Uncategorized

শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু : মানবর্দ্ধন পাল

ভাষা-গবেষণা ধারাবাহিক

ঊনিশতম পর্ব

[প্রাচীন ভারতীয় আলঙ্কারিকরা শব্দকে ‘ব্রহ্ম’ জ্ঞান করেছেন―শব্দ যেন ঈশ্বরতুল্য। পাশ্চাত্যের মালার্মেসহ নন্দনতাত্ত্বিক কাব্য-সমালোচকদেরও বিশ্বাস, শব্দই কবিতা। শব্দের মাহাত্ম্য বহুবর্ণিল ও বহুমাত্রিক। বাংলা ভাষার বৃহদায়তন অভিধানগুলোর পাতায় দৃষ্টি দিলেই তা প্রতিভাত হয়। আগুনের যেমন আছে অসংখ্য গুণ, তেমনই ভাষার প্রায় প্রতিটি শব্দেরও আছে অজস্র অর্থের সম্ভার। কালস্রোতে ও জীবনের প্রয়োজনে জীবন্ত ভাষায় আসে নতুন শব্দ, তা বিবর্তিতও হয়। পুরনো শব্দ অচল মুদ্রার মতো ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে মণি-কাঞ্চনরূপে ঠাঁই নেয় অভিধানের সিন্দুকে।

বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার সমুদ্রসম―মধুসূদনের ভাষায় : ‘ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন’। বৈঠকি মেজাজে, সরস আড্ডার ভঙ্গিতে লেখা এই ‘শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু’। ব্যক্তিক ও নৈর্ব্যক্তিক―সবকিছু মিলিয়ে শব্দের ভেতর ও বাইরের সৌন্দর্য-সৌগন্ধ এবং অন্তর্গত আনন্দধারার ছিটেফোঁটা ভাষিক রূপ এই ‘শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু’ ধারাবাহিক।]

শৈশব

ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে,

ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।

       Ñকিশোর, গোলাম মোস্তফা

‘মহাবিশ্বের মহাকাশে’ সবকিছুরই শৈশব থাকে, সবারই শৈশব আছে। মহাবিশ্বের শৈশব আছে, মহাকাশেরও শৈশব আছে। বস্তজগতের আছে, পৃথিবীর আছে, প্রাণিজগতের আছে, প্রকৃতির আছে, গাছপালার আছে―মানুষের তো আছেই। সবকিছুর শৈশবের ভেতর আছে অনাবিষ্কৃত রহস্য, আলো-আঁধারি ঘটনার সমাবেশ। মহাবিশ্বের শৈশবের মধ্যে আছে রহস্যময় দর্শন ও বিজ্ঞান। তপ্ত বাষ্পীয় অবস্থা থেকে যে বিশ্বজগতের সৃষ্টি, তারও আছে শৈশব। এই যে পাহাড়-পর্বত, গিরি-নদী, বন-জঙ্গল, মহীরুহ, সাগর-মহাসাগর―এসবেরও নিশ্চয়ই আছে শিশুকাল। এই যে বিরাট বিটপীশ্রেণি, সুউচ্চ গাছপালা, তারও আছে শৈশব। বীজের অঙ্কুরোদগম থেকে হয়েছে চারাগাছ, ডিম থেকে পক্ষিশাবক, ডিম্বাণু-শুক্রাণু থেকে প্রাণিকুলের সন্তানসন্ততির জন্ম থেকে বেড়ে-ওঠার পর্যায়―এসবই শৈশবকাল।

তবে শৈশব বা শিশুকাল বলতে আমরা কেবল প্রাণিজগৎ নয়; মানুষের জীবৎকালের প্রাথমিক পর্যায়টুকুই প্রধানত বুঝি এবং বোঝাতে চাই। তাই মনুষ্যেতর প্রাণি বা উদ্ভিদের কথা বাদ দিয়ে আমরা শুধু মানুষের জীবনকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের এই পর্যায়গুলোকে বলি : শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন, বার্ধক্য। তারপর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিলয়―পঞ্চভূতে মিশে যাওয়া।

প্রতিটি শব্দের সদরে থাকে অর্থের মাহাত্ম্য। অন্দরে থাকে বিচিত্র চেতনার বিকাশ। শব্দের বহুমুখী অর্থের স্বরূপ প্রকাশ পায় এর সদরে-অন্দরে। ‘শিশু’ শব্দটি তৎসম বা সংস্কৃত এবং পদ হিসেবে বিশেষণ। এর বুৎপত্তিÑশিশ্ (গমন করা) + উ = শিশু। শব্দটি উভলিঙ্গ―অল্পবয়সী নারী-পুরুষ উভয়কে বোঝায়। অভিধানে শিশু শব্দের অর্থ পাওয়া যায় : শাবক, আট বছরের অনধিক বয়সী, মতান্তরে ষোলো বছরের বেশি নয় এমন। প্রাচীন বাংলা ভাষায় শিশুর স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ ছিল ‘শিশুনী’। আধুনিক কালে তার প্রচলন নেই। মধ্যযুগে এর সাক্ষ্য আছে ভবানীদাসের রামরত্ন গীতায় :

‘দুগ্ধপোষ্য দেখিয়া জলপতি/ক্রোড়ে করি নিজালয়ে গেলা শীঘ্রগতি।/বারুণীরে সমর্পিলা সে কন্যা রতন।’ (বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়)। এই কাব্যপঙ্ক্তিতে কন্যাশিশু অর্থে কেবল ‘শিশুনী’ শব্দের প্রয়োগই নয়; এর নিহিতার্থে রয়েছে প্রাচীন কালে সনাতন ধর্মের একটি কুসংস্কার―প্রথম কন্যাসন্তান গঙ্গাজলে বিসর্জনের ইঙ্গিত।

শিশু শব্দের সমার্থক বা প্রতিশব্দ হিসেবে অভিধানে লেখা হয়েছে :

বাল, বাচ্চা, কচি, কাঁচা, কচিকাঁচা, বাচ্চা, কাচ্চাবাচ্চা, শাবক, ছানা, ছানাপোনা, ছোট বাচ্চা, কোলাচ, অর্ভক, বালিশ, অব্রুবাণ, মুষ্টিন্ধয়, বেবি, নবজাত, নবজাতক, সদ্যোজাত, সদ্যঃপ্রসূত, দুগ্ধপোষ্য, পোগণ্ড, অপোগণ্ড, অঙ্কগ, বাছা, বৎস, যাদু, পৃথুক, অল্পবয়স্ক, অল্পবয়সী, অপত্য, নব, অচিরোদিত, অপ্রাপ্তবয়স্ক, অপরিণতবয়স্ক, অপ্রাপ্তযৌবন, ছেলেমানুষ, অপরিপক্ব, ইত্যাদি। (অশোক মুখোপাধ্যায়ের সংসদ সমার্থশব্দকোষ ও হাবিবুর রহমানের যথাশব্দ)। এই তালিকার অনেক শব্দই সংস্কৃত বা তৎসম―আমাদের অজানা বা প্রথম জানা। এগুলো মোগলীয় প্রাচীন মুদ্রার মতোই অভিধানের সিন্দুকে বন্দি। আধুনিক বাংলা ভাষায় এসবের অধিকাংশই অচল এবং প্রয়োগবর্জিত বলে একালের ভাষা-বিশেষজ্ঞদের কাছেও নিশ্চয়ই অপরিচিত। তবে এ কথাও সত্য যে, বাজারে অচল হলেও মোগলীয় মুদ্রার মতো তা অমূল্য―বর্জ্যের মতো মূল্যহীন নয়। সংস্কৃত বা বাংলা যা-ই হোক, এসব শব্দের মূল অর্থ ‘শিশু’। এই শিশু শব্দের সঙ্গে তদ্ধিত যুক্ত হয়ে ‘শৈশব’ শব্দের সৃষ্টি―শিশু + ষ্ণ/য = শৈশব। তাই ব্যাকরণের প্রত্যয় বিবেচনায় এটি তদ্ধিতান্ত শব্দ। (জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান দ্বিতীয় খণ্ড)।

শিশু ও শৈশব শব্দের ভেতর আরও মারপ্যাঁচ আছে। মানবশিশু মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শুরু হয় শিশুকাল বা শৈশব। এর সময়সীমা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ? এ-নিয়ে নৃবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। শৈশবের সময়সীমা সকল দেশে, সব জাতি-রাষ্ট্রে একরকম নয়। কোনও দেশে শৈশবকাল অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত আবার কোনও দেশে প্রলম্বিত। শিশুকালকে আমরা ছেলেবেলা বলি। ‘ছেলেবেলা’ শব্দটিতে আমরা লিঙ্গভেদ করি নাÑউভলিঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করি। রবীন্দ্রনাথও শৈশবস্মৃতি লিখেছেন ছেলেবেলা শিরোনামে। কিন্তু নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন ‘ছেলেবেলা’ শব্দটি পুংলিঙ্গ বিবেচনা করে তাঁর শিশুকালের স্মৃতি লিখেছেন আমার মেয়েবেলা নামে। এই মেয়েবেলাকে ‘ছেলেবেলা’র স্ত্রীলিঙ্গবাচক বিবেচনা করলে শিশু শব্দের ভিন্নমাত্রিকতা প্রকাশ পায়। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ-ও নিশ্চয়ই প্রতিবাদ।

সাধারণভাবে শিশুকাল বলতে আমরা বছরতিনেক বয়স পর্যন্ত বুঝি―চিৎ থেকে উপুড় হওয়া, বসতে শেখা, হামাগুড়ি দেওয়া এবং দৌড়ুতে শেখা। এরই মধ্যে মা-বাবাকে ডাকতে ও ছোট ছোট শব্দ-বাক্য বলতে শেখা। তারপর বাল্যকাল ১০/১২ বছর পর্যন্ত। তবে মনোবিজ্ঞানে শৈশবকে ৫/৬ বছর এবং বাল্যকালকে ৬-১২ বছর পর্যন্ত বলা হয়েছে। এরপর ১২ থেকে ১৮ বছরের পূর্বপর্যন্ত সময়কে কৈশোরকাল বা বয়ঃসন্ধিকাল ধরা হয়। জাতিসংঘের শিশু-অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত মানবসন্তানকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বয়সসীমা সারা বিশ্বে শিশু-অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মান্য করা হয়। (ইন্টারনেট)। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এখন জাতিসংঘের বিধান অনুসারে ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু বলে বিবেচনা করা হয়। আমাদের দেশেও এ-নিয়ম প্রচলিত। তাই ১৮ বছর পূর্ণ না-হলে কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হয় না, ভোটার হতে বা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারে না।

পাশ্চাত্যের মনোবিজ্ঞানীরাও জন্মের পর থেকে কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বের সময়টাকে শৈশব বলেছেন। পিয়াজেঁর থিওরি অনুসারে শৈশবের দুটি পর্ব রয়েছে―প্রাককর্মক্ষম পর্ব ও কর্মক্ষম পর্ব। মনোবিজ্ঞানে শৈশবের মনোদৈহিক উন্নতির উপপর্বগুলো হলো হাঁটা শেখার সময়, খেলার সময়, স্কুলে যাওয়ার সময় এবং বয়ঃসন্ধির সময়। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে, বিশেষত দার্শনিক জন লকের শিক্ষাবিষয়ক মতবাদে শৈশবকাল সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হয়। (ইন্টারনেট)।

সবকিছু বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, জন্ম থেকে ১৮ বছরের আগ পর্যন্ত সময়টা বেশ দীর্ঘ। এই শৈশবকালের দীর্ঘত্ব দেশে-দেশে ভিন্ন হতে পারে। তা নির্ভর করে সে-দেশের জলবায়ু এবং আবহাওয়ার ওপর। পৃৃৃথিবীতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ আছে, আছে বরফাচ্ছন্ন শীতপ্রধান ও নাতিশীতোষ্ণ দেশ। শারীরবিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, গ্রীষ্মমণ্ডলের দেশে মানুষের যৌবন ও বয়ঃসন্ধিকাল শীতপ্রধান দেশের তুলনায় দ্রুত আসে। শীতের জড়তা শৈশবকে দীর্ঘায়িত করে। শৈশবের সময় নির্ণয়ে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

শৈশবকে প্রায় সকল মহাজন মাধুর্যময় সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মাতা-পিতা ও অভিভাবকদের আদর-যত্নে, স্নেহ-ভালোবাসায় শিশুকাল অতিবাহিত হয়। থাকে না কোনও চিন্তা-ভাবনা, দায়দায়িত্ব ও দুঃখের ভার। কিন্তু আনন্দময় ও নিরাপদ শৈশব কি সবার থাকে ? আমাদের দেশে অধিকাংশ শিশুর শৈশব আনন্দময় নয়, নিরাপদও নয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও শিশুশ্রম আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু এর কার্যকারিতা আছে এই দেশে ? প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিশু প্রাথমিক স্কুল থেকে ড্রপআউট হয়ে অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যতে নিমজ্জিত হচ্ছে। গৃহকর্ম থেকে গার্মেন্টস, চা-খানা থেকে ছোট যানবাহন চালনায় নিয়োজিত হচ্ছে। অসংখ্য নারী-শিশু শিকার হচ্ছে শারীরিক নির্যাতনের। দৈনিক পত্রিকা এসব খবরে সয়লাব। পথশিশুদের সংখ্যা দেশে এখন ক্রমবর্ধমান।

এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজে, বিত্ত ও চিত্তের ব্যবধান যেখানে আকাশ-ছোঁয়া, সেখানে সোনার চামচ মুখে নিয়ে সবাই জন্মায় না। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুজনেই বড় কবি কিন্তু তাঁদের শৈশব একরকম নয়। মধুসূদন ও সুকান্তর শৈশবকালও অভিন্ন ছিল না। মূলত বিত্তের ব্যবধান তাঁদের শৈশবকে ভিন্ন ও বিপরীত খাতে বাহিত করেছে। পারিবারিক এবং সামাজিক পরিবেশও শৈশবকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। তাই নগরজীবনে প্রতিপালিত একটি শিশুর সঙ্গে গ্রামে বেড়ে-ওঠা শিশুর শৈশবকালে থাকে বিস্তর ব্যবধান। কিন্ডারগার্টেনে পাঠরতদের শৈশবের সঙ্গে টোকাই-শিশুর মনস্তত্ত্বে, উভয়ে নগরবাসী হলেও, আছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শিশু ও শৈশবকালের মধ্যে এই শ্রেণি-বিভাজন বড় নির্মম।

শৈশবে বাল্যশিক্ষায় মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কবিতায় আমরা সবাই পড়েছি : ‘রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে/ শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।’ এখানেও সেই শ্রেণি-বিভাজন সুস্পষ্ট। মাঠে গরুর পাল নিয়ে-যাওয়া রাখালরা যেন শিশু নয়! বয়সে ওরা শিশু হলেও পরিবারের অর্থকষ্ট ওদের রাখাল বানিয়েছে। আর অর্থের সামর্থ্য এক শ্রেণির শিশুকে বানিয়েছে শিক্ষার্থী। সমুদ্র-উপকূলীয় অঞ্চলে নিয়ত ঝঞ্ঝার কবলে বেড়ে-ওঠা শিশু, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে শরণার্থী শিবিরে বেঁচে-থাকা শিশু কিংবা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে বেঁচে-থাকা শিশুর শৈশব একরকম নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশ ইথিওপিয়া, লেবানন, বৈরুত, প্যালেস্টাইন, ইরান প্রমুখ দেশের শিশুদের শৈশবকালের কথা না হয় না-ই ভাবলাম।

বাংলা সাহিত্যে শিশুচরিত্র ও শৈশবের বর্ণনাও কম নেই। ছড়া-কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে শিশু-চরিত্রের বিচিত্র বর্ণনা ও বিকাশের বিবরণ ছড়িয়ে আছে। শিশু ও শৈশব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক লেখালেখি করেছেন। গান-গদ্য, ছড়া-কবিতাসহ তাঁর বহু রচনায় শিশুদের প্রসঙ্গ আছে। শিশুদের নিয়ে এবং শিশুদের জন্য তিনি একাধিক বইও রচনা করেছেন : সহজ পাঠ (১ ও ২), শিশু ভোলানাথ ও শিশু রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শিশুতোষ গ্রন্থ। রঙিন শৈশবে শিশুদের থাকে বিস্ময়-ভরা চোখ, কৌতূহলী মন, জিজ্ঞাসা-ভরা অসংখ্য কথামালা! নতুন পরিপার্শ্বকে জানার জন্য শৈশবে থাকে অন্তহীন আবেগ। রবীন্দ্র-রচনায় শৈশবের সেই সব রঙিন আবেগ-অনুভূতি এবং মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শিশুর থাকে আলাদা জগৎ, নিজস্ব পৃথিবী। সেই পৃথিবীর নাড়ি-নক্ষত্র যারা বোঝেন, বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং লিখে শিল্পিতভাবে প্রকাশ করেন তারাই শিশুসাহিত্যিক। সাহিত্যিক হলেই সকলে শিশুসাহিত্যিক হতে পারেন না। সেজন্য চাই আলাদা মন-মনন, প্রকাশ-ক্ষমতা এবং শিশু-মনস্তত্ত্ব অনুধাবনের শক্তি।

সামগ্রিক মানব-মনস্তত্ত্ব তো বটেই, শিশু-মনস্তত্ত্ব অনুধাবন ও রূপায়ণের প্রতিভাও অসামান্য ছিল রবীন্দ্রনাথের। শিশুদের জন্য রচিত তাঁর ছড়া-কবিতা, গান, ছেলেবেলার আত্মস্মৃতি এবং ছোটগল্পের অনেক চরিত্রের মধ্যে তার পরিচয় পাওয়া যায়। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘পোস্টমাস্টার’-এর রতন, ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনি, ‘গিন্নি’ গল্পের আশুতোষ, ‘সমাপ্তি’র মৃন্ময়ী, ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক, এবং ‘অতিথি’র তারাপদর কথা। এরা সবাই চার থেকে বারো বছরের শিশু এবং গ্রামীণ পরিবেশে প্রকৃতির কোলে স্বাধীনভাবে বেড়ে-ওঠা। রবীন্দ্রনাথ এসব চরিত্রের মাধ্যমে শৈশবের বিচিত্র মনস্তত্ত্বের স্বরূপ ও স্বাধীন শৈশব বিকাশে প্রতিবন্ধকতার ফল গল্পের আবরণে তুলে ধরেছেন। সেসবের প্রসঙ্গ বহুমুখী, প্রেক্ষাপটও বিস্তৃত এবং তা আলাদা আলোচনার বিষয়।

বাংলা গদ্যের সূচনার পর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে বিশ শতকের বিখ্যাত কবি-লেখকরা প্রায় সকলেই শৈশবস্মৃতি লিখেছেনÑকেউ সংক্ষিপ্ত, কেউ বা বিস্তৃত। অনেকের আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথায়ও উঠে এসেছে শিশুকালের স্মৃতিচারণ। সেসব বাল্যস্মৃতিতে বর্ণিত হয়েছে যাপিত জীবনের পরিবেশ-প্রকৃতি, হাসিকান্না ও অম্লমধুর ঘটনাবলির সরস বিবরণ। সেই মহাজনরা শিশুকালে যেভাবে গড়ে উঠেছেন তা পাঠ করে নতুন প্রজন্ম পেতে পারে ভবিষ্যৎ গঠনের পথনির্দেশনা। শিশুদের কল্পপ্রবণ ও কৌতূহলী মনে থাকে অজানাকে জানার প্রবল আগ্রহ। কথা বলতে শেখার পর থেকে অসংখ্য প্রশ্নে তারা জর্জরিত করে মাতাপিতা এবং অভিভাবককে। শিশুদের সেসব প্রশ্নের ধারাও একালে সময়ের প্রবহমানতায় রূপান্তর হয়েছে। একুশ শতকের এই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যুগে শিশুরা আর পুতুলবউ খেলার যুগে নেই। শিশুকালেই তারা কম্পিউটার-প্রযুক্তিবিদ্যায় প্রাগ্রসর। এই সত্যটি উঠে এসেছে সুফিয়া কামালের ‘আজিকার শিশু’ কবিতায় :

আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা

তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।

আমরা যখন আকাশের তলে উড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি

তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।

উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু সব তোমাদের জানা

আমরা শুনেছি সেখানে রয়েছে জিন, পরী, দেও, দানা।

পূর্বপ্রজন্মের শিশুদের সঙ্গে নতুন যুগের শিশুদের এই পার্থক্য তুলে ধরে কবি শেষ দুই পঙ্ক্তিতে কামনা করেছেন :

তোমরা আনিবে ফুল ও ফসল পাখি-ডাকা রাঙা ভোর

জগৎ করিবে মধুময়, প্রাণে প্রাণে বাঁধি প্রীতিডোর।

চিরকালের শৈশবের কাছে এই প্রার্থনাই চিরন্তন হোক সকলের।

পাহাড়

বজ্রের সঙ্গে মেঘের বিয়েটা হয়ে গেল ঠিকই

কিন্তু পাহাড়কে সে কোনোদিনই ভুলতে পারল না।

                                 Ñসেই গল্পটা, পূর্ণেন্দু পত্রী

আমাদের বাংলাদেশ তেরো শত নদীর দেশ, খালবিল-ঝিলের দেশ, হাওর-বাওরের দেশ, ষড়ঋতুর দেশ―পাহাড়-পর্বতের দেশ নয়, লালমাটি কাঁকড়ের দেশ নয়। যা চোখের সামনে প্রতিনিয়ত থাকে তা-ই মনের বাগানে নিত্য ফুল ফোটায়, ফল ধরায়। পাহাড় আমার নিত্য-দর্শনের বস্তু নয়, তবু যেন জোনাকির হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে অন্তর্গত অনুপ্রেরণায় পাহাড় নিয়ে ভাবতে-বসা। গারো পাহাড়ের পাদদেশে জন্ম নিয়েও সেভাবে পাহাড়ের সঙ্গ পাইনি। চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে বিপরীত দিকে ছুটতে থাকা পাহাড়ই আমার অপভ্রংশ স্মৃতি। তবু আকুল ভাবনাবলয়ে মনে পড়ে, একমাত্র দক্ষিণবঙ্গের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি ছাড়া বাংলাদেশে আর তেমন কোথাও পাহাড় নেই। সিলেট ও মৌলভীবাজারে যা আছে তা ঠিক পাহাড় নয়, টিলামাত্র―বলা যায়, টিলাগড় ও টিলাপুঞ্জ।

আমরা সবাই জানি, টিলা হলো উঁচু নিচু ও বন্ধুর মাটির ঢিবি। পাহাড় এর চেয়ে বড়―গাছপালা ও বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ। আর পর্বত তার চেয়েও বড় ও বিস্তৃত। যদিও ‘ছোট’ ও ‘বড়’ শব্দ দুটি নিতান্তই আপেক্ষিক, তবু বলা যায়, টিলা বৃহৎ হলে পাহাড় বৃহত্তর আর পর্বত বৃহত্তম। বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন চর্যাপদেই আমরা শব্দদুটি পাই : ‘টালত ঘর মোর নাহি আবেশী’, এবং ‘উঞ্চা উঞ্চা পাবত তহি চড়ি সবর বালি’। এই পদদুটিতে ‘টালত’ মানে টিলায়, ‘পাবত’ মানে পর্বত। পাহাড় ও পর্বত যদিও ভিন্নার্থক শব্দ তবে একদা সম্ভবত সমার্থকই ছিল। সমার্থক শব্দে এর সাক্ষ্য মেলে। তাই অভিধানের আশ্রয় নিয়ে পাহাড়ের সমার্থক বা প্রতিশব্দগুলো দেখে নেওয়া যাক।

তার আগে শব্দটির ব্যাকরণগত ও আভিধানিক খোঁজখবর নেওয়া যেতে পারে। এটি বিশেষ্যপদ। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সংস্কৃত শব্দ ‘পাষাণ’ থেকে প্রাকৃত বাংলায় ‘পাহাণ’। হিন্দি ও মৈথিলী ভাষায় ‘পহাড়’ আর মারাঠি ও গুজরাটিতে ‘পহাড’। এর অর্থ পাষাণস্তূপ, ক্ষুদ্র পর্বত। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস এর অর্থ লিখেছেন : অনতি উচ্চ পর্বত, উচ্চ এবং বিস্তৃত মৃৎস্তূপ। পাহাড়ের অন্যান্য অপ্রচলিত অর্থ : পুকুরের উচ্চ তীর, পাড়, উচ্চ তীরভূমি, রাগিণীবিশেষ, সুদীর্ঘ, বিশাল ইত্যাদি। এবার পাহাড়ের সমার্থক শব্দগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিই। এগুলো প্রায় সবই তৎসম শব্দ এবং অধিকাংশই বর্তমান বাংলা ভাষায় অপ্রচলিত ও ব্যবহারহীন :

পর্বত, গিরি, শৈল, অদ্রি, অচল, ভূধর, নগ, অগ, ক্ষিতিধর, মেদিনীধর, পৃথিবীধর, পৃথ্বীধর, অবনীধর, পৃথিবীধারক, অবনীধ্র, ধরণীধর, ধরণীধ্র, ধরাধর, মহীধর, বসুধাধর, উর্বীধর, বসুভৃৎ, মহীধ্র, ভৃড়ৎ, ক্ষিতিভৃৎ, ক্ষ্মাধর, গোধর, গোধ্র, গোভৃৎ, শৃঙ্গবান, শিখরী, শৃঙ্গী, সানুমান, পৃথুশেখর, শৃঙ্গধর, ধরণীকীলক, ঢেঁকি। সংস্কৃত ও প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে এসব শব্দের প্রয়োগ থাকলেও বর্তমানে নৈবনৈব চ।

পাহাড়ের এই সমার্থক শব্দগুলো আধুনিক কালের কবি-লেখকদের রচনায় প্রয়োগবঞ্চিত হয়ে অভিধানের পাতায় ঠাঁই নিলেও এর মূল্য কম নয়! বাদশাহি আমলের মুদ্রার মতোই এর কদর। প্রাচীনকালের মুদ্রা বাজারে না-চললেও ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে জাদুঘরে তা যেমন মহামূল্যবান, তেমনই এই শব্দসম্ভার। এর বাজারমূল্য নেই কিন্তু ইতিহাস ঐতিহ্য ও সমাজতত্ত্বের বিচারে তা অমূল্য। বাংলা ভাষা যে শব্দসম্পদে পৃথিবীর অনেক ভাষার তুলনায় ধনবান এবং ঋদ্ধ―তারই সাক্ষ্য এই শব্দমালা। এজন্যই মধুকবি বলেছেন―‘মাতৃভাষা রূপ খনি পূর্ণ মণিজালে।’

দুই

এক অর্থে পাহাড় মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে আদিম মানুষের আবাস এবং আশ্রয়স্থল। শ্বাপদের ভয়ে মানুষ যখন বৃক্ষশাখা অনিরাপদ মনে করেছে তখন আশ্রয় নিয়েছে পাহাড়ের গুহায়। পাহাড়ের গুহাবাসী সেই আদিম মানবসমাজ পাহাড়ে অবস্থান করেই শিকারের সন্ধান ও খাদ্যাদির খোঁজ করেছে। ফলমূল আহরণ এবং আমিষ খাদ্যের প্রধান উৎসই তো পাহাড়ের বনজঙ্গল। আদিম মানুষের সৌন্দর্যবোধের প্রকাশ যে চিত্রকলায়, তা-ও প্রথম পাহাড়-পর্বতের গুহাচিত্রে খোদিত হয়েছিল। শুধু কি তা-ই ? পাহাড় প্রাচীনকালের মানুষকে দিয়েছে রোগব্যাধি নিরাময়ের উপকরণও। আমরা জানি, প্রকৃতির আদিপ্রাণসত্তা বৃক্ষরাজি, ফুলফলপাতা, বীজমূল ও লতাগুল্মের মধ্যে আছে রোগনিরাময়ের বহুবিধ গুণ। সেসবের উৎস পাহাড়ের বনবনানী। তা-ই লক্ষ করা যায়, প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণে। রাবণের অশোককাননে বন্দি সীতাকে উদ্ধারকালে যুদ্ধে লক্ষ্মণ মেঘনাদের শক্তিশেলের আঘাতে অচেতন হয়ে পড়েছিল। তার সুস্থতার জন্য প্রয়োজন হয় বিশল্যকরণী, অস্থিসঞ্চারিনী ও মৃতসঞ্জীবনীর। গন্ধমাদন পর্বত থেকে হনুমান সেই প্রাকৃতিক ওষুধ নিয়ে আসে। এখানেও পাহাড়ের মহিমা। তাছাড়া সনাতনধর্মীদের চতুর্বেদের মধ্যে যার নাম অথর্ববেদ, যেটি প্রাচীনতম চিকিৎসাশাস্ত্র, তার উপকরণও পাহাড় এবং প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত। আয়ুর্বেদ, ইউনানি, কবিরাজি ইত্যাদি নামে যে দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতি এ দেশে এখনও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়, তার উপাদানগুলোও পাহাড়ি গাছপালা এবং লতাগুল্ম থেকে প্রাপ্ত। এসব বিবেচনায় পাহাড়কে মানবসমাজের জীবনধারণের অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

জলজলা ও নদীনালায় আকীর্ণ আমাদের দেশ। এ দেশ সমতলের সাম্রাজ্য―বন্ধুরতার আবহ এখানে বেশি নেই। তাই বাংলাদেশের প্রকৃতিতে পাহাড় যৎসামান্যই। এ কথা কুমিল্লার ময়নামতি, টাঙ্গাইলের মধুপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের কথা মনে রেখেই বলা যায়। তাই এ দেশের কবিতা ও গদ্যে পাহাড় ও পাহাড়ি জনপদের কথা বেশি নেই। মনে পড়ছে, চাঁদের পাহাড় নামে বিভূতিভূষণের একটি মনকাড়া উপন্যাস আছে। চট্টগ্রামবাসী একালের কবি, বন্ধু হাফিজ রশিদ খানের কথাও এ মুহূর্তে মনে পড়ছে। তাঁর কবিতায়, যা পড়েছি বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে, পাহাড়ের চিরহরিৎ স্নিগ্ধতা, অটল গাম্ভীর্য ও বনানী-আচ্ছাদিত রূপময়তার রহস্য ভিন্নধর্মী চিত্রকল্পে বিধৃত হয়েছে। পাহাড়ের লালচে মাটির এঁটেল মায়াময়তায় আমি নিজেও আজন্মকাল থেকে গোপন বিরহীর মতো মগ্ন ও আচ্ছন্ন হয়ে আছি। এই গোপন আচ্ছন্নতা আমার জন্মের দক্ষিণা। ময়মনসিংহের সীমান্তঘেরা পাহাড়ি দক্ষিণাঞ্চল হালুয়াঘাটে গত শতকের পঞ্চাশ দশকের শেষে জন্মেছিলাম আমি। সেই পাহাড়ঘেরা অঞ্চল ব্রিটিশ আমলে ‘হাতিখেদা’র জন্য বিখ্যাত ছিল। পরে জমিদারি শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কমরেড মণি সিংয়ের নেতৃত্বে তেভাগা ও টঙ্ক আন্দোলনও সংঘটিত হয়েছিল এই পাহাড়াকীর্ণ নালিতাবাড়ি, হালুয়াঘাট, শ্রীবর্দী অঞ্চলে। রাসমণি হাজং নাম্নী এক বিপ্লবী পাহাড়ি নারী সেই আন্দোলনের প্রথম শহিদ, যার উত্তরাধিকারী একালের কল্পনা চাকমা।

তিন

‘নেই নেই’ বলেও বাংলা কবিতায় একেবারে কম নেই পাহাড়ের বর্ণনা, বন্দনা, ভাষ্য ও সংকীর্তন। সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্য কর্ষণেই মিলবে পাহাড়-সম্পর্কিত অগণন বিবরণ ও কাব্যমনিকা। তাঁর অণু কবিতার সংকলন কণিকা কাব্যের পাতা প্রদক্ষিণ করলেও পাহাড় নিয়ে পাওয়া যাবে চিৎপ্রকর্ষিত পঙ্ক্তিমালার প্রাচুর্য। তেমন কয়েকটি উজ্জ্বল উদ্ধার :

* পর্বতমালা আকাশের পানে চাহিয়া না কহে কথা,

অগমের লাগি ওরা ধরণীর স্তম্ভিত ব্যাকুলতা।

* কুয়াশা যদি বা ফেলে পরাভবে ঘিরি,

তবু নিজ মহিমায় অবিচল গিরি।

* মেঘ সে বাষ্পগিরি, গিরি সে বাষ্পমেঘ,

কালের স্বপ্নে যুগে যুগে ফিরি ফিরি

এ কিসের ভাবাবেগ।

* দাঁড়ায়ে গিরি শির মেঘে তুলে,

দেখে না সরসীর বিনতি

অচল উদাসীর পদমূলে ব্যাকুল রূপসীর মিনতি।

* হে সমুদ্র, চিরকাল কী তোমার ভাষাÑ

সমুদ্র কহিল, মোর অনন্ত জিজ্ঞাসা।

কিসের স্তব্ধতা তব ওগো গিরিবর ?

হিমাদ্রি কহিল, মোর চির-নিরুত্তর।

‘কণিকা’ কাব্য থেকে ঋণকৃত এই পঙ্ক্তিমালায় প্রকৃতির পাহাড়-পর্বত নিয়ে রবীন্দ্রদর্শনের সুগভীর তত্ত্ব ও প্রকৃতি অবলোকনের নতুন মাত্রা পরিলক্ষিত হয়। ‘ফিলসোফি’ অর্থে তাত্ত্বিক দর্শনের কথা বাদ দিয়ে পল্লিপ্রকৃতির সঙ্গে পাহাড়ের ঘনিষ্ঠতা-সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের একটি শিরোনামহীন কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করি :

আমাদের এই পল্লিখানি পাহাড় দিয়ে ঘেরা,

দেবদারুর কুঞ্জে ধেনু চরায় রাখালেরা!

কোথা থেকে চৈত্রমাসে হাঁসের শ্রেণী উড়ে আসে,

অঘ্রানেতে আকাশপথে যায় যে তারা কোথা,

আমরা কিছুই জানিনে কো সেই সুদূরের কথা।

আমরা জানি গ্রাম ক’খানি, চিনি দশটি গিরিÑ

মা ধরণী রাখেন মোদের কোলের মধ্যে ঘিরি।

আধুনিক ও সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা ক্রমেই প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই অর্থে পাহাড়ও কবির মনোভূমি থেকে অনেকটা বিলীয়মান। কবির মনোজগৎ এখন প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন হয়ে চিত্তবৃত্তির বদলে বুদ্ধিবৃত্তি ও বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় ‘আত্মরতির সম্মোহনে’ নিমগ্ন। কাব্যবীজের অন্বেষণে তাঁরা এখন দেশজ ও লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্যিক উপাদানের বদলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চষে বেড়ান। তাই হয়তো সাম্প্রতিক কবিতা হয়ে উঠছে প্রকৃতি ও ঐতিহ্য-বিচ্ছিন্ন এবং নিষ্প্রাণ। তাছাড়া পাহাড় ও প্রকৃতি-বিধ্বংসী অপকর্মেও কিছু লোভী মানুষ জড়িত। তাই তো বাংলা ভাষায় ‘পাহাড়খেকো’ শব্দটির জন্ম! প্রকৃতি ও পাহাড়ের ওপর এমন অন্যায়-অনাচারের যুগেও আমরা লক্ষ করি, আণুবীক্ষণিক হলেও কেউ কেউ একালেও লিখেছেন ‘সহৃদয় হৃদয় সংবেদী’ কবিতা। তেমনি তিনজন কবির উজ্জ্বল কবিতার উদ্ধৃতি :

* অনেকদিন পাহাড় না দেখলে চোখ খরখর করে

অনবরত সমতল সব কল্পনাকে বিকল করে দেয়

বাংলা একাডেমিতে মিটিং-এয়েও

আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে ঢেউ খেলানো টিলা

চরাই-উৎরাই, চরাই-উৎরাই, এই তো জীবনের ছন্দ…।

     (পাহাড় ডাকে, সমুদ্র ডাকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)।

* অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার সখ।

কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না।

যদি তার দেখা পেতাম,

দামের জন্য আটকাতো না।

আমার নিজস্ব একটা নদী আছে,

সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে।

কে জানে, পাহাড়ের চেয়ে নদীর দামই বেশি।

পাহাড় স্থাণু, নদী বহমান।

তবু আমি নদীর বদলে পাহাড়টাই কিনতাম।

কারণ আমি ঠকতে চাই।

     (পাহাড় চূড়ায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)।

* পাহাড় যে ওখানে উঠেছে, তার নিচে প্রাণ ছিল।

জলরাশি বইতো ওখানে

তার মধ্যে আমি বইতাম শান্ত মাছ।

পাহাড়ের নীচের পাথরে আজো আছে

আমার পল্লবহীন চোখের একদৃষ্টে চেয়ে থাকা…

খোঁড়ো

দেখে নাও।

(প্রাণ, জয় গোস্বামী)।

* পাহাড়টা, আগেই বলেছি

ভালোবেসেছিল মেঘকে

আর মেঘ কীভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে

বানিয়ে তুলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকরা…

সেদিন ছিল পাহাড়টার জন্মদিন।

পাহাড় মেঘকে বললে

আজ তুমি লাল শাড়ি পরে আসবে।

মেঘ পাহাড়কে বললে

আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেবো চন্দন জলে।

(সেই গল্পটা, পূর্ণেন্দু পত্রী)।

এতসব কবিতা-কলামৃত ও কাব্যমঞ্জরীর মধু আস্বাদনের পরেও আমরা কিন্তু ভুলতে পারি না নজরুলের সেই গীতসুধার অমৃত-আস্বাদ : ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।/ ওই পাহাড়ের ঝরনা আমি দূরে নাহি রই।’ পাহাড়ের সঙ্গে ঝরনার মিতালি, ঝরনার সঙ্গে জলের মিত্রতা। আর জলই তো জীবনের উৎস―তাতেই প্রাণের প্রকাশ।

[চলবে]

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button