আর্কাইভপ্রবন্ধ

প্রবন্ধ : হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে পুরাণের নবরূপায়ণ : শূর্পণখা : তপন দেবনাথ

রামায়ণ মহাকাব্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ অথচ উপেক্ষিতা এক খল নারীচরিত্র-শূর্পণখা। বলা যায়, রাম রাবণের যুদ্ধ ও লঙ্কাপুরী ধ্বংসের মূল হোতা এই রাক্ষসী। কথিত আছে, কুরূপা এই রাক্ষসী যদি না থাকত, তাহলে বোধ করি এই মহাকাব্যটিই রচিত হতো না। সৃষ্টিও হতো না-‘লঙ্কাকাণ্ড’, ‘লঙ্কাভাগ’, ‘লঙ্কায় মরল রাবণ, বেহুলা কেঁদে সারা’, ‘লঙ্কায় গেলেন দরিদ্রা, নিয়ে এলেন হরিদ্রা’, ‘রাম রাবণের যুদ্ধ’, ‘রাবণের চিতা’, ‘রাবণের দোষে সমুদ্রবন্ধন’, ‘রাবণের হাতে যথা, মারীচ কুরঙ্গ’, ইত্যাদি অসংখ্য প্রবাদ প্রবচন ও বাগধারা। শূর্পণখা চরিত্রটি রামায়ণে ব্যাপক আলোকায়িত নয়; অথচ এই চরিত্রটির কারণে সৃষ্ট ঘটনাক্রম মহাকাব্যের প্রায় অর্ধাংশ জুড়ে বিস্তৃত ও সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তবে এই খলচরিত্রটি সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি। কারণ তাকে নিয়ে খুব একটা গদ্য রচনা হয়নি। হরিশংকর জলদাসের শূর্পণখা উপন্যাসের বদৌলতে জেনে নেওয়া যাক, তার অজানা কিছু কাহিনি ও রামায়ণের নবরূপায়ণ।

বাংলাদেশে বর্তমানে অতি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস (জন্ম : ৩ মে ১৯৫৩)। কর্মেই যার পরিচয়, তাঁকে পাঠকদের কাছে নতুন করে পরিচিত করার কোনওই প্রয়োজন নেই। তবু চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গা গ্রামের জেলেপল্লিতে বেড়ে ওঠা এই গুণীজনের কথাসাহিত্য নিয়ে আমার জানা মতে বাংলাদেশ ও ভারতে অন্তত পাঁচজন গবেষক পিএইচডি থিসিস রচনা করেছেন। ফলে নিজ গুণেই হয়ে উঠেছেন বাঙালির জনবল্লভ। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার, সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার (২০১২ সালে রামগোলাম উপন্যাসের জন্য, ২০২৪ সালে কথাপ্রকাশ প্রকাশিত উপেক্ষিতা সীতার জন্য), বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন পদক, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক ইত্যাদি। তাঁর সাহিত্যকর্মের দুটি ধারা। বর্তমান সমাজের প্রান্তজনদের নিয়ে লেখা গল্প, উপন্যাস, গবেষণা ও জীবনভিত্তিক গ্রন্থাদি। এই প্রান্তজনের মধ্যে জেলে, কামার-কুমোর, মেথর, দিনমুজর, বিভ্রান্ত নারী চরিত্রগুলোকে প্রধান্য দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। এজন্যই বোধ করি তাঁর লেখা অনেক উপন্যাস, গল্প, গবেষণা ও জীবনভিত্তিক গ্রন্থ পাঠক হৃদয়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে। এরপর হঠাৎ তিনি তাঁর লেখায় বাঁক বদল করলেন। বাঁক বদল করতে গিয়ে তিনি পুরাণকে তথা রামায়ণ ও মহাভারতকে লেখার আধার হিসেবে গ্রহণ করলেন। এই পুরাণ মহাকাব্যাদিকে উপজীব্য করে প্রকাশ করেন নয়টি পৌরাণিক উপন্যাসÑসেই আমি নই আমি, একলব্য, মৎস্যগন্ধা, দুর্যোধন, কর্ণ, উপেক্ষিতা সীতা, শূর্পণখা, ঘটোৎকচ এবং কচদেবযানী। তিনি মহাভারত ও রামায়ণে বর্ণিত প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পৌরাণিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে উপন্যাসে উপর্যুক্ত চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব ও তার মানবিক দিকগুলো অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছেন। শূর্পণখা তাঁর সপ্তম পৌরাণিক উপন্যাস, যা ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারিতে কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়।

শূর্পণখার জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরাকাণ্ডের রাবণাদি পূর্ববৃত্তান্ত (সর্গ ৯-১৩) অংশে বর্ণিত আছেÑ‘সুমালী তাঁর রূপবতী কন্যা কৈকসীর সঙ্গে রসাতল থেকে মর্ত্যলোকে বেড়াতে এলেন। সেই সময়ে ধনেশ্বর কুবের পুষ্পকরথে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখে সুমালী পুনর্বার রসাতলে ফিরে গিয়ে কৈকসীকে বললেন, পুত্রী, তোমার বিবাহযোগ্য যৌবনকাল অতীত হচ্ছে, তুমি পুলস্ত্যপুত্র মুনিবর বিশ্রবাকে পতিত্বে বরণ করো। কৈকসী তপোনিরত বিশ্রবার কাছে এসে অধোমুখে অঙ্গুষ্ঠ দিয়ে মৃত্তিকায় অঙ্কন করতে লাগলেন। উদারপ্রকৃতি বিশ্রবা প্রশ্ন করলেন, তুমি কার কন্যা, কি চাও ? কৈকসী যুক্ত করে বললেন, ব্রহ্মর্ষি, আমি সুমালীর কন্যা কৈকসী, পিতার আজ্ঞায় এখানে এসেছি, আপনি নিজের প্রভাবে আমার অভিপ্রায় বুঝে নিন। বিশ্রবা ধ্যানস্থ হয়ে বললেন, তোমার উদ্দেশ্য পুত্রলাভ, কিন্তু তুমি দারুণ প্রদোষকালে এসেছ, সেজন্য তোমার পুত্রগণ দারুণ ক্রূরকর্মা রাক্ষস হবে। কৈকসী বললেন, ভগবান, আপনার কাছে আমি দুরাচার পুত্র চাই না, আপনি দয়া করুন। বিশ্রবা বললেন, তোমার শেষ পুত্র আমার বংশানুরূপ ও ধর্মাত্মা হবে। যথাকালে কৈকসী (নিকষা) এক দারুণ রাক্ষস প্রসব করলেন, এই পুত্র দশগ্রীব বিংশতিহস্ত মহাদংষ্ট্র নীলাঞ্জনবর্ণ। ইনিই রাবণ। তার পর মহাবল কুম্ভকর্ণ, বিকৃতাননা শূর্পণখা এবং কনিষ্ঠ পুত্র ধর্মাত্মা বিভীষণের জন্ম হ’ল।’১

মহাভারতে পাইÑ‘কুবের একসময় পিতা বিশ্রবার কাছে তিনজন রাক্ষসী পরিচারিকা পাঠিয়েছিলেন। তাদের অন্যতম ছিল রাকা। বিশ্রবার ঔরসে রাকার গর্ভে খর ও শূর্পনখার জন্ম হয়। রাকায়া মিথুনং জজ্ঞে খরঃ শূর্পণখা তথা [মহা (শ) ৩.২৭৫.৮; (হরি) ৩.২২৯.৮]। এই সম্পর্কের নিরিখে শূর্পণখা রাবণের বৈমাত্রেয় ভগিনী।’২

আবার হরিশংকর জলদাস উপন্যাসে দেখতে পাই-বিচক্ষণ ও শিক্ষিতা কৈকসী তার পিতা রাক্ষসরাজ সুমালীর আদেশে বিশ্রবার সাথে দেখা করতে আসে। উদ্দেশ্যÑবিশ্রবার ঔরসে যেন তার গর্ভে একটি পুত্রসন্তান জন্মে। শুধু একটি পুত্রসন্তানের বাসনা থাকলেও জন্মেছিল চারটি সন্তানÑরাবণ, কুম্ভকর্ণ, শূর্পণখা ও বিভীষণ। কৈকসীকে বিশ্রবার কাছে পাঠানোর পেছনে সুমালীর হয়তো অন্য একটি উদ্দেশ্য ছিল। তা হলো, কৈকসীর গর্ভের পুত্রসন্তানের মাধ্যমে লঙ্কাপুরী পুনরুদ্ধার করানো। উপন্যাসে তেমনই ইঙ্গিত দেখতে পাই। রাবণ যখন বড় হয় তখন কৈকসী বলেছিল, ‘পরাধীন লঙ্কাকে স্বাধীন কর রাবণ। এই নগরী রাক্ষসদের। কুবের সেখানে অনধিকার প্রবেশ করেছে। লঙ্কা থেকে কুবেরকে তাড়াও পুত্র।’৩ রাবণকে কৈকসীর এই উপদেশ বা নির্দেশ রামায়ণে উল্লেখ নেই। তবে বাল্মীকি রামায়ণে বর্ণিত অন্যান্য তথ্যের সাথে হরিশংকর জলদাসের  তথ্যচিত্রের সাদৃশ্য লক্ষণীয়। উল্লেখ্য, সুমালী ওই সময় লঙ্কাপুরী থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পাতালে বাস করছিল। আর বিশ্রবার প্রথমা স্ত্রী দেববর্ণিনীর গর্ভজাত সন্তান কুবের ছিল লঙ্কাপুরীর অধীশ্বর।

শূর্পণখার চেহারা সম্পর্কে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী বলেন, ‘জন্ম থেকেই তাঁকে দেখতে ভালো ছিল না। শূর্প মানে কুলো। তাঁর নখগুলো ছিল কুলোর মতো খানিক চ্যাপটা। তাই কৈকসী তার নাম দিলেন শূর্পণখাÑততঃ শূর্পনখা নাম সংযজ্ঞে বিকৃতাননা।’২ কিন্তু হরিশংকর জলদাসের মতে, শূর্পণখা নাম দিয়েছেন পিতা বিশ্রবা।৪

