প্রসঙ্গ : নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ ও টি. এস. এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’ : মুহম্মদ নূরুল হুদা

প্রচ্ছদ রচনা : শতবর্ষে অন্য আলোয় বিদ্রোহী কবিতা

কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, আসানসোল আয়োজিত আজকের এই আলোচনা অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ করায় সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

‘রিলেভেন্স অফ বিদ্রোহী ইন কনটেমপোরারি টাইমস’ অর্থাৎ সমসাময়িক সময়ে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার প্রাসঙ্গিকতা।

“বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’”― এই কথাটি বলেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কাজেই কাজী নজরুল ইসলামের সমসাময়িকতাকে যদি আমরা ধরি সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যে সময়, তখন থেকে তার যে চেতনসময়, ১৯৪২ পর্যন্ত, তা হলে তো কাজী নজরুল ইসলামকে আর প্রাসঙ্গিক বলার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু আমরা আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করছি, কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আমরা শুধু এই মুহূর্তে কথা বলছি না। যে কাজী নজরুল ইসলাম কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করেননি, তাকে নিয়ে ঢাকা, কলকাতা অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেছে এবং কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই একটি টোটাল ডিসকোর্স তথা পাঠ্যবিষয়ে পরিণত হয়েছেন। ফলস্বরূপ, আমরা বুঝতে পারছি তিনি কতখানি প্রাসঙ্গিক।

কাজী নজরুল ইসলাম ইউনিভার্সিটি উইটদের কটাক্ষ করে এ কথা বলেছিলেন “বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’, কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!” আর তোমরা যারা সোনার ছেলে ভালো থাকো।

কিন্তু, কাজী নজরুল ইসলাম নিজে সোনার ছেলে তো বটেই, তিনি সোনার মানুষ এবং সোনার কবিও। তিনি এইভাবেই আমাদের মাঝে আবির্ভূত হয়েছেন। আজকে আমরা তাকে বাঙালির জাতীয় কবি হিসেবে যে অভিধা দিই, যাকে এখন আমরা বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং আজকে আমরা বলি সর্বমানবিক একজন কবি; সারা পৃথিবীর যে মানবতাবাদ, তাকে তিনি ধারণ করতেন। মানবিকতা ছাড়া কাজী নজরুল ইসলামকে ধারণ করা যাবে না। কাজেই, আমরা শুধু এটুকুই বুঝতে পারছি কাজী নজরুল ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা তো যায়নি, বরং দিন দিন তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘বিদ্রোহী’র নব্বই বছর বয়স যখন হলো, তখন সদ্য প্রয়াত আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশে একটি আলোচনার সৃষ্টি করেছিলেন। আমি মনে করি, তার প্রভাব সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ হচ্ছে―এর অর্থ অনেকটা এই ধরনের যে, আসলে বিদ্রোহী চরিত্রটিই নজরুল। আসলে প্রত্যক কবির ভেতর একজন নায়ক, একজন কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকে। কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে সেটি হলো―সবকিছুকে ভেঙেচুরে নতুন করে তৈরি করার সংকল্প। সে কেন্দ্রীয় চরিত্রকে তিনি প্রতীকী আকারে শিবের ভেতর উপস্থাপন করেছিলেন এবং সেই শিবের যে বহুরূপ আছে, সবরূপ নিয়ে তিনি তার এই ১৪১ বা ১৩৯ পঙ্ক্তির কবিতাটিতে বলেছেন। নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা যাচ্ছে না ‘আমি, তুমি সে’-এর কারণে। আমি মানেই তুমি, তুমি মানেই সে। আমরা যারা এই অন্তর্জালে বসে আছি, আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু আমি। আমাদের ভেতর একধরনের সমীকরণ আছে। এ সমীকরণের ভেতর যখন ব্যক্তি আমিকে বলি, তখন আমি একা হয়ে যাই। এর সঙ্গে যখন অন্য একজনকে যুক্ত করি, তখন আমি দ্বিতীয় হয়ে যাই। যখন আরও একজনকে যুক্ত করি, তখন বহু হয়ে যাই। কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমি’র ভেতর এই বিষয়টি আছে বলে আমার মনে হয়েছে। সে কারণেই যতদিন এই ‘আমি’র অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকবে, ব্যক্তির অস্তিত্ব থাকবে, সমষ্টির অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন কাজী নজরুল ইসলামের বৈশ্বিক বা স্থানিক প্রাসঙ্গিকতা কোনও না কোনওভাবে থেকে যাবে।

এর বাইরে আমি আরও দুটো প্রাসঙ্গিকতার কথা বলব। জাতীয় ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা। বিশেষত, বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের যে প্রাসঙ্গিকতা, সেটা কখনও লুপ্ত হওয়ার নয়। কারণ, বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ হয়েছে বহু আগে। আমরা বলি, সেই ভুসুকু থেকে, যেদিন তিনি বাঙালি শব্দটি ব্যবহার করলেন। কোনও না কোনওভাবে ধ্বনির মাধ্যমে সেটি এসেছিল। তারপর পরিপূর্ণ বিকাশের একটি স্তরে এসে কাজী নজরুল ইসলাম যখন বললেন : বাঙালি যেদিন বলতে পারবে বাঙালির বাংলা, সেদিন বাঙালি অসম্ভবকে সত্যে পরিণত করবে। বাঙালি একাই ভারতকে স্বাধীন করবে।

অর্থাৎ, যখন একটি ব্যক্তিসত্তা সামষ্টিক পর্যায়ে জাতিসত্তায় পরিণত হয়, তখন জাতিকে মুক্ত করার কাজে সেই সামষ্টিকতা এগিয়ে দেয়।

বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতার যে কথা বলছি, তা অতি হাল আমলে শুরু হয়নি। সারা পৃথিবীতে ব্যক্তি মানুষের উত্থান, সামষ্টিক মানুষের উত্থান এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে উত্থান, সে কথাটি নজরুল ইসলাম বলেছেন। সুতরাং, এই প্রাসঙ্গিকতা হাল আমলেরও আগের।

আমরা যখন তার প্রাসঙ্গিকতা খোঁজার জন্য যাব, তখন কেবল ইন্টারটেকচুয়ালিটির দিকেই যাব না। বরং, ওয়েস্ট ল্যান্ডের দিকে যেতে পারি, সেকেন্ড কামিং-এর দিকে যেতে পারি কিংবা সং অব মাইসেল্ফ-এর দিকে তো যেতেই পারি। এমনকি আমরা ‘আত্মশক্তি’র দিকেও যেতে পারি। নজরুল লিখেছিলেন ‘বল বীর―বল উন্নত মম শির!’ শুনলে কখনও মনে হবে, তিনি নিজেকে ‘বীর’ বলছেন। কিন্তু না। বীর শব্দটি ব্যবহার করেছেন এই কারণে : ব্যক্তির ভেতর তখন আত্মশক্তি-বুদ্ধ অভিজ্ঞানটি তৈরি হয়, যে অভিজ্ঞানের কথা কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আত্মশক্তি’ কবিতায় প্রবলভাবে বলেছেন। তখনই আমরা বুঝতে পারি, কাজী নজরুল ইসলামের যে ব্যক্তির বীরত্ব ও সমষ্টির বীরত্ব, যে বীরত্ব ব্যক্তিক-সামষ্টিক ও বৈশ্বিক মাঙ্গলিকতার পক্ষে, সে বীরত্ব প্রত্যেক ‘আমি’ নামক সত্তার ভেতর থাকতে হবে।

আরও একটি ইন্টারটেকচুয়াল কবিতার কথা আমি বলতে চাই।

‘তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে, আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ তলে এসে’। কার কাছে ? যে বিজয়িনী। যে ব্যক্তিকে বিজয়ী করেছে অর্থাৎ প্রেম বা ভালোবাসা বা মাঙ্গলিক সত্তা, যা অন্য মাঙ্গলিক সত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একধরনের যুক্ততা তৈরি করতে চায়, এক ধরনের মুক্ততা তৈরি করতে চায়, ব্যক্তি ও সামষ্টিক স্বাধীনতাকে বিকশিত করতে চায়। তার ‘সাম্যবাদী’ কবিতাগুচ্ছেও আমরা ইন্টারটেকচুয়ালিটিকে বিস্তৃত করতে পারব।

আমি ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ সম্পর্কে একটু কথা বলতে চাই। কাকতালীয়ভাবে ১৯২২ সালে ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ রচিত হয়। আমাদের ‘বিদ্রোহী’ যদি ১৯২২ সালে না-ও হয়, বলতে গেলে, ১৯২১ সালের শেষ দিনটাতে লিখিত হয়েছিল। বিদ্রোহী কবিতার ভেতর ‘ওয়েস্ট ল্যান্ডে’র এক ধরনের সাজুয্য আছে। আমি বলব, এক ধরনের দূরান্বয়ী তুলনীয় বিষয় আছে।

―এই দুটি কবিতা বিশেষত ‘শান্তি’ শব্দটির কারণে আজীবন প্রাসঙ্গিক থাকবে। এই দুটি কবিতার মধ্যকার ‘শান্তির’ মধ্যে একধরনের পার্থক্য আমি দেখি। সেটি হচ্ছে―যথার্থই উপনিষদীয় শান্তি, বুদ্ধের শান্তি এবং ইসলামের  ঐকবাদের শান্তির কথা তো আছেই―কিন্তু এলিয়ট অনুর্বর পৃথিবী থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যার সমন্বয় দেখেছিলেন, সেটি হচ্ছে মূলত সদাচারী ধর্ম যাপনের মধ্য থেকে উত্থাপিত যে পথ, সেই পথ। যদিও নজরুল একটি ধর্মে জন্ম নিয়েছিলেন, তবু তিনি বলেছিলেন, আমি ইসলাম ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি বলে মনে করবেন না যে, আমি শুধু ইসলামের জন্য এসেছি। তাই বরং, আমরা এর থেকে দূরে গিয়ে ‘আমার সুন্দর’ প্রবন্ধের দিকে চলে যাব। যেখানে তিনি সুন্দরের নানান কৌণিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন ‘অভেদ সুন্দর’। বিশ্বের সমস্ত মানুষের ভেতর, সমস্ত বস্তুর ভেতর সুন্দরের একটি অভিন্নতা আছে। যার নাম আমরা বলি ‘নান্দনিকতা’। অ্যাস্থেটিক ইউনিটি অফ সোলস। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতীক, বিভিন্ন ধরনের মিথ প্রভৃতির ইন্টারটেকচুয়ালিটি করেও শেষ পর্যন্ত নিজের যে শান্তি কিংবা মানবশান্তির জন্য যে কথাটি বলেছেন, সেটি হলো মানুষের একধরনের নান্দনিক ইউনিটির শান্তির কথা। ফলে, আমি নজরুলের প্রাসঙ্গিকতাকে এভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই যে, ব্যক্তির ভেতর কাজী নজরুল ইসলাম যে শক্তি দেখেছিলেন এবং সে শক্তির ভেতর যে প্রয়োগ দেখেছিলেন, সে শক্তি অন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য নয়, বরং অন্য ব্যক্তিকে আপন করে নেওয়ার জন্য।

কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতাকে রোমান্টিক মডার্ন না বলে, আমি বলব ওপেন মডার্ন। যা বারবার পরিবর্তন হচ্ছে। বিবর্তিত হচ্ছে। ফলে, কাজী নজরুল ইসলামের এই টেক্সটকে আমরা বলতে পারি, আমাদের সময়ে ব্যক্তি বা সময়ের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

কাজী নজরুল ইসলামের এই ১৪১ পঙ্ক্তির টেক্সটকে পাঠ করতে গিয়ে আমি কয়েকটি ভাগ লক্ষ্য করেছি। নিজের মতো করে ভাগগুলোর কথা আমি উপস্থাপন করতে চাই। লিখিত একটি অংশ থেকে আমি পড়ছি―

আসলে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল তার অধীত জ্ঞানগম্য ও তাবৎ অলংকার প্রয়োগ করেন। মূল চরিত্রটির প্রতীক ‘শিব’, আর তাকে কেন্দ্র করেই বাস্তবায়িত হচ্ছে কবিতাটির সৃষ্টিবিশ্ব। এই কেন্দ্রীয় চিত্রকল্প ছাড়াও এতে আছে অজস্র যৌগিক শব্দগুচ্ছ, তৎসম-তদ্ভব-দেশি শব্দের পাশে আরবি-ফারসি-গ্রিক ইত্যাদি বিদেশি শব্দের সুসামঞ্জস্য প্রয়োগ, বৃত্তানুপ্রাস, অন্ত্যমিল, মধ্যমিল, আবৃত্ত পদ, অনুপ্রাসায়ন, রূপকায়ন, প্রতীকায়ন, পুরাণ প্রয়োগ (হিন্দু, মুসলিম, গ্রিক, সিমেটিক), ঘূর্ণিচিত্র, লোকশ্রুতি, কিংবদন্তি সর্বোপরি স্বরমাত্রিক ছন্দের স্বতঃস্ফূর্ত ও কুশলী প্রয়োগ।

উপরন্তু, কবি এক্ষেত্রে বিষয় আর শৈলীর অন্তর্বয়নের পদ্ধতিও অবলম্বন করেছেন। তিনি নানাব্যঞ্জনায় কেবল ‘আমি’ সর্বনামটিই ব্যবহার করেছেন ১৪৭ বার। এই ‘আমি’-র একাধিক ব্যবহার ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতার চরণবিন্যাসের কথা মনে করায়। একইভাবে শব্দ ও বিষয়ের দূরান্বয়ী সম্পর্কের কারণে এই কবিতার প্রেরণা-স্থল হিসেবে কেউ কেউ মোহিতলালের ‘আমি’ কথিকা, আবার সেই সূত্রে ক্ষেত্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অভয়ের কথা’ কিংবা ‘বেদান্তাশ্রিত তত্ত্ব’-এর কথাও স্মরণ করে থাকেন। আবার কেউ কেউ এই কবিতায় ওয়াল্ট হুইটম্যানের ‘সং অব মাইসেল্ফ’-এর অনুরণনও লক্ষ্য করেছেন। আধুনিককালের প্রায় সব রচনাই এই ধরনের ইন্টারটেক্সুয়ালিটি তথা অন্তর্ভাষ্যের ফসল, যা মূলত শিল্পস্রষ্টার চেতন-অবচেতন ও অচেতন স্তরে ক্রিয়াশীল। এই ধরনের নানামাত্রিক পরিগ্রহণজাত সফল সৃষ্টি অবশ্যই মৌলিক সৃষ্টি। তাই বহুরৈখিক পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ গ্রহণ-বর্জন-পরিশীলনের মধ্য দিয়েই নতুন ও মৌলিক সৃষ্টি হয়ে উঠেছে এই ‘বিদ্রোহী’। এই তর্ক কালে কালে আরও শাণিত, আরও প্রাণিত, দলিলীকৃত ও মননগ্রাহ্য হবে, সন্দেহ নেই।

আসলে দ্রোহে-সংগ্রামে প্রেমে ও বিরহে, উপসংহারমূলক আশাবাদে বিদ্রোহী এক অসৃষ্টপূর্ব মানবদলিল। শ্রেষ্ঠ কবি যে তার শ্রেষ্ঠ পঙ্ক্তির সাহায্যে জনগণের মুখের ভাষা পরিস্রুত করেন, বিদ্রোহী তারও এক প্রামাণ্য ভাষ্য। আমরা বিস্মৃত হইনি যে, গত একশ বছরে বাঙালির সবচেয়ে উচ্চারিত কাব্য-প্রণোদনা ও প্রাণিত পঙ্ক্তি :

        বল                বীর-

বল         উন্নত মম শির!

আগেই বলেছি, এই কবিতা নিয়ে ইতোমধ্যেই নানাকৌণিক নান্দনিক আলোচনা শুরু হয়েছে দেশ-বিদেশে। তবে এখনও আমাদের চোখে পড়েনি সেই সর্বব্যাপী উত্তরকাঠামোবাদী ব্যবচ্ছেদ ও মূল্যায়ন, যা কবিতাটির বাণী, তাৎপর্য ও শৈলীগত উৎকর্ষের একক ও তুলনামূলক উৎকর্ষ নির্ণয়ে সক্ষম। আমাদের প্রায় সব উচ্চারণই হয় অন্ধ ভক্তি বা অপর্যাপ্ত শিক্ষার কুসংস্কার থেকে উত্থিত অথবা নৈর্ব্যক্তিক পাঠ-বিবর্জিত অথবা অকারণ তাচ্ছিল্য-জাত। ভক্তি, আসক্তি বা নিরাসক্তির প্রান্তিকতা থেকে বেরিয়ে এই কবিতার শৈল্পিক পাঠ-ব্যবচ্ছেদ চাই। ৯০ বছর একটি কবিতার ক্ষেত্রে নিতান্ত কম সময় নয়। এই সময়-পরিসর প্রমাণ করেছে, কবি নজরুল ও তার রচনা, বিশেষত বিদ্রোহী সম্পর্কে তিরিশের কলাকৈবল্যবাদী ‘ইউনিভার্সিটি উইট’সহ যারাই অহেতুক অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন, তারাই পরিণামের হাস্যাস্পদ প্রতিভাত হয়েছেন। একবিংশ শতাব্দীতে নজরুল ও তার তাবৎ রচনা এক ব্যতিক্রমী নান্দনিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে নবায়িত হওয়ার অপেক্ষায়। এই নবায়ন ও নবমূল্যায়ন নজরুলের রচনাকে, বিশেষত বিদ্রোহীকে বাংলা কবিতার এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের পাশাপাশি বিশ্বমানবতার আন্তর্সাংস্কৃতিক মুক্তিসনদ হিসেবেও বীক্ষণ করবে।

বিদ্রোহীর বর্তমান টেক্সটে অন্তত দশটি স্বতন্ত্র অথচ অন্তর্বয়িত স্তবক আছে যেখানে বিষয়ের আপাত-ভিন্নতার পাশাপাশি ভাবনাস্রোতের ঐক্য সুগ্রথিত। প্রথম স্তবক প্রথম ১২ পঙ্ক্তির, যেখানে ব্যক্তি-আত্মা ও ব্যক্তিতার অদৃষ্টপূর্ব জাগরণের কথা আছে। এখানে অনেক অনুষঙ্গের মধ্যে মূল প্রতীক শিব ও তার প্রলয়রূপ। দ্বিতীয় স্তবকে বিষয়টি বিবর্তিত হয়ে শিবের ঘূর্ণিনৃত্যের রূপ ধারণ করেছে। হাম্বীর, ছায়ানট, হিন্দোল প্রভৃতি রাগরাগিণীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঝড়ের শঙ্কা ও সংহারক মূর্তি। এই স্তবকে আছে ২৯ পঙ্ক্তি। তৃতীয় স্তবকটি আবার মাত্র ১২ পঙ্ক্তিতে সীমিত। এতে রয়েছে পৌরাণিক পুরোহিতের চিত্র, যা ধ্বংস ও পুনসৃষ্টির অনুঘটক। তাই এখানে রণতূর্য আর বাঁশরি সমীকৃত। চতুর্থ স্তবকে আছে ১৫ পঙ্ক্তি, যার শুরু বেদুইন ও চেঙ্গিসের প্রতীক দিয়ে। এখানে জাগরণের চেয়ে ব্যক্তির শক্তিমত্তা ও আত্মপ্রত্যয়ের ঘোষণা অধিকতর উচ্চকিত। এখানেও আদি ওঙ্কার আর ইস্রাফিলের শিঙাধ্বনির পর পুনরুত্থানের বিশোধিত উত্থান সঙ্কেতায়িত। ৫ম স্তবকের সুর অপেক্ষাকৃত ধীরলয়ের ও আত্মোপলব্ধির। ১৮ পঙ্ক্তির এই স্তবকে কবি কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি, কুমারীর প্রথম পরশের আদিশিহরণ ইত্যাকার প্রেমার্ত গীতিরসের অন্তঃপ্রবাহ তৈরি করেছেন। এটি যেন কবি ও পাঠকের বিশ্রাম গ্রহণের সময়। অনেকটা মহাকাব্যের ইন্টারলিউডের মতো। তবে সর্বশেষ চরণে কবি নিজেকে চেনার যে ঘোষণা দিয়েছেন তার ফলে এই স্তবকটি বিষয়গত বিচারে এই কবিতার ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু। ৬ষ্ঠ স্তবকে বর্তমানে ১৪টি পঙ্ক্তি দেখা যায়। তবে আদি-ভাষ্যে এখানে আরও চরণ ছিল, যা কবি কর্তৃক সম্পাদিত ও সংক্ষেপিত। এখানে মানবশক্তি কর্তৃক গতিশক্তিকে ব্যবহারের পদ্ধতি ও অর্জনের বিষয়টি উন্মোচিত। ‘র্বোরাক্’, ‘উচ্চৈঃশ্রবা’, ‘হিম্মত-হ্রেষা’ প্রভৃতি প্রতীক ও উৎপ্রেক্ষা মানুষের সঙ্গে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দূরতম বা শীর্ষতম প্রান্তে জগতের শীর্ষশক্তির মিলনের দ্যোতক। এখানে গতিময় নজরুল অভেদসুন্দরের সঙ্গে মিলনাকাক্সক্ষী। ৭ম স্তবকে ১১ পঙ্ক্তি, ৮ম স্তবকে ৪ পঙ্ক্তি আর নবম স্তবকে ৮ পঙ্ক্তি রয়েছে। এগুলো বিভিন্ন ঐতিহ্যের মিশ্রণে এক ধরনের যৌগিক চিত্রকল্প ও মানববৈচিত্র্যের ইঙ্গিতবহ। আর ৮ম স্তবকে জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসতে পারার ক্ষমতার মধ্যে বিশোধিত মানবাত্মার পুনর্জন্ম ও শক্তিময়তার ইঙ্গিত আছে। আর এই ইঙ্গিতটিই পূর্ণমানবশক্তির ঘোষণা হয়ে এসেছে মাত্র আট পক্তির ৯ম স্তবকে। কবি এখানে বিশুদ্ধ আত্মশক্তিকে ‘অজর, অমর, অক্ষয়’ এবং ‘পুরুষোত্তম সত্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। আসলে এই আত্মশক্তি যেমন সক্রিয়, তেমনি সতত অতন্দ্র। এই শক্তি যেকোনও অপশক্তি বা তার শাসন-ত্রাসন-উৎপীড়নের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, আবার সংহারকও বটে। তাই ১৯ পঙ্ক্তির সমাপ্তিসূচক ১০ম স্তবকে কবি সেই অপশক্তিকে সমূলে বিনাশ না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত না হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে ঘুমন্ত ভগবানকে জাগ্রত করার পাশাপাশি নবসৃষ্টির আনন্দে উৎপীড়কের অগ্রহণীয় বিশ্বকে উপড়ে ফেলার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। সব মিলিয়ে নজরুল তার এই বিবর্তমান মুক্তভাষ্যে মানুষের জন্য যে শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর কথা বলেছেন তা হচ্ছে সকল মানুষের জন্য বাসযোগ্য এক প্রযুক্ত পৃথিবী।

আসলে বিদ্রোহী-র শব্দ-সংগীত-চিত্র- ব্যঞ্জনায় যে নানাতলীয় মুক্তির ইশারা অন্তর্বয়িত, তার একটি অসম্পূর্ণ তালিকায়নও করা যেতে পারে। আমাদের মতে, এই তালিকায়নের কেন্দ্রীয় বাণী ‘মুক্তি’। আর এর বিভিন্ন শনাক্তযোগ্য পরিপ্রেক্ষিত হচ্ছে : ভাষিক মুক্তি, ছান্দিক মুক্তি, সাংগীতিক মুক্তি, আলংকারিক মুক্তি, প্রাকরণিক মুক্তি, ব্যক্তিক মুক্তি, জাতীয় মুক্তি, আর সবশেষে সর্বমানবিক মুক্তি ইত্যাদি। পরম্পরাময় ওক্সিমোরন বা বিরোধাভাস, অতিকথন, সম্প্রসারণশীল চিত্রকল্প, কনসীট, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীকময়তা, যৌগিক শব্দবন্ধ, তর্কাকুল বর্ণনাবৈভব, সম্বোধন ও স্বীকারোক্তিমূলক বহুময়তায় প্রকীর্ণ এই কবিতাভাষ্য অবশ্যই বিশ্বভাষার এক স্ফিংকস-সদৃশ রহস্যময়তা, যা মহাকালের সমান বয়সি। প্রায় শতবর্ষী এই সৃষ্টিভাষ্যের রহস্যভেদের দায় মূলত আমাদেরই, আমরা যারা নৈর্ব্যক্তিক ও নান্দনিক বোদ্ধা হওয়ার দাবিদার।

জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বপ্ন, সংগ্রাম, জন্ম, বিকাশ ও ভবিষ্যৎ আলোকযাত্রার কথা বিবেচনায় রেখে যদি একজন-মাত্র বাঙালি কবির নাম বলতে হয়, তাহলে সে-নাম নিঃসন্দেহে কাজী নজরুল ইসলাম। এই গাঙ্গেয় অববাহিকায় ইতিহাসপূর্বকাল থেকে যে জনগোষ্ঠীর উদ্ভব, মিশ্রণ ও বিবর্তন, তাদেরই ইতিহাসবাহিত নাম বাঙালি। বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ এই বিবেচনায় অবিচ্ছেদ্য। এ এমন এক চেতনাশ্রয়ী বিবেচনা যা অনাদিকালের উৎস থেকে ভবিতব্যের দূরতম মুহূর্ত পর্যন্ত এক অবিভাজ্য বৃত্তীয় পরিধিতে বিবর্তিত ও পরিভ্রমণরত। এই চেতনার শুরু আছে শেষ নেই। এই আদিঅন্তহীন বাঙালি চেতনার সঙ্গে অবিকৃতভাবে সমীকৃত হয়ে আছে যার দৃষ্টি ও সৃষ্টি, তিনি শুধু অমিত-তারুণ্যের প্রতীক বিদ্রোহী কবিযোদ্ধা মাত্র নন, বরং তিনি ‘বাঙালির বাংলা’-র স্রষ্টা এক ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, যিনি ত্রিকালদর্শী টাইরেসিয়াসের চেয়ে কম প্রাজ্ঞ নন। তাই বলতেই হয়, ব্যক্তি, সমষ্টি, স্বজাতি ও সমগ্র মানবজাতির মুক্তি, কল্যাণ আর ভারসাম্যময় অবস্থানসহ বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে এমন অঙ্গীকৃত আস্থা ও নান্দনিক বিশুদ্ধতা নিয়ে কম কবিরই আবির্ভাব ঘটেছে আমাদের এই দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ গ্রহটিতে।

পরিশেষে নিবেদন করি, আমরা যারা বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাঙালির জাতিরাষ্ট্রিক বিজয় দেখেছি, তাদের চোখে স্বদেশে ও স্বকালে নজরুলের বিদ্রোহী’র মূর্তিমান প্রতিকৃতির নাম ৭ মার্চের ভাষণদানরত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি ঊর্ধ্বলোকে তর্জনী উঁচিয়ে সামষ্টিক বাঙালির স্বাধীনতা ঘোষণার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিমানুষের প্রান্তমুক্ত বিদ্রোহী সত্তার বাস্তব অভিব্যক্তিকেই মূর্ত করে তুলেছেন। ব্যক্তিবাঙালি আর সর্বকালের শক্তিমত্তার এই জয়গান মূলত সর্বপ্রান্তের ব্যক্তিমানুষের শক্তিমত্তার এই প্রাকৃতিক- অপ্রাকৃতিক তাবৎ প্রতিকূলতাজয়ী মানবিক শক্তিরই অনিবার্য স্বীকৃতি। বিশ্বব্যাপী বিদ্রোহীর এই মঙ্গলশক্তির জয় হোক।

পরিশেষে বলব, বিদ্রোহী’র এই মঙ্গলময়, নান্দনিক ও মানবিক মুক্তির ইশারা, এটা কখনও থামবে না। আমরা বারবার এর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত হয়ে নিজেদেরকেই গৌরবান্বিত করব। সকলকে ধন্যবাদ।

বিদ্রোহী ও ওয়েস্ট ল্যান্ডের মধ্যে মিল-অমিলের একটি দ্রুতরেখ চিত্র আমরা এখানে আভাসিত করছি।

১. ‘বিদ্রোহী’ রচিত হয়েছিলো ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে;  আর ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ রচিত হয় ১৯২২ সালে।

২. ‘বিদ্রোহী‘ প্রায় সারারাত বিনিদ্র জাগরণে, একটানা অপরিমিত আবেগ ও সৃষ্টিকল্পনার অবিশ্বাস্য প্রয়োগে রচিত; অন্যদিকে ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ রচিত হযেছিলো দীর্ঘদিন ধরে চিন্তা ও প্রজ্ঞার কুশলী প্রয়োগ।

৩. রচনার পর কবি নিজেই সম্পাদনা করেছেন ‘বিদ্রোহী’ এবং মূল দৈর্ঘ্যের চেয়ে সামান্য কমিয়েছেন: অন্যদিকে ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ সম্পাদনা করে মূল টেক্সটের অর্ধেকেরও বেশি বর্জন করেছেন কবিবন্ধু এজরা পাউন্ড। ফলে এলিয়ট একাই এই কবিতার কৃতিত্বের দাবিদার নন, বরং এজরা পাউন্ডও।

৪. ‘বিদ্রোহী’ একটি আত্যন্তকি অনুপ্রাণিত রচনা; স্মৃতিবাহিত, সঙ্গীতময়, চিত্রময় ও অখণ্ড: অন্যদিকে ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ একটি পঠনজাত, সুচিন্তিত, স্মৃতিমন্থিত, টানাবর্ণনাময়, আপাত পরম্পরাহীন পাঁচটি অসম খণ্ডে বিভক্ত ঢিলেঢালা কবিতা।

৫. দুটোই প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যে নষ্ট-কলুষিত-মূল্যবোধহীন-সুষ্টিহীন-নীতিবোধহীন-মূল্যবোধহীন-অবক্ষয়শাসিত বিশ্বসমাজ তারই ভিন্নমাত্রিক ভাষ্য।

৬. ‘বিদ্রোহী’তে আছে চিরমানুষের ‘বীর‘সত্তার জয়গান, যা ওয়েস্ট ল্যান্ড নেই বললেই চলে। সেখানে আছে পতিত মানুষ, অনুর্বর জমি ও অবাস্তব নগরের কাহিনী, যা পুরোটাই নেতিবাচক।

৭.  ‘বিদ্রোহী’ স্ট্রিম অব কনশাসনেস‘ ও সাঙ্গীতিক ঐক্যশাসিত রচনা; আর ওয়েস্ট ল্যান্ড যুক্তিতর্ক ও গদ্যচিত্রের দূরান্বয়ী সম্পর্কযুক্ত ভাষ্য।

৮. ‘বিদ্রোহী’র ব্যবহৃত চিত্রকল্প যথাসম্ভব পূর্ণ বিকশিত; কিন্তু ওয়েস্ট ল্যণ্ডের প্রায় চিত্রকল্প অবিকশিত বা অস্পষ্ট বা চূর্ণ বা ভগ্ন।

৯. ‘বিদ্রোহী’তে আছে পাঠজাত ও শ্রুতিজাত বিষয়ের অন্তঃমিশ্রণ (ইনটারটেক্সুয়ালিটি), আর ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ প্রধানত পাঠজাত বিষয়ের মিশ্রণ।

১০. ‘বিদ্রোহী’-র মূল প্রণোদনা সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরোধিতা আর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামষ্টিক স্বাধীনতার বিকাশ। ওয়েস্ট ল্যান্ড তুলে ধরেছে মূলত পশ্চিমা যন্ত্রসভ্যতাশাসিত মূল্যবোধহীনতা, উৎপাদনের অনুর্বরতা, নাগরিকতার কুফলতা ও মানসভ্যতার প্রতিকারহীন বিপর্যয়।

১১. দুটি টেক্সটেই মিথ ও পুরাণের ব্যবহার ব্যাপক। ‘বিদ্রোহী‘তে ভারতীয়, সিমেটিক ও গ্রিক মিথ আর ওয়েস্ট ল্যান্ডে মূলত পাশ্চাত্য পুরাণ।

১২. দৃটি কবিতাতেই ব্যক্তিপ্রতীক ও চরিত্রের ব্যবহার আছে নানা ভঙ্গিতে।

১৩. ‘বিদ্রোহী’র কেন্দ্রীয় চরিত্র শিব আর ওয়েস্ট ল্যান্ডের পরোক্ষ মূল চরিত্র টাইরেসিয়াস। এই দুজনেই দুই কবিতার অন্তরের ঐক্য।

১৪. দুই কবিতাই শেষাবধি মানবমঙ্গলের কথা বলে, তবে তা সাদামাটা নৈতিক অনুশাসনের আদলে নয়।

১৫. দুটি কবিতাতেই নানা ধর্মের রেফারেন্স আছে প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে; তবে তার প্রবাহ প্রধান হয়ে দেখা দেয়নি কোথাও।

১৬. দুটি কবিতাতেই ‘শান্তি’ সর্বশেষ আরাধ্য ও প্রাপ্তি হিসেবে উল্লেখিত।

১৭. এলিয়টের শান্তির উৎস পূর্ব-পশ্চিমের প্রধান প্রধান ধর্মদর্শনের (খৃস্টধর্ম, সনাতন ধর্ম, উপনিষদ, বৌদ্ধ ধর্ম, ইসলাম ইত্যাদি) পুনর্জাগরণে আভাসিত।

১৮. অন্যদিকে নজরুলের শান্তিদর্শন সুন্দরের নান্দনিকতা ও সর্বধর্মের সাম্যবাদী মানবিকতার মধ্যে নিহিত।

১৯. আসলে নজরুলের অভেদসুন্দরের বোধ ‘রণবাদ্য’ আর ‘বাঁকা বাঁশের বাঁশরি‘র মিলনে সৃষ্টিকল্পনার কাব্যসুন্দর।

২০. এলিয়টের অবাস্তব শহরে সুন্দর ও সৃষ্টিকল্পনা আপাতত তিরোহিত।

২১. এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কেন্দ্রাভিগ পদ্ধতিতে আহরিত একটি বদ্ধভাষ্য (ক্লোজ্ড টেক্সট) আর নজরুলের ‘বিদ্রোহী‘ কেন্দ্রাতিগ পদ্ধতিতে বিচ্ছুরিত ও পুনরায় আহরিত একটি মুক্তভাষ্য (ওপেন টেক্সট)।

২২. দুটি কবিতাই স্ব স্ব ভাষায় রচিত বিংশ শতাব্দীর দুটি শ্রেষ্ঠ কবিতা। এলিয়ট যদি আধুনিকতার স্থপতি, নজরুল আধুনিকোত্তর মেটামডার্নের উৎসমুখ। বিশ্বসাহিত্যে দুটি কবিতাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অননুকরণীয়।

*‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, আসানসোল আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে পঠিত।

লেখক : কবি, বাংলা একাডেমি ফেলো ও মহাপরিচালক, একুশে পদকপ্রাপ্ত

অনুলিখন : রাহাতুল ইসলাম রাফি

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares