
স্বাধীনতার পর গ্রন্থকেন্দ্রের প্রধান কাজই ছিল বছরে একবার জাতীয় গ্রন্থমেলা আয়োজন করা। ১৯৭৪ সালে ঢাকায় শুরু হয়। তখনই সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিবছর ১ বৈশাখ থেকে ৭ বৈশাখ এই মেলা দেশের কোনও না কোনও বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত হবে। সেই মতে, ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রামে মেলা হবার পর ’৭৬ সালে রাজশাহীতে মেলা হয়। ভেন্যু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অডিটোরিয়াম।
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে কিছু হলে স্থানীয় প্রশাসন তার সঙ্গে নামেমাত্র যুক্ত হতো। সেবারও তাই হয়েছিল। তবে, তখনকার ডিসি নজরুল ইসলাম, সিএসপি বেশ আমুদে লোক ছিলেন। তিনি বিভাগীয় কমিশনার শফিউল আলম, সিএসপিকে সঙ্গে নিয়ে প্রায়শ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। আমার প্রতি তাঁর ছিল একটু আলাদা রকমের স্নেহ-ভালোবাসা। এককালে রাজশাহী জেলার (অবিভক্ত) দুঃসাহসী, দাপুটে ও কিংবদন্তি ডিসি ছিলেন সিএসপি পি এ নাজির। তাঁর সাক্ষাৎ ভাতিজা হওয়ায় আমাকে তিনি তাঁদের ঘরের লোক মনে করতেন।
মেলা খুব সফল হয়েছিল। আমরা প্রশাসনের সুদৃষ্টিতে ছিলাম। আর, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলিট অংশের পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছিলাম। ভিসি সৈয়দ আলী আহসান, শিক্ষকদের মধ্যে আলী আনোয়ার, সনৎ কুমার সাহা, হাসান আজিজুল হক, প্রভোস্ট মনিরুজ্জামান, জুলফিকার মতিন (সবার নাম মনে আসছে না) প্রমুখের অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি। সহযোগিতায় সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিআরও নাজিম মাহমুদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অনেক গুণী শিক্ষক এ উদ্যোগে সামিল হতে পারেননি, যেমন : কাজী আব্দুল মান্নান, ইবনে গোলাম সামাদ।
আজ যখন স্মরণ করছি তখন সনৎ কুমার সাহা ও কবি জুলফিকার মতিন ব্যতীত তাঁদের আর কেউ জীবিত আছেন বলে মনে হয় না।
আজকের আয়োজিত বিভাগীয় গ্রন্থমেলা সফল হোক−এই প্রত্যাশা করি। বিভাগীয় পর্যায়ে মেলার আয়োজন একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা কঠিন তা গ্রন্থকেন্দ্রের গঠনকালে মেলার সমুদয় দায়িত্ব পালনের সময় আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আশা করি, এখনকার পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু খোলা মাঠ, আর অকাল ঝড়বৃষ্টির আগাম সংকেত মনে আশঙ্কাও সৃষ্টি করছে।
রাজশাহীতে জাতীয় গ্রন্থমেলার পর ১৯৭৭ সালে খুলনা, ১৯৭৮ সালে সিলেট, এরপর বরিশালে ঐ গ্রন্থমেলার বিভাগীয় শহর পরিক্রমা শেষ হয়। এরপর কেবল ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম ব্যতীত আর কোনও বিভাগীয় শহরে জাতীয় গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে, বিভিন্ন জেলা শহর ও ঢাকাতে আয়োজিত হয়। ১৯৯৩ সালের পর জাতীয় গ্রন্থমেলা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরিবর্তে ঢাকা গ্রন্থমেলা, ঢাকা আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলা ইত্যাদির মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা অকার্যকর প্রতিভাত হলে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের গ্রন্থমেলার আয়োজন থেকে গ্রন্থকেন্দ্র সরে আসে।
জাতীয় গ্রন্থমেলা ১৯৭৪ সালে যখন চালু হয় তখন দেশে বই নিয়ে কোনও বড় ধরনের মেলার অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৭৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে বাংলা একাডেমি মাঠে প্রথম তিন সপ্তাহব্যাপী একুশে গ্রন্থমেলা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
পরের বছর ১৯৮০ সাল থেকে বাংলা একাডেমি মেলার আয়োজন করে। ১৯৮৪ সাল থেকে মেলার নাম পালটে অমর একুশে গ্রন্থমেলা বড়সড়োভাবে এক মাস ধরে আয়োজন হতে থাকে। এ মেলার পরিসর, কার্যকারিতা অর্থাৎ লেখক-প্রকাশক-পাঠকের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং বই বিক্রি, বইয়ের প্রচার ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢাকা শহরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের দ্বিতীয় কোনও বইমেলার সুযোগ তিরোহিত হয়। এখন বাংলা একাডেমির আয়োজিত বার্ষিক অমর একুশে গ্রন্থমেলাই দেশের প্রধান ও সর্ববৃহৎ গ্রন্থমেলা।
উল্লেখ্য, এনাম কমিটি প্রণীত ও সরকার অনুমোদিত চ্যাটার্ড অব ডিউটিজ অনুযায়ী বাংলা একাডেমি কেবল নিজের প্রকাশিত বইয়ের প্রচার-প্রসারের জন্য প্রদর্শনী করতে পারে। অন্যদিকে, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের দায়িত্ব জাতীয় স্তরে গ্রন্থমেলার আয়োজন করা। কিন্তু, বাংলা একাডেমি বিগত কয়েক দশক প্রধান দায়িত্বসমূহ শিকেয় তুলে বইমেলাতেই যেন সর্বশক্তি নিয়োগ এবং একাডেমিক কাজে শিথিলতার কুফল ভোগ করছে।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের দুটি প্রধান ও প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়গোচর (ঃধহমরনষব) মৌলিক কাজ যথা : ১. বইমেলার আয়োজন ও ২. দেশে পাঠাভ্যাস সৃষ্টি। প্রথম কাজটি বাংলা একাডেমি গ্রাস এবং দ্বিতীয় কাজটি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র অত্যন্ত নিপুণতা ও সাফল্যের সঙ্গে দেশব্যাপী পরিচালনা করায় গ্রন্থকেন্দ্রের অস্তিত্বই সংকটাপন্ন।
যা হোক, বাস্তব অবস্থায় গ্রন্থকেন্দ্রের বিভাগীয় গ্রন্থমেলার আয়োজন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের অস্তিত্ব জানান দিয়ে বিপর্যয়কে সামান্য হলেও ঠেকাতে একটি কার্যকর পন্থা। তাই, এ মেলা যাতে দেশের বৃহত্তর সংখ্যক মানুষ স্থায়ীভাবে জনহিতকর ও সুফলদায়ক বলে উপলব্ধি করে−সে বিষয়ে যথাযথ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।
বিভাগীয় গ্রন্থমেলা মোটামুটি বড় ধরনের গ্রন্থমেলারই ইঙ্গিত বহন করে। মেলায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকদের অংশগ্রহণ ব্যতীত এ মেলা সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু, তাঁদের প্রতিটি বিভাগীয় গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণ বাস্তবে সম্ভব নয়। তাঁদের সেই লোকবল নেই। তাছাড়া মেলায় অংশগ্রহণ আর্থিক দিক থেকে তেমন লোভনীয় নয়। মেলার জন্য বই আনা-নেওয়া, কর্মচারীদের যাতায়াত, অবস্থান, আহার ও হাতখরচ বাবদ ব্যয় সাধারণত তা বইবিক্রির গ্রস আয়কে প্রায় খেয়ে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশকের নিট লাভ তো দূরের কথা বরং পুঁজিতে ঘাটতি দেখা যায়।
প্রকাশকেরা বিভাগীয় শহরে কমপক্ষে একটি প্রতিষ্ঠানকে এজেন্সি দিলে ঐসব প্রতিষ্ঠান মেলায় মূল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করতে পারত। কিন্তু, সেটি হবার কথা নয়। প্রথমত, সৃজনশীল বইয়ের স্থানীয় চাহিদা তেমন একটা নেই। যাতে বিভাগীয় শহর থেকে কোনও প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হবে। যদি বা হতে চায় প্রকাশক তাতে উৎসাহী হন না। এর প্রধান কারণ বই বিপণনে এই লেনদেন হয় বাকিতে এবং প্রকাশক বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাওনা আদায় করতে পারেন না। তবে, বিভাগীয় শহরে দু-একটি বড় বইয়ের দোকান নিজ বিবেচনায় অ্যাসটেড ম্যানারে একাধিক প্রকাশকের বিক্রি উপযোগী বই দোকানে রাখেন। এতে অসুবিধে হলো, ঐরকম প্রতিষ্ঠান মেলায় যোগ দিলে অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের সংখ্যা পাটিগণিতের হিসেবে হ্রাস পায়। আর মেলায় বইবিক্রির বড় ধরনের ডিসকাউন্ট থাকায় তার লাভ অতি সামান্য থাকে।
বিভাগীয় পর্যায়ে স্থানীয় প্রকাশক নেই-ই বলতে হবে। তাই, আর্থিকভাবে লাভশূন্য এই মেলায় বইয়ের যদি বা প্রচারের সুযোগ তৈরি হয়, তাতে প্রকাশকের তরফে চড়া মূল্য দিতে হয়। এক্ষেত্রে, বিভাগীয় গ্রন্থমেলাকে প্রকাশকদের জন্য আকর্ষণীয় করতে তাদের অধিক সংখ্যায় অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে অবশ্যই এই মেলাকে বাণিজ্যসফল করে তুলতেই হবে।
উদ্যোক্তারা এরূপ লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হলে এই মেলা বাংলা একাডেমির মেলার মতো জন-আকাক্সিক্ষত কোনও উৎসবে পরিণত হবে না। অন্যথায়, সরকারি টাকার সাবসিডি নির্ভর এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের খবরদারির একটি বার্ষিক ইভেন্ট হয়েই নিষ্প্রাণভাবে কোনওমতে টিকে থাকবে। এতে সামগ্রিকভাবে বই ব্যবসা এবং লেখক-পাঠক কোনওভাবে উপকৃত হবে না। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে তাই মরিয়া হয়ে বিভাগীয় গ্রন্থমেলাকে বাণিজ্যসফল করার সবরকম আয়োজন করতে হবেই। সেজন্য সুচিন্তিত পরিকল্পনা করতেও হবে।
কোনও পাঠক, লেখক ও প্রকাশক দ্ব্যর্থকণ্ঠে ব্যক্ত করেছেন, বিভাগীয় গ্রন্থমেলা বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলে তা দেশের প্রকাশনা-ব্যবসায় কোনও অবদান রাখতে পারবে না।
একজন সুধী বিদেশ থেকে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, কী ভাবে মফসসল শহরে ঢাকার প্রকাশকদের এজেন্সিধারী খুচরা বইয়ের দোকানের প্রসার করা যায়। তেমনই তৃতীয় একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বিভাগীয় শহরে গ্রন্থমেলাকে বাণিজ্যসফল করার উপায় জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁদের বিভাগীয় গ্রন্থমেলা সম্পর্কে এ মনোভাব ও জিজ্ঞাসাকে শ্রদ্ধা জানাই।
বিহেভেরিয়াল সায়েন্স মতে, প্রফিট অথবা গেইনই মানুষকে কোনও কাজে উদ্বুদ্ধ করে। বইয়ের ছোটবড় ব্যবসায়ী, লেখক ও পাঠকÑসকলেই এর আওতায় পড়েন। আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, একজন পাঠক বই থেকে কী প্রফিট বা গেইন করেন। আমি বলব, একজন পাঠক বই পাঠ করে যে জ্ঞান অর্জন করেন, তাকেই পুঁজি করে জাগতিক ক্ষেত্রে কামিয়াব হন।
একটি গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি ইত্যাদি পাঠ করে কোনও পাঠক তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভ না করলেও তিনি ঐ সকল বই পাঠ করে বিনোদন লাভ করেন। এ বিনোদনের মূল্য মোটেও কম নয়।
বই লিখে লেখকের কী লাভ ? প্রকাশকের থেকে রয়্যালটি বাবদ অর্থ, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে সুনাম, চাকরিতে প্রমোশন−আরও কত কী।
কিন্তু যিনি প্রচুর মেহনত ও সে সঙ্গে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে বই প্রকাশ করেন তিনি তো প্রফিট অথবা গেইনের লক্ষ্যে পরিচালিত হবেন।
যে বইয়ের দোকান নগদে বা ধারে বই সংগ্রহ করে সারা বছর তার তদারকি, দোকান-ভাড়া ও কর্মচারিদের বেতন দেন তারও তো প্রফিট অথবা গেইনের লক্ষ্য থাকে।
শেষোক্ত পর্যায়ে যথেষ্ট লাভ না থাকায় মফসসলের বইয়ের দোকান ঢাকার কোনও প্রকাশকের এজেন্সি নিতে চান না। তার প্রধান কারণই ঐ পর্যায়ে বইয়ের ক্রেতার অপ্রতুলতা। আবার প্রকাশক বিভিন্ন মেলা উপলক্ষ্যে অনলাইন পদ্ধতিতে নানা কৌশলে এত বেশি ডিসকাউন্টে বই বিক্রি করেন, তাতে যে দোকান এজেন্সি নেয় তার মার্জিন ৭ থেকে ৮ পারসেন্টে নেমে আসে, সে স্থানীয় খুচরা বইয়ের দোকানে বই দিয়ে লাভবান হয় না, আবার খুচরা দোকানগুলো বিক্রেতার প্রাপ্য পুরো ডিসকাউন্টে (সাধারণত ৩৫ পার্সেন্টে) ঢাকা থেকেই বই সংগ্রহ করে। বই বিক্রি করে লাভ না থাকলে, আবার স্থানীয় খুচরা বইয়ের দোকানে যথেষ্ট মার্জিনে বই সরবরাহ করতে পারলে ঢাকার কোনও প্রকাশকের এজেন্সি নিয়ে মফসসলের কোনও এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের কী লাভ ?
গলদটা তাহলে কোথায় ? কোথায় কোন জিনিস সংশোধনে প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে ? যৌক্তিকভাবে বলা যায়, প্রকাশককে প্রথম সংশোধন করতে হবে। তিনি কোনও জেলায় একটার বেশি এজেন্সি দেবেন না। তিনি যে উপলক্ষ্যে সর্বোচ্চ যত ট্রেড ডিসকাউন্ট দিন না কেন, এজেন্টকে তার থেকে কমপক্ষে ২০ পার্সেন্ট বেশি ডিসকাউন্ট দিতে হবে। কিন্তু কথাটা বলা যত সহজ, তার বাস্তবায়ন অধিকতর কঠিন।
কারণ, বই-ব্যবসায় সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে বেচারি প্রকাশক থাকেন। যিনি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের পর প্রক্রিয়াজাত করে বইকে বাজারে আনেন। তাঁর নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছে : ১. বাজারে বিক্রয়যোগ্য (সেলেবল) লেখকের ও পাণ্ডুলিপির অত্যন্ত অভাব, ২. ক্রয়েচ্ছু পাঠকের অভাব ও তাদের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, ৩. যৎসামান্য ক্রেতার কাছে বইয়ের খবর ও বই পৌঁছানোর প্রায় অসম্ভবতা এবং ৪. বইয়ের উৎপাদন ব্যয়ের থেকে মাত্র আড়াই থেকে তিন গুণের বেশি বইয়ের অভিহিত মূল্য না রাখতে পারা।
সাধারণত দেশে একটি বইয়ের অভিহিত মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের আড়াইগুণ রেখে ১০০ টাকা হলে তার উৎপাদন ব্যয় হয় ৪০ টাকা, পুস্তক বিক্রেতার ডিসকাউন্ট ৩৫ টাকা। প্রকাশকের থাকে ২৫ টাকা। এটা দিয়েই তার এসট্যাবলিশমেন্ট ও ওভারহেড কস্ট, ট্যাক্স, লেখকের রয়্যালটি। সব বই বিক্রি হলেই তিনি অতি সামান্য কিছু আশা করতে পারেন। আমি উপরোক্ত খরচসমূহে বিনিয়োগের টাকার সুদ ধরিনি। ভাবুন প্রকাশক কোথা থেকে এজেন্সির জন্য বেশি ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করবেন ?
আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজে দেশের বই বিক্রি না হওয়াকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা আছে। সেসব ব্যাখ্যায় লক্ষ করেছি, তাঁরা প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের দায় এড়ান। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁদের হীনম্মন্যতা প্রকটভাবে প্রকাশও পায়।
কোনও বইয়ের দোকানে শওকত আলীর বিখ্যাত বই প্রদোষে প্রাকৃতজন ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময় সামনে ডিসপ্লে করা থাকলে ক্রেতাকে বই কেনার বিষয়ে দ্বিধান্বিত হতে দেখিনি। বরং, তাঁকে কোনও প্রশ্ন ছাড়াই সেই সময় কিনতে দেখেছি। উভয় বই-ই সুমুদ্রিত, সেই সময় থেকে প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর কাগজ ও বাঁধাই উন্নত, দামও কম। তাহলে নিজেদের বই বাদ দিয়ে কলকাতার বই কেনার রহস্য কোথায় ?
এ দেশের কোনও বুদ্ধিজীবী লেখককে এ প্রশ্নে সৎ ও খোলামেলা উত্তর দিতে দেখিনি। বরং বলতে শুনি, বাংলাদেশের পাঠকদের দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে। একই জিনিস আমাদের বৃহত্তর পর্যায়ে জাতীয় মননে ক্ষয়রোগের মতো স্থায়ীও হয়েছে।
আমরা কলকাতার মেলায় সাড়ম্বরে যোগ দিই, বিশাল প্যাভিলিয়ন করি, প্রকাশকদের চেয়ে বেশি উৎসাহী হয়ে মন্ত্রী, আমলা, সরকারি কর্মচারীরা কলকাতা ভ্রমণ করেন। মেলার একটি দিন বাংলাদেশকে উৎসর্গ করা হয়। বিনিময়ে আমরা বাংলা একাডেমির মেলায় ভারতীয় প্রকাশকদের যোগদান নিষিদ্ধ রেখেছি। প্রয়াত আহমদ ছফা ছিলেন এর একজন বড় ক্যাম্পেনার। কারণ কী ? তিনি এর কারণ রাখঢাক রাখেননি। সেটা স্পষ্ট করে বললে, ভারতীয় বইকে বাংলাদেশের প্রকাশক ও লেখকদের গোষ্ঠীগত ভয়ই তো ? ওরা এলে আমাদের বই বিক্রি না হবার ভয়।
তাহলে কি স্বীকার করতে হবে, উভয় দেশের বইতে প্রায় সমান সমান উপকরণ যোগ করা হলেও আমাদের বই নামক পণ্যের অন্যতম প্রধান উপাদান, লেখকের রচনা, তাতে কি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ? এ জন্যেই কি পাঠক সৃষ্টি কিংবা ক্রেতা তৈরি হচ্ছে না ?
এটিই কি আসল কারণ, যেজন্য প্রকাশক সকল ট্রিকস ব্যবহার করেও বইকে জনমুখী করতে পারছেন না। বইয়ের সেই চাহিদা সৃষ্টি করতে পারছেন না যার ওপর নির্ভর করে প্রচলিত ধারায় বিপণনে প্রযোজ্য ফোর পি অর্থাৎ প্রোডাক্ট, প্লেস, প্রাইস ও প্রোমোশন ঠিকঠাক করেও কূল করতে পারছেন না বা এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কিংবা তত্ত্বটিকেই প্রয়োগ করতে পারছেন না ?
যাঁরা বাংলাদেশের সৃজনশীল বইয়ের বাজারজাতকরণ সম্পর্কে মাঝে মাঝে কেতাবি কথা বলেন তাঁদের বলতে শোনা যায়, দেশের মফসসল শহর ও হাট-বাজারে সৃজনশীল বই না থাকার অন্যতম কারণ হলো−দেশে ঐ ধরনের বইয়ের ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা। তাঁদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ এই আবিষ্কার হাসির উদ্রেক করে। মনে হয়, তাঁরা সোনার পাথর বাটির জন্য হাহাকার তুলেছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে উপস্থিত বা সম্ভাব্য চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই কোনও পণ্যের উৎপাদক বা আমদানিকারক পণ্যটির বাজারজাতকরণের পরিকল্পনা করেন। কেন্দ্র থেকে উপকেন্দ্র, উপকেন্দ্র থেকে উপ-উপকেন্দ্র, অতঃপর স্থানীয় বাণিজ্যকেন্দ্র, হাট-বাজারে পণ্যটি সরবরাহ হয় এবং বিক্রিত পণ্যের টাকাও এর উলটোযাত্রায় মূল সরবরাহকারীর কাছে পৌঁছায়। এভাবেই সরবরাহ ব্যবস্থা কাজ করে। চাহিদা না থাকলে বা চাহিদার পরিমাণ একান্তই তুচ্ছ হলে ঐ পণ্যের ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যবসায় কেউ এগিয়ে আসবেন কি ?
বাবু চিত্তরঞ্জন সাহার পুথিঘরের দেশব্যাপী ডিপো এবং লোকাল ডিস্ট্রিবিউশন করার সমুদয় আয়োজন ছিল। তিনি তাঁর সেই অ্যাডভান্টেজকে সৃজনশীল বইয়ের কারবার মুক্তধারায় কাজে লাগাতে পারেননি। কারণ একটাই। তিনি ঐ শ্রেণির বইয়ের যথেষ্ট চাহিদার সন্ধান পাননি। তিনি অজস্র বই ছেপেও কাক্সিক্ষত (commercially viable) চাহিদা সৃষ্টি করতে পারেননি।
কিন্তু এই ধরনের বইয়ের বেলায় না হলে ঢাকার প্রকাশকেরা নোট, গাইড, সাজেশন, টেস্টপেপার, মাদ্রাসাগোত্রীয় বিভিন্ন বই জেলায়, জেলা থেকে উপজেলায়, মফস্বলের বিভিন্ন কেন্দ্রে পৌঁছানো এবং বিক্রিত বইয়ের টাকাও ঠিকঠাক পাচ্ছেন। কারণ, ঐ সকল বইয়ের চাহিদা আছে। বিনিয়োগে ভালো লাভের জন্য ঐ ব্যবসায় বর্ধিত হারে বিনিয়োগ ও তদারকির জনবল আছে। ঐ সকল বইয়ের ব্যবসায়ীকে তাই নিত্য হায়-হায় করতে শুনি না।
২৮ জানুয়ারি ২০২১ কোভিড মহামারির সময় খ্যাতিমান অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক আলম খোরশেদ ‘বিস্তার সাহিত্যচক্র’ আয়োজিত সাপ্তাহিক সাহিত্যবিষয়ক অন্তর্জাল অনুষ্ঠান (২৭তম) পাণ্ডুলিপি করে আয়োজনে বই সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে আমার একটি সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার (https://youtu.be/D3MIhpy8eFF) নেন। তাঁর প্রস্তুতি ভালো ছিল। আমাকে এক্সেটেম্পোর উত্তর দিতে হয়েছিল। তিনি বইয়ের প্রকাশনা থেকে বিপণনÑসকল বিষয়ে আলাপ করেন।
তাঁরও একটি প্রশ্ন ছিল, সৃজনশীল বই কেন মফস্বল ও গ্রামেগঞ্জে পাওয়া যায় না ? পাওয়ার উপায় কি ? আমি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করি, আপনি কী গ্রামের দিকে যান (তিনি চট্টগ্রাম শহরবাসী) ? একটু ইতস্তত উত্তর দেন, হ্যাঁ যাই। বলি, বাজারে উঁকি দেন। বলেন, দিই। বাজারে কোল্ড ড্রিংক, চিপস ইত্যাদি দেখেন ? বলেন, হ্যাঁ। বলি, মফসসলের বাজারে ঐ জিনিসগুলো কেন যায় ? তিনি প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন বিবেচনায় আলাপ সংক্ষিপ্ত করি। ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাইকে উপেক্ষা করে পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের আর কোনও বিকল্প উপায় আছে কি ?
সবকিছু বিচারে এটাই স্পষ্ট যে, যথেষ্ট ক্রেতা না থাকাটাই বাংলাদেশের গ্রন্থ প্রকাশনার মূল সমস্যা। শহরে কিংবা মফসসলে অতি সামান্য তারতম্য ভেদে চিত্রটি একই রকম। এই ক্রেতাদের আমরা কোথায় পাব ? কীভাবে পাব ?
বইয়ের ক্রেতা মোটাদাগে দু প্রকার : ১. পাঠক ক্রেতা : যিনি কোনও না কোনওভাবে উদ্বুদ্ধ বা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের টাকায় বই কেনেন; ২. প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা : যারা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনে বই কেনেন ; যেমন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি স্পেশালাইজড বা গণগ্রন্থাগার ও বিভিন্ন প্রকল্প, যেমন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্ট্রেন্থদেনিং রিডিং হ্যাবিট অ্যান্ড রিডিং স্কিল।
যেসব দেশে প্রথমোক্ত ধরনে ক্রেতা কম থাকে, সেসব দেশে সরকার সচেতন হলে দ্বিতীয় রকমে ক্রেতাদের বই কেনার বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার থেকে বই বিক্রির একটি সহনীয় অনুপাত বজায় থাকে। কিন্তু, আামাদের দেশে সেই সমন্বিত চেষ্টা কখনও দেখা যায়নি। কখনও কোনও মহল অনুরূপ উদ্যোগ নেয়নি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে যে যার অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। অনেক উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, এখানে দুর্নীতি (?), রাজনৈতিক চাপ ও উপর মহল থেকে তদবির (হুকুম) কোথাও কোথাও প্রধান বিবেচ্য হিসেবে কাজ করে।
জনগণের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টি করে ভালো বই অ্যাকোয়ার করার ইচ্ছা বা ডিজায়ারকে অ্যাকশনে পরিণত করা গেলেই কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি বইয়ের ক্রেতায় পরিণত হন। যতক্ষণ না তিনি বা তাঁরা বই কিনছেন ততক্ষণ প্রকাশকের বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসে না।
লাইব্রেরি সার্ভিস বিস্তৃত করে জনগণের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টি করা গেলেও অর্থাভাবে বা অন্যান্য কারণে, বাংলাদেশের বাস্তবতায়, তাঁদের একটি ক্ষুদ্র অংশকেই কেবল বইয়ের ক্রেতারূপে পাওয়া সম্ভব। তবু, জনগণের পাঠাভ্যাসের ওপরই বইয়ের প্রকাশনা ও বিতরণ নির্ভরশীল। দেশব্যাপী পাঠাভ্যাস সৃষ্টি গ্রন্থকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বইমেলার আয়োজন ঐ লক্ষ্য পূরণের একটি অনুষঙ্গ মাত্র।
যা হোক, জনসাধারণের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টিরই অপর নাম দেশে ‘রিডিং সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করা। সেটা কীভাবে সম্ভব তার উপায় খ্ুঁজতেই ১৯৯৪ সালে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণীত হয়েছিল। তার ৩৪টি সুপারিশের শেষটি ছিল গ্রন্থনীতি বাস্তবায়নে একটি জাতীয় গ্রন্থনীতি কমিটি গঠন এবং ২৪ নম্বর ছিল ‘গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সামগ্রিক কর্মপরিধি ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠানকে পুনর্বিন্যস্ত করে ইউনেস্কোর প্রস্তাবের আলোকে বাংলাদেশ গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ নামে একটি উপযোগী প্রতিষ্ঠানে রূপদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।’
জাতীয় গ্রন্থনীতি ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪-তে ক্যাবিনেট কমিটি কর্তৃক গৃহীত হবার অনতিবিলম্বে (মার্চ, ১৯৯৪) প্রধানমন্ত্রী ঐ গ্রন্থনীতি বাস্তবায়নের সরকারি আদেশ জারি করেন। কিন্তু, গ্রন্থনীতি অনুমোদনের দীর্ঘ বত্রিশ বছর পরও আজ পর্যন্ত একটি রেকমেন্ডেশনও বাস্তবায়িত হয়নি। গ্রন্থ প্রকাশনা সেক্টর কত অবহেলিত এবং অপদার্থদের কর্মক্ষেত্র, তা প্রমাণের জন্য দ্বিতীয় আর কোনও উদাহরণের প্রয়োজন আছে কি ?
বইকে কোনও ব্যক্তির সহজ নাগালে, অর্থাৎ ঘরের কাছে বইয়ের দোকান, গণগ্রন্থাগারের উপস্থিতি থাকলেই কেউ পাঠক হয় না বা তার বইকেনার ইচ্ছা তৈরি হয় না। এক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি জিনিস আবশ্যক : ১. পাঠদক্ষতা অর্থাৎ পড়ে বোঝার ক্ষমতা; ২. পাঠাভ্যাস।
পাঠাভ্যাস একদিনে গড়ে ওঠে না। বলা হয়, অভ্যাসের ছেলেবেলা থেকে লালন-পালন হয়, সেটাই সবচেয়ে স্থায়ী হয়। আর পড়ার অভ্যাসের ব্যাপারে পরীক্ষিত ও সর্বজনমান্য পরামর্শ হলো, ক্যাচ দেম ইয়ং। ছোট থাকতে থাকতেই তাদের পাঠকে পরিণত কর। এ বিষয়ে জাতির কর্ণধারগণ এবং যেসব এজেন্সি দেশে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি করার জন্য জান-কোরবান করার দাায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের সবারই একবার আত্মজিজ্ঞাসা করা উচিত এই বিশাল দায়িত্বের তাঁরা এ পর্যন্ত কে কতটুকু করেছেন ? বাইরে থেকে আমরা নিট রেজাল্ট যা দেখি, সেটা শূন্য। আমার কথাটা ভুল হলে সত্যিটা তাঁরা জাতিকে জানান।
শুরুতে পাঠদক্ষতা নিয়ে আলোচনা করতে পারি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কী বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বর্ণপরিচয় লাভ করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যতটুকু বা ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করে স্কুল ড্রপআউট হয়ে পাঠোপকরণের প্রয়োজনহীনতা ও সংস্পর্শের অভাবে সেই অর্জনকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে। আবার যারা স্কুলে থাকে তারা পাঠ্যবই ব্যতীত জ্ঞানবিজ্ঞান এবং বিনোদনমূলক বইয়ের সান্নিধ্য লাভ করতে পারে না।
আমাদের পরিবারগুলো থেকে শিশুরা সাধারণভাবে ভালো কিছু শেখে না। কল্পনা ও মননের বিকাশ শিশুদের প্রায় পরিবারে সংকুচিত। স্কুলে শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা ও সৃষ্টিশীল বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুমানস গঠিত হয়। সে ঐ বয়সে তার পাঠদক্ষতার সমান্তরাল বিভিন্ন বই পড়তে পারলে তার কল্পনা, সৃষ্টিশীলতা ও জ্ঞানবিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে একজন ভবিষতের পাঠক অঙ্কুরিত হয়। আমরা কি এ নিয়ে কখনও ভেবেছি ? না, বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী পালনের অছিলায় কোটি কোটি টাকার শিশুর অপাঠ্য বই কিনে কিছু গ্রন্থবণিক ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তির লাভবান হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি অসম্ভব হলে শ্রেণিপিছু কিছু বইসহ বুকসেল্ফ বরাদ্দ টাকায় স্বচ্ছন্দে হয়ে যেত। কিন্তু আমরা তো শিক্ষার্থীদের ভালো ভাবিনি, স্বীয় স্বার্থে তাদের উপলক্ষ্য করেছি মাত্র।
মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে এ ব্যাপারে আমাদের কীর্তি তুলনাহীন। ব্রিটিশ আমল থেকেই এ স্তরে সরকারি-বেসরকারি যে স্কুলই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন−লাইব্রেরি থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু বেসরকারি স্কুলগুলোতে বিদ্যমান লাইব্রেরির অবস্থা কী রকম ছিল, ১৯৩৮ সালে এক সরকারি রিপোর্টে তার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে :
It is not unusual now to find a school Library, which is open only once a week and from which the issue of books for reading in school or for taking home is made as difficult as possible. Inspection has shown that in many cases Library books are kept in disorderly fashion… In some cases, the Library books are not suitable for school boys.
স্কুলে লাইব্রেরি থাকার আইন সে থেকে আজও আছে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় এভাবে : এরশাদ সাহেবের মার্শাল ল’তে এনাম কমিটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রিস্ট্রাকচারিংয়ের দায়িত্ব পায়। এ কমিটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোর লাইব্রেরিয়ানের পদ বিলোপপূর্বক শিক্ষার্থীদের জন্য লাইব্রেরি সার্ভিসই বন্ধ করে। এ থেকে অন্তত বোঝা যায়, সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে লাইব্রেরি ছিল। কতখানি কার্যকরভাবে তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এ যেন কাদম্বরী মরিয়া…
আর, বেসরকারি স্কুলের লাইব্রেরি ? ১৯৮০-এর দশকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ফজলে রাব্বি ও আমি দাপ্তরিক কাজে যশোর শহরে অবস্থান করছিলাম। দুপুরে আমরা বইয়ের বাজার পরিদর্শনে গিয়ে একটি দোকানে বেশ ভালো সংগ্রহ দেখি। কিন্তু, দোকানদারকে নিদ্রিত অবস্থায় পাই। তাঁকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করার জন্য ঘুম ভাঙালে বেশ বিরক্ত হন। তারপর, এসব বইয়ের বিক্রি কেমন জিজ্ঞেস করলে তিনি একরাশ বিরক্তি নিয়ে উত্তর দেন, আমরা এই বই বিক্রি করি না। স্কুল-ইন্সúেক্টর স্কুল পরিদর্শনে এলে স্কুল এসব বই ভাড়ায় নিয়ে যায়। এসব বই তাই বিক্রির জন্য নয়।
তবু তো জানা গেল, স্কুলে লাইব্রেরি থাকার ব্রিটিশ আমলের নিয়ম বহাল আছে। সদাশয় স্কুল-ইন্সúেক্টরগণ স্কুল পরিদর্শনে গেলে লাইব্রেরিও একটি বিষয় হয়। এখান থেকে জানা গেল, যারা মাধ্যমিক স্কুলে লেখাপড়া করেছে, তাদের জন্য লাইব্রেরির প্রভিশন থাকলেও পাঠাভ্যাস সৃষ্টিতে কার্যকর কিছু করা হয়নি। আর, কার্যকর কিছু করতে গিয়ে তার কী বিষম ফল হয়েছে আগামীতে বলার ইচ্ছা রাখি।
স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, মাটিতে চাষ করলে সোনা ফলতো অর্থাৎ পাঠক ও ভবিষ্যতের বই-ক্রয়েচ্ছু পাঠককে পেতে পারতাম, সেই মাটি প্রকৃতপক্ষে অকর্ষিত রয়েছে। কিন্তু সেজন্য পাঠক-পাঠাভ্যাস সৃষ্টির নামে রঙ্গতামাশা কিন্তু থেমে নেই।
ব্রিটিশ আমলে মাধ্যমিক স্কুল থেকে উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে লাইব্রেরি থাকা বাধ্যতামূলক ছিল, সে নিয়ম অদ্যাবধি চালু আছে। যদিও বেশির ভাগই ছিল কাগজে-কলমে। এদের সাংগঠনিক কাঠামো লাইব্রেরিয়ান পদের (সহকারী) প্রভিশন থাকলেও ঐ জনবল দু-একটি ব্যতিক্রমী স্কুল ছাড়া বেসরকারি স্কুলে পূরণ করা হতো না। এমনিতেই স্কুল ম্যানেজমেন্ট স্বীয় প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি থাকার আবশ্যকতা অনুভব করতেন না। আর যদি কেউ করতেন, তখন ঐ লাইব্রেরিয়ানের বেতন কোথা থেকে আসবে, সে প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিত। এককথায়, কোনও সময়ই ঐ সব প্রতিষ্ঠানে কারুরই কার্যকর লাইব্রেরির অস্তিত্ব চোখে পড়েনি।
দেখা গেল এখানে প্রধান সমস্যা লাইব্রেরিয়ানের বেতন, যেহেতু পদগুলো আছে, তাই ঐ পদগুলোকে সরকারের এমপিও (মান্থলি পে অর্ডার) প্রজেক্টের অন্তর্ভুক্ত করলে দীর্ঘ দিনের জমে থাকা এ সমস্যাটির সমাধান হয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দেশব্যাপী স্কুল শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গঠনে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করে আসছিল, ঐ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এ দিকে নজর পড়ে। তিনি এটা উপলব্ধি করেন যে, স্কুলে লাইব্রেরি থাকা যেমন শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস যেমন জরুরি, তেমনি ঐ জনবল তাঁর প্রতিষ্ঠানের দেশব্যাপী (পর্যায়ক্রমে) পাঠাভ্যাস কর্মসূচির জন্যও সহায়ক হবে।
এই বিবেচনায় তিনি সরকারের উচ্চমহলে জোর তদবির করে সফল হন। সরকার ২০১০ সালে গ্রন্থাগরিকের শূন্যপদকে এমপিওভুক্ত করে। পদের নাম সহকারী গ্রন্থাগরিক, দশম গ্রেড, প্রার্থীর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা স্নাতক বা সম্মানসহ স্নাতক এবং গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এক বছরের ডিপ্লোমা। ডিপ্লোমাটি বাধ্যতামূলক।
সে সময় এই ডিপ্লোমার কোনও চাহিদা ছিল না। তারপরও গোটাতিনেক প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এই কোর্স পরিচালনা করত। যাঁরা কোর্স করতেন, তাঁরা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি, এরকম একটা সুযোগ এই কোর্স সম্পন্নকারীদের জন্য আসতে পারে। মুষ্টিমেয় কয়েকজনেই সরকারের ঘোষিত এই নতুন পদের যোগ্যতা ছিল। বয়স ও কর্মস্থল প্রধানত গ্রামীণ অঞ্চল হওয়ায় চাকরিটি যোগ্যদের নিরুৎসাহিত করার কথা। কিন্তু তাতে কী, ত্বরিত গতিতে মূলত স্থানীয় বেকার যুবক-যুবতী কোনও প্রকার ক্লাস না করেই কতক ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট ক্রয় করে। সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভুয়া ক্যাম্পাস ( ?) খুলে উচ্চমূল্যে ঐ সার্টিফিকেট বিক্রি করে। বহুলভাবে কথিত ও প্রচারিত যে, জেনেশুনে ঐ সকল জাল সার্টিফিকেট জমা করে স্কুল ও সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষও অতি উচ্চমূল্যে রাতারাতি ঐ পদ বিক্রি ( ?) করে। বাংলাদেশ লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় বাইশ হাজার ব্যক্তি এভাবে নিয়োগ পায়। তবে, জুরিখে কর্মরত গবেষক জাকির হোসেনের একটি স্টাডি (status of secondary school libraries and librarians in Bangladesh) June IFLA Journal ৪৫(২) (১৫৭-১৬৭) মতে, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০, ৫৬০ জনকে মাধ্যমিক স্কুলে এমপিওভুক্ত অ্যাসিস্টান্ট লাইব্রেরিয়ান পদে নিযুক্ত করা হয়। এ লেখকের মতে, মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে ৭৬১৮ এবং ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি ২৩১৯টি প্রতিষ্ঠান ও কারিগরি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে এই হিসাবে ধরা হয়নি এবং সংখ্যাগুলি ২০১৭ সালের।
নিয়োগপ্রাপ্ত এই ব্যক্তিদের ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের (যাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন) এই জালিয়াতি চাপা থাকেনি। সরকার বিচারপতি কাজী এবাদুল হককে প্রধান করে কমিশন গঠন করে। কমিশন স্পষ্ট করে জানায় যে, দাখিলকৃত সার্টিফিকেট জাল। কিন্তু, জনপ্রতিনিধিদের প্রবল চাপে সরকার এই প্রবঞ্চকদের চাকুরিচ্যুত তো করতেই পারেনি বরং কতক সহজ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তাদের চাকরি বহাল রাখে।
আজও তারা দিব্যি আছে। মাস গেলে বেতনের ব্যাপারে তারা এতটাই নিশ্চিন্ত যে, লাইব্রেরির ভাবনা ভাবতে হয় না। এই ব্যক্তিরা, বলতে গেলে, কেউই লাইব্রেরির দায়িত্ব পালনে আগ্রহী নয়, করেও না। সরকার এদের নন-টিচিং স্টাফ ঘোষণার পরও তারা শিক্ষক, নয়তো নিদেনপক্ষে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে আগ্রহী। ফলে, স্কুল লাইব্রেরি যে তিমিরে ছিল, সেখানেই আছে। পাঠাভ্যাস ও পাঠক তৈরিÑসবই কল্পলোকে বা দিবাস্বপ্ন হয়ে থাকল আরও কয়েক দশক।
পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে জাতি গঠনের এমন একটি সুবর্ণ সম্ভাবনার সুযোগ দায়িত্বজ্ঞানহীন, অসৎ ও লোভী লোকজনের কারণে আঁতুড় ঘরেই মারা গেল। হায়রে, অভাগা জাতি! অতি প্রার্থিত স্কুল লাইব্রেরিকে জাহান্নামে রেখে তার পরিবর্তে বছরে দশ-বিশটা বাছাই করা স্কুলে বুক এক্সিবিশন কাম সেলসের আয়োজন করেই নাকি সংঘটিত এই বিপুল ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব। এভাবেই নাকি এক সময় দেশে রিডিং সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করব। কষ্টকল্পনারও একটা সীমা থাকে।
ব্যানবেইসে এমপিওভুক্ত গ্রন্থাগারিকদের সর্বশেষ সংখ্যা অনায়াসে জানা যাবে। তবে গুগলে ২০১৭ সালের একটি রিপোর্টে উল্লেখ আছে, ১. বাংলাদেশে সেকেন্ডারি স্তরে ১২,১৯৮ জন লাইব্রেরিয়ান আছেন; ২. এদের প্রায় সবাই এমপিও স্কিমে বেতন পাচ্ছেন; ৩. এমপিওভুক্ত লাইব্রেরিয়ান থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ স্কুলে লাইব্রেরি চোখে পড়ে না। ৪. লাইব্রেরির জন্য কোনও বাজেট নেই; ৫. উক্ত রিপোর্ট ২০১৩ সালে ঢাকা ট্রিবিউনের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে উল্লেখ করে জানিয়েছে, ২০১৩ সালেও কিছু লাইব্রেরিয়ান বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের সনদধারী ছিলেন।
কিন্তু ভয়াবহ যে তথ্য অপেক্ষা করছে তা হলো, লাইব্রেরির অস্তিত্ব না থাকলেও এবং লাইব্রেরি পরিচালনা না করেও এই বিপুল সংখ্যক জনবল এমপিও স্কিম অনুযায়ী বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করছে।
এসব নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনও মাথাব্যথা নেই। অপরদিকে, অভিভাবক সম্প্রদায় থেকেও কেউ আওয়াজ তোলে না, লাইব্রেরিয়ান এমপিওভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের সন্তানেরা কেন স্কুলের লাইব্রেরি সুবিধা থেকে বঞ্চিত ?
আবার যাঁদের দেশে গ্রন্থের প্রচার-প্রসার ও সারা দেশে পাঠাভ্যাসের অভাব নিয়ে ঢেঁকুর তোলাই কাজ বা যাঁদের রুটিরুজি এই খাতের উন্নতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত তাঁরাও সম্মিলিতভাবে যথাস্থানে এজন্য তদ্বির-তাগাদা, জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির কোনও চেষ্টাই করেন না। সবাই আশ্চর্য রকমের চুপচাপ।
কল্পনা করুন তো, যদি প্রাথমিক স্তরে পরিকল্পনামাফিক শিশুমনে বইপাঠের স্থায়ী আকাক্সক্ষা বপণ করা যেত, যদি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক, ইন্টারমিডিয়েট, ডিগ্রি স্তরে ও মাদ্রাসা শিক্ষার সমান্তরাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে (এরা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান) যথাযথ লাইব্রেরি সার্ভিস পরিচানা করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যপুস্তক-বহির্ভূত জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য -সুস্থ বিনোদনমূলক বই পাঠের অভ্যাস তৈরি করা যেত, তাহলে বছরে কী বিপুল সংখ্যক পাঠক ও বইক্রয়েচ্ছু পাঠকের নিয়মিত জোগান ঐসব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান দিয়ে যেতে পারত। এদের একটা বড় অংশ অভ্যাসের তাড়না ও বই সম্পর্কে সচেতনতার কারণে অবশ্যই বাজারে ভিড় করত। ফলে, আমাদের একটি পাঠপ্রবণ সুস্থ জাতি গড়ে উঠত এবং জাতীয় জীবনে সুবাতাস বইতে পারত।
প্রতিষ্ঠান আছে, বেতনভোগী জনবল আছে অথচ লাইব্রেরির জন্য বাজেট নেই। এটা কি আমাদের লজ্জিত করে না ? মোটিভেশন থাকলে ঐ লাইব্রেরিয়ান সম্প্রদায়ই উপর মহল ও সরকারের কাছে বাজেট দাবি করতে পারতেন, যেমন বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিদাওয়া নিয়ে করে।
সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রকৃতই জনহিতৈষী হলে বাজেটের অভাবে যে লাইব্রেরি চলছে না তার বিহিত অবশ্যই করতেন। লাইব্রেরিয়ানের এক বা দু মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ লাইব্রেরি বাজেটে বই কেনা ও অন্যান্য খরচ বাবদে অনায়াসেই বরাদ্দ দিতে পারতেন।
স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কর্তৃপক্ষ জনসচেতন ও শিক্ষার্থীদের হিতৈষী হলে তাঁরা ঐ বাজেটের সামান্য টাকা অন্য কোনও খাত থেকে সাশ্রয় করতে পারতেন। বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন দিতে হয়, তাঁরা তো ঐ বেতনের সঙ্গে লাইব্রেরি বাবদে সামান্য ফি নিতে পারতেন। না কী পারতেন না ?
২০১৬-’১৭-এর উপাত্ত অনুযায়ী দেশব্যাপী ৩,২৫৬টি জুনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল, ১২,৭৭৫টি সেকেন্ডারি স্কুল, ৫৩৮০টি দাখিল মাদ্রাসা, ১,১১১টি আলিম মাদ্রাসা, ৯৮২টি ফাজিল মাদ্রাসা, ১৪৫টি কামিল মাদ্রাসা, ১,৩৮৩টি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও ৯৩৬টি ডিগ্রি কলেজ, সর্বমোট ২৫,৯৬৮টি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে।
উপরোক্ত প্রতিষ্ঠান কেবল বিধি অনুযায়ী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য লাইব্রেরি পরিচালনা এবং লাইব্রেরির জন্য বই বাধ্যতামূলকভাবে নিজ উপজেলা বা জেলাস্থ বইয়ের দোকান থেকে ক্রয় করলে মফসসল শহরেও চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে প্রকাশকদের বই সরবরাহের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
স্থানীয়ভাবে নিয়মিত ও স্থায়ী চাহিদা সৃষ্টি হলে অবশ্যই দেশে বই বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে বাধ্য। আমার তো তাই মনে হয়। এটা কোনও আকাশ-কুসুম কল্পনা নয়। এটি সম্ভব। প্রয়োজন শুধু ঐ লক্ষ্যপূরণে দৃঢ় অঙ্গীকার ও ঐক্যবদ্ধভাবে সমবেত প্রচেষ্টা।
জনগণের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টি ও তাদের নিজস্ব বই সংগ্রহকে উৎসাহিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে। তবে, তার ক্রমবৃদ্ধি ও পাঠাভ্যাস জীবনভর জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে পাবলিক লাইব্রেরি বা গণগ্রন্থাগার প্রধান ভূমিকা পালন করে।
গণগ্রন্থাগার প্রকাশকদের অন্যতম বড় ক্রেতাও। বাংলাদেশে সরকারি গণগ্রন্থাগার ৭১টি এবং সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি গণগ্রন্থাগার প্রায় নয়শত।
একবার ভাবুন তো, যদি এই গ্রন্থাগারগুলো বই কেনা বাবদে বরাদ্দ টাকার বই নিজ উপজেলা ও জেলাস্থ বইয়ের দোকান থেকে কিনত, তবে দেশে বই বিপণনের চিত্র কেমন হতে পারত! কিন্তু, সেটি হচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতেও তা সম্ভব নয়।
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা থেকে বই কেনে। প্রকাশকদের থেকে বইয়ের তালিকা নিয়ে সেইসব তালিকাভুক্ত বই থেকে বই নির্বাচন করে আমলানির্ভর কমিটি। স্থানীয় পর্যায়ে পাঠকের কি চাহিদা তার দিকে কমিটি ভ্রƒক্ষেপ করে না। কমিটিই ঠিক করে, লাইব্রেরিতে কী বই থাকবে। কমিটিই পাঠকের রুচি নির্মাণ করে। এটা এক ধরনের জুলুম বৈকি!
অথচ উন্নত দেশে এই লাইব্রেরিগুলো কমিউনিটি লাইব্রেরি হিসেবে পরিচালিত হয়। কমিউনিটির প্রয়োজন, ইচ্ছা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে লাইব্রেরিয়ান বই নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় বইয়ের দোকান থেকে বই কেনেন। এ কারণে স্থানীয় বইয়ের দোকানকে এফিসিয়েন্ট এবং লাইব্রেরিতে নিয়মিত সার্ভিস দিতে হয়। ফলে, দুই তরফে এফিসিয়েন্সি বাড়ে।
কিন্তু, বাংলাদেশে সরকারি গণগ্রন্থাগারে দেশীয় বইকেনায় এক অদ্ভুত সিস্টেম কাজ করে। পরিবেশক বা বইয়ের খুচরা দোকানদারদের সম্ভাব্য সার্ভিসকে উপেক্ষা করে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর একটি নির্দিষ্ট কমিশনে সরাসরি প্রকাশকদের কাছ থেকে বই কেনে।
বই নির্বাচন পদ্ধতিও অদ্ভুত। বই নির্বাচনকালে কর্তৃপক্ষ প্রকাশকদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি অনুয়ায়ী তাদের মধ্যে সুবিধা বণ্টনের নীতি অনুসরণ করেন। প্রথমে প্রকাশকদের কোনও অর্থবছরের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক বইয়ের তালিকা চাওয়া হয়। সেই প্রকাশক ঐ নির্ধারিত সংখ্যার অধিক উন্নতমানের প্রয়োজনীয় বই প্রকাশ করলেও ঐ তালিকাতে সে সব বই উহ্য থাকে।
কর্তৃপক্ষ আবার অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের মধ্যে বরাদ্দ অর্থ প্রকাশকের প্রভাব অনুযায়ী ভাগ করে ঐ টাকার মধ্যে যতগুলি বই কেনা যায় ততগুলি বই শতকরা ৩০ পার্সেন্ট কমিশনে প্রকাশককে সরবরাহের অর্ডার দেন। ফলে প্রকাশক, লেখক ও বইয়ের বেলায় মুড়ি ও মিছরির একই দর বিবেচিত হয়। এই পদ্ধতিতে যে কোনও বছরে সব ভালো বই বা ভালো বইয়ের ক্রমানুসারে বই প্রকাশকের বই বিক্রি হয় না।
সে যা হোক, গণগ্রন্থাগার বই ক্রয় ও বইয়ের প্রসেসিংয়ের এমন এক পদ্ধতি চালু রেখেছে যে, চাইলেও বই স্থানীয় বইয়ের দোকান থেকে কেনা যাবে না। তাঁরা শাখাস্তরে বই ক্ল্যাশিফিকেশনের কোনও ব্যবস্থা রাখেননি। কেন্দ্রীয়ভাবে বই কিনে কেন্দ্রীয়ভাবে কাজটি সম্পন্ন করা হয়। এর ওপর স্থানীয়ভাবে কিনলে আছে বই কেনার জন্য টেন্ডারের বাধ্যবাধকতা। কারণ, ঐ স্তরে কোনও বই একাধিক খুচরা দোকানে থাকতে পারে। উন্নত দেশে এই ক্ষেত্রে ‘ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ’ নীতি পালিত হয়। খুচরা দোকানে কাউকে কমিশন দেওয়া হয় না।
সুতরাং, সরকারি গণগ্রন্থাগার থেকে স্থানীয় বুকট্রেড কোনও সুবিধাই পাচ্ছে না। গ্রন্থাগারিক ও বইয়ের দোকানদারদের মধ্যে পেশাগতভাবে কোনও সম্পর্ক তৈরির সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না।
সরকারের অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি গ্রন্থাগারের জন্য বই নির্বাচন ও সরবরাহের পদ্ধতি অভিন্ন হলেও এর ব্যবস্থাপনায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আছে। ঐ প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য দেশের গ্রন্থ উন্নয়ন। বেসরকারি লাইব্রেরিতে বই সরবরাহ ব্যবস্থাকে গ্রন্থকেন্দ্রের মূল লক্ষ্য অর্জনে কিছুটা ভিন্নভাবে পরিচালনার মাধ্যমে জেলা ও উপজেলায় বই বিপণনের বিস্তার সম্ভব।
দেশব্যাপী প্রায় নয়শত বেসরকারি গণগ্রন্থাগারকে সরকার বছরে একবার অনুদান দেয়। বরাদ্দ টাকার অর্ধেক টাকার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে সরবরাহ এবং বাকি টাকা সরাসরি পাঠাগারের অ্যাকাউন্টে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়। এ খাতে বার্ষিক বরাদ্দ পাঁচ কোটি টাকার ওপর।
এই ব্যবস্থার পেছনে একটা ইতিহাস আছে। পূর্ব পাকিস্তান আমল থেকে ডিপিআই অফিস থেকে প্রায় একশতের মতো বেসরকারি গণগ্রন্থাগারকে বার্ষিক একবার নগদ অর্থ প্রদান করা হতো। মূলত জেলা, মহকুমা ও মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যেই টাকার বিতরণ সীমিত থাকত। টাকার পরিমাণও তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না।
স্বাধীনতার পর এই অর্থ বিতরণের দায়িত্ব সংস্কৃতি বিভাগ/মন্ত্রণালয়ের ওপর অর্পিত হয়। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় দাপ্তরিক কাজে আমি কক্সবাজার গেলে গণগ্রন্থাগারেও ঢুঁ মারি। কথায়-কথায় জানতে পারি, ঐ গ্রন্থাগার অনুদানের টাকা দিয়ে কখনও বই কেনে না। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খরচ মেটাতে ঐ টাকা খরচ হয়। এছাড়া, তাদের উপায়ও নেই। লাইব্রেরির সদস্য চাঁদা বাবদ অতি সামান্য টাকা আয় হয়। কালেভদ্রে এখান-সেখান থেকে কিছু টাকা পায়। তবে, ঐ টাকা পাওয়ার কোনও গ্যারান্টি নেই।
ঐ সময় আরও কয়েকটি গণগ্রন্থাগারে খোঁজ নিয়ে ঐ একই চিত্র দেখতে পাই। এ বাস্তবতায় আমি গ্রন্থকেন্দ্রের তৎকালীন পরিচালক ফজলে রাব্বিকে অনুরোধ করি, তিনি যেন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে অনুদানের টাকা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নামে এমনভাবে আনেন যাতে আমরা গণগ্রন্থাগারগুলোকে অনুদান অর্ধেক টাকা নগদে এবং বাকি টাকার বই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বিক্রয় বিভাগ থেকে সরবরাহ করতে পারি। আইডিয়াটি তাঁর মনে ধরে এবং একক প্রচেষ্টায় আমার পরামর্শটিকে বাস্তব রূপ দিতে সক্ষম হন।
এই পরামর্শের পেছনে যুক্তি ছিল যে, ফলে ১. গ্রন্থাগারগুলোতে প্রকাশকদের বই ঢুকবে; ২. আমরা ততদিন পর্যন্ত প্রকাশকদের কোনও আর্থিক সহায়তা দিতে পারিনি, এই প্র্যাকটিসের ফলে তাঁরা পরোক্ষভাবে আর্থিক সহায়তা পাবেন, অন্যথায় নগদ অর্থ সহায়তার নয়-ছয় হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে; ৩. এতদিন এ সকল গ্রন্থাগারের আর্থিক অনুদান বৃদ্ধির জন্য সরকারের কাছে তদ্বির-তাগাদা করার কেউ ছিল না। এরপর থেকে গ্রন্থকেন্দ্র নিজ স্বার্থে হলেও তাদের পক্ষ নিয়ে ঐ কাজে লিপ্ত হবে।
এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দুটি প্রধান বাধা দেখা যায় : ১. মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং আরও কিছু ব্যক্তি ভুয়া গ্রন্থাগার দেখিয়ে নগদ টাকা তুলতো। নতুন ব্যবস্থায় অর্ধেক টাকার বই নিতে বাধ্য হবার ফলে তারা বিড়ম্বনায় পড়ে যায়। তাদের অনেকে গ্রন্থকেন্দ্রের বিক্রয় বিভাগ থেকে সেইসব বই বাছাই করত, যেগুলি তারা পুনঃবিক্রি করতে পারবে বলে মনে করত। এ বেইজ্জতি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য অনুদানের বইতে কোনও সিল দিতাম না। এটা ছিল একপ্রকার কম্প্রোমাইজ।
২. বড় বেসরকারি গণগ্রন্থাগার (বিশেষ করে, জেলা পর্যায়ের) পরিচালকেরা (সম্পাদক) ভালো ভাবেই জানতেন, বরাদ্দ টাকার তারাই সম্পূর্ণ হকদার এবং এতকাল সেটাই হয়ে এসেছে, তাঁরা এর মধ্যে গ্রন্থকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে চাইছিলেন না। তাঁরা বলতে লাগলেন, শুধু দেশীয় বই দিয়ে গ্রন্থাগারের সেল্ফ ভর্তি করলে ভারতীয় বইয়ের অভাবে গ্রন্থাগারের ব্যবহারকারী কমে যাবে। বিশেষ করে, বরিশাল জেলা গণগ্রন্থাগারের সম্পাদককে কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছিল না। উপরন্তু তিনি হুমকি দেন, অন্য গণগ্রন্থাগারদের নিয়ে তাঁরা মন্ত্রণালয়ে রিপ্রেজেন্টশন দেবেন।
আমি তাঁকে ভারতীয় বই দেব বলে আশ্বাস দিই। মৌখিকভাবে স্থির হয়, বইয়ের জন্য বরাদ্দ টাকার দশ শতাংশ ভারতীয় বই তাঁরা নিতে পারবেন। তাতে তাঁরা রাজি হন। আমি তাঁদের স্টেডিয়ামে হাক্কানী ব্রাদার্স, বেইলী রোডে তবু বই পড়ুন ও নিউমার্কেটের জিনাত বুক সাপ্লাই থেকে বিদেশি বই দেবার ব্যবস্থা করি। আমি যতদিন গ্রন্থকেন্দ্রে ছিলাম (১৯৯৪ সাল) এই ওয়াদা পুরোপুরি রক্ষা করেছি। উপরন্তু, তাঁদের চাহিদামতো যে কোনও বাংলাদেশি বই সরবরাহ করেছি। তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি বইওতো চাপানো হয়নি।
কিন্তু, বই নেবার ক্ষেত্রে লাইব্রেরির সেই স্বাধীনতা থাকেনি। কমিটি দিয়ে বই বাছাই শুরু হয়। এমনিতেও বরাদ্দ দেবার ক্ষমতা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কখনও ছাড়েনি। চমৎকার নীতিমালা থাকে ওপর ওপর। মন্ত্রণালয় গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। লাইব্রেরি দরখাস্ত করে। নির্বাচনের বিবেচনায় থাকে লাইব্রেরির বয়স, বইয়ের মোট সংখ্যা ও দৈনিক পাঠক উপস্থিতির হার। মন্ত্রণালয় কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বার্ষিক গড়ে প্রাপ্ত ১৪০০-১৫০০ দরখাস্ত থেকে ৮-৯ শতাধিক লাইব্রেরি বাছাই করে তিন শ্রেণিতে টাকা ও বই বরাদ্দ মঞ্জুুর করে।
ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা অনুযায়ী, বরাদ্দের জন্য শক্ত নীতিমালা ও চিরুনি বাছাই (?) সত্ত্বেও প্রতি বছর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি ভুয়া লাইব্রেরি এই বরাদ্দ পায়। সংস্কৃতি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পিওন থেকে ওপরের কোনও কর্মচারী, এমন কি লিফটম্যানও নাকি এক বা একাধিক লাইব্রেরি পরিচালনা করে। এই কাতারে মফসসলেও প্রচুর ভুয়া লাইব্রেরি আছে।
কমিটির মাধ্যমে বই নির্বাচনও হয়। সেখানে থাকে কমিটির কোনও সদস্যের নিজস্ব পছন্দ, প্রকাশকসহ প্রভাবশালী তদ্বিরকারীদের উৎপাত। এর ওপর সরকারি রাজনৈতিক দলের অসহ্য রকমের চাপ। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় যে বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়, বরাদ্দের প্রকৃত হকদার দেশের প্রকৃত গণগ্রন্থাগারসমূহ হলেও পুরো প্রক্রিয়াতে তারা উপেক্ষিত থাকে। প্রকাশকেরা মনে করেন, এই বরাদ্দের টাকা তাঁদের। তাঁরা বরাদ্দের টাকা নিজেদের মধ্যে এক প্রকার ভাগ করে নিতে পারলেই সন্তুষ্ট থাকেন। বেসরকারি গণগ্রন্থাগারের জন্য বই ক্রয় ও এমনকি গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বই ক্রয়কে নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে চিত্রটি প্রতিভাত হবে।
বেসরকারি গণগ্রন্থাগারে বরাদ্দ মঞ্জুরিতে কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের কোনও চেষ্টা দেখা যায় না। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে বাধ্যতামূলকভাবে একটি করে গণগ্রন্থাগারকে বছরের পর বছর অর্থ ও বই বরাদ্দ করে দেশে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নেতৃত্বে একটি বেসরকারি গণগ্রন্থাগার নেটওয়ার্ক ইত্যবসরে অনায়াসে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল। গ্রন্থকেন্দ্র ‘জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র : গ্রন্থ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকল্প ১৯৮৬/৭-১৯৯০/১’ প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ২০০টি গণগ্রন্থাগারকে একটি নেটওয়ার্কের অধীনে আনতে সমর্থ হয়। কথা ছিল, ঐ স্তরের বাকি উপজেলাকে পরবর্তী প্রকল্পে আনা হবে। এরপর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পরপর দুটি গ্রন্থ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও উপজেলা গণগ্রন্থাগার উন্নয়ন কার্যক্রমে বেকুফের মতো প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তই করেনি।
দেশে উপজেলাসমূহে গ্রন্থাগার শক্তিশালীকরণের মধ্যমে মফসসলে স্তরভিত্তিক গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পরিত্যক্ত হয়। এলোমেলো বিক্ষিপ্ত হযবরলভাবে বেসরকারি অনুদান নয়ছয় ব্যতীত উপরোক্ত জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন প্রতি একটি করে গণগ্রন্থাগারের ভিত্তিকে সবল এবং বাকি দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে শক্তিশালী পাঠাগার কার্যক্রমের দ্বারা দেশে অধিকতর পাঠাভ্যাস ও পাঠক সৃষ্টির সুবিধা তৈরি করতে পারি।
কিন্তু, মফসসলে বই বিক্রির নেটওয়ার্ক সৃষ্টিতে গ্রন্থকেন্দ্র কীভাবে সহায়তা করতে পারে ?
আগেই উল্লেখ করেছি, বেসরকারি গণগ্রন্থাগারগুলোকে প্রতি বছর বই কিনতে বাধ্য করা ছিল প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা। এটি চিরস্থায়ী কোনও আদর্শ ব্যবস্থা হতে পারে না। বই বিক্রি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কাজ নয়, তার কাজ হলো দেশে সার্বিক গ্রন্থ উন্নয়ন। এককথায়, দেশে রিডিং সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করা। অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে দেশের সার্বিক বই বিপণনের অসুবিধা দূর করাও তার জরুরি কাজ। যদি স্থানীয়ভাবে বইয়ের যথেষ্ট চাহিদা থাকত, তবে বই ব্যবসায়ীরা নিজস্ব স্বার্থে দেশে বই বিপণন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতো। বাংলাদেশ এ বিষয়ে পশ্চাদপদ একটি দেশ। তাই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে দেশের স্বার্থে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
গ্রন্থকেন্দ্র প্রতিটি জেলায় বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে একটি ক্লাস্টার তৈরি করে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে এক বা একাধিক (প্রয়োজনে) বইয়ের দোকান নির্বাচন এবং বরাদ্দপ্রাপ্তদের সেই দোকান থেকে বই নেবার ব্যবস্থা করবে। ব্রিটিশ আমলে ডিপিআই অফিসে স্কুল লাইব্রেরির কেনার জন্য প্রকাশকেরা একটি বই জমা দিত। বছরান্তে ডিপিআই অফিস প্রাপ্ত বই থেকে বই নির্বাচন করে ক্যালকাটা গেজেটে একটি বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করত। স্কুল যার যার প্রয়োজন ও সাধ্যমতো ঐ তালিকাভুক্ত বই ক্রয় করত। কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রও অনুরূপ ব্যবস্থা করতে পারে অথবা কোনও বই বরাদ্দের টাকায় কেনা যাবে না তার একটি তালিকা প্রকাশ করতে পারে। ফলে, ১. লাইব্রেরিগুলো বরাদ্দ টাকার মধ্যে পছন্দমাফিক বই সারা বছর স্থানীয় দোকান থেকে কিনতে পারবে; ২. প্রকাশক, লেখক বা তদ্বিরকারী কেউ জোর করে কোনও বই তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না; ৩. স্থানীয় দোকান যাতে বই রাখে তার জন্য প্রকাশকেরা সচেষ্ট হবে; ৪. লাইব্রেরি যাতে বই কেনে সেজন্য প্রকাশক ঐ প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে : এবং ৫. অন্যদিকে, সরকারও লাইব্রেরিতে ভালো বই কেনা নিশ্চিত করতে পারবে।
‘বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না’র অনুরূপ কিছু বচন আমাদের জ্ঞানীগুণী বুদ্ধিজীবীরা রেখে গেছেন। বাজারে বইয়ের বিক্রিকে উৎসাহিত করতেই কথাগুলোর ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের কালেও বাজারে বইয়ের যথেষ্ট কাটতি ছিল না। থাকলে, এসব সবকের দরকার হতো না।
চিত্রটি উভয় বাংলার। ওপার বাংলা বই ব্যবসায় টিকে আছে পাঠকের প্রতুলতার জন্য যতটা, তার থেকেও বেশি লেখকদের বিচিত্রমুখী সফল রচনাকর্মের জন্য জনস্বীকৃত যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার কারণে। গত শতকের শুরুর দশক থেকে এই লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বাংলা বইয়ের ঐ পাঠক শ্রেণি দেশবিভাগের ফলে দেশান্তরী হয়েছে এবং যে সংখ্যাধিক্য মুসলমান নিয়ে নতুন সমাজ বিকাশ ঘটে তাতে না ছিল তেমনভাবে স্বীকৃত লেখক শ্রেণি এবং বইয়ের পাঠক। দুদিক থেকেই ছিল বিপুল আক্রা।
যা হোক, বিষয়টিকে আমি অনুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছি বাংলাদেশে গ্রন্থ প্রকাশনা গ্রন্থে। উল্লেখ্য যে, বিদ্যমান পরিস্থিতিকে বইবান্ধব করার জন্য যে অঙ্গীকার, দৃঢতা, প্রজ্ঞা, সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সম্মিলিতভাবে জাতীয় গ্রন্থ উন্নয়নে আমাদের যে সকল উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল তা বিভাগোত্তর কাল থেকে আজ পর্যন্ত সিরিয়াসলি করাও হয়নি। বিষয়টি নিয়ে একটি কাজই হয়েছিল, ‘জাতীয় গ্রন্থনীতি ১৯৯৪’, কিন্তু সেটি জন্মের পর থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় হিমঘরে আছে। আমাদের ব্যর্থতাগুলো কী এবং বাংলাদেশে গৃহীত গ্রন্থ উন্নয়ন প্রচেষ্টার স্বরূপ এবং আশু করণীয় ইত্যাদি নিয়ে আমার অপর একটি বই বাংলাদেশে গ্রন্থ উন্নয়ন-এর প্রকাশ (কথাপ্রকাশ) চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। আশা করা যায়, আগামী বছর জানুয়ারিতে বইটি প্রকাশ পাবে। সে কারণে এখানে দীর্ঘ আলোচনা থেকে দূরে থাকলাম।
আমাদের অধিকাংশ প্রকাশকের লক্ষ্যই হলো কোনওমতে বই প্রকাশ করে সেসব বই নৈতিক বা অনৈতিকভাবে মুখ্যত প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাকে গছিয়ে দেওয়া। ব্যবসা মানুষ লাভের জন্যই করে। কিন্তু, যে কোনও উপায়ে লাভবান হতে চেয়ে তাঁরা বই প্রকাশনা ও বিপণনের পর্যায়গুলো গ্রাহ্য করেন না। কিসে পাঠক তৈরি হয় তা নিয়ে একদমই সময় দেন না। তাঁদের যে সমিতি আছে তার মাধ্যমে তাঁরা আর কিছু না হোক, ব্যবসায়ের ফেয়ার প্র্যাকটিসগুলোকে সারা দেশে করতে পারতেন। কিন্তু হায়! ব্যক্তি-প্রকাশক সমিতিতে গিয়েও নিজের ও নিজগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় ব্রতী থাকেন। নোট বইয়ের প্রকাশকই হন বা সৃজনশীল (?) বইয়ের প্রকাশকই হন, উইন্ডফলের জন্য অপেক্ষা করেন এবং পরিস্থিতি সেরূপ হলে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বই প্রকাশ ও বিক্রির সময় এবং সরকারের ‘স্ট্রেন্থদেনিং রিডিং হ্যাবিট অ্যান্ড রিডিং স্কিল’ প্রকল্পে বই নির্বাচন ও বিপুল সংখ্যায় বই সরবরাহে তাঁরা যে সব পন্থা অবলম্বন করেছেন সেগুলি মোটেও আদর্শিক অবস্থানে থাকা কোনও প্রকাশক করেন না। উপরন্তু ছোট্ট, আবার দলভুক্তও নয়, এমন প্রকাশকেরা এই কারণে হয়েছেন বঞ্চিত।
তাই, দেশে পাঠাভ্যাস ও পাঠক সৃষ্টির জন্য পদ্ধতিগত উপায়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনও উদ্যোগে প্রকাশকদের শামিল হতে সময় লাগবে। এখন তাঁরা সেজন্য ক্যাপেবলও নন। সেজন্য, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রকেই মুখ্য দায়িত্ব নিতে হবে।
বইকে হতে হবে ক্রেতার কাক্সিক্ষত পণ্য। মানুষ কী কী মোটিভেশনের জন্য পণ্য কিনতে উৎসাহিত ও উজ্জীবিত হয় সেগুলি এরূপ :
১. সামাজিক স্বীকৃতি বা সোশ্যাল অ্যাপ্রুভাল: এ কারণে মানুষ লেটেস্ট মডেলের গাড়ি কেনে আবার নিজে না পড়লেও কফিটেবল বুক্স্, বহু খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলির মতো বই কেনে দর্শনীয় জায়গায় রাখে।
২. অ্যাফেকশন/ রোমান্স : গিফ্ট মেটেরিয়াল হিসেবে প্রিয়জনকে বই দেওয়া একটি রেওয়াজ। এটি বই কেনার একটি জোরালো মোটিভেশন।
৩. ইকনোমি : নানা উপলক্ষ্যে বই সস্তায় কেনা যায়। সস্তায় কোনও জিনিস কিনতে বা বার্গেন প্রাইসে কিছু কিনতে মানুষ উৎসাহী হয়। এটাও কোনও জিনিস কেনার শক্ত একটি মোটিভেশন।
৪. স্বাস্থ্য : স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য মানুষ ব্যয় করতে সদা প্রস্তত থাকে। এ বিষয়ে দরকারি ও ভালো বই থাকলে মানুষ সেটা কিনতে আগ্রহী হয়।
৫. গেইন অ্যান্ড প্রফিট : মানুষ এজন্য জমিজমা, হীরা ও সোনা যে সব জিনিসের রিসেল ভ্যালু আছে সেসব কেনে। বই তেমন হলে তারও কম-বেশি রিসেল ভ্যালু পাওয়া যায়।
৬. কমফোর্ট অথবা কনভিনিয়েন্স : এর পেছনেও মানুষ সাধ্যমতো ব্যয় করে। এ বিষয়েও বই মানুষকে উপযুক্ত তথ্য দিলে সেটি কিনতে তারা আগ্রহী হবে।
৭. কিউরিয়সিটি : এটার জন্য বইয়ের জুড়ি নেই। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ওজারতির দুই বছর ছাড়াও কত যে কৌতূহলোদ্দীপক বই নিত্যনতুন প্রকাশিত হয়! রচনায় কৌতূহল সৃষ্টি করার উপাদান থাকলে সেটা নিবৃত্তির জন্য মানুষ অবশ্যই বই কেনে।
৮. সৌন্দর্য বা বিউটি : এর জন্য মানুষ কত কী না করে। ঐ বিষয়ে শত শত বই প্রকাশিত হয়। ভালো বই হলে মানুষ তা কিনতে উদ্বুদ্ধ হয়।
৯. বিনোদন বা এন্টারটেনমেন্ট : বইয়ের এ গুণ সম্পর্কে বলাই বাহুল্য।
১০. শিক্ষা বা এডুকেশন : সেল্ফ ইমপ্রুভমেন্ট মানুষের বই কেনার সবচেয়ে শক্তিশালী মোটিভেশন।
যাঁরা বই নিয়ে আছেন, লেখক, প্রকাশক, বইয়ের দোকানদার, গ্রন্থাগারিকসহ সবাইকে জানতে হবে পণ্য হিসেবে বইয়ের গুণাবলি। পৃথিবীতে এমন পণ্য খুবই কম আছে যার মধ্যে এই দশটি গুণ একত্রে পাওয়া যায়। বই লেখা প্রকাশ ও বিক্রির সময়, পাঠাগারে পাঠককে আকর্ষণ করার সময় বিষয়টি মাথায় রাখলে বই নিয়ে ব্যবসায়ী ও নির্ভরশীল অন্য পেশাগোষ্ঠীর দুশ্চিন্তার কারণ নেই। বইকে যাঁরা প্রমোট করবেন, তাঁদেরও বইয়ের অন্তর্নিহিত শক্তি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



