Uncategorized

ছেলেটি আসছে : মূল : হান কাং

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প

বাংলা ভাষান্তর : গোপাল দাশ

[হান কাং-এর জন্ম দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়াংজুতে, ২৭ নভেম্বর ১৯৭০ সালে। তিনি ২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর পূর্বে তিনি ২০১৬ সালে তাঁর ভেজিটেরিয়ান উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তাঁর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য―দ্য হোয়াইট বুক, হিউম্যান অ্যাক্টস, গ্রিক লেসনস, আই ডু নট বিড ফেয়ারওয়েল, এবং স্কার্স। উপন্যাস ছাড়াও তিনি অনেক ছোটগল্প ও কবিতা লিখেছেন।]

হান কাং-এর Human Acts উপন্যাসের এই অংশটি The Boy 1980 ১৯৮০ সালের গুয়াংজু গণঅভ্যুত্থানের এক বীভৎস অথচ মানবিক দলিল। কিশোর ডং-হো তার নিখোঁজ বন্ধু জং-দাইকে খুঁজতে গিয়ে প্রাদেশিক অফিসের অস্থায়ী মর্গে লাশের সারিতে যুক্ত হয়। সেখানে সে মৃতদেহের পরিচয় লিপিবদ্ধ করা এবং পচনশীল লাশের দেখাশোনার দায়িত্ব নেয়। তার স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে জং-দাই ও তার বোন জং-মির সাথে কাটানো সাধারণ জীবনের অমূল্য মুহূর্তগুলো, যা বর্তমানের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে আরও অসহনীয় করে তোলে। একদিকে সামরিক বাহিনীর আসন্ন অভিযানের আতঙ্ক এবং মায়ের ঘরে ফেরার আকুতি, অন্যদিকে নৈতিক দায়িত্ববোধ ও অপরাধবোধের টানাপোড়েনে ডং-হো এক চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়। পরিশেষে, প্রিয়জনকে হারানো এক বৃদ্ধের অসহায়ত্ব ডং-হোর সংবেদনশীলতাকে আরও গভীর করে তোলে।]

গাছে তরুণ পাখি দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে। তুমি জোরে জোরে বলছো বৃষ্টি নামো, বৃষ্টি নামো।  সত্যিই কি বৃষ্টি নামবে ? তুমি তোমার চোখ সরু করে প্রাদেশিক অফিসের সামনে জিঙ্কো গাছগুলির দিকে তাকিয়ে আছো আর বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করছো। গাছের ডালপালার নড়াচড়া দেখে খুব জোরে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। বাতাসে ঝুলে থাকা বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে দম বন্ধ করে আটকে আছে, টলোমলো অবস্থায় ঝিকমিক করছে, ঠিক যেন দামি পাথরের মতো। তুমি চোখ খুললেই দেখতে পাবে, হয়তো তোমার ডাকেই বৃষ্টি নেমেছে। কিন্তু আমার তির্যক দৃষ্টির কারণে গাছগুলোকে ঝাপসা দেখায়। হয়তো আমার এখন চশমা পরা উচিত। বর্গাকার, বাদামি হর্ন-রিমড চশমা পরা একটি ছোট আকারের পাউটি মুখ আমার মনে পড়ে। তখন ফাউন্টেন বা ফোয়ারা থেকে আসা চিৎকার এবং করতালির শব্দে ঐ মুখটি তোমার চেতনা থেকে আবার হারিয়ে যায়।

এখন গ্রীষ্মকাল। আমার ছোট ভাই বলেছিল যে তার চশমা তার পিঠে পড়ে থাকে, কারণ সে চশমাটি লেইছ দিয়ে গলায় পড়ে। শীতকালে যখনই সে বাড়ির ভেতরে যায় তখনই চশমাটি কুয়াশায় ঘোলা হয়ে যায়, তখন সে কিছুই দেখতে পায় না। আমি ভেবেছিলাম যে আমার দৃষ্টিশক্তি যেহেতু আর খারাপ হয়নি, তাই আমি চশমা পরা বন্ধ করে দেব।

‘আমার কথা শোনো, যদি নিজের ভালো চাও: এই মুহূর্তেই বাড়ি ফিরে এসো।’

 তুমি মাথা নাড়ালে, স্মৃতি থেকে সেই কণ্ঠস্বরটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করলে; তোমার ভাইয়ের সেই কণ্ঠস্বর যাতে রাগের ছোঁয়া লেগে আছে। ফোয়ারার সামনের স্পিকারগুলো থেকে একজন তরুণীর স্পষ্ট ও তীক্ষè কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, যিনি মাইক্রোফোন ধরে আছেন। তুমি যেখানে বসে আছো মিউনিসিপ্যাল জিমনেসিয়ামের দিকে উঠে যাওয়া সিঁড়ি, সেখান থেকে ফোয়ারাটা দেখা যাচ্ছে না। স্মৃতিসভাটা দূর থেকে একটুখানি দেখার জন্য তোমাকে ভবনের ডান দিক ঘুরে যেতে হবে। কিন্তু তার বদলে তুমি ঠিক করলে যেখানে আছো সেখানেই থাকবে এবং কেবল শুনবে।

‘ভাই ও বোনেরা, আমাদের প্রিয়জনদের আজ রেড ক্রস হাসপাতাল থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে, তারা সবাই মারা গিয়েছে।’

সেই নারী তখন চত্বরে জড়ো হওয়া জনতাকে নিয়ে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া শুরু করলেন। বিশাল জনসমুদ্রের হাজার হাজার কণ্ঠস্বরের ভিড়ে তাঁর কণ্ঠস্বর অচিরেই হারিয়ে গেল; শব্দের এক সুউচ্চ মিনার যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে। সুরটি একবার চূড়ায় উঠছে, আবার পরক্ষণেই পেণ্ডুলামের মতো নিচে নেমে আসছে। তোমার নিজের কণ্ঠের মৃদু গুঞ্জন তোমার নিজের কানেই প্রায় পৌঁছাচ্ছে না।

আজ সকালে যখন তুমি জানতে চাইলে রেড ক্রস হাসপাতাল থেকে আজ কতগুলো মৃতদেহ স্থানান্তর করা হচ্ছে, জিন-সুর উত্তর ছিল প্রয়োজনের তুলনায় সংক্ষিপ্ত: তিরিশ। জাতীয় সঙ্গীতের সেই ভারী সুর যখন ওঠানামা করছিল, তখন একে একে তিরিশটি কফিন ট্রাক থেকে নামানো হলো। কফিনগুলো আজ সকালে তোমার আর জিন-সুর সাজিয়ে রাখা আটাশটি কফিনের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হবে; এই সারি এখন জিমনেসিয়াম থেকে ফোয়ারা পর্যন্ত বিস্তৃত। গত পরশু সন্ধ্যা পর্যন্ত তিরাশিটি কফিনের মধ্যে ছাব্বিশটি কফিনও গণ-স্মৃতিসভার জন্য বের করা হয়নি; কিন্তু গতকাল সন্ধ্যায় দুটি পরিবার এসে তাদের স্বজনের মৃতদেহ শনাক্ত করায় সেই সংখ্যা বেড়ে আটাশ হয়। এরপর তড়িঘড়ি করে এক প্রকার কাজ চালানোর মতো করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সেগুলোকে কফিনে রাখা হয়। তোমার লেজারে তাদের নাম আর কফিন নম্বর টুকে রাখার পর তুমি ব্র্যাকেটের ভেতর লিখে দিয়েছিলে ‘গণ-স্মৃতিসভা’; জিন-সু তোমাকে স্পষ্ট রেকর্ড রাখতে বলেছিলেন, যাতে একই কফিন ভুল করে দুইবার বের করা না হয়। তুমি শুধু একবার গিয়ে অনুষ্ঠানটি দেখতে চেয়েছিলে, কিন্তু তিনি তোমাকে জিমনেসিয়ামেই থাকতে বলেছিলেন।

‘স্মৃতিসভা চলাকালীন কেউ হয়তো তার আত্মীয়কে খুঁজতে আসতে পারে। দরজায় কাউকে না কাউকে থাকতে হবে।’

তোমার সাথে কাজ করা অন্য সবাই, যারা তোমার চেয়ে বয়সে বড়, তারা স্মৃতিসভায় যোগ দিতে চলে গেছে। তাদের বুকের বাম পাশে কালো রিবন পিন দিয়ে লাগানো। কফিনগুলোর সামনে যারা বেশ কয়েক রাত ধরে জেগে শোক পালন করছিল, তারা এখন ধীর ও স্তব্ধ মিছিলে তাদের অনুসরণ করছে; তাদের নড়াচড়া দেখে মনে হচ্ছে যেন বালি বা ন্যাকড়া দিয়ে ঠাসা কতগুলো কাকতাড়ুয়া। ইউন-সুক পেছনে পড়ে ছিল, কিন্তু যখন তুমি তাকে বললে, ‘ঠিক আছে, তুমি ওদের সাথে যাও,’ তখন তার হাসিতে একটা উঁচু দাঁত (ংহধমমষব-ঃড়ড়ঃয) বেরিয়ে এল। যখনই কোনও অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে সে নার্ভাস হাসি দিত, সেই দাঁতটি তাকে এক প্রকার দুষ্টুমিভরা চেহারা এনে দিত।

‘আমি শুধু শুরুটা দেখে এখনই ফিরে আসছি।’

একেবারে একা হয়ে তুমি জিমনেসিয়ামের দিকে উঠে যাওয়া সিঁড়িতে বসে পড়লে। তোমার কোলে রাখা সেই লেজার খাতাটি একটি সাধারণ জিনিস যার মলাটটা মাঝখান থেকে ভাঁজ করা কালো স্ট্রবোর্ড দিয়ে তৈরি। কংক্রিটের সিঁড়ির হিম শীতলতা তোমার ট্র্যাকস্যুটের পাতলা কাপড়ের ভেতর দিয়ে শরীরে বিঁধছে। তোমার পিই  জ্যাকেটের বোতামগুলো একদম ওপর পর্যন্ত লাগানো, আর তুমি তোমার দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে ভাঁজ করে রেখেছো।

‘হিবিস্কাস এবং তিন হাজার রি ব্যাপী চমৎকার পাহাড় আর নদীর’―এটি কোরিয়ান জাতীয় সঙ্গীতের একটি অংশ।

তুমি জাতীয় সঙ্গীতের সাথে গান গাওয়া বন্ধ করে দিলে। ওই শব্দগুচ্ছ ‘চমৎকার পাহাড় আর নদী’ তোমাকে ‘চমৎকার’ শব্দের দ্বিতীয় অক্ষর ‘রিয়ো’ (ৎুবড়)-র কথা মনে করিয়ে দিল, যেটি তুমি তোমার চীনা ভাষা শিক্ষার ক্লাসে পড়েছিলে। অক্ষরটিতে অনেক স্ট্রোক বা টান ছিল; তোমার সন্দেহ হচ্ছে তুমি এখন আর ওটা লিখতে পারবে কি না। এর অর্থ কি ? ‘পাহাড় আর নদী যেখানে ফুলগুলো চমৎকার’ নাকি ‘পাহাড় আর নদী যেগুলো ফুলের মতোই চমৎকার’ ? তোমার মনে সেই লিখিত অক্ষরটির ওপর হলিহক (যড়ষষুযড়পশং) ফুলের ছবি ভেসে উঠল, ঠিক যেমন তোমার বাবা-মায়ের আঙিনায় ফুটত এবং গ্রীষ্মকালে তোমার চেয়েও লম্বা হয়ে যেত। লম্বা শক্ত ডাঁটা, সাদা কাপড়ের টুকরোর মতো পাপড়িগুলো মেলে ধরত। ছবিটা আরও পরিষ্কারভাবে দেখার জন্য তুমি চোখ বন্ধ করলে। যখন তুমি তোমার চোখের পাতা সামান্য একটু ফাঁক করলে, দেখলে প্রাদেশিক অফিসের সামনের জিঙ্কো গাছগুলো বাতাসে দুলছে। এখন পর্যন্ত বৃষ্টির একটি ফোঁটাও পড়েনি।

জাতীয় সঙ্গীত শেষ হলো, কিন্তু কফিনগুলো নিয়ে আসতে যেন কিছুটা দেরি হচ্ছে। হয়তো কফিনের সংখ্যা অনেক বেশি। চারপাশের শোরগোলের মাঝে বিলাপের শব্দ মৃদুভাবে শোনা যাচ্ছে। মাইক্রোফোন হাতে থাকা নারীটি প্রস্তাব করলেন, কফিনগুলো প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষায় সবাই যেন ‘আরিরং’ (অৎরৎধহম) গানটি গায়।

‘তুমি যে আমাকে এখানে ফেলে চলে গেছো দশ ‘রি’ যাওয়ার আগেই তোমার পায়ে ব্যথা হবে…’

গানটি শেষ হওয়ার পর নারীটি বললেন, ‘আসুন আমরা এখন মৃতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করি।’ হাজার হাজার মানুষের গুঞ্জন তাৎক্ষণিকভাবে এমনভাবে থেমে গেল যেন কেউ ‘মিউট’ বাটন চেপে দিয়েছে। সেই নীরবতার রেশ ছিল চমকে দেওয়ার মতো প্রখর। তুমি এক মিনিটের নীরবতা পালনের জন্য দাঁড়ালে, তারপর প্রধান দরজার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলে, যার একটি দরজা খোলাই ছিল। তুমি পকেট থেকে তোমার সার্জিক্যাল মাস্কটা বের করলে এবং মুখে পরে নিলে।

এই মোমবাতিগুলো কোনও কাজেরই না। তুমি জিমনেসিয়াম হলের ভেতরে পা রাখলে, সেই তীব্র গন্ধের কারণে নাকে আসা বমি ভাবটা দমন করার চেষ্টা করলে। এখন ভরা দুপুর, কিন্তু হলের ভেতরের আবছা আলো সন্ধ্যার গোধূলির মতো লাগছে। যে কফিনগুলোর স্মৃতিসভা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে সেগুলো দরজার কাছে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে; আর বড় জানালার নিচে সাদা কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় শুইয়ে রাখা হয়েছে বত্রিশজন মানুষের দেহ, যাদেরকে শনাক্ত করার জন্য এখনও কোনও আত্মীয়স্বজন এসে পৌঁছায়নি। তাদের প্রত্যেকের মাথার কাছে খালি পানীয়র বোতলের উপরে রাখা একটি করে মোমবাতি শান্তভাবে জ্বলছে।

তুমি অডিটোরিয়ামের আরও ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলে, যেখানে একপাশে সাতটি মৃতদেহ সারিবদ্ধভাবে শুইয়ে রাখা হয়েছে। অন্যদের শরীরের কাপড় কেবল গলা পর্যন্ত টেনে রাখা হয়েছে যেন তারা ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু এই সাতজনকে পুরোপুরি ঢেকে রাখা হয়েছে। কেবল তখনই তাদের মুখ থেকে কাপড় সরানো হয় যখন কেউ কোনও কিশোরী মেয়ে বা শিশুর খোঁজে আসে। অন্যথায় তাদের এই অবস্থা দেখাটা ছিল সহ্য করার ক্ষমতার বাইরে। এমনকি এই সাতজনের মধ্যেও বীভৎসতার আলাদা আলাদা স্তর রয়েছে; সবচেয়ে খারাপ অবস্থা একদম কোনায় থাকা মৃতদেহটির। যখন তুমি প্রথম তাকে দেখেছিলে, তখন সে ছিল আঠারো বা কুড়ি বয়সের একজন তরুণী। কিন্তু এখন তার পচন ধরা শরীরটা ফুলে ফেঁপে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সমান হয়ে গেছে। প্রতিবার যখন তুমি কোনও বাবা-মা বা ভাইয়ের জন্য কাপড়টা সরাও, যারা তাদের মেয়ে বা ছোট বোনকে খুঁজছে, তখনই পচনের এই দ্রুত হার তোমাকে স্তম্ভিত করে দেয়। ছুরির আঘাতগুলো তার কপাল থেকে বাম চোখ পর্যন্ত, গাল থেকে চোয়াল পর্যন্ত এবং বাম স্তন থেকে বগল পর্যন্ত চিরে ফেলেছে; যেখানে ক্ষতগুলো এতটাই গভীর যে কাঁচা মাংস দেখা যাচ্ছে। তার মাথার ডান দিকটা একদম ডেবে গেছে, মনে হচ্ছে কোনও ভারী লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে এবং মগজের অংশ দেখা যাচ্ছে। এই খোলা ক্ষতগুলোই সবার আগে পচতে শুরু করেছিল, এরপর পচন ধরেছে তার ক্ষতবিক্ষত শরীরের অগণিত কালশিটে দাগগুলোতে। তার পায়ের আঙুলগুলো, যেগুলোতে স্বচ্ছ পেডিকিউর করা ছিল, শুরুতে অক্ষত থাকলেও সময়ের সাথে সাথে সেগুলো আদার মতো মোটা হয়ে ফুলে কালো বর্ণ ধারণ করেছে। তার কুঁচি দেওয়া স্কার্টটি, যাতে জলের ফোঁটার নকশা করা, যেটি আগে তার হাঁটুর নিচ পর্যন্ত পৌঁছাত, সেটি এখন তার ফুলে যাওয়া হাঁটু দুটোও ঢেকে রাখতে পারছে না।

তুমি দরজার কাছে থাকা টেবিলের কাছে ফিরে এলে নতুন মোমবাতি নিতে। এরপর আবার সেই কোনায় থাকা মৃতদেহটির কাছে ফিরে গেলে। নিভে যাওয়া মোমবাতির শেষ অংশ থেকে নতুন মোমবাতির সুতলিটা জ্বালিয়ে নিলে। একবার শিখা জ্বলে উঠলে তুমি নিভে যাওয়া মোমবাতিটি সরিয়ে নিলে এবং সাবধানে কাচের বোতলের ভেতর নতুনটি বসালে যেন হাত পুড়ে না যায়। তোমার আঙুলগুলো তখনও উষ্ণ মোমবাতির টুকরোটিকে আঁকড়ে ধরে আছে। তুমি নিচু হলে সেই তীব্র পচা গন্ধের সাথে যুদ্ধ করতে করতে তুমি নতুন শিখাটির হৃৎপিণ্ডের মতো জ্বলজ্বলে কেন্দ্রের দিকে তাকালে। এর স্বচ্ছ কিনারাগুলো অনবরত কাঁপছে; মনে হচ্ছে শিখাটি এই হলের ভেতর কুয়াশার মতো ঝুলে থাকা মৃত্যুর গন্ধকে পুড়িয়ে ফেলছে। শিখার কেন্দ্রের উজ্জ্বল কমলা আভার ভেতর মোহময় কিছু একটা আছে, যার উত্তাপ চোখেই বোঝা যাচ্ছে। তুমি দৃষ্টি আরও নিবদ্ধ করলে সেই নীলচে ছোট কেন্দ্রটির ওপর যা সুতলিটাকে আঁকড়ে ধরে আছে; এর কাঁপতে থাকা আকৃতিটা অনেকটা হৃৎপিণ্ডের মতো, অথবা হয়তো একটা আপেলের বীজের মতো। তুমি সোজা হয়ে দাঁড়ালে, কারণ এই গন্ধ সহ্য করার ক্ষমতা তোমার আর নেই। হলের আবছা অন্ধকারের ভেতর তুমি প্রতিটি মোমবাতির ওপর দিয়ে তোমার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলে; প্রতিটি মৃতদেহের পাশে মোমবাতির শিখাগুলো কাঁপছে ঠিক যেন নিথর চোখের মণি। হঠাৎ তোমার মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন জাগল; যখন শরীর মরে যায়, তখন আত্মার কী হয় ? হঠাৎ মনে হয়, দেহ মরলে আত্মা কোথায় যায় ? কতক্ষণ আত্মা দেহের পাশে থাকবে ? তুমি দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে  সাবধানে দেখছো আরও কোনও মোমবাতি পরিবর্তন করা দরকার কি না।

আমি হাঁটছি। জীবিতরা যখন মৃতদের দিকে তাকায়, তখন মৃতদের আত্মাও কি তাদের মুখের দিকে তাকায় না ? হলরুম ছাড়ার ঠিক আগে আবার ঘুরে দাঁড়াই। আত্মা কোথাও নেই। সেখানে শুধু মানুষ শুয়ে আছে নীরবতা আর ভয়ানক গন্ধ নিয়ে। শুরুতে মৃতদেহগুলোকে এই জিমনেসিয়ামে রাখা হয়নি; রাখা হয়েছিল প্রাদেশিক অফিসের অভিযোগ বিভাগের করিডোরে। সেখানে দুজন স্বেচ্ছাসেবী নারী ছিলেন, দুজনই তোমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। একজন স্কুলের চওড়া-কলারওয়ালা ইউনিফর্ম পরে ছিলেন, অন্যজন সাধারণ পোশাকে। তুমি এক মুহূর্তের জন্য ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলে, ভুলে গেলে যে তুমি কেন সেখানে এসেছো। দেখলে, তারা ভেজা কাপড় দিয়ে রক্তাক্ত মুখগুলো মুছে দিচ্ছে এবং শক্ত হয়ে যাওয়া হাতগুলোকে সোজা করে শরীরের পাশে নামিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

‘আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি ?’ ইউনিফর্ম পরা নারীটি জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তোমার দিকে ফেরার সময় তার মাস্কটি মুখের নিচে নামিয়ে আনলেন। তার গোল গোল চোখ দুটোই ছিল তার চেহারার সবচেয়ে সুন্দর অংশ, যদিও সেগুলো সামান্য একটু সামনের দিকে ঝোঁকানো। তার চুলগুলো দুটি বিনুনিতে বিভক্ত ছিল, যেখান থেকে ছোট ছোট কোঁকড়ানো চুল বেরিয়ে আসছিল। ঘামে ভেজা সেই চুলগুলো তার কপাল আর রগের সাথে লেপ্টে ছিল।

‘আমি একজন বন্ধুকে খুঁজছি,’ তুমি বললে। যে হাতটি দিয়ে তুমি তোমার নাক চেপে ধরেছিলে সেটি সরিয়ে নিলে; রক্তের সেই গন্ধ সহ্য করার অভ্যাস তখনও তোমার হয়নি।

‘তোমরা কি এখানে দেখা করবে বলে ঠিক করেছিলে ?’

‘না, ও… ও এদেরই একজন।’

‘বুঝেছি। তুমি চাইলে ভেতরে এসে একবার দেখে নিতে পারো।’

তুমি করিডোরের দেয়ালের পাশে শুইয়ে রাখা সেই কুড়ি-পঁচিশ জন মানুষের মুখ আর শরীরগুলো একে একে পরীক্ষা করলে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তোমাকে খুব কাছ থেকে দেখতে হচ্ছিল; খুব দ্রুতই তোমার চোখ জোড়া ক্লান্ত হয়ে এল, তোমাকে বারবার চোখ পিটপিট করে দৃষ্টি স্থির করতে হচ্ছিল।

‘এখানে নেই ?’ অন্য নারীটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তার ফ্যাকাসে সবুজ শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো ছিল। তুমি ভেবেছিলে তিনিও হয়তো ওই স্কুল ইউনিফর্ম পরা তরুণীটির সমবয়সী; কিন্তু মাস্ক ছাড়া তাকে দেখে মনে হলো তিনি কিছুটা বড়, বয়স হয়তো কুড়ির কাছাকাছি হবে। তার গায়ের রং ছিল কিছুটা হলদেটে এবং তার ঘাড় ছিল বেশ সরু আর সুদৃশ্য। কেবল তার চোখের দৃষ্টি ছিল দৃঢ় আর শক্তিশালী। তার কণ্ঠস্বরে কোনও দুর্বলতা ছিল না।

‘না।’

‘তুমি কি জন্নাম (ঔবড়হহধস) মর্গে খুঁজে দেখেছো ? আর রেড ক্রসের ওটাতে ?’

‘হ্যাঁ।’

‘ঐ বন্ধুর বাবা-মায়ের কী খবর ?’

‘ওর মা মারা গেছেন, আর বাবা দেজন-এ (উধবলবড়হ) কাজ করেন; ও ওর বড় বোনের সাথে আমাদের বাড়ির অ্যানেক্স বা লাগোয়া ঘরে থাকে।’

‘ওরা কি এখনও ট্রাঙ্ক-কল (দূরপাল্লার কল) সংযোগ দিচ্ছে না ?’

‘না, আমি কয়েকবার চেষ্টা করেছি।’

‘আচ্ছা, তোমার বন্ধুর বোনের কী খবর ?’

‘সে রবিবার থেকে বাড়ি ফেরেনি; আমি তাকেও খুঁজতে এখানে এসেছি। আমাদের এক প্রতিবেশী বললেন যে তিনি গতকাল আমার বন্ধুকে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছেন, যখন সৈন্যরা গুলি চালাচ্ছিল।’

‘এমন কি হতে পারে না যে সে শুধু আহত হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি আছে ?’ ইউনিফর্ম পরা নারীটি মুখ না তুলেই প্রশ্নটি ছুড়ে দিলেন।

তুমি মাথা নাড়ালে।

‘সেক্ষেত্রে সে নিশ্চয়ই আমাদের ফোন করার কোনও একটা উপায় বের করত। সে জানত যে আমরা তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করব।’

‘আগামীকাল আবার এসো এবং পরের কয়েক দিনও এখানে এসো,’ হালকা সবুজ শার্ট পরা নারীটি বললেন। ‘বোঝা যাচ্ছে এখন থেকে সব মৃতদেহ এখানেই নিয়ে আসা হবে। ওরা বলছে মর্গে আর কোনও জায়গা খালি নেই।’

ইউনিফর্ম পরা নারীটি একজন তরুণ যুবকের মুখ মুছে দিলেন, যার গলা বেয়নেট দিয়ে চিরে ফেলা হয়েছে, তার লাল আলজিভটা বেরিয়ে আছে। তিনি তার হাতের তালু যুবকের অপলক চোখের ওপর বুলিয়ে দিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দিলেন, এরপর বালতির জলে কাপড়টি ধুয়ে নিলেন এবং অত্যন্ত জোরে সেটি নিংড়ালেন। কাপড় নিংড়ে বের হওয়া জল ছিল রক্তে কালচে, যা বালতির বাইরেও ছিটে পড়ল। সবুজ শার্ট পরা নারীটি উঠে দাঁড়ালেন।

‘তোমার হাতে সময় থাকলে আমাদের একটু সাহায্য করবে কি ?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ‘শুধু আজকের জন্য। আমাদের যথেষ্ট লোক নেই। কাজটা খুব কঠিন নয়… তোমাকে শুধু ওই কাপড়টা কেটে টুকরো করতে হবে এবং সেগুলো দিয়ে মৃতদেহগুলো ঢেকে দিতে হবে। আর যখন কেউ তোমার মতো বন্ধুর খোঁজে আসবে, তুমি শুধু কাপড় সরিয়ে দেবে। মুখগুলো খুব বাজেভাবে জখম হয়েছে, তাই তাদের শরীর আর পোশাক দেখে নিশ্চিত হতে হবে যে তারা কাদের খুঁজছে।’

সেই দিন থেকে তুমি তাদের দলের একজন হয়ে গেলে। যেমনটা তুমি আন্দাজ করেছিলে, ইউন-সুক ছিল হাই স্কুলের শেষ বর্ষের ছাত্রী।

ইউন-সুক এবং সোন-জু উভয়েই জন্নাম ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়েছিলেন, যখন তারা রাস্তায় মাইকিং শুনতে পান যে মানুষ রক্তের অভাবে মারা যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে তারা শুনতে পান যে প্রাদেশিক অফিস, যা এখন সাধারণ নাগরিকরাই পরিচালনা করছে, সেখানে কর্মীর খুব অভাব। সেই মুহূর্তের চরম বিশৃঙ্খলার মাঝে তারা মৃতদেহগুলো সামলানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।

শ্রেণিকক্ষে, যেখানে উচ্চতা অনুযায়ী বসার জায়গা ঠিক করা হতো, তুমি সবসময় একদম সামনের সারিতে বসতে, অন্য কথায় তুমি ছিলে ক্লাসের সবচেয়ে খাটো ছেলে। মার্চ মাস থেকে, যখন তুমি মিডল স্কুলের তৃতীয় বর্ষ শুরু করলে, তোমার শরীরে বয়ঃসন্ধির ছাপ পড়তে শুরু করে; যার ফলে তোমার কণ্ঠস্বর কিছুটা ভারী হয় এবং উচ্চতাও সামান্য বাড়ে। কিন্তু তবু তোমাকে তোমার বয়সের তুলনায় অনেক ছোট দেখাত। জিন-সুর কাজ মূলত ব্রিফিং রুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; প্রথমবার যখন সে তোমাকে দেখল, সে বেশ অবাক হয়েছিল।

‘তুমি ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র, তাই না ? এটা তোমার থাকার মতো জায়গা নয়।’ জিন-সুর গভীর পলকহীন চোখ আর লম্বা চোখের পাপড়িগুলো ছিল প্রায় মেয়েলি; সে সিউলের যে ইউনিভার্সিটিতে পড়ত সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে গোয়াংজুতে ফিরে এসেছিল।

তুমি তাকে বললে, ‘না,’ আমি থার্ড ইয়ারে পড়ি। আর এখানে কাজ করতে আমার কোনও সমস্যা নেই।’

এটা কোনও বাহাদুরি ছিল না; তোমাকে যে কাজগুলো দেওয়া হয়েছিল তা টেকনিক্যালি কঠিন কিছু ছিল না। সোন-জু এবং ইউন-সুক ইতিমধ্যে ভারী কাজের বেশির ভাগই করে ফেলেছিলেন, যার মধ্যে ছিল প্লাস্টিক দিয়ে প্লাইউড বা স্টাইরোফোম বোর্ডগুলো ঢাকা দেওয়া এবং তারপর সেই বোর্ডগুলোর ওপর মৃতদেহগুলো তুলে রাখা। তারা মৃতদেহগুলোর ঘাড় এবং মুখ জল দিয়ে ধুয়ে দিতেন, জট পাকানো চুলগুলো চিরুনি দিয়ে একটু আঁচড়ে গুছিয়ে দিতেন, তারপর দুর্গন্ধ কমাতে শরীরগুলো প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে দিতেন। এর ফাঁকে তুমি তোমার লেজারে তাদের লিঙ্গ, আনুমানিক বয়স, তারা কী পোশাক পরে ছিল এবং কোন ব্র্যান্ডের জুতো ছিল সেসবের নোট নিতে এবং প্রতিটি মৃতদেহকে একটি করে নম্বর দিতে। এরপর তুমি একই নম্বর একটি কাগজের টুকরোয় লিখতে, সেটি মৃতদেহের বুকে পিন দিয়ে আটকে দিতে এবং সাদা কাপড় দিয়ে তাদের গলা পর্যন্ত ঢেকে দিতে। এরপর ইউন-সুক এবং সোন-জু তোমাকে সাহায্য করতেন সেগুলো দেয়ালের পাশে টেনে নিয়ে যেতে। জিন-সু, যাকে দেখে মনে হতো সে সবসময় ভীষণ ব্যস্ত, দিনে কয়েকবার তোমার কাছে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসতেন। তিনি চাইতেন তোমার লেজারে নথিবদ্ধ তথ্যগুলো পোস্টারে লিখে ভবনের প্রধান প্রবেশপথে টাঙিয়ে দিতে। প্রচুর মানুষ যারা তাদের স্বজনদের খুঁজছিল, তারা হয় নিজেরা সেই পোস্টার দেখে আসত, অথবা অন্য কারও কাছে শুনে আসত। যদি কেউ সঠিকভাবে স্বজনকে শনাক্ত করতে পারত, তবে তুমি কিছুটা দূরে গিয়ে সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখে অপেক্ষা করতে যতক্ষণ না তাদের কান্না আর বিলাপ থামছে। যেহেতু মৃতদেহগুলোকে কেবল প্রাথমিক তদারকি করা হয়েছিল, তাই শোকাতুর স্বজনদের ওপরই দায়িত্ব পড়ত তুলা দিয়ে মৃতদের নাক ও কান বন্ধ করে দেওয়া এবং তাদের পোশাক বদলে দেওয়া। একবার যখন তাদের পোশাক পরিয়ে কফিনে রাখা হতো, তখন তোমার কাজ ছিল জিমনেসিয়ামে সেগুলোর স্থানান্তর তদারকি করা এবং তোমার লেজারে সবকিছুর নোট রাখা।

জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হচ্ছিল, যা শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর জন্য আয়োজিত একটি সংক্ষিপ্ত এবং অনানুষ্ঠানিক স্মৃতিসভায় পরিবেশিত হয়েছিল, যখন তাদের মৃতদের আনুষ্ঠানিকভাবে কফিনে রাখা হয়েছিল। কফিনের ওপর জাতীয় পতাকা ‘তেগুকগি’ বিছিয়ে দেওয়া এবং শক্ত করে বেঁধে রাখাটাও ছিল খুব অদ্ভুত এক দৃশ্য। তুমি কেন সেই মানুষদের জন্য জাতীয় সঙ্গীত গাইবে যাদের সৈন্যরা হত্যা করেছে ? কেন কফিনগুলোকে ‘তেগুকগি’ দিয়ে ঢেকে রাখা হবে ? যেন এটি সেই রাষ্ট্রই বা জাতি ছিল না যারা তাদের হত্যা করেছে।

যখন তুমি সংকোচের সাথে এই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করলে, ইউন-সুক-এর গোল গোল চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল।

‘কিন্তু সেনাবাহিনীর জেনারেলরা তো বিদ্রোহী, তারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। তুমি নিশ্চয়ই দেখেছো: দিনের আলোয় মানুষকে মারধর করা হচ্ছে, ছুরিকাঘাত করা হচ্ছে, এমনকি গুলিও করা হচ্ছে। সাধারণ সৈন্যরা তো কেবল তাদের ঊর্ধ্বতনদের আদেশ পালন করছিল। তুমি কীভাবে তাদের রাষ্ট্র বা জাতি বলতে পারো ?’

তোমার কাছে এটি বিভ্রান্তিকর মনে হলো, যেন এটি তোমার করা প্রশ্নের বদলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রশ্নের উত্তর ছিল। সেই বিকেলে একের পর এক মৃতদেহ শনাক্ত হতে শুরু হলো এবং করিডোর জুড়ে বিভিন্ন স্থানে একই সাথে অনেক কফিনে কাপড় জড়ানোর অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। জাতীয় সঙ্গীত বারবার গাওয়া হচ্ছিল, কান্নার অবিরত শব্দের সাথে সেই সুরের এক একটি পঙ্ক্তি যেন সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছিল। তুমি শ্বাসরুদ্ধকর এক নিস্তব্ধতা নিয়ে সেই সূক্ষ্ম অমিল বা অসামঞ্জস্যগুলো শুনতে থাকলে। যেন এটিই শেষমেশ তোমাকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে যে প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র বা জাতি কী ছিল।

পরদিন সকালে, তুমি এবং ওই দুই নারী মিলে সবচেয়ে পচন ধরা মৃতদেহগুলোর কয়েকটি প্রাদেশিক অফিসের পেছনের আঙিনায় বের করে নিয়ে এলে। এত বেশি নতুন মৃতদেহ আসছিল যে সেগুলোকে ভেতরে রাখার আর কোনও জায়গা ছিল না। ব্রিফিং রুম থেকে জিন-সু দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন, বরাবরের মতোই তৎপর তিনি; এসে জানতে চাইলেন যদি বৃষ্টি নামে তবে তোমাদের পরিকল্পনা কী। তিনি যখন করিডোরের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে দেখছিলেন তখন তার কপালে ভাঁজ পড়ল; সেখানে দেয়ালের সাথে ঘেঁষে মৃতদেহগুলো স্তূপ করে রাখা ছিল। সন-জু তার মাস্কটা খুলে ফেললেন।

‘এখানে জায়গা খুব কম,’ সে বলল, ‘আর কোনও উপায় নেই। সন্ধ্যায় আরও মৃতদেহ আসবে বলে মনে হচ্ছে, তখন আমরা কী করব ? মিউনিসিপ্যাল জিমনেসিয়ামের কী খবর ? সেখানে কি পর্যাপ্ত জায়গা নেই ?’

এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে জিন-সুর পাঠানো চারজন লোক সেখানে হাজির হলো। তারা নিশ্চয়ই কোথাও পাহারায় ছিল, কারণ তাদের কাঁধে রাইফেল ঝোলানো ছিল এবং তারা দাঙ্গা পুলিশের ফেলে যাওয়া ভিসারযুক্ত হেলমেট পরে ছিল। তারা যখন মৃতদেহগুলো একটি ট্রাকে তুলছিল, তুমি এবং ওই দুই নারী মিলে টুকিটাকি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলে। এরপর শান্ত বিকেলের আলোয় ট্রাকটিকে অনুসরণ করে তোমরা হেঁটে হেঁটে জিমনেসিয়ামের দিকে রওনা দিলে।

রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল ছিল। একটি তরুণ জিঙ্কো গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় গাছের একটি ডাল নিচে নেমে এসেছে। গাছের ডালটি তুমি ধরে রেখে কোনও অর্থ ছাড়াই ছেড়ে দিয়েছো যার মধ্যে নিচু ডালটি তোমার কপাল ছুঁয়ে গেল। ইউন-সুক পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল এবং সে-ই প্রথম জিমনেসিয়ামে প্রবেশ করল। যখন তুমি ভেতরে ঢুকলে, দেখলে সে কফিনে ঠাসা হলরুমের দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে। তার হাতের তালুতে আঁকড়ে ধরা সুতির দস্তানাগুলো কালচে রক্তের দাগে ছোপ ছোপ হয়ে আছে। সন-জু, যে সবার পেছনে আসছিল, সে সামনে এগিয়ে এল এবং তার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলগুলো একটি রুমাল দিয়ে বেঁধে নিল।

‘আমি বুঝতে পারিনি ওরা সবাইকে এখানে নিয়ে আসছে… একসাথে সবাইকে দেখে, হে ঈশ্বর, এখানে কত মানুষ।’

তুমি শোকাতুর পরিবারগুলোর দিকে তাকালে, যারা প্রায় পিঠাপিঠি হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। প্রতিটি পরিবার তাদের পাহারায় থাকা কফিনের ওপর একটি করে বাঁধানো প্রতিকৃতি (ছবি) রেখেছিল। কিছু কফিনের মাথার পাশে এক জোড়া করে কাচের ফান্টা (ঋধহঃধ) বোতল দাঁড় করানো ছিল। একটি বোতলে এক গুচ্ছ সাদা ফুল রাখা, আর অন্যটিতে একটি মোমবাতি। সেই সন্ধ্যায়, তুমি যখন জিন-সুর কাছে এক বাক্স মোমবাতি চাইলে, সে উৎসাহের সাথে মাথা নাড়ল।

‘অবশ্যই, মোমবাতি দিলে ওই গন্ধটা দূর হবে।’

তুমি যখনই জিন-সুকে বলতে যে তোমার কিছু প্রয়োজন, তা সে সুতির কাপড় হোক, কাঠের কফিন, কাগজের টুকরো কিংবা পতাকা, সে সাথে সাথে তার নোটবুকে সেটা টুকে নিত এবং একই দিনের মধ্যে সেগুলো যেন জাদুর মতো হাজির হয়ে যেত। সে সন-জুকে বলেছিল যে প্রতি সকালে সে ডেইন (উধবরহ) অথবা ইয়াংডং (ণধহমফড়হম) বাজারে যায়; আর সেখানে কিছু না পাওয়া গেলে সে শহরের সমস্ত ছুতারের দোকান, শেষকৃত্যের দোকান এবং কাপড়ের দোকানে হানা দেয়। সভায় সংগৃহীত অনুদান থেকে তখনও অনেক টাকা বাকি ছিল। আর যখন সে বলত যে সে প্রাদেশিক অফিসের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছে, অনেকে তাঁকে বড় ছাড় দিত, আবার কেউ কেউ একদমই টাকা নিত না। তাই টাকা কোনও সমস্যা ছিল না। কিন্তু এখন শহরে কফিন ফুরিয়ে গেছে, তাই সে যতটুকু পেরেছে প্লাইউড জোগাড় করেছে এবং ছুতারদের কাছে নতুন এক ব্যাচ কফিন তৈরির অর্ডার দিয়েছে।

পরদিন সকালে জিন-সু প্রতিটি বক্সে ৫০টি করে মোমবাতি থাকা পাঁচটি বক্স এবং দিয়াশলাই নিয়ে হাজির হলো। তুমি ভবনের প্রতিটি কোনা খুঁজে দেখলে এবং পানীয়র খালি বোতলগুলো সংগ্রহ করলে যা মোমবাতি রাখার স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা যায়। শোকসন্তপ্ত মানুষগুলো প্রবেশপথের টেবিলের কাছে লাইনে দাঁড়াল, আর তুমি প্রতিটি মোমবাতি জ্বালিয়ে বোতলের ভেতর বসিয়ে দিলে। এরপর তারা সেই বোতলগুলো বহন করে তাদের স্বজনের কফিনের কাছে নিয়ে গেল এবং মাথার পাশে রেখে দিল। সেখানে পর্যাপ্ত মোমবাতি ছিল।

সেই অন্ধকার ঘরটি যা প্যান্ট্রি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তারপর তুমি জানতে, সে প্যান্ট্রির বড় দরজাটা খুলে সেখান থেকে কেকগুলো বের করে আনবে যেগুলো কোনও আত্মীয়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে উৎসর্গ করার জন্য সেখানে রাখা হতো: তেলের পিঠা, মধু আর চালের গুঁড়োর তৈরি ব্লক আকৃতির কেক। সে তোমার দিকে তাকিয়ে হাসত, হাসলে তার চোখ দুটো সরু চেরার মতো হয়ে যেত। আর তোমার ঠাকুমা, তাঁর মৃত্যু ছিল ঠিক তেমনই এক প্রশান্ত আর নিরুদ্বেগ ঘটনা যেমনটা তিনি নিজে ছিলেন। কিছু একটা যেন তাঁর মুখের ওপর দিয়ে ঝাপটে উড়ে গিয়েছিল, ঠিক যেন কোনও বন্ধ খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়া একটি পাখির মতো। তুমি তাঁর কোঁচকানো মুখের সামনে হাঁ করে দাঁড়িয়েছিলে, হঠাৎ অবাক হয়ে ভেবেছিলে পাখির মতো সেই ডানাওয়ালা চঞ্চল জিনিসটা কোথায় হারিয়ে গেল ? এখন জিমনেসিয়ামে যারা আছে তাদের কী হবে, তাদের আত্মাও কি পাখির মতো শরীর থেকে পালিয়ে গেছে ? তারা কোথায় যেতে পারে ? সেটি নিশ্চয়ই রোববার স্কুলের সেই স্বর্গ বা নরকের মতো কোনও ভিনদেশি জায়গা নয়, যেখানে তুমি আর তোমার বন্ধুরা একবার চকোলেট ইস্টার এগের লোভে গিয়েছিলে। তোমরা টিভিতে দেখা ঐতিহাসিক নাটকগুলো দেখে নিশ্চিত ছিলে যে মৃতদের আত্মা সবসময় ভয়ংকর কোনও মূর্তি হবে, সাদা পোশাকে ঢাকা আর কুয়াশার মাঝে এলোমেলো চুলে ঘুরে বেড়ানো কোনও অতৃপ্ত আত্মা।

তুমি অনুভব করলে তোমার মাথায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। ওপরের দিকে তাকালে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তোমার গাল আর কপালে আছড়ে পড়ছে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আলাদা আলাদা ফোঁটাগুলো মিলেমিশে পুরু ধারায় পরিণত হলো এবং প্রচণ্ড গতিতে ঝরতে শুরু করল।

মাইক্রোফোন হাতে থাকা লোকটি চিৎকার করে বলছেন, ‘অনুগ্রহ করে সবাই বসুন। শোকসভা এখনও শেষ হয়নি। এই বৃষ্টি হলো মৃত আত্মাদের ঝরানো চোখের জল।’

শীতল বৃষ্টির জল তোমার ইউনিফর্মের কলারের ভেতর দিয়ে ঢুকে পিঠ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আত্মাদের চোখের জল শীতল হয়, তাই না ? তোমার বাহুতে আর পিঠে কাঁটা দিয়ে উঠল যখন তুমি মূল দরজার ওপর ঝুলে থাকা কার্নিশের নিচে আশ্রয় নিতে ছুটলে। প্রাদেশিক অফিসের সামনের গাছগুলো বৃষ্টির তোড়ে চাবুক খাওয়ার মতো কাঁপছে। দরজার সবচেয়ে কাছের সিঁড়িটাতে উবু হয়ে বসে তুমি তোমার জীববিদ্যা ক্লাসের পঞ্চম পিরিয়ডের সেই উদ্ভিদ শ্বসন প্রক্রিয়ার পাঠের কথা মনে করলে, যখন জানলা দিয়ে রোদের ঝিলিক আসত। গাছপালা, তোমাকে বলা হয়েছিল, অন্য এক জগতের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে। যখন সূর্য ওঠে, তারা দীর্ঘ আর বিলাসী এক চুমুকে তার রশ্মি পান করে। আর যখন সূর্য ডুবে যায়, তারা নিজেদের ভেতর থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডের এক বিশাল স্রোত বের করে দেয়। ওই গাছগুলো সেখানে অটল ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যারা বৃষ্টির এই প্রবল আক্রমণের নিচে নুইয়ে পড়ছে। যদি এই ঘটনা না ঘটত, তবে গত সপ্তাহে তুমি হয়তো তোমার মিডটার্ম পরীক্ষায় বসে থাকতে।

আজ রবিবার; কোনও পরীক্ষা না থাকায় অন্য কোনও পৃথিবী হলে হয়তো তুমি এতক্ষণে দেরি করে ঘুম থেকে উঠতে এবং তারপর জং-দাইয়ের সাথে উঠানে ব্যাডমিন্টন খেলতে। সেই অন্য জগতের সময়টা এখন আর গত সপ্তাহের তুলনায় বেশি বাস্তব মনে হয় না। গত রবিবার ঘটনাটি ঘটেছিল। তুমি যখন স্কুলের সামনের বইয়ের দোকান থেকে কিছু প্র্যাকটিস পেপার কিনতে একা গিয়েছিলে, তখন সশস্ত্র সৈন্যদের দেখে ভয়ে তুমি নদীর ধারের একটি গলিতে ঢুকে পড়লে। তোমার উলটো দিক দিয়ে এক দম্পতি আসছিলেন; পুরুষটির পরনে ছিল স্যুট আর হাতে বাইবেল ও স্তোত্রবই, আর নারীটির পরনে ছিল গাঢ় নীল রঙের পোশাক। তাঁদের কথা বলার ধরন দেখে তোমার মনে হয়েছিল তারা হয়তো নবদম্পতি। হঠাৎ রাস্তার ওপর দিক থেকে কয়েকবার তীক্ষè চিৎকার শোনা গেল এবং রাইফেল ও লাঠি হাতে তিনজন সৈন্য পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এল এবং সেই তরুণ দম্পতিকে ঘিরে ধরল। মনে হলো তারা কাউকে তাড়া করছিল এবং ভুল করে এই গলিতে ঢুকে পড়েছে।

‘কী হয়েছে ? আমরা তো গির্জায় যাচ্ছিলাম…’

স্যুট পরা লোকটির কথা শেষ হওয়ার আগেই তুমি দেখলে একজন মানুষের হাত যা যা হতে পারে বলে তুমি কখনও ভাবোনি সেই হাত, পিঠ আর পায়ের ওপর যা ঘটছিল তা সহ্য করার ক্ষমতা তোমার ছিল না। একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। ‘বাঁচাও!’ বলে লোকটি চিৎকার করছিল, তার কণ্ঠস্বর তখন একদম ভেঙে গেছে। সৈন্যরা লোকটিকে লাঠি দিয়ে পেটাতেই থাকল যতক্ষণ না তার নড়তে থাকা পা দুটো স্থির হয়ে গেল। নারীটি সেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছিলেন যখন তার আসলে পিছু হটে যাওয়া উচিত ছিল; তুমি দেখলে তারা তার চুল ধরে হ্যাঁচকা টান দিল, কিন্তু এরপর আর কী হয়েছিল তা তুমি জানো না। কারণ তখন তুমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হামাগুড়ি দিয়ে পরের রাস্তায় চলে গিয়েছিলে―এমন এক দৃশ্য যা তোমার অভিজ্ঞতার সীমানারও বাইরে ছিল।

হঠাৎ কাঁধের ওপর একটি হাতের স্পর্শে তুমি আতঙ্কে মাথা ঝাঁকিয়ে উঠলে। এক চিলতে সুতোয় জড়ানো একটি সরু হাত, যা দেখে মনে হচ্ছে কোনও ভঙ্গুর প্রেতাত্মা।

‘ডং-হো।’

ইউন-সুক, যার বিনুনি থেকে শুরু করে জিন্সের প্যান্টের নিচ পর্যন্ত ভিজে একাকার, সে তোমার ওপর ঝুঁকে হাসল। তোমার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, তুমি বিনিময়ে একটি ম্লান হাসি দিলে।

‘আরে বোকা, ভূতের আবার হাত দিয়ে কী কাজ ?’

‘আমি আরও আগে ফিরতে চেয়েছিলাম; দুঃখিত তুমি এই বৃষ্টিতে আটকে গেলে… আমি ভাবছিলাম আমি চলে গেলে হয়তো অন্যরাও চলে যেতে শুরু করবে। বিশেষ কিছু কি ঘটেছে ?’

তুমি মাথা নাড়ালে। ‘না, কেউ কাউকে খুঁজতে আসেনি। কোনও পথচারীও এদিকে আসেনি।’

‘স্মৃতিসভায় তেমন লোক আসেনি।’

ইউন-সুক তোমার পাশে উবু হয়ে বসল এবং তার হুডির পকেট থেকে একটি স্পঞ্জ কেক বের করল; মোড়ক খোলার খসখস শব্দ হলো। এরপর সে একটি দইয়ের পাত্র বের করল।

‘গির্জার সিস্টাররা এগুলো দিচ্ছিলেন, ভাবলাম আমিও কয়েকটা নিয়ে যাই।’

তুমি যে ক্ষুধার্ত ছিলে তা নিজেও বুঝতে পারোনি; তুমি প্লাস্টিকের মোড়কটি ছিঁড়ে স্পঞ্জ কেকটি মুখে পুরলে। ইউন-সুক দইয়ের পাত্রের ঢাকনাটি খুলে তোমার হাতে বাড়িয়ে দিল।

‘আমি আপাতত এখানেই থাকব; তুমি বাড়ি গিয়ে পোশাক বদলে আসতে পারো। যদি কেউ আসার থাকত, তবে এতক্ষণে এসে চলেও যেত।’

‘না, তুমি যাও, আমি খুব একটা ভিজিনি,’ মুখে কেক নিয়েই বিড়বিড় করে তুমি বললে। তুমি কেকটি গিলে ফেললে এবং বড় এক চুমুকে দইটুকু খেয়ে নিলে।

‘প্রাদেশিক অফিস বা এই জিমনেসিয়ামে তো বাড়ির মতো আরাম নেই,’ ইউন-সুক খুব মোলায়েমভাবে বলল। ‘আর তুমি বেশ কিছুদিন ধরে অনেক খাটাখাটনি করছো…’

তুমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠলে; তুমি জানো তোমার শরীর থেকে ঘামের দুর্গন্ধ আসছে। অ্যানেক্সের ছোট বাথরুমে যখনই তুমি সময় পাও, চট করে মাথায় জল ঢেলে নেওয়ার চেষ্টা করো। লাশের সেই পচা গন্ধ তোমার চামড়ার সাথে মিশে গেছে বলে মনে হয়, তাই রাতে তুমি বালতি বালতি ঠান্ডা জল শরীরে ঢালো; শীতে তোমার দাঁতে দাঁত লাগে আর তুমি প্রচণ্ড হাঁচি দাও। এখন মনে হচ্ছে ওসব না করলেও চলত।

‘আমি স্মৃতিসভায় শুনলাম যে সেনাবাহিনী আজ রাতে আবার শহরে ঢুকে পড়বে। যদি বাড়ি যাও, তবে ওখানেই থেকো। আজ রাতে আর আসার চেষ্টা করো না।’

ইউন-সুক তার কাঁধ দুটো ঝাঁকালো, তার বিনুনি থেকে বেরিয়ে আসা ছোট ছোট চুলগুলো তার ঘাড়ের কাছে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। তুমি নিঃশব্দে তাকে লক্ষ করলে সে তার ভিজে চুলগুলো আঙুল দিয়ে ঠিক করছে আর সোয়েটারের ওপর থেকে ময়লা ঝেড়ে ফেলছে। তার মুখটি, যাতে আগে এক ধরনের গোলগাল মায়াবি ভাব ছিল, গত কয়েক দিনে সেটি বেশ বসে গেছে। তুমি তার চোখের দিকে তাকালে, যা এখন কোটরাগত আর কালো ছায়ায় ঢাকা। তুমি ভাবলে, মানুষ যখন বেঁচে থাকে, তখন ওই ‘পাখি’ বা আত্মাটি শরীরের ঠিক কোথায় থাকে ? ওই কপালে থাকা ভাঁজগুলোর ভেতর ? মাথার ওই সাদাটে তালুর ওপর ? নাকি হৃৎপিণ্ডের কোনও কুঠুরিতে ?

তুমি কেকের শেষ অংশটুকু মুখে পুরলে এবং এমন ভান করলে যেন সেনাবাহিনী নিয়ে ইউন-সুক যা বলল তা তুমি শোনোনি।

‘একটু ঘাম হলে কী আর হয় ?’ তুমি বললে। ‘মানুষ তো বৃষ্টিতে ভিজলেও পোশাক বদলায়।’

ইউন-সুক তার পকেট থেকে আরেকটা দই বের করল।

‘এটা আসলে সন-জুর জন্য ছিল… এটা ধীরে সুস্থে খাও, গপাগপ গিলতে যেও না। কেউ তোমার মুখ থেকে এটা কেড়ে নেবে না!’

তুমি লোভাতুর ভঙ্গিতে ওটা গ্রহণ করলে, নখ দিয়ে ঢাকনাটি খুললে এবং হাসলে।

সন-জু, ইউন-সুকের মতো চুপি চুপি আসে না। সে যখন হেঁটে আসছিল, তখনও সে বেশ কয়েক মিটার দূরে, সেখান থেকেই সে তার পরিষ্কার এবং জোরালো গলায় তোমার নাম ধরে ডাকল।

‘কেউ আসেনি ?’ সে প্রশ্ন করল, তোমার যথেষ্ট কাছে আসতেই যাতে তাকে চিৎকার করতে না হয়।

‘তুমি কি এতক্ষণ একাই এখানে ছিলে ?’ সে তোমার পাশের সিঁড়িতে ধপ করে বসে পড়ল এবং তোমার দিকে ফয়েল পেপারে মোড়ানো এক রোল কিমবাপ (শরসনধঢ়) বাড়িয়ে দিল। তুমি তোমার আঙুল দিয়ে এক টুকরো কিমবাপ তুলে মুখে পুরলে, আর সন-জু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ক্রমশ কমে আসা বৃষ্টির দিকে।

‘তাহলে তুমি এখনও তোমার বন্ধুর খোঁজ পাওনি ?’ কোনও ভূমিকা ছাড়াই প্রশ্নটি তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, উত্তর দেওয়ার আগে তোমার এক মুহূর্ত সময় লাগল মাথা নেড়ে ‘না’ বলতে।

‘আচ্ছা,’ সন-জু বেশ দ্রুততার সাথে বলতে থাকল, ‘যেহেতু এখন পর্যন্ত তুমি কোনও খোঁজ পাওনি, সৈন্যরা হয়তো তাকে অন্য কোথাও কবর দিয়ে দিয়েছে।’ তুমি তোমার বুক ডললে; শুকনো সামুদ্রিক শৈবালে মোড়ানো ভাতের সেই দলাটি হঠাৎ গিলতে তোমার কষ্ট হতে লাগল। ‘সেদিন আমি সেখানেই ছিলাম, তুমি তো জানো। সৈন্যরা যাদের খুব কাছ থেকে গুলি করেছিল তাদের তুলে নিয়ে ট্রাকে ভরেছিল।’ পরের কথাগুলো আন্দাজ করে তুমি দ্রুত কথা বলে উঠলে।

‘তুমি একদম ভিজে গেছো,’ তুমি বললে, ‘তোমার বাড়ি গিয়ে পোশাক বদলে আসা উচিত। ইউন-সুক ইতিমধ্যেই চলে গেছে।’

‘কীসের জন্য ? আজ সন্ধ্যায় যখন আমরা আবার কাজ শুরু করব, তখন তো এমনিতেই বালতি বালতি ঘাম ঝরবে।’ সন-জু অ্যালুমিনিয়ামের খালি ফয়েলটি ভাঁজ করতে করতে আঙুলের সমান ছোট করে ফেলল এবং বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাতে ওটা ধরে রাখল। তার প্রোফাইল বা মুখের একপাশ দেখে তাকে বেশ ধীরস্থির এবং সংকল্পবদ্ধ মনে হচ্ছিল, আর তোমার মনের ভেতর একটি প্রশ্ন বুদ্বুদ কাটছিল:

আজ যারা এখানে থেকে যাবে, তারা কি সত্যিই সবাই মারা পড়বে ?

তুমি ইতস্তত করলে, এবং এই চিন্তাগুলো মুখে না বলাই ভালো মনে করলে। যদি সত্যিই তেমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে হয়, তবে তো সবারই উচিত প্রাদেশিক অফিস ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে থাকা। কেন কেউ চলে যাচ্ছে আর কেউ থেকে যাচ্ছে ? সন-জু ফয়েলের টুকরোটি ফুলের বাগানের দিকে ছুড়ে মারল, তার খালি হাতটি একবার পরীক্ষা করল এবং তারপর বেশ জোরে জোরে তার ক্লান্ত চোখ, গাল, কপাল এমনকি কানেও ঘষতে লাগল।

‘আমি আর চোখ খুলে রাখতে পারছি না। আমি বরং একটু অ্যানেক্স-এর দিকে যাই… সেখানকার কোনও সোফায় একটু আরাম করে ঘুমিয়ে নিই। সেই ফাঁকে আমার কাপড়গুলোও শুকিয়ে নিতে পারব।’ সন-জু হাসল, তার সামনের গোছানো দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল। ‘বেচারা ডং-হো, আমি তোমাকে আবার একা ফেলে যাচ্ছি!’

হয়তো সন-জু-ই সঠিক; হয়তো সৈন্যরা জং-দাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে কোথাও কবর দিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, তোমার মা এখনও নিশ্চিত যে তাকে কোনও একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে; আর কেবল সে কারণেই সে এখনও কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি, কারণ সে এখনও জ্ঞান ফিরে পায়নি। গতকাল বিকেলে তোমার মা তোমার মেজো ভাইকে নিয়ে এখানে এসেছিলেন তোমাকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য রাজি করাতে। যখন তুমি জেদ ধরলে যে জং-দাইকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তুমি বাড়ি ফিরবে না, তিনি বলেছিলেন, ‘ও তো আইসিইউ-তে আছে; তোমাদের উচিত সব হাসপাতালগুলো একসাথে খুঁজে দেখা।’

তিনি তোমার ইউনিফর্মের হাতা আঁকড়ে ধরেছিলেন।

‘তুমি জানো না যখন মানুষ বলল যে তোমাকে এখানে দেখা গেছে আমি কতটা চমকে উঠেছিলাম ? ঈশ্বর, এত এত লাশ; তুমি কি ভয় পাচ্ছ না ?’

‘সৈন্যরাই ভয়ের কারণ,’ তুমি সামান্য হেসে বলেছিলে। ‘মৃতদের ভয় পাওয়ার কী আছে ?’

তোমার মেজো ভাই ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তোমার ভাই, সেই জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্র, যে তার শৈশবে পড়ালেখা ছাড়া আর কিছুই চিনত না, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বারবার হোঁচট খাওয়ার মতো ভুল করেছিল। বর্তমানে সে তার তৃতীয়বারের মতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। সে দেখতে তোমার বাবার মতো চওড়া মুখ আর ঘন দাড়িওয়ালা, যার কারণে তাকে তার উনিশ বছর বয়সের চেয়েও অনেক বেশি বয়স্ক দেখায়। অন্যদিকে, তোমার বড় ভাই, সিউলে কর্মরত নবম গ্রেডের সিভিল সার্ভেন্ট, অনেক বেশি সুঠাম দেহের অধিকারী, তুমি তাকে প্রায় সুন্দরই বলতে পারো। যখন সে গোয়াংজু-তে ছুটিতে ফিরে আসত এবং তোমরা তিন ভাই একসাথে হতে, তখন মেজো ভাইকেই সবাই বড় মনে করত।

‘স্পেশাল ওয়ারফেয়ার কমান্ডের প্যারাট্রুপাররা, তাদের ট্যাঙ্ক আর মেশিনগান নিয়ে তুমি সত্যিই ভাবো, তারা একদল বেসামরিক মানুষকে দেখে কাঁপছে যারা কেবল হাততালি দিয়েছে আর যুদ্ধের সময়কার পুরোনো রাইফেল হাতে নিয়েছে ? তুমি কী মনে করো তারা কেন শহরে আবার ঢোকেনি ? তারা তাদের সময় নিচ্ছে এবং উচ্চতর আদেশের অপেক্ষায় আছে। তারা যদি ফিরে আসে, তবে তোমাকে মেরে ফেলা হবে।’

তুমি এক পা পিছিয়ে গেলে, চিন্তিত ছিলে যে সে হয়তো তোমার কানে একটা চড় কষিয়ে দেবে।

‘ওরা আমাকে মারতে যাবে কেন ?’ তুমি বললে। ‘আমি তো কেবল কয়েকটা কাজে সাহায্য করছি, ব্যস।’ তুমি তোমার মায়ের আঁকড়ে ধরা হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলে। ‘চিন্তা করো না, আমি সাহায্য শেষ করেই বাড়ি ফিরে আসব। জং-দাইকে খুঁজে পেলেই আমি চলে আসব।’

তুমি জিমনেসিয়ামের ভেতর দৌড়ে ঢুকলে এবং কাঁধের ওপর দিয়ে এক হাত নেড়ে বিদায় জানালে।

আকাশ, যা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছিল, হঠাৎ করেই চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তুমি উঠে দাঁড়ালে এবং ভবনের ডান দিক দিয়ে হেঁটে গেলে। চত্বরটি এখন কার্যত জনশূন্য, কারণ ভিড় ততক্ষণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। কেবল শোকার্ত পরিবারগুলোর কিছু অবয়ব ফোয়ারার কাছে দুই-তিনজনের ছোট ছোট দলে জমা হয়ে আছে। বিলাপ করতে থাকা সেই শোকার্ত মানুষগুলো এবং একদল পুরুষ যারা কফিনগুলো নিচ থেকে একটি ট্রাকে তুলছিল। তীব্র আলোর এই ঝাপটায় তোমার চোখের পাতা কাঁপছে। মুহূর্তের মধ্যে সেই কাঁপুনির রেশ তোমার গালের পেশি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। ইউন-সুক এবং সন-জু-কে প্রাদেