আর্কাইভকবিতা

দীর্ঘ কবিতা : আসাদ মান্নান

অসময়ে ভালোবাসা

মৃতবৎসা কোনও কোনও রমণীর কান্নার আড়ালে

যদিও কখনও জ্বলে হৃদয়ের সবুজ আগুন,

সে-আগুন জ্বলতে জ্বলতে দপ করে শূন্যে উড়ে যায়।

তারপর দেখতে দেখতে শূন্যতায় দরজা খুলে গেলে

নির্বিচারী অনুষঙ্গে ধীরে ধীরে পর্দা নেমে আসে;

লাবণ্যমথিত কামে মৌনতায় শিস দিয়ে জাগে

মৃত্যুর আসন্ন গন্ধ; গোধূলির মদের গেলাসে

লেবুর রসের সাথে টুকরো টুকরো ঠাণ্ডা আর কালো

বরফের নীল নীল পরি; পরির গলন্ত বুকে 

এ কেমন ঝড় ওঠে-উন্মাদনা জাগানিয়া ঝড়!

বিরূপ বসন্তে ঝরে উদ্ভিদের নিঃশব্দ বিলাপ।

মানববিধ্বংসী যুদ্ধে দানবের উলঙ্গ উল্লাস,

স্বার্থের লোলুপ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে খবিশ কমিনা―

পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয় খুন আর গুপ্তহত্যা,

ঘরে ঘরে অসংযমী নারী-পুরুষের অসংগত

বীর্যপাতে নির্ঘুম চৈতন্য নীড়ে আগুনের পাখি

ঘুরে ফিরে উড়ে যায়―দূরে ওড়ে গোধূলির আলো;

ব্যথা ও বীর্যের জ্বালা আস্তে আস্তে প্রশমিত হয়;

অসময়ে ভালোবাসা আগুনের বর্ম গায়ে দিয়ে

ঐশ্বরিক শক্তি নিয়ে একা মহাকবি হোমারের

সহোদর এক অন্ধ কবি চিতার থাবার নিচে

বাতাসের আত্মা খুলে দেখে, ভালোবাসা সারাক্ষণ

অবুঝ শিশুর মতো বসে আছে স্মৃতির খাঁচায়,

হরিণ শিকারি যেন তীর হাতে ঝোপের আড়ালে:

রবীন্দ্রনাথের খোঁজে বাউলের একতারা ছেড়ে

কেন সে নির্জন পথে নিরালোকে জলের সানাই

বাজাতে বাজাতে পার হয় নদী গিরি উপত্যকা ?

কাউকে তেমন করে ভালোবেসে আকাশে উড়িনি―

ঘুরিনি বেঘোর চিত্তে উন্মাতাল কারো হাত ধরে;

তবু কেন আজো ভুল ভালোবাসা আগুনের মতো

আমার নিখিল জুড়ে জ্বালিয়েছে নারকীয় দাহ!

আমার উদ্ধার নেই; দেখতে দেখতে সহস্র নিশির

নীলাচলে জড়িয়ে নিজেকে আমি হারিয়ে ফেলেছি!

কখন ফুরিয়ে যায় ভালোবাসা ? কেউ কেউ বলে

যখন ফুরিয়ে যায় আশা; আমার ছিল না আশা;

তবু কেন আশাহীন ভালোবাসা আমাকে কাঁদায় ?

———— ———————– ——————

একসময় দেখা যাবে

এখানে কালিন্দী জলে বাতাসের হাত ধরে নাচে

জন্মান্ধ চাঁদের ছায়া; তার সঙ্গে আলো থেকে দূরে

কুয়াশা জড়িয়ে গায়ে জঙ্গলের ঘন অন্ধকারে

ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে কিছু কিছু বর্ণচোরা হাতি;

এসব হাতির পালে কী সুন্দর সুবেশী ইবলিশ

নাদুসনুদুস সুবোধ বাবুর মতো হেলেদুলে

হরহামেশাই নির্বিঘ্নে বেড়াচ্ছে ঘুরে যত্রতত্র;

ওদের শুঁড়ের নিচে খেলছে কত মত্ত বুনো ষাঁড়।

শহর-বন্দর-গ্রাম গঞ্জে ব্যবসাটা জমেছে বেশ;

সবখানে হচ্ছে কত জুয়াচুরি পুকুর ডাকাতি।

এসব এখন অতি তুচ্ছ আর মামুলি ব্যাপার―

যা কিছু অস্বাভাবিক তা নিত্য ঘটেই যাচ্ছে, যেন

এটাই আসলে সত্য, যা হচ্ছে তা কিন্তু স্বাভাবিক;

মাফিয়া চক্রের হাতে সীমাহীন ক্ষমা ও ক্ষমতা!

যা হবার তা-ই হবে―প্রতিবাদে কোনও লাভ নেই।

বরং কালোবাজারে যাও―কিনে নাও অনায়াসে

নানা কিসিমের দর্শকের জন্য দামি শুধু 

একটা টিকেট; এই এক টিকেটেই দেখা যাবে

বক্স হিট সিনেমার পরিবর্তে ষাঁড়ের লড়াই;

ষাঁড়ের লড়াই দেখতে দেখতে দর্শক সারিতে বসে

একসময় দেখা যাবে সকলের অগোচরে

অন্ধ ও বধির ভণ্ড পুরোহিত সেবক বাহিনী

কোনওরূপ প্রতিরোধ ব্যতিরেকে অবলীলাক্রমে

কী করে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রার্থনা গৃহের দানবাক্স!

———— ———————– ——————

নেশার বিনিদ্র চোখে

বাঘের ক্ষুধার কাছে রূপসীর রূপের কী দাম!

গভীর অরণ্য ছেড়ে যখন ক্ষুধার্ত হিংস্র বাঘ

প্রবল প্রতাপে লোকালয়ে হানা দেয় তখন তো

সহজেই অনুমেয়―অনুমান করে নিতে হয়

বাঘের নখড়ে যে হিংস্রতা আর পেটে ক্ষুধা আছে

কিছু কিছু দাগী নরজন্তু আর নষ্ট মানুষের

ক্ষুধা ও লোভের কাছে জানি তা কিন্তু কিছুই নয়।

এটাই পরম সত্য : প্রকৃতির মৌলিক নিয়মে

সব মানুষের অনিবার্য মৃত্যু হয়―থেমে যায়

বনেদি ঘড়ির কাঁটা, জীবনের চাওয়া-পাওয়া :

কালিন্দী নদীর তীরে কবরের পাশে রেখে যাওয়া

শোকাচ্ছন্ন ঘাসের ডগায় ফুটে থাকে ফুলের বদলে

ভয়ঙ্কর বিকৃত নেশার মুখ―লোভ ও জিঘাংসা

সর্বত্র দাপটে থাকা ব্যাভিচারী পশুর স্বভাবী

এইসব জানোয়ার কী করে আলোর উল্টো দিকে

টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্রুশে বিদ্ধ মাটির যিশুকে!

চারিদিকে এ কেমন নগ্নতার অশ্লীল ইশারা;

রাত ক্রমে বাড়তে বাড়তে ঢলে পড়ে বাঈজিবাড়িতে;

নেশার বিনিদ্র চোখে ঝুলে আছে মনীষার লাশ;

এ লাশ জড়িয়ে কাঁদে লক্ষ কোটি আমার সন্তান।

———— ———————– ——————

অন্ধ চিতাবাঘ

আমার জানালা দিয়ে চাঁদ দেখা যায়; কিন্তু কেন

তোমাকে দেখি না ? তুমি কি এখন খুব

সুখে আছো

মুখে পুরে অমাবস্যা জলে ভাসা মেঘের বাসরে ?

এত নদী চারপাশে তবু জল আমাকে নেবে না―

এ কেমন নিষিদ্ধতা, অবারিত গোপন কুহেলী!

আমাকে বসিয়ে রাখে ফাল্গুনীর ময়ূর বালিকা।

চাঁদের ওলান ফেটে আহ কী সুন্দর দুধের নহর

ছড়িয়ে পড়েছে, দ্যাখো ঘুমাচ্ছন্ন প্রকৃতির কোলে।

কে আমাকে বেশি ভালোবাসে―পাথর না নির্জনতা!

পাথুরে গুহার গায়ে এক বিকেলের ভাঙা রোদে

তুমি কেন দেখেছিলে চিরন্তন মায়ার বন্ধন ?

হৃদয়ের উপকূলে সমুদ্রের একটানা কান্না

জমতে জমতে সহসা স্রোতের টানে শূন্যে মিশে গেছে;

তোমার জানালা ভেঙে ঢুকে পড়ে অন্ধ চিতাবাঘ।

———— ———————– ——————

মৃতের বন্দনা

জীবিত মৃতেরা কেন কুয়াশার মতো ঝুলে আছে ?

ওদের তাড়াতে হলে রৌদ্র কিংবা মুদ্রা প্রয়োজন

অথবা নিদেনপক্ষে একটা তৈলাক্ত মুলিবাঁশ;

এই বাঁশে বানরের মতো যারা উঠে আর নামে

আমি কিন্তু এই দলে নেই; ছলে বলে কিংবা কলে―

কৌশলে হাতিয়ে নিতে নাম যশ কামের পাহাড়

কামাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সহজে সফল

তেমন বিখ্যাত মুন্সি কিংবা মুদিরাজ আমি নই।

বাঁশের বিচিত্র রূপ ব্যবহারে মগ্ন যারা থাকে

মূলত ওস্তাদ তারা রাজবংশী দক্ষ কারিগর,

বিনোদনে চণ্ডালিনী, নগ্ন বুকে নৃত্যপটিয়সী

ওদের প্রশংসা গীতি গাইতে গিয়ে কত কত গত

আর যত রয়েছে জীবিত তারা বোকা নান্দীকর

তা কিন্তু বলি না আমি, কেউ কেউ বেশ সুচতুর

অনেকে আবার নাকি কারো কারো গুপ্ত সহচর;

কেউ হাঁটে বৃন্দাবনে কেউ যায় মদনবিহারে―

আমার ঘড়ির কাঁটা তৈরি করা বাঁশের কঞ্চিতে

খোঁচা দিলে মুহূর্তেই ওটা কিন্তু ভেঙে যেতে পারে।

আমি কবি; বাঁশ দিয়ে বাঁশি ছাড়া অন্য হাতিয়ার

কোনওদিন বানাতে শিখিনি, কী করে বানাবো, বন্ধু!

যে নদী মৃতের জন্য বাতাসের হাত ধরে কাঁদে

কে তাকে থামাতে পারে বরফের পাহাড় জমিয়ে!

———— ———————– ——————

রবীন্দ্রনাথের পাল্কিবাহকেরা

বসন্তের বক্ষ ছেড়ে যাত্রা করে দুরন্ত বৈশাখ;

এই মাসে বাঙালির প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথের

জন্ম হয়―আজ তাঁর শুভ জন্মদিন : এই দিনে

সোনালি ফুলের পাশে ফোটে কত জুঁই কৃষ্ণচূড়া;

দেখতে দেখতে কত কাল মহাকাল পার হয়ে গেছে

কাল থেকে মহাকালে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন ঠাকুর―

কে আছে এমন পুরোহিত, যে তাঁকে সরাতে পারে?

কেউ নেই আর; তাঁর তুল্য ঋষি কবি মহাজন

কেউ নেই, আগেও ছিল না―কোথাও জন্মেনি আর;

অনন্য একক তিনি; বলা যায় ঐশ্বরিক কবি।

ওই নামে আজ সীমা ও সীমান্তহীন দেবালয়ে

আদিগন্ত প্রসারিত মর্মরিত ঊষার বেদিতে

অজস্র গোলাপ হাতে ভক্তকূল দাঁড়িয়ে রয়েছে―

অনুরাগে কুলু কুলু ধ্বনি দেয় পদ্মার দু কূল;

ওই চিরনতুনের দাউদাউ প্রাণের আগুনে

হাওয়াকে জড়িয়ে গায়ে শূন্যতার মায়ালোক থেকে

চারিদিকে নেমে আসছে কল্লোলিত আনন্দের ঢেউ;

আমি দিব্য চোখে দেখতি পাচ্ছি : উড়ন্ত মেঘের পিঠে

খালি পায়ে ভর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কালো কালো

পাল্কিবাহকেরা তাঁর সোনার বাংলায় ফিরে আসছে।

———— ———————– ——————

এখনও ভোরের স্বপ্ন

বাতাসে মৃত্যুর গন্ধে নড়ে ওঠে গোধূলির আলো;

পাখির ডানার নিচে বসে আছে জীবনপ্রেমিক

অরণ্যের ঘন ছায়া―উল্টোদিকে ছায়ার আড়ালে

আসমুদ্রহিমাচলে কী সুন্দর অদৃশ্য খাঁচায়

মানুষ কিসের টানে পথে নেমে পিছু ফিরে চায়,

চিরন্তন রহস্যের তাঁতকলে কেন বুনতে থাকে

প্রসন্ন রঙিন আর স্বপ্নমাখা দিনের পোশাক,

প্রাণের আগুন দিয়ে তৈরি করে ঈশ্বরের মায়াবি আশ্রম!

ফাঁসির আদেশনামা হাতে নিয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়ে

প্রস্তুত রয়েছে ওই ডানাহীন উড়ন্ত জল্লাদ―

সময়ের গুণ টানে অস্তগামী সূর্যের নাবিক।

তবু নদীর জলে শ্বাস ফেলে যে উঠে দাঁড়ায়

এখনও ভোরের স্বপ্ন তার রক্তে প্রখর উত্তাপে

জ্বালিয়ে রেখেছে রঙ আশা আর মৌন ভালোবাসা।

———— ———————– ——————

সে এক অদৃশ্য নারী 

বাইরে তাকিয়ে দেখি আদিগন্তে আদিম নেশায়

আহা কী সুনসান হা হা নীরবতা দাঁড়িয়ে রয়েছে!

হৃদয়ে চাঁদের মতো একফালি রতিকান্ত মুখ;

পাশের গলির মোড়ে একা একটা কুকুর দেখি―

হাবভাবে মনে হয় দুশ্চরিত্র পুরুষ কুকুর;

লাটসাহেবের মেয়েকুকুরের সীমানা প্রাচীরে

পা উঁচিয়ে আরামে পেশাব করছে বেগানা লম্পট;

অদূরে বেশ্যার ঘরে ফুর্তিবাজ লোভী মহাজন

গলা ছেড়ে গান গায় বেসুরে গলায়―টাকা তুমি

কেন যে সময় মতো আইলা না! বেলা ডুবু ডুবু

কামানে ফুরিয়ে গেছে গোলা ও বারুদ―খেলা শেষ।

অলৌকিক জ্যোৎস্নাজলে একদিন স্নান করে যারা

পাহাড়ে বেড়াতে যায় তারা ঘরে এখনও ফেরেনি;

সবুজ স্তনের বাঁটে মুখ ঘষে জিভের ডগায়

ওরা কি মেঘের কোলে বৃষ্টি দেখে ময়ূরীর চোখে ?

আগুনে নির্ভীক নগ্ন পা রেখে যে সন্ন্যাসিনী হাঁটে,

অন্ধকারে প্রাণ খুলে একাকী দুঃখের গান গায়

সে এক অদৃশ্য নারী, যে আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে।

———— ———————– ——————

অগ্নি-জলে কবি একা

অনিবার্য ডাক এলে অন্তরঙ্গ সব কিছু ছেড়ে

ঘুমের টানেল ধরে জীবনের সচল গাড়িটা

হঠাৎ অচল পথে মুহূর্তে গায়েব হয়ে যায়;

চূড়ান্ত অদৃশ্যে সূর্য পড়ে থাকে বরফের খাদে:

মেঘের দিঘিতে চাঁদ শূন্যতায় ডুবে মরে গেলে

ভুল পথে হেঁটে হেঁটে উলুবনে মুক্তা খোঁজে কবি―

শিশিরে সমুদ্র দেখে চমকে ওঠে প্রবল খুশিতে;

অস্তগামী জীবনের পদচিহ্ন লুপ্ত হয়ে যায়।

পেছনে গোপন পথে কবিতার উত্তরাধিকার

প্রতীক উপমা ফেলে অলৌকিক শান্তির আশায়

সাঙ্গপাঙ্গ ছেড়ে একা পারহীন নদীর ওপারে

নৈঃশব্দ্যের কল্পরাজ্যে হুট করে যদি চলে যায়,

যেভাবে সবাই যায়, গেছে কত রথী মহাজন;

অগ্নি-জলে কবি তবু যুগান্তরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

———— ———————– ——————

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button