
খু ব ব্যস্ত আপনি ? মোবাইলের ওপারে রুনা। মৃদু গলায় লালিত্য, যা প্রায় দুর্লভ।
সিগারেটে টান দিতে দিতে চেয়ারে হেলান দেয় অনন্য―ব্যস্ত না, বসে আছি একা একা রুমে। কিন্তু কেন জানতে চাইছেন ?
বিকেলের দিকে সময় হবে ?
রুম কাঁপিয়ে হাহাহা হাসিতে ফেটে পড়ে অনন্য। রুনার কৌশলটা জেনে গেছে ও এতদিনে। কোনও কিছুতেই তাড়া নেই। তীব্র স্রোতে ভেসে যাবে, ডুবে যাবে কিন্তু ধীরে সুস্থে। কোথাও কোনও তাড়াহুড়া নাই। ঢাকায় একই অফিসে দুজন চাকরি করে কিন্তু বিশাল শহরের দুই প্রান্তে। মতিঝিলে একই অফিসে ছিল দুজনে। ছয় মাস আগে রুনা নিরবধিকে ট্রান্সফার করে উত্তরার অফিসে পাঠায় কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করেই। বিশাল অফিসে অনন্য রতন বসে ছয়তলায়। তিনতলায় বসে রুনা। অনন্য রতনের তিন ধাপ নিচের কর্মকর্তা রুনা। অফিসের একই গাড়িতে আসা-যাওয়ার কারণে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুজনার মধ্যে, না ঘনিষ্ঠ, না দূরত্বের। দেখা হলে একে অপরের খোঁজ খবর নেওয়া এই পর্যন্ত। বছরখানেক আগে রামপুরা থেকে মতিঝিলে অফিসে যাওয়ার পথে শাহজাহানপুরে বিশাল জ্যামে পড়ে গাড়ি, সঙ্গে আকাশ ভেঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। হতাশ ড্রাইভার গাড়ি বন্ধ করে বসে থাকে বিচিত্র গাড়ি রিকশা বাস ট্রাকের মহাসমাবেশে। মাইক্রোবাসে ছয়জন আসা যাওয়া করে নিয়মিত। নিয়মিত যাতায়াতকারী দুজন কলিগ সহকর্মী গাড়িতে আসেনি আজকে। চারজন গাড়ির মধ্যে ঝিম মেরে বসে আছে বৃষ্টির মধ্যে। হঠাৎ গাড়ির দরজা খুলে নেমে যায় অনন্য।
আপনি কোথায় যাচ্ছেন ? পাশে বসা রুনা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করে।
চা খেতে, বৃষ্টির মধ্যে ফুটপাখে চায়ের দোকানের সামনে যায় অনন্য, চা দোকানদারের মাথার ওপর টিনের চাল থাকলেও দুই পাশে ঝুলিয়ে রাখা পলিথিনে বৃষ্টি মানছে না। চা দোকানের মাথার ওপর বিশাল এক বৃক্ষ। বৃক্ষের ছোট ছোট পাতা চুঁইয়ে পানি পড়ছে টপ টপ টপ। দোকানির পিছনে দুই-তিনজন রিকশাঅলা গুটিসুটি মেরে বসে বসে ভিজছে আর বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে খাচ্ছে। সামনের ফুটপাথে কয়েকটি খালি রিকশা ভিজছে আর ঝিমাচ্ছে।
বৃষ্টিতে থমকে যাওয়া পরিস্থিতির মধ্যে দোকানের সামনে কেতাদুরস্ত একজনকে দেখে অবাক চাঅলা। চাঅলার বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে দারুণ সুখে ভিজতে ভিজতে অনন্য তাকায়, এক কাপ চা দিন, আদা দিয়ে আর একটা বিস্কিট।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যে চা খেতে আসায় তরুণ বিক্রেতা দারুণ খুশি। দ্রুত কাপ ধুয়ে এক কাপ চা বাড়িয়ে দিলে অনন্য বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে থাকে। বাস প্রাইভেট গাড়ি রিকশার যাত্রীরা অবাক চা পান দেখে অনন্যর। ভাবছে, লোকটা পাগল টাইপের না হয়ে যায় না। কিন্তু অনন্য রতন নির্বিকার, চারদিকের থেঁতলানো বৃষ্টি, ভিজে যাওয়া কাকের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে চায়ের কাপে আরাম করে চুমুক দেয়।
আমাকেও এক কাপ চা দিন তো!
চায়ের কাপ থেকে মুখ তুলে চমকে তাকায় অনন্য, পাশে দাঁড়িয়ে রুনা। ভিজে গেছে ইতিমধ্যে শরীরের স্যালোয়ার কামিজ অর্ধেক।
হাসে অনন্য, আমার মতো পাগলামি আপনারও আছে ?
আছে, আপনার মতো সাহস আমার নাই। কিন্তু আপনাকে দেখে সাহস পেলাম।
নেন, চা নেন। লগে একটা টোস্ট ভিজাইয়া খাইলে টেস পাইবেন, চা দিতে দিতে বলে চাঅলা।
দিন না একটা টোস্ট, চায়ের কাপ নিতে নিতে বলে রুনা।
বিস্কিট খাওয়ার পর রুনার সঙ্গে অনন্যও একটা টোস্ট নেয়। বৃষ্টি যদিও একটু ধরে এসেছে কিন্তু ভিজতে ভিজতে দুজনে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চায়ে ভিজিয়ে টোস্ট খায়। গাড়ির ভেতরে বসা কলিগ ইশরাত জানালা খুলে একের পর এক ছবি তোলে মোবাইলে। চা খাওয়ার পর বৃষ্টি আবার বাড়ছে।
সিগারেট টানবেন ?
আমি ? অবাক রুনা নিরবধি ?
আমাকে একটা সিগারেট দিন ভাই, হাত বাড়িয়ে দেয় অনন্য রতন দোকানদারের দিকে, হ্যাঁ আপনি ? টানেননি কখনও ?
দু দিকে মাথা নাড়ে রুনা নিরবধি, আমি কোনওদিন টানিনি। শুনেছি সিগারেট টানলে মাথা ঘুরায়।
তাই ? বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে সিগারেটে আগুন জ্বালায় কয়েকবার চেষ্টার পর। দিয়াশলাই দোকানদারকে ফিরিয়ে দিয়ে তাকায় রুনার দিকে। মেয়েটা সুন্দর, কমনীয়। টিকলো নাকের ডগার ওপর বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির কণাফুল ফুটছে। খুব ইচ্ছে করছে রুনাকে জড়িয়ে ধরতে। বুকের মধ্যে রুনার মুখটা আটকে রেখে ওর মাথার ঘন কালো চুলের ওপর মুখ রাখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে কিন্তু বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়, সব ইচ্ছে কী পূরণ হয় ?
কী হলো ? দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন কেন ?
আপনার জন্য…বলতে গিয়ে নিজেকে সামলে নেয় অনন্য। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে জবাব দেয়, আপনি বুঝবেন না। চলুন, গাড়ির ভিড় কমেছে, উঠি গাড়িতে।
চলুন।
গাড়িতে ফিরে আসে দুজনে। গাড়ির সহকর্মীরা কেউ বিরক্ত কেউ উৎফুল্ল। গাড়ির সহকর্মীরা নিরাপদ দূরত্বে সরে বসে, যাতে শরীরের কাপড় ভিজে না যায়। পারভেজ মুরাদ উদ্বেগ জানায়, অনন্য আপনার তো জ্বর আসবে।
হাসে অনন্য।
আরে হাসছেন কেন ?
আমার জ্বর আসবে না।
মানে ?
কারণ আমার অভ্যাস আছে। বৃষ্টি এলে সুযোগ পেলে আমি ভিজি। রাতে বৃষ্টি নামলে বাসার কাছে হাতিরঝিলে আমি লুঙ্গি আর শার্ট গায়ে ভিজতে যাই। দিনে রাস্তাঘাটে হালকা বৃষ্টিতেও ভিজি।
করুণ স্বরে প্রশ্ন করে ইশরাত, ভেজা প্যান্ট শার্ট কী করেন ? আপনার শরীরের প্যান্ট শার্ট তো ভেজা, রুনা আপারও। শুকাবেন কী করে ?
ইশরাতের প্রশ্নে মাথার চুলের পানিতে ঝাড়া দিতে দিতে বাইরে তাকায় অনন্য, রুনা কীভাবে শরীরের ভেজা জামা কাপড় শুকাবে জানি না কিন্তু আমার ভেজা জামাকাপড় শরীরেই শুকিয়ে যাবে।
আঁতকে ওঠে ইশরাত, বলেন কী ?
হ্যাঁ, শরীরেরই শুকিয়ে যাবে। নো টেনশন…।
পরের দিন অফিসে চা খাওয়ার সময়ে ফোন আসে রুনার, আপনার জন্য আমার শরীরে জ্বর এসেছে।
আমার জন্য আপনার শরীরে জ্বর এসেছে ? অবাক অনন্য রতন।
হ্যাঁ, কাল আপনার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজলাম, চা খেলাম যে!
আপনাকে চা খেতে আমি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম ?
না, কিন্তু আপনার চা খাওয়া দেখে আমার খুব ইচ্ছে হলো তো, নিজেকে সামলাতে পারলাম না। এখন জ্বরে ভুগছি। হালকা জ্বর, কাশিও আছে, বলতে বলতে খুক খুক কাশে রুনা। সুতরাং আমার জ্বরের জন্য আপনি দায়ী।
মামলা করুন।
মামলা ?
হ্যাঁ।―
কীভাবে মামলা করে জানিই না তো।
আপনার হাসবেন্ডকে বলুন। উনি ব্যবস্থা করবেন, মামলা হলে কোর্ট আপনার জ্বরের কারণে আমাকে জরিমানা করতে পারে। ঘরে বসে ভালো একটা ইনকাম হবে আপনার। ভাইকে পরামর্শ দিন…
নীরব রুনা।
আপনি বলতে না পারলে ভাইকে ফোনটা দিন, আমি বলে দিচ্ছি। আর হ্যাঁ, আমার পরিচিত ভালো উকিল আছে। কম খরচায় ভালো উপকার পাবেন। দিন ভাইকে…
দেওয়া যাবে না, আস্তে বলে রুনা।
কেন ? ভয় পান ভাইকে ?
ভয় পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই…রুনার বিষাদগ্রস্ত স্বর।
বুঝতে পারে না অনন্য রতন, ভয় পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই―মানে কী ? স্বামীর সঙ্গে রাগারাগি চলছে ? নাকি বিদেশে থাকে ? চোখের সামনে ভেসে ওঠে অনন্য রতনের―হালকা গড়নের, কামরাঙ্গা রঙের চওড়া কপালের রুনাকে। মাথায় ঘন কালো চুলের বিরাট খোপায় কী কাঁটা গাঁথে মনে পড়ছে না কিন্তু রুনা কেন আক্রান্ত হলো এই দুপুরে, অফিসের অনেক ফাইলের মধ্যে ?
হ্যালো ? ওপাশে রুনার কণ্ঠ!
হ্যাঁ বলুন।
চুপ করে গেলেন যে!
আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না!
কী বুঝতে পারছেন না ?
আপনি যে বললেন, ভয় পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই, মানে কী ?
মোবাইলের ওপাশে কোনও সাড়া নেই রুনার! ভেসে আসছে শ্বাসপ্রশাসের শব্দ। নিশ্চয়ই কোনও ঘটনা আছে, প্রকাশ করতে চাইছে না, ভাবে অনন্য। না, মেয়েটাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে, ঠিক আছে। আপনার সমস্যা থাকলে জানতে চাই না।
আসলে আমি একা! আমার হাজবেন্ডের সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছে চার বছর আগে। আমি আট বছরের পুত্র অর্ঘ্যকে নিয়ে থাকি মায়ের বাসায়। সেই কারণেই বলছি, আমার ভয় পাওয়ার সুযোগ নেই। আমি কারও নির্দেশে চলি না, আমার নির্দেশে চলি।
সরি!
সরি কেন ?
আমি জানতাম না আপনার জীবনের এই ব্যক্তিগত ক্ষত।
জানেন, ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম আশরাফ ফিরোজকে। প্রথম কয়েকটা বছর ভালোই কাটালাম দুজনে হাসি আনন্দে, অভিমানে, গানে। কিন্তু যখন জানলাম আমার ভালোবাসার মানুষটা অফিসের একজন বয়স্ক নারীর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে―সরাসরি প্রমাণ পেলাম, মেনে নিতে পারলাম না। তখন অর্ঘর বয়স চার বছর। আমার মা-বাবা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু আমার কাছে ওর শরীরটাকে মনে হয়েছে বিষাক্ত কাঁটায় সাজানো মহাবিষবৃক্ষ। প্রেম তো মনে না, শরীরেও। শরীর আছে বলেই তো মন―দুটো মিলে একটা অনন্য সত্তা। ফলে, ফিরে আসতে হয়েছে আমাকে আমার কাছে… ডুকরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে রুনা। অবাক ঘটনা, অনন্য রতন জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। বাইরে বৃষ্টি আর ঘরের মধ্যে রুনার চোখের বৃষ্টি, ওর অস্তিত্বের মধ্যে একাকার হয়ে অদ্ভুত এক মেঘরাজ্য সৃষ্টি করে।
জানেন, এই প্রথম আত্মীয়স্বজনের বাইরে কাউকে আমার এই ঘটনা বললাম। আমি জানি, আমার ব্যক্তিজীবনের এসব ঘটনা বললে আমার ওপর অনেকে কুকুরের মতো হামলে পড়বে, আমাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে খাবে। বিশ্বাস করুন, বুকের মধ্যে কষ্টের সমুদ্র নিয়ে বেঁচে আছি। কাউকে কিছু বলতে পারি না। নিজের মুখে একখণ্ড হাসির পেয়ালা ঝুলিয়ে রাখি, প্রমাণ রাখি, আমি খুব ভালো আছি। কাউকে ব্যক্তিগত ঘটনা বলি না। আজ ভীষণ দুর্বল মুহূর্তে বললাম আপনাকে, কাউকে বলবেন না, প্লিজ।
আমি কাউকে বলব না, নিশ্চিত থাকুন রুনা।
বিশ্বাস করলাম। রাখি…
অনন্য রতন মোবাইল সেট টেবলের উপর রেখে তাকায় জানালা দিয়ে বাইরে। বৃষ্টি পড়ছে তুমুল। চেয়ার ছেড়ে জানালার কাছে যায়। জানালা খুলে বাইরে হাত বাড়ায়, বৃষ্টিতে হাতটা ভিজে যাচ্ছে। তাহলে এই যে মানুষ দেখি টগবগ করে ফুটছে গোলাপের সৌরভে, প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকের মধ্যে বাস করে ঘুণপোকা! স্বার্থের, পরাজয়ের, ক্লেদের, আত্মহননের ঘুণপোকারা কুরে কুরে খায়। দগ্ধ হতে হতে ভেতরে ভেতরে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় কিন্তু কেউ দেখতে পায় না, বুঝতে পারে না, অথচ কত নির্বিকার সুন্দর! অনন্য রতন সিগরেট ধরিয়ে টানতে টানতে কেবলই রুনার কান্নাকাতর মুখটাকে ভাবতে থাকে। আহা নারী, কী বেদনায় গেয়ে যায় বেদনার গান…। জানালা থেকে চেয়ারে বসে। কিন্তু ভালো লাগছে না। আবার দাঁড়ায়, ফিরে যায় জানালার কাছে। জানালার কাচ সরিয়ে বাইরের তুমুল বৃষ্টি দেখে, দেখে বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে যায় রুনা, রুনা নিরবধি। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজছে আর লাল গোলাপের পাপড়ির রঙে হাসছে! জানালায় দাঁড়িয়ে নিচে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা রুনাকে দেখতে দেখতে ভাবে, এই রুনা নিরবধি যদি এখানে ভিজতে থাকে, বাসায় বিছানায় শুয়ে কাঁদছিল কে ? আমার মধ্যে কি রুনা নিরবধির বাঁশি বাজছে ?
বৃষ্টিমুখর দিনে আলাপের সূত্র ধরে দুজনার মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্কটা জলে অতলের স্রোতের মধ্যে ঘুঙ্গুরের মতো বাজছে কিন্তু জমাট হয়ে উঠছে না। ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে মাঝেমধ্যে সংযোগ হয় কিন্তু তরঙ্গ তোলে না। বিশেষ করে রুনার দিক থেকে এক ধরনের শিথিলতা টের পায় অনন্য রতন। খুব সাবধানে পা ফেলতে চায় রুনা। স্বাভাবিক―
কেমন আছেন, কী করছেন ? ম্যাসেঞ্জারে লিখলে রুনা দেখেও উত্তর লেখে না সঙ্গে সঙ্গে। সময় নেয়, এমনও দেখা গেছে দুদিন পর লেখে, ভালো আছি। কেমন আছেন আপনি ?
দু’দিন পরের জবাবের জবাব দেয় অনন্য রতন আরও তিনদিন পর, আমি ভালো নেই।
ইচ্ছে করেই লেখে আমি ভালো নেই, যাতে লেখে রুনা, কেন ? কিন্তু রুনা যথারীতি নীরব। অনন্য খুব ভাবে, কল্পনা করে রুনাকে কিন্তু হামলে পড়বে না বা জোরও করতে চায় না। মাথার মধ্যে গেঁথে আছে রুনার বাক্য―‘আমি জানি, বললে আমার ওপর অনেক কুকুর হামলে পড়বে, আমাকে টুকরা টুকরা করে ছিঁড়ে খাবে। বুকের মধ্যে কষ্টের সমুদ্র নিয়ে বেঁচে আছি।’
আমি একজন কামুক পুরুষ হতে চাই না, কুকুর হতে চাই না―মনে মনে সিদ্ধান্ত অনন্য রতনের। রুনা নিরবধির ফেসবুকে প্রায় প্রতিদিনই ঢোকে অনন্য। ভাবে, কারও সঙ্গে নিশ্চয়ই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ও। কীভাবে আগুনের শরীর নিয়ে থাকবে একা একা ? কিন্তু ফেসবুকে কোনও স্বাক্ষর নাই। কারও সঙ্গে কোনও ছবি পোস্ট করে না। কয়েকদিন পর পর ছেলে অর্ঘ্যর সঙ্গে দু-একটি ছবি পোস্ট করে। কোনও সূত্র খুঁেজ পায় না অনন্য।
দূরের রুনা কখনও কখনও হঠাৎ কাছে চলে আসে। ফোন করে জানতে চাইছে, বিকেলে সময় হবে ?
মানে! আমাকে নিয়ে কোথাও যেতে চাইছে রুনা ? ধারণা করে অনন্য, যখন আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না, তখন আমাকে ডাকে।
হবে, সময় হবে।
তাহলে উত্তরা আসতে পারবেন ?
পারব।
থ্যাঙ্কস।
কখন ? কোথায় ?
সেই আগের অতিথি রেস্টুরেন্টে, সন্ধ্যার আগে আগে…
ঠিক আছে।
রুনার জন্য এই যে অপেক্ষা, ঠিক হচ্ছে ? মাঝেমধ্যে উত্তরায় বা সদরঘাটের খেয়া রেস্টুরেন্টে বসে রুটি মাংস সালাদ খাওয়া তো জীবন নয়। এই বেহায়া জীবনের বাইরে গভীর ঘনিষ্ঠ আর গোপন রূপায়ণের জীবন আছে, সেই জীবনের সন্ধান কবে পাব ? সবটাই কি মায়া ? মরীচিকা ? এমনও হতে পারে, আজকে উত্তরার রেস্টুরেন্টে বলতে পারে রুনা―আর পরলাম না একা থাকতে, মা-বাবার চাপে বিয়ে করতে যাচ্ছি। ভদ্রলোক ব্যাংকার। প্রাইভেট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট। বউ ক্যান্সারে মারা গেছে। একটা মাত্র মেয়ে, বয়স নয় বছর। ঈষিতা নাম। ঈষিতা আর অর্ঘ্য একসঙ্গে বড় হবে, একটি বাসায়, কী বলেন ভালো হবে না ?
নিশ্চয়ই ভালো হবে, মুখ ফুটে বলতে বাধ্য হবে, মুখে ধরে রাখতে হবে মিটি মিটি হাসির রেখা! কিন্তু বলতে পারবে না―আমার কী হবে ? আমি যে বঁড়শি পেতে ছিলাম! আমি যে ভালোবাসার সন্দেশ সাজিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম রুনা, তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্য। কিন্তু তুমি অপমানিত হও কিংবা ডিভোর্সি নারী হিসেবে তোমার ওপর জোর করি, এই ভাবনায় কিচ্ছু বলিনি, বলতে পরিনি। অথচ তুমি নিজেকে সরিয়ে নিলে তোমার সংসারবিশ্বে, আমাকে রেখে গেলে খালি রেল লাইনের উপর। ট্রেন আসবে যে কোনও সময়ে…
অনন্য যতবারই গেছে রুনার সঙ্গে দেখা করতে, খালি হাতে যায়নি। থ্রি পিস, পায়ের নূপুর, কিংবা বিদেশি বডি স্প্রে নিয়ে যায়। শুরুতে গাইগুই করলেও গ্রহণ করে হাসি মুখে রুনা। বুঝতে পারে অনন্য রতন, উপহার পেয়ে ভেতরে ভেতরে ভীষণ খুশি। আলাপের বিচিত্র বিষয় থাকে, অফিসের নানা ঘটনা, রাজনীতি, ভারতের পেয়াজ রপ্তানি নিয়ে খামখেয়ালি―কিন্তু খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে চলে দুজনার সংসারের প্রসঙ্গ। মূলত, কে ডিমটা ভাঙ্গবে, কেবল ডিম ভাঙলেই তো হবে না, ভাজতেও হবে। রিস্কটা নেয় না দুজনের কেউ!
অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বিকেলেই বের হয় অনন্য। নিউমার্কেট থেকে একটা গর্জিয়াস কাতান শাড়ি কেনে। শাড়ি কিনতে কিনতে সিদ্ধান্ত নেয়, আজই শেষ, আর কোনওদিন দেখা করব না রুনার সঙ্গে। কারণ, দেখা করার পর যন্ত্রণাটা বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে, কী নিঃসীম যন্ত্রণা। রাতটা জেগে কাটাতে হয়। রেস্টুরেন্টে আড্ডা দেবার সময়ে টুকটাক হাতের ছোঁয়া লাগে। এই আধুনিক সময়ে মধ্যযুগীয় ধারণায় আক্রান্ত অনন্য রতন নিজেকে উপহাস করে আর ভেতরে ভেতরে হাসে, এক নারীর সামান্য ছোঁয়ায় তুৃমি হারামজাদা এতটা কাতর ? এতটা আক্রান্ত জলের আগুনে ? তোমাকে সুনামির পোড়া জলে পোড়ানো দরকার।
উত্তরার অতিথি রেস্টুরেন্টে যখন ঢোকে, তখন সন্ধ্যা নামেনি। পশ্চিমের আকাশে অনেকটাই হেলে পড়েছে সূর্য। অনন্য রতন প্রায়ই পশ্চিমের কোনার এই টেবিলে বসে রুনা নিরবধির সঙ্গে। এখনও এসে পৌঁছেনি রুনা। ওয়েটার এলে, পানির বোতল দিতে বলে অনন্য। বোতলের পানি খুলে গ্লাসে ঢেলে পান করতে করতে তাকায় দরজার দিকে, ঢুকছে রুনা। হাতে বিখ্যাত ব্র্যান্ডের একটা ব্যাগ। অনুমান করে, রুনা কোনও উপহার নিয়ে এসেছে। পরেছে শাড়ি, কপালে বড় একটা টিপ। চওড়া কপালে লাল টিপটা জ্বলছে আগুনের শিখায়। কানে পরেছে মাটির দুল। এত সুন্দর এত লাবণ্যখচিত রুনাকে কখনও দেখেনি অনন্য। বুঝতে পেরেছে, ওর বিয়ের খবরই দিতে এসেছে। মনটা শরীর ছিঁড়ে টর্পেডোর গতিতে বেরিয়ে যেতে চাইছে অথবা ইচ্ছে হচ্ছে, এখনই চলে যায় ওর সামনে থেকে।
সামনে বসেই প্রশ্ন ছোড়ে রুনা, কোনও খাবারের অর্ডার দিয়েছেন ?
না, মাথা নাড়ায় অনন্য।
ঠিক আছে, পরেই খাবারের অর্ডার দেওয়া যাবে, তার আগে আজকে, এখন যে প্রশ্নটা করব, সঠিক জবাব দেবেন ?
নিশ্চয়ই দেব।
আপনি বিবাহিত না ? আপনার সংসার আছে না ? প্রশ্ন করে চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে অনন্যর দিকে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে অনন্য, একটু সময় নেয়―ছিল সংসার কিন্তু আট বছর ধরে নাই। বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার বউ সাবরিনা সুনন্দা চলে যায় আমাকে ছেড়ে, আমারই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে, অষ্ট্রেলিয়ায়। না, প্রেমের বিয়ে ছিল না। পাশের গ্রামের মেয়ে। দেখতে সুন্দরীই ছিল কিন্তু আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল জানতাম না। ঘটনার পর নিজের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা সৃষ্টি হয়েছিল, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর বিয়ে করব না কখনও কোনও নারীকে। লজ্জায় কাউকে মুখ দেখাতে যাতে না হয়, সে জন্য গ্রামে যাই না। ভেবেছিলাম সারাটা জীবন একলা থাকব। কিন্তু একদিন এক কন্যার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে চা খেতে খেতে….
চা খেতে খেতে কী ? টেবিলের ওপর দুই হাতের ভর রেখে মিষ্টি করে প্রশ্ন করে রুনা।
সিদ্ধান্তটা পরিবর্তন করেছিলাম।
সেই সিদ্ধান্তটা কন্যাকে জানাননি কেন ?
কন্যা বলেছিল―
কী বলেছিল ?
‘আমি জানি, বললে আমার ওপর অনেক কুকুর হামলে পড়বে, আমাকে টুকরা টুকরা করে ছিঁড়ে খাবে। বুকের মধ্যে কষ্টের সমুদ্র নিয়ে বেঁচে আছি। আমি সেই কুকুর হতে চাইনি!
টেবিলের ওপর রাখা হাতটার ওপর নিজের হাতটা রাখে রুনা, পুরুষমানুষের আর একটু সাহস থাকা দরকার। আমার বাবা মা বড় ভাই বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অনেক পাত্র লাইন দিয়েছে, ভাবলাম―ট্রেন ফেল করার আগে একবার ট্রেন যাত্রীর মুখোমুখি হই। গল্পে উপন্যাসে সিনেমায় অনেক ঘটনা ঘটে―শেষ বেলায় মুখ না খুললে পরে হয়তো দুঃখ পেতে হবে, তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আমাকেই…
রুনা! হাতটা আরও জোরে চেপে ধরে অনন্য, আমি তোমাকে…
আমিও… কিন্তু মুখ ফুটে কখনও বলবে না। কেবল পরম আত্মা দিয়ে অনুভব করব। বলো অনন্য, আমাকে কষ্ট দেবে না। বিশ্বাসভঙ্গ করবে না।
অনন্য মুখের কাছে মুখ এগিয়ে আসে, দুটো মুখের দূরত্ব একটি পাকা রস টসটসে আঙুর ফলের, তোমাকে কখনও কষ্ট দেব না। কখনও তোমার বিশ্বাস ভঙ্গ করব না।
সত্যি ?
সত্যি।
একটা বিশাল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রুনা নিরবধি, এতদিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম।
কিসের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলে ?
তুমি পুরুষ, বুঝবে না। পরে বলব।
ঠিক আছে, অনন্য রতনের বুকের মধ্যে লাখ লাখ কবুতর উড়তে থাকে দ্বিগি¦দিক। আনন্দে উল্লাসে আবেগে চোখে জল নামে।
কিন্তু তুমি হাতটা ছাড়ো। এত জোরে ধরে রেখেছো… হাসে রুনা।
হাতটা ছেড়ে দেয় অনন্য।
আমি তোমার জন্য একটা লাল শার্ট এনেছি, যদি বলতে তুমি সংসারী, শার্টের প্যাকেটটা তোমাকে দিয়ে চলে যেতাম। এই জীবনে আর দেখা হতো না। এখন এই শার্ট তোমাকে দেব না, নিয়ে যাব, বিয়ের রাতে তোমাকে পরাব নিজের হাতে, ঠিক আছে!
ঠিক আছে! একশো বার…
গল্পের শুরু থেকেই আপনারা জানেন, উত্তরার অতিথি রেস্টুরেন্টে, দুজনের মধ্যে সঙ্গমের সেতু তৈরির সময়টা ছিল সন্ধ্যার একটু আগে আগে, তাই না!
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