আঞ্চলিকতার ওপর ভিত্তি করে শূর্পণখার বিভিন্ন ধরনের নাম পাওয়া যায়। যেমনÑতামিল ভাষায় সূর্পণগৈ, ইন্দোনেশীয় ভাষাতে সর্পকনকা, খমের (কম্বোডীয়) ভাষাতে শূর্পণখর, মালয় ভাষাতে শূরপণ্ডাকী এবং থাই ভাষাতে শম্মণক্খা। বিভিন্ন লোককাহিনি এবং কিছু প্রাচীন গ্রন্থে এমন তথ্যও পাওয়া যায় যে, শূর্পণখা  জন্মকালে ‘মীনাক্ষী’ নামে পরিচিত ছিলেন। কারণ তার চোখ ছিল মাছের মতো। এই নামটি ‘মীন’ (মাছ) এবং ‘অক্ষী’ (চোখ) শব্দ দুটি থেকে এসেছে। আবার অনেকের মতে, চাঁদের মতো আকৃৃতির নখের জন্য তিনি ‘চন্দ্রনখা’ নামেও পরিচিতা ছিলেন। অনেকের ধারণা ‘মীনাক্ষী’ নামটি স্বয়ং রাবণ দিয়েছে; আবার কারও মতে এই নাম রেখেছিল কৈকসী। কিন্তু ‘চন্দ্রনখা’ নামটি কে দিয়েছে তা জানা যায়নি। শূর্পণখার জন্মকালে কিংবা পরবর্তী সময়ে ‘মীনাক্ষী’ কিংবা ‘চন্দ্রনখা’ নামের অস্তিত্ব বাল্মীকি রামায়ণে উল্লেখ নেই। হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে কেবল ‘শূর্পণখা’ নামই রয়েছে, অন্য কোনও নামের বর্ণনা তিনি উল্লেখ করেননি।

আবার রামায়ণ মহাকাব্যের বিভিন্ন সংস্করণের মধ্যে শূর্পণখার চেহারার বিবরণ ও চরিত্রের বর্ণনায় বিভিন্নতা দেখতে পাই। রাজশেখর বসুর বাল্মীকি রামায়ণে শূর্পণখা কুরূপা লম্বোদরী তাম্রকেশা কর্কশকণ্ঠী বৃদ্ধা কামরূপী রাক্ষসী।৫ বিপরীতে, তামিল কবি কাম্বা রামায়ণম তাকে সুন্দরী, তন্বী, মৎস্যের মতো চোখ এবং মোহময়ী নারী হিসেবে বর্ণনা করে।৬

শূর্পণখা কীভাবে বেড়ে উঠেছিল সে-ব্যাপারে রামায়ণে কোনও বর্ণনা নেই। তবে হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে শূর্পণখার ছোটবেলা ও যৌবনকালের বিভিন্ন চেহারার সুনির্দিষ্ট বিস্তর বিবরণ পাইÑ‘ছোটবেলায় চেহারা ভালো ছিল না তার। মুখের আদলটা ছিল বিশ্রীর দিকে। অন্যান্য অনার্যবালিকার মতো গায়ের রং কালো ছিল ঠিকই, কিন্তু কালোরঙের মধ্যেও যে একটা পেলবঘন সৌষ্ঠব থাকে, তা শূর্পণখার ত্বকে ছিল না। নাকটা বোঁচা ছিল, চোখ ছিল ড্যাবডেবে। …যুবতী শূর্পণখার দেহবর্ণ কালো বটে, কিন্তু সেই কালোত্বের কী অপরূপ সৌন্দর্য! বোঁচা নাকটা বর্তমানের শূর্পণখার শ্রী বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। চেহারাতেও বিপুল এক পরিবর্তন ঘটে গেছে। আগে মুখে যে ভাঙচুর ছিল, যুবতী শূর্পণখার মুখমণ্ডলে এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। সুশ্রী মুখমণ্ডলে তীব্র মোহিনী দুটো চোখ এখন শূর্পণখার।’৭

কিন্তু হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে শূর্পণখার ছোটবেলা ও যৌবনকালের চেহারার তুলনা থাকলেও তাতে কেশরাশি ও কণ্ঠস্বরের কোনও উল্লেখ নেই। অন্য দিকে রাজশেখর বসুর বাল্মীকি রামায়ণে শূর্পণখার বাল্য ও যৌবন কালের কোনও বর্ণনা উল্লেখ নেই। শূর্পণখা রাক্ষসবংশীয়। রাক্ষসদের মধ্যে মায়াবিদ্যা, উড্ডয়ন ক্ষমতা, বর্ধিত দৈহিক শক্তি এবং অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এই কারণে হয়তো বা শূর্পণখার চেহারা নিয়ে এত মতানৈক্য।

পূর্ণ যৌবনা শূর্পণখাকে নিয়ে পাঠকদের মনে নানা প্রশ্নÑবিদ্যুদজিহ্বর সাথে শূর্পণখার বিয়ে কীভাবে হয়েছিল ? Ñসে কি স্বেচ্ছায়, নাকি রাবণের পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করেছিল ? রাবণ আপন বোন শূর্পণখার স্বামী বিদ্যুদজিহ্বকে নিধন করল কেন ? এর পেছনে কি কোনও কূটচাল আছে ? শূর্পণখা কি স্বামীনিধনের শোধ নিয়েছিল ? সীতাহরণের ফল কী দাঁড়াল ? রাবণের জ্বলন্ত চিতার সামনে দাঁড়িয়ে শূর্পণখা অশ্রুহীন থাকল কেন ? পাঠকের এসব প্রশ্নের উত্তর ধারণ করেই প্রথিতযশা হরিশংকর জলদাস টানটান ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায়, ঋজু ও মর্মভেদী বক্তব্যে লিখেছেন উপন্যাসÑশূর্পণখা। বাল্মীকি রামায়ণে ‘শূর্পণখা’র কর্ণ-নাসিকা কর্তনের বিবরণ এবং সীতাহরণের ইন্ধনদাতা হিসেবে বর্ণনা আছে, নেই কোনও বিপ্রতীপ ভাবনার অভিজ্ঞান। তাই হয়তো বা পাঠকমনে এত জিজ্ঞাসা। সেই অভিজ্ঞান খুঁজতে চোখ ফেরানো যাক হরিশংকর জলদাসের শূর্পণখা উপন্যাসে।

বিদ্যুদজিহ্বর সাথে শূর্পণখার বিয়ে কীভাবে হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে মতান্তর। বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীর রামায়ণের পেঙ্গুইন সঙ্গী গ্রন্থ থেকে জানা যায়Ñ‘শূর্পণখা উপযুক্ত বয়সে দৈত্যবংশধর দানব রাজপুত্র বিদ্যুদজিহ্বকে গোপনে বিয়ে করে। স্বভাবতই শূর্পণখার বিয়ে রাক্ষসকুল থেকে দৈত্যকুলে হওয়ায় জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাবণ ক্রুদ্ধ হয়েছে। দানবরা নীতিগতভাবে রাক্ষসদের বিপক্ষে। তাই রাক্ষসরা তাদের শত্রু বলে মনে করত। এ কারণে রাবণ শূর্পণখাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে চাইলে তাঁর প্রথমা স্ত্রী মন্দোদরী বাধাদান করে। ফলে বোনের ইচ্ছাকে সম্মতি জানিয়ে তার সম্মানরক্ষার জন্য সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার জন্য মন্দোদরীকে অনুরোধ করে। এভাবে রাবণ শূর্পণখার বিয়েকে ও দানবকুলকে নিজ আত্মীয় মেনে নিয়ে তাতে সামাজিক সম্মতি দেয়।’৮

আবার রামায়ণ ও মহাভারতের উদ্ধৃতি দিয়ে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী পুরাণকোষ [পঞ্চম খণ্ড] গ্রন্থে উল্লেখ করেনÑ‘রাক্ষস রাবণ লঙ্কারাজ্য লাভ করার পর ভগিনীর বিবাহ নিয়ে চিন্তা করতে লাগলেনÑতত প্রদানং রাক্ষস্যা ভগিন্যাঃ সমচিন্তয়ৎ। অবশেষে দানবরাজ কালকাসুরের ছেলে বিদ্যুদজিহ্বের সঙ্গে তিনি বোনের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন।Ñ

দদৌ তাং কালকেয়ায় দানবেন্দ্রায় রাক্ষসীম্।

স্বসাং শূর্পনখাং নাম বিদ্যুদজিহ্বায় রাক্ষসঃ ॥’২

রাজশেখর বসুর বাল্মীকি রামায়ণে শুধু উল্লেখ আছে―‘ভ্রাতাদের সাথে পরামর্শ করে রাবণ দানবরাজ বিদ্যুদ্জিহ্বের সঙ্গে ভগিনী শূর্পণখার বিবাহ দিলেন।’৯ অন্যদিকে, হরিশংকর জলদাস উপন্যাসে শূর্পণখার বিয়ের পূর্বাপর বিস্তর বিবরণ আছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, শূর্পণখা বালিকা থেকে তরুণী, তরুণী থেকে যুবতী হয়ে উঠলেও বিয়ের যোগ্য কন্যাকে পাত্রস্থ করার ব্যাপারে পিতা বিশ্রবা ছিল নির্বিকার। ফলে শূর্পণখা পিতার উদাসীন দৃষ্টির সামনে অনেকটাই বৈরী পরিবেশের মধ্যে যৌবনবতী হয়ে ওঠে। শূর্পণখার বিয়ের ব্যাপারে পিতা যে কর্তব্য সম্পাদন করেনি, সেই কর্তব্যতাড়না রাবণের মধ্যে লক্ষ করা গেছে। রাবণ উপযুক্ত পাত্রের সন্ধানে নানা স্থানে গুপ্তচর পাঠায়। এক্ষেত্রে দূত বা ঘটক পাঠানোর কথা। কিন্তু রাবণ তা করল না। তার বিশ্বাসÑঘটক বা দূতরা বাড়িয়ে বলবে। যথাযথ সংবাদ তাদের কাছে পাওয়া যাবে না। গুপ্তচররাই পারবে নির্ভেজাল তথ্য সংগ্রহ করতে। তাই গুপ্তচরের অন্বেষিত পাত্র বিদ্যুদ্জিহ্বের সঙ্গে শূর্পণখাকে রাবণ সাড়ম্বরেই বিয়ে দেয়।১০

শূর্পণখার বিয়ে নিয়ে মতান্তর যাই থাকুক না কেন, রাজশেখর বসু, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী ও হরিশংকর জলদাসের তথ্যপ্রবাহের মধ্যে একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়Ñরাবণ শূর্পণখাকে স্বপ্রণোদিত হয়েই বিয়ে দেয়। ভাদুড়ী উপর্যুক্ত বিবরণের বাইরে কিছু উল্লেখ করেননি। পক্ষান্তরে, হরিশংকর জলদাস শূর্পণখার বিয়ে কীভাবে হয়েছে তা বিস্তর তুলে ধরেছেন উপন্যাসে। এখানে উপন্যাসে পুরাণের নবরূপায়ণ লক্ষণীয়।   

প্রশ্ন জাগে, দানবরা নীতিগতভাবে রাক্ষসদের বিপক্ষ হলেও দানবশ্রেষ্ঠ কালকাসুর রাক্ষসী শূর্পণখার সঙ্গে পুত্র বিদ্যুদজিহ্বকে বিয়ে দিতে রাজি হলো কেন ? এ-প্রসঙ্গে হরিশংকর জলদাস উপন্যাসে তাঁর অভিজ্ঞান তুলে ধরেন এভাবেÑ

প্রস্তাব পাঠাল রাবণ কালকাসুরের কাছে। প্রস্তাবটা লুফে নিল কালকাসুর। বয়স্ক, অভিজ্ঞ রাজা সে। দূরদর্শীও। কালকাসুর বুঝে গিয়েছিলÑএই রাবণ একদিন দুনিয়া কাঁপাবে। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল নিজের কব্জায় নিয়ে আসবে একদিন। সুর-অসুর তার ভয়ে কাঁপবে এবং সেই দিনটি খুব বেশি দূরে নয়।১১

বোধ করি এই আশঙ্কায় পাতালরাজ্যের অসুরপতি কালকাসুর পুত্র বিদ্যুদজিহ্বের সঙ্গে শূর্পণখার বিয়ের প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে রাজশেখর বসুর বাল্মীকি রামায়ণ, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর পুরাণকোষ কিংবা অন্য কোনও পণ্ডিতজনের লেখায় এই সংক্রান্ত কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। এখানেই হরিশংকর জলদাস উপন্যাসে পাঠককে বিপ্রতীপ ভাবনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।

কালকাসুর পুত্রের সঙ্গে শূর্পণখার বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তার অজুহাতে রাবণের পরাক্রম থেকে পাতালপুরী রক্ষা করার একটা উপায় খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু তাতে কি তার শেষ রক্ষা হয়েছিল ?

না। শেষ রক্ষা তো হয়নি বরং পুত্রকেই হারাতে হয়েছে। যদিচ শূর্পণখার সাথে বিয়ে না দিলেও যে পুত্রকে হারাত না, তা বলা যায় না। কারণ রাবণ ছিল দুরাচারী ও জিঘাংসু দানব; যে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল নিজের কব্জায় রাখতে ব্রতী হয়। এই ব্যাপারে হরিশংকর জলদাস বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন উপন্যাসে, যা কোনও রামায়ণেই উল্লেখ নেই। এখানেই তাঁর উপন্যাসের নবরূপায়ণ।

শূর্পণখার বিয়ের পর রাবণ সমস্ত পৃথিবীর ওপর প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয়। দুর্দমনীয় সৈন্যবাহিনী গঠন করে রাজ্যজয়ে বেরিয়ে পড়ে। একে একে বহু রাজ্যজয়ের পর একদিন সে অশ্মাননগরী আক্রমণ করতে এল। রাজ্যজয়ের নেশায় উন্মাদ রাবণ যেন ভুলেই গেছে এই রাজ্যের যুবরাজ বিদ্যুদজিহ্বের সঙ্গে ভগিনী শূর্পণখাকে বিয়ে দিয়েছিল। রাবণ ভুলে গেলেও বিদ্যুদজিহ্ব ঠিকই রাবণকে চিনতে পেরেছিল। অভিমান প্রবল হয়ে সে বলেছিল, ‘জ্যেষ্ঠ সহোদর হয়ে ভগিনী শূর্পণখার শ্বশুররাজ্য আক্রমণ! এ কেমন দাদা! যে দাদা বোনের সুখ বোঝে না, যে দাদার কাছে আত্মীয়তার কোনও মূল্য নেই, সেই দাদার কাছে আত্মীয়তার দাবি নিয়ে দূত পাঠাবে না বিদ্যুৎজিহ্ব।’১২

বিদ্যুদজিহ্ব রাবণশক্তির মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিল। যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে স্বামীকে বাধা দিয়েছিল শূর্পণখা। বলেছিল, ‘যুদ্ধ-উন্মাদ হয়ে গেছে দাদা রাবণ। উন্মাদদের হিতাহিতজ্ঞান থাকে না। রক্তপিপাসুদের কাছে মা-বাবা-ভাই-বোন বলে কিছু নেই। রক্তনেশা পেয়ে বসেছে রাবণকে। দাদা কি জানে না, এই রাজ্যের যুবরাজ বিদ্যুৎজিহ্বের সঙ্গে তার বোনের বিয়ে দিয়েছে ? মনে আছে তার সব। আমার বড় ভয় করছে বিদ্যুৎ। তুমি যুদ্ধে যেয়ো না। উন্মাদটা কখন কী করে বসে তার ঠিক নেই।’১৩

শূর্পণখা অবশ্য যুদ্ধ বন্ধ করার প্রস্তাব নিয়ে রাবণের কাছে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু বিদ্যুদজিহ্ব তাতে রাজি হয়নি। অভিমানক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, ‘না। তা হয় না শূর্পণখা। তাহলে আমি অপমানবোধ করব। দানবশ্রেষ্ঠ কালকাসুরের মাথা নত হয়ে যাবে। সর্বোপরি দানবজাতির জয়ের যে ইতিহাস, তা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। বউকে ব্যবহার করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে আমি রাজি নই শূর্পণখা।’১৪

যুদ্ধ শুরু হলো। রাবণ আর বিদ্যুদজিহ্বের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ চলল। যুদ্ধের একপর্যায়ে ধারালো অসির এক টানে বিদ্যুদজিহ্বের গলা কেটে ফেলল রাবণ। রাবণের যুদ্ধজয় হলো ঠিকই কিন্তু শূর্পণখার সুখের দাম্পত্যজীবন ছারখার হয়ে যায়! শুধুই কি তাই, পাষণ্ড লম্পট চরিত্রহীন রাবণ নিজের ভগ্নিপতিকে হত্যা করে পাতালপুরী দখল তো করলই, সাথে পরাজিত দেশের সুন্দরী রমণীদের হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যেতে থাকল। এর মধ্যে নিজের বোন শূর্পণখাকেও ছাড় দিল না। শূর্পণখা এতই উপেক্ষিতা ছিল যে, বাল্মীকি রামায়ণে তার স্বামীর মৃত্যু কীভাবে হলো তার কোনও বিবরণ নেই। তবে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী কিছুটা তথ্য প্রদান করেছেন। এক্ষেত্রে হরিশংকর জলদাস অবশ্যই অনেক ধন্যবাদের প্রাপ্যতার দাবিদার। তিনি দিয়েছেন বিস্তর বিবরণ। তবে এখানে একটা খটকা থেকেই যায়Ñরাবণ নিজের ভগ্নিপতিকে চিনবে না, তা কি কখনও হয়!

সংগত কারণেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে অশ্মাননগরী আক্রমণে রাবণের কি শুধুই রাজ্যজয়ের নেশা কাজ করেছিল ? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনও উদ্দেশ্য!

না। রাবণের কেবল রাজ্যজয়ের নেশা কাজ করেনি। ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি ভয়। হরিশংকর জলদাস এরই গুপ্তরহস্য শূর্পণখার মাধ্যমে তাঁর উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। বহুসংখ্যক যুদ্ধবন্দির সঙ্গে শূর্পণখা লঙ্কায় এসে সভাসদের সামনে গলা চড়িয়ে রাবণকে বলল, ‘বিদ্যুদজিহ্ব রণদক্ষ একজন দানববীর। তার যুদ্ধকুশলতা আর বীর্যবত্তার কথা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে ছিল যুদ্ধপ্রিয় মানুষ। এ জন্য বিরাট এক সৈন্যবাহিনী তৈরি করেছিল সে। এসব কিছু তোমার কানে পৌঁছে গিয়েছিল দাদা। তুমি ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুদজিহ্বকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করেছিলে। ভেবেছিলেÑ তাকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে না দিলে একদিন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হবে তোমাকে। তুমি তাকে হত্যার পরিকল্পনা করলে এবং অশ্মননগরী আক্রমণ করে বসলে তুমি।’১৫

আবার যুদ্ধ করার সময় রাবণ কি সত্যিই বিদ্যুদজিহ্বকে চিনতে পারেনি ? না কি তা-ও ছিল তার অপলাপবাক্য!

হ্যাঁ, রাবণ ঠিকই বিদ্যুদজিহ্বকে চিনতে পেরেছিল, যার বহিঃপ্রকাশ বাল্মীকি রামায়ণে উল্লেখ নেই। কিন্তু হরিশংকর জলদাস তা প্রকাশ করেছেন উপন্যাসে। আর এখানেই রামায়ণের নবরূপায়ণ। ঔপনাসিক হরিশংকর জলদাস শূর্পণখাকে দিয়ে বলিয়েছেনÑ

‘তুমি জানতে ওই রাজ্যের পরোক্ষ-কর্ণধার বিদ্যুদজিহ্ব। এখন তুমি না-জানার ভান করছ। এ তোমার অভিনয় দাদা। এই রাজসভায় উপস্থিত সভাসদরা তোমার মেকি অভিনয় বুঝতে না পারলেও আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না তুমি। প্রত্যুত্তরে স্নেহকাতর কণ্ঠে রাবণ বলেছিল, ‘তুমি আমাকে ভুল বুঝ না বোন। সত্যি বলছিÑতোমার স্বামীকে আমি রণক্ষেত্রে চিনতে পারিনি। লোহার বর্ম পরা ছিল বিদ্যুদজিহ্ব, মাথা আর মুখমণ্ডল ঢাকা শিরস্ত্রাণ ছিল তার।’ এ কথা শোনার পরে শূর্পণখা বলল, ‘তুমি যদি বিদ্যুদজিহ্বকে না-ই চিনতে পেরেছ, তা হলে এত অনুপুঙ্খ বিবরণ দিচ্ছ কী করে। … ধরা পড়ে গেলে তো দাদা ? চিনে-বুঝে যে তুমি বিদ্যুদজিহ্বকে হত্যা করেছ, প্রমাণ হয়ে গেল তো ?’১৬

বিদ্যুদজিহ্বকে হত্যার পেছনে রাবণের যে দুরভিসন্ধি ছিল তা ধারণা করে তিনি উপন্যাসে আরও উল্লেখ করেছেনÑ ‘শূর্পণখার হাহাকার-আর্তনাদে রাবণ খুব বিচলিত হয়েছে বলে মনে হলো না। ভগ্নিপতিকে মেরে ফেলেছে বলে তেমন কোনও অনুতাপ রাবণের চোখেমুখে দেখা গেল না। শূর্পণখার ধিক্কারে রাবণ কোনও লজ্জাও পেল না।’১৭ হরিশংকর জলদাস উপন্যাসের উপর্যুক্ত সংলাপগুলো নিজের লেখক-সৃষ্ট, যা অন্য কোনও রামায়ণে উল্লেখ নেই।

বিদ্যুদজিহ্বের মৃত্যুর পর শূর্পণখাকে রাবণ দণ্ডকারণ্যে একটি অঞ্চলের অধীন করে পাঠিয়ে দেয়। সাথে চোদ্দ হাজার রাক্ষসসৈন্য, বৈমাত্রেয় ভাই খর ও মহাবীর দূষণকে সেনাপতি করে। তার পেছনে রাবণের কি শুধুই দান ও মান দিয়ে তুষ্ট করা মূল উদ্দেশ্য ছিল ? না কি অন্য কোনও উদ্দেশ্য বা কূটকৌশল ছিল ?

না। এখানেও ছিল রাবণের কূটকৌশল। এ-প্রসঙ্গে হরিশংকর জলদাস প্রথমত মনে করেন, ‘রাবণ জানে, কোন কৌশলে শূর্পণখাকে কব্জা করা যাবে। জানে কীসে লোভাতুর হয়ে উঠবে শূর্পণখা। …রাবণের প্রলোভনের ফাঁদে পা দিল শূর্পণখা। ভাবতে লাগলÑযে গেছে, তাকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না! বিনিময়ে নগদ যা পাচ্ছে, তা হাত পেতে নিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।’১৮

দ্বিতীয়ত, ‘শূর্পণখাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে রাবণ স্থির করেছেÑস্পষ্টভাষী শূর্পণখাকে লঙ্কার প্রাসাদে রাখা যাবে না। তার কূটকৌশলের অনেক কিছু জেনে ফেলেছে সে। বিশেষ করে কুম্ভকর্ণ-বিষয়ে অতি গোপন কথাটি কী করে শূর্পণখা জেনে গেল, কে জানে ? তাকে রাজপ্রাসাদে ঠাঁই দিলে খুঁচিয়ে আরও অনেক তথ্য বের করে নেবে সে। বিভীষণকে উসকাবে, তার কুটিলতার কথা জানিয়ে দিয়ে তার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তুলবে বিভীষণকে। আর মা কৈকসী তো ভীষণ ভালোবাসেন শূর্পণখাকে! সর্বদা তারই পক্ষ নেবেন তার মা। শূর্পণখা কোন সময় মন্দোদরীর মন তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে তার ঠিক নেই।’১৯ রামায়ণের প্রচলিত ঘটনার বিপরীতে এসে হরিশংকর জলদাস এই কথাগুলো উপন্যাসে তুলে ধরেছেন, যা রামায়ণের নবরূপায়ণ।

শূর্পণখা কামরূপী তেজস্বিনী নারী। দণ্ডকারণ্যে অবকাশযাপনে যাওয়ার পর শূর্পণখার অন্তরে জেগে ওঠে কাম-লোভ-ক্রোধ-প্রতিরোধ-প্রতিশোধের আগুন। এই অংশে প্রথমে রাম লক্ষণের প্রতি শূর্পণখার কাম-লোভ; পরে নিজের নাসিকা-কর্ণ হারানোর ফলে তা থেকে প্রতিরোধ-প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। আবার বলা যায় প্রকারান্তরে রাবণের প্রতি স্বামীহত্যার প্রতিশোধ। এবার দেখা যাক এর মূলে কী ঘটনা রয়েছে। বাল্মীকি রামায়ণে শূর্পণখার প্রেম পরিণাম অংশে [সর্গ-১৭-২০] রয়েছে :

“গোদাবরী নদীতে স্নান করে সীতা দেবী ও লক্ষ্মণের সঙ্গে শ্রীরাম আশ্রমে ফিরে এলেন। এমন সময় শূর্পণখা যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ করতে করতে তাঁদের কাছে এলো। দেবতুল্য রূপবান মহাবাহু জটামণ্ডলধারী সুকুমার রাজলক্ষণযুক্ত কন্দর্পকান্তি রামকে দেখে সে কামমোহিত হয়ে বলল, ‘তুমি তপস্বীর বেশে ধনুর্বাণহস্তে ভার্যার সঙ্গে কেন এই রাক্ষসসেবিত দেশে এসেছ ?’

শ্রীরাম সরলভাবে নিজের সকল বৃত্তান্ত জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কে, তোমাকে রাক্ষসী মনে হচ্ছে, এখানে কেন এসেছ ?’

প্রত্যুত্তরে সে বলল, ‘আমি কামরূপিণী রাক্ষসী শূর্পণখা, এই বনে একাকী বিচরণ করি, সকলে আমাকে ভয় করে। রাবণের নাম শুনে থাকবে নিশ্চয়ই, সে আমার বড়োভাই। নিদ্রাসক্ত মহাবল কুম্ভকর্ণ, ধর্মাত্মা বিভীষণÑযাঁর স্বভাব রাক্ষসোচিত নয়, এবং বিখ্যাত যোদ্ধা খর ও দূষণÑএরাও আমার ভাই। তোমাকে দেখেই আমি মোহিত হয়েছি। আমি প্রভাবশালিনী, সর্বত্র ইচ্ছামত যেতে পারি, তুমি আমার ভর্তা হও। সীতাকে নিয়ে কি করবে, ও বিকৃতা কুরূপা, তোমার যোগ্য নয়। আমিই তোমার অনুরূপ ভার্যা। এই কুৎসিত অসতী ভয়ংকরী কৃশোদরী সীতাকে আর তোমার ভ্রাতাকে আমি ভক্ষণ করব। তুমি আমার সঙ্গে দণ্ডকারণ্যের সর্বত্র যথেচ্ছা বিচরণ করবে।’

শ্রীরাম একটু হেসে বললেন, ‘আমি কৃতদার, ইনি আমার প্রিয়া পত্নী। তোমার মতো নারীদের পক্ষে সপত্নীর সঙ্গে থাকা কষ্টকর হবে। আমার এই কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষ্মণ সচ্চরিত্র ও প্রিয়দর্শন, ইনি অবিবাহিত, রূপে তোমারই তুল্য। বিশালাক্ষী, তুমি এঁকেই ভজনা কর।’

শূর্পণখা শ্রীরামকে ছেড়ে লক্ষ্মণকে বলল, ‘তোমার যে রূপ তা আমারই যোগ্য। তুমি আমাকে বিয়ে করে আমার সঙ্গে দণ্ডকারণ্যের সর্বত্র সুখে বিচরণ করবে।’ লক্ষ্মণ সহাস্যে উত্তর দিলেন, ‘আমি আমার অগ্রজের দাস, তুমি দাসী-ভার্যা হ’তে চাচ্ছ কেন ? তুমি রামেরই কনিষ্ঠা পত্নী হও, রাম এই বিরূপা অসতী করালদর্শনা বৃদ্ধাকে ত্যাগ করে তোমারই ভজনা করবেন।’

লক্ষ্মণের পরিহাস বুঝতে না পেরে শূর্পণখা পুনরায় রামকে বলল, ‘তুমি তোমার এই কুরূপা ভার্যাকে ত্যাগ করে আমায় আদর করছ না। দেখ, আমি এখনই একে ভক্ষণ করছি।’Ñএই বলে সে ক্রুদ্ধ হয়ে সীতার দিকে ধাবিত হলো, যেন মহা উল্কা রোহিণী নক্ষত্রের দিকে যাচ্ছে। তখন রাম বললেন, ‘সৌমিত্রি, এই ক্রূরপ্রকৃতি অনার্যার সঙ্গে পরিহাস করা উচিত নয়, দেখ, সীতা যেন মৃতপ্রায় হয়েছেন। তুমি এই প্রমত্তা অসতীকে বিরূপ করে দাও।’ লক্ষ্মণ তখনই খড়্গাঘাতে শূর্পণখার নাসাকর্ণ ছেদন করলেন। বর্ষার মেঘের ন্যায় গর্জন করতে করতে সে শোণিতাক্তদেহে মহাবনে চলে গেল।”২০

এই অপমানের পর শূর্পণখা তার ভ্রাতা খরের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানায়। খর এই খবর পেয়ে প্রথমে সেখানে সাত জন রাক্ষসকে পাঠায়। কিন্তু শ্রীরাম সকলকে পদানত করেন। অতঃপর খর স্বয়ং চৌদ্দ হাজার সৈন্য সঙ্গে নিয়ে দশরথ পুত্রদের আক্রমণ করল। যুদ্ধে শ্রীরামচন্দ্র ইন্দ্রপ্রদত্ত ব্রহ্মদণ্ডতুল্য বাণে খরের বক্ষ ভেদ করল।২১ হরিশংকর জলদাস রামায়ণের আলোকে যুদ্ধ বিবরণ আরও বিশদভাবে উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। রামায়ণের বিবরণ অনুযায়ী শ্রীরামচন্দ্র খরকে বাণ দ্বারা নিহত করে। কিন্তু উপন্যাসে দেখতে পাইÑ‘খরের বুকে অসির অগ্রভাগটি গেঁথে দিল রাম।’২২ প্রসঙ্গত, ত্রেতাযুগে সমরাস্ত্র হিসেবে তির-ধনুক ব্যবহৃত হতো, অসির ব্যবহার ছিল কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে বোধ করি ঔপন্যাসিক রামায়ণকে নবরূপদান করতে গিয়ে এমন যুদ্ধাস্ত্রর অবতারণা করেছেন। সে যাই হোক, যুদ্ধে একমাত্র নিকষার ভ্রাতা অকম্পন বেঁচে যায়। 

অকম্পন পলায়ন করে লঙ্কায় এসে একে একে খর, দূষণ, ত্রিশিরা ও চৌদ্দ হাজার রাক্ষসসৈন্যের মৃত্যুর সংবাদ বর্ণনা শেষে রাবণকে পরামর্শ দিলÑ‘আপনি রামের স্ত্রীকে হরণ করুন। হত্যা করতে হবে না রামকে। স্ত্রীকে এমন ভালোবাসে রাম, স্ত্রীবিহনে এমনিতেই মরে যাবে সে।’২৩

রাজশেখর বসুর বাল্মীকি রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডে বর্ণিত উপর্যুক্ত ঘটনাবৃত্তান্তের আলোকেই হরিশংকর জলদাস তাঁর উপন্যাসে রাম লক্ষ্মণ শূর্পণখা ও অকম্পনের সংলাপ এবং কাহিনিবিন্যাস লেখককল্পনায় রচনা করেন। লক্ষ্মণ শূর্পণখার নাসাকর্ণ ছেদন করার পর ঔপন্যাসিক এখানে প্রচলিত ঘটনার সঙ্গে সীতাকে দিয়ে কিছু নারীবাদী সংলাপও যুক্ত করেছেন, যা একান্তই তাঁর নিজস্ব চিন্তা ও মনস্তত্বের আলোকে রচিত। তাতে তিনি উল্লেখ করেনÑ

এ কী করলে তুমি লক্ষ্মণ! পুরুষ হয়ে নারীকে আঘাত করলে! অনার্যা বলে কি সে মানুষ নয় ? তোমরা দুই ভাই মিলে তো সবসময় নারীর মর্যাদার কথা বল! এই কি নারীর মর্যাদা! কী অন্যায় করেছে শূর্পণখা ? প্রেমনিবেদন করেছে তো! তোমাকে স্বামী হিসেবে পেতে চেয়েছে তো ? একজন নারীর কি প্রেমনিবেদনের অধিকার নেই ? তার প্রেম সার্থকতা পাক বা না-পাক, নিবেদনে তো কোনও অপরাধ নেই! নাকি আছে ? বিবাহিত পুরুষকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া কীসের অপরাধ ? তোমরা একাধিক বিয়ে কর না ? রাজপ্রাসাদে তার প্রমাণ নেই ? আর্যসমাজে যেমন, নিশ্চয়ই অনার্য সমাজেও বহু বিয়ের প্রচলন আছে। এই প্রথার সূত্র ধরেই হয়তো শূর্পণখা তোমাদের দুই ভাইকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে তো সে কোনও অপরাধ করেনি। ওর যেমন প্রস্তাব দেওয়ার অধিকার আছে, তোমাদেরও তেমনি প্রত্যাখ্যান করার অধিকার ছিল। সেই অধিকার প্রয়োগ না করে, তোমরা করলে কী! ছি ছি লক্ষ্মণ! এ কী করলে তুমি ? একজন যুবতীর জীবনের সকল বাসনা গুঁড়িয়ে দিলে! পরে সীতা দেবী মর্মাহত অথচ উষ্ণ গলায় বলে উঠল, ‘দেখে নিয়ো তোমরা, এই অন্যায় কাজের জন্য অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে তোমাদের। শূর্পণখা কিছুতেই এই অপমানের জ্বালা ভুলে থাকবে না।’২৪

শূর্পণখা ঠিকই অপমানের জ্বালা ভুলে যায়নি। লক্ষ্মণের কাছ থেকে প্রাপ্ত অপমানের জ্বালা রাবণকে বর্ণনার সময় শূর্পণখা একটু কৌশলী হয়, যাতে রাবণ কামোদ্দীপক হয়। সে রাবণকে বলল, ‘রামের একটি স্ত্রী আছে দাদা। কত সহস্র সুন্দরী রমণী দেখেছি, সীতার মতো সুন্দরী আমি দেখিনি কখনো! ত্রিভুবন ঢুঁড়েও তুমি সীতার মতো রূপসী খুঁজে পাবে না। তার যেমন চোখমুখ, তেমনি চুল। সোনার মতো রং তার দাদা, বিশ্বাস কর, বনলক্ষ্মী যেন সীতা! …যে সীতাকে অঙ্কশায়িনী করতে পারবে, সে ইন্দ্রের অধিক সুখ পাবে। একমাত্র তুমিই সেই সুখের দাবিদার দাদা, অন্য কেউ নয়। একমাত্র তুমিই তার স্বামী হবার যোগ্যতা রাখ। …নিজে অপমানিত হয়েও তোমার সুখের জন্য এখানে ছুটে এসেছি দাদা। সীতাকে যদি একবার দেখ, নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না। যদি সত্যি সত্যি সীতাকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চাও তুমি, তাহলে রামের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে আন।’২৫

হরিশংকর জলদাস বলেন, শূর্পণখার এই পরামর্শের মধ্যে রাবণের প্রতি মমতা যতটুকু ছিল, তার চেয়ে অধিক ছিল গভীর প্রতিহিংসার বীজ। রাবণের নিষ্ঠুরতার কথা মুহূর্তের জন্যও ভোলেনি শূর্পণখা। এই রাবণই তো নির্বিচারে তার স্বামী বিদ্যুজিহ্বকে হত্যা করেছে, তার সুখের দাম্পত্যজীবন ছারখার করে দিয়েছে। নিজের অপমানের শোধ দুইভাবে নিল শূর্পণখা। রাবণকে সীতাহরণের পরামর্শ দিয়ে রামের ওপরে শোধ নিল, অন্যদিকে সীতাহরণে রাবণকে প্ররোচিত করে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে স্বামীহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রাথমিক কাজটা সম্পন্ন করল।২৬

শুরু হলো রাম-রাবণের যুদ্ধের পূর্বরাগÑসীতাহরণ। আর এরই মাধ্যমে শূর্পণখা তার কাক্সিক্ষত লক্ষের দিকে এগুতে শুরু করল। শূর্পণখার প্রলোভনের ফাঁদে পা দিল রাবণ। সীতার রূপলাবণ্যের কথা শুনে রাবণ কামোন্মাদ হলো। শেষে অকম্পন ও বোন শূর্পণখার পরামর্শে রাবণ সীতাহরণের সিদ্ধান্ত নেয়। সে স্বর্ণময় ও রত্নভূষিত রথে [উপন্যাসে-পুষ্পকরথ] চড়ে সাগর পার হয়ে মারীচের আশ্রমে গেল। তাকে বলল, ‘বৎস্য, আমি রামের পত্নী সীতাকে হরণ করব, তুমি আমার সহায় হও। বিক্রমে ও উপায়নির্ণয়ে তোমার তুল্য কেউ নেই, তুমি মহা মায়াবিশারদ। এখন কী করতে হবে শোন। তুমি রামের আশ্রমে যাও, রজতবিন্দুচিত্রিত [উপন্যাসে-রুপালি চিহ্ন] স্বর্ণমৃগ [উপন্যাসে-সোনার হরিণ] হয়ে সীতার সম্মুখে বিচরণ কর। সীতা নিশ্চয়ই রাম-লক্ষ্মণকে বলবেনÑওই হরিণকে ধর। রাম-লক্ষ্মণ চলে গেলে আমি সীতাকে অবাধে হরণ করব। পত্নীর বিরহে রাম কৃশ হয়ে যাবে, তখন আমি অনায়াসে তাঁকে বধ করব।’২৭

রাবণের কথা শুনে মারীচ ভয়ার্ত হয়ে শুষ্কমুখে ওষ্ঠ লেহন করে রাবণের দিকে অনিমেষনেত্রে চেয়ে রইল। শেষে রাবণকে বলল, ‘রাজা, যারা সতত প্রিয় কথা বলে এমন লোক অনেক আছে, কিন্তু অপ্রিয় অথচ হিতকর বাক্যের বক্তা ও শ্রোতা দুর্লভ। আপনি চপল-স্বভাব, চর নিযুক্ত করেন না, তাই মহেন্দ্র ও বরুণের তুল্য মহাবল মহাগুণশালী রামকে জানেন না। বৈদেহী রাম কর্তৃক নিজ তেজে রক্ষিতা, তাঁকে সবলে হরণ করতে আপনি কেন ইচ্ছা করেন ? সূর্যের প্রভা কি হরণ করা যায় ? রাক্ষসাধিপ, এই ব্যর্থ চেষ্টা করে আপনার কি লাভ হবে ? রাম আপনাকে রণস্থলে দেখলেই আপনার আয়ু শেষ হবে [রামায়ণ ৩৭।২-৩; ৩৭।১৪; ৩৭।২১]।’২৮

অবশেষে মারীচ রাবণের ভয়ে সীতাকে হরণের উদ্দেশ্যে স্বর্ণমৃগের রূপ ধারণ করে শ্রীরামচন্দ্রের আশ্রমে গেল। এই মায়ামৃগটির বর্ণনা রাল্মীকি রামায়ণে দিয়েছে এভাবেÑ‘তার শৃঙ্গাগ্র উৎকৃষ্ট মণির তুল্য, মুখমণ্ডল কোথাও শ্বেত কোথাও কৃষ্ণ, বদন রক্ত পদ্ম ও উৎপলের ন্যায়, কর্ণ ইন্দ্রনীল মণি ও নীলোৎপল তুল্য। তার গ্রীবা কিঞ্চিৎ উন্নত, উদর ইন্দ্রনীলবর্ণ, পার্শ্ব মধুকপুষ্পের ন্যায় পদ্মরাগবর্ণ। খুর বৈদুর্যতুল্য, জঙ্ঘা ক্ষীণ ও দৃঢ়, পুচ্ছ ইন্দ্রধনুবর্ণ এবং উত্থিত। তার বর্ণ স্নিগ্ধ ও মনোহর, যেন নানাবিধ রত্নে ভূষিত। ক্ষণমধ্যে রাক্ষস মারীচ অতি শোভাময় মৃগের রূপ ধারণ করলে [রামায়ণ ৪২।১৬-১৯]।’২৯ কিন্তু উপন্যাসে এই বর্ণনার উল্লেখ নেই।

মায়াময় স্বর্ণমৃগটি দেখে শ্রীরাম সীতা দুজনেই বিস্মিত ও মুগ্ধ হলেন। সীতা শ্রীরামকে মৃগটিকে জ্যান্ত ধরে আনতে অনুরোধ করেন। সীতার মনবাঞ্ছা পূরণ করতে শ্রীরাম মায়ামৃগের পশ্চাতে দ্রুতগতিতে চললেন। ক্রমশ মায়ামৃগ শ্রীরামকে আশ্রম থেকে বহুদূরে নিয়ে গেল। তখন তিনি শ্রান্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে ব্রহ্মাস্ত্র দিয়ে বধ করেন।  

এই সুযোগে রাবণ প্রথমে ব্রাহ্মণরূপ পরে স্বীয়রূপ ধারণ করে সীতাকে মায়াময় দিব্যরথে চড়িয়ে আকাশে উঠল। এমন সময় সীতা এক বৃক্ষের উপর জটায়ুকে দেখতে পেলেন। সীতা বললেন, ‘আর্য জটায়ু, দেখুন এই পাপাত্মা রাবণ আমাকে অনাথার ন্যায় হরণ করছে। এই অস্ত্রধারী রাক্ষসকে নিবারণ করা আপনার সাধ্য নয়, আপনি রাম-লক্ষ্মণকে জানান।’৩০

জটায়ু নিদ্রিত ছিল, সীতার কথা শুনে জেগে উঠল। পরে রাবণকে এই পাপকর্ম থেকে নিবৃত্ত হতে অনুরোধ করে। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। অগত্যা সীতা দেবীকে উদ্ধারে রাবণকে আক্রমণ করল। উভয়ের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হলো। যুদ্ধে জটায়ু রাবণের পৃষ্ঠে পতিত হয়ে তার দশ বাম হস্ত বিচ্ছিন্ন করে, ধনুর্বান ভেঙে ফেলে। এমনকি, রথও বিচূর্ণ করে দেয়। তবু শেষ রক্ষা হলো না, রাবণ খড়্গাঘাতে জটায়ুর পক্ষ চরণ ও পার্শ্বদেশ ছিন্ন করল, গৃধ্ররাজ মৃতপ্রায় হয়ে ভূপতিত হলো। রাবণ পুষ্পকরথে চরে সীতাকে হরণ করে লঙ্কাপুরীতে নিয়ে গেল।

আমরা সকলেই জানি, সীতাহরণকে কেন্দ্র করে রাম-রাবণের যুদ্ধ হয়। আবার এ-ও জানি, যুদ্ধে লঙ্কাপুরী ধ্বংস ও রাবণের মৃত্যু ঘটে। এই কাহিনি অতি দীর্ঘ। সপ্তকাণ্ড রামায়ণের তিনটি কাণ্ডÑ (কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড, সুন্দরকাণ্ড ও যুদ্ধকাণ্ড) জুড়েই এর বিস্তৃতি। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে শূর্পণখার উপস্থিতি বাল্মীকি রামায়ণ মহাকাব্যের কোথাও নেই; প্রয়োজনও বোধ করেননি রচয়িতা মহর্ষি বাল্মীকি! অথচ খল চরিত্রের এই শূর্পণখা হতে পারত সাহিত্যে অলম্বনীয় ভাব বা বিষয়। কিন্তু হরিশংকর জলদাস এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন, হয়েছেন জননন্দিত। তিনি উপন্যাসে রাবণের মৃত্যুক্ষণ পর্যন্ত শূর্পণখার সরব উপস্থিতি দেখিয়েছেন। মূলত এটাই হলো হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে পুরাণের নবরূপায়ণের উল্লেখযোগ্য আখ্যান। যেখান থেকে পাঠকমনে আসা প্রাসঙ্গিক অনেক প্রশ্নেরই জবাব পাওয়া যাবে। যেমনÑসীতাহরণের ফলে রাম-রাবণের যুদ্ধ হয়েছে ঠিক, কিন্তু তাতে শূর্পণখার কী লাভ হলো ? যুদ্ধে রাবণের মৃত্যু হয়, ভাইয়ের মৃত্যুকে সে কি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছিল ? না কি স্বামীনিধনের শোধ হিসেবে দেখেছে! রাবণের জ্বলন্ত চিতার সামনে শূর্পণখা কি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল ? না কি প্রশান্তি অনুভব করেছিলÑএমন সব জিজ্ঞাসার নানাবিধ দিক। এখন দেখা যাক উপন্যাসে শূর্পণখার খল চরিত্রের ভূমিকা কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে :

রাবণ সীতাকে লঙ্কায় এনে অন্তঃপুরসংলগ্ন একটি কক্ষে বন্দী করে রাখে। অসহায় সীতাকে দেখে রাজমহিষী মন্দোদরীর হৃদয়তলে আকুলিবিকুলি হতে থাকল। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস নেই তার। কিন্তু শূর্পণখা চুপ মেরে থাকল না। সে গোপনে বন্দী কক্ষে ঢুকে সীতাকে বলল, ‘সেদিনের সেই লাঞ্ছিত শূর্পণখা আমি। সেই শূর্পণখা, প্রেমনিবেদনের অপরাধে যাকে তোমার দেবর আমার এই হাল করেছে। সেদিন তুমি লক্ষ্মণকে বিরত করতে পারতে। রামকে তার নির্দেশ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করতে পারতে তুমি। কিন্তু তা তুমি করনি। রামের ওপর তোমার যে প্রভাব আমি দেখেছি, তোমার সামান্য ইঙ্গিতেই থেমে যেত রাম, থেমে যেত লক্ষ্মণও। কিন্তু কুকর্মটি থেকে ওদের বিরত করার কোনও চেষ্টাই তুমি করনি। … একবারও ভাবনি, আমিও তোমার মতো একজন নারী! তোমার মতো আমারও একটি মন আছে, সেই মনে প্রেম আছে। সেই প্রেম-নিবেদনের অধিকারও আছে আমার। তুমি একবারও ভাবনি, তোমার যেমন একজন পুরুষ সঙ্গী আছে, আমারও তো মন চায় আমার একজন পুরুষ সঙ্গী থাকুক। সেই চাওয়া থেকে তোমার স্বামীর কাছে গিয়েছিলাম আমি। ফল পেলাম কী ? নাসিকা-কর্ণ ছেদন!’Ñবলতে বলতে হুহু করে কেঁদে উঠল শূর্পণখা।৩১

কিন্তু শূর্পণখা কেন কেঁদে উঠল তার কোনও মনস্তত্ত্ব হরিশংকর জলদাস উপন্যাসে প্রদান করেননি। সে যাই হোক, অতি ধীর লয়ে চোখের জল মুছে শূর্পণখা আবারও বলল, ‘সমুদ্রের মাঝখানে এই লঙ্কাপুরী। কারো সাধ্য নেই যে সেই সমুদ্র অতিক্রম করে রাবণকে আক্রমণ করে। তোমাকে সারাজীবন দাদা রাবণের শয্যাসঙ্গিনী হয়েই কাটাতে হবে।’ জ্বলে উঠল সীতা, ‘রামচন্দ্রকে তুমি সামান্য সময়ের জন্য দেখেছ। তার রূপ দেখেছ তুমি, তার রণকৌশল দেখনি। চৌদ্দ হাজার রাক্ষসসেনার হত্যাসংবাদ নিশ্চয়ই পেয়ে গেছ তুমি। আমার রাম একক হাতে সবাইকে নিধন করেছে। যে রাবণের কথা বলছ, তুমি দেখে নিয়ো, রাম এই রাবণের রক্ত ওই সমুদ্রজলে মিশাবে।’ এবার শূর্পণখা হিসানো কণ্ঠে বলল, ‘রাবণ তোমাকে সহজে ছাড়বে না, বলে গেলাম। তোমার সব রূপযৌবন নিঃশেষ করে আখের ছোবড়ার মতন দূরে নিক্ষেপ করবে একদিন। পচতে থাক তুমি এই অন্ধকার কুঠরিতে।’৩২     

রাবণ যতই নারীলোলুপ আর ব্যভিচারী হোক না কেন, সীতার ক্ষেত্রে রাবণের সেরূপ দেখা গেল না উপন্যাসে। বরং রাবণ সীতার কাছে মন পেতে চেয়েছিল এবং সীতাকে সে এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল যে, যতদিন রাজি না হবে, ততদিন অপেক্ষা করবে। 

শ্রীরাম লক্ষ্মণ সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে কিষ্কিন্ধ্যা এসে উপস্থিত হলো। সেখানে তাঁরা মুমূর্ষু জটায়ুর কাছ থেকে জানতে পারেন যে, রাবণ সীতাকে হরণ করে নিয়ে গেছে; এর বেশি কিছু জানতে পারেননি। পরে কমন্ধ রাক্ষসীর কাছে জানলেন যে, রাবণ সীতাকে লঙ্কাপুরীতে বন্দী করে রেখেছে।

শুরু হলো সীতা উদ্ধারের পালা। কমন্ধর পরামর্শে শ্রীরাম লক্ষ্মণ ঋষ্যমূক পর্বতে সুগ্রীবের কাছে গেল। সুগ্রীব সীতার ফেলে দেওয়া কিছু অলংকারাদি দেখানোর পর তাঁদের মধ্যে শর্তসাপেক্ষে বন্ধুত্ব হয়। সেই শর্তের অংশ হিসেবে সুগ্রীবের আপন বড়ভাই বালীকে হত্যা করে রাম। সুগ্রীবের অনুচর ও মন্ত্রী হনুমান ও অঙ্গদের সাথে দেখা হয় তাঁদের। একপর্যায়ে হনুমান রামের ভক্ত হয়ে ওঠে। এই দীর্ঘ সময়ে শূর্পণখার কোনও উপস্থিতি উপন্যাসে দেখতে পাওয়া গেল না।

সীতা দেবীকে উদ্ধারে হনুমান লঙ্কায় গেল। রাক্ষসদের নানা বাড়ি ঘুরতে ঘুরতে একসময় রাজ-অন্তঃপুরে চলে এল হনুমান। সেখানে প্রতিটি প্রকোষ্ঠ তল্লাশি করতে করতে একটি স্বল্প আলোর কক্ষের ভেতর শোনতে পায় শূর্পণখা ও বিভীষণের কথোপকথন। বিভীষণ শূর্পণখাকে বলল, ‘সীতার রূপের বর্ণনা করে, তার দেহের নানা অঙ্গের অশ্লীল বর্ণনা দিয়ে রাবণ দাদার ভেতরের পশুটাকে জাগিয়ে তুলেছ তুমি। সেই সঙ্গে মর্মস্পর্শী ভাষায় খর-দূষণ-ত্রিশিরার হত্যাদৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছ। সব আমি নিজ কানে শুনেছি দিদি। সেদিন রাজসভায় ছিলাম আমি।’ শূর্পণখা এবার চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘বেশ করেছি আমি। তুমি আমার দিকে ভালো করে তাকাওনি বিভীষণ ? রাম-লক্ষ্মণ দুই ভাই মিলে আমার চেহারার কী হাল করেছে, দেখতে পাওনি তুমি ? …এই অপমানের প্রতিশোধ নেব না আমি ? তাছাড়া দাদা রাবণ…।’ উৎকণ্ঠ বিভীষণ বলল, ‘তাছাড়া দাদা রাবণÑকী দিদি ?’ না থাক। ‘ওই কথা বলার সময় আসেনি এখনও। সময় এলে সব বুঝতে পারবে তখন।’ এবার কাতর কণ্ঠে বিভীষণ বলল, ‘দিদি, সীতা তো তোমার মতোই একজন নারী! সরমার মতো, বউদি মন্দোদরীর মতো একজন গৃহবধূ। সেই মমতায় মেয়েটিকে আজ জনমানবহীন অশোকবনে বন্দী করে রেখেছে দাদা রাবণ!’৩৩

শূর্পণখা ও বিভীষণের কথোপকথন থেকে সীতার সন্ধান পায় হনুমান। হনুমান সীতার সাথে দেখা করল এবং তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু সীতা রাজি হলো না। বললেন, ‘তাতে তাঁর বীর্যবান স্বামীর কৃতিত্ব খর্ব হবে।’ বিফলে হনুমান ফিরবার সময় সীতা দেবী বললেন, ‘আর এক মাস বেঁেচ থাকব আমি। রাবণ বলেছেÑআর এক মাস জোর খাটাব না আমি তোমার ওপর। ঠিক এক মাস পর তোমার সতীত্ব ভেঙ্গে চুরমার করে দেব।’ চোখের জল মুছে তিনি আরও বললেন, ‘এই এক মাসই বেঁচে আছি আমি। তারপর প্রাণবিসর্জন দেব। এই কথাটা রামচন্দ্রকে গিয়ে বল হনুমান।’৩৪             

শ্রীরাম সুগ্রীবের বানরবাহিনী নিয়ে সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কায় এলেন। রাম-রাবণের যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধে ধূম্রাক্ষ, বজ্রদংষ্ট্র, অকম্পন, প্রহস্ত, কম্পন, প্রজঙ্ঘ, শোণিতাক্ষ, যূপাক্ষ, কুম্ভ-নিকুম্ভ, মকরাক্ষ-সহ বহু বীর রাক্ষসসেনানী মুত্যুবরণ করে।

যুদ্ধে যাবার পালা এল ইন্দ্রজিতের। মা মন্দোদরী বেঁকে বসল। তখন শূর্পণখা বলল, ‘তোমার পুত্র ইন্দ্রজিৎ পিতাকে বড় ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। দাদা রাবণকে ঈশ্বরের জায়গায় বসিয়ে রেখেছে ইন্দ্রজিৎ। যুদ্ধ হলে নিজের জীবন থাকা অবধি দাদাকে যুদ্ধে যেতে দেবে না তোমার ইন্দ্রজিৎ। নিজে যাবে।’ এ কথা শুনে মন্দোদরী ‘হা ঈশ্বর! আমার পুত্র ইন্দ্রজিৎ। হিংস্র রাম, প্রতিশোধপরায়ণ লক্ষ্মণ! ওরা, ওরা কি আমার মেঘনাদকে…।’Ñবলতে বলতে মূর্ছা গেল। কিছুক্ষণ পর সংবিত ফিরলে শূর্পণখা মন্দোদরীর উদ্দেশে আবার বলল, ‘খেয়াল রেখ বউদি, কোনওক্রমেই যাতে ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধে না জড়ায়।’Ñএ কথা বলে অতি সূক্ষ্ম এক ক্রূর হাসি দিয়ে শূর্পণখা ঘর থেকে মৃদু পদক্ষেপে বেরিয়ে এসে মনে মনে বলল, ‘অপেক্ষা কর রাবণ। একদিন তুই সবংশে ধ্বংস হয়ে যাবি। যে অগ্নিকুণ্ডের দিকে আমি তোকে ঠেলে দিয়েছি, সেই আগুন থেকে তোর রেহাই নেই। সীতা রূপসী নারী নয়, জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। ওই আগ্নেয়গিরি তোকে গিলে খাবে রে রাবণ!’৩৫

ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধে গেল। যুদ্ধের একপর্যায়ে সে মেঘের আড়াল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ মেরে রাম-লক্ষ্মণকে বিদ্ধ করল। চেতনা হারাবার উপক্রম হলো দু-ভাইয়ের। এই সুযোগে ইন্দ্রজিৎ নাগপাশ বাণ নিক্ষেপ করল। তাতে করে শত-সহস্র সাপ এসে দু-ভাইকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। দুজনের শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। একসময় চেতনা হারিয়ে ফেললেন তাঁরা। রটে গেল রাম-লক্ষ্মণ মারা গেছে। এই সংবাদ শূর্পণখা শুনে উৎফুল্ল হয়ে উঠল, আবার ম্রিয়মাণও হলো। মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় আবিষ্ট শূর্পণখার হঠাৎ করে সীতা দেবীর কথা মনে পড়ে গেল। ছুটে গেল অশোকবনের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখে সীতা দেবী বিলাপ করে বলছেনÑ‘অ ঈশ্বর রে! আমার কী হলো রে! আমার যে সর্বনাশ হয়ে গেল রে!’ ব্যঙ্গময় বিকৃত ভঙ্গিতে শূর্পণখা বলল, ‘আমাকে লাঞ্ছিত করার দিন ভাবনি আজকের দিনের কথা ? লক্ষ্মণ তো তোমার সামনেই আমার নাক-কান কেটে নিয়েছিল, তোমার গায়ে হেলান দিয়েই তো ওই রামটা লক্ষ্মণকে নির্দেশ দিয়েছিল আমাকে লাঞ্ছিত করতে। কই সেদিন তো তুমি কোনও প্রতিবাদ করনি! তোমার সামনেই একজন নারী হেনস্তা হচ্ছে, তুমি তো একবারও বাধা দাওনি স্বামী আর দেবরকে!’ একটু দম নিয়ে শূর্পণখা আবার বলতে শুরু করল, ‘তোমরা নাকি আর্য! আর্যসমাজে নাকি নারীদের সম্মানের জায়গা অনেক উঁচুতে! নারীদের নাকি স্বর্গের চেয়েও গরীয়ান বলা হয়েছে তোমাদের শাস্ত্রে! সেদিন কোথায় গিয়েছিল এই শাস্ত্রকথার মাহাত্ম্য ? রাম-লক্ষ্মণ ভুলেছিল, ঠিক আছে, তুমি ভুলেছিলে কেন ? নাকি ভুলে থেকেছিলে আমি আর্যনারী ছিলাম না বলে।’৩৬

পরের দিন ইন্দ্রজিৎ যজ্ঞ করতে নিকুম্ভিলা গেল। সেখানে নিরস্ত্র ইন্দ্রজিৎকে হঠাৎ আক্রমণ করে লক্ষ্মণ ঐন্দ্রবাণ [রামায়ণে উদ্ধিৃত] দিয়ে তাকে হত্যা করল। ইন্দ্রজিতের মৃত্যুসংবাদে মূর্ছা যায় রাবণ। রাজ-অন্তঃপুরে মন্দোদরী বুক ফাটিয়ে পুত্র ইন্দ্রজিতের জন্য আহাজারি করে যাচ্ছে। এই শব্দে প্রত্যুষে শূর্পণখার ঘুম ভেঙে যায়। আলুথালু বেশে মন্দোদরীর শয়নকক্ষের দিকে ছুটে আসে। তাকে দেখেই মন্দোদরী গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। ‘সর্বনাশী! দূর হ তুই আমার সামনে থেকে।’ অবাক চোখে কিছু একটা বলতে চাইল শূর্পণখা। দেহরক্ষিণীরা শূর্পণখাকে ঠেলে মন্দোদরীর শয়নকক্ষ থেকে বের করে দিল।৩৭

হরিশংকরের মতে, ‘এই যুদ্ধে কুম্ভকর্ণই ছিল রাবণের শেষ অবলম্বন।’৩৮ কিন্তু রামায়ণে দেখতে পাই ইন্দ্রজিৎ ছিল রাবণের শেষ অবলম্বন। সে যাই হোক, শ্রীরাম প্রথমে ঐন্দ্রাস্ত্র, পরে অর্ধচন্দ্র, ঐন্দ্রশরের আঘাতে কুম্ভকর্ণকে হত্যা করল। সবশেষে শ্রীরামের ব্রহ্মাস্ত্রের আঘাতে রাবণও ভূপাতিত হয়। এভাবেই বহু সহস্র বছরের জন্য অনার্যদের স্বাধীনতার সূর্য অস্ত গেল। এই ঘটনার বিবরণ হরিশংকর জলদাস উপন্যাসে বিস্তর উল্লেখ করেছেন। কিন্তু প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিকতায় বর্ণনা সংক্ষিপ্ত করা হলো। তবে রাবণের মৃত্যুর পর মন্দোদরীর মুখে কোনও বিলাপ নেই, কথা আছে। সেই কথাগুলো ছিল সত্য অথচ শ্রুতিকটু, বাস্তব অথচ হৃদয়বিদারী, যা হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে বর্ণিত রয়েছে :

মন্দোদরী রাবণের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শূর্পণখার মতো একজন নিকৃষ্ট নারীর কথা শুনে সীতার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিলে তুমি। নিজের বোনটাও তোমার কেমন নির্লজ্জ! দাদা আর বোনের মধ্যে ভব্যতার যে আড়ালটুকু, তা বেমালুম ভুলে সীতার স্পর্শকাতর নানা অঙ্গের বিবরণ দিয়ে গেছে তোমাকে। তোমার বোনের এই নির্লজ্জতার কথা আমি আমার খাসদাসীর মুখে শুনেছি। শূর্পণখার কথায় প্ররোচিত হয়ে পরস্ত্রীহরণের মতো অসভ্য কাজটি করেছ তুমি। আজ তুমি কোথায়, শূর্পণখা কোথায় ? তোমার রাজ্য আজ রসাতলে গেছে। ধুলায় গড়াচ্ছ আজ তুমি! আর শূর্পণখা ? শূর্পণখা হয়তো এখন রাজপ্রাসাদের সুখশয্যায় নিদ্রা যাচ্ছে! তার কারণে আজ আমরা সমূলে উচ্ছিন্ন হলাম রে ভগবান!’৩৯Ñএ কথা বলেই দু চোখ ভাসিয়ে জলধারা মন্দোদরীর বুকজুড়ে নেমে এল। কর্তিত কদলীবৃক্ষের মতো রাবণের বুকে আছড়ে পড়ল মন্দোদরী।

রাবণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় শূর্পণখাও কি মন্দোদরীর মতো আত্মবিলাপে মগ্ন ছিল ?

না। বরং শূর্পণখার স্মৃতি দ্রুত পেছনে সরে গেল। মনে মনে বলছিলÑ‘স্বামীহত্যার প্রতিশোধ নিতে এর চেয়ে ভালো কোনও উপায় আমার জানা নেই। রাবণ নারীলোভী বলেই নারীদেহের টোপ তার সামনে ঝোলালাম। আমি জানতাম, কামান্ধ রাবণ সীতাটোপ গিলবে। গিলেছেও। রাবণের কামলোভ তুঙ্গে চড়েছে বলেই লঙ্কাযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। তার ফলে রাক্ষসবংশ ধ্বংস হয়েছে, সোনার লঙ্কা পুড়ে খাক হয়ে গেছে, বিভীষণ ছাড়া পুরুষ আত্মীয়দের কেউই বেঁচে নেই। তাতে কী হয়েছে ? রাবণ তো মরেছে! বিদ্যুদজিহ্বের হত্যার প্রতিশোধ তো নিতে পেরেছি আমি!’৪০

রাবণের চিতায় যখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, আগুনের লেলিহান শিখা আকাশচুম্বী, সেই বহ্নিমান চিতার দিকে তাকিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল শূর্পণখা। বলল, ‘রাবণ, তুমি আমার স্বামীকে ইচ্ছে করে হত্যা করেছ। অন্যরা না বুঝলেও আমি বুঝেছি। বিদ্যুদ্জিহ্বকে না-চেনার অভিনয় করেছ তুমি। আমি ধরতে পেরেছি তোমার মেকি অভিনয়। মনে করেছিলে, আমার বিদ্যুদ্জিহ্বকে হত্যা করে বেঁচে যাবে তুমি। কিন্তু দেখ, তোমাকে বাঁচতে দিইনি আমি। সবান্ধবে তোমাকে হত্যা করিয়ে আমার স্বামীহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছি রে রাবণ!’৪০

‘শূর্পণখা’কে নিয়ে হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসটি কোনও মনগড়া কাহিনিবৃন্তে রচিত হয়নি। বাল্মীকি রামায়ণের আশ্রয়ে চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহ ঠিক রেখে নিজস্ব অভিজ্ঞানে সাধারণ পাঠক উপযোগী করে তুলে ধরেছেন। তবে এতে যে রামায়ণের মূল বক্তব্য উপেক্ষিত হয়েছে, তেমনটি লক্ষণীয় নয়; বরং ছোট ছোট বাক্যালাপে শূর্পণখা উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে সমুজ্জ্বল ও পাঠকপ্রিয়।

তাঁর এই উপন্যাসে শূর্পণখার কাম-লোভ-ক্রোধ-ভালোবাসা-প্রতিশোধ-প্রতিরোধের বৃত্তান্ত লক্ষ করা যায়। তবে প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের চিত্র দুটিই বেশি প্রকট। প্রথমটি শ্রীরাম লক্ষ্মণের প্রতি নাক-কান কাটার অপমানের প্রতিশোধ; দ্বিতীয়টি রাবণের প্রতি স্বামীহত্যার প্রতিশোধ। প্রথম প্রতিশোধটি সে নিতে না পারলেও দ্বিতীয়টি প্রথমটির ধারাবাহিকতায় এসেছে। এর জন্য নিয়তিই শূর্পণখাকে সাহায্য করেছে। রামায়ণ মহাকাব্যে সীতা দেবীর পরে বোধ করি সবচেয়ে অবহেলিত লাঞ্ছিত ও দণ্ডিত চরিত্র শূর্পণখা; অথচ অনুজ্জ্বল। কিন্তু হরিশংকর জলদাস তার উপন্যাসে মহাকাব্যের এই ঘাটতি পূরণে সচেষ্ট ছিলেন এবং শূর্পণখাকে দিয়েছেন খল নারী চরিত্রের মর্যাদা।

উপন্যাসটি পড়ে হয়তো অনেকেরই জিজ্ঞাসাÑরাবণ তো গেল, লঙ্কাপুরী আগুনে পুড়ে ছারখার, শূর্পণখার কী গতি হলো। রামায়ণ মহাকাব্যে কিংবা হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসে এ ব্যাপারে কিছু উল্লেখ নেইÑতার অবশ্য সংগত কারণও আছে। তবে কিছু লেখক পণ্ডিতের ধারণাÑরাবণের মৃত্যুর পর শূর্পণখা লঙ্কায় বিভীষণের সাথে বসবাস করেছিল। কয়েক বছর পরে তাকে তার বৈমাত্রেয় ভগিনী কুম্বিনীর সাথে সমুদ্রে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, যদিও তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল তা নির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি। আবার ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ’-এ উল্লেখ আছে যে, শূর্পণখা তার পরবর্তী জন্মে ভগবান শ্রীরামকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য ব্রহ্মার কাছে প্রার্থনা করেছিল, যা ব্রহ্মা মেনে নিয়েছিলেন। দ্বাপরযুগে সে কুব্জা কুমারী রূপে পুনর্জন্ম লাভ করে। যিনি শ্রীকৃষ্ণের সংস্পর্শে এসে তার শারীরিক কুব্জতা থেকে মুক্তি লাভ করে এবং সুন্দর রূপ ফিরে পায়।  

আনুমানিক আড়াই হাজার বছর পূর্বে বাল্মীকি মুনি রামায়ণ মহাকাব্য রচনা করেনÑএমনটাই সাধারণের ধারণা। কিন্তু ভারতের হায়দরাবাদে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্টিফিক রিসার্চ অন ভেদাজ বা সংক্ষেপে আই-সার্ভ নামের গবেষণা সংস্থার গবেষকরা প্ল্যানেটোরিয়াম সফটওয়্যারের সাহায্যে গবেষণা চালিয়ে জানিয়েছেন, ৫১১৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রামায়ণ রচিত হয়। শ্রীরামচন্দ্র অযোধ্যায় ৫১১৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ১০ জানুয়ারি বেলা ১২টা থেকে ১টার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।৪১ আবার এমনও লোকশ্রুতি রয়েছেÑরামের জন্মের ৬০ হাজার বছর পূর্বে বাল্মীকি মুনি রামায়ণ রচনা করেছেন। এটি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য কি না তা জানা যায়নি। তবে বাল্মীকি মুনি, রামের সমসাময়িক। তিনি যে রামের সমসাময়িক তার প্রমাণ হলোÑরাম যুদ্ধ শেষ করে অযোধ্যায় ফিরে যাওয়ার পরে যখন সীতাকে বনবাস দেয়, তখন সীতা বাল্মীকি মুনির আশ্রমে ছিলেন, সেখানেই তাঁর পুত্র লব-এর জন্ম হয় এবং বাল্যকাল সেখানেই কাটে। তবে সর্বসম্মত যে, বাল্মীকি মুনিই রামায়ণ রচনা করেন।

কৃত্তিবাস ওঝা বহুকাল পরে চতুর্দশ শতাব্দীতে মূল সংস্কৃত রামায়ণের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন। তা-ও বাংলা কাব্যরূপে ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে গদ্য রচনা শুরু হলে রামায়ণ মহাকাব্যটি গদ্যানুবাদরূপেই আবির্ভূত হয়। তবে তাতে যৎসামান্য সংলাপ লিখে ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে মাত্র। একবিংশ শতাব্দীতে এসে হরিশংকর জলদাস পুরো রামায়ণটি নয়, এই মহাকাব্যের কিছু অংশের কাহিনি উপন্যাসে রূপ দিয়েছেন; করেছেন বিপ্রতীপ ভাবনার উত্তরণ। যেমন- উপেক্ষিত সীতা, শূর্পণখা, ইত্যাদিÑযা কিনা রামায়ণের নবরূপায়ণ।

তথ্যসূত্র :

১.         বাল্মীকি রামায়ণ [উত্তরাকাণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৪৮]Ñসারানুবাদ : রাজশেখর বসু, নিউ লতিকা প্রকাশনী, ডিসেম্বর ২০২১

২.        পুরাণকোষ [পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৮২]Ñনৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, সাহিত্য সংসদ, জুন ২০২৪

৩.        শূর্পণখা [পৃষ্ঠা-৪৫]Ñহরিশংকর জলদাস, কথাপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৫

৪.         তথৈব [পৃষ্ঠা-৪২]

৫.        বাল্মীকি রামায়ণ [অরণ্যকাণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫৭]Ñসারানুবাদ : রাজশেখর বসু, নিউ লতিকা প্রকাশনী, ডিসেম্বর ২০২১

৬.        শূর্পণখা-একটা প্রশ্নÑসুজন দাশগুপ্ত

৭.         শূর্পণখা [পৃষ্ঠা-৬১]Ñহরিশংকর জলদাস, কথাপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৫

৮.        রামায়ণের পেঙ্গুইন সঙ্গী (মূল গ্রন্থ ইংরেজিতে, ২০০৬)Ñবিষ্ণুপদ চক্রবর্তী

৯.        বাল্মীকি রামায়ণ [উত্তরাকাণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৪৯]Ñসারানুবাদ : রাজশেখর বসু, নিউ লতিকা প্রকাশনী, ডিসেম্বর ২০২১

১০.       শূর্পণখা [পৃষ্ঠা-৬২]Ñহরিশংকর জলদাস, কথাপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৫

১১.       তথৈব [পৃষ্ঠা-৬৩]

১২.      তথৈব [পৃষ্ঠা-৬৯]

১৩.      তথৈব [পৃষ্ঠা-৭০]

১৪.       তথৈব [পৃষ্ঠা-৭১]

১৫.      তথৈব [পৃষ্ঠা-৭৪]

১৬.      তথৈব [পৃষ্ঠা-৭৫]

১৭.       তথৈব [পৃষ্ঠা-৭৭]

১৮.      তথৈব [পৃষ্ঠা-৭৯]

১৯.      তথৈব [পৃষ্ঠা-৮১]

২০.      বাল্মীকি রামায়ণ [অরণ্যকাণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫৬-৫৭]Ñরাজশেখর বসু

২১.      তথৈব [পৃষ্ঠা-১৬২]

২২. শূর্পণখা [পৃষ্ঠা-১৪৪]Ñহরিশংকর জলদাস, কথাপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৫

২৩.      তথৈব [পৃষ্ঠা-১৪৭]

২৪.      শূর্পণখা [পৃষ্ঠা-১৩৫-৩৬]Ñহরিশংকর জলদাস, কথাপ্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৫

২৫.      তথৈব [পৃষ্ঠা-১৫৪]

২৬.     তথৈব [পৃষ্ঠা-১৫৫]

২৭.      বাল্মীকি রামায়ণ [অরণ্যকাণ্ড, পৃষ্ঠা-১৬৫]Ñরাজশেখর বসু

২৮.     তথৈব [পৃষ্ঠা-১৬৬]

২৯.      তথৈব [পৃষ্ঠা-১৬৭]

৩০.      তথৈব [পৃষ্ঠা-১৭৪]

৩১.      শূর্পণখা [পৃষ্ঠা-১৭৬]Ñহরিশংকর জলদাস

৩২.      তথৈব [পৃষ্ঠা-১৭৭-৭৮]

৩৩.     তথৈব [পৃষ্ঠা-১৯১]

৩৪.      তথৈব [পৃষ্ঠা-১৯৫-৯৬]

৩৫.     তথৈব [পৃষ্ঠা-২১৯]

৩৬.     তথৈব [পৃষ্ঠা-২৩২-৩৪]

৩৭.      তথৈব [পৃষ্ঠা-২৩৮]

৩৮.     তথৈব [পৃষ্ঠা-২৪৭]

৩৯.     তথৈব [পৃষ্ঠা-২৫৫]

৪০.      তথৈব [পৃষ্ঠা-২৫৬]

৪১.       রামায়ণের পোস্টমর্টেম-সনাতন জ্ঞান

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button