নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার ১০০ বছর : শাহীনুর রেজা

প্রচ্ছদ রচনা : শতবর্ষে অন্য আলোয় বিদ্রোহী কবিতা

ইংরেজি An.ni.ver.sary শব্দের অর্থ বার্ষিক উৎসবের তিথি। কোনও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারিখের বার্ষিক আবর্তন; এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান; বার্ষিকী। জন্মবার্ষিকী (Birth anniversary), মৃত্যুবার্ষিকী (Death anniversary), বিবাহবার্ষিকী (Marriage anniversary) আমাদের এখানে খুব প্রচলিত। ব্যতিক্রম যে নাই, তা নয়। প্রতিষ্ঠানের বর্ষপূর্তি, পত্রিকার বর্ষপূর্তি, সংগঠনের বর্ষপূর্তিও বেশ ঘটা করে পালিত হয়। পালিত হয় এসবের রজতজয়ন্তী (২৫ বছর), সুবর্ণজয়ন্তী (৫০ বছর), হীরকজয়ন্তী (৬০ বছর), প্লাটিনাম জয়ন্তী (৭৫ বছর), শতবার্ষিকী (১০০ বছর) উদ্যাপন। কিন্তু একটি সৃষ্টি, একটি উপন্যাস, একটি গল্প অথবা একটি কবিতার বর্ষপূর্তি হয় কি ? হয়। একটি কবিতার হয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি ২০২১ ছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ১০০ বছরপূর্তি। দেশে-বিদেশে একাধিক সংগঠন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বর্ষপূর্তি করেছে। শীর্ষ পত্রিকাগুলো খ্যাতিমান গবেষকেরা এ-সংক্রান্ত বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন।

১৪৮ পঙ্ক্তির এই কবিতা বাংলাসাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠতম দীর্ঘ কবিতা। ইংরেজি সাহিত্যে Alexander Pope-এর লেখা ৫ সর্গে (Canto) ‘The Rape of the lock’-এর মতো অতি দীর্ঘ কবিতা আছে। অবশ্য এটি একটি এপিক কবিতা। বিশ^সাহিত্যের অন্য ভাষাতেও দীর্ঘ কবিতা থাকতে পারে। তবে বাংলা সাহিত্যে এক এবং একমাত্র ‘বিদ্রোহী’। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম কবিতা ‘বিদ্রোহী’।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ৩/৪-সি, তালতলা লেনের একটি দোতলা বাড়ির নীচতলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরে এক রাতের মধ্যে বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ রচনা করেছিলেন। কবিতাটির প্রথম শ্রোতা মুজফফর আহমদ নজরুল স্মৃতিকথায় বর্ণনা করেছেন―সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রির কোনও সময়ে তা আমি জানি না। রাত ১০টার পরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি, এমন সময় নজরুল বলল―সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে আমাকে পড়ে শোনাল―

                বল            বীর―

          বল      উন্নত মম শির!

শির নেহারি’ আমারি নতশির এই শিখর হিমাদ্রীর!

‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা। … আমার মনে হয়, নজরুল ইসলাম শেষ রাত্রে ঘুম থেকে উঠে কবিতাটি লিখেছিল। … এখন থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে নজরুল কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারবার কলম ডোবাতে গিয়ে তাঁর মাথার সঙ্গে হাতের তাল রাখতে পারবে না, এই ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেনসিলে লিখেছিল।

১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) শুক্রবার সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রথম ছাপা হয়। সেদিন বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও কাগজের চাহিদা এত বেশি হয়েছিল যে, সেই সপ্তাহে কাগজ দুই বার ছাপা হয়েছিল। এবং শোনা যায় সেই সপ্তাহের বিজলী দুই বারে ২৯ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। ‘বিদ্রোহী’ ১৩২৮-এর কার্তিক সংখ্যা মোসলেম ভারতেও যুগপৎ প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু পত্রিকাটি মাসিক হওয়ায় (অক্টোবর ১৯২১ সংখ্যা হলেও তা জানুয়ারির আগে প্রকাশিত হয়নি) সাপ্তাহিক বিজলীই কবিতাটির প্রথম প্রকাশের কৃতিত্ব অর্জন করে। প্রবাসী পত্রিকা ও তার পাঠকদের দাবি মেটাতে ১৯২২-এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি (মাঘ ১৩২৮) সংখ্যায় এবং সাধনা পত্রিকা এপ্রিল ১৯২২ (বৈশাখ ১৩২৯) সংখ্যায় ‘বিদ্রোহী’ পুনমুদ্রণ করে। ১৯২৩-এ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পুরোভাগে রেখে প্রকাশিত হয় নজরুলের প্রথম কাব্যগন্থ অগ্নিবীণাতে।

বলতে দ্বিধা নেই যে, সাহিত্য সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাসসহ তৎকালীন অনেক লেখক কবিতাটির বিরোধিতা করেন। মোহিতলাল মজুমদার প্রচার করেছিলেন যে, নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমি’ শীর্ষক একটি লেখার ভাব নিয়ে কবিতাটি লিখেছেন, অথচ কোনও ঋণ স্বীকার করেননি। সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠিতে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে ব্যঙ্গ করে ‘ব্যাঙ’ কবিতা লিখেছিলেন। অথচ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পড়ে শোনানোর পরে তিনি নজরুলকে বুকে চেপে ধরেন। আসাধারণ লেখা বলে অভিহিত করে অভিনন্দন জানিয়ে নিজ সম্পাদিত পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখে নজরুলকে আশীর্বাদ করেছিলেন।

১৯২৩ সালের ২৪ মার্চ মঙ্গলবার আনন্দবাজার পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় সমালোচনা স্তম্ভে লেখা হয়েছে―‘বিদ্রোহী’র কবি কাজী নজরুলের বোধ হয় পরিচয় দিবার আবশ্যক করে না। … কাজী নজরুলের বিশেষত্ব তিনি বাংলার কাব্যকুঞ্জে দীপক রাগিণীতে নতুন উন্মাদনার সৃষ্টি করিয়াছেন। শুধু এক ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্যই তিনি বাংলা সাহিত্যে অমর হইতে পারিতেন। যেদিন কবি, সাহিত্য পরিষদে স্বয়ং এই কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন, সেদিন বৃদ্ধ শাস্ত্রী মহাশয় হইতে তরুণ শ্রোতারা পর্যন্ত সকলে একটা ভাবের উন্মাদনায় মুগ্ধ হইয়াছিলেন।

বিজয় চন্দ্র মজুমদার ও দীনেশ চন্দ্র সেন সম্পাদিত মাসিক বঙ্গবাণী প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা চৈত্র ১৩২৮ (মার্চ-এপ্রিল ১৯২২)-এর সাহিত্য বীথিতে মন্তব্য করা হয়েছে―‘আমাদের সাহিত্য যদি একা রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্বে সমৃদ্ধ হইত, তবে আনন্দের মধ্যে বিপদ অনুভব করিতাম। … আমরা যে অন্যান্য ভালো কবিতা রচনায় তৃপ্তি পাই, ইহা জাতীয় সাহিত্যের গৌরবের বিষয়। গত দুই-এক মাসের মধ্যে যেসব প্রাণস্পর্শী সুন্দর কবিতা পড়িয়াছি, তাহার মধ্যে একটি কবিতার নাম বলিব। মোসলেম ভারত পত্রে প্রকাশিত নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ অতি উচ্চ শ্রেণির কবিতা। কবিতাটি পড়িতে পড়িতে পাঠকের বুক ফুলিয়া ওঠে, মাথা উঁচু হয়। শেষের দিকে কিয়দংশ পড়িলে সুইনবার্ন রচিত ‘ঐবৎঃযধ’ মনে পড়ে, কিন্তু হার্থা অপেক্ষা ‘বিদ্রোহী’ অনেক উচ্চে।

১৯২৩ সালের ১৭ মার্চ শনিবার আনন্দবাজার পত্রিকার ৩য় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত শ্রীযুক্ত উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন―‘বাঙ্গালা বা ইংরেজিতে এমন কবিতা আর পড়ি নাই। এটা বাঙালির সম্পদ, বাঙালির গৌরবের জিনিস।’

নজরুল অসুস্থ হওয়ার বেশ পরে ১৯৬২ সালের ২৫ জুন ‘দৈনিক অমৃত বাজার’ পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় লন্ডনে বাঙালি ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে কনওয়ে হলে (Connway hall) নজরুল জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের খবর ছাপা হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে পত্রিকার সম্পাদক শ্রী তুষার কান্তি ঘোষ বলেছিলেন, ‘If Nazrul had written only his poem ‘Bidrohi’ (rebel) he would have been famous.’

‘বিদ্রোহী’ কবিতা পৃথিবীর বহু ভাষায় ভাষান্তরীণ হয়েছে। যার সঠিক সংখ্যা এখনও নিরোপিত হয়নি। এযাবৎ নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার যত অনুবাদ হয়েছে তার মধ্যে অধ্যাপক বিনয় সরকার, ড. আখতার হোসেন রায়পুরী ও উইলিয়াম রাঁদিচি উল্লেখযোগ্য। ‘বিদ্রোহী’র প্রথম লিটারারি তর্জমা অধ্যাপক বিনয় সরকারের করা। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ যখন প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয় বিনয় সরকার তখন বার্লিন প্রবাসী। তিনি বার্লিন বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। সেই প্রবাস থেকে ‘বিদ্রোহী’ পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান এবং উচ্ছ্বসিত ভাষায় সে মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটান। ঢাকার বিক্রমপুরের সন্তান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি পণ্ডিত জার্মানির বার্লিন বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিনয় সরকার সুদূর বার্লিনে বসেই চোখ রেখেছিলেন কোলকাতার বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের লেখার প্রতি। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’তে তিনি শুনতে পেয়েছিলেন নতুনত্বের ধ্বনি, বিশ^ছন্দের দোলা আর চিনে নিয়েছিলেন নজরুলের শক্তিকে অনন্যতাকে।

১৯২২ সালে জার্মানির বার্লিন শহর থেকে তাঁর প্রকাশিত ৪০০ পৃষ্ঠার বই  Futurism of Young Asia গ্রন্থে বাংলা সাহিত্যের সাম্প্রতিক আলোচনা নিয়ে রচিত ‘Recent Bengali Tought’ প্রবন্ধে উঠে এসেছে ‘কাজী নজরুল ও তার বিদ্রোহী’ কবিতা প্রসঙ্গে। মাত্র ২২ বছর বয়সি কোনও তরুণ বাঙালি লেখককে আন্তর্জাতিক পরিসরে এমনভাবে চিহ্নিত করার কাজটি খুব বেশি হয়েছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। তিনি নজরুলের বিপ্লবী সত্তাকে প্রত্যক্ষ করেছেন নিবিড়ভাবে। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’তে তিনি দেখেছেন নিত্যপাগল ছন্দ আর নজরুলের ভাষার ক্ষেত্রে সংস্কৃত শব্দের সঙ্গে দেশি-বিদেশি আটপৌরে প্রাকৃত শব্দের মেলমেশ। ‘বিদ্রোহী’ হলো ব্যক্তির উপনিষদ। ব্যক্তি এই কবিতার বেদান্তর। নজরুলের কবিতায় রক্ত-মাংসে গড়া প্রত্যেক ব্যক্তিই ‘বিদ্রোহী’। এ দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবন দর্শন বাংলা কবিতায় ১৯২২ সালের আগে ছিল না। নজরুল আবহমান বাংলার লোকায়ত ঐতিহ্যের ধারক―এই বিষয়টি বোধ হয় বিনয় সরকারের আগে কেউই স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। প্রফেসর সরকার তাঁর Futurism of Young Asia গ্রন্থে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন―‘আমি নজরুল ইসলামের কবিতা ‘বিদ্রোহী’ পড়ার পর অনুভব করলাম, বিগত ১০ বছর ধরে আমরা বাংলা সাহিত্যে যে বিপ্লবের প্রত্যাশী ছিলাম, আজ তারই সূচনা হলো। মনে হচ্ছে, আমাদের সাহিত্যে জীবনে উত্তেজনার একটি সমুদ্র উছলিয়ে পড়েছে। মুসলমানরা এখনও পর্যন্ত স্বীয় মাতৃভাষার এতটুকু খেদমত করেনি, যতটুকু তাদের ওপর প্রত্যাবর্তিত হয়। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠিত সত্যে রূপ নিয়েছে যে বাংলার নিদ্রিত আত্মাকে জাগ্রত করার দায়িত্ব সম্ভবত তারই স্কন্ধে এসে পড়ল।’

কী আছে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ? এক বাক্যে বলা যায়―এ কবিতায় ‘স্পিড’ বা ‘গতি’ আছে। গ্রিক মাইথোলজি, হিন্দু মাইথোলজি, ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সনাতন ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সাধারণ ইতিহাস―সব আছে। আছে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ভেদ করা শব্দভাণ্ডার, ভাষার প্রাঞ্জলতা, ক্ষুরধার বাক্য গঠন, মন গুড়-গুড় করা সব উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক, একই সঙ্গে চকিত-চমকিত বিষয় বস্তু, সব শ্রেণিদের মনের ভাব সম্মিলিত লৌকিক রূপ-কল্প, প্রকৃতির উঠোনে শুকানো সব চিন্তাচেতনা, ভাঁজে ভাঁজে মসৃণ কথকতা, উর্বর জমিন, বর্ণ-বৈষম্যহীন ইঙ্গিত, নির্ভীক উচ্চারণ, নরম-কোমল ভালোবাসা, সত্যের ঝাণ্ডা, মিথ্যার বৈপরীত্য, স্বপ্নের আরশী―তাবৎ আছে।

আরও আছে যুবকের স্বপ্ন, যুবতীর কোমল হৃদয়, বৃদ্ধার নিশ্চিন্ত চাহনি, শিশুর বেড়ে ওঠা, প্রেমিক-প্রেমিকার সান্নিধ্য, পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মেল, সঙ্গীতের বিন্যাস, ভাবের থৈ থৈ নৃত্য, জীব-জীবনের সুরম্য স্থান ইত্যাদি। যা ভাবতে চাই, যা ভাবতে চাই না, যা পেতে চাই, যা পেতে চাই না, যা করতে চাই, যা করতে চাই না, যা হওয়া উচিত, যা হওয়া উচিত না―সব কিছু আছে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়।

স্বভাবতই একটি প্রশ্ন জাগে, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান নামক মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ার পর আবার বিদ্রোহ কিসের ? ১৯৫২ সালে ভাষার সুরক্ষার পর বিদ্রোহ কেন ? ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পর বিদ্রোহ মনে আসে কীভাবে ? ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর বিদ্রোহী কোন পথে পরিচালিত হবে ? এমনকি ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির আর কোনও প্রয়োজন আছে কি ? এমন প্রশ্ন জাগে।

পাকিস্তান হওয়ার পর এক সভায় এসেছেন মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার, সঙ্গে বন্ধু আব্বাসউদ্দীন আহমেদ। বক্তৃতা মঞ্চ থেকে আব্বাসউদ্দীন গাইলেন―

কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট

রক্ত জমাট শিকল পুজোর পাষাণ বেদি

ওরে ও তরুণ ঈষাণ, বাজা তোর প্রলয় বিষাণ

ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।

গান শেষে বাহার সাহেব বললেন, পাকিস্তান হওয়ার পর এখন তো আমরা স্বাধীন। এখন আর কোন জেলের তালা ভাঙবেন ?

আসলে কী ?

মহাযুদ্ধ, দাঙ্গা, মন্বন্তর, সাতচল্লিশ, বায়ান্ন, একাত্তর পেরিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বয়স ৫০ বছর চলছে। সঙ্গে বাড়ছে হুমকি, হত্যা, গুম, ধর্ষণ। এক শ্রেণি ফুলতে ফুলতে উপরে আরেক শ্রেণি নিঃস্ব হতে হতে নিচে। দিনকে দিন বাড়ছে উৎপীড়িতের ক্রন্দন। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে অত্যাচারীরা নির্যাতন চালাচ্ছে। নতুন নতুন খড়গ কৃপাণ হাতে নিয়ে ভিনদেশি অনুচরেরা প্রতিনিয়ত আগত। এ অবস্থায় বিদ্রোহ থামে কী করে! তাহলে চলবে কত দিন ? নজরুলের ভাষায়―

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম-রণ-ভূমে রণিবে না―

বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত।

৬ জানুয়ারি ১৯২২-এ যেদিন বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ, শ্রেষ্ঠতম কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হয় সেদিন যুবক নজরুলের বয়স ছিল ২২ বছর ৭ মাস ১১ দিন মাত্র। তখনও একটি বইও প্রকাশিত হয়নি তাঁর। অথচ কবি খ্যাতির শীর্ষে―ভাবা যায়!

লেখক : কণ্ঠশিল্পী, গবেষক, সম্পাদক

উপ-অধ্যক্ষ, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares