাঝখানে (তুমি লক্ষ করবে ওখানে যদি গিয়ে থাকো) সাঁকোটা খুব নড়বড়ে হয়ে থাকে, দুলতে থাকে, মনে হয় এক্ষুনি পড়ে যাবে। তাহলে কি আত্মহত্যা করবে ? নাকি পাঠককে নিয়ে বসে যাবে এক নৌকায় ? অথবা কী করবে ? এই যে অমীমাংসা, বিষ্ণু দে-র ভাষায় বলছি (tension) আততি, সেটাই প্রায় কবিতার ব্যাপার। এবার এখানে আমি আসছি, তুমি খুব সুন্দরভাবে বেদান্তের কথাটা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছ―বেদান্তে বলা হচ্ছে ‘আনন্দময় অভ্যাস্মাত’, আনন্দকে অভ্যাস করে নিতে হয়। ‘বিশ্ব যখন নিদ্রামগন গগন অন্ধকার’ সেই সময়ে একজন কবি যখন লিখতে বসেন, যা নিশা সর্বভূতানি… সারা রাত্রি সারা দুনিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে, কবি লিখতে বসেছেন, তার করতলে তখন সারা বিশ্বের ভার এসে পড়েছে। তিনি কিন্তু সমস্ত জগতের অস্তিত্বের উত্তরণের জন্য একা দায়বিদ্ধ পুরুষ। আনন্দ সৃষ্টি করে মানুষকে এই গ্রহের উপযোগী করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেই দায়বদ্ধতা থেকে যদি কোনও কবি না লেখেন, তিনি মেজর মাইনর বা অনতিগৌণ কবি হয়েই রয়ে যাবেন। সেই জায়গাটা কবির পক্ষে মৃত্যুর … Eliotও বলছেন, তার আগে বেদান্তও বলে দিয়েছে এই কথাটা
প্রশ্ন : আরোপিত আশাবাদ নয় আপনি বলছেন। বলেছেন দায়বদ্ধতার জায়গাতেও কবিকে আসতে হবে। দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গে মনে পড়ছে প্রান্তিক-এর যে শেষ দুটো কবিতা যিশুর জন্মদিনে বসে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন…
উত্তর : শুধু আশাবাদ নয়, শুধু ভাড়া করা আশাবাদ নয়, কিংবা বইতে পড়া বা পূর্বসূরির কাছ থেকে অধীত আশাবাদ নয়, এমন একটা আশার কথা বলতে হবে, ‘আলোও নিজে কেমন যেন অন্ধকারের মতো।’ সেই দ্ব্যর্থ-দ্যোতকতার মধ্যে থেকে যদি না হয় তবে সেই কবিতার কাছে আমরা ফিরবই না। জীবনানন্দের একটা কবিতা যেটা প্রায় একটা বঢ়রপ-এর ভগ্নাংশ, সেখানে তিনি বলছেন ‘কোথায় সেদিন রয়েছিলাম আজকে মনে হয়/সাগর থেকে আরও বৃহৎ আলো দেখেছিলাম। ঠিক তা সাগর নয়।’ সেটা কি ? ‘প্রশান্ত না কৃষ্ণ মেরিন (? ? ?) ভূমধ্যলীন/আরব মহাসাগর তাকে বলে/এখানেতে সাদা ঘোড়ার ভিড়ে/একটি ঘোড়া সূর্য হয়ে জ্বলে’―এই যে ঘোড়াটা সূর্য হয়ে জ্বলছে তার দু চোখে অসীম বেদনা, অসংখ্য মৃত্যুর স্মৃতি অথচ সে হচ্ছে সূর্যের ঘোড়া। সূর্যের সাতটা ঘোড়ার একটা ঘোড়াই মাত্র কবিতা।
প্রশ্ন : ‘কোটরে-রাখা মানব করোটি যে/দেবদূতের টুকরোখানি। এসব জড়ো করতে নিয়ে জাগে/ভুরুর কাছে শিশির, সম্ভ্রম/এবং আমার নির্ধারণে বিচার করার সময় ভীষণ কম’―(টুকরোগুলো জড়ো করতে গিয়ে/ গিলোটিনে আলপনা)
বা
‘যার ভিতরে সব ঘটনা এবং চরিত্রের/স্বতন্ত্র তাৎপর্য আছে, ভাবতে গিয়ে ঢের/দেরি হয়েছে’ (ক্রমান্বয়/গিলোটিনে আলপনা)
‘…কিংবা যদি আনাচে-কানাচে
ভুলের নজির মেলে, তাহলে তো কথার প্রহারে
তিন প্রহরের পূর্বে যতিচিহ্ন পড়বে না রোদ্দুরে
একঠায় দাঁড়িয়ে পায়ে ক্লান্তি নামে মনেও হবে না,’ (আমার ঠাকুমা/যৌবন বাউল)
এই কবিতাগুলোকে সামনে রেখে ভাবযতি এবং পর্বযতির বিচ্ছিন্নতা এবং ছন্দের বিবর্তন সম্বন্ধে কিছু বলুন।
উত্তর : একদিক থেকে দেখলে এখানে sprung rhythm আছে, বাকছন্দ আছে। তুমি দেখবে চারটে stress বা প্রস্বর থাকছে। কোটরে রাখা, এখানে যেমন চারের জায়গায় পাঁচ চলে এল, যেমন ‘যমুনাবতী সরস্বতী’। এটা আদিম এবং আধুনিক।
প্রশ্ন : প্রত্যেকটাই মুক্তদল, পাঁচই হওয়া উচিত।
উত্তর : পাঁচই হচ্ছে। দ্বিতীয়টি স্বরমাত্রিক,―‘যার ভিতরে―৪, সব ঘটনা―৪, এবং চরিত―৪ রের-অপূর্ণপদী/স্বতন্ত্র তাৎ―৪, পর্য আছে―৪ ভাবতে গিয়ে―৪ ঢের―অপূর্ণপদী- পর্ব,/দেরি হয়েছে।’
প্রশ্ন : ওই কবিতাটিতে পর্বযতি আসছে ‘ঢের’ শব্দটিতে, অথচ ভাবযতি আসছে দেরি হয়েছে বলার পর, এখানে আমি জানতে চাইছি ছন্দের এই প্রয়োগ-কৌশলের জটিলতা এবং একই সঙ্গে আধুনিকতার বিষয়ে।
উত্তর : এর মাঝখানে একটা অব্যক্ত বর্ণের কান্না রয়েছে। যেমন ধরো যেটাকে ত্রিতাল বলা হচ্ছে, সেটা কিন্তু আসলে চার পর্বের। চারের ওপর beat-টা হচ্ছে। তা ধিন ধিন ধা/তা ধিন ধিন ধা/তা ধিন ধিন না/তেটে ধিন ধিন―ধা/চতুর্থ যে পর্ব আসছে, ওটা দিয়ে সমাপ্ত করা হচ্ছে। এবং সেই জায়গাটায় দেখবে ভাবযতির একটা ব্যবহার। যতিটা কী ? ‘জিহ্বেষ্ট বিশ্রাম স্থানং যতিঃ’, জিহ্বা যেখানে একটুখানি বিশ্রাম খোঁজে। মানুষ তো একটানা অনেকখানি শ্বাস ধরে রাখতে পারে না, এই যে শুচিশ্রী গান গায়, লক্ষ করবে মাঝখানে যে একেকটা লম্বা অংশ থাকে, তার মধ্যেও কিন্তু গোপনে গোপনে নিশ্বাস নিচ্ছে। একটা জায়গায় গিয়ে একটু থামল, সেই সময় যন্ত্রের একটা অবকাশ রইল। synthesizer এল বা তানপুরা এল বা এখন যেটাকে বলা হচ্ছে ই-রোদ সেটা এল (হাসছেন। সেদিন খবরের কাগজে ইলেকট্রনিক সরোদ হাতে একজন স্বনামধন্য শিল্পীর পুত্রের ছবি বেরিয়েছিল)। এখন এই বিশ্রামটা না পেলে তিনি একেবারে পড়ে যাবেন। একজন শিল্পীর মধ্যে দেখো, তাকে ভাবযতিটা প্রায়ই ঘন ঘন নিতে হয়, যেমন দেবব্রত বিশ্বাস। কেন ? তার asthma ছিল বলে পাছে না কেশে ওঠেন, সেই জন্য।
কবিতায় এই জায়গায় একটা challenge আছে, যেটা আলোক সরকারের সাম্প্রতিক কবিতায় তুমি পাবে। এটা লক্ষ করবে একটা লাইন থেকে আর একটা লাইন যাবার মধ্যে অনেকক্ষণ পাঠককে ভাবতে দেয় আলোক। এই অবকাশটা যে দেওয়া হচ্ছে, এটা নিয়ে আমাদের এক বন্ধু কাজ করেছিলেন যিনি আমাদের শতভিষার ছান্দসিক আচার্য দীপঙ্কর দাশগুপ্ত―rhythm of silence. এই silence-টা ছাড়া কোনও কবিতাই কবিতা হয় না, কোনও গানই গান হয় না। ইউরোপের composition-এ দেখবে o-ver-ture থেকে পরবর্তী জায়গায় আসবার জন্য একটা বিরতি দেয়, disc-এ তারপর নতুন করে যেন একটা অংশ শুরু হলো… এইবার তোমার প্রশ্নের দ্বিতীয় লেখাটা যদি আমি এভাবে পড়ি―‘যার ভিতরে সব ঘটনা এবং চরিত্রের ১২/স্বতন্ত্র তাৎপর্য আছে ভাবতে গিয়ে ঢের ১২(এক টাকে ভেঙেই এক-দুই দ্রুত উচ্চারণ করা হচ্ছে)/দেরি হয়েছে… এবার তৃতীয় কবিতাটিকে এভাবে scan করো ‘কিংবা যদি আনাচে কানাচে ১/ভুলের নজির মেলে, তাহলে তো কথার প্রহারে ১/তিন প্রহরের পূর্বে যতিচিহ্ন পরবে না রোদ্দুরে।’
প্রশ্ন : যৌবন বাউল-এ―
উত্তর : যৌবন বাউল-এ ‘আমার ঠাকুমা’। ‘একঠায় দাঁড়িয়ে পায়ে ক্লান্তি নামে মনেও হবে না’… কবিতা যখন শেষ হয়, Shakespeare-এর ভাষায় বলব the rest is silence… গানের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় ভুল জায়গায় তালি দেওয়া হয়। শেষ হলে তালি দেয়া নিয়ম―অনেকে জানে না শেষ হয়েছে কি ? একজন যদি তালি দেওয়া শুরু করেন বাকিরা সবাই শুরু করে দেন। লক্ষ্য করেছো না (হাসছেন) ? আর একটা ব্যাপার হচ্ছে, লয়টাকে যখন ওপরে তুলে দেওয়া হলো, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ারা সুযোগ নেন, শ্রোতারা তালি দেবে। ভিতরে যেখানে তান বিস্তারের কাজ হচ্ছে সেই জায়গায় কিন্তু তারা তালি দেন না, চুপচাপ তাড়িয়ে তাড়িয়ে শিল্পীর সংগ্রামটাকে উপভোগ করতে থাকেন, তাঁর ভিতর যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, উপভোগ করেন। এর মধ্যে একটা sadism আছে, একটা পৈশাচিক তৃপ্তি আছে দেখবে তুমি, পাঠকের দিক থেকেও… ‘যার ভিতরে সব ঘটনা এবং চরিত্রের’… ঘটনা এবং চরিত্র কেন এক করা হলো ? এখানে ভাববাচ্যতাকে দু-বর্ণ অবকাশ দেওয়া হলো।
এখানে একটা সংযোজনী রাখছি। কবিতার মধ্যে ভাবযতি এবং পর্বযতি কখনও কখনও এক হয়ে যায়। বা পর্বাঙ্গযতি―‘বুক ভরে শুতে যাই শ্রী রাগ ধ্রুপদগম্ভীর’ (অমিয় চক্রবর্তী), শ্রী রাগ, তারপর তুমি ধ্রুপদগম্ভীর-কে বিশ্লিষ্ট করে দিচ্ছ―গম্-ভীর। কিন্তু আরেকটা পড়া আছে―‘বুক ভরে শুতে যাই শ্রীরাগ (শ্রী রাগ এখানে দ্রুত উচ্চারণ করা হলো) ধ্রুপদগম্ভীর’। ‘শ্রী রাগ’, শ্রী…ই…ই পড়লে দুটো মাত্রা হচ্ছে, না ‘শ্রীরাগ’―এখন তুমি কোনটা পড়বে ? অনেক সময় খুব বড় কবি দুটো সুযোগই একসঙ্গে নেন, দু-দিকটা খোলা রাখেন।
প্রশ্ন : ‘প্রথাগত ছন্দ নিয়ে আমার মনে হয় একটু স্বাধীনতা নেবার সময় হয়েছে’―এ কথাও বলেছেন আপনি। আমি একদিন আপনার লেখার জায়গাটায় কাব্যগ্রন্থের বিভাব কবিতাটির ছন্দ সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম―আপনি মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্তের এক যুগলবন্দির সম্ভাবনার দিকে আলো ফেলেছিলেন মনে পড়ছে…
উত্তর : আমি কবিতাটি পড়ছি―‘এখন তারার পিনকুশন হয়ে/রাত আকাশ ঝলে/পালিয়ে গেল অবক্ষয়গুলি/শোভন কৌতূহলে’, ‘পালিয়ে গেল’-র মধ্যে পাঁচ এসে গেছে।
প্রশ্ন : সব-কটাই তো মুক্তদল ?
উত্তর : কবিতার শেষে, ‘মুশকিল ওই লেখার টেবিলটুকু/মস্ত বিশাল বড়’―এখানেও কিন্তু দেখবে এক-আধটা জায়গায় পাঁচ মাত্রার সুযোগ নিয়েছি। আমার আদর্শ উদাহরণ রয়েছে, ‘গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করে॥’ চারের মধ্যে ধরতে একটু অসুবিধা হয়। তারপর ‘যমুনাবতী সরস্বতী’―দেখো ‘কাজিফুল কুড়াতে গিয়ে (এই জায়গাটা দেখো, এখানে ছন্দের ভুল) পেয়ে গেলুম মালা/হাত ঝুমঝুম পা ঝুমঝুম সীতারামের খেলা।’ ‘কুড়োতে কুড়োতে’―এইভাবেই তো ফুল কুড়িয়ে নেওয়া হয়। আলোকও এই স্বাধীনতাটা নিচ্ছেন। এটা প্রথম এনেছেন সাহিত্যের ইতিহাসে Gerard Manley Hopkins, তিনি এটার নাম দিয়েছেন sprung rhythm. এবং sprung rhythm-এর একটা ব্যাপার হচ্ছে, বাক ছন্দটা ঢুকে যাচ্ছে কবিতার মধ্যে, যেমন ‘কাব্যকে খুঁজেছি প্রায় গরু-খোঁজা করে/অনেকদিন খিদিরপুর ডকের অঞ্চলে/’ এখানে ‘অনেকদিন’টা কি বলবে ? বা ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’ ? এখানে ভাবযতি বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে―ফুল ফুটুক না…আ ফুটুক (না-টাকে বিস্তার করা হচ্ছে) আজ বসন্ত। অমিয় চক্রবর্তীর ভিতরেও এটা ছিল। ওই যে বলছিলাম, ‘বুক ভরে শুতে যাই শ্রী রাগ ধ্রুপদগম্ভীর’… মাত্রার সংজ্ঞা হচ্ছে ‘মীয়তে ইতি মাত্রা’―তুমি যেটাকে তোমার নিজের মতো পরিমাপ করে নিচ্ছ, যেভাবে তুমি মাত্রাটা ভাবছো… সাধারণ মানুষ যখন তোমার চারপাশ দিয়ে যাচ্ছে, তার বিপ্লবের ভাষা ধরো এরকম… ‘জ্যোতি বসুর হলে খুন/বাংলা দেশে জ্বলবে আগুন’―জ্যোতি বসুর―চার মাত্রা, হলে খুন―একটা মাত্রা কম নেওয়া হলো, বাংলা দেশে জ্বলবে আগুন―সেখানে পর্বটা কে উড়িয়ে দেওয়া হলো। বাকছন্দের দিক থেকে কিন্তু মাপটা ঠিকই হচ্ছে, এই ভাবেই তো আমরা কথা বলি। তোমাকে আমি মজা দেখিয়ে দেব, এই যখন বলি, তোমাকে আমি মজা/দেখিয়ে দেব, এইভাবে যদি scan করি, তাহলে ছন্দেই কিন্তু কথা বলছি। আমাদের চারপাশের লোকেরা ছন্দেই কথা বলে, সেটাকে stylize করেই ছন্দ। ছন্দ কথাটার একটা মানে হচ্ছে ছাঁদ। সেটা অনেকটা মুদ্রার মতো, কিছুটা গোপন রাখে কিছুটা প্রকাশ করে। নববধূর যে ছাঁদ, ছাদনাতলার যে ছাঁদ, তাতো গোপন রহস্যের মতো। সে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে একটা বৈদিক মন্ত্র বলছে। সে বলছে, আমি যে পতিকুলে যাচ্ছি, সেখানে আমাকে গণ্য করে নেওয়া হোক। অরুন্ধতী তারার দিকে তাকিয়ে সে বলছে, রুদ্ধাহহস্মি (? ? ?), আমি মুক্ত ছিলাম এতদিন, কৌমার্যে ছিলাম, আমার স্বামীর কোলে আমাকে তুমি বন্দি করে নাও। ছন্দটা এই বন্ধন যেটা ছাড়া কবিতার মুক্তিও নেই। তারপর সে চাবিটা পেয়ে যাচ্ছে, সেই চাবিটা খুলে যে পরিসর ঘরের মধ্যে হচ্ছে তাতে তার অনন্ত মুক্তি। শাশুড়ি তার হাতে চাবিটা ধরিয়ে দিলেন।
প্রশ্ন : ছন্দের অলিন্দ ?
