ক্রোড়পত্র : রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল : নজরুল-জীবনী গ্রন্থের সংযোজন : জাকিয়া রহমান

বাংলা সাহিত্যে ভিন্নধর্মী বিষয়ভাবনা―তীব্র বিপ্লব, বিদ্রোহ, মহাপ্রলয়, মত্ততার ঝনঝনানিতে খড়গ হাতে যে কবির আবির্ভাব তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রি.)। কালবৈশাখী ঝড়ের মাসে জন্ম নেওয়া নজরুলের প্রতিটি রচনায় তাঁর বিপ্লবী, বিদ্রোহী চেতনার অগ্নিপ্রকাশ ঘটেছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম এক নতুন ধারার প্রবর্তক। নজরুল গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষণাকেন্দ্রের প্রথম পরিচালক রফিকুল ইসলামের নজরুল-জীবনী গ্রন্থটি ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে পরিমার্জিত আকারে ২০১৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়।

নজরুল-জীবনী-গ্রন্থটিতে নজরুলের-বাল্য ও কৈশোর, সৈনিক জীবন, সৈনিক কবি, সাংবাদিকতা, কুমিল্লা ও দৌলতপুরে, বিদ্রোহী, বিপ্লবী, সংসারী, সাম্যবাদী, বুলবুল, মসীযুদ্ধ, প্রেমিক, মোহাম্মদী বনাম সওগাত, জাতীয় সংবর্ধনা, শিল্পীজীবন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল, নীরব কবি, জীবনের শেষ দিনগুলি শীর্ষক সামগ্রিক আঠারোটি অধ্যায় রয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ের সূচনায় আখ্যানভাগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নজরুল লিখিত কবিতা অথবা নজরুলকেন্দ্রিক অন্য লেখকের লেখা কবিতার কয়েক লাইন সংযোজিত হয়েছে। বিষয়টি অভিনবত্বের দাবিদার। নজরুলের মতো বিস্ময়শিশুর জন্ম ও বাল্যজীবন আলোচনার সূচনায় লেখক সর্বস্তরের পাঠকের মনে জয়ধ্বনি আহ্বান করেছেন। এ বিশ্বাসে প্রথম অধ্যায় ‘বাল্য ও কৈশোর জীবন’-এ সংযোজন করেছেন :

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্! !

 ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখীর ঝড়!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্! !’

পৃথিবীপৃষ্ঠে নজরুলের আগমনী বার্তাকে জয়ধ্বনি দিয়ে উপস্থাপন করে লেখক রফিকুল ইসলাম যেন অদম্য প্রতিভাবান শিশু-নজরুলকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। এরূপেই নজরুল জীবনী গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ে নজরুলের জীবনঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা ও তদসংলগ্ন তথ্যাবলি উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের সর্বগ্রাসী প্রতিভাময় প্রাণপুরুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জয়জয়কার এর সমকালে বাংলা সাহিত্যে বিরল প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব। নজরুল রচনার নতুনত্ব তথা ভিন্ন ভাবধারায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুগ্ধচিত্তে বলেছিলেন―‘জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহপূর্ণ সম্পর্কের মাঝেই সাময়িক টানাপোড়েনসহ পরবর্তীকালীন সুসম্পর্কের বিশদ বর্ণনা গ্রন্থটির ষষ্ঠদশ অধ্যায়ে অর্থাৎ ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক লিপিবদ্ধ করেছেন।

‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ শীর্ষক প্রবন্ধের সূচনায় নজরুলকে উদ্দেশ করে রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতার কয়েকটি লাইন সংযোজিত হয়েছে। নজরুল সম্পাদিত, ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১১ আগস্ট প্রকাশিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকে প্রতিটি সংখ্যায় এই কবিতা আশীর্বাণী রূপে ছাপা হয়েছে। কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের হস্তলিপিতে প্রথম ছয়টি সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় এবং সপ্তম সংখ্যা থেকে তৃতীয় পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় স্তম্ভের ওপরে স্থান পেয়েছে। নজরুল ও ধূমকেতুকে উদ্দেশ্য করে কবিগুরুর লেখা কবিতার প্রতিটি লাইনের অর্থ অসাধারণ ভাবব্যঞ্জনাময় ও তাৎপর্যপূর্ণ :

‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,

আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,

আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,

দুর্দিনের এই দুর্গশিরে

উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।

অলক্ষণের তিলক রেখা

রাতের ভালে হোক না লেখা,

জাগিয়ে দে রে চমক মেরে’

আছে যারা অর্ধচেতন!

২৪ শে শ্রাবণ ১৩২৯ শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ (পৃ. ৪৭৩)

কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করেই কবিগুরু উপর্যুক্ত কবিতাটি লিখেছিলেন। ধুলো, বরফ ও গ্যাসের সমন্বয়ে ছোট ছোট পাথরের তৈরি এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের নাম ধূমকেতু। ধূমকেতুর উজ্জ্বলতা নিয়ে নজরুলের ধুমকেতু আত্মপ্রকাশ করেছিল। সঙ্গত কারণেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু’। জাতির এই দুর্দিনে নজরুলকে কঠোর বিজয় কেতন উড়িয়ে দিতে বলেছেন অর্থাৎ নজরুলকে তাঁর উদ্দেশ্য পূরণে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। যারা অর্ধচেতন কবিগুরু এই কবিতায় তাদের ঘুম ভাঙিয়ে জাগিয়ে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তরুণ কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেতনায়, অন্তরের অন্তস্তলে অন্যতম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। রবীন্দ্রপ্রেমের উৎকৃষ্ট প্রমাণ নজরুল তাঁর অসংখ্য রচনায় রবীন্দ্রসঙ্গীত বা কবিতার বহুল ব্যবহার করেছেন। গীতাঞ্জলির প্রায় সবগুলো গান নজরুল কণ্ঠস্থ রেখেছিলেন। কমরেড মুজাফ্ফর আহমদের ভাষায় :

‘তখন নজরুলের সম্পত্তির মধ্যে অন্যান্য জিনিস ছাড়া ছিল―কবিতার খাতা, গল্পের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি ইত্যাদি। মুজফ্ফর আহমদ নজরুলের কোলকাতা জীবনের সূচনা পর্ব সম্পর্কে তার নজরুল স্মৃতিকথায় আরও লিখেছেন, “এসব সত্ত্বেও সে মূলত গাইত রবীন্দ্রনাথের গান। এত বেশি রবীন্দ্র-সঙ্গীত সে কী করে মুখস্থ করেছিল তা ভেবে আমরা আশ্চর্য হয়ে যেতাম।… আমরা বলতাম নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র-সঙ্গীতের হাফিজ।”’ (পৃ. ৪৬৮)

কাজী নজরুল ইসলাম ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের তৎকালীন সচিব কবি সুধাকান্ত রায় চৌধুরীর ভাই নিশিকান্ত রায় চৌধুরী সেই স্মৃতি স্মরণ করে ‘আমার কৈশোর স্মৃতিতে নজরুল’ প্রবন্ধে বলেছেন―‘তবু যতদূর মনে হয়, তিনি হয়তো ড. শহীদুল্লাহ সাহেব হবেন। তিনি কবিগুরুকে বলছিলেন―ট্রেনে আসতে আসতে কাজী সাহেব আপনার গীতাঞ্জলির সব কটা গান আমাকে গেয়ে শুনিয়েছেন। কবিগুরু বললেন, ‘তাই নাকি? অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি তো। আমার গীতাঞ্জলির গান সব তো আমারই মনে থাকে না।’ (পৃ. ৪৬৯) নজরুল-জীবনী গ্রন্থে সংকলিত―নিশিকান্ত রায় চৌধুরীর ‘আমার কৈশোর স্মৃতিতে নজরুল’ প্রবন্ধে শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের পারস্পরিক কথোপকথন, তাদের পরস্পরের কবিতা আবৃত্তি ও গান শোনার আকাক্সক্ষার উল্লেখ রয়েছে। পারস্পরিক কথোপকথন এবং ভক্তি-স্নেহ দুই কবির আন্তরিকতা ও সুসম্পর্কের ইঙ্গিতবাহী। পবিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় পর্ব প্রসঙ্গে তাঁর চলমান জীবন দ্বিতীয় পর্ব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :

“সত্যেনদা জড়িয়ে ধরেন কাজীকে, বলেন, তুমি ভাই, নতুন ঢেউ এনেছ। আমরা ত নগণ্য, গুরুদেবকে পর্যন্ত বিস্মিত করেছ তুমি।’ ‘গুরুদেব আমার কোনও লেখা পড়েছেন নাকি।’ বিহ্বল হয়ে প্রশ্ন করে কাজী। ‘সত্যি বলতে কী’, বললেন, সত্যেনদা, ‘গুরুদেবই আমাকে একদিন নিজে থেকে প্রশ্ন করলেন, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা পড়েছ কি না। তাঁর মতে ভাবের সংস্কৃতির সমন্বয়ের সাধনার এই এক নতুন অবদান আনছ তুমি। ‘গুরুদেব বলেছেন’। আনন্দের আতিশয্যে মুখের কথা শেষ করতে পারে না নজরুল।” (পৃ. ৪৭২)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম দেখা হয়েছিল কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। এ প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মে মাস থেকে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দ মাস রবীন্দ্রনাথ ইউরোপে ছিলেন। ইউরোপ থেকে ফিরে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে জুলাই-আগস্ট মাসের দিকে রবীন্দ্রনাথ কিছুদিন কলকাতায় অতিবাহিত করেন। ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের দেখা হওয়া সম্ভবপর।’ (পৃ. ৪৭২) সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের বর্ণনা থেকে জানা যায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির ভাবগাম্ভীর্যে সাধারণের গতানুগতিক আড়ষ্টতায় ভীত বা শঙ্কিত না হয়ে নজরুল ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’ আওয়াজ তুলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করেন। কবিগুরুও নজরুলের এ স্বাচ্ছন্দ্য প্রবেশে অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। তরুণ নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আন্তরিক স্নেহদৃষ্টিই যেন মার্জনায় রূপ নিয়েছিল। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অন্তর্ধানে রামমোহন লরিতে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে শোকসভার আয়োজন করা হলে কাজী নজরুল ইসলাম কবিগুরুর পাশে বসে একান্ত সান্নিধ্যে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনাও করেছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকার শুভকামনায় আশীর্বাণী দিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একই সময়ে আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন। সঙ্গত কারণেই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রবন্ধে আশীর্বাণীটি আলোচ্য প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ রয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নজরুলকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন―‘তোমাদের কাগজের দীর্ঘজীবন কামনা করিয়া তোমাকে একটি মাত্র আশীর্বাদ করি, যেন শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে নির্ভয়ে সত্য কথা বলিতে পার।’ (পৃ. ৪৭৪) ধূমকতু পত্রিকার ১২শ সংখ্যায় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামক একটি প্রতীকাশ্রয়ী রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হলে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন আইনজীবীর বিনা পারিশ্রমিকে নজরুলের পক্ষ সমর্থন করায় নজরুলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও বিদ্রোহী চেতনায় জনসমর্থনের ঈঙ্গিত পাওয়া যায়। বিচারের সময় নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থনে যে বিবৃতি দেন তা রাজবন্দির জবানবন্দি নামে প্রকাশিত হয়েছে। বিচারে এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ হলে নজরুলকে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ সময়ে ‘বসন্ত’ নাটকটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র বাবুকে তিনি বলেন, “জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল’। তাই আমার সদ্যপ্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করেছি। সেখানে নিজের হাতে তাকে দিতে পারলে আমি খুশি হতাম, কিন্তু আমি যখন নিজে গিয়ে দিয়ে আসতে পারছি না, ভেবে দেখলাম, তোমার হাত দিয়ে পাঠানোই সবচেয়ে ভালো, আমার হয়েই তুমি বইখানা ওকে দিও।” (পৃ. ৪৭৫) রবীন্দ্রভক্ত বা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের বাইরে এই প্রথম কোনও গ্রন্থের প্রথম উৎসর্গ। রবীন্দ্র অনুসারীরা বিষয়টি ভালোভাবে না নেওয়ায় ভিন্ন মতাবলম্বীদের উদ্দেশ্যে কবিগুরু যে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন তা পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের জবানীতে আলোচ্য প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ রয়েছে―“নজরুলকে আমি ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ এটা অনুমোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছ। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।” (পৃ. ৪৭৬) বসন্ত গীতিনাট্য দ্বিতীয় সংস্করণে উৎসর্গ পত্রটি না থাকলেও পরের সব সংস্করণসহ রবীন্দ্র-রচনাবলিতেও উৎসর্গ পত্রটি সংযোজিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হয়তো অতি ভক্তদের তৎপরতায় বসন্ত নাটিকায় দ্বিতীয় সংস্করণে উৎসর্গপত্রটি ছিল না।’ (পৃ. ৪৭৭) নজরুল রচনার দ্রোহের আগুনে বাংলা কবিতার রূপ-রসের প্রলেপটুকু হারিয়ে গেছে মন্তব্যের বিরোধিতা করে কবিগুরু সেই ব্যক্তিকে জাতির সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন―‘আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও ওই সুর বাজত।’ (পৃ. ৪৭৬) পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে নজরুলের হাতে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য পৌঁছে দিয়ে বলতে বলেন, ‘কবিতা লেখা যেন কোনও কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জাগাবার কবিও তো চাই।’ (পৃ. ৪৭৬) প্রকৃতপক্ষে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনার কবিতাকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ জাতিকে শোষণ ও লাঞ্ছনার হাত থেকে মুক্ত করার অদম্য অগ্নিচেতনায় নজরুলের কবিতায় যে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল তা ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বিশ্বকবির উৎসর্গীকৃত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যকে হাতে পেয়ে নজরুল কপালে ঠেকিয়ে পরম শ্রদ্ধাভরে বুকে চেপে ধরেছিলেন। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকেই পরবর্তীকালে নজরুল ইসলাম তাঁর ‘সঞ্চিতা’ কাব্যগ্রন্থ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেছিলেন। এ সম্পর্কে নজরুল লিখেছিলেন, ‘এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত নাটক আমায় উৎসর্গ করেন। তাঁর এই আশীর্বাদ-মালা পেয়ে আমি জেলের সর্বজ্বালা, যন্ত্রণা ক্লেশ ভুলে যাই।’ (পৃ. ৪৭৭) নজরুলের প্রতি আশীর্বাদস্বরূপ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে ‘লাঙ্গলের’ প্রথম খণ্ড ১৫শ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :

‘জাগো জাগো বলরাম

ধরো তব মরুভাঙ্গা হাল

বল দাও ফল দাও

স্তব্ধ কর ব্যর্থ কোলাহল।’ (পৃ. ৪৭৭)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতায় বিদ্রোহের ঝনাৎকার প্রকাশ না করলেও তিনি সাহিত্যে বিদ্রোহের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। সঙ্গত কারণে নজরুলের বিদ্রোহী চেতনাকে ‘জাগো বলরাম’ ডাকে সমর্থন করেছিলেন এবং অধিকার আদায়ে ক্রম-অধিক বিদ্রোহী হয়ে জ্বলে উঠতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। হুগলি জেলের রাজবন্দিদের দুঃসহ জীবন, অত্যাচার নির্যাতনের চিত্রও ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ শীর্ষক প্রবন্ধে উঠে এসেছে। সাধারণ বন্দিদের মতো নজরুল ইসলাম ও অন্যান্য রাজবন্দিরা জেল সুপার ও তার সহযোগী অফিসারদের ‘সরকার সালাম’ বলতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ওপরে নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। জেল সুপারের ডান্ডাবেরী আর অসহনীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে বিদ্রোহে নজরুল অনশন শুরু করেন। জেলের বাইরে নজরুলের অনশনের খবরটি ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী নজরুলের শুভাকাক্সক্ষী কবি, সাহিত্যিক, লেখক হুগলী জেলে ছুটে আসেন। কারাকর্তৃপক্ষ তাদের কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি না দিলে নজরুলের বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় এবং নলিনীকান্ত সরকার জেলের প্রাচীরে উঠে সেখান থেকে নজরুলকে হাতজোড় করে অনশন ভঙ্গের অনুরোধ জানান। নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন না। ২৩ মে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়―‘আজ ৪০ দিন হইল অনশনব্রত অবলম্বন করিয়াছেন। অনশনের পঞ্চম দিনে নাকের ভেতর দিয়ে জোর করিয়া খাদ্য দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু তাহার ফলে তাঁহার নাক দিয়া রক্ত পড়িতে থাকে। তারপর হইতে কাজী নজরুল প্রায় অনশনেই আছেন। … যেকোনো মুহূর্তে চরম দুঃসংবাদ আমাদের কাছে আসিয়া পৌঁছাতে পারে।’ (পৃ. ৪৮০)

জেল কর্তৃপক্ষ চেয়েছিলেন অনশনরত নজরুল যেন কোনও উপায়ে অনশন ভঙ্গ না করেন। সে উদ্দেশ্যেই শুভাকাক্সক্ষী আত্মীয়-পরিজন কাউকেই জেলগেটে দেখা করার অনুমতি দেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনশন প্রসঙ্গে বলেন, ‘আদর্শবাদীকে আদর্শ ত্যাগ করতে বলা তাকে হত্যা করারই শামিল। অনশনে যদি কাজীর মৃত্যু ঘটে তা হলেও তার অন্তরে সত্য আদর্শ চিরদিন মহিমাময় হয়ে থাকবে।’ (পৃ. ৪৮০) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ মন্তব্যে নজরুলের অধিকার আদায়ের, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিদ্রোহের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সমর্থক রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়। নজরুলের অনশনে বিচলিত রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে অনশনভঙ্গের অনুরোধে পত্রও পাঠিয়ে ছিলেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ পুত্র রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে বলেন- ‘এরাব ঁঢ় যঁহমবৎ ংঃৎরশব, ড়ঁৎ খরঃবৎধঃঁৎব পষধরসং ুড়ঁ. জেল থেকে সবসড় এসেছে ঃযব ধফফৎবংংবব হড়ঃ ভড়ঁহফ. অর্থাৎ ওরা আমার বার্তা ওকে দিতে চায় না। কেননা, নজরুল প্রেসিডেন্সি জেলে না থাকলেও ওরা নিশ্চয়ই জানে সে কোথায় আছে। অতএব নজরুলের আত্মহত্যায় ওরা বাধা দিতে চায় না।’ (পৃ. ৪৮১) অনশন চলাকালীন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং নজরুলের মা হুগলি জেলে এসেও দেখা করার অনুমতি পাননি। অবশেষে অনশনের চল্লিশতম দিবসে কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর হাতে লেবুর রস পান করে কবি অনশন ভঙ্গ করেন।

নজরুল-জীবনী গ্রন্থের ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ শীর্ষক প্রবন্ধকে দুটি পর্বে বিভক্ত করা যায়। প্রথমাংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে নজরুলের সুসম্পর্কের বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি অগ্রজ লেখকদের সঙ্গে নজরুলের সুসম্পর্ক, তারুণ্যদীপ্ত জীবন, সাহসিকতা, জনপ্রিয়তাসহ ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশে নজরুল কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারার সূচনাবিষয়ক আলোচনা স্থান পেয়েছে। গবেষক রফিকুল ইসলাম ‘বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার বিতর্ক ও খুনের মামলা’ শিরোনামে যেন প্রবন্ধের দ্বিতীয়াংশের বর্ণনা দিয়েছেন। কেননা, বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার বিতর্ক ও খুনের মামলা অংশ থেকে নজরুল রচনাকেন্দ্রিক সমালোচনার বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়াংশে সাহিত্য সমালোচনার আসরে নজরুল রচনার অবস্থান, অগ্রজ লেখকদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তথা সমালোচকদের তীব্র সমালোচনার বিশদ বর্ণনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সুসম্পর্কের মাঝে সৃষ্ট সাময়িক টানাপোড়েন এ অংশের মূল আলোচ্য বিষয়।

রবীন্দ্র বলয়ের বাহিরে বাংলা কাব্যলক্ষ্মীকে স্বতন্ত্ররূপে উপস্থাপন করলেন কল্লোল গোষ্ঠী। কাজী নজরুল ইসলাম এ ধারার অন্যতম লেখক। ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’ পত্রিকার প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে বিশেষত কাজী নজরুল ইসলামের বিপক্ষে শনিবারের চিঠি নামক সাময়িক পত্রিকার আবির্ভাব। সজনীকান্ত দাস, মোহিতলাল মজুমদারের সমকালে বাংলা সাহিত্য সমালোচনার বাঁক-পরিবর্তনও সূচিত হয়েছিল। সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠিতে নজরুলের রচিত বিখ্যাত কবিতাগুলোর প্যারোডি কবিতা ক্রমানুসারে প্রকাশ করতে থাকে। শনিবারের চিঠি ভাদ্র সংখ্যায় নজরুল ইসলামকে ‘বাংলার আধুনিক বরপুত্র নবযুগ ধুরন্ধর সাহিত্য সারথি’ উপাধি দিয়ে তার ‘অনামিকা’ কবিতার একটি প্যারোডি ছাপা হয়। মনেহয় যেন প্রাচীনপন্থি বা গতানুগতিক ভাবধারার অনুসারী হিসেবে শনিবারের চিঠি এবং আধুনিক পন্থি বা নতুনের জয়গানে কল্লোল, কালি-কলম পত্রিকার প্রকাশ। সনাতনের সঙ্গে আধুনিকের সংঘর্ষই যেন মূল বিষয়। প্রাচীনপন্থিরা নতুনের উৎকর্ষ বা গতানুগতিকতার পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে ভয় পায়। সঙ্গত কারণেই কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঐক্যজোট গঠন করে প্রাচীনপন্থি সজনীকান্ত দাস এবং মোহিতলাল মজুমদার। বিষয়টিকে গুরুত্ববহ করার মানসে সমর্থক হিসেবে তারা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সমর্থন কামনা করে। ‘সজনীকান্ত দাসকে নজরুলের অনামিকা, মাধবী প্রলাপ, গোপন-প্রিয়া কবিতা সম্পর্কে অশ্লীলতার প্রশ্ন তুলে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ছোটাছুটি করতে দেখা যায়, তারই ভূমিকা এই প্যারডি।’ (পৃ. ৪৮২) নজরুল প্রমীলার বিয়ের পর থেকেই শনিবারের চিঠিতে নজরুল কবিতার প্যারোডি প্রকাশিত হতে থাকে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নজরুলকে দুশ্চরিত্র প্রমাণের চেষ্টাও করা হয়। সজনীকান্ত দাস নজরুলের রচিত ‘ঝড়’―কবিতা প্যারোডি করে লিখেছিলেন ‘কবি ঝড়’, ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’-এর প্যারোডি ‘ভাণ্ডারি হুঁশিয়ার’, ‘মাধবী প্রলাপের’ প্যারোডি ‘কবির প্রলাপ’ রচনা করে অনুষ্ঠ নামক গ্রন্থে সংকলিত করে প্রকাশ করেন। নজরুলের অসংখ্য গানও প্যারোডি রূপে শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত হয়েছে। নতুনধারার সাহিত্যের মুখপাত্র প্রগতি, কল্লোল, কালি-কলম, উত্তরা, ধূপছায়া এবং আত্মশক্তি পত্রিকাসমূহকে তিনি ‘নব-সাহিত্য বন্দনায়’ কটাক্ষ করেছিলেন।

সজনীকান্ত দাস রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ও সাহিত্যিকদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে অনুরোধ করলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। শনিবারের চিঠির দলের উপর্যুপরি অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে ‘সাহিত্যধর্ম’ প্রবন্ধে মতামত ব্যক্ত করেন যা বিচিত্রায় শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। আলোচ্য প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের মতামতের সাপেক্ষে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে নরেন্দ্রচন্দ্র সেনগুপ্ত ‘সাহিত্য ধর্মের সীমানা’ প্রবন্ধে বলেন, ‘নতুন সাহিত্যকে বিদেশের আমদানি বলিয়া কবিবর কটাক্ষ করিয়াছেন; রবীন্দ্রনাথের কাছে একথা লইয়া কটাক্ষপাতের প্রত্যাশা করি নাই। আলো যদি আমার অন্তরে আসিয়া থাকে, তাহা কোন জানালা দিয়া আসিয়াছে তাতে কিছু আসিয়া যায় না …’ (পৃ. ৪৮৫) সজনীকান্ত দাস এবং মোহিতলাল মজুমদার আধুনিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা বিশেষত কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আক্রমণের সাধারণ লক্ষ্য আধুনিক সাহিত্যিকরা হলেও বিশেষ লক্ষ্য কাজী নজরুল ইসলাম। এর পেছনে সজনীকান্ত-মোহিতলালের ঈর্ষাজনিত মনোভাব সক্রিয় থাকতে পারে।’ (পৃ. ৪৮৬) আধুনিক সাহিত্য ও সাহিত্যিক সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের অভিব্যক্তি শনিবারের চিঠি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তিনি বিব্রত হয়েছিলেন। বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সাহিত্যের রীতি ও নীতি’ নামক প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র বলেন, ‘ইতিমধ্যে বিনা দোষে আমার অবস্থা করুণ হইয়া উঠিয়াছে। শ্রীযুক্ত সজনীকান্ত শনিবারের চিঠিতে আমার মতামত এমন প্রাঞ্জল স্পষ্ট করিয়া দিয়াছেন যে ঢোক গিলিয়া মাথা চুলকাইয়া পালাইবার আর পথ রাখেন নাই। একেবারে বাঘের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছেন।’ (পৃ. ৪৮৭) আধুনিক সাহিত্য ও সাহিত্যিক সম্পর্কে কবিগুরুর মন্তব্য সাপেক্ষে শরৎচন্দ্র এ প্রবন্ধে যা বলেন, তাতে শনিবারের চিঠির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্থাৎ তাদের ঈর্ষাকাতরতার বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি লিখেছিলেন― ‘প্রিয়পাত্ররা গিয়া কবিকে ধরিয়াছে, আমরা তো আর পারিয়া উঠি না, এবার আপনি অস্ত্র ধরুন। না, না ধনুর্বাণ নয়, ধনুর্বাণ নয়―গদা। ঘুরাইয়া দিন ফেলিয়া ওই অতি আধুনিক-সাহিত্যিক-পল্লীর দিকে। লক্ষ্য! কোনও প্রয়োজন নাই। ওখানে একসঙ্গে অনেকগুলো থাকে। কবির সেই গদাটাই অন্ধকারে আকাশ হইতে পড়িয়াছে ইহাতে ইপ্সিত লাভ না হোক শব্দ এবং ধূলা উঠিয়াছে প্রচুর।’ (পৃ. ৪৮৭) শরৎচন্দ্রের এই বিবৃতি প্রমাণ করে আধুনিক সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে তিনি খড়গহস্ত ছিলেন না। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক সাহিত্য ও সাহিত্যিক সম্পর্কিত মন্তব্যে একে ‘মত্ততার আত্মবিস্তৃতিতে মাধুর্যহীন রূঢ়তা বা পালোয়ানের মাতামাতি’ বলে অভিহিত করেন। আধুনিক সাহিত্য ও সাহিত্যিক আলোচনার বিষয় হলেও মূলত নজরুল রচনার ভিন্নমাত্রিক বিষয়ভাবনাকে কবিগুরু ইঙ্গিত করেছিলেন। অন্যদিকে, ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে তিনি সাহিত্যের পথে গ্রন্থে সংকলিত ‘সাহিত্যে নবত্ব’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। এ প্রবন্ধে মোহিতলালের রচনার প্রশংসা করতে গিয়ে প্রবন্ধের অন্তস্তলে নজরুলের শৌর্যবীর্যময় রচনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। এ সমালোচনায় কবিগুরু নজরুল সাহিত্যে প্রতিফলিত তাঁর দারিদ্র্যে জর্জরিত জীবন-যন্ত্রণাকে কটাক্ষ করলে প্রত্যুত্তরে নজরুল ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে বলেন―

‘আমাদের অভিশপ্ত জীবনের দারিদ্র্য নিয়েও যেন তিনি বিদ্রƒপ করতে শুরু করেছেন। আমাদের এই দুঃখকে কৃত্রিম বলে সন্দেহ করবার প্রচুর ঐশ্বর্য তাঁর আছে, জানি এবং এও জানি, তিনি জগতের সবচেয়ে বড় দুঃখ ওই দারিদ্র্য ব্যতীত হয়তো আর সব দুঃখের সঙ্গেই অল্প বিস্তর পরিচিত। তাঁর কাছে নিবেদন, তিনি যত ইচ্ছা বাণ নিক্ষেপ করেন, তা হয়তো সইবে, কিন্তু আমাদের একান্ত আপনার এই দারিদ্র্য-যন্ত্রণাকে উপহাস করে যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে না দেন। শুধু এই নির্মমতাটাই সইবে না।’ (পৃ. ৪৯২)

নজরুল রচনায় আরবি ফারসি শব্দের বহুল ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। কাব্যে রক্তের স্থানে খুন শব্দের ব্যবহার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘সেদিন কোনও একজন বাঙালি হিন্দু কবির কাব্যে দেখলুম তিনি রক্ত শব্দের জায়গায় ব্যবহার করেছেন ‘খুন’। পুরাতন ‘রক্ত’ শব্দে তাঁর কাব্যে রাঙা রং যদি না ধরে তা হলে বুঝব, সেটাকে তাঁরই অকৃতিত্ব। তিনি রং লাগাতে পারেন না বলেই তাক্ লাগাতে চান। আমি তরুণ বলব, তাঁদেরই যাঁদের উষাকে নিউমার্কেটে ‘খুন’ ফরমাশ করতে হয় না।’’ (পৃ. ৪৯০) বাঙ্গলার কথা ও শনিবারের চিঠি পত্রিকা রবীন্দ্রনাথের ‘খুন’ শব্দের ব্যবহার সম্পর্কিত অভিমত কিছুটা ভিন্নরূপে প্রকাশ করলে কাজী নজরুল ইসলামের দিকে অভিযোগের তির নিক্ষিপ্ত হয়। রক্তের পরিবর্তে ‘খুন’ শব্দ ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আপত্তি প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, “আমি কথায় কথায় রক্তকে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি। কবির চরণে ভক্তের সশ্রদ্ধ নিবেদন, কবি ত নিজেও টুপি পায়জামা পরেন, অথচ আমরা পড়লেই তার এত আক্রোশের কারণ হয়ে উঠে কেন, বুঝতে পারিনি। এই আরবি-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।” (পৃ. ৪৯১) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সাহিত্যে নবত্ব’ প্রবন্ধ এবং এর প্রত্যুত্তরে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘বড় পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধের মাধ্যমে তর্ক-বিতর্কে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে প্রমথ চৌধুরী ‘বঙ্গসাহিত্যে খুনের মামলা’ শীর্ষক প্রবন্ধে এ বিষয়ের মধ্যস্থতা করেন। তিনি এ প্রবন্ধে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা ও স্নেহপূর্ণ সুসম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা করেছেন। ‘বঙ্গ সাহিত্যে খুনের মামলা’ নামক প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী সুস্পষ্টভাবে বলেন―

“যতদূর মনে পড়ে, কোনও উদীয়মান তরুণ কবির নবীন ভাষার উদাহরণস্বরূপ তিনি ‘খুনের’ কথা বলেন। কোনও উদিত কবির প্রতি তিনি কটাক্ষ করেননি। বাংলা কবিতায় যে ‘খুন’ চলছে না এমন কথা আর যেই বলুন রবীন্দ্রনাথ বলতে পারেন না, কারণ কাজী সাহেব এ পৃথিবীতে আসবার বহুপূর্বে নাবালক ওরফে বালক রবীন্দ্রনাথ বাল্মিকী প্রতিভা নামক যে কাব্য রচনা করেছিলেন, তার পাতা উল্টে গেলে খুনের সাক্ষাৎ পাবেন। কিন্তু এসব খুন এত বেমালুম খুন যে, হঠাৎ তা কারও চোখে পড়ে না।” (পৃ. ৪৯৩)

প্রমথ চৌধুরীর প্রচেষ্টায় রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের সাহিত্যিক সংঘর্ষের সাময়িক টানাপোড়েনের অবসান ঘটে। প্রকৃতপক্ষে বাংলার সাহিত্যের দুই দিকপালের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা যেন একে অপরকে মমতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল। এ প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শনিবারের চিঠি’র সজনীকান্ত দাস এবং মোহিতলাল মজুমদারের ঈর্ষান্বিত প্রয়াসে আধুনিক সাহিত্য নিয়ে বিতর্কে আর ‘বঙ্গসাহিত্যে খুনের মামলা’ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া ১৯২০ থেকে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পূর্ব কাল পর্যন্ত রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক স্নেহ ও শ্রদ্ধার।” ( পৃ. ৫০০)

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রবন্ধের শেষাংশে বর্ণনা করা হয়েছে দার্জিলিং এ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবস্থানরত অবস্থায় নজরুল সেখানে দেখা করতে যান। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের হাস্যোজ্জ্বল কথোপকথনের বর্ণনা তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মিষ্টতাকে যেন নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে। আবদুল মান্নান সৈয়দ পূর্বোল্লিখিত মুখবন্ধে এ বিষয়ে বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। দার্জিলিংয়ে অবস্থানরত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের সংস্পর্শে ওই দিনগুলোতে সংঘটিত আনন্দ-ফুর্তি ও গানে গানে এবং সাহিত্য-আড্ডায় তাদের সময়গুলো অতিবাহিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তৎকালীন স্বদেশ পত্রিকায় নজরুল রচিত ‘রবীন্দ্র সন্নিধানে’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্র-নজরুল দার্জিলিংয়ের সাক্ষাৎবিষয়ক অখিল নিয়োগী লিখিত ‘রবীন্দ্রসকাশে’ এবং ‘রবীন্দ্র স্মৃতিকথা’ শীর্ষক প্রবন্ধ স্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পারস্পরিক সাক্ষাৎ ছাড়াও তাদের পত্রালাপের বিষয়টিও আলোচ্য প্রবন্ধে সংযোজিত হয়েছে। কলকাতার সাপ্তাহিক নাগরিক পত্রিকার জন্য ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে লেখা চেয়ে কবিগুরুকে অনুরোধ জানালে; প্রত্যুত্তরে তিনি নজরুলকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিনয়ের সঙ্গে বার্ধক্যজনিত কারণে লেখা পাঠানোর অপারগতা প্রকাশ করেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাঠানো পত্রের জবাবে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন :

‘হে কবি, হে ঋষি অন্তর্যামী, আমারে করিও ক্ষমা!

পর্বত-সম শত দোষ-ত্রুটি ও চরণে হল জমা।

জানি জানি তার ক্ষমা নাই, দেব, তবু কেন মনে জাগে

তুমি মহর্ষি করিয়াছ ক্ষমা আমি চাহিবার আগে!

প্রার্থনা মোর, যদি আবার জন্মি এ ধরণীতে

আসি যেন শুধু গাহন করিতে তোমার কাব্যগীতে!!’ (পৃ. ৫০০)

 নজরুলের আলোচ্য কবিতা ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের ‘১৪০০ সাল’ কবিতার উত্তরে তিনি ‘১৪০০ সাল’ নামক কবিতা রচনা করে গুরুর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। নজরুলের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গোরা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছায়াছবিতে নজরুলের সঙ্গীত পরিচালনার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। যা নজরুলের প্রতি কবিগুরুর হৃদয়ে সঞ্চিত স্নেহ-ভালোবাসার অকৃত্রিম বহিঃপ্রকাশ। রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণে কাজী নজরুল ইসলাম শোকার্ত হৃদয়ে ‘রবিহারা’, ‘সালাম অস্তরবি’, ‘মৃত্যুহীন রবীন্দ্র’ নামক কবিতা ও ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে, জাগায়োনা, জাগায়োনা’ শীর্ষক বেদনাময় গান রচনা করেন। রবীন্দ্র শোকসভায় অংশগ্রহণ করে সভাপতিত্ব করেন। রবীন্দ্রনাথের অন্তর্ধানের মাত্র এক বছরের মধ্যে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে নজরুল ইসলামও অসুস্থ হয়ে ক্রমেই স্মৃতিহারা ও নির্বাক হয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রবন্ধের শেষ লাইনে গবেষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলার দুই মহান কবির কণ্ঠ প্রায় একই সময়ে নীরব হয়ে যায়।’ (পৃ. ৫০১) প্রবন্ধের শেষ লাইনটি যেন পাঠকের মনেও সমুদ্রসম শোক ও দুঃখের সুতীক্ষ্ম বেদনা বোধের সৃষ্টি করে।

রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ ও নজরুল ইসলামের স্মৃতিভ্রম হওয়ার প্রায় শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও পাঠকের হৃদয়ে এই দুটি নাম আজও অবিকৃত, অক্ষত, অবিস্মরণীয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের অন্তর্ধান স্মরণে বাঙালি পাঠকের হৃদয় যেন আজও শতছিন্ন হয়। কালের গহ্বরে গতানুগতিক বিলীনতার ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে অক্ষত রাখাও সৃজনশীল মানুষের অস্তিত্বের দাবি। ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ, অস্তিত্বের চেতনা, শ্রম, মেধা ও প্রতিভার প্রাচুর্য তাঁকে অমরত্ব দান করে। পৃথিবীর ইতিহাসে সৃষ্টিশীল মানুষই তাঁর চেতনার আলোয় বিশ্বকে আলোকিত করে সূর্যসম আয়ু ও আলোকোজ্জ্বলতা লাভ করেছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই সূর্যসম আলোকোজ্জ্বল নাম। নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম প্রণীত নজরুল-জীবনী গ্রন্থটি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনঘনিষ্ঠ সমীক্ষাধর্মী উপস্থাপনা। নজরুল-জীবনী অধ্যয়নে তৎকালীন বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্য সমালোচনার প্রবাহ তথা স্বর্ণযুগ সম্পর্কেও অবহিত হওয়া যায়। এ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ প্রবন্ধ বাংলার আপামর জনসাধারণের নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের পারস্পরিক সম্পর্ককেন্দ্রিক কৌতূহলের অবসান ঘটাতে সক্ষম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম শতবর্ষ পরেও সাহিত্যে ও সৃষ্টিকর্মে বাঙালির হৃদয়ে অমর, অজর, অক্ষয় হয়ে-চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখক : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, এমফিল গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক   

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares