ক্ষরব্রহ্মের কবিয়াল : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার
সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন : দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য
‘এ যেন গুল্মের ডাল, আর আমি একটি বউল,/তার বেশি নই’―যৌবন বাউল কাব্যগ্রন্থের এই স্নিগ্ধ উচ্চারণ পেরিয়ে একদিন জায়গা করে নিল ‘পথে পড়ে থাকে শ্মশান, কুকুর, মানুষ ও বসুমতী/ছুঁয়ে উড়ে যায় একফোঁটা প্রজাপতি’ তাঁর গিলোটিনে আলপনা-র ‘ভিয়েৎনাম্নী’ কবিতাটিতে। পরে আরও-আরও পথ খরায়-বন্যায় হেঁটে তাঁকে বলতে শোনা গেল, ‘সদ্যমৃত সমূহ সৈন্যের/পা থেকে জুতো সরায় সারে-সারে/অন্য যারা এখনও বেঁচে আছে/প্রলয়শীতে, রাতের কান্দাহারে।’ তবে কি রুক্ষ ক্রমশ আরও রুক্ষ বাস্তব-প্রতিম আর নিরুপায় দিগ্দর্শী হয়ে উঠবে তাঁর কণ্ঠস্বর ? কোনও শিথিলতাই তাঁর কবিতায় প্রশ্রয় পাবে না আর! আমাদের নিজের সঙ্গে নিচু স্বরে বলা কথাগুলোও কী করে পৌঁছে যায় তার প্রাণে আর আমরা পেয়ে যাই ‘তোমার নামে নক্ষত্রের বৃক্ষ ভরে শুধু’ বা, ‘ধীমান মুখের পাশে জড়ো করে আনি অভিমানও’―তাঁর এই আর্দ্র রাগমালা। তিনি যখন বলে ওঠেন, ‘ক্ষুধিত মুখের সঙ্গে নগ্নতার তফাৎ কোথাও নেই’―তখন আমাদের ঘুমন্ত সাজগোজ-পরা রূপবান নাগরিক অস্তিত্ব যেন আভূমি কেঁপে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ‘গোপন কান্নার মতো ঘুণাক্ষরে আমার ভিতরে বুদ্ধ বাড়ে’ এমন সব গভীর, বিবেক মথিত-করে-তোলা উচ্চারণে পেয়ে যাই আমরা।
তিনি সমন্বয়ের কবি। দুটো আলাদা দেশ, মহাসময়ের দুটো প্রান্ত ঈশ্বরচেতনা এবং মানবচেতনার দুই ভিন্ন অভিমুখ অন্য এক বোধের ধারকে মিশে যেতে পারে তাঁর মধ্যে―ব্রেশট এবং সুরদাস একই সময় মাথা তোলেন তাঁর বিশ্বে, খ্রিষ্টপূর্বাব্দের রচনার সঙ্গেই সহবাস করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ক্ষতবিক্ষত দিনগুলোর স্মৃতিবিদ্ধ জার্মান কবি পাউল সেলানের রচনা এবং আজকের দিনে বসেই অনায়াসে তিনি অপৌরুষেয় সৃষ্টির দায় বহন করার কথাও ভাবেন।
‘সমস্ত দিন প্রতিবাদ রেখে ফেরার প্রহরে/এ-কী বিস্ময়, কার প্রশাসন তারায় তারায়!’―এই বিস্মিত-দেখা তাঁর চেতনার দীপ্তি মেখে নেয় যখন অথর্বসংহিতার পুরুষসুক্তের ‘ঈশ’ যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো প্রশাসক―খুব আলতোভাবে সেই ঐতিহ্যের দিকে আমাদের জানতে না দিয়ে তুলে নিয়ে যান তিনি। তেমনই একই সঙ্গে একই কাব্যগ্রন্থে বলে উঠতে পারেন ‘গালফের পর/কবিতা আর আগের মতো নয় প্রগলভা/তাকে এখন ভাবতে হবে ভ্রূকুঞ্চনে।’ এমনকি ‘পাড়ার ছেলেমেয়েরা হ্যারি পটারের গল্পে মশগুল হতে হতে তরণী ছাড়াই নদী পার হয়ে গেল’ তা-ও তিনি দেখতে ভোলেন না ।
যে-কোনও বিশিষ্ট কবির সাক্ষাৎকার পল্লবগ্রাহী হতে বাধ্য এবং সেই কবির নাম যদি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত হয়, পাঁচ দশকেরও বেশি যিনি বাংলা কবিতার মেঠো-পথটিতে তাঁর ইথার-মণ্ডিত জামা গায়ে নিয়ে ধুলো উড়িয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং স্বয়ং শক্তি চট্টোপাধ্যায় যাকে তার ‘ছন্দ, বাক-চাতুর্য ও আপাত-সরল বাংলাভাষার’ শিক্ষক হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন, তখন তা আরও প্রশ্নাতীতভাবে সত্যি হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে ওঁর বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তেরোটি সাক্ষাৎকারের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে―‘নিজেকেই যেন দিয়েছি শ্রুতিলিখন’। এই সাক্ষাৎকারটিকে ধরলে ওঁর কথোপকথনের ভুবন নিয়ে একটি চতুর্দশপদী যেন সম্পূর্ণ হলো। একটু খেয়াল করলেই আগের কাজগুলোতে ছন্দ নিয়ে এবং ওঁর অসাধারণ কবিতাগুলোর কবোষ্ণ মুহূর্তের নির্দিষ্ট দায় এবং দাবি নিয়ে জানতে-চাওয়া প্রশ্নের স্বল্পতা লক্ষ করা যাবে। সেই দিক থেকে এই কাজটিকে তাদের পরিপূরক স্বর হিসেবে ভাবা যেতে পারে।
তাঁর ‘বাকরীতির নিসর্গের দিকে’ আমাদের তাকিয়ে থাকতে হয়, যে ছন্দ তাঁর ‘বাল্যবন্ধু’ আমাদেরও তা দু-হাত বাড়িয়ে আহ্বান করে, তবু নিশ্চিন্ত সেই বলয় ছেড়ে অ-সময়ের যে ছন্দ পারার মতো টলমল করছে তাঁর সাম্প্রতিক কবিতায়, যে স্পন্দ কথা-ভাষা আর পড়া-ভাষার মধ্যে দুলে-দুলে উঠছে, তাকে বুঝতে হবে পথে নেমে মিছিলে হেঁটে বিক্ষোভ সমাবেশের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কিংবা হয়তো শ্রী-বিস্মৃত পাগলের বুকে কান পেতেও।
কোনটি পরমার্থ তাঁর―দিন না রাত ? পূর্ণতা না শূন্যতা ? এককভাবে কোনওটাই নয় মনে হয়। তাঁর তো সমতলে পথ-চলা নয়, প্যারাবোলার মতো বাঁক নিতে নিতে তা উঠে যায় এবং নেমেও আসে। অম্লান মেধার হতাশ তীক্ষè অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে তিনি বোধহয় মিশিয়ে দিতে পারেন আশা আর বিরল-পলাশের লাল রং এবং তিনি বলেন, ‘রাত্রি আর দিন/ওতপ্রোত হয়ে আজ কবিতার চলেছে প্রস্তুতি।’ ক্ষর-অক্ষর দুদিকেই তাঁর নিমন্ত্রণ, তবু বিনীতভাবে তিনি যেন ‘দুঃখ তাপের উপত্যকায়’ নেমে এসেছেন অধিকতর আগ্রহে―‘কতোটা জগৎ বুকে নিতে পারে তার সেদিকেই মন’ তখন তাঁকে ক্ষরব্রহ্মের কবিয়াল বলে চিনতে কোথাও ভুল হয় না আমাদের।
(সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সকাল দশ-টা থেকে তিনটের মধ্যে, ১৫/২/৪৯ ঝিল রোড ব্যাঙ্ক প্লট যাদবপুর-এ। সঙ্গী ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী শুচিশ্রী রায়।)
দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য : আজ ২০১২-র প্রথম ভাগে এসে আপনার সুদীর্ঘ কবিজীবনের সার্থকতা সম্বন্ধে আপনার আত্মমূল্যায়ন কী ? গতকালের শিশিরমঞ্চের বক্তব্য এবং কবিতা-পাঠ থেকে (২১শের অনুষ্ঠান) একটা বিষাদের সুর উঠে আসছিল আপনার বলায়।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত : সার্থকতা শব্দটা আমি ব্যবহার করব না, এমনকি মহতী ব্যর্থতা, সেটাও বলব না। একটি কবিতার থেকে আর একটি কবিতায় যাওয়া, সেটা সবসময় কিন্তু একটা নিরন্ধ্র পরম্পরা নয়। একটি কবিতার যে বৃত্ত সেটা সম্পূর্ণ করে আর একটি কবিতার বৃত্তে প্রবেশ করার মধ্যে কবিরও একটা transmigration, একটা জন্মান্তর হয়ে যায় এবং আমি যদি এভাবে বলি, ‘আমার সুন্দর/এই জীবনে ঘটাল মোর জন্ম-জন্মান্তর’ সেইটা যদি হয়, তাহলে আমার মনে হয় যে প্রতিটি কবিতার যে স্বয়ম্পূর্ণ বিশ্ব সেই বিশ্বকে নতুন করে স্পর্শ করার একটা কামনা আমার মধ্যে বোধহয় জন্মাবধি রয়ে গেছে। এই সঙ্গে এই কথাটা আমি যোগ করব যে সম্ভবত আমার যে প্রাক-জন্মের সংস্কার (সেটাকে যদি ভরীব fixe idée বলি, ইংরেজিতে যেটাকে ভরীবফ fixed idea বলা হয়) যে আমার ভাষা যেটা, অর্থাৎ আমার মাতৃভাষা, সেই মাতৃভাষাকে তার সম্পূর্ণ বলয়ের মধ্য থেকে আমি ধরব, সেটা ‘যৌবন বাউল’-এও ছিল এবং আমার সদ্যতন বই, ‘সে কি খুঁজে পেল ঈশ্বরকণা’ তার মধ্যেও রয়েছে। এই দিক থেকে বলতে পারো, আমি আত্মখণ্ডন করে বলছি, প্রথমে যেটা আমার ছিল ‘যা পেয়েছি প্রথম দিনে সেই যেন পাই শেষে,/ দু-হাত দিয়ে বিশ্বেরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে’-এর মধ্যে আশাবাদের সঙ্গে একটা বিষাদও মিশে গেছে, যেটা নশ্বর মানুষের উত্তরাধিকার। একটা খুব সুন্দর কথা বলেছিলেন Leslie Stephen যিনি রবীন্দ্রনাথ-কেও আদি পর্বে বিভাবিত করেছিলেন―nothing is less poetical than optimism, অর্থাৎ আশাবাদের মতো অ-কাব্যিক আর কিছু হতে পারে না। সেই আত্মতৃপ্তির অভাব যখন একজন কবিয়ালের মধ্যে ফুরিয়ে যায়, তার আর কবি হিসেবে বেঁচে থাকার কোনও সার্থকতা নেই। এবং আমি এই সূত্রে আরও বলব, একদিক থেকে বললাম একটা কবিতা থেকে আর একটা কবিতায় যাওয়া, এর মধ্যে যেরকম ভুবন-ভুবন বিসারিত হয়ে যায় তেমনি আবার এটাও ঠিক যে যদি কবি-চারিত্র্য বলে কিছু থাকে তার কাজ হবে সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়ে অন্তত একটা প্রাতিভাসিক সঙ্গতি রচনা করা। অর্থাৎ কবির একটা লক্ষ্য থাকে, পাঠকের কাছে তার যে অঙ্গীকার বা commitment, সেই দায়ভাগের কাছে সত্যকাম থাকা, যদিও তিনি সংস্কারক নন। সেদিক থেকে বলতে পারো, আমি আবারও ফিরে আসি, সার্থকতার আমি কিছুই দাবি করব না, সেই দাবির মূল্যায়ন নিশ্চয়ই মহাকাল করবে, তবে এইটুকু আমি বলব যে আমি আমার আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াই করে গেছি। এই কথাটুকু যদি আমার সমাধি বেদিতে উৎকীর্ণ থাকে তাহলে আমি নিজেকে ধন্য বলে মানব।
প্রশ্ন : আশাবাদ প্রসঙ্গে বলছি, ১৯৩৭-এ যখন রবীন্দ্রনাথের অসুখ করল, দুটো দিন সম্পূর্ণ চেতনাহীন অবস্থায় কাটালেন এবং প্রায় মৃত্যুকেই প্রত্যক্ষ করলেন, তার পরের লেখাগুলোতেও এমনকি অন্য পর্যায়ের আর এক আশাবাদের কথা আমরা পাই। প্রান্তিক-এর লেখাগুলোতেও দেখতে পাচ্ছি…
উত্তর : এই খানে যেটা বলছ সেটা এক ধরনের রাবীন্দ্রিক নির্মিতি বা construct. একেবারের শেষ দিকের কবিতাগুলো যদি দেখো, ‘মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে’ অথবা রানী চন্দ-কে যখন তিনি শ্রুতিলিখন দিচ্ছেন তাঁর কবিতা ‘কে তুমি ?/মেলেনি উত্তর’ যার শেষ কথা ‘কে তুমি ?/পেলনা উত্তর’। আমি আজকে রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাগুলোই আমার রক্তমনের হার করে রেখে দিয়েছি যে সব কবিতার মধ্যে কোনও আরোপিত আশাবাদ নেই এবং সেই সব কবিতাই আমি বরণ করে নিয়েছি, বিশেষ করে তাঁর শেষ পর্বের কবিতা―শেষ পর্বের কবিতার মধ্যে একটা অনির্ণেয়তার টঙ্কার… মনে আছে ? দুই বন্ধু মিলিত হয়েছে। তারা যাচ্ছে। একজন সদ্য বিবাহিত। তার মিলনের সমাচার বন্ধুকে নিবেদন করছে। শেষ ষরহবগুলো দেখ―‘টেলিগ্রাম এল সেই ক্ষণে/ফিন্ল্যান্ড্ চূর্ণ হলো সোভিয়েট বোমার বর্ষণে’।

প্রশ্ন : ‘অপঘাত’।
উত্তর : এই যে রবীন্দ্রনাথ যিনি তাঁর গীতাঞ্জলির মূর্তিটাকে অনায়াসে দলে দিয়ে চলে যাচ্ছেন, আত্ম-দেবায়নের যে গরিমা তাকে ভেঙেচুরে দিয়ে মানুষের অবচেতন অস্তিত্বের ছবি আঁকছেন, সে সব ছবি এখনও বাঙালির অন্তর্জীবনে প্রবেশ করেনি। সেই রবীন্দ্রনাথকে আমার অত্যন্ত বড় বলে মনে হয়… ইন্দিরা গান্ধীর প্রযোজিত emergency-র সময় আমাদের উনি নিমন্ত্রণ করেছিলেন রাজভবনে। তিনি বললেন ‘আপনি শান্তিনিকেতনের ছেলে হয়ে এসব বলছেন! রবীন্দ্রনাথের আশাবাদের উপর নির্ভর করেই তো আমরা এগিয়ে চলেছি, নতুন ভারতবর্ষ এগিয়ে চলেছে। আমি বলেছিলাম ওই Leslie Stephen-এর কথা―আপনি হয়তো জানতেন না কিন্তু আপনার পিতৃদেব জানতেন যে nothing is less poetical than optimism’
প্রশ্ন : তার মানে আপনি বলতে চাইছেন বেদান্তের যে কথা, অর্থাৎ আনন্দকে নির্মাণ করে নিতে হবে, সেই দিকে…
উত্তর : খুব সুন্দর বলেছ। এই যে কথাটা দেখ, এটা Eliot-ও বলেছেন, ‘..to construct something/Upon which to rejoice’. … আজকের সকালটা দেখে ভালো লাগছে। এই যে তুমি আর আমি বসেছি, একটা অপূর্ব পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে। একটু আগেই আমাদের এক বন্ধুর সঙ্গে দোতলায় দেখা করে এলাম। চারদিকে ভেবে দেখো আলোক-বসন্ত এল, এখানে নতুন সরকার বদল হলো। এইগুলোকে দেখেই যে আমরা জীবন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি তা তো নয়। আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি একটা অনপনেয় ভরসার উপর ভিত্তি করে ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস, ওরে মন, হবেই হবে’। স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার দেবার ব্যাপারটা থেকে যাচ্ছে। পদ্ম তুলতে গিয়ে কতবার শাপলা নিয়ে বেরিয়ে আসছি। একটা কবির দুর্ঘট হচ্ছে, যখন তিনি প্রকাশ করতে আরম্ভ করলেন তখন তিনি পাঠকের কাছে উন্মোচিত, বলা যেতে পারে নগ্ন। তার জন্য একজন লিরিক কবি যখন কবিতা লেখেন দেহলিতে দাঁড়িয়ে, তার অর্ধেক ঘর অর্ধেক বাহির। অর্ধেক তার সাজঘরের প্রস্তুতি আর অর্ধেক তার বাইরের দিক থেকে যে জীবন এসে প্রবেশ করছে, পাঠকের প্রত্যাশা এসে প্রবেশ করছে, সেইটা। এর শামিল হতে হয়। পাঠক এবং কবি যখন মেলে কোনও এক লছমন ঝুলার সেতুর মাঝখানে (তুমি লক্ষ করবে ওখানে যদি গিয়ে থাকো) সাঁকোটা খুব