গল্প : উপলার দুঃস্বপ্ন : মিলু শামস

দুঃস্বপ্নটা আজকাল প্রায়ই হানা দেয়। রাত দুপুরে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে উপলা। গ্লাসের ঢাকনা তুলে জল খায়। সেলফোনের বাটন টিপে সময় দেখে। ভেঙে যাওয়া ঘুম দুচোখে আর লাগে না। প্রথম প্রথম ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। বালিশ আঁকড়ে জোর করে বিছানায় শুয়ে থেকেছে। এখন উঠে পড়ে। ঘরময় হাঁটে। ছবির অ্যালবামগুলো পুরানো হয়ে গেছে, ওগুলোই বারবার নেড়েচেড়ে দেখে। আজকাল তো সব ডিজিটাল। অ্যালবামের প্রয়োজন কমেছে। দূরের ব্যবধান ঘুচে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে দুনিয়া। দূরের প্রিয়জনের ছবি অ্যালবামে রেখে দেখার দরকার হয় না। চাইলে মুহূর্তেই জীবন্ত হয়ে ওঠে তারা। দু’সন্তান মহুয়া আর পিয়ালের সঙ্গে ম্যাসেঞ্জারে কথা হয় প্রায় প্রতিদিন। প্রতিদিন দেখা যায় ওদের ভিনদেশি ঘরদোর, ল্যান্ডস্কেপ, কর্মস্থল। মাত্র কয়েকটা বছর, পৃথিবী কীভাবে বদলে গেল! স্বামী গত হয়েছেন বছর তিনেক। ছেলেমেয়েরা ইউরোপে সেটেলড তারও অনেক আগে। অবসরপ্রাপ্ত জীবনে উপলা এখন একা। একেবারেই একা। লন্ডন ও অস্ট্রিয়া থেকে ছেলেমেয়েরা বারবার বলে তাদের কাছে চলে যেতে। নিঃসঙ্গতা শুধু নয়, এ বয়সে একা থাকা নিরাপদ নয়―বলে তারা। জোর করে টিকিট পাঠানোয় দুজনার কাছে পালা করে দুমাস থেকে এসেছে গত জুলাইয়ে। কর্মজীবনে ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে গিয়েছে বহুবার, অফিসিয়াল নানা দায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু ওসব দেশের কোথাও স্থায়ীভাবে থাকতে মন টানেনি উপলার। ছেলেমেয়ের সঙ্গে থাকতেও নয়। নিজ দেশে নিজের মতো করে থাকাই তার ইচ্ছে। অখণ্ড অবসর যদিও ভীষণ ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে কখনও কখনও। কোথাও স্যুটেবল জব পেলে যোগ দেবে অথবা নিজেই কোনও ব্যবসা খুলবে, ভাবছে উপলা।

যে প্রতিষ্ঠানে ঢুকেছিল কর্মজীবনের শুরুতে, অবসরে গিয়েছে তার প্রধান হিসেবে। কাজের প্রতি নিবিড় নিষ্ঠা ও একাগ্রতা উপলাকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের শীর্ষে। দক্ষ প্রশাসনিক অফিসার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে। অবসরের দু’বছর যেতে না যেতে হাঁফিয়ে উঠেছে। রক্তে সামান্য উচ্চচাপ ছাড়া তেমন কোনও শারীরিক অসুস্থতা নেই। এভাবে শুয়ে-বসে থাকা জীবন দুর্বিষহ লাগে উপলার। ক’দিন ধরে মনে হচ্ছে মানসিক বৈকল্য দেখা দিচ্ছে। নিয়ম করে দুঃস্বপ্ন হানা দিচ্ছে ঘুমে। দিনে তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেও―ফ্রিল দেওয়া সাদা ফ্রক আর লাল জুতো পরা ফুটফুটে এক শিশুর হাত ধরে হেঁটে চলেছে সে। দুপায়ে নৃত্যের তাল তুলে আনন্দে চলছে শিশু। সুন্দর সবুজে ঢাকা প্রান্তর আর ফুলবাগানের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা উঠে যায় এক পাহাড়-চূড়ায়। যেমন পাহাড়ে উঠেছে উপলা দার্জিলিংয়ে। দুধারে বিশাল গিরিখাদের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে পাহাড়ি পথ। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে উপলা। শিশু থমকে যায়। ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এক মুহূর্ত, উপলা এদিক ওদিক তাকিয়ে সজোর ধাক্কা দেয় শিশুকে। পড়ে যেতে যেতে তীব্র আর্তনাদ গিরিখাদে প্রতিধ্বনি তুলে হাওয়ায় মিলায়―‘মা… আমায় ফেলে দিলে…মা…’ এ চিৎকার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। উঠে বসে বিছানায় তারপর বিনিদ্র রাত। এই একই বীভৎস স্বপ্ন প্রতি রাতে ঘুমে, তন্দ্রাচ্ছন্নতায়।

দুই

উপলা ভাবতেও পারেনি জায়গাটা এত ভালো লাগবে। তিনশ একরজুড়ে বিশাল রিসোর্ট আর রিহ্যাবিলিটি সেন্টার পাশাপাশি। মূল ফটক একটাই। ভেতরে ঢোকার পর আলাদা পার্টিশন। রাজপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম ছিল এই ক’বছর আগেও। এখন টানটান পাকা সড়ক, ঢাকা থেকে সরাসরি একেবারে রিসোর্টের দোরগোড়ায়। জ্যাম না থাকলে ঘণ্টা তিনেকের পথ। প্রথম দিন ভেতরে ঢুকে অবাক হয়েছিল উপলা। রিসেপশনে বসে মনে হচ্ছিল আন্তর্জাতিক কোনও এয়ারপোর্টে কানেকটিভ ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছে। যেমন ব্যবস্থাপনা, তেমনি কর্র্মীদের আন্তরিকতা ও আদব কায়দা। ইউরোপীয় কোনও ট্রেইনারের কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিঃসন্দেহে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পাশাপাশি অবস্থান দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারেনি।

বিশাল বিস্তৃত খোলা মাঠ, প্রাকৃতিক জলাশয়, গাছপালার ভেতর দিয়ে শানবাঁধা ঘাট নেমে গেছে জলাশয়ে। সেখানে ছাদ দেওয়া বেদি, চারপাশ খোলা। চেয়ার পেতে বসলে মনে হয় জলের ওপর বসে আছি। একটা দুটো নৌকা ভাসছে। চাইলেই কেউ   বৈঠা বেয়ে ঘুরতে পারে বিকেল কিংবা ছায়াময় সন্ধ্যায়। একজন কর্ণধারও থাকেন আশপাশে, প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে। একটু দূরে কৃত্রিম লেকে রং-বেরঙের প্যাডেল বোট। মোটা গাছে কাছি বাঁধা গ্রামীণ দোলনা আবার তার ওপর দিয়ে চলে গেছে রোপওয়ে। ভীষণ পছন্দ হয় উপলার জায়গাটা। একদিকে এ রকম গ্রামীণ পরিবেশ অন্যদিকে থাকার জন্য ফাইভ স্টার মানের ব্যবস্থাপনা। জিম, সুইমিং পুল, চাইল্ড কর্নার, ব্যাডমিন্টন কর্নার। শপিং ডিসপ্লে। একটু পর পর ছোট ক্যাফে। দুর্দান্ত! তাক লাগে উপলার। এ গণ্ডগ্রামে এমনটা হতে পারে! অবিশ্বাস্য! শুধু টাকা নয়, সন্দেহাতীতভাবে পেছনে রয়েছে নিখুঁত পরিকল্পনা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি। মনে মনে সিদ্ধান্ত টানে উপলা। এই যে রিহ্যাবিলিটি সেন্টার, এও সম্ভব নয় আধুনিক শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া।

সেন্টারের বয়স বছর পাঁচেক। রিসোর্টের মতো এটাও খুবই পরিকল্পিত। স্পেশাল চাইল্ড বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সর্বাধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছেন। আছে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্যবস্থা, বুদ্ধির বিকাশ যাদের স্বাভাবিক। এদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কোনও একটি বিষয়ে স্কিল ডেভেলপ করা হয়, যাতে অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজেকে নিজে চালাতে পারে। উপলা অবাক হয় শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকেও এভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব! এ বিষয়ে তেমন কোনও ধারণা ছিল না ওর। এ কর্মযজ্ঞ দেখে বিস্মৃত অতীত থেকে উঠে আসে হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা, ধূসর কিছু পৃষ্ঠা। একটি নিকষ কালো রাত। উপলা শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে। ভুলে যাওয়া সে সব পৃষ্ঠাকে কালের গর্ভে চিরতরে ডুবিয়েই তো দিতে চেয়েছে। তবু কেন আজও…। উপলা ভুলে যায় অথবা ভোলার ভান করে আরও একবার। দ্রুত চারপাশে তাকিয়ে স্বাভাবিক হয়। এখানে সে এসেছে এই রিহ্যাব সেন্টারের প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব নিয়ে। অবসর জীবনের একাকিত্ব কাটাতে চেষ্টা করছিল কোনও কাজে যুক্ত হতে। খুব বেশি সময় লাগেনি। সফল প্রশাসনিক ক্যারিয়ার দেখে রিহ্যাব সেন্টার সাদরে নিয়োগ দেয়। এমন দক্ষ একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রয়োজন ছিল তাদের।

তিন

নতুন করে আবার কর্মব্যস্ততায় ডুবে ভালোই কাটছিল সময়। বিশেষ করে এই নির্জন প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রাণ শক্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে। নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয় উপলার। তার সঙ্গে অবসরে যাওয়া অনেকেই দুঃসহ নিঃসঙ্গতায় ভুগছে। কেউ কেউ ধর্মকর্মে এমন মজেছে যে, এ জীবনটাকে জীবনই মনে করছে না আর। এত কালের এত কাজ, এত অর্জন যেন কিছুই নয়।

সে কাজ-পাগল মানুষ আজীবন। এখানে আসার পর ভালো ঘুম হচ্ছে রাতে। দুঃস্বপ্নও আসেনি আর। কম্পাউন্ডের ভেতরেই দুরুমের ছোট্ট কটেজে থাকার ব্যবস্থা। দিনের পুরোটাই প্রায় কাটে অফিসে। উপলার মনে হয় না অবসর-পরবর্তী দ্বিতীয় কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। সেই তরুণ বয়সে যেমন আনন্দ নিয়ে কাজ করেছে তেমনই ভালো লাগা কাজ করছে এখনও। স্বামী-সন্তান-সংসার কখনও অন্তরায় হয়নি তার কাজে। পরিবারের সবাই যার যার নিজের কাজ নিজের মতো পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে করেছে। কারোর মত কেউ কোনও দিন অন্যের ওপর চাপায়নি। প্রচলিত আর দশটা পরিবার থেকে উপলার পরিবার ছিল একেবারেই আলাদা। কাজকে ভালবেসেই তাই কাটাতে পেরেছে গোটা কর্মজীবন।

পরিবারটি এমন ব্যতিক্রমী হয়েছিল মূলত স্বামী ও সন্তানদের সত্যিকারের আধুনিক মনস্কতার কারণে। উপলা এসেছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। লোয়ার মিডল ক্লাস মানসিকতা কেটেছিল অনেক পর। ততদিনে সেই তামসিক ঘটনা আবর্তিত করে গেছে তাকে। যা সে ছাড়া দ্বিতীয় কেউ জানে না। এমন কি বন্ধুপ্রতিম স্বামীও কোনও দিন জানতে পারেনি সে কথা।

কি করে ওরকম একটা ঘটনা এত বছর চেপে রেখেছে মনের গভীরে ভাবলে আজকাল বিহ্বল হয়ে পড়ে উপলা। এই রিহ্যাব সেন্টারে এসে, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা দেখে মাঝে মাঝে কাতর হয়। মা বাবাদেরও কাউন্সেলিং করানো হয়। কি অপার মমতায় সন্তানদের লালন করেন তারা। বিরক্তি নেই, নিয়তিকে দোষারোপ করা নেই। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় পৃথিবীতে স্বাভাবিক বিচরণে অক্ষম শিশুদের মোটামুটি সক্ষম করে তোলার কি আন্তরিক প্রচেষ্টা! উপলার কি অনুশোচনা হয় ? আত্মদংশন ? হ্যাঁ দুঃসহ এক অপরাধবোধ আজকাল ভীষণ তাড়িত করে তাকে।

চার

মায়ের ভীষণ আপত্তি ছিল মেয়ের একাকী ঢাকার বাইরে জেলা শহরে চাকরি করতে যাওয়ায়। বাবাহীন সংসারে সংগ্রাম করে মা-ই ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ করে দিয়েছিলেন। মায়ের মতামত উপেক্ষা করা তাই কঠিন ছিল উপলাদের জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরুনোর পরের বছরই বিসিএস প্রিলিমিনারিতে টিকে যায় উপলা। পরের ধাপগুলোও যথারীতি একবারেই উতরে গিয়েছিল। মেধাবী উপলার শিক্ষাজীবন আপাদমস্তক ঝকঝকে উজ্জ্বল। বিসিএস কোয়ালিফাই করার পর সুপ্ত অ্যামবিশন মাথা চাড়া দেয় ডালাপালাসহ। বিয়েটা করে ফেলেছিল মাস্টার্স ফাইনালের পর পরই। দীর্ঘদিনের প্রেম, দু’পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। জীবনের বাঁক বদলের তুমুল সে দিনগুলোয় সব কিছু যাচ্ছিল ওর সাফল্যের অনুকূলে। উপলার দুচোখে তখন কেবলই আকাশ ছোঁয়ার নেশা। প্রথম পোস্টিং হয়েছিল আখাউড়া। আজন্ম ঢাকায় বড় হওয়া উপলার খুব একটা অনীহা ছিল না ঢাকা ছাড়ায়। স্বামীরও না। নির্ধারিত সময়ে গিয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছে। মনে মনে মফস্সলের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চর্চা করেছে। কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরলে মা তার তীব্র আপত্তির কথা জানান। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল চেষ্টা করলে যে কোনও প্রথম শ্রেণির প্রতিষ্ঠানে উপলার উৎরে যাওয়া সম্ভব। সরকারি চাকরি ছাড়া নিয়ে কিছুটা দোটানায় ভুগলেও শেষ পর্যন্ত কনভিন্সড হয় উপলা। চাকরির পাশাপাশি চলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দেওয়া। এক সময় কাজ পেয়ে যায় প্রথম সারির স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে।

নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েই টের পায় এখানে ক্যারিয়ার করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা। অন্যান্য সুবিধার মধ্যে সবচেয়ে বড় সুবিধা এ চাকরিতে বদলি নেই। ঢাকা ছাড়তে হবে না কখনও। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন মা। উপলাও খুশি। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের দিন গুনতে হবে না। পরে ভেবেছে, মা কি দূরদর্শী চিন্তাই না করেছিলেন। শিক্ষা ক্যাডারের সেই সরকারি  চাকরিতে থাকলে নিজের ভেতরের এত সম্ভাবনার হদিস কখনও জানাই হতো না হয়ত। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দেয়। আরও উন্নতি করার নেশা পেয়ে বসে উপলাকে।

সেই উন্মাতাল ছুটে চলা দিনে তার প্রেগন্যান্সি টেস্টে পজিটিভ রিপোর্ট আসে। মায়ের বাসা, নিজের বাসা করে কেটে যায় আর্লি স্টেজের দিনগুলো। মর্নিং সিকনেস খানিকটা ভুগিয়েছে, নইলে পুরো প্রেগন্যান্সি ওর কেটেছে ঝামেলাহীনই। উপলা তখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। অফিস, সংসার ও নিজেকে দক্ষ হাতে সামলেছে। অফিসে নিজের অবস্থান দৃঢ় হচ্ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তার পটেনশিয়ালিটির স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে। এ সময় অনিবার্য না হলে উপলা মাতৃত্বকালীন ছুটিও  বাতিল করত।

সন্তানের জন্ম হয়েছিল বারডেম হাসপাতালে।

পাঁচ

সব কিছুতে সাফল্য ঘিরে থাকা উপলা জীবনের নেতিবাচক সিদ্ধান্ত মানতে পারছিল না কিছুতেই। এমন হতে পারে তা ছিল ওর কল্পনার অতীত। স্বামী, মা, পরিবারের অন্যরা প্রাথমিক মর্মবেদনা কাটিয়ে মেনে নিয়েছিল। এর পেছনে কারও হাত নেই, যা হওয়ার হয়েছে, এই মেনে নিতে হবে―এমন মনোভাবে থিতু হয়েছিল সবাই। উপলা ছিল শুধু অস্থির। কতটা, তা বাইরে থেকে আঁচ করা সম্ভব ছিল না কারওর পক্ষে। একে ও নিজের পরাজয় মনে করে ভেতরে ভেতরে গুমরে মরেছে। জন্মের পর পর হাসপাতালেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মত দিয়েছিলেন, ‘যে ধরনের বৈকল্য, সারিয়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’ ডান পা ভাঁজ হয়ে মিশে আছে পেলভিসের সঙ্গে। বাঁ পায়ের অস্তিত্বই নেই। হাতের অবস্থাও তেমন। ডান হাত বাঁকা হয়ে উল্টে আছে। বাঁ হাতের জায়গায় কয়েকটা আঙ্গুল শুধু। এমন বিসদৃশ শিশু চিকিৎসকদেরও অবাক করেছে। কি কারণে এমন হলো তারাও ঠিক বুঝতে পারছিলেন না।

সপ্তাহখানেক পর হাসপাতাল থেকে বাসায় এলে আত্মীয়স্বজনের ঢল নামে। নানাজনের নানা মন্তব্য উপলাকে আরও বিচলিত করে। যদিও বাইরে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাত না। নিজের সঙ্গে নিজের তুমুল যুদ্ধ চলে। এ মেয়ে বড় হতে হতে কি কি শারীরিক প্রতিকূলতা ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে ভাবতে গিয়ে শিউরে ওঠে। শুধু মেয়ে তো নয় গোটা পরিবারকেই সামাজিক হয়রানি পোহাতে হবে পদে পদে।

নিজের কাজ, ক্যারিয়ার, ভবিষ্যত সব সামনে এসে ভিড় করে। উ™£ান্তের মতো সময় কাটে উপলার। তারপর… এক হিম সন্ধ্যায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

দু’সপ্তাহের শিশুর নাসারন্ধ্র কতটুকুই বা অক্সিজেন নিতে পারে। পূর্ণ বয়স্ক মানুষের পক্ষে সেপথ বন্ধ করা মুহূর্তের ব্যাপার।

ছয়

কোথাও কোনও ছন্দপতন হয়নি। কারও পক্ষেই কোনও অস্বাভাবিকতা আঁচ করা সম্ভব ছিল না। ও রকম বিকলাঙ্গ শিশুর বেঁচে থাকাই ছিল যেন অস্বাভাবিক।

মাতৃত্বকালীন ছুটি পুরো কাটাতে হয়নি উপলাকে। ক’দিন পরই যোগ দিয়েছিল কাজে। সব কিছু আবার চলেছে আগের মতো দৈনন্দিন রুটিনে। যেন এক দুঃস্বপ্নের রাত শেষে শুরু হয়েছে নতুন দিন। সন্তানের জন্ম এবং মৃত্যুর ঘটনা যেন ঘটেইনি।

দ্বিগুণ উৎসাহে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে উপলা। একটি একটি করে সাফল্যের সিঁড়ি টপকেছে। দু’বছরের ব্যবধানে দুটো সন্তান হয়েছে আবার। স্বাভাবিক, ফুটফুটে। তাদের পরিচর্যা, অফিস, সংসার―সব মিলে উপলার জীবন তখন মধ্য গগনে জ্বলজ্বলে সূর্য। দুর্দান্ত কর্মমুখর। কোনও দিকে তাকানোর অবকাশ নেই, সময় নেই কিছু ভাবার।

সাত

রিহ্যাব সেন্টারে দাপ্তরিক কাজে খুব বেশি স্টাফ নেই। শিক্ষক, প্রশিক্ষক, বিভিন্ন ধরনের থেরাপিস্টই বেশি। অনেকের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছে এরই মধ্যে। তারাই সারপ্রাইজ দিল। কি করে জানল এরা ? ফেইসবুকের নোটিফিকেশন অফ করা। কাউকে বলেওনি কখনও। অফিসে জমা দেওয়া সনদপত্র থেকে কি ? হতে পারে। দুপুরের পর এক মনে কাজ করছিল উপলা। হঠাৎ ফুল আর কেক নিয়ে কোত্থেকে সব হুড়মুড়িয়ে এসে জড়ো হয় টেবিলের চারপাশ ঘিরে। ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগায় ভরে যায় মন। ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশ সময় গত রাত বারোটায় উইশ করেছে। মহুয়া স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু গ্র্যান্ড মা’ লেখা কেক কেটেছে। কথপোকথন শেষে সেই নিয়মিত অনুযোগ ‘মা, কেন একা পড়ে আছ ওখানে ? চলে এসো। উপলা বরাবরের মতো হেসেছে। জানে, কখনই ও দেশে থাকতে যাবে না সে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কর্মক্ষম থেকে দেশেই কাজ করতে করতে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চায়।

ফুল, কেক নিয়ে যারা এসেছে, তাদের মধ্যে ক’জন অভিভাবকও আছেন। টুসি নামে বছর পাঁচেকের ডান পাহীন এক মেয়ের মাও এসেছেন মেয়েকে নিয়ে। ক্র্যাচে ভর করে হাঁটার অভ্যাস করান হচ্ছে টুসিকে। কিছুতেই ক্র্যাচ ধরে রাখতে পারে না। যতবার ধরিয়ে দেয়া হয়, হাঁটতে গিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। মেয়েকে আজ সাদা ফ্রক পরিয়ে এনেছে মা। উপলা এক মুহূর্ত থমকে যায়। ঠিক যেন স্বপ্নে দেখা সাদা ফ্রক পরা সেই শিশু! শুধু এর একটি পা নেই। আর ও নাচের তালে শরীর দুলিয়ে দু’পায়ে হাঁটে।

আট

রাতের খাবার খেয়ে পত্রিকা পড়তে পড়তে বেশ হাল্কা মেজাজে ঘুমোতে যায় উপলা। বহুদিন পর আজ একটা আনন্দমুখর জন্মদিন পার হলো। অবসর জীবনের একাকিত্বের কালে ছেলেমেয়েরা দূর থেকে কেক কেটে উইশ করেছে। ওটুকুই বছরের অন্য সব দিন থেকে দিনটিকে আলাদা বিশেষত্ব দিত।

সাধারণত রাত বারোটার মধ্যে শুতে গেলেও আজ একটু তাড়াতাড়িই চোখ লেগে আসে। হাতে ধরা পত্রিকা পড়ে যায় এক পাশে। কাত হয়ে শোয় উপলা। তন্দ্রায় নাকি অবচেতনে দূর থেকে শুনতে পায় ক্র্যাচের খুট খুট আওয়াজ। ক্রমশ কাছে আসে… ‘টুসি এলে! আরে টুসী, হাঁটতে শিখে গেছ তুমি! টুসি… টুসি…! টুসি কই, না না তার হাত ধরে আনন্দে লাফাতে লাফাতে হাঁটছে তো… হাঁটছে তো… যেতে যেতে সেই পাহাড় চূড়া… সেই… তারপর তীব্র সেই চিৎকার… ‘মা… আমায় ফেলে দিলে… মা…।’

উপলা ধড়ফড় করে উঠে বসে বিছানায়। বেড সাইড টেবিল থেকে জলভরা গ্লাস তুলে নেয়। ধীর পায়ে খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। আকাশ আলো করে জ্বলজ্বল করছে ধবধবে চাঁদ। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখনও যা হয়নি, দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখের কোল বেয়ে…’

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares