আর্কাইভগল্প

গল্প : নগরঘড়ি ও সুবোধ : শিহাব শহিদুল

নগরভবনের দেয়ালের মস্ত ঘড়িটা হঠাৎ থেমে গেছে। ভাঙ্গা নয়, ত্রুটিপূর্ণ নয়, কেবল থেমে গেছে। ঠিক ৩টা ১৫ মিনিটে থেমে গেছে। সেদিকে কেউ লক্ষ করেনি, লক্ষ করার প্রয়োজন অনুভব করেনি। লোকজন দল বেঁধে, মিছিল নিয়ে, কখনও একাকী পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিল, তাদের কারও চোখ সেদিকে পড়েনি। মনে হলো সময় হতবাক হয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে; যেন নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।

দিন কয়েক পরে ঘড়ি মেরামতের জন্য একজন প্রকৌশলীকে নিয়োগ দেওয়া হলো। যার এরকম বড় ঘড়ি মেরামতের অভিজ্ঞতা নেই। তবে, ইতোমধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকৌশল বিদ্যা প্রয়োগ করে জগৎ জোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজের সফলতার সুবাদে বেশ স্বনামধন্য হয়েছেন। থেমে যাওয়া ঘড়ি মেরামতের জন্য নগরের সবাই তাকে উপযুক্ত মনে করেছে। প্রকৌশলী সাহেব তার কাজের সুবিধার্থে আরও কয়েকজন প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে একটা টিম গঠন করেছেন। পুরো নগরভবন জুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে যাতে থেমে যাওয়া ঘড়ির কাঁটা রাস্তার টোকাই বা হেরোইন আসক্ত কেউ চুরি করে না নিয়ে যেতে পারে এবং মেরামতের কাজে প্রকৌশলী দলের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়। ঘড়ি মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। সবাই সেদিকে তাকিয়ে আছে বেশ ভিড় জমিয়ে।

সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল, আকাশ তখন বেগুনি রঙয়ের গভীর ছায়ায় মধ্যে ক্রমশ ডুবে যেতে লাগল। সে পরিবর্তন কেউ লক্ষ করেনি। যদিও এ রঙ বৃষ্টির ফোঁটায় জলরঙের মতো ক্রমান্বয়ে একে-অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে ক্রমশ সন্ধ্যা নেমে এল শহর-শরীরে। বেগুনি রঙের ছটা তখনও সন্ধ্যা মেঘের গায়ে হালকা আলো ছড়াচ্ছিল। মসজিদের মাইকে মাগরিবের আজান শোনা যাচ্ছে, বাতাসে ধূপ আর ছাতিমের গন্ধ, দূর হতে শাঁখ বাজানোর ধ্বনি কানে আসছে। এ এক মাতাল করা সন্ধ্যা। এরকম সন্ধ্যায় সুবোধ উদ্যানের গাছের সারির মধ্যে এসে দাঁড়াল।

সারা দিন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে সুবোধের ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে। উদ্যানে একটা সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে সে উদাসভাবে সামনের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। সে দেখল-গাছগুলো উল্টাভাবে বেড়ে উঠেছে, তাদের শেকড়গুলো মাটির উপর উঁচুতে প্রসারিত হয়েছে। গাছের শেকড়ের ওপর মেঘগুলো ধোঁয়ার মতো ঘোরাফেরা করছে; ঘন হচ্ছে আবার শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণে দেখল সামনের রাস্তাটি ফাঁকা হয়ে গেছে; সন্ধ্যার ধূপছায়া আলোর মধ্যে ধীরে ধীরে আকার পরিবর্তন করছে। তার মনে হলো―ওটা রাস্তা নয়, দূরে চলে গেছে একটি নদী, তার শৈশবের সেই নবগঙ্গা নদী। সে যেন তার কূলে বসে উদাসভাবে সামনের জলের দিকে তাকিয়ে আছে। শৈশবে যেরকম মন খারাপ হলে এ নদীর কূলে বসে থাকত সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত। সে চোখ ফেরাতে পারছে না। সন্ধ্যার শরীরে কালো ছায়া ফেলে ক্রমশ রাত নেমে এল। শীত ও কুয়াশা জড়ানো রাত, বেশ মায়াবী অন্ধকার। হঠাৎ একটা মিষ্টি সুবাস সুবোধের নাকে লাগল এবং একটা কোমল হাতের স্পর্শে তার সম্বিৎ ফিরে এল।

হাতটা কোমল তবে স্পর্শ বেশ উষ্ণ; নাকি শীত লাগছে বলে উষ্ণ মনে হচ্ছে। সে দেখল তার সামনে দাঁড়ানো একটা তরুণী। তরুণী বললে ঠিক হবে না; ভেঙ্গে যাওয়া মুখ, অভাবের ছাপ লেগে আছে মুখময়, চুলগুলো পরিপাটি করে বাঁধা হলেও বেশ ধূসর, বলা যায় যুবতী। বয়স বেশি না হলেও ক্ষুধা, অভাব, দরিদ্রতা ও অসহায়ত্বে বয়স এসে দাঁড়িয়েছে কোন ধূসর সীমারেখায়।

মেয়েটা সুবোধের দিকে চেয়ে আছে, মুখে হালকা হাসি। এক হাত সুবোধের দিকে, হাতে আছে কাগজে মোড়ানো একটা কিছু।

মেয়েটা বলল―‘লও খাইয়্যা লও, সেই হন্ধা তন দেকতাসি তুমি এইহানে বইস্যা বইস্যা কী জানি ভাবতাছো। একলাই হাসতাছো, একলাই কথা কইতাছো। আবার উপ্রে-নিচে, আসমান-জমিন, গাছপালার দিকে চাইয়্যা কী যেন ভাবতাছো।’

মেয়েটির হাত থেকে কাগজে মোড়ানো জিনিসটা নিয়ে সুবোধ দেখল তাতে সরষে ভর্তা লাগানো একটা গরম চিতই পিঠা। সুবোধ এতই ক্ষুধার্ত ছিল যে, কোনও কিছু না ভেবেই পিঠা খেতে লাগল। সুবোধের মনে হলো আসলেই তার সারা দিন কিছু খাওয়া হয়নি। খাবার কেনার মতো টাকা তো তার পকেটে নেই। কোনও কাজ সে কখনও ঠিকভাবে করতে পরেনি। একটা স্কুলে একসময় মাস্টারি করত। চাকরিটা চলে গেছে। এরকম বিপ্লবীদের কোথাও কাজ জোটে না। এ মুহূর্তে তার কোনও ঠিকানা নেই, ঘর নেই। আল্লার মেহেরবানিও নেই। মনে হয় এ পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন, অসহায় আর নিঃসঙ্গ মানুষ সে।

সুবোধ জিজ্ঞেস করল―‘তোমার নাম কী ? থাকো কোথায় ?’

মৃদু হাসির আভা ছড়ানো মুখ তুলে মেয়েটা বলল―‘আমাগো আবার নাম! ছোটকালে মায় রাখছিল তানিয়া। বাপরে দেখি নাই; আমার জন্মের আগেই নাকি মরছে। বস্তির হগ্গলে আমায় কইত বেজম্মা। আমাগো একখান ঘর আছিল হাতিরঝিল বস্তিতে। মা বাসা-বাড়িতে ঠিকা বুয়ার কাম করত, করোনায় মইরা গেছে। আমার বিয়া দিছিল এক মদনের লগে, রিক্সা চালাইত, আমায় ফালাইয়া একদিন চইল্যা গেল। হুনছি মিরপুর চলন্তিকা বস্তিতে হে নাহি থাহে, এক হোগা মোটা মাগিরে বিয়া করছে। শালার মিনসে, আমারে কয় মাগি তোর লগে শুইতে ভালো লাগে না।’

 একটা দুঃখ জড়ানো চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেয়েটা! তারপর চুপচাপ, নিস্তব্ধতা।

সে আবার বলল―‘হাতিরঝিল অহন পার্ক হইছে, সুন্দর হইছে। আমাগো উচ্ছেদ করা হইছিল। কইছিল টাহা দিবে, ঘর দিবে। দিছে ঘোড়ার আন্ডা। এহন একখান ঘর আছে; গুলশানের পাশে করাইল বস্তিতে। তয় সব দিন সেইহানে থাহি না। এইহানে হাইকোর্ডের পাশে আমাগো একখান ঝুপড়ি আছে। সেইহানেই রাইত কাডে।’

‘তুমি একটু বহো, আমি আইতাছি’―বলেই চকিতে সামনের গাছের সারির মধ্যে গাঢ় অন্ধকারে মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

রাত যত গভীর হচ্ছে, শীতল হাওয়া কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। এ রাতে কাঁপুনি ধরা শরীর একটুখানি উষ্ণতার পরশ চাইছে। একটা নারীশরীরের স্পর্শ, একটু উষ্ণতা। যতই হোক সুবোধ একটা প্রাণি তো। সুবোধ ভাবছে―মেয়েটার সঙ্গে দেখা না হলেই ভালো হতো। খাবারটা না খেলেই ভালো হতো। সে ভাবছে―সে নবগঙ্গা নদীর জলে পিঠাটা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। সে জলের মধ্যে তানিয়া ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আবার নদীর জলও শুকিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। মাছেরা আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে, তারা হয়ে মিশে যাচ্ছে আকাশের গায়ে।

কয়েক ঘণ্টা পর মেয়েটি ফিরে এল। তার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে সুবোধের বেশ করুণা হলো। তার মনে হলো রাতে ফোটা একটি সুগন্ধি ফুল যেন দুটি কুৎসিত বীভৎস হাতের তালুতে পিষে মলিন হয়ে গেছে।

মেয়েটা আস্তে আস্তে তার পাশে এসে বসল।

মেয়েটা বলল―‘তোমার নাম কী ?’

‘সুবোধ’―সুবোধ উত্তর দিল।

‘তুমি কী বেকার ? কাম-কাজ নাই ?’―মেয়েটি বলল।

‘হ্যাঁ ছিল, তবে এখন নেই’―সুবোধ বলল।

‘তোমার কি থাকনের জায়গা নাই ?’―মেয়েটি বলল।

‘একটা ছিল, এখন নাই’―সুবোধ উত্তর দিল।

‘তয় তুমি আর আমি এক, আমগো ঘরবাড়ি নাই। এ শহর জুইড়া এত এত দালান-কোডা, কিন্তু আমাগো কোনও ঘর নাই। আচ্চা, এই শহরের এত এত জমি, ফেলাট, বাসা এইগুলো আসলে কাগো ? এইহানে কারা থাহে, তারা পয়সা পায় কই ?’―মেয়েটা বলল।

সে প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে পারেনি সুবোধ।

মেয়েটা আবার বলল―‘এইহানে আর থাকা যাইব না। বড় শীত পড়তাছে। পুলিশে পিডাইব। চলো, আমার লগে, আমার সঙ্গে হুই বো আইজ রাইতে, তোমার ট্যাকা লাগব না। তুমি আমার বন্ধু না।’

সুবোধ উঠে দাঁড়াল, তারপর মেয়েটির সঙ্গে হাঁটতে লাগল। উদ্যান থেকে বের হয়ে মেট্রো স্টেশনের নিচ দিয়ে এগিয়ে ঢাকা গেট পার হয়ে হাইকোর্টের দিকে তারা হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে সুবোধ দেখল রাস্তার দু ধারের দেয়ালে নানা রকম গ্রাফিতি লেখা হয়েছে : দেশ সংস্কার চলছে, সুবোধ তুই ঘুরে দাঁড়া, নতুন স্বাধীনতা, দাম দিয়ে কিনেছি বাঙলা, সুবোধ কবে হবে ভোর, ৩৬ জুলাই, স্বাধীনতার সূর্যোদয় ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা হাঁটছে, হাঁটছে। পথ যেন শেষ হচ্ছে না।

সুবোধের মনের মধ্যে একটা বাতাস যেন গান করে যাচ্ছে। বেশ করুণ সে গান। সে ভাবল―একদিন সে দিন বদলের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিল। নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা! সেই সুবোধ, ‘যে কি না মানব-জাতির ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে গুরুগম্ভীর চিন্তা করত, সমাজব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাবার স্বপ্ন দেখত, রাজনীতি-বিপ্লব নিয়ে মাথা ঘামাত, বই-পড়া অতলস্পর্শী পণ্ডিত্য নিয়ে রীতিমতো মগ্ন থাকত, সমাজের বিরুদ্ধ শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে যে নিজেকে সম্পূর্ণ সচেতন করার চেষ্টা করত, সেই সুবোধ কি না একটা ছিন্নমূল, ঘরহারা, অসহায় মেয়ের সঙ্গে চলেছে এই শীতের রাতে একটা নারীশরীরের উষ্ণতা লাভের অভিলাষে।’

সুবোধ ভাবল মেয়েটার সামনে একবার হাঁটু মুড়ে তাকে স্যালুট করি কিংবা ভক্তি ভরে বলি―তুমি আমার প্রিয়তমা, আমার জননী, আমার দুঃখিনী দেশ।

সুবোধ ও তানিয়া হাঁটছে। হঠাৎ তারা আবিষ্কার করল তাদের দু হাত প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ, সেখানে পালক গজাচ্ছে, দু হাত যেন বিশাল দুটি ডানায় রূপ নিল। তারা নিজেকে ওজনশূন্য মনে করল, তাদের পা দুটি ক্রমশ মাটি থেকে উপরে শূন্যে উঠে যাচ্ছে। তারা উড়ে যাচ্ছে। উদ্যানের উপর দিয়ে, সচিবালয়ের ওপর দিয়ে, শহরের উঁচু উঁচু দালানের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। উড়তে উড়তে নগরভবনের ওপর এসে চক্রাকারে ঘুরতে লাগল। কয়েকবার প্রদক্ষিণ করতে লাগল সেই নগরভবনের দেয়ালের ঘড়ির মাথার উপর। ক্রমশ বিশাল ডানা থেকে পালকের মতো আগুন ঝরতে লাগল। সে আগুনের হলকা-হাওয়ায় পুরো নগরভবন উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ঘড়ি মেরামতকারী প্রকৌশলী ও তার দলবল আস্তে আস্তে সেখান থেকে একে একে সরে যাচ্ছে। শহরের সব ল্যাম্পপোস্টের আলোর সারি বিশাল আলোর মিছিল হয়ে নগরভবনের সামনে এগিয়ে আসছে। সুবোধ ও তানিয়া একা নয়, সব শহরবাসী যেন অগ্নিডানা মেলে সমস্ত আকাশজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্ধকার শহর, উদ্যান, নগরভবন আলোকিত হয়ে উঠছে। ক্ষুধা নেই, যন্ত্রণা নেই, ছিন্নমূল তানিয়া নেই। সব অগ্নিবলাকা। কোথাও কোনও অন্ধকার নেই। সমস্ত শহর যেন আলোয় উদ্ভাসিত সবুজ প্রান্তর। ঘড়িটার চূড়ায় যখন তারা বসল, তাদের ডানার অগ্নিস্পর্শে থেমে যাওয়া ঘড়ি আবার চলতে শুরু করল।

সুবোধ আবিষ্কার করল উদ্যানের সিমেন্টের বেঞ্চির ওপর সে শুয়ে আছে। ক্রমশ পুবের আকাশ আলোকিত করে সূর্য উঠছে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button