নড়বড়ে হয়ে থাকে, দুলতে থাকে, মনে হয় এক্ষুনি পড়ে যাবে। তাহলে কি আত্মহত্যা করবে ? নাকি পাঠককে নিয়ে বসে যাবে এক নৌকায় ? অথবা কী করবে ? এই যে অমীমাংসা, বিষ্ণু দে-র ভাষায় বলছি (tension) আততি, সেটাই প্রায় কবিতার ব্যাপার। এবার এখানে আমি আসছি, তুমি খুব সুন্দরভাবে বেদান্তের কথাটা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছ―বেদান্তে বলা হচ্ছে ‘আনন্দময় অভ্যাস্মাত’, আনন্দকে অভ্যাস করে নিতে হয়। ‘বিশ্ব যখন নিদ্রামগন গগন অন্ধকার’ সেই সময়ে একজন কবি যখন লিখতে বসেন, যা নিশা সর্বভূতানি… সারা রাত্রি সারা দুনিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে, কবি লিখতে বসেছেন, তার করতলে তখন সারা বিশ্বের ভার এসে পড়েছে। তিনি কিন্তু সমস্ত জগতের অস্তিত্বের উত্তরণের জন্য একা দায়বিদ্ধ পুরুষ। আনন্দ সৃষ্টি করে মানুষকে এই গ্রহের উপযোগী করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেই দায়বদ্ধতা থেকে যদি কোনও কবি না লেখেন, তিনি মেজর মাইনর বা অনতিগৌণ কবি হয়েই রয়ে যাবেন। সেই জায়গাটা কবির পক্ষে মৃত্যুর … Eliotও বলছেন, তার আগে বেদান্তও বলে দিয়েছে এই কথাটা
প্রশ্ন : আরোপিত আশাবাদ নয় আপনি বলছেন। বলেছেন দায়বদ্ধতার জায়গাতেও কবিকে আসতে হবে। দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গে মনে পড়ছে প্রান্তিক-এর যে শেষ দুটো কবিতা যিশুর জন্মদিনে বসে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন…
উত্তর : শুধু আশাবাদ নয়, শুধু ভাড়া করা আশাবাদ নয়, কিংবা বইতে পড়া বা পূর্বসূরির কাছ থেকে অধীত আশাবাদ নয়, এমন একটা আশার কথা বলতে হবে, ‘আলোও নিজে কেমন যেন অন্ধকারের মতো।’ সেই দ্ব্যর্থ-দ্যোতকতার মধ্যে থেকে যদি না হয় তবে সেই কবিতার কাছে আমরা ফিরবই না। জীবনানন্দের একটা কবিতা যেটা প্রায় একটা বঢ়রপ-এর ভগ্নাংশ, সেখানে তিনি বলছেন ‘কোথায় সেদিন রয়েছিলাম আজকে মনে হয়/সাগর থেকে আরও বৃহৎ আলো দেখেছিলাম। ঠিক তা সাগর নয়।’ সেটা কি ? ‘প্রশান্ত না কৃষ্ণ মেরিন (? ? ?) ভূমধ্যলীন/আরব মহাসাগর তাকে বলে/এখানেতে সাদা ঘোড়ার ভিড়ে/একটি ঘোড়া সূর্য হয়ে জ্বলে’―এই যে ঘোড়াটা সূর্য হয়ে জ্বলছে তার দু চোখে অসীম বেদনা, অসংখ্য মৃত্যুর স্মৃতি অথচ সে হচ্ছে সূর্যের ঘোড়া। সূর্যের সাতটা ঘোড়ার একটা ঘোড়াই মাত্র কবিতা।
প্রশ্ন : ‘কোটরে-রাখা মানব করোটি যে/দেবদূতের টুকরোখানি। এসব জড়ো করতে নিয়ে জাগে/ভুরুর কাছে শিশির, সম্ভ্রম/এবং আমার নির্ধারণে বিচার করার সময় ভীষণ কম’―(টুকরোগুলো জড়ো করতে গিয়ে/ গিলোটিনে আলপনা)
বা
‘যার ভিতরে সব ঘটনা এবং চরিত্রের/স্বতন্ত্র তাৎপর্য আছে, ভাবতে গিয়ে ঢের/দেরি হয়েছে’ (ক্রমান্বয়/গিলোটিনে আলপনা)
‘…কিংবা যদি আনাচে-কানাচে
ভুলের নজির মেলে, তাহলে তো কথার প্রহারে
তিন প্রহরের পূর্বে যতিচিহ্ন পড়বে না রোদ্দুরে
একঠায় দাঁড়িয়ে পায়ে ক্লান্তি নামে মনেও হবে না,’ (আমার ঠাকুমা/যৌবন বাউল)
এই কবিতাগুলোকে সামনে রেখে ভাবযতি এবং পর্বযতির বিচ্ছিন্নতা এবং ছন্দের বিবর্তন সম্বন্ধে কিছু বলুন।
উত্তর : একদিক থেকে দেখলে এখানে sprung rhythm আছে, বাকছন্দ আছে। তুমি দেখবে চারটে stress বা প্রস্বর থাকছে। কোটরে রাখা, এখানে যেমন চারের জায়গায় পাঁচ চলে এল, যেমন ‘যমুনাবতী সরস্বতী’। এটা আদিম এবং আধুনিক।
প্রশ্ন : প্রত্যেকটাই মুক্তদল, পাঁচই হওয়া উচিত।
উত্তর : পাঁচই হচ্ছে। দ্বিতীয়টি স্বরমাত্রিক,―‘যার ভিতরে―৪, সব ঘটনা―৪, এবং চরিত―৪ রের-অপূর্ণপদী/স্বতন্ত্র তাৎ―৪, পর্য আছে―৪ ভাবতে গিয়ে―৪ ঢের―অপূর্ণপদী- পর্ব,/দেরি হয়েছে।’
প্রশ্ন : ওই কবিতাটিতে পর্বযতি আসছে ‘ঢের’ শব্দটিতে, অথচ ভাবযতি আসছে দেরি হয়েছে বলার পর, এখানে আমি জানতে চাইছি ছন্দের এই প্রয়োগ-কৌশলের জটিলতা এবং একই সঙ্গে আধুনিকতার বিষয়ে।
উত্তর : এর মাঝখানে একটা অব্যক্ত বর্ণের কান্না রয়েছে। যেমন ধরো যেটাকে ত্রিতাল বলা হচ্ছে, সেটা কিন্তু আসলে চার পর্বের। চারের ওপর beat-টা হচ্ছে। তা ধিন ধিন ধা/তা ধিন ধিন ধা/তা ধিন ধিন না/তেটে ধিন ধিন―ধা/চতুর্থ যে পর্ব আসছে, ওটা দিয়ে সমাপ্ত করা হচ্ছে। এবং সেই জায়গাটায় দেখবে ভাবযতির একটা ব্যবহার। যতিটা কী ? ‘জিহ্বেষ্ট বিশ্রাম স্থানং যতিঃ’, জিহ্বা যেখানে একটুখানি বিশ্রাম খোঁজে। মানুষ তো একটানা অনেকখানি শ্বাস ধরে রাখতে পারে না, এই যে শুচিশ্রী গান গায়, লক্ষ করবে মাঝখানে যে একেকটা লম্বা অংশ থাকে, তার মধ্যেও কিন্তু গোপনে গোপনে নিশ্বাস নিচ্ছে। একটা জায়গায় গিয়ে একটু থামল, সেই সময় যন্ত্রের একটা অবকাশ রইল। synthesizer এল বা তানপুরা এল বা এখন যেটাকে বলা হচ্ছে ই-রোদ সেটা এল (হাসছেন। সেদিন খবরের কাগজে ইলেকট্রনিক সরোদ হাতে একজন স্বনামধন্য শিল্পীর পুত্রের ছবি বেরিয়েছিল)। এখন এই বিশ্রামটা না পেলে তিনি একেবারে পড়ে যাবেন। একজন শিল্পীর মধ্যে দেখো, তাকে ভাবযতিটা প্রায়ই ঘন ঘন নিতে হয়, যেমন দেবব্রত বিশ্বাস। কেন ? তার asthma ছিল বলে পাছে না কেশে ওঠেন, সেই জন্য।
কবিতায় এই জায়গায় একটা challenge আছে, যেটা আলোক সরকারের সাম্প্রতিক কবিতায় তুমি পাবে। এটা লক্ষ করবে একটা লাইন থেকে আর একটা লাইন যাবার মধ্যে অনেকক্ষণ পাঠককে ভাবতে দেয় আলোক। এই অবকাশটা যে দেওয়া হচ্ছে, এটা নিয়ে আমাদের এক বন্ধু কাজ করেছিলেন যিনি আমাদের শতভিষার ছান্দসিক আচার্য দীপঙ্কর দাশগুপ্ত―rhythm of silence. এই silence-টা ছাড়া কোনও কবিতাই কবিতা হয় না, কোনও গানই গান হয় না। ইউরোপের composition-এ দেখবে o-ver-ture থেকে পরবর্তী জায়গায় আসবার জন্য একটা বিরতি দেয়, disc-এ তারপর নতুন করে যেন একটা অংশ শুরু হলো… এইবার তোমার প্রশ্নের দ্বিতীয় লেখাটা যদি আমি এভাবে পড়ি―‘যার ভিতরে সব ঘটনা এবং চরিত্রের ১২/স্বতন্ত্র তাৎপর্য আছে ভাবতে গিয়ে ঢের ১২(এক টাকে ভেঙেই এক-দুই দ্রুত উচ্চারণ করা হচ্ছে)/দেরি হয়েছে… এবার তৃতীয় কবিতাটিকে এভাবে scan করো ‘কিংবা যদি আনাচে কানাচে ১/ভুলের নজির মেলে, তাহলে তো কথার প্রহারে ১/তিন প্রহরের পূর্বে যতিচিহ্ন পরবে না রোদ্দুরে।’
প্রশ্ন : যৌবন বাউল-এ―
উত্তর : যৌবন বাউল-এ ‘আমার ঠাকুমা’। ‘একঠায় দাঁড়িয়ে পায়ে ক্লান্তি নামে মনেও হবে না’… কবিতা যখন শেষ হয়, Shakespeare-এর ভাষায় বলব the rest is silence… গানের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় ভুল জায়গায় তালি দেওয়া হয়। শেষ হলে তালি দেয়া নিয়ম―অনেকে জানে না শেষ হয়েছে কি ? একজন যদি তালি দেওয়া শুরু করেন বাকিরা সবাই শুরু করে দেন। লক্ষ্য করেছো না (হাসছেন) ? আর একটা ব্যাপার হচ্ছে, লয়টাকে যখন ওপরে তুলে দেওয়া হলো, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ারা সুযোগ নেন, শ্রোতারা তালি দেবে। ভিতরে যেখানে তান বিস্তারের কাজ হচ্ছে সেই জায়গায় কিন্তু তারা তালি দেন না, চুপচাপ তাড়িয়ে তাড়িয়ে শিল্পীর সংগ্রামটাকে উপভোগ করতে থাকেন, তাঁর ভিতর যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, উপভোগ করেন। এর মধ্যে একটা sadism আছে, একটা পৈশাচিক তৃপ্তি আছে দেখবে তুমি, পাঠকের দিক থেকেও… ‘যার ভিতরে সব ঘটনা এবং চরিত্রের’… ঘটনা এবং চরিত্র কেন এক করা হলো ? এখানে ভাববাচ্যতাকে দু-বর্ণ অবকাশ দেওয়া হলো।
এখানে একটা সংযোজনী রাখছি। কবিতার মধ্যে ভাবযতি এবং পর্বযতি কখনও কখনও এক হয়ে যায়। বা পর্বাঙ্গযতি―‘বুক ভরে শুতে যাই শ্রী রাগ ধ্রুপদগম্ভীর’ (অমিয় চক্রবর্তী), শ্রী রাগ, তারপর তুমি ধ্রুপদগম্ভীর-কে বিশ্লিষ্ট করে দিচ্ছ―গম্-ভীর। কিন্তু আরেকটা পড়া আছে―‘বুক ভরে শুতে যাই শ্রীরাগ (শ্রী রাগ এখানে দ্রুত উচ্চারণ করা হলো) ধ্রুপদগম্ভীর’। ‘শ্রী রাগ’, শ্রী…ই…ই পড়লে দুটো মাত্রা হচ্ছে, না ‘শ্রীরাগ’―এখন তুমি কোনটা পড়বে ? অনেক সময় খুব বড় কবি দুটো সুযোগই একসঙ্গে নেন, দু-দিকটা খোলা রাখেন।
প্রশ্ন : ‘প্রথাগত ছন্দ নিয়ে আমার মনে হয় একটু স্বাধীনতা নেবার সময় হয়েছে’―এ কথাও বলেছেন আপনি। আমি একদিন আপনার লেখার জায়গাটায় কাব্যগ্রন্থের বিভাব কবিতাটির ছন্দ সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম―আপনি মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্তের এক যুগলবন্দির সম্ভাবনার দিকে আলো ফেলেছিলেন মনে পড়ছে…
উত্তর : আমি কবিতাটি পড়ছি―‘এখন তারার পিনকুশন হয়ে/রাত আকাশ ঝলে/পালিয়ে গেল অবক্ষয়গুলি/শোভন কৌতূহলে’, ‘পালিয়ে গেল’-র মধ্যে পাঁচ এসে গেছে।
প্রশ্ন : সব-কটাই তো মুক্তদল ?
উত্তর : কবিতার শেষে, ‘মুশকিল ওই লেখার টেবিলটুকু/মস্ত বিশাল বড়’―এখানেও কিন্তু দেখবে এক-আধটা জায়গায় পাঁচ মাত্রার সুযোগ নিয়েছি। আমার আদর্শ উদাহরণ রয়েছে, ‘গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করে॥’ চারের মধ্যে ধরতে একটু অসুবিধা হয়। তারপর ‘যমুনাবতী সরস্বতী’―দেখো ‘কাজিফুল কুড়াতে গিয়ে (এই জায়গাটা দেখো, এখানে ছন্দের ভুল) পেয়ে গেলুম মালা/হাত ঝুমঝুম পা ঝুমঝুম সীতারামের খেলা।’ ‘কুড়োতে কুড়োতে’―এইভাবেই তো ফুল কুড়িয়ে নেওয়া হয়। আলোকও এই স্বাধীনতাটা নিচ্ছেন। এটা প্রথম এনেছেন সাহিত্যের ইতিহাসে Gerard Manley Hopkins, তিনি এটার নাম দিয়েছেন sprung rhythm. এবং sprung rhythm-এর একটা ব্যাপার হচ্ছে, বাক ছন্দটা ঢুকে যাচ্ছে কবিতার মধ্যে, যেমন ‘কাব্যকে খুঁজেছি প্রায় গরু-খোঁজা করে/অনেকদিন খিদিরপুর ডকের অঞ্চলে/’ এখানে ‘অনেকদিন’টা কি বলবে ? বা ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’ ? এখানে ভাবযতি বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে―ফুল ফুটুক না…আ ফুটুক (না-টাকে বিস্তার করা হচ্ছে) আজ বসন্ত। অমিয় চক্রবর্তীর ভিতরেও এটা ছিল। ওই যে বলছিলাম, ‘বুক ভরে শুতে যাই শ্রী রাগ ধ্রুপদগম্ভীর’… মাত্রার সংজ্ঞা হচ্ছে ‘মীয়তে ইতি মাত্রা’―তুমি যেটাকে তোমার নিজের মতো পরিমাপ করে নিচ্ছ, যেভাবে তুমি মাত্রাটা ভাবছো… সাধারণ মানুষ যখন তোমার চারপাশ দিয়ে যাচ্ছে, তার বিপ্লবের ভাষা ধরো এরকম… ‘জ্যোতি বসুর হলে খুন/বাংলা দেশে জ্বলবে আগুন’―জ্যোতি বসুর―চার মাত্রা, হলে খুন―একটা মাত্রা কম নেওয়া হলো, বাংলা দেশে জ্বলবে আগুন―সেখানে পর্বটা কে উড়িয়ে দেওয়া হলো। বাকছন্দের দিক থেকে কিন্তু মাপটা ঠিকই হচ্ছে, এই ভাবেই তো আমরা কথা বলি। তোমাকে আমি মজা দেখিয়ে দেব, এই যখন বলি, তোমাকে আমি মজা/দেখিয়ে দেব, এইভাবে যদি scan করি, তাহলে ছন্দেই কিন্তু কথা বলছি। আমাদের চারপাশের লোকেরা ছন্দেই কথা বলে, সেটাকে stylize করেই ছন্দ। ছন্দ কথাটার একটা মানে হচ্ছে ছাঁদ। সেটা অনেকটা মুদ্রার মতো, কিছুটা গোপন রাখে কিছুটা প্রকাশ করে। নববধূর যে ছাঁদ, ছাদনাতলার যে ছাঁদ, তাতো গোপন রহস্যের মতো। সে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে একটা বৈদিক মন্ত্র বলছে। সে বলছে, আমি যে পতিকুলে যাচ্ছি, সেখানে আমাকে গণ্য করে নেওয়া হোক। অরুন্ধতী তারার দিকে তাকিয়ে সে বলছে, রুদ্ধাহহস্মি (? ? ?), আমি মুক্ত ছিলাম এতদিন, কৌমার্যে ছিলাম, আমার স্বামীর কোলে আমাকে তুমি বন্দি করে নাও। ছন্দটা এই বন্ধন যেটা ছাড়া কবিতার মুক্তিও নেই। তারপর সে চাবিটা পেয়ে যাচ্ছে, সেই চাবিটা খুলে যে পরিসর ঘরের মধ্যে হচ্ছে তাতে তার অনন্ত মুক্তি। শাশুড়ি তার হাতে চাবিটা ধরিয়ে দিলেন।
প্রশ্ন : ছন্দের অলিন্দ ?
উত্তর : ছন্দের অলিন্দ। ছন্দের অলিন্দ থেকেই ছন্দের দিগন্তের দিকে ঝাঁপ দেওয়া যায়।
প্রশ্ন : ‘এই মুহূর্তে যে-মানুষটি চলে যাচ্ছে আমি তাকে মন্ত্রের ভিতরে তুলে নিলাম।
তুমি এক থেকে দশ গোনো আমি তারই মধ্যে দেব তার মাথায় মুকুট,
সূর্যের সম্মান, লক্ষ কাশফুল, আপন অস্তিত্ব থেকে প্রাত্যহিকতার অন্ন,
যে-জ্যোৎস্না কখনো পায়নি কারো থেকে, ছেয়ে দেব ম্রিয়মাণ শিরায় শিরায়,
ছন্নছাড়া―দেব ওর চলনবলনে ছন্দ যা থেকে কখনো কেউ ফিরতে পারে
না মৃত্যুসমতলে’ (বিভাব কবিতা/ নিষিদ্ধ কোজাগরী)
―কী ছন্দ দেবেন তাকে, জানতে ইচ্ছা করছে।
উত্তর : প্রথম যে ছন্দটা আমাদের জীবনে এসেছে, সেটা স্বরবৃত্ত আর পয়ারের সমন্বয়।
প্রশ্ন : স্বরাক্ষরিক ?
উত্তর : হ্যাঁ, স্বরাক্ষরিক। কী রকম জানো, ‘পয়ার’ কথাটা এসেছে ‘প্রকার’ থেকে। প্রকার সংস্কৃত, তার থেকে পয়ার হয়েছে। তুমি কথা বলছো, কথা বলতে বলতে, তুমি তার মধ্যে অনেক কিছুই চাপিয়ে দিতে পারছো… যেমন আমাদের রাগ-সঙ্গীতে এসেছে পতঙ্গ আর চারপাশের প্রাণিদের আওয়াজ―মতঙ্গের বৃহদ্দেশী বলে একটা বই আছে লক্ষ করবে। মধ্যযুগের বই। বৃহদ্দেশী-তে মতঙ্গ বলছেন রাগ সঙ্গীতের জন্ম হয়েছে একেবারেই চারপাশের যে স্তর, তার মধ্যে থেকে, ব্যাঙ ডাকছে কোকিল ডাকছে ঝিঁঝিঁ ডাকছে… বৃহদ্দেশী-র দেশি অর্থাৎ লোকছন্দ। সেই লোকছন্দটাই যখন বাঁধছো, মন্ত্র হয়ে উঠছে। এখানে তুমি দেখবে, ‘কা আ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।/ চঞ্চল চিত্তে (বা, চী এ) পইঠো কাল ॥’
প্রশ্ন : প্রথম চর্যাপদ ?
উত্তর : ‘চঞ্চল চিত্তে’ এখানে কিন্তু স্বরবৃত্ত ঢুকে গেল। (যেমন : ঝর ঝর বরিষে বারি ধারা) তার মধ্যে চঞ্চল শব্দটাতে যখন এসেছে, দেখবে ছন্দের কারাগার ভেঙে সেটা বেরিয়ে যাচ্ছে, ছন্দের মধ্যে সবসময় কিন্তু কয়েকটা জানালা খোলা থাকবে, কবি সদ্য যেটা রচনা করেছেন এই জানলাগুলোর মধ্যে দিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে, কবি সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু চারপাশ থেকে লোকায়ত বাকছন্দ সংগ্রহ করছেন―একজন ধুনুরি টঙ্কার দিচ্ছে, একটি ফেরিওয়ালা চলে যাচ্ছে, একটি ভিখিরি খঞ্জনী বাজিয়ে চলে গেল―এই সমস্ত কিছুতে ঢুকে তাকে অন্তর্গত করে নিচ্ছেন। আমাদের সঙ্গীত সম্পর্কে প্রথম যে শ্রেষ্ঠ বই বৃহদ্দেশী, সেখানে মতঙ্গ স্পষ্ট করে বলছেন, উচ্চাঙ্গ কথাটার মতো হাস্যকর কিছু নেই। লোকায়ত যে একেকটা সুর, আহির ভৈঁরো যেমন হয়েছে,―ভোরবেলা রাখালরা গরুদের চালিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে, তা থেকে একটা সমাহিতির সুর তৈরি হলো। এই মাধ্যাকর্ষণ যদি না থাকে, এটাকে আমরা বলব ভূস্পর্শ-মুদ্রা, যেটা না থাকলে কোনও শিল্পী কখনওই সবার হয়ে উঠতে পারেন না। উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর থেকে একটা গল্প শুনেছিলাম। সবাই আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি গান শুরু করলেন, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল কী করে! উনি বললেন, তোমরা বুঝতে পারলে না ? তোমাদের কাছ থেকে আসতে গিয়ে দেখি কতগুলো পিঁপড়ে দেয়াল বেয়ে উঠে যাচ্ছে, আমি একটু calculate করলাম (calculate শব্দটাই উনি ব্যবহার করেছিলেন) যে একটু পরে বৃষ্টি নামবে, ঠিক সময় বুঝে গেয়েছি। এর মধ্যে খুব একটা মজার ব্যাপার আছে, আমি বলছি না যে ওঁর গানে এটা হতো না, আমার বিশ্বাস যে বৈজু বাওরা বা তানসেন―এঁদের গানে বৃষ্টি হতো, সুরদাস যখন গাইতেন কবীর যখন গাইতেন আমি অনুমান করি বৃষ্টি হতো, পৃথিবীটা শুদ্ধ ছিল তো ecologically পরিপার্শ্ব শুদ্ধ ছিল এবং মানুষ তাদের আবর্জনাগুলোকে স্তূপ করে ফেলে দিত না―তপোবনে যে সমস্ত নিয়ম দেখা যায়, বাইবেলেও দেখা যায়, মোজেস (Moses) বলছেন মানুষকে শুদ্ধ রাখার জন্য মলিনতাকে দূরে রাখতে হবে। যারা ধর্ম প্রবর্তন করছেন বা যারা গাইছেন, তাদের সঙ্গে লোকবৃত্তের সেই মুহূর্তের যোগ না থাকলে সেটা ধ্রুপদী সঙ্গীত হতে পারছে না। এটা ব্যাখ্যা করতে দাও, তুমি দেখবে একটা courtly audience ছাড়া সভা ছাড়া নির্জনতম গান কবি গাইতে পারেন না। দুটো গান তুমি পাশাপাশি রাখো, ‘আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে’, রবীন্দ্রনাথ এই গানটা যখন লিখছেন, সঙ্গে সঙ্গে স্বরলিপি করাচ্ছেন, শেষে তিনি গেয়ে শোনাচ্ছেন (পূর্ণকণ্ঠে অলোকরঞ্জন গানের মুখটি গাইতে শুরু করলেন)… গুলজার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত কি বিশ্বসঙ্গীত ? আমি বলেছিলাম, নিশ্চয়ই―ইউরোপে কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথ-কে বড় সুরকার বলেও মনে করছেন, শুধু বাণী কেন ? গজলও classical বলব, যদিও গজলের ভাষা উর্দু, আরব থেকে এসেছে (এবার উনি বিখ্যাত গজল গায়ক গুলাম আলি-র ‘চুপকে চুপকে রাত দিন আঁসু বাহানা ইয়াদ হ্যায়’ গাইতে শুরু করলেন)―দুটো গানের সাদৃশ্য দেখো―‘চুপি চুপি আমি যে কেঁদেছিলাম, এখনও মনে পড়ে’, সঙ্গে সঙ্গে লোকেরা হাততালি দিয়ে উঠল, হাততালিটা অশ্লীল নয়, কেননা উনি অংশগ্রহণ করেছিলেন, এমনকি মুশায়রা-তেও নির্জনতম বিষাদ যতক্ষণ না ভাগ করে নিতে পারছেন গায়ক, ততক্ষণ তা হয়ে উঠছে না। বৈদিক যুগে ধ্রুপদী সঙ্গীত ছিল না, আরোহ ছিল অবরোহ ছিল না, বৈদিক যুগে ছিল তিনটি স্বর, উদাত্ত অনুদাত্ত স্বরিত। এটা এল মুঘলরা যখন এলেন, পারস্য থেকেও অনেক সুরের ব্যাপার এল, এস্রাজ ইত্যাদি কিন্তু পারসিক যন্ত্র… বৈদিক যুগের ঋষিরা একা একা ঈশ্বরের সম্মুখীন হচ্ছেন, ঈশ্বরকে একা একা আলিঙ্গন করছেন―স্বার্থপর ছিলেন বলতে হয়। মন্ত্রগুলোর মধ্যেও দেখ ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’―আর সবাইকে নিয়ে নয় …এদিকে আবার আকবরের সভার বাইরেও যখন বৈজু বাওরা গান করছেন, তাঁর অজস্র শ্রোতা দরকার হতো। শ্রোতা ছাড়া নিঃসঙ্গতা জমিয়ে উপভোগ করা যায় না। এটা আমাদের মার্গ সঙ্গীতের একটা নির্দেশ।
প্রশ্ন : ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে উপনিষদের ‘অদঃ পূর্ণম্ ইদং পূর্ণাৎ’ (পূর্ণ ওই দূরে পূর্ণতা গভীরে…) শান্তিপাঠের এই স্তোত্রটাতে বাইরের সম্পূর্ণতাকে নেবার কথাও বলা হচ্ছে।
উত্তর : আমি তো শুধু ভিতর নই। বাহিরের সঙ্গে ভিতরের যে টানাপোড়েন তারই একটা পরম্পরা আমি।
প্রশ্ন : অলোকদা, ছন্দ নিয়ে আমাদের কথা শুরু হয়েছিল। সেখান থেকে আমরা চলে গেলাম গানে। সেটা বোধহয় এইজন্য যে কীভাবে লৌকিক ছন্দকে লৌকিক স্পন্দকে সমস্ত শিল্পের অনুকূল করে নিতে হয়, সেই অত্যন্ত দরকারি কথাটা গানকে সামনে রেখে হলে একটা সহজ বোঝাবুঝির জায়গা তৈরি হয়। আপনার নিষিদ্ধ কোজাগরী কাব্যগ্রন্থের ‘বিভাব’ কবিতাটি সামনে রেখে আমার মূল প্রশ্নটা ছিল―কোন ছন্দ আপনি পাঠকের হাতে তুলে দিতে চান ?
উত্তর : হ্যাঁ―এই মুহূর্তে যে মানুষটি চলে যাচ্ছে আমি তাকে ছন্দের ভিতরে তুলে নিলাম। ছন্দের ভিতরে যদি তাকে তুলে নিই তাতে তার অসুবিধা হচ্ছে, সে যখন ছন্দ থেকে বেরোবে তখন তার steppingগুলো তার চলাটা ছন্দবদ্ধ হয়ে যাবে, সে আর কোনওদিন বেচাল চলতে পারবে না। আমার একটা কবিতা আছে, ‘অধমর্ণ’। গড়িয়াহাটের বাজারের একটি লোকের কাছে আমি প্রত্যেক দিন স্থলপদ্ম কিনি। তিনি আমাকে সমস্ত ফুলের পাপড়িগুলো মেলে ধরেন। তিনি সম্প্রতি একটা ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন যে তাকে আমি যেন কবিতায় তুলে নিই। তুলে নিলে তার দুর্গতি হবে। অনায়াসে তার আর পদ্ম মেলে দেবার ক্ষমতা থাকবে না। কতগুলো বাঁধা নিয়মের মধ্যে তার যে স্বাভাবিকতা সেটা হারিয়ে যাবে। তিনি তখন শুধু শিল্পিত স্বভাব নিয়ে চলবেন। ছন্দের মধ্যে একবার যে দীক্ষিত হলো সে আর বেচাল চলতে পারবে না।
প্রশ্ন : কী ছন্দ তুলে দেবেন তার হাতে, কিছু মীমাংসা হলো ?
উত্তর : আমি তাকে নিশ্চয়ই বাকছন্দটাই দেব। বাকছন্দের মধ্যে যে পষধংংরপধষ ছন্দ রয়েছে, দুটো মিশিয়ে তাকে আমি একটা ছন্দ দেব। অথবা একটা ছন্দ আমি তৈরি করব। ধরো একটা ছন্দ ‘শীতের আকন্দ ফুটি-ফুটি/ফুটে উঠল দুটি/শীতের আকন্দ’। যে classical এখানে আমি করছি, ‘শীতের আকন্দ ফুটি-ফুটি (এখানে দুটো বর্ণ আছে ধরে নাও)/ফুটে উঠল দুটি (দুটো বর্ণ, দু বার নিঃশ্বাস নেবে)/শীতের আকন্দ’ শীতের আ/কন্দ (কন্দটা অপূর্ণপদী)
প্রশ্ন : মধ্যখণ্ডন হলো ?
উত্তর : এখানে পর্ব ভাগ হলো …মানুষের যে রকম বাঁচার নিয়ম আছে তেমন নশ্বর বাঙালির তিনটিই ছন্দ আছে। আর একটা হচ্ছে গদ্যের ছন্দ। এখন ধরো, ‘সেখানে ডানা টিউব ট্রেন রাজার প্লেন আর টেলিপ্যাথির গতি/ছাড়িয়ে নীল আকাশে এসে নীল আকাশে নিজের পরিণতি।’ এখন এই জায়গাটাতে জীবনানন্দ গদ্যে বলছেন না ছন্দে বলছেন বলা খুব মুশকিল। অবন ঠাকুরের লেখার মধ্যেও সেটা ছিল, বলছেন যেটা সেটা scan করা যেত, আমরা অবন ঠাকুরের কাছে গল্প শুনতাম।
প্রশ্ন : আপনি বলেছেন তো, যাদের কথা শুনেছেন তাদের প্রত্যেকের কথা scan করতে পারতেন ?
উত্তর : প্রত্যেকের। এমনকি যখন ওর কাজের লোককে শুচিশ্রী বকছে―(বকে না―হয়তো একটু একটু বকেও জানি না আমি) আমি scan করে দিতে পারি।
প্রশ্ন : আপনার কবিতায় তো বলেইছেন, সাইকেল গ্যারেজের ছেলেটার সারাই-এর শব্দগুলোও আপনি scan করে দিতে পারেন।
উত্তর : সেটা আমি পারি। যখন দেখি পারছি না, তখন মনে হয় আমার চারপাশের বলার মধ্যে কোনও গোলমাল হয়ে গেছে… যেমন…থাক এ কথা থাক… রাজনীতির কথায় আসছি না, কারণ তোমাদের যে সর্বদল-নিরপেক্ষ ইমেজ সেটা আহত হবে…এখন লক্ষ করছো, শপিং মল হবার পর তোমার তো ভাষার দরকার হয় না, তুমি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সেই জিনিসটা কিনে নিচ্ছ। ভাষায় আর বাঙালি কথা বলছে না যেটা নিয়ে আমি কাল বলছিলাম (একুশের সভায়, শিশির মঞ্চে)।
প্রশ্ন : এটা নিয়ে আমার নির্দিষ্ট প্রশ্ন আছে
‘অমাবস্যার বধ্যভূমিতে বিবিক্ত এই বিবাহ
মুণ্ডবিহীন তন্বী রাজকুমারী
তার পাশে এক দর্পনীল ভিখারী
প্রেমিকেরা আনে উপহার জ্বর, বারুদ এবং বিরহ’
(টর্সো/ গিলোটিনে আলপনা)
‘অমাবস্যার বধ্যভূমিতে বিবিক্ত এই বিবাহ/মুণ্ডবিহীন তন্বী রাজকুমারী’ এখানে ‘রাজকু’ অংশটির পরে মধ্যখণ্ডন আসছে। অনেকে বলেন মধ্যখণ্ডন syllable যেভাবে ভাঙ্গে সেই ভাবে হওয়া উচিত। সেভাবে দেখতে গেলে ‘রাজ’-এর পর মধ্যখণ্ডন এলে স্বাভাবিক হতো। এভাবেও তাহলে করা যেতে পারে ?
উত্তর : এটা হয়ে গেছে। ‘তার পাশে এক দর্প নীল ভি/ খারি।’
প্রশ্ন : এটাও ?
উত্তর : ‘প্রেমিকেরা নেয়’ এখানে ছয় হয়ে গেল কিন্তু।
প্রশ্ন : ‘প্রেমিকেরা নেয়’ হতে পারে, এখানে সবই মুক্তদল বা অর্ধস্বর ?
উত্তর : এখানে আমি ‘রাজদুহিতাও’ করতাম যদি ‘দু’-এর পরে কাটতে হতো।
প্রশ্ন : আমার প্রশ্ন যেটা specifically আগেই বলেছি ?
উত্তর : তুমি এটা বুঝতে পারছো না কেন ? hint তো আমি দিয়ে দিয়েছি। টর্সো তো।
প্রশ্ন : হ্যাঁ, টর্সো, বিবিক্ত ?
উত্তর : আমি কেটে দিচ্ছি এক-একটা জায়গায়। বোঝাই যাচ্ছে রাজকুমারীর গলাটা তার আগে কাটা হয়েছে। যখন গলা কাটা হয় তখন তো ছন্দ নিয়ে কাটা হয় না। এখানে ছন্দের বিরুদ্ধে ছন্দ, এরকম একটা ব্যাপার হচ্ছে। মালার্মে একটা কথা বলেছিলেন, কবিদের কবি―সরকার আসে-যায়, ছন্দ থাকে। তিনি কিন্তু সবসময় ছন্দে লিখতেন না। বা বোদলেয়ার, অনেক সময় prose-poem অর্থাৎ গদ্য-কবিতা লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের এই লাইনটা ধর, অনেকটাই গদ্য কবিতার মতো, ‘দিনটা যেন খোঁড়া পায়ের মতো, ব্যন্ডেজেতে বাঁধা।’। এর পাশাপাশি যদি তুমি ছন্দ রাখো, ‘মন্থর পায়ে চলেছে মহিষগুলি,/রাঙা পথ হতে রহি রহি ওড়ে ধূলি,/নানা পাখিদের মিশ্রিত কাকলিতে,/আকাশ আবিল ম্লান সোনালির শীতে।/…শীতের বেলায় রৌদ্র তোমার /জানালায় পড়ে বেঁকে।’―ছন্দের কোনও সঙ্ঘাতের ব্যাপার নেই। কিন্তু ধরো, খুব ছন্দ আনবার চেষ্টা করলাম, ‘তোমারে ডাকিনু যবে কুঞ্জবনে,/ তখনো আমের বনে গন্ধ ছিল।/ জানি না কী লাগি ছিলে অন্য মনে,/ তোমার দুয়ার কেন বন্ধ ছিল।’…বাংলা ভাষায় প্রথম স্বরের ওপর জোর পড়ে। আমি যাচ্ছি। ফলে উদুম্বর-টা ডুমুর হয়ে গেছে, অলাবু-টা লাউ হয়ে গেছে। প্রথম স্বরটা তারপর কাটা যায়―উধার, ধার হয়ে গেছে, কাটা চলে গেছে। এটার প্রাকৃত একটা নাম ছিল অপভ্রংশ একটা নাম ছিল, যখন একটা আঘাত এসে পড়ত তাকে বলা হতো ঘত্তা। আঘাত থেকে ঘত্তা কথাটা এসেছে। রবীন্দ্রনাথ গদ্যছন্দ যখন লিখছেন, ‘আমার ছুটি চার দিকে ধু ধু করছে ধান-কেটে-নেওয়া খেতের মতো।’ আমি এভাবে scan করতে পারি, আমার ছুটি/ চার দিকে ধু ধু করছে/ ধান কেটে নেওয়া খেতের মতো/… পত্রলেখা থেকে একটা বই বেরিয়েছে রবীন্দ্র আলোকবর্ষে, একটু দেখে নিও। সেখানে গানের ওপর অনেকগুলো আলোচনা আছে। (বইটার কপি এখনও পাইনি, তাহলে তোমার জন্য নিয়ে আসতাম) সেখানে রক্তকরবী নাটকের গদ্যের passage যেখানে নন্দিনী বলে চলেছে―পুরো passage throughout scan able (একটা জায়গায় শুধু আমি একটা ছোট্ট শব্দ যোগ করেছিলাম)। আমি scan করে দিয়েছি। নন্দিনী বলছে বিশু পাগলকে, তুমি যে আমাকে ভালোবেসেছ বলোনি তো তেমন করে। আজ রঞ্জন জুয়া খেলায় আমাকে নিয়ে চলে গেল, নন্দিনী যেন বলতে চায় you just missed your chance. থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সে বলছে… (না, দুই হাতে দুই দাঁড় ধরে সে আমাকে তুফানের নদী পার করে দেয়; বুনো ঘোড়ার কেশর ধরে আমাকে বনের ভিতর দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায়; লাফ-দেওয়া বাঘের দুই ভুরুর মাঝখানে তির মেরে সে আমার ভয়কে উড়িয়ে দিয়ে হা হা করে হাসে। আমাদের নাগাই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্রোতটাকে যেমন সে তোলপাড় করে, আমাকে নিয়ে তেমনি সে তোলপাড় করতে থাকে। প্রাণ নিয়ে সর্বস্ব পণ করে সে হারজিতের খেলা খেলে। সেই খেলাতেই আমাকে জিতে নিয়েছে। একদিন তুমিও তো তার মধ্যে ছিলে, কিন্তু কী মনে করে বাজিখেলার ভিড় থেকে একলা বেরিয়ে গেলে। যাবার সময় কেমন করে আমার মুখের দিকে তাকালে বুঝতে পারলুম না―তার পরে কতকাল খোঁজ পাইনি। কোথায় তুমি গেলে বলো তো।) রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আমার সেই কবিতাটা কি তোমার কাছে আছে এখানে ? রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও দু বছর আগের একটা বই বেরিয়েছিল। ওখানে মিছিলে চলার একটা ব্যাপার আছে। সেখানে রয়েছে, বহুরূপী নাটকে রক্তকরবীর পরিচালনা করছেন শম্ভু মিত্র, এ-রকম সময়ের (দরকার হলে পড়ে যোগ করে দেব ফোন করে)। দেখো কত কথা মনে পড়ছে, বামনাচার্য বলেছেন ‘গদ্যং কবিনাং নিকষং বদন্তি’ গদ্যই কবিদের নিকষ পাথর। কীরকম গদ্য তিনি বলেন তা থেকেই বোঝা যাবে তিনি কেমন কবিতা লেখেন। এখানেও একটা সেতু তৈরি হচ্ছে, একটা লছমন ঝুলা তৈরি হচ্ছে। হোমারের যে কবিতা, তাতেও একেকটা জায়গায় আঁকাবাঁকা এলোমেলো নানা রকম ব্যাপার আছে। সফোক্লিসের যে কোরাস, সেই কোরাসের মধ্যে এইটা লক্ষ করা যায়…।
প্রশ্ন : ছন্দের ক্ষেত্রে এই licenseটা তাহলে প্রয়োজনে নিতে পারি আমরা। ‘মধু মাঝির ওই যে নৌকো/ খানা’ এভাবে মধ্যখণ্ডন হতে পারে আবার ‘মুণ্ডবিহীন তন্বী রাজকু/মারী’ এভাবেও হতে পারে।
উত্তর : হ্যাঁ, এখনও আমরা যদি একটু উদার না হই তাহলে অসুবিধা হবে। জগৎটাকে কবিতায় রূপান্তরিত করতে পারব না।
প্রশ্ন : একটা কবিতা প্রচলিত ছন্দে, মুক্ত ছন্দে না-কি গদ্যছন্দে―কীভাবে লেখা হবে, এই ভাবনা রচনার কোন পর্যায়ে স্থির করেন ? অনুভূতির পরিবর্তনের সাপেক্ষে ছন্দকাঠামোর পরিবর্তনের কথা কীভাবে ভাবেন ?
উত্তর : অনেক সময় প্রথমে একটা ছন্দময় শুরু মনে এল। এটা হয় যে কলমটা যখন কাগজের মধ্যে এল তখন সেই ছন্দ-টা বদলে গেল। একটি রাজমিস্ত্রি শুনলাম আর একটি রাজমিস্ত্রিকে বলছে, ‘কাল যের’ম এসেছিলি তেমনি আসবি কাল’। আমার মধ্যে ওমনি একটা কবিতা শুরু হয়ে গেল। আমি ওখানটায় বদলে নিলাম, ‘কাল যেমন এসেছিলি তেমনি আসিস কাল’ … সিন নামের (Seán OÕCasey) একজন আইরিশ নাট্যকার ছিলেন, উনি একটি গোপন মাইক্রোফোন নিয়ে চলতেন, লোকজনের কথাবার্তা dialogueগুলোকে তুলে নিতেন। সমস্ত ছন্দময় সংলাপ। এখন, ‘কাল যেমন এসেছিলি তেমনি আসবি কাল’ এই দুটো লাইন তারা তোমায় দিয়ে চলে গেল, বাকিটা তুমি পূরণ করো। ‘আর তখনি আমার হাতে যেন, জ্বলবে রংমশাল’, এইটা তুমি যোগ করলে। সবচেয়ে সুবিধা হয়, একজন সহ নশ্বর যদি কথা বলতে বলতে তোমার হাতে একটা ছন্দ জুগিয়ে দেয়। না হলে স্টুডিয়োর মধ্যে তুমি যখন একটা ছন্দ তৈরি করছ সেটা করতে গিয়ে দ্বিগুণ একটা সৃষ্টির বেদনা অনুভব কর যে কোন ছন্দটা তুমি তৈরি করবে যা মানুষের কাজে লাগবে। এইটা যখন আমি করি, আমার খুব সুবিধা হয় যে একজন কেউ আমায় এটা ধরিয়ে দিল (‘কাল যেমন এসেছিলি তেমনি আসিস কাল’)। অবশ্য তুমি কখনও কখনও দেখবে যে আমার কবিতায় বলতে বলতে একটা গদ্যের passage -ও এসে গেছে মাঝখানে, তারপর শেষ লাইনটা শুধু ছন্দে এল আলাদা করে, তার কারণ অপচ্যুতি তো আছেই। আমরা যখন রেগে যাই আমরা যখন ভালোবাসি, রাগের মধ্যে দু একটা কথা অতিরিক্ত বলে ফেলি তারপর শমিত করে আনি নিজেকে, ‘আ চ্ছা ঠিক আ ছে।’
প্রশ্ন : রচনার প্রথম পর্যায়েই স্থির হয়ে যাবে ?
উত্তর : লিখতে লিখতে। বলা যেতে পারে দ্বিতীয় ঝোঁকে দ্বিতীয় স্তবকে দ্বিতীয় লাইনে কিংবা দ্বিতীয় অংশে মানে সঞ্চারিতে অন্তরাতে। অন্তরার মুখে ওটা ঠিক হয়ে যায় আবার কোনও কোনও জায়গায় ওটা ঠিক হতেই চায় না। আলোকের ব্যাপারটা বুঝতে পারি ওর একটা লাইন ছন্দে আসে তারপর ও সেটাকে deconstruct করে বিনির্মাণ করে। ও যেরকম ভাবে ভাঙে, মানে ছন্দটাকে ভেঙে দেয়, আমি ইচ্ছে করলে ও যে শব্দগুলো ফেলে দিল, ওর waste paper বাক্স টেনে ওই কবিতাটিকেই পয়ার বা মাত্রাবৃত্ত করে দিতে পারি। ও রেগে যাবে, আমার সঙ্গে কথা বলবে না অনেকদিন সেই সম্ভাবনা আছে কিন্তু।
প্রশ্ন : আপনি বলেছেন ‘চারদিকে যে কাণ্ডকারখানা ঘটছে কবিতা হবে তার ভূকম্পলেখ’―সময়ের কাছে বাগদত্ত থাকতে চান আপনি। কবিতায় স্থান-কালের আভাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর : কবিতার যদিও একটা সংজ্ঞা দেওয়া হয় ‘নিয়তি-কৃত নিয়ম রহিত’ নিয়তির নিয়ম সেখানে খাটে না। আলাদা একটা জগৎ তৈরি হয়। কিন্তু কবিতাও একটা নিয়তির জগতে বাস করে এবং তার চারপাশে যা ঘটছে…আমি দেখি চশারের মতো এ রকম মহাকবি আছেন যিনি সমকালের যন্ত্রণাগুলোকে বাদ দিয়ে গেছেন। যে আলোক রবীন্দ্র পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে তার যুগচেতনা প্রমাণ করেন সেই আলোক কবিতার মধ্যে সমকালের ঘটনা উল্লেখ করবেন না। এটাতে শুদ্ধতার ব্যাপার আছে। যে আরচিবাল্ড ম্যাক্লিশ (Archibald MacLeish) ভিয়েতনামের যুদ্ধে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি তাঁর কাব্যনাটক কিংবা কবিতায় একটাও কিন্তু সংগ্রামী অঙ্গীকার প্রকাশ করবেন না। কবিতাকে শুদ্ধ রাখার একটা ব্যাপার কাজ করে। আমি একটু ধুলোকাদা মাখতে চাই। আমার জামাটা ধুলো মাখা ইথারের জামা। আমি এমন সময় জানি না যে আমি সমকাল কে নিয়ে লিখিনি। যৌবন বাউলে-ও একটা কবিতা দেখবে যখন চিনের অন্তর্গত হয়েছে তিব্বত, আমি লিখেছি, ‘পাঞ্চেন লামা যাই বলুন বাঁধা দিন কি না দিন’―একটা কবিতা আছে শেষের দিকে, দেখ। সেখানে কিন্তু আমি প্রতিবাদ করছি। তারপর থেকে ক্রমশ বিশেষ করে যখন গাল্ফ যুদ্ধ হলো সম্ভবত আমিই একা নিধিরাম সর্দারের মতো প্রতিবাদ করেছিলাম। অনেক উদ্বাস্তু আমার সঙ্গে থেকেছেন। তাদের সাথে জীবন যাপন করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, যেমন আডর্নো (Adorno) বলেছিলেন Auschwitz-এর (অঁংপযরিঃু) নাৎসি নির্যাতনের পর্বের পরও কি লিরিক কবিতা লেখা সম্ভব ? কখনওই না (To write poetry after Auschwitz is barbaric)―। এই প্রশ্নটা আমার কাছে জ্বলন্ত এল যখন আমেরিকা গাল্ফ আক্রমণ করল। সেই সময় আমি চুপ করে বসে থাকব! আমি জানি আমি যা লিখছি তার অনেকখানি অংশই মহাকালের বুকে ঝরে যাবে কিন্তু ঝরে গেলেও আমি যদি সময়কে না ছুঁয়ে থাকি নিজেকে মার্জনা করতে পারব না। তুমি জানো যে আমার মধ্যে একটা মার্ক্সবাদের ব্যাপার আছে, তা সত্ত্বেও আমার মনে হলো সরকার কিছু ভুল করছেন এবং যাদের অনেকের সম্বন্ধে আমার মনে একটা কোমল কোণ আছে তারা ভুল করছেন। তখন আমি লিখলাম ‘গোলাপ এখন রাজনৈতিক’। এটা আমি জানি যে আমার কবিতাপ্রেমী বন্ধুরা আমাকে ভালোবাসেন বলে হয়তো কিছু বলছেন না কিন্তু তাদের মনে একটা অভিমান জমে উঠতে পারে। হয়তো মালার্মে আমার সঙ্গে দেখা হলে বকতেন ‘এগুলো তুমি কী করছ অলোক ?’ আমি যখন রবীন্দ্রনাথের আভায় লালিত হয়েছি তখন আমি কিন্তু সাম্যবাদের আন্দোলনেও যোগ দিয়েছি।
প্রশ্ন : আপনি তো ঘুরেও বেড়িয়েছেন গ্রামে-গ্রামে ?
উত্তর : হ্যাঁ, ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি নানা গ্রামে। অক্ষরব্রহ্মের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষরব্রহ্মের সঙ্গেও আমার খুব ভালো একটা জবর-দোস্তি আছে।
প্রশ্ন : আপনি তো উপনিষদের একটা তৃতীয় ভাষ্য এনে দিলেন ?
উত্তর : তাই তো, দোস্তি (হাসছেন)। আচ্ছা একটা কবির ক-টা কবিতা থাকে বলোতো ?
প্রশ্ন : বলেছিলেন, পাঁচটা কবিতা থাকলেই যথেষ্ট। অনেকেরই সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলেছি আমি। তাঁদের মত অলোকদা এই সংখ্যা পেরিয়ে অনেক নিশ্চিন্ত দূরত্বে আছেন।
উত্তর : এটা গটফ্রিড বেন (Gottfried Benn))-এর কথা।
প্রশ্ন : দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে কাব্যগ্রন্থের বিভাব কবিতাটি, ‘আজ দেখি…আমার পার্বণ।।’ মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছে ওই বইটার ‘মাধ্যাকর্ষ’ কবিতার ‘মানুষ কোথাকার!’ এই লাইনটাও। মনে হয় আপনার সমগ্র অস্তিত্ব মথিত করে রয়েছে মনুষ্যত্বের এই বোধ এবং তার বিস্তৃত নিয়ত-সম্প্রসারণশীল চরাচর।
উত্তর : আমি তো মানুষ হয়েই জন্মেছি। কতখানি মানবজমিন আমি ব্যবহার করতে পারি, কতটা আবাদ করে সোনা ফলাতে পারি সেটা একটা লক্ষ্য থাকবে আমার। কিন্তু মানুষের সর্বস্বতা নিয়ে, একাধিপত্য নিয়ে আমার মনে সংশয় জেগেছে। মানুষ নিসর্গকে হত্যা করেছে, মানুষ নিউক্লিয়ার যুদ্ধ বাঁধিয়েছে, মানুষ ঈশ্বরের সরণিটাকে বারবার লুপ্ত করে দিয়েছে। তাই যদি হয় দীপকরঞ্জন, তাহলে man is a measure of all things বলে এক গ্রিক দার্শনিকের যে কথা আছে, মানুষ সবকিছুর মাপকাঠি, সেটা মানতে আমার খুব অসুবিধা হচ্ছে। দালাই লামা একবার বলেছিলেন মানুষ না থাকলে বিশ্বচরাচর আরও পবিত্র থাকত, আমি বললাম সেদিন।
প্রশ্ন : হ্যাঁ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে বলছিলেন ?
উত্তর : যার জন্য ecology ব্যাপারটা আসছে। এই শব্দটা আসছে oikos এবং logos থেকে। মানে বিশ্ব এবং মানুষ প্রকৃতি এবং মানুষ পশু আর মানুষ একই বাড়িতে থাকবে। আর logos―তার বাণীটা তার তত্ত্বটা। মানুষ তো worst ecological animal। দোয়েল পাখিদের দেখে এক্ষুনি অলকবাবু দুঃখ করে বলছিলেন, সবাই নির্বিচারে নোংরা ফেলে যাচ্ছে তোমাদের সামনের ঝিলটাতে। আর একটা কথাও মনে হয়, মানুষের অসহায়তার কথা। ‘দেখেছি যা হ’লো হবে মানুষের যা হবার নয়’―জীবনানন্দের … এখন আমার মনে হয় যে মানুষ একটু বেশি ধ্বংসাত্মক আবার অন্যদিকে আমার মনে হয় মানুষের মধ্যে একটা দিব্যতা আছে। সব মিলিয়েই মানুষ। আজকে যে দিন যাপন করবে, তুমি যখন পৌঁছবে তোমার কাজের জায়গায়, তোমার চারপাশে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোকে রেখে তুমি পৌঁছবে সেখানে। তুমি যখন দীপকের (কবি দীপক রায়) সঙ্গে বসবে, একটা সমাহিতি তৈরি হবে আজকে সন্ধেবেলা। তুমি দেখবে যেতে যেতে তোমার পাশের কামরায় লুটতরাজ হচ্ছে ধর্ষণ হচ্ছে, একজন শিক্ষককে ধরে মার দিচ্ছে। তুমি তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারো না, ঈশ্বর পারেন কি না সেটা দ্বিতীয় প্রশ্ন। আমি মানুষের এই সীমাবদ্ধতার কথাটা খুব বেশি ভাবছি। ঈশ্বরকে নিয়ে আমার অভিমান আছে। ঈশ্বর যদি নাও থাকতেন তাহলেও আমার ঈশ্বর দরকার ছিল। একজন বড় অস্ট্রেলীয় কবি, তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি বইটা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করেছেন, এটা কি আপনার construct ? তিনি বলেছিলেন আমি ঈশ্বরের construct। তিনি কিন্তু ভক্তির কবি নন। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার এটাও মনে হচ্ছে মানুষ হয়ে না জন্মালে আমি তো কবিতা লিখতে পারতাম না। ঈশ্বর আমাকে দয়া করেছেন কিন্তু এটাও হতে পারে একদিন আমি আর পারব না। একটা উদাহরণ দিই। আমার এক মাস্টারমশাই ছিলেন শশীভূষণ বাবু, তাঁর তখন খুব অসুখ হয়েছে। তাঁকে বলেছিলাম, আপনি বলবেন ফরপঃধঃরড়হ দেবেন। আমরা লিখে নেব। তিনি বললেন, অলোক নিজের হাতে যদি লিখতে না পারি খুব অসুবিধা হয়। আমি না লিখতে পারলেও যদি computer-এর আশ্রয় নিই, হয়তো লিখতে পারি কিন্তু আমি সেটা চাইব না। এমন যদি কোনওদিন হয় দীপকরঞ্জন যে আমি আর লিখতে পারছি না হাতের লেখায়… অমিয় চক্রবর্তীর হয়েছিল, তখন তিনি যেসব dictation দিয়েছিলেন তার মধ্যে তিনি নেই। কালি কলম মন লেখে তিনজন। মানুষকে ঈশ্বর দিয়েছেন সেই ক্ষমতাটা ‘পাখিরে দিয়েছ গান, গায় সেই গান,/ তার বেশি করে না সে দান।/আমারে দিয়েছ স্বর, আমি তার বেশি করি দান,/আমি গাই গান।/’ … আমাকে স্বরটা তিনি দিয়েছেন।
…………………………………….



