আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

সুব্রত বড়ুয়ার গল্পগ্রন্থ তৃণা : মাহবুবুল হক

সুব্রত বড়ুয়ার সাহিত্যকর্ম : আলোচনা

সুব্রত বড়ুয়ার গল্পগ্রন্থ তৃণাতে গল্প আছে তিনটি। যথা―দূরত্ব, দ্বৈরথ ও  তৃণা। কিন্তু নামে আলাদা আলাদা গল্প হলেও তিনটি গল্প জুড়ে একটিমাত্র কাহিনিরই বিস্তার। বিষয়, উপস্থাপনা, বর্ণনাভঙ্গি এবং চরিত্র নির্মাণের দিক থেকে গল্পগুলো স্বতন্ত্র। গল্পের টান যতটা তার চেয়ে বেশি আছে উপন্যাসের আমেজ―যদিও উপন্যাসের গভীরতা ও ব্যাপ্তি এতে নেই। এ প্রসঙ্গে লেখক ভূমিকায় বলেছেন, ‘বিষয়টি কোনও উপন্যাসে তুলে ধরা হলে বেশি মানাত। কিন্তু অনুভবের খণ্ডতা সেটি করতে দেয়নি আমাকে। ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কেবল মানুষেরই নয় অনুভবেরও।’

স্বভাবতই সুব্রত বড়ুয়ার গল্পগ্রন্থ তৃণাতে আমরা গল্প ও উপন্যাসের আঙ্গিকের এক দোলাচল উপত্যকায় উপনীত হই। করণকৌশল নিয়ে পরীক্ষা গল্প ও উপন্যাসের প্রান্তিক এলাকায় পাঠককে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

তৃণাতে সুব্রত বড়ুয়া আমাদের জীবনের চিরায়ত প্রশ্নকে নতুনভাবে দেখেছেন। প্রেম কি অমর ? তা কি সত্যিই চিরন্তন ? নাকি শেষপর্যন্ত স্বপ্নিল প্রেমের মৃত্যু হয় বাস্তবের রূঢ় আঙিনায় ? এই প্রশ্নের ওপর এখানে আলো পড়ে।

উপন্যাস, প্রতিম তৃণা গল্পমালায় কাহিনির প্রধান চরিত্র একজন ‘সে’। ঢাকার কোনও অফিসের চল্লিশোত্তর বয়সি কর্মকর্তা একদিন কোনো কাজে অফিসের বাইরে যান। পরদিন অফিসে গিয়ে অফিসের দারোয়ানের কাছে একটা ছোট্ট চিরকুটে একটা চিঠি পান। চিঠির শেষে পত্রলেখিকার নাম দেখে চমকে যান তিনি। এ চিঠি তৃণার, সতেরো বছর আগে নায়কের জীবনবৃত্তের সীমা থেকে সে ছিটকে চলে গিয়েছিল সুদূর বিদেশে। গতদিন হঠাৎ তৃণা তার বোন রীনাকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে এসেছিল তার সঙ্গে। কিন্তু তাকে না পেয়ে চলে যাচ্ছে চট্টগ্রামে।

পরদিন কাকতালীয়ভাবে অনেকটা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ঐ কর্মকর্তাকে চট্টগ্রাম যেতে হয় একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে। যৌবনের প্রেমের মধুর স্মৃতি বিজড়িত চট্টগ্রামে পৌঁছে সে অস্থির হয়ে পড়ে। জীবনে ঝড়ো হাওয়ার ঝাপটার মতো একটা ব্যাপার ঘটে যায়। নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক অদৃশ্য সুতোর টানে সে সম্ভাব্য ঠিকানায় গিয়ে তৃণাকে পেয়ে যায়। ওই বাসায় তৃণার সঙ্গে কাটানো চারটি ঘণ্টা, তারপর হোটেলে নিঃসঙ্গ রাত্রি কাটানো, পরদিন ঢাকার ফেরার আগে স্টেশনে তৃণার শেষ উপস্থিতি―প্রসঙ্গ তিনটির আলাদা আলাদা নাম দেওয়া হয়েছে―দূরত্ব, দ্বৈরথ ও তৃণা।

কাহিনির শেষে গল্পের নায়ক অর্থাৎ নামহীন তৃতীয় পুরুষ ‘সে’ বুঝতে পারে, সতেরো বছর পার হয়ে গেলেও তৃণার আকর্ষণ সে এড়াতে পারে না। হয়তো এড়াতে পারবে না কোনও দিন। সেই সঙ্গে সে এটাও বুঝতে পারে যে, জীবনের সুস্থির বৃত্তে এখন সে বন্দি। তৃণার টানে সে বৃত্ত ছিন্ন করার ক্ষমতা তার নেই। কারণ ক্লান্ত, অসহায়, অবসন্ন ও সীমাবদ্ধ একজন মানুষ সে। এভাবে জীবনের কঠিন মাটিতে এক ধরনের অপূর্ণতা নিয়ে বেঁচে থাকার বোধের মধ্যে কাহিনি শেষ হয়। পাঠকও নায়কের অন্তর্বেদনার সঙ্গে শরিক হয়ে যান।

তৃণা গল্পমালার কাহিনি একমুখী সরল রৈখিক ও বিবৃতিধর্মী। কাহিনিতে চরিত্র আছে মোট তিন-চারটি। কিন্তু নায়ক ‘সে’ আর ‘তৃণা’ ছাড়া আর সবই গৌণ। ঘটনা বিন্যাসে কোনো জটিলতা নেই, বাহুল্য নেই। কাহিনি বর্ণনার বড় গুণ হলো সংযম। অতীত ও বর্তমান―সব মিলিয়ে একটি রোমান্টিক বিষণ্নতার জায়গা তৈরি করা হয়েছে তৃণা গল্পগ্রন্থে।

‘সে’ চরিত্রটি মূল আলোক সম্পতের মধ্যে রেখে পুরো কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ‘সে’ চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মগ্নচৈতন্যের অধিতল ফুটিয়ে তোলাতে রয়েছে লেখকের কৃতিত্ব। সেই সঙ্গে আছে মনন ও মনের যোগ―যা বিশ-শতকীয় আধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

গল্পের কাহিনিতে চমক নেই বললেই চলে। নিটোল কাহিনি। লেখকের গদ্যের হাত ভালো। নিপুণ বর্ণনা-কুশলতার সঙ্গে কখনও কখনও আছে সুচারু অনুপুঙ্খ কাজ। কখনও কখনও বর্ণনা অনেকটা কবিতার মতো জীবনের শূন্যতা ও পূর্ণতার স্বপ্নকে একসূত্রে গেঁথেছে। এর ফলে পুরো কাহিনিতে প্রেমের স্মৃতিভারাতুর একটা ঠাণ্ডা, স্নিগ্ধ ও বিষণ্ন স্রোত বয়ে যায়।

সুব্রত বড়ুয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলা একাডেমিতে কাজ করেছেন। বিজ্ঞান-লেখক, তিনি একাধারে কবি, অনুবাদক, প্রবন্ধকার, ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। এ পর্যন্ত তাঁর বিশটিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি উপন্যাস ও দুটি ছোটগল্প গ্রন্থ।

তাঁর প্রথম গল্প গ্রন্থ জোনাকি শহর প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। এরপর প্রকাশিত হয়েছে কাচপোকা (১৯৭৫), অনধিকার (১৯৭৭), আত্মচরিত ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৮), ভালোবাসা (১৯৮৯)।  তৃণা তাঁর সর্বশেষ গল্পগ্রন্থ।

এ গল্পে একজন মানুষের অতীত ও বর্তমানের দোলাচল মানসিকতার ঐকতান আমরা অনুভব করি। সেই সঙ্গে আমরা বুঝতে পারি, জীবনকে দেখার একটা নিজস্ব জানালা সুব্রত বড়ুয়ার রয়েছে।

তৃণা প্রকাশ করেছে পুনম প্রকাশনী। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। এর দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন মামুন কায়সার। ৫৭ পৃষ্ঠার বইটির দাম রাখা হয়েছে চল্লিশ টাকা।

তৃণা এক নাগাড়ে পড়ে ফেলার বই। পাঠকের ভালো লাগার বই।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button