উত্তর : ছন্দের অলিন্দ। ছন্দের অলিন্দ থেকেই ছন্দের দিগন্তের দিকে ঝাঁপ দেওয়া যায়।
প্রশ্ন : ‘এই মুহূর্তে যে-মানুষটি চলে যাচ্ছে আমি তাকে মন্ত্রের ভিতরে তুলে নিলাম।
তুমি এক থেকে দশ গোনো আমি তারই মধ্যে দেব তার মাথায় মুকুট,
সূর্যের সম্মান, লক্ষ কাশফুল, আপন অস্তিত্ব থেকে প্রাত্যহিকতার অন্ন,
যে-জ্যোৎস্না কখনো পায়নি কারো থেকে, ছেয়ে দেব ম্রিয়মাণ শিরায় শিরায়,
ছন্নছাড়া―দেব ওর চলনবলনে ছন্দ যা থেকে কখনো কেউ ফিরতে পারে
না মৃত্যুসমতলে’ (বিভাব কবিতা/ নিষিদ্ধ কোজাগরী)
―কী ছন্দ দেবেন তাকে, জানতে ইচ্ছা করছে।
উত্তর : প্রথম যে ছন্দটা আমাদের জীবনে এসেছে, সেটা স্বরবৃত্ত আর পয়ারের সমন্বয়।
প্রশ্ন : স্বরাক্ষরিক ?
উত্তর : হ্যাঁ, স্বরাক্ষরিক। কী রকম জানো, ‘পয়ার’ কথাটা এসেছে ‘প্রকার’ থেকে। প্রকার সংস্কৃত, তার থেকে পয়ার হয়েছে। তুমি কথা বলছো, কথা বলতে বলতে, তুমি তার মধ্যে অনেক কিছুই চাপিয়ে দিতে পারছো… যেমন আমাদের রাগ-সঙ্গীতে এসেছে পতঙ্গ আর চারপাশের প্রাণিদের আওয়াজ―মতঙ্গের বৃহদ্দেশী বলে একটা বই আছে লক্ষ করবে। মধ্যযুগের বই। বৃহদ্দেশী-তে মতঙ্গ বলছেন রাগ সঙ্গীতের জন্ম হয়েছে একেবারেই চারপাশের যে স্তর, তার মধ্যে থেকে, ব্যাঙ ডাকছে কোকিল ডাকছে ঝিঁঝিঁ ডাকছে… বৃহদ্দেশী-র দেশি অর্থাৎ লোকছন্দ। সেই লোকছন্দটাই যখন বাঁধছো, মন্ত্র হয়ে উঠছে। এখানে তুমি দেখবে, ‘কা আ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।/ চঞ্চল চিত্তে (বা, চী এ) পইঠো কাল ॥’
প্রশ্ন : প্রথম চর্যাপদ ?
উত্তর : ‘চঞ্চল চিত্তে’ এখানে কিন্তু স্বরবৃত্ত ঢুকে গেল। (যেমন : ঝর ঝর বরিষে বারি ধারা) তার মধ্যে চঞ্চল শব্দটাতে যখন এসেছে, দেখবে ছন্দের কারাগার ভেঙে সেটা বেরিয়ে যাচ্ছে, ছন্দের মধ্যে সবসময় কিন্তু কয়েকটা জানালা খোলা থাকবে, কবি সদ্য যেটা রচনা করেছেন এই জানলাগুলোর মধ্যে দিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে, কবি সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু চারপাশ থেকে লোকায়ত বাকছন্দ সংগ্রহ করছেন―একজন ধুনুরি টঙ্কার দিচ্ছে, একটি ফেরিওয়ালা চলে যাচ্ছে, একটি ভিখিরি খঞ্জনী বাজিয়ে চলে গেল―এই সমস্ত কিছুতে ঢুকে তাকে অন্তর্গত করে নিচ্ছেন। আমাদের সঙ্গীত সম্পর্কে প্রথম যে শ্রেষ্ঠ বই বৃহদ্দেশী, সেখানে মতঙ্গ স্পষ্ট করে বলছেন, উচ্চাঙ্গ কথাটার মতো হাস্যকর কিছু নেই। লোকায়ত যে একেকটা সুর, আহির ভৈঁরো যেমন হয়েছে,―ভোরবেলা রাখালরা গরুদের চালিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে, তা থেকে একটা সমাহিতির সুর তৈরি হলো। এই মাধ্যাকর্ষণ যদি না থাকে, এটাকে আমরা বলব ভূস্পর্শ-মুদ্রা, যেটা না থাকলে কোনও শিল্পী কখনওই সবার হয়ে উঠতে পারেন না। উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর থেকে একটা গল্প শুনেছিলাম। সবাই আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি গান শুরু করলেন, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল কী করে! উনি বললেন, তোমরা বুঝতে পারলে না ? তোমাদের কাছ থেকে আসতে গিয়ে দেখি কতগুলো পিঁপড়ে দেয়াল বেয়ে উঠে যাচ্ছে, আমি একটু calculate করলাম (calculate শব্দটাই উনি ব্যবহার করেছিলেন) যে একটু পরে বৃষ্টি নামবে, ঠিক সময় বুঝে গেয়েছি। এর মধ্যে খুব একটা মজার ব্যাপার আছে, আমি বলছি না যে ওঁর গানে এটা হতো না, আমার বিশ্বাস যে বৈজু বাওরা বা তানসেন―এঁদের গানে বৃষ্টি হতো, সুরদাস যখন গাইতেন কবীর যখন গাইতেন আমি অনুমান করি বৃষ্টি হতো, পৃথিবীটা শুদ্ধ ছিল তো ecologically পরিপার্শ্ব শুদ্ধ ছিল এবং মানুষ তাদের আবর্জনাগুলোকে স্তূপ করে ফেলে দিত না―তপোবনে যে সমস্ত নিয়ম দেখা যায়, বাইবেলেও দেখা যায়, মোজেস (Moses) বলছেন মানুষকে শুদ্ধ রাখার জন্য মলিনতাকে দূরে রাখতে হবে। যারা ধর্ম প্রবর্তন করছেন বা যারা গাইছেন, তাদের সঙ্গে লোকবৃত্তের সেই মুহূর্তের যোগ না থাকলে সেটা ধ্রুপদী সঙ্গীত হতে পারছে না। এটা ব্যাখ্যা করতে দাও, তুমি দেখবে একটা courtly audience ছাড়া সভা ছাড়া নির্জনতম গান কবি গাইতে পারেন না। দুটো গান তুমি পাশাপাশি রাখো, ‘আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে’, রবীন্দ্রনাথ এই গানটা যখন লিখছেন, সঙ্গে সঙ্গে স্বরলিপি করাচ্ছেন, শেষে তিনি গেয়ে শোনাচ্ছেন (পূর্ণকণ্ঠে অলোকরঞ্জন গানের মুখটি গাইতে শুরু করলেন)… গুলজার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত কি বিশ্বসঙ্গীত ? আমি বলেছিলাম, নিশ্চয়ই―ইউরোপে কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথ-কে বড় সুরকার বলেও মনে করছেন, শুধু বাণী কেন ? গজলও classical বলব, যদিও গজলের ভাষা উর্দু, আরব থেকে এসেছে (এবার উনি বিখ্যাত গজল গায়ক গুলাম আলি-র ‘চুপকে চুপকে রাত দিন আঁসু বাহানা ইয়াদ হ্যায়’ গাইতে শুরু করলেন)―দুটো গানের সাদৃশ্য দেখো―‘চুপি চুপি আমি যে কেঁদেছিলাম, এখনও মনে পড়ে’, সঙ্গে সঙ্গে লোকেরা হাততালি দিয়ে উঠল, হাততালিটা অশ্লীল নয়, কেননা উনি অংশগ্রহণ করেছিলেন, এমনকি মুশায়রা-তেও নির্জনতম বিষাদ যতক্ষণ না ভাগ করে নিতে পারছেন গায়ক, ততক্ষণ তা হয়ে উঠছে না। বৈদিক যুগে ধ্রুপদী সঙ্গীত ছিল না, আরোহ ছিল অবরোহ ছিল না, বৈদিক যুগে ছিল তিনটি স্বর, উদাত্ত অনুদাত্ত স্বরিত। এটা এল মুঘলরা যখন এলেন, পারস্য থেকেও অনেক সুরের ব্যাপার এল, এস্রাজ ইত্যাদি কিন্তু পারসিক যন্ত্র… বৈদিক যুগের ঋষিরা একা একা ঈশ্বরের সম্মুখীন হচ্ছেন, ঈশ্বরকে একা একা আলিঙ্গন করছেন―স্বার্থপর ছিলেন বলতে হয়। মন্ত্রগুলোর মধ্যেও দেখ ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’―আর সবাইকে নিয়ে নয় …এদিকে আবার আকবরের সভার বাইরেও যখন বৈজু বাওরা গান করছেন, তাঁর অজস্র শ্রোতা দরকার হতো। শ্রোতা ছাড়া নিঃসঙ্গতা জমিয়ে উপভোগ করা যায় না। এটা আমাদের মার্গ সঙ্গীতের একটা নির্দেশ।
প্রশ্ন : ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে উপনিষদের ‘অদঃ পূর্ণম্ ইদং পূর্ণাৎ’ (পূর্ণ ওই দূরে পূর্ণতা গভীরে…) শান্তিপাঠের এই স্তোত্রটাতে বাইরের সম্পূর্ণতাকে নেবার কথাও বলা হচ্ছে।
উত্তর : আমি তো শুধু ভিতর নই। বাহিরের সঙ্গে ভিতরের যে টানাপোড়েন তারই একটা পরম্পরা আমি।
প্রশ্ন : অলোকদা, ছন্দ নিয়ে আমাদের কথা শুরু হয়েছিল। সেখান থেকে আমরা চলে গেলাম গানে। সেটা বোধহয় এইজন্য যে কীভাবে লৌকিক ছন্দকে লৌকিক স্পন্দকে সমস্ত শিল্পের অনুকূল করে নিতে হয়, সেই অত্যন্ত দরকারি কথাটা গানকে সামনে রেখে হলে একটা সহজ বোঝাবুঝির জায়গা তৈরি হয়। আপনার নিষিদ্ধ কোজাগরী কাব্যগ্রন্থের ‘বিভাব’ কবিতাটি সামনে রেখে আমার মূল প্রশ্নটা ছিল―কোন ছন্দ আপনি পাঠকের হাতে তুলে দিতে চান ?
উত্তর : হ্যাঁ―এই মুহূর্তে যে মানুষটি চলে যাচ্ছে আমি তাকে ছন্দের ভিতরে তুলে নিলাম। ছন্দের ভিতরে যদি তাকে তুলে নিই তাতে তার অসুবিধা হচ্ছে, সে যখন ছন্দ থেকে বেরোবে তখন তার steppingগুলো তার চলাটা ছন্দবদ্ধ হয়ে যাবে, সে আর কোনওদিন বেচাল চলতে পারবে না। আমার একটা কবিতা আছে, ‘অধমর্ণ’। গড়িয়াহাটের বাজারের একটি লোকের কাছে আমি প্রত্যেক দিন স্থলপদ্ম কিনি। তিনি আমাকে সমস্ত ফুলের পাপড়িগুলো মেলে ধরেন। তিনি সম্প্রতি একটা ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন যে তাকে আমি যেন কবিতায় তুলে নিই। তুলে নিলে তার দুর্গতি হবে। অনায়াসে তার আর পদ্ম মেলে দেবার ক্ষমতা থাকবে না। কতগুলো বাঁধা নিয়মের মধ্যে তার যে স্বাভাবিকতা সেটা হারিয়ে যাবে। তিনি তখন শুধু শিল্পিত স্বভাব নিয়ে চলবেন। ছন্দের মধ্যে একবার যে দীক্ষিত হলো সে আর বেচাল চলতে পারবে না।
প্রশ্ন : কী ছন্দ তুলে দেবেন তার হাতে, কিছু মীমাংসা হলো ?
উত্তর : আমি তাকে নিশ্চয়ই বাকছন্দটাই দেব। বাকছন্দের মধ্যে যে পষধংংরপধষ ছন্দ রয়েছে, দুটো মিশিয়ে তাকে আমি একটা ছন্দ দেব। অথবা একটা ছন্দ আমি তৈরি করব। ধরো একটা ছন্দ ‘শীতের আকন্দ ফুটি-ফুটি/ফুটে উঠল দুটি/শীতের আকন্দ’। যে classical এখানে আমি করছি, ‘শীতের আকন্দ ফুটি-ফুটি (এখানে দুটো বর্ণ আছে ধরে নাও)/ফুটে উঠল দুটি (দুটো বর্ণ, দু বার নিঃশ্বাস নেবে)/শীতের আকন্দ’ শীতের আ/কন্দ (কন্দটা অপূর্ণপদী)
প্রশ্ন : মধ্যখণ্ডন হলো ?
উত্তর : এখানে পর্ব ভাগ হলো …মানুষের যে রকম বাঁচার নিয়ম আছে তেমন নশ্বর বাঙালির তিনটিই ছন্দ আছে। আর একটা হচ্ছে গদ্যের ছন্দ। এখন ধরো, ‘সেখানে ডানা টিউব ট্রেন রাজার প্লেন আর টেলিপ্যাথির গতি/ছাড়িয়ে নীল আকাশে এসে নীল আকাশে নিজের পরিণতি।’ এখন এই জায়গাটাতে জীবনানন্দ গদ্যে বলছেন না ছন্দে বলছেন বলা খুব মুশকিল। অবন ঠাকুরের লেখার মধ্যেও সেটা ছিল, বলছেন যেটা সেটা scan করা যেত, আমরা অবন ঠাকুরের কাছে গল্প শুনতাম।
প্রশ্ন : আপনি বলেছেন তো, যাদের কথা শুনেছেন তাদের প্রত্যেকের কথা scan করতে পারতেন ?
উত্তর : প্রত্যেকের। এমনকি যখন ওর কাজের লোককে শুচিশ্রী বকছে―(বকে না―হয়তো একটু একটু বকেও জানি না আমি) আমি scan করে দিতে পারি।
প্রশ্ন : আপনার কবিতায় তো বলেইছেন, সাইকেল গ্যারেজের ছেলেটার সারাই-এর শব্দগুলোও আপনি scan করে দিতে পারেন।
উত্তর : সেটা আমি পারি। যখন দেখি পারছি না, তখন মনে হয় আমার চারপাশের বলার মধ্যে কোনও গোলমাল হয়ে গেছে… যেমন…থাক এ কথা থাক… রাজনীতির কথায় আসছি না, কারণ তোমাদের যে সর্বদল-নিরপেক্ষ ইমেজ সেটা আহত হবে…এখন লক্ষ করছো, শপিং মল হবার পর তোমার তো ভাষার দরকার হয় না, তুমি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সেই জিনিসটা কিনে নিচ্ছ। ভাষায় আর বাঙালি কথা বলছে না যেটা নিয়ে আমি কাল বলছিলাম (একুশের সভায়, শিশির মঞ্চে)।
প্রশ্ন : এটা নিয়ে আমার নির্দিষ্ট প্রশ্ন আছে
‘অমাবস্যার বধ্যভূমিতে বিবিক্ত এই বিবাহ
মুণ্ডবিহীন তন্বী রাজকুমারী
তার পাশে এক দর্পনীল ভিখারী
প্রেমিকেরা আনে উপহার জ্বর, বারুদ এবং বিরহ’
(টর্সো/ গিলোটিনে আলপনা)
‘অমাবস্যার বধ্যভূমিতে বিবিক্ত এই বিবাহ/মুণ্ডবিহীন তন্বী রাজকুমারী’ এখানে ‘রাজকু’ অংশটির পরে মধ্যখণ্ডন আসছে। অনেকে বলেন মধ্যখণ্ডন syllable যেভাবে ভাঙ্গে সেই ভাবে হওয়া উচিত। সেভাবে দেখতে গেলে ‘রাজ’-এর পর মধ্যখণ্ডন এলে স্বাভাবিক হতো। এভাবেও তাহলে করা যেতে পারে ?
উত্তর : এটা হয়ে গেছে। ‘তার পাশে এক দর্প নীল ভি/ খারি।’
প্রশ্ন : এটাও ?
উত্তর : ‘প্রেমিকেরা নেয়’ এখানে ছয় হয়ে গেল কিন্তু।
প্রশ্ন : ‘প্রেমিকেরা নেয়’ হতে পারে, এখানে সবই মুক্তদল বা অর্ধস্বর ?
উত্তর : এখানে আমি ‘রাজদুহিতাও’ করতাম যদি ‘দু’-এর পরে কাটতে হতো।
প্রশ্ন : আমার প্রশ্ন যেটা specifically আগেই বলেছি ?
উত্তর : তুমি এটা বুঝতে পারছো না কেন ? hint তো আমি দিয়ে দিয়েছি। টর্সো তো।
প্রশ্ন : হ্যাঁ, টর্সো, বিবিক্ত ?
উত্তর : আমি কেটে দিচ্ছি এক-একটা জায়গায়। বোঝাই যাচ্ছে রাজকুমারীর গলাটা তার আগে কাটা হয়েছে। যখন গলা কাটা হয় তখন তো ছন্দ নিয়ে কাটা হয় না। এখানে ছন্দের বিরুদ্ধে ছন্দ, এরকম একটা ব্যাপার হচ্ছে। মালার্মে একটা কথা বলেছিলেন, কবিদের কবি―সরকার আসে-যায়, ছন্দ থাকে। তিনি কিন্তু সবসময় ছন্দে লিখতেন না। বা বোদলেয়ার, অনেক সময় prose-poem অর্থাৎ গদ্য-কবিতা লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের এই লাইনটা ধর, অনেকটাই গদ্য কবিতার মতো, ‘দিনটা যেন খোঁড়া পায়ের মতো, ব্যন্ডেজেতে বাঁধা।’। এর পাশাপাশি যদি তুমি ছন্দ রাখো, ‘মন্থর পায়ে চলেছে মহিষগুলি,/রাঙা পথ হতে রহি রহি ওড়ে ধূলি,/নানা পাখিদের মিশ্রিত কাকলিতে,/আকাশ আবিল ম্লান সোনালির শীতে।/…শীতের বেলায় রৌদ্র তোমার /জানালায় পড়ে বেঁকে।’―ছন্দের কোনও সঙ্ঘাতের ব্যাপার নেই। কিন্তু ধরো, খুব ছন্দ আনবার চেষ্টা করলাম, ‘তোমারে ডাকিনু যবে কুঞ্জবনে,/ তখনো আমের বনে গন্ধ ছিল।/ জানি না কী লাগি ছিলে অন্য মনে,/ তোমার দুয়ার কেন বন্ধ ছিল।’…বাংলা ভাষায় প্রথম স্বরের ওপর জোর পড়ে। আমি যাচ্ছি। ফলে উদুম্বর-টা ডুমুর হয়ে গেছে, অলাবু-টা লাউ হয়ে গেছে। প্রথম স্বরটা তারপর কাটা যায়―উধার, ধার হয়ে গেছে, কাটা চলে গেছে। এটার প্রাকৃত একটা নাম ছিল অপভ্রংশ একটা নাম ছিল, যখন একটা আঘাত এসে পড়ত তাকে বলা হতো ঘত্তা। আঘাত থেকে ঘত্তা কথাটা এসেছে। রবীন্দ্রনাথ গদ্যছন্দ যখন লিখছেন, ‘আমার ছুটি চার দিকে ধু ধু করছে ধান-কেটে-নেওয়া খেতের মতো।’ আমি এভাবে scan করতে পারি, আমার ছুটি/ চার দিকে ধু ধু করছে/ ধান কেটে নেওয়া খেতের মতো/… পত্রলেখা থেকে একটা বই বেরিয়েছে রবীন্দ্র আলোকবর্ষে, একটু দেখে নিও। সেখানে গানের ওপর অনেকগুলো আলোচনা আছে। (বইটার কপি এখনও পাইনি, তাহলে তোমার জন্য নিয়ে আসতাম) সেখানে রক্তকরবী নাটকের গদ্যের passage যেখানে নন্দিনী বলে চলেছে―পুরো passage throughout scan able (একটা জায়গায় শুধু আমি একটা ছোট্ট শব্দ যোগ করেছিলাম)। আমি scan করে দিয়েছি। নন্দিনী বলছে বিশু পাগলকে, তুমি যে আমাকে ভালোবেসেছ বলোনি তো তেমন করে। আজ রঞ্জন জুয়া খেলায় আমাকে নিয়ে চলে গেল, নন্দিনী যেন বলতে চায় you just missed your chance. থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সে বলছে… (না, দুই হাতে দুই দাঁড় ধরে সে আমাকে তুফানের নদী পার করে দেয়; বুনো ঘোড়ার কেশর ধরে আমাকে বনের ভিতর দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায়; লাফ-দেওয়া বাঘের দুই ভুরুর মাঝখানে তির মেরে সে আমার ভয়কে উড়িয়ে দিয়ে হা হা করে হাসে। আমাদের নাগাই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্রোতটাকে যেমন সে তোলপাড় করে, আমাকে নিয়ে তেমনি সে তোলপাড় করতে থাকে। প্রাণ নিয়ে সর্বস্ব পণ করে সে হারজিতের খেলা খেলে। সেই খেলাতেই আমাকে জিতে নিয়েছে। একদিন তুমিও তো তার মধ্যে ছিলে, কিন্তু কী মনে করে বাজিখেলার ভিড় থেকে একলা বেরিয়ে গেলে। যাবার সময় কেমন করে আমার মুখের দিকে তাকালে বুঝতে পারলুম না―তার পরে কতকাল খোঁজ পাইনি। কোথায় তুমি গেলে বলো তো।) রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আমার সেই কবিতাটা কি তোমার কাছে আছে এখানে ? রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও দু বছর আগের একটা বই বেরিয়েছিল। ওখানে মিছিলে চলার একটা ব্যাপার আছে। সেখানে রয়েছে, বহুরূপী নাটকে রক্তকরবীর পরিচালনা করছেন শম্ভু মিত্র, এ-রকম সময়ের (দরকার হলে পড়ে যোগ করে দেব ফোন করে)। দেখো কত কথা মনে পড়ছে, বামনাচার্য বলেছেন ‘গদ্যং কবিনাং নিকষং বদন্তি’ গদ্যই কবিদের নিকষ পাথর। কীরকম গদ্য তিনি বলেন তা থেকেই বোঝা যাবে তিনি কেমন কবিতা লেখেন। এখানেও একটা সেতু তৈরি হচ্ছে, একটা লছমন ঝুলা তৈরি হচ্ছে। হোমারের যে কবিতা, তাতেও একেকটা জায়গায় আঁকাবাঁকা এলোমেলো নানা রকম ব্যাপার আছে। সফোক্লিসের যে কোরাস, সেই কোরাসের মধ্যে এইটা লক্ষ করা যায়…।
প্রশ্ন : ছন্দের ক্ষেত্রে এই licenseটা তাহলে প্রয়োজনে নিতে পারি আমরা। ‘মধু মাঝির ওই যে নৌকো/ খানা’ এভাবে মধ্যখণ্ডন হতে পারে আবার ‘মুণ্ডবিহীন তন্বী রাজকু/মারী’ এভাবেও হতে পারে।
উত্তর : হ্যাঁ, এখনও আমরা যদি একটু উদার না হই তাহলে অসুবিধা হবে। জগৎটাকে কবিতায় রূপান্তরিত করতে পারব না।
প্রশ্ন : একটা কবিতা প্রচলিত ছন্দে, মুক্ত ছন্দে না-কি গদ্যছন্দে―কীভাবে লেখা হবে, এই ভাবনা রচনার কোন পর্যায়ে স্থির করেন ? অনুভূতির পরিবর্তনের সাপেক্ষে ছন্দকাঠামোর পরিবর্তনের কথা কীভাবে ভাবেন ?
উত্তর : অনেক সময় প্রথমে একটা ছন্দময় শুরু মনে এল। এটা হয় যে কলমটা যখন কাগজের মধ্যে এল তখন সেই ছন্দ-টা বদলে গেল। একটি রাজমিস্ত্রি শুনলাম আর একটি রাজমিস্ত্রিকে বলছে, ‘কাল যের’ম এসেছিলি তেমনি আসবি কাল’। আমার মধ্যে ওমনি একটা কবিতা শুরু হয়ে গেল। আমি ওখানটায় বদলে নিলাম, ‘কাল যেমন এসেছিলি তেমনি আসিস কাল’ … সিন নামের (Seán OÕCasey) একজন আইরিশ নাট্যকার ছিলেন, উনি একটি গোপন মাইক্রোফোন নিয়ে চলতেন, লোকজনের কথাবার্তা dialogueগুলোকে তুলে নিতেন। সমস্ত ছন্দময় সংলাপ। এখন, ‘কাল যেমন এসেছিলি তেমনি আসবি কাল’ এই দুটো লাইন তারা তোমায় দিয়ে চলে গেল, বাকিটা তুমি পূরণ করো। ‘আর তখনি আমার হাতে যেন, জ্বলবে রংমশাল’, এইটা তুমি যোগ করলে। সবচেয়ে সুবিধা হয়, একজন সহ নশ্বর যদি কথা বলতে বলতে তোমার হাতে একটা ছন্দ জুগিয়ে দেয়। না হলে স্টুডিয়োর মধ্যে তুমি যখন একটা ছন্দ তৈরি করছ সেটা করতে গিয়ে দ্বিগুণ একটা সৃষ্টির বেদনা অনুভব কর যে কোন ছন্দটা তুমি তৈরি করবে যা মানুষের কাজে লাগবে। এইটা যখন আমি করি, আমার খুব সুবিধা হয় যে একজন কেউ আমায় এটা ধরিয়ে দিল (‘কাল যেমন এসেছিলি তেমনি আসিস কাল’)। অবশ্য তুমি কখনও কখনও দেখবে যে আমার কবিতায় বলতে বলতে একটা গদ্যের passage -ও এসে গেছে মাঝখানে, তারপর শেষ লাইনটা শুধু ছন্দে এল আলাদা করে, তার কারণ অপচ্যুতি তো আছেই। আমরা যখন রেগে যাই আমরা যখন ভালোবাসি, রাগের মধ্যে দু একটা কথা অতিরিক্ত বলে ফেলি তারপর শমিত করে আনি নিজেকে, ‘আ চ্ছা ঠিক আ ছে।’
প্রশ্ন : রচনার প্রথম পর্যায়েই স্থির হয়ে যাবে ?
উত্তর : লিখতে লিখতে। বলা যেতে পারে দ্বিতীয় ঝোঁকে দ্বিতীয় স্তবকে দ্বিতীয় লাইনে কিংবা দ্বিতীয় অংশে মানে সঞ্চারিতে অন্তরাতে। অন্তরার মুখে ওটা ঠিক হয়ে যায় আবার কোনও কোনও জায়গায় ওটা ঠিক হতেই চায় না। আলোকের ব্যাপারটা বুঝতে পারি ওর একটা লাইন ছন্দে আসে তারপর ও সেটাকে deconstruct করে বিনির্মাণ করে। ও যেরকম ভাবে ভাঙে, মানে ছন্দটাকে ভেঙে দেয়, আমি ইচ্ছে করলে ও যে শব্দগুলো ফেলে দিল, ওর waste paper বাক্স টেনে ওই কবিতাটিকেই পয়ার বা মাত্রাবৃত্ত করে দিতে পারি। ও রেগে যাবে, আমার সঙ্গে কথা বলবে না অনেকদিন সেই সম্ভাবনা আছে কিন্তু।
প্রশ্ন : আপনি বলেছেন ‘চারদিকে যে কাণ্ডকারখানা ঘটছে কবিতা হবে তার ভূকম্পলেখ’―সময়ের কাছে বাগদত্ত থাকতে চান আপনি। কবিতায় স্থান-কালের আভাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর : কবিতার যদিও একটা সংজ্ঞা দেওয়া হয় ‘নিয়তি-কৃত নিয়ম রহিত’ নিয়তির নিয়ম সেখানে খাটে না। আলাদা একটা জগৎ তৈরি হয়। কিন্তু কবিতাও একটা নিয়তির জগতে বাস করে এবং তার চারপাশে যা ঘটছে…আমি দেখি চশারের মতো এ রকম মহাকবি আছেন যিনি সমকালের যন্ত্রণাগুলোকে বাদ দিয়ে গেছেন। যে আলোক রবীন্দ্র পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে তার যুগচেতনা প্রমাণ করেন সেই আলোক কবিতার মধ্যে সমকালের ঘটনা উল্লেখ করবেন না। এটাতে শুদ্ধতার ব্যাপার আছে। যে আরচিবাল্ড ম্যাক্লিশ (Archibald MacLeish) ভিয়েতনামের যুদ্ধে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি তাঁর কাব্যনাটক কিংবা কবিতায় একটাও কিন্তু সংগ্রামী অঙ্গীকার প্রকাশ করবেন না। কবিতাকে শুদ্ধ রাখার একটা ব্যাপার কাজ করে। আমি একটু ধুলোকাদা মাখতে চাই। আমার জামাটা ধুলো মাখা ইথারের জামা। আমি এমন সময় জানি না যে আমি সমকাল কে নিয়ে লিখিনি। যৌবন বাউলে-ও একটা কবিতা দেখবে যখন চিনের অন্তর্গত হয়েছে তিব্বত, আমি লিখেছি, ‘পাঞ্চেন লামা যাই বলুন বাঁধা দিন কি না দিন’―একটা কবিতা আছে শেষের দিকে, দেখ। সেখানে কিন্তু আমি প্রতিবাদ করছি। তারপর থেকে ক্রমশ বিশেষ করে যখন গাল্ফ যুদ্ধ হলো সম্ভবত আমিই একা নিধিরাম সর্দারের মতো প্রতিবাদ করেছিলাম। অনেক উদ্বাস্তু আমার সঙ্গে থেকেছেন। তাদের সাথে জীবন যাপন করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, যেমন আডর্নো (Adorno) বলেছিলেন Auschwitz-এর (অঁংপযরিঃু) নাৎসি নির্যাতনের পর্বের পরও কি লিরিক কবিতা লেখা সম্ভব ? কখনওই না (To write poetry after Auschwitz is barbaric)―। এই প্রশ্নটা আমার কাছে জ্বলন্ত এল যখন আমেরিকা গাল্ফ আক্রমণ করল। সেই সময় আমি চুপ করে বসে থাকব! আমি জানি আমি যা লিখছি তার অনেকখানি অংশই মহাকালের বুকে ঝরে যাবে কিন্তু ঝরে গেলেও আমি যদি সময়কে না ছুঁয়ে থাকি নিজেকে মার্জনা করতে পারব না। তুমি জানো যে আমার মধ্যে একটা মার্ক্সবাদের ব্যাপার আছে, তা সত্ত্বেও আমার মনে হলো সরকার কিছু ভুল করছেন এবং যাদের অনেকের সম্বন্ধে আমার মনে একটা কোমল কোণ আছে তারা ভুল করছেন। তখন আমি লিখলাম ‘গোলাপ এখন রাজনৈতিক’। এটা আমি জানি যে আমার কবিতাপ্রেমী বন্ধুরা আমাকে ভালোবাসেন বলে হয়তো কিছু বলছেন না কিন্তু তাদের মনে একটা অভিমান জমে উঠতে পারে। হয়তো মালার্মে আমার সঙ্গে দেখা হলে বকতেন ‘এগুলো তুমি কী করছ অলোক ?’ আমি যখন রবীন্দ্রনাথের আভায় লালিত হয়েছি তখন আমি কিন্তু সাম্যবাদের আন্দোলনেও যোগ দিয়েছি।
প্রশ্ন : আপনি তো ঘুরেও বেড়িয়েছেন গ্রামে-গ্রামে ?
উত্তর : হ্যাঁ, ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি নানা গ্রামে। অক্ষরব্রহ্মের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষরব্রহ্মের সঙ্গেও আমার খুব ভালো একটা জবর-দোস্তি আছে।
প্রশ্ন : আপনি তো উপনিষদের একটা তৃতীয় ভাষ্য এনে দিলেন ?
উত্তর : তাই তো, দোস্তি (হাসছেন)। আচ্ছা একটা কবির ক-টা কবিতা থাকে বলোতো ?
প্রশ্ন : বলেছিলেন, পাঁচটা কবিতা থাকলেই যথেষ্ট। অনেকেরই সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলেছি আমি। তাঁদের মত অলোকদা এই সংখ্যা পেরিয়ে অনেক নিশ্চিন্ত দূরত্বে আছেন।
উত্তর : এটা গটফ্রিড বেন (Gottfried Benn))-এর কথা।
প্রশ্ন : দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে কাব্যগ্রন্থের বিভাব কবিতাটি, ‘আজ দেখি…আমার পার্বণ।।’ মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছে ওই বইটার ‘মাধ্যাকর্ষ’ কবিতার ‘মানুষ কোথাকার!’ এই লাইনটাও। মনে হয় আপনার সমগ্র অস্তিত্ব মথিত করে রয়েছে মনুষ্যত্বের এই বোধ এবং তার বিস্তৃত নিয়ত-সম্প্রসারণশীল চরাচর।
উত্তর : আমি তো মানুষ হয়েই জন্মেছি। কতখানি মানবজমিন আমি ব্যবহার করতে পারি, কতটা আবাদ করে সোনা ফলাতে পারি সেটা একটা লক্ষ্য থাকবে আমার। কিন্তু মানুষের সর্বস্বতা নিয়ে, একাধিপত্য নিয়ে আমার মনে সংশয় জেগেছে। মানুষ নিসর্গকে হত্যা করেছে, মানুষ নিউক্লিয়ার যুদ্ধ বাঁধিয়েছে, মানুষ ঈশ্বরের সরণিটাকে বারবার লুপ্ত করে দিয়েছে। তাই যদি হয় দীপকরঞ্জন, তাহলে man is a measure of all things বলে এক গ্রিক দার্শনিকের যে কথা আছে, মানুষ সবকিছুর মাপকাঠি, সেটা মানতে আমার খুব অসুবিধা হচ্ছে। দালাই লামা একবার বলেছিলেন মানুষ না থাকলে বিশ্বচরাচর আরও পবিত্র থাকত, আমি বললাম সেদিন।
প্রশ্ন : হ্যাঁ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে বলছিলেন ?
