দ্য নিউ ক্যাটাকম্ব : মূল : স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা অনুবাদ : মোশাররফ হোসেন

[স্যার আর্থার কোনান ডয়েল (২২ মে, ১৮৫৯ – ৭ জুলাই, ১৯৩০) ছিলেন একজন ইংরেজ লেখক ও চিকিৎসক। শার্লক হোমসের গল্পগুলোর জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তাঁর অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে কল্পবিজ্ঞান গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতা, ননফিকশন, ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং রম্যরচনা। বোয়ের যুদ্ধের সময় দক্ষিণ আফ্রিকান এক মাঠ-চিকিৎসাকেন্দ্রে অবদান রাখার জন্য ১৯০২ সালে তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।]
‘দেখো বার্গার’, কেনেডি বলতে থাকল, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করে সবকিছু খুলে বলছো না কেন ?’
পুরাতত্ত্বের দুজন বিখ্যাত ছাত্র কেনেডির আরামদায়ক বৈঠকখানায় বসে ছিল। শীতের রাত; তারা দুজনই তাদের চেয়ার টেনে নিয়ে এসেছিল ফায়ার-প্লেসের কাছে। ফায়ার-প্লেসটা অবশ্য যতটা না উত্তাপ দিচ্ছিল তার চাইতে বেশি দিচ্ছিল একটা গুমোট অনুভূতি। বাইরে শীতের উজ্জ্বল নক্ষত্রের নিচে আধুনিক রোম শহরের রাস্তাঘাট তখন আলো ঝলমলে আর রেস্তোরাঁগুলো সরগরম। কিন্তু ঘরের ভেতরে, ইংরেজ ভূতত্ত্ববিদের বিলাসবহুল কক্ষে শুধু প্রাচীন রোমের স্মারকচিহ্ন। একদিকের দেয়ালে ঝুলছে বয়সের ভারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া একটি দেয়ালচিত্র, ঘরের কোনায় নিষ্ঠুর মুখে দাঁড়িয়ে আছে রোমান সিনেটর এবং যোদ্ধাদের ধূসর হয়ে যাওয়া পুরোনো আবক্ষমূর্তি। ঘরের মাঝে রাখা টেবিলের উপর ‘বাথস অফ কারাকুলা’ নামে পরিচিত রোমানদের অন্যতম বড় গণ-স্নানাগারের ছোট একটা সংস্করণ রাখা আছে। কেনেডির বানানো এই ছোট সংস্করণটি বার্লিন প্রদর্শনীতে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল। ছাদ থেকে ঝুলছে একটা প্রাচীন রোমান ফুলদানি আর লাল রঙের একটা দামি টার্কিশ কার্পেট। এ সবকিছুই অকৃত্রিম এবং দুর্লভ; অর্থ দিয়ে এদের মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কেনেডির বয়স ত্রিশের সামান্য বেশি, কিন্তু এই বয়সেই পুরাতাত্ত্বিক গবেষক হিসেবে তার নাম সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। আর্থিক সচ্ছলতা অনেক সময় ধনী পরিবারের সন্তানদের জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু সেই সন্তান যদি তার লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকে তাহলে খ্যাতির চূড়ায় উঠার জন্য আর্থিক সচ্ছলতা তাকে বাড়তি অনেক সুবিধাও দিয়ে থাকে। কেনেডি মাঝে মাঝেই পড়াশোনা থেকে দূরে সরে গিয়ে খেয়ালের বশে পয়সা উড়িয়ে আনন্দ করলেও তার মানসিক দৃঢ়তা এতই কঠিন এবং প্রত্নতত্ত্বের প্রতি ভালোবাসা এতই তীব্র যে, দীর্ঘ সময় ধরে একাগ্রচিত্তে সে গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকতে পারে। সে দেখতে বেশ সুপুরুষ―চওড়া শুভ্র কপাল, টিকালো নাক, কমনীয় মুখে একই সাথে দৃঢ়তা এবং কোমলতার ছাপ।
তার সঙ্গী জুলিয়াস বার্গার কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের মানুষ। তার বাবা জার্মান আর মা ইতালিয়ান। উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার কাছ থেকে পেয়েছে শারীরিক শক্তি ও কঠোরতা, অন্যদিকে মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে লাবণ্যপ্রভা। রোদ-জ্বলা মুখে নীল জার্মান চোখ, চার কোনা বিশাল কপাল আর কোঁকড়ানো সোনালি চুল; সেই সঙ্গে ক্লিন শেভ করা শক্তিশালী দৃঢ় চোয়ালের বার্গারকে দেখে মাঝেমাঝেই তার সঙ্গীরা মন্তব্য করে বসে যে, তাকে দেখলে নাকি রোমের পুরোনো আবক্ষমূর্তিগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। তার সরল হাসি আর স্বচ্ছ দৃষ্টি দেখে যে কেউ বুঝতে পারত তার শারীরিক শক্তিমত্তা কেবল তার বংশপরিচয়ের ইঙ্গিত বহন করছে কিন্তু সেটার কোনও প্রভাব তার চরিত্রের উপর পড়েনি। বয়স এবং খ্যাতিতে বার্গার তার ইংরেজ সঙ্গীর সমকক্ষ হলেও জীবনযাপন এবং কর্মক্ষেত্রে তাকে কেনেডির চাইতে অনেক বেশি শ্রম দিতে হয়েছে। বারো বছর আগে একজন দরিদ্র ছাত্র হিসেবে সে রোমে এসেছিল, জীবনযাপনের জন্য তাকে নির্ভর করতে হতো জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া সামান্য একটা বৃত্তির উপর। এরপর এত বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে খুব ধীর গতিতে সে পুরাতত্ত্ব গবেষক হিসেবে খ্যাতির চূড়ায় উঠতে সক্ষম হয়েছে। এখন সে বার্লিন একাডেমির একজন সদস্য এবং এটা বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে যে শীঘ্রই সে জার্মানির কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগ প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করবে। কিন্তু পুরাতত্ত্বের প্রতি এই অবিচল আগ্রহ তাকে পেশাগত দক্ষতার মাপকাঠিতে ধনী এবং মেধাবী কেনেডির সাথে একই কাতারে দাঁড়াবার সুযোগ করে দিলেও অন্য সব ক্ষেত্রে তার অবস্থান কেনেডির চাইতে অনেক পেছনে। পড়াশোনায় কিছুটা বিরতি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ এবং আদবকায়দা রপ্ত করাটা তার কখনও হয়ে উঠেনি। শুধু নিজের পড়াশোনার ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই বার্গারের চোখ-মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠে, বাকি সব ক্ষেত্রে সে চুপচাপ এবং অস্বস্তি বোধ করে। নিজের এই অক্ষমতার ব্যাপারে সে নিজেও সচেতন।
চারিত্রিক বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে এদের দুজনের বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে গভীর হয়েছে। একই বিষয়ের প্রতি উৎসাহ এবং আগ্রহ তাদেরকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তারা দুইজনই পরস্পরের পেশাগত দক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অনুরক্ত। কেনেডি মুগ্ধ ছিল বার্গারের সহজ সরল ব্যবহারে, অন্যদিকে বার্গার মুগ্ধ ছিল কেনেডির প্রাণপ্রাচুর্য এবং উচ্ছলতায় যেটা তাকে এমনকি রোমের ধনী-সমাজেও জনপ্রিয় করে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমানে কেনেডির উপর মেঘের একটা কালো ছায়া দেখা যাচ্ছে। একটা প্রণয়ঘটিত ব্যাপার―যার বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি, কিন্তু কেনেডি নাকি মেয়েটির সাথে খুবই নির্মম এবং হৃদয়হীন আচরণ করেছে আর এজন্যই কেনেডির কিছু বন্ধু তার উপর বিরক্ত। অবশ্য অবিবাহিত ছাত্র এবং শিল্পীসমাজে এমনটা অহরহই ঘটে বলে ব্যাপারটা নিয়ে কেউ নিন্দাজনক কিছু বলেনি, কিন্তু কৌতূহল আর ঈর্ষাবশত অনেকেই ঘটনাটা নিয়ে কানাঘুষা করছে।
‘দেখো বার্গার’, সঙ্গীর শান্ত মুখের দিকে তীক্ষè দৃষ্টি রেখে কেনেডি বলতে লাগল, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করে সবকিছু খুলে বলছো না কেন ?’
কথা বলতে বলতে কেনেডি মেঝের কার্পেটের দিকে আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করল। কার্পেটের উপর বেতের তৈরি লম্বাটে একটা ফলের ঝুড়ি রাখা। ঝুড়িটা নানা জিনিসে বোঝাই―শিলালিপি, খোদাই করা টালির ভগ্নাবশেষ, ভেঙে যাওয়া মোজাইক ফলক, ছেঁড়া প্যাপিরাস কাগজ, মরচে ধরা পুরোনো গহনা এবং আরও টুকিটাকি যেগুলো দেখে প্রথমেই মনে হবে―এগুলোকে কোনও আস্তাকুড় থেকে কুড়িয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু পুরাতাত্ত্বিকের চোখে এগুলো ধরা দেবে দুর্লভ এবং মূল্যবান বস্তু হিসেবে। এই স্তূপ করে রাখা জিনিসগুলোর মাঝে প্রাচীন সমাজকে জানার একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল আর স্বাভাবিকভাবেই এই বিষয়ে পুরাতত্ত্বের ছাত্রদের আগ্রহ ছিল অসীম। কেনেডির ঘরে জিনিসগুলো বার্গার নিয়ে এসেছে আর এগুলো দেখেই কেনেডির চোখ লোভে চকচক করতে শুরু করেছে।
‘তোমার এই অমূল্য রত্নরাজিতে আমি ভাগ বসাবো না, কিন্তু এগুলো কোথায় পেলে সেটাও কি বলবে না ?’ বার্গার তার চুরুট ধরাল, কেনেডি তখনও বলে চলেছে―‘এগুলো একেবারে প্রথম সারির আবিষ্কার, সারা ইউরোপে এরা সাড়া ফেলে দেবে।’
‘এখানে যা কিছু আছে, তার সবকিছুই সেখানে আছে লাখে লাখে!’ বার্গার বলতে লাগল, ‘সেখানে এত জিনিস আছে যে ডজন খানেক পুরাতাত্ত্বিক অনায়াসে তাদের সারা জীবন সেখানে কাটিয়ে দিতে পারবে, আর তাদের খ্যাতি হবে সেন্ট এঞ্জেলো দুর্গের মতোই চিরস্থায়ী।’
কেনেডি কপাল কুঁচকে তার লম্বা গোঁফে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘তুমি না বললেও আমি বুঝে গেছি বার্গার, তুমি নিশ্চয়ই ভূগর্ভস্থ কোনও সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কার করেছ।’
‘জিনিসগুলো দেখে যে তুমি এমনটাই ধারণা করবে সেটা আমি জানতাম।’
‘উঁহু, এদেরকে দেখে যদিও তাই মনে হচ্ছে, কিন্তু তোমার শেষের কথাটা কিন্তু সরাসরি সমাধিক্ষেত্রের দিকেই ইঙ্গিত দেয়। তুমি যে পরিমাণের কথা বললে একমাত্র ভূগর্ভস্থ সমাধিক্ষেত্র ছাড়া আর কোথাও এত রত্নরাজি থাকা সম্ভব নয়।’
‘ঠিকই ধরেছো, সত্যিই আমি একটা সমাধিক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছি।’
‘কোথায় ?’
‘সেটা তো গোপনীয় প্রিয় বন্ধু। কিন্তু এইটুকু বলতে পারি আমি দেখিয়ে না দিলে কেউ সেটা খুঁজে পাবে না। পরিচিত সকল সমাধিক্ষেত্র থেকে এর বয়স বেশি আর এটা সংরক্ষিত ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য। যে কারণে এখানে যে সকল ভগ্নাবশেষ এবং স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে সেগুলো অন্য কোথাও কখনও দেখা যায়নি। আমি যদি তোমার জ্ঞান এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতা সম্পর্কে না জানতাম তাহলে তোমাকে সবকিছু খুলে বলতে ইতস্তত করতাম না। কিন্তু আমি আগে এই জিনিসগুলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটা গবেষণাপত্র লিখব তারপর সবকিছু খুলে বলব।’
পুরাতত্ত্বকে কেনেডি পাগলের মতো ভালোবাসে, এ ভালোবাসায় কোনও খাদ নেই। জীবন নিয়ে তার উচ্চাকাক্সক্ষা আছে, কিন্তু সেই উচ্চাকাক্সক্ষাও এই শহরের প্রাচীন জীবনযাত্রা এবং ইতিহাস জানার আনন্দের কাছে তুচ্ছ। তার সঙ্গীর এই নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে জানার জন্য সে প্রায় অস্থির হয়ে পড়ল।
‘দেখো বার্গার’, সে বলতে লাগল, ‘আমি শপথ করে বলছি যে এই ব্যাপারে তুমি আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারো। তোমার অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত এই ব্যাপারে কোনওকিছুই আমি লিখব না। তোমার ভয়ের জায়গাটা আমি বুঝতে পারছি আর এরকম ক্ষেত্রে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ব্যাপারে আমাকে তোমার ভয় পাবার কিছু নেই। কিন্তু তুমি যদি আমাকে না বলো তাহলে কিন্তু আমি নিজে জায়গাটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করব, আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে আমি খুঁজে পাবই। সেক্ষেত্রে আমি আমার নিজের মতো করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করব এবং তুমি তখন বাধাও দিতে পারবে না।’
চুরুটে টান দিয়ে মৃদু হেসে বার্গার বলল, ‘কিন্তু আমি খেয়াল করে দেখেছি বন্ধু, আমি কিছু জানতে চাইলে তুমি কিন্তু সবসময় সেটা জানাও না।’
‘কবে তুমি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছো আর আমি বলিনি ? তুমি কি ভুলে গেছো যে চিরকুমারী সন্ন্যাসীদের মন্দিরের উপর যখন গবেষণাপত্র লিখছিলে তখন আমিই তোমাকে সব তথ্য জোগাড় করে দিয়েছিলাম।’
‘হ্যাঁ, তা দিয়েছিলে; কিন্তু সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। তোমার গোপনীয় কোনও ব্যাপারে কিছু জানতে চাইলে আমার ধারণা তুমি সেটা বলবে না। এই সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কারের ব্যাপারটা আমার জন্য খুবই গোপনীয় একটা ব্যাপার এবং এর বিনিময়ে আমি চাইব তুমি তোমার গোপনীয় কিছু আমাকে জানাবে যার উপর নির্ভর করে আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারব।’
‘তুমি কী জানতে চাইছো আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, তবে তোমার যে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত।’
‘সেক্ষেত্রে!’ সোফায় আয়েশ করে হেলান দিয়ে চুরুটের নীলচে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বার্গার বলতে লাগল, ‘মিস মেরি স্যান্ডারসনের সঙ্গে তোমার সম্পর্কের ব্যাপারটা খুলে বলো।’
কেনেডি তার চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল, প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তার সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘কী বলতে চাইছো তুমি ? এটা কী ধরনের প্রশ্ন ? তুমি কি আমার সাথে মজা করছ ?’
বার্গার স্বাভাবিকভাবেই বলল, ‘না, মজা করছি না। সত্যিই আমি এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী। পুরাতত্ত্ব ছাড়া অন্যান্য বিষয়, যেমন―সামাজিক জীবনযাপন এবং রমণীসঙ্গের ব্যাপারে আমার কোনও ধারণা নেই বললেই চলে। এই বিষয়গুলো নিয়ে তাই আমার জানার খুব আগ্রহ। আমি তোমাকে চিনি, আর ঐ মেয়েটিকেও দেখেছি―তার সাথে দু-একবার কথাও বলেছি। এজন্যই আমি জানতে আগ্রহী তোমাদের মাঝে ঠিক কী হয়েছিল ?’
‘আমি তোমাকে কিছুই বলব না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি শুধু ঝোঁকের বশে দেখতে চেয়েছিলাম তোমার গোপন কথা তুমি এত সহজে আমাকে বলো কিনা, যত সহজে তুমি আশা করো আমার এই সমাধিক্ষেত্রের কথা তোমাকে বলব। অবশ্য তুমি বলবে এমনটা আশাও করিনি, কিন্তু আমার কাছ থেকে তুমি ভিন্ন রকম কিছু আশা করো কীভাবে ? সেইন্ট জনের ঘড়িতে দশটা বাজার ঘণ্টা দিচ্ছে, অনেক রাত হলো, এবার যাই।’
ব্যাকুল হয়ে কেনেডি বলে উঠল, ‘না বার্গার, দাঁড়াও। এত পুরোনো একটা প্রেমকাহিনি জানতে চাওয়াটা একটা হাস্যকর আবদার। আর তুমি তো জানোই―যে লোক চুমু খেয়ে অন্যকে বলে বেড়ায় আমরা তাকে কাপুরুষ আর বাজে লোক হিসেবেই দেখে থাকি।’
‘তা ঠিক’ ফলের ঝুড়িটা তুলতে তুলতে বার্গার বলে উঠল, ‘কিন্তু এই ঘটনাটা শুধু তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার বললে ভুল হবে, পুরো রোম শহর এই ঘটনাটা জানে এবং এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। কাজেই এই ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলে তুমি মেরি স্যান্ডারসনের নতুন করে কোনও ক্ষতি করছ না। যাই হোক, এই ব্যাপারে তোমার কিছু বলতে চাওয়ার সঙ্কোচকে আমি সম্মান করি, শুভ রাত্রি।’
‘বার্গার, একটু দাঁড়াও’ বার্গারের বাহুতে ধরে কেনেডি বলতে লাগল, ‘এই সমাধিক্ষেত্রটার ব্যাপারে জানতে আমি খুবই আগ্রহী। কিন্তু এমন হাস্যকর ব্যাপার বাদ দিয়ে তুমি আমাকে অন্য কিছু জিজ্ঞেস করো।’
‘না, আর তুমি প্রত্যাখ্যান করেছো। কোনও সন্দেহ নেই উত্তর না দেবার ব্যাপারে তোমার সিদ্ধান্ত সঠিক, একই ভাবে সমাধিক্ষেত্র নিয়ে কিছু না বলার ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্তও সঠিক। আমি এখন যাচ্ছি বন্ধু, শুভরাত্রি।’
দরজার কাছ থেকে বার্গারকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে কেনেডি বলল, ‘তুমি খুবই অদ্ভুত আচরণ করছো, কিন্তু তবু, এটাই যদি তোমার শর্ত হয় তাহলে আমি বলব। কোনও মেয়ের সম্পর্কে কিছু বলা আমি ঘৃণা করি, কিন্তু তুমিই তো বললে যে রোমের সবাই এই ব্যাপারটা জানে। কাজেই মনে হয় না আমি এমন কিছু জানাতে পারব যেটা তুমি আগে থেকেই জানো না। এখন বলো, কী জানতে চাও ?’
ঝুড়িটা মেঝেতে রেখে ফায়ার-প্লেসের পাশের চেয়ারে এসে বার্গার আবার বসল।
‘একটা চুরুট দিতে পারো ?’
চুরুট ধরিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ বন্ধু! কাজের সময় আমি কখনওই ধূমপান করি না, কিন্তু আলাপ করার সময় আমি ধূমপানটা খুব উপভোগ করি। এখন সেই তরুণীর ব্যাপারে বলো, শেষ পর্যন্ত তার কী হয়েছিল ?’
‘সে তার বাড়িতে ফিরে গেছে।’
‘তাই নাকি ? ইংল্যান্ডে ?’
‘হ্যাঁ।’
‘ইংল্যান্ডের কোথায় ? লন্ডনে ?’
‘না, টুইকেনহ্যাম।’
‘আমার অতিরিক্ত কৌতূহলকে ক্ষমা করো কেনেডি, বরং এভাবে দেখো যে এই সকল ব্যাপারে আমার ধারণা খুবই কম বলেই এগুলো জানতে চাচ্ছি। সন্দেহ নেই যে একজন তরুণীকে পটিয়ে ফেলতে পারলে তিন সপ্তাহ পর তাকে তার পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো খুব একটা কঠিন নয়। কিন্তু এই ব্যাপারটা কোনওভাবেই আমার মাথায় আসছে না যে কাজটা তুমি কী করে করলে ? মানে বলতে চাচ্ছিলাম তুমি যদি মেয়েটিকে ভালোবাসতে তাহলে তিন সপ্তাহে তোমার ভালোবাসা উবে যেতে পারত না। কাজেই আমি ধরে নিচ্ছি, তুমি তাকে মোটেও ভালোবাসতে না। কিন্তু, তুমি যদি ভালো নাই বাসতে তাহলে এই গ্লানিকর ঘটনাটা কেন ঘটালে যেটা তোমার সম্মানহানি করল আর মেয়েটাকে ধ্বংস করে দিল ?’
ফায়ার-প্লেসের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক কেনেডি বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছো। ভালোবাসা শব্দটার ব্যাপ্তি অনেক বড়, আমি তাকে পছন্দ করতাম। তাকে তুমি দেখেছো, কাজেই তুমি তো জানোই সে কতটা মোহনীয়। কিন্তু তারপরও স্বীকার করতে বাধা নেই যে আমি সত্যিকার অর্থে কখনওই তাকে ভালোবাসিনি।’
‘তাহলে এমনটা কেন করলে ?’
‘দুঃসাহসিক কাজ করার রোমাঞ্চের জন্য।’
‘রোমাঞ্চের জন্য!’
‘রোমাঞ্চ না থাকলে জীবনে নতুনত্ব কী ? এডভেঞ্চারের নেশাতেই আমি প্রথম তার দিকে মনোযোগ দিয়েছিলাম। রোমাঞ্চের জন্য আমি অনেক কিছু করলেও একজন সুন্দরী তরুণীকে পটানোর চাইতে বড় রোমাঞ্চ আর কীসে থাকতে পারে ? আর এক্ষেত্রে তো বিশাল বড় বাধা ছিল। সে ছিল লেডি এমিলি রোডের সহচরী, কাজেই তার সঙ্গে একাকী দেখা করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এছাড়াও আরও কিছু বাধা ছিল, তবে আমাকে সবচাইতে আকৃষ্ট করেছে এই ব্যাপারটা যে তার সাথে একজনের বাগদান হয়েছিল।’
‘বলো কী! কার সাথে ?’
‘নাম তো বলেনি।’
‘আমার মনে হয় না এই ব্যাপারটা কেউ জানে। এই বাগদানের জন্যই কি তাহলে তাকে পটানোর কাজটা আরও লোভনীয় হয়ে গিয়েছিল ?’
‘হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। তোমার কি তাই মনে হচ্ছে না ?’
‘আমার আসলে এই সব ব্যাপারে একেবারেই ধারণা নেই।’
‘আহ বন্ধু, প্রতিবেশীর বাগান থেকে চুরি করা আপেল সবসময় তোমার নিজের গাছের আপেলের চাইতে বেশি সুস্বাদু। আর এরপরই আমি বুঝতে পারলাম সে আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।’
‘বলো কী! সাথে সাথেই ?’
‘আরেহ… না, তিন মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত আমি তাকে জয় করতে পেরেছিলাম। আর যতদিন আমরা একসাথে ছিলাম, আমাদের মধুর সময় কেটেছে।’
‘আর মেয়েটির হবু স্বামীর কী হলো ?’
কেনেডি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘সে নিশ্চয়ই আমার চাইতে কম যোগ্যতাসম্পন্ন ছিল, না হলে মেরি নিশ্চয়ই তাকে ত্যাগ করত না। অনেক কথা বলে ফেলেছি, এই প্রসঙ্গটা এখন বাদ দাও।’
‘আর একটা প্রশ্ন। মাত্র তিন সপ্তাহে মেয়েটিকে তুমি বিদায় করলে কীভাবে ?’
‘আমাদের ব্যাপারটা জানাজানি হবার পর মেয়েটি আর রোমে থাকতে চাইল না, আর আমার পক্ষে তো কোনওভাবেই রোম ছাড়া সম্ভব নয়, এটা ছিল একটা কারণ। আর ওদিকে ওর বুড়ো বাবাও রাগারাগি করে খুব বাজে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল আর পুরো ব্যাপারটাই এত বিরক্তিকর হয়ে পড়েছিল যে, আমি ধীরে ধীরে নিজেকে এই সম্পর্ক থেকে সরিয়ে নিলাম। যদিও শুরুর দিকে আমি ওকে প্রচণ্ড মিস করতাম, কিন্তু এই সম্পর্ক থেকে ছুটে আসতে পেরে আমি খুশিই হয়েছিলাম। এখন আমি তোমার উপর এইটুকু ভরসা নিশ্চয়ই করতে পারি যে এই কথাগুলো তুমি কাউকে বলবে না।’
‘প্রিয় কেনেডি, ভুলেও আমি কাউকে কিছু বলব না। তুমি যা বললে তাতে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা পেলাম। তোমার আর আমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম, অবশ্য এর কারণ সম্ভবত আমি পৃথিবীকে খুব কম দেখেছি। যাই হোক, তুমি আমার আবিষ্কৃত সমাধিক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে চাও তো! বিস্তারিত সব কিছু বললেও কোনও লাভ হবে না, কেননা একা একা তুমি কখনওই সেটা খুঁজে বের করতে পারবে না। একমাত্র উপায় হচ্ছে, তোমাকে সঙ্গে করে সেখানে নিয়ে যাওয়া।’
‘চমৎকার, সেটা তো আরও ভালো হয়।’
‘তাহলে কবে যেতে চাও ?’
‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমি তো সেখানে যাবার জন্য অস্থির হয়ে আছি।’
‘আজ রাতেই চলো তাহলে, একটু শীত হলেও আজকের রাতটা চমৎকার। আমাদের অবশ্য একটু গোপনে যেতে হবে। আমাদের দুজনকে একসঙ্গে কেউ দেখলেই বুঝে ফেলবে আমরা কোনও অনুসন্ধানে চলেছি।’
‘জায়গাটা কতদূর ?’
‘কয়েক মাইল।’
‘তাহলে তো খুব দূরে নয়।’
‘না, আমরা হেঁটেই সেখানে যেতে পারব।’
‘সেটাই ভালো হবে। এত রাতে কোনও নির্জন জায়গায় আমাদের নামিয়ে দিলে গাড়িওয়ালাও সন্দেহ করবে।’
‘ঠিক তাই। আমি তাহলে রাত বারোটার সময় আপ্পিয়ান ফটকের কাছে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। মোমবাতি, দেয়াশলাই আর কিছু দরকারি জিনিসপত্র আনতে আমি তাহলে এখন বাড়ি গেলাম।’
‘ঠিক আছে বার্গার, আমি প্রতিজ্ঞা করছি তোমার গবেষণাপত্র প্রকাশিত হবার আগে আমি এই ব্যাপারে কিছুই লিখব না। এখনকার মতো বিদায়, রাত বারোটার সময় তাহলে দেখা হচ্ছে।’
শহরের ঘড়িঘরে যখন রাত বারোটার ঘণ্টা দিল তখন ওভারকোট গায়ে বার্গার হাতে একটা লণ্ঠন ঝুলিয়ে দেখা করার স্থানে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারে অপেক্ষারত কেনেডি এগিয়ে এল বার্গারের কাছে।
হাসতে হাসতে বার্গার বলল, ‘ভালোবাসার মতো কাজের ক্ষেত্রেও তুমি একইরকম অনুরক্ত!’
‘প্রায় আধাঘণ্টা ধরে আমি এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি এই সম্পর্কে কোনও সূত্র রেখে আসোনি তো ?’
‘এতটা বোকা আমি নই! ঠান্ডায় আমার হাড় পর্যন্ত জমে যাচ্ছে, এখন চলো তো, একটু দ্রুত হাঁটো যেন শরীর গরম হয়।’
তাদের পায়ের শব্দ পাথুরে রাস্তায় খুব জোরাল ভাবে শোনা যেতে লাগল। দু-একজন বিক্ষিপ্ত পথচারী আর কয়েকটা গাড়ি ছাড়া রাস্তায় আর কেউ নেই। রাস্তার দুই ধারের কবরস্থানের মধ্য দিয়ে পথ চলতে চলতে তারা সেইন্ট ক্যালিস্টাসের সমাধির কাছে এসে থামল।
‘তোমার পা আমার চাইতে লম্বা আর তুমি হাঁটতেও বেশ অভ্যস্ত’, হাসতে হাসতে বার্গার বলল। ‘যাই হোক, আমার আবিষ্কৃত সমাধিক্ষেত্রটা কাছেই। এই যে, এই দিকে। রাস্তাটা খুব সরু, আমি আগে আগে যাচ্ছি তুমি আমার পিছন পিছন এসো।’
বার্গার লণ্ঠন জ্বালালে লণ্ঠনের মৃদু আলোতে তারা একটি সরু এবং আঁকাবাঁকা পথ ধরে সামনে এগুতে লাগল। মৃদু আলোতে প্রাচীন রোমের জল নিষ্কাশনের বিখ্যাত নালাটাকে তখন একটা দানবীয় শুঁয়োপোকার মতো দেখাচ্ছিল। কাঠের তৈরি একটা ফাঁকা গোয়ালঘরের সামনে গিয়ে বার্গার পকেট থেকে একটা চাবি বের করল।
কেনেডি অবাক হয়ে বলে উঠল ‘তোমার সমাধিক্ষেত্র কি এই বাড়ির ভিতর নাকি ?’
‘এটাই প্রবেশ পথ। এই গোয়ালঘরটার জন্যই কেউ চিন্তাও করবে না এখানে একটা সমাধিক্ষেত্র আছে।’
‘এটার মালিক কি সমাধিক্ষেত্রের কথা জানে ?’
‘মোটেও না। সে কয়েকটা জিনিস খুঁজে পেয়েছিল, সেগুলো দেখেই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম যে সমাধিক্ষেত্রের কোনও একটা পথ এই গোয়ালঘরে আছে। গোয়ালঘরটা ভাড়া নিয়ে তাই আমি খোঁজাখুঁজি করেছি। ভেতরে এসে এখন দরজাটা বন্ধ করে দাও।’
বাড়িটা যদিও জনমানবহীন কিন্তু বার্গার তার ওভারকোট দিয়ে লণ্ঠনের আলো যতদূর সম্ভব ঢেকে রাখল।
‘এই জনমানবহীন বাড়িতে আলো জ্বলছে দেখলে কেউ সন্দেহ করতে পারে’, বার্গার বলতে লাগল, ‘এখন আমাকে এই পাটাতনগুলো সরাতে সাহায্য করো।’
ঘরের এক কোনায় কাঠের মেঝেটা আলগা ছিল। দুজনে মিলে সেখান থেকে কয়েকটা তক্তা তুলে দেয়ালের গায়ে দাঁড় করিয়ে রাখল। তক্তাগুলো সরাতেই একটা চার কোনা ফোঁকর বেড়িয়ে পড়ল আর সেখান থেকে একটা পাথুরে সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে।
‘সাবধানে!’ তাড়াহুড়া করে নামছিল বলে কেনেডিকে বার্গার সাবধান করল, ‘এটা একটা খরগোশের গর্তের মতো, অজস্র অলিগলিতে ভর্তি, একবার পথ হারালে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।’
‘এই গোলকধাঁধায় তুমি চলাফেরা করো কীভাবে ?’
‘শুরুর দিকে তো কয়েকবার অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছি, এরপর ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশের কৌশলটা বুঝে ফেলেছি। কিন্তু তোমার সঙ্গে যদি আলো না থাকে তাহলে কৌশল জানলেও তুমি বের হতে পারবে না। কিন্তু এখনও বেশি ভিতরে যাবার সময় সুতোর গোলা সঙ্গে নিয়ে সুতা ছড়াতে ছড়াতে যাই। তুমি নিজেই দেখতে পাবে কী কঠিন এই গোলকধাঁধা, যে কোনও গলি দিয়ে একশ গজ যাবার আগেই দেখবে প্রায় ডজনখানেক পথ ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলে গেছে।’
প্রায় বিশ-ফুট নিচে একটা চার কোনা জায়গায় এসে ওরা দাঁড়াল। লণ্ঠনের আলো মেঝে আলোকিত করে রাখলেও ছাদের দিকটা অন্ধকার। কাঁপা কাঁপা আলোতে চোখে পড়ছিল হলদেটে দেয়ালের ফাটল। এই চার কোনা জায়গাটা থেকে চারদিকে অসংখ্য অন্ধকার সুড়ঙ্গ পথ চলে গেছে।
‘আমার সঙ্গে প্রায় লেগে থাকো বন্ধু’, বার্গার বলল, ‘যাবার পথে কিছু চোখে পড়লে সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিও না, যেখানে তোমাকে নিয়ে যাব সেখানে এই রত্নরাজির সবকিছুই অসংখ্য পরিমাণে পাবে। সরাসরি চলো সেখানেই যাই।’
একটা সুড়ঙ্গ ধরে বার্গার চলা শুরু করল, আর কেনেডি তাকে প্রায় পায়ে পায়ে অনুসরণ করতে লাগল। প্রতিনিয়তই গলিগুলো দুই ভাগ হয়ে দুই দিকে চলে যাচ্ছে, কিন্তু কোথাও না থেমে বা ইতস্তত না করে বার্গারের এগিয়ে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল কোনও গোপন চিহ্ন দেখে সে এমন নির্দ্বিধায় এগুচ্ছে। যাবার পথের দুই পাশেই দেয়াল ঘেঁষে সাজিয়ে রাখা হয়েছে মমি হয়ে যাওয়া মৃতদেহ। লণ্ঠনের হলদেটে আলোতে মমিগুলোকে জীবন্ত মনে হচ্ছিল। কেনেডি খুব উৎসাহ নিয়ে মমিগুলোর পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা শিলালিপি, ছবি, তৈজসপত্র, গহনা ও অন্যান্য জিনিসপত্র দেখছিল। যদিও দ্রুততার সঙ্গে পথ চলছিল এবং এক পলকের বেশি জিনিসগুলো দেখার সুযোগ পাচ্ছিল না, তবু কেনেডি বুঝতে পারল আবিষ্কৃত সমাধিক্ষেত্রগুলোর মধ্যে এই সমাধিক্ষেত্রটাই সবচাইতে প্রাচীন এবং ঐশ্বর্যমণ্ডিত।
‘লণ্ঠনটা নিভে গেলে কী হবে ?’ উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে সে জানতে চাইল।
‘আমার কাছে অনেক মোমবাতি আর দেয়াশলাই আছে। তোমার কাছে দেয়াশলাই নেই ?’
‘না, তুমি বরং আমায় কয়েকটা দেয়াশলাই দাও।’
‘সেটার দরকার পড়বে না, আমরা তো আর আলাদা হচ্ছি না।’
‘আর কতদূর যেতে হবে ? প্রায় সিকি মাইল তো মনে হয়ে হেঁটে ফেললাম।’
‘তার চাইতেও বেশি। এই সমাধিক্ষেত্রের কোনও শেষ নেই―অন্তত আমি খুঁজে পাইনি। এরপরের পথ আরও জটিল, এখান থেকে আমাদের সুতোর গোলা ব্যবহার করতে হবে।’
সুতোর এক প্রান্ত একটা পাথরে বেঁধে গোলাটা বুক পকেটে রেখে সুতো ছাড়তে ছাড়তে বার্গার চলতে লাগল। কেনেডিও বুঝতে পারছিল যে গলিগুলো এখন গোলকধাঁধার মতো প্যাঁচানো হয়ে উঠেছে আর একে অন্যের মাঝ দিয়ে গিয়ে জালের মতো বিস্তীর্ণ হয়ে আছে। খানিকক্ষণ পর তারা একটি বড় গোলাকার ঘরে এসে পৌঁছল, ঘরের মাঝে চার কোনা বেদির উপর শ্বেতপাথরের একটি ফলক রাখা।
বার্গার ফলকের কাছাকাছি লণ্ঠন নিয়ে এলে সেটাকে দেখতে পেয়ে কেনেডি আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ‘আরেহ… এটা তো প্রার্থনাকক্ষের বেদি। খ্রিষ্টানদের বানানো প্রথম বেদি সম্ভবত এটাই। কোনও সন্দেহ নেই এই ঘরটা একসময় গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।’
‘ঠিক তাই’, বার্গার বলল, ‘হাতে অনেক সময় থাকলে তোমাকে ঘুরে ঘুরে সবগুলো মৃতদেহ দেখাতাম। এই ঘরের দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে যত মমি রাখা আছে সবগুলোই সেই সময়ের গির্জার পাদ্রি আর বিশপদের। কাছ থেকে একটাকে দেখে আসো।’
কেনেডি দেয়ালের কাছে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত বীভৎস একটা মাথার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অসাধারণ!’ বদ্ধ ঘরে তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর গর্জনের মতো শোনাল। ‘আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি তোমার এই আবিষ্কার তুলনাহীন। লণ্ঠনটা একটু কাছে নিয়ে এসো তো, এই সবগুলোকে একটু দেখব।’
কিন্তু বার্গার তখন একটু দূরে সরে গিয়ে ঘরের অন্য কোনায় দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকেই কেনেডিকে বলল―‘তুমি কি জানো এখান থেকে বাইরে বের হবার সিঁড়ি পর্যন্ত যাবার কতগুলো ভুল রাস্তা আছে ? দুই হাজারেরও বেশি। এইরকম গোলকধাঁধা বানিয়ে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করত। সঙ্গে যদি আলো থাকে তাহলে এখান থেকে বের হবার সম্ভাবনা দুই হাজার ভাগের এক ভাগ, আর আলো না থাকলে তো বের হওয়া আরও মুশকিল।’
‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে।’
‘আর এই অন্ধকার তো ভয়াবহ! আমি একবার আলো নিভিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছিলাম। চলো আজ আবার দেখা যাক!’ বলেই বার্গার লণ্ঠনটা নিভিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই যেন একটা অদৃশ্য হাত কেনেডির চোখের উপর চেপে বসল। সে কখনও চিন্তাও করতে পারেনি অন্ধকার এতটা নিñিদ্র হতে পারে। অন্ধকার যেন তাকে পিষে ফেলতে চাইছে। এই অন্ধকারকে মনে হচ্ছিল একটা নিরেট দেয়ালের মতো, নড়াচড়া করতেও যেন ভয় লাগে। সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে সে অন্ধকারের এই দেয়ালকে সরিয়ে দিতে চাইল।
‘অনেক হয়েছে বার্গার, আলোটা জ্বালো।’
কিন্তু তার সঙ্গী তখন হাসতে শুরু করেছে, আর এই বৃত্তাকার ঘরে মনে হচ্ছিল হাসিটা যেন চারদিক থেকে ছুটে আসছে।
‘ঘাবড়ে গেলে নাকি, বন্ধু!’
‘আহ! আর দেরি করো না তো, আলোটা জ্বালাও’, কেনেডির কণ্ঠে ব্যাকুলতা।
‘ব্যাপারটা অদ্ভুত, তোমার গলা শুনে আমি বুঝতেই পারছি না তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছো। আমি কোথায় আছি তুমি বুঝতে পারছো ?’
‘না, মনে হচ্ছে তুমি আমার চারপাশে ঘিরে আছো।’
‘এই সুতোটা আমার হাতে না থাকলে বুঝতেই পারতাম না কোন পথে বের হতে হবে।’
‘অনেক হয়েছে, এবার এই তামাশা বন্ধ করে আলোটা জ্বালাও।’
‘কেনেডি! আমি যেটা বুঝতে পারলাম, দুটো জিনিস তুমি খুব পছন্দ করো। প্রথমটা হচ্ছে এডভেঞ্চার আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে যে কোনও বাধা অতিক্রম করা। এই সমাধিক্ষেত্র থেকে বের হওয়াটা হবে তোমার এডভেঞ্চার, আর বাধাগুলো হচ্ছে এই অন্ধকার আর দুই হাজার ভুল রাস্তা, যাদের কারণে সঠিক রাস্তাটা খুঁজে বের করতে তোমার একটু কষ্ট হবে। কিন্তু তাড়াহুড়া করার দরকার নেই, তোমার হাতে অনেক সময় আছে। আর মাঝে মাঝে যখন বিশ্রামের জন্য থামবে তখন মেরি স্যান্ডারসনের কথা ভেবো। একটু ভেবে দেখো তার সঙ্গে তুমি যথাযথ আচরণ করেছিলে কি না ?’
‘শয়তান! তুই কী চাস ?’ কেনেডি গর্জে উঠল। কেনেডি ছোট ছোট বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে সেই নিকষ অন্ধকারকে দুই হাত দিয়ে ধরতে চাইছিল।
‘বিদায় কেনেডি!’ একটা বিদ্রƒপের সুর ভেসে এল। ইতিমধ্যেই বার্গার বেশ কিছুটা দূরে সরে গিয়েছে, ‘মেয়েটির প্রতি তুমি অন্যায় করেছো কেনেডি। একটা ছোট ব্যাপার অবশ্য তুমি জানো না, সেটা না হয় এখন আমিই বলে দিচ্ছি। মিস স্যান্ডারসনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল সামাজিক আদবকায়দা না জানা এক গরিব ছাত্রের সঙ্গে, আর তার নাম হচ্ছে জুলিয়াস বার্গার।’
জামাকাপড়ের খসখসে আওয়াজ শোনা গেল আর শোনা গেল আস্তে আস্তে দূরে সরে যাওয়া পদশব্দ। তারপর সেই কবরস্থানের প্রার্থনাকক্ষে নেমে এল নিñিদ্র নীরবতা, আর পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষের চারপাশে পানি যেভাবে ঘিরে থাকে সেভাবে এই ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা কেনেডিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল।
প্রায় দুই মাস পর ইউরোপের বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিচের খবরটি বের হয়েছিল―
রোমে সদ্য আবিষ্কৃত একটি ভূগর্ভস্থ সমাধিক্ষেত্রকে পুরাতত্ত্বের একটি চমকপ্রদ আবিষ্কার হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, সমাধিক্ষেত্রটি সেইন্ট ক্যালিস্টাসের খিলানের সামান্য পুবে অবস্থিত। প্রাচীন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মূল্যবান স্মৃতিচিহ্নে ভরা এই সমাধিক্ষেত্রটি আবিষ্কার করেন প্রাচীন রোমের উপর গবেষণায় একেবারে প্রথম সারির পুরাতাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত জার্মানির তরুণ ডক্টর জুলিয়াস বার্গার। যদিও ডক্টর বার্গার এই সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কারের গবেষণাপত্রটি লেখেন, কিন্তু মনে হচ্ছে অন্য এক হতভাগা পুরাতাত্ত্বিক তার আগেই এটি আবিষ্কার করেছিলেন। কয়েক মাস আগে তরুণ ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক কেনেডি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, একজন মেয়ের সঙ্গে একটি কলঙ্কজনক ঘটনায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন বলে তিনি রোম ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে পুরাতত্ত্বের প্রতি গভীর প্রেমের কারণেই তিনি বিপদে পড়েছেন। তার মৃতদেহ এই সমাধিক্ষেত্রের গভীরে পাওয়া গেছে, এবং তার পা ও জুতো দেখে মনে হয়েছে দিনের পর দিন তিনি এই গোলকধাঁধায় পথ খুঁজে বেরিয়েছেন। মৃত ভদ্রলোক তাড়াহুড়োর কারণে কোনও মোমবাতি বা দেয়াশলাই ছাড়াই ভূগর্ভে প্রবেশ করে যে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছেন তারই ফলস্বরূপ তাকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছে। ব্যাপারটা আরও বেদনাদায়ক এ কারণে যে, কেনেডি ছিলেন ডক্টর জুলিয়াস বার্গারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধু সহকর্মী কেনেডির এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি তার এই বিস্ময়কর আবিষ্কারের আনন্দকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
সচিত্রকরণ : রজত



