ঈদ-উৎসব : যাপন সংস্কৃতি হিসেবে ঈদ-উৎসব : আহমেদ মাওলা

যাপন-সংস্কৃতির কথা আমাদের লিখিত সাহিত্যে প্রায় তুলে ধরা হয় না। ‘যাপন-সংস্কৃতি’র ঐতিহাসিক কিছু নিয়ামক থাকে, যেমন জনগোষ্ঠী ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, জনগোষ্ঠীর উৎপাদন-বণ্টন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের শাসন-বিন্যাস―এসব যাপন-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘একচ্যুয়েল লিভিং’ বা প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে আচার-অভ্যাস, খাদ্য-বস্ত্র, আসবাবপত্র, নিত্য ব্যবহার্য তৈজসপত্র ইত্যাদির সঙ্গে ট্রেডিশন বা পরম্পরাগত রীতি থাকে। এটাকেই ঐতিহাসিক নিয়ামক বলা হয়, যার সঙ্গে ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন হয়ে থাকে।
মোটিফ বা চিহ্নবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ভাষা কেবল মানুষের আবেগ-অনুভূতি-ভাব প্রকাশের ধ্বনিগত দৃশ্যগ্রাহ্য চিহ্নশক্তির প্রকাশ নয়, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রধান পরিচায়কও বটে। ভাষাকে তাই সংস্কৃতির অবিকল্প মাধ্যম বা প্রধান বৃক্ষকাণ্ড বলা হয়। অনুরূপ ধর্ম এবং লোকবিশ্বাস জাগতিক যাপন-সংস্কৃতির অভিন্ন অংশ। নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব লোকবিশ্বাস, ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে তাদের সামষ্টিক উৎসব বা ঐকান্তিক মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
ঈদ মুসলমান সমাজের প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সংস্কৃতির অভিন্ন সম্পর্ক বিদ্যমান। ‘কালচারাল স্টাডি’ বা সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন শাস্ত্রে ধর্মকে সংস্কৃতির মূল কাণ্ড ধরা হয়। কারণ, ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে আবশ্যিক পালনীয় কিছু বিধি-বিধান আছে, আচার নির্ভরতার একটা বিষয় আছে।
ইসলাম ধর্মে ইহজাগতিক এবং পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট বয়ান রয়েছে। উপমহাদেশে ইসলাম এসেছে মূলত আরবি-ফার্সি-উর্দু ভাষা ও পির-মুরশিদ-আধ্যাত্মিক পুরুষদের মাধ্যমে, অথচ বঙ্গীয় বদ্বীপের ভাষা ছিল বাংলা। এখানকার মানুষের ভাব-কল্পনা-অবেগ-অনুভূতি প্রকাশের বাহন হচ্ছে বাংলা। ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান এবং জাতি-পরিচয়ে বাংলাভাষী, আরবি-ফার্সি তাদের ধর্মীয় ভাষা, বাংলা তাদের মাতৃভাষা। এই ভাষাগত জটিলতা তাদের আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে। পাঠান-মোগল আমলে রাজভাষা ছিল ফার্সি, ইংরেজ উপনিবেশ আমলে রাষ্ট্রীয় ভাষা হয় ইংরেজি। ধর্ম যেহেতু আচারনির্ভর, তার প্রকাশ ভাষানির্ভর। তাই ধর্ম হয়ে ওঠে সংস্কৃতির মূল কাণ্ড।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত এ দেশের মানুষদের আত্মপরিচয় বা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস কাটিয়ে ওঠার সংগ্রাম।
সংস্কৃতির মূল উপাদান দুটি―ভাষা ও ধর্ম। ধর্ম উপমহাদেশের সামাজিক বাস্তবতা। ধর্মকে উপেক্ষা বা অস্বীকার করে সমাজে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব। ঈদ মূলত ধর্মীয় উৎসব হলেও এই উৎসব-আয়োজনের মধ্যে যুগপরম্পরায় নানা উপাদান-উপকরণ যুক্ত হয়ে ঈদের খুশিকে আরও উপভোগ্য করেছে। বিশেষ করে বঙ্গীয় বদ্বীপে ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার যেমন ঘটেছে নানা পথ ও পদ্ধতিতে, তেমনি উপমহাদেশে ধর্মীয় আচার এসেছে হরেক রকমের খাদ্য-রসনা, পোশাক-পরিচ্ছেদে যুগ-রুচির বৈচিত্র্যের মাধ্যমে। পাশাপাশি যাপন-সংস্কৃতিতেও নানা বিনোদন-উপকরণ যুক্ত হয়েছে।
ভাষা-সংস্কৃতিতে পত্রিকাগুলো ঈদসংখ্যা প্রকাশ নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করেছে নিঃসন্দেহে। যতদূর জানা যায়, বিশ শতকের গোড়ার দিকে ভাষা-সংস্কৃতির উৎসব-আয়োজনের বিনোদিত উপকরণ হিসেবে পত্রিকাগুলোর ঈদ সংখ্যা প্রকাশ শুরু হয়।
ড. অনিসুজ্জামানের মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্র (১৯৬৯) গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ঈদ নিয়ে প্রথম কবিতা লিখেছেন মুন্সী মোহাম্মদ আসাদ আলী। ১৯০২ সালে কলকাতার মাসিক প্রচারক পত্রিকার চতুর্থ বর্ষ ৯-১০ সংখ্যায় প্রকাশিত মুন্সী আসাদ আলীর ‘ঈদুল আজহা’ শিরোনামে কবিতা। ১৯০৩ সালে সৈয়দ এমদাদ আলী তাঁর সম্পাদিত মাসিক নবনূর পত্রিকায় ‘ঈদ’ শিরোনামে নিম্নোক্ত কবিতাটি প্রকাশ করেন―
ধর্ম ও কর্মের জীবন মাঝে
প্রতিষ্ঠিত করি আজ জীবনের আবহে হও অগ্রসর
নাহি তাতে কোন লাজ।
জীবনে ঢালে অনন্ত বিষাদ
দেও তারে দূর করে।
আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
রঙে নাচিয়ে যেন কয়ে যায়
মুসলিম জাহান আজি একতায়
দেখ কত বল ধরে।
মানব জীবনে ঈদের উৎসবকে সৈয়দ এমদাদ আলী দেখেছেন, অজস্র দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে একটুখানি আনন্দের সঞ্চার হিসেবে। ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিক ঐক্যের মিলন হিসেবে ঈদ উদ্যাপনকে দেখেছেন কবি। কবি কায়কোবাদ তাঁর ‘ঈদের আহ্বান’ কবিতায় লিখেছেন―
আজি এ ঈদের দিনে হয়ে এক মন প্রাণ
জাগায় মোসলেম সবে গাহ আজি মিলনের গান
ডুবিবেনা তবে আর ঈদের এ জ্যোতিষ্মান রবি
জীবন সার্থক হবে, ধন্য হবে দরিদ্র কবি।
অশ্রুমালা গ্রন্থের ‘ঈদের আহ্বান’ কবিতায় কায়কোবাদ ঈদকে মুসলমানদের ঈদগাহের জাগতিক জীবনের একদিনের উৎসব হিসেবে দেখেননি, পারস্পরিক ঐক্যবদ্ধ থাকার আনন্দময় বার্তা হিসেবে দেখেছেন।
মুসলমান সমাজে ধনী-গরিবের শ্রেণিগত ব্যবধান, আশরাফ-আতরাফ বংশগত বৈষম্য সেই সময় বিরাজমান ছিল, ঈদগাহে ঈদের জামাতে একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার মধ্য দিয়ে যে সমতার মেলবন্ধন তৈরি হয়, ইসলাম ধর্মের সাম্যের এই মহান আদর্শকে গুরুত্ব দিয়ে গান ও কবিতা লিখে জনমন জয় করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। যেমন―‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় নজরুল লিখেছেন―
‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ
মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ ?’
নিজস্ব সাং¯ৃ‹তিক ঐতিহ্য, এই কৃষি অর্থনীতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশটির মূল উৎপাদক শক্তি প্রান্তীয় ‘কৃষকের ঘরে’র দিকে সহানুভুতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন ভদ্রলোক সমাজের প্রতি―‘হররোজ’ বা প্রতিদিন যাদের ভাতের অভাবে ‘রোজার’ মতই উপোস থাকতে হয়, ‘ক্ষুধার’ যন্ত্রণায় চোখে ‘নিদ’ আসে না, সেই ‘মুমূর্ষু’ ‘কৃষকের ঘরে কি এসেছে ঈদ ?’ এই জিজ্ঞাসার সামনে সমাজ ও রাষ্ট্রের সমস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নির্বাক। ভেঙে পড়ে শ্রেণিগত বৈষম্যের বিবিধ দেয়াল।
‘ঈদ’ আরবি শব্দ, অভিধানিক অর্থ খুশি, আনন্দ। সামাজিক বাধা, বৈষম্য থেকে, স্বার্থবুদ্ধি থেকে মন বা আত্মার মুক্তি, স্বাধীন বিহার। কাজী নজরুল ইসলামের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটির মূল বার্তা হচ্ছে ইসলাম ধর্মের সেই মহান আদর্শ―
‘ও মন রমজানের ঐ রোজা শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ।
যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী
সেই গরীব ইয়াতিম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ’
গানটিতে সহানুভূতি, সাম্য ও মৈত্রীর যে বার্তা ধ্বনিত হয়েছে, তা ইসলাম ধর্মের মৌল আদর্শ। প্রথাগত রাজনৈতিক লেন্স দিয়ে এই আদর্শ না দেখাই উত্তম।
ইব্রাহীম খাঁর ‘পুটু’ গল্পটিতে দেখা যায়, একটা বকরির নাম হচ্ছে ‘পুটু’। আসন্ন বকরি ঈদ উপলক্ষে পুটুকে কোরবানি করা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মানুষের ভালোবাসায় একটা গৃহপালিত পশু যে পরিবারে সদস্যের মতো হয়ে উঠতে পারে, মানবিক মায়ার বন্ধনে কীভাবে আপন হয়ে ওঠে, তার প্রমাণ পুটু। পুটুকে জবাই করার মধ্য দিয়ে যে আত্মত্যাগ, ওটাই ‘মনের পশুকে’ অর্থাৎ আত্মার পাপবোধকে ত্যাগ করার মহত্ত্ব ধ্বনিত হয়েছে।
সৈয়দ শামসুল হকের ‘সাহেবচান্দের ঈদভোজন’ গল্পে দেখা যায়, ঈদের দিনে চারদিকে যখন পোলাও-মাংসের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন জলেশ্বরীতে আসা অদ্ভুত লোকটা বাড়ির উঠোনে গর্ত খুঁড়ে পাটখড়ির আগুনে ভাত আর বেগুন রান্না করছে। গ্রামের লোকেরা নানা রকম তিরস্কার করলে সে বলে, পঞ্চাশের মন্বন্তরে তার মা-বাবা অনেক দিন অভুক্ত থাকার পর এক গৃহস্তবাড়িতে পোলাও-মাংস খেয়ে বমি করতে করতে মারা যায়। সেই ভয়ংকর স্মৃতি সাহেবচান্দ মন থেকে মুছতে পারে না। পেয়াজ-মরিচ ও শর্ষের তেল দিয়ে বেগুনভর্তা বানিয়ে থালাভরা ভাত খেয়ে জলেশ্বরীর দিকে হারিয়ে যায়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘ঈদ’ গল্পে চৌধুরী বাড়ির ঠিকে ঝি ফতেমা ঈদের দিন ছেলেকে নতুন জামা কিনে দিতে পারে না। চৌধুরীর বৌকে বলে কলার ও বোতাম ছেঁড়া একটা পুরোনো জামা চেয়ে নিয়ে ছেলেকে দেয়। সেই জামা পরে চৌধুরীবাড়ির ছেলেদের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে গেলে ফতেমার ছেলে রজব নানা রকম অপমানের শিকার হয়। রাতে বস্তিতে ফিরে বাতি জ¦ালিয়ে ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে চেয়ে বুঝতে পারে, ছেলে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফতেমাও অঝোর ধারায় কাঁদে। ঈদ ফতেমার জীবনে খুশি নয়, অপমানের অশ্রু হয়ে আসে।
সমাজে এই শ্রেণিবৈষম্যের ঈদই যাপিত হয়। এটাই বাস্তব ঈদের চেহারা।
১৯৪৬ সালে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে সম্পাদক আবুল হাশিম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক মিল্লাত পত্রিকার ঈদসংখ্যা। ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে কলকাতায় সংঘটিত ভয়াবহ দাঙ্গার রক্তাক্ত ক্ষত তখনও শুকায়নি। সম্পাদকীয়তে লেখা হয়,―‘কি মর্মান্তিক আজিকার ঈদের দিন। সদ্য রক্ত-স্নাত কলিকাতার অলিতে-গলিতে পচা শবের দুর্গন্ধে বাতাস ভারাক্রান্ত। সন্তানহারা জননীর আর্তনাদ অবিশ্রান্ত চলিয়াছে। স্বামীহারা বধূর মূর্চ্ছা এখনো ভাঙে নাই। ক্রন্দনরত মাসুম বাচ্চা নিহত পিতা-মাতাকে খুঁজিয়া খুঁজিয়া হয়রান হইয়া হাত-পা ছুড়িয়া কাঁদিতেছে। …আর এমনি দিনে সদা কোলাহল-মুখরিত কলিকাতা নগরীর নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় আসমানে উঠিয়াছে ঈদের চাঁদ।’
সত্যি নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে এই সম্পাদকীয়তে। ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে বেগম নুরজাহান সম্পাদিত বেগম পত্রিকার ঈদ উপলক্ষে একটা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কলকাতার পাক্ষিক, সাপ্তাহিক, সিনে সাময়িকীর পূজাসংখ্যা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে সম্ভবত তিনি বেগম পত্রিকার ঈদসংখ্যা প্রকাশ শুরু করেন। দেশভাগের পর ঢাকা থেকে ১৯৫১-৫২ থেকে বেগম পত্রিকা বিশেষ ঈদসংখ্যা বের হয়। যাতে লেখিকাদের লেখার পাশে ছবি ছাপা হতো। এতে লেখিকাদের পরস্পরের চেনা-পরিচয় ও লেখা প্রকাশের আগ্রহ দেখা দেয়। তখন হয়তো এটাকে ঈদসংখ্যা বলার চল ছিল না, বলা হতো ‘ঈদ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন’। তবে এই উৎসব আয়োজনের মধ্যে ঈদের আমেজের সঙ্গে বাঙালি মুসলমান সমাজের যাপন-সংস্কৃতি, মনন ও চিন্তাচর্চার পরিচয় পাওয়া যায়।
স্বাধীনতার পর ভারতীয় পত্রিকা ও বইয়ের একচেটিয়া দাপটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের লেখকদের কথা চিন্তা করে সাপ্তাহিক বিচিত্রা, রোববার, সন্ধানী পত্রিকা ঈদসংখ্যার ধারণাটি নিয়ে আসে। ১৯৭২ সালে নভেম্বরে ১ম বর্ষ, ২৫ সংখ্যার বিচিত্রার ঈদসংখ্যার সূচিতে দেখা যায়―উপন্যাস একটি, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সর্বনাশ চতুর্দিকে, বড় গল্প শওকত আলীর―অবশেষে দ্বৈরথ, গল্প চারটি, অনুবাদ গল্প একটি, কবিতা আঠারোটি, ফিচার সাতটি। তারপর থেকে বিচিত্রা, রোববার, সন্ধানী পত্রিকার ঈদসংখ্যা বের করা শুরু করে। রাহাত খান, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের প্রমুখের ৫-৬টি উপন্যাস নিয়ে ঢাউস সাইজের স্বল্পমূল্যে ঈদসংখ্যা পড়ার স্মৃতি আজও সুখকর হয়ে আছে। ১৯৮০ সালে বিচিত্রা পত্রিকায় ঈদসংখ্যায় ২৫টি কবিতা, চারটি উপন্যাস, দুইটি প্রবন্ধ, ব্যক্তিগত রচনা একটি, গল্প একটি, নিবন্ধ তিনটি, স্মৃতিচারণ দুটি, কার্টুন সিরিজ একটি। ১৯৯৭ সালে বিচিত্রার শেষ ঈদসংখ্যায় ৬টি উপন্যাস, তিনটি গল্প, প্রবন্ধ দুটি, জীবনী একটি, স্মৃতিকথা দুটি, কবিতা ২৮টি, কার্টুন সিরিজ একটি। মনে পড়ে, ১৯৮০ সালে বিচিত্রায় পড়েছিলাম মহাশ্বেতা দেবীর বিখ্যাত উপন্যাস চোট্টি মুণ্ডা ও তার তীর, ১৯৭৯ সালে বিচিত্রায় ছাপা হয়েছিল সৈয়দ শামসুল হকের নিষিদ্ধ লোবান, ১৯৮১ সালে শওকত আলীর উপন্যাস প্রদোষে প্রাকৃতজন। আশির দশকে ঈদসংখ্যায় পড়েছি শওকত আলীর উত্তরের খেপ, হাসনাত আবদুল হাইয়ের মহাপুরুষ, হুমায়ূন আহমেদের অপরাহ্ন, ১৯৭১, সৌরভ, নির্বাসন, ইমদাদুল হক মিলনের রূপনগর, ভূমিপুত্র, পরাধীনতা, আনু মুহাম্মদের অনুবাদে ওরিয়ানা ফালাচির হাত বাড়িয়ে দাও। নব্বই দশকে পেয়েছিলাম হুমায়ুন আজাদের কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ ইত্যাদি। মোগল-পাঠান আমলে ঈদ-উৎসবের আড়ম্বর ছিল আমির-ওমরাহের মধ্যে মহাজৌলুসে পালিত হতো। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ থিওরির কারণে ঈদ-উৎসব মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হযে পড়ে। কারণ, ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর মুসলমানেরা ভূমিস্বত্ব হারিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ায় ঈদ উদ্যাপন আড়ম্বর তাদের মধ্যে ছিল না। অর্থ ও ক্ষমতা কোনওটিই মুসলমানদের হাতে ছিল না। কৃষি অর্থনীতির জায়গায় গড়ে ওঠে ব্রিটিশ পুঁজিনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতে বর্ণহিন্দুর একচেটিয়া প্রাধান্য ছিল। হিন্দুদের পূজা-পার্বণে আড়ম্বর বাড়তে থাকে, যেমন―শিবপূজা, জগন্নাথ পূজা, স্বরসতী পূজার প্রচলন ইংরেজ আমলেই শুরু হয়। মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব হিসেবে ঈদ হয় আনন্দহীন। কারণ, মুসলিম সমাজ ততদিনে কেবল চাষার স্তরে নেমে আসে, ধান-পাট উৎপাদনের মধ্যে বাঙালি মুসলমান এবং তফশিলি হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা বাঁধা পড়ে যায়।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বিদায় নেওয়ার সময় ভারত ভাগ এবং মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ে উঠলেও বাঙালি মুসলমাদের জীবনে নতুন সংকট দেখা দেয়। আদমজী, বাওয়ানি, ইস্পাহানি, একে খান প্রভৃতি বড় পুঁজির কলকারখানাগুলোর মালিক, ব্যাংক-বীমা, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে উর্দুভাষী বিহারি-পাঞ্জাবিদের হাতে পুরো অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। শোষণ ও বৈষম্যের শিকার বাঙালি মুসলমানের ঈদ-উৎসব ছিল ম্রিয়মাণ। রাজনৈতিকভাবে বিভাজন-বৈষম্যর শিকার, রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত, রাজনীতি চিহ্নিত সমাজে ঈদের আভিধানিক অর্থ মানুষে মানুষে আত্মিক মিলনের মধ্য দিয়ে যে আনন্দের ভাগাভাগি, ঈদগাহের খোলা প্রান্তরের উদার মহব্বতের, ভ্রাতৃত্ববোধের মিলন, সেই ঈদ সুদূর পরাহত থেকে গেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল কেবল দলদাসই তৈরি করেছে, দলকে পুষ্ট করার কর্মসূচি পালন করেছে। কেবল বিভাজন, বৈষম্যকে জারি রেখে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। এই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় বাঙালি সমাজে ঈদের প্রকৃত আনন্দ কই ?
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক, অধ্যাপক, বাংলা
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



