শব্দঘর ঈদসংখ্যার কথাসাহিত্য : স্বপন নাথ

ক্রোড়পত্র : শব্দঘর ঈদুল ফিতর ২০২৬ পর্যালোচনা

ঈদ উৎসব উপলক্ষ্যে বিভিন্ন পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে থাকে। শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রকৃতি ও সমাজসহ বিচিত্র বিষয়সমৃদ্ধ ঈদসংখ্যা প্রকাশের সংস্কৃতি এখন প্রতিষ্ঠিত। এ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে শিল্প সাহিত্যের পত্রিকা শব্দঘর ঈদসংখ্যা অনেকেই খেয়াল করেছেন, সংগ্রহ করেছেন। বিশাল এর পরিসর। এ সংখ্যায় রয়েছে প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোটগল্প, বড়গল্প, অনুবাদ, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণসাহিত্য, স্মৃতিকথা ও কবিতা। বলা যায় বিষয়বৈচিত্র্যের কারণে এ সংখ্যা প্রশংসিত হয়েছে। দৈনিক পত্রিকাসহ অনলাইন মাধ্যমগুলোও ঈদসংখ্যা প্রকাশ করেছে। যেগুলোর সঙ্গে শব্দঘরও পাঠকরা পছন্দে রেখেছেন। এ পরিসরে আলোচ্য হলো উপন্যাস ও গল্প। এসব উপন্যাস ও গল্পের বিষয় এবং রচনাশৈলীর বৈভিন্ন্য পাঠকদের চিন্তায় ধাক্কা দেবে নিশ্চয়ই। ভাষাশৈলীর দিক থেকেও রচনাগুলো সমৃদ্ধ। রচনাসমূহের বিষয়বৈচিত্র্য থাকায় একত্রে আলোচনা করা মুশকিল।
উপন্যাসগুলো হলো অমর মিত্রের পেদ্রো পারামোর মুক্তি, হরিশংকর জলদাসের আমিই সেই বধূ হে, নলিনী বেরার ঝিঁঝি পোকার জীবন, মনি হায়দারের কার্নিসে কালো সাপ, সাদিয়া সুলতানার অশ্রুঅমরা, দীপু মাহমুদের মেমোরি ট্রান্সফিউশন। কয়েকটি বিষয়ে ঐক্য রয়েছে, তা হলো―সমাজ ও মানুষের জীবনবাস্তবতা। এ ছাড়াও বহির্বাস্তবতা ও অন্তর্বাস্তবতার অসামান্য যুগপৎ ভাষ্য লক্ষ করি। বিভিন্ন আখ্যানে রূপায়িত হয়েছে প্রেম, প্রকৃতি, জীবনার্থের প্রতি তীব্র আকুতি ও একই সঙ্গে নানাবিধ সংকট। প্রকাশিত উপন্যাসগুলো বিষয়শৈলীতে আলাদা, তেমনি গঠন ও ভাষার ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র। সব মিলিয়ে আমরা প্রতিটি পাঠ থেকে ভিন্ন উপলব্ধি গ্রহণ করি।
এ উপমহাদেশ শুধু নয়, বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় উপনিবেশ ও বিজাতীয় লক্ষণ বৈশিষ্ট্য, এর অধঃক্ষেপ, অবশেষ যে এখনও ক্রিয়াশীল, এর প্রমাণ পাঠ করি পেদ্রো পারামোর মুক্তি উপন্যাসে। ইতিহাস বলে, পর্তুগিজ ও ডাচরা এসেছিল অনেক আগে। তখন ভারতীয় ভূখণ্ড শুধু নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠিত হয় আরও কত উপনিবেশ। সেই কবে বিদায় হলো পর্তুগিজ, মোগল-পাঠান, ব্রিটিশ; তারপরও ঔপনিবেশিক চিহ্নগুলো কীভাবে সক্রিয় রয়ে গেছে নানা ক্ষেত্রে। কীভাবে রয়ে গেল, এ নিয়ে প্রশ্ন হতেই পারে। অন্তত পাঠক হিসেবে আমাদের চিন্তায় উত্থিত হয়। সেই পর্তুগিজ আগমনের কাল থেকে একালের লাতিন-স্প্যানিশ ভাবনায় যোগসূত্র তৈরি করেছেন অমর মিত্র তার উপন্যাসে। এ-উপন্যাসের অনল চৌধুরী বিদেশ থেকে দেশে ফিরে নতুন পরিচিতি ঘোষণা করে। ক্ষমতা, দাপট, নগদ লাভের আশা ও স্বপ্নে মিথ্যের এক সৌধ গড়ে তোলে। অনল চৌধুরী হঠাৎ ঘোষণা করে যে, সে পর্তুগিজ উপনিবেশক পেদ্রো পারামোর বংশধর ও উত্তরাধিকার। এটা প্রচার করতে করতে একটি সংস্থাও তৈরি করে। মূল উদ্দেশ্য তখনও প্রকাশ পায় না। সে নিজেও অনল চৌধুরী পারামো নাম ধারণ করে। আসলে সে কী করতে ইচ্ছুক। সে পেদ্রো পারামো উৎসব করতে চায় প্রচারের জন্য। পক্ষে নিতে চায় সামাজিক শ্রেণি পেশার মানুষকে। সে বলে, ‘মনে করলেই পেদ্রো পারামো বাস্তব, আমাদের পূর্বপুরুষ হেয়ার লিভস ডেসেন্ডান্ট অফ পেদ্রো পারামো। ফলক লেগে গেছে, আমরা যে পেদ্রো পারামো ফেস্টিভ্যাল করব, তাতেই হৈহৈ পড়ে যাবে, দেখুন এই আইডিয়া বেচেই অনেক টাকা কামানো যায়, রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলেই আমি ফেস্টিভ্যালের কথা ঘোষণা করে দেব।’
অনল চৌধুরী এভাবে উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠার নানা পরিকল্পনা করে। তারই নিকটতম একজন সুজন চন্দ এ উপনিবেশের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে উপলব্ধি প্রকাশ করে। সুজন ব্যাখ্যা করে এ উপনিবেশ একটি দেশকে কীভাবে মৃত দেশে পরিণত করেছে। তারা দেখল, পারামোর উত্তরাধিকার হিসেবে অনল চৌধুরীর প্রত্যাবর্তন অনেকটা হিংসুটে আডলফ হিটলারের মতো। সে অনেকের সহায়তা নিয়ে গরিব জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী গ্রাম দখলের প্রচেষ্টা চালায়। অন্যদিকে মানবিক, এনজিওধর্মী কাজের খোলসে কৃত্রিম, নকল মানবিক ব্যক্তি সম্পর্কে আদিবাসী দেবু মান্ডিদের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়। ফলে দেবু মান্ডি জানায়, ‘কামালো, তাইই তো, অনল কি সেই কামালো যার মাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল পেদ্রো পারামো। অনল কেউ না। জাল পারামো, জালিয়াত। পেদ্রো পারামোর বংশধর আমি। শালা আমাদের জমি পাহাড় সব সেই শয়তানটা দখল করে নিয়েছে, ক্ষেতের জমি পতিত করে দিয়েছে, শুয়োরের বাচ্চা জালিয়াত, আমাকেও কিনে নিয়েছে।’ বংশধর হিসেবে সে তার চারপাশে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক নানা শ্রেণি পেশার মানুষের সমাবেশ ঘটায়। এর মধ্যে একজন ছিল দেবু মান্ডি। শেষ পর্যন্ত দেবু মান্ডিই অনল চৌধুরীর আসল রূপ উন্মোচিত করে।
আমরা জানি, সমাজের নানা শ্রেণি, পেশা, দলিত সাধারণ মানুষের রূপায়ণ হয়েছে কথাসাহিত্যে। তবু পেশাসংশ্লিষ্ট নরসুন্দর/নাপিত জনসমাজের উল্লেখ রয়েছে কেবলই প্রসঙ্গ অনুযায়ী। আলাদাভাবে শুধুই এ-সম্প্রদায় কেন্দ্র বা উপলক্ষ্য করে কথাসাহিত্য রচিত হয়েছে কি না আমাদের জানা নেই। সাহিত্যে খণ্ডিত, আংশিক বা কোনও চরিত্র, ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে এসেছে, তা আসাই স্বাভাবিক। কিন্তু নাপিত সম্প্রদায়ের জীবনযাপন বিষয় হিসেবে গ্রহণ ও পূর্ণাঙ্গ কথাবস্তু নির্মিত হলো হরিশংকর জলদাসের আমিই সেই বধূ হে উপন্যাসে। হরিশংকরের চিরচেনা ভঙ্গি, সহজবোধ্য ভাষায় যেখানে কথাবস্তু বিন্যস্ত করেছেন। তাঁর ভাষা ও ঘটনাবলির সংযোগসেতুর বৈশিষ্ট্য হলো সারল্য। এতে পাঠকও সক্রিয় থাকেন এ ভাষায়। যা পাঠককে সহজেই প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। তিনি এ প্রতিবেদনে যুক্ত করেছেন লোককথার উপকরণ। উল্লেখ করা যায়, শব্দঘর এ সংখ্যায় প্রকাশিত কথাসাহিত্যের অধিকাংশেই লোকউপাদানের প্রয়োগ লক্ষ করি, যা এ উপন্যাসেও চমৎকৃত করেছে। এখানে লেখক অনিবার্যভাবেই উল্লেখ করেছেন সেই খ্যাতিমান বিনয়বাঁশি জলদাস প্রসঙ্গ। ফলে উপন্যাসকে আলাপ শুধুই কল্পনাপ্রসূত বলে মনে হয় না। পাঠক সহজেই কাহিনির মধ্য দিয়ে ভূগোল ও পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেন।
সাধারণ বাঙালি সমাজ এখনও সেই সাবেকি জাতপাত বর্ণবৈষম্য জায়মান রেখেছে; তা স্পষ্ট হয় বাবুলালের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এ বর্ণবিভাজন শোষণ, অবহেলা, বঞ্চিত রাখার কৌশল হিসেবে প্রয়োগ করা হয়, তা আমরা জানি। এ উপন্যাসে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবেই উদ্ভাসিত। আমরা অর্থনীতিতে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র জেনেছি। লক্ষ্যণীয় এ দেশে এ নাপিত সম্প্রদায়সহ আরও কয়েকটি পেশাগত সম্প্রদায় রয়েছে যারা এ দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারেনি। বের হয়ে আসতে পারেনি সামাজিক শ্রেণি ও বর্ণবৈষম্যের নিবর্তন থেকে। মানবিকতা প্রদর্শন হলেও মনোজগৎ থেকে কেউ তাকে বাদ দিতে পারেনি। এমনকি বাবুলালের শেষকৃত্যেও এ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘এই ফাঁকে দুটো বাতাসা আর এক ঘটি জল এনে চক্রবর্তী মশাইয়ের সামনে রাখল সুশীলা। ও স্থির জানেÑ চক্রবর্তী মশাই বাতাসা তো খাবেনই না, উপরন্তু জলও স্পর্শ করবেন না। এ অঞ্চলের ব্রাহ্মণরা কখনও অব্রাহ্মণের বাড়িতে কিছু খান না।’ ফলত তারা প্রজন্মান্তরে শোষণ ও নির্যাতনের আবর্তনেই জীবন অতিবাহিত করছে। ওইদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন লেখক। যেমন একটি বাক্যেই সামাজিক এ ব্যবধানকে স্পষ্ট করেছেন; এখানেই ধরা পড়েছে অভিনবত্ব। ‘ব্রাহ্মণের পা-ঘষা পাথরে বাবুলালের মাথাটা সাংঘাতিকভাবে ঘা খেল।’ এরপরও উত্তরাধিকারীগণ বিভিন্নভাবে নির্যাতন বঞ্চনার বৃত্তে আটকে থাকে।
নলিনী বেরার ঝিঁঝিপোকার জীবন উপন্যাসেও উপনিবেশের অধঃক্ষেপ রয়েছে। এর ফলেই তো জঙ্গলের অধিবাসীদের জায়গা হয় না বনে-জঙ্গলেও। কৃত্রিম এ সভ্যতার ধারে কাছেও তারা আসতে পারেনি। যারা এসেছে, তারা ছেড়ে এসেছে অকৃত্রিম জীবনাচরণ। তাদের নেই শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান। তাদের জায়গা হয় না অভ্যস্ত পরিবেশে। এ জীবন তো পোকাসমাজের সঙ্গেই মানায়। বস্তুত মূল্যহীন জীবন যাপন করে সকলেই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। সারা বিশ্বব্যাপী সাধারণ, দরিদ্র, দলিত মানুষকে নিয়ে কত জটিলতা জঞ্জাল তৈরি হতে থাকে, হচ্ছেও, এ কথাটি স্পষ্ট করেছেন এ-উপন্যাসে। কথা হলো, ‘গরিব মানুষ রাজনীতির কাজে লাগে, তা ছাড়া তাদের দ্বারা কী হয়, গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মায়, তাদের ফ্রিতে রেশন দাও, ফ্রিতে ঘর দাও, নইলে ফুটপাথ দখল করে রান্না করতে বসবে ভিক্ষার চাল।’ জঙ্গলবাসীরা এতই গরিব যাদের ঠিকানা বলার কোনও স্থান উল্লেখ করতে পারে না : ‘নিজেদের বাড়ি বলে কোন গ্রামের নাম করব ? তেমন নিরাপদ গ্রামনামও তো আমার জানা নেই। চটজলদি মুখে এসে গেল বাবার মাসতুতো ভাইয়ের গ্রামনামটা।’ থানা-পুলিশ বা হাসপাতাল মানুষের জন্য নিরাপদ স্থান হওয়ার কথা। কিন্তু হয় না। অসুস্থতায় পাহারাদারের পা ধরেও রক্ষা হয় না। হাসপাতালে ভর্তি হলেও একজন জঙ্গলবাসী মা অবশেষে মৃত্যুবরণ করে। ছেলে তখন খেয়াল করে, ‘মা তো আর নয়, একটা লাশ। এতক্ষণে আবারও আঙুলের, কড় গুনে গুনে হিসাব করলাম, আমাদের পরিবারের আমরা চারজন একসঙ্গে ঘর ছেড়েছিলাম, এখন আমরা একজন। একজন! একজন!!’
এ জীবন-সংসারের সাধারণ সমস্যা, মানসিক টানাপোড়েন নিয়ে উপন্যাস কার্নিসে কালো সাপ লিখেছেন মনি হায়দার। এসব সমস্যার মধ্যেই জীবনকে যাপন ও পার করে অনেক অথবা কয়েকজন মানুষ। পারিবারিক, সামাজিক সমস্যার সঙ্গে সমকালীন বিষয় হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসের কথাবস্তু। আমরা যে স্বাভাবিক জীবন পার করছি প্রতিদিন। সমকালীন দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত মানুষেরই কাহিনি। জীবন আপাত শর্তাধীন মনে হলেও ভালোবাসাই মুখ্য। সবকিছুর উপরে প্রতিষ্ঠা পায় প্রেম, ভালোবাসা। ফলে মুহিব লাইজুকে বলে ‘শর্ত ছিল, শর্ত আছে, শর্ত থাকবে কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি। সেই ভালোবাসাটি আজকের নয়, যেদিন তুমি প্রথম আমাকে সব দিয়েছিলে উজাড় করে, সেইদিন থেকেই…।’
ব্যতিক্রমী সমকালীন বিষয় কেন্দ্র করে নির্মিত মেমোরি ট্রান্সফিউশন উপন্যাস। যে কোনও ধরনের পাঠককে আকৃষ্ট করবে এ উপন্যাস। কোনও বিচ্যুতি ছাড়াই পাঠে ধরে রাখে পাঠককে। এর কারণ সায়েন্স ফিকশন। উপন্যাসে বর্ণিত ট্রান্সফিউশন পদ্ধতি এ কালের যে কোনও অপরাধ দমনেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ যুগে আমরা নানা ধরনের নিরীক্ষার মুখোমুখি। ফলে এ মেমোরি ট্রান্সফিউশনের পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। এ উপন্যাসের কুশীলবরা পরীক্ষা করে দেখেছে যে, মানুষের আবেগ পরিবর্তন করে ফেলা যায়। পরীক্ষা করা হলো কৃত্রিম স্মৃতি ও প্রকৃত স্মৃতির মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং দুয়ের মিশ্রণের প্রতিক্রিয়া। পদ্ধতি প্রয়োগের পর ‘দেওয়ান হাবীব ঘরের বাইরে তাকালেন। পাহাড়ের সবুজ ঢিবি, হালকা কুয়াশা, নরম রোদ―সব কিছু যেন তার ভেতরের আবেগের সঙ্গে মিশে নতুন এক জগৎ তৈরি করেছে। কিন্তু কী সেই জগৎ সেটা বুঝতে পারছেন না।’ এরকম দেওয়ান হাবীবের ছেলেবেলার স্মৃতির মুখোমুখি করার মাধ্যমে সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা করা হয়। তারপর দেওয়ান হাবীব বলে যায় সত্য ঘটনার রহস্য। প্রথমত দেখা গেল যে, কৃত্রিমভাবে স্মৃতি সংযোজনে কিছু সমস্যা। অর্থাৎ মেশিন সরিয়ে নিলে স্মৃতি আর থাকছে না। তখন ট্রান্সফিউশনের পর যার সাথে ছোটবেলার স্মৃতি রয়েছে এমন সমবয়সী একজন সহপাঠী আয়াতকে মুখোমুখি করা হয়। আয়াতের স্মৃতি ট্রান্সফার করা হয় দেওয়ান হাবীবের মধ্যে। ‘এরপর দেওয়ান হাবীবের স্মৃতিতে বীভৎস এক ঘটনার ছবি দেখা দিয়েছে। রাত। আয়াত আলির পরনে মাদ্রাসার বড় হুজুরের পোশাক। মাথায় বিশাল সবুজ পাগড়ি। মুখে লম্বা দাড়ি। এত অল্প বয়সে তার এমন লম্বা দাড়ি কীভাবে হয়েছে সেটাও ভেবে বের করা যাচ্ছে না। আয়াত আলির জোব্বার নিচে কোরবানির সময় গরু জবাই করার ধারালো বড় ছুরি।’ এরপর দীর্ঘ স্বীকারোক্তি প্রদান করে দেওয়ান হাবীব। এ স্বীকারোক্তির ফলে সে দণ্ডিত হলো মৃত্যুদণ্ডে।
এ জগতের অনিবার্য বাস্তবতা অবলম্বনে রচিত উপন্যাস সাদিয়া সুলতানার অশ্রুঅমরা। এ উপন্যাসের ভাষাই বলে দেয় লেখক, তাঁর এ-উপন্যাস ও শিল্প-সম্ভাবনার পরিণাম। মূলত একসঙ্গে মানুষ থাকতে চায়, ঘর তৈরি ও উত্তরাধিকারের মায়ায় স্বপ্ন দেখে। তবে বিশ্লিষ্ট হওয়া বহুগামিতাও মানুষের আদি বৈশিষ্ট্য। রক্তের ভেতর সবসময় খেলা করে আদি সমাচার। ঘর বাঁধে মানুষ, স্বপ্ন দেখে। সুখী হতে চলে ভাঙা-গড়া; প্রত্যাশিত কিছু না হলে ভাঙতে চায়, আবার নস্টালজিক হাহাকারে কাতর হয়। এই তো জীবন। বাহ্যিক বিষয়ের প্রতি যতই আকর্ষণ থাকুক, তারপরও ওই প্রচলিত আবেগ উপলব্ধিতে ঘরে ফিরে যাবার তাড়না থাকে। তা হলে ছকে বাঁধা বৃত্তাবদ্ধ এক জীবন। ওই প্রচলিত ঘর সামলে নিতে মূল্যবোধের চাপে পিষ্ঠ হয় মানুষ। আমরা জানতে পারি না, কী এক অচেনা নিয়তি নিয়ন্ত্রণ করে এ জগৎ সংসার। ‘―এই ছকবাঁধা জীবনের প্রতি এখনও ওর খুব লোভ। আবার জোর করে ঘাড়ে ধরে কেউ এমন একটা জীবনে ওকে ঢুকিয়ে দিয়েছে বিষয়টা ঠিক তাও নয়। জীবনে কতবারই তো বহ্নি বাবার নির্দেশ অমান্য করেছে, পাভেলকে বিয়ে না করলে আরেকবার অমান্য করা হতো। কী হতো তাতে ? আর এখন এসব ভেবেই বা কী হবে! সংসারের ছক থেকে কি আর বহ্নি বের হতে পারবে ?’ পারে না তো। বের হতে গিয়ে করোনাকালে গলির অভুক্ত কুকুরদের খাবার দেয়। তাতেও মুক্তি কি আসে ? রনকও তার জীবনের অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে পারে না। পাভেলও নিজের তৈরিকৃত রুচির ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে পারে না। কী এক অসুস্থ জালে আটকে থাকে সকলে। কপটতা গভীর থেকে গভীর হতে থাকে। পরিশেষে শূন্যতা অশ্রু, মৃত্যু আর অনিশ্চিতি যেন ঘিরে রাখে, তানি যেমন অনিশ্চিতির মুখে ঠেলে দেয় নিজেকে। জানুখালার মেয়ে বানু মারা যায় বিষপানে। এই ঘটনা হলো এ-সামাজিক কদর্যতার পরিণাম। ‘পৃথিবীর এই বিপর্যয়ের মাঝেও যাদের জন্য নিজেকে নতুন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে তাদের জন্য বুকের মধ্যভাগে জল থই থই করে। দূরে সরিয়ে দিয়ে চাওয়া মুখজোড়াও মনে পড়ে। মনের ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা বিপ্লব ওর সঙ্গেই সংঘর্ষে মেতে ওঠে।’
২
প্রকাশিত গল্পগুলোর প্রতিবেদন পাঠে আমরা বিস্মিত হই ভাষাশৈলী ও বিষয়বস্তুর কারণে। প্রতিটি গল্পের বিষয় নির্বাচন ও নির্মাণ স্বতন্ত্র। গ্রাম শহরের প্রাত্যহিক সমস্যা, মানুষের জৈবনিক জটিলতা, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা রূপায়ণ করেছেন গল্পকাররা। কোনও কোনও গল্পে এনথ্রোপসিন ধারণাকে ভেঙে দিয়ে সামগ্রিক পরিবেশের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। চিত্রিত করা হয়েছে, বলা হয়েছে প্লানেটারি বোধ। টোটাল ইকোসিস্টেমের বোধ থেকে গল্পের প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে অনেক গল্পের বিষয়বস্তু আমাদের আকৃষ্ট করে। আবার কোনও কোনও গল্পে রয়েছে লোকছড়া, উপগল্প ও লোককথার অন্তর্বয়ন। সাধারণ মানুষের মধ্যে, লোকসমাজে যা কিছু সাধারণের জীবনের সঙ্গে বহমান, সেগুলোর প্রাসঙ্গিক প্রয়োগ লক্ষ করি গল্পের প্রতিবেদনে।
প্রচলিত বিষয় নির্বাচন ও কাহিনি বলার রীতিও আছে; তবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্ম সংকটকেও বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে অনেক গল্পে। এ সুযোগে শব্দঘরের গল্প নির্বাচন ও প্রকাশনার কৃতিত্ব আমরা স্বীকার করি। এ বিষয়টি মূল্যায়নে অবশ্যই বাংলা কথাসাহিত্যের পরিধি ও বিদ্যমান স্রোতধারা আমাদের বিবেচনায় রাখতে হয়। এর অর্থ এ নয় যে, গল্পগুলোর অধিকাংশ গল্প হয়ে ওঠেনি। লেখা ও পরিসর বিবেচনায় এ আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। গল্পগুলোর পাঠ থেকে মনে হয় আমরা এখনও প্রচল রীতির বাইরে যেতে পারিনি। আবার অংশত মনে হয় বিষয়ে পৌঁছার জন্য পাঠককে অনেক দূর ভ্রমণ করতে হয়। কারণ অতিরিক্ত বর্ণনা। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, গল্পের বিষয় বোঝা ও মূল ঘটনা উপলব্ধির জন্য প্রচল বিবরণে আমরা ফিরছি কি না। এটি অভিযোগ নয়, গল্পগুলোর বৈশিষ্ট্য তা নির্দেশ করে। তবে কোনও কোনও গল্পে রয়েছে প্রচল রীতি অতিক্রমের বৈশিষ্ট্য। রয়েছে অসামান্য আকর্ষণ। এখানে ভেবে দেখা যেতে পারে ধ্রুব এষের গল্প ‘তার মুখাগ্নি কে করল’ প্রসঙ্গ। এটা কি গল্প, না কবিতা ? আয়তনে খুবই ছোট, তবে ভাবায়। গল্পের এমন গড়ন আগে পড়েছি বলে আমাদের জানা নেই। কখনও মনে হয় কোনও চিত্রনাট্যের একটি খসড়া পাঠ করছি কি না। বলার ভাষা, প্রকরণ ভিন্ন। উপস্থাপিত শব্দ ও বাক্যে এ ক্ষুদ্র পরিধিতে চিন্তার দ্যোতনাও রয়েছে।
সব গল্পই যে পাঠকের কাছে সমন্বিতভাবে ভালো লাগবে, তা কিন্তু নয়। তারপরও অনন্যতার নিরিখে আমরা কয়েকটি গল্পের কথা উল্লেখ করতে পারি। যেমন দুটো বড় গল্প মঞ্জু সরকারের ‘গৃহপালিত গরুটার গতিপথ’, তপন বাগচীর ‘চান্দার বিলের রাতকাহন’ গল্পে বিষয়বস্তু আমাদের চারপাশের ঘটনাবলি থেকে নির্বাচিত। এ দেশের গ্রামবাংলার চিরাচরিত সমস্যা, আশা নিরাশারই দলিল। একদিকে এ সমাজের দালাল, ফড়িয়া, ঠকবাজ সুবিধা কেড়ে নেওয়া ভোগকারী এবং পাশাপাশি দলিত, বঞ্চিত, নিবর্তিত জনদের কথা বর্ণিত হয়েছে এসব গল্পে। আমরা তো এ জীবন চক্রের বাইরে যেতে পারি না। আমাদের দুর্ভাগ্য বলতেই হবে; এমন নিয়তি আমাদেরই সাজানো। বহির্বাস্তবতার একটা সাবটেক্সট দিয়ে এ সমাজের অন্ধকার রূপায়ণ করেছেন হোসেন আবদুল মান্নান ‘লোকটা এখন গান গায়’ গল্পে। একই সঙ্গে আরও অনেকে। আমরা শুধু অভ্যস্ত নই, এমন বৃত্তাবদ্ধ চক্রই আমাদের পছন্দ বলে মনের বিকার দূর হয় না। ওই বৃত্তাবদ্ধ সংসার জীবনের গল্প রয়েছে জায়েদ ফরিদের ‘লাল ঘুড্ডি’ ও আনিস রহমানের ‘মশার সঙ্গে মশকরা’ গল্পে।
মূলত মানুষের ঠিকানা কোথায় ? এমন প্রশ্ন হতেই পারে ‘স্থায়ী ঠিকানা’ গল্প পাঠে। চারপাশে যখন টক্সিক মানুষের ভিড় ও দূষিত সমাজ। গল্পে বলা হয়েছে করোনা সংক্রমণে মানুষ ও প্রাণির জীবন যাপনের সংকট। এ সমস্যা বিস্তৃত হয়েছে প্রাণির প্রতি মানুষের সামাজিক ও সম্মিলিত হিংসা পর্যন্ত। লেখক জানান, ‘অল্প কদিনের মধ্যেই কুকুরবিরোধী এই আলোচনা টক অব দ্য বিল্ডিং-এ রূপ নিল। শুধু আলোচনার মধ্যেই বিষয়টি সীমিত থাকল না। আকস্মিকভাবে কুকুর-ধাওয়া অভিযানও চলল কয়েকবার।’ প্রাণি বিরোধী প্রতিবেশীদের বিরোধিতার কারণে রোহিনীবাবু জীবনদর্শনে পরাজিত হন। তার মেয়ে তমা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। তবে দেখা গেল, যেখানে যায় সেখানেই একই ধরনের প্রাণীবিরোধী মানুষ। তমার ভাষায়, ‘এত টক্সিক লোকের সঙ্গে বাস করা যায় না। টক্সিক লোক।’ গোটা সমাজই টক্সিক লোকে ভর্তি। অবশেষে তমা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গল্পের সাক্ষ্য নিয়ে আমরা প্রশ্ন করতেই পারি―এ পৃথিবী, মহাজগৎ কি শুধুই মানুষের ? এর উত্তর আমরা পেয়ে যাই মুম রহমানের ‘স্মৃতির সোয়াদ’ গল্পে। গল্পের বাকি অংশ অবশ্যই পাঠককে নাড়া দেবে। তবে আমরা এখানে চমৎকৃত করা গল্পাংশের শুরুটা উল্লেখ করতে ইচ্ছুক। ‘শুধু কি তার ঘুম ভাঙল! উঁচা শিমুল গাছে বাস করা এক ঝাঁক সবুজ টিয়া উড়ে গেল। লাল টুকটুকা শিমুল ফুলগুলো থেকেও কয়েকটা মাংসল শিমুল ঝরে পড়ল টুপ করে। পাশের বড় পুকুর থেকেও তিন চারটা জলপিপি দিল উড়াল। মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণি। এই যে শস্যের মতো মনোরম সবুজ টিয়া সেটা মানুষ খায়, কোমল হৃদয়ের মতো শিমুল ফুল সেটাও মানুষ খায়। সোনালি নীল আর তামাটে রঙের একটা চিত্রকর্মের মতো সুন্দও যে জলপিপিÑতাও মানুষ খায়। মানুষ সর্বভুক প্রাণিকুল। মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব বলা হয়, কিন্তু কুদরত এভাবে দেখে না। তার কাছে মানুষ সৃষ্টিকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বভুক প্রাণি।’
বিশ্বজিৎ চৌধুরীর গল্প ‘মাঝে নদী বহে ধীরে’ পাঠককে অত্যন্ত ট্রাজিক একটি পরিণতির মুখোমুখি করে। এক ঘটনায় দীর্ঘদিন পর পরস্পর হারানো প্রিয়রঞ্জন ও শারমিনের সাক্ষাৎ ঘটে। একসময় পরস্পরকে ভালোবাসত তারা; তবে তা আধেক প্রকাশিত ও আধেক অপ্রকাশিত। মাঝখানে বাধা ছিল সম্প্রদায়গত ব্যবধান। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের নিবর্তনে শারমিন বিচ্যুত হয়ে যৌনকর্মীর জীবন বেছে নেয়। প্রিয়রঞ্জন শারমিনকে ভুলে না, খুঁজতে থাকে। খোঁজ নিতে নিতে এক সময় পেলেও বিষয়টা বেশ নাটকীয় ঘটনায় পতিত হয়। অজানা পথিক ও খদ্দের হিসেবে রঞ্জনকে হোটেলে নিয়ে যায় শারমিন, কিন্তু ক্লান্তির কারণে সে ঘুমিয়ে পড়ে। এর ফাঁকে রঞ্জন কিছু টাকা ও একটি চিঠি লিখে শারমিনকে না বলেই বেরিয়ে যায় হোটেল থেকে। শারমিন এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চায়নি কখনও। পেছনে যে জীবন চলে গিয়েছে, তা আর ফেরত পেতে চায়নি সে। সে একজন ব্যক্তি ও মানুষ হিসেবে বাঁচার চেষ্টা করেছে খড়কুটো ধরে। কিন্তু নির্ভরতার স্থান থেকে পিছলে পড়েছে বারবার। তার শেষ কথা হলো, ‘এতদিন খালি বাইচা থাহনের লাইগা কত কিছু করছি। বাইচা থাহন যে এত কঠিন শারমিনের মতো কয়জন সেইটা জানে। … তোমার লগে দেখা হওয়ার পর সামান্য একটু ভালোবাসার জন্য যে এত বাসনা জাইগা উঠছে মনে, না মরলে তো সেই বাসনা আর জুড়াবে না!’ আসলেই জীবন যাপনের বাস্তবতা খুবই নির্মম।
ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি আর কঠিন রূঢ়তার মুখোমুখি হতে হয় মানুষকে। নিকট অতীতের নয় অথচ এ দেশে যে কোনও সময়ই এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করি আমরা। আন্দোলন সংগ্রাম, ইত্যাদি জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবনে। অন্তত পিছিয়ে পড়া সমাজে প্রতিদিন বেঁচে থাকাই এক সংগ্রাম। এমনি ঘটনাবলিতে ঠাসা এক গল্প হাজির করেছেন পারভেজ হোসেন ‘কাটাঘুড়ির সুতোয় বোনা’ গল্পে। কী ঘটে জীবনের প্রাত্যহিক ঘটনাবলিতে। আমরা প্রতিদিন ভোরে এভাবেই সংবাদ পাঠে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। অপরের ঘটনায় বিচলিত হই, একই রকম ঘটনা নিজের ওপর যখন পতিত হয়। এরপরও কিছু ঘটনা আমাদের জীবনে প্রশ্ন তৈরি করে। “আমাদের জুবায়েরের ছবিসহ একটা খবর দুই কলাম জুড়ে। শিরোনামটা এরকম―‘ধানমন্ডি থানার ওসির একমাত্র পুত্রের গুলিবিদ্ধ লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায়’।’’ প্রতিদিনের জাতীয় সমস্যা যা থেকে কখনওই মুক্ত হতে পারি না। অবশেষে তীব্র ঘৃণার জন্ম দিলে কোনও সচেতনতা তৈরি হয় না আমাদের মনে। এ বাস্তবতা তো আমরা অস্বীকার করতে পারি না। সমাজের নানামাত্রিক বাস্তবতাকে চিত্রিত করতে অনেকেই তুলে ধরেছেন, কিংবা বলেছেন ভিন্ন এক উপগল্প। এটি মূল ঘটনা ও বাস্তবতাকে উপস্থাপনেরই শিল্পিত কৌশল। কখনও সমকাল ও স্বীয় উপলব্ধি গল্পের কাহিনিতে বলার কৌশলে আশ্রয়ী হয়েছেন ইতিহাসের। এছাড়াও কোনও এক দূরবর্তী ঘটনার নির্ভরতায় বলেছেন একালের কথা।
মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা নানাভাবে পেয়ে থাকি। তবে উদাসীনতায় থাকা হাওরের কথা বলেছেন গোপাল দাশ। অথচ বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগান দিচ্ছে হাওর এলাকা। যোগাযোগ সমস্যায় যেমন বিচ্ছিন্ন, তেমনি ভাবনার দিক থেকেও বিচ্ছিন্ন ওই বিশাল এলাকার জনজীবন। এরই এক ক্ষুদ্র আখ্যান ‘বিধবা প্রথার নতুন দিশা’ গল্প। তুলির আঁচড় হলেও বার্তাটি পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। বিধবা ব্যক্তির মতোই অজ্ঞাত থেকে যায় হাওরের জীবন। ‘সমাজ বলে বিধবার চোখ শুকনো থাকবে, হৃদয় মরুভূমি হয়ে যাবে। কিন্তু আসল সত্যি অন্য। রক্ত, মাংস, হাড়―সব মানুষেরই এক। শরীরের টান, ভালোবাসার অভাব, কাছে থাকার আকাক্সক্ষা বিধবারও থাকে।’ এরপর দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, বর্ণবিভাজন, নির্যাতনের মধ্যে দাঁড়িয়ে গোকুল মাঝি জানায় ‘না নন্দু ভাই, সমাজ ভাঙে নাই। বিধবারা বাঁচত আর সংসার করতে পারত―এইডাই নয়া নিয়ম।’
‘লাশখোকো নদী’র রূপকে রাষ্ট্র ও সমাজের কদর্যতা নির্দেশ করেছেন কাজী রাফি। যে সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের সৃজনশীলতা, আলোচনা, সমালোচনার বিষয়ে সহিষ্ণুতা অনুপস্থিত। এর অনুষঙ্গে গল্পকার নিয়ে এসেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কার্যক্রম। যে প্রাদুর্ভাবের সংক্রমণ আমরা এখন লক্ষ করছি। গল্পে বর্ণিত কার্যক্রম সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখালেন লেখক। আমরা যেমন প্রতিদিন একটি ছোট ঘটনার বিস্তৃতি দেখি; গল্পেও লক্ষ করি কীভাবে সামান্য একটি বিষয় কত রঙে প্রসারিত হতে পারে। শিক্ষক শোয়েবের কার্যক্রম ছিল গণিত শেখানো, লক্ষ ছিল জনপ্রিয়তা অর্জন আর মিডিয়ার মাধ্যমে বাড়তি আয়। তবে এর মধ্যে আবার দ্বিধা ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। ‘যে রাষ্ট্রে জীবন বাঁচে না সেই রাষ্ট্রে এই বোকা শিক্ষক কেন জীবনের স্বপ্ন দেখার জন্য একটা কড়াইতে দশটা ডিম কত মিনিটে সেদ্ধ করা যায়―এসব ফালতু অঙ্কের ক্লাস নেয় ?’ পরিণামে যে সামাজিক মাধ্যম জনপ্রিয়তার কারণ, তা আবার ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ গল্পের প্রতীকে মোচড় দেওয়া কথাটি উচ্চারিত হয় গল্পের উপান্তে। “শোয়েব তার ‘দশ মিনিটে অঙ্ক শেখা’ বিষয়টাকে তাচ্ছিল্য করা লোকটাকে শায়েস্তা করতে পারবে ভেবে উল্লসিত হয়ে তাকে নাম্বারটা দিয়েছিল। মাঝে মাঝে মধ্যরাতে মেয়েটা আমার বাসার চাবি খোঁজে, দরজা খুলে নদীর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। একটাই স্বপ্ন সে দেখে―নদীতে তার বাবার লাশ ভেসে যাচ্ছে।’’
ভিন্ন স্বভাব ও মেজাজের গল্প তাপসকুমার দত্তের ‘ফুলের বনে যার পাশে যাই’। বলতে গেলে সম্প্রতি এমন গল্প পাঠ করিনি। ফলে আলাদা মনে হয়েছে আমাদের কাছে। বর্তমান বাস্তবতা উপস্থাপনে তিনি পুরাণের আশ্রয়ে গল্প নির্মাণ করেছেন। এ গল্পে মানুষের অস্তিত্ব, প্রাগৈতিহাসিক বৈশিষ্ট্য, মানুষের পরস্পর সম্পর্ক ইত্যাদি বেশ সাহসে উপস্থাপিত। তথাকথিত ও প্রচলিত সামাজিক অনুমোদন ব্যতীত সম্পর্কের নিরীক্ষা লেখক দেখাতে চেয়েছেন বলে আমাদের মনে হয়। কিন্তু ভূগোল, পরিবেশ, অতল ম্রোতে বহমান থাকা জিনগত বৈশিষ্ট্য সহজে কি ত্যাগ করা যায়। ফলে সামাজিক প্রচল মূল্যবোধ অস্বীকারে পুরুষ ও নারী যৌন সম্পর্কে উৎসাহী হলেও অবশেষে আদিবৈশিষ্ট্য ত্যাগ করতে পারে না। কিন্তু বন্ধন ভেঙে যাওয়ার সাহসী বার্তা পৌঁছে দিতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। গল্পে উপস্থাপিত একালের প্রতিনিধিরা কী মনোভাব পোষণ করে। মন্দ্রা জানায়, ‘প্রাংশুর সঙ্গে আমার কোনও বিশ্বাস ভঙ্গের ব্যাপার নেই। কারণ আমরা ডিভোর্স দিয়ে লিভ টুগেদার করি। দুজনেই স্বাধীন। কারণ বিয়ে মানে একটি অসুখী দাম্পত্যে আটকা পড়া, বিয়ে মানে সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীলতা, বিয়ে মানে সময়ের সাথে সাথে আকর্ষণ কমতে থাকা, বিয়ে মানে ব্যক্তিত্বকে ক্ষতবিক্ষত করা।’ কিন্তু একালে অনেকেই যৌনতার ক্ষেত্রে বাণিজ্যপুঁজির বাজারি প্রলোভন এড়াতে পারেনি। এ বিষয়টিও গল্পের অন্যতম অনুষঙ্গী হয়েছে। প্রাংশু ও মন্দ্রার অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক ও মৃত্যুর ঘটনার আগে লেখক পুরাণের একটি সম্পর্ক এবং সম্পূরক ঘটনা তুলে এনেছেন। অবশেষে মন্দ্রা প্রাংশুর জীবনের সমস্যা ও নেক্রোফিলিয়া অসুখের বিষয়টি প্রকাশ করে। প্রাংশু ও মন্দ্রার যৌথ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মূলত মানুষের প্রকৃতি ও অনুভূতি উন্মোচিত হতে থাকে।
আমাদের এ জীবনে প্রতিষ্ঠিত, সুন্দরভাবেই উপস্থাপিত, প্রদর্শিত দুর্নীতি ও প্রতারণা। এরই এক চরিত্র লোভ লালসা প্রতারণায় ডুবে থাকা সমষ্টির একজন নেহাল করিম। চারদিকের ঘনীভূত ঘটনাবলির মধ্যে নেহাল করিমের পতনের সংবাদ ওঠে আসে ফরিদুর রহমানের ‘স্বগতোক্তি ও একটি নির্ঘুম রাত’ গল্পে। একই সঙ্গে সমাজের অসঙ্গতি, নির্মমতার চিত্র লক্ষ করি আবদুল ওয়াহাবের ‘সিরিয়াল কিলার’, মাহমুদুর রহমানের ‘কবিতারা ভেসে যায়’, সাইফুর রহমানের ‘একজন নৃপতির খেয়াল’, ইসহাক হাফিজের ‘শহিদ মিনার’, হামিম কামালের ‘বিকেলের তৈলচিত্র’, মৌরী তানিয়ার ‘তিতির’ গল্পে।
কথাসাহিত্যের কাজই তো তাই―মানুষের সামগ্রিক কথা বলা। বলার কৌশলে থাকে শৈলী। প্রতিটি উপন্যাস ও গল্পে খুব নিবিড়তায় চলমান সামাজিক চালচিত্র বিবেচনা করেছেন লেখকরা। একই সঙ্গে প্রকাশিত সাহিত্যকর্ম সমাজস্থিত মানুষের মনোলোক, বাস্তবতা, বহির্বাস্তবতা রূপায়ণে শিল্পসাফল্যে উত্তীর্ণ। যে কারণে শব্দঘর ঈদসংখ্যার মনোনীত লেখাগুলো নিশ্চিত পাঠককে বিচলিত করবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



