বিদ্রোহী কবিতার মনস্তত্ত্ব : মোহিত কামাল

প্রচ্ছদ রচনা : শতবর্ষে অন্য আলোয় বিদ্রোহী কবিতা

সৃজনশীল প্রতিচ্ছবি তৈরি করা বা নির্মাণ করার ক্ষমতা বা ধারণাই কল্পনাশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ। এই কল্পনার আলো মেধারই একটি উদাহরণ। আর মেধা হচ্ছে মনস্তত্ত্বের ভেতরের আলো, বাইরেরও। সাহিত্যসৃজনে এ অনুষদ স্বতঃস্ফূর্ত ঢঙে ব্যবহার করে থাকেন সৃজনশীল কবি ও কথাসাহিত্যিকগণ।

দেহের সংবেদনশীল পঞ্চ ইন্দ্রিয় বা মনের পাঁচটি জানালা দিয়ে নানা তথ্য ঢোকে ব্রেনে। তা মানুষের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে এবং সচেতন ভাবনা-জগৎ বা কগনিটিভ ওয়ার্ল্ড কিংবা ‘কনশাস স্ট্রিম অব থটস’ আলোড়িত করে, আবেগে পরিবর্তন ঘটায়, আচরণেও। আবার ইন্দ্রিয়-অনুভূতির বাইর থেকেও অনুভব করা যায় ঠিক দেখা-শোনার সরাসরি মনের একই রকম অনুভবের মতো। এটাই সৃষ্টিশীল কল্পনা বা ‘ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন’। এর ওপর ভর করে সৃষ্ট বিপুল-বিস্তৃত অথচ লক্ষ্যমুখি যাত্রার এক মনস্তাত্ত্বিক ঝড়ো-অনুভবের শব্দজোয়ার আমরা দেখতে পাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়।

এ কবিতাটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণায় সংকলিত হয়েছে ২৫ অক্টোবর ১৯২২ সালে (প্রকাশক : গ্রন্থকার)। এ গ্রন্থের কবিতার সংখ্যা ১২। সব ছাপিয়ে ‘বিদ্রোহী’ যেন হিমালয়চূড়ায় আসীন একটি কবিতা। একাই একটি সূর্য। এ-সূর্যের কিরণে আলোকিত হয়েছে পুরো বাংলা সাহিত্য। এর মনস্তাত্ত্বিক ঝড় জনগণের মুক্তির আকাক্সক্ষায় ঘূর্ণি তোলে। শোষণ, নিপীড়ন, দুঃশাসন, অপশাসন আর সাম্রাজ্যবাদী হিংস্রতার বিরুদ্ধে জনগণের বিবেককে তীব্র নাড়া দেয়। সচেতন সত্তায় সৃষ্টি করে দ্রোহ। বাঙালির চেতনার বারুদ বিস্ফোরিত করে। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের তাগিদ জাগায় ঘরে-ঘরে, জনগণের মস্তিষ্কে, মনোজগতে।

নির্যাতিত-নিপীড়িত, শোষিত মানুষের উদ্দেশে প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর দ্রোহ, বিদ্রোহ। তখন থেকে বিদ্রোহী কবির স্বর্ণপালক উপহার পেতে পেতে অবশেষে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে স্থায়ী উপাধির স্বর্ণমুকুট অর্জন করে ফেলেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

তাঁর কাব্যে প্রেমসত্তাও প্রবল, প্রখর, উজ্জ্বল। এসব চাপা পড়ে গেছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আকাশসমান সাহিত্যমূল্য আর অনন্য শিল্পসম্ভারের প্রভাবে। প্রেমসত্তা চাপা পড়ে গেলেও বিলীন হয়নি। একইসঙ্গে আমরা কবিকে প্রেমের কবি হিসেবেও দেখতে পাই তাঁর অন্যান্য কাব্যে, গানে, গল্প-উপন্যাসে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার মনস্তত্ত্ব মূল্যায়ন করতে বসে প্রেমসত্তাটা টেনে আনলাম কেন ? ‘কারণ তিনি কেবল বিদ্রোহী নন, প্রেম ও সুন্দরের সার্থক সাধকও।’ 

আমরা জানি দ্রোহ যেমন আবেগ, প্রেম-ভালোবাসাও তেমনি আবেগ, দ্রোহ-বিদ্রোহী অনুভবও বটে; আর আবেগ হচ্ছে মনের অঙ্গ, উপাদান। মস্তিষ্কের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র এবং এর নিয়ন্ত্রণাধীন স্নায়ুবার্তা বহনকারী জৈব-রাসায়নিক পদার্থ নিউরোট্রান্সমিটার ও হরমোনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে যা নিয়ন্ত্রিত হয়। বিদ্রোহী কবিতার মূল্যায়ন করতে হলে নজরুলের সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তির পাশাপাশি তাঁর তীব্র আবেগময় সত্তা নিয়েও কথা বলতে হবে। তা না-হলে পুরো বিদ্রোহী কবিতার অন্তর্নিহিত মনোজাগতিক শিল্পরূপ স্পষ্ট হবে না; আর বিদ্রোহী কবিতার মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে নজরুলের ছেলেবেলার বুনিয়াদটাও বুঝতে হবে। জানতে হবে বিদ্রোহী কবিতা লেখার স্বভাবজাত প্রাক-প্রস্তুতি ও আনুষঙ্গিক প্রেক্ষাপটের কথাও।

তার আগে আমাদের বুঝতে হবে মনস্তত্ত্ব কী? মনস্তাত্ত্বিক ঝড় কী? আবেগ কী? প্রেষণা বা মোটিভেশন কী ?

‘মন’ থেকে এসেছে ‘মনস্তত্ত্ব’ শব্দটা; আর এর থেকে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক শব্দ আমাদের জানান দিয়ে যায় মন-বিষয়ক নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কথা। দেহের যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে, যেমন হার্ট, ফুসফুস, লিভার, কিডনি, চোখ, ইত্যাদি, মনেরও রয়েছে তেমনি কিছু প্রক্রিয়া বা প্রসেস। মনস্তত্ত্বের ভাষায় এসবকে বলা হয় ‘মেন্টাল প্রসেস’ বা মানসিক প্রক্রিয়া। আর তা হচ্ছে প্রত্যক্ষণ, আবেগ, চিন্তা, ভেতরের শক্তি-গতি, উৎসাহ-আকাক্সক্ষা-চাহিদা বা প্রেষণা। শিক্ষণ, বিশ্বাস, মনোভাব, স্বপ্ন এবং সর্বোপরি চিন্তাশক্তি। মানুষের মেধা বা প্রতিভাও মনের স্বাস্থ্যের অঙ্গ, অনুষদ। প্রতিভার মধ্যে রয়েছে স্মরণশক্তি, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীল ক্ষমতা, অর্থপূর্ণ উপলব্ধির ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।১

   মনের ভেতরের এসব অদৃশ্য প্রক্রিয়া বাইরে প্রকাশিত হয় দৃশ্যমান আচরণ, কথাবার্তা কিংবা লেখালেখির মধ্য দিয়েও। এছাড়াও মনের রয়েছে নির্জ্ঞান বা অবচেতন স্তর, রয়েছে প্রাক-চেতন ও চেতন মন। সাহিত্যের ভাষায় ‘মনস্তাত্ত্বিক ঝড়’ বলতে আমরা বুঝব এসব মানসিক প্রক্রিয়ার আলোড়ন, উদ্দীপনার কথা :

যাপিত জীবনের যেকোনো ঘটনাপ্রবাহ, সংকট, অবিচার-অনাচার, নির্যাতন- নিপীড়ন আমাদের মনোরাজ্যে কষ্ট জাগাতে পারে, ক্রোধের সঞ্চার করতে পারে, বিদ্রোহী-বিপ্লবী করতে পারে অথবা ভয় পাইয়ে আমাদেরকে কুঁকড়ে দিতে পারে। এসব হচ্ছে আবেগের আলোড়ন। ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা আমাদের আবেগের মধ্যে উত্তাল ঢেউ তুলতে পারে। এজন্য প্রয়োজন বাইরের উদ্দীপক। দেহের ভেতরের উদ্দীপকের কারণেও আবেগ সৃষ্টি হতে পারে। আবেগের একটা ব্যক্তিগত অনুভূতি থাকে, একটা শারীরবৃত্তীয় বোধ থাকে, একটা প্রকাশিত অভিব্যক্তি থাকে।২

আবেগ এবং মানুষের ভেতরের চালিকাশক্তি (Inner Force) বা জীবনীশক্তি (Motivational Force) বা প্রেষণার কথা বুঝতে পারলে আমরা সহজে বিদ্রোহী কবিতার ভেতরের মনোজগৎ দেখতে পাব, মনস্তত্ত্বটা বোঝার সুযোগ পাব ?

‘বিদ্রোহী’ কবিতার রচনার প্রকৃত সময় ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ।… দোয়াতে বারে বারে কলম ডুবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তার হাত তাল রাখতে পারবে না, এই ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেন্সিলে লিখেছিল।৩

এভাবে লিখতে গেলে ব্রেনের গতিসঞ্চারী সংকেত বাধা পেতে পারে। তাই, একটানে লেখার জন্য নজরুল প্রথমে কবিতাটি পেন্সিলে লিখেছিলেন বলে ধরে নিতে পারি আমরা। এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান। এ-তথ্যটাও তাঁর স্বতঃউৎসারিত কাব্যসত্তা এবং তাঁর ভেতরে প্রবলভাবে আসন গেড়ে বসা দ্রোহ আর বিদ্রোহীসত্তার স্বরূপ এবং অসাধারণ কল্পনাশক্তি আর সৃজন ক্ষমতার আলোর উদ্ভাস ছড়িয়ে দেয় আমাদের সামনে।

২.

১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (২২ পৌষ, ১৩২৮) বিজলি পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় কবিতাটি। এছাড়া, মোসলেম ভারত, প্রবাসী, সাধনা, ধূমকেতু-এসব পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। ওই সময় বিদ্রোহী কবিতায় কবির আত্মগত বিচিত্র ভাবোচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভেসে সাহস, সত্য ও সুন্দরকে আঁকড়ে ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর খুঁটি পেয়ে যায় উপমহাদেশের বাঙালি সমাজ। বাংলাসাহিত্যে মাইলফলক তৈরি হয়ে যায় ওই সময়ই।

সৎ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী ও অসাম্প্রদায়িক মানবীয় চেতনার জীবনদর্শন নজরুলের মধ্যে প্রবল প্রলয়ের ঢেউ তোলে। শব্দের স্রোতে সেই ঢেউয়ের চূড়ায় বসে কাজী নজরুল ইসলাম মূলত বিদ্রোহ করেছেন অসত্য, অন্যায় ও অমঙ্গলের বিরুদ্ধে। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে মুক্তি ঘটেছে মানুষের শৃঙ্খলিত ব্যক্তিসত্তার। একইসঙ্গে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের শিল্প-প্রতিনিধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নজরুলের ‘আমি’, ‘মম’, ‘আমিত্ব’; আর এ-বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর পেন্সিল প্রকাশ ঘটিয়েছে শৃঙ্খলিত-নিপীড়িত মানুষের আমিত্বের ভেতর লুকিয়ে-থাকা মুক্তিকামী চেতনাকেও। বিদ্রোহী কবিতার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গভীরে ঢুকতে হলে নজরুলের ওই আমিত্ব-র উৎস খুঁজতে বিদ্রোহী কবিতা লেখার আগে তাঁর ফেলে-আসা সময়কালটার (১৮৯৯-১৯২১ইং) দিকেও নজর দিতে হবে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার স্রষ্টা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪১ সালে বাকরুদ্ধ হয়ে যান। তারপরও প্রায় ৩৫ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। নজরুলের সৃজনশীল জীবনকালকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করতে পারি আমরা:

তিনি ১৯১২ সাল পর্যন্ত শৈশবকালে চুরুলিয়ায় ছিলেন। আসানসোলেও কিছুদিন কাটিয়েছেন। পুলিশ সাব- ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ এবং তাঁর স্ত্রী মিসেস শামসুন্নেসা খানমের ঘরেও কিছুদিন কাটিয়েছেন। তাঁদের উৎসাহে, ‘দুখু’র সৃজনশীলতার আলামত টের পেয়ে পড়াশোনা করার জন্য তাঁকে বড়ো ভাই সাখাওয়াত উল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার কাজীর শিমলা গ্রামে (তাঁকে ছেলেবেলায় দুখু নামে ডাকা হতো)।

মা জাহেদা খাতুন তাঁকে নুরু নামে ডাকতেন; এ নামেও তাঁর পরিচিতি ছিল। ত্রিশালে দুখু কাটিয়েছেন এক বছর (১৯১৩-১৯১৪ ইং)। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেছেন দরিরামপুর স্কুলে। সপ্তম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন। জন্মের পর থেকে বড়ো হওয়ার পথে পদে-পদে বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন, যেমন অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন, অবহেলা দেখেছেন;  তেমনি মমতাও পেয়েছেন; তা তাঁর শৈশবের বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিল।

দরিরামপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহিমচন্দ্র খাসনবিশ ও বাংলার পণ্ডিত মশাই দুখুর স্বতঃউৎসারিত শব্দচয়নের প্রমাণ পেয়ে চমকে উঠেছিলেন। পরীক্ষায় রচনা লিখতে দেওয়া হয়েছিল। গদ্যের পরিবর্তে ‘বর্ষা’র ওপর পদ্যে পরীক্ষার খাতায় বিরাট এক রচনা লিখে ফেলেন হলে বসেই। তা দেখে সবাই চমকে উঠেছিলেন।

দরিরামপুর থেকে ফিরে ভিক্টর ইনস্টিটিউটে কিছুদিন পড়াশোনা করে, স্কুলটি উঠে যাওয়ায় রানীগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ স্কুলে তিন বছর পড়াশোনা করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম (১৯১৩-১৯১৭ ইং)। স্কুলের প্রধান শিক্ষক নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বেশি উৎসাহ দিয়েছিলেন। সেই স্কুলে তাঁর পরিচয় ঘটে শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটকের সঙ্গে। তিনি যুক্ত ছিলেন ‘যুগান্তর’ গোষ্ঠীর সঙ্গে। ‘অনুশীলন’ নামের আরেকটা গোষ্ঠী ছিল। সেই দুই গোষ্ঠী মনে করত সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আর কোনও উপায় নেই। নিবারণ ঘটকের চিন্তা-চেতনার প্রভাব নজরুলের কিশোরসত্তায় স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক বিশ্বাস ও বিপ্লবের চেতনার ছাপ রেখে গেছে বলে ধারণা করা হয়।

নজরুলের বন্ধু শৈলজানন্দের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ কেউ ভোলে না কেউ ভোলে (নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৮) থেকে জানা যায় ওদের বন্ধু পঞ্চুলাটের এয়ারগান নিয়ে পাখি শিকার করতে বেরিয়ে নজরুল আর শৈল গাছগাছালির দিকে এগিয়ে গিয়েও এগিয়ে গেল কবরস্থানের ভেতর। ওই সত্য ঘটনাকে ভর করে বর্তমান প্রবন্ধকার তাঁর দুরন্ত দুখু কিশোর উপন্যাসে একটি ছোট্ট আখ্যান তুলে ধরেন। ব্রিটিশবিরোধী নজরুলের বিপ্লবী-বিদ্রোহী সত্তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিধায় এখানে কয়েকটি লাইন তুলে ধরা হলো :

গাছগাছালির কথা বললেও সেদিকে পা বাড়াল না দুখু। এগিয়ে গেল কবরস্থানের ভেতর। সারি-সারি বেদির দিকে তাকিয়ে উল্লাসের আরও জোর বেড়ে গেল। ইটবাঁধানো বেদিগুলোই দুখুর লক্ষ্যস্থল বুঝতে পেরে শৈল কথা বলতে শুরু করল, ‘পাখি না মেরে বেদির দিকে বন্দুক তাক করছ কেন?’

‘দেখছ না, বেদির গায়ে পাথর খোদাই করা নেমপ্লেট বসানো’―বলতে-বলতে সে ফটাস ফটাস সিসার গুলি ছুড়তে লাগল বড়োলাট আর ছোটোলাটের বেদিতে। চুনকাম করা বেদির পলেস্তারা খসে যেতে লাগল, বেদির চেহারা বিকৃত করে জোর কদমে সামনে এগিয়ে দেখল ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আর এসডিওর কবর। সেখানেও ‘আক্রমণ’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

শৈল বলল, ‘একি দুখু! কী করছ?’

‘দেশের শত্রু ইংরেজদের গায়ে গুলি ছুড়ছি।’

‘এগুলো তো ইট-সুরকির দেয়াল। দেয়ালে গুলি ছুড়ে কি ইংরেজ মারা যায়?’

‘মারার মহড়া দিচ্ছি, হাত পাকা করে নিচ্ছি। তুমিও চালাও। নাও বন্দুক।’

শৈল বলল, ‘ওদের কী দোষ? বড়োলাট, ছোটোলাট তো চাকরি করে, কর্মচারী।’

‘কী! ওরা শোষক, ইংরেজদের দোসর। দোসরদেরও ছাড়ব না আমরা। ইংরেজমাত্রই আমাদের শত্রু। ওদের না-মারলে ইংরেজদের তাড়াতে পারব না, আমরা।’

অবাক হয়ে শৈল তাকিয়ে রইল দুখুর তেজোদীপ্ত মুখের দিকে। কোনো কথা বলতে পারল না সে।৪

এ সত্য আখ্যানের ভেতর দিয়ে আমরা দৃঢ়চেতা কিশোর দুখুকে আবিষ্কার করি। কেবল ইংরেজবিরোধী নয়; তাদের দোসরদের বিরুদ্ধেও তাঁর অটল, অনড় মনোভাব প্রত্যক্ষ করি। বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করতে পারি; একাত্তরে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনীর দোসরদের অপকর্মও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ নজরুলের দূরদৃষ্টি কেবল নির্দিষ্ট কালে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অনন্তকালেরই প্রতিনিধিত্ব করছে নজরুল-চেতনার মর্মকথা, মনস্তাত্ত্বিক আবেদন।

আবার আমরা দেখব একদিকে নিবারণচন্দ্র ঘটক স্কুল ছেড়ে গেছেন। অন্যদিকে ১৯১৭ সালে ৭০০০ সৈন্য নিয়ে ‘৪৯নং বাঙালি পল্টন’ প্রতিষ্ঠিত হলে হিন্দু যুবাদের পাশাপাশি কাজী নজরুল ইসলাম ও মাহবুব-উল আলমদের মতো তরুণ মুসলিম যুবারাও তাতে যোগ দেন। উদ্দেশ্য…ভারতীয়রা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে সামরিক অভিজ্ঞতা লাভ করবে এবং তার ভিত্তিতে একপর্যায়ে ব্রিটিশদের ভারতভূমি থেকে হটিয়ে দেবে। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নজরুলের সম্মুখ সমরে সক্রিয় অংশগ্রহণের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কেননা, তিনি করাচিতে ১৯১৭ সালের শেষভাগ থেকে ১৯২০-এর মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও রণক্ষেত্রে যাওয়ার আদেশ শেষ পর্যন্ত পাননি। কিন্তু তাঁর হতাশা তিনি মেটান তখন সংঘটিত হওয়া রুশ বিপ্লবে বলশেভিকদের বিজয় ও তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের গ্রিসের বিরুদ্ধে বিজয়ের ঘটনায় একাত্মতা প্রকাশ করে। নজরুলের যুদ্ধ-অন্তপ্রাণ দ্রুত যুদ্ধঅন্ত কাব্য ও গানে পরিণত হতে থাকে এবং ১৯২১ সালের অক্টোবরে ‘কামাল পাশা’ শীর্ষক কবিতার শব্দচয়ন একান্তই যুদ্ধসম্পৃক্ত বলা যায়। এর আগে সম্ভবত তিনি ‘আনোয়ার পাশা’ শীর্ষক বীরত্বসূচক কবিতাটি লেখেন, যে কবিতা দুটি অচিরেই নজরুলের জগদ্বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ (১৯২১) কবিতার বচনরীতির পটভূমি হিসেবে কাজ করে।৫

উপরের আলোচনা থেকে আমরা ধারণা পাচ্ছি: নজরুলের বোধ-উপলব্ধি-ব্যক্তিত্ব তথা ব্যক্তিসত্তা এবং নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার বুনিয়াদ বিষয়ে। এ-প্রসঙ্গে আমরা মনস্তাত্ত্বিক মতবাদের দিকেও তাকাতে পারি:

ফ্রয়েডিয়ান থিওরিতে জন্মের প্রথম পাঁচ বছর সময়কালকে ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলা হলেও নব্য ফ্রয়েডিয়ানদের মধ্যে কার্ল ইয়ুং পুরো জীবনকালকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য কথার প্রবর্তক।

অ্যাডলারসহ অন্য নব্য ফ্রয়েডিয়ানগণ ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে সঙ্গীদের সঙ্গে মেলামেশা, খেলাধুলা এবং যাপিত সামাজিক জীবনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। আর এরিকসন বয়ঃসন্ধিকালকে গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি।৬

এসব মনোবৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে আমরা দুখুর ছেলেবেলার লেটো গানের আসরে অংশগ্রহণ, ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুল এবং শিয়ারশোল রাজ স্কুলে পড়াশোনার সময়কাল, শৈলজানন্দসহ অন্য বন্ধুদের সঙ্গে নজরুলের সখ্য-খেলাধুলা, আনন্দ-বেদনার অধ্যায় এবং স্কুলের শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটকসহ অন্যদের প্রভাবে তাঁর মধ্যে যে ব্যক্তিত্বের বুনিয়াদ তৈরি হয়েছিল নজরুলের বিদ্রোহীসত্তা বিবেচনায় সেটাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

৩.

‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মনস্তত্ত্বের স্বরূপ সন্ধান করতে গেলে প্রথমে আমরা কয়েকটি শব্দের বিশ্লেষণ বোঝার চেষ্টা করব। আর শব্দগুলো হলো :

‘বল’, ‘বীর’, ‘মম’, ‘আমি’।

মূলত শব্দ কিংবা ছন্দবিন্যাস ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ভেতর থেকে এক প্রাণসঞ্চারী ভাবোচ্ছ্বাস জাগিয়ে তোলে; আবেগের প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করে। তা কেবল ফাঁকা আওয়াজ নয়, ক্ষণস্থায়ী জয়ধ্বনি বা কেবলই বিপ্লবী সত্তার উদ্গিরণ নয়―তার স্থায়ী প্রভাব শতবর্ষ পরেও আমাদের মনোজগত নাড়িয়ে দেয়, কাঁপিয়ে দেয়, পরম আত্মবিশ্বাসী হওয়ার শক্তি সঞ্চার করে। অত্যাচারী-মিথ্যাবাদী এমনকি তোষামোদকারীর বিরুদ্ধেও সোচ্চার করে তোলে আমাদের মনোজগৎ। নজরুলের এই দ্রোহ কেবল আধিপত্যবাদীদের অপশাসন বা জুলুমের বিরুদ্ধে নয়, সমাজের ক্ষত সৃষ্টিকারী প্রবঞ্চকদের বিরুদ্ধেও তাঁর শব্দ-তরবারি কঠিন আঘাত হানে। তার প্রাসঙ্গিক গুরুত্ব এখনও আমরা দেখতে পাই বিশ্বজুড়ে। প্রশংসা ও প্রসাদের লোভে না-ছুটে, নিজের সত্য ও সুন্দরের সাধনাকে বিক্রি না-করে দিয়ে, সত্যদ্রষ্টা নিজের ঋষি-আত্মাকে গৌরবদীপ্ত করার চেতনাকেও ঋদ্ধ করে  কবিতাটি; পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা ঢেলে দিয়েছে তখনকার সময়ের মানুষের মনে। বর্তমান সময়েও তা প্রাসঙ্গিক। ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক থাকবে। এ-কবিতার আহ্বান আর কেবল একটি নির্দিষ্ট যুগের ভারতবর্ষের মানুষকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান নয়, সর্বযুগের সমাজে শোষিত-বঞ্চিত অত্যাচারিত মানুষের জন্য বিশ্বজনীন আহ্বান হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে বলা যায়: এটি একটি আন্তর্জাতিক বোধ-জাগানিয়া কবিতা। এই বোধ বিশ্বজুড়ে সমাজের পর সমাজে নির্যাতিত-নিপীড়িত, লাঞ্ছিত মানুষেরই প্রতিবাদী জাগরণের বোধ। এ-বিশ্লেষণের আলোকে নজরুলকে একজন সমাজবিজ্ঞানীও বলা যায়।

বিদ্রোহী কবিতার মনস্তাত্ত্বিক অনুষদ খুঁজতে গিয়ে এ-কবিতার প্রবল বিদ্রোহী সত্তার জাগরণ, মনোজগতের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ―‘সাহস’, ‘দুরন্ত সাহস’, কিংবা ‘আত্মবিশ্বাসী’ এ ধরনের কয়েকটি শব্দের ব্যবহার উল্লেখ করতে চাই। কবি আপন সত্তার ভেতর থেকে নিপুণ ঢঙে ব্যবহার করে গেছেন প্রতীকী শব্দসম্ভার। প্রতিটি শব্দের ভেতর দিয়ে তা দ্রোহ আর বিদ্রোহের দাপট সৃষ্টি করে, গতি সঞ্চার করে। এসবই এ-কবিতার অনন্য সাহিত্যশিল্প, সাহিত্য-শস্যকণা, মনস্তত্ত্বের ভেতরের শক্তি, জোশ।

শুরুর শব্দটা হচ্ছে ‘বল’। দ্বিতীয় শব্দটা ‘বীর’। কবি কাকে বলতে বলছেন? কে বীর ?

শুরুর দুটো শব্দই বিদ্রোহী কবিতার ফাউন্ডেশনে সহস্র মণ ওজন চাপিয়ে দিয়েছে। সেই চাপে ভিতের গহন থেকে উৎসারিত হয়েছে অসাধারণ বিপ্লবী সত্তার উদ্গিরণ।

মূলত উত্তমপুরুষে কথক কবি, নিজেকেই দীপ্ত শব্দস্বরে ‘বলার’ জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। আবার, উত্তমপুরুষ কথক হয়েও এ-আহ্বান কেবল নিজের জন্য সীমাবদ্ধ রাখেননি। এমনভাবে তা উচ্চকিত হয়ে ওঠে যে, প্রত্যেক পাঠক, সকল ‘জনগণ’ শব্দের বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে স্বয়ং উত্তমপুরুষ হয়ে যান। সকলে একযোগে ‘আমি’ হয়ে যান অর্থাৎ কোটি কোটি‘ জনগণ ‘ আমি’ হয়ে গিয়ে জোরালো আমিত্বের স্বর সৃষ্টি করে, জাগরণ সৃষ্টি করে, গণজোয়ার সৃষ্টি করে; ‘আমি-সমুদ্র’ সৃষ্টি করে। এই ‘আমি-সমুদ্র’ কখনও নিঃশেষ হবে না, রয়ে যাবে মানবকল্যাণের জন্য অনন্তকাল। নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলবেই, বলতেই থাকবে।

প্রত্যেক পাঠক উত্তমপুরুষের দ্রোহে-বিদ্রোহে ঝলসে ওঠেন। এই ঝলসে ওঠার মধ্য দিয়ে মানুষের প্রেষণার শক্তি নাড়া খায়, আবেগে আলোড়ন ওঠে, চিন্তার জগৎ আশার আলোয় ভরে যায়। এভাবে জনগণের মনোজগৎ জেগে ওঠে; আর এই ‘আমি’র মধ্য দিয়েই বিদ্রোহী কবিতার সারকথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে, হচ্ছে, যুগে-যুগে হতে থাকবে। এখানেই এ-কবিতার মনস্তত্ত্বের অনন্যতা স্পষ্ট হয়ে যায়।

৪.

কবিতার দ্বিতীয় লাইনে/চরণে আমরা দেখব তিনটি নতুন শব্দ : ‘উন্নত’, ‘মম’ ও ‘শির’ ।

এখানে ‘মম’ অর্থ আমার, শির অর্থ মস্তক বা মাথা। কবি মাথা উঁচিয়ে চলার কথা বলছেন। অবনত নয়, উদ্যত মস্তকে উঁচুস্তরে উঠে নিজেই দেখছেন চারপাশ, দেখার আহ্বানও জানাচ্ছেন প্রতিটি ‘আমি’কে, অচেতন জনগণের প্রত্যেককে যারা শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাম্রাজ্যবাদী অপশাসকদের ভারবাহী এবং অবনত মস্তকের তোষামোদকারী মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তিতে/জাতিতে পরিণত হয়ে গেছেন, তাদেরকেও মেরুদণ্ড সোজা করে মাথা উঁচিয়ে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন। এটা কেবল আবেগঘন আহ্বান নয়; এই শব্দবিক্ষেপের মধ্যে লুকিয়ে আছে মনস্তত্ত্বের প্রবল আত্মবিশ্বাস (self-confidence), নিজেকে যথাযথ প্রত্যক্ষ করে (Perception) চারপাশকে মূল্যায়ন করে (Cognitive appraisal) নিজের চিন্তা-ভাবনার আলোকে জ্বলে-ওঠার আহ্বান, প্রেষণাশক্তিকে নাড়া দেওয়ার আহ্বান।

ভাবোচ্ছ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভাব, চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা; আর তার প্রকাশের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস থাকে তা ‘আবেগ’। চিন্তন-জগতের মূল অনুষদ এবং অভিজ্ঞতালব্ধ মনোভাব যখন নিয়ন্ত্রিত আবেগের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখন জয় ছিনিয়ে আনা সহজ হয়।

এসব অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই নিজের বোধের জগৎ থেকে, উপলব্ধির গভীর থেকে মনোজাগতিক বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়-আশয় স্বতঃস্ফূর্ত ধারায় উঠে এসেছে নজরুলের প্রবল-প্রতাপশালী মন-ভুবনের গহন স্তর ভেদ করে।

কবিতার ভেতর উত্তমপুরুষে কবি বলছেন, ‘শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির।’ কবি নিজের মাথাকে অবনত দেখছেন না, দেখছেন তাঁর সামনে অবনত হয়ে গেছে ওই হিমালয় চূড়া। শিখর অর্থ শীর্ষ চূড়া, আর হিমাদ্রি এখানে হিমালয় অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

কবি প্রবল আত্মপ্রত্যয়ী, শব্দের স্ফূরণ কী মহাশক্তিধর! কী বেগবান জোশের প্লাবন! তারই প্লাবনে-উচ্ছ্বাসে নিজের সামনে হিমালয়কে নত দেখতে পেলেন কবি!

দেখার মতো করে দেখতে হয়। শির সোজা করে সরাসরি তাকিয়ে দেখে নিতে হয় চারপাশ। এ-দেখার জন্য মনের জানালার একটা জানালা হচ্ছে চোখ। চোখ দিয়ে আমরা দেখি। দৃশ্যমান জগতের সবকিছু চোখ দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে গিয়ে আমাদের নতুন বোধ তৈরি করে, উপলব্ধি তৈরি করে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে দৃশ্যমান সবকিছু বিশ্লেষিত হয় মস্তিষ্কে।

‘নেহারি’ শব্দটা বিস্ময়করভাবে প্রয়োগ করে পাঠক হিমালয়-শৃঙ্গের ওপর দিয়েও ছুটতে পারে। ক্যামেরার মতো চোখ দৃশ্যমান বস্তুর ইমেজ ধরে, তা চালানও করে দেয় ব্রেনে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্রেন। তারপর আমরা বস্তুটিকে দেখতে পাই। এটা বিজ্ঞান। নজরুল কী অবলীলায় বলে গেলেন ‘শির নেহারি’!

আসলে বাইরের মাথা দিয়ে আমরা দেখতে পাই না, মাথার ভেতর যে মস্তিষ্ক আছে তাই-ই চোখের মাধ্যমে আমাদের দেখায় সমাজের চারপাশ, বিশ্বজগৎ। কী বিজ্ঞান!

কীভাবে মনস্তাত্ত্বিক মহাসমুদ্রের শত-সহস্র কল্লোল নজরুল দুটো শব্দে ভ’রে রেখে দিয়ে গেছেন! ভাবতে গেলে আলোচকের মনোজগতের সবক’টি জানালা সচকিত হয়ে ওঠে। অন্য জানালাগুলো হচ্ছে কান, ত্বক, জিব এবং নাক।

কবি নজরুল কি কেবল বিদ্রোহী কবি? নাকি তাঁর মধ্যে প্রবলভাবে সক্রিয় ছিল এক গুপ্ত বিজ্ঞানী? সমাজ-সংস্কারক সমাজবিজ্ঞানী? প্রশ্ন জাগে আলোচকের মনে।

৫.

পরবর্তী পঙ্ক্তিগুলোতে আমরা দেখছি :

বল  মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’

       চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’

       ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া

       খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,

       উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর!

 মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!

              বল        বীর –

              আমি   চির উন্নত শির!

আগের পঙ্ক্তিসমূহে প্রকৃতিবাচক শব্দ ‘শিখর’, ‘হিমাদ্রি’র মতো এ-স্তবকেও একই ধরনের শব্দ ‘মহাকাশ’, ‘চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা, ‘ভূলোকে-দ্যুলোক’, ‘গোলক’ ‘খোদার আসন-আরশ’ ব্যবহার করেছেন। একইসঙ্গে ‘বিশ্ববিধাত্রী’ ও ‘রুদ্র-ভগবান’ এসব দেবত্ববাচক শব্দ ব্যবহার করে কবিতার মাধুর্য ও শিল্পবোধের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। নিজস্ব জোশ ও মহাপ্রতাপের জয়গান গেয়েছেন কবি। এসব শব্দের ভেলায় চড়ে পাঠকের ভেতরের দৈবশক্তি, সামনে চলার অনুপ্রেরণা-গতি-স্রোত উসকে ওঠে, জাঁতাকলে পিষ্ট জীবন থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর উৎসাহ-উদ্দীপনা টের পায় জনগোষ্ঠী। নতুন জীবনের চাহিদার ফর্দ তৈরি করে। আশার আলো ঢেলে দেয় তাদের বোধের জগতে। এসব উপাদান হচ্ছে মনোজগতের বিপুল বিস্ময়কর শক্তি, প্রেষণার প্রাণরসায়ন। মনস্তত্ত্বের ভাষার মোটিভেশনাল ফোর্সের মূল অনুষদ অর্থাৎ নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মূল স্রোতে প্রেষণাকে উদ্দীপ্ত ও আলোড়িত করার গোপন স্রোত বয়ে গেছে জলোচ্ছ্বাসের মতো।

আমরা দেখার সুযোগ পেলাম নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার আবেগ-উচ্ছ্বাস, ভাবনা-উচ্ছ্বাস এবং প্রেষণায় গতি-সঞ্চারী টান। একইসঙ্গে ‘কল্পনাশক্তি’ তথা কল্পনাপ্রতিভাও।

এই স্তবকসহ পুরো কবিতার পরতে-পরতে বিপুল ও বিস্ময়কর কল্পনাপ্রতিভার পরিচয় পেয়ে যাই আমরা।

মহাকাশ ফেড়ে, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা ছাড়িয়ে ভূলোক-দ্যুলোক গোলক ভেদ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কাব্যশক্তির গতিময়তার জোরে তা সম্ভব। এ শক্তি মনের কল্পনাপ্রতিভায় শক্তিশালী ডানা জুড়ে দেয়। বর্তমান কালের ওয়েবপোর্টালের বাহনের মতো কল্পনার বাহনও খোদার আরশ ছেদ করে কবিকে যেমন তুমুল জোশে টেনে নিয়ে যায়, তেমনি পাঠককেও।

এই কল্পনাশক্তিও আবেগ-চিন্তা- ভাবনা-প্রেষণা-প্রত্যক্ষণের মতো মনের অনুষদের কলকব্জা। বাড়তি কথা হলো কল্পনাশক্তি মূলত মেধা বা প্রতিভারও এক বড় উপাদান। যার কল্পনাশক্তি যত প্রখর, তাঁর সৃজনক্ষমতাও তত উজ্জ্বল। শুরুতে এ সারকথা তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে মনোবৈজ্ঞানিক উপাদানের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে।

এই স্তবকের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমাদের মনে রবীন্দ্রভাবনার উদয় ঘটে। রবীন্দ্রনাথ বলছেন:

তব নাম লয়ে চন্দ্র তারা অসীম শূন্যে ধাইছে―

         রবি হতে গ্রহে ঝরিছে প্রেম, গ্রহ হতে গ্রহে ছাইছে।

অসীম আকাশ নীলশতদল তোমার কিরণে সদা ঢলঢল,

        তোমার অমৃতসাগর-মাঝারে ভাসিছে অবিরামে ॥

এটি পূজা পর্যায়ের প্রেমভক্তির রবীন্দ্রসংগীত হলেও কবি কল্পনার মাধ্যমে সূর্য থেকে প্রেম ঝরতে দেখছেন, গ্রহান্তরে তা ছড়িয়ে পড়তে দেখছেন। এই ‘কল্পনাশক্তি’ ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল কাব্যসাহিত্যে সৃজন খেলায় বেপরোয়াভাবে মেতেছিলেন। তাঁদের উৎস-মহড়ায় ঋদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্য। কল্পনাশক্তির যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যেমন সমৃদ্ধ ফলাফল অর্জিত হয়, একইসঙ্গে অভিভূত হতে হয়। পাঠক মহাবিস্ময়ের অনুভূতি লাভ করে কেবল স্তব্ধ হয়ে থাকেন না, তার নিজের অদম্য প্রাণচাঞ্চল্যও জেগে উঠতে পারে সৃষ্টিশীল উন্মাদনায়। এর সবই পাঠককে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল উপহার দিয়ে গেছেন সৃজনশীল জগতে তাঁদের কল্পনার ওয়েবপোর্টালে ভাসিয়ে দিয়ে। আবারও  বলা যায়: কল্পনা হচ্ছে মেধার অঙ্গ, আর মেধা হচ্ছে মনের অঙ্গ; মনস্তত্ত্বের অন্তর্নীল উপাদান। এর মধ্য দিয়েই বিদ্রোহী কবিতার ভেতর দ্রোহের মনস্তত্ত্বের সন্ধান পাচ্ছি।

৬.

প্রাথমিক শৈশব থেকে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটতে থাকে। আবার গবেষণায় দেখা গেছে, দু’বছর বয়স থেকে কল্পনাপ্রতিভার বিকাশ শুরু হয়ে যায়। পাঁচ বছরের শিশু-কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে। শিশুর মন থেমে থাকে না। কল্পনা চলতেই থাকে। কল্পনার মাধ্যমে আনন্দ পেয়ে থাকে, নানা রঙে রঙিন হতে থাকে তাদের কল্প-জগৎ।৮

এজন্য বড়োবেলার মনোজগতের কল্পনাপ্রতিভা ও সৃজনশীল প্রতিভা বুঝতে হলে চোখ ফেরাতে হবে কবির শৈশবের দিকে:

ছেলেবেলায় দুখুর জীবনে আমরা দেখি স্বভাব কবির স্বতঃউৎসারিত কাব্য-ছন্দ-গানের সুর। বাঁশিতে সুর তোলার অনন্য ক্ষমতার কথাও জানি। মঞ্চে উঠে পূর্ব-প্রস্তুতি ছাড়া একদম শৈশবে লেটো গান ও  কবি গানে অংশ নিতেন কবি। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর শৈশবের বুনিয়াদে অন্যরকম রশদ ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার আলোকে সুন্দর, সৎ মন নিয়ে নজরুল বড় হতে পেরেছেন।

হাজী পালোয়ানের কবরে খাদেম হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বড় খাদেমের টাকা সরানোর অনিয়মের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল দুখুর মন। দুর্দমনীয় সেই তেজের বিকিরণ ঘটেছিল আপন মহিমায়। তাঁর কল্পনাপ্রতিভা, সৃজনপ্রতিভা এবং অনিয়ম-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ঘটনা আমরা দেখতে পাই তাঁর শৈশব-কৈশোর বয়সজুড়ে। নানা ঘটনায় তাঁর বিদ্রোহী সত্তার এসব প্রাসঙ্গিক বুনিয়াদও আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার স্বরূপ সন্ধান করতে হলে :

নানা বৈশিষ্ট্য শিশুকাল থেকে মানুষের ব্যক্তিত্বের ভিত গড়ে দেয়। বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত গুণ বা গড়ন সহজেই একটি শিশু থেকে অন্যটিকে পৃথক করে দিতে পারে। আসলে ব্যক্তিত্ব হচ্ছে ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত আচরণ যা অন্যরা মূল্যায়ন করতে পারে। এ আচরণের মোড়কে লুকিয়ে থাকে অনন্যসাধারণ মানসিক প্রক্রিয়া, যা মানুষের বাইরের আচরণ করে তোলে অনন্য।… শিশুর আত্ম-উপলব্ধি, নিজস্ব ধারণা (self-concept) এবং বৈশিষ্ট্যের (traits) মিলিত ধারায় অনন্যসাধারণ আচরণ প্রতিফলিত হয়। ব্যক্তিত্বের গড়ন-ভিত দাঁড়িয়ে যায়। একটা চাকার সঙ্গে ব্যক্তিত্বের কাঠামোর তুলনা করা যেতে পরে―চাকার স্পোকসগুলো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য এবং কেন্দ্রস্থলটি হচ্ছে নিজের প্রতি নিজস্ব ধারণা, উপলব্ধি। এসব শিশুর বিশ্বাস এবং মানসিক প্রক্রিয়াগুলো (mental processes) প্রতিফলিত করে।৯

চাকা ঘুরতে থাকে। এগোতে থাকে সামনে। মানবজীবনের গতিও এমন। self-concept দিনে দিনে পরিণত হয়ে নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করে, সমৃদ্ধ হয়। কেউ কেউ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। কেউ হয় ভীতু। আত্মবিশ্বাসী শিশুদের যেকোনো পরিস্থিতি, শুভ-অশুভ, যা-ই হোক মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বেশি, নিজেকে পদে পদে দক্ষ করে তোলে তারা, তুলতে পারে।

 …নিজের দক্ষতা ও সামর্থ্যরে ব্যাপারে যৌক্তিক বিশ্বাস ও মনোবল শিশুর আত্মমর্যাদাবোধও সুসংহত করে, সর্বোপরি সার্বিক সফলতার পথে টেনে নিয়ে যায়।১০

ইতোমধ্যে আমরা নজরুলের ‘আমি’, ‘মম’, ‘আমিত্ব’ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছি। এসব হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক অনুষদ, নিজের প্রতি নিজের ধারণা বা self-concept; ইতিবাচক জয়ধ্বনি।

জন্মের পর থেকে চুরুলিয়া গ্রাম, আসানসোলের জীবন, দরিরামপুর স্কুলের জীবন (১৯১৩-১৯১৪), রানীগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ স্কুলে পড়াশোনার সময় (১৯১৫-১৯১৭) এবং সৈনিক জীবনের (১৯১৭-১৯২০ এর মার্চ পর্যন্ত) সময়কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে-করে, নানা বাধা ডিঙ্গিয়ে, নানা ধরনের অবহেলা-উপেক্ষা ভোগ করে-করে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হতে-হতে সোনা হয়ে ঝলসে উঠেছেন নজরুল এবং গড়ে উঠেছে তাঁর দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের self-concept। তাঁর ঐশ্বরিক দক্ষতা আপনজগতের ভেতর থেকে শাণিত হয়েছে। সেই দক্ষতার স্বর্ণাভ আলোর বিকিরণ ঘটে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে পেন্সিলের দুরন্তগতিতে মূর্ত হয়ে-ওঠা শব্দজলোচ্ছ্বাসের মাধ্যমে; আর তাঁর ‘আমি-সত্তা’র শক্ত ও প্রবল আত্মবিশ্বাসী ভিত ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে:

               আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,

মহা-      প্রলয়ের আমি নটরাজ,

               আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!

আমি   মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,

আমি   দুর্বার,

আমি   ভেঙে করি সব চুরমার!

আমি   অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,

আমি     দ’লে যাই যত বন্ধন,

               যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!

আমি     মানি না কো কোন আইন,

আমি     ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি,

               আমি টর্নেডো, আমি ভীম

               ভাসমান মাইন!

আমি     ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড়

                অকাল-বৈশাখীর

আমি     বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত

                বিশ্ব-বিধাত্রীর!

এ যে এক ভিন্ন উচ্চতার কণ্ঠস্বর। এর ভাষা, ছন্দ, আঙ্গিক ও ভাবনাতত্ত্বে নতুনত্বের জয়গান স্পষ্ট। অবাধ আবেগ প্রকাশের ঝড় কোথাও থেমে যায়নি, পথভ্রষ্ট হয়নি, নিয়ন্ত্রণহারা হয়নি। ছন্দঝড় আর ভাবনাঝড় যেন একালের নার্গিস, সিডর, হারিকেন কিংবা টর্নেডোকে হার মানায়। তবে, ছন্দের ঝড় বা শব্দঝড় কখনও প্রকৃতির ঝড়ের মতো এলোমেলো হয়ে যায়নি, অন্যায়-অবিচার, অনিয়মের বিরুদ্ধে কবিতার উদ্দাম-উচ্ছ্বাস, প্রাণশক্তি সঠিক টার্গেট তথা অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন আর শোষণের মসনদে আঘাত হেনেছে।

“‘আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস’; ‘আমি ভেঙে করি সব চুরমার’ আমি টর্নেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন”―এসব ছন্দময় বাক্য যেন সমকালীন যুদ্ধের আকাশে উড়ে-আসা একেকটা মিসাইল, একেকটা স্কাড, একেকটা পেট্রিয়ট যা আক্রমণ করতে ছুটে-আসা স্কাড কিংবা মিশাইলও ধ্বংস করে দেয়।

এই ছন্দ, ভাষা, ভাবনা, আর আবেগতত্ত্বের মধ্য দিয়ে মনস্তত্ত্বের কী কী অনুষদ প্রকাশ পেয়েছে? এর উত্তরে বলা যায় ক্রোধ-ঘৃণা-ক্ষোভ এসব আবেগ, আবেগ প্রকাশের স্বাতন্ত্র্য ঝংকার, ভক্তি, বিস্ময় নিয়ে আমিত্বের সিংহাসনে চড়ে সফল সম্রাটের মতো কবি ঝিমিয়ে-পড়া জাতীয় মননের প্রাণশক্তি জাগিয়ে মূলত মোটিভেশনাল ফোর্স বা ভেতরের জীবনীশক্তিকে উজ্জীবিত করেছেন। শব্দজোয়ারের উদ্গিরণে বেপরোয়া- উদ্দাম-উচ্ছ্বাস মেরুদণ্ড ভেঙে-যাওয়া জাতির কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর নতুন জোশ-শক্তির স্রোত তৈরি করে। এই স্রোত লক্ষ্যমুখী হয়ে ছুটেছে। চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে ব্রিটিশ শাসনের অবসান, শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি। এই টার্গেট থেকে নজরুল চ্যুত হয়েছেন বলে মনে হয়নি। কিন্তু নজরুলকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সৈয়দ আলী আহসানের বক্তব্যের একাংশে আমরা দেখতে পাই:

এ-কাব্যে আমরা কোনো শিল্প-কুশলী কবিকে আবিষ্কার করি না। কিন্তু একজন চঞ্চল, সাহসী এবং নিঃসংশয় ভাষণের অধিকারী কবিকে আবিষ্কার করি। অগ্নিবীণা কোনো মহৎ সৃষ্টি নয় এবং এর মধ্যে কাব্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য পঙ্ক্তির সংখ্যাও খুব কম। কিন্তু অগ্নিবীণা বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। তিনি কৃপণের ধনসঞ্চয়ের মতো শব্দকে আড়াল করেননি। তিনি বেহিসাবী যুবকের মতো যৌবনের উচ্ছ্বাসে শব্দকে আপন ধনভাণ্ডারের মতো উজাড় করে দিয়েছেন। অগ্নিবীণায় লক্ষ করি যে, এখানে শব্দ নির্বাচিত নয়, তৎসম, তদ্ভব এবং দেশজ শব্দের মধ্যে কোনো জাতি বিচার নেই; একটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ধূলিকণা, তৃণগুচ্ছ এবং বৃষ্টির বিন্দু যেভাবে একসঙ্গে চতুর্দিকে ছড়িয়ে যায়, তেমনি অগ্নিবীণায় কবির শব্দগুলো নিশ্চিন্তে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনোরূপ বিচার-বিবেচনা না মেনে চিত্তের স্বাধীন স্ফূর্তিতে নজরুল ইসলাম অগ্রসর হয়েছিলেন। এভাবেই অগ্নিবীণায় বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে আমরা একজন নতুন নায়ককে পেলাম।১১

মনস্তাত্ত্বিকভাবে এখানে জনাব সৈয়দ আলী আহসানের বক্তব্যকে অশ্রদ্ধা না-করেও বলা যায়, নজরুল ‘কৃপণের ধন সঞ্চয়ের মতো শব্দকে আড়াল করেননি।’ ঠিক আছে।

‘তিনি বেহিসাবী যুবকের মতো যৌবনের উচ্ছ্বাসে শব্দকে আপন ধনভাণ্ডারের মতো উজাড় করে দিয়েছেন’,―কিন্তু এ-উচ্ছ্বাসের ঝড় ছুটেছে লক্ষ্যমুখী।

‘বেহিসাবী’ যুবক শব্দভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছেন তা-ও ঠিক। তবে, পার্থক্য হচ্ছে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ধূলিকণা, তৃণগুচ্ছ এবং বৃষ্টির বিন্দু যেভাবে একসঙ্গে চতুর্দিকে অর্থহীনভাবে ছড়িয়ে যায়, নজরুলের শব্দরা বিপুল শক্তির উদ্ভাসে কেবল ছড়িয়ে যায়নি, শব্দঝড় এলোমেলো হয়ে যায়নি বরং সুশৃঙ্খলভাবে একটি লক্ষ্যেরই পতাকা উড়িয়েছে; আর তা হচ্ছে মুক্তি, স্বাধীনতা, ঔপনিবেশিক শাসনের অবলুপ্তি; স্বৈরশাসক এবং যুদ্ধবাজ মানব নিধনকারী রাষ্ট্রের পরাজয়। যুগ-যুগান্তরের উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল থেকে তখনই ঘটবে মানবতার মুক্তি।

এত বেপরোয়া প্রকাশের মধ্যে দিয়ে ছুটতে গিয়েও কখনও তাঁর তৎসম, তদ্ভব, দেশজ শব্দ, কখনও তাঁর শক্তির উৎস দেবত্ববাচক শব্দ (বিশ্ব বিধাত্রী’, নটরাজ, ধূর্জটি, ইত্যাদি) কিংবা প্রকৃতিবাচক শব্দ (সাইক্লোন, বৈশাখী ঝড়, ধ্বংস, টর্নেডো, ইত্যাদি) কিংবা প্রতীকী শব্দ (অনিয়ম-উচ্ছৃঙ্খল) ইত্যাদি প্রকাশশৈলীতে তাল হারায়নি, এলোমেলো হয়ে ধূলিকণার মতো তা উড়েও যায়নি, মূল লক্ষ্য থেকে সরে যায়নি, চ্যুত হয়নি। এই আবেদন সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। কালজয়ী। বরং সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলছি: আমরা এখানেই অনন্য প্রতিভাধর শিল্প-কুশলী কবি নজরুলের বিপুল মেধা আর তাঁর আবেগের মধ্যে, প্রেষণার মধ্যে অসাধারণ এক সমন্বয়ের প্রকাশভঙ্গি দেখতে পাই। যখন মানবমনের লক্ষ্যমুখী যাত্রায় চিন্তন, আবেগ-প্রেষণার যুগপৎ সুশৃঙ্খল সমন্বয় ঘটে, তখন যেকোনো মানুষ সহজেই তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। স্বভাবজাত কবির মেধার গোপন ভাণ্ডার ফুঁড়ে আকাশের সূর্যের মতো সত্য হয়ে বেরিয়ে এসেছে মনস্তত্ত্বের এসব উপাদান।

নজরুলকে কি কেবল আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাসের কবি বলব? না। আমি তাঁকে একজন মেধাবী বিজ্ঞানীও বলি, বলতে চাই:

মোটিভেশন বা প্রেষণার মূল মনস্তাত্ত্বিক উপাদান হচ্ছে উৎসাহ-আকাক্সক্ষা- চাহিদা। এসব মানুষের লক্ষ্যমুখী যাত্রার প্রাণরসায়ন। এসব মানুষকে আলোড়িত করে, সক্রিয় করে, জাগিয়ে রাখে; লক্ষ্যের দিকে টেনে নিয়ে যায়।১২

এই টেনে-নেওয়ার কাজে, শৃঙ্খল ভাঙার তাগিদ সৃষ্টিতে জনগণের মহৎ সঙ্গী হয়েছিলেন নজরুল। মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন, আলোড়িত-উদ্দীপ্ত করেছিলেন, উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার করেছিলেন, সুশৃঙ্খল শব্দ-তুফানের মধ্য দিয়ে নতুন সাম্যবাদী চেতনা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন জাতির মননে, মুক্তির নেশা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবিতার মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল সুর স্বাধীনতার বার্তাও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, গণজোয়ার বেগবান করেছিলেন। এই আহ্বান হিটলারসহ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতার বিরুদ্ধে, যত স্বৈরশাসক ছিল, ভবিষ্যতে যত অত্যাচারী-জুলুমবাজ শাসক আসবে তাদের বিরুদ্ধে, যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও। এই আহ্বান মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে চিরঞ্জীব থাকবে যুগ থেকে যুগে। গোটা মানবজাতির কল্যাণের পক্ষে, ন্যায়বিচারের পক্ষে মানুষের চেতন-জগৎকে আলোড়িত ও সমৃদ্ধ করবে অনন্তকাল।

৭.

কাব্যছন্দে ‘আমিত্বে’র দুর্বিনীত গতি বীরত্বের সাহসী উচ্চারণে ঋদ্ধ!

আমিত্বের মধ্য দিয়ে আবেগের নির্যাস নজরুলের কাব্যনির্মাণ-কৌশলের ভেতর থেকে ঝলকে-বলকে, ঠমকে-চমকে ছুটে-ছুটে চলে। এর লক্ষ্য এক। যাত্রাপথ এক। আগেই বলেছি, শব্দছুট ট্র্যাকচ্যুত হয়নি।

নিজের শক্তির কথা, সাহসের কথা জানান দিতে কখনও অবনত হননি, দ্বিধাগ্রস্ত হননি কবি। ভয় তাঁকে কাবু করেনি। অন্যায়ের প্রতি হুঙ্কার ছেড়েছেন, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে নিজের আমিত্বের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতির সাহস জাগিয়ে তোলার প্রতীকী শব্দ বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করে গেছেন। তাহলে কি আমরা বলতে পারি না যে, এখানে  সাহসী নজরুল শব্দজোয়ার থেকে প্রবল বেগে মাথা উঁচিয়ে যুগ-যুগান্তরে অত্যাচারিতদের পক্ষে সূর্যের মতো তীব্র রোদ ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন?

অবশ্যই পারি। কারণ এই রোদ যুগ থেকে যুগে নিপীড়িত মানুষের মনে শক্তি বা মোটিভেশনাল ফোর্সকে চাঙ্গা করে রাখবে, সজীব করে রাখবে, নিজের অধিকারের কথা জানান দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে না মানুষ, তারা সাহসী হবে। সাহস-ই হচ্ছে মনের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ এক প্রাণরসায়ন।

‘আমি ঝঞ্ঝা’, ‘আমি ঘূর্ণি’, ‘আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল’―এসব শব্দের অর্থ এটা প্রকাশ করে না যে, নজরুল সহিংস ছিলেন। এসব প্রতীকী উচ্চারণের মধ্য দিয়ে নজরুলের সাহসী মনের উচ্চাঙ্গ-সংগীত গীত হয়েছে।

এটা ঠিক: তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত সমাজে নানা অনিয়ম-অবিচার-অত্যাচার দেখে-দেখে নজরুলের প্রতিবাদী সত্তা ধীরে-ধীরে বিকাশ লাভ করেছে। তাঁর ফাউন্ডেশন মজবুত হয়ে গড়ে উঠেছে; আর সেই নজরুল সমাজলব্ধ হতাশাকে সংক্ষুব্ধ-শব্দ আর বাক্যের মাধ্যমে শৈল্পিকভাবে প্রকাশ করে গেছেন প্রতীকী শব্দ ও ছন্দে।

মনস্তত্ত্বের সূত্র মতে:

‘হতাশা থেকে সহিংসতা সৃষ্টি হয়, আর সহিংসতা হচ্ছে হতাশার ফলাফল, পরিণতি’-(ফ্রাস্টেশন-অ্যাগ্রেশন সূত্র, Doller, Doob, ১৯৩৯)। প্রমাণিত হয়েছে হতাশাজনক পরিস্থিতিতে সহিংসতা উসকে উঠতে পারে, বেড়ে যেতে পারে।১৩

‘অ্যাগ্রেশন’ কখনও-কখনও নিজের দিকে ধাবিত হয়। সহিংস মনোবৃত্তির কারণে ব্যক্তি নিজেকে জখম করতে পারে, নিজেকে আঘাত কিংবা নিজেকে কষ্ট দিতে পারে, নিজেকে কাটাকুটি করতে পারে, এমনকি সুইসাইড বা নিজেকে হত্যার মাধ্যমেও মানবমনের ‘অ্যাগ্রেশন’ প্রতিফলিত হতে পারে। আবার, সহিংস মনোবৃত্তির কারণেই অন্যকেও আঘাত করতে পারে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি।

মনস্তত্ত্বের এই থিওরির আলোকে কি বলব নজরুল সহিংস ছিলেন, নজরুল আতঙ্কবাদী ছিলেন? না। মোটেই না। বরং নজরুল ব্রিটিশ রাজড়া, শাসক-প্রশাসক, বড়লাট-ছোটলাট, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, আর এসডিওকে গালাগাল করতে পারতেন, অশোভন বাক্যবাণ ছুড়ে দিয়ে ‘ভার্বাল অ্যাগ্রেশন’ দেখাতে পারতেন; তাদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়তে পারতেন; তা করেননি তিনি। বরং নজরুল শব্দচয়নের মাধ্যমে, কাব্যঝংকারের ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে-ছুটতে অত্যাচারী সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের অবরুদ্ধ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মুক্তির জন্য, মঙ্গলের জন্য অমঙ্গলের দিকে শব্দ-তির ছুঁড়ে দিয়েছেন কাব্যশিল্পের ধনুক নির্মাণের মধ্য দিয়ে। ঘৃণা-দ্রোহ আর বিপ্লবী ক্ষোভকে তিনি নান্দনিক ছন্দশব্দের বাহনে বসিয়ে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এভাবে ‘অ্যাগ্রেশন’ প্রতিফলিত করার অন্তর্গত কৌশলকে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘ইগো- ডিফেন্স মেকানিজম’-এর ‘সাবলিমেশন’- এর সঙ্গে তুলনা করা যায় :

‘সাবলিমেশন’ অর্থ প্রবৃত্তিজাত আবেগ অথবা সহিংস তাড়না বা সংক্ষুব্ধতা নির্জ্ঞাতভাবে অধিকতর শোভন বা বাঞ্ছনীয় খাতে প্রবাহিত করা, চালনা করা। এটি ‘বিহেভিয়ার চ্যানেলিং মেকানিজম’-এর স্বতঃস্ফূর্ত একটি উপকারী কৌশল। এই কৌশল মনের স্বাস্থ্যকে সুরক্ষা করে। ব্যক্তিত্বের ধরন অনুযায়ী মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৌশলটি ব্যবহার করে ফেলে নিজের অজান্তে।

 ফ্রয়েডের মতে, মানবসভ্যতা বিনির্মাণ এবং সামাজিক উন্নতির জন্য ‘সাবলিমেশন’ গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিহেভিয়ার চ্যানেলিং অনুষদ।১৪

৮.

নজরুলের মনের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ ইমোশন বা আবেগের রূপান্তরিত ভাবরস ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আত্মার রস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে (নিচে আবেগের শ্রেণিবিন্যাস আলোচনা করা হয়েছে প্রাসঙ্গিকভাবে।) একইসঙ্গে চিহ্নিত হয়েছে যেকোনও জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় নজরুলের ব্যক্তিত্বের শক্তিশালী  দিকটাও।

মহৎ সাহিত্যের কাব্যগুণের উপাদান হচ্ছে ইমোশন বা আবেগজারিত ভাবরস। এই গুণে গুণান্বিত হয়েছেন আমাদের প্রিয় কবি নজরুল। লক্ষ্য করুন :

‘কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতে, ইমোশন বা মানসিক অবস্থার রূপান্তরিত ভাবই রস।’ আলঙ্কারিকদের মতে, কাব্য নির্মাণ- কৌশল তিনটি ভাগ হচ্ছে : বিভাব, সঞ্চারী ভাব ও অনুভব। এখান থেকে নব রস সৃষ্টি। নজরুলের কবিতায় ‘বীর রস’ প্রবলভাবে উপস্থিত। ‘আমি’-ই নজরুলের ‘বড় বীর’ রসের উদাহরণ। বিদ্রোহী কবিতাজুড়ে রয়েছে বীর রস। বিভিন্ন কবিতায় প্রবল দেশপ্রেম থেকেও বীর রস পাওয়া যায়। ব্রিটিশ সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নজরুলের ক্রোধ দেখা যায় কবিতায়। এসব ক্ষেত্রে রুদ্র রসের উপস্থিতি দেখা যায়। নজরুলের কবিতায় আর একটি রসের উপস্থিতি রয়েছে― বীভৎস রস। শত্রুর প্রতি ঘৃণা কবির অনেক কবিতাতেই রয়েছে। মূলত কবি নজরুলের কবিতায় বীর-রুদ্র-বীভৎস রসের উপস্থিতি বেশি। নজরুলের কবিতায় অলঙ্কারের প্রয়োগ অনেক বেশি। অন্ত্যানুপ্রাস তো আছেই; তাঁর মতো বৃত্তানুপ্রাসের প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। যমকের ব্যবহারও বেশকিছু কবিতায় পাওয়া যাবে। উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার কবিকে করেছে অনন্য। আর বক্রোক্তি তো কবির অস্থিমজ্জায়। অনাচার ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বক্রোক্তির ব্যবহার লক্ষ্যণীয়।১৫

আবু আফজাল সালেহ’র এই বিশ্লেষণের মধ্যেও আমরা দেখতে পাই বিদ্রোহী কবিতায় মনস্তত্ত্বের কয়েকটি উপাদান: ইমোশন বা আবেগ, ভাব রস, অনুভব, বীর রস, ক্রোধ, রুদ্র রস, ঘৃণা, বীভৎস রস, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বক্রোক্তি।

ভাব রসের মধ্যে লুকিয়ে আছে ‘ভাব’ বা ‘ভাবনা’। আমরা অনেক সময় ‘ভাবনা’কে প্রকাশ করে থাকি ‘চিন্তা-ভাবনা’ শব্দযুগলের বন্ধনী দ্বারা। ‘ভাব’ কথাটাও প্রকাশ করে থাকি অনুভব বা অনুভূতি প্রকাশের জন্য।

বীর রসের মধ্যে লুকিয়ে আছে বীরত্ব, সাহস, আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদাবোধ, দেশপ্রেম।

রুদ্র রসের মধ্যে আছে  ক্রোধ; আর বীভৎস রসের মধ্যে আছে ঘৃণা।

এসব মনস্তাত্ত্বিক অনুষদগুলো যেনতেন ব্যবহার করেননি কবি নজরুল। এ-কবিতায় কাব্যশীলনের অলংকার প্রয়োগের অসামান্য দক্ষতার কারণে অন্ত্যানুপ্রাস, বৃত্তানুপ্রাসের সঠিক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে কবি উপহার দিয়ে গেছেন কেবলই বিপ্লবী সত্তা নয়, সাহিত্যশিল্পের অনুপম শস্যভাণ্ডারও; আর তা হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ সবার মাঝে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকিরণ ছড়িয়েছে।

উল্লিখিত মনস্তাত্ত্বিক উপকরণগুলো বুঝতে হলে আবেগের শ্রেণিবিন্যাস সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা নিলে তা বোঝা সহজ হবে। নিচে উল্লিখিত আবেগের বিভিন্ন ধরন সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা লাভ করা যেতে পারে :

আবেগের প্রকারভেদ:

নানা ধরনের ইমোশন বা আবেগ রয়েছে। ইমোশন প্রকাশের তীব্রতার মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। এ-কারণেই ইমোশনের শ্রেণিবিন্যাস করা দুরূহ কাজ। নিচের শ্রেণিবিন্যাসটি মোটামুটিভাবে গ্রহণ করা হয়েছে:

১. ইতিবাচক বনাম নেতিবাচক ইমোশন :

ইতিবাচক বা পজিটিভ ইমোশনের উদাহরণ, যেমন―ভালোবাসা, আনন্দ, সুখ, ইত্যাদি। ইতিবাচক আবেগ মানুষের ভালো-থাকার ইন্ধন জোগায়, অন্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে। পক্ষান্তরে নেতিবাচক ইমোশনের কারণে মানুষের ভালো থাকার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক জটিলতর হতে থাকে। নেতিবাচক ইমোশনের উদাহরণ হচ্ছে রাগ, বিরক্তি, দুঃখ, কষ্ট, ইত্যাদি।

২. প্রাথমিক বনাম মিশ্র ইমোশন:

প্রাথমিক ইমোশন আবেগের মৌলিক দিকগুলো ফুটিয়ে তোলে। দুই বা ততোধিক প্রাথমিক ইমোশনের যৌথ মিলনের ফলে মিশ্র আবেগের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক আবেগগুলো হচ্ছে : ভালোবাসা, সুখ, দুঃখ, রাগ, বিস্ময়, ভয়, ঘৃণা, লজ্জা, ইত্যাদি। পক্ষান্তরে, মিশ্র আবেগের মধ্যে আছে, জেলাসি (ভালোবাসা+রাগ), নিরাশা (দুঃখ+ বিস্ময়), ইত্যাদি।

৩. বিপরীতধর্মী ইমোশন:

এই গ্রুপে আছে বিপরীতমুখী আবেগের বর্ণনা। আনন্দের উল্টো পিঠে রয়েছে দুঃখ। ভালোবাসার উল্টো পিঠে রয়েছে ঘৃণা। প্রকৃতপক্ষে একইসঙ্গে দুটি অপোজিট ইমোশন অনুভব করা যায় না। সাইকোথেরাপিতে ক্লায়েন্টদের নেগেটিভ ইমোশনের পথ থেকে পজিটিভ ইমোশন জাগানোর ব্যাপারে সহযোগিতা করা হয়।

৪. মাত্রাগত তারতম্যের বিচারে আবেগ:

মাত্রাগত তীব্রতার ব্যবধানের কারণে নানা ঢঙের আবেগের প্রকাশ ঘটে থাকে। যেমন, ভয়ের প্রকাশ ঘটে নানাভাবে।

ভয় : অস্বস্তি, খিটখিটে → সন্ত্রস্ত কম্পমান অবস্থা → অতি ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা → প্যানিক।

এককভাবে প্রতিটি প্রাথমিক আবেগেরই মাত্রাগত হেরফের রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়Ñ

বিরক্তি → রাগ → ক্রোধ → ক্রোধে উন্মত্ততা, ইত্যাদি।১৬

আবেগের এসব প্রকারভেদ নানাভাবে ব্যবহৃত হয় সাহিত্যে। নজরুলের কাব্য-ছন্দ এর নান্দনিক ব্যবহার আলোচককে চমকে দেয়। বলতে ইচ্ছে করে নজরুল কেবল কবি নন, কেবলই প্রেমের কবি নন, কেবলই বিদ্রোহের কবি নন, নজরুল একজন স্বভাবজাত বিজ্ঞানীও বটেন।

সাহিত্য মতবাদ বিশ্লেষণ করেও আমরা বিদ্রোহী কবিতা, কবিতার অন্তর্গত আবেগ-উচ্ছ্বাস, চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা এবং কবির মনোদর্শন মূল্যায়ন করতে পারি :

যুগ যুগ ধরে চলে-আসা সাহিত্যতত্ত্বের ভাববাদী ও যুক্তিবাদী ধারা, কল্পনাশক্তি-কবিকল্পনা, রিয়ালিজম বা বাস্তববাদী মতবাদ, সুরিয়ালিজম (Surrealism), রোমান্টিসিজম, সেন্টিমেন্টালিজম, হিউম্যানিজম, ইত্যাদি সাহিত্য-মতবাদে (হীরেন চট্টোপাধ্যায়, সাহিত্যতত্ত্ব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০১৬ দে’জ পাবলিশিং) প্রবলভাবে উপস্থিত রয়েছে মনস্তত্ত্বের অন্তর্লীন স্রোত।…

আর মনস্তত্ত্বেরও রয়েছে বিভিন্ন প্রেক্ষিত বা মতবাদ: নিউরোসায়েন্স, বিহেভিয়ারাল, হিউম্যানিস্টিক, কগনিটিভ ও সাইকোডাইনামিক মতবাদ, ইত্যাদি। এসব মতবাদের ওপর ভর করে আচরণ ও মনের নানা প্রসেস বা ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাহিত্যে সৃষ্ট চরিত্রের মনোবিশ্লেষণে এসব মতবাদ ব্যবহার করা যায় নানাভাবে।

রোমান্টিসিজমের প্রধান অনুষঙ্গ হচ্ছে রোমাঞ্চ ও রোমান্সের মতো স্বতঃস্ফূর্ত মনস্তাত্ত্বিক বিষয়―উত্তেজনা, ভয় বা বিস্ময়ে গায়ে কাঁটা দেওয়া; শিহরণ; পুলক কিংবা উগ্র বা অস্বাভাবিক প্রেমকাহিনি, যেকোনো প্রণয়ঘটিত ব্যাপার, অলীক কল্পনায় রং মাখানো বর্ণনা; রোমান্টিক মানসিকতা, ইত্যাদি। নিউরোসায়েন্স-এর দৃষ্টিকোণ থেকে রয়েছে রোমাঞ্চ কিংবা রোমান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্রেনের জৈব-রাসায়নিক পদার্থের রহস্যময় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এই বিমূর্ত প্রতিক্রিয়াগুলো মূর্ত হয়ে ধরা দেয় আচরণে। একজন নিপুণ কথাশিল্পী শৈল্পিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করতে পারেন অন্তর্গত সেই সত্যের বাস্তব রূপ;  আর আদর্শ ও নীতিবোধ নিয়ে অতিরিক্ত আবেগের প্রকাশ দেখা যায় সেন্টিমেন্টালিজমে। এই আবেগ হচ্ছে মনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বা উপাদান। এই উপাদান অন্তর্গত প্রেষণা ও চিন্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কবি ও সাহিত্যিকের মধ্যে জাগিয়ে তোলে সাহিত্য সৃষ্টির গতিময় ধারা। যথাযথভাবে মন-জোগানো সম্ভব না-হলে মনোসংযোগ তৈরি হয় না, মন জাগে না। মন-জোগানো সম্ভব হলে ভাবনাতত্ত্ব বা চিন্তনে টান লাগে, জটিল গিঁট খুলে-খুলে তখন জেগে ওঠে মন।১৭

আমরা লক্ষ্য করি; সাহিত্য মতবাদ কিংবা মনস্তাত্ত্বিক মতবাদে ‘মনস্তত্ত্বের ফাইভ ফ্যাক্টর কম্পোনেন্ট’-এর আলোকে সাহিত্যেসৃষ্ট চরিত্রের আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা, মন মেজাজ, মানুষের সঙ্গে মানুষের আন্তঃসম্পর্ক নির্ণীত হয়ে যায়। সাহিত্যসৃজনে এসব মনস্তাত্ত্বিক ও সাহিত্য মতবাদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ ধারণা থাকতেই হবে এমন কোনো বিধি-বিধান নেই। তবে, স্বভাবজাত সৃজনশীল ও প্রজ্ঞাবান কবিসাহিত্যিকগণ আপন মেধার ঔজ্জ্বল্যে জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে এসব তত্ত্বকথার মধ্যে সমন্বিত প্রেক্ষাপট নির্মাণ এবং ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশনের মধ্য দিয়ে অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেন। এই গুণটি আমরা নজরুলের কাব্যে দেখতে পাই।

উপরোক্ত কারণে মনস্তত্ত্বের ‘ফাইভ ফ্যাক্টর সূত্র’ প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে উল্লেখ করতে চাই :

[পরিবেশ (অতীত ও বর্তমান)↔(চিন্তন↔আবেগ↔আচরণ↔ শারীরিক প্রতিক্রিয়া), ১৯৮৬  অনুযায়ী আবেগের সঙ্গে চিন্তনের রয়েছে পারস্পরিক যোগসূত্র। আবেগ বা চিন্তনের যেকোনো একটি মনঃক্রিয়া নাড়া খেলে আলোড়িত হয় অন্যটিও।১৮

পৃথকভাবে মন জেগে ওঠার সুযোগ নেই মনস্তত্ত্বে, সাহিত্যসৃজনে। মন জাগাতে হলে জোগাতেও হবে মন; মনের খোরাক। মনের নানা ধরনের খোরাকের মধ্যে আবেগ হচ্ছে অন্তর্লীন এক বিশেষ উপাদান বা মনঃক্রিয়া। কেবলমাত্র সেন্টিমেন্টালিজমে নয়, অতীতকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত আলোচিত সব ধরনের সাহিত্য মতবাদে সৃষ্টিশীল সাহিত্য নির্মাণে আবেগের রয়েছে দোর্দণ্ড প্রতাপ।…

কোনো কোনো মতবাদে সুনির্দিষ্ট বিশেষ মনঃক্রিয়া প্রাধান্য পেলেও সাহিত্য সৃষ্টি কিংবা মূল্যায়নে কখনো আবেগের স্থানচ্যুতি ঘটেনি কোথাও। 

ভাববাদ কিংবা যুক্তিবাদ, যাই বলি না কেন, সর্বত্রই চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কের কারণে সাহিত্যের মূল প্লাটফর্মে রয়েছে আবেগের উজ্জ্বল উপস্থিতি।… ‘সস্তা আবেগ’ বলে কোনো শব্দ নেই বিজ্ঞানে, সাহিত্যেও নেই। অথচ কোনো কোনো সাহিত্যÑসমালোচক ‘সস্তা’ শব্দটি ব্যবহার করে আবেগের মূল্যকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করেন। তবে লেখকের রচনায় আবেগ প্রকাশের ধরনটি হতে পারে সহজ; এটা বোঝাতে ‘সস্তা’ শব্দটির প্রয়োগ অযথার্থ হবে না। কিন্তু মানবীয় কোনও আবেগই ‘সস্তা’ হতে পারে না। আসলে শব্দটি ব্যবহার করে তাঁরা প্রকাশ করে থাকেন আবেগ-বিষয়ে নিজেদের অজ্ঞতা।১৯

ইতোমধ্যেই ‘ভাবোচ্ছ্বাস’ শব্দটিকে আমরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। প্রখ্যাত নজরুল-গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের উদ্ধৃতির আলোকেও শব্দটিকে ব্যাখ্যা করতে চাই। তিনি লিখেছেন:

বিদ্রোহী কবিতাটি ষান্মাত্রিক মাত্রাবৃত্ত মুক্ত ছন্দে রচিত, এ কবিতায় মাত্রাবৃত্ত মুক্ত ছন্দ সমিল কিন্তু ছন্দের বৈশিষ্ট্য আনা হয়েছে মাত্রাবৃত্তে প্রবহমানতা সঞ্চার করে। পর্ব বিভাগ ছয় মাত্রার চালে কিন্তু চরণের শুরুতে একটি অতিরিক্ত পর্ব এবং চরণের শেষে খণ্ডপর্ব রয়েছে। ফলে পঙ্ক্তিগুলো সমান নয়। এই বৈচিত্র্য প্রয়োজন হয়েছে ভাব ও বক্তব্যের কারণে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবির আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাসের যে বিচিত্র প্রকাশ তাতে ঐ ছন্দ-বৈচিত্র্যের প্রয়োজন ছিল।২০

অর্থাৎ ভাব ও বক্তব্যের প্রকাশের যে উচ্ছ্বাস-উৎক্ষেপ তাকেই নজরুলের বিদ্রোহী কবিতায় ‘আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এ-ভাবের উচ্ছ্বাসের ঝড় তুলতে গিয়ে কবি কাব্যকৌশলের অনন্য শৈলী ছন্দ- বৈচিত্র্যত্রের আশ্রয় নিরেছেন। এই ভাবোচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে কেবলই নজরুলের হৃদয়ের আবেগ-অনুভূতির তীব্রতা বা গভীরতার প্রকাশ ঘটেনি; একইসঙ্গে কবির মনের অবস্থা, অস্তিত্ব, অভিপ্রায়, নিজস্ব অভিজ্ঞতা, ভাবনা এবং বিশ্বাসের মৌলিক মর্মকথাও প্রচারিত হয়ে গেছে, প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এ-যুগেও। আবেগ এবং অভিজ্ঞতালব্ধ ভাবনা-ছন্দের জাদুকরী বাহনে চড়ে যুগপৎ শৈল্পিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে বিধায় তা হয়ে গেছে সর্বজনীন, জীবনঘনিষ্ঠ ও শিল্পসম্মত।

‘আবেগ আলাদা রেখে কোনো সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে না’―সাহিত্য-সৃজনে কবি ও কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ-কথাটাও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথার্থ। সাহিত্যের কোনো শর্ত নেই (দে’জ-২০১১) গ্রন্থেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভাবনা-আবেগ-বিষয়বস্তু, লিটল ম্যাগাজিনবিষয়ক ভাবনাসহ সাহিত্য-সংক্রান্ত এক বিচিত্র, বর্ণময়, বহুমুখী চিন্তাজগৎ উন্মোচন করেছেন। এ-প্রসঙ্গ টেনেও বলা যায়: বিদ্রোহী কবিতায়ও ভাবোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি একটু গভীরে দেখলে আমরা দেখব সাহিত্যের ভাববাদ, কল্পনাশক্তি-কবিকল্পনা, সেন্টিমেন্টালিজম, হিউম্যানিজম, এমনকি সুররিয়ালিজমের ব্যবহারের উপস্থিতি নানাভাবে উচ্চকিত হয়েছে। নজরুল আদর্শ ও নীতিবোধ প্রচারে তাঁর কবিতায় সেন্টিমেন্টালিজম মতবাদের আবেগের প্রাবল্যের মতো উচ্ছ্বাস ঘটালেও তা পাঠকের প্রেষণা ও চিন্তন-জগতের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে, ভাবনাতত্ত্ব ও বোধিজগতে টান মারে। পাঠক তখন জেগে ওঠেন। আর একারণেই বলা যায়: মনস্তত্ত্বের বিহেভিয়ারাল, হিউমিনিস্টিক, কগনিটিভ এবং ডাইনামিক প্রেক্ষিত বা মতবাদের আলোর স্ফূরণ ঘটেছে বিদ্রোহী কবিতায়। এর ব্যবহার যে কবি জেনেশুনে করেছেন তা বলা মুশকিল; বরং ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশনের মাধ্যমে তাঁর স্বভাবজাত কবিসত্তা অবচেতন মনের দেয়াল টপকে চেতন মনে প্রতিভাত হয়েছে। এটি সুরিয়ালিজম সাহিত্য মতবাদেরই বৈশিষ্ট্য। আর বিদ্রোহী কবিতার এক স্তবকে আমরা দেখতে পাই :

আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,

আমি বিশ্ব-তোরণে চরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।

ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া

স্বর্গ মর্ত্য-করতলে,

তাজী র্বোরাক্ আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার

হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!

‘অচেতন-চিতে চেতন’―কী নান্দনিক বিজ্ঞান! কী প্রত্যয়দীপ্ত শৈল্পিক ঘোষণা! তাঁর আমিত্বের অচেতন মন ঘুমিয়ে নেই। সদা জাগ্রত, মানবকল্যাণ চিন্তায় সবসময় চেতন অর্থাৎ অচেতন-চেতন মনকে তিনি বিদ্রোহী কবিতায় একাকার করে দিয়েছেন, জনগণকে অচেতনে না-থেকে সদা জাগ্রত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন! তাঁর এই আহ্বান সব যুগের বঞ্চিত-লাঞ্ছিত মানুষের আমিত্বের জন্যই প্রযোজ্য!

অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষের নজরুল বিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ সৃষ্টি সুখের উল্লাস-গ্রন্থে (কথাপ্রকাশ, ২০১৭) সাহিত্যবিশ্লেষণের পরতে-পরতেও নজরুলের সৃজনপ্রতিভার উল্লাস দেখার সুযোগ পাই আমরা। উল্লাসও একটি আবেগ; আর আগেই বলা হয়েছে: সৃজনপ্রতিভা মেধারই অঙ্গ, উপাদান। মেধা ও আবেগের যুগপৎ মিলনে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটি শিল্পগুণ ও বিশ্বজনীন উপযোগিতায় হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রম, অনন্য, অসাধারণ, যুগোত্তীর্ণ, কালজয়ী।

৯.

সবশেষে বলব, বিদ্রোহী কবিতার ‘আমি’ কেবলই নজরুলের আত্মশক্তির একক ‘আমি-সত্তা’ নয়। এই ‘আমি’ সর্বযুগের সর্বকালের বিশ্বের প্রত্যেক অঞ্চলের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের ‘আমি’; সচেতন করে-তোলা গণসমুদ্রের ‘আমি; আর নজরুল কেবল আবেগের ঝড়ে তাঁর কাব্যে ‘আমি-সত্তা’ উড়িয়ে দেননি; এই ঝড়ের মধ্যে তাঁর মনস্তত্ত্বের সৃষ্টিশীল কল্পনা তথা মেধা ও জীবনবোধের উজ্জ্বল, অনন্য ‘নজরুল-সত্তা’রও উদগিরণ ঘটে গেছে। একইসঙ্গে তাঁর সাহিত্যে সংযোগ ঘটেছে বিভিন্ন সাহিত্য মতবাদ ও মনস্তাত্ত্বিক মতবাদেরও; আর এ-কারণে বিদ্রোহী কবিতা শিল্পগুণে অসাধারণ; শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক  হয়ে আছে, যুগে-যুগে সর্বকালের, সব দেশের, সব সমাজের নিপীড়িত পরাধীন মানুষের মুক্তির সনদ হিসেবে প্রাসঙ্গিক থাকবে। এসব কারণে নজরুলকে সমাজ-মনস্তত্ত্ববিদও বলা যায় বটে।

তথ্যসূত্র :

১.            মোহিত কামাল, শিশুর মনোজগৎ/শিশুর সৃজনশীল বেড়ে ওঠা, বিদ্যাপ্রকাশ, তৃতীয় প্রকাশ ২০০৭, পৃষ্ঠা : ৯৫-১০৯

২.           মোহিত কামাল, মানব মনের-গতিপ্রকৃতি, বিদ্যাপ্রকাশ ষষ্ঠ প্রকাশ, ২০১৪, পৃষ্ঠা : ২১-২২

৩.          মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা, হাওলাদার প্রকাশনী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃ. ১৬৭-১৬৮

৪.           মোহিত কামাল, দুরন্ত দুখু, অনিন্দ্য প্রকাশ, ২০১৮, পৃষ্ঠা : ১৯০-৯১

৫.           মোহীত উল আলম, বিদ্রোহীসত্তা, কালের খেয়া, দৈনিক সমকাল ২৫ মে, ২০১৮

৬.          Paul Harrison, Philip Cowen, Tom Burns, Mina Fazel, Shorter Oxford Textbook of Psychiatry 17th edi, Oxford University Press, 2018, Page: 393 – 94.  (অনুবাদ : এ নিবন্ধের লেখক)

৭.           রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, ব্রহ্মসঙ্গীত ১। বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, পৃ. ১২৮

৮.          মোহিত কামাল, শিশুর মনোজগৎ/শিশুর সৃজনশীল বেড়ে ওঠা; বিদ্যপ্রকাশ পৃ : ১০৩ , ৯৯

৯.           মোহিত কামাল, শিশুর মনোজগৎ/শিশুর সৃজনশীল বেড়ে ওঠা, ওই পৃষ্ঠা : ৭৮―৭৯

১০.         মোহিত কামাল, শিশুর মনোজগৎ/শিশুর সৃজনশীল বেড়ে ওঠা,ওই পৃষ্ঠা : ৭৯

১১.         সৈয়দ আলী আহসান, আধুনিক বাংলা কবিতা, গতিধারা, ১৯৭০

১২.         Andrew B. Crider et al, Psychology, Herper Collins college publishers 1993, Page: 132, (অনুবাদ : এ নিবন্ধের লেখক)

১৩.        Andrew B. Crider et al, Psychology, Herper Collins college publishers 1993, Page: 465, (অনুবাদ : এ নিবন্ধের লেখক)

১৪.         Andrew B. Crider et al, Psychology, Herper Collins college publishers 1993, Page: 465, (অনুবাদ : এ নিবন্ধের লেখক)

১৫.        আবু আফজাল সালেহ, নজরুলের কবিতা : অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী মানস, সাহিত্য ডেস্ক, ২০ আগস্ট, ২০২০

১৬.        মোহিত কামাল, মানব মনের গতি-প্রকৃতি, বিদ্যাপ্রকাশ ষষ্ঠ প্রকাশ ২০১৪, পৃষ্ঠা ২২-২৩

১৭.         মোহিত কামাল, সাহিত্যসৃজনে মনস্তত্ত্বের প্রভাব, তীরন্দাজ, মার্চ ২০২০

১৮.        Denis Green Berger & Padesky CA; Mindover Mood, The Guilford, Inc. Newyork 1995,  Page: 04 (অনুবাদ : এ নিবন্ধের লেখক)

১৯.         মোহিত কামাল, সাহিত্যসৃজনে মনস্তত্ত্বের প্রভাব, তীরন্দাজ, মার্চ ২০২০]

২০.        রফিকুল ইসলাম, নজরুল-পর্যালোচনা, প্রকাশক কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, ঢাকা, প্রথম মুদ্রণ জুন ২০১৮, পৃ: ৪৭

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

বাংলা একাডেমি ফেলো, মনোশিক্ষাবিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares