গল্প : অণুগল্প : মঈন আহমেদ

এক বছর মাত্র তাদের বিয়ে হয়েছে। নিজেদের ইচ্ছায় নয়। উভয়ের অভিভাবকরা আয়োজন করেছিলেন― খাসি কেটে অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন হয়েছিল।
কিন্তু বারো মাস না যেতেই আমলা শ্রেণির অভিভাবকরা বিগড়ে গেলেন।
হই হই। কী হলো! কী হলো!
কনের অভিভাবক মেয়েকে জামাইয়ের কাছে রাখতে সহসা আপত্তি তুললেন আর ছেলের অভিভাবকও ঘরের লক্ষ্মীকে ঘরে তুলতে নারাজ। বাঁধল মহা বিভ্রাট!
কারণটা সবাই জানল। কনের অভিভাবক বরের নামে অভিযোগ দিলেন―ছেলেটি নপুংসক। কৃষি বিশারদ ছেলে নিজের নামের পাশে ডিগ্রির জায়গায় এই বিশেষ্যটা পেয়ে তো হতভম্ব!
পাল্টাপাল্টি ছেলের অভিভাবক ধুঁয়া তুললেন―মেয়েটি নাকি বাঁজা। মেয়েটি হেন অভিযোগ শুনে বদ্ধ ঘরের বিছানায় শুয়ে ছাদে তারা খোঁজা শুরু করল।
আশপাশের তথাকথিত সুহৃদরা কেউ কেউ দন্ত বিকশিত করে তো কেউ কেউ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসেন।
কতগুলো দিন গেল, রাত গেল কালান্তরে ভেসে। তারপর একদিন ছেলে-মেয়ে সবার অলক্ষ্যে নিজেরা সাক্ষাৎ করল।
ছেলেটি মেয়ের কাছে জানতে চাইল―তুমি সক্ষম তো ?
মেয়েটি প্রত্যুত্তরে জানালো, হ্যাঁ।
তারপর মেয়েটি নিজের কৌতূহল মেটাতে চাইল―তুমি কি অক্ষম ?
না। তুমি সেটা জানো।
অতঃপর কালক্রমে ছেলে-মেয়ে দুজনে অস্থির হলো। আসমানের সাত তবকের উপরে যাঁর প্রকাণ্ড অধিষ্ঠান তাঁর কল্পিত জ্যোতির্ময় সিংহাসনের পা ধরে তারা ওছিলার মারফত জোর নাড়া দিল।
মহান কর্তা ছেলে-মেয়ের বেদম তাড়াহুড়ায় বড় বিচলিত হলেন কিংবা হলেন না।
অবশেষে কুশীলববৃন্দ অভিভাবকদের মুখে চুন-কালি দিয়ে বর্তমানে নাতি-নাতনি নিয়ে কুশলে আছে।
শব্দ সংখ্যা ২০০
দুই
আমাদের পিসিমা
বিধবা পিসিমা এক চিলতে দাওয়ায় বসে মাথা থেকে উকুন তুলে দুই বুড়ো আঙুলের নখে চাপ দিয়ে পুটুস পুটুস শব্দে তাদের নিধন করতে করতে নিকানো উঠানে জটলা পাকানো সলিম উদ্দিনের ছেলে আর বউদের উদ্দেশ করে বললেন―আমি মরলে তোদের মতো করে আমাকে কবর দিস।
কেন পিসিমা ? মুখাগ্নি করার কেউ নাই বলে কবরে শুতে চাও ?
না।
তবে ?
মাটি আমার মা। মাকে ছেড়ে ধোঁয়া হয়ে অন্তরীক্ষে যাওয়ার সাধ নেই রে―আমি মাটিতেই থাকব। আচ্ছা, কবরে শোয়ানোর জন্য কতটুকুন জায়গা লাগে রে ?
সাড়ে তিন হাত।
আমার জন্য অত জমি নষ্ট করবি না। দেড় হাত জায়গা খুঁড়ে মাথা উঁচু করে বসিয়ে দিবি।
আচ্ছা, বেশ।
আর শোন।
শুনছি।
১০৮টা পুঁতির একটা জপমালা দিতে ভুলিস না কিন্তু। না-হয়, আমি যেটা জপি সেটাই মনে করে দিয়ে দিস।
বেশ, বেশ।
পিসিমার ১৯২৫-এ জন্ম।
১৯৪০-এ বিয়ে।
১৯৪৩-এ বিধবা।
টিকোলো নাকের গৌরবর্ণ নিঃসন্তান আমাদের পিসিমা। মৃত্যুকালে তিনি মাটি পাননি, আগুনও নয়―ভেসেছিলেন নদীর জলে।
সেই বছরটা ছিল ১৯৭১ সাল।
শব্দ সংখ্যা ১৫১
তিন
মা-জননী
তোর যন্ত্রণায় আর বাঁচি না! হাড়-মাংস সব কালি করে দিলি!
দুঃখিনী জননী খোঁটা দিয়েই পাছার তলা থেকে পিঁড়িটা টেনে থপাস করে বসিয়ে দিলেন ছেলের উন্মুক্ত পিঠে।
পিঁড়িটা দীর্ঘকাল মায়ের শরীরের ভার নিতে নিতে এমনিতেই নড়বড়ে হয়ে ছিল। এবার আর নিজেকে রক্ষা করতে পারল না।
অর্বাচীন ছেলের তামাটে পিঠে প্রচণ্ড সংঘর্ষে পিঁড়ির পাটা মায়ের হাতে ধরাই থাকল আর তার অবশিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খান খান ভেঙে পড়ল স্যাঁতসেঁতে মা-মাটির বুকে।
এই মাকেও আমরা চিনি। এই মায়েরও সহ্যক্ষমতা অঢেল।
শব্দ সংখ্যা ৭৬
চার
শয়তান নিপাত যাক
পরিচ্ছন্ন চার দেওয়ালের সুপরিসর ঘরের ফরাসের ওপর শুভ্র বিছানায় কয়েকজন মুরব্বিগোছের ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি অপেক্ষা করছেন। গৃহকর্তার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে খোদার দরবারে সমবেতভাবে দু হাত তুলে মাগফিরাত কামনা করার দুর্বার বাসনা তাঁদের।
অধোমুখে দুঃখ বিহ্বলচিত্তে অপেক্ষা করছিলেন সবাই। বুড়ো-কিশোর-শিশুও ছিল মজলিসে―নিষ্পাপ শিশুদের দোয়া কবুল হয় নির্ঘাত।
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে একমুঠ দাড়ি ঝুলিয়ে সৌম্যকান্তি মৌলভি এলেন দু পাশে দুজন সাগরেদ নিয়ে, যেন কিরামান কাতেবিনের ‘রাকিব’ আর ‘আতিদ’। সালাম-সম্ভাষণ বিনিময় হলো উপস্থিত ধর্মভীরু কিংবা বেহেস্ত আকাক্সক্ষীদের সাথে।
মৌলভি-হুজুর উপবিষ্ট হলেন নির্দিষ্ট সিংহাসনী আসনে। দুটা কথা তো বলতেই হয়―আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টার জন্য এক, দেড় বা দু হাজার টাকা নজরানা জায়েজ করার জন্য। হুজুর নসিহত করতে করতে তাঁর দৃষ্টিতে পড়ল ডান দিকে মিয়া-হয়ে-বসা এক ভদ্রজনের মাথায় টুপি কিংবা কোনও ফেট্টি―কিচ্ছু নাই।
…এ-রকম পবিত্র মজলিসে যার মাথায় টুপি থাকে না, সে মজলিস অপবিত্র করে, তার মাথায় শয়তান মুইত্তা দেয়।
যে জনের মাথায় টুপি কিংবা ফেট্টি কিছু ছিল না সে সবার চোখ এড়িয়ে নিজের মাথায় হাত বুলালো―নাহ! মাথার চুল ভেজেনি!
সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও কোনায় বসা তিনটি কৈশোরোত্তীর্ণ উচ্ছল ছেলের দৃষ্টি আটকে গেল। তারা ফিসফাস করা শুরু করল। ফিসফিসানি দেখে একজন মুরব্বি তাদের নিবৃত্ত করতে ধমক দিলেন―
এই শয়তানগুলা, চুপ!
আর একজন সায় দিলেন―এই তোরা চুপ কর!
আর একজন…
এরপর আর একজন…
হৈ-হট্টগোলের ঢেউ উঠল। খেই হারিয়ে ফেলে মৌলভি-হুজুর ভীষণ বিরক্ত হলেন―
হেতারা চোদাকগা, আপনারা পড়েন―‘…’
শয়তান বড়ই চক্রান্তকারী। শয়তান নিপাত যাক।
শব্দ সংখ্যা ২১০
পাঁচ
পরাধীনতা মানা যায় না
চল যাই, মিছিলে যাই।
নাহ, আমি যাব না।
কাল যে গেলি।
কালকে প্রাণের ডাকে গিয়েছিলাম।
আজকে প্রাণে ডাক দেয় না ?
নাহ।
কেন ? কাল প্রাণে ডাক দিল আজ ডাকছে না কেন!
আমি রাজনীতি করি না, তাই। গতকাল ছিল সমষ্টির দাবি, তাই আমিও ছিলাম। সেটা আজ রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়েছে, তাই আমি নাই।
তুই এভাবে পিছিয়ে থাকলে দেশটা স্বাধীন হবে কী করে ?
দেশ কি এখন পরাধীন আছে নাকি!
বন্ধুটি জানালার গ্রিল গলে শুভ্র পাহাড়ের মতো টুকরো টুকরো ভেসে বেড়ানো মেঘের উপত্যকার ফাঁক দিয়ে নীল আকাশে দৃষ্টি মেলে ভাবে, ভাবতে থাকে―বন্ধুটি তার অকাতরে বুক চিতিয়ে জীবন দিল। আদতে কি বন্ধুটির কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি!
শব্দ সংখ্যা ১০৩
ছয়
আত্মজীবনী
গন্দমের দিকে একবার দৃষ্টিও উঠাবে না―আদমের প্রতি কড়া নির্দেশ ছিল।
কিন্তু প্রথম-মানব আদমকে নিভৃতে দেখে ফেললেন হাওয়া। আদমও দেখলেন, অভিভূতও হলেন, তারপর সৃষ্টিকর্তার প্রকোপের ভয়ে দৌড়ে পালালেন দিগি¦দিক।
হাওয়া ত্বরিৎ পিছন নিলেন তাঁর―এ আবার কোন অবতার ? ―তারা-নক্ষত্র সাক্ষী আছে।
কাণ্ড দেখে বিরাট-শিশুর ভীষণ অভিমান হলো। পানি-মাটির অবয়বধারী দুজনকেই নিক্ষেপ করলেন মর্ত্য―েযাহ, তোরা মর গিয়ে!
জল-থল, সবুজ বৃক্ষ শোভিত মর্ত্যে নেমে আদি পিতা আদি মায়ের পিছু নিলেন―তাঁর তো একান্ত সঙ্গী দরকার! তিন দিন কী তিনশ দিন কী আরও বেশিদিন সময় হবে হয়তো, আদি পিতার সাফল্য পেতে।
স্বর্গে মাতা পিছু নিয়েছিলেন পিতার। আদিবাসী বৃক্ষের মর্ত্যে পিতা ঘুরেছেন মাতার পিছনে, অবিরাম।
আদিরসে সিক্ত আমিও ঘুরছি জন্মাবধি! আমার কী দোষ!
মহান শয়তান খিলখিলিয়ে হাসেন―হাসি তার থামে না!
শব্দ সংখ্যা ১১৫
সাত
অন্তরীক্ষে নতুন বসতি চাই
ব্রহ্মা বড় রসিক। দিব্যি নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন―বনফুল বলেছেন। তাঁর ঘুম পনেরো দিনের আগে ভাঙবে না। ততদিনে পৃথিবীর বয়স বেড়ে হবে অনেক গুণ।
ঘুম না ভাঙাই ভালো। ঘুম ভাঙলেই তো বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। সবুজ শোভিত ধরায় কত প্রাণ আর তাদের কত মাঙন―এগুলো মেটাতে হয়তো পারবেন না। তখন নিজের ওপর জন্মাবে আক্রোশ। তাঁর রুদ্ররোষে ভস্মীভূত হবে শস্যময়, প্রাণময় পৃথিবী।
মানুষ পুড়বে, জন্তু পুড়বে, কীট-পতঙ্গ-তেলাপোকা পুড়বে, চন্দ্র পুড়বে, পৃথিবীর অধিপতি সূর্য পুড়বে―পুড়তে পুড়তে নিঃশেষ হয়ে, হয়ে যাবে শ্বেতবামন-নক্ষত্র।
স্টিফেন হকিং স্বর্গ চান নাই। নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখতে অন্তরীক্ষের অন্যত্র বসতি স্থাপনের ওপর নির্ভর করতে চেয়েছেন।
শব্দ সংখ্যা ৯৫
আট
মরব না
আমি জল-থল-পাহাড়-আকাশ-অগ্নি-বাতাস প্রাণ ভরে ভোগ করব। তোমরা গাড়ি-বাড়ি নিয়ে থাকো। একে অপরের পেছনে অঙুলি চালনে ব্যস্ত থাকো। আমি দেখব, নিম্নগামী তোমরা কত অধঃপতনে যেতে পারো!
বেঁচে থাকাটা ঐশ্বর্যের।
এই আরাধ্য জীবনকে বয়ে-বেড়ানো-মৃত্যুর কাছে এক লহমা বেশি হলেও জীবন চেয়ে নেব―বড়ই আবদার করে। এত দিন আমাকে ধারণ করল যে মৃত্যু সে কি শেষ সময় আমার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারবে ?
আমি কেন সেধে মৃত্যুকে অযাচিত আলিঙ্গন করতে যাব। অন্যের প্ররোচনায় কারও স্বার্থ রক্ষায় নিজেকে বলি দিতে যাব কেন ? কেন ? কেন আমার শূন্যতাকে প্রিয়জনের কাছে দুর্বিষহ করে তুলব ? কেন আমার মা-জননীর কোল খালি করে আকাশের ওপারের আকাশ থেকে উঁকি মেরে বিচলিত হবো ?
আমার মায়ের এক ফোঁটা অশ্রু আমার কাছে যে পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত স্বর্ণখনির চেয়ে দামি। সেই মা কিংবা মাটি ছাড়া আর কারও জন্য জীবনকে সঁপে দেব না অমোঘ মৃত্যুর কোলে।
শব্দ সংখ্যা ১২৭
নয়
ভূতের মুখে মুত
সেদিন ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। দেশের ভেতর তিন দিনের দূরপাল্লার যাত্রা। ঢাকা থেকে রওয়ানা হয়ে সিলেটের দিকে সবার যাওয়ার ঝোঁক। আমি মুরব্বি। আমার কোনও কিছুতেই আপত্তি নাই। প্রকৃতির কোলে-পিঠে বেড়াতে ভালোই লাগে।
প্রত্যুষে বেরিয়ে হইহই করতে করতে বড়লেখার পর্যটন স্পট মাধবকুণ্ডের ফটকে গিয়ে পৌঁছালাম, তখন সন্ধ্যা এসে গেছেন। রক্ষীরা গেইট বন্ধ করে দিয়েছে। টিকেট দেওয়া বন্ধ। পর্যটক সবাই ফেরত আসছেন। আমার ভ্রমণ পিপাসু উনিশটি মুখ নিষ্প্রভ হয়ে গেল।
দ্বারবান আর কর্মকর্তাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ করলাম। তারা বিচলিত হলেন কিন্তু অনুরোধ রক্ষা করলেন, বললেন, দ্রুত ফিরতে হবে। এখনি অন্ধকার ঘিরবে বলে! সুতরাং, ঝরনার কাছে একেবারেই সময় কাটানো যাবে না।
―যা বলেন ভাই, সবটাতেই রাজি।
গেইট থেকে অনেক দূরে জলপ্রপাতের খাড়ি। সবাই ঊর্ধ্বমুখে দৌড় দিল ঝরনার প্রপাত দেখার জন্য।
আমি অর্বাচীন, পেছনে পড়ে গেলাম। পা চলছে না, এগোতে পারছি না। যাকগে ওরা! কিছুক্ষণেই অনুভব করলাম কে যেন আমার পেছন পেছন হাঁটছে। ফিরে চাইলাম―নাহ কেউ নাই!
সামনে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখলাম। অনুভব করলাম কেউ যেন আমার পা দুটা জড়িয়ে রেখেছে।
আমি গন্তব্য পর্যন্ত যেতে পারলাম না। সবাই হইহই করতে করতে ফেরত আসছে। যাক, ওদের দেখতে পেয়ে স্বস্তি এল। বললাম একটু আস্তে হাঁটতে। তারা গুরুত্বই দিল না। আমাকে পেছনে ফেলে কেউ হন হন, কেউ দুলতে দুলতে এগিয়ে গেল।
পদবিক্ষেপের জন্য পা উঠাতেই পারছি না। এ কী যন্ত্রণা! এরকম নানা পরিস্থিতিতে আগেও পড়েছি, অভিজ্ঞতা আছে―ভয় পাই না। তবুও!
অনুভব করলাম প্রস্রাবের বেগ―কী জানি ভয়েই নাকি! তার ওপর ডায়াবেটিসের শরীর!
দূর ছাই! আমি প্যান্টের চেইন অবমুক্ত করে গরুর মতো ছড়ছড় করে মোতা শুরু করলাম। মনে হলো কারও মুখে মুতে দিয়েছি। কারণ, কেউ যেন ছিটকে পড়ল দু হাত দূরে―অনুভব করলাম।
শরীর হালকা করে দিব্যি হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে চলে এলাম―কেউ আর মশকরা করেনি।
সচিত্রকরণ : রজত



