দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপার : মূল : শার্লট পারকিন্স গিলম্যান

অনূদিত নভেলা
ভাষান্তর : ফারহানা আজিম শিউলী
[শার্লট পারকিন্স গিলম্যান (১৮৬০ ― ১৯৩৫) আমেরিকান লেখক।তাঁর জীবন ও লেখালেখি পরবর্তী প্রজন্মের নারীবাদী চিন্তাধারায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে।]
জন আর আমার মতো নিতান্ত সাধারণ মানুষের গ্রীষ্মাবকাশের জন্য পুরোনো আমলের বিশাল দালান জোটাবার সৌভাগ্য কালেভদ্রে ঘটে।
একটা ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ি, একটা খানদানি বাগানবাড়ি, বলতে পারো একখানা ভুতুড়ে বাড়ি, আর পৌঁছে যাও রোমাঞ্চকর উল্লাসের তুঙ্গে। কিন্তু ভাগ্যের কাছে এতটা চাওয়া বাড়াবাড়িই বটে!
তবু আমি জোর গলায় বলব, এই বাড়িটায় কিছু একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে।
তা না হলে, এত সস্তায় পাওয়া গেল কেন? আর এত দিন ধরে খালিই বা পড়ে ছিল কেন ?
জন স্বভাবতই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে। অবশ্য দাম্পত্যে তো এমনটাই চলে!
জন চরম বাস্তববাদী। বিশ্বাস-টিশ্বাসের ব্যাপারে ওর কোনওরকম ছাড় নেই, আছে কুসংস্কারে তীব্র বিরাগ। আর যা বোঝা যায় না, দেখা যায় না, সংখ্যায় মাপা যায় না―ওসব নিয়ে খোলাখুলিই ব্যঙ্গ করে।
জন ডাক্তার, আর হয়তো―(আমি নিশ্চয়ই কোনও জীবিত প্রাণিকে এটা বলব না, কিন্তু এই মৃত কাগজে লিখে ফেলাটা মনে দারুণ স্বস্তি দেয়)―হয়তো ওটাই আমার দ্রুত সেরে না-উঠার একটা কারণ।
দেখো তো, ও বিশ্বাসই করে না যে আমি অসুস্থ!
আর আমিই বা করবটা কী ?
যদি কোনও নামি ডাক্তার, তাও আবার নিজের বর, বন্ধু-আত্মীয়দের আশ্বস্ত করে বলে যে―সাময়িক মানসিক অবসাদ, হালকা হিস্টিরিয়া ভাব ছাড়া আসলে আর কোনও সমস্যা নেই―তাহলে করার থাকে কী ?
আমার ভাইও ডাক্তার, নামকরা এবং ঠিক একই কথা বলে।
তাই আমাকে খাওয়ানো হয় ফসফেট বা ফসফাইট (নাম যেটাই হোক)। আর টনিক, আর হাওয়াবদল, আর খোলা বাতাস, আর ব্যায়াম। আর ‘কাজ করা’ একদম বারণ, একদম সেরে উঠা পর্যন্ত।
আমি নিজে ওদের সঙ্গে একমত না।
আমি মনে করি, মনমতো কোনও রোমাঞ্চকর-বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজ বরং ভালোই হতো আমার জন্য।
কিন্তু এখন উপায় কী ?
ওদের কথা না-শুনেই অল্প কিছুদিন লেখালেখি করেছি। কিন্তু হয় লুকিয়ে-চুরিয়ে লেখো, নয়তো প্রচণ্ড বাধার মুখে পড়ো―এই ব্যাপারটা আসলেই আমাকে অবসন্ন করে ফেলে।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমার এই পরিস্থিতিতে যদি বাধা একটু কম পেতাম, পেতাম মানুষের সঙ্গ, পেতাম উৎসাহ-উদ্দীপনা! কিন্তু জন বলে, এই পরিস্থিতির কথা ভাবাটাই নাকি আমার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। আর সত্যি বলতে, এ নিয়ে ভাবলেই মনটা ভারী হয়ে যায়।
তাই ওসব ছেড়ে বরং বাড়িটার কথাই বলি।
জায়গাটা অপূর্ব! একদম নির্জন, রাস্তা থেকে অনেকটা ভেতরে, গ্রাম থেকে অন্তত মাইল তিনেক দূরে। বাড়িটা চোখের সামনে এনে দেয় বইয়ে পড়া সাহেবি-বাংলোর ছবি। এখানে আছে ছাঁটা-ঝোপের বেড়া, পাঁচিল, খিল আঁটা ফটক। আছে মালিদের আর লোকজনের জন্য আলাদা আলাদা অনেকগুলো ছোট ঘর।
দুর্দান্ত একটা বাগান আছে এখানে! এমন বাগান আমি জীবনেও দেখিনি! বিশাল, ছায়াময়, চারদিকে ছাঁটা ঝোপ-ঘেরা পথের জাল, নিচে বসার আসনসহ সার সার দীর্ঘ দ্রাক্ষালতাকুঞ্জ।
চারাঘরও ছিল একসময়, কিন্তু এখন সবই ভাঙাচোরা।
যদ্দুর জেনেছি, কিছু আইনি ঝামেলা ছিল, ওয়ারিশদের নিয়ে। জায়গাটা এমনিতে বছরের পর বছর খালিই পড়ে আছে।
ভুতুড়ে আবহটা এতে মাটি হলো বটে, কিন্তু আমার কিচ্ছু যায় আসে না। বাড়িটায় অদ্ভুত কিছু একটা আছে―আমি টের পাই।
এক জ্যোৎস্নাভরা সন্ধ্যায় বললামও কথাটা জনকে। কিন্তু ও বলল, আমি যা টের পাই, ওটা বাতাসের ঝাপটা। আর জানালাটা দিল বন্ধ করে।
মাঝেমধ্যে জনের ওপর অকারণ রাগ হয়। আমি নিশ্চিত, আগে আমি এতটা আবেগপ্রবণ ছিলাম না। মনে হয়, স্নায়বিক দুর্বলতার জন্যই এই হাল।
কিন্তু জন বলে, যদি তা-ই ভেবে বসে থাকি, তাহলে নিজেকে সামলাতে গাফিলতি করব। তাই প্রাণপণে নিজেকে সামলে রাখি―অন্তত ওর সামনে। আর ওটাই আমাকে অবসন্ন করে তোলে।
নিজেদের ঘরটা মোটেও পছন্দ হয়নি আমার। চেয়েছিলাম নিচতলার ওই ঘরটা―সামনে খোলা বারান্দা, জানালাজুড়ে লতানো গোলাপ আর ভেতরে চমৎকার সাবেকী ফুলেল নকশার ঝুল-সাজ! কিন্তু জন পাত্তাই দিল না!
ও বলল, নিচের ঘরটায় জানালা মোটে একটা, দুটো খাট রাখার মতো জায়গা নেই, আর ওর থাকার মতো লাগোয়া কোনও ঘরও নেই।
জন খুবই সাবধানী আর যত্নবান। ওর বিশেষ অনুমতি ছাড়া নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারি না।
দিনের প্রতি ঘণ্টার জন্য আমার একটা করে নির্দিষ্ট চিকিৎসা-সূচি বাঁধা। ও-ই পুরোপুরি দেখাশোনা করে আমার। তাই এর যথেষ্ট কদর না-করার জন্য নিজেকেই ঘোর অকৃতজ্ঞ মনে হয়।
জন বলল, এখানে আসা হয়েছে শুধুই আমার জন্য―যাতে আমি পুরোপুরি বিশ্রাম পাই, আর পাই যতটা সম্ভব খোলা হাওয়া। ‘শক্তি অনুযায়ী ব্যায়াম,’ বলল ও, ‘আর খিদে অনুযায়ী খাবার, কিন্তু হাওয়া নিতে পারো সারাক্ষণই।’ তাই শেষ পর্যন্ত আমরা বাড়ির একদম উপরতলার বাচ্চাদের ঘরটাই নিলাম।
ঘরটা বিশাল, খোলামেলা―প্রায় পুরোটা তলা জুড়ে। চারদিকে জানালা, আলো-হাওয়া ভরপুর। আমার ধারণা, একসময় এটা ছিল বাচ্চাদের শোবার ঘর, পরে খেলার ঘর আর ব্যায়ামাগার। কারণ ছোট বাচ্চাদের জন্য জানালায় লোহার গরাদ লাগানো, আর দেয়ালে ঝোলানো আংটাসহ নানা সরঞ্জাম।
দেয়ালের রং আর ওয়ালপেপারের দশা দেখলে মনে হয় যেন এটা ছেলেদের কোনও স্কুলঘর ছিল। বিছানার মাথার চারদিকে বড় বড় চৌকো চৌকো জায়গায় ওয়ালপেপারটা উঠে গেছে, মোটামুটি আমার হাতের নাগাল পর্যন্ত। ঘরের অন্য পাশেও, নিচের দিকে, বিশাল এক জায়গাজুড়ে ছেঁড়া। জীবনে এত জঘন্য ওয়ালপেপার দেখিনি।
নকশাটা―শিল্পরীতির সমস্ত নিয়মকানুন লঙ্ঘন করা, অসংলগ্নভাবে বিন্যস্ত, বাহুল্য কারুকাজময়।
দেখতে গেলে দৃষ্টি গুলিয়ে দেবার মতো যথেষ্ট অস্পষ্ট। আবার ক্রমাগত বিরক্তি জাগানো আর খুঁটিয়ে দেখতে প্ররোচিত করার মতো যথেষ্ট সুস্পষ্ট। ওর ঝাপসা, আঁকাবাঁকা, টালমাটাল রেখাগুলো দেখতে দেখতে কিছু দূর গেলেই ওরা আচমকা হয়ে উঠে আত্মঘাতী―বেমক্কা কোণে ছিটকে পড়ে, অবিশ্বাস্য স্ববিরোধে নিজেদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলে।
রংটা গা-গুলানো, একদম অসহ্য। ধীরে ধীরে ঘুরে আসা সূর্যের আলোয় অদ্ভুতভাবে বিবর্ণ, ধোঁয়াটে-ময়লাটে এক হলুদ। কোথাও কোথাও নিষ্প্রভ অথচ উৎকট কমলার মতো দেখায়, কোথাও আবার পাণ্ডুর গন্ধকের আভা।
বাচ্চারা যে ওয়ালপেপারটা ঘৃণা করত, এতে আর আশ্চর্যের কী! এই ঘরে অনেক দিন থাকতে হলে আমিও নিশ্চয় তা-ই করতাম!
ঐ যে জন আসছে। খাতাটা সরিয়ে ফেলতে হবে। ও একদমই চায় না আমি একটা শব্দও লিখি।
****
আমরা এখানে এসেছি দুই সপ্তাহ হলো। এর মধ্যে লেখার ইচ্ছে আর হয়নি―সেই প্রথম দিনের পর একবারও না। এখন আমি বসে আছি জানালার পাশে, বাচ্চাদের এই বিশ্রী ঘরটায়। যত ইচ্ছে খুশি লিখতে বাধা দেবার মতো কেউ নেই, শুধু শরীরটাই দুর্বল।
জন দিনভর বাইরে থাকে। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে রাতও।
ভালোই হয়েছে, আমার অবস্থা গুরুতর না! কিন্তু এইসব স্নায়বিক গোলযোগ ভয়াবহরকম বিমর্ষ করে তোলে।
জন বোঝে না আমি সত্যি সত্যি কতটা ভুগছি। ও বোঝে―ভোগান্তির কোনও ‘কারণ’ই নেই, আর তাতেই ও তুষ্ট।
অবশ্যই এটা শুধুই স্নায়ুচাপ। কোনওভাবেই দায়িত্ব পালন করতে না-পারাটা আমাকে সত্যিই খুব মানসিক চাপে রাখে।
আমার তো জনের অনেক বড় সহায় হবার কথা! হবার কথা ওর প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি! আর নিজেই কি না বোঝা হয়ে উঠলাম!
বিশ্বাস করবে না কেউ, যতটুকুই করে উঠতে পারি―নিজেকে গোছগাছ রাখা, একটু মেহমানদারি, বাসার টুকটাক তদারকি―এটুকু করতেই কতখানি কষ্ট হয় আমার!
ভাগ্য ভালো, মেরি খুব যত্নে বাচ্চাটা সামলায়। কী যে লক্ষ্মী বাচ্চা একটা!
তবু কিছুতেই ওর সঙ্গে থাকতে পারছি না, অসম্ভব স্নায়ুচাপে ভুগি।
আমার ধারণা, জন জীবনে কখনও স্নায়ুচাপে ভোগেনি। এই ওয়ালপেপারের ব্যাপারটায় আমাকে নিয়ে ও এত ঠাট্টা করে!
শুরুতে ঘরটায় ওয়ালপেপার বদলানোর কথাই ভেবেছিল ও। কিন্তু পরে বলে বসল, আমি নাকি ব্যাপারটা চেপে বসতে দিচ্ছি, আর স্নায়ুচাপের রোগীর জন্য এমন খেয়াল চেপে বসতে দেবার চেয়ে খারাপ আর কিছু নেই।
বলল, ওয়ালপেপার বদলালে শুরু হবে ভারী খাটটা নিয়ে, তারপর জানালার গরাদ, তারপর সিঁড়ির মাথার ওই দরজা―এভাবে একটার পর একটা।
‘দেখছোই তো, এই জায়গায় আসাটা তোমার জন্য বেশ ভালোই হয়েছে,’ বলল জন, ‘আর সত্যিই, সোনা, স্রেফ তিন মাসের জন্য বাড়িটা নতুন করে সাজাতে মোটেও ইচ্ছে নেই আমার।’
‘তাহলে নিচতলায় চলো না’ বললাম আমি, ‘ওখানকার ঘরগুলো কত্ত সুন্দর!’
ও আমাকে বুকে টেনে নিল, ডাকল পাগলি বলে, বলল আমি চাইলে ও নিচের ভাঁড়ারে পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, সেই সঙ্গে চুনকামও করিয়ে দিতে পারে।
তবে খাট, জানালা আর অন্য জিনিস নিয়ে জনের কথাই মোটামুটি ঠিক।
ঘরটা আসলে দরকার মতো খোলামেলা-আরামের। আর স্রেফ একটা খেয়ালের বশে ওকে অস্বস্তিতে ফেলব এতটা গাধা আমি নিশ্চয়ই না।
আসলে, বিশাল ঘরটা আস্তে আস্তে আমার বেশ ভালোই লাগছে―শুধু ওই বিকট ওয়ালপেপারটা ছাড়া।
এক জানালা দিয়ে দেখতে পাই বাগানটা―ওই রহস্যময়-কৃষ্ণাভ দ্রাক্ষালতাকুঞ্জের সারি, অগুনতি ফুটে থাকা উজ্জ্বল বুনো ফুলের সমারোহ, ঘন গুল্মরাজি, আর গ্রন্থিল বৃক্ষদলের বিস্তার।
আরেকটা দিয়ে চোখে পড়ে উপসাগরের চমৎকার দৃশ্য, আর এই জমিদারিরই একটা ছোট্ট নিজস্ব ঘাট। বাড়ি থেকে ওদিকটায় গিয়ে পড়েছে ছায়াময়-শোভাময় এক ছিপছিপে পথ। ওইসব অগুনতি পথ আর লতাকুঞ্জে মানুষের পদচারণ―এমন দৃশ্য প্রায়ই আমার চোখে ভাসে। কিন্তু জন আমাকে কড়া করে সাবধান করেছে, একটুও যেন কল্পনায় গা না-ভাসাই। বলে, আমার কল্পনাবিলাস আর গল্প বানানোর অভ্যাস মিলিয়ে এই স্নায়ুচাপ সহজেই নানা উদ্ভট খেয়ালের জন্ম দেবে। বলে, আমার মনের জোর আর বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে এর রাশ টানা দরকার। তা-ই চেষ্টা করি আমি।
কখনও কখনও মনে হয়, যদি লেখার মতো সুস্থ থাকতাম, অন্তত একটু, তাহলে মাথায় জমে থাকা ভাবনাগুলোর চাপ কিছুটা হালকা হতো, আরাম হতো আমার।
কিন্তু লিখতে বসলেই দেখি অবসন্ন লাগে।
নিজের কাজ নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলা, পরামর্শ নিতে না-পারাটা আমাকে ভীষণ নিরাশ করে দেয়। আমি পুরোদস্তুর সেরে উঠলে তবেই, জন বলে, হেনরি আর জুলিয়াকে বেশ কিছুদিনের জন্য আমরা বেড়াতে আসতে বলব। এই মুুহূর্তে ওদের মতো চঞ্চল মানুষজনের উপস্থিতি নাকি বালিশের খাপে পটকা রেখে ঘুমানোর মতোই বিপজ্জনক!
ইশ, যদি তাড়াতাড়ি সেরে উঠতাম! কিন্তু ওসব ভাবা চলবে না।
ওয়ালপেপারটা দেখলে মনে হয় যেন ভালোভাবেই জানে নিজের মারাত্মক প্রভাবের কথা।
নকশার একটা জায়গা বারবার ঘুরে ঘুরে আসে। ওখানে নকশাটা মটকানো ঘাড়ের মতো ঝুলে আছে আর বিস্ফারিত উলটানো চোখ দুটো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
ওর আস্পর্ধা আর বেহায়াপনা দেখে সত্যিই খুব রাগ হয়। ওরা উপরে-নিচে, ডাইনে-বাঁয়ে হামাগুড়ি দেয়। আর ঐ উদ্ভট-অপলক চোখগুলো সবখানে। এক জায়গায় ওয়ালপেপারের পাশাপাশি লাগানো দুটো ফালি ঠিকমতো মেলেনি। ওই রেখা বরাবর চোখ ওপর-নিচ করতে থাকে। কারণ একটা অন্যটার চেয়ে খানিকটা উঁচুতে।
জড় জিনিসেরও কতটা প্রকাশক্ষমতা থাকে, তা তো আমরা সবাই জানি। তবু এই নকশার মতো এতটা স্পষ্ট প্রকাশ আমি আগে দেখিনি। ছোটবেলায় অনেক রাত কেটেছে জেগে-শুয়ে। তখন ফাঁকা দেয়াল আর সাদামাটা আসবাব দেখেই যতটা মজা আর ভয় পেতাম, বেশিরভাগ বাচ্চা খেলনার দোকানেও ততটা পায় না।
মনে আছে, আমাদের বড় পুরানো আলমারির হাতলগুলো কেমন নরম করে চোখ পিটপিটিয়ে তাকাত। আর ছিল এক চেয়ার, ভীষণ কাছের বন্ধু বলে মনে হতো ওকে সবসময়।
ঘরের অন্য কিছু খুব ভয়ঙ্কর ঠেকলে, তক্ষুনি চেয়ারটায় লাফ দিয়ে উঠে বসলেই নিরাপদ মনে হতো।
এই ঘরের আসবাবগুলো খারাপ না, বড়জোর একটু বেমানান। কারণ সবই নিচতলা থেকে তুলে আনা। আমার ধারণা, খেলার ঘর বানানোর সময় বাচ্চাদের আসবাবগুলো সরাতে হয়েছিল, আর ওটাই তো স্বাভাবিক!
বাচ্চারা এখানে যেরকম তাণ্ডব চালিয়েছে, এমনটা আমি জীবনে দেখিনি।
ওয়ালপেপারটা, আগেই বলেছি, জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে উঠানো। বাকিটুকু কিন্তু এমনভাবে সাঁটানো যেন ভাইয়ের চেয়েও আপন। বাচ্চাদের ঘৃণার সঙ্গে জেদও ছিল বলতেই হয়!
মেঝেটা জায়গায় জায়গায় আঁচড়ানো, খোঁচানো, কাঁটার মতো চেরা। এখানে ওখানে পলেস্তারা পর্যন্ত খসানো। আর ঘরে পাওয়া একমাত্র এই বিশাল ভারী খাটের হাল দেখে মনে হয় যেন যুদ্ধের ময়দান পেরিয়ে আসা।
তবু এসবে আমি একদমই পরোয়া করি না―শুধু ওই ওয়ালপেপারটা ছাড়া।
ওই তো, জনের বোন আসছে। কী যে ভালো মেয়ে, আর কী যে নজর আমার দিকে! ওকে কিছুতেই দেখানো যাবে না যে আমি লিখছি।
সুনিপুণভাবে-সোৎসাহে ঘরকন্না সামলায় ও। এই কাজই ওর কাছে সেরা। সত্যিই মনে হয় আমার, ও ভাবে এই লেখালেখিই আমাকে অসুস্থ বানিয়েছে।
তবে ও বাইরে থাকলে লেখা যায়, আর জানালাগুলো দিয়ে অনেক দূর থেকেই ওকে আসতেও দেখা যায়।
একটা জানালা নজরে রাখছে পুরো পথটা। ছায়াময়, আঁকাবাঁকা, অপূর্ব একটা পথ। আরেকটা জানালা শুধুই পাখির চোখে দেখছে পল্লিপ্রান্তর। বিশাল বিশাল এল্ম আর মখমলি তৃণভূমিতে ছাওয়া ওই প্রান্তরও অপূর্ব!
এই ওয়ালপেপারটার মূল নকশার আড়ালে আছে একরকম ছায়া-নকশা, ভিন্ন আভায়। খুবই রাগ ধরায় ওটা। কারণ ওকে দেখা যায় শুধু বিশেষ কিছু আলোয়, তাও আবার ঝাপসা।
তবে যেখানে রং চটেনি, আর রোদটা ঠিকঠাক পড়ে, সেখানে দেখতে পাই আজব, বিরক্তিকর, নিরাকার একরকম অবয়ব। ওই হাস্যকর-দৃষ্টিকটু সামনের নকশার আড়ালে চুপিসারে ঘুরে বেড়ায় বলে মনে হয়।
ওই যে, সিঁড়িতে বোনটা!
তো জুলাইয়ের চার কেটে গেল! সবাই ফিরে গেছে, আর আমি ক্লান্ত-অবসন্ন। জন ভেবেছিল, একটুখানি স্বজন-সঙ্গে হয়তো আমার উপকার হবে। তাই শুধু মা, নেলি আর বাচ্চারা বেড়িয়ে গেল সপ্তাহখানেক ।
সত্যি বলতে, আমি একদমই কিছু করিনি। এখন সবকিছুই সামলায় জেনি।
তবু বরাবরের মতোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
জন বলছে, যদি তাড়াতাড়ি সেরে না-উঠি, তাহলে শরতে উইয়ার মিচেলের কাছে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু ওখানে মোটেও যেতে চাই না। একবার আমার এক বন্ধু ওই ডাক্তারের চিকিৎসাধীন ছিল। বন্ধু বলে, উনি একদম জন আর আমার ভাইয়ের মতোই, বরং আরও এক কাঠি বাড়া!
তাছাড়া, অত দূর যাওয়াটা বিশাল ঝক্কির।
কিছুই করতে হাত উঠে না। দিনকে দিন খুবই খিটখিটে আর খুঁতখুঁতে হয়ে উঠছি।
অকারণে কাঁদি, প্রায় সারাক্ষণই।
জন বা অন্য কেউ আশপাশে থাকলে না নির্ঘাত, কাঁদি একা থাকলে। ইদানীং বেশ অনেকটাই একা থাকা হয়। গুরুতর রোগী সামলাতে জনকে প্রায়ই শহরে থাকতে হয়। আর জেনি খুব ভালো। চাইলে আমাকে আমার মতো থাকতে দেয়।
তো একটু হাঁটতে যাই বাগানে, কখনও ওই সুন্দর ছায়াময় ছিপছিপে পথটায়। কখনও বসে থাকি গোলাপলতা-ছাওয়া দেউড়িতে, আর অনেকটা সময় কাটে শুয়ে―এই ঘরেই।
ঘরটার প্রতি সত্যিই মায়া জন্মাচ্ছে আমার, ওই ওয়ালপেপার থাকার পরও। হয়তোবা ওই ওয়ালপেপারের জন্যই!
ও আমার মাথায় যে কীভাবে গেড়ে বসেছে!
আমি শুয়ে থাকি এই বিশাল, নিশ্চল খাটে (আমার ধারণা, খাটটা মেঝেতে পেরেক মারা) আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে থাকি নকশাটার পেছনে। একরকম ব্যায়ামই হয়, দিব্বি বলছি। শুরু করি, ধরো, নিচ থেকে, ওই নিচের কোনাটা থেকে, যেখানটা এখনও অক্ষত। আর অগুনতিবার স্থির করি, এই দিশাহীন নকশার একটা দিশা পাওয়া পর্যন্ত লেগে থাকবই।
নকশার কিছু সূত্র আমি অল্পস্বল্প জানি। আর এও জানি, এই জিনিসটার বিন্যাসে মানা হয়নি কোনওরকম সূত্র―না বিকিরণের, না রূপান্তরের, না পুনরাবৃত্তির, না প্রতিসাম্যের, না এযাবৎকালে শোনা কোনওটা।
পাশাপাশি লাগানো ফালিগুলোয় একই নকশার পুনরাবৃত্তি আছে আলবৎ, কিন্তু ঐটুকুই।
একভাবে দেখলে প্রতিটা ফালির নকশা আলাদা। ফোলা ফোলা আঁকাবাঁকা রেখা আর বাহুল্য কারুকাজগুলো (একরকম বিকারগ্রস্ত-বিকৃত রোমান শৈলী-মতো) নির্বোধ-বিচ্ছিন্ন স্তম্ভ বেয়ে টলোমলো করে উঠছে-নামছে।
আবার কিন্তু ওদের আড়াআড়ি সংযোগ আছে। আর এলোমেলো ওই নকশাচিত্র দৃশ্যমান বিভীষিকার বিশাল ঢেউখেলানো তরঙ্গে ছুটে চলছে, যেন জলে লুটোপুটি করা সমুদ্র শৈবালদল ধেয়ে আসছে।
পুরো জিনিসটা সমান্তরালভাবেও চলমান, অন্তত মনে হয় তাই। আর ওই চলন ধরতে গিয়ে আমি হয়ে পড়ি ক্লান্ত-অবসন্ন।
সাজ-বন্ধনী হিসেবে লাগানো হয়েছে একটা সমান্তরাল ফালি। আর ওটা আরও দারুণভাবে জট পাকিয়ে তুলেছে।
ঘরের এক প্রান্তে নকশাটা এখনও প্রায় অক্ষত। যখন আড়াআড়ি আলো মিলিয়ে যায় আর অস্তগামী সূর্যের আলো সরাসরি পড়ে ওখানটায়, তখন আমি অবশেষে এক ধরনের রশ্মি-বিকিরণ কল্পনা করতে পারি। মনে হয়, অন্তহীন বীভৎস অবয়বগুলো যেন একটা যৌথ আবর্তনবিন্দু ঘিরে রূপ নিচ্ছে, আবার একইরকম উন্মত্ততায় মাথা গুঁজে ছিটকে পড়ছে।
নকশার পেছনে লেগে থাকতে থাকতে ক্লান্ত লাগে। মনে হয় একটু ঘুমাই।
****
জানি না কেন এসব লিখছি।
লিখতে ইচ্ছে করে না।
পারছি না।
আর জানি, জন ব্যাপারটাকে আজগুবি বলবে। তবু যা ভাবি, যা মনে আসে, তা জানাতেই হয়। অনেকটা আরাম পাই তাতে!
কিন্তু আরাম ছাপিয়ে যাচ্ছে আয়াস।
এখন দিনের অর্ধেকটাই যায় নিদারুণ আলসেমিতে। শুয়ে কাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
জন বলে, গায়ের জোর কিছুতেই হারানো চলবে না। আর আমাকে গিলতে হয় কড লিভার তেল, নানা পদের টনিক-ফনিক। বিয়ার, ওয়াইন, আর আধসেদ্ধ মাংসের কথা নাইবা বললাম।
জন সোনা! আমাকে আদরে রাখে খুবই, আর আমার অসুস্থতা খুবই অপছন্দ ওর। সেদিন মন খুলে, যুক্তি দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম ওর সঙ্গে। বললাম, আমি খুব চাই, ও যেন আমাকে জুলিয়া-হেনরিদের ওখানে যেতে দেয়।
কিন্তু জন বলল, আমি যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই, আর গেলেও শরীর নিয়ে টিকতে পারব না।
আমিও নিজের দিকে জোরালো কিছুই বলতে পারলাম না। কথা ঠিকমতো বলার আগেই ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললাম।
আমার জন্য সোজাসাপ্টা চিন্তা করাটা খুবই কষ্টকর হয়ে উঠছে। স্নায়বিক দুর্বলতাই, মনে হয়।
ওদিকে জন সোনা আমাকে পাঁজাকোলা করে সোজা উপরতলায় নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দিল। আর আমার মাথা ঝিম-ধরা অবধি পাশে বসে পড়ে শোনালো।
বলল, আমি ওর প্রিয়তমা, ওর প্রাণের আরাম, ওর সবকিছু। বলল, ওর জন্য হলেও আমাকে নিজের যত্ন নিতে হবে, ভালো থাকতে হবে।
জন বলে, আমার এই দশা থেকে মুক্তি একমাত্র আমারই হাতে। মনের জোর রেখে নিজেকে সামলাতে হবে আর কোনওরকম অবান্তর খেয়াল চড়াও হতে দেওয়া চলবে না।
একটাই সান্ত্বনা, বাচ্চাটা ভালো আছে, হাসিখুশি আছে, আর এই ভয়ানক ওয়ালপেপারওয়ালা বাচ্চাদের ঘরটায় ওকে থাকতে হচ্ছে না।
আমরা ঘরটায় না-উঠলে, থাকতে হতো সৌভাগ্যবান বাচ্চাটাকেই! ভাগ্যিস!
সত্যি বলছি, আমার নিজের কোনও বাচ্চাকে, কোমলমতি একটা শিশুকে, এরকম ঘরে গোটা জগৎসংসারের বিনিময়েও থাকতে দিতাম না।
তবে ব্যাপারটা আগে মাথায় আসেনি। ভাগ্য ভালো যে, শেষমেশ জন ঘরটায় আমাকেই রাখল। একটা বাচ্চার চেয়ে আমার জন্য মানিয়ে নেওয়াটা অনেকটাই সহজ, বুঝতেই পারছো।
সত্যি বলতে, প্রসঙ্গটা ওদের সামনে আর ভুলেও তুললাম না। যথেষ্ট চালাক এখন আমি। তবে আগের মতোই নজর রাখছি ওয়ালপেপারে।
ওই ওয়ালপেপারের এমন সব ব্যাপার আছে, আমি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না, কোনওদিন জানবেও না।
বাইরের দিকের নকশাটার আড়ালের আবছা অবয়বগুলো দিনকে দিন ফুটে উঠছে। দেখতে একই, কিন্তু অগুনতি। দেখায় মানবীর মতো। ঝুঁকে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে নকশার আড়ালে আড়ালে।
একদমই ভালো লাগে না আমার। ভাবছি―মনে মনে ভাবতে শুরু করেছি―ইশ্ এখান থেকে জন যদি নিয়ে যেত আমায়!
****
জনের সঙ্গে আমার ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করাটা খুব মুশকিলের। কারণ একটা―ওর খুবই জ্ঞানগম্যি, আরেকটা কারণ―আমাকে ভালোবাসে খুবই।
তবু গত রাতে চেষ্টা করেছিলাম।
তখন ছিল চাঁদের আলো। সূর্যের আলোর মতোই চাঁদের আলো চারদিকে।
কখনও কখনও আলোটা খুবই অসহ্য লাগে। খুব আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসে আর বরাবরই কোনও না কোনও জানালা দিয়ে ঢুকেই পড়ে।
জন ঘুমে। ওকে জাগাতে খুব খারাপ লাগল। তাই একদম নড়াচড়া না-করে ওই ঢেউ খেলানো ওয়ালপেপারের গায়ে পড়া চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম, যতক্ষণ না গা ছমছম করে উঠল।
আড়ালের ঝাপসা অবয়ব যেন সামনের নকশাটা ঝাঁকাচ্ছে। একদম যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে।
আমি আলগোছে উঠে দাঁড়ালাম। ছুঁয়ে দেখতে গেলাম সত্যিই কাগজটা নড়ছে কি না।
ফিরে দেখি জন সজাগ।
‘কী হলো, খুকিটা?’ জন বলল। ‘ওভাবে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি কোরো না―ঠান্ডা লেগে যাবে।’
মনে হলো, কথা বলার এটাই মোক্ষম সময়। বললাম, এখানে থেকে আমার আসলে কোনও উন্নতি হচ্ছে না। আমি চাই ও এখান থেকে আমাকে নিয়ে যাক।
‘আরে!’ বলল জন, ‘ভাড়ার চুক্তিনামা তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে, আর এর আগে বের হবার উপায়ও দেখছি না।’
‘বাড়ি মেরামত শেষ হয়নি, আর এই মুহূর্তে খুব সম্ভব আমি শহরও ছাড়তে পারছি না। অবশ্য তুমি কোনওরকম বিপদে পড়লে, আমি পারতাম এবং ছাড়তাম। আসলেই কিন্তু তোমার উন্নতি হয়েছে সোনা, তুমি বোঝো বা না-বোঝো। আমি ডাক্তার, লক্ষ্মীটি, আর বলছি আমি। গায়ে মাংস লেগেছে, রং ফিরেছে, মুখে রুচি এসেছে। তোমাকে নিয়ে সত্যিই কিছুটা হালকা লাগে এখন।’
‘আমার ওজন একটুও বাড়েনি,’ বললাম আমি, ‘বরং কমেছে। আর সন্ধ্যার দিকে, তুমি যখন থাকো, তখন হয়তো একটুখানি খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সকালে, যখন থাক না, একদমই ইচ্ছে করে না।’
‘ওরে সোনা রে!’ আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল জন, ‘যতখুশি অসুস্থ থাকো! কিন্তু এখন চল ঘুমিয়ে স্বর্ণালী সময়টার সদ্ব্যবহার করা যাক, সকালে আবার কথা হোক!’
‘যাচ্ছ না তুমি তাহলে?’ মনমরাভাবে জানতে চাইলাম।
‘কেন, কীভাবে, সোনা? আর তো মোটে তিন সপ্তাহ। তারপর জেনি যখন বাড়িটা গুছিয়ে নেবে, ওই ফাঁকে দিনকয়েকের জন্য কোথাও ঘুরতে যাব। সত্যি সত্যি মানিক, তুমি অনেকটাই ভালো আছ!’
‘শরীরটা হয়তো কিছুটা ভালো…’ বলতে গিয়েই থেমে গেলাম। কারণ জন সোজা হয়ে বসে, এমন কড়া-তিরস্কারভরা চোখে তাকাল যে আর একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের হলো না।
‘লক্ষ্মীটি আমার’, বলল জন, ‘আমার-আমাদের সন্তান-তোমার নিজের দিকে তাকিয়ে, দয়া করে ওই রকম চিন্তা একটুর জন্যও মাথায় ঢুকতে দিও না। তোমার ধাতের মানুষের জন্য এত লোভনীয়, এত বিপজ্জনক আর কিছু নেই। এই খেয়াল অবাস্তব-অবান্তর। আমি নিজে যখন তোমাকে বলছি, ডাক্তার হিসেবে অন্তত ভরসা করতে পারো না ?’
তাই স্বাভাবিকভাবেই কথা আর বাড়ালাম না। দেরি না করে বিছানায় গেলাম। জন ভেবেছিল, ওর আগেই ঘুমিয়ে গেছি। আমি কিন্তু ঘুমাইনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে শুয়ে বের করতে চাইছিলাম ওই সামনের নকশা আর ছায়া-নকশা আসলেই একসঙ্গে নড়াচড়া করে নাকি আলাদা আলাদা।
****
দিনের আলোয় নকশাটা দেখলে বোঝা যায়―ছন্দের ঘাটতি, নিয়মের লঙ্ঘন। একটা সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য সার্বক্ষণিক উপদ্রব ওটা।
রংটা যথেষ্ট বীভৎস, আর যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর, আর যথেষ্ট রাগ-ধরানো। কিন্তু নকশাটা অত্যাচারের মতো।
ভাবলে, নকশাটা ধরতে পেরেছ। কিন্তু যেই না ওর পিছু লেগে খুব ভালোভাবে এগিয়েছো, অমনি এক ডিগবাজি খেয়ে তোমাকে আবার গোড়ায় নিয়ে যায়। তোমার মুখে লাগায় চড়, আছাড় মারে, মাড়ায় পায়ের তলায়। যেন আস্ত এক দুঃস্বপ্ন।
বাইরের নকশাটা কারুকাজময়, চিত্রবিচিত্র লতাপাতা-বক্ররেখাময়। ব্যাঙের ছাতার কথা মনে পড়ে। কল্পনা করতে পারো, জোড়ায় জোড়ায় ব্যাঙের ছাতা, অগুনতি সারি সারি ব্যাঙের ছাতা, ক্রমাগত পাক খেতে খেতে অঙ্কুরিত-মুকুলিত হচ্ছে। কেন? নকশাটা অনেকটা এমনই দেখায়।
মানে, কখনও কখনও!
এই ওয়ালপেপারটার একটা চোখে পড়ার মতো অদ্ভুত ব্যাপার আছে। আমি ছাড়া আর কারও চোখে পড়েছে বলে যদিও মনে হয় না। ব্যাপারটা হলো―আলো বদলের সঙ্গে সঙ্গে নকশার বদল।
পুবদিকের জানালা দিয়ে যখন তিরবেগে ঢোকে সূর্যের আলো (বরাবর নজর থাকে আমার ওই পয়লা লম্বা-সিধা আলোর দিকে), তখন নকশাটা এত দ্রুত বদলে যায় যে, কখনওই ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না।
এজন্যই আমি সবসময় নজর রাখি।
চাঁদের আলোয় (চাঁদ উঠলে সারা রাতই আলো ছড়ায়), আমি ওকে চিনতেই পারি না।
রাতে যে-কোনও আলোয়―গোধূলিতে, মোমের আলোয়, লণ্ঠনের আলোয়, আর সবচেয়ে জঘন্য ওই চাঁদের আলোয়― গরাদের মতো হয়ে উঠে ওটা! বলছি বাইরের নকশাটার কথা। ওর আড়ালে থাকা মানবীকে তখন দেখা যায় একদম স্পষ্ট।
অনেক দিন পর্যন্ত বুঝতে পারিনি পেছনে দেখা দেয় কী ওটা, ওই ছায়া-নকশাটা, কিন্তু এখন আমি ঠিক ঠিক জানি, ওটা এক মানবী।
দিনের আলোয় থাকে প্রশমিত-চুপচাপ। মনে হয়, এই নকশাই ওকে রাখে অমন নিশ্চল। কী যে ধাঁধা! আমাকেও চুপচাপ করিয়ে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আজকাল অনেকটা বেশি সময় শুয়ে কাটাই। জন বলে, এটা আমার জন্য ভালো, যতটা পারি যেন ঘুমাই।
আমার অভ্যাসটা করিয়েছে ও-ই, প্রতিবার খাবারের পর ঘণ্টাখানেক শুইয়ে রেখে।
এটা বদভ্যাস, আমি জানি। দেখতেই পাচ্ছ, আমি ঘুমাই না।
আর এতে হলো ছলচাতুরির অভ্যাস। আমি যে সজাগ তা তো ওদের বলি না―একদমই না!
আসল কথা হলো, আমি জনকে নিয়ে একটু ভয়ে আছি।
ওকে কখনও কখনও খুব অদ্ভুত লাগে। জেনির চোখে পর্যন্ত দুর্বোধ্য চাহনি।
মাঝে মধ্যে একদম বৈজ্ঞানিক অনুমানের মতো মনে উদয় হয় হয়তো দায়ী ওই ওয়ালপেপারটাই!
আমি জনকে খেয়াল করেছি ওর অগোচরে। আচমকা ঘরে ঢুকেছি খুব সামান্য কোনও অজুহাতে। আর একদম ওয়ালপেপারের দিকে তাকানো অবস্থায় ধরা খেয়েছে ও। জেনিও। একবার ও ধরা খেয়েছে ওয়ালপেপারে হাত বুলানো অবস্থায়।
ও টের পায়নি আমি তখন ঘরে। নিচু গলায়, খুবই নিচু গলায়, যথাসম্ভব সামলে জিজ্ঞেস করলাম, ওয়ালপেপারটা নিয়ে কী করছে ও। এমনভাবে ফিরে তাকালো যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। ভীষণ রাগ চোখে-মুখে। জিজ্ঞেস করল, কেন এত ভড়কে দিলাম!
তখন ও বলল, ওয়ালপেপারটার গায়ে যা-যা লাগে, সবকিছুতেই দাগ লাগিয়ে দেয়! বলল, আমার আর জনের সব কাপড়চোপড় নাকি হলদে ছোপে ভরা! আমরা যেন আরেকটু সাবধানে থাকি!
কথাটা কি খুব নিরীহ-আলাভোলা শোনায়নি? কিন্তু আমি জানি, ও নকশাটা খুঁটিয়ে দেখছিল। এবং আমি ধরেই নিয়েছি, এর রহস্যোদ্ঘাটন আমি ছাড়া কেউ করতেই পারবে না।
****
আগের চেয়ে জীবনটা এখন অনেক রঙিন। দেখছই তো, আমার চাইবার, প্রতীক্ষায় থাকবার, দেখবার মতো নতুন আরও কিছু আছে। আগের চেয়ে সত্যি খেতে পারি বেশ, আর অনেক শান্ত হয়ে গেছি আগের চেয়ে।
আমাকে ভালো হয়ে উঠতে দেখে কী যে খুশি জন! সেদিন একটু হেসে বলল, চোখে পড়ার মতো উন্নতি হচ্ছে আমার, ওই ওয়ালপেপার থাকার পরও।
আমি হেসে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলাম। ওকে বলার কোনওরকম ইচ্ছে ছিল না যে, উন্নতিটা বরং ওই ওয়ালপেপারের জন্যই। শুনলে আমাকে নিয়ে মজা করত। হয়তো এখান থেকে আমাকে নিয়ে যেতেও চাইতো।
আমি এই মুহূর্তে এখান থেকে নড়তে চাই না, রহস্যোদ্ঘাটনের আগে না। হাতে আছে এক সপ্তাহ। আমার মনে হয়, ওইটুকুই যথেষ্ট।
এখন অনেকটাই ভালো আছি! রাতে ঘুমাই না খুব একটা। ওয়ালপেপারের নিত্যনতুন ঘটনা দেখতে কী যে মজা লাগে! কিন্তু দিনে ঘুমাই বেশ।
দিনের আলোয় ব্যাপারটা ক্লান্তিকর-ধাঁধাময়।
ব্যাঙের ছাতার গায়ে দেখা যায় নিত্যনতুন অঙ্কুর, আর সবটুকু জুড়ে হলুদের নিত্যনতুন ছটা। গুনে কুলাতে পারিনি, মন দিয়ে চেষ্টা করেও।
হলুদটা কী যে অদ্ভুত! ওই ওয়ালপেপারের! আমার দেখা হলুদ সব জিনিসের কথা মনে করিয়ে দেয়। হলুদ বুনোফুলের মতো সুন্দরগুলো না, মনে করিয়ে দেয় পচা-বিচ্ছিরিগুলোর কথা।
তবে ওয়ালপেপারটার অন্য আরেকটা ব্যাপার আছে। গন্ধটা! ঘরে প্রথম পা দিয়েই টের পেয়েছিলাম। কিন্তু প্রচুর আলো-হাওয়া থাকায় অতটা বুঝিনি। এখন সপ্তাহখানেক ধরে কুয়াশা আর বৃষ্টি। জানালা বন্ধ থাকুক কি খোলা, গন্ধটা আছেই। বাড়িময় গন্ধ।
ওকে দেখি খাবারঘরে ভেসে বেড়াচ্ছে, বসারঘরে লুকোচুরি খেলছে, হলঘরে গা-ঢাকা দিচ্ছে, সিঁড়িতে শুয়ে আছে আমার অপেক্ষায়।
চুলে ঢুকে পড়ে আমার।
ঘোড়ায় চড়তে গেলে পর্যন্ত হঠাৎ ঘাড় ফেরালে ধরা পড়ে। গন্ধটা ওখানেও!
খুব অদ্ভুতও গন্ধটা! কিসের মতো যে, তা ধরতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর পেছনে লেগে থেকেছি।
খুব একটা মন্দ না গন্ধটা। আর খুবই হালকা। কিন্তু আমার চেনা সবচেয়ে সূক্ষ্ম অথচ সবচেয়ে নাছোড়বান্দা গন্ধ এটাই।
এই স্যাঁতস্যাতে আবহাওয়ায় গন্ধটা ভয়াবহ। রাতে জেগে উঠি আর দেখতে পাই আমার উপর ঝুলছে ওটা।
শুরুর দিকে খুব বিরক্ত করত গন্ধটা। ওর হাত থেকে মুক্তি পেতে বাড়িটাই জ্বালিয়ে দেবার কথাও সত্যি সত্যি ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন ধাতস্থ হয়ে গেছে।
কাগজটার রং ছাড়া আর কোনও কিছুর সঙ্গেই মেলাতে পারছি না ওকে! একটা হলুদ গন্ধ!
এই দেয়ালটায় খুবই আজব একটা দাগ দেখা যায়। নিচের দিকে, কিনারার কাছে। একটা ডোরা, পুরো ঘরটা ঘিরে। প্রত্যেকটা আসবাবের পেছন দিয়ে চলে গেছে, খাটটা ছাড়া। একটা লম্বা, সোজা ডোরা। মসৃণও, যেন বারবার ঘষা হয়েছে।
ভাবি, কীভাবে করা হলো আর কে করল, আর কেনইবা করল। চক্রাকারে ঘুরছে আর ঘুরছে―ঘুরছে ঘুরছে আর ঘুরছে―আমার মাথা ঘুরিয়ে দেয়!
****
অবশেষে সত্যিই আমি কিছু একটা আবিষ্কার করেছি।
রাতে লম্বা সময় ধরে চোখ রেখে, অদলবদল দেখতে দেখতে, শেষমেষ আমি ধরতে পেরেছি।
সামনের নকশাটা সত্যিই নড়ে! আর অবধারিতভাবেই, ঝাঁকায় আড়ালের ওই মানবী!
কখনও মনে হয়, আড়ালে অনেক অনেক মানবী, কখনও মনে হয়, শুধু একজন। দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর তাতেই পুরো নকশাটা কেঁপে উঠে।
খুব উজ্জ্বল জায়গায় থাকে স্থির, আর খুব ছায়াময় জায়গায় গরাদ একদম আঁকড়ে ধরে, ঝাঁকায় প্রাণপণ।
মানবী সবসময় চায় নকশা পেরিয়ে আসতে। কিন্তু কেউই পার হতে পারে না ওই নকশা। ওটা টুঁটি চেপে ধরে। মনে হয়, ঐজন্যই নকশাটায় এত এত মাথা।
ওরা গরাদ গলে কোনওমতে বেরিয়ে এলেই নকশাটা অমনি ঘাড় মটকে উলটো করে ঝুলিয়ে দেয়, আর চোখ করে তোলে বিস্ফারিত!
ওই মাথাগুলো ঢেকে রাখলে বা সরিয়ে ফেললে নকশাটা খুব একটা মন্দ লাগত না।
****
মনে হয়, ওই মানবী দিনের বেলা বেরিয়ে আসে!
বলছি কেন, চুপি চুপি, দেখেছি যে আমি ওকে!
আমি সবকটা জানালা দিয়েই ওকে দেখতে পাই!
ওই মানবীই, জানি আমি। কারণ সবসময় ও হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর খুব কম নারীই দিনেদুপুরে হামাগুড়ি দেয়।
ওকে দেখি ওই দীর্ঘ-ছায়াময়-ছিপছিপে পথে, এদিক-ওদিক হামাগুড়ি দিচ্ছে। দেখি, ওই সব কৃষ্ণাভ দ্রাক্ষালতাকুঞ্জে। দেখি, বাগানজুড়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে।
ওকে দেখি বৃক্ষঘেরা ওই দীর্ঘ পথে। ধার ঘেঁষে হামাগুড়ি দিচ্ছে। আর কোনও ঘোড়াগাড়ি এলেই কালোজামের ঝোপে লুকিয়ে পড়ছে।
ওকে একটুও দোষ দিই না। দিনেদুপুরে হামাগুড়ি দিতে গিয়ে ধরা পড়াটা নিশ্চয়ই খুব লজ্জার!
আমি দিনের বেলা হামাগুড়ি দেবার সময় বরাবর দরজা আটকে নিই। রাতে হামাগুড়ি দিতে পারি না। জানি, জন সঙ্গেসঙ্গেই কিছু একটা সন্দেহ করে বসবে।
আর জন আজকাল এতটাই অদ্ভুত হয়ে উঠেছে যে, ওকে একদম ঘাঁটাতে চাই না। ইশ্ ও যদি অন্য কোনও ঘরে চলে যেত! আমি ছাড়া অন্য কেউ ঐ মানবীকে রাতের বেলা বের করে আনুক, তাও আমি চাই না।
প্রায়ই ভাবি, যদি একসঙ্গে সব কটা জানালা দিয়ে ওকে দেখতে পেতাম! কিন্তু যত দ্রুতই ঘুরি না কেন, একবারে একটা মাত্র জানালা দিয়েই দেখা যায়।
ওকে আমি সবসময় দেখতে পেলেও, আমি ঘোরার আগেই হয়তো ও হামাগুড়ি দিয়ে দ্রুত সরে যেতে পারে!
কখনও দেখেছি ওকে অনেক দূরে, খোলা প্রান্তরে। ঝোড়ো হাওয়ায় ছুটে চলা মেঘের ছায়ার মতো দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে চলছে।
ইশ্ বাইরের নকশাটা যদি ছায়া-নকশা থেকে সরানো যেত! ঠিক করেছি, চেষ্টা করব, একটু একটু করে।
আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার জানতে পেরেছি। কিন্তু এই যাত্রা আর বলছি না! লোকজনকে অতিরিক্ত বিশ্বাস করতে নেই।
কাগজটা সরাতে হাতে আছে মাত্র দুই দিন। এবং আমার বিশ্বাস, জন কিছু একটা টের পেয়েছে। ওর চাহনি ভালো ঠেকছে না।
শুনলাম ও জেনিকে আমার ব্যাপারে নানারকম ডাক্তারিমার্কা জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
জেনির হাতে দেবার মতো ছিল দারুণ রিপোর্ট! বলল, দিনে আমি অনেকটা ঘুমাই।
জন জানে, রাতে আমার খুব একটা ভালো ঘুম হয় না। আমি এত চুপচাপ থাকলেও!
সবরকম জিজ্ঞাসাবাদ করল জন আমাকেও। আর খুব প্রেম-প্রেম নরম-নরম ভাব দেখাল।
আমি কি বুঝতে পারি না!
তবু ওর এই আচরণ আমাকে অবাক করে না। এই ওয়ালপেপারের ঘরেই তো ঘুমাচ্ছে তিন মাস ধরে!
ওয়ালপেপার ঘিরে আমারই শুধু যত আগ্রহ। কিন্তু আমি একদম বুঝতে পারি, জন আর জেনি অলক্ষ্যে এতে আক্রান্ত।
****
হুররে! আজই শেষ দিন। কিন্তু এটুকুই ঢের। রাতটা জন শহরেই আছে, আজ সন্ধ্যার আগে ফিরছে না।
জেনি আমার সঙ্গে ঘুমাতে চেয়েছিল। সেয়ানা মেয়ে! কিন্তু আমি বললাম, একা একটা রাত কাটালে নিঃসন্দেহে ভালো বিশ্রাম হবে।
ওটা ছিল চালাকি। আমি একা ছিলাম না মোটেও! চাঁদ উঠতেই, আর ওই বেচারি হামাগুড়ি দিয়ে ঝাঁকাতে শুরু করতেই, আমি উঠে পড়লাম আর ওকে সাহায্য করতে দৌড়ে গেলাম।
আমি টানলাম, ও ঝাঁকাল। আমি ঝাঁকালাম, ও টানল। আর ভোরের আগেই তুলে ফেললাম বেশ অনেকটা।
প্রায় মাথা সমান উঁচু, ঘরের চারপাশের অর্ধেকজুড়ে থাকা একটা ফালি।
তারপর রোদ এলে, আর ওই ভয়ানক নকশাটা আমাকে দেখে ঠাট্টা শুরু করলে, জানিয়ে দিলাম আজই শেষ করছি!
কাল চলে যাচ্ছি আমরা। লোকজন আমাদের ঘরের সব আসবাবপত্র আবার নিচে নিয়ে যাচ্ছে, আগের মতো সাজিয়ে রাখবে বলে।
জেনি তাজ্জব হয়ে দেয়ালের দিকে তাকালো। কিন্তু আমি হাসিমুখে বললাম, এই ভয়াবহ জিনিসটার উপর রাগ ঝাড়তেই এমনটা করেছি। ও হেসে বলল, কাজটা নিজে করতে ওর আপত্তি নেই, কিন্তু আমি যেন কিছুতেই ক্লান্ত না হই।
নিজে নিজে কীভাবে ধরাটা খেলো ও!
কিন্তু আমি আছি এখানটায়। এবং এই কাগজে স্পর্শ শুধু আমার, আর কারও না। জীবিত কারও না!
ও আমাকে ঘরটা থেকে বের করে নিতে চাইছিল। স্পষ্ট সেটা! কিন্তু আমি বললাম, ঘরটা এখন এতটাই চুপচাপ, ফাঁকা আর সাফসুতরো যে, মনে হচ্ছে, আবার শুয়ে পড়ি আর ইচ্ছেমতো ঘুমিয়ে নিই। রাতের খাবারের জন্যও যেন না জাগায়। উঠলে আমিই ডাকব।
তো চলে গেল জেনি, চলে গেল গৃহকর্মীরা, চলে গেল সব আসবাব। রইল শুধু ওই পেরেক দিয়ে আটকে রাখা বিশাল খাট, তার উপর পাওয়া ক্যাম্বিস কাপড়ের গদিসমেত।
আজ রাতে আমরা নিচতলায় ঘুমাব। কাল নৌকাটা বাড়ি নিয়ে যাব।
ঘরটা বেশ ভালোই লাগছে। এখন আবার খালি।
কী তাণ্ডবটাই না চালিয়েছে বাচ্চারা এখানে!
খাটের অনেক জায়গা কামড়ানো!
কিন্তু কাজে ফেরা দরকার।
ঘরের দরজায় তালা মেরে চাবিটা সামনের রাস্তায় ছুড়ে দিয়েছি।
নিজে বেরোব না, আর জন আসার আগে অন্য কেউ আসুক চাই না।
ওকে তাক লাগিয়ে দিতে চাই।
একটা দড়ি রেখেছি, জেনিও দেখেনি। ওই মানবী বেরিয়ে যদি আসেই, আর পালাতে চেষ্টা করে, ওকে বেঁধে ফেলতে পারব!
কিন্তু ভুলে গেছি যে, কোনও কিছুর উপর দাঁড়ানো ছাড়া বেশিদূর নাগাল পাই না!
এই খাট একচুলও নড়ে না!
খাটটা তুলতে আর ধাক্কা দিতে গিয়ে আমার খোঁড়া হবার জোগাড়। এত রাগ উঠল যে, এক কোণে কামড়ে ছোট্ট একটা টুকরা তুলে ফেললাম। কিন্তু তাতে দাঁতই ব্যথা পেল।
তারপর মেঝেতে দাঁড়িয়ে নাগালের সবটুকু কাগজ টেনে ছিঁড়লাম। কাগজটা ভীষণভাবে সেঁটে আছে আর নকশাটা এতে খুব মজা পাচ্ছে। ঐ সমস্ত মটকানো মাথা, আর বিস্ফারিত চোখ, আর টলমলে ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো অবয়বগুলো শুধু বিদ্রƒপের অট্টহাসি হাসছে!
আমি এতটাই রেগে গেছি যে, বেপরোয়া কিছু একটা করে বসতে পারি।
জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়তে পারলে দারুণ ব্যায়াম হতো। কিন্তু গরাদ এতটাই মজবুত যে চেষ্টা করারও উপায় নেই।
অবশ্য আমি এটা করবও না। একদমই না। ভালো করেই জানি, এমন কিছু করে বসা ঠিক হবে না, আর ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।
জানালার বাইরে তাকাতেও আমার ভালো লাগে না। ওখানে এত বেশি হামাগুড়ি দেওয়া মানবী, আর এত দ্রুত হামাগুড়ি দেয় ওরা!
ভাবছি, ওরা সবাই কি বেরিয়ে এসেছে ঐ ওয়ালপেপার থেকে, আমারই মতো?
কিন্তু আমি এখন শক্ত করে বাঁধা, ভালো করে লুকানো দড়িটি দিয়ে। ওই রাস্তার দিকে আমাকে আর বের করতে পারছো না!
মনে হচ্ছে, রাত হলে আমাকে আবার ঐ নকশার আড়ালে ফিরতেই হবে, আর ওটা খুবই কষ্টকর!
এই বিশাল ঘরটায় বেরিয়ে এসে ইচ্ছেমতো হামাগুড়ি দিতে কী যে ভালো লাগে!
আমি বাইরে যেতে চাই না। যাব না, জেনি বললেও।
বাইরে মাটিতে হামাগুড়ি দিতে হবে, আর ওখানে হলুদের বদলে সবকিছুই সবুজ।
কিন্তু এখানে মেঝেতে অনায়াসে হামাগুড়ি দিতে পারি। আর আমার কাঁধ দেয়ালের চারদিক ঘিরে থাকা ওই লম্বা মসৃণ ডোরার সঙ্গে খাপে খাপে মিলে যায়। তাই দিশা হারাই না।
জন দরজায় যে!
কোনও লাভ নেই হে যুবক, দরজা তুমি খুলতে পারছো না!
কীভাবে যে ডাকছে আর ধাক্কাচ্ছে!
এখন একটা কুড়ালের জন্য চেঁচাচ্ছে।
এত সুন্দর দরজাটা ভেঙে ফেললে খুবই আফসোসের ব্যাপার হবে!
‘জন, সোনা!’ বললাম খুবই মোলায়েম গলায়, ‘চাবিটা সামনের সিঁড়ির কাছে, একটা কলাপাতার নিচে!’
শুনে কয়েক মুহূর্ত ও স্তব্ধ হয়ে রইল।
তারপর বলল, একদম নিচু গলায়, ‘দরজাটা খোলো, লক্ষ্মীটি!’
‘পারছি না,’ বললাম। ‘চাবিটা সামনের দরজার কাছে, কলাপাতার নিচে!’
তারপর আবার বললাম কথাটা, বেশ কয়েকবার, খুবই নরম করে, আস্তে আস্তে।
এবং এতবার বললাম যে শেষমেষ ওকে গিয়ে দেখতেই হলো। এবং পেল বটেই। এবং ভেতরে এল।
দরজার কাছে ও থমকে দাঁড়াল।
‘কী হলো ?’ আর্তনাদ করে উঠল ও। ‘আরে করো কী!’
আমি একইভাবে হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকালাম।
‘অবশেষে আমি বেরিয়ে এসেছি,’ বললাম আমি, ‘তোমার আর জেনির নজরদারির পরও। বেশিরভাগ ওয়ালপেপার ছিঁড়েও ফেলেছি। আমাকে ওখানে আর ফেরত পাঠাতে পারছো না!’
এখন ওই লোকটার মূর্ছা যাবার কথা ? কিন্তু মূর্ছা গেল। এবং দেয়াল ঘেঁষে একদম আমার চলার পথে। তাই প্রতিবারই ওর উপর দিয়ে আমাকে হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হলো!
সচিত্রকরণ : সংগ্রহে ফারহানা আজিম শিউলী



