আর্কাইভকবিতা

দীর্ঘ কবিতা : মিনার মনসুর

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে

বিষাদের বারান্দায় বসে আছেন তিনি। একা। বৃষ্টির সঙ্গে দেখা নেই বহুদিন। বুকে তার সাহারার গুরুভার। চরাচরজুড়ে ফোঁস ফোঁস করে তপ্ত হাওয়ার চাবুক : তবে কেন কথা দিয়েছিলে ? কেন দিয়েছিলে কথা ? সহস্র বর্ষ আগে কলার ভেলায় ভেসে কী কথা হয়েছিল দুজনার মাঝে কে রাখে তার খোঁজ!

আমি তারে বলি, ‘কাকা, ধানসিঁড়ি পাড়ের কবিরে তো চেনেন ? তাঁর কোমল হৃদয়খানি ভাগ হইয়া গেল অকস্মাৎ। বলেন, এ কেমন বিচার বিধাতার ? অতঃপর হাজার বছর ধরে তিনি পথ হাঁটিয়াছেন পৃথিবীর পথে; কিন্তু আর দেখা হয় নাই প্রিয় রূপসী বাংলার মুখ। আপনের দুঃখ কি তাঁর চেয়ে বেশি ?’

কবিঘাতী ট্রামের মতো নিরুত্তর তিনি। তাঁর প্রাগৈতিহাসিক মুখের মানচিত্রজুড়ে বয়ে যায় শত শত রুদ্ধবাক নদী। কোথা থেকে আসে এত জল ? কোথায় চলেছে ছুটে ? তাহাদের কি ক্ষুধাতৃষ্ণা নাই ? নাই উপশমহীন চিতার দহন ? এই শুষ্ক মেঘের দুপুরে একটি একাকী চিল উড়ে উড়ে শুধায় তাহারে।

অদূরে, উজ্জয়নীপুরে, বন্ধ্যা মেঘেরা গর্জন করে। 

—  ————- ————— —————————–

ছাতার বন্দনা

ছাতার বন্দনা আজ দিকে দিকে। আহা কী সৌভাগ্য তোমার—এইসব দেখার আগেই গিয়েছো ঘুমিয়ে! ঘুম উধাও হয়ে গেছে আমাদের গ্রহ থেকে। ধরিত্রীর ঘরে ঘরে প্রাণহীন লক্ষ প্রাণ জেগে আছে। জেগে থাকে নিশিদিন। মাতৃবন্দনার উচ্চ কলরবে ধরিত্রী নিজেও নিদ্রাহীন বহুকাল।

মার্ক জাকারবাগে’র পৃথিবীজুড়ে আজ শুধু ছাতার বন্দনা! নিন্দুকেরা বুক চাপড়ে বলে—হায়, কী দুর্ভাগ্য আমাদের, ছিনতাই হয়ে গেছে মানবের প্রকৃত পৃথিবী! শুনে এআই সুন্দরীও হাসে। তার অনিন্দ্য গ্রীবায় ধ্রুবতারার মতো জ¦লে ম্যামথের দুর্লভ দন্তহার।

কীভাবে তোমাকে বলি—ছাতা নও, বটবৃক্ষ নও, তুমি ছিলে জেদি অথচ মহাক্লান্ত এক নাবিক—যে তার হারায়েছে দিশা। আমার খুব ইচ্ছে হতো—ছাতা হই, মমতায় মুছে দিই সব ক্লান্তি তোমার। কিন্তু তোমার চারপাশে ছিল পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া অদ্ভুত এক একাকিত্বের প্রাচীর—যক্ষের ধনের মতো যা তুমি আগলে রেখেছিলে সারাক্ষণ।

তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শক্তি!

—  ————- ————— —————————–

সমাধিফলক

চেয়েছিলাম শুধু ছায়াময় দুইখানি হাত, দিয়ে গেলে আস্ত এক শ্রাবণ-আকাশ! বুকে তার অনির্বাণ কালাহারি মরুর গর্জন। শূন্য জলপাত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছি সহস্র বছর। মমিরা মিছিল করে। সগর্জনে ধেয়ে আসে করোটির ঝড়।

অনন্ত অন্ধকারে ধ্রুবতারার মতো জেগে আছে দুই পাশে দুই সমাধিফলক। বলো, আমি কোনদিকে যাব ?

—  ————- ————— —————————–

কার যেন অপস্রিয়মাণ চরণের ধ্বনি

আর যারা বিভ্রান্ত তারা কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখো না ওরা সকল উপত্যকায় (লক্ষ্যহীনভাবে) ঘুরে বেড়ায়, আর যা বলে তা করে না? [সুরা শোআরা, রুকু: ১১, আয়াত: ২২৪-২২৬]

আষাঢ়ের আকাশ ত্রস্ত পায়ে ঢুকে পড়েছিল আমাদের ডাইনিংরুমে। রবীন্দ্রনাথের মতো সৌম্য এক আলখেল্লায় ঢাকা তার আপাদমস্তক। আমি সসম্ভ্রমে বলি, ‘মহাশয়, খুব যে চেনা চেনা লাগে! আপনার সঙ্গে কি আমার ইতঃপূর্বে দেখা হয়েছিল চট্টগ্রামের কাপাসগোলায় কিংবা জোবরার পাহাড়ে ?’

তিনি হাসেন। বড় রহস্যময় সেই হাসি। কণ্ঠে অমিয় স্নেহধারা: ‘বাছা, বিশ লক্ষ বছর ধরে ধরিত্রীর দুর্গম পথে-প্রান্তরে কত যে হয়েছে দেখা তোমাতে-আমাতে—তার কি কোনও লেখাজোখা আছে! সব ভুলে তোমার নাদান হৃদয় কেন আজ কবিদের মতো অযথা মরছে ঘুরে কোথাকার কোন্ পাহাড়ে পাহাড়ে ?’

আমি বলি, ‘সে আমার মনে নাই মনে নাই। আপনার সৌম্য আলখেল্লার সুবিশাল ক্যানভাসজুড়ে আমি শুধু শুনি—কার যেন অপস্রিয়মাণ চরণের ধ্বনি!’

—  ————- ————— —————————–

ইজিচেয়ারে দোল খেতে খেতে তুমি ভাবছো

তুমি মাটিতে দেমাক করে পা ফেলো না। তুমি মাটিও ফাটাতে পারবে না ও পাহাড়ের সমান উঁচুও হতে পারবে না। [সুরা বনি-ইসরাইল, রুকু: ৪, আয়াত: ৩৭]

মনোরম বৃক্ষশোভিত পাখিদের কলরবময় সুরম্য এ প্রাসাদ। চতুর্দিকে স্তাবকের উন্মত্ত কাফেলা। পুষ্পাঞ্জলির মতো অবিরাম বর্ষিত হচ্ছে তোমার বন্দনাগান। ইজিচেয়ারে দোল খেতে খেতে তুমি ভাবছো, ওটাই তুমি! আর আফসোসে ভরে যাচ্ছে তোমার চির বুভুক্ষু উদর।

ভরবেই তো! তপ্ত বালির সন্তান তুমি। দীর্ঘ যাত্রাপথে তোমাকে রক্তাক্ত করেছে ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর কত না কালাহারি মরুর চাবুক। তিন প্রস্থ জামাও ঢাকতে পারেনি ক্ষতচিহ্ন তার। এসি রুমে বসেও দরদর করে তুমি ঘামছো; কেননা লখিন্দরের সাপের মতো অদৃশ্য বালিরা তোমাকে চোখ রাঙ্গাচ্ছে অবিরাম—কী বিপুল তৃষ্ণা তাদের বক্ষজুড়ে সে কেবল তুমিই জানো।

কফিনের ডালা বন্ধ করবার একটু আগেও তুমি ভেবেছ, যা কিছু দৃশ্যমান সব স-অ-ব জামার বেঢপ পকেট ভরে সঙ্গে নিয়ে যাবে! তিন প্রস্থ জামা, তবু পকেটের স্বল্পতাহেতু আফসোসে আফসোসে ভরে গেছে তোমার বুভুক্ষু হায়েনা হৃদয়।

—  ————- ————— —————————–

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button