Uncategorized

আধুনিকতার বিষয়বস্তু : ভার্চুয়াল বাস্তবতা ও বাস্তবের নাজুকতা : স্লাভোয় জিজেক

বিশ্বসাহিত্য : সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : গ্লিন দালি

বাংলা ভাষান্তর : ড. মাসুদ আলম

[সমকালীন দার্শনিকদের মধ্যে জিজেক (Slavoj Žižek) অত্যন্ত প্রভাবশালী ও উদ্দীপনাময় ব্যক্তিত্ব। তিনি দর্শনের প্রচলিত ধারাবাহিক তত্ত্ব ও জ্ঞান পর্যালোচনা করেছেন নিজস্ব যৌক্তিক শৈলীতে। লাকাঁর মনোবিশ্লেষণিক তত্ত্ব ব্যবহার করেছেন দর্শনে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি পুনরায় বাস্তবসম্মত করার জন্য। ফলে মানবপ্রকৃতি ও সমাজ সম্পর্কে তিনি একটি নতুন মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। লাকাঁ ছাড়াও হেগেল, শেলিং, মার্কস, ফ্রয়েড, হাইডেগার, দেরিদা, আলথুসার ও বাদিউ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত জিজেক। যৌক্তিক চিন্তনের ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে দর্শনালোচনায় হেগেলীয়, মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রে লাকাঁনীয়, ধর্মালোচনায় ‘খ্রিষ্টীয় বস্তুবাদী’ এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে সাম্যবাদী বলে চিহ্নিত করতে আগ্রহী। দর্শনের সঙ্গে মনোবিশ্লেষণের একীভব (fusion) করেছেন তাঁর নিজস্ব যৌক্তিক রীতির মাধ্যমে। তিনি তাঁর লেখনী ও আলাপচারিতায় হেগেলের লাকাঁনীয় পাঠ ও লাকাঁর হেগেলীয় পাঠ তুলে ধরেছেন নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। তাঁর ‘স্রেফ বিনোদনের বাক্স’ বা হাস্য-রসাত্মক কৌতুকের নেপথ্যে অন্তর্ভূত হয়ে থাকে নিবিড় বার্তা। তাঁর ভাবাদর্শের পাঠ আমাদেরকে নতুন চিন্তা-বিশ্বে নিয়ে যায় এবং সমসময়ের নতুন ভাবাদর্শিক ঘটনা, যেমন: কৃচ্ছতাবাদ, সর্বাত্মকবাদ, গণতন্ত্রের নাজুক দশা, উগ্র জনবাদ ও নব্য-জাতীয়তাবাদের উত্থান, অভিনব ডিজিটাল প্রযুক্তির মনস্তাত্ত্বিক সংকট প্রভৃতি বুঝতে সহায়তা করে। জিজেক পুঁজিবাদের মার্কসীয় ব্যাখ্যা থেকে বের হয়ে অর্থাৎ ‘অর্থনৈতিক-সামাজিক’ চৌহদ্দি থেকে বের হয়ে পুঁজিবাদ কেমন করে ব্যক্তি পর্যায়ে কাজ করে এবং ব্যক্তিক মনস্তত্ত্বের উপর কী প্রভাব তৈরি করে তার একটি অন্তর্দৃষ্টি দিতে চান। ইতিহাস ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তিনি যতটা না মার্কসীয় রীতি অনুসরণ করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি দেখেছেন হেগেলীয় দৃষ্টিতে। জিজেক যে কোনও দার্শনিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন হাস্যরস, প্রাঞ্জলতা ও অসাধারণ পাণ্ডিত্যের সাহায্যে। তাঁর প্রতিটি লেখায় অভেদ-সম্পর্কিত দার্শনিক সমস্যা (philosophical problem of indentity), তত্ত্ববিদ্যা, বিশ্বায়ন, উত্তর-আধুনিকতাবাদ, রাজনৈতিক দর্শন, চলচ্চিত্র, ধর্ম, ভাষা-দর্শন ও মনোদর্শনের প্রক্ষেপণ থাকে। তিনি নিজস্ব বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বয়ান ও ভাববিশ্ব তৈরি করেন।

জিজেক ১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ল্যুবলিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট ফর সোসিওলজি অ্যান্ড ফিলসফির অধ্যাপক এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেক ইন্সটিটিউট ফর হিউম্যানিটিজের আন্তর্জাতিক পরিচালক। জিজেকের প্রথম বই The Sublime Object of Ideology (1989) দর্শনবিশ্বে তাঁর পোক্ত অবস্থান তৈরি করে দেয়। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে Tarrying With the Negative (1993), Interrogating the Real (2005), How to Read Lacan (2006), Violence: Big Ideas/ Small Books (2007), In Defense of Lost Causes (2008), First as Tragedy, Then as Farce (2009), Living in the End Times (2010), Less than Nothing: Hegel and the Shadow of Dialectical Materialism (2012), The Courage of Hopelessness: Chronicles of a Year of Acting Dangerously (2017), Like a Thief in Broad Daylight: Power in the Era of Post-Human Capitalism (2018), Sex and the Failed Absolute (2019), Pandemic: Covid–19 Shakes the World (2020), Pandemic: Chronicles of a Time Lost (2020), Heaven in Disorder (2021) ।

বর্তমান সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে Conversations with Zizek (Cambridge: Polity Press, 2004: 80–109) বই থেকে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গ্লিন দালি। তিনি দ্য ইউনিভার্সিটি অব নর্থাম্পটন-এর রাজনীতিবিষয়ক সিনিয়র লেকচারার। একজন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর গবেষণা ও আগ্রহের বিষয় মহাদেশীয় চিন্তা, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ভাবাদর্শের কার্যকারিতা। তাঁর বিখ্যাত বই স্পেকুলেশন: পলিটিকস, ইডিওলজি, ইভেন্ট।

সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন ড. মাসুদ আলম। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন সদস্য এবং দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল-এ পড়ান। তিনি মূলত গবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। ইতিপূর্বে ঐতিহ্য, ঢাকা থেকে তাঁর অনূদিত বই (জিজেক রচিত) প্যানডেমিক: কোভিড–১৯ শেক্স দ্য ওয়ার্ল্ড (২০২০), প্যানডেমিক ২: ক্রনিকলস অব অ্যা টাইম লস্ট (২০২১) এবং কথাপ্রকাশ, ঢাকা থেকে ফেদেরিকো ফিনচেলস্তাইন রচিত ফ্যাসিবাদী মিথ্যার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (২০২৬) প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মৌলিক প্রবন্ধের বই মেধাতন্ত্র: দর্শন, সমাজ ও রাজনীতি (২০২৫) কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।]

প্রশ্ন : আপনি অব্যাহতভাবে সকল সত্তার আমূল নেতিবাচকতার একটি মাত্রা হিসেবে কর্তা বা বিষয়ীর (subject) স্থায়িত্বের উপর গুরুত্বারোপ করছেন। তবে, ‘উত্তর-আধুনিক’ বিশেষ মনোভাবকে বিষয়ীর প্রতি তীব্র বিরোধিতার ধারণা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এই বিরোধিতার কারণ কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয় ? 

উত্তর : আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি ও অমার্জিত ভাষায় যা বলা যায় তা হলো: বিষয়ী হলো কেবল বাস্তব এবং প্রত্যেক বিরোধিতাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবের বিরোধিতা। যেসব সমালোচক বিশ্বাস করেন যে আমাদের বিষয়ীগততা অতিক্রম করা উচিত তারা মূলত বিষয়ীর একটি সীমিত ধারণার (সপ্রাঞ্জল কার্তেসীয় বিষয়ীর মতো) বিরুদ্ধে একটি ছদ্মÑসংগ্রামে লিপ্ত। তবে, একটি বিষয়ী বলতে কী বোঝায় সে সম্পর্কে তারা সুস্পষ্টভাবেই সচেতন রয়েছেন—মৌলিক নেতিবাচকতা, মৃত্যু প্রবণতার মাত্রা ও এ রকম আরও কিছু—এবং এটাই হলো আসল বিষয়। এখানে প্রায় একটা আবেগোন্মত্ত কাঠামো রয়েছে এই অর্থে যে বিরোধিতা হলো বাস্তবের গঠনমূলক মধ্যবর্তী মাত্রার বিরুদ্ধে, যা প্রকৃতি বা সংস্কৃতি নয় বরং এমন একটা ফাঁকা: আদিম উন্মাদনার চিহ্ন, আদিম নিস্ক্রিয়তার অবস্থান। এই অর্থে আমি মনে করি যে বিরোধিতার চূড়ান্ত ভিত্তি হলো এমন একটি অসহনীয় অতিরিক্ততার মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা যা সুনির্দিষ্টভাবে বিষয়ীর মাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিষয়ী থেকে মুক্তি পাওয়ার অর্থ হলো এই বিরক্তিকর অতিরিক্ত থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করা, যা সংস্কৃতির একটি অতীন্দ্রিয় অবস্থা: এক ধরনের ত্রুটি যা প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্যে একটি প্রয়োজনীয় অদৃশ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।

প্রশ্ন : অন্তত কিছু বিরোধিতা সুনির্দিষ্টভাবে কর্তা বা বিষয়ীর যৌনতার মনোবিশ্লেষণীয় দৃষ্টিভঙ্গির দিকে পরিচালিত হয়। কেন পুরুষ/মহিলা বিভাজনকে একটি প্রাথমিক বাস্তব দ্বন্দ্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয় ? এটি কি অন্যান্য প্রকারের দ্বন্দ্ব থেকে আলাদা ?

উত্তর : আমি প্রথমে মনে করি যে সম্ভবত দ্বন্দ্ব শব্দটি এখানে পুরোপুরি উপযুক্ত নয়। অবশ্য বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং থাকলেও সেক্ষেত্রে আমার কোনও সমস্যা নেই। লাকাঁনীয় মূলতত্ত্ব হলো যে, সুনির্দিষ্টভাবে মানবিক অর্থে যৌন পার্থক্য যেমন জৈবিক দিক থেকে বোঝা যায় না, আবার তেমনি এটিকে একটি সরল প্রতীকী পার্থক্য হিসেবেও বোঝা যায় না—যেমনটি দেখা যায় জন গ্রে-এর বইয়ে, পুরুষরা এসেছে মঙ্গল থেকে, নারীরা শুক্র থেকে (অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকী মহাবিশ্ব থেকে)। মূল কথা হলো, যৌন পার্থক্য হলো এমন কিছু যা সর্বজনীন মানবতার সঙ্গে সহযোজিত। যৌন পার্থক্যের উল্লেখ ছাড়া মনুষ্য সত্তার কোনও নিরপেক্ষ সংজ্ঞা নেই। এই পার্থক্যই মানবতাকে সংজ্ঞায়িত করে। এই অর্থে, একজন মনুষ্য সত্তা কী—এর এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ সংজ্ঞায়ন হলো যৌন পার্থক্য। তাই এটি এমন নয় যে মানবপ্রকৃতি (কথা বলা, যুক্তি প্রদান, ভাষা ব্যবহার, প্রজনন ক্রিয়া, বা যাই হোক না কেন) সংজ্ঞায়নের জন্য আপনার কাছে একটি সর্বজনীন সেট রয়েছে এবং সেক্ষেত্রে সবার উপরে রয়েছে পুরুষ ও নারী। না, এটি বিপরীত: মানুষ হওয়ার অর্থ হলো যৌন পার্থক্যের সীমারেখা বরাবর সঠিকভাবে বিভাজন করা।

লাকাঁর তত্ত্বে, লিঙ্গগত পার্থক্য প্রতীকী বিন্যাসের কাঠামোতেই লিপিবদ্ধ। এটি প্রতীকীকরণের দুটি পদ্ধতির মধ্যে কোনও পার্থক্য নয়, বরং এই পার্থক্য প্রতীকী বিন্যাসের একটি নির্দিষ্ট মৌলিক অনড় অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। এটি প্রাথমিক অবস্থায় যতটা ধরা পড়ে তার চেয়েও অনেক বেশি সূক্ষ্ম, কারণ আবারও মূলকথা হলো এই পার্থক্যটি সর্বজনীন। মনুষ্য সত্তা হওয়ার অর্থ হলো নিজেকে একটি নির্দিষ্ট উপায়ে আলাদা করতে সক্ষম হয়ে উঠা: একটি নির্দিষ্ট পার্থক্যের মধ্যে বেঁচে থাকা। এটিই লাকাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিকতা।

প্রশ্ন : কর্তা বা বিষয়ী সম্পর্কে লাকাঁনীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে, দেল্যুজ নামটি প্রায় সময়ই উচ্চারিত হয়। আধুনিক দর্শনে দেল্যুজীয় ধারা সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী ?

উত্তর : দেল্যুজের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো যে তাঁর কাজে দুটি যুক্তি রয়েছে, দুটি ধারণাগত বৈপরীত্য কাজ করে। এই অন্তর্দৃষ্টি এতটাই স্পষ্ট বলে মনে হয়— ফরাসিরা যাকে অনিবার্য সত্য (lapalissade) বলে থাকেন—বিষয়টি এমন যে একজন ব্যক্তি আচমকা উপলব্ধি করেন যে এটি এখনও সাধারণভাবে উপলব্ধি করা হয়নি। একদিকে, শেলিঙিয় যুক্তি রয়েছে, যা ভার্চুয়াল ও বাস্তবের বিরোধিতা করে: বাস্তবের পরিসর (বাস্তব বর্তমানে কাজ করে, অভিজ্ঞতায় পাওয়া বাস্তবতা এবং ব্যক্তি হিসেবে বিষয়ী, নির্মিত ব্যক্তি), এর সঙ্গে রয়েছে এর ভার্চুয়াল ছায়াসঙ্গী (আদিÑবাস্তবতার ক্ষেত্র, বহু এককত্বের ক্ষেত্র, নৈর্ব্যক্তিক উপাদান যা পরবর্তীকালে আমাদের বাস্তবতার অভিজ্ঞতায় সংশ্লেষিত হয়)। এটাই হলো ‘অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাবাদ’র দেল্যুজ, দেল্যুজীয় ভাবনা যা কান্টের অতীন্দ্রিয়বাদকে একটি অনন্য বাঁক দেয়: যথাযথ অতীন্দ্রিয় পরিসর হলো বহু একক সম্ভাবনার ভার্চুয়াল স্থান, ‘বিশুদ্ধ’ নৈর্ব্যক্তিক একক ভঙ্গিমা, প্রভাব, প্রত্যক্ষণ, যা এখনও একটি পূর্বÑবিদ্যমান স্থিতিশীল ও স-প্রকাশ বিষয়ীর ভঙ্গিমা-প্রভাব-ধারণা হয়ে উঠতে পারেনি। এই কারণেই, উদাহরণস্বরূপ, দেল্যুজ সিনেমার শিল্পকে উদ্যাপন করেন: কোনও একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ীকে সূচিত করা ছাড়াই এটি দৃষ্টি, চিত্র, গতিবিধি ও চূড়ান্তভাবে সময়কেও ‘মুক্ত’ করে। যখন আমরা একটি সিনেমা দেখি, তখন আমরা একটি ‘যান্ত্রিক’ ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রের প্রবাহ দেখতে পাই। এমন একটি দৃষ্টিকোণ যা কোনও বিষয়ীর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; সংযোজিত (montage) শিল্পের মাধ্যমে, গতিকেও একটি নির্দিষ্ট বিষয়ীর বা বিষয়ের বৈশিষ্ট্য বা প্রভাববলয় থেকে বিমূর্ত/মুক্ত করা হয়। এটি একটি নৈর্ব্যক্তিক গতিবিধি যা কেবল গৌণভাবে, পরবর্তীকালে, কিছু ইতিবাচক সত্তার ক্ষেত্রে আরোপ করা হয়।

অন্যদিকে, আরও ঐতিহ্যবাহী যুক্তি রয়েছে যা উৎপাদন ও উপস্থাপনার বিরোধিতা করে: উপস্থাপনার ক্ষেত্রের বিপরীতে ভার্চুয়াল ক্ষেত্রটিকে সৃজনশীল, উৎপাদনশীল শক্তি হিসেবে (পুনঃ)ব্যাখ্যা করা হয়। এখানে আমরা এককের সামগ্রিক কাঠামো বা এ রকম কিছু দ্বারা আবদ্ধ উৎপাদনশীলতার আণবিক বহুমুখী স্থানের মানসম্মত বিষয় পাই।

হওয়া ও হয়ে উঠার মধ্যে বৈপরীত্যের শিরোনামের আওতায়, দেল্যুজকে এই সব মৌলিকভাবে অসঙ্গত যুক্তিগুলোকে একত্র করতে দেখা যায়—এবং এখানে কেউ হয়তো ফেলিক্স গুয়াত্তারির ‘মন্দ’ প্রভাবের কথা উল্লেখ করতে চাইবেন যা তাঁকে দ্বিতীয় যুক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। দেল্যুজের যথাযথ ধারাটি পাওয়া যায় তাঁর প্রথম দিকের বইগুলোতে, যেমন: ডিফারেন্স অ্যান্ড রিপ্রেসেন্টেশন ও দ্য লজিক অব দ্য সেন্স, প্রুস্ট অ্যান্ড দ্য সাইনস ও ইন্ট্রোডাকশন টু স্যাইচার-মাসোচ এর মতো কিছু সংক্ষিপ্ত ভূমিকামূলক লেখায়; তাঁর শেষের দিকে লেখা দুইটি বই, সিনেমাবিষয়ক দুইটি বইয়ে দ্য লজিক অফ সেন্স-এর বিষয় ফিরে আসে। এই সিরিজটি দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির যৌথ লেখা বইগুলো থেকে আলাদা, এবং এখানে যে কোনও একজন কেবল আফসোস করতে পারেন যে দেল্যুজকে অ্যাংলো-স্যাক্সন ধারায় অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং দেল্যুজের রাজনৈতিক প্রভাব মূলত একজন ‘গুয়াত্তারীয়’ দেল্যুজের মতো: এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে দেল্যুজের নিজস্ব কোনও লেখাই সরাসরি রাজনৈতিক নয়—দেল্যুজ নিজেই রাজনীতির প্রতি উদাসীন একজন অত্যন্ত অভিজাত লেখক। একমাত্র গুরুতর দার্শনিক প্রশ্ন হলো: কোন অন্তর্নিহিত সংকট দেল্যুজকে গুয়াত্তারির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছিল ? তর্কাতীতভাবে দেল্যুজের সবচেয়ে খারাপ বইটি কি অ্যান্টি-ইডিপাস, যদিও বইটি একটি সরলীকৃত ‘সহজ’ সমাধানের মাধ্যমে একটি অচলাবস্থার পূর্ণ দ্বন্দ্ব থেকে পালানোর ফলাফল নয় ? এর সঙ্গে ওয়েল্টাল্টার প্রকল্পের অচলাবস্থা থেকে শেলিঙ-এর পালানোর মিল রয়েছে যেখানে তিনি ইতিবাচক ও নেতিবাচক দর্শনের দ্বৈততার মাধ্যমে অবস্থান্তর করেছিলেন, অথবা হ্যাবারমাস আলোকায়নের দ্বান্দ্বিকতার অচলাবস্থা থেকে পালানোর জন্য উপকরণগত ও যোগাযোগমূলক কারণের দ্বৈততার দিকে স্থানান্তর করেছিলেন। আমাদের কাজ হলো পুনরায় এই অচলাবস্থার মুখোমুখি হওয়া।

এবং এই বৈপরীত্য কি আবারও বস্তুবাদ বনাম ভাববাদের নয় ? দেল্যুজের ক্ষেত্রে, এর মানে হলো, দ্য লজিক অফ সেন্স বনাম অ্যান্টিÑইডিপাস-এর মধ্যে। বিশুদ্ধ ‘হয়ে উঠা’ এর প্রবাহ হিসেবে ইন্দ্রিয়-ঘটনা হয় শারীরিক বস্তুগত কারণগুলোর জটিলতার অবস্তুগত প্রভাব (নিরপেক্ষ, সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় নয়), অথবা ইতিবাচক শারীরিক সত্তাগুলো নিজেরাই ‘হয়ে উঠা’ (ইন্দ্রিয় ?)-এর বিশুদ্ধ প্রবাহের সৃষ্ট-বস্তু। ভার্চুয়ালিটির অসীম ক্ষেত্র হলো, হয় পারস্পরিক ক্রিয়াশীল দেহের একটি অবস্তুগত প্রভাব, অথবা দেহগুলো নিজেরাই ভার্চুয়ালিটির এই ক্ষেত্র থেকে উদ্ভূত হয়, নিজেদের বাস্তবে নিয়ে আসে। দেল্যুজ নিজেই তাঁর লজিক অফ সেন্স বইয়ে এই বৈপরীত্যটিকে বাস্তবের দুইটি সম্ভাব্য উৎপত্তির ছদ্মবেশে বিকশিত করেন: আকারগত উৎপত্তি (হয়ে উঠার বিশুদ্ধ প্রবাহ হিসেবে নৈর্ব্যক্তিক চেতনার অস্থিরতা থেকে বাস্তবতার উত্থান) যা বাস্তব উৎপত্তি দ্বারা পরিপূরক হয়, যা শারীরিক মিথস্ক্রিয়া থেকে অবস্তুগত ঘটনাপৃষ্ঠের উত্থানের জন্য কার্যকর। কখনও কখনও, যখন তিনি প্রথম পথ অনুসরণ করেন, দেল্যুজ তখন বিপজ্জনকভাবে ‘প্রত্যক্ষ-বিচারবাদী’ (empiriocriticist) সূত্রের কাছাকাছি চলে আসেন: আদিম সত্য হলো অভিজ্ঞতার বিশুদ্ধ প্রবাহ, কোনও বিষয়ীকেই সূচিত করা যায় না, বিষয়ীগত বা বিষয়গত কোনওটিই নয়—বিষয়ী বা বিষয় হলো সকল স্থির সত্তার মতো, এই প্রবাহের গৌণ ‘জমাট বাধা’ অবস্থা মাত্র।

এই দুটি যুক্তি (শক্তি হিসেবে ঘটনা যা বাস্তবতা তৈরি করে; শারীরিক মিথস্ক্রিয়ার নিষ্ফলা বিশুদ্ধ প্রভাব হিসেবে ঘটনা) দুটি বিশেষায়িত মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের সঙ্গেও জড়িত বলে মনে হয়: হয়ে উঠার সৃজনশীল ঘটনা ‘বিভ্রম’ (schizo)-এর উৎপাদনশীল শক্তির উপর নির্ভর করে, আকাক্সক্ষার তীব্রতার নৈর্ব্যক্তিক বহুত্বে একীভূত বিষয়ীর এই বিস্ফোরণ তখন ইডিপাসীয় নকশা দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে; নিষ্ফলা অবস্তুগত প্রভাব হিসেবে ঘটনা নির্ভর করে কষ্টপ্রিয়Ñ আত্মপীড়নকারীর (masochist) মানবমূর্তির উপর যিনি মঞ্চস্থ আচার-অনুষ্ঠানের নিষ্ফলা পুনরাবৃত্তিমূলক খেলায় সন্তুষ্টি খুঁজে পান এবং যার কাজ হলো যৌন উত্তরণকে চিরতরে স্থগিত রাখা। কার্যকরভাবে এমন বিভ্রম আছে কি যেখানে একজন ব্যক্তি একাধিক আবেগের প্রবাহের জটিলতার মধ্যে স্থিরভাবে নিজেকে নিক্ষেপ না করে এবং কষ্টপ্রিয়Ñআত্মপীড়নকারী হিসেবে সাবধানে মঞ্চস্থ পরিবেশনার ছায়ার থিয়েটারে আঁকড়ে থাকার চেয়ে শক্তিশালী বৈপরীত্য কল্পনা করতে

প্রশ্ন : ইডিপাসীয় নকশার প্রশ্নটি বিবেচনায় নিয়ে যৌনতার নতুন রূপ, জৈবপ্রযুক্তি, পিতা-মাতার পরিচয় ইত্যাদি এই কাঠামোর উপর কতটা প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন ? এগুলো কি ইডিপাসের পতনের দিকে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি এর নীতিগুলোর পুনর্গঠনের দিকে পরিচালিত হচ্ছে ?

উত্তর : প্রথমত, আমি মনে করি না যে ইডিপাস যৌনতার সঙ্গে যথারীতি সহ-গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি অনেক আকারের মধ্যে ইডিপাস কেবল একটি আকার। আমার মতে, আসল সমস্যাটি উত্তরÑইডিপাসীয় পাঁচমিশালী পিতৃমাতৃগত পরিচয়ের এই আকারগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয় না; প্রকৃত সমস্যাটি ক্লোনিংয়ের সম্ভাবনা ও প্রজননের নতুন রূপ (কোষের কারসাজির মাধ্যমে নারীদের প্রকৃত গর্ভধারণ করার সম্ভাবনা)-এর প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠে এবং পিতৃত্বের ঐতিহ্যবাহী ধারণার সম্পূর্ণ বিলুপ্তির উপর কেন্দ্রীভূত। তাহলে এক্ষেত্রে কী হবে ?

আমি মনে করি যে অত্যন্ত মৌলিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে কারও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একদিকে, এই পুরোনো মানবতাবাদী ধারণাটি ত্যাগ করা উচিত যে, যাই ঘটুক না কেন, মানব মর্যাদার একটি নির্দিষ্ট রূপ বজায় রাখতে হবে বা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এটি কেবল সরলভাবে এক ধরনের প্রতারণা। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গোঁড়ামিপূর্ণভাবে ধরে নেয় যে, মানবতার একটি মৌলিক ধারণা কোনও না কোনওভাবে প্রচলিত সকল সামাজিক-প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্যে টিকে থাকবে। কিন্তু আমি তাদের বিপরীত ধারণাটিও মেনে নিতে পারি না, যারা মনে করেন যে এখন পর্যন্ত আমরা একটি নির্দিষ্ট পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ আছি এবং জেনেটিক কারসাজির সম্ভাবনা একটি নতুন নমনীয়তা, একটি নতুন স্বাধীনতা দেয়। আমি জানি না, ফলাফল কী হবে। আমি যা নিশ্চিত তা হলো এই যে, যদি এই প্রবণতাগুলো অব্যাহত থাকে, তাহলে মানুষ হয়ে উঠার অর্থের অবস্থাই বদলে যাবে। এমনকি সবচেয়ে প্রাথমিক বিষয়গুলো, যেমন: কথা বলা, ভাষা, আবেগীয় অনুভূতি ইত্যাদিও প্রভাবিত হবে। কিছুই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয় এবং আশাবাদী বা হতাশাবাদী হওয়াটা অবান্তর হয়ে উঠবে।

লিঙ্গগত পার্থক্যের এই মৌলিকতার কারণে—যেখানে মানবতার বোধই লিঙ্গগত পার্থক্যের মাধ্যমে নির্মিত হয়—সেক্ষেত্রে এই কাঠামোটিই যদি টিকে না থাকে, তাহলে আমি বলতে প্রায় বাধ্য হচ্ছি যে, একটি নতুন প্রজাতির আবির্ভাব ঘটবে। হয়তো এটি আর মানব প্রজাতি থাকবে না: এর সবই নির্ভর করে বাস্তবের অসম্ভাব্যতা নতুন কোন রূপ ধারণ করতে পারে তার উপর।

প্রশ্ন : আপনি বিষয়ীগততার সমকালীন আকারগুলোর বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে হরহামেশাই আকাক্সক্ষার অপূরণীয় বস্তুর (ড়নলবপঃ ঢ়বঃরঃ ধ, ড়নলবপঃ ংসধষষ ধ)  লাকাঁনীয় ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেন। আপনি কি এই অধরা (বষঁংরাব) বস্তুর কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে পারেন ?

