
রেডিওতে সন্ধ্যায় এক জরুরি ঘোষণায় সুন্দর বাংলায় নারীকণ্ঠে যখন জানানো হলো দেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং কাল থেকে খুলে দেওয়া হচ্ছে ইউনিভার্সিটি, তখন তখনই অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাইসুল ইসলাম আসাদ সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকায় ফেরার এবং ঠিক তখন তখনই কাল সকাল আটটার লঞ্চ ধরার জন্য ব্যাগ আর বিছানাপত্র গোছাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে সে।
বরিশাল থেকে লঞ্চ ছাড়ে। বিলম্বে। ভেড়ে সদরঘাটে। শেষ বিকেলে। ঘাট থেকে নেমে রিকশা ডাকে। উঠে পড়ে। রিকশাঅলার হাতের দিকে চোখ যায়। হাতে মালা। বকুল ফুলের। কিছুদূর এগুতেই রাস্তার একপাশের হোটেল থেকে ভেসে আসে গান―
‘৮০ তোলায় সের হৈলে ৪০ সেরে মণ।
মনে-মনে ১ মন না হৈলে মিলবে না ওজন’।
রিকশাঅলা স্বগতোক্তি করে, ‘গানই একখান মামা। বাঘের লাহান।’
উপমাটা আসাদকে অবাক করে। গান কীভাবে বাঘের মতো হয় তা ঠিক বুঝে আসছে না আসাদের। তয় সে ভাবে, কোনও গান যদি বাঘের মতো হয়, তবে নিশ্চয়ই কোনও কোনও গান কুত্তার মতো, আবার কোনও কোনও গান বিলাইর মতো হওয়ার কথা। তাই না ?
আসাদ মনে মনে ভাবতে থাকে তার নিজের পছন্দের কোন কোন গান বাঘের মতো।
আসাদ মনে মনে ভাবতে থাকে তার নিজের পছন্দের কোন কোন গান কুত্তার মতো।
আসাদ মনে মনে ভাবতে থাকে তার নিজের পছন্দের কোন কোন গান বিলাইর মতো।
সামনের রিকশাটা হঠাৎ থেমে পড়ে।
সেই সঙ্গে থেমে পড়ে আসাদদের রিকশাটা।
সেই সঙ্গে থেমে পড়ে আসাদের গান-ভাবনা।
এবারও রিকশাঅলার স্বগতোক্তি,―‘পাক্কি জ্যাম। চাক্কি ট্যাম।’
রিকশাঅলার এহেন স্বতঃস্ফূর্ত ছড়া কাটা দেখে ভেতরে ভেতরে মজা পায় আসাদ।
রিকশাঅলা পরক্ষণেই স্বগতোক্তি করে, ‘খাড়ান মামা, একটু কান্নি লই।’ এই বলে দ্রুতই সে পাশের একটা চিপাগলিতে ঢুকে পড়ে। গলি পেরিয়ে তারা এসে পড়ে আরেকটা বড় রাস্তায়। একটু এগুতেই হঠাৎ ব্রেক।
ব্যাপার কী!
সহসা একটা মেয়ে, কিশোরীই বলা যায়, পরনে সালোয়ার কামিজ কিন্তু ওড়না নাই, রিকশার সামনে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। না-ভালোবাসা না-ঘৃণা এমন একটি স্বর কণ্ঠে তুলে চট করে রিকশাঅলা বলে ওঠে, ‘সর রান্ডি। টান্ডিপান্ডি।’ আসাদ লক্ষ করল, কোনও এক ধরনের ছন্দের মিল না-রেখে যেন কথা বলতে পারে না রিকশাঅলাটি।
‘হায় হায় কছ কী মুখপোড়া! নাগর আমার বিছনাউছনা লৈয়া আইছে। তুই হালায় ভাগাইবার চাস। বেরহম কোনহানকার।’ কথা কয়টা কইয়া খিলখিল কইরা হাইসা হাইসা গইরা গইরা রাস্তা পার হৈয়া একটা বাড়িতে ঢোকে মেয়েটি।
আসাদের চোখ আটকে যায় বাড়িটার দিকে।
রাস্তাঘেঁষা আয়তাকার এক বাড়ি। তিনতলা। পুরনো। চাকচিক্যহীন। বাড়ি লাগোয়া লম্বা একটা চিপা গলি গোটা বাড়িটাকে প্রতিবেশী বাড়িগুলো থেকে যেন অচ্ছুত করে রেখেছে। বাইরের দিকের তারগুলোতে রংবেরঙের কাপড় ঝুলছে। আসাদ লক্ষ করল সবগুলো কাপড়ই মেয়েদের। ছেলেদের একটাও না। বাড়িটাকে তার খুব চেনা-চেনা মনে হলো। কখনও কি সে এসেছিল এই বাড়িতে ? কী জানি! মনে তো পড়ে না।
তবে আসাদের এখন মনে পড়ে।
মনে পড়ে ঢাকায় যেবার তারা প্রথম এসেছিল―সেই কথা।
বরিশাল থেকে স্টিমারে চেপে এসেছিল তারা। তারা বলতে পরিবারের সবাই। স্টিমার ভেড়ে বাদামতলি। বাদামতলি থেকে সদরঘাট দিয়ে যেতে যেতে আসাদ লক্ষ করেছিল বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে বাঁধা আছে একসঙ্গে পাশাপাশি অনেকগুলো বোট। এইরকম একটা বোট সে দেখেছিল বাবার সঙ্গে যখন সে গিয়েছিল জৈনপুরির পির সাহেবের বাড়িতে।
পর পর দুটি রিকশা এসে ভেড়ে কলতাবাজারের একটা বাড়ির সামনে। দোতলা বাড়ি। বাড়ির গেটের দুই পাশে দুইটা করে দোকান। ভেতরে ঢুকলেই একটা সিমেন্টের উঠান। উঠানের দুই পাশে দুটি গাছ। এক পাশে শিউলি অন্য পাশে পেয়ারা। বাড়ির চারপাশে স্বল্প-উচ্চতার বাউন্ডারি। অনায়াসেই ডিঙ্গানো যাবে। সরকারি সেটেলমেন্টের চাকরিতে বদলি হয়ে ঢাকায় পোস্টিং হয় আসাদের বাবার। তবে তিনি খুব বেশিদিন ঢাকায় থাকবেন না। বরিশালেই আবার পোস্টিং নেবেন। সেই তদবির বরিশালে থাকতেই করা হচ্ছে। তিনি স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ঢাকায় একটানা বেশিদিন থাকলে এলাকার রাজনীতিতে তার প্রভাব কমে আসবে। এটা সে জানে। তাই এটা হতে দেওয়া যাবে না। অতএব এই বাড়িতেই আসাদরা আপাতত সপরিবার ওঠে। বাবার কথা, পরে ভালো দেখে বাসা চেঞ্জ করা যাবে।
ঢাকায় এটাই তাদের প্রথম আবাসস্থল। বাসার উল্টোদিকে একটা মসজিদ। আসাদদের এখানে আসার একটা বড় কারণ হলো বরিশালের অনেক মানুষজনই এই এলাকায় থাকে। কেউ ফ্যামিলিসহ, কেউ সিঙ্গেল। আসাদের বাবা সঙ্গপ্রিয় মানুষ। এটা তার রাজনীতির জন্যও জরুরি। প্রয়োজনে সে চাকরি ছেড়ে দেবে কিন্তু রাজনীতি ছাড়তে পারবে না। চাকরিতেই আটকে পড়ে থাকতে চায় না সে। তার লক্ষ্য অনেক দূর।
চাকরি আর অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে আসাদকে স্কুলে ভর্তি করানোর সময় হয় না তার বাবার। আসাদের একটা বোন আছে। বোনটা ছোট। ওর স্কুলে যাওয়ার সময় হয়নি। মায়ের চেঁচামেচিতে একদিন আসাদকে নিয়ে যাওয়া হলো ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। স্কুলের প্রধান ওকে দেখলেন। আসাদও এই প্রথম কোনও ইংরেজ দেখল। লোকটি ইংরেজ হলেও বাংলা বলতে পারেন। কীরকম যেন পোশাক পরে আছেন তিনি। এইরকম পোশাক আসাদ এর আগে কখনও কাউকে পরতে দেখেনি। লোকটির গলায় বেশ বড় একটা মালাও ঝুলছে। এই স্কুলের প্রধানকে বলা হয় ফাদার। ফাদার কেন বলে আসাদ বুঝে উঠতে পারে না। ফাদার মানে তো সে জানে পিতা। একটা লোক সবার ফাদার হয় কী করে ?
কী কারণে বাবা তাকে সেই স্কুলে ভর্তি করালো না তা ছোট্ট আসাদ জানে না। তয় ভর্তি না-হওয়াতে ভালোই হয়েছে তার। ওর বয়সীরা স্কুলে যায় কিন্তু আসাদকে যেতে হয় না। আরামছে সে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায় সে বাংলাবাজার, রায়সাবাজার, পাচঁভাই ঘাট লেন, বসুবাজার, বেচারাম দেউরি, শাঁখারিপট্টি, গোয়ালনগর। কখনও একা। কখনও বিশু মুচির ছেলে শিবুর লগে। শিবুটার যেন সব মুখস্থ। কোন গলির পরে কোন গলি ও যেন চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে পারবে।
বাবা যেহেতু ঢাকায় বেশিদিন চাকরি করবে না তাই আসাদকে স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যাপারে তার তত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
তো যেহেতু স্কুল নাই, অতএব বেকার। ক্ষুদে বেকার।
দোকান থেকে সওদাটওদা আনাই আসাদের প্রধান কাজ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যেদিন বাসায় মেহমান আসে। তখন বিস্কুট চানাচুর, কখনও কখনও শাঁখারিপট্টির মাথায় পুলিশফাঁড়ির পাশে সীতারাম আর কালাচাঁন মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি নিমকি অমৃত্তি―এই সব আনতে হয়। মেহমানরা কেউ কেউ ওর কর্মতৎপরতার তারিফ করেন, কেউবা করেন তিরস্কার। শুনতে হয়, ‘ওকে এখনও স্কুলে ভর্তি করান নাই। ছিঃ ছিঃ।’
ছিঃ-ছিঃ-তে বোধ হয় কাজ হয়।
বাসায় পড়ার জন্য ধমকটমক চলতে থাকে। সকালসন্ধ্যা নিয়ম করে পড়তে বসতে হয়। বরিশালে থাকতে সে ক্লাস টু-তে পড়ত। এখানেও তাকে টু-র বই কিনে দেওয়া হলো।
সারা রাস্তায় রিকশাঅলা কোনও-না-কোনও গানের কলি ভাজতে ভাজতে এসেছে। মনে হয় গানের ছন্দের সঙ্গে তাল রেখে ব্যাটা প্যাডেল মারে। নইলে এমন করবে ক্যান ? রিকশা সলিমুল্লাহ হলের কাছাকাছি এলে যেই না সে নামতে যাবে আর ঠিক তখন তখনই দুইটা বিষয় একসঙ্গে তার মনে পড়ে। একটা তার প্রিয় কবিতা, হয়তো নিজের নামের সঙ্গে মিল আছে বলে কি না জানে না―‘আসাদের শার্ট’; আরেকটা সেই বাড়ির স্মৃতি। অথচ একটার সঙ্গে আরেকটার কোনও মিলই তখন খুঁজে পেল না আসাদ। দুইটা আলাদা আলাদা বিষয় কি একসঙ্গে মনে পড়তে পারে ? এমন কেন হয় ?
হয়।
এমনভাবেই আমাদের ঘটনাগুলো ঘটে।
সেদিন বোধহয় বাসায় মেহমান এসেছিল। কালাচাঁদ বণিকের দোকান থেকে মিষ্টিউষ্টি কিনে বাসায় ফিরছিল আসাদ। হঠাৎ করেই বৃষ্টি। বৃষ্টি দেখে অন্য সব পথচারীর দেখাদেখি আমপট্টির ভিতরে ঢুকে পড়ল সে। এদিক দিয়ে সে এর আগে কখনও যায়নি। একদিকে শীতের শুরু অন্যদিকে এই বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতে এগুচ্ছে সে। একটু একটু কাঁপছেও। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে কোথাও যে নিরাপদে একটু দাঁড়াবে এই কথা যেন মনে নেই ওর।
কোত্থেকে হঠাৎ করে এক নারী ছোঁ মেরে প্রায় কোলে করে নিয়ে গেল ওকে। তার ঘরে। আসাদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটনাটা ঘটে গেল। ওর হাতে খাবারের ঠোঙ্গা দেখে হয়তো সবই বুঝলেন নারীটি। ভারি মিষ্টি করে তিনি বললেন, ‘কী কাণ্ড, এক রত্তি ছেলেটাকে পাঠালো কি না মিষ্টি কিনতে! কেমন মা-বাবা তোর, বল দেখি।’ আসাদ এতদিন ভাবত এত সুন্দর করে কথা বলার লোক বুঝি রেডিওতেই থাকে। বাস্তবে যে এই রকম সুন্দর করে কথা বলার লোক থাকতে পারে তা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। সে খুব আশ্চর্য হলো। আসাদের কেন জানি মনে হয়―এই রকম নারীরাই বুঝি রেডিওতে ঘোষণা পাঠ করেন।
পরিষ্কার একটা গামছা দিয়ে মাথা মুছিয়ে খাটের মাঝখানে বসিয়ে দিল ওকে। খুব দ্রুতই তেল-পেঁয়াজ দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে খেতে দিল। সত্যি খিদে পেয়েছিল, না-কি ঐ ভদ্রমহিলাকে খুশি করার জন্যই কি না, জানে না ছোট্ট আসাদ―তখন সবটাই চেটেপুটে খেয়ে নিল। ওদের কথার শব্দে আরও কয়েকজন নারী এসে ঘরে ঢোকে। বিচিত্র অঙ্গভঙ্গিতে তারা যেন কীসব বলছিল আর এ ওর গায়ে হেসে হেসে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। আসাদের ভালো লাগছিল না। ওর খুব ঘুম-ঘুম পাচ্ছিল।
কখন যেন বৃষ্টি ধরে আসে।
ঘুম থেকে তুলে চিপা গলি পেরিয়ে ঠোঙ্গাটি হাতে দিয়ে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে নারীটি বললেন, ‘এবার এসো।’
পরক্ষণেই আবার বললেন, ‘চিনবে তো ?’
আসাদ চলে আসছিল প্রায়। হঠাৎ কী যেন হলো ওর। ভদ্রমহিলা কিছু বোঝার আগে দ্রুতই এক হাত দিয়ে তার পা ছুঁয়ে সালাম করল। ভদ্রমহিলা হকচকিয়ে গেলেন। তারপর আসাদের ছোট্ট কপালে চুমু খেয়ে আরও দ্রুতই যেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
বাসায় ফিরতে ফিরতে আসাদের শিশুমনে ভাবনার জট পাকালো। ভদ্রমহিলা শেষে যে বললেন, ‘চিনবে তো ?’
কী চিনবার কথা বললেন উনি ?
আসাদদের নিজের বাসা, না-কি কখনও আবার এদিকে এলে ঐ-নারীকে, মানে তাকে ?
ফুলার রোডে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে অপেক্ষা করছে আসাদ। সাবিরার আসার কথা। টিএসসিতে দেখা করা যেত। কিন্তু স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন এখন তুঙ্গে। যখন-তখন ছাত্র-পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। ওদিকটা এখন স্বস্তিকর না। তাই এখানকার কথা বলেছিল সাবিরা নিজেই। কিন্তু সাবিরার আসার নাম-নিশানা নাই। প্রায় দুই ঘণ্টা হতে চলল। এমনটা হয়নি কখনও। সাধারণত দেখা করার কথা থাকলে সাবিরাই আগে আগে চলে আসে। বরাবর দেরি হয় আসাদের। কিন্তু আজ ঘটনা উল্টা। দেরি করছে সাবিরা। অস্বাভাবিক দেরি। কী হলো সাবিরার ?
সাবিরার কী হলো আপাতত জানা না-গেলেও আসাদের কিছু একটা হলো।
ফুলার রোডে বেশ কিছু বড় বড় গাছ। সেই রকম একটা গাছের ছায়ার নিচে ফুটপাথে বসে বসে ফটোগ্রাফির একটা অ্যালবাম দেখছিল সে। পুরনো এই অ্যালবামটা সে পরশুদিন কিনেছিল নীলক্ষেত থেকে। বাংলা নিয়ে পড়লেও ফটোগ্রাফির প্রতি আসাদের ভীষণ প্যাশন। ইউনিভার্সিটি পাস করে নিজের উপার্জনের টাকায় সে একটা ক্যামেরা কিনবে। এটা যেন তার নিজের নিকট নিজের একটা পণ।
অ্যালবামের ছবিগুলো ঘুরেফিরে বারবার দেখতে থাকে আসাদ। কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ! মাথার উপরের বিশাল রেইনট্রি গাছে হঠাৎ একটা পাখি ডেকে ওঠে। কী মিষ্টি পাখিটার স্বর! একেবারে রেডিওর নারীদের মতো! কী পাখি ওটা ? এটা ভাবতে গিয়েই হঠাৎ সে আবিষ্কার করে―আরে, সাবিরাও তো রেডিওর নারীদের মতো সুন্দর করে কথা বলে। এতদিন কেন এ কথাটি তার মনে হয়নি! কী আশ্চর্য তখন তখনই আবার তার মনে পড়ে সেই বাড়িটির কথা।
আসাদ যদি এখন সেই বাড়িটাতে যায়―ঐ নারীটির দেখা কি সে পাবে ? সে কি বেঁচে আছে ? বেঁচে থাকলেও এতদিনে বৃদ্ধা হয়ে যাওয়ার কথা। যেহেতু আসাদও আর সেই ছোট্টটি নেই। সেই নারী কি আসাদকে চিনতে পারবে ? বয়ঃসন্ধি পার হওয়ার পর দীর্ঘদিন কেউ কাউকে না দেখলে চেনা খুব দুষ্কর। শরীরে আমূল পরিবর্তন ঘটে। চিনবে কী করে! আচ্ছা, আসাদ নিজে কি তাহলে সেই নারীকে চিনতে পারবে ?
হঠাৎ একটা রিকশা তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
আসাদ ভেবেছিল বুঝি সাবিরা এসেছে। কিন্তু খালি রিকশা দেখে সে হতাশ হয়। পরক্ষণেই তার কৌতূহল হয় যে, খালি রিকশাটি কেন তার সামনে এসে দাঁড়াল। আশ্চর্য, রিকশাঅলার গলায় ‘বাঘের লাহান’ একটা গান। গান শেষ না-করেই রিকশাঅলাটি তার পাশে এসে নির্বিকারভাবে বসে, যেন আসাদ তার অনেক দিনের পুরনো কোনও বন্ধু। লোকটি লুঙ্গি দিয়ে মুখ মোছে এবং ছায়ায় জিরোয় এবং স্বগোতক্তি করে ‘টরম টরম গরম মামা’। আসাদ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করে রিকশাঅলার হাতে একটা মালা। তীক্ষè একটা চোরা দৃষ্টি দিয়ে সে ভালো করে দেখে নিশ্চিত হয় যে এটা বকুল ফুলেরই মালা। কিন্তু সেদিনকার রিকশাঅলা আর আজকের রিকশাঅলা তো এক না। না-কি এক ? ঠিক বুঝতে পারছে না আসাদ। ওদের দুজনের স্বভাবে একটা অদ্ভুত মিল দেখা যায়; তবে কি ঢাকার রিকশাঅলারা আজকাল বকুল ফুলের মালা হাতে নিয়ে রিকশা চালায় আর তাদের কণ্ঠে থাকে বাঘের লাহান গান ?
দুই রিকশাঅলার মধ্যকার কোইনসিডেন্স দেখে, না-কি রিকশাঅলা তার পাশে এসে বসল দেখে―কে জানে কী ভেবে অপেক্ষার শেষ হয় আসাদের। এতক্ষণ সে একটা ঘোরের মধ্যেই ছিল। অপেক্ষার ঘোর। এবার সে উঠে দাঁড়ায়। আর ঠিক তখন তখনই আসাদের মনে হয় সাবিরার মুখটা যেন অনেকটাই সেই বাড়ির নারীটির মতো। তাহলে তো সেই নারীকে চিনতে পারবে সে। নিজেরেই সে জিগায়―‘কী আসাদ, চিনতে পারবা না ?’
কী জানি!
ছোটবেলা থেকেই আসাদের শুধু রেডিওর ঘোষিকাদের দেখতে ইচ্ছে করে; যারা কী সুন্দর মিষ্টি করে কথা বলে কিন্তু কখনই যাদের মুখ দেখা যায় না।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