উত্তর : যার জন্য ecology ব্যাপারটা আসছে। এই শব্দটা আসছে oikos এবং logos থেকে। মানে বিশ্ব এবং মানুষ প্রকৃতি এবং মানুষ পশু আর মানুষ একই বাড়িতে থাকবে। আর logos―তার বাণীটা তার তত্ত্বটা। মানুষ তো worst ecological animal। দোয়েল পাখিদের দেখে এক্ষুনি অলকবাবু দুঃখ করে বলছিলেন, সবাই নির্বিচারে নোংরা ফেলে যাচ্ছে তোমাদের সামনের ঝিলটাতে। আর একটা কথাও মনে হয়, মানুষের অসহায়তার কথা। ‘দেখেছি যা হ’লো হবে মানুষের যা হবার নয়’―জীবনানন্দের … এখন আমার মনে হয় যে মানুষ একটু বেশি ধ্বংসাত্মক আবার অন্যদিকে আমার মনে হয় মানুষের মধ্যে একটা দিব্যতা আছে। সব মিলিয়েই মানুষ। আজকে যে দিন যাপন করবে, তুমি যখন পৌঁছবে তোমার কাজের জায়গায়, তোমার চারপাশে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোকে রেখে তুমি পৌঁছবে সেখানে। তুমি যখন দীপকের (কবি দীপক রায়) সঙ্গে বসবে, একটা সমাহিতি তৈরি হবে আজকে সন্ধেবেলা। তুমি দেখবে যেতে যেতে তোমার পাশের কামরায় লুটতরাজ হচ্ছে ধর্ষণ হচ্ছে, একজন শিক্ষককে ধরে মার দিচ্ছে। তুমি তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারো না, ঈশ্বর পারেন কি না সেটা দ্বিতীয় প্রশ্ন। আমি মানুষের এই সীমাবদ্ধতার কথাটা খুব বেশি ভাবছি। ঈশ্বরকে নিয়ে আমার অভিমান আছে। ঈশ্বর যদি নাও থাকতেন তাহলেও আমার ঈশ্বর দরকার ছিল। একজন বড় অস্ট্রেলীয় কবি, তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি বইটা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করেছেন, এটা কি আপনার construct? তিনি বলেছিলেন আমি ঈশ্বরের construct। তিনি কিন্তু ভক্তির কবি নন। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার এটাও মনে হচ্ছে মানুষ হয়ে না জন্মালে আমি তো কবিতা লিখতে পারতাম না। ঈশ্বর আমাকে দয়া করেছেন কিন্তু এটাও হতে পারে একদিন আমি আর পারব না। একটা উদাহরণ দিই। আমার এক মাস্টারমশাই ছিলেন শশীভূষণ বাবু, তাঁর তখন খুব অসুখ হয়েছে। তাঁকে বলেছিলাম, আপনি বলবেন dictation দেবেন। আমরা লিখে নেব। তিনি বললেন, অলোক নিজের হাতে যদি লিখতে না পারি খুব অসুবিধা হয়। আমি না লিখতে পারলেও যদি computer এর আশ্রয় নিই, হয়তো লিখতে পারি কিন্তু আমি সেটা চাইব না। এমন যদি কোনওদিন হয় দীপকরঞ্জন যে আমি আর লিখতে পারছি না হাতের লেখায়… অমিয় চক্রবর্তীর হয়েছিল, তখন তিনি যেসব dictation দিয়েছিলেন তার মধ্যে তিনি নেই। কালি কলম মন লেখে তিনজন। মানুষকে ঈশ্বর দিয়েছেন সেই ক্ষমতাটা ‘পাখিরে দিয়েছ গান, গায় সেই গান,/ তার বেশি করে না সে দান।/আমারে দিয়েছ স্বর, আমি তার বেশি করি দান,/আমি গাই গান।/’ … আমাকে স্বরটা তিনি দিয়েছেন।
প্রশ্ন : তারপর আমি সেটা বাড়িয়ে নিয়েছি ?
উত্তর : হ্যাঁ, ‘আমি গাই গান’। আমি গান গাইতে পারছি। মোজার্ট-এর ম্যাজিক ফ্লুটের মধ্যেও পাখিদের সুরের নানা ব্যাপার আছে, যেমন ধরো পাভরত্তি গান করেন কিন্তু তার মধ্যে পাখিদের গান মিশে যায়, সিংহ-এর ডাক, সমস্ত কিছু মিশে যায়। কিছুটা এখানে অনুকরণের ব্যাপার আছে। কিন্তু তার মধ্যেও একটা যোজনার ব্যাপার থাকে। এই যোজনাটুকুই শিল্প। রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে তুমি লক্ষ করবে অনেক জায়গায় যেসব স্বর লাগে না যে রাগে, সেগুলো তিনি বসিয়ে দিয়েছেন। সেটা যদি রবীন্দ্রনাথ করতে পারেন তবে আজকে যিনি classical গান করছেন তিনি আজকের অস্তিত্বের সমস্যার কথা বুঝে কেন একটু স্বাধীনতা নেবেন না ? আমি রবিশঙ্কর আলি আকবরের সঙ্গেও এ ব্যাপারে কথা বলেছি।
আমাদের মধ্যে খাদ থাকেই কিন্তু হাতটা বাড়িয়ে আছি আলোকলতা ফুলের মতো আকাশের দিকে, আমি মানুষকে কখনওই পাতালের দিকে নিয়ে যাব না। এমনও হতে পারে আমি বিপাকে পড়েছি জানো, আমি সত্য থেকে সরে গেছি কিছুক্ষণের জন্য,… সেটা চলতেই থাকবে কিন্তু কবিতায় আমাকে শুদ্ধ থাকতে হবে, কবিতায় আমাকে একটা জায়গায় পৌঁছোতে হবে যে জায়গাটা মনুষ্যত্বের প্রতিফলন। তার সঙ্গে সুন্দরের সোনার কাঠিটাও থাকবে নইলে তাকে কবিতা বলে আমি স্বীকার করব না। এটা মধুসূদন দত্তের কবিতায় আছে অনেক সময়। চতুর্দশপদী কবিতাগুলোতে দেখবে তিনি তাঁর শৈশবের স্মৃতির জায়গাগুলোতে বলছেন নবমী এসে গেছে …বোঝা যায় যে চারপাশ সম্পর্কে তাঁর চেতনাটা কাজ করছে। বড় মানুষদের নিয়ে, যেমন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, এঁদের নিয়ে তিনি অনেকগুলো কবিতা লিখেছেন। ওই কবিতাগুলোই বেশি। তাঁরা যখন তাঁর পিছনে দাঁড়ান, অনেক নৈরাজ্যের দিকে গিয়ে অনেক মদ খেয়ে ফেললেও তাঁদের প্রশ্রয়টা যে থেকে যায়―শোনো, পকেট থেকে টাকা দিয়ে বললেন, আজ একটু খেয়ে এসো, কেন ? ওই যে, ‘মানুষ কোথাকার!’
প্রশ্ন : আপনি লিখেছেন, ‘গোপন কান্নার মতো ঘুণাক্ষরে আমার ভিতরে বুদ্ধ বাড়ে’ (প্রাণী/গিলোটিনে আলপনা)―বুদ্ধ সম্বন্ধে আপনার অন্তরঙ্গ ভাবনার কথা জানতে চাইছি।
উত্তর : বুদ্ধকে জাতক-বৃত্তের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল, কখনও শয়তান, কখনও শ্রমণ, লক্ষ-লক্ষ জন্মচক্রের মধ্য দিয়ে। BESHAM বলে একজন ঐতিহাসিক বলেন, কোনও কিছু অতীন্দ্রিয় কাজ বুদ্ধ করেননি।
প্রশ্ন : ওঁকে যাজ্ঞবল্ক্যের উত্তরসূরি বলেছেন অনেকে, উনিও মেধাকে এবং বোধি-কে মেলাতে চেয়েছিলেন।
উত্তর : আমি অত দূর যাব না। বুদ্ধর কাছে যখন একজন মা এসে বলল, আমার ছেলে মারা গেছে তুমি আমাকে সান্ত্বনা দাও, উনি বললেন প্রতিবেশীদের বাড়ি যেতে। বললেন, যে বাড়িতে শোক নেই একমুঠো তিল নিয়ে এসো সেখান থেকে। সন্ধেবেলা যখন সেই মহিলা এলেন, বুদ্ধ বললেন, শোনো মা… মহিলা বললেন, আমি সান্ত্বনা পেয়ে গেছি। শোক সব জায়গায় আছে। বুদ্ধের এই যে সৌজন্য, ইঊঝঐঅগ বলছেন এটাই তাঁর miracle. যিশু কিন্তু অনেক BESHAM ঘটিয়েছেন। বুদ্ধের সমস্ত কিছুর মধ্যে একটা ভূস্পর্শ-মুদ্রা আছে, মাটি ছুঁয়ে আছেন। বুদ্ধ এমন একটা জায়গা থেকে জীবনকে দেখেছেন, এমন involved হয়ে দেখেছেন―এখন কেন সারা জগতে সবাই বৌদ্ধ ধর্ম নিচ্ছে (ভারতবর্ষে নয়, ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত) ? তার কারণ মানুষের যন্ত্রণাকে এইভাবে আর কেউ সম্বোধন করেনি। এই ধর্মের একটা থেরাপিগত দিক আছে, আর কোনও ধর্মে এটা নেই, হিন্দু ধর্মে তো নেই-ই। বুদ্ধের যে প্রাণি-সত্তা এটা আমার দারুণ ভালো লাগে। জাতকের একটা ফ্রেসকোতে আছে বুদ্ধ একটা হাতি হয়ে মৃত্যুকে পদ্ম ভেবে এগিয়ে যাচ্ছেন। এই কবিতাটিতে ওই ফ্রেসকোটার একটা প্রভাব আছে। তুমি কি জানো হাতিরা প্রত্যেকে একা একা মৃত্যুর দিকে যায় ?
প্রশ্ন : না, আমি জানতাম না।
উত্তর : সারা দিনের শেষে তোমার কি মনে হয় না, কত চারদিকে সমস্যা, তুমি কিছুই সমাধান করতে পারোনি ? সেজন্য বুদ্ধ বা বিবেকানন্দ বারবার জন্ম নিতে চেয়েছেন যেন একটি প্রাণিরও যন্ত্রণা অশমিত না থাকে, সেই জায়গা থেকে তাঁকে আমার অদ্ভুত ভালো লাগে। দু-রকম বুদ্ধ, এক বুদ্ধ ভালোবেসেই ভিক্ষাপাত্র নিয়ে গোপীর কাছে দাঁড়িয়েছেন। খুব বিশাল হয়ে গেছেন। এটা ঠিকই তাঁর ওপর অভিমান হয় তিনি গোপাকে রেখে চলে গিয়েছিলেন। রাগ হয় মারধোর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ওই যে ফিরে এলেন, তাঁকে খুব প্রেমিক বলেও আমার মনে হয়। সে আমার পুত্র হতে পারত সে আমার পিতা হতে পারত। একজন মানুষের সমস্ত প্রাণি হয়ে জন্মানোর যে অধিকার, এই ব্যাপারটা কোনও যাজ্ঞবল্ক্য বা কোনও বিশ্বামিত্র বা কোনও বৈশিষ্ট্যের নেই, তাঁরা এক একটা সত্তার মধ্যে থেকে গেছেন … অনেক সন্ন্যাসীর জীবনে অনেক ঋত্বিক-এর জীবনে দেখা যায় যে আগের জন্মে কোনও একটা ভুল ছিল, অনেক saint Zuviv sinner আসলে, অনেক সন্ন্যাসী ছিলেন পাপী, যেমন Saint Augustine. সমস্ত পাপী-তাপীর দায়িত্ব নেবার ব্যাপার ছিল ওঁর (বুদ্ধ) মধ্যে। বুদ্ধকে masculine বা feminine না ভেবে আমি প্রেমিকা হিসেবে ভালোবাসতে পারি। আমি একটি মেয়েকে দেখেছি, সে আমার ক্লাস-এ পড়ত, এমএ ক্লাসে। সে মেয়েটিকে আমি দেখতাম ‘চোখ দুটো বুদ্ধের করুণ আঁখি দুটি’। আমার এত ভালো লাগত… সে কথা একদিন তাকে বলেছিলাম। বুদ্ধ নারী না পুরুষ তা ভাবছি না, সেই মেয়েটিকেও নারী না পুরুষ ভাবিনি। তাকে বুদ্ধের মতো দেখতে, এর থেকে বিরোধাভাস আর কী হতে পারে! আমি বুদ্ধকে নিয়ে ঘর সংসার করব, এ তো হতে পারে না…আবার আমার পছন্দ হয় না, আনন্দকে যখন বলছেন কোনও নারীকে যেন কাছে ঘেঁষতে না দেওয়া হয়। আমি যখন তাঁকে দেখি, তার বদগুণগুলো ঝরিয়ে দিয়ে তাঁকে দেখি আমার চরিত্র হিসেবে। আমার মনে হয়েছিল সমস্ত মানুষের সমস্ত জীবের প্রতিনিধি তিনি। আমি যদি নারী হই সে আমার জঠরে জন্ম নিয়েছে।
প্রশ্ন : ‘সদয় ভদ্রমহোদয়, দেখুন এখানে একটা কমা ব্যবহার করেছি’। জার্মান কবি হোল্ডারলিনের ভাষ্যে আপনি যখন এই সংলাপ রচনা করেন ‘নিয়তি ও দেবযান’ নাট্য-কোলাজটিতে, তখনি একটা নির্মাণ-সচেতন কবিচেতনার ওপর আলো এসে পড়ে। এই নির্মাণ-নিবেশ নিয়ে কিছু বলুন।
উত্তর : এখানে আলোকের একটা বড় theory আছে, প্রকৃত যা প্রাকৃত তা সৃষ্টি নয়। প্রকৃতি অগোছালো হয়ে আছে। সেখান থেকে যতটা তুমি সরে আসতে পারবে ততটাই তুমি শিল্পী। এবং শিল্পটা আলোক বলেন বানিয়ে তোলা একটা ব্যাপার। নির্মিতি। আমি ততটা যাব না, আমি শিল্পকে নিয়েই স্টুডিওতে আনতে গিয়ে কিছু কিছু অংশ তার ঝরিয়ে দেব। ঝরিয়ে দিয়ে স্টুডিওতে আনব। তার চেহারার ওপর খোদাই করে আমি এদিক-ওদিক করে দেব। কোনও কিছু শিল্প হয়ে উঠছে যখন চারদিকের জীবনকে তা syntax দিচ্ছে। চারদিকের জীবনের কোনও syntax নেই―কোনও কমা নেই সেমিকোলন নেই কোলন নেই। (হোল্ডারলিনের মতো) একজন বোহেমিয় যুবকও ভাবছে, আচ্ছা এই জায়গায় কমাটা কি ঠিক বসালাম ? একজন তরুণ কবি আমাকে জিজ্ঞেস করল, অলোকদা, শেষ লাইনটা কি এখানে থাকবে ? তার কিন্তু সবসময় সমস্যা, তার সংস্কার, আমি যে ভাবে কমাটা বসাচ্ছি আমি যে ভাবে punctuation করছি চিহ্নায়ন করছি তার ওপর বিশ্বের শান্তি নির্ভর করছে, এটা না হলে হবে না।―কী এসে যাচ্ছে বিশ্বের! ইরাকে এসে সাদ্দামকে খুন করে দেওয়া হচ্ছে, পিশাচের মতো বোমা ফেলে চলে যাচ্ছে। লাদেনকে যেভাবে হত্যা করা হলো, কল্পনা করতে পারো ? এইখানেই শিল্পীর মহত্ত্ব। তিনি ভঙ্গুর, তিনি মারা যাবেন। তিনি খুব seriously ভাবছেন তার ওপর বিশ্ব-শান্তি একটু-একটু নির্ভর করছে। তিনি কিন্তু লোকটা খুব গোলমেলে, হয়তো তিনি তার স্ত্রীকে খুব অবজ্ঞা করেন। এইরকম যে লোক তিনি, দেখবে শিল্পের কাছে কিন্তু জুতোটা মন্দিরের বাইরে খুলে এসে ঢুকছেন ঘরে। আমাদের চেনা চারপাশে এরকম বেশ কয়েকটা চরিত্র আছে।
প্রশ্ন : ‘আমাকে অপৌরুষেয় সৃষ্টির দায়িত্ব নিতে হবে―’
(আমি তার হব না জনক/ গিলোটিনে আলপনা)
আমরা জানি বেদকে অপৌরুষেয় রচনা বলা হয়। এই লাইনটি নিয়ে কিছু বলুন ?
উত্তর : ‘আমাকে অপৌরুষেয় সৃষ্টির দায়িত্ব নিতে হবে’। একটা theory আছে, আমার নিটসের (? ? ?) কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। শিল্পীই একা শিল্প রচনা করে না, শিল্পও কিন্তু কবিকে রচনা করে। তুমি যেভাবে কবিতাটা লিখতে বসলে, কবিতাটা অন্যদিকে চলে গেল। Thomas Hardy-র স্ত্রী তার বান্ধবীকে লিখছেন, আজকে আমার স্বামীর মনটা ভীষণ ভালো, আজকে সবচেয়ে দুঃখের কবিতাটা লিখবেন অর্থাৎ মহৎ সৃষ্টির ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না শিল্পীর। তখন তিনি কিছুই নন, তিনি non-entity almost. He is a-human. সুনীলের একটা লাইন আছে, ‘সে কি লেখে কবিতা ? না কবিতা রচনা করে তাকে ?’ negative capability বা নঞর্থক সামর্থ্যরে ব্যাপারটা হচ্ছে তুমি লিখতে শুরু করলে একটা জায়গায় কিন্তু কলমটা তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে আর একটা জায়গায়। তুমি কলমটা অনুসরণ করে চলেছো অনেকটা প্লানচেটের মতো। কলমটা লিখছে। সেই সৃষ্টিই বড় যেখানে কর্তৃত্বের কোনও সিলমোহর থাকে না, যেমন অজন্তায় তুমি দেখবে। অপৌরুষেয় শব্দটা আমি সেই অর্থে ব্যবহার করেছি।
প্রশ্ন : আপনি বলেছেন ‘বক্তব্যের কবিতায় নয়, কবিতার বক্তব্যে আপনার বিশ্বাস।’ কবিতার বক্তব্য কীভাবে উঠে আসে ?
উত্তর : আরচিবাল্ড ম্যাক্লিশ (Archibald MacLeish) বলছেন, ‘A poem shall not mean but be’ একটা কবিতার কোনও মানে হবে না, সে হয়ে উঠতে থাকবে। একটা কবিতা লিখতে গিয়ে আমি শুরুতে একটা কথা বলতে চেয়েছি কিন্তু লিখতে লিখতে তার একটা নিজস্ব বিবর্তন হয়েছে। সেই বিবর্তনটা কিন্তু আমার অভিপ্রেত হচ্ছে না সবসময়। এই জায়গা থেকে আমি বলছি যে কবিতার মধ্য থেকে যে বক্তব্যটা আমরা পাচ্ছি তখন কিন্তু একটা কোনও নির্দিষ্ট message আমি পাচ্ছি না―‘জয় অস্তসূর্য জয় আলোক হৃদয়ের জয়’। (? ? ?) কোনটা বড় হলো ? এমপেডোক্লেস (Empedocles) বলেছিলেন, প্রেম আর অপ্রেম মিলিয়ে একটা বিশ্ব আছে। তেমন যদি একটা বিশ্ব থাকে যে কোনও একটা message-এর ওপর সেটা দাঁড়িয়ে থাকছে না। সেই message-টার ভিতরে মিশে যাচ্ছে ambivalence. কবিতার মধ্যে একটা ambivalence থাকে একটা প্রতীপ-সম্মিতি থাকে―সদা সত্য কথা বলিবেক, এটা সে বলে না।
প্রশ্ন : পূর্বনির্ধারিত কোনও বক্তব্য নিয়ে কবিতা লেখার ভাবনা আপনার সমর্থন পাচ্ছে না ?
উত্তর : Felinii ছবিতে। (? ? ?) কোনও গল্প বা কোনও বক্তব্য ছাড়াই শুরু করে দিলেন। সুন্দর জীবন। এই প্রথম তিনি করলেন একটা বক্তব্য ছাড়া ছবি। যখন তুমি মোনালিসার কাছে দাঁড়াও বক্তব্যটা কী বোঝার কোনও উপায় নেই― মোনালিসাতে কী আঁকতে চেয়েছেন। এমনকি পিকাসোরই পায়রার ছবি দেখো। পায়রা তো কতই আছে কিন্তু পিকাসোর যে পায়রা সে শুধু শান্তির কথাই বলছে না, তার মধ্যে এক অনির্ণেয় শীতের সরঞ্জামও আছে। একজন শিল্পী যদি শুধু বক্তব্যই পেশ করেন তার কাছে ফিরে আসব না আমি। বারবার আসব তখনি যখন আমার মনের মধ্যে সেটা memorable speech হয়ে উঠছে, স্মৃতিধার্য শ্লোক হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন : বলার কথা এবং কীভাবে বলতে হবে―এই দুটো বিষয় যদি পূর্বনির্দিষ্ট হয়, তবে এদের কোনটা আগে কোনটা পরে ভাবেন ?
উত্তর : এই প্রশ্নটা আমি এখনও জানি না, উত্তর নেই। সেইজন্যই তো আমার সাধনা, কীভাবে বলব ? পূরবীতে গাইব না রামকেলি-তে ? আমি গড়িয়ার কাছে একটা মন্দিরে গিয়েছিলাম, মা কালীর মন্দিরে। সেখানে সবসময় দিন-রাত বাগেশ্রী, সকাল থেকে চলবে রাত পর্যন্ত। আমরা এখন সিডির যুগে আছি। বেশির ভাগ recording হচ্ছে কিন্তু দুপুরে। তখন ভোরের রাগ হোক সন্ধেবেলার হোক কিংবা মালকোষ, সবই দুপুরবেলা হচ্ছে। তখন তোমাকে রাত্রির মেজাজটা বুকের মধ্যে ধারণ করে গাইতে হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ যেমন করছেন ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’, মালকোষে, এটা সম্ভবত দিনের বেলা রচনা করেছিলেন কিন্তু মালকোষে করছেন। এই গানটার রিমেক হয়েছে সম্প্রতি ইউরোপে। এই যে ‘আ আ আ ন অ ন্দ’ (গেয়ে দেখাচ্ছেন) মালকোষে এল, হয়তো উনি সুর দিয়েছেন সকালবেলা। বলার style-ও মিশে আছে, বক্তব্য কটাই-বা আছে। বলার কথা থেকে যেটা বেরিয়ে আসছে সেটা একটা বিরাট ব্যাপার। বলতে বলতে একটা কথা বেরিয়ে এল। দেখবে যারা বাজনা বাজান, বাজাতে বাজাতে কখন একটা জায়গা চলে এল, সেই জায়গাটা তারা ধরে রাখতে চেষ্টা করেন।
প্রশ্ন : কীভাবে বলতে হবে সেটাই তাহলে মূল, তার পরে বলার কথা ?
উত্তর : তার মধ্যে থেকে বলার কথাটা বেরিয়ে আসবে। দার্শনিক-কবিতা বলেও কিছু নেই, দার্শনিক বক্তব্যটা কবিতার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসবে―দান্তে যখন বললেন ‘যে প্রেমের হাটে (? ? ?) চলে অনন্ত সূর্য চন্দ্র তারা’―কীভাবে বললেন… ঘুরছে ঘুরছে অনন্ত চক্র তার মধ্যে দিয়ে সূর্য চন্দ্র তারা …ডিভাইন কমেডির শেষ লাইন-এ এসে দান্তে যখন এভাবে বললেন, বলাটার জন্যই ওটা গেঁথে গেল আমাদের মনে। সে কথা কিন্তু আগেও অনেকে বলেছেন, তিনি যার প্রশিষ্য Thomas Aquinas তিনিও এটা বলেছেন। আমরা তো তাঁর কাছে যাই না, আমরা দান্তের কাছে যাচ্ছি। বলার বিশেষত্বের জন্য এটা আমাদের মনে থাকে।
প্রশ্ন : কবি হিসেবে একটা ‘জানা’ থেকে একটা লেখায় কীভাবে পৌঁছোন ?
ধরুন, আমি ‘প্রণীত অগ্নি কাকে বলে তুমি জানো ?’ কাব্যগ্রন্থের ‘লাস্ট সাপার’ কবিতাটিকে সামনে রেখে জানতে চাইছি।
উত্তর : অস্বাভাবিক একটা ছবি চমস্কি-র ( ? ?) রয়েছে, যেখানে যিশু এবং পার্ষদরা বসে আছে সমুদ্রের মধ্যে। ফিলিপাইন্স দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে দেখতে পারছি যে কলাপাতা দিয়ে মৃতদেহ ঢেকে দেওয়া হয়। এটা হলো information। মৃন্ময় থালি থেকেই তো আমি খেতে বসেছি। আমি জানি এই খাবারটা আমি যদি খাই, যেমন যিশু ওই খাবারটা খাচ্ছেন, শেষ খাবার, ওই খাবারটা খেলে মৃত্যুর সামিল হব। আমি ভোগ করলাম। যে কোনও মুহূর্তে সেটা লাস্ট সাপার হতে পারে। আমি জরা ক্ষোভ ক্ষুধা অতিক্রম করতে পারতাম যদি আমি একেবারে অগ্রাহক হতে পারতাম। কিন্তু আমি খেতে বসেছি। এটাও আমার মনে ছিল আমাদের যত প্রতিমা সমস্ত কিন্তু মাটির, মৃৎ এবং এর মধ্যে মৃত্যুর ব্যাপারটাও কাজ করছে। কাজেই এই কলাপাতা দিয়ে মৃতদেহ ঢেকে দেবার এই তথ্যটাকে আমি রূপান্তরিত করছি, একজন ভারতীয় হিসেবে একটা ছবির উত্তরাধিকার নিলাম, নিয়ে প্রাচী, প্রাচী থেকে ফিলিপাইন্স-এর মধ্য দিয়ে দেশে ফেরার মুখে স্বরান্তরিত করতে করতে এলাম। তখন আমার সব সঙ্গীরা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি একা হয়ে গেলাম। এখানে একটা message আছে, একক সম্ভোগ মৃত্যুর প্রতিশব্দ হতে পারে।
প্রশ্ন : হঠাৎ কোনও ছবি বা রং আপনাকে দিয়ে পরের লাইনটা লিখিয়ে নেয় ?
উত্তর : একবার দেগা (Edgar Degas) বলেছিলেন মালার্মেকে, আমার মধ্যে কত idea আসে কিন্তু কবিতা লিখতে পারি না কেন ? মালার্মে বলেছিলেন কবিতা idea নয় কবিতা শব্দ। এই শব্দই আমাকে নিয়ে যায় শব্দব্রহ্মে―আমার foreign land. সেখানে কোনও রং তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে না। এক-একটা ideaকে ছুড়ে দলা পাকিয়ে রেখে দিই সেটা কবিতার কাজে লাগে না। সেটা দিয়ে হয়তো মানব সভ্যতাকে বদলে দিতে পারতাম কিন্তু কবিতার কাজে সে লাগছে না। আমাকে যখন সে নিয়ে যায় মালার্মে কল্পিত শব্দব্রহ্মে, idea নয় বা association-ও নয় সবসময়। আমি তখন শব্দের ক্রীতদাস।
প্রশ্ন : আপনি দিঅনুসিয় শক্তি এবং অ্যাপোলোধর্মীয় সচেতন সন্ধিৎসা এই দু-ভাবে কবিতা লেখার কথা লিখেছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেভাবে ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকারে’ যেন একটা ঘোরের মধ্যে লিখে ফেলেন বা ফার্নান্দো পেসোয়া একটি টেবিলের কোনায় দাঁড়িয়ে একসাথে একত্রিশটি কবিতা লিখে ফেলেন সেই বিষয়ে আপনার অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইছি।
উত্তর : দিঅনুসিয় জীবনের দেবতা, সুরার দেবতা, মাদকতার দেবতা। তিনি কোনও সীমানা মানেন না। একটু শক্তির মতো। আলোক হচ্ছে অ্যাপোলোর মতো। অ্যাপোলোর কপাল থেকে দেবী মিনার্ভা বেরিয়ে এসেছিলেন, শিল্প সরস্বতী। একটা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপার চলে আসে। এমনকি যদি মধুসূদন দত্তকে বলি দিঅনুসিয় শক্তি কথাটা খুব ঠিক। কিন্তু ছন্দের যে বৈপ্লবিক যুগান্তর তিনি ঘটালেন সেখানে ছন্দ ভুল একটা জায়গাতেও কেউ পায়নি এ-পর্যন্ত অথচ উনি তো অমিত্রাক্ষর তৈরি করলেন, একটা লাইন অন্য লাইনে ডিঙিয়ে গেল যেটা দিঅনুসিয় শক্তি, আর তাকে যে তিনি ছন্দের বাঁধনে ধরে রাখলেন সেটা অ্যাপোলোর শক্তি। দুয়ের একটা যুগ্মতা না এলে কবিতা হবে না। সেই জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রেমিক কোনও প্রেমের কবিতা লিখতে পারে না, বুঝতে পারছো ?
প্রশ্ন : অক্টাভিও পাজ এক জায়গায় বলছেন তাঁর Sun Stone কবিতায় প্রথম তিরিশ লাইন নাকি ওনার লেখাই নয়। উনি বলেছেন পরে আমি যখন ভাবী ওই এগারো মাত্রার জটিল ছন্দ কীভাবে লিখলাম, আমি অবাক হই। একত্রিশতম লাইন থেকে আমার রচনা।
উত্তর : অনেক সময় মনেই হতে পারে এটা কি লিখেছিলাম আমি, না মা-সরস্বতী তাঁর খাগের কলম দিয়ে আমাকে লিখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ? আমি তো জানিই না আমি কে। তবু আমার একটা ধারণা হয় আমি লোকটা মোটামুটি এইরকম। সেই সংস্কারটা ভালো, সেটা হলো একটা মননের জায়গা। ‘মননাত্রায়তে’ মানে মনন থেকে পরিত্রাণ করে যা, তাই মন্ত্র―গায়ত্রী ছন্দের মধ্যে দিয়ে গানের মধ্যে দিয়ে ত্রাণ করে। মনন ছাড়া ত্রাণটা হচ্ছে না কিন্তু। মননের মধ্যে দিয়ে মন্ত্রটা তৈরি হচ্ছে। তার মধ্যে একটা আবেগ কাজ করছে ঠিকই কিন্তু মননের অ্যাপোলো সত্তাও কাজ করছে। দুটোই থাক। হয়তো সমান সমান।
পুরো স্বয়ংক্রিয় কবিতাকে আমি সমর্থন করি না, একটা নিয়ন্ত্রণ থাকবেই। স্বয়ংক্রিয় কবিতা বা non-poetry―সব কবিতারই জায়গা আছে। আমার শরীরটাই আধার তখন, আমার আধারেই তখন সেই কবিতাটা রচিত হচ্ছে, আমি কিন্তু তার জন্য দায়ী। আমি যদি তাকে নৌকো বলি কবিতাটা আমার মধ্য দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে অন্য ঘাটে। আমাকে দেখতে হবে অদরকারি উপকরণ যেন তার মধ্যে না থাকে তাহলেই ভরাডুবি ঘটবে। আমি কিন্তু সম্পূর্ণ তার ধারক। আমি তাকে পৌঁছে দিচ্ছি। অনেক সময় হয় না, পাঁচটা গ্রামের একটা খেয়া, পাঁচ গ্রামের যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে―এটা তেমনই।
প্রশ্ন : কবিতায় প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দের ভবিষ্যৎ কি ? গতকাল বলেছিলেন কথা-ভাষা এবং পরা-ভাষার মধ্যে একটা ইথারের সেতু থাকা প্রয়োজন।
উত্তর : কোনও কথা ঠিকভাবে যদি না বলা হয় বা কথার মধ্যে যদি কোনও ছন্দ না থাকে, কবিতা লিখতে অসুবিধা হয়। কেউ কথা বলছে, কথার মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে এবং অদরকারি মৌন কতকগুলো অবকাশ থাকছে যেখান থেকে ভাষার স্পন্দের ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না, তখন কিন্তু কবিতা লেখার একটা অসুবিধা তৈরি হয়। লোকভাষার সঙ্গে কাব্যভাষার একটা যোগাযোগ আছে। প্রত্যহ ব্যবহৃত শব্দগুলো, মাঝি-মাল্লার জেলের শব্দ কবিতার মধ্যে ঢুকে পড়ছে, কবিতা একটা জায়গায় উন্নীত হচ্ছে। যেমন ‘সূর্য নাকি সূর্যের চপ্পলে পা গলিয়ে পৃথিবীতে এসে’―এই যে ‘চপ্পল’টা এল, এই ‘চপ্পল’টা একটা অলৌকিক ব্যাপার। ওই জায়গায় যদি আরও ভালো একটা অন্যরকম শব্দ দিতে―‘খাদিমের জুতো’ বসিয়ে দিতে, তা হলে আর হতো না। সেই জায়গায় যত সংস্কৃত শব্দ বসাও, কবিতাটা মারা যাবে। লৌকিক শব্দ তো হাজারবার আনতে হয়।
প্রশ্ন : কিন্তু আপনি তাকে একটা দ্বিতীয় তল দিচ্ছেন ?
উত্তর : দ্বিতীয় তল দিতে হবে। তাকে বসিয়ে আমি…
প্রশ্ন : ইথারাইজড করে দিলেন ?
উত্তর : ইথারিত করে দিলাম এবং একটা অসামান্য কাণ্ড ঘটে গেল। আমি লৌকিক মেজাজে লিখছি―ধর এক জায়গায় লিখলাম ‘কথাটা ইরিত হলো না ভালো করে’। অনেকে বলবেন, এই তো, অলোকদার দুর্বোধ্যতা। প্রচলিত শব্দ হলো ‘উচ্চারিত হওয়া’। কিন্তু আমার মনে হলো ‘ইরিত’ হলে ওখানে খুব সুন্দর হবে। অর্থাৎ শুধু তৎসম শব্দ নয়, যেসব শব্দ হারিয়ে গেছে তাকে ফিরিয়ে এনে সচল কালস্রোতে প্রতিষ্ঠিত করার একটা দায় বহন করা। অনেক সময় ধরতেই পারবে না কেউ।
প্রশ্ন : ত্রসরেণু শব্দটাও এনেছেন আপনি ?
উত্তর : হ্যাঁ, ত্রসরেণু। জানালা দিয়ে যে সূর্যাস্তের আলো ঢুকে ঝিকমিক করছে, তেমনি রাস্তার ধুলোও তো ঢুকছে তার মধ্যে, সেটা একটা অসামান্য কাণ্ড হচ্ছে। অর্থাৎ কবিতার দিব্যসংঘটন কিন্তু পঞ্চভূতকে নিয়েই।
প্রশ্ন : সাধারণ ভাবে কবিতায় পরিমার্জনা এবং নিজের কবিতায় সম্পাদনার বিষয়ে আপনার ভাবনা কী ?
উত্তর : আমার কবিতা আর কেউ পরিমার্জনা করছে এটা ভাবতে আমার অসুবিধা হয়। যদি তিনি বিরাট কবিও হন, আমার কাছে না জেনে একটা শব্দও পরিবর্তন করলে আমি খুব দুঃখ পাব। আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধুও যদি করেন অমি খুব দুঃখ পাব।
প্রশ্ন : আপনার কবিতায় পরিমার্জনা করবেন কে ?
উত্তর : এমন হতে পারে আমার কোনও শুভার্থী সেটা নিয়ে আমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করলেন। ‘একটি কথার মৃতুবার্ষিকী’র একটা ইতিহাস আছে। বুদ্ধদেব বসু ছাপিয়েছিলেন। প্রথমটা কি ছিল জানো ? ‘অতৃতীয়তায় অরুন্ধতী’। উনি বললেন যে অলোক, অতৃতীয়তা শব্দটা অত্যন্ত বেশি ভালো, বড় বেশি ভালো―আরেকটু অন্য কিছু করতে পারো কি ? না হলে আমি ছেপে দিচ্ছি, এটা তো আমি ছাপাবই―আমি ‘অহংকার ভুলে’ লিখলাম। তবে এই তথ্যটা কোনওদিন কাউকে দিইনি। আজ তোমায় দিলাম।
প্রশ্ন : আর নিজের কবিতা নিজে পরিমার্জনা করার ব্যাপারে ?
উত্তর : আমি যখন তোমার জন্য কবিতাটা কপি করছি তখন তো একটা দুটো শব্দ বদলেই যেতে পারে। মনে হলো আগের শব্দটা ভয়ংকর বিশদ হয়ে গিয়েছে আর একটু সংবৃত করে দিই অথবা খুবই সংবৃত হয়ে গেছে একটুখানি পাপড়িটা খুলে দিই।
প্রশ্ন : জীবনানন্দের যে পাণ্ডুলিপি আমরা দেখেছি সেইরকম হবে কি ?
উত্তর : সেটা হতেই পারে। যেমন রবীন্দ্রনাথের সমস্ত কবিতাকে বলা হয় একটাই কবিতা, তিনি সারা জীবন সংশোধন করতে করতে গেছেন। এটা একটা মেজাজ। জীবনানন্দেরও আছে। ‘স্বাতী তারা কবে তোমায় দেখেছিলাম কলকাতাতে আমি’―এটা জাহানারা ছিল আগে, অনেক ভাবতে ভাবতে সেটা ‘স্বাতী তারা’ হয়েছে। ‘জাহানারা’ থেকে ‘স্বাতী তারা’ অনেক ভালো হয়েছে। জীবনানন্দ হয়তো ঘুমোননি সেদিন। আমার মনে হয় একটা কবিতা লিখেই না ছাপতে দেওয়া ভালো, একটু রেখে দেওয়া ভালো। এটা আমার বিশেষ করে মনে হয়। যেমন একটা পটকে এঁকে রাত্রের শিশিরে শুকোতে দেওয়া হয়। আবার আগের লেখাটা পুরো পরিমার্জনা করে যেমন সুধীন্দ্রনাথ দেখছেন, সেখানে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবটা একটু যেন আহত হয়। উনি খুব বড় কবি তবু সেটা মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে। আমি পরম ভক্তি নিয়েই বলছি কিন্তু এই কথাটা।
প্রশ্ন : রমেন্দ্রকুমার আচার্য্যচৌধুরীও বলতেন, যে সন্তান সবে জন্ম নিল তার গায়ে নোংরা লেগে থাকে, তাকে পরিষ্কার করতে হয় ?
উত্তর : রমেন্দ্রবাবু আবার অনেক সময় তান্ত্রিক গহনতার দিকে চলে যেতেন। একটা ‘হ্রীং’কার হয়তো তিনি দিয়ে দিলেন একটা জায়গায়। পাঠকের সঙ্গে তিনি একটু মজা করতেন―তোরা জানিস না, জানতে গেলে আমার কাছে আসতে হবে।
প্রশ্ন : ‘মেয়েটি অন্যদিকে বেঞ্চিতে তার প্রেমিককে সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে চুম্বন করছিল, আর তখনি আমি ধরতে পেরেছিলাম, বিশ শতক ফুরিয়ে আসার আগেই, তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে আসবে। এ কথাটা ওদের জানিয়ে দিলেই কি ভালো করতাম ?’ (জেনে নেওয়া মানেই মৃত্যু/গিলোটিনে আলপনা)
উত্তর : আমি তোমাকে একজন কবির কথা বলেছি যে আঠারো বছর বয়সে আত্মপ্রয়াত হয়েছে, সুগত ভট্টাচার্য। আমরা তাঁর মৃত্যুর আগের কবিতার একটা সংকলন করেছি, আসামান্য কবিতা। ইংরেজিতে লেখে সে। আজকে যদি আলোক সরকার বা অলোকরঞ্জন ইংরেজিতে লিখতে আরম্ভ করেন, একটু অদ্ভুত লাগবে। লিখবেন অসাধারণ কিন্তু এঁরা যেভাবে লেখেন সেটা ঠিক আছে। ও আঠারো বছর বয়সে যখন নিজের মৃত্যু ঘটাল তখন ও সব জেনে গিয়েছিল। প্রজ্ঞা যখন মানুষের পুরোপুরি এসে যায় সে মৃত্যুর উপযোগী হয়ে ওঠে। মানুষ যখন জগৎটাকে জেনে যায়, মনে হয় এখানে বেঁচে কী হবে। একটা ইচ্ছামৃত্যুর ব্যাপার থাকে। Francis Bacon বা অন্য কোনও কোনও ঔপনিবেশিক দার্শনিকের কাছ থেকে এইরকম একটা মতামত এসেছিল যে ‘knowledge is power’―কিন্তু একবার জানা হয়ে গেলে আমি বলব ‘knowledge is absence of power’ অথবা আমি বলব যে, ‘nowledge is the end of power’―যেমন ধরো, আমার মাস্টারমশায়ের ক্যান্সার হয়েছে। এক সতীর্থের সাথে লেক-এ বেড়াতে যাচ্ছেন। একজন বললেন, সে-কী, আপনার তো ক্যান্সার হয়েছে, আপনি এরকম বেড়াচ্ছেন কেন! সেদিন থেকেই উনি ভাবতে আরম্ভ করলেন যে উনি মরে যাবেন। এই জানাটা মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। আমি একটা কথা লিখেছিলাম, মুমূর্ষুকে যে বলে যথার্থ কথা সে অতি নচ্ছার। সেটা না বললেই ভালো হয়। তোমার প্রশ্নে উল্লেখ করা কবিতাটায় আমি দেখতে পাচ্ছি ওরা চুম্বন করছে―ওরা ঘর বাঁধবে কিংবা শেষ মুহূর্তে পরস্পরকে পুরোপুরি পেয়ে যাওয়ার পর হয়তো ওদের প্রেমের শেষ হয়ে গেল সেখানেই। এটা কি আমার বলা উচিত হবে ? মনে হয় উচিত হবে না।
প্রশ্ন : গতকাল যেটা আপনি বলেছিলেন সেই প্রসঙ্গে জানতে চাইব, দুরূহ কবিতা থেকে সহজ লেখায় এসে দাঁড়ানোর বাধ্যবাধকতা এসে গিয়েছে কি না।
উত্তর : এই যে দুরূহ থেকে আমি সহজে এলাম, সেটা হয়তো এই কারণে যে আমি পাঠকদের কাছে পৌঁছোতে চাইছি আরও বেশি। আবার আমার লেখা যখন সহজেই কারও কারও কাছে পৌঁছোয় আমার ছাত্ররা মাঝে মাঝে দুঃখ করে বলে, ‘ইস, আপনি আগে কী-সুন্দর দুরূহ করে কথা বলতেন! আপনি আগের মতো বলুন। ভাবি, কিছুতেই তো খুশি করতে পারি না দেখি!
প্রশ্ন : তারা আপনার কাছ থেকে ‘কীর্তির কিঞ্জল’-এর সমতুল্য শব্দগুচ্ছের দুরূহতা চান।
উত্তর : একটা জায়গায় আমি দেখলাম, ‘নিম্নগপ্রপাত’-টা ‘নিমগ্ন-প্রপাত’ ছাপা হয়েছে। ভাষা নিয়ে পরীক্ষার ব্যাপার-টা, সেটা থাকবে। আমি যখন বাংলাতে কথা বলছি, আমি তো শিক্ষকও, চেষ্টা করছি একটা কথা-কে বুঝিয়ে বলতে―সেটা যে অবোধ্য থেকে যাবে তা হয়তো নয়। অন্তত একটা-দুটো রণন লোকের কাছে পৌঁছে যাবে।
প্রশ্ন : আমি আশ্চর্য হই, চর্যাপদ হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে অত দুরূহতা নিয়ে।
উত্তর : ওটা ছিল একটা গোষ্ঠীর জন্য লেখা। কতগুলো ব্যাপার অদ্ভুতভাবে আমাদের কাছে পৌঁছে যায়―একজন ডোম্বীকে নিয়ে পালাচ্ছে একজন শবর, এই সমস্ত সাংঘাতিক। মাঝরাত্রে একটা পদ্ম অর্ধেকটা ফুটে উঠল এই সমস্ত ব্যাপার রয়েছে।
প্রশ্ন : সহজতার দিকে আসার ব্যাপারটা কি একটা compulsion ?
উত্তর : ভিতরের একটা বাধ্যবাধকতা বা Inner compulsion থাকতে পারে। খুব বড় শিল্পীরাও শেষে একটা ঠুমরি গেয়ে দেন, একটু ভাওয়াইয়া-ছোঁয়ানো ভৈরবী গেয়ে দেন―মানুষ তো, পৌঁছোনোর একটা সাধ থেকে যায়। শেষ দিকে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত চাইতেন ওঁকে পাড়ার কোনও প্রতিযোগিতার বিচারক করা হোক। এটাই স্বাভাবিক।
প্রশ্ন : আপনি যখন বলেন, ‘কাতারে-কাতারে নরনারী তাদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পথটাই আজ আমার নিসর্গ’ (বিভাব কবিতা/জবাবদিহির টিলা) বা, ‘ক্ষুধিত মুখের সঙ্গে নগ্নতার তফাৎ কোথাও নেই’―তখন মানবতন্ত্রী হিসেবে আপনার অবস্থান চিনে নিতে পারি আমরা। এতে কবি হিসেবে আপনার সমগ্র সৃষ্টি পরিসরের সঙ্গে কোনও রকম compromise করা হলো কি ?
উত্তর : একদিক থেকে আমি সৃষ্টির একটা মাধ্যম এবং অন্যদিকে আমি সৃষ্টির প্রণেতা। এই দুটোর মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে সমস্ত শিল্পীকেই মানবজীবনের সঙ্গে একটা compromise বা সামঞ্জস্যে আসতে হয়। আমি এঁকেছি একটা নির্বস্তুক ছবি কিন্তু রাস্তার ভিখিরিকে ডেকে বলছি ‘দেখ-তো কেমন হয়েছে’― এখানে একটা সামঞ্জস্যের প্রশ্ন রয়েছে। সেই অর্থে আমি প্রকৃতির দুলাল নই। যদি তুমি আমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিসর্গের মধ্যে ছেড়ে দাও, আমি পাগলের মতো অপেক্ষা করব চৌরঙ্গির ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে। আবার আমি হাহাকার করব কেন ভালো ভালো গাছগুলোকে কেটে নেওয়া হচ্ছে এখান থেকে―শহরের মধ্যে থেকেই আমি অরণ্যের আবেদন তুলব। আমি যাই-ই করি, সেই সুরটাকে মানবতন্ত্রে বাজিয়ে নেব।
প্রশ্ন : আপনি বলছেন, ‘নির্বাণ ভালোবাসি না…’ অর্থাৎ আপনাকে যেখানেই নিয়ে যাওয়া হোক, শেষমেশ আপনি মানুষের পৃথিবীতে…
উত্তর : যদি দেবতাও একটা অনুশাসন করেন emergency করেন, আমি ঠিক অন্য দিকটাতে চলে যাব। যদিও আমি ঈশ্বরকে চাই তবুও বলছি, কবিতা লেখার ক্ষেত্রে ঈশ্বরেরও কোনও অনুশাসন আমি মেনে নেব না, সেটা আমার একান্ত নিজের এলাকা। কবিতার কথার শুরুতেই লক্ষ করবে জীবনানন্দ দাশ বলেছেন ঈশ্বরের কথা এলে মনে হয় ছুরি দিয়ে যেন কেটে দেওয়া হলো। আমার একটা স্বভাব আছে। যে মুহূর্তে ভাবলে অলোকদার এটাই ‘stand’, তখনই তোমার প্রত্যাশাটাকে একটু বিস্রস্ত করে দিয়ে আমি কিন্তু আরেকটা ‘stance’ নেব আরেকটা মুদ্রা নেব। এইখানে আমি ‘stand’ আর ‘stance’-এর তফাৎ করছি। কবিতার মধ্যে ‘stance’ এবং ‘stance’-এর একটা দোলাচল কিন্তু চলতেই থাকবে।
প্রশ্ন : হ্যাঁ, তারপরেও আপনি বলে উঠবেন ‘নির্বাণ ভালোবাসি না…’
উত্তর : এটা ঠিকই, যদি ঈশ্বরের একটা দল আর মানুষের একটা দলের মধ্যে খেলা হয়, আমি মানুষের দলে উইকেট-কিপিং করব।
প্রশ্ন : ‘গাছটার গায়ে একটি ডাল/হুবহু হাতল যেন ’
(বৃক্ষ এক উপলক্ষ/গিলোটিনে আলপনা)
একদিকে রাখা যাক আপনার এই কল্পছবি। পাশাপাশি কবি জয় গোস্বামীর ‘দু-দণ্ড ফোয়ারা মাত্র’ থেকে ‘দু-পৃষ্ঠা’ কবিতাটি রাখলাম ‘আকাশ দু-ভাঁজ করে রাখা ছিল। ভাঁজ খোলা মাত্রই/ভোরের দু-চোখ থেকে রশ্মি এসে বিঁধে গেল সায়াহ্ন-ললাটে।’ আজকের কবিতায় ইমেজের বিষয় কিছু বলুন।
উত্তর : ইমেজ প্রকৃতির অনুকরণ আদৌ নয়, প্রকৃতির একটা সম্প্রসারণ বা কখনও কখনও সংকোচনও। চেরিফুলে উপত্যকা একেবারে ছেয়ে গেছে, সেই জায়গাটাতো খুব সুন্দর। আমি আনলাম না। আমি রাখলাম হয়তো রডডেন্ড্রনের একটা অংশ… রাঙা-রং দিয়ে একটা অন্ধকার তৈরি হয়েছে সেটা রাখলাম…ইমেজের মধ্যে কবির জটিল অভিজ্ঞতার অংশবিশেষ মিশে যায়। যেটার জন্য Ezra Pound বলছেন ‘an intellectual emotional complex’। তোমার অভিজ্ঞতা আবেগের সঙ্গে মিশে একটা image তৈরি করছে তাই তোমার রসধমব তৈরি হচ্ছে। সেটা কিন্তু photography, তার মধ্যে আলোকচিত্রের বিশ্বস্ততা থাকবে না।
প্রশ্ন : একটা ভাবচ্ছবি ?
উত্তর : একটা কল্পছবি। …ওই যে, ‘গাছটার গায়ে একটি ডাল/হুবহু হাতল যেন’―আমার তখন খুব তেষ্টা পেয়েছে, গাছের ওই ‘হাতল’টা তুলে নিয়ে আমি যেন পান করছি। এবার জয়ের ‘ভোরবেলা’ কবিতাটা। ‘আকাশ দু-ভাঁজ করে রাখা ছিল’… অদ্ভুত এই কবিতাটা আসবার আগে জয়ের মনটা একটা কবিতা লেখার জন্য তৃষিত ছিল। আমি কল্পনা করতে পারি, বন্ধ ছিল বইপত্র। ও খুলে ধরল, তখনি আলোটা ওর কপালে এসে পড়ল। কবিতা লেখা শুরু হয়ে গেল। আমার মনে হয় এই ‘দু-ভাঁজ’টা ভুরুর ভাঁজ আসলে―
প্রশ্ন : আচ্ছা এখানে আমি জানতে চাইব, কখনও কি ইমেজের মধ্যে প্রতীকও আসবে ?
উত্তর : এ তো হতেই পারে। ‘উটের গ্রীবার মতো’―ইমেজের সঙ্গে প্রতীক তো আসতেই পারে। একটা সুর তুমি সরোদে বাজাচ্ছ, আর সেটা বেহাগ রাগে বাজছে―এখানে কোনও বিরোধ নেই। এ তো আসতেই পারে। প্রতীক ব্যাপারটা কী ? প্রতীক ব্যাপারটা হচ্ছে, যেখানে তুমি জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতাগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করছ, জড়ো করে সেটাকে মেলে ধরছ। চিত্রকল্পেও একটা মেলে ধরার ব্যাপার আছে। কিন্তু সেই মেলে ধরার ব্যাপারটার মধ্যে তোমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কিছু বিক্ষেপ বা projection থেকে যাচ্ছে।
প্রশ্ন : সেটা চিত্রকল্পের মধ্যে ?
উত্তর : হ্যাঁ।
প্রশ্ন : সেটা কখনও আবার প্রতীকও হতে পারে ?
উত্তর : অনায়াসেই হতে পারে। উপমাও হতে পারে।
প্রশ্ন : আপনার ব্যক্তিগত শান্তি, এই রাজ্যের শান্তি আর বিশ্বশান্তি নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাইব। অডেনের মতো আপনিও কি কোনও শান্তির গান লিখতে চান ?
উত্তর : আমার ব্যক্তিগত শান্তি বলে কিছু নেই। আমি যখন এই গ্রহের সবচেয়ে সুখী মানুষ, তখনও আমি সবচেয়ে দুঃখী মানুষ হতে পারি, কারণ আমার চারপাশের যারা তারা কেউ ভালো নেই। আমার সবচেয়ে বড় বন্ধুটি অসুস্থ। সে মুমূর্ষু। আমি যখন দেখি বন্ধু বন্ধুর পিঠে ছোরা মারছে, যখন দেখি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ক্ষমতার লোভে সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, তখন আমি ভেঙে পড়ি। এতই ভেঙে পড়ি যে আমার মধ্যে তখন কোনওরকম কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। আমি হয়তো আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করি…শান্তির গান লিখতে তো চাই-ই―যদি আমাকে সেরকম অনুমতি দেওয়া হত। তবে সেই গান খুব জটিল হবে। অডেনের মতো আমি নিশ্চয়ই চেষ্টা করব শান্তির গান লিখতে যেটা প্রথমে পড়ে মনে হতে পারে যে আমার মন খুব অশান্ত হয়ে রয়েছে―দ্বিতীয় পাঠে আমার অভিভাবনাটা ফুটে উঠবে―বুদ্ধের সেই অবস্থা, যখন একজন মানুষও অশান্ত থাকবে ততক্ষণ শান্তি নেই―‘অশান্তি যে আঘাত করে তাই তো বীণা বাজে।’
প্রশ্ন : শিল্পের অন্য ধারাগুলির অভিঘাত এবং আশ্রয় আপনার লেখালেখিজুড়ে, বিশেষত সঙ্গীত এবং চিত্রকলা এমনকি নাটক।―অন্য ধারাগুলোর প্রেরণা কবিকে লিখতে সাহায্য করে ?
উত্তর : কবিতা হচ্ছে সমস্ত muse অর্থাৎ শিল্প-সরস্বতীদের একজন। (নজন muse হলেন lio, Thalia, Erato, Euterpe, Polyhymnia, Calliope, Terpsichore, Urania, Melpomene)। চিত্রকল্প ছাড়া, ভাস্কর্য ছাড়া, সঙ্গীত ছাড়া, নাটক ছাড়া তার কোনও অস্তিত্বই নেই―কবিতা একটা মিশ্র-শিল্প। যে কবিতায় সঙ্গীত নেই সে কবিতা কিছু নয়। যে কবিতায় ছবি নেই সে কবিতা কিছু নয়। আমি যখন তাইরেসিয়াস-এর কথা বলছি, আমি তখন ‘আন্তিগোনে’ সফোক্লিসের (সোফোক্লেস বানানটিও প্রচলিত) খ্রিষ্টপূর্বাব্দের নাটক অনুবাদ করছি। ক্রেয়ন যখন ক্ষমতান্ধ হয়ে গেছিলেন, তখন উনি তাইরেসিয়াসকে দেখছেন এক বালককে যষ্টি করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাইরেসিয়াস বলছেন―‘ক্রেয়ন তুমি ফিরে এসো, শক্তি কামনাকে তুমি নির্বাপিত করো’। তাইরেসিয়াস তখন prophet, ভাবী কথাকার। তখন আমি অনুবাদ করতে করতে ভাবছি এ কি অদ্ভুত ক্ষমতা। তারপর দেখলাম যে তিনি একই জন্মে আগে নারী ছিলেন, তারপর সাপ ছিলেন, তারপরে পুরুষ―এই ভাবে অভিশপ্ত হয়ে অনেক জন্মান্তরের মধ্যে দিয়ে গেছেন। তখন আমি তাইরেসিয়াস-কে নিয়ে লিখলাম (তাইরেসিয়াস/ দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে)। এমন হতে পারে যে, যে তাইরেসিয়াস পড়েনি হয়তো বলবে, এ অলোকদা কী বলছেন ? আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম, নীহাররঞ্জন রায়ের কথা। একজন বড় সমালোচিকা বলছেন এরা কারা ? মান্দাসের ভেলা আবার কী! এই বলে তো বাঙালি পাঠকের থেকে তিনি দূরে সরে যাবেন! আমি লক্ষ করেছি, হয়তো জুবিন মেহতার কথা বলেছি। জুবিন মেহতা ছিলেন একজন বড় conductor―ওমনি কেউ কেউ বলবেন এটা কেন অলোকদা লিখতে গেলেন, ওকে তো কেউ চেনে না। অথচ তিনি কিন্তু ভারতীয়। কিন্তু এগুলো ছাড়া আমি তো বাঁচব না, জুবিন মেহতার নাম না করলে আমি তো বাঁচতেই পারব না। তিনি তখন হয়তো স্ট্রাউসের (Richard Georg Strauss) একটা waltz নাচের composition পরিচালনা করছেন, আমি তার কাছে শিখলাম―আমার বুক গর্বে ভরে যায়। তারপরে তাকে আবার দেখলাম দিল্লি এয়ারপোর্টে। কাস্টমসের কেউ ওকে চেনে না আমি লক্ষ করছি। ভাবছি গিয়ে কথা বলব, বললাম না। শিল্পের মধ্যে ব্যবহৃত এরকম একেকটি দিগ্বলয় বা দিকস্তম্ভ, তাদেরও কিন্তু একটা অনামিক হওয়ার অধিকার আছে, anonymous হওয়ার―আছা খুঁজে দেখুক তাইরেসিয়াসকে। এগুলোকে বলে পূর্বল্লেখ―allusion। সমস্তটাই তো পূর্বল্লেখ। ধর আমি যদি, ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান’ এ কথা লিখি আরেকটা কবিতায়, আমি যদি আমার প্রেমিকাকে সে কথা বলি, তার জানতেই হবে কিন্তু এই গানটা রবীন্দ্রনাথের, তারপরে আসবে আমি তার মধ্যে কী সুরসংযোজনা করেছি, improvise করছি। প্রত্যেক কবিতাই কিন্তু একটা পূর্বল্লেখের সম্প্রসারণ।
প্রশ্ন : ‘তাইরেসিয়াসের কান জিভ দিয়ে চেটে দে, তাহলে বুঝতে পারবে যতো ভবিষ্যকথক দৈববাণীরত পাখির সংলাপ!’
ফলত যেমন অন্ধ তেমনি অন্ধ রইল, সন্ন্যাস চায়নি, সন্ন্যাসী তবু রয়ে গেল তাইরেসিয়াস।
(তাইরেসিয়াস/দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে)
এই অলোকসামান্য কবিতাটির জন্মবৃত্তান্ত জানতে চাইব আপনার কাছে।
উত্তর : UNESCO-র অনুরোধে সাহিত্য আকাদেমির জন্য যখন গ্রিক থেকে ‘আন্তিগোনে’ অনুবাদ করছি তখন এই কবিতাটা রচিত হয়েছে। ‘আন্তিগোনে’ যখন অনুবাদ করেছি এক একটা কবিতা বেরিয়ে এসেছে। তাইরেসিয়াস চরিত্রটা আমাকে খুব স্পর্শ করেছে বা ক্রেয়নের চরিত্রটা বা আন্তিগোনের চরিত্র, যে সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়ে বিপ্লব করছে। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে দেড় মাস ধরে একজন বিরাট জার্মান পরিচালক হান্স গুন্টার হাইমের পরিচালনায় ‘আন্তিগোনে’ নাটকটা অভিনীত হয়েছিল। অনুবাদ যখন করি তখন আমি চাই আমার যে অনুভূত অভিজ্ঞতার এলাকা তার একটা বিস্তার। আমি যখন ব্রেশটের অনুবাদ করছি, তখন আমি সুরদাসেরও অনুবাদ করছি। আমার মধ্যে আমি কে অলোকরঞ্জন আমি তো জানি না। আমি ব্রেশটের অনুবাদ করছি কারণ আমি প্রগতিবাদী কিন্তু আমি সুরদাসের কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে দেখছি ‘রংক চলে…’―একজন গরিব তার ছাতা দুলিয়ে যাচ্ছে, সেটা রাজছত্র।―এও অলোকরঞ্জন। এইভাবে নিজেকে বাড়িয়ে দেওয়া―আমি তো তাইরেসিয়াসের মতো অন্ধ হয়ে যেতে পারতাম, তাহলে কী হতো ? তাছাড়া আরও একটা কথা―একজন কবি যদি তার রচনা শুরুর প্রথম জায়গায় চিরদিন থেকে যান, তার কবিতা আমি নিজে পড়ব না।
প্রশ্ন : কাব্যগ্রন্থের নামটাতেই, ‘তাইরেসিয়াস’ কবিতাটার সঙ্গে বা হয়তো আপনার অন্যান্য লেখালেখির সঙ্গেও ওদের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে…
উত্তর : হ্যাঁ জানি আমি। অনেকেই আমাকে খুব ধিক্কার দিয়েছে…
প্রশ্ন : ‘নগদবিদায়’ এবং ‘রাত্রি’ কবিতা দুটি যেন মৃত্যুবোধের আরোহী-অবরোহী (নগদবিদায়/এবার চলো বিপ্রতীপে)
উত্তর : ফরাসি ভাষায় প্রত্যেকটি বিদায় অর্ধমৃত্যু বলে একটা কথা আছে আমরা শুনেছি। সেটা তো আছেই… আমার একটা স্ট্রোক-মতো হয়েছিল বছর তিনেক আগে। হাসপাতালে কিছুদিন ছিলাম। সেখানে যাদের অ্যাফাসিয়া (Aphasia) হয়েছিল, কথা বলতে পারত না, তাদের আমি একটু খবরের কাগজ পড়ে পড়ে কথা বলতে শেখাতাম। তার মধ্যে একজন ঠিকমতো কথা বলতে পারতই না, তার ভাব-ভঙ্গি দিয়ে সবাইকে বিরক্তই করত। তারপর যখন সে চলে যাচ্ছে হাসপাতাল ছেড়ে সবার কাছে করুণভাবে বিদায় নিয়ে যাচ্ছে। অন্যেরা ভাবছে যায় তো যাক না বাবা, এসব কী করছে―এইরকম হয় না ? এখানে প্রথম কবিতাটিতে একজন অতিথি বিদায় নিচ্ছেন। তিনি অনেক দিন এই গ্রহে ছিলেন। তিনি চলে যাচ্ছেন বলে একটা বিদায় উৎসব হচ্ছে। যখন তার খুব মন ধরে গেল, ভাবলেন একটু থাকব, তখন কিন্তু সেই বিদায় অভ্যর্থনা স্তিমিত হয়ে আসছে। আমাদের যে উৎসবগুলো হয়―‘ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ ঠাকুর যাবে বিসর্জন’―প্রথম দিন থেকেই তিন দিনের বেশি পুজো যেন না হয় তেমন একটা বাজনা বাজতে থাকে। আমাদের সমস্ত উৎসবের লগ্ন একেবারে সীমাবদ্ধ, এইটা মানুষের জীবনে একটা অদ্ভুত নিয়তি। পরের কবিতাটা এইটার যুগ্মক কবিতা। গৃহকর্তার কাছে অতিথি এসেছেন। একটা সন্ধ্যায় খুব সুন্দর আসর জমেছে, কবিতা পাঠ হয়েছে। কবিতা পাঠেরও একটা মেধা থাকে―একসময় তা শেষ হয়ে যায়। এরপর খুব পরিচ্ছন্ন ভাবে বিদায় নিয়েছেন তিনি। তারপর আবার তার মনে হচ্ছে আচ্ছা, ওই কবিতাটা আর একবার শুনি। তখন গৃহকর্তা পাগলের মতো খুঁজছেন, লণ্ঠনের কাচ পরিষ্কার করে দেখছেন কোনখানে ওই বইটা আছে, কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছেন না। তার মনে হচ্ছে কীভাবে তাকে আমি সম্মোহন করব―কোন কবিতায় ভোলাব এখন তাকে ? … সংবেদী অতিথি তার এই দশা দেখে নিজেই অদৃশ্য হয়ে গেছেন।
প্রশ্ন : ‘চূর্ণকবিতার সময় এসে গেছে’, বলেছেন আপনি। বড় কবিতা লেখা হবে না আর ?
উত্তর : এখন মহাকবিতা বা মহাকাব্যের সময় নেই। বড় কবিতা যেগুলো লেখা হচ্ছে, সেগুলো ছোট কবিতার ব্রেক-জার্নি। এখান থেকে তুমি বখতিয়ারপুর গেলে, নেমে আবার একটা জায়গায় উঠলে, রাজগির পৌঁছোলে, রাজগির থেকে তুমি বাসে করে ব্রেক-জার্নি করে নালন্দায় যাচ্ছ। কিন্তু Canterbury Cathedral-এর দিকে যেমন Canterbury tale-এ যাত্রা সমানে এগিয়ে চলেছে, সেই যাত্রাতীর্থ আজ আর ফিরে আসবে না, যদিও সেখানেও কিন্তু রাত্রিবাসের বিরতি ছিল, সারা রাত ধরে কেউ চলে না। বিবেকানন্দ যখন ভারতাত্মা আবিষ্কার করেন এক রাতে তো হয়নি, বিরতি আছে।
প্রশ্ন : চূর্ণকবিতা এবং তার মধ্যে একটা সমগ্রতা―আজকের দিনটায় দাঁড়িয়ে এটাই কি আমাদের লক্ষ্য হবে ?
উত্তর : চূর্ণকবিতার মধ্যে সমগ্রতা আমি কল্পনা করতে পারি। সঙ্গীতের নির্মিতির মধ্যে এটা হয় যে অনেকগুলো চূর্ণরাগ নিয়ে একটা রাগমালা তৈরি হলো। ভীমসেন যোশি ভোজপুরি, লোকগীতি কিছু কিছু অংশ নিয়ে একটা কোলাজের মতো তৈরি করেছিলেন। আমাদের সময়টা হচ্ছে কোলাজের সময়, জোড়াতালির সময়। Tasso যেমন মহাকাব্য লিখেছিলেন ওভাবে হয়তো আজ আর ভাবা যাবে না। একত্রিশ বছরে তাঁর লেখার ক্ষমতা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। খণ্ডকাব্যের সময় এসে গেছে আমি এটা বিশ্বাস করি। এর বেশি আমি তো জানি না। এখান থেকে বিরাট মহাকবি হয়তো জন্ম নেবেন, সেটা একদিন সম্ভব হতে পারে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ―আনন্দ বাগচী যেমন কাব্যোপন্যাস লিখেছেন।
প্রশ্ন : পবিত্র বাবু ?
উত্তর : পবিত্র লিখেছেন। এটা খুব ভালো উদাহরণ, পবিত্র সবসময় মহাকবিতা নিয়ে চলার কথা ভাবে। পবিত্র এখানে খুব বিশিষ্ট উদাহরণ, কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানেও আবার যেসব লাইন মনে থাকে সেগুলো lyric-এর অভিব্যক্তি।
প্রশ্ন : আপনি ‘না-ভাষা’য় কথা বলার বিপদের কথা বলেছেন।
উত্তর : কালকে বলছিলাম ভাষার মধ্যেও একটা নীরবতার জায়গা থাকে।
প্রশ্ন : হ্যাঁ, একুশের মঞ্চে। এখনি শপিংমল নিয়েও বলছিলেন ?
উত্তর : আমি যদি সঠিক ভাষা না পাই, এমনকি বিকিকিনির মধ্যেও যে জিনিসটা চাইছি সেটা হয়তো বোঝাতে পারব না। না-ভাষার বিপদ হচ্ছে আমি আমার অভিপ্রায়টাকে বোঝাতে পারছি না। এমনকি পণ্যের ক্ষেত্রেও হয়তো আমি ভুল পণ্য নিয়ে এলাম, যেটা আমাকে আবার বদলাতে যেতে হতে পারে। মেয়েরা যখন কেনে তখন হাজার হাজার কথা বলে, সেটাও কিন্তু সমান বিপজ্জনক।
প্রশ্ন : সেটাও কি না-ভাষা ?
উত্তর : সেটাও একধরনের না-ভাষা, কারণ ঠিক ভাবে বলতে পারছে না।
প্রশ্ন : এই বিপদটা কি আমাদের কাব্যেও ঢুকে গেছে ?
উত্তর : একেবারে তাই। ঠিক জায়গায় silence―তার মতো সৌন্দর্য আর কিছু হতে পারে না। নৈঃশব্দ্য এবং গ্যোয়েটে-এর কবিতায় যেমন আছে―প্রতিটি গিরিচূড়ায় শান্তি। বুদ্ধ বসে আছেন পাহাড়ের উপর। এটাই কবিতার লক্ষ্য।
প্রশ্ন : তার আগে নির্মাণ করতে হবে ?
উত্তর : পাহাড়টাকে শব্দ দিয়েই গড়ে তুলতে হবে এবং গলার থেকে রক্ত বেরোতে থাকবে, ফেনা উঠতে থাকবে।
প্রশ্ন : কবিতায় স্বচ্ছতা থাকা জরুরি কি ? আপনি কি মনে করেন ?
উত্তর : অনেকে অমূর্ত কবিত্ব করে, সেটা বড় বিচ্ছিরি ব্যাপার। কবিতায় স্বচ্ছতা এই অর্থে থাকা দরকার যে কোনওরকম অস্পষ্ট আবেগ বা vague emotion চলবে না। বেশির ভাগ পত্র-পত্রিকায় আজকাল যেসব কবিতা বেরোয়, কী-যে বলতে চায় একেবারে বোঝাই যায় না। একটা স্পষ্ট আবেগ, Eliot যাকে precise emotion বলেছেন যেটা দরকার এবং স্বচ্ছতা দিয়েও একটা রহস্য যদি তৈরি করা যায় সেটা খুব ভালো হতে পারে। যেমন ওই যে সূর্যের চপ্পলে পা গলিয়ে…
প্রশ্ন : কবিতা নামহীন হওয়া উচিত ?
উত্তর : রবীন্দ্রনাথ শেষের দিকে কবিতা নামহীন রেখেছিলেন। বেশির ভাগ ছবিরও কোনও নাম দেননি। নামহীন কবিতা যদি একটা পুপষব-এর মধ্যে একটা cycle-এর মধ্যে আসে, আমি নামহীনতার পক্ষপাতী। কারণ একটা নাম দিলে অনেকটা বলে দেওয়া হয়। তাহলে পাঠকের প্রত্যাশাটা সেই নামটিকে অবলম্বন করেই এগোবে। তবে নামটাকে একটা আভাসসূত্র হিসেবে দিলে কোনও ক্ষতি হয় না। নাম রাখাটা কিন্তু খুব কঠিন কাজ। কালকে একটি মেয়ে আমার কাছে কবিতার বই-এর নাম চেয়েছে। বারবার তার প্রেমিকের কথা মনে পড়ে। তাই নিয়ে কতরকম লিখেছে সে। আমি বললাম, লিখে দাও স্মৃতিধার্য। সে পরম আনন্দে যেন ব্রহ্মকে পেয়েছে এভাবে ছুটতে থাকল। কিন্তু আমার ভালো লাগল না। নাম না রাখলে ক্ষতিটা কী ? আগে কবিতার কোনও নাম থাকত না, চর্যাপদে রাগ-রাগিণীর নাম থাকত যেমন পাহাড়ি রাগে লেখা, আর কবিদের নাম থাকত। এমনকি আমি এটাও বিশ্বাস করি একদিন কবিতায় কবিদের নাম থাকবে না, পাঠককে চিনে নিতে হবে―এই চ্যালেঞ্জটা।
প্রশ্ন : আপনি কাব্যগ্রন্থের নামকরণের ব্যাপারে একটা অসাধারণ কথা বলেছেন―‘কিছু কবিতা থাকবে, তিন-চারটে কবিতা গোপন প্রেমিকার মতো, যেগুলো কাব্যগ্রন্থের নামকরণটাকে ধারণ করবে।’
উত্তর : কাব্যগ্রন্থের নামকরণের মধ্যে এমন অনেক কবিতা থাকতে পারে যে কবিতাগুলো ওই বই-এর উদ্দেশ্যটাকে বহন করে না, অথচ তার মধ্যে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ-এর মানসী কাব্যগ্রন্থের মধ্যেও ‘বঙ্গবীর’ জাতীয় কিছু স্যাটায়ারধর্মী কবিতা আছে, কোনও কবিতায় আবার অযথা ঈশ্বর সম্পর্কে কথা বলে দিলেন। কেউ শুনতে চায়নি তখন ঈশ্বরের নাম। ‘মানসী’ নামটা কেন যে রেখেছেন অনেক জায়গায় বার করা খুব মুশকিল। তার মধ্যে একটা জায়গা ধরে তিনি নামটা দিয়েদিলেন যেখানে তেমন দু-তিনটে কবিতা থাকবে। পাঠককে খুঁজে বার করে নিতে হবে কেন তিনি ‘মানসী’ নাম-টা দিয়েছেন। এটা কবির একটা প্রক্রিয়া, এই নামের ব্যাপারটার মধ্যে পাঠকের সঙ্গে ধানখেতে একটা লুকোচুরি খেলা থাকে।
প্রশ্ন : দর্শন ও কবিতা একই গোত্রের এবং উভয়েই আমাদের ভাষায় যাকে বলে সভ্যতা―সেই চূড়ান্ত মঙ্গলকেই চায়―এই উচ্চারণের সঙ্গে আপনি কি একমত হবেন ? (সূত্র : দার্শনিক এ.এন.হোয়াইটহেড)
উত্তর : জীবনানন্দ হোয়াইটহেডের একজন সমঝদার ছিলেন… সভ্যতার পতনের মুখেও শ্রেষ্ঠ কাব্য রচিত হতে পারে যেটা অবনীন্দ্রনাথ তাঁর বাগেশ্বরী শিল্প ভাষণমালায় দেখিয়েছেন। যে সময়টায় দান্তে ডিভাইন কমেডি লিখেছেন সেটা বলতে পারা যায় খুব দুরারোগ্যের সময়―তখন পোপের ক্ষমতা খুব বেড়ে গেছে এবং দান্তেকে ভেনিস শহর থেকে নির্বাসিত করা হয়েছে। হোয়াইটহেড যেটা বলেছেন, সভ্যতা কবিতার লক্ষ্য তো হওয়া উচিতই। সভ্যতা কবিতারই হয়তো লক্ষ্য পরম মূল্যবোধ, যেটা দান্তের মধ্যে আছে বা গ্যোয়েটের ফাউস্ট-এর মধ্যে আছে, জীবনানন্দের বেলা অবেলা কালবেলার মধ্যে আছে, সভ্যতার সংকট-এর মতো গদ্য-ভাষণে আছে―কবিরাই হয়তো সভ্যতার ধারক।
প্রশ্ন : দর্শন ততটা নয় ?
উত্তর : দর্শনের ব্যাপারটা যে মঙ্গলের দিকেই যাচ্ছে তাও নয়―অনেক দর্শনই আছে যেটা খুব গোলমেলে দর্শন। দর্শনের কাজ কিন্তু বাঁকিয়ে-চুরিয়ে না বলে যা সত্য তাকে প্রকাশ করা। আর কবিতার কাজ যা সত্য হওয়া উচিত তাকে প্রকাশ করা।
প্রশ্ন : কবিতায় দার্শনিকতার জায়গা কী ?
উত্তর : কবিতায় দার্শনিকতার জায়গা আছে। প্রত্যেক কবিতাতেই কবির দর্শন প্রকাশ পায় কিন্তু সেটা কবিতার বিয়োগফল হিসেবে উঠে আসে। যেমন ‘লোকেন বোসের জার্নাল’ (জীবনানন্দ) কবিতাটা খুব হালকাভাবে শুরু হচ্ছে―‘সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি―/এখনও কি ভালোবাসি ?’―এখন আর সুজাতাকে আমি ভালোবাসি না তখন ভালোবাসতাম, এই সব বলতে বলতে সেই জায়গা থেকে আলগোছে বেরিয়ে এসেছে ‘প্রতিটি দিনের নতুন জীবাণু আবার স্থাপিত হয়’―এই হলো দার্শনিক কবিতা কিন্তু দার্শনিক কবিতা বলে প্রথমেই কোনও সিলমোহর ছিল না, হঠাৎ বেরিয়ে এল। এর দর্শনের নাম ক্ষণসাম্প্রতবাদ (empiricism)। অথবা ধরো, ‘এসো জাগো হৃদয় তুমি বিষয় জেনেছিলে/গিয়েছিলে অনেক দূরে স্থির বিষয়ের দিকে/এবার তুমি গ্রহণ করো আরেকরকম ব্যবহারের মানব পৃথিবীকে’ বা, ‘একটি ঘোড়া সূর্য হয়ে জ্বলে’―কী অপূর্ব ছবি―মরুভূমির পাশে সমুদ্র, সমুদ্রের পাশে ঘোড়াদের বিক্রি করা হচ্ছে, সেই সব ঘোড়া কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছে। তারপাশেই একটি প্রেমিক প্রেমিকা পরস্পরের অপেক্ষা করছে, সেখান থেকে ভেঙে তারা আবার পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং কবি যেন বলছেন তুমি যেভাবে আবেগ দিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছ সেখানে একটা ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। তর্জনীর আঙুল দিয়ে কিন্তু বললেন না, বললেন আনামিকার আঙুল দিয়ে। এইখানে তিনি দার্শনিক কবি।
প্রশ্ন : আপনার বিচারে কোন কাব্যগ্রন্থটি সবচেয়ে সার্থক ?
উত্তর : কোনওটাই নয়। আমার কাছে শ্রেষ্ঠ-অশ্রেষ্ঠ বলে কিছু নেই। Pablo Picasso-র কথা হচ্ছে পাঁচটা আঙুলের মধ্যে কোনটাকে ভালো বলব ? … সেটা মহাকাল বিচার করবে। তবে এটা বলতে পারি যে যৌবন বাউল নয়। তার কারণ হচ্ছে যৌবন বাউল একটা বই নয়, অনেকগুলো পর্যায়ের সংকলন। একটি ছেলে একটি মেয়ে এসেছিল, মনে হয় ১২টা চ্যানেল আছে তার মধ্যে কোনও একটার। মেয়েটি বলল ‘একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব ?’ আমি বললাম ‘করো’। সে বলল ‘আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ কোনটি ?’ আমি বললাম ‘এইটা কিন্তু সবাই জানে’।
প্রশ্ন : আধ্যাত্মিকতার বোধ মহৎ কবিতার ক্ষেত্রে কোনও প্রাক-শর্ত হিসেবে কাজ করে ?
উত্তর : একেবারেই না। আত্মিকবোধ। কবিরা তো আধ্যাত্মিকই, তাছাড়া আবার কী ? বিদ্যাপতিতে এত অসাধারণ সব ঐহিক কামনার কথা আছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর যে কবিতাগুলো থেকে গেল সেগুলো আধ্যাত্মিক― প্রচলিত অর্থে যদিও আধ্যাত্মিক নয়, পৃথিবীকে অনাসক্ত অথচ সুন্দর চোখে দেখার আধ্যাত্মিকতা। তিনি একটি মেয়েকে দেখছেন মন্দির থেকে বেরোচ্ছে, নতুন বিদ্যুতের মতো যেন দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে চলে গেল―এই দেখাটাও আধ্যাত্মিক। কিন্তু এটা শুক্রাচার্যের আধ্যাত্মিকতা নয়। এটা অস্তিত্বের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা আধ্যাত্মিকতা। বিদ্যাপতি একদিন কবিতা লিখে বেরোচ্ছেন, সন্ধে হয়ে আসছে―‘যব গোধূলি সময় বেলি/ধনি মন্দির বাহির হেলি/নব জলধর বিজলি রেহা/দ্বন্দ্ব পসারি গেলি।’ যখন গোধূলি সময় হলো মেয়েটি মন্দির থেকে বেরিয়ে এল। মনে হলো নতুন বিদ্যুৎ আমার মধ্যে ধাঁধা আর দ্বন্দ্ব তৈরি করে কোথায় মিলিয়ে গেল। এ কবিতাকে আধ্যাত্মিক বলব না তো কী বলব ?
প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় উৎকৃষ্ট কবিতাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারের কোনও ভূমিকা থাকা উচিত ? ধরুন কয়েকজন বিশিষ্ট কবি-লেখক-শিল্পীকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো ?
উত্তর : একেবারেই না। কবিতা অত্যন্ত স্বল্প সংখ্যক মানুষের একটা পারমিতা। এজন্য কেউ যদি চেষ্টা করেন তাহলে কয়েকজনের নাম এখানে আসতে পারে। সরকার যদি ঠিক করে দেন তার আগে আমার যেন মৃত্যু হয়। আমি এর মধ্যে নেই। আমাকে যদি এই কাজের ভার দেওয়া হয়, আমি তো নেবই না, আরবে কিংবা মেসোপটেমিয়ার কোনও জায়গায় পালিয়ে যাব। এর চেয়ে মারাত্মক কমিশন আর কিছু হতেই পারে না।
প্রশ্ন : কোনও নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট টেবিল, সঙ্গীত-কবিতা লেখার জন্য আবশ্যিক বলে মনে করেন ?
উত্তর : আদৌ নয়। আমি অনেক সময় রাস্তায় যেতে যেতে ট্রামের টিকিটের পিছনে কবিতা লিখে রেখেছি। তবে টেবিলের ব্যাপারটা…
প্রশ্ন : আপনি লিখেছিলেন, ‘মুশকিল ওই লেখার টেবিলটুকু/মস্ত বিশাল বড়’ ওই টেবিলটা ছাড়া আপনি লেখার কথা ভাবতে পারেন ? ওই লেখার টেবিল কি নির্দিষ্ট থাকবে ?
উত্তর : হলে ভালো হয়। বোল পিয়ারম্যানকে যখন নির্বাসন দেওয়া হলো ( ?) পূর্ব থেকে পশ্চিমে তখন তিনি টেবিলটাকে অর্ধেক করে আধখানা টেবিল নিয়ে এসেছিলেন।
প্রশ্ন : মদ্যপান বা অন্য কোনও অনুষঙ্গ কি লেখার পক্ষে সহায়ক হতে পারে ?
উত্তর : একটা অনুষঙ্গ খুব দরকার হয়―পাশের বাড়িতে ঝগড়া হলে আমার খুব কান্না পায়। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে যেটা এখানে প্রায় হয়। কত জায়গায় আমি প্রতিবাদ করব ? খুব অসুবিধা হয় আমার। মদ্যপান একেবারেই না, মদ্যপানের সাথে কবিতা লেখার কোনও যোগ নেই। আমি বলছি না যে বন্ধুজন মিলিত হয়ে কখনও পান করবেন না। বার্ট্রান্ড রাসেল প্রত্যেকদিন একটু করে শেরি খেতেন।
প্রশ্ন : যদি একটিমাত্র কথায় যারা কবিতা লিখতে চান তাদের কিছু বলতে হয়―কী বলবেন ?
উত্তর : অদেখা পাঠকের দিকে একটা চিঠি লিখে জলে ভাসিয়ে দাও। সম্প্রতি কে কী কবিতা পড়ছে, কোনও সম্মেলনে তোমায় ডাকা হচ্ছে বা হচ্ছে না, কী পুরস্কার পাওয়া যাচ্ছে বা যাচ্ছে না, এগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হলে তুমি সন্ন্যাসী হবে। একজন কবি আসলে সন্ন্যাসী।
প্রশ্ন : প্রণীত অগ্নি কাকে বলে তুমি জানো ? এই কাব্যগ্রন্থের ‘পুরস্কৃত’ কবিতাটির প্রায় প্রতিধ্বনি বলা যেতে পারে আপনার শেষ উত্তরটা।
উত্তর : আমি মনে করি এই যে এখন এত পুরস্কারের ব্যাপার হয়েছে, এটা খুবই ক্ষতিকর।
প্রশ্ন : এত দীর্ঘক্ষণ উপস্থিত থেকে এই সাক্ষাৎকারটা সম্ভব করে তোলার জন্য ধন্যবাদ অলোকদা। আমার প্রশ্নপত্রের দীর্ঘতা ও নিরুপায় নিষ্ঠুরতাকে আপনি সস্নেহ ভর্ৎসনা করুন এইটুকুই শেষ আবেদন রাখছি।



