গল্প : নিখোঁজ সংবাদ : মহি মুহাম্মদ
মুখডোবা। গ্রামের বুক চিরে পথ। সে পথে গেলে প্রায়ই একটা দৃশ্য চোখে পড়ে। জমির আইল ধরে এক নারী হাঁটছে। পরনে ধানী রঙের শাড়ি। সবার কাছে এ দৃশ্য ডালভাতের মতো। এ দৃশ্য যে কেউ দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। কেউ কেউ প্রশ্ন রাখে, এ নারীর কাজ কী ? কেন সে এভাবে হেঁটে বেড়ায় ? কিংবা ধানখেতের আল ধরে হেঁটে হেঁটে সে যায় কোথায় ? কেউ সে প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারে না। তবে বাইক, ট্যাক্সি আর অটোতে চড়া লোকজন নারীটিকে দেখে। ধানের বীজ ফেলার সময় দেখে। নিড়ানি বা আগাছা বাছাই করার সময় দেখে। আর দেখে ধানের চারা যখন সবুজ হাওয়ায় দোলে তখন। মাইলা সবুজ রঙের কাপড় পরে আছে। কচি ধানের চারার মতো তার কাপড়ের রং। লোকজন মাঠে তাকে বিড়বিড় করতে দেখে। কী বলে সে বিড় বিড় করে ? তার কথা কেউ শুনতে পায় না। আবার যখন খেতে সোনার রঙের ধান হয় তখনও তাকে দেখা যায়। একই রঙের শাড়ি পরে সে আইল দিয়ে হাঁটছে।
খেতের চিকন আইল। মাঝে মাঝে কাত হয়ে পড়তে যায়। কিন্তু পড়ে না। কাপড়ের নিচে খালি পা শালিকের ঠ্যাংয়ের মতো আগ বাড়ায়। পড়লেও তেমন কিছু হবে না। সবুজ খেতে পানি আছে। পানিতে পড়লে কাদায় মাখামাখি হবে। খেতের পাশে পাহাড়। শেষ আলের সঙ্গে কয়েকটা হিজলের গাছ। ফুরফুরে হাওয়ায় পাতাগুলো দুলছে। শৈশবের কত স্মৃতি যে আছে এসব মাঠে, তার হিসেব নেই। চোখ বুঝলে এখনও সেসব স্মৃতি চোখের পাতায় দোল খায়। মাইলা তার এক টুকরো জমিতে নিড়ানি দিতে দিতে সেসব দিনের স্মৃতি ভাবে।
সবুজ গোছায় সবুজ আভা। মাইলার পরনেও একই রং। দক্ষিণের আকাশজুড়ে হালকা মেঘের চামড়। ফিনফিন করে মেঘ ওড়ে। মাইলা সেদিকেই তাকিয়ে দেখে। গুনগুন করে একটা গান আসে মনে। কিন্তু গানের কথা ধরতে পারে না। তাই শৈশবের বিয়েবাড়িতে মাইকে শোনা একটি গানের কথা মনে পড়ে যায় তার― ‘ঢোল বাজের আর মাইক বাজের/ আর পরানত ক্যান গরের/ ক্যান গরি যাইয়্যুম পরের ঘর।’ এমন গান কেন মনে পড়ল ? বুঝতে পারে না মাইলা।
এমন কেন ? কোথাও কেউ নেই। মাঠ জুড়ে সবুজ আর সবুজ। বাতাসের গতিবেগ বাড়ে। কোত্থেকে এত বাতাস আসে কে জানে! ধূলি ওড়া পথঘাট মুহূর্তেই ঘূর্ণি হাওয়ায় তোলপাড় তোলে। মনে হলো পথের মোড়ের শ্যাওড়া গাছটা ঝাঁকড়া পাতা নিয়ে নাচতে নাচতে উড়ে চলল।
আচমকা বাউকুড়ানি বয়। মাইলাকে যেন শ্যাওড়া গাছটার মতো তুলে নিয়ে যাবে। সারা অঙ্গের কাপড়ে টান লাগে। এমন দুষ্টু বাতাস মাইলা জনমেও দেখেনি। একি, তার শাড়ির প্যাঁচ যে খুলে গেল! কী করে সম্ভব! দুরন্ত হাওয়া একটা জলজ্যান্ত মেয়ের পরনের কাপড় খুলে ফেলল! বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু এমন দমকা হাওয়াতে শাড়ি খুলেছে ঠিক আছে, কিন্তু পুরো মাইলাকেই যদি উড়িয়ে নিয়ে যেত তাহলে কী হতো ? নিয়ে গেলেই মনে হয় ভালো হতো। কিন্তু এখন নাঙ্গা শরীরে মাইলার কী হবে ? কী করে সে ঘরে ফিরবে ? এই দুশ্চিন্তায় মাইলার ঘুমটাই ছুটে গেল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। জিহ্বাটা মুখের ভেতর অসাড় মনে হচ্ছে। দু একবার জিহ্বাটা নাড়াতে চেষ্টা করল কিন্তু শুষ্ক জিহ্বাটা খুব বেশি সুবিধা পেল না। পানি দরকার। উঠে গিয়ে ঘরের কোণের মাটির কলস থেকে বড় মগে পানি নিল। তারপর ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দিল।
এবার স্বপ্নটার কথা মনে হলো। ডাকাতের মতো বাতাসটা তার পরনের কাপড়টা উড়িয়ে নিয়ে গেল! তাকেও উড়িয়ে নিতে পারত! বুকটা এখনও ঢিবঢিব করছে। সবুড়া পাগলির কথা মনে হলো তার। এমনি একটা গল্প শুনিয়ে ছিল সবুড়া।
ধানকুড়ানি মেয়েদের মধ্যে সে ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। মেয়েটিকে দেখতে কেমন চোখে লাগত। গরিবের ঘরের মেয়ে আটার জাউ খেলেও নাকি শরীর বাড়ন্ত হয়। মেয়েটির বেলায় তাই হয়েছিল। মেয়েটি ধান কুড়াত একা একা। কারও আগেও নেই পাছেও নেই, কোনও ঝগড়াফ্যাসাদেও নেই। সেদিন ঠিক দুপুরে ধান কুড়াতে গিয়েছিল। পাকাধানের খেত থেকে অসময়ের হাওয়া এসে মেয়েটিকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বাবা-মা সারা গ্রাম ঢুরেও মেয়েটির সন্ধান আর পায়নি। সুন্দর ফুটফুটে মেয়েটি একেবারে হারিয়ে গেল। সবুরা পাগলি এর জলজ্যান্ত সাক্ষী। পুরো ব্যাপারটাই পাগলি চোখের সামনে ঘটতে দেখেছে। কারণ সবুড়া তখন নাকি পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। আর ওই ঘটনাটা সে নিজের চোখে দেখেছে। পাগলি প্রায়ই ওই গল্পটা বলে। মাইলার দেখা স্বপ্নটার সঙ্গে সবুড়ার গল্পের মেয়েটার যেন কোথায় মিল পাওয়া যায়। এই কারণটা মাইলা কিছুতেই বুঝতে পারে না।
রাত মনে হয় আর বেশি বাকি নেই। এমন একটা আজগুবি স্বপ্ন কেন যে দেখল, বুঝতে পারে না মাইলা। এ স্বপ্নের মানে কী ? মনে মনে অনেক ভেবে কুল পায় না সে। পড়ালেখা তেমন করেনি মাইলা। তার বাবা চেষ্টা করেছে কিছু অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার জন্য। হালচাষ করার ফাঁকে যেদিন মনে করত, আজ একটু সময় আছে হাতে, সেদিন মুখে মুখে বলত, ‘মাইলা মুখে মুখে কও, স্বরে অ, অ—তে অজগর। অজগর ওই আসছে তেড়ে। বলো, স্বরে আ। আ—তে আম, আমটি আমি খাব পেরে।’
পিতার কষ্টার্জিত মুখের দিকে তাকিয়ে মাইলা বোল শেখানো টিয়া পাখির মতো সব বলত। তবে তার জীবনে আর আম খাওয়া হলো না। বারবারই অজগর এসে তার আম খেয়ে যায়। ভাগ্যের এমন সচল চাকাকে মাইলা দোষারোপ করার সময় পায় না। সবই তার সৃষ্টিকর্তার লীলা বলে সে চালিয়ে দেয়। যা তার ভাগ্যে নেই, তা তার হবার কখনও নয়―এটুকুই বিশ্বাস ধারণ করে সে।
একবার ঘুম ভাঙলে মাইলার ঘুম আর আসে না। সে কিছু না কিছু করে সময় পার করে। সূর্য ওঠার জন্য অপেক্ষা করে। কেন জানি মনে হয় তার, সূর্য উঠলেই সবকিছু আলোকিত হয়ে উঠবে। কিন্তু তার জীবন আলোকিত হলো না। দিনকে দিন ঘন তমসায় ঢুকে যাচ্ছে জীবন। সে ঘরের ঝাপ খুলে উঠোন ঝাড়ু দিতে শুরু করে। শব্দ যেন না হয়-সেদিকে কড়া নজর রাখতে হয়। ঝাড়ুর শব্দে কারও ঘুম ভেঙে যেতে পারে। শলার ঝাড়ুর খসখসে আওয়াজ সকালের ঘুম ভেঙে দিলে মানুষের মেজাজ সপ্তমে উঠতেই পারে! আর যদি ঝাড়ু দেবার শব্দে ঘুম ভেঙেই যায় তাহলে পাশের বাড়ির ছেমনা তাকে পাগল ঠাওরাতে পারে। মুখ তো নয় ছেমনার, কথা যেন র্ছরা গুলি। ঝাঁঝরা করে দেবে। তাই ঝাড়ুকে মাটিতে চেপে চেপে, আস্তে আস্তে, ভয়ে ভয়ে ঝাড়ু দেয় মাইলা। শব্দটা যেন কারও ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটায়।
এত সহজে মানুষের বিরক্তি উৎপাদন করা ঠিক হবে না। না হয় ঘরের কাছে ঘর বানিয়ে থাকা যাবে না। এসব করতে করতে ফজরের আজান পড়ে, মাইলা চাপকলে ওজু করে নেয়। তারপর মনের যত ক্লেদ আছে, যত অভিযোগ অনুযোগ আছে, সব স্রষ্টার কাছে দু চোখের জলে অর্পণ করে। চারপাশে যখন আলো ফোটে। তখন ছাপড়া ঘরে গাইটার দিকে উঁকি মারে। কেমন করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে গরুটা। কাজলকালো চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায় গরুটার পেটে অনেক ক্ষুধা। এই ক্ষুধা মাইলা কী দিয়ে মেটাবে ? কষ্ট হয় মাইলার। গরুর ওলানে দুধ শুকিয়ে গেছে। হাড্ডিগুলো গোনা যায়। পথের দু ধারে যা ঘাস ছিল, তা এখন শুকিয়ে পুড়ে গেছে। ধুলো উড়ছে। ঘাসের গোড়া পর্যন্ত চিবিয়ে খেয়েছে গরু-ছাগল। যেখান থেকে পারে কলাপাতা, কাঁঠাল পাতা এসব ছিঁড়ে এনে দিতে চেষ্টা করে। ভাতের মাড় আর খালি পানিতে গরুর পেট ভরে কি ? আহারে, বোবা প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে মাইলার কষ্ট হয়।
দুই
দোকানের পাশেই রাস্তা। চলে গেছে সোজা দক্ষিণে। ওদিকে কাজিরহাট। মোটামুটি গ্রাম্য বাজার বলতে যা বোঝায়, তা। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে বাজারে। টিলাটক্কর বেয়ে মানুষের ঢল নামে। মোটর সাইকেল, অটোওয়ালারা বাজারদিনে খুব খুশি। মাইলাদের দোকানের সামনের রাস্তাটা নেমে এসেছে গাড়িটানা থেকে। ফেলে এসেছে শাপমারা, নয়নপোড়া। আরও কত ছোট-বড় পাহাড় জমি, বনের রাস্তা। এ রাস্তায় সব ধরনের যানবাহন চলে। তবে সবাই থামে না। থামার মধ্যে আছে বাইক আর অটোওয়ালারা। মাঝেমধ্যে দু-একটা গাড়ি, সিএনজিও থামে। যাত্রীদের পানি কিংবা চায়ের প্রয়োজন হলে। দোকানটা চালায় মাইলার স্বামী মনু। চেহারাটা বদখত। মাথায় বদ চিন্তা কিলবিল করে। ছেলেমেয়েগুলোও হয়েছে বাপের মতো। একটার চাইতে একটা। মাইলাকে জ্বালিয়ে খেয়ে ফেলল। বিচার সালিস শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। এদেরকে সামলাতেই মাইলার সময় পার হয়ে যায়। তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু জামাইর ঘরে শান্তি নাই। সারাক্ষণ ঝগড়াঝাটি লেগেই আছে। এই সালিস করতে করতে মাইলার জীবন শেষ। দুই মেয়ের পর এক ছেলে। ভেবেছিল ছেলেটাই সংসারটাকে টেনে তুলবে। কিন্তু ওকে টেনে তুলতেই মাইলার দম বের হওয়ার জোগাড়।
এখন আরেকটা নতুন সমস্যা হয়েছে বড় মেয়েকে ঘিরে। পাড়ার সবাই মিলে তুলে দিয়েছে। কোথাও কাজে লাগাতেও পারে না। যেখানেই দেয় ঝগড়া করে চলে আসে। মাইলা আছে মহাবিপদে। ছেলেটা এর মধ্যে তিন নাম্বার বউ ঘরে তুলে এনেছে। দুই নাম্বার বউয়ের বাপের পুলিশি হাঙ্গামা না ফুরোতেই নতুন ঝামেলা। মাইলা দিনভর যে শ্রম দেয়, তা ছেলেময়েগুলোর জন্য আলোর মুখ দেখতে পায় না। মাইলার ইচ্ছে করে এদেরকে ফেলে দূরে কোথাও চলে যেতে। সেটাও পারে না। পারলে ভালো হতো। যেমনি জ্বালায় বুড়ো জামাই, তেমনি শকুনের বাচ্চাগুলো। কতবার ধানের বিষ মুখের কাছে নিয়ে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু সাহস করে মুখে ঢালতে পারেনি।
আর ঢালতেও পারবে না। সে বুঝে গেছে জীবন যতই কষ্টের হোক না, সে এ জীবনকেই ভালোবাসে। জরা-মৃত্যু এসব নিয়েই থাকতে হবে তাকে। তাই মৃত্যুর কথা সে আর চিন্তা করে না। যেদিন কপালে মৃত্যু লেখা আছে সেদিন মৃত্যু এমনিতেই হবে।
তিন
কথাটা মাইলার কানেও আসে। সন্ধ্যার পর যখন মাইলা মনুর জন্য ভাত নিয়ে আসে দোকানে। মনু রাতে দোকান পাহারায় থাকে। না হয় দোকান চুরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন সে জামাইর সামনে ভাতের টিফিন ক্যারিয়ারটা ঠকাস শব্দে রেখে নিজের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। জামাই বাতির আলোয় মাইলার মুখটা পড়তে চেষ্টা করে। মাইলা জামাইকে পাত্তা না দিয়ে একটা একটা কাজ করে ধুমধাম শব্দ করে।
‘কী হইছে তোর, অমুন কইরা ঝনঝন আওয়াজ করতাছোস কিল্লাই ?’
‘কী আর হইব, আমার পুড়াকপাল। শকুনের ঘরে আইসা শকুন পয়দা করছি। এহন বুড়া শকুনরে লইয়া পড়ছি আরেক জ্বালায়।’
‘মাথা ঠিক আছেনি তোর ? কই থাইকা আবার কী হুইনা আলি ?’
‘আমি তো কুনোদিন কিছু হুনি নাই, খালি চক্ষে দেহি। এই নিরুপায় মাইলার করনের কিচ্ছু নাই।’
‘মদের বোতল লুকানো ছিল দোকানের খাটের নিচে। বাতির স্বল্প আলোয় সেদিকে মাইলার চোখ যায়। এ আর নতুন কী! মদ খাওয়া ফেরানো যাবে না। মাইলাকে মনু ফাঁকি দিবেই। ওদের পাড়ার শয়তান মেয়ে কাঞ্চুনি সেদিন বলছিল, ‘তুর জামাই মদ খাইবু না তো কি খাইবুরে ?’
মাইলা তেজ দেখিয়ে বলেছিল, ‘খাওনের কি অভাব পড়ছেরে হারামজাদি।’
‘পড়ছেই তো! তুমি বুড়া হইছ না! তার উপরে যে পোলাপান জন্ম দিছ হেইগুলিন তো আর বেডারে শান্তি দেয় না।’
কাঞ্চনির কথা মাইলার মাথায় ধরে যায়। এই অসৎ মহিলার মাথায় তো কুবুদ্ধি ছাড়া আর কিছু নাই। না জানি কী মতলব আটছে তার সংসার নিয়ে। না ওকে এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
‘তরে কইছে হারামজাদি! পরের ঘরের খবর নিয়া নাচোস। নিজের ঘরের খবর তো হাটেবাজারে বিকায়, হেই খবর কি রাখোছরে মুখপুড়ি ?’
মুখ ঝামটা মেরে চলে যায় কাঞ্চনি। মাইলার সঙ্গে কথায় না পেরে সে আজেবাজে শব্দ উগরে দেয়। সে সব কথা মাইলা শুনেও না শোনার ভান করছে। কিন্তু এখন এই রাতের বেলা মদের বোতল দেখে সে জ্বলন্ত আঙরার মতো নিজেই জ্বলে। ইচ্ছে করছে বোতলটা নিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে আসে। মনু ভাত খায়। কাঁচা মরিচ ঘচঘচ করে কামড় দেয়। পানখাওয়া আর মদ খাওয়া জিহ্বায় যেন ঝালের কোনও বালাই নেই লোকটার। চপ্পর চপ্পর করে ভাত চাবানোর শব্দটা মাইলার গায়ে জ্বালা ধরায়।
মাইলা বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে। ইচ্ছে করছে দোকান থেকে ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু এত রাতে আজ আর ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। শরীরটাও কেমন ক্লান্ত হয়ে আছে। তাই সে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। চোখটা লেগে আসে। মনু কখন ভাত খেয়ে মদের বোতলের ছিপি খুলেছে, সে টের পায়নি। কিন্তু হঠাৎ মাইলার চেতন ফিরে আসে। ভকভক করে দুর্গন্ধ নাকের মধ্যে ঢোকে। বমি আসে মাইলার। কিন্তু সে নড়েচড়ে না। মনু শুয়ে পড়েছে তার পেছন ঘেঁষে। মাইলা টের পাচ্ছে মনুর উত্তেজনা। সে নিশ্চুপ। কোনও সাড়া দিচ্ছে না। সাড়া দেবার ইচ্ছেও নেই। মদের গন্ধে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। যদিও মুসলমানের কাছে চোলাই বেচার নিয়ম নেই। কিন্তু চা বাগানের শ্রমিকরা সে নিয়ম মানে না। বলে, ‘টাকা পাইলেই তো হইল। এত কিছু দেখার কি আছে!’
দোকানের পাশেই কৈয়াছড়া চা বাগান। লেবার লাইন থেকে এই চোলাই নিয়ে আসে মনু। নিজে যায় না। ওর অনেক সাঙাত আছে যাদের দু পয়সা দিলে কোকের বোতলে করে চোলাই দিয়ে যায়। কিংবা দোকানে বসিয়ে এক কাপ চায়ের বিনিময়েও ওরা এ কাজ করে।
যাই হোক, মাইলার ঘুম আসতে চায় না। রাতের বেলা মনুর সঙ্গে চেঁচামেচি করতেও মন চায় না। পথের ধারে দোকান হওয়ায় পথ থেকে সব কথাবার্তাই শোনা যায়। কিন্তু সে বিষয়টা বুঝি আর রক্ষা করতে পারল না মাইলা। তার জামাই কোন ফাঁকে যে গলায় চোলাই ঢেলে দিয়েছে সে টের পায়নি। আর চোলাই পেটে পড়লে এ ধরনের পুরুষরা সাহসী হয়ে ওঠে।
‘তুই বলে কাঞ্চনিরে কি কইছোস ?’
‘ও তইলে আইজকাল তুমার ওই মাগিডার লগে খাতির অইছে, না ?’
মনু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এ কথায় সে কথায় কথা কাটাকাটি বেড়ে যায়। মাইলাও পারে না আর নিজেকে সংযত রাখতে। কোমরে কাপড় গুঁজে সমানে চিৎকার করতে থাকে। আর এই মওকাটাই মনে হয় মনু মনে মনে চেয়েছিল। বউ পিটাতে ওস্তাদ মনু। আরও দুটো বিয়ে করেছিল কিন্তু সেই বউগুলো কেউ তার ঘর করেনি। মাইর খেয়ে ভেগেছে। কিন্তু একমাত্র মাইলাই টিকে আছে। মনু সব জায়গায় ঝামেলা পাকিয়ে মাইলার কাছেই ঠাঁই নেয়। কিন্তু রাগ উঠলে সে মাইলাকে রেহাই দেয় না। মনু একটা চিকন গাছের ডাল বের করে মাইলাকে বেধড়ক পিটাতে শুরু করে। রাতের বাতাসে মাইলার চেঁচামেচি কেউ শোনে না। শক্তি দিয়ে পিটিয়ে মনু ভাত-পানি সব উগরে দেয় মাইলার ওপর। দুর্গন্ধে ভরে যায় চা ঘরটি। মাইলা দোকানের ঝাপ খুলে বের হয়ে আসে। এই রাতে এখানে মনুর মাইর না খেয়ে ঘরে ফিরে গেলেই ভালো। মাতাল মনুকে এখন কিছুই বোঝানো যাবে না। অন্ধকার রাতকে আজ কোনও ভয় লাগে না মাইলার। শুধু পাড়ায় ঢুকতে গিয়ে কুকুরের মুখোমুখি হয়। তবে দু-একবার চিৎকার দিয়ে কুকুরগুলো থেমে যায়। মাইলাও চিৎকার দিতে গিয়ে থেমে যায়। চোখের সামনে ভূতের মতো ওরা কারা ?
চার
একটা কঠিন গলার স্বর শোনা গেল। মাইলা ভেবে পেল না এত রাতে তার ঘরের সামনে এরা কারা দাঁড়িয়ে আছে ? প্যান্ট শার্ট পরা। মাথায় ক্যাপ। মাইলা সাহস করে জিজ্ঞেস করে, ‘এই এত রাইতে আমার ঘরের সামনে তুমরা কেডা ? কী করতাছো এইহানে ?’
‘আমরা পুলিশ, তুমি কে, এত রাইতে কোত্থেকে আসো ?’
‘ওরে বাপরে!’ বলে মাইলা উলটো দিকে দৌড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই মাথায় চিন্তা এল পুলিশ এত রাতে তার ঘরের সামনে কেন ?
‘এই চুপ করে আছো কেন ?’ মাইলা এবার কাঁচুমাচু করে কথা বলে, ‘ছার, আমি দোকানে জামাইরে ভাত দিয়া আসতেছি যে!’
‘তোমার ছেলের নাম কী ?’
‘শমসু।’
‘ঠিক আছে। দরজা খুলতে বলো, ডাকো পোলারে।’
পুলিশ শক্ত কণ্ঠে ধমক লাগায়। মাইলা বুঝতে পারে। কোথাও একটা গড়বড় হয়েছে। তার শমসু নিশ্চয়ই কোনও অকাম করেছে। থানায় বিচার গেছে। ছোট মেয়ে মনা দরজা খুলে দেয়। পুলিশ ভেতরে ঢুকে ধরে আনে ঘুমন্ত শমসুকে। মাইলার কোনও কথাই শোনে না পুলিশ। এত হাতে-পায়ে ধরে তারপরও ছেলেটাকে রেখে যায় না। মনা তেজ দেখায় মায়ের সঙ্গে। বলে, ‘এমুন ছেলে জনম দিছ কেন ? খালি বিয়া করে আর প্যাঁচ লাগায়।’
মেয়ের কথার কোনও জবাব দেয় না মাইলা। ছেলেটাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলে। শমসু পালাতে চাইলে এক পুলিশের লাথি পড়ে পাছায়। একটু পরে পুলিশের ভ্যান গুমগুম আওয়াজ তুলে চলে গেল। মাইলা ফিরে এল নিস্ফল হয়ে। ছোট মেয়ে মনা মাকে ধমক দিল। ঘুমাতে যেতে বলল। আর বলল সকালে টাকা নিয়ে গিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে। মাইলা ভ্যাবলার মতো রইল। পিঠে জামাইর মাইরের দাগ এখনও জ্বলছে। মনে হচ্ছে চোতরা পাতা ডলে দিয়েছে কেউ। মেয়েটাকে একটু ভয় ভয় করে মাইলার। অন্যগুলো থেকে একটু আলাদা হয়েছে এটা। বড় মেয়েটাকে নিয়েও ঝামেলা চলছে। প্রতিবেশীরা ওকে জায়গা দিতে নারাজ। মেয়েটা অকারণে মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করে। কুৎসিত আর অশ্লীল কথা বলে। মুখ খুললেই নাকি টাট্টিখানার কাঁচামলের দুর্গন্ধ। গত রাতে সালিস বসেছিল। বিচারকদের সে সম্মান করেনি। বরং অকথ্য গালিগালাজ করেছে। মান্যতা না পেয়ে বিচারকরা ক্ষেপে গেছে। তাই সবাই মিলে ওকে পাড়া থেকে উচ্ছেদ করেছে। মাইলা কী করবে এখন ? কোথায় যাবে ? কাল ছেলের জামিন আনতে গেলেও অনেক টাকার দরকার। ছেলেকে এমনি এমনি তো আর জামিন দেবে না। পুলিশের কাছে গেলে সব টাকার খেলা।
মেয়ের চাপাচাপিতে তারপরেও কাত হয় মাইলা। মায়ের পিঠে হাত দিয়েই মনা বুঝতে পারে এগুলো আঘাতের চিহ্ন। মেয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, মা কিছু বলে না। মাইলা মেয়েকে ধমক দেয়। কথা বলতে নিষেধ করে। তার ছেলের চিন্তায় কোনও কিছুই ভালো লাগছে না। কাল সকালে কার কাছে হাত পাতবে সেটাই চিন্তা করে অস্থির হয়ে উঠছে।
সকালে মেম্বারের কাছে যাবে নাকি! অনেক দিন থেকেই তো মেম্বার তাকে ফুসলাচ্ছে। ওই এক টুকরো জমির জন্য। ওই দশ শতক জমি তো মাইলার শেষ সম্বল। মনে মনে ভেবেছিল ছোট মেয়েটার বিয়ে দেবে জমি বন্ধক দিয়ে। এখন তো ছেলের শ্বশুরের গোষ্ঠী কেস করে দিয়েছে। না জানি কত টাকা ক্ষতিপূরণ চায়। এই ছেলেটার জন্য সে কোনও কিছুই করতে পারল না। কত কিছু ঠিক করল কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারল না। দিনে দিনে মাইলার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। আর পারে না সে। এবার একটু ছুটি পেলে ভালো হতো বুঝি!
সকালে উঠে বুঝতে পারে না মাইলা রাতে ঘুমিয়েছে কি না। কাল চিন্তায় শুধু প্রভাবশালী মেম্বারকেই দেখেছে। যে তার এক টুকরো জমি নেওয়ার জন্য কত শত প্রলোভন দেখিয়েছে। ওই লোকের কাছে গিয়ে মাইলা টাকা চাইলে তো না করবে না। এমনকি তার ছেলে শমসুকে জামিনের ব্যাপারেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে জব্বার। কী এমন হবে! লোকে তো একটু সুবিধার জন্য কত কিছুই করে। সে না হয় জব্বারের কাছে গেল, তার হাতে-পায়ে একটু ধরলই।
মাইলার ভাবনায় আর কেউ বাধা দিল না। মনু ব্যাপারটা পছন্দ করে না। কিন্তু ছেলে ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে টাকা দিয়ে কোনও সহযোগিতা সে করতে পারবে না। তাহলে মাইলার করণীয় কী ? মাইলাকে তো কিছু একটা করতেই হবে। জব্বারের হাতে পায়ে ধরে আশ্বাস নিয়ে আসে মাইলা।
এসে মনার সঙ্গে কথা বলে। কেন জানি মনে হয় মনার একটা গতি হওয়া দরকার। না হয় সে স্বস্তি পাচ্ছে না। কিছু মুখে দিয়ে গরুটার খাওয়ার জোগাড় করতে লেগে যায় মাইলা। আর মনা সকালে উঠেই হাঁস-মুরগির খাবার দিয়েছে। নিজে কিছু মুখে দিয়ে মাইলা খেতের দিকে যায়। ধানের ছড়াগুলো বেশ মোটাতাজা হয়েছে। ঘুরে ফিরে মাঠের ধানের সঙ্গে কথা বলে। এক জমি থেকে আরেক জমিতে পানি চলে কি না সেসব দেখে। এই করতে করতে তার সময় পেরিয়ে যায়।
মনুর ওপর রাগ হয়। ছেলেটাকে দেখতে গেল, তাকে নিয়ে গেল না। শমসুর শ্বশুরের কেসে শমসু জেলে গেছে। তাড়াতাড়ি টাকা দিতে হবে, না হয় শমসুকে কোর্টে চালান করে দেবে পুলিশ। কিছুদিন পর মাইলা আবার জব্বারের কাছে আসে। মাইলার পরনে তখন ধানী রঙের শাড়ি। হঠাৎ জব্বারের কী হয় বোঝা যায় না। তার চোখে যেন রং ধরে। মাইলার দিকে সে কেমন কেমন করে তাকিয়ে থাকে। মাইলার বুকটা ধড়াস ধড়াস করে। সে তো এখন বয়েসী, তারপরও জব্বার কেন তার দিকে অমন নেশাখোর চোখে তাকাল। মাইলার মাথায় ঢোকে না। যা হোক, এখন ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে তার টাকা দরকার। কিংবা জব্বার মেম্বার যদি একটা বিচার সালিস করে সব মিটমাট করে দেয় তাহলে মাইলা জব্বারের গোপন শর্তেও রাজি। সবকিছু ঠিকঠাক করে দিতে জব্বার একটু সময় নেয়।
ততদিনে খেতের ধান হলুদবরণ হতে শুরু করেছে। একদিন মাইলা বোরকা পরে জব্বারের বাইকে চড়ে ছেলেকেও দেখে আসে। মনু এসব খবর পায় না। কারণ জব্বারের বাইকের পেছনে কে বা কারা বোরকা পরে থানায় গেছে তা কেউ সহজে জানতে পারে না। না হয়, ঠিকই মনুর কাছে খবর পৌঁছে যেত। এই বয়সে এসে মনু মাইলাকে চোখে চোখে রাখে। আর জব্বারের সঙ্গে মনুর কীসের এত শত্রুতা মাইলা কখনও তা উদ্ধার করতে পারে না।
ছোট মেয়ে মনার বিয়ের কথা ঠিক করে ফেলে মাইলা। খরচপাতি মনু কোত্থেকে জোগাড় করে জানে না সে। তবে এই চিন্তা মাথায় আনে না মাইলা। তার চোখে হলুদ রঙের ধানের ছড়া আর শমসুর মুখখানা এক হয়ে যায়। হাড্ডিসার গাভিটার জন্য পরম মমতা অনুভব করে। চোখ বুজে সুখ অনুভব করে সে। তার শমসু ফিরে আসবে। মোরগ-মুরগিগুলো বিক্রি করে দেয়। গাছের কলা, অন্যসব ফল-ফলাদি বিক্রি করে। আর সবার চোখ বাঁচিয়ে জব্বারের সঙ্গে দেখা করে। জব্বার খুব তাড়াতাড়ি মুক্ত করবে শমসুকে। কারণ শমসুর শ্বশুর কেস তুলে নেবে টাকার বিনিময়ে। মাইলা টাকার ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
শমসু মুক্ত হয়ে যেদিন ফিরে আসে মুখডোবায় সেদিন মাইলাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ বলে তাকে খেতের আশেপাশে দেখেছে। কেউ বলে জব্বারের সঙ্গে বাইকে চড়ে যেতে দেখেছে। কিন্তু জব্বার জানায়, সে মাইলাকে কোথাও দেখেনি। অতঃপর মনু, শমসু আর মনা ঘুরে ঘুরে মাইলাকে খোঁজে, খুঁজতে থাকে।
সচিত্রকরণ : রজত



