
আপনি কি মেডিকেল সায়েন্সকে মিথ্যা বলছেন ? জামিল আহমেদ প্রশ্ন ছুড়লেন।
মেডিকেল সায়েন্স সত্যি না মিথ্যা সেই প্রশ্ন আসছে কেন ? শায়লা পারভীন পাল্টা প্রশ্ন ছোড়েন।
আপনি মনে হয় ভুলে যাচ্ছেন, আমি একজন ডাক্তার। আমাকে গোঁজামিল দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই, এটা আপনার বোঝা উচিত। জামিল আহমেদ দৃঢ় গলায় বলেন।
আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আপনাকে আমি সত্যিটাই শুধু বলেছি। এখানে গোঁজামিলের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। শায়লা পারভীনের কণ্ঠ বেশ শান্ত।
আপনার কথা যদি সত্যি হয়, জামিল আহমেদের ঠোঁটে অবিশ্বাসের হাসি। তাহলে মেডিকেল সায়েন্স মিথ্যা!
পাঠক, আমরা দেখতে পাচ্ছি এই গল্পে মেডিকেল সায়েন্সের সত্য-মিথ্যা নিয়ে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। কিন্তু কেন ?
চলুন আমরা ঢুকে যাই গল্পের মধ্যে।
১.
সোভানাদের ড্রয়িং রুম। সোভানা আর রাফির বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে রাফির মা, বাবাসহ কজন আত্মীয় স্বজন এসেছেন। ড্রয়িং রুমের সোফাসেটে দু-পরিবারের কয়েকজন বসেছেন। অন্যরা কেউ ড্রয়িং রুমের এক পাশে মোড়া পেতে বসেছেন, কেউ ড্রয়িং রুমের পূর্ব দিকের দেয়ালের পাশে রাখা ডিভানটায় বসেছেন। কেউ ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে ড্রয়িং রুমের একপাশে বসেছেন। দু-পরিবারের প্রায় জনাবিশেক মানুষ বড় ড্রয়িং রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছেন। সোফা সেটের সেন্ট্রাল টেবিল ভর্তি খাবার-দাবার। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে সবাই এটা সেটা মুখে তুলছেন। বাইরে থেকে আসা শীতের গন্ধমাখা হেমন্তের মিষ্টি বাতাস বিকেলটাকে মোহনীয় করে তুলেছে।
জামিল আহমেদ, মানে রাফির বাবা ড্রয়িং রুমের দক্ষিণ পাশের সোফায় বসে, উত্তর-পূর্ব দিকের কোনায় মোড়া পেতে বসা সোভানার মার দিকে বার বার তাকাচ্ছেন আর মগ্ন হয়ে ভাবছেন, তাকে কোথায় যেন দেখেছেন! প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। জায়গাটা কোথায় সেটা মনে ধরা দিতে দিতে যেন পালিয়ে যাচ্ছে বারবার। জায়গাটা মনের ভেতরে উঁকি দিয়ে যেন একটা ভোঁয়া মাছির মতো সাঁই সাঁই করে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি যেন সেই ভোঁয়া মাছির পেছন পেছন ছুটছেন, মাছিটিকে ছুঁতে ছুঁতে পালিয়ে যাচ্ছে বার বার, ধরতে পারছেন না কিছুতেই। সোভানার মাকে দেখার পর থেকে এই ধরাছোঁয়ার খেলা খেলতে খেলতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ক্লান্তির সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরে প্রচণ্ড জেদ আর রাগ কাজ করছে, কেন তিনি কোথায় তাকে দেখেছেন মনে করতে পারছেন না ? কেন জায়গাটা মনের ভেতর বার বার ধরা দিয়েও দিচ্ছে না ? কেন কেন কেন― ?
জামিল আহমেদ মনকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন খুব, একটা শুভকাজে এসেছি, কাজটা ভালোভাবে সমাধা করাটা এখন আমার একমাত্র ভাবনার বিষয় হওয়া উচিত। শায়লা পারভীন মানে সোভানার মাকে কোথায় দেখেছি, এই মুহূর্তে সেটা মনে করাটা গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজ নয়। ওনাকে কোথাও যদি দেখেই থাকি, তাতে সমস্যা কি ? এই মুহূর্তেই সেটা মনে করাটা কি খুব জরুরি ? অদ্ভুত একটা মানুষ আমি! মাথা থেকে বিষয়টা ঝেড়ে ফেলে নড়ে চড়ে বসে, সবার সঙ্গে বিয়ের আলোচনায় যোগ দেন তিনি, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডিসেম্বরের ১০ তারিখে বিয়ের দিন কনফার্ম করে ফেলি। সবার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে, কী বলেন আপনারা ?
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবারও জামিল আহমেদ সেই ধরাছোঁয়ার খেলায় মেতে ওঠেন। আর ধরতে পারছেন না বলে তার যে কী রাগ হচ্ছে!
শায়লা পারভীন, সোভানার মা বিষয়টি নিয়ে খুবই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। আসার পর থেকেই রাফির বাবা, জামিল আহমেদ তার দিকে বার বার তাকাচ্ছেন আর কী চিন্তায় যেন তলিয়ে যাচ্ছেন! এমনও হচ্ছে উনি সোভানার মার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছেন!
একটা ভয় হিস হিস করে তাকে ছোবল মারল। আর সেই বিষ শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে গেল! তার শরীরটা মুহূর্তেই ফাঁকা বেলুনের মতো ওজনহীন হয়ে পড়ল। কেউ যেন তাকে ধাক্কা মেরে উঁচু পাহাড় থেকে ফেলে দিল আর তিনি শূন্যে ভেসে ভেসে মাটিতে পড়ছেন। মাটিতে পড়ার পর তিনি সম্বিত ফিরে পেলেন। তার মেয়ের মায়াবী মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। তার হৃৎপিণ্ডটাকে কেউ যেন জোরে মোচড়াতে শুরু করল।
ধ্যাত, এসব কী ভাবছি! শায়লা পারভীন উঠে গিয়ে শুকিয়ে যাওয়া গলায় ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি ঢাললেন। মোড়াটা সামনে একটুখানি টেনে নিয়ে হাসি হাসি মুখে আবার বসলেন, রাফির বাবা ডাক্তার মানুষ, কত রকম ব্যস্ততা তার, কত কত জটিল রোগী সামলাতে হয় তাকে। সার্জন হওয়ায় রোগীর জীবন মরণ তার হাতে। যত ছোট অপারেশনই হোক, রোগীর অপারেশনের আগেও চিন্তা, অপারেশনের পরেও চিন্তা।
কাজের বুয়াকে সেন্ট্রাল টেবিল থেকে খালি হয়ে যাওয়া বাটিগুলি সরাতে বললেন শায়লা পারভীন। ফোনের স্ক্রিনটা আঁচলে মুছতে মুছতে, হয়তো কোনও মুমূর্ষু রোগী নিয়েই চিন্তায় ডুবে আছেন তিনি।
ফোনে আনমনে স্ক্রল করতে করতে, কিন্তু তিনি যদি রোগী নিয়েই চিন্তায় ডুবে থাকবেন, তাহলে অন্য কারও দিকে না তাকিয়ে বার বার শুধু তার দিকেই তাকাচ্ছেন কেন! এই ভাবনাটা শায়লা পারভীনকে আবার অস্বস্তিতে ফেলল। মনটা আবার অশান্ত হয়ে উঠল।
সোভানার মুখটা সামনে দুলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এবার বুকে সাহস সঞ্চয় করেন তিনি। সোভানার বাবা নেই, তাকেই তো সবকিছু সামলাতে হবে। সোভানার বাবার কথা মনে হতেই অভিমানে বুকটা ভরে ওঠে। লোকটা মারা যাওয়ার পর থেকে ওর জন্য শুধু অভিমান আর ভালোবাসা অবশিষ্ট আছে। যখন বেঁচেছিল তখন ওর প্রতি রাগ, ঘৃণা, অভিমান, ভালোবাসা একাকার হয়ে মিশে ছিল। তখন ঘৃণা আর ভালোবাসা যেন সমান্তরালে চলত। এত কিছুর পরও ওর প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি। আর এই সর্বনাশা ভালোবাসার কারণে ওকে ছাড়তে পারেননি শেষ পর্যন্ত।
সবাই গল্পে মশগুল থাকায় সোভানার মার দিকে জামিল আহমেদ যে বার বার তাকাচ্ছেন বা উনি যে গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন এই বিষয়টা অন্যরা কেউ খেয়াল করলেন না।
রাফির মা, রেবেকা ইসলামের চোখ এড়াল না বিষয়টা। তিনিও শুরু থেকেই খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়েছেন। জামিল যখন সোভানার মার মুখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকছে তখন তার লজ্জায় মাথা নুইয়ে আসছে। ছি! ছি! এই বয়সে এ কেমন হ্যাংলামি! রেবেকা ইসলাম নিশ্চিত হন, ওদের দুজনের প্রেম ছিল। কিন্তু জামিল কোনওদিনও বলেনি তাকে। উল্টা সে সবসময় তাকে বলেছে, ছোটবেলা থেকে বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে কখন যে বিয়ের বয়স চলে এসেছে টেরই পায়নি সে। হাসতে হাসতে বলেছে, প্রেম তো দূর কি বাত, কোনও মেয়ের দিকে তাকানোর সুয্যোগই হয়নি কোনওদিন। মিথ্যুক একটা! জামিলের সঙ্গে ওর অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। আরে বাবা বিয়ের আগে তো অনেকেরই প্রেম থাকে। সেটা বললে কী এমন হতো!
রেবেকা ইসলাম জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। হেমন্তের সোনালি যে রোদ চারপাশে ঝলমল করছিল তা একটু একটু করে কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে। উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলোর মাথায় এখনও কিছু রোদ ঢলাঢলি করছে। হায় খোদা এ কেমন বিপদে ফেললে আমায়! স্বামীর প্রেমিকার মেয়েকে তার ছেলে ভালোবেসে বসে আছে। আমি এখন কী করব! ছেলে তো সোভানার প্রেমে পাগল। সেই কলেজ জীবনে প্রেমের শুরু। দুজন ডাক্তারি পাস করার পর এখন তা বিয়েতে রূপ নিতে চলেছে। এত দীর্ঘদিনের প্রেম!
সবাই আলোচনা করে ডিসেম্বরের ১০ তারিখে বিয়ের দিন ঠিক করলেন। এখন উঠতে চাচ্ছেন সবাই। রেবেকা ইসলামের চোখ আবারও জানালার বাইরে। মুখ ভার করা বিষণ্ন সন্ধ্যা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। পাশের ছাদে দুই কিশোরী বিষণ্ন সন্ধ্যাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এল চুল দোলাতে দোলাতে হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। স্বামীর প্রেমিকার মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে আমি কীভাবে মেনে নেব! কিন্তু মেনে না নিয়ে তো উপায় নেই। ছেলে তো শুনবে না আমার কথা! কেমন করে এই যন্ত্রণাটা আমি বাকি জীবন বয়ে নিয়ে বেড়াবে খোদা!
খুব গম্ভীর মুখে বাসায় ফিরে রেবেকা থমথমে গলায় জামিল সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন, সোভানার মার সঙ্গে তোমার আগে থেকেই চেনাজানা আছে ? কিন্তু তোমরা দুজনই বিষয়টা চেপে গেলে কেন, বুঝলাম না ? সরাসরি প্রেমের কথাটা বললেন না তিনি। এই বয়সে এসে স্বামীকে সরাসরি প্রেমের অভিযোগ করতেও কেমন জানি মুখে বাঁধছে তার।
জামিল আহমেদ সেই ভোঁয়া মাছির পেছনে ছুটতে ছুটতে আনমনে উত্তর দিলেন, না তো।
রেবেকা ভ্রু কুঁচকে স্বামীর দিকে তাকালেন। গভীর ভাবনায় ডুবে আছে সে। এমনিতেই জামিল আহমেদ খুব বেশি হাসিখুশি না হলেও গম্ভীর প্রকৃতির নয়।
এবার রেবেকা বললেন, তা না হলে তুমি বার বার ওনার দিকে অমন করে তাকাচ্ছিলে কেন ?
জামিল আহমেদ বাস্তবে ফিরে এলেন, বললেন, তুমি ভুল দেখেছ। আমি সবার মুখের দিকেই তাকিয়েছি। তোমার শুধু শুধু মনে হচ্ছে আমি ওনার দিকেই বার বার তাকিয়েছি।
সোভানার মাকে তিনি কোথায় দেখেছেন―এই গভীর চিন্তায় ডুবে থাকার কারণে ওনার দিকে জামিল আহমেদ যে এত অজস্রবার তাকিয়েছেন বা মাঝে মাঝে তার দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিলেন, সেটা তিনি সত্যিই বুঝতে পারেননি।
আচ্ছা তা না হয় মানলাম, রেবেকা ইসলাম চুলটা বাঁধতে বাঁধতে বললেন, কিন্তু ওনাদের বাসায় যাওয়ার পর থেকে তুমি এমন গভীর ভাবনায় ডুবে আছ কেন ?
একটু দমে গেলেন জামিল আহমেদ। নিজেকে সামলে নিয়ে, খুব জটিল একটা রোগী নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। ওনার কিছু হলে অনেক হাঙ্গামা পোহাতে হবে।
আসল ঘটনাটা চেপে গেলেন তিনি। বললে হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। পুরুষ মানুষের বিষয় হলে তবু বলা যেত। যেহেতু মেয়েঘটিত ব্যাপার সেহেতু এড়িয়ে যাওয়ায় ভালো।
রেবেকার ভয়ে গা কাঁটা দিয়ে উঠল। তৎক্ষণাৎ মনে মনে দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করলেন। দোয়া পড়তে পড়তে তার ভয়টা কিছুটা দূর হলো। মাঝে মাঝে জটিল রোগী সামলাতে যেয়ে জামিল এমন গভীর চিন্তায় ডুব দেয়। আসলে চিন্তারই বিষয়। রোগী মারা গেলে সমস্ত দায় ডাক্তারকে দেয় তার আত্মীয়স্বজনেরা। ভাঙচুর, ডাক্তারের গায়ে হাত তোলা, কেস ফেস আরও কত হাঙ্গামা! জামিল রোগীকে তার সর্বোচ্চটা দেয়। কিছু দায়িত্বহীন ডাক্তার যে আছে সেটা অস্বীকার করা যাবে না। বিকেল থেকে চেপে থাকা পাথরটা রেবেকার বুক থেকে নেমে গেল। অনেকক্ষণ পর যেন তিনি বুক ভরে শ্বাস নিলেন। ছি! ছি! এই বয়সী দুজন মানুষকে নিয়ে কী সব আজেবাজে চিন্তা করেছি! নিজেকে বার বার ধিক্কার দিলেন। দুজনের কাছে মনে মনে সরি বললেন। কিন্তু মনের খচখচানিটা পুরোপুরি দূর হলো না। জটিল রোগী নিয়েই যদি সে এমন ভাবনায় ডুবে থাকবে তাহলে সোভানার মার দিকে সে বার বার তাকাচ্ছিল কেন ? কি জানি ওর কথাই হয়তো ঠিক। ও হয়তো সবার দিকেই তাকিয়েছিল, আমিই হয়তো ভুল ভাবছি। রোগীটা যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে খোদা। রেবেকা শুয়ে পড়লেন।
২.
শুক্রবার দুপুর। ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছেন রেবেকা ইসলাম আর জামিল আহমেদ। ছুটির দিন হওয়ায় রাফি আর সোভানা আজ সারাদিন শপিং করবে, খাবে, দাবে আর ঘোরাঘুরি করবে। গত পরশু সোভানাদের বাসা থেকে ফেরার পর এক মুহূর্তের জন্যও জামিল আহমেদের চোখ থেকে সোভানার মার চেহারাটা সরছে না। এই মুখটা আঠার মতো তার মুখের সামনে যেন লেগে আছে। আর এই মুখটা কোথায় দেখেছেন―সেটা মনে করার জন্য তিনি যথারীতি ধরাছোঁয়ার খেলায় মত্ত হয়ে আছেন।
স্বামীর চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে রেবেকা জানতে চাইলেন, তোমার রোগীর সার্জারি কবে ?
জামিল আহমেদ অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিলেন, প্রতিদিনই তো সার্জারি করি।
সেটা তো ঠিক। রেবেকার গলায় ঝংকার, তাহলে সোভানাদের বাসা থেকে ফিরে এমন ভাবনায় ডুবে আছ কেন ?
জামিল সাহেব নড়েচড়ে বসলেন, ও হ্যাঁ, সেই জটিল রোগীর কথা বলছ তো ? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই সার্জারিটা গতকাল রাতে হয়েছে। কিন্তু আটচল্লিশ ঘণ্টা পার না হলে কিছু বলা যাবে না।
রেবেকা এবার উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, তুমি কেন এই জীবন-মরণ খেলায় নিজেকে জড়ালে, বলো তো ? সার্জন হওয়ার ডিসিশনটা তোমার ভুল হয়েছে। প্রথমে তো চাইল্ড স্পেশালিস্ট হতে চেয়েছিলে। ওটাই ঠিক ডিসিশন ছিল তোমার। ডাক্তারি পাস করেই তুমি শুরুতে যেন কোনও চাইল্ড স্পেশালিস্ট-এর আন্ডারে কাজ করছিলে ? ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, ডা. সাইফুর রহমান স্যারের আন্ডারে, তাই না ?
জামিল আহমেদ ভাতের প্লেট রেখে চেয়ার থেকে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠেন, ও হ্যাঁ, পেয়েছি, পেয়ে গেছি। সাইফুর রহমান স্যারের চেম্বার। হ্যাঁ হ্যাঁ সেই চেম্বারে―।
জামিল আহমেদের মুখের কথা আটকে গেল। তিনি স্তব্ধ হয়ে সামনের দেয়ালে ঝুলানো দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠলেন, না, না, এ হতে পারে না। এ হতে দেব না আমি। কখনও না। তিনি উন্মাদের মতো বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলেন।
এই কী হলো, কী হয়েছে তোমার ? এমন পাগলের মতো কোথায় ছুটে চললে ? সার্জারির রোগীটা কি মারা গেল ? ফোনে সেই মেসেজ পেয়ে এমন পাগলামো শুরু হলো তোমার ? কিন্তু চেম্বার ? সাইফুর রহমান স্যারের চেম্বারের কথা বললে কেন ? হায় খোদা! কিছুই তো বুঝতে পারছি না আমি! রেবেকা অস্থির হয়ে রাফিকে ফোন দিলেন।
৩.
এটা মেডিকেল সায়েন্সের সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন নয়। বিশ্বাস করুন, আপনি আমার উপর বিশ্বাস রাখুন প্লিজ, সোভানা একদম সুস্থ। বিয়েটা ভেঙে গেলে আমার মেয়ে মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত হবে। রাফিকে ছাড়া সোভানা ওর জীবন কল্পনা করতে পারে না। আপনি আমার কথা বিশ্বাস করুন। শায়লা পারভীনের কণ্ঠে আকুতি।
আপনি এখনও কেন মিথ্যা বলছেন, বলুন তো ? জামিল আহমেদ বলে চলেন, আপনার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে সেদিনের সেই রিপোর্ট কি ভুল ছিল ? নাহ, সেই রিপোর্ট ভুল হওয়ার কোনও সুযোগই নেই।
নাহ, রিপোর্ট ভুল ছিল না। শায়লা পারভীন চোখ থেকে চশমাটা খুলতে খুলতে বলেন।
জামিল আহমেদ সরাসরি শায়লা পারভীনের দিকে তাকান, ওনার মুখের ওপর হালকা কুয়াশার লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে বলে চলেন, সেদিন রিপোর্ট পাওয়ার পর আপনার স্বামী বুঝতে পারেন তার মাধ্যমে আপনি এবং আপনার মেয়ে দুজনই আক্রান্ত হয়েছেন। বিষয়টি যেন জানাজানি না হয় সেজন্য অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় তিন মাস বয়সী একমাত্র মেয়ে সোভানাসহ আপনাকে নিয়ে আপনার স্বামী বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু বছর দুয়েক পর আপনার স্বামী মারা যাওয়ায় আপনি আপনার একমাত্র মেয়ে সোভানাকে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। আমি জানি, আপনার দ্বিতীয় কোনও সন্তান হয়নি। সোভানা আপনার একমাত্র মেয়ে, ঠিক ?
হুম। শায়লা পারভীন ছোট্ট করে জবাব দেন।
আপনি বলছেন, সেদিনের সেই রিপোর্ট সঠিক। জামিল আহমেদের চোখেমুখে বিস্ময়, তাহলে সোভানা সুস্থ হয় কীভাবে! এইডস আক্রান্ত কেউ কি কখনও সুস্থ হয়! মেডিকেল সায়েন্স কি মিথ্যা! তাঁর গলায় এবার অনুনয়, এসব গোঁজামিল দিয়ে সত্যিটা অস্বীকার করা বন্ধ করুন প্লিজ। আমার ছেলেকে এই বিপদ থেকে বাঁচান। আমি বাবা হয়ে সত্যিটা জেনে ছেলেকে এই বিপদের মুখে ছেড়ে দিতে পারি না। বিয়েটা ভেঙে দিন প্লিজ। আপনার মেয়েকে সত্যিটা বলুন। আমার বিশ্বাস সত্যিটা জানলে সোভানা নিজেই বিয়েটা ভেঙ্গে দেবে। ও জেনেশুনে রাফির এমন সর্বনাশ করবে না। যেহেতু রাফিকে সোভানা ভালোবাসে।
সোভানা সুস্থ, শায়লা পারভীন ধীর গলায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বলে চলেন, হ্যাঁ, বলছি, সোভানা সুস্থ। আমার মেয়ে একদম সুস্থ। যে সোভানাকে আমি পেটে ধরেছিলাম সেই সোভানা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাবার কাছে পরপারে চলে যায়। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থাকেন, এরপর জামিল আহমেদের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলেন, আমার মেয়ে সোভানা সুস্থ, কারণ… এবার তিনি আকাশের দিকে উদাস চোখে তাকান, একটা নিঃসঙ্গ উড়ন্ত চিলের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে দম ফুরিয়ে যাওয়া গলায় বলেন, কারণ আমার মেয়ে এই সোভানাকে আমি পেটে ধরিনি!
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