উত্তর : মধ্য ইয়োরোপে বিক্রি হওয়া জনপ্রিয় চকলেট পণ্যগুলোর মধ্যে একটির নাম হলো কিন্ডার। একটি খালি ডিমের খোসা চকলেট দিয়ে তৈরি এবং উজ্জ্বল রঙিন কাগজে মোড়ানো; ডিমটি খুলে চকলেটের খোসাটি ভেঙে ফেলার পরে, একজন ব্যক্তি এতে একটি ছোট প্লাস্টিকের খেলনা (অথবা ছোট ছোট অংশ যা একত্র করে একটি খেলনা তৈরি করা যেতে পারে) খুঁজে পায়। এই খেলনাটি কি সবচেয়ে বিশুদ্ধতম ইচ্ছার বস্তু (ষ’ড়নলবপঃ ঢ়বঃরঃ) নয়—মাঝখানের ফাঁকা ভরা ছোট বস্তু, লুকানো ধন, অতি প্রত্যাশিত বস্তু (ধমধষসধ) ? যে শিশুটি এই চকলেট ডিম কেনে, সে প্রায় ক্ষেত্রেই ভয়ে ভয়ে এটি খুলে ফেলে এবং চকলেটটি ভেঙে ফেলে, খাওয়া নিয়ে চিন্তা না করেই, কেবল মাঝখানের খেলনাটির জন্য উত্তেজিতÑচিন্তান্বিত হয়—সে কি লাকাঁর মূলমন্ত্রের মতোই একজন চকলেটপ্রেমী যে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু, ব্যাখ্যাতীতভাবে, আমি তোমার মধ্যে এমন কিছুকে ভালোবাসি যা তোমার চেয়েও বেশি, এবং তাই, আমি তোমাকে ধ্বংস করি’-এর নিখুঁত উদাহরণ নয় ? মাঝখানের এই উপাদানগত (‘বাস্তব’) শূন্যতা, অবশ্যই, কাঠামোগত (‘আকারগত’) শূন্যস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে যার কারণে কোনও পণ্য ‘সত্যিই তা’ হয়ে উঠতে পারে না, কোনও পণ্যই তা যে প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলে তা পূরণ করতে পারে না। অন্য কথায়, ছোট প্লাস্টিকের খেলনাটি কেবল চকলেট (আমরা যে পণ্যটি কিনেছি) থেকে আলাদা নয়; বস্তুগতভাবে ভিন্ন হলেও, এটি চকলেটের শূন্যস্থান পূরণ করে, অর্থাৎ এটি চকলেটের মতো একই পৃষ্ঠে থাকে। (ফ্রান্সে, এখনও লা তেতে দ্যু নেগ্রে (নিগ্রোর মাথার মতো) এই বর্ণবাদী নামে একটি মিষ্টিজাতীয় খাবার কেনা সম্ভব: ভেতরে খালি বলের মতো চকোলেট কেক (‘নির্বোধ নিগ্রোদের মাথার মতো’ [!])—কিন্ডার ডিম এই শূন্যস্থান পূরণ করে। এর শিক্ষা হলো আমাদের সকলেরই একটি ‘নিগ্রোর মাথা’ আছে, যার মাঝখানে একটি ছিদ্র রয়েছে।) এবং এই ডিমটি সকল জিনিসের সূত্র প্রদান করে যা অনেক বেশি প্রতিশ্রুতি দেয় (‘একটি ডিভিডি প্লেয়ার কিনুন এবং বিনামূল্যে পাঁচটি ডিভিডি পান’, অথবা, আরও সরাসরি আকারে, একই রকম আরও—‘এই টুথপেস্ট কিনুন এবং বিনামূল্যে আরও এক-তৃতীয়াংশ পান’), এখানে কোকের বোতলের প্রতিষ্ঠিত কৌশল উল্লেখ না করলে অপূর্ণ রয়ে যায় (‘ধাতুর কভারের ভেতরের দিকে তাকান এবং আপনি দেখতে পাবেন যে আপনি অন্য একটি বিনামূল্যের কোক থেকে শুরু করে একটি নতুন ব্র্যান্ডের গাড়ি পর্যন্ত যে কোনও একটি পুরস্কারের বিজয়ী’): এই ‘আরও’-এর কাজ হলো ‘কম’-এর অভাব পূরণ করা, এই বিষয়টির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া যে, সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি ব্যবসায় পণ্যদ্রব্য কখনওই তার (কল্পনাপ্রসূত) প্রতিশ্রুতি পূরণ করে না। অন্য কথায়, চূড়ান্ত ‘সত্য’ ব্যবসায় পণ্যদ্রব্য হবে সেই পণ্য যার কোনও পরিপূরকের প্রয়োজন হবে না, যা কেবল তার প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণরূপে পূরণ করবে—‘আপনি যা পরিশোধ করেছেন তা পাবেন, না কম না বেশি।’ তাহলে, অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এই ডিমগুলো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ এবং কানাডা থেকে চোরাচালান করতে হবে (এবং তিন গুণ দামে বিক্রি করা হবে): সরকারি অজুহাতের পিছনে (তারা আপনাকে অন্য কোনও জিনিস কিনতে অনুরোধ করে, প্রচারিত জিনিসটি নয়), এর গভীর কারণটি সহজেই অনুধাবন করা যায়—এই ডিমগুলো একটি পণ্যের অন্তর্নিহিত কাঠামো খুব স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করে।

প্রশ্ন : এটি একটি সাধারণ লাকাঁনীয় কাঠামো যার ইতিবাচক বিষয়বস্তু নেই, কিন্তু এমন কী আছে যা একটি অসীম রূপান্তরযোগ্য শূন্যতার চারপাশে ঘুরপাক খায় ?

উত্তর : হ্যাঁ, পণ্যের এই কাঠামো ও বুর্জোয়া বিষয়ীর কাঠামোর মধ্যে কি কোনও স্পষ্ট কাঠামোগত সমতা নেই ? বিষয়ীগুলো, ঠিক যতদূর সম্ভব সর্বজনীন মানবাধিকারের বিষয়ী হিসেবে তারা কি এই কিন্ডার চকলেট ডিমের মতো কাজ করে না ? মানবতাবাদীÑ বিশ্বজনীনতাবাদীরা তেতে দ্যু নেগ্রে-এর প্রত্যুত্তরে কি ঠিক একটি কিন্ডার ডিমের মতো আচরণ করে না ? মানবতাবাদী ভাবাদর্শবাদীরা যেমনটি বলতে পারেন: আমরা অসংখ্য প্রক্রিয়ায় আলাদা হতে পারি—আমাদের মধ্যে কেউ কালো, কেউ সাদা, কেউ লম্বা, কেউ খাটো, কেউ নারী, কেউ পুরুষ, কেউ ধনী, কেউ গরিব, ইত্যাদি ইত্যাদি—তবু, আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে, প্লাস্টিকের খেলনার মতোই একই নৈতিক সমতুল্যতা রয়েছে, একই গুণ যাকে ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করা যায় না (লব হব ংধরং য়ঁড়র), একটি অধরা ‘ক’ যা কোনওভাবে সকল মানুষের দ্বারা ভাগ করা মর্যাদা বলে বিবেচিত।

দুই দশক আগে, জার্মান বামপন্থি সাপ্তাহিক জার্নাল স্টার্ন বেশ নিষ্ঠুর একটি পরীক্ষা চালিয়েছিল: এটি কয়েক জোড়া নিঃস্ব গৃহহীন মানুষকে, একজন পুরুষ ও একজন মহিলাকে অর্থ প্রদান করেছিল, যারা নিজেদেরকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, ভালভাবে ক্ষৌরকর্ম সেরে এবং তারপর শীর্ষস্থানীয় ডিজাইনার ও হেয়ারড্রেসারদের কাছে উপস্থাপন করেছিল। এর একটি সংখ্যায়, জার্নালটি তারপরে প্রতিটি ব্যক্তির দুইটি বৃহৎ সমান্তরাল ছবি প্রকাশ করেছিল। প্রথমে তাদের নিঃস্ব গৃহহীন অবস্থায়, নোংরা ও ক্ষৌরকর্মহীন মুখের সঙ্গে, এবং তারপর একজন শীর্ষ ডিজাইনারের পোশাক পরে। ফলাফলটি কার্যকরভাবে অদ্ভুত ছিল: যদিও এটি স্পষ্ট ছিল যে আমরা একই ব্যক্তিকে নিয়ে কাজ করছিলাম, বিভিন্ন পোশাক ও অন্যান্য কিছুর প্রভাব ছিল এই যে, আমাদের বিশ্বাস, বিভিন্ন চেহারার আড়ালে একজন ও একই ব্যক্তি থাকলেও তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কেঁপে উঠেছিল।  এক্ষেত্রে কেবল চেহারাই ভিন্ন ছিল না, যা ভিন্ন ছিল: চেহারার এই পরিবর্তনের গভীর বিরক্তিকর প্রভাব ছিল যে আমরা, দর্শকরা, কোনওভাবে চেহারার আড়ালে একটি ভিন্ন ব্যক্তিত্ব প্রত্যক্ষণ করেছি। পাঠকরা স্টার্ন-এর উপর চিঠির মাধ্যমে বোমাবর্ষণ করেছিল, যেখানে জার্নালটি গৃহহীন মানুষদের মর্যাদা লঙ্ঘন করেছে, তাদেরকে অপমান করেছে, তাদেরকে নিষ্ঠুর রসিকতার শিকার করেছে। তবে যাই হোক, এই পরীক্ষার মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে যা ক্ষুণ্ন করা হয়েছিল তা হলো ফ্যাক্টর ‘ক’-এর উপর বিশ্বাস, পরিচিতির মূল বিষয় যাকে আমাদের মর্যাদার জন্য বিবেচনায় নেওয়া হয় এবং চেহারার পরিবর্তনের মাধ্যমে টিকে থাকে। সংক্ষেপে, এই পরীক্ষাটি অভিজ্ঞতামূলকভাবে প্রমাণ করেছে যে আমাদের সকলেরই একটি ‘নিগ্রোর মাথা’ আছে, আমাদের বিষয়ীগততার মূল হলো চেহারা দ্বারা পূর্ণ একটি শূন্যস্থান।

তাহলে আসুন আমরা একটি ছোট শিশুর দৃশ্যে ফিরে আসি, যেখানে সে প্রচণ্ডভাবে চকলেট ডিম ছিঁড়ে ফেলে প্লাস্টিকের খেলনাটি পাওয়ার জন্য—সে কি তথাকথিত ‘সর্বাত্মকবাদিতা’র প্রতীক নয়, যেখানে সে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ঐতিহাসিক সম্বন্ধশূন্য আবরণ থেকে মুক্তি পেতে চায়, মানুষের সারবত্তাকে মুক্ত করার জন্য ? চূড়ান্ত ‘সর্বাত্মকবাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি কি পুরোনো কলুষিত মানবতার সহিংস বিনাশের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ভূত একটি নতুন মানুষ-এর দৃষ্টিভঙ্গি নয় ? কূটাভাষিকভাবে, তাহলে, উদারতাবাদ ও ‘সর্বাত্মকবাদ’ ফ্যাক্টর ‘ক’-এর উপর বিশ্বাস ভাগ করে নেয়, যা মানব চকলেট আবরণের মাঝখানে প্লাস্টিকের খেলনা।

প্রশ্ন : এটি আপনার কাজের একটি স্থায়ী মূল বিষয়বস্তুর দিকে নিয়ে যায় যে, আপনি সার্বিক ও বিশেষের সম্পর্কের উপর জোর দিয়েছেন। আপনি এই সম্পর্কটিকে কীভাবে দেখেন ?

উত্তর : লাকাঁ সম্পর্কে যা আমাকে মুগ্ধ করে এবং আমার মনে হয় তাঁকে একজন সত্যিকারের দ্বান্দ্বিকতাবাদী করে তোলে তা হলো, তিনি এই মিথ্যা বিরোধিতা এড়িয়ে যান: যেখানে বিশ্ব কীভাবে গঠিত হয় সে সম্পর্কে সর্বজনীন সত্য, অর্থাৎ পুরোনো ধাঁচের অধিবিদ্যা এবং সেই ঐতিহাসিক অবস্থান যেখানে সবকিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রোথিত এবং এরকম আরও অনেক কিছু। যথার্থ দ্বান্দ্বিকতার অর্থ হলো যে নিরেট ঐতিহাসিক সংগ্রামগুলো একই সময়ে পরম সত্তার নিজের জন্যই সংগ্রাম; যেন প্রতিটি নির্দিষ্ট যুগের নিজস্ব তত্ত্ববিদ্যা রয়েছে, যেমনটি আগেও ছিল। এটি দ্বান্দ্বিকতার যথার্থ প্রকৃতি। আর এই কারণেই আমি সবসময়ই ‘আমূল পরলোকপন্থি খ্রিষ্টীয় দৃষ্টিভঙ্গি’ পছন্দ করি, যেখানে ধারণাটি হলো যে যখন মানবতা মুক্তির জন্য, ভালোর জন্য মন্দের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তখন এটি এমন কিছু যা কেবল মানবতাকেই নয়, বরং এক অর্থে মহাবিশ্বের ভাগ্য ও স্বয়ং ঈশ্বরের ভাগ্যকেও সম্পৃক্ত করে। একই প্রক্রিয়ায়, একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সংগ্রাম হলো একই সঙ্গে সেই সংগ্রাম যেখানে সমগ্র মহাবিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। এটা বলা কেবল একটি অসত্য পছন্দ যে আমরা হয় সুনির্দিষ্ট সামাজিক বিশ্লেষণের স্তরে অগ্রসর হই—ঐতিহাসিক আপেক্ষিকীকরণ—অথবা আমরা নিজেদেরকে চিরন্তন প্রশ্নগুলোর সঙ্গে যুক্ত করি।

সমগ্র দ্বান্দ্বিক বিষয় হলো এই তথাকথিত চিরন্তন প্রশ্নগুলোকে ঐতিহাসিকীকরণ করা, কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার অর্থে নয়, বরং ঐতিহাসিকতাকে ‘পরম’-এর নিজের মধ্যে প্রোথিত করা। এটাই করা কঠিন কাজ। এবং এখানে আবার আমরা হেগেল এবং শেলিং-এর দিকে ফিরে যাই, কারণ জার্মান ভাববাদ থেকে যদি কিছু শেখার থাকে তবে তা হলো এই ‘দ্বান্দ্বিক মনোভাব’। এটি হাইডেগার এবং তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে যেখানে সত্তার প্রকাশের জন্য মানুষকে প্রয়োজন, অর্থাৎ দাসেইন (অস্তিত্বশীল থাকা) অর্থে। এর মানে হলো, সম্বন্ধশূন্য মানবতা একই সঙ্গে পরম সত্তার প্রকাশের একমাত্র স্থান।

প্রশ্ন : এটা কি বলা যায় যে, বাস্তব-এর ভাগ্যও সম্বন্ধশূন্য বিকাশের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় ? উদাহরণস্বরূপ, জৈবপ্রযুক্তির নতুন রূপগুলো তাদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই বাস্তব-এর একটি নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে।

উত্তর : লাকাঁ যাকে বাস্তবের জ্ঞান বলতেন তার সঙ্গে একটি ব্যাপক উদ্বেগ জড়িত। এবং বাস্তবের জ্ঞান গ্রহণ করা খুবই বেদনাদায়ক। যদিও আমরা জানি যে জিনগুলো আমাদের ভাগ্য নয়, এটি সবই পরিবেশের এবং এরকম আরও কিছুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। আসুন আমরা কয়েকটি ক্ষেত্রের একটি গ্রহণ করি যেখানে নিয়ন্ত্রণবাদ কমবেশি নিখুঁত: হান্টিংটনের রোগ, যেখানে জেনেটিক কোডটি খুব কমই পুনরাবৃত্তি হয় এবং আপনি লেখায় এক ধরনের ত্রুটি করেন। একজন ব্যক্তির রক্ত/জিন পুল বিশ্লেষণ করে, এখন এক বা দুই মাস পর্যন্ত ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব যে তার কখন প্রথম লক্ষণগুলো প্রকাশ পাবে এবং কখন মৃত্যু ঘটবে।

এখন এটি কেবল ভাগ্যের বিষয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ কি ‘বাস্তব’-এর এই জ্ঞানের জন্য প্রস্তুত ? একটি আকর্ষণীয় বিবরণ যা আত্মনিয়ন্ত্রণের অন্তর্নিহিত সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে তা হলো, হান্টিংটন নিজে, যদিও এই রোগটি তার নিজের পরিবারে বিদ্যমান, নিজের উপর এই পরীক্ষাটি প্রয়োগ করতে চাননি বা সাহস করেননি। তাই হান্টিংটনকে নতুন বৈজ্ঞানিক ‘বাস্তব’-এর সঙ্গে আধুনিক মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় একটি দৃষ্টান্তমূলক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা যেতে পারে। এবং এই প্রশ্নের প্রতিটি জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ আসলে জানতে চান না—একমাত্র ব্যতিক্রম হলো ছোট বাচ্চাদের মা-বাবা যাদের ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে হয়।

এটি একটি আকর্ষণীয় কূটাভাস যা সম্ভাব্যতার আরেকটি কূটাভাষের সঙ্গে যুক্ত, যা ব্যাখ্যা করে যে লাকাঁ কী বোঝান যখন তিনি দাবি করেন যে ‘অজ্ঞাতসারে আমরা সকলেই ঈশ্বরে, আমাদের অমরত্বে বিশ্বাস করি।’ আসুন আমরা একটি সংঘাতের পরিস্থিতি কল্পনা করি যেখানে আমাদের মধ্যে চারজনকে একটি কমান্ডো কাজ সম্পাদন করতে হবে। যদি আমরা চারজনই এই কাজটি সম্পাদন করি, তাহলে বাস্তবে প্রায় শতভাগ নিশ্চিত যে আমাদের অর্ধেক মারা যাবে। তাই যদি আমরা একসঙ্গে এটি করি, তাহলে আমার মৃত্যুর সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ—কিন্তু কেউ আগে থেকে জানে না যে কে মারা যাবে।

বিকল্পভাবে, আরেকটি সম্ভাবনা হলো আমাদের মধ্যে কেউ নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে: উদাহরণস্বরূপ, একটি আত্মঘাতী বোমা হামলা। সেই ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই মারা যাবে, কিন্তু এইভাবে আমাদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ মারা যাবে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আপনি কী করবেন ? আমরা কি ৫০ শতাংশ মৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে একসঙ্গে এটি করি, কিন্তু কে মারা যাবে তার কোনও জ্ঞান ছাড়াই ? নাকি আমরা লটারি করেই সিদ্ধান্ত নিই যেখানে মৃত্যুর সম্ভাবনা মাত্র ২৫ শতাংশ হয়, কিন্তু সেক্ষেত্রে আপনি অন্তত আগে থেকেই জানতে পারবেন যে, কে মারা যাবে ? বাস্তবে সবাই প্রথম সম্ভাবনাটি বেছে নেয়, কারণ ‘আপনি মারা যাবেন’ সেটা নিশ্চিতভাবে জানাটা অনেক ভয়ানক। আপনি সেই আশাটি রাখতে চান। এটি ঈশ্বরের সঙ্গে আমাদের বিশেষ সম্পর্কের প্রতি আমাদের গোপন বিশ্বাসের একটি ভাল লাকাঁনীয় উদাহরণ। এখানে আমরা কল্পনার কাজটি দেখতে পাই।

প্রশ্ন : এবং কল্পনাপ্রসূত প্রক্রিয়াটি এই ধরনের বাস্তব-পরিপ্রেক্ষিতে-জ্ঞান পরিস্থিতির সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট পুনরাবৃত্তির সুযোগ করে দেয় ?

উত্তর : একটি নির্দিষ্ট পর্যায় গিয়ে, যদিও এখানে যথেষ্ট জটিলতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জেনেটিক গোলযোগ (ফরংড়ৎফবৎ)-এর একটি কাল্পনিক সমাধান কী হবে ? ধরুন আমার পরিবারে হান্টিংটনের রোগ হলে এবং এটি আমার হওয়ারও একটি নিশ্চিত সম্ভাবনা রয়েছে। আমি কী করব ? এটি একটি কল্পনা, কিন্তু ধরা যাক যে আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে, যিনি একজন ডাক্তার, যার কাছে প্রয়োজনীয় সকল বিষের সহজলভ্যতা রয়েছে। আমি তাকে পরীক্ষাটি প্রয়োগ করতে বলব কিন্তু আমাকে কিছু বলতে বলব না—ফলাফলটি কেবল তিনিই জানতে পারবেন যে আমার রোগটি আছে কি না। যদি এটি ইতিবাচক হয়, তাহলে অসুস্থতা শুরু হওয়ার এক বা দুই মাস আগে সে আমার অজান্তেই আমার খাবারে বিষ মিশিয়ে দেবে। আমার জন্য, এটি সম্ভবত নিখুঁত কল্পিত সমাধান হবে: আমি কিছুই জানি না, এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমি স্বাভাবিকভাবেই আনন্দের সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ব এবং আর জাগবো না।

কিন্তু এটি লাকাঁনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করে না; কারণ লাকাঁর জন্য সবচেয়ে সমস্যাযুক্ত প্রকরণটি কেবল জ্ঞান নয়, বরং অন্যের জ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞান। আমি মনে করি এটিই লাকাঁর মৌলিক শিক্ষা। এটি কেবল আপনি যা জানেন তা নয়, বরং আপনি জানেন যে অন্যজন জানে। অন্যজনের জ্ঞান আপনাকে সবসময় বিরক্ত করবে, আপনাকে আঘাত করবে।

প্রশ্ন : আপনি হয়তো আপনার বন্ধুর কাছ থেকে ডিনারের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন বোধ করতে পারেন ?

উত্তর : হ্যাঁ, আপনি এই সত্যটি মুছে ফেলতে পারেন না যে অন্যরা জানে। তাই আবারও, এখানে একমাত্র নিখুঁত সমাধান ছিল এমন কিছু অজ্ঞাত রাষ্ট্রীয় সংস্থা থাকা যা আমাদের সকলের জন্য এটি করে এবং আমাদের কেউই সেটা জানে না। কিন্তু অবশ্যই এটি একটি নিখুঁত সর্বাত্মকবাদী কল্পনা, তাই না ?

স্কোরসেসি-এর এইজ অফ ইনোসেন্স এ উন্মোচন করা পরিস্থিতিকে আমি এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে তুলে ধরতে চাই, যেখানে একজন পুরুষ তার স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণা করছে এই ভেবে যে সে [স্ত্রী] এটা জানে না। কিন্তু যখন সে [পুরুষ] জানতে পারে যে সে [স্ত্রী] সবসময় এটা জানত, তখন এটি সবকিছু নষ্ট করে দেয়। যদিও কার্যকরভাবে কোনও কিছুই পরিবর্তন হয়নি, তুমি এখন যা জানো তা হলো সে [স্ত্রী] সবসময় জানত, তাই পরিস্থিতি অত্যন্ত অপমানজনক হয়ে উঠে। তাই আবারও বলছি, অন্যরা যা জানে তা জানা, অন্যরা জানে—এ বিষয়টি জানা, একটি অত্যন্ত জটিল দ্বান্দ্বিক প্রকরণ।

প্রশ্ন : বিজ্ঞান ও প্রগতির ঐতিহ্যবাহী আলোকায়ননির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির উপর বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের নতুন রূপগুলো কতটা প্রভাব ফেলবে ?

উত্তর : এখানে কূটাভাসের মূল বিষয়টি হলো সেই প্রক্রিয়া যে প্রক্রিয়ায় হ্যাবারমাসের মতো ঐতিহ্যপন্থি দার্শনিকরা প্রচলিত মানবতাবাদী ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। জৈবজিনবিদ্যা কীভাবে নীতিগত প্রশ্ন ও গুরুত্বপূর্ণ আলোকায়নভিত্তিক বিষয়গুলোর উপর প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে হ্যাবারমাস সম্প্রতি একটি সম্মেলন করেছেন। আমি মনে করি তার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়, তবে এটি গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণও। হ্যাবারমাসের থিসিস হলো যে, যদি কোনও ব্যক্তির জৈবিক উত্তরাধিকার মূলসূত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হয় অর্থাৎ তার মানসিক/শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব হয়, তাহলে এটি সম্ভাব্যভাবে আমাদের স্বশাসন, স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ইত্যাদির বোধকে দুর্বল বা নাজুক করে দেয়।

হ্যাবারমাস ঠিকই বলেছেন যে, সভ্যতার প্রভাব হিসেবে শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী ধারণাকে উপড়ে ফেলা যায়। যদি কেউ অশিক্ষিত হয়, অর্থাৎ পড়তে না পারার অর্থে নয়, বরং অতিশয় বন্য ও অসভ্য হওয়ার অর্থে, তাহলে নৈতিক সংগ্রামের পুরো ধারণাটি হলো এই যে, তারা জানেন কীভাবে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়; কীভাবে সভ্য হয়ে উঠতে হয়। কিন্তু যদি বিজ্ঞানীরা একজন ব্যক্তির জেনেটিক কোডে হস্তক্ষেপ করেন এবং তাদেরকে কম হিংস্র ও আরও অনুগত করে তোলেন, তাহলে ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে নৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে শিক্ষাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া যায়, এটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। সুতরাং হ্যাবারমাসের প্রথম বক্তব্য হলো, ব্যক্তিকে একজন স্বশাসিত কর্তাসত্তা হিসেবে অবমাননা করা হয়। তাঁর দ্বিতীয় বক্তব্য হলো যে আন্তঃবিষয়ীগত সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রেও আপস করতে হবে এবং আমরা দুটি শ্রেণির মনুষ্য সত্তা পেতে পারি: যারা ঐতিহ্যগত অর্থে পরিপূর্ণ ‘মানব’, এবং যাদের জেনেটিক কোডগুলো হেরফের করা হয়েছে এবং যারা উপ-অথবা অতি-মানব হিসেবে বিবেচিত হবে। হ্যাবারমাস মনে করেন যে, একটি সঠিক নৈতিক সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সমতা ও কার্যকর প্রতিসাম্যের শর্তগুলোকে এটি ধ্বংস করবে। ফলস্বরূপ, মানব সমষ্টির ধারণা এবং অবিকৃত যোগাযোগের মাধ্যমে সমতার একটি গণতান্ত্রিক গোষ্ঠী গঠনের সম্ভাবনা ব্যাহত হবে। এটাই হলো আসল হুমকি।

আমি হ্যাবারমাসের সঙ্গে একমত যে জৈব জেনেটিক্স একটি হুমকি তৈরি করে; কারণ, আমরা সকলেই জানি, জৈব জেনেটিক্স মানে প্রকৃতির শেষ। অর্থাৎ, প্রকৃতি নিজেই এমন কিছু হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে যা কিছু নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করে যাকে পরিবর্তন করা যেতে পারে। প্রকৃতি একটি প্রযুক্তিগত পণ্য হয়ে উঠে যা তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রাকৃতিক চরিত্র হারায়। এবং হ্যাবারমাস ঠিকই উল্লেখ করেছেন যে কেবল এই প্রাকৃতিক স্বতঃস্ফূর্ততার পটভূমিতে মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদার আধুনিক ধারণাগুলো কাজ করার প্রবণতা তৈরি করেছে। কিন্তু মূলত, হ্যাবারমাসের সমাধান হলো মৃত্যু: যেহেতু জৈব জেনেটিক্স হেরফেরের কৌশল আমাদের স্বশাসন ও স্বাধীনতার ধারণাগুলোকে প্রভাবিত করে, তাই আমাদের এটিকে নিষিদ্ধ করা উচিত, প্রতিহত করা উচিত।

আমার মনে হয় এই সমাধানটি কাজ করবে না, কেবল এই অশ্লীল কারণেই নয় যে মানুষ যেভাবেই হোক এটা করবে, বরং একবার আমরা যদি জানতে পারি যে জিনগুলোকে হেরফের করে কাজে লাগানো যেতে পারে, তাহলে আপনি সেই জ্ঞানকে বাতিল করতে বা অকেজো করে দিতে পারবেন না। এটি একটি জাল, এক ধরনের কল্পপূজনীয় বিভাজন হয়ে উঠতে পারে যেখানে আপনার পরিস্থিতি হবে জিনকে কীভাবে কাজে লাগাতে হয় তা জানার পাশাপাশি স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য এটি না জানার ভান করে থাকা। সুতরাং এখানে  কূটাভাসটি হলো যে, মহান আলোকায়ন-অনুসারী হ্যাবারমাস মূলত ‘না জানাই ভালো’ এই পুরোনো ক্যাথলিক কৌশল গ্রহণ করেন: মানব মর্যাদা রক্ষা করার জন্য, আসুন আমরা খুব বেশি অনুসন্ধান না করি। কূটাভাসিকভাবে, হ্যাবারমাসকে আলোকায়নবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে।

প্রশ্ন : এই আলোকায়নবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতা ও স্বশাসনের একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি কি তৈরি করা যেতে পারে ?

উত্তর : হ্যাবারমাসের রক্ষণশীলতা উদ্ভূত হয়েছে স্বাধীনতা ও স্বশাসনের একটি আদর্শ ধারণা থেকে। ধারণাটি হলো, যেহেতু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এই ধারণাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে, তাই আসুন আমরা কেবল এই অগ্রগতিগুলোকে বাধাগ্রস্ত করি। এর সঙ্গে আমি যে সমস্যাটি দেখতে পাচ্ছি তা হলো, আমরা যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতাগুলোর অভিজ্ঞতা লাভ করি তা সম্পূর্ণরূপে আনুষঙ্গিক অর্থহীন জেনেটিক সঞ্চয়ন দ্বারা নির্ধারিত হয়। তাই কূটাভাসটি হলো: মানুষের স্বশাসন, মর্যাদা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য, হ্যাবারমাস আমাদের স্বাধীনতাকে (বিশেষ করে, বিজ্ঞানের মাধ্যমে আমাদের নিজেদেরকে হেরফের করার স্বাধীনতা) সীমাবদ্ধ করতে চান। যাই হোক, এই সীমাবদ্ধতা কাজ করে না। আমি যদি আপনার জেনেটিক উত্তরাধিকারকে হেরফের করতে পারি তাহলে আপনি স্বাধীন নন; কিন্তু একবার যদি আমার জিনগত হেরফেরের সম্ভাবনার বিষয়টি সম্পর্কে আপনি জেনে যান তাহলে সেক্ষেত্রেও আপনি আপনার স্বাধীনতা হারাবেন। তাহলে আপনার কেন আরও বেশি স্বাধীন হতে হবে যদি আপনি জানেন যে এটি হলো বিশুদ্ধ নির্বোধ প্রাকৃতিক আনুষঙ্গিকতা যা নির্ধারণ করে দেয় যে, আপনি কী ? এক্ষেত্রে যে মুহূর্তে জৈবজিনগত হেরফেরের সম্ভাবনা দেখা দেয় সে মুহূর্তে আদর্শ চিরায়ত অর্থে স্বাধীনতা হারিয়ে যায়। হ্যাবারমাস এখানেই ব্যর্থ হয়ে যান, এবং এটি তাদের জন্য একটি অবাক করা বিষয় যে যারা নিজেকে আলোকায়নের একজন বৃহৎ অংশীজন বলে দাবি করেন, তারা পুরোনো রক্ষণশীল ধারণাটি পুনরাবৃত্তি করেন যে, স্বাধীনতা ধরে রাখার জন্য আমাদের জ্ঞানকে সীমিত করতে হবে—নৈতিক স্বাধীনতা, মর্যাদা, স্বশাসনের শর্ত হলো আপনি বস্তুনিষ্ঠভাবে কী, সে সম্পর্কে খুব বেশি কিছু না জানা।

যে প্রশ্নটির সমাধান করা সত্যিই প্রয়োজন তা হলো, আমরা কি আসলেই জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ? সরল ভাষায় বলতে গেলে, আমাদের জিনোমের পূর্ণ সংজ্ঞা ও জৈবজিনগত সূত্রের সম্ভাবনার মুখে কি মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব ? এখানে আমি যে প্রকৃত দার্শনিক চ্যালেঞ্জটি দেখতে পাচ্ছি তা হলো, জেনেটিক জ্ঞানের প্রেক্ষাপটে মানব স্বাধীনতার ধারণাটিকে পুনর্গঠন করা, এবং আমরা এখনও কোন অর্থে স্বাধীন থাকব, স্বশাসন বলতে কী বোঝায় ইত্যাদি বিকশিত করা। আমি মনে করি এটি সঠিকভাবে মনোবিশ্লেষণের মাধ্যমে এবং বিশেষ করে ‘মৃত্যুর চালনাশক্তি’র ধারণার মাধ্যমে করা যেতে পারে। মৃত্যুর চালনাশক্তি এমন কিছু নয় যা আমাদের জিনে রয়েছে; মৃত্যুর চালনাশক্তির জন্যও কোনও জিন নেই। যদি কিছু থাকে, তাহলে তা হলো মৃত্যুর চালনাশক্তি হলো একটি জিনগত বিচ্যুতি।

প্রশ্ন : এবং একটি জিনগত বিচ্যুতি হিসেবে, মৃত্যুর চালনাশক্তি সম্ভবত এমন কিছু নয় যাকে ক্লোন করা যেতে পারে ?

উত্তর : এখানে সমস্যাটি ক্লোনিং নিয়ে নয়, বরং যা ক্লোন করা যায় না তার সঙ্গে সংঘর্ষের। ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে, আমরা সকল পুরোনো কূটাভাসকে দ্বৈতভাবে পাই। ধরা যাক, এই স্বাভাবিক পরিস্থিতির কথা: মা-বাবার একটি সন্তান মারা গেছে এবং তারা এই সন্তানের একটি কপি পেতে চান। কিন্তু আমার মনে হয় পরিস্থিতি আসলে ভয়াবহ হয়ে উঠবে। এই ক্লোনের মাধ্যমে, আপনি এমন একজনকে পাবেন যে দেখতে, কথা বলতে ও আচরণ করতে একেবারে প্রথম সন্তানের মতোই, কিন্তু আপনি জানবেন যে, ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে সে আপনার প্রথম সন্তান নয়। আমার মনে হয় দ্বিতীয় সন্তানটি একটি ভয়াবহ অধিগ্রহণের মতো অভিজ্ঞতা লাভ করবে: তার বিশুদ্ধতম দ্বৈততার সঙ্গে সাক্ষাৎ। এটা হবে সেই পুরোনো মার্কস ভাইদের রসিকতার মতো, যা নাইট অ্যাট দ্য অপেরা-এর শুরুতেই দেখা যায়, যখন গ্রুচো একজন সাধারণ যৌতুকপ্রেমীকে প্রলুব্ধ করে এবং বলে: ‘তোমার চোখ, তোমার নাক, তোমার সবকিছু, আমাকে তোমার কথা মনে করিয়ে দেয়… সবকিছু ছাড়াই কেবল তুমি!’ পরিস্থিতিটা এমনই হবে। তাই আমার মনে হয় ক্লোনিং ও জৈব জিনবিদ্যার এই সকল সম্ভাবনা আমাদেরকে মৌলিক দার্শনিক সমস্যার মুখোমুখি করে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আমরা ‘দার্শনিক সমস্যার’ মুখোমুখি হতে বাধ্য হই।

প্রশ্ন : আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ভার্চুয়াল বাস্তবতা হিসেবে বাস্তবতার ক্লোনিংয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বাস্তবতা ও ভার্চুয়াল বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে অনুধাবন করা উচিত ?

উত্তর : প্রথমত, আমি মনে করি না যে ভার্চুয়ালাইজেশন যতটা সহজ মনে হয়, ততটা সহজ। ডিজিটালাইজেশন আমাদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা প্রযুক্তির মধ্যে খোদাই করা নেই। আমার মনে হয় ভার্চুয়ালাইজেশনের প্রথম পাঠটি হেগেলীয়। ব্যাপারটি এরকম নয় যে আগে বাস্তবতা ছিল না এবং এখন আমরা ভার্চুয়াল বাস্তবতায় আছি, বরং ভূতাপেক্ষভাবে আমরা শিখি যে তাৎক্ষণিক (অথবা মধ্যস্থতাহীন) অভিজ্ঞতার অর্থে কখনও ‘বাস্তবতা’ ছিল না। ভূতাপেক্ষভাবে, ভার্চুয়ালাইজেশন আমাদের সচেতন করে তোলে যে কীভাবে প্রতীকী মহাবিশ্ব সর্বদা ইতিমধ্যেই ন্যূনতমভাবে ভার্চুয়াল ছিল এই অর্থে যে প্রতীকী পূর্বধারণার একটি সম্পূর্ণ সেট আমরা বাস্তবতা হিসেবে যার অভিজ্ঞতা লাভ করি তা নির্ধারণ করে দেয়। আমরা বাস্তবতা হিসেবে এমন কোনও কিছুর সরাসরি অভিজ্ঞতা লাভ করি না, এবং এই কারণে ‘বাস্তব’, ঠিক অরূপান্তরিত ‘বাস্তব’-এর অর্থে, ছায়ামূর্তি ও কল্পনা হিসেবে অভিজ্ঞতায় আসে; যা বাস্তবতার সঙ্গে একীভূত হতে পারে না।

যদি আমরা ভার্চুয়াল বাস্তবতা বনাম প্রকৃত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিই, তাহলে ‘বাস্তব’কে প্রকৃত বাস্তবতার সেই অংশ হিসেবে কল্পনা করা উচিত নয় যাকে ভার্চুয়ালাইজ করা যায় না। এক্ষেত্রে ভার্চুয়ালাইজেশনের জন্য, আমাদের আরও মৌলিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে হবে : বাস্তবতার ভার্চুয়ালাইজেশন কীভাবে আদৌ সম্ভব ? বাস্তবতার নিজের মধ্যেই ভার্চুয়ালাইজেশনের জন্য একটি স্থান কীভাবে আবির্ভূত হতে পারে ? একমাত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তর হলো, লাকাঁনীয় ভাষায় বলতে গেলে, বাস্তবতা নিজের মধ্যে নিজেই সবকিছু নয়; বাস্তবতার মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট ফাঁকা রয়েছে এবং ফ্যান্টাসিই বাস্তবতার এই ফাঁকাটি পূরণ করে। ভার্চুয়ালাইজেশন ঠিকঠাকভাবে সম্ভব হয়ে উঠে, কারণ ‘বাস্তব’ বাস্তবতার মধ্যে একটি ফাঁকা তৈরি করে দেয় যা তারপর ভার্চুয়ালাইজেশন দ্বারা পূরণ করা হয়।

আরও ধ্রুপদী সরল দার্শনিক পরিভাষায় বলতে গেলে, প্রকৃত সমস্যাটি এই নয় যে, আমরা কীভাবে অবভাস থেকে বাস্তবতায় পৌঁছাই, তার চেয়ে বরং কীভাবে অবভাসের মতো কিছু বাস্তবতার মধ্যে আবির্ভূত হতে পারে ? বাস্তবতা কীভাবে নিজেকে একটি অবভাসের মধ্যে যুগ্মদ্বৈত করতে পারে ? একমাত্র সমাধান হলো হেগেলীয়-লাকাঁনীয় সমাধান: কারণ বাস্তবতার নিজেরই অবভাসের প্রয়োজন, বাস্তবতা নিজেই সবকিছু নয়। অবভাস ঠিক কোনও গৌণ-ঘটনা [পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া] নয়। অবভাস বাস্তবতার মধ্যে অন্তর্জাত। অন্য কথায়, ‘বাস্তব’ বাস্তবতার ব্যর্থতা বা অসঙ্গতি হিসেবে টিকে থাকে যা অবভাসের মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। অবভাস গৌণ নয়; বরং, এটি এমন স্থান থেকে উদ্ভূত হয় যা বাস্তবতার মধ্যে থাকে না।

প্রশ্ন : স্পষ্ট হওয়ার জন্য বলছি: যুক্তিটি কেবল এই নয় যে বাস্তবতা কখনওই নিজের সঙ্গে মিলিত হতে পারে না—যেখানে বাস্তবতার অন্তর্নিহিত ফাঁকার কারণে অবভাস, অথবা ভার্চুয়ালাইজেশন সবসময় সম্ভব—কিন্তু এটিও সত্য যে ‘বাস্তব’ ছাড়া বাস্তবতা নিজেই অসম্ভব ?

উত্তর : আমি এমনকি দাবি করতে প্রলুব্ধ যে ‘বাস্তব’-এর এই ধারণা এবং কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যায় বিদ্যমান মহাজাগতিক অনুমানের ফলাফলের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পুনরাবৃত্তি রয়েছে যেখানে খুব সাধারণ পর্যায় থেকে আপনার এই ধারণাটিও হতে পারে যে, এর সামগ্রিকতার বাইরে থেকে দেখলে, মহাবিশ্ব একটি শূন্যতা। এটিই বস্তুবাদী অবস্থান যাকে দেল্যুজ সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিবাদ (ঢ়বৎংঢ়বপঃরারংস) বলেছিলেন। এর মানে এই নয় যে বাস্তবতা নেই, যেহেতু সবকিছুই কেবল একটি বিষয়ীগত দৃষ্টিভঙ্গি; এটি এর চেয়েও বেশি মৌলিক। আমরা যদি একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি জিনিসকে উপলব্ধি করি, আমাদের তাৎক্ষণিক সংবেদন এটি হতে পারে যে ঐ প্রত্যক্ষণটি বস্তুটি নিজেই কী সে সম্পর্কে একটি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্গত। কিন্তু সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিবাদের আরও মৌলিক উপসংহার হলো এই যে, আপনি যদি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিটি সরিয়ে ফেলেন, তাহলে আপনি জিনিসটিকেই হারাবেন। বাস্তবতা নিজেই একটি নির্দিষ্ট বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির ফলাফল।

এই বিকৃতির বাইরে কোনও ইতিবাচক বাস্তবতা নেই। এই অন্তর্দৃষ্টি—এবং এখানে, হে ঈশ্বর, আমি প্রায় নতুন যুগে প্রবেশ করব—মহাযান বৌদ্ধমতের প্রতিষ্ঠাতা নাগার্জুনের মধ্যে কিছুটা হলেও উপস্থিত রয়েছে। নাগার্জুন যে যুক্তি দেন তা হলো এই যে, বৌদ্ধধর্ম যেখানে ফাঁকার—শূন্যতা (অভাব/অবিদ্যমানতা) ধারণাকে সমর্থন করে; সেখানে সরল অর্থে এটি কিছুই নয় মানে এই নয় যে; কিছুই নেই। ধারণাটি হলো, বরং এই যে, প্রতিটি ইতিবাচক সত্তা একটি বিচ্যুত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত হয় এবং শূন্যতা এর থেকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বা স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল থাকে। বস্তুনিষ্ঠভাবে শূন্যতা বিদ্যমান থাকে, এবং সত্তা কেবল দৃষ্টিভঙ্গিগত পৃথকীকরণের ফলাফল হিসেবে আবির্ভূত হয় যেখানে প্রতিটি পৃথকীকরণ একটি আংশিক বিকৃতি।

এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে লেনিন তাঁর ম্যাটেরিয়ালিজম অ্যান্ড এমপিরিও-ক্রিটিসিজম বইয়ে কোন অর্থে বস্তুবাদী হতে চেয়েছিলেন: তিনি মনের ধারণা নিয়ে আচ্ছন্ন ছিলেন, যা বাইরে বিদ্যমান বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। যাই হোক, এই ধারণাটি একটি লুকানো ভাববাদের উপর নির্ভর করে, কারণ আমাদের প্রক্ষেপণের বাইরে যে বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা রয়েছে তা এই ধারণাটি ধরে নেয় যে আমাদের মন, যা বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে, এই বাস্তবতার বাইরের একটি দৃষ্টি হিসেবে কাজ করে। সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিবাদ এই ধরনের যে কোনও দৃষ্টিকে প্রত্যাখ্যান করে। মূল কথা এই নয় যে আমাদের মনের বাইরে কোনও বাস্তবতা নেই, বরং মূল কথা হলো  এই যে, বাস্তবতার বাইরে কোনও মন নেই। বাস্তবতার বিকৃতি ঘটে কারণ আমাদের মন বাস্তবতার অংশ। তাই যখন লেনিন দাবি করেন যে আমরা কেবল একটি অন্তহীন অনন্তস্পর্শী অনুমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার কাছে পৌঁছাতে পারি, তখন তিনি যা এড়িয়ে যান তা হলো বাস্তবতার ক্ষেত্রে আমাদের বিচ্যুতি ঘটে, কারণ আমরা বাস্তবতার অংশ এবং তাই এর প্রতি আমাদের কোনও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নেই: আমাদের উপলব্ধি বাস্তবতাকে বিকৃত করে, কারণ প্রত্যক্ষণকারী প্রত্যক্ষিত বিষয়ের অংশ। এটাই হলো সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিবাদ যাকে, আমি মনে করি, একটি ‘মৌলিক বস্তুবাদী অবস্থান’ ধারণ করে।

বস্তুবাদের প্রকৃত সূত্র এই নয় যে আমাদের বিকৃত ধারণার বাইরেও কিছু ‘অতীন্দ্রিয় বাস্তবতা’ আছে। একমাত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ বস্তুবাদী অবস্থান হলো যে জগৎটি ‘অস্তিত্বহীন’—শব্দটির কান্টীয় অর্থে, একটি স্বআবদ্ধ সমগ্র হিসেবে। একটি ইতিবাচক মহাবিশ্ব হিসেবে জগৎকে ধারণা করা হলে তা একজন বহিরাগত পর্যবেক্ষক পূর্বানুমান করে নেয়, এমন একজন পর্যবেক্ষক যিনি এতে আটকা পড়েন না। যে অবস্থান থেকে আপনি জগৎকে ‘একটি স্বআবদ্ধ সমগ্র’ হিসেবে উপলব্ধি করতে পারেন তা হলো একজন বহিরাগত পর্যবেক্ষকের অবস্থান। অর্থাৎ কূটাভাষিকভাবে, এই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিবাদই আমাদেরকে একটি সত্যিকারের বস্তুবাদী অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করে। তবে ব্যাপারটা এমন নয় যে জগৎ আমাদের মনের বাইরে অস্তিত্বশীল, কিন্তু আমাদের মনও বিশ্বের বাইরে অস্তিত্বশীল নয়। লেনিন ‘ভুল’ বিষয়টির উপর জোর দিয়েছিলেন। বস্তুবাদের সমস্যাটি ‘বাস্তবতা কি বাইরে অস্তিত্বশীল ?’ নয়, সমস্যাটি হলো ‘আমাদের মন কি অস্তিত্বশীল ?’ আমার মন কীভাবে অস্তিত্বশীল এবং বাস্তবতার সঙ্গে এটি কীভাবে অন্তর্জাতভাবে রয়েছে ?

প্রশ্ন : তবু, এখানে একটি নির্দিষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও (ভূতাপেক্ষভাবে) আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ‘বাস্তব বাস্তবতা’ সর্বদা একটি নির্দিষ্ট অর্থে ভার্চুয়াল ছিল, আপনি (দ্য প্লাগ অব ফ্যান্টাসিস-এ) এই ধারণার বিরুদ্ধে যুক্তি দেন যে বাস্তব বাস্তবতাকে ভার্চুয়াল বাস্তবতার আরেকটি ‘জানালা’ হিসেবে বোঝা উচিত; যেন ভার্চুয়াল বাস্তবতা বৃহৎভাবে লিখিত হয়।

উত্তর : হ্যাঁ, যা এড়িয়ে চলা দরকার তা হলো এই ধারণা যে বাস্তব বাস্তবতা, বলতে গেলে, ভার্চুয়াল বাস্তবতার সমাহারের মধ্যে কেবল একটি; অথবা, যেমনটি কখনও কখনও বলা হয়, সেই বাস্তবতা হলো আরও একটি কম্পিউটার উইন্ডো। এখানে আমরা বাস্তবতার দুটি সমান ভুল ধারণার মধ্যে একটি মিথ্যা বিরোধের মুখোমুখি হই: হয় আমাদের ভার্চুয়াল মহাবিশ্বের বাইরে বাস্তবতার পূর্ণতা আছে, অথবা কোনও বাহ্যিক বাস্তবতা নেই এবং ‘বাস্তব’ জীবন কেবল আরেকটি উইন্ডো। এগুলোই হলো একই মুদ্রার দুটি দিক, দুটি প্রলোভন যা প্রতিহত করতে হবে।

এই মিথ্যা বিরোধিতা সাধারণত সাইবারস্পেস সম্পর্কে আশাবাদী ও হতাশাবাদী উভয় মনোভাবের মূলে রয়েছে। একদিকে, সাইবারস্পেসকে প্রোটো-কমিউনিস্ট ঐক্যের একটি নতুন ফ্যাশনপ্রদর্শী ক্ষেত্র হিসেবে উদ্যাপন করার প্রবণতা রয়েছে যেখানে মানুষ ভার্চুয়াল সত্তায় রূপান্তরিত হবে, যারা একটি অংশীদারমূলক পরিসরে অবাধে বিচরণ করবে—এটি আধ্যাত্মিক― জ্ঞানকেন্দ্রিক (এহড়ংঃরপ) ভাববাদের একটি রূপ। অন্যদিকে, প্রযুক্তিগত রক্ষণশীলরা রয়েছেন যারা সাইবারস্পেসকে কেবল একটি মায়াময় ফাঁদ হিসেবে দেখেন যা মানুষের সম্ভাবনা এবং প্রকৃত স্বাধীনতা ও স্ব-শাসন চর্চার সক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করে। তার চেয়ে বরং, এটিই হলো সেই প্রামাণিকতার ধারণা যা অধ্যাসমূলক। হুবার্ট ড্রেইফাস এই ধরনের প্রামাণিকতার একটি উদাহরণ। যেহেতু আমাদের অভিজ্ঞতার চূড়ান্ত উৎস হলো বাস্তব-জীবনÑজগৎ, তাই সাইবারস্পেস কার্যকলাপ যা পরবর্তীকালের আত্মÑ বিচ্ছেদ (অঙ্গচ্ছেদ) বা বিপর্যয়ের প্রতি আকর্ষণ ইত্যাদির মতো পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের সংযোগ বিঘ্নিত করে, যে ঘটনাগুলোকে ‘বাস্তব’-এ ফিরে যাওয়ার জন্য অনেক মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে বোঝা উচিত। কিন্তু, আবার, যা স্থানচ্যুত করা দরকার তা হলো চূড়ান্ত জীবনজগৎ হিসেবে ‘বাস্তব’-এর ধারণা। লাকাঁনীয় ‘বাস্তব’ হলো যথার্থভাবে ‘বাস্তবতার চেয়েও বেশি বাস্তব’; যেমন, এটি বাস্তবতার বিভাজনে হস্তক্ষেপ করে।

প্রশ্ন : ঠিক কোন অর্থে ‘বাস্তব’ ভার্চুয়ালিটির পক্ষে এবং ‘বাস্তব বাস্তবতার’ বিপক্ষে ?

উত্তর : আমি এখানে ব্যথার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে চাই। বাস্তবতার ভার্চুয়ালাইজেশন এবং অসীম ও অফুরন্ত শারীরিক যন্ত্রণার উত্থানের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। জৈব জেনেটিক্স ও ভার্চুয়াল বাস্তবতা কি নির্যাতনের নতুন ‘বর্ধিত’ সম্ভাবনা, ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন ও অশ্রুত দিগন্ত উন্মোচন করে না (ব্যথা সহ্য করার জন্য আমাদের সংবেদনশীল ক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে এবং সর্বোপরি, সংবেদনশীল উপলব্ধি এড়িয়ে ব্যথাসংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের কেন্দ্রগুলোকে সরাসরি আক্রমণ করে ব্যথা আরোপের নতুন রূপ আবিষ্কার করে) ? সম্ভবত নির্যাতনের শিকার ‘মৃত্যু হয়নি এমন’ একজন ব্যক্তির চূড়ান্ত সেইডিয়ান চিত্র, যিনি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পালানোর সুযোগ না পেয়ে অবিরাম ব্যথাও সহ্য করতে পারেন, তিনিও বাস্তবতায় পরিণত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। এই ধরনের একটি সঞ্চয়ন (পড়হংঃবষষধঃরড়হ), চূড়ান্ত বাস্তব/অসম্ভব ব্যথা আর বাস্তব শরীরের ব্যথা থাকে না, বরং ভার্চুয়াল বাস্তবতার কারণে সৃষ্ট ‘পরম’ ভার্চুয়াল-বাস্তব ব্যথা হয়ে উঠে যেখানে আমি নড়াচড়া করি (এবং, অবশ্যই, একই কথা যৌন আনন্দের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য)। আমাদের নিউরনের সরাসরি হেরফের হওয়ার সম্ভাবনা আরও ‘বাস্তব’ দৃষ্টিভঙ্গির দ্বার উন্মোচন করে: যদিও আমরা যে বাস্তবতায় বাস করি তার অংশ হওয়ার অর্থে ‘বাস্তব’ নয়, এই ব্যথা হলো ‘অসম্ভব-বাস্তব’। আর আবেগের ক্ষেত্রেও কি একই কথা প্রযোজ্য নয় ? হিচককের আবেগের সরাসরি হেরফের সম্পর্কে স্বপ্নের কথা মনে করতে পারেন: ভবিষ্যতে, একজন পরিচালককে আরও জটিল সত্তাখ্যান তৈরি করতে হবে না এবং দর্শকের মধ্যে সঠিক আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করার জন্য সেগুলোকে একটি বিশ্বাসযোগ্য হৃদয়বিদারক উপায়ে চিত্রিত করতে হবে না; তিনি দর্শকের মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত একটি কি-প্যাড ব্যবহার করবেন, যাতে, যখন তিনি সঠিক বোতাম টিপবেন, তখন দর্শক দুঃখ, আতঙ্ক, সহানুভূতি, ভয়… অনুভব করবেন। তিনি বাস্তবে এগুলো এমন পরিমাণে অনুভব করবেন যা ‘বাস্তব জীবনে’র পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা যায় না এমন ভয় বা দুঃখের কারণ হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে ভার্চুয়াল বাস্তবতার থেকে আলাদা করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: ভয় জাগানো হয় ভার্চুয়াল ছবি ও শব্দ তৈরি করে নয় যা মূলত ভয়কে উসকে দেয়, বরং সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে যা উপলব্ধির স্তরকে সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করে যায়। এটি, কৃত্রিম ভার্চুয়াল পরিবেশ থেকে ‘বাস্তব জীবনে ফিরে আসা’ নয়, এটি মূলত আমূল ভার্চুয়ালাইজেশন দ্বারাই সৃষ্ট ‘বাস্তব’। আমরা এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বিশুদ্ধভাবে অনুভব করি তা হলো বাস্তবতা ও ‘বাস্তব’-এর মধ্যে ব্যবধান: ধরা যাক, সরাসরি স্নায়ুকেন্দ্রিক হস্তক্ষেপ দ্বারা সৃষ্ট যৌন আনন্দের বাস্তবতা শারীরিক যোগাযোগের বাস্তবতায় ঘটে না, তবু এটি ‘বাস্তবতার চেয়ে বেশি ‘বাস্তব’, আরও বেশি তীব্র। এই ‘বাস্তব’ বাস্তবতার বস্তু ও তাদের ভার্চুয়াল অনুকৃতির মধ্যে বিভাজনকে দুর্বল করে দেয়: যদি, ভার্চুয়াল বাস্তবতায়, আমি একটি অসম্ভব কল্পনা মঞ্চস্থ করি, তাহলে আমি সেখানে একটি ‘কৃত্রিম’ যৌন উপভোগ অনুভব করতে পারি যা ‘বাস্তব বাস্তবতা’তে আমি যা কিছু অনুভব করতে পারি তার চেয়ে অনেক বেশি ‘বাস্তব’।

ফলস্বরূপ, সাইবারস্পেসের একটি আমূল অস্পষ্ট অবস্থা রয়ে গেছে। যদিও এটি ‘বাস্তব’-এর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে, বাধাহীন একটি কাল্পনিক স্থানের, একই সঙ্গে এটি এমন একটি স্থান হতে পারে যেখানে আপনি ‘বাস্তব’-এর কাছে যেতে পারেন যার বর্জন আপনার সামাজিক বাস্তবতার অভিজ্ঞতা গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাইবারস্পেস হলো ট্রমা থেকে মুক্তির একটি উপায় এবং ট্রমা তৈরির একটি উপায়—এবং এই অর্থে এটি ওয়াগনারের পার্সিফাল কূটাভাস [অনুবাদকের নোট: এটি এমন একটি বিরোধিতা উপস্থাপন করে যেখানে একটি গভীর খ্রিষ্টীয়-থিমযুক্ত অপেরা তৈরি করা হয়েছে যা করুণা, মুক্তি ও পবিত্রতার পক্ষে ছিল, একজন সুরকার যিনি ঐতিহ্যবাহী খ্রিষ্টীয় মতবাদে বিশ্বাস করতেন না এবং ইহুদিবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। এটি একটি ‘আদি-আধুনিক’ কাজ যা ধর্মের বিকল্প হিসেবে কাজ করা শিল্পের সঙ্গে আধ্যাত্মিক আকাক্সক্ষাকে মিশ্রিত করে]  অনুসরণ করে, যেখানে ক্ষতটি কেবল সেই বর্শা দ্বারাই নিরাময় করা যেতে পারে যা আঘাতের মাধ্যমে এটিকে তৈরি করেছিল। একদিকে, এক ধরনের কাল্পনিক অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার গতিময়তায় আটকা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তবে অন্যদিকে, সাইবারস্পেস ‘বাস্তব’-এর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য একটি স্থান উন্মুক্ত করে দেয় যাকে আমি কাল্পনিক ‘বাস্তব’ বলেছি: অর্থাৎ, মায়াময় বাস্তব, আঘাতমূলক মাত্রা যা আমরা আমাদের বাস্তবতায় পূর্বকল্পনা করি।

প্রশ্ন : তাহলে সাইবারস্পেস কেবল ‘বাস্তব’-এর মুখোমুখি হওয়ার (অথবা এড়িয়ে যাওয়ার) আরেকটি উপায় নয়, বরং ‘বাস্তব’কে অনুভব করার আরেকটি উপায়ও ?

উত্তর : সাইবারস্পেসে ‘বাস্তব’-এর অভিজ্ঞতার আদর্শ সূত্রটি এক ধরনের ভৌত সীমা, শারীরিক জড়তার পরিপ্রেক্ষিতে হতে থাকে। ধারণাটি হলো যে আপনি ভার্চুয়াল বাস্তবতার মধ্যে যতই গভীরে থাকুন না কেন, আপনি তবু একটি বাস্তব শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত (যা বার্ধক্য, কর্মক্ষমতার অবনতি ইত্যাদির ঝুঁকিতে থাকে) যাকে বিমূর্তকরণ করা যায় না, এবং তাই মানুষের ভার্চুয়াল সত্তায় রূপান্তরের আধ্যাত্মিক-জ্ঞানবাদী স্বপ্ন একটি অসম্ভব বিষয়। কিন্তু আমি মনে করি না যে শরীরের এই অবশিষ্টাংশ ‘বাস্তব’ এর চূড়ান্ত বলয় গঠন করে। বিপরীতে, সাইবারস্পেসের মধ্যেই আপনি যে ‘অসম্ভবতার মুখোমুখি হন’ তা হিসেবে ‘বাস্তব’কে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করতে হবে। এটি এর মধ্যেই অন্তর্নিহিত।

উদাহরণস্বরূপ, সাইবারস্পেসে ‘বাস্তব’-এর সঙ্গে একটি সম্ভাব্য সাক্ষাৎ হতে পারে এমন একটি কল্পনার নির্মাণ যা এতটাই চরম ছিল যে আপনি, যেন, ‘বাস্তব জীবনে’ ফিরে যাবেন। ফ্রয়েডীয় ঘটনার ক্ষেত্রে এরকম কিছু ঘটে যখন একজন বাবা স্বপ্ন দেখেন যে তার ছেলে তাকে ‘তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না যে আমি জ্বলছি ?’ এই শব্দগুলো দিয়ে ভর্ৎসনা করছে এবং তারপর যিনি এই চাপমূলক সাক্ষাৎ এড়াতে জাগ্রত জীবনে ফিরে আসেন। সাইবারস্পেসের ক্ষেত্রে, আমাদেরকে সর্বদা আমাদের কল্পিত পরিসরের মৌলিক সমতুল্যতার কাছে যাওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু, লাকাঁ যেমনটি উল্লেখ করেছেন, মৌলিক কল্পনাগুলো অসহনীয়; এই অর্থে অসহনীয় যে একজন ব্যক্তি কখনওই তাদের সম্পূর্ণরূপে আত্মস্থ করতে পারে না। তাই ‘বাস্তব’ কেবল প্রতীকীকরণের বাহ্যিক সীমা নয়, এটি কঠোরভাবে অন্তর্নিহিত: ফাঁকাগুলো প্রতীকীকরণ দ্বারাই তৈরি হয়। এই অর্থে প্রতীকীকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘বাস্তব; এর একটি প্রায় নাজুক গুণ রয়েছে।

প্রশ্ন : কাল্পনিক ‘বাস্তব’-এর এই ধারণাটি এমন একটি বিষয় যা আপনি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাবলি সম্পর্কিত সাম্প্রতিক একটি লেখায়ও প্রকাশ করেছেন, যার শিরোনাম, যার একটি বিদ্রƒপাত্মক প্রামাণ্য হলো ওয়াচোস্কি ভাইদের চলচ্চিত্র, ম্যাট্রিক্স।

উত্তর : ‘ওয়েলকাম টু দ্য ডেজার্ট অব দ্য রিয়াল’ কথাটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট অর্থে উল্লেখ করা হয়েছে। শুরুতেই যেটা বলতে চাই, এর মানে এই নয় যে ‘আমেরিকানরা’, অথবা, আরও সাধারণভাবে, ‘পশ্চিমারা’, এখন পর্যন্ত একটি কৃত্রিম মহাবিশ্বে বাস করত এবং এখন তারা বাস্তব জগতে ফিরে এসেছে। আমেরিকান দৃষ্টিকোণ থেকে, ব্যাপারটি এ রকম ছিল না যে বাস্তবতা—একটি অতি উন্নত ভার্চুয়াল মহাবিশ্বে অনুপ্রবেশ করেছিল, বরং, বর্ণিল ভার্চুয়াল কল্পজগৎ হিসেবে যার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তা বাস্তবে অনুপ্রবেশ করেছিল। তৃতীয় বিশ্বের সন্ত্রাস, দুর্যোগ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সাধারণত কল্পনাপ্রসূত ও অবাস্তব কিছু হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যেখানে এই ধরনের বিষয়গুলো সংবাদে বা চলচ্চিত্রে উল্লেখ করা হতো বা উপস্থাপন করা হতো, সেখানে সর্বদা একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। তাই ১১ সেপ্টেম্বর যা ঘটেছিল তা হলো বাস্তবতা আমাদের কাল্পনিক জগতে অনুপ্রবেশ করেনি, বরং ঠিক যথার্থ অর্থে আমাদের দূরবর্তী পর্দায় কল্পনাপ্রসূতভাবে যা অনুভূত হয়েছিল তা বাস্তবতায় অনুপ্রবেশ করেছিল। এবং এই কারণেই ১১ সেপ্টেম্বরের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বিচ্ছিন্নতামূলক অনুভূতির (ফবৎবধষরুধঃরড়হ) প্রভাবও ছিল, কারণ যদিও এটি বেদনাদায়ক ছিল তবে এটি আমেরিকান বাস্তবতার অংশ না হওয়ার কারণে মৌলিক অর্থে অবাস্তবও ছিল।

এখানে আমাদের কাছে একটি চমৎকার উদাহরণ রয়েছে যে কীভাবে লাকাঁনীয় ‘বাস্তব’ এর ধারণাটি রোলা বার্তের দ্বারা বিকশিত যুক্তির বিপরীত যুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে, যিনি, দ্য এফেক্ট অফ দ্য রিয়েল-এ, তাৎক্ষণিক বাস্তবতার যেকোনও উল্লেখের গ্রহণযোগ্য অবিনির্মাণবাদী (ংঃধহফধৎফ ফবপড়হংঃৎঁপঃরড়হরংঃ) সমালোচনার পূর্বনির্ধারণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, বার্ত ফ্লবেয়ারের মতো লেখকদের কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি একটি রুমের বর্ণনায় অকার্যকর অতিরিক্ত বিবরণের একটি সম্পূর্ণ সিরিজ উল্লেখ করেছেন, এবং ধারণাটি হলো এই যে এগুলো ‘বাস্তব’-এর প্রভাব তৈরি করে। এবং অবশ্যই অবিনির্মাণবাদী সমালোচনার মূল বিষয় হলো আমরা আমাদের প্রাত্যহিকতায় বাস্তবতা হিসেবে যা অনুভব করি তা কীভাবে কার্যকরভাবে প্রতীকী পদ্ধতির একটি কাঠামো হয়ে ওঠে।

কিন্তু লাকাঁনীয় দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক এর বিপরীত। এই সাধারণ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে, প্রতীকী কল্পকাহিনিকে বাস্তবতার সঙ্গে বিভ্রান্ত করা উচিত নয় বা ভুলভাবে বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, লাকাঁর কেন্দ্রীয় অন্তর্দৃষ্টি হলো ‘বাস্তব’কে প্রতীকী কল্পকাহিনি হিসেবে ভুল করা উচিত নয়। অর্থাৎ, প্রকৃত দার্শনিক শিল্প হলো ‘বাস্তব’-এর পিছনের কল্পকাহিনিকে স্বীকৃতি না দেওয়া—অর্থাৎ আপনি কোনও কিছুর বাস্তবতা হিসেবে অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং অবিনির্মাণমূলক সমালোচনার কাজের মাধ্যমে আপনি এটিকে কেবল প্রতীকী কল্পকাহিনি হিসেবে উন্মোচন করেন—অথচ যাকে কেবল প্রতীকী কল্পকাহিনি বলে মনে হয় তাকে ‘বাস্তব’ বলে স্বীকৃতি দিতে হয়। এটি অন্যভাবেও ঘটতে পারে। আসল কাজ হলো বাস্তবতাকে প্রতীকী কল্পকাহিনি হিসেবে চিহ্নিত করা নয়, বরং এটা দেখানো যে প্রতীকী কল্পকাহিনিতে এমন কিছু থাকতে পারে যা কল্পকাহিনির চেয়েও বেশি কিছু। এই উদ্বৃত্ত মাত্রাই ‘বাস্তব’ হিসেবে কাজ করে। আমরা বলতে পারি যে বাস্তবতা ও এইসব বর্ণিল কল্পনার মধ্যে বিরাট বিরোধের ক্ষেত্রে, ‘বাস্তব’ কল্পনার পাশে থাকে। এটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘বাস্তব’-এর ধারণাকে কেবল একটি চূড়ান্ত চাপমূলক অগ্রহণযোগ্য কঠিন ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এটি লাকাঁনীয় ‘বাস্তব’-এর মূল কক্ষপথ নয়—লাকাঁনীয় ‘বাস্তব’ নিজেকে আরও সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করে।

প্রশ্ন : আর যদি ‘বাস্তব’কে কল্পনাপ্রসূত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে, একটি ঐতিহাসিক বলয় হিসেবে, এটি কি আমাদের সম্ভাবনার ধারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে ?

উত্তর : যে মৌলিক ধারণার চারপাশে সবকিছু ঘুরপাক খায় তা হলো বাস্তবতা নিজেই ইতিমধ্যেই কিছু বর্জন বা অসঙ্গতির উপর ভিত্তি করে তৈরি—বাস্তবতাই সব নয়। তাহলে ‘বাস্তব’ কীভাবে কাজ করে ? একটি ঐতিহাসিক পরিস্থিতির খুব সহজ একটি উদাহরণ বিবেচনায় নেওয়া যাক, যেখানে একটি বিপ্লব শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ধরা যাক যে এই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল এবং ইতিহাস একটি ভিন্ন, কম মৌলিক পথ বেছে নিয়েছিল। এখানে ‘বাস্তব’ হলো ঠিক সেই হাতছাড়া হওয়া সুযোগ: বিশ্বাসঘাতকের অভিঘাত, যা হতে পারে। যা ঘটতে পারে তার বিকল্প ইতিহাসের কল্পনা কেবল একটি বিভ্রম নয়, বরং ‘বাস্তব’-এর বিশ্বাসঘাতকতা বা আঘাত হিসেবে কাজ করে।

আমি মনে করি দেরিদার ‘বর্তমানকে তাড়িত করা অতীতের ভূত’ (যধঁহঃড়ষড়মু, ভূতপূর্ব-ভবিষ্য- তাড়নবাদ) ধারণা এবং এটি বর্তমানে যেভাবে কাজ করে তাকে এখানে আমরা আরও মৌলিক বাঁক দিতে পারি। এর উল্লেখ করার মতো উদাহরণ হলো বাণিজ্যিক সিনেমায় অতি জনপ্রিয় বিকল্প ইতিহাসের দৃশ্যপট—অর্থাৎ ইতিহাসকে বহুমুখী পথ ও বিকাশের জগৎ হিসেবে উপস্থাপন করা (ইটস অ্যা ওয়ান্ডারফুল লাইফ, দ্য ব্যাক টু দ্য ফিউচার ট্রিলজি, স্লাইডিং ডোরস ইত্যাদি)। আমার মনে হয় এই ঘটনাগুলো যতটা মনে হচ্ছে তার চেয়েও অনেক বেশি অস্পষ্ট। প্রথমত, আমি দাবি করতে প্রলুব্ধ যে বিকল্প ইতিহাসের দৃশ্যপটের জনপ্রিয়তা এই সত্যের প্রকাশ নয় যে আমরা স্বাধীন পছন্দের সমাজে বাস করি, যেখানে আমরা সর্বদা ভিন্ন পছন্দ করতে পারি, বরং আসল ব্যাপার হলো এর প্রায় বিপরীত: অর্থাৎ এই দৃশ্যপটগুলো বরং এই সত্যের একটি সংকেত যে আমাদের কোনও  মৌলিক পছন্দ নেই।

বিকল্প ইতিহাসকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের স্বাভাবিক শিক্ষা হলো, হয় পছন্দগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়, অথবা, আরও সাধারণভাবে, ইতিহাসে যে কোনও হস্তক্ষেপ বা পরিবর্তন অনিবার্যভাবে একটি বিপর্যয়কর ফলাফল তৈরি করে। ইতিহাসকে অসীম সম্ভাবনা ও পরিবর্তনের জগৎ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমেই পরবর্তীকালের ‘প্রাকৃতিক পথের ভাবাদর্শিক কল্পনা’ পুনরুৎপাদন করা হয়। বিকল্প ইতিহাসের পরিস্থিতিগুলো চূড়ান্ত সমাপ্তির উপস্থাপনা হিসেবে শেষ হয়।

প্রশ্ন : কার্যক্ষেত্রে (ফব ভধপঃড়) সমাপ্তির এই ধারণাটি সাইবারস্পেসের উদ্যাপনবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত বলে মনে হতে পারে।

উত্তর : আমি মনে করি সাইবারস্পেসের প্রাসঙ্গিকতার ক্ষেত্রে যে ভাবাদর্শ এড়িয়ে চলা উচিত তা হলো কেবল স্বীকার করা যে এটি ডিজিটালাইজেশন, অনিশ্চয়তা, পছন্দ ইত্যাদির একটি সীমাহীন বলয়। একটি ভাসা ভাসা স্তরে এটি এমনই মনে হতে পারে, কিন্তু আমি মনে করি যে আমাদের কার্যকরভাবে খুব কম পছন্দের সুযোগ রয়েছে। আমি মনে করি যে, আমাদের সমাজ বর্তমানের চেয়ে আর কখনও এত বেশি আত্ম-সীমাবদ্ধ ছিল না। অবশ্যই, আমরা সর্বদা পছন্দের বোমাবর্ষণ দ্বারা পরিপূর্ণ, কিন্তু আসলে আমাদের কাছে খুব কম বাস্তব পছন্দের সুযোগ রয়েছে। এবং আবারও, এখানে ‘বাস্তব’ বলতে যে কোনও ধরনের মৌলিক পছন্দের অভাবকে নির্দেশ করে। পরবর্তীগুলোকে সমসাময়িক পছন্দের ক্ষেত্র দ্বারা স্পষ্টভাবে বাদ দেওয়া যায়; তারা আপাতদৃষ্টিতে অসীম পছন্দের জগতে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : এবং যদি বাস্তব পছন্দ করার ক্ষমতা হ্রাস পায়, তাহলে এটি কি জগতে আমাদের কাজের বিষয়ে আমাদের দায়বদ্ধতাকেও প্রভাবিত করবে ?

উত্তর : এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে আমরা কীভাবে সম্পর্কিত হই। আমি মূলত মৃত্যুদণ্ডের (অথবা অন্তত মৃত্যুদণ্ডের ধারণার) পক্ষে, কিন্তু এটি মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো যারা মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে যুক্তি প্রদান করেন—যদি আমরা তাদের যুক্তিকে সীমার মধ্যে ঠেলে দিই—তারা শেষ পর্যন্ত নিৎশের ‘শেষ মানুষ’-এর অবস্থানকেই মেনে নেন। নিৎশের শেষ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, কোনও বড় ঐতিহাসিক লক্ষ্য নেই, এমন কোনও কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় যার জন্য মরতে হবে, জীবনের ধারাবাহিকতাই হলো সর্বোচ্চ মূল্য ইত্যাদি। এটি এক ধরনের বেঁচে থাকার মনোভাব। আমি এই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করি না।

আমি মনে করি নিৎশের সক্রিয় শূন্যবাদ থেকে নিষ্ক্রিয় শূন্যবাদের যে বিরোধিতা—অর্থাৎ, কোনও কিছু করার ইচ্ছা না করার চেয়ে সক্রিয়ভাবে কোনও কিছু না করার ইচ্ছা ভালো—তা কৌতূহলজনকভাবে আধুনিক অবস্থাকে প্রতিফলিত করে। ‘অন্য ধর্মান্ধদের’ অনুভূত মৌলবাদের বিপরীতে, আজ আমাদের সামনে যা আছে তা হলো উদারপন্থি ব্যক্তিত্বের আধিপত্যবাদী ব্যক্তিত্ব, যারা নিৎশের ‘শেষ মানুষ’ (খধংঃ গধহ)-এর মতো, শুধু ব্যক্তিগত আনন্দ ও সুখের আদর্শের সাধনা নিয়েই উদ্বিগ্ন; ঐতিহাসিক মিশন বা সম্পৃক্ততার কোনও ধারণা ছাড়াই একটি বিশুদ্ধ বেঁচে থাকার নীতি।

আমি বলব, যারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে, তারা নিৎশের ‘শেষ মানুষ’-এর এই সমস্যাটির গভীরে প্রোথিত। এর বিরুদ্ধে—এবং আগামবেনের হোমো স্যাইচার অনুসরণ করে, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত, আমাদের একটি সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা উচিত, যা হলো, যারা মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেন তাদের মধ্যে কোন ধরনের জৈবরাজনীতি অন্তর্নিহিত রয়েছে ? আমি মনে করি যথাযথ উত্তরটি হলো টিকে থাকার ও ‘শেষ মানুষ’-এর নিৎশীয় জৈবরাজনীতি: অর্থাৎ জীবনের কোনও  চূড়ান্ত অর্থ নেই এবং একমাত্র লক্ষ্য হলো ব্যক্তিগত সুখ। তাই ইতিহাসের কার্যকর সমাপ্তির এই সমস্যাটির সঙ্গে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার একটি নির্দিষ্ট স্থগিতাদেশ যুক্ত। অন্যদিকে, আজ বাদিউ ও অন্যান্য লেখকদের ক্ষেত্রে যা উঠে আসছে তা হলো এক নতুন ধরনের উন্নয়ন (যার আমিও একটি অংশ), সহজ ভাষায়, যাকে একটি উত্তর-অবিনির্মাণবাদী দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

প্রশ্ন : ‘শেষ মানুষ’ দৃষ্টিভঙ্গি কি ‘বাস্তব’কে অতিক্রম করার ঐতিহ্যবাহী ভাবাদর্শিক প্রতিশ্রুতির আরেকটি সংস্করণ ?

উত্তর : আমার মনে হয় তাই। উদাহরণস্বরূপ, আজকের বাজারে আমরা পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক বৈশিষ্ট্য ছাড়াই তাদের একটি সম্পূর্ণ সিরিজ দেখতে পাই: ক্যাফেইন ছাড়া কফি, চর্বি ছাড়া ক্রিম, অ্যালকোহল ছাড়া বিয়ার… এবং তালিকাটি আরও লম্বা। ভার্চুয়াল যৌনতাকে যৌনতা ছাড়া যৌনতা হিসেবে, কলিন পাওয়েল-এর যুদ্ধবিষয়ক মতবাদকে কোনও ক্ষয়ক্ষতি ব্যতিরেকে যুদ্ধ ছাড়া যুদ্ধ হিসেবে (অবশ্যই আমাদের পক্ষে), রাজনীতির সমসাময়িক পুনঃসংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ প্রশাসনের কলাকৌশলকে রাজনীতি ছাড়া রাজনীতি হিসেবে, আজকের সহনশীল উদার বহুসংস্কৃতিবাদকে তার ‘অন্যত্ব’ থেকে বঞ্চিত ‘অন্য’-এর অভিজ্ঞতা হিসেবে (ভাবাদর্শিক অন্য যারা আকর্ষণীয় নৃত্য করে এবং বাস্তবতার প্রতি পরিবেশগতভাবে সুস্থ সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, যখন বউ-পেটানোর মতো বৈশিষ্ট্যগুলো দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়…)। ভার্চুয়াল বাস্তবতা কেবল এই প্রক্রিয়াটিকে সাধারণীকরণ করে যে, এটি একটি পণ্য সরবরাহ করে যা এর মূলসত্তা থেকে বঞ্চিত: এটি বাস্তবতা নিজেকে সরবরাহ করে যা তার মূলসত্তা থেকে বঞ্চিত, ‘বাস্তব’-এর প্রতিরোধী শক্ত মূল শাঁস থেকে—ঠিক যেমনভাবে ক্যাফেইনবিহীন কফি আসল জিনিস না হলেও আসল কফির মতো গন্ধ ও স্বাদ ধারণ করে, তাই ভার্চুয়াল বাস্তবতা বাস্তব না হলেও বাস্তবতা হিসেবে অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়।

এটি কি সুখবাদী ‘শেষ মানুষ’ এর মনোভাব নয় ? সবকিছু অনুমোদিত, আপনি সবকিছু উপভোগ করতে পারেন, কিন্তু সেই মূলসত্তা থেকে বঞ্চিত যা এটিকে বিপজ্জনক করে তোলে। (এটিও শেষ মানুষের বিপ্লব—‘বিপ্লব ছাড়া বিপ্লব’।) এটি কি লাকার দস্তয়েভস্কি-বিরোধী নীতিবাক্যের দুটি সংস্করণের মধ্যে একটি নয়, ‘যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকে, তবে সবকিছু নিষিদ্ধ’ ? (১) ঈশ্বর মৃত, আমরা একটি অনুমতিমূলক মহাবিশ্বে বাস করি, আপনার আনন্দ ও সুখের জন্য প্রচেষ্টা করা উচিত—কিন্তু, সুখ ও আনন্দে পূর্ণ জীবন পেতে, আপনার বিপজ্জনক বাড়াবাড়ি এড়ানো উচিত, তাই সবকিছু নিষিদ্ধ যদি এটি তার মূলসত্তা থেকে বঞ্চিত না হয়। (২) যদি ঈশ্বর মৃত হন, তাহলে অতি-অহং (ংঁঢ়বৎবমড়) আপনাকে উপভোগ করতে বলে, কিন্তু প্রতিটি নির্ধারিত উপভোগ ইতিমধ্যেই শর্তহীন উপভোগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাই এটি নিষিদ্ধ করা উচিত। এর খাদ্যমান হিসেবে গ্রহণযোগ্য রূপ হলো সরাসরি জিনিসটি উপভোগ করা: কফি নিয়ে কেন ঝামেলা করবেন ? সরাসরি আপনার রক্তে ক্যাফেইন প্রবেশ করান! কেন বাহ্যিক বাস্তবতার দ্বারা ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি ও উত্তেজনা নিয়ে বিরক্ত হবেন ? এমন ওষুধ খান যা সরাসরি আপনার মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে! এবং যদি একজন ঈশ্বর থাকেন, তাহলে সবকিছুই অনুমোদিত—যারা ঈশ্বরের পক্ষে সরাসরি কাজ করার দাবি করেন, তাঁর ইচ্ছার হাতিয়ার হিসেবে; স্পষ্টতই, ঈশ্বরের সঙ্গে একটি সরাসরি সংযোগ আমাদের যে কোনও ‘মানবিক’ সীমাবদ্ধতা এবং বিবেচনার লঙ্ঘনকে ন্যায্যতা দেয় (যেমন স্ট্যালিনবাদ, যেখানে ঐতিহাসিক অপরিহার্যতাবাদ বৃহৎ (শক্তিমান) অন্যপক্ষের উল্লেখ পরম নির্মমতাকে ন্যায্যতা দেয়)।

প্রশ্ন : যেখানে আপনি একটি উত্তর-অবিনির্মাণবাদী ভাবকাঠামোর কথা উল্লেখ করেন, সেক্ষেত্রে এর মানে কি অবিনির্মাণের প্রত্যাখ্যান বা পরিত্যাগকে বোঝায় ?

উত্তর : না। অধিবিদ্যায় প্রত্যাবর্তনের কোনও বিষয় এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি সম্পূর্ণরূপে অবিনির্মাণবাদের ফলাফলকে সমর্থন করে; এটি দ্বিবিধত্ব- এর উপর জোর দেয়। আপনাকে কিছু ধারণা দেওয়ার জন্য, আসুন ধর্মীয়তার সমসাময়িক প্রত্যাবর্তনের উদাহরণটি নেওয়া যাক যা একটি সম্পূর্ণ বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিকশিত হচ্ছে।

এখন ধর্মীয় অনুভূতির পার্থক্য করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাকে আমি সমর্থন করব—এবং যা আপনি খুঁজে পেতে পারেন বাদিউ, আগামবেন ও অন্যদের কাজের মধ্যে—উত্তরÑঅবিনির্মাণবাদী লেভিনাসীয়-দেরিদীয় ধর্মীয় প্রত্যাবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে। লেভিনাসীয় ও উত্তর অবিনির্মাণবাদী ধর্মীয় প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে আমাদের মৌলিক অন্যত্বের ধারণা রয়েছে এবং এর প্রতি একটি নিঃশর্ত উন্মুক্ততা ও দায়বদ্ধতার অনুভূতি রয়েছে। বিপরীতে, আমি যে ধরনের ধর্মীয় সংবেদনশীলতার কথা বলছি তা (এবং এই শব্দটি ব্যবহার করতে আমাদের ভয় পাওয়া উচিত নয়) একটি বীরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তবাদের ধারণাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেয় যাতে ফলাফলের ঝুঁকি নেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয় এবং বাস্তব অর্থে তাদের জন্য দায়বদ্ধতা গ্রহণের উপর জোর দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডের উদাহরণে ফিরে আসি, যারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বলে দাবি করেন তাদের সঙ্গে আমার সমস্যা হলো তাদের অন্তর্নিহিত ধারণা নিয়ে যেখানে তারা মনে করেন যে, মৃত্যুর যোগ্য কিছুই নেই।

প্রশ্ন : ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়তা ছাড়া এটি একটি ধর্মীয় সংবেদনশীলতা হতে পারে: অর্থাৎ, এমন একটি সংবেদনশীলতা যা ঈশ্বর বা অন্যত্বের প্রতি সীমাহীন অঙ্গীকারের বিরোধিতা করে, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কী রয়েছে যা জীবনের মধ্যে কেবল বেঁচে থাকার চেয়েও বেশি কিছু দেখে ?

উত্তর : এবং এখানে আমি বেশ ঐতিহ্যবাহী নীতিবান ব্যক্তিত্ব। আমি মনে করি যে সম্মান, লজ্জা, স্বাধীনতা ইত্যাদির মতো জিনিস রয়েছে যার জন্য মৃত্যু মূল্যবান হয়ে উঠে। জীবন শুধু জীবন নয়। জীবন সব সময় একটি নির্দিষ্ট উদ্বৃত্তের সঙ্গে থাকে; এমন কিছু যার জন্য কেউ জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এই কারণেই আমি মনে করি যে একজন ব্যক্তির বর্তমানে নিত্যতা, সিদ্ধান্ত, বাহাদুরি ও বীরত্বের মতো শব্দগুলোকে আরও বেশি করে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা উচিত। এই বিষয়ে আমি বাদিউ এর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। আমি আপনাকে বলতে চাই যে বাদিউ-এর সঙ্গে আমার একটি আলাপচারিতায়, যখন আমরা আমাদের ব্যক্তিগত রুচি নিয়ে কথা বলছিলাম, তখন আমি অত্যন্ত অবাক ও সন্তুষ্টির সঙ্গে আবিষ্কার করেছি যে তিনি আমেরিকান পশ্চিমাদের খুব পছন্দ করেন। এখন আপনি কখনওই বাদিউর কাছ থেকে এটা আশা করবেন নাÑআধুনিক কালের ম্যালার্মে, ফ্রাঙ্কোফিল-এর মতো কথিত আমেরিকানÑবিরোধীদের মতো। আর যখন আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন, তখন তিনি আমাকে বললেন কারণ এটিই একমাত্র ধারা যা সাহসের উপর আলোকপাত করে।

এখন যদি আমরা বর্তমান সময়ের ভাবকাঠামোগত চলচ্চিত্র বিবেচনায় নিই এবং তা হবে যুদ্ধ নিয়ে সিনেমা। উদাহরণস্বরূপ, এটি হলো স্পিলবার্গের সেইভিং প্রাইভেট রায়ান, যেখানে আপনার সামনে তুলে ধরা হয় সীমাহীন আতঙ্ক, অর্থহীন হত্যা এবং সহিংসতা। স্পিলবার্গের দৃষ্টিভঙ্গি আবারও সেই ‘শেষ মানুষ’-এর: অর্থাৎ, যুদ্ধ কেবল একটি দুঃস্বপ্ন, অবোধগম্য, মানব জীবনের এক করুণ অপচয়। কিন্তু আমি মনে করি যে আমাদের যা ভুলে যাওয়া উচিত নয় তা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ডি-ডে আক্রমণে উদ্দেশ্য ও নৈতিক সংগ্রামের বীরত্ব ছিল এবং এক্ষেত্রে এমন কারণ ও আদর্শ রয়েছে যার জন্য মৃত্যুবরণ করা মূল্যবান। ঘটনাক্রমে, এটি আজকের ভাবাদর্শিক আলোচনার অপ্রতিরোধ্য প্রবণতাকেও প্রতিফলিত করে, যেখানে ‘যারা নির্দিষ্ট কারণ বা উদ্দেশ্যের নামে তাদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলতে প্রস্তুত’ তাদের নির্বোধ ধর্মান্ধতার রাজ্যে প্রেরণ করা হচ্ছে।

১৯৪০-এর দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু হওয়া পশ্চিমা ধারার সংকটকে এই ভাবাদর্শিক প্রবাহের অংশ বলা যেতে পারে—যদিও অবশ্যই তথাকথিত অধি-পশ্চিমারা রয়েছে যারা অন্যান্য ধারাগুলোকে তুলে ধরে। তবে তা সত্ত্বেও ১৯৫০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা ধারার একটি সংক্ষিপ্ত পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল। এগুলো ইতিমধ্যেই এক ধরনের বিষণ্ন স্মৃতিকাতর মনোভাব প্রতিফলিত করেছে, তবে তারা দুর্দান্ত। এই সিরিজের প্রথমটি, যা বাদিউ-এর পশ্চিমা সাহসিকতার প্রতীক হবে (যদিও এটি সেরা নয়), অবশ্যই, হাই নুন। তবে আমার মনে হয় যে এই সিরিজে আরও দুটি চলচ্চিত্র রয়েছে যা আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং যেগুলো আমার প্রায় সবচেয়ে প্রিয় পশ্চিমা চলচ্চিত্র। এগুলো অ্যান্থনি ম্যানের চলচ্চিত্র নয়, যাকে সাধারণত মনে করা হয়, বরং ডেলমার ডেইভস-এর চলচ্চিত্র: ৩:১০ টু ইউমা এবং দ্য হ্যাঙ্গিং ট্রি। এই ছবিগুলো নীতিগত অগ্নিপরীক্ষা, সাহস এবং ঝুঁকি সম্পর্কে: আপনি কীসের জন্য সবকিছুর ঝুঁকি নেবেন ? সাধারণত পশ্চিমাদের এটিই কেন্দ্রীয় উদ্বেগের বিষয়—কোন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আপনি নিজের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করার সাহস সঞ্চয় করবেন ?

তাই আমি মনে করি যে কোনওভাবেই পশ্চিমের বিষয়কে এক ধরনের আমেরিকান ভাবাদর্শিক মৌলবাদ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিপরীতভাবে, আমি মনে করি আমাদের এই বীরত্বপূর্ণ মনোভাবকে আরও অনেক বেশি করে প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে, অবিনির্মাণের পরে যা আসে এবং মৌলিক অনিশ্চয়তার গ্রহণযোগ্যতা একটি সর্বজনীন বিদ্রƒপাত্মক সংশয়বাদ হওয়া উচিত নয়, যেখানে যখনই আপনি নিজেকে কোনও কিছুতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেন তখন আপনার সচেতন থাকা উচিত যে আপনি কখনও নিজেকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেন না—না, আমি মনে করি যে আমাদের পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার অনুভূতি ও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পুনর্বাসন করা উচিত।

প্রশ্ন : আপনি কি এটি বলতে চান যে, ‘ঝুঁকিপূর্ণ সমাজের’ চূড়ান্ত ঝুঁকি হলো আমরা ঝুঁকি নিই না ?

উত্তর : একদম যথার্থ। শুরু থেকেই আমার মনে হয় এটাই মূল কথা। হ্যাঁ, ‘ঝুঁকিপূর্ণ সমাজ’ এক ধরনের অসার্থক নাম। এর কোনও বিকল্প নেই। আর যদি কোনও ঝুঁকি থাকে, তাহলে তা হলো নিষ্ক্রিয় ঝুঁকি। আমার কাছে এটাই ঝুঁকিপূর্ণ সমাজের মৌলিক কূটাভাস। উদাহরণস্বরূপ, এনরন ও ওয়ার্ল্ডকমের সাম্প্রতিক পতনের কথা ধরা যাক। আমি বলতে চাইছি, এই ঘটনাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে চিহ্নিত করা যথাযথ নয়, কারণ দরিদ্র কর্মচারীরা, যারা চাকরি হারিয়েছেন তারা কোনও ঝুঁকি নেননি। তারা এটিকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ভাগ্য হিসেবে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। এবং আমার মনে হয় এখানে যখন ঝুঁকিপূর্ণ সমাজের তাত্ত্বিকরা আমাদের উপর ‘আপনি আজই বেছে নিতে, ঝুঁকি নিতে স্বাধীন’―এই ধারণা দিয়ে বোমাবর্ষণ করেন, তখন তারা অন্তত একটি পর্যায়ে ভাবাদর্শের পুরোনো কাজ করছেন, অর্থাৎ আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ পছন্দগুলোকে অন্ধ ভাগ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করার অর্থে। আসুন এনরন বা ওয়ার্ল্ডকমের একজন দরিদ্র মধ্যস্তরের কর্মচারীর কথা ধরা যাক যিনি তার চাকরি, তাদের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ইত্যাদি হারিয়েছেন। ঐ ব্যক্তি কী কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ? তার কি কোনও যুক্তিসঙ্গত উপায় ছিল এটি প্রতিষ্ঠিত করার যে কেন এনরন/ওয়ার্ল্ডকম, অথচ অন্য কোনও বড় কোম্পানি নয়, ভেঙে পড়বে ? এখানে ঝুঁকিকে এক ধরনের বেনামী ধারণা হিসেবে সম্পূর্ণরূপে বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হ্যাঁ, এই অর্থে আমি পুরোপুরি একমত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button