

বলার অপেক্ষা রাখে না যে ইমদাদুল হক মিলন বাংলাদেশের পাঠকপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। পাঠকপ্রিয়তার মানদণ্ডে হুমায়ূন আহমেদকে এক বাক্যে শীর্ষস্থানীয় বলা হয়ে থাকে। এর পরের আসনটি ইমদাদুল হক মিলনের দখলে আছে, বাংলাদেশের লেখক ও পাঠকরা এমনই বলে থাকেন যা সচরাচর শোনা যায়। আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বইমেলা থেকে উপলব্ধি করতে পারতাম যে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ও ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস পাঠকেরা পাল্লা দিয়ে কিনতেন। যদিও ওয়েস্টার্ন সিরিজের বইয়েরও জনপ্রিয়তা ছিল বা এখনও আছে। সেগুলোকে বাংলা সাহিত্যের বিচারে কখনও বিবেচনা করা হয় না। প্রসঙ্গটি কেন জনপ্রিয়তার ? এই জন্য যে, হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে জনপ্রিয়তা কথাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এবং তাঁদের নাম এলেই জনপ্রিয়তা শব্দটিও পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। পাঠকপ্রিয় হওয়াটা খুব সহজ কথা নয়; সৃষ্টিশীল কর্ম দিয়ে মানুষের মন জয় করা অনেক কষ্টসাধ্য; কেউ কেউ বলেন নিয়তি। পাঠকপ্রিয় লেখকরাই ব্যাপক পরিচিতি সম্মান সমাদর ও অর্থযোগ―এই চারটি সমানভাবে লাভ করে থাকেন যেখানে অন্য লেখকরা এই চারটিতে সমানভাবে ভাগ বসাতে পারেন না। এই প্রসঙ্গে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরীর একটি কথা প্রণিধানযোগ্য। তিনি দৈনিক আমাদের সময়ের একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান। একটা দৌড় না থাকলে কেউ পপুলার রাইটার হতে পারে না। জনপ্রিয় হলেও মিলনের কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিশীলতা আছে। অনেক ছোটগল্পেও সে ওস্তাদি দেখিয়েছে।’ দৈনিক আমাদের সময়, ৩০ জানুয়ারি ২০২১।
অনেকেই ‘জাত লেখক’ বলে একটি কথা বলে থাকেন। অর্থাৎ ক্ষুরধার লেখক-প্রতিভা নিয়ে যাদের জন্ম তাদের ‘জাত লেখক’ হিসেবে অনেকে অভিহিত করেন, সম্মানিত করেন। ইমদাদুল হক মিলনকে ‘জাত লেখক’ হিসেবেও অনেককে বলতে শোনা যায়। বলতে গেলে তিনি কিশোর বয়স থেকেই লেখালেখির জগতে বিচরণ করছেন, অনুমান করছি―প্রায় তিনশ’ বই তাঁর হাত দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে যা বিস্ময়কর তো বটেই, অভাবনীয়ও! টিভি-নাটক হয়তো দুই শতাধিক। এই বিপুল সৃষ্টিসম্ভার সাধারণ কোনও কথা নয়।
আমরা এখানে ইমদাদুল হক মিলনের সমস্ত সাহিত্যসৃষ্টি নিয়ে আলোকপাত করতে যাচ্ছি না, তাঁর লেখা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাতটি উপন্যাসের বিষয় ও রচনাশৈলী নিয়ে সংক্ষেপে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস লেখায় যাঁরা শীর্ষস্থানে আছেন তাঁরা হলেন সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন। তাঁদের প্রত্যেকেরই অর্ধ-ডজনের বেশি মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস রয়েছে। তবে কার অবস্থান শীর্ষে সে-রকম নির্ভুল তথ্য এই মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে মনে হচ্ছে ইমদাদুল হক মিলনের অবস্থান শীর্ষে থাকতে পারে। তাঁর লেখা মুক্তিযুদ্ধ ফোকাস্ড, থিম ও মোটিফ বিবেচনায় উপন্যাস ও উপন্যাসিকা মিলিয়ে এক ডজন (কালো ঘোড়া, ঘেরাও, দ্বিতীয় পর্ব, মহাযুদ্ধ, রাজাকারতন্ত্র, জীবনপুর, সাড়ে তিন হাত ভূমি, একাত্তর ও একজন মা, নয়মাস, একজনা, সুতোয় বাঁধা প্রজাপতি, বালকের অভিযান) গ্রন্থ সম্পর্কে বর্তমান লেখক জ্ঞাত। এক ডজনের ফিতা ছুঁতে আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
ইমদাদুল হক মিলন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস লেখেন ১৯৮১ সালে―তরুণ বয়সে এবং আশির দশকে কালো ঘোড়া, ঘেরাও, দ্বিতীয় পর্ব, মহাযুদ্ধ, রাজাকারতন্ত্র―এই পাঁচটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস লেখেন। এই দিক দিয়ে তাঁকে নিঃসন্দেহে সাহসী লেখক বলা যায়। কারণ, পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে বত্রিশ নম্বরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নিঃশেষ করার পর থেকে নব্বই পর্যন্ত ক্যান্টনমেন্টের শাসনের অনুপ্রবেশ এবং তাদের সুনজরে দেশে মহান স্বাধীনতা বিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির অশুভ চক্র রাজাকার আলবদর ও আল শামসদের পুনরুত্থান ঘটে এবং আত্মগোপনাবস্থা থেকে বের হয়ে তারা তেলতেলে শরীরে ফুরফুরে মেজাজে প্রশাসন কাঠামোতে অনুপ্রবেশসহ ক্ষমতাবলয়ে শক্তিশালী মোড়লে পরিণত হয়। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি তখন রীতিমতো কোণঠাসা ছিল। সত্তর দশকের শেষের দিকে স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথা বলা বা লেখালেখি করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। অনেক লেখক তো তখন খোলসই পালটিয়েছিলেন। তবে, তখন অনেক সাহসী কবি সাহিত্যিক সামরিক জান্তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁদের লেখায় স্বাধীনতার গৌরবকে ঔজ্জ্বল্য দান করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি যাঁদের কাফেলায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উল্লেখযোগ্য পাঁচটি উপন্যাস এবং কিছু গল্প নিয়ে ইমদাদুল হক মিলনও যুক্ত হন―একই সঙ্গে হেঁটেছেন, হাঁটছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যে কোনও রচনায় তিনি অকপটে রাজাকারদের কথা বলেছেন, সাহসের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে সামনে এনেছেন উপন্যাসের পৃষ্ঠায়।
আলোচিত সাতটি উপন্যাসে নির্মাণস্থাপত্যে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে। অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধাশ্রিত উপন্যাসে বিষয়বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা কিছুটা দুরূহ এইজন্য যে, এসব উপন্যাসের মূল উপজীব্য ও মোটিফই হলো মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকার, মুক্তিবাহনী এবং বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগোষ্ঠী প্রধান চরিত্র হিসেবে চিত্রিত হয়। বর্তমান লেখক ‘সত্তর দশকের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পকলা’ প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস কোনগুলোকে বিবেচনা করা হবে তার একটি সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘ওয়ার লিটারেচারের’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংজ্ঞার সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের লাগসই সংজ্ঞা না থাকার কারণে উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের থিম ও মোটিফ না থাকলেও সে সব উপন্যাসকে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস বলে চালিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। একই সঙ্গে বলা প্রাসঙ্গিক যে, উপন্যাসের কলেবর ও বৈশিষ্ট্যগত কারণে কিছু উপন্যাসিকা বা নভেলাও রয়েছে যেগুলো উপন্যাসের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে―এই বিষয়ও দেখা দরকার। এখন দেখা যাক ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাসগুলোর বিষয়-আশয় ও শিল্পকলার স্বরূপ।
কালো ঘোড়া
ইমদাদুল হক মিলনের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলোর মধ্যে কালো ঘোড়া প্রথম, ১৯৮১ সালে প্রকাশিত। তিন ফর্মার এই উপন্যাসের ল্যান্ডস্ক্যাপটি মনে হয় লৌহজংয়ের কোনও একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলের স্ন্যাপশট যে স্ন্যাপশটে এক্সপোজ্ড হয়েছে চারজন মুক্তিযোদ্ধা, কুখ্যাত শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান ও তার সাঙ্গপাঙ্গ এবং রতনলালের মিষ্টির দোকান ও তার পরিবার। ক্ষুদ্র পরিসরের উপন্যাসে কাহিনির তেমন ডালপালা না থাকলেও আঁটসাঁট গল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গ্রামীণ জনপদের নিখুঁতভাবে চিত্রকল্প অঙ্কিত হয়েছে। ক্যানভাসে উনিশশো একাত্তর সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিজয় দিবস এবং শেষ অধ্যায়ের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের সময়ের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাকের কারণে মনস্তাত্ত্বিক সংকট এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের হতাশা পরিস্ফুটিত হয়েছে।
অবিরাম বৃষ্টির ব্যঞ্জনা দিয়ে উপন্যাসের বয়নযাত্রা, হয়তো লেখকের দৃষ্টিতে রূপক―বৃষ্টি স্বপ্নভূমির উর্বরতা ও শস্যের আশীর্বাদ―স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকসেনাদের জন্য বৃষ্টি ছিল অভিশাপ, গেরিলাদের আশীর্বাদ। পাঠককের চোখেও স্বপ্নজাল বয়ন হতে পারে প্রথম দুটি শব্দের বাক্যে―‘বৃষ্টিটা আছেই।’ এ-রকম বর্ষণমুখর দিনে রতনলালের মিষ্টির দোকানের রতনলালের মনোকথন, গ্রাহক আসা, না-আসার জন্য অস্থিরতা, কর্মচারী করিতকর্মা বারেক ও নিষ্কর্মা বোকাসোকা নয়নের (নয়না) মিথস্ক্রিয়ার বর্ণনা থেকে উনিশশো একাত্তর সালের হাটবাজারের চালচিত্র উপলব্ধি করা যায়।
জয় বাংলা জয় বাংলা ধ্বনি উচ্চারিত হয় রতনলালের মুখ থেকে। রতনলালের যুবতী কন্যা ‘কালী’। উপন্যাসের নারী কেন্দ্রীয় চরিত্র, মাতৃহারা বাকপ্রতিবন্ধী মেয়েটির গায়ের রং কালো বলে নামও ‘কালী’। বাবার খুব আদরের বলে কালী বড় হলেও বাবার কাছে যেন তিন বছরের শিশু। বাবা-মেয়ে রাতে ঘুমায়ও গলাগলি করে। মেয়েটি যেন রতনলালের আত্মার পরিপূরক। দুটি চরিত্রই ব্যতিক্রমধর্মী।
বারেক করিতকর্মা ও চালাক হলেও সে অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতির, বদ খাসলতের। রাতে মিষ্টির দোকানে নয়ন (নয়না) ও সে একই বিছানায় ঘুমায়। গাব্বাডাব্বা নয়নকে সে প্রতি রাতেই বিরক্ত করে, শেষে যখন রাজাকার ও পাকসেনাদের অত্যাচারে হিন্দুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন নেমে আসে, বারেক (বারেইক্কেয়া) শান্তিকমিটির চেয়ারম্যানের বডিগার্ড হবে শোনা যাচ্ছে তখন নয়ন বারেকের আনুকূল্য পাওয়ার প্রত্যাশায় বারেকের মনস্কামনা চরিতার্থ করতে নিজেকে মেলে দেয়। এই ঘটনা আখ্যানের বিমূর্ত তুচ্ছ অনুষঙ্গ হলেও চরিত্র দুটির পরিপক্বতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
বর্ষণমুখর এক গভীর রাতে এলাকার চারজন মুক্তিযোদ্ধা খোকা, মন্না, কাদের ও আলম ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলাকায় আসে গেরিলা আক্রমণে এলাকা শত্রুমুক্ত করতে, তারা ঢোকে রতনলালের মিষ্টির দোকানে। এরা সবাই নয়নের পরিচিত। বারেক চেয়ারম্যানের বডিগার্ড হওয়াতে রাতে এই দোকানে নয়ন একা থাকে। নয়নের কাছে আশ্রয় ও খাবার চায় তারা। বেচারা লজ্জায় পড়ে, দ্বিধান্বিত হয়―এই বীরদের খেতে দেওয়ার মতো তেমন কিছু নেই। শেষে, মিষ্টি খেতে দেয় এবং রাতে থাকার ব্যবস্থা করে। সূর্যের আলো ফোটার আগেই তারা চলে যায়। তারপর, নিরাপদ আশ্রয় ভেবে ঘুমানোর জন্য প্রতি রাতে এখানে আসে তারা এবং নয়নের কাছ থেকে এলাকার খবরাখবরও নিতে পারে যা গেরিলা যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত জরুরি বিষয় ছিল।
এই কাহিনিতে সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের চালচিত্রও প্রকাশ পায়। নিম্ন শ্রেণির হিন্দু পেশাজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া অন্যরা ভারতে চলে গেছে রাজাকারদের নির্যাতনের কারণে। দুর্ধর্ষ লম্পট চেয়ারম্যান পবিত্র পাকিস্তানের অখণ্ডতার জন্য বেপরোয়া। সে বারেকের সহযোগিতায় কালীকে টার্গেট করে এক দুপুরে তাকে ধর্ষণ করে। বাকপ্রতিবন্ধী অসহায় কালী জীবনের গ্লানি থেকে নিজে মুক্তি দেয় পুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করার মাধ্যমে। মাতৃহারা মেয়ের জন্য হাহাকার করতে থাকে রতনলাল এবং কালীকে খুঁজে পায় নগ্নাবস্থায় পুকুরে ভাসমান লাশ হিসেবে।
লম্পট চেয়ারম্যানের দ্বিতীয় স্ত্রী মন্নার সাবেক প্রেমিকা টুনটুনি। সাবেকি প্রেম হলেও তাদের প্রেমের টালমাটাল টান এখনও বিদ্যমান। এই হেতু টুনটুনি মুক্তিযুদ্ধের গুপ্তচরবৃত্তি করে, কৌশলে মন্নাকে চেয়ারম্যানের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের আগমন টের পেয়ে চেয়ারম্যান তার চাকর আফাজউদ্দিন ও বডিগার্ড বারেকের সহযোগিতায় নয়নকে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দিতে বলে। নয়ন অনড়, অবিচল―সে কিছুই জানে না। শাপান্তে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে বিলে নিক্ষেপ করে।
চার মুক্তিযোদ্ধা এক দিন সফল হয়। তারা চেয়ারম্যান ও বারেককে গুলি করে হত্যা করে―লৌহজং এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। চেয়ারম্যানের কালো ঘোড়ার পেটে লাল কালি দিয়ে ‘স্বাধীনতা’ লেখে ঘোড়াটিকে ছেড়ে দেয় তারা। কালো ঘোড়া স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায় সারা মাঠ জুড়ে। যে ক্ষেতেই ইচ্ছে হয় সে খায়। ক্রমে তাজা ও তেলতেলে হয়ে ওঠে। তাকে কেউ ধরে না। ধরা নিষেধ।
নবম অধ্যায়ে প্রতিফলিত হয়েছে স^াধীনতার পরবর্তীকালের মুক্তিযোদ্ধাদের অনিশ্চিত জীবনের হতাশা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং মনস্তাত্ত্বিক সংকট। ঢাকায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে সে খবরও ওরা পায়। টুনটুনিকে বিয়ে করার জন্য মন্নার টাকা নেই। তখন ডাকাতি করার প্রস্তাবও তার মুখ থেকে নিঃসৃত হয়। টুনটুনির বিয়ে পর্যন্ত কাহিনি গড়ায়নি।
তারা ছোটে কালো ঘোড়ার দিকে অর্থাৎ যে ঘোড়ার পেটে লেখা ছিল স্বাধীনতা তাকে ধরতে যায় কিন্তু ধরতে পারে না।
কালো ঘোড়া―একটি ম্যাটাফোর। ম্যাটাফোরকে পাঠক কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন সে দায় লেখকের নয়। একেকজন একেকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, সে অধিকার পাঠকের আছে। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী লম্পট চেয়ারম্যানের করায়ত্ত থেকে কালো ঘোড়াকে মুক্ত করে পেটে লাল জ¦লজ¦লে হরফে ‘স্বাধীনতা’ লিখে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে যে ঘোড়াকে কেউ যেন না ধরে সে এলার্ম জারি করা হয়েছে। দুর্ধর্ষ অত্যাচারী পাকিস্তানিদের করায়ত্ত থেকে স্বাধীনতা পাওয়া। ঘোড়াটি ছুটে বেড়াচ্ছে, মানুষের ক্ষেতে খেয়ে খেয়ে মোটাতাজা হচ্ছে। স্বাধীনতা পূর্ণতা ও সফলতা পাচ্ছে।
পাঠক হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারেন যে ঘোড়াটি লাগামহীন হওয়াতে মানুষের জমিনের ফসল খায় আর মোটাতাজা হয়। কিন্তু শেষে যখন মুক্তিযোদ্ধারাই ধরতে চাইল তখন আর ধরতে পারেনি। তাহলে কি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতছাড়া হয়ে গেল স্বাধীনতা!
তরুণ বয়সে ইমদাদুল হক মিলন এই মেটাফোর সৃষ্টি করেছেন তা রীতিমতো তাক লাগার মতো। পঁচাত্তর পরবর্তীকালে রাজাকারদের পুরুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতা হাতছাড়া হয়েছে এই ধারণা সেই সময় একজন অগ্রসর চিন্তার লেখক করতে পারেন এবং সেই চিন্তার ফসলই কালো ঘোড়া।
এই উপন্যাসে সংলাপ ছাড়া ন্যারেশনেও আঞ্চলিক ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আঞ্চলিক উচ্চারণের কারণে ‘চেরম্যান’ বানানের ক্ষেত্রেও তাই লক্ষ করা যায়। ন্যারেশনে প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণ কি ‘সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ দূষণীয়’―এ-রকম দূষণীয় কিনা আমাদের জানা নেই। তবে বলা যায় যে, লেখক যখন কালোত্তীর্ণ হয়ে যান তখন তাঁর সকল কর্মই রেফারেন্স হয়ে যায়। ফিওদর দস্তইয়েভস্কির সাবেকি ও সেকেলে ভাষা যা তাঁর পূর্বসূরি পুশকিনও ব্যবহার করেননি তা তিনি ব্যবহার করায় রাশিয়ায় অনেকের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে যদিও তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন। আমরা অনুবাদ পড়ি বলে তার ভাষার কেরামতি আমাদের কাছে দুর্বোধ্য। গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ লেখক ইউলিসিস উপন্যাসের স্রষ্টা জেমস জয়েস ফিনেগানস ওয়েক উপন্যাসে বারোটি ভাষা ব্যবহার করে ইউলিসিসের চেয়েও দুর্বোধ্য উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন। তার লেখা এখন অনেক লেখকের রেফারেন্স হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরুলের লেখায় বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি ইত্যাদি ভাষার সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়। হয়তো আমার পক্ষপাতিত্ব―ভাষা নিয়ে আমার কথা নেই।
দ্বিতীয় পর্বের শুরু
তিন বা সাড়ে তিন ফর্মার উপন্যাসে (দ্বিতীয় পর্বের শুরু) বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তীকালের ঘটনাবলি বিধৃত হয়েছে। এই আখ্যানটির নির্মাণে চমৎকারিত্ব রয়েছে। এক রাতের বর্ণনায় প্রধান হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ, এক মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের দুর্দশা এবং দুই মুক্তিযোদ্ধার প্রেমকাহিনি। এই প্রেমকাহিনির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ের কিছু খণ্ডচিত্র এই উপন্যাসের উপজীব্য এবং প্রধান আকর্ষণ হয়ে ফুটে উঠেছে।
রতন একজন মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার এগারো মাস পরে কারামুক্তির পর সন্ধ্যার প্রাক্কালে লঞ্চে করে নিজ বাড়ি ফেরে। লঞ্চ থেকে নেমে বাড়িতে যাওয়ার পর ওই রাতের শেষ প্রহরে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে। চলমান লঞ্চে কিছু মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ নির্বাক দৃষ্টিতে দেখা, লঞ্চ ঘাট ও চায়ের স্টলের সন্নিহিত এলাকার বর্ণনা, চায়ের স্টলে চা খাওয়া এবং সারা দিনে দুটি কথা বলা এবং পথের বর্ণনার মধ্য দিয়ে প্রোটাগনিস্ট বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। রতনের সঙ্গে আরও চারজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল, তারা হলো―মজনু খোকা বাদল আর আজমত। রহমত মাস্টার রতনের বাবা যিনি গ্রামের একজন সম্মানিত মানুষ। বুলবুলি রতনের বোন যার সঙ্গে প্রেম করে মজনু। ফিকশন লেখায় ইমদাদুল হক মিলনের ওস্তাদির সাক্ষ্য মিলে। রতন রাতে বাড়ি ফিরে আর বুলবুলি কৌশলে গ্রামে চিরাচরিত নিয়মে যে ধরনের প্রেম হয় সে ধরনের প্রেমের একটি বাস্তব অথচ নিখুঁত প্রেমালাপের ঘটনা ঘটায়। রাত পরিণতির দিকে যাচ্ছে, উপন্যাসও সমাপ্তির দিকে যাচ্ছে আর এর ভেতরে মজনুর সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের তৎপরতা এবং কুখ্যাত শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মাজেদ মিয়ার কুকীর্তি। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধারা মাজেদ মিয়াকে হত্যা করতে চাইলে রতনই বাধ সাধে। কারণ, মাজেদ মিয়ার মেয়ে চিনির সঙ্গে তার প্রণয় ছিল। চিনির অনুরোধে মাজেদকে ক্ষমা করে ভুল করলেও মাজেদ রতনকে সাজানো অস্ত্র মামলায় জেলে পাঠাতে ভুল করেনি। রাজাকারের পুনরুত্থান ঘটে, তার দাপট ও প্রভাবে এলাকার মানুষ আবার ভীতসন্তস্ত্র হয়ে পড়ে।
রতনের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে তারা বাবাকে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে নিয়ে টর্চার করা হয়। তিনি মানসিক রোগী হয়ে ফিরেন। তবে তাঁর সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা না বললে তার মনোবৈকল্যের বিষয়টি ধরা পড়ে না। রতনের মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং অবর্ণনীয় সেবার কারণে তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে জীবনযাপন করেন।
রাতের শেষ প্রহরে রতন ঘরে আসে, বুলবুলিও বাগানবাড়ি থেকে মজনুর কাছ থেকে ঘরে ফেরে। তারপর রতন আবার বাইরে যায় এবং সতীর্থদের ডেকে পুকুরপাড় থেকে লুকানো অস্ত্রগুলো বের করে আবার নতুন যুদ্ধের সূচনা করতে চায়। তারা দেশকে সম্পূর্ণ শত্রু মুক্ত করতে দৃঢ় প্রত্যয় পুনঃব্যক্ত করে।
এক রাতের গল্প পরবর্তী সাড়ে তিন হাত ভূমি উপন্যাসে দেখতে পাব। টু দ্য লাইট হাউজ উপন্যাস দিয়ে ভার্জিনিয়া ওলফ, ইউলিসিস উপন্যাস দিয়ে জেমস জয়েস এবং ডরথি রিচার্ডসন টু দ্য রুফটপ উপন্যাস দিয়ে উপন্যাস জগতে ‘স্ট্রিম অব কনসাসনেস’ বা ‘চেতনা-তরঙ্গ’ বা ‘চেতনা-প্রবাহ’ কৌশলের জন্য সাহিত্য জগতে সাড়া জাগিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্তঃশীলা এবং গোপাল হালদারের একদা এক দিনে ঘটনা-বর্ণনায় চেতনা-প্রবাহ রীতিতে লেখার জন্য বিশেষভাবে আলোচিত উপন্যাস হিসেবে মান্যতা পাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রথম এই রীতিতে লেখার কৃতিত্ব সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর, তিনি কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসে এই রীতি প্রয়োগ করেছেন। আমাদের আলোচনার সাড়ে তিন হাত ভূমি এক রাতের ঘটনার মধ্যে চেতনা-প্রবাহের রীতিটি দেখতে পাব। তবে, চেতনা-প্রবাহের রীতির একটি বৈশিষ্ট্য হলো ইনটেরিয়র-মনোলগ ও চিন্তার চেতনা থাকা। কথকের চিন্তা দিগি¦দিক ছুটোছুটি করবে, বর্তমানের কাহিনি কখনও অতীতে আবার অতীত থেকে বর্তমানে গড়াবে। ইমদাদুল হক মিলনের সাড়ে তিন হাত ভূমি উপন্যাসের পুরোটাই বলতে গেলে ইনটেরিয়র মনোলগ, চিন্তার গতিবিধিতে স্থিরতা লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে এর উপস্থিতি কম থাকলেও চেতনা-প্রবাহের দ্যোতনা রয়েছে বলা যায়। এক দিনের বর্ণনায় ও ঘটনাপ্রবাহে আরও কিছু উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে দেখা যায়। তন্মধ্যে শওকত ওসমানের চার সৈনিক এবং দিলারা হাশেমের একদা এবং অনন্ত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত। জানা যায় দিলারা হাশেমের এই উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বাংলা একাডেমির পুরস্কারে ভূষিত হন।
জীবনপুর
উত্তম পুরুষের জবানবন্দিতে প্রায় আড়াইশ পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ উপন্যাসটি রচিত। নাতিদীর্ঘ উপন্যাস বলা সমীচীন এই জন্য যে আমাদের হাতে অনেক ডাউস ডাউস দীর্ঘ উপন্যাস রয়েছে। এই লেখকেরই নূরজাহান উল্লেখযোগ্য। সেগুলোর তুলনায় এটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস হিসেবে মান্যতা পাওয়ার যোগ্য।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যখন একই বিষয়ের অধিক উপন্যাস-কাব্য-গল্প রচিত হয় তখন কাহিনি প্রায় একই রকম মনে হয় বা হয়ে যায়। সাহিত্য হয়ে পড়ে বৃত্তবন্দি। বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে রচিত হলে উপস্থাপনায় ও আঙ্গিকে নতুনত্ব আনা সম্ভব হলেও বিষয়বস্তুতে নতুনত্ব আনা দুরূহ। তবে সৃষ্টিশীল শিল্পীরা ভাবেন নতুনত্ব নিয়ে, তিনি সৃষ্টি করেন নতুন ধারার। ইজেলে ক্যানভাস চড়িয়ে রঙের খেলা খেলবেন, টানটোনে থাকবে নতুন মাত্রা এটাই স্বাভাবিক। সাহিত্য হলো শব্দের ছবি। কবি-সাহিত্যিকরা শব্দের ছবি আঁকতে গিয়ে ক্যানভাস বদলাবেন, আঙ্গিক বদলাবেন, রঙের বিন্যাস বদলাবেন―তা না হলে কী করে শব্দশিল্পী বা কথাশিল্পী হবেন ? ইমদাদুল হক মিলনের জীবনপুর উপন্যাসের বিষয়বস্তুতে নতুন উপকরণ রয়েছে, রন্ধনেও রসব্যঞ্জনা যুক্ত করায় গিন্নিপনার নৈপুণ্যও উজ্জ্বল। শিল্পসাহিত্যে শিল্পস্রষ্টাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাই বেশি প্রতিফলিত হয়। এই কথাটি জোরালোভাবে হাসান আজিজুল হক বলেছেন তাঁর ‘লেখকের উপনিবেশ’ প্রবন্ধে। তিনি অবশ্যই খুব বেশি জোর খাটিয়ে বলেছেন যে, অভিজ্ঞতার বাইরে লেখকের সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। এর সপক্ষে প্রমাণও দাঁড় করিয়েছেন কয়েকটি। আমি এতটা জোর না দিলেও অন্তত অকপটে স্বীকার করছি যে, লেখায় লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষণের প্রতিফলন ঘটে, চিন্তার প্রভাব পড়ে। ইমদাদুল হক মিলন স্বাধীনতা-উত্তর লেখালেখির জগতে পদার্পণ করে দু হাতে লিখে যাচ্ছেন। এ কারণেই তাঁর লেখায় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের ঘটনা ও সামাজিক বিষয়-আশয় বেশি প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর লেখা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলোও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কে ধারণ করেছে যদিও সমান্তরালভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রতিবিম্বও রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে চরম নাজুকাবস্থায় ছিল যা বলা বাহুল্য। পাকিস্তানিদের নির্মম শোষণ লুটপাট নির্যাতনের ক্ষত ও অভিঘাতের ফলে প্রতিটি সেক্টরে দগদগে ঘায়ের সৃষ্টি হয়েছিল এবং যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তখন যুব সমাজের, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান ও শূন্যতার জন্য ছিল চরম হতাশা। বেকারত্ব, কর্মহীনতা, দারিদ্র্য, কালোবাজারি, দুর্নীতির কারণে সবার মধ্যে হতাশা থাবা বিস্তার করেছিল। অনেকেই ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল। তার রেশ হালেও রয়েছে। জীবনপুর উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের এ রকম হতাশায় তাদের নৈতিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের স্রোতে ভেসে গিয়েছিল, স্বাধীনতার চেতনা, দেশপ্রেম-মূল্যবোধও উধাও হয়ে গিয়েছিল। রাতারাতি ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য অনেক সমাজবিরোধী কুকর্মে যুক্ত হয়েছিল।
জীবনপুর উপন্যাসের নায়কসহ আরও কয়েকজন সুখের প্রত্যাশায়, জীবিকার সন্ধানে দেশ ত্যাগ করে পাকিস্তানে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। সেখান থেকে সুযোগ হলে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই চলে যাবে অথবা পাকিস্তানেই থেকে যাবে। এই দুষ্ট চক্রের খপ্পড়ে পড়ে উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট মুক্তিযুদ্ধের চৌকশ সক্রিয় সহায়তাকারী ইনফরমার বা গুপ্তচর লাল মিয়ার জবানিতে উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহের বিস্তৃতি ঘটে।
লাল মিয়াকে বলা যায় ভাগ্যবিড়ম্বিত এক যুবক। সে শৈশবে আঁকতে পারত, গাইতে পারত, ছিল ফুটবল খেলোয়াড়, লেখাপড়ায় মোটামুটি, বিলুর সঙ্গে কৈশোরেই প্রেমে পড়ে তারপর বিচ্ছেদে মোহমুক্তি, মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য ট্রেনিং নিতে চাইল, তাকে বানানো হলো ইনফরমার―সব প্রত্যাশা নাকের ডগা বেয়ে হাওয়া হয়ে যায়―সে যেন অধরা পৃথিবীর ব্যর্থ এক মানুষ। এই মানুষটি দালালচক্রের সদস্য মোফজ্জল ও তার কথিত স্ত্রী (প্রকৃত স্ত্রী নয়) রানীর খপ্পড়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত কাজের সন্ধানে পাকিস্তান যাওয়ার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা চূড়ান্ত করে। পর্যায়ক্রমে এদের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে আরও অনেক দালাল এবং মানব পাচারকারী। মূল গল্পের স্রোত হতাশাগ্রস্ত বেকার এক দল তরুণ-তরুণীর দেশ ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার পথে নানা ঘটনাপ্রবাহ, দ্বিতীয় স্রোতটি পারিবারিক গল্প এবং তৃতীয় স্রোতটি মুক্তিযুদ্ধ অথবা উলটোভাবেও বলা যায়।
উপন্যাসটি উত্তম পুরুষে বিবৃত কিন্তু এই উপন্যাসে সুস্পষ্ট চেতনা-প্রবাহ (ংঃৎবধস ড়ভ পড়হংপরড়ঁংহবংং) বিদ্যমান। লাল মিয়াদের দলটি ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে প্রথমে রাজশাহী। রাজশাহী দিয়ে বর্ডার ক্রস করে চোরাই পথে দিল্লি যায়। কৌশলগত কারণে দিল্লির বস্তিতে তাদের অবস্থান নিতে হয়। সেখানকার বস্তিজীবনের দুর্বিষহ বর্ণনা এবং নারী বিক্রি ও পাচারের ঘৃণ্য চক্রান্তের ঘটনাপ্রবাহ শিউরে ওঠার মতো। মানুষ কতটা নিকৃষ্ট হতে পারে ও নিচে নামতে পারে, নারীর শরীর কতটা সস্তা পণ্য হতে পারে এবং দালালচক্র কতটা হিংস্র হতে পারে তা কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন এই উপন্যাসে। দলের সবাই চূড়ান্তভাবে নষ্টদের দখলে গেলেও লাল মিয়া অন্তত নিজের নৈতিকতা সমূলে ধ্বংস করেনি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমূলে বিনষ্ট করেনি, দেশপ্রেমের টান ও স্মৃতিমন্থনে তার হৃদয় প্রতি নিয়তই ক্ষত বিক্ষত হতে থাকে। আর দীর্ঘ পথযাত্রায় স্মৃতিপ্রবাহের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি ধীরে ধীরে উপন্যাসের পাতায় স্থান দখল করতে থাকে। যদিও এই উপন্যাসের কাহিনি, ঘটনা ও চরিত্রগুলো কাল্পনিক, তথাপি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি নিছক কাল্পনিক নয়। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় (তখনকার থানা) সংঘটিত মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ এবং যুদ্ধসংশ্লিষ্ট ঘটনা লেখক সুকৌশলে দুর্দান্ত প্লাস্টিক সার্জারিতে প্রতিস্থাপন করেছেন। প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো, মাইজবাগের বীর মুক্তিযোদ্ধা হলুদ মিয়াকে উপন্যাসের পৃষ্ঠায় স্থান দেওয়া এবং কর্নেল তাহেরের শ্বশুরবাড়ির উল্লেখ। তবে তিনি ঐতিহাসিক তথ্য দিয়ে প্রামাণ্য বা আধা-প্রামাণ্য ফিকশন রচনা করেননি।
অনেক বাধাবিপত্তি, অসংখ্য ঘটনার সমারোহ, মিথস্ক্রিয়া, রানীর সঙ্গে লালের মনস্তাত্ত্বিক রসায়ন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অনাহার-অর্ধাহার, রোগভোগ, অনিদ্রা-ক্লান্তি, নারীর শরীর বিক্রি, শিশুদের কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দুতিন দিন ঘুম পাড়িয়ে রাখার মতো অমানবিক কার্যসাধন করে বর্ডার ক্রস করা ইত্যাদি একটির পর একটি জীবনের যুদ্ধ জয় করে শেষপর্যন্ত অবৈধ পথে তারা পাকিস্তানের সীমায় যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু সে দেশের মাটিতে পা রেখে লাল মিয়ার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তার মনে পড়তে থাকে পাকিস্তানিদের অতীতের নির্যাতনের কথা এবং তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেয় স্বদেশে ফিরে আসবে। ফুল ডাকে। পাখি ডাকে। তার পা চলতে থাকে বাংলাদেশের দিকে। জীবনপুরের দিকে। উপন্যাসের সমাপ্তির দিকে।
ইমদাদুল হক মিলনের ভাষা সরল। ঝরঝরে। জটিল বা যৌগিক বাক্যের ব্যবহার নেই বললেই চলে; কদাচিৎ হয়তো মিলে। সরল ভাষায় পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন ভালো হয়। তাই বলা হয় তাঁর ভাষা কমিউনিকেটিভ। পাঠকের সঙ্গে মেলবন্ধন তৈরির জন্য সরল ও সাবলীল ভাষা অত্যাবশ্যকীয় সাহিত্যের উপাদান। তিনি প্রমিত চলিত ও আঞ্চলিক ভাষা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেন। স্ল্যাংও আছে। আছে সতেজ নিসর্গের রূপের বর্ণনা। এই উপন্যাসে তিনি মিথ, ইতিহাস, বাঙালি সংস্কৃতি ইত্যাদি অনেক বিষয়-আশয়ের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। তবে ঐতিহাসিক তথ্য ঠেসে ফিকশনকে ভারী করে ডকুফিকশন বানাননি। তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ফিকশন রচনায়, ইতিহাস রচনায় নয়। বলতে দ্বিধা নেই, ইমদাদুল হক মিলন যে অত্যন্ত পরিশ্রমী লেখক জীবনপুর তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
সাড়ে তিন হাত ভূমি
সাড়ে তিন হাত ভূমি ব্যতিক্রম শিল্পশৈলীতে রচিত উপন্যাস। কথক মুক্তিযোদ্ধা রবিউল―উত্তম পুরুষে এক রাতের বর্ণনায় মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ পৌনে তিনশ পৃষ্ঠা দখল করেছে। স্বর্ণগ্রামের চৌধুরী বাড়ির ছেলে মুক্তিযোদ্ধা রবিউল এক রাতে বাড়ি ফিরে বাবা মা বোন বকুল এবং সাড়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মায়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখে তাদের লাশ। পরিবারের আর কেউ জীবিত নেই। সে প্রতিটি লাশের জন্য একটি করে কবর খোঁড়ে আর স্মৃতিপ্রবাহে মুক্তিযুদ্ধসহ অতীতের পারিবারিক ঘটনাগুলো বর্ণনা করতে থাকে। কবর খোঁড়ার ঘটনা পরিক্রমায় হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পের স্মৃতি পাঠককে তাড়া করতে পারে। তবে সে গল্পে অবশ্যই নায়ক নিঃশব্দে গভীর রাতে লাশ সমাহিত করে। আর এই উপন্যাস ধারণ করেছে দেশভাগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের অসংখ্য নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনাবলি। প্রতিটি কবর খোঁড়ার সময় মুক্তিযোদ্ধার বুকে আবেগ ও কষ্টের ঝড় ওঠে। গল্পের গাঁথুনিও শক্ত, পাঠককে চুম্বকীয় আকর্ষণে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত।
‘ঘুমিয়ে থাকা গ্রাম’, ‘আমার মায়ের আঁচলখানি’ ও ‘বকুল ফুলের ভোরবেলাটি’―এই তিনটি অধ্যায়ে বিভাজিত এই উপন্যাস। প্রথম অধ্যায়ে বাবার কবর খোঁড়ার সময় মুক্তিযোদ্ধা প্রতিটি কোদালের কোপের পর স্মৃতিমন্থন করে এবং পারিবারিক উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়। এভাবেই উপন্যাসটি এগিয়ে যায় সমাপ্তির দিকে।
রবিউল কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল, কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে, দেশে কীভাবে রাজাকার বাহিনী সৃষ্টি হলো তাও বর্ণনায় আসে। উপন্যাস এগিয়ে যায়, কবর খোঁড়াও এগিয়ে যায়। ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চের গণহত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাযজ্ঞ, মধুদার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ড, আগরতলার ইতিহাস, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, উল্লেখযোগ্য নেতার নাম, সংখ্যালঘু ও নারী নির্যাতনের কথা যেন মুক্তিযোদ্ধা মৃত বাবার সৎকারের সময় কানে কানে শুনিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গণসঙ্গীতের কিছু কিছু পঙ্ক্তি, প্রাসঙ্গিক কবিতাংশ, মিথ, পাবলো নেরুদার কবিতাংশসহ বাংলাদেশে সংঘটিত ১০টি গণহত্যার সংক্ষিপ্ত চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে উপন্যাসে।
তারপর মায়ের কবর খোঁড়ার সময় মায়ের আদর-স্নেহ, পারিবারিক নিবিড় ভালোবাসার স্মৃতির বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। নিজের পড়ালেখার ঘটনা ও খালাত বোন মায়ার সঙ্গে বিয়ের ঘটনাপ্রবাহও স্থান পেয়েছে। বেয়নেটের খোঁচায় মায়ার ক্ষতবিক্ষত মুখের বর্ণনা আবেগকাতরতা জাগ্রত করে। কয়েকজন সেক্টর কমান্ডারের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়ে বকুলের কবর খোঁড়ার সময় পিরোজপুরের ‘ভাগীরথী’র আত্মত্যাগের বর্ণনাটিও এই উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে―কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার প্রশ্ন―এই স্মৃতি নিয়ে আমি করে বাঁচব! এই উপন্যাস স্বাধিকার আন্দোলনের অনেক ঘটনা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবদান যেমন জানা যায়, ঠিক তেমনই স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার ও বিহারিদের নির্যাতন ও লুটপাট সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
একাত্তর ও একজন মা
দেড়শ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের কাঠামো বা রচনাশৈলী এখানে আলোচিত অন্যান্য উপন্যাসের মতো নয়; কিছুটা ভিন্ন ধারার। এই উপন্যাসটিও সংলাপশাসিত, তেরোটি অধ্যায়ে বিভক্ত এবং প্রতিটি অধ্যায়ের কথক যথাক্রমে আনোয়ারা বেগম, মিলু, আজাদ, মিলু, আজাদ, মণি, মিলু, আজাদ, মিলু, মণি, মিলু, আজাদ ও মিলু। উত্তম পুরুষে কথন।
উপন্যাসের মূল কাহিনি একজন অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর অফিস ও পরিবারকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের অক্টোবরের ৭ তারিখের মাত্র এক দিনের ঘটনায় উপন্যাসের কাহিনি। দশ সন্তানের জননী আনোয়ারা বেগম পরিবারের দুর্দশার ঘটনার বর্ণনা সূচনা করেন ওই দিনের রাতের শেষ প্রহরে সুবেহ সাদেকের সময় যেদিন স্বামীর লাশ হাসপাতাল থেকে এনে বাসার বারান্দায় রাখা হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই মনে হয় কথকরা তাদের স্মৃতিচারণের কোনও অনুষ্ঠানে তাদের মনের কথা বলে যাচ্ছে। মিলু আজাদ ও মণি মৃত কর্মচারীর সন্তান। তারা বলেছে তাদের বাবার কথা। এই কাহিনি শুধু এগিয়ে যায়নি, প্রচুর ফ্ল্যাশব্যাক, পারিবারিক গল্পের ভাঁজে ভাঁজে মুক্তিযুদ্ধের কিছু কিছু ঘটনার বিস্তার।
একজন কেরানির তেরোজন মানুষের অভাবের সংসারের নানা অভাব-অনটনের কথা উঠে এসেছে উপন্যাসে। ১৯৭১ সালের অক্টোবরের ৭ তারিখে, আগের দিন ছিল শবেবরাত। সেই শবেবরাতের রাতে মিলুর বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। হাসপাতালে যাওয়া এবং হাসপাতাল থেকে লাশ বাসায় আনা এবং কবর দেওয়া পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ নিখুঁতভাবে উপন্যাসে বিবৃত হয়েছে। ডিটেইলিং বিদ্যমান। এই যে হাসপাতালে যাওয়া-আসা, লাশ আনা, লাশের গোসলসহ সৎকারের ঘটনা সংলাপের পর সংলাপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ হয়েছে। পরিবারের দুর্দশার জন্য এক কাবলির কাছ থেকে সুদের ওপর টাকা নিয়ে বাবা সংসারে খরচ করেছে এবং সেগুলো সুদে-আসলে সাড়ে সাত হাজার টাকা হওয়াতে ওদের বাবা আরও কঠিন সংকটে পড়েন। তখনই মিলিশিয়া নিয়ে এসে ধরে নেওয়ার হুমকি দেয় কাবলি।
আমির হোসেন নামের এক দুষ্ট প্রকৃতির লোকের গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি চাকরিচ্যুত হন। অবশ্যই পরে তাকে উদ্ধার করে আখতার হোসেন নামে আরেকজন। এর আগেও একবার সাসপেন্ড হয়েছিল। সহজ-সরল সৎ মানুষটি বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েই বারবার অর্থ-সংকটে পড়েছে এবং পরিবারের দুর্দশা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েছে।
গ্যাস্ট্রিকের রোগী ছিল মিলুর বাবা। ঘটনার দিন খাবার সোডা খেয়েই তার পাতলা পায়খানা শুরু হয় এবং হাসপাতালে যাওয়ার পর মৃত্যু হয়। প্রসঙ্গত, উল্লেখ করতে হয় যে ইমদাদুল হক মিলন নিখুঁতভাবে সময়ের ছবি এঁকেছেন তাঁর কথাসাহিত্যে। তখনকার সময়ের মানুষেরাই কেবল গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং খাবার সোডার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন, বর্তমান প্রজন্মের এই বিষয়ে বিশদ জানতে হলে পুস্তকাদি ঘাঁটতে হবে। আমরা দেখেছি গ্রামে গ্যাস্ট্রিকের জন্য অনেক মানুষ ট্যাঁকে খাওয়ার সোডার (সোডিয়াম বাই কার্বনেট; বেকিং সোডা নামেও পরিচিত) কৌটা রাখত। পেটে ব্যথা শুরু হলেই পানি দিয়ে সোডা খেত। অনেক মানুষ মারা যেত গ্যাস্ট্রিক আলসারের ব্যথায়। সে সময় এই ব্যাধির ভালো কোনও চিকিৎসা ছিল না। অনেককে অপারেশন করে পাকস্থলী বা ক্ষুদ্রান্ত্র বা বৃহদন্ত্রের ক্ষতস্থান কেটে ফেলে দেওয়া হতো। অনেকেই মারা যেত। সেই রকম একটি ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে কথাসাহিত্যিক মিলন এই উপন্যাসের সময়ের ছবি এঁকেছেন।
মিলুদের বাবার সৎকারের কাহিনি পর্যন্ত গড়াতে একাত্তর সালের মুক্তিবাহিনী, পাকসেনা, রাজাকারদের অত্যাচার নির্যাতন হত্যাযজ্ঞও গল্পে স্থান নিয়েছে।
মিলুর মা-বাবার আকাক্সক্ষা ছিল তার কোনও ছেলে মুক্তিযোদ্ধা হবে, মিলু পালিয়ে গিয়েওছিল কিন্তু শেষে ফিরে আসে। এই দুঃখবোধ ছিল বাবা-মায়ের মনে। দেশের প্রতি মায়ের অগাধ টান, স্বাধীনতাকামী নারীর মনের কথা উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়। মিলুরা আবেগকাতর হয়।
শেষে অনেক আশা-আকাক্সক্ষা, আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো এবং সেই সঙ্গে প্রত্যেক মানুষের মনে স্বপ্নের সূর্য প্রজ¦লিত হলো।
উপন্যাসের গঠনগত দিক থেকে চারজন কথক। কথকরা একাধিকবার ঘটনা ও স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গল্প বলার আসরে বসেছে এবং পাঠকের সামনে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উন্মোচন করে একটি দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের দুঃখ-কষ্টের কাহিনির সঙ্গে দেশের ইতিহাসও তুলে ধরেছে। একই ধরনের ফরম্যাটে অর্থাৎ একাধিক কথকের ফরম্যাট দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুরঙ্গ, সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী, হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া উপন্যাসে। এই উপন্যাসে কথকদের বর্ণনায় প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার রয়েছে যা বাস্তবসম্মত। কেননা, যে পরিবারের গল্পটি বলা হয়েছে সে রকম পরিবারের সদস্যরা মিশেল ভাষাই ব্যবহার করে থাকে।
‘বারেক’ চরিত্রটি এখানেও এসেছে। বলছি না লেখক নাম সংকটে পড়েছেন, বরং বলা যায় হয়তো বারেক নামের প্রতি লেখকের কোনও দুর্বলতা থাকতে পারে, যার ফলে কয়েকটি উপন্যাসে এই নামের চরিত্র পাওয়া যায়। সম্ভবত একটি ধারাবাহিক নাটকেও বারেক নামের একটি দুর্দান্ত আমুদে বখাটের চরিত্রও ছিল।
রাজাকারতন্ত্র
ওয়াহাব নামের আত্মস্বীকৃত রাজাকারের আত্মকথনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনি নির্মিতÑ উত্তম পুরুষে বিবৃত। সাধু চলিত ও আঞ্চলিক ভাষার মিশেল। ওয়াহাব পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী, লোভী এবং নিকৃষ্ট চরিত্রের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের সময় কীভাবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে কী কী কুকীর্তি করেছে তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছে নিজের ভাষায়। রাজাকার হলেও তার আত্মশ্লাঘার অভাব ছিল না। তবে সে শেখ মুজিবুর রহমানকে হাজার বছরের বড় নেতা হিসেবে অভিহিত করেছে এবং এমন মহান হৃদয়ের ব্যক্তি ও নেতা কোনও জাতির মধ্যে জন্ম নেয় হাজার বছর পর। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার জন্য সে বেঁচে গেছে সে গুণকীর্তনও রাজাকার ওয়াহাব করে।
পুরান ঢাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ওয়াহাবের স্ত্রী ফাতেমা, এইট পড়ুয়া রোগাসোকা কন্যা জরি, বাড়ির চাকর ও দোকানের কর্মচারী আলিমুদ্দিন এবং দোকানের কর্মচারী অকর্মণ্য করিম (ওর ভাষায় কইর্যা) নিয়ে ছিল তার ঢাকার জীবন। কাহিনির বিস্তার মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটি থেকে যে থানা কমিটির সে চেয়ারম্যান এবং পঁচাত্তরের আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর রাজাকারদের পুনরুত্থানের পর আরও কয়েক বছর। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে লুটতরাজ ও মুক্তিযোদ্ধা নয়নকে ধরে ও বেঁধে পাকসেনাদের হাতে তুলে দেওয়া এবং নয়নকে গুলি করে হত্যার ঘটনা বিধৃত হয়।
ডিসেম্বরের শুরুতেই পাক হানাদারদের বিদায় ঘণ্টা বাজতে শুরু করে আর সেই ঘণ্টাধ্বনির আঘাতে রাজাকারদের হৃৎপিণ্ডের কম্পন সৃষ্টি হয়। ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য সে একটি উপায় বের করে। ঢাকার সবকিছু ফাতেমাকে বুঝিয়ে দিয়ে সে চাকর আলিমুদ্দিনের গ্রামের বাড়ি চলে যায়। সেখানে সে সারা দিন লুকিয়ে থাকে এবং রাতে মাঝে মাঝে বের হয়। সেই সময় লক্ষাধিক টাকা ছিল ফাতেমা ও জরির জন্য। তাছাড়া দোকান তো ছিলই। আলিমুদ্দিন চালাত।
দিন যায়। রাত যায়। ফাতেমা আমড়া কাঠের ঢেঁকি করিমের সঙ্গে জরির বিয়ে দেয়। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টের পর ওরাও গর্ত থেকে বের হয়ে আসে।
জরির এক ছেলে হয়। নাম রুমি। ওয়াহাব বাসাতেই থাকে বেশি সময়। এই সময় রুমি তার প্রিয় সঙ্গী হয়। রুমির মুখের দিকে তাকালে ওর মনে হয় রুমির মুখে যেন দেখতে পায় সাহসী ও তেজি তারুণ্যদীপ্ত মুক্তিযোদ্ধা নয়নের মুখ। ওয়াহাব সানন্দে রুমিকে শোনায় তার রাজাকার জীবনের কাহিনি। শোনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। কিশোর রুমি বিস্মিত হয় নানার কথায় এবং এক সময় সে ঘৃণায় নানার মুখে থু থু ছিটিয়ে দেয়।
এই তো গল্প! এই তো কাহিনি! কিন্তু এটুকু দিয়ে কি আর তিন ফর্মার উপন্যাসটি হয়ে গেল ? না, তা হয়নি। চরিত্রের পূর্ণতার জন্য ডিটেইলিং আছে। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আছে। প্রেক্ষাপটের চমৎকার বর্ণনা আছে। কোথাও কোথাও আছে প্রকৃতির মনোরম বর্ণনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
উপন্যাসের শেষ প্যারাটি চমকে দেওয়ার মতো―
তুমি দালাল ছিলে, দেশদ্রোহী ছিলে ?
ছিলাম মানে কী, এখনও আছি।
সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ঘৃণা আর ক্রোধে জ¦লে উঠল রুমি। চোখ দিয়ে আগুন বেরুতে লাগল তার। পারলে আমার মুখে লাথি মারে। তা করল না রুমি। থুউক করে মুখ ভরতি থুতু আমার একদম মুখে ছিটিয়ে দিল। যেমন করে নয়ন দিয়েছিল, একদম তেমন করে। মুহূর্তে রুমি হয়ে গেল নয়ন। মুক্তিযোদ্ধা নয়ন। আর রুমির ছিটিয়ে দেওয়া থুতুতে মুখ চোখ ঝাপসা হয়ে গেল আমার। দেখতে পেলাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুর্দান্ত এক মুক্তিযোদ্ধা। দুর্দান্ত এক নয়ন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সৈনিক। শুনতে পেলাম, আমার চারপাশে আবার পা তুলছে মুক্তিযোদ্ধারা। বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা। ‘গণতন্ত্র’। পা ফেলছে। ‘গণতন্ত্র’। রাজাকারতন্ত্র শেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের। মুক্তিযোদ্ধারা এগুচ্ছে গণতন্ত্রের দিকে। আকাশের দিকে রাইফেল উঁচিয়ে স্লোগান দিচ্ছে ‘জয় বাংলা’। [মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র, ইমদাদুল হক মিলন, পৃষ্ঠা ১৪২]
নয়মাস
ছয় ফর্মা অর্থাৎ ছিয়ানব্বই পৃষ্ঠাবন্দি নয়মাস বইখানিতে নয়মাস ও ঘা নামে দুটি নভেলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দুটি নভেলার গল্পই সরল কিন্তু হৃদয়গ্রাহী। ইন্দ্রিয়ে নাড়া পড়ে। দুটি নভেলাই উত্তম পুরুষের বয়ানে রচিত।
নয়মাস আখ্যানের কথক পাকিস্তানি কিশোরী স্থানীয় একটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্রী মায়মুনা হায়দার খান। তার বাবা আশরাফ হায়দার খান টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, কাঁচপুরে বাতেন টেক্সটাইল মিলে চাকরি করেন। তারা থাকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ‘টেনামেন্ট হাউস’ নামে দশটি বিল্ডিংয়ের মধ্যে সাত নম্বর বিল্ডিংয়ে। স্কুলে বাঙালি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পরিচয়। বান্ধবী জারাহর পরিচয়ের সূত্রে এখানকার বাসিন্দা জনৈক লেখকের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে এবং এই লেখক বাংলাদেশ সৃষ্টির গল্প, পাকিস্তানিদের নির্যাতন, ভাগীরথীর হত্যার কাহিনি তাকে শোনালে সে খুব মর্মাহত হয় এবং পাকিস্তানিদের নির্যাতনের জন্য সে লজ্জায় ও ঘৃণায় পরিবারসহ বাংলাদেশ ত্যাগ করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে লেখকের কাছে পাকিস্তানিদের পক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদায় নেয়। নিঃসন্দেহে বলা যায় এই কিশোরীর ক্ষমা প্রার্থনা পাকিস্তানিদের পক্ষে প্রতীকী। লেখক কল্পনায় এক কিশোরীর মাধ্যমে পাকিস্তানিদের ক্ষমার কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন।
দ্বিতীয় নভেলা ঘা আখ্যানে জার্মানি প্রবাসী মিনহাজ মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের সহায়তা করার জন্য দেশে এসেছেন। তিনি নির্যাতিতা নারীদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এক দিন জনৈক রিকশাচালকের রিকশায় উঠে তাঁর বন্ধুর সঙ্গে তাদের অভিপ্রায় নিয়ে কথা বলার সময় রিকশাচালক শুনেছেন। পরে এক দিন মিনহাজের বাসায় গিয়ে হাজির হয়ে তিনি তাজবিবি নামে এক নারীর নির্যাতনের কথা জানালেন। কিন্তু নাটকীয়ভাবে নিজের পরিচয় দেননি। তাজবিবি বলতে গেলে নিশ্চল, তাঁর লজ্জাস্থান ও মলদ্বার এক হয়ে গেছে। নয়বার অপারেশন করার পরও ঠিক হয়নি। তারপর মলদ্বার ও লজ্জাস্থান বন্ধ করে দিয়ে নাভির নিচে পেট কেটে পেশাব-পায়খানার বিকল্প ব্যবস্থা করে দিয়েছে ডাক্তারগণ। তাজবিবি নিশ্চল, চলতে পারে না, সারা দিন ঘরের আবছা অন্ধকারে শুয়েবসে থাকে। তার স্বামীই তাকে রান্না করে খাওয়ায়, গোসল করায় আর সেবাযত্ন করে। তারপর মিনহাজ তার বন্ধুকে নিয়ে সেই নারীকে দেখতে যান। সেখানে নাটকীয়ভাবে পরিচয় ঘটে তাজবিবির স্বামী আর কেউ নন, তিনিই রিকশাচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা রমজান আলি।
স্তম্ভিত হয়ে পড়েন মিনহাজ ও তার বন্ধু। তারা ভাবেন, এই অসহায় দম্পতিকে একটি বাড়ি করে দেবেন।
স্বল্প বিস্তরে এটি সরল গল্প হলেও এতে আরও দু-একটি চরিত্র, মুক্তিযুদ্ধের গভীর ক্ষত, নিস্তরঙ্গ বিষাদনদী চিত্রিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের কিছু উত্তাপ ছড়িয়েছে।
পূর্বে বলা হয়েছে ইমদাদুল হক মিলন অত্যন্ত পরিশ্রমী লেখক। শেষ করতে চাই এই বলে যে, তিনি শুধু পরিশ্রমী নন, আত্মবিশ্বাসী ও নিষ্ঠাবান। তাঁর সৃষ্টিতে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করেন, আংশিক নয়। তাঁর সমস্ত সত্তাব্যাপী সাহিত্য ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনে হয় না। আগামী দিনে নূরজাহানের মতো কালজয়ী আরও উপন্যাস তিনি উপহার দেবেন সে প্রত্যাশা বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমীরা করতেই পারে।
লেখক : কথাশিল্পী



