সুব্রত বড়ুয়ার গল্পের ভুবন ‘গল্প নেই―ঘটনা আছে’ : তারেক রেজা
সুব্রত বড়ুয়ার সাহিত্যকর্ম : আলোচনা
সাহিত্যের যেকোনও মাধ্যমই মূলত পাঠকের অনুভব ও উপলব্ধি, বোধ ও বুদ্ধি, চিন্তা ও রুচির মানদণ্ডে বিশেষ মূল্য ও মর্যাদা লাভ করে। সৃষ্টিশীল মানুষের অন্তর্লোকের যে অংশটুকু পাঠকের মন ও মগজে আলোড়ন তোলে, তা দিয়ে হয়তো কোনও রকমে কাজ চালানো যায়। কিন্তু আমাদের আগ্রহ যখন সেই কাজের অধিক কিছুর দিকে ধাবমান, তখন পাঠককেও সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে হয়। পাঠকের এই সৃষ্টিশীলতা যে নামেই সম্বোধন করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত মূল রচনার কাঁধে চেপে তাঁর নিজের কথাগুলোও গতিপ্রাপ্ত হয়। তাতে লেখকের সৃষ্টির বিশেষ কোনও ক্ষতির আশঙ্কা আছে বলে আমার মনে হয় না বরং কখনও কখনও মূল্যবৃদ্ধির মতো মহিমান্বিত গল্প ও ঘটনার জন্ম হয়। এসব নবোত্থিত গল্প-ঘটনার নিকটবর্তী হওয়ার প্রণোদনা যেসব রচনার শরীরে সুপ্ত থাকে, আমাদের প্রতিভাবান শিল্পসমালোচকবৃন্দের বিবেচনায় তা কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি হিসেবে চিহ্নিত। সুব্রত বড়ুয়ার গল্পপাঠের অভিজ্ঞতা আমাকে কীভাবে প্রাণিত করেছে, ‘তারি দু-চারিটি অশ্রু’ বর্তমান নিবন্ধের নানা স্থানে হয়তো ছড়িয়ে পড়বে। আর যা কিছু তা নিশ্চয়ই কথার কথা নয়, সুব্রত বড়ুয়ার গল্পেরই কথা। তবে সেই কথামালার ভাঁজ খুললে যে ‘নবোত্থিত গল্প-ঘটনা’র আস্বাদন মিলবে, পাঠক হয়তো সেখানেই নতুন এক সুব্রত বড়ুয়ার দেখা পাবেন, যাকে ‘আমি আপনার মনের মাধুরী মিশায়ে’ নির্মাণ করে নিয়েছি।
গল্পকার হিসেবে সুব্রত বড়ুয়াকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনও প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশের ছোটগল্পের ইতিহাস সম্পর্কে যাঁদের জানাশোনা আছে, বাংলা ছোটগল্পের সদর-অন্দরে অনুপ্রবেশের আগ্রহ যাঁদের আছে, সুব্রত বড়ুয়া নিশ্চয়ই তাঁদের নিকটাত্মীয়। জোনাকি শহর (১৯৭০), কাচপোকা (১৯৭৫), অনধিকার (১৯৭৭), আত্মচরিত ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৯), ভালোবাসা ভালোবাসা (১৯৮৯), তৃণা (১৯৯৩)―গল্পের বইয়ে এসব নাম অনেকেই এক নিশ্বাসে বলে দিতে পারবেন। আর তাঁর গল্পের অনেক ঘটনা ও চরিত্রের কথাও আমি অগ্রজ, সমবয়সি এমনকি তরুণতর গল্পপাঠকের মুখে শুনেছি যা আমার মতো কবিতাপ্রেমিক দুর্বল পাঠককেও সুব্রত বড়ুয়ার গল্পের দিকে টেনে নিয়ে গেছে। আমার গল্পপাঠ অনেকটা কবিতাপাঠের মতোই। কারণ আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্যের অন্য যেকোনও শাখার তুলনায় ছোটগল্পের সঙ্গেই কবিতার ভাব ও বোঝাপড়া অধিক। এই আধিক্যের কারণ বা সূত্র নির্দেশ করা আমার কাজ নয়। তবে আমার গল্প-বিষয়ক যেকোনও আলোচনা পাঠ করলে পাঠক তা ধরতে পারবেন, যদিও এই ধরতে পারাটা জরুরি বলে আমার মনে হয় না। তবে এটুকু বলে রাখি, কবিতার মতো করে গল্প পড়ার প্রণোদনাও কালজয়ী গল্পকারদের সৃষ্টিকর্মেই নিবিড়ভাবে মুদ্রিত থাকে। সুব্রত বড়ুয়ার গল্পগুলোর গতরে কবিতার রসদ অর্থাৎ কবিতাপাঠের আরাম ও আনন্দ সুপ্তাবস্থায় বিরাজমান কি না ভেবে দেখা যেতে পারে।
সুব্রত বড়ুয়ার ছোটগল্পের আলোচনা থেকে গল্পকারের অভিপ্রায় ও অভিজ্ঞতার অংশীদার হওয়ার চেষ্টা করলে যেকোনও পাঠকই বঞ্চিত হবেন। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর চেষ্টা করা পাঠকের সঙ্গে এই গল্পকারের ভাব হওয়ার সংকীর্ণ গলিপথও খোলা নেই। আর তাঁর গল্প যে রাজপথের সঙ্গে পাঠককে মিলিয়ে দিতে চায়, সেই পথের নাম যা-ই হোক, গন্তব্যের নাম হৃদয়পুর। সেখানে সেই অর্থে কোনও গল্প নেই, ঘটনা আছে এবং সেই ঘটনাও বিশেষ কোনও বিস্ময়কর রঙ্গমঞ্চের প্রতিভাস রচনা করে না। তাঁকে পাঠ করতে করতে পাঠককে গল্পকারের কথা ভুলে গিয়ে বারবার নিজের দিকে তাকাতে হয়। তাঁর জীবনের গল্প নয়, ঘটনাবলির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেয়ার এক দুর্দান্ত দর্পণ হয়ে ওঠে সুব্রতের গল্প। হাতের কাছে নড়েচড়ে, অথচ জনমভর খুঁজলেও যার দেখা মেলে না―এমন অনুষঙ্গে ভরপুর লালনের গানের কথা হয়তো এখানে বলা যায় কিন্তু লালনের গান যে আধ্যাত্মিক আবহের দিকে ঠেলে দেয়, সেই দিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই সুব্রতের। তিনি যাপিতজীবনের এমন সব বিষয় গল্পের ছলে গেঁথে দেন যেগুলো আমাদের জীবনের অনিবার্য অংশ হলেও অনবধানতাবশত দৃষ্টির অগোচরে থেকে গেছে।
জ্যোতিষশাস্ত্রে অবিশ্বাসী মানুষও কখনও কখনও পরম উৎসাহে জ্যোতিষীর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, ভাগ্যে অবিশ্বাসী মানুষও অদৃষ্টের কাঁধে দোষ চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিত হতে চায়। সুব্রত বড়ুয়ার ‘নিরন্তর’ গল্পে এমন একজন মানুষের দেখা মেলে যিনি সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের বন্ধু আশরাফ আজিজের অনুরোধে একজন অন্ধ বুজুর্গ হাফিজ সাহেবের সঙ্গে দেখা করেন, যাঁর অন্তর্দৃষ্টিজাত বয়ান এই গল্পের কথককে জীবন ও যাপন সম্পর্কে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে। এই সিদ্ধান্ত গল্পটিতে মুখ্য হয়ে ওঠেনি। হাফিজ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার যে পথ, সেই পথের বর্ণনাই পাঠকের মুগ্ধতাকে ধরে রাখে। গল্পের কথককে অন্ধ হাফিজ বলেছিলেন, ‘আপনার মধ্যে একটা শক্তি আছে। এ শক্তি খুব কম মানুষেরই থাকে। আপনি যদি দিল থেকে কাউকে ঘৃণা করেন, তার ক্ষতি কামনা করেন―তাহলে সেই লোকের ক্ষতি হবে। কিন্তু একটা কথা―এরপর সে শক্তি আর আপনার মধ্যে থাকবে না।’ একথা বলার পর কথকের কাছে নিজের জন্যই দোয়া চেয়েছিলেন সেই অন্ধ সাধক। চল্লিশ বছর আগের কথাটি এখনও নেড়েচেড়ে দেখেন কথক, অনুধাবন করেন―‘আসলে হাফিজ সাহেব হয়তো চেয়েছিলেন, আমি যেন নিজেকে জয় করতে পারি।’ এমন ঘটনা আমাদের অনেকের জীবনেই ঘটে কিন্তু নিজেকে জয় করার জন্য নিজের ভেতরের নেতিবাচক প্রবৃত্তিগুলো বিসর্জন দিই না। সেই অন্ধ হাফিজের সততা কিংবা ভণ্ডামি অর্থাৎ তাঁর ভেতরের খবর জানার আগ্রহ আমাদের নেই কিন্তু নিজেকে জয় করার যে শক্তির হদিস তিনি দিয়েছিলেন তা একটি জীবনকে আলোর দিকে টেনে নিয়ে গেছে। সুব্রত বড়ুয়ার গল্পের প্রবণতা অনুধাবনের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে আমি গল্পটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। গল্পে তিনি দৃশ্যত বিশেষ কিছু বলেন না, কিন্তু যা বলেন তা জীবনকে বদলে দেওয়ার তাৎপর্যপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
ধার করে টাকা ফেরত না দেওয়া দু-চারজন বন্ধু সবার জীবনেই থাকে। সেই গল্প আমরা সবাইকে বলি না কিংবা বললেও এই নিরস গল্প শোনার ধৈর্য আমাদের কাছের মানুষের থাকার কথা নয়। কিন্তু সুব্রত বড়ুয়া যখন বলেন তখন আমাদের শুনতে হয়। ‘ছেদ’ গল্পের বিত্তবান আতিক সাহেব দুর্দিনে বন্ধু সায়ীদের কাছ থেকে নেয়া ধারের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য গেছেন, এটা বলে বেড়ানোর মতো কোনও বিষয় নয়। আতিকের বিত্তবান হওয়ার যে গল্প তিনি বলেন, সেই গল্পের আতিকেরা আমাদের চারপাশেই ঘোরাঘুরি করে। ধূর্ত-ভণ্ড-প্রতারকদের উপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত মানুষের ভাগ্য এই গল্পের সায়ীদ সাহেবের মতোই নিরানন্দ, নিষ্প্রভ, নিস্তরঙ্গ। ফলে ফোকাস বিন্দু তাই এই ধারের টাকা নয়, আতিক সাহেবের অন্তর্গত ভাবনা-চিন্তার বিচিত্র প্রান্ত। আতিক সাহেব বিশ্বাস করেন, ‘নিয়ম-নীতির বাইরেও মানুষকে পা ফেলতে হয় এবং তা কোনও ভাবেই অপরাধ হতে পারে না।’ সায়ীদের বাসায় গিয়েও আতিক টাকা না দিয়েই ফেরত আসে। টাকাটা কেন সায়ীদকে ফেরত দেওয়া হয় না, সেটাও বুঝতে পারে না আতিক। ‘আসলে টাকাই তো… ?’ ―এই বলে গল্পের সমাপ্তি টানেন সুব্রত বড়ুয়া। দুই বন্ধুর মধ্যে যে বিচ্ছেদের দেওয়াল তৈরি হয়ে গেছে, সেই দেওয়ালের ইট-বালি-সিমেন্ট সরবরাহ করেন গল্পকার―এসব উপাদানের পুরোটাই এই গল্পে ব্যবহৃত হয় না, পাঠকের মনে এ জাতীয় আরও অনেক গল্পের জন্ম হতে থাকে।
সুব্রত বড়ুয়ার গল্প অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশেষ কোনও গন্তব্য নির্দেশ করে না। এমনকি গল্পের নাম যখন ‘গন্তব্য’ তখনও এমন কোনও লক্ষ্যবস্তুর দিকে তিনি যাত্রা করেন না যেখানে পাঠকের জন্য বিস্ময়কর কিছু অপেক্ষা করে। এই গল্পের রূপসুন্দরপুর গ্রামের কথা কথক জেনেছেন একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন পড়ে যেখানে আর্টিস্ট দেবীপদের নানা সৃষ্টির বিস্তর বর্ণনা ছিল। এই প্রতিবেদনের সূত্রেই কথকের স্কুলজীবনের বন্ধুর কথা মনে পড়ে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে বিপর্যস্ত বন্ধুর বর্ণনা দিয়েছেন কথক। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি সাইনবোর্ড লেখার কাজ করত সে। এই মেধাবী ছেলেটির কাছে কথকের পরাজিত হওয়ার কথা আমরা জানতে পারি। একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় দেবীপদ। আর গল্পের কথক পড়াশোনা শেষ করে মোটামুটি একটি সম্মানজনক জায়গায় পৌঁছে গেছে। স্মৃতির ভেতর দিয়ে স্কুলজীবন নেড়েচেড়ে দেখার একটা সুযোগ হয়েছে তার। কেবল নামের সাদৃশ্যের কারণে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রূপসুন্দরপুর পৌঁছে যাওয়ার ঘটনায় কথক নিজেই বিস্মিত। আর পাঠকের বিস্ময় জাগে, অচেনা রূপসুন্দরপুর পৌঁছানোর দীর্ঘ পথের বর্ণনা যা চলচ্ছবির মতো পাঠককে গ্রামীণ জনপদে পরিভ্রমণের আনন্দ দেয়। ‘মানুষের জীবনে কত কিছুই না হয়, ঘটে’―এই গল্পের শেষ এভাবেই। কিন্তু গল্পটির কোথাও সেই অর্থে গল্পের কিছু নেই। কিন্তু জীবন আছে, যে জীবন জয়পরাজয় বিবেচনার ভিন্নতর একটি মানদণ্ড নির্মাণ করতে শেখায়।
‘একজন রমণীমোহন’ গল্পের নামকরণের মধ্যে একটা মজার ব্যাপার আছে। এই গল্পের প্রধান চরিত্রের নারী-সম্ভোগে যথেষ্ট আগ্রহ আছে, বয়সের কাছে পরাজয় না মেনেই জীবন ও যৌনতাকে বিশেষভাবে উপভোগে পারদর্শী সে। কিন্তু এ কারণে গল্পের এ রকম নামকরণ নয়, এটাই একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর নাম। তার কোনও সুনাম আছে বলে মনে হয় না। বরং টাকার কুমির হিসেবে তিনি বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। এই নামের কারণে কি না জানি না কিন্তু সত্তরোর্ধ্ব মানুষটি শরীর স্বাস্থ্যের দিকে যথেষ্ট মনোযোগী। কারণ চল্লিশ না পেরুনো তৃতীয় স্ত্রীকে এখনও তিনি যথেষ্ট সুখ দেন বলে জনশ্রুতি আছে। রমণীমোহনের জীবনযাপনের দীর্ঘ ও রসালো বর্ণনা দিয়েছেন গল্পকার। ব্যবসা-চালানো, প্রতিপত্তি লাভের প্রতিটি বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগ তাকে আজকের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। সোনার চামচ মুখে নিয়ে তিনি জন্মাননি কিন্তু জীবনে সোনা ফলানোর করণকৌশল তিনি রপ্ত করেছেন। এই যারপর নাই কৃপণ লোকটি এই বয়সেও সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখেন। টিকেটের অভাব হলে কালোবাজারির কাছ থেকে বেশি দামে টিকেট কিনতেও সে কুণ্ঠিত নয়। তার নামকরণের সার্থকতা বোঝা যায়, যখন তিনি সিনেমার নায়িকার শরীর নিয়ে গবেষণা করেন―‘নায়িকাটি চমৎকার। ছিমছাম শরীর। ওই রকম শরীর রমণীমোহনের ভারি পছন্দ। পাকাল মাছের মতো বেশ ছিনাল ভাবখানা আছে বটে।’ এই কৃপণ মানুষই ছবি দেখার আনন্দে ফেরার পথে বাচ্চা কোলে ঘুরে বেড়ানো ভিখিরির থালায় চার আনা পয়সা ছুঁড়ে মারে, যা ভিখারিকেও বিস্মিত করে। গল্পকার আমাদের জানিয়েছেন, রমণীমোহন কৃপণ হলেও অসুখী নয়। এই গল্পের ‘উপসংহারে’ সুব্রত বড়ুয়া লিখেছেন, ‘তিন দিনের জ্বর ভোগের পর সজ্ঞানে নির্ভেজাল ভালো স্বাস্থ্য নিয়ে রমণীমোহন মৃত্যুবরণ করলেন তাঁর সাতটি ছেলে, দুটি মেয়ে ও তিন পত্নীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে।’ অর্থাৎ কোনও গল্প শোনালেন না গল্পকার। একজন রমণীমোহনকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন মাত্র।
‘নিজামউদ্দিনের নগর দর্শন’ গল্পে নগর দর্শনের চেয়ে জীবনদর্শন অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রাম থেকে শহরে ছেলের সংসারে এসে বদলে যাওয়া ঢাকা শহরের নানা দৃশ্য এই গল্পে ধরা পড়েছে বটে কিন্তু তাকে সবচেয়ে বেশি আহত করেছে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। শহুরে চাকুরে শামসুদ্দিনের সংসারের নানা কথা এতে উঠে এসেছে, যেগুলো সেই অর্থে বলার মতো কিছু নয়। কিন্তু নিজামউদ্দিনের শৈশব-যৌবনের দিনগুলোর কথা স্মৃতির কাঁধে ভর করে গল্পে জায়গা করে নিয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে গল্পে ঠাঁই পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল দিনগুলোর স্মৃতি, যখন রক্তাক্ত ঢাকা ছেড়ে পুত্র শামসুদ্দিন তার তিন-চার মাস বয়সি পুত্রকে নিয়ে গ্রামে বাবা-মায়ের কাছে ফিরেছিলেন―সেটা ছিল একাত্তর সালের এপ্রিল মাস। পঁচিশে মার্চের রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি আর্মির বর্বর আক্রমণের খবর পেয়েছিলেন তিনি ছাব্বিশে মার্চেই। নিজামউদ্দিন রাজনীতি-সচেতন মানুষ। চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনে তিনিও অংশ নিয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তাকে আহত করেছে, বিশাল অট্টালিকার সামনের ফুটপাতে নিরন্ন মানুষের রাতযাপনের দৃশ্য তাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। ফলে তার ভেতরে জেগে উঠেছে সাম্যবাদপুষ্ট গভীর আত্মবিশ্বাস―‘নিজামউদ্দিনের মনে হয়, একদিন ওই ফুটপাতের মানুষগুলোর সংখ্যা হয়তো সারা ঢাকা শহরের সুখী লোকদের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। তখন ? তখন কী হবে ?’ নিজামউদ্দিনের কথার অর্ধেক সত্যি হয়েছে―ঢাকা শহরে নিরন্ন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু এই বেশির ভাগ মানুষের সংঘবদ্ধ সংগ্রামের কোনও দৃশ্যপট এখনও রচিত হয়নি।
সুব্রত বড়ুয়া ‘দিনাতিপাত’ গল্পের নায়কের মধ্যে কবিপ্রতিভার উন্মেষের কথা বলেছেন কিন্তু বিকাশপর্ব চিত্রিত হয়নি। গল্পের নায়কের দিনগুলো অনেকটা নিস্তরঙ্গ কেটে যায়। মনুষ্যত্বহীনতার নানা ছবি তার চোখের সামনে পর্দা তোলে এবং সে রক্তাক্ত হয়―‘রক্তহীন রক্তপাতে সে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে―যেন জীবন তাকে নিয়ে নিরন্তর খেলা করে, অদৃশ্য সুতোয় সে ঝুলতে থাকে ত্রিশঙ্কু শূন্যে। এই তার বেঁচে থাকা কিংবা বেঁচে না থাকা।’ এই গল্পের নায়কের ভাবনাচিন্তার মধ্যে কোনও শৃঙ্খলা নেই। এলোমেলোভাবে শহরের নানা দৃশ্য ভেসে ওঠে তার চোখে। যে মেয়েটি তাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল সেই মেয়ের মুখও সে স্পষ্ট মনে করতে পারে না। গল্পকার জানাচ্ছেন―‘মানুষগুলো তার চোখে লিট্ল্ ডেভিড হয়ে যায়, দৈত্য হয়ে ওঠে ডবল ডেকার, সুন্দরী তরুণী সুবিন্যস্ত বেণি তার চোখের সামনে লাফিয়ে ওঠে।’ পঁচিশে মার্চের ভয়াল দৃশ্যপট নায়কের কল্পনার কাঁধে ভর করে এই গল্পেও জায়গা করে নিয়েছে।
‘অপরূপের খোঁজে’ সুব্রত বড়ুয়ার একটি অসাধারণ গল্প যেখানে রূপ ও অরূপের চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে। এই গল্পের অবনীশকে আমরা পরবর্তী আরও বেশ কয়েকটি গল্পে খুঁজে পাব। এই গল্পে স্মৃতি-নির্ভর প্রেমের আলেখ্য মুদ্রিত হয়েছে। নিঃসঙ্গ অবনীশের স্বপ্নসঙ্গী যে বালিকারা, তারা নানা রূপে অবনীশের নির্ঘুম রাতকে দীর্ঘতর করে তোলে। নিঃসঙ্গতার জঠর থেকে জন্ম নেয়া মৃত্যুচেতনাও এই গল্পের বিরাট জায়গা দখল করে নিয়েছে, যদিও মানুষের মৃত্যু নয়, টমি নামক একটি কুকুরের মৃত্যু তাকে কীভাবে বিধ্বস্ত করেছিল, সেই গল্প প্রাধান্য পেয়েছে। মনীষা রায় নামের মেয়েটির সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল অবনীশের। মনীষাদের খুব কাছেই অবস্থান করছে সে কিন্তু কিছুতেই মনীষার সঙ্গে তার দেখা করা হয় না। উপায় হয়তো আছে কিন্তু ইচ্ছে নেই। মনীষাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায় না সে―‘আমি অবনীশ। তুমি মনীষা রায়। এবং আমাদের মাঝে এক অদৃশ্য দেওয়াল।’ সুব্রত বড়ুয়ার কোনও গল্পের নায়কই দেয়াল ভাঙার দুঃসাহস দেখায় না। এরা একাকী দুঃখ ও নিঃসঙ্গতাকে উদ্যাপন করে। তাদের প্রিয় গান―‘বেদনা মধুর হয়ে যায় তুমি যখন দাও।’ মনীষার সঙ্গে প্রেম ও বিরহযাপনের যে দীর্ঘ বয়ান এই গল্পে উপস্থিত তা আমাদের আলোচনায় অনুধাবনসম্ভব হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। মনীষার মতোই আরেকজন, অবনীশের শেফালিদির সঙ্গেও অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল কিন্তু সাহসের অভাবে তেমন কিছুই ঘটেনি। শেফালিদির পরিচিত মনীষার ব্যর্থ প্রেমিক অবনীশকে সে সান্ত¦না দেয়, স্পর্শও দেয় কিন্তু কোথায় যেন একটা দূরত্ব থেকে যায়। এই দূরত্বের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, গতি ও গভীরতা অনুধাবনের জন্য আমাদের নামতে হবে মানুষের মনের গহনে, কিন্তু ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে ?’ ‘অরূপের খোঁজে’ গল্প নিয়ে অনেক কথা বলা যায় কিন্তু অনেক বলার পরও মনে হবে কিছুই হয়তো বলা হলো না। এই গল্পের বিরহকাতর যুবক, নিংসঙ্গ প্রেমিক ও স্মৃতিভারাক্রান্ত ব্যর্থ মানুষটির মুখে অসাধারণ সব কবিত্বদৃপ্ত পঙ্ক্তিজুড়ে দিয়েছেন গল্পকার। কয়েকটি দৃষ্টান্ত হাজির করি―
ক) পুরনো ঘড়ির কাটা ঘষা কাচের নিচে ডায়ালের কাঁটায় কালো বেড়ালের চোখের মতো রেডিয়ামের জ্বলজ্বল আলো ছিল।
খ) শব্দগুলো শেষ রাতের চাপা স্তব্ধতার বুকের ওপর সুড়সুড়ি দিয়ে যেতে লাগল।
গ) এতক্ষণ চড়ায় আটকে থাকা বাঁশের বাঁধা চালি পোয়াতি রমণীর মতো স্রোতের বুকে গা ভাসিয়ে।
ঘ) উদ্ধত যুবকের মতো মাস্তুল আর পাখির বাসার মতো জাহাজ।
ঙ) রোদের তাতে ধুকতে ধুকতে বিশালদেহিনী মহিলার পিঠের মতো রাস্তার পিচ ঘামবে এবার।
চ) চারপাশে ব্যস্ততার অরণ্যানির মাঝে বুড়ো অক্ষয় বটের মতোই অবনীশ সুস্থির-অস্থির।
ছ) বালতির টলমলে কালো জল যেন অন্তরঙ্গ বাসনার স্রোত।
জ) নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার লোভের মতো শেফালিদির সঙ্গে এই এক জায়গা নামক আকর্ষণীয় আমন্ত্রণে যাবার একটি দুর্বিনীত ইচ্ছা সারাক্ষণ অবনীশকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
উদ্ধৃতি আরও বাড়ানো যায়। কিন্তু পাঠকের ধৈর্যেরও নিশ্চয়ই একটা সীমা আছে। মনীষার জন্য দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অবনীশ। কিন্তু শেফালিদির শরীরের প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ করতেও সে কুণ্ঠিত নয়। লেখক জানাচ্ছেন, ‘সব মিলিয়ে অবনীশ একটা অপরূপ চেতনায় আচ্ছন্ন ছিল, যেটা কালো গুঁড়ো বৃষ্টির মতো শরীরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু কিছুতেই সিক্ত একাকার করতে পারছে না।’ অবনীশ লক্ষ্য করে, ‘বরফের গুঁড়োর মতো বাতির আলোরা হালকা নীল শাড়ির শেফালিদির সারা শরীরে ঝরতে লাগল অজস্র।’ শেফালিদি অবনীশের মতো অক্ষম অপদার্থ নয়। ফলে শূন্য ঘরে এই তৃষ্ণার্ত পুরুষকে একা পেয়ে সে তার নিজের কাজটি ঠিকমতোই করে নিয়েছে―‘সহসা অবনীশ কিছু বুঝে উঠবার আগেই কাঁধের ওপর হাত দিয়ে অবনীশকে টেনে শেফালিদি চুমোয় চুমোয় তার ঠোঁট আর মুখ আচ্ছন্ন করে দিলেন।’ আরও অনেক দূর এগুনোর সুযোগ ছিল। কিন্তু অবনীশের ভাবনা তখন হৃদয়ের ঔজ্বল্য অক্ষুণ্ন রাখার দিকে ঝুঁকে পড়েছে―‘তারপর অবনীশ একটা উজ্জ্বল ঝুলন্ত হৃদয় নিয়ে বেরিয়ে এল রাজপথে। অথচ হায়! পৃথিবীর বোকা মানুষগুলো, যারা বর্তমানকে নিঙড়ে খাচ্ছে জানোয়ারের মতো উল্লাসে, তারা খোঁজ পেলো না কোনও কিছুরই।’ গল্পের পাঠকের অবশ্য মনে হবে না, অবনীশ এমন কিছু পেয়েছে যা অন্য কেউ পায়নি বলে আক্ষেপ করতে পারে। অবনীশকে হয়তো আরও দীর্ঘ দীর্ঘ দিন অপরূপের খোঁজে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হবে।
সুব্রত বড়ুয়া অবনীশকে নিয়ে একটা বড়সড় উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না জানি না। কিন্তু ‘অপরূপের খোঁজে’ পাঠ করার পর ‘সুখের বাসর’, ‘জোনাকি শহর’, ‘নির্বাসন’, ‘অন্তর্গত স্বপ্ন’ ‘অবনীশের গল্প’―গল্পগুলো পাঠ করলে সেই রকম একটা চিন্তা পাঠকের মাথায় আসার কথা। গল্পগুলোতে অবনীশ আছে, আছে মনীষাও―সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু চরিত্র যারা অবনীশকে বুঝতে সাহায্য করে। মনীষার মানসগঠনের প্রবণতা অনুধাবনেরও সুযোগ করে দেয়। মনীষার কথা সে ভোলে না কিন্তু এই মনে রাখা অন্য মেয়েদের সঙ্গে অবনীশের ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টির প্রতিবন্ধকও হয়ে ওঠে না। ‘সুখের বাসর’ গল্পের নাম হতে পারতো স্বপ্নের বাসর, কারণ মনীষার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার স্মৃতিগুলো স্বপ্নের মতোই তাকে নাড়া দিয়ে গেছে। ‘জোনাকি শহর’ গল্পের নায়ক অবনীশ একজন গল্পকার যে দাবি করে, ‘ কোনও মিথ্যে মানুষকে আমি আমার কলম আর কথা দিয়ে আঁকতে পারিনি। কখনও আমি পারব না।’ অর্থাৎ সেই মনীষার মধ্যেই সে আবর্তিত হয় এবং পাঠককেও একজন মনীষাতেই নিমজ্জিত হতে হয়। এই গল্পের শেষে সুব্রত বড়ুয়া আমাদের জানাচ্ছেন, ‘এমনকি অস্তিত্বের সত্যের মতো মনীষার মুখটাও আর মনে পড়ল না অবনীশের। জন্মান্তরের মানুষের মতো মনীষারাও সব জোনাকি হয়ে গেছে!’ কিন্তু ‘নির্বাসন’ গল্পেও মনীষা ফিরে আসে। এই গল্পের রিনি-বৌদি পাঠককে কিছু সময়ের জন্য নাড়া দেয় বটে, তার জলের শব্দের মতো হাসিতে আমরাও নড়েচড়ে বসি কিন্তু অবনীশ আটকে থাকে মনীষায়। ‘অন্তর্গত স্বপ্ন’ গল্পে অবনীশ জানাচ্ছেন, ‘আমি পাথর চাইনে, চাই মাটির মতো নরম একতাল কাদা―যার শরীরে লেপ্টে আছে সোঁদা গন্ধ, আর সেই গন্ধে সমস্ত সত্তাকে ডুবিয়ে অবনীশ যেন ডুবে যেতে চাইলো।’ এই চাওয়াও স্বপ্নের মতোই, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়―‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে।’ অবনীশের চরিত্র আরও পরিস্ফুট করার প্রয়াস লক্ষ্য করি তার নাম গল্পে। ফলে ‘অবনীশের গল্প’ আসলে আলাদা কোনও গল্প নয়―অবনীশ-আশ্রয়ী গল্পগুলোর নির্যাস থেকে জন্ম নেয়া একটি শাখা-নদী মাত্র যার ঋণ মূলত মূল নদীর কাছে।
‘গ্রহণের কাল : বসন্ত’ গল্পের বসন্ত কোনও ঋতু নয়, মরণব্যাধি অসুখ, যার প্রভাবে জনপদে নেমে আসা মৃত্যুর ছায়া এই গল্পে ধরা পড়েছে। অবিনাশ বাবুর দৈনিন্দিন জীবন, অফিসের কাজকর্ম, ফিরে এসে সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়া―এসব নিয়ে এই গল্প। বসন্তের ভয়াবহ প্রভাব দেখানোর উদ্দেশ্যে গল্পকার লিখেছেন, ‘কালব্যাধিটা দুঃসাহসী ঈগলের মতো হাত উঁচিয়ে, থাবা ছড়িয়ে তাঁর ঘরের এত কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।’ তারপর অনেকগুলো মৃত্যুর খবর এই গল্পের বাতাস ভারি করে তুলেছে। অবিনাশের ছোট ছেলেটির খুব কাছের বন্ধুর মৃত্যুর পর অবনীশ আরও বেশি ভেঙে পড়েছে। এই ভেঙে পড়া অবিনাশকে গল্পের শেষে লেখক দেখাচ্ছেন এভাবে―‘অবিনাশ বাবু বুঝতেও পারলেন না তার দুচোখের কোনা থেকে জলের ধারা নেমে তাঁর মুখ চিবুক বেয়ে নিচে, আরও নিচে, মাটিতে পড়ে শুকিয়ে যাচ্ছে।’
‘আত্মপক্ষ’ গল্পের নায়ক টেলিফোনে একটি অপরিচিত নারীর কণ্ঠস্বর শোনার পর স্মৃতির সদর-অন্দর চষে বেড়ায়, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সমস্ত বান্ধবীর সঙ্গে তার সম্পর্কের গতিবিধি নিয়ে ভাবনায় ডুবে যায়। এই গল্পের নায়ক নিজেই গল্পকার। অতসীর গল্প লিখে জনপ্রিয় লেখক হয়ে উঠেছেন। এই গল্পের অতসী যার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু দীপিতার কথাও সে দীর্ঘক্ষণ নানাভাবে নাড়াচাড়া করতে থাকে। পথে পথে ঘুরে রেড়ানোর সময় দেখা হয় বন্ধু বিদেশি ওষুধ কোম্পানির সেলসম্যান রবিউলের সঙ্গে, যে জানায়, ‘বুঝলি! সেলসম্যান মানে বেশ্যা। তোকে সব জায়গায় তোর মাল দেখিয়ে বেড়াতে হবে। কেউ পছন্দ করলে তো বর্তে গেলি। শালা বেশ্যা নয়তো আর কি!’ এরপর গল্পের নায়ককে রবিউলের নারী-গমনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা শুনতে হয়, বিশেষ করে নারীর শরীর ও মন বিষয়ে রবিউলের যে ‘দার্শনিক’ অভিব্যক্তি, তা মনে রাখার মতো। অংশবিশেষ উদ্ধৃত করি―
‘আসলে শালা সব মেয়েই এক।’―রবিউিল প্রায় তুরীয় ভঙ্গিতে বলতে থাকে। ‘অন্ধকারে কাপড় খুললে তো আর কথাই নেই। আমি বাপ অইটুকু বুঝি। তোদের মতো অইসব প্রেমট্রেম অত সব আমি বুঝি না। আরে বেটা মেয়েরা প্রেমের বোঝেটা কি! একদম খালি―ঠনঠন। একবার দে লাগিয়ে, তারপর সব ঠিক। এই আমার ফিলসফি। বুঝলি ?’
এই গল্পের নায়কের নারী-বিষয়ক জানাশোনা অত গভীর বলে মনে হয় না। কিন্তু প্রেমে যে তারও খুব আস্থা আছে এমনটিও চোখে পড়ে না। বিশেষ করে সে যখন ভাবতে পারে―‘হাত বাড়ালেও কাউকে স্পর্শ করা যায় না―শুধু জড়ানো আঙুলের ফাঁক দিয়ে ফুরিয়ে যায় জীবন।’ এই জীবন কেবল অন্ধকারে আবর্তিত হয় এবং এই অন্ধকার অজগরের মতো ভয়াল থাবা বাড়িয়ে জীবন-যৌবন-ধনমান― সবকিছু গ্রাস করতে চায়।
সুব্রত বড়ুয়া ‘নান্দনিক’ গল্পে নন্দনতত্ত্বের উপযোগবাদ বা ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন। এই গল্পের নায়কও একজন গল্পকার। কিন্তু গল্পকার হিসেবে ভদ্রসমাজে খুব বেশি খ্যাতি অর্জন করেছেন বলে মনে হয় না। ফলে মিসেস চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার পরিচয় হলেও বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে না সে। এই মিসেস চৌধুরীই এই গল্পের প্রধান চরিত্র, সে অত্যন্ত সচেতনভাবে তার শরীর ও সৌন্দর্যকে ব্যবহার করে যেকোনও কাজ বাগিয়ে নিতে সিদ্ধহস্ত। ‘আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি’ জাতীয় উক্তির বদলে গল্পের নায়ককে মৃদু হাসির বেশি কিছু বলার প্রয়োজন হয় না। কারণ সে জানে, ‘ভদ্রসমাজের রীতি-নীতিই এমন যে, অনেক কিছুই অসহায়ের মতো হজম করতে হয়। এবং মিসেস চৌধুরীর মতো সুন্দরী ও সংস্কৃতি-প্রেমিকা মহিলা হলে তো কথাই নেই।’ এই ভদ্রমহিলার চরিত্র গল্পকার চিত্রিত করেছেন এভাবে― ‘মিসেস চৌধুরী কথা বলেন অনুচ্চ কণ্ঠে, ধীরে ধীরে। তাতেই তাঁর চোখের ভ্রু নেচে ওঠে, মসৃণ ফর্সা গালে টোল পড়ে এবং মাঝে-মধ্যেই সিল্কের চঞ্চল শাড়ির আঁচল স্খলিত হয় কাঁধ থেকে। তখন তাঁর নিটোল ফর্সা হাত, শাদা ব্লাউজের বাইরে মরাল গ্রীবা আর রহস্যময় দুটি চোখ উদ্ভাসিত হয়ে কাঁপতে থাকে চোখের ওপর।’ এত এত যোগ্যতাসম্পন্ন রমণীর কোনও কাজই অসাধ্য হওয়ার কথা নয়। গল্পের নায়ক একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চাকুরে হওয়ার সুবাদে এই রমণীকেও তার কাছে আসতে হয়। এই আসার ব্যাপারটা সহজ হয়ে ওঠে কথকের বন্ধু আজাহারের মধ্যস্থতায়। কথকের অফিসে মিসেস চৌধুরীর বসার ভঙ্গি গল্পকথকের ভাষায়, ‘তিনি এমনভাবে বসেছেন যে, আমি অনায়াসে তাঁর দেহের বিপজ্জনক সব বাঁক লক্ষ্য করতে পারি। কোমরের কাছ থেকে সরে গেছে বেয়াড়া শাড়ির প্রান্ত।’ মিসেস চৌধুরীর সঙ্গে কথকের বোঝাপড়া এখানেই শেষ হতে পারত কিন্তু আজাহার কথককে এই রমণীর বাসায়ও নিয়ে যায়। কারণ বড় কিছু আদায়ের জন্য তো বড় কিছ্ইু বিসর্জন দিতে হয়। বাসায় কাক্সিক্ষত কিছুই ঘটে বলে মনে হয় না কিন্তু এই রমণীর রূপের আগুনে কথকের ভেতরের পাথর গলে জল হতে শুরু করেছে। তাই গল্পের শেষে কথককে বলতে শুনি―‘আমি জানতাম, লোক্যাল পারচেজ সম্পর্কে তাঁর অনুরোধের কথাটি আমাদের পারচেজ ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার ইমতিয়াজকে অবশ্যই বলব আমি।’ এভাবেই নান্দনিকতার এক ভিন্নতর উপস্থাপনে গল্পটি আমাদের সময়-সমাজ বাস্তবতায় সদ্যজাত হয়ে ওঠে।

‘মধ্যাহ্নের পাখি’ গল্পে নন্দিতা ও সুমিত্রের ভালোবাসার গল্প যথারীতি বিরহের আবহেই আগাগোড়া মুদ্রিত হয়েছে। এই প্রথম নায়কের পরিবর্তে আমরা নায়িকাকে গল্পের শুরুতে সক্রিয় হতে দেখলাম। নন্দিতার সঙ্গে তার পুরনো প্রেমিক সুমিত্রের নিউ মার্কেটে আকস্মিক দেখা। সেই দেখা, কথাবার্তা এবং আগের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের স্মৃতিপুঞ্জ মাথায় নিয়ে আমরা নন্দিতাকে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। নিউমার্কেটে দুজনের দেখা নাও হতে পারত যদি নন্দিতার বোন সুনীতা মধ্যস্থতা না করত। নন্দিতা তার বরের কাছে দূরদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। বাংলাদেশের কোনও এক ভবঘুরে প্রেমিকের কথা হয়তো তার মনেও পড়বে না কোনও দিন। চলে যাওয়ার আগে দুজনের বিশেষ মুহূর্তের মণিমুক্তা নেড়েচেড়ে দেখা। নন্দিতা তার পুরনো প্রেমিককে বলছে, ‘আমার স্বামী এখানে আড়াই মাস ছিলেন। কত রাতই বা আমি তার উত্তপ্ত ক্ষমাহীন দেহের প্রচণ্ড তৃষ্ণা থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছি। তুমি যেদিন আমাকে প্রথম চুম্বন করেছিলে সেদিন আমি বারবার নিজের মনেই কেঁপে উঠেছিলাম।’ এই গল্পে আহামরি কিছু নেই। কিন্তু গল্পের শেষে গল্পকার একটি পাখির দিকে নন্দিতার দৃষ্টি গেঁথে দিয়েছেন। সেই পাখি আমাদের ভোরের পাখি―কাক। গল্পটির শেষ আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে ―‘নন্দিতা জানে না―যেখানে সে যাচ্ছে সেখানে―সেই সাগরপারের দেশে, এমন একটা কাক সে আর কোনও দিন এমনভাবে দেখবে কি না।’ এই কাক কি নন্দিতার উজ্জ্বল অতীতকে অন্ধকারে ঢেকে দেওয়ার প্রতীক হয়ে উঠছে ? পাঠক হিসেবে তো আমরা এরকম ভাবতেই পারি।
নামকরণই বলে দিচ্ছে ‘অতসীকে ভালোবাসি’ গল্পের বিষয়বস্তু। শিল্পসাহিত্য পাঠকালে বিষয়বস্তুতে নতুনত্ব আমি সব সময় প্রত্যাশা করি না। কিন্তু স্রষ্টার দেখা ও দেখানোর মধ্যে এমন কিছু চাই, যে চাওয়া সাধারণের মধ্যে স্বভাবতই অনুপস্থিত। না, এই গল্পে সুব্রত বড়ুয়া আমার ভাবকল্পনার মুকুটে নতুন কোনও পালক যোগ করছেন না। সেই অতসী যে কি না চার বছর আগে গল্পকথকের শার্টের বোতাম খুলে তার ঠাণ্ডা হাত বুকে রেখেছিল, তার কথাই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলছেন, গল্পে উপস্থিত হচ্ছেন কথকের মা, বন্ধু পরমেশ এবং এই পরমেশের সঙ্গে গল্প করতে করতেই গল্পকার অতসীর সঙ্গে তার সম্পর্কের নানা দিগন্তে দৃষ্টি ফেরাচ্ছেন। এই গল্পের সমান্তরালে আরও একটি গল্প বিস্তার লাভ করেছে―সে একটি সিনেমার গল্প―‘সাইড ট্র্যাক’। সেই গল্প অতসীর সঙ্গে কথকের সম্পর্কের নাড়িনক্ষত্র নির্দেশে কিঞ্চিত সহায়তা করছে মাত্র। অতসীর ছোট ভাই নিরুপম গল্পকথকের স্কুলেরই ছাত্র। দুজনের প্রেমে এই ছোট্ট ছেলেটির ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু অতসীর যখন অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়, তখন এই নিরুপমের আচরণেও দর্শনীয় পরিবর্তন চোখে পড়ে। গল্পকথক স্কুল মাস্টার আমাদের জানাচ্ছেন―‘অতসী, তুমি জানো না―তুমি, আমি আর এই ছোট নিরুপম আমরা সবাই কী ভীষণ বদলে গেছি এখন!’ হ্যাঁ, এভাবেই মানুষকে বদলে যেতে হয়। বদলাতে না পারলে তো বেঁচে থাকা যায় না।
সুব্রত বড়ুয়ার অনেক গল্পকেই তাঁর আত্মজীবনীর অংশ বলে মনে হয়। এটা কোনও গল্পের দুর্বল দিক নিশ্চয়ই নয় বরং এ জাতীয় গল্পে লেখকের অভিনিবেশ, বিশেষ করে তাঁর জীবনবোধ ও শিল্পদৃষ্টির গতি ও গভীরতা অনাস্বাদিত অভিব্যক্তি লাভ করে। ফলে ব্যক্তিজীবননির্ভর গল্প কখনও কখনও বিশেষ মূল্য ও মর্যাদা পায়। এই গল্পে গল্পকার বাংলাদেশ থেকে নয়, কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভেন্যু এবং তার আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশকে দেখেছেন। ‘নির্বাসনে একজন’ গল্পে গল্পকার সরাসরি উপস্থিত হয়েছেন―স্বনামে, সুব্রত বড়ুয়া হিসেবেই। এই গল্পে বিজ্ঞানের ছাত্র সুব্রত বড়ুয়ার বিজ্ঞান-আশ্রয়ী বেশকিছু বিবেচনা উঠে এসেছে―‘আইনস্টাইনের চতুর্মাত্রিক কাঠামোর কোনও কিছুই স্থিত থাকে না।’, ‘আসলে আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল’ ইত্যাদি। এই গল্পে লেখক নিজেকে একটি অনির্দেশ্য অসুখে আক্রান্ত হওয়ার কথা বলেছেন। ‘আমি সুব্রত না হয়ে আমার অন্য যে কোনও নাম হতে পারত।’―এই উচ্চারণে লেখকের অস্তিত্বসচেতনা হয়তো ধরা পড়েছে। ইয়ান ফ্লেমিং, আগাথা ক্রিস্টি হেডলি চেজ, কাম্যু, কাফকার পাশেই তিনি জুড়ে দিয়েছেন জীবনানন্দ ও মানিকের নাম। সারা জীবনের সাহিত্যপাঠের নির্যাস তিনি ঢেলে দিয়েছেন এই গল্পে। এই গল্পে ঘুরেফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের কথা। কয়েকটি উদাহরণ হাজির করি―
ক) ১৯৭১ সালের মার্চে আমরা সবাই যেন একটি নক্ষত্র থেকে তার বাইন্ডিং ফোর্সকে অগ্রাহ্য করতে বেরিয়ে পড়েছি।
খ) একাত্তরের মার্চ। বাংলাদেশ। সময় একটি উত্তাল জোয়ারের মতো স্ফীত হতে হতে একসময় প্রবল প্রকাণ্ড দৈত্যের আস্ফালনে সাজানো ফুলের বাগানে এসে আছড়ে পড়েছিল। আমাদের অফিসের সামনে বড় বটগাছটার নিচে প্রতিদিন মিছিল এসে দাঁড়াত।
গ) আজ দুপুরে শুনলাম, আমার সেই বন্ধুর ছোট ভাই, বাংলাদেশের অনেক তুখোড় ছাত্রের একজন―মাত্র তিন দিন আগে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে।
ছোটগল্পে যাঁরা গল্প না খুঁজে জীবন খুঁজতে ভালোবাসেন, এই গল্প তাঁদের নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। আর সৃষ্টিশীল মানুষের যে দেখা এবং দেখানোর কথা বলছিলাম, তার ছিঁটেফোঁটা এই গল্পের শরীর ছেনে উদ্ধার করা সম্ভব। এই গল্পে একটি মেয়ের কথা বারবার এসেছে যার সঙ্গে লেখকের বিশেষ সম্পর্কের খবর আমরা গল্পপাঠসূত্রে জেনে গেছি। তার নাম যুবতী। যুবতী সম্পর্কে লেখক বলছেন, ‘একদিন যুবতী ও তার সমস্ত অনুষঙ্গ কর্পূরের গন্ধের মতো উড়ে গেলে চাটগাঁর বাঁকা সাপের পিঠের মতো রাস্তায় আমি আমার যৌবন ও স্বপ্নকে অভিশপ্ত করে একটি গভীর কালো অসুখে আক্রান্ত হয়েছিলাম।’ জীবন ও যাপনের নির্মম অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ গল্পকার বলছেন, ‘আমি জাতিস্মরের মতো পূর্বজন্মের প্রেক্ষাপটে গিয়ে কিছু ফ্যাকাশে রঙের মধ্যে হারিয়ে যাই।’ কিন্তু গল্পের শেষে সুব্রত সবকিছু ছুটি দিয়ে একটি চলন্ত ট্রামের দিকে দৃষ্টি দেন এবং পাঠককে দেখান কীভাবে একটি উজ্জ্বল আলো হাউইয়ের মতো জ্বলে উঠে পরক্ষণেই নিষ্প্রভ হয়ে যায়। ধাবমান ট্রাম ও আলোকরশ্মির হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে জীবন-জগৎ বিষয়ে লেখকের অনুধাবন পাঠককে স্তম্ভিত করে দেয়।
সুব্রত বড়ুয়া যখন পাঠককে ‘আলো-হাওয়ার রাজ্যে’ নিয়ে যান, সেই গল্পের নায়ককেও আমরা গল্প লেখায় পারদর্শী দেখতে পাই। অর্থাৎ এই গল্পের নায়ক হিসেবেও সুব্রত বড়ুয়াকে কল্পনা করে নেয়া যায়। এই গল্পে তেমন কিছু নেই কিন্তু গল্পকারের জীবনবোধের নির্যাস-নির্ভর কয়েকটি উজ্জ্বল অংশ আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে একাকিত্ব বিষয়ক উপলব্ধি ‘অনেক মানুষের মাঝে বসে আছে সে। অথচ একটা মানুষের এই রকম একাকিত্বের কথা ভাবতে গেলে মনে হয় তার―এটিই হচ্ছে মানুষের আসল পরিচয়।’ প্রসঙ্গক্রমে জীবনানন্দের কবিতা থেকে ধার করে বলেন, ‘সে কি নিজে নিজেরই মুদ্রাদোষে আলাদা হয়ে যাচ্ছে আর সবার কাছে থেকে ?’ গভীরতর জীবনবোধ তাঁকে উচ্চারণ করতে শেখায়, ‘এককটি মানবী যেন একেকটি কিন্নরী হয়ে যায় তার চোখে।’ কিংবা ‘তার সমস্ত ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ পৃথক সত্তার বন্ধন থেকে বেরিয়ে যেন একক সত্তায় কেন্দ্রীভূত হয়।’
সুব্রত বড়ুয়া নারী-হৃদয়ের রহস্য উন্মোচনে খুব বেশি সফল হয়েছেন এমনটি দাবি করা যায় না। অন্তত তাঁর গল্পের পুরুষ চরিত্রগুলোর চালচলন ও কথাবার্তা অর্থাৎ জীবনযাত্রা থেকে সে-রকমই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। ভালোবেসে―ঘৃণা করে― অবহেলা করে মেয়েমানুষকে দেখার কাজটি কেবল জীবনানন্দ দাশ একাই করেননি, তাঁর সময়ে এবং পরবর্তীকালে আরও অনেক লেখককেই আমরা তা করতে দেখি। দেখা ও দেখানোর স্পর্শকাতর কাজটিতে সুব্রত বড়ুয়াও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। আগের দুয়েকটি গল্প থেকে আমি কিছু উদাহরণ হাজির করেছি। পরবর্তী পর্যায়ে নারীর শরীর বিষয়ে সুব্রত বড়ুয়া কিছুটা বেপড়োয়া হয়ে উঠছেন বলে মনে হয়। বিশেষ করে ‘বিলয়’ গল্পটিতে এই নারী-শরীর-আশ্রয়ী প্রবণতা আলাদা করে চোখে পড়ে। এই গল্পের অতসীর সঙ্গে আমাদের আগেই পরিচয় হয়েছে―‘অতসীকে ভালোবাসি’ গল্পের কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে পড়বে। সেখানেও লেখক অতসীর সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারটিতে কিছুটা রেখেঢেকে বলার চেষ্টা করেছেন। সুব্রত বড়ুয়ার গল্পের নায়কেরা (যদিও তাঁর গল্পের নায়ক সংখ্যা খুব বেশি বলে মনে হয় না, একই চরিত্রের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করি বিভিন্ন গল্পে) সারাক্ষণ সিগারেট টানে। সিগারেট টানার ব্যাপারে স্থানকালের সীমানা লঙ্ঘনের অজস্র উদাহরণ তাঁর বিভিন্ন গল্প থেকে হাজির করা যাবে। নিজ কক্ষে, বারান্দায়, রাস্তায়, রিকশায়, বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় কিংবা হোটেল রেস্তোরাঁয় সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারটাকে অসঙ্গত মনে হয় না। তাঁর নায়কেরা অনেক ভদ্রমহিলার বাসায় ঢুকে অনায়াসে সিগারেট ধরায়, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ওয়েটিং রুমে সিগারেট খায়, স্কুলের টিচার্স রুমেও সিগারেট টানতে তারা দ্বিধা করে না। যাই হোক, সেটা ভিন্ন আলোচনা। ‘বিলয়’ গল্পের অতসী নায়কের সিগারেট খাওয়া অপছন্দ করে এবং এই অপছন্দের সুযোগ নিয়ে নায়িকার সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা নাটকীয় দৃশ্যের জন্ম দেন। উদ্ধৃতি দীর্ঘ হবে, তাই পাঠকের কাছে পূর্বেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি―
আমি খুব বেশি সিগারেট খেলে অতসী রাগ করত। বলত, ‘আমার সামনে সিগারেট খেতে পারবে না।’ তবু খেতাম। ওকে খ্যাপাবার জন্যেই খেতাম। ও জোর করে কেড়ে নিতে চাইত, ঝাঁপিয়ে পড়ত। এবং আমি ইচ্ছে করেই হাতটাকে দূরে রাখতাম। হাতটা ধরার জন্যে, সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবার জন্যে ব্যাকুল অতসীর কিছুই আর খেয়াল থাকত না। নরম শরীর, ঠাণ্ডা হাত-গাল এবং নেশার মতো মিষ্টি এক গন্ধ ক্রমেই আমার শরীরে এসে জড়িয়ে যেত। জড়িয়ে যেত আর আমি ওর শরীরটা অন্য হাতে বেষ্টন করে গলার নিচে, বুকে, কাঁধে, থুতনিতে, ঠোঁটে আমার মুখ রাখতাম।
এসবের প্রতিক্রিয়া হিসেবে অতসীর ‘অসভ্য’ শব্দটিও বেশ উত্তেজক। এই গল্পের অতসী এসেছে স্মৃতির সরণি বেয়ে। কিন্তু গল্পের কথক ও তার বন্ধুকে আমরা শীঘ্রই একটি অভিজাত হোটেলে উপস্থিত দেখব যেখানে টাকার বিনিময়ে অনায়াসে নারীর দেহ উপভোগ করা যায়। উচ্চবিত্তের ভোগ-বিলাসের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এসব হোটেলের মেয়েদের বর্ণনায় লেখকের লিবিডো-ভাবনার চরম প্রকাশ লক্ষ করি। একজন মহিলার অবয়ব সম্পর্কে গল্পের কথক বলছেন, ‘একদিকে নিতম্ব প্রসারিত এবং স্তনযুগল চোখের সামনে নিষিদ্ধ ফলের মতোই পরম আকর্ষণীয়।’ এই গল্পে কথকের নারী-বিদ্বেষী মনোভাব অত্যন্ত খোলামেলাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে নারীর হৃদয়ে ভালোবাসা বলে কিছু নেই বলে কথকের যে বিশ্বাস, তার প্রকাশ ঘটেছে এভাবে―
ভালোবাসা মানে খেলা। প্রেম প্রেম খেলা। এ যেন এমন একটা ব্যাপার―শাড়ি গয়নার মতো কোনও কোনও মেয়ের একজন প্রেমিকও থাকা চাই। গয়নার ডিজাইন পুরনো হয়, শাড়ির নকশা বদলে যায়। প্রেমিক পুরুষটিকে অতো সহজে বদলানো যায় না বলেই―ছলছল আঁখি, অভিমান এবং ইচ্ছাকৃত রাগ ইত্যাদি কাণ্ডগুলো সময়মতো ব্যবহার করার কায়দা জেনে রাখতে হয়।
এসব কথার কোনও ব্যাখ্যা চলে না। কথক ও তার বন্ধুদের কর্মকাণ্ড বিষয়েও বিশদ আলাচনার প্রয়োজন নেই। ভালোবাসা ও ঘৃণার সহাবস্থান তো মানুষের হৃদয়েই। কথক বলছেন, ‘মানুষই মানুষকে ভালোবাসে। আবার মানুষই মানুষকে ঘৃণা করে। সময় বুঝি ভালোবাসাকেও ক্রমেই কেমন করে বদলে দেয়। ভালোবাসা হুইস্কির বোতলের মতো একসময় শূন্য হয়ে যায়।’ একদম সময়োপযোগী উপমা। হোটেলের মদ্যপানরত পুরুষ-রমণীর মনোজগতে এই ভাবনার উদয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কথকের বন্ধুরা তাদের পছন্দমতো নারীকে নিয়ে ভিন্নকক্ষে নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছে। কথকের সামনেও একে একে খুলে যাচ্ছে সম্ভোগ-সম্ভব নারীর সমুদয় পোশাক ও প্রতারণা। কিন্তু কথক জেগে উঠছেন না, ‘গভীর শীতার্ত এক অনুভূতি ধীরে ধীরে সারা দেহটাতে ছড়িয়ে পড়ছে সরীসৃপের মতো।’ স্তনের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন না কথক কিন্তু এর সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করছে, ‘একসময় ব্লাউজটা খসে পড়লে শাদা ব্রেসিয়ার একা চাঁদের মতো জ্বলতে লাগল বুকে।’ কথকের পাঠাভ্যাস বোঝা যায় বিবস্ত্র নারীর সামনে বসে সে যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চতুষ্কোণে’র কথা ভাবছেন। বিবস্ত্র নারীর সামনেও জেগে উঠছে না কথক অপমানিত নারীর মুখে তাই শুনি, ‘আমাকে তেমন কেউ পছন্দ করে না।’ সান্ত¦না হিসেবে কথক জানায়, এর জন্য সে মূল্য পরিশোধ করতে প্রস্তুত। তখন প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী বলে ওঠে, ‘আমি দান নিই না। ভিক্ষা তো এখনও শুরু করিনি।’ এই গল্পে একটি তিন চাকার সাইকেল কথককে ভীষণ স্মৃতিভারাক্রান্ত করে তুলেছে। শৈশবের একটি সাইকেল তার বর্তমানকে ভীষণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। তিন চাকার সাইকেল যে সন্তানের উপস্থিতি স্মরণ করে দিচ্ছে, সেই সন্তানের মায়ের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয় না কথক। টাকার বিনিময়ে যাদের শরীরে ইচ্ছেমতো উপভোগ করা যায়, তাদের উপস্থিতিতে পূর্বতন প্রেমিকাদের স্মরণ করা, ক্রয়যোগ্য নারীর মধ্যে প্রেমিকাদের উপস্থিতি কল্পনা করার মধ্যে নারীর প্রতি চরম অবিশ্বাস ধরা পড়ে।
সুব্রত বড়ুয়া ‘কাচপোকা’ গল্পেও অনেক বেশি শরীর-আশ্রয়ী। এই গল্পের রীতু ও নীতা ‘বিলয়’ গল্পেরই নিকটাত্মীয়। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে এরাও শরীর ব্যবহার করে কিন্তু এই ব্যবহারকে ভালোবাসার খোলসে মুড়িয়ে তথাকথিত ভদ্র-সুবোধ পুরুষের সামনে উপস্থাপন করে। এই গল্পে চুম্বন ও আলিঙ্গনের ছড়াছড়ি। নগ্নতাকেও বেশ উপভোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও গল্পের কথক বলছেন, ‘অথচ আমি কোনও দিন ওকে নগ্ন করতে চাইনি। নগ্নতাকে আমি ঘৃৃণা করতাম।’ কথক ছিলেন একজন নির্ভেজাল ভালো ছেলে এবং পবিত্র ভালোবাসায় বিশ্বাসী সাধারণ যুবক। এই গল্পে দুই বোনের সঙ্গে কথকের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্ক কেমল মানসিক নয়, শারীরিকও। ফলে একজনের উপস্থিতিতে অন্যজনকে নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে কথক। রীতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার ফলে নীতার উপস্থিতিতে সে ভয় পেতে শুরু করে―‘আমি আনাড়ি বালকের মতো চুরি করে খেতে গিয়ে আচারের বোয়েম ভেঙে ফেলার মতো অপরাধী চোখে দেখেছিলাম ওকে।’ নীতার শরীরের অলিগলি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত হওয়া যুবকটি যখন রীতুর আহ্বানে তাদের বাড়িতে আসে, তখন দৃশ্যপটে একটা ভয়াল থমথমে অবস্থা ছড়িয়ে পড়ে। এই গল্পে একজন অনিমেষকে আমরা কথকের বয়ানে উপস্থিত হতে দেখি যে নারীর ফাঁদে পড়ে জীবনকে নষ্ট করে ফেলেছে, গল্পকার হিসেবে অর্জিত খ্যাতি নারী-সঙ্গের কারণে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। এই গল্পের নায়কের দুর্দিনের কথাও এতে প্রকাশ পেয়েছে। উচ্চ বেতনে চাকরি করার ফলে এখন পরিবার ও বন্ধুমহলে তার কদর বেড়েছে। কিন্তু সেসব স্মৃতির হাত ধরেছে। রীতু মাঝখানে এসে কথকের কাছ থেকে কাল ফেরত দেওয়ার শর্তে বিশ টাকা নিয়ে গেছে, যদিও কথক জানে এভাবে তার অনেক টাকা ওরা খসিয়েছে এবং এসব ফেরত দেওয়ার ব্যাপারস্যাপার ভণিতা মাত্র। গল্পে যখন রীতু চা নিয়ে কথকের সামনে আসে এবং ঠাণ্ডা হওয়ার আগেই খাওয়ার অনুরোধ করে তখন গল্পকার এই ঠাণ্ডা হওয়ার ব্যাপারটাকে ভিন্নখাতে ঠেলে দেয় : ‘ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। দেরি করলে শালা সবকিছু ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ভালোবাসা… প্রেম… এমনকি শালা মেয়েমানুষের শরীরও।’ বুঝতে পারি এই পুরুষ জীবনানন্দের মতো নারীকে নানাভাবে দেখতে শিখেছে। এই গল্পের কথক নারীকে নিয়ে খেলার কিছু কৌশল শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে―‘খেলতে জানলে, তলপেটের ব্যবহার পর্যন্ত এগিয়ে গেলে―ওইসব স্বর্গীয়টর্গীয় ভাবটা যে কোথায় উড়ে যেত ওর ? শালা গাধা, কাপুরুষ।’ কথাগুলো কথক নিজের উদ্দেশ্যেই বলে, যাদের কাছে প্রতারিত হয়েছে সেইসব নারীর কথা মাথায় রেখে। নীতার সঙ্গে শরীর-সম্পর্কের নিবিড় মুহূর্তটি কথক জানান দিচ্ছে এভাবে―
আমি ওকে দেখতে শুরু করেছিলাম ভালো করে। গাল, চোখ, চিবুক, ঠোঁট, হাত, কণ্ঠদেশ, গ্রীবা এমনকি ব্লাউজের নিচে পেটের অনাবৃত অংশ পর্যন্ত। আর ঠিক তখনই নীতাকে পুরোপুরি দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আমার। একবার থমকে গেলাম। ভাবতে চাইলাম অন্যকিছু। তারপর অভ্যাসমতো পিঠের নিচে হাত দিয়ে টেনে আনলাম। চুমু খেলাম। এবং একসময় ব্লাউজের বোতামগুলো খোলা হয়ে গেল, ব্রেসিয়ারের হুক ঝুলে পড়ল ডাহুকের মতো। চোখের সামনে ভেসে রইল শাদা বুক।
এই ঘনিষ্টতার সূত্রেই কথক অনুভব করে, ‘হাল্কা নীল রঙের অই শাড়ির নিচে একজন অন্য নীতা আছে। আছে দুনিয়ার আদিম এক মানবী। কত হাজার যুগ ধরে ছিল। কত কোটি বছর ধরে থাকবে।’ শরীর নিয়ে কাব্য করার এই প্রয়াসে আরও গভীরভাবে ডুব দেওয়ার জন্যই কথককে হলঘরে বসে বরফমিশ্রিত আরও দুই পেগ ওল্ড রাম গিলতে হয়, তখন বরফ কেন পানিতে ভাসে―প্রশ্নটি তার মাথায় ঘুরপাক খায়। ভোগ ও উপভোগের এই উষ্ণ মুহূর্তে কথকের চোখের সামনে ভাসে অন্য এক নারীর মুখ, যে তাকে ছেড়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে অনেক দূর চলে গেছে―তার চ্যাপ্টা নাক, উঁচু ঠোঁট আর গোলাপের মতো বিশাল এক জোড়া চোখ। কিন্তু সব ছাপিয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে পরিপাটি সিঁথির সিঁদুর, তারই খুব কাছে, কপালে কাচপোকার মতো স্থির অচঞ্চল টিপ।
‘আত্মচরিত’ সেই অর্থে গল্প নয়, আক্ষরিক অর্থেই আত্মচরিত। তাতে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ ঘটেছে এবং কল্পনা ও সত্যের অনুপাত নিয়েও কখনও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। ‘আত্মচরিতে’র কথক আমাদের অপরিচিত নয়। বাংলাদেশের গ্রাম থেকে উঠে এসে শহরে থিতু হওয়া অধিকাংশ যুবককেই এই গল্পে খুঁজে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে গ্রাম থেকে শহরে পড়তে আসার অভিজ্ঞতা। কোনও রকমে হয়তো জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা যায় কিংবা প্রতিষ্ঠা আসে কিন্তু পুরোপুরি মুক্তভাবে জীবনকে উপভোগ করা হয়ে ওঠে না তাদের। গল্পকার নিজেকে ‘একজন নির্ভেজাল কাপুরুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাবা-মায়ের আদর ও শাসন, সন্তানকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন-কল্পা―এসবই এই গল্পের বিষয়। একজন মধ্যবিত্ত যুবকের জীবনচিত্র হিসেবে গল্পটি মন্দ নয়। গল্পের শেষে কথক বলছেন, ‘মনে হয়, আমি যেন খাঁচার পাখি। খাঁচার থেকে বাইরের বিরাট বিশাল উদার আকাশের জীবনে হারিয়ে যাওয়ার কথা আর চিন্তা করতে পারি না। এই আমার জীবন। আমি এ জীবন মেনে নিয়েছি―কোনও কোনও মানুষের জীবন কেবল এই রকমই হয়।’
‘অচৈতন্যে মৃত্যু’ এবং ‘নিরবয়ব অভিলাষ’ গল্পে প্রেমের আবহ সঞ্চারিত হলেও, সেই প্রেম কামের কাছে চরমভাবে পরাস্ত হয়েছে। প্রাইভেট টিউশনি করতে গিয়ে ছাত্রীর প্রেমে পড়ার মতো ঘটনা নিয়ে অনেক বস্তাপচা গল্প, নাটক, সিনেমা আমরা দেখেছি। ছাত্রীর বোনের সঙ্গে সম্পর্ক করার পর অনেক দূর অগ্রসর হয়ে যখন দেখা যায়, ছাত্রীও ওই শিক্ষকের সঙ্গেই প্রাণ বেঁধে নিয়েছে, তখন জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দুই বোন যখন ভালোবাসার জন্য পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে তখন আবহাওয়া তৃতীয় পক্ষের অনুকূলে থাকার কথা নূয়। সেসব জটিলতার কিছু নমুনা এই গল্পে হাজির করা হয়েছে। এই দুই গল্পের কথক ও বুলিদের তাই আমরা সহজেই চিনতে পারি, আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী মনে হয়।
গল্প পড়তে গিয়ে যাঁরা টানটান উত্তেজনা কিংবা চরম মুহূর্ত উপভোগের জন্য মুখিয়ে থাকেন, তাঁদের জন্য সুব্রত বড়ুয়া সুখপাঠ্য বলে মনে হয় না। তিনি আসলে গল্প বলেন না, জীবনকে মেলে ধরেন এবং সেই জীবনের ফাঁকফোঁকর গলে যা কিছু বেরিয়ে আসে তা আমাদের বিস্ময়ে হতবাক করে না। সুব্রতের গল্পের মানুষজন আমাদের চারপাশেই ঘোরাফেরা করে। তারা নিতান্তই সাধারণ মানুষ। তাই তাদের দিকে গভীর মনোযোগ দেওয়ার লোকের খুবই অভাব। তারা স্বভাবের দাসত্ব করে, বড় কিছু পাওয়ার জন্য জীবন বাজি রাখতে ভয় পায়, আবার পেয়ে হারালেও তা নিয়ে বিশেষ হাপিত্যেশ করে না। নিয়তি ভেবেই জীবনের যাবতীয় পরাজয় সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। জীবনটি উপভোগ করার চিন্তাও অনেকের কাছে বিলাসিতা মনে হয়। এসব নির্বোধ-নিরীহ-গোবেচারা মানুষের জীবনেও কখনও কখনও ভালোবাসা আসে এবং তা এমন নীরবে আসে যে, বাতাসও তা কখনও কখনও জানতে পারে না। কিন্তু হারানোর পর আলো হয়ে আসা মানুষটিকে আলেয়া ভেবে একান্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সুব্রত বড়ুয়া গল্পে সেই দীর্ঘশ্বাস শব্দে ধারণ করার চেষ্টা করেন। দু-চারটি গল্পে আমরা যে বেপরোয়া পুরুষকে ভোগোন্মত্ত নারী-সান্নিধ্যে সক্রিয় হতে দেখি, সেই সক্রিয়তাও অনেকাংশে তাদের স্বভাবের বিপরীত বলে মনে হয়। পাঠক হিসেবে ধারণা জন্মে, নারীর ছলনার শিকার এই পুরুষরা প্রতিশোধ নেয়ার অভিপ্রায়েই নারীকে নগ্ন করতে চেয়েছে, নারী দেহের বিচিত্র বাঁক-বিভঙ্গ পরিক্রমণ করে অন্তর্গত জ্বালা-যন্ত্রণা নিরসনের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।
আগেই উল্লেখ করেছি, সুব্রত বড়ুয়ার গল্পের পুরুষেরা সিগারেট ছাড়া এক মুহূর্তও চলতে পারে না। সুযোগ পেলেই সিগারেটে অগ্নি-সংযোগের এই প্রবণতাকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়াও হয়তো অসম্ভব নয়। জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হওয়া সিগারেটের মতোই কি নয় তাদের জীবন ও যাপনের বিস্তৃত চালচিত্র ? প্রেয়সীর ঠোঁট যখন অর্থাভাবে, প্রতিষ্ঠাহীনতায় কিংবা ভীরুতার কারণে বারবার কক্ষচ্যুত হয় তখন সিগারেটে আস্থা রাখাকে খুব বেশি অপরাধ বলা যায় না। বিষ্ণু দের কবিতায় বিধ্বস্ত মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি সুরেশকে আমরা শুধু গ্লুকোজ খেতে দেখেছি―‘সুরেশ শুধু খায় দেখি গ্লুকোজ।’ সুব্রত বড়ুয়ার তাঁর বিপন্ন মধ্যবিত্তের হাতে গ্লুকোজের পরিবর্তে সিগারেট ধরিয়ে দিয়েছেন। কবিতায় বিজ্ঞানের ছাত্র সুব্রত বড়ুয়া গল্প লেখার সময় স্বাস্থ্যবিজ্ঞানকে যেমন মূল্য দেননি তেমনি সমাজ-সংসারের নিয়মকানুন নীতি-আদর্শেরও দাসত্ব করেননি। ‘ভালো-মন্দ যাহাই আসুক’ সত্যকে সহজে গ্রহণ করার সাহস দেখিয়েছেন তিনি। তত্ত্বের কাঁধে ভর করে তাঁর গল্পপাঠের অভিজ্ঞতা সুখকর হওয়ার কথা নয়। তিনি সত্যের নিকটবর্তী থাকতে চেয়েছেন এবং সেই সত্য কখনওই সমাজসত্যের সমান্তরাল নয়, বরাবরের মতো শিল্পসত্যের মুখাপেক্ষী। একারণেই সুব্রত বড়ুয়াকে পাঠ করার আনন্দ অপার।
সুব্রত বড়ুয়া একটি গল্পে লিখেছেন, ‘অবনীশের জীবনে গল্প নেই―ঘটনা আছে কিছু’ এবং তিনি এও বলেছেন যে, ‘ঘটনাগুলো এমন যে সবকিছু বেশ রসালো করে বললেও ঠিক গল্প হয়ে ওঠে না। গল্প অন্য জিনিস।’ এই অন্য জিনিসের সন্ধানে ছুটে বেড়াননি সুব্রত। যে জীবন তিনি যাপন করেছেন, তারই ভাঁজ খুলে পাঠকের সামনে মেলে ধরেছেন। অর্থাৎ তাঁর গল্পে ধরা পড়েছে জীবনযাপনের আত্মখচিত অনুভবপুঞ্জ। তাঁর গল্প পড়ে তাই ‘কী পাইনি তারি হিসেব মিলাতে মন মোর নহে রাজি।’ চেনাশোনার বাইরে গিয়ে বিস্ময়-জাগানো ভিনগ্রহের মানুষজনকে তিনি গল্পের গতরে তুলে আনতে চাননি। কাছের মানুষের কাছে তিনি দায়বদ্ধ থেকেছেন। এই দায়বদ্ধতা শিল্পের বিচারে কতটা উচ্চমার্গের, কালের পরীক্ষায় নিশ্চয়ই তা চিহ্নিত হয়ে যাবে। জীবনের প্রতি প্রগাঢ় আকর্ষণ এবং সেই আকর্ষণ শিল্পে রূপান্তরের দক্ষতাই একজন শিল্পস্রষ্টাকে কালোত্তীর্ণ করে তোলে। গল্পকার হিসেবে ‘তিনি আমাদের লোক’―একজন সুব্রত বড়ুয়াকে পাঠ করার অভিজ্ঞতা থেকে অনায়াসে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক



