Uncategorized

গল্প : হলুদ চন্দ্রমল্লিকা : সায়ন্তনী ভট্টাচার্য

কুটু বৈরাগী লটারিতে পঁচিশ লাখ টাকা জিতেছে। আশুলাল আটাশ কেজির আড় মাছ নিলামে তুলেছে। জিতেনের মিষ্টির দোকানে ভিড় লেগে আছে, খুব বিক্রি। পুলকের ছেলে এটিএমের গার্ডের কাজ পেয়েছে। এমন সব ভালো ভালো জিনিস হচ্ছে পৃথিবীতে। ভালো জিনিস হলে আরাম লাগে ঘোঁতন মান্নার। ভাত একটু বেশি খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু চার হাতার বেশি ভাত দেয় না টুনুরানি। সে নিজে খায় তিন হাতা। ছেলে খায় সাত হাতা। এই চৌদ্দ হাতা ভাতের হিসেবে সারা মাস চলে। তার বেশি খেলে খরচ বেড়ে যায়। রাতে অবশ্য রুটি। রুটিও বাঁধা। ছ খানা মোটে। টুনুরানি নিজে খায় চারখানা। ছেলে আটখানা। এর বেশি কিছুতেই না। মানে টুনু নিজেকে আর ঘোঁতনকে এর বেশি একটুও দেবে না। পেটে যত খিদেই থাকুক না কেন! ছেলের কথা আলাদা।     

ঘোঁতন মান্না চার হাতা ভাত, ডাল, শুকনো লংকা ভাজা দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধ, চারাপোনার ঝোল খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। মেঘলা আকাশ, নারকেলডাঙা থেকে সুকিয়া স্ট্রিট হেঁটেই মেরে দেবে। হেঁটে মেরে দেওয়ার মুশকিল হচ্ছে চার হাতা ভাত বড্ড তাড়াতাড়ি হজম হয়ে যায়। কিন্তু এটুকু রাস্তার জন্য বাস-অটোর পেছনে টাকা খরচ করার মানে হয় না। ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে চলে যাবে। সুকিয়া স্ট্রিটের কাছে ঘোঁতনের পান-বিড়ি-সিগারেটের গুমটি। দুপুরের খাওয়া খেয়ে একেবারে দেড়টা-দুটো নাগাদ গুমটি খোলে। বন্ধ করে সাড়ে এগারোটা-বারোটা। মালপত্র নিয়ে ওই হাজার চারেক টাকা দাম হবে গুমটির। ফুটপাথে ঘোড়া নিমগাছের পাশে, দত্তদের ভাঙা, বিপজ্জনক বোর্ড ঝোলানো বাড়িকে পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। সরিয়ে নেওয়াই যায়। আরও ভালো জায়গায় যাওয়া যায়। বিক্রি বাড়তে পারে। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা সেট হয়ে গেছে। মাসে হাজার দুয়েকের বেশি দিতে হয় না। ছেলেপিলেরা হুজ্জত করে কম, টাকা বাড়াতেও বলে না।  

আজ গুমটি খুলতে গিয়ে ঘোঁতন দেখল সামনের রাস্তায় শুটিং হচ্ছে। হদ্দ লোকজন। খুব সুন্দর দেখতে একটা মেয়ে, হিরোইন বোধহয়! সে নাচছে। মাখনের মতো সৌন্দর্য, আলো পিছলে যাচ্ছে। আলো পিছলে যাওয়া লোকেরা আর ঘোঁতনের মতো আলো শুষে নেওয়া লোকেরা ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছু নেই বলে মনে হয় ঘোঁতনের। দেখলেই বোঝা যায় কে খেয়ে-পরে আছে, কে নেই, ঘোঁতন ভাবে। ভাবনায় মাথা চিড়বিড় করে। বড় বড় আলো, সাদা রঙের বোর্ড নিয়ে ছোটাছুটি করছে কয়েকটা ছেলে-মেয়ে, একজন দাড়িওয়ালা লোক সবসময় রেগে আছে, চিৎকার করছে। একজন নায়িকার মুখে বারবার কতকিছু লাগিয়ে দিচ্ছে, মুছে দিচ্ছে।    

ঘোঁতন দোকান খুলবে কী, এসব দেখে থ! আশপাশের দু একটা দাঁড়িয়ে থাকা ছোট লরি থেকে ড্রাইভার খালাসিরা এসেছে, এদিক-ওদিক থেকে আরও দু-চারজন দোকানদার, মোড়ের ফুচকাওলা নিমকিলালও। সবাই শুটিং দেখছে। ভিড় মজা পাচ্ছিল। এখন আবার নায়ক লাল গাড়ি নিয়ে এসেছে। শুটিং দেখতে দেখতে বিড়ি-টিরি খাচ্ছে সব। ঘোঁতনের বিক্রি বাড়ছে। ভালো ব্যাপার। ভালো ব্যাপার হলেই অন্তত ছ হাতা ভাত খাবার বিষয়টা ঘোঁতনের মাথায় ঢুকে যায়। এখনও তাই হলো। খিদের চাগাড় দিল খুব। 

কোলে বাচ্চা নিয়ে লাল চুলের, ঘাগড়ার মতো করে শাড়ি পরা যে মেয়েটা রাস্তায় ভিক্ষা করে, সিগনালে গাড়ি দাঁড়ালেই কাচে ঠক ঠক করে, হাত পাতে, সে পর্যন্ত কাজকর্ম ছেড়ে বাচ্চা নিয়ে শুটিং দেখছে। ঘোঁতনের থেকে সেও একখানা বিড়ি কিনল।  

নিমকিলাল বলল, ‘বিড়ি খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক।’

শুনে মেয়েটার সে কী হাসি। হানিকারক আবার কী! জীবনটাই বলে হানিকারক।

তো শুটিং হচ্ছে তো হচ্ছেই। ঘোঁতনের বিক্রিও হচ্ছে তো হচ্ছেই। ভালো লাগছে ঘোঁতনের। ছ হাতা থেকে সাত হাতা ভাত খাওয়ার বিষয়টা মাথার মধ্যে জোরে জোরে ধাক্কা মারছে। মেঘ আরেকটু কালো হলো এ সময়। স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলে উঠল। শুটিং-এ একটা ব্রেক হয়েছে। শুটিং-এর এরা খাচ্ছে পকোড়া, বার্গার এসব। ঘোঁতন টিফিন কৌটো বের করল। মুড়ি আছে একবাটি। আরেকবাটি আলুভাজা। টুনুরানি দিয়ে দিয়েছে। রোজই দেয়। আলুভাজার জায়গায় কোনওদিন শশা থাকে, কোনওদিন চানাচুর। 

মুড়ি-আলুভাজা ঘোঁতনের ভালো লাগার মস্তিষ্কে বিরক্তি আর রাগ উসকে দিল।

‘টুনু, তোমার সমস্যাটা কী ? টিপে টিপে খরচা করো কেন ?’

টুনু বিড়বিড় করে। ঘোঁতন জানে টুনু গালি দিচ্ছে। কাঁচা খিস্তি টুনুর ভালো আসে।

‘গুমটিতে বিক্রি এখন ভালোই। এক হাতা ভাত বাড়ালে কী সমস্যা! চারের জায়গায় অন্তত পাঁচ হাতা করো।’

সমস্যা অনেক। টুনুও জানে, ঘোঁতনও জানে। তার মাঝে এসব ফালতু কথা। ছেলে মা-বাবার ঝগড়া শুনতে শুনতে হাসে, মোবাইল থেকে চোখ সরাতে কষ্ট হয়, তাও হাসে। 

ঘোঁতন আবার শুটিং-এ ফিরে আসে। টুনুরানির টাকা বাঁচানোর এসব ন্যাকামো দেখলে মটকা গরম হয়ে যায়।

গরম মটকা নিয়ে রাস্তার ওপাশে যাচ্ছিল ঘোঁতন। ওপাশে বাথরুম আছে একখানা। জল ছাড়তে হবে। জল ছাড়ার সমস্যা হয়েছে। ডাক্তার দামি ওষুধ দিয়েছে। টুনুরানি ওষুধের টাকা দেয়, ঘোঁতন ওষুধ কিনতে ভুলে যায়! এই চলছে। ভাত দেয় না বেশি, আর ওষুধ কেনার টাকা। ন্যাকামো নয়তো কী! মটকা আরও তিন-চার ডিগ্রি বেশি গরম হলো। রাস্তা পেরোনোর পথে গরম মটকার ঘোঁতন বেশ জোরে ছুটে আসা একটা বাসে ধাক্কা খেল। ধাক্কা খেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ঘোঁতন নেই হয়ে গেল। জল ছাড়ার সমস্যাও মিটে গেল একই সঙ্গে। 

শ্মশানের সব কাজ মিটতে টুনু দেখে শরীর আর চলছে না। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। এদিকে ঘোঁতনের ভূত এসে টুনুকে ঠেলাঠেলি করে, ‘টুন, ও টুনু।’

টুনু জবাব দেয় না।

‘টুনু, ও টুনু, দু হাতা ভাত আর বেশি দিলে না কেন ? চার হাতা ভাতে কী হয়!’ 

‘কেন দেব ? রোজগার কী তোমার ? ওই তো একখানা গুমটি। আমাকে পাঁচ বাড়ি কাজ করতে হয়। ছেলে পড়া ছেড়ে গ্যারাজে কাজ করে। থাকি এই লড়ঝরে ভাড়া বাড়িতে। সপ্তাহে একদিন মাছ খাই কী খাই না! চার হাতার বেশি ভাত চাও, লজ্জা করে না ?’ 

ঘোঁতন এখন লজ্জার বাইরে। ছ হাতা ভাত পেলেও এখন কী! শরীরই নেই। ভাত যাবেই বা কোথায়! 

টুনু ভোর ভোর কাজে বেরোয়। বাসন মাজছে। আবার ঠেলাঠেলি। ‘টুনু ও টুনু, কোন মানুষের জীবনে দুর্দশা নেই বলো! আমাদের মতো কোটি কোটি গরিব এ দেশে, তা বলে তুমি চাল মেপে ভাত দেবে ?’

টুনু বিরক্ত হয়। উত্তর দেয় না। ঘোঁতনের গুমটিতে ছেলে বসা শুরু করে। টুনু ছেলেকে ঘোঁতনের ভাগের ভাত দেয়। ছেলের থালা ভরে যায়।     

ঘোঁতন ঠেলাঠেলি কমায় না। দু হাতা কম ভাতের জন্য ঘোঁতন বড্ড হুজ্জত শুরু করে। 

টুনু ছেলেকে নিয়ে ঠাকুরমশাইয়ের কাছে যায়। ঠাকুরমশাই বলে গয়ায় পিণ্ড দিতে হবে। হাজারটা ফর্দ, টাকা খরচা। টুনু বলে ‘দুত্তোর।’

ছেলে বলে, ‘বাবাকে দু হাতা ভাত বেশি দিলেই তো মিটে যায় মা।’

‘কেন দেব ? তোর বাবা আমাকে কী দিয়েছে ? জন্মে সমুদ্রটা পর্যন্ত দেখায়নি। পেটের চিন্তায় জীবন কেটে গেল। কেন দেব ? মেপে দেব ভাত, বেশ করব। থাক ক্ষিদে। ক্ষিদে নিয়ে মরুক। আমারও তো শালা কত ক্ষিদে। আমাদের মতো যারা তাদের ক্ষিদে কখনও মেটে না। না মিটুক। বেশ হবে। কেন দেব দু হাতা বেশি ভাত!’

ঘোঁতন শোনে সবটা। পৃথিবীটা এমনই। দেওয়া আর নেওয়ার।

পরদিন সকালে উঠে টুনু দেখে নারকেলডাঙা বস্তির ঘরের বাইরে মস্ত এক সমুদ্র। ঘোঁতনের ভূত বলে, ‘নাও টুনু, তোমাকে সমুদ্র দিলাম। সমুদ্র দ্যাখোনি বলছিলে! এবার আমাকে দু হাতা ভাত বেশি দাও।’

টুনু মুখ ফিরিয়ে নেয়। বাসন মাজতে যায়। কানাঘুষোয় শোনে ছেলে প্রেম করছে বস্তির পায়েলের সঙ্গে। টুনু ঘষে ঘষে বাসন মাজে। 

পরদিন সকালে নারকেলডাঙা বস্তির ঘরের বাইরে ঘোঁতন পাহাড় এনে রাখে। বরফ ভরতি পাহাড়। বলে, ‘নাও টুনু, তোমাকে হিমালয় দিলাম। এবার আমাকে দু হাতা ভাত বেশি দাও।’

টুনু ফিসফিস করে বলে, ‘মানে কী ? এখন আর এসবের মানে কী!’

ঘোঁতন মানে বলতে পারে না। সে ভাতে আটকে আছে। দু হাতা বেশি ভাতে।

তিথি বলল, ‘টিপে টিপে খরচা করি গো দিদি। চার বাড়ি কাজ মোটে। বাড়ি বাড়াতে হবে। এই তো সেদিন ইমিটেশনের কানের দুল পছন্দ হলো। হাতিবাগানে। বলে দেড়শো টাকা। আমি বললাম পঁচিশ। শেষে চল্লিশ পর্যন্ত নামল। আমি পঁচিশের বেশিতে নেব না বলে নিলাম না।

পুষ্পিতা মার-টার খায়। অনেকবার বলেছে টুনু পুলিশে যেতে। যায় না। টাকা কেড়ে নেয় বর। বলল, ‘সে টিপে টিপে আমিও খরচা করি। একবাড়ি রান্না, পাঁচ হাজার টাকা মাইনে দেয়। তার বেশি কিছুতেই দিচ্ছে না। ওকে দিতে হয় দু হাজার। হাতে থাকে তিন হাজার। তাই দিয়ে সংসারের হাজার বায়নাক্কা।’

টুনু আইসক্রিম দেখতে দেখতে বলে, ‘দিস কেন তোর বরকে ? মাছ নিয়ে ঠিকঠাক বসলে ভালো রোজগার করত। তা না, বউ পেটায়। তুইও তেমন।’

পুষ্পিতা হাসতে থাকে। আহিরিটোলার গঙ্গার ঘাটে বসে কমলা কাঠি আইসক্রিম খেতে খেতে সবাই টিপে টিপে খরচের গল্প করে। মাসে একদিন করে সবাই মিলে গঙ্গার ঘাটে আড্ডা মারতে আসা হবে ঠিক হয়েছে। টুনুই ঠিক করেছে। বেশ হা-হা-হি-হি হচ্ছে। 

ঘোঁতনের ভূত টুনুর পাশে এসে বসে। পা দোলায়। কিছু বলে না। আইসক্রিমের দিকে তাকায়। টুনু তাড়াতাড়ি আইসক্রিম শেষ করে ফেলে।

ফেরার পথে দেখে ফুলের দোকানে হলুদ চন্দ্রমল্লিকা। দশ টাকা করে পিস। টুনু পাঁচটা ফুল কিনে ফেলে। ঘরে ঢুকে কাচের গ্লাসে জল দিয়ে ফুল সাজিয়ে রাখে। বস্তির ছেঁড়া ঘর হলুদ ফুলের সৌন্দর্যে ভরে যায়। 

ঘোঁতনের ভূত দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছু বলে না।

টুনুর বুক ধড়ফড় করে। কেন কিছু বলছে না ভূত, ভেবে ভয় হয়। নিজের বিয়ে, ছিপছিপে ঘোঁতনের কথা মনে পড়ে, একটু নরম নরম লাগে। ফিসফিস করে, ‘এসবের মানে কী! এখন আর এসবের মানে কী!’ 

ছেলে ফিরে বলে খেতে দাও। আজ রাতেও ভাত। ছেলেকে থালা ভর্তি করে ভাত দেয় টুনু। নিজে নেয় তিন হাতা। ঘোতনের ভূত পাশে এসে বসে। বলে, ‘টুনু, ও টুনু।’

‘হুঁ! ’

‘তিন হাতা নয়, আজ তুমি চার হাতা ভাত খাও না কেন। ক্ষিদে যে তোমারও মেটে না, মেটেনি, তা কী আর আমি বুঝি না!’

টুনুর মন হুহু করে। বলে কী এ ভূত! ডায়লগে ভুল আছে। এর বলার কথা, ‘আমাকে দু হাতা ভাত বেশি দিলে না কেন’, না বলে কীসব বলছে!    

টুনু উত্তর দেয় না। ঘোঁতনের ভূতও আর কিছু বলে না। কেউই আর তেমন কিছু বলে না যার সত্যি সত্যি মানে আছে। হলুদ চন্দ্রমল্লিকার পেছনে পঞ্চাশ টাকা খরচা করেছে বলে ছেলে টুনুকে বকাবকি করে শুধু আর মাসে একবার সবাই টিপে টিপে খরচের গল্প করবে বলে কাঠি আইসক্রিম খেতে খেতে গঙ্গার ধারে জড়ো হয়। এছাড়া আর তেমন কিছু না। দু হাতা বেশি ভাতের ব্যর্থতা আর মটকা গরম ঘোঁতনের রাস্তা পেরোতে গিয়ে বাসের ধাক্কায় মরে যাওয়ার কথা পৃথিবী ভুলে মেরে দেয়, যেমন দেওয়ার কথা ছিল।  

সচিত্রকরণ : রজত           

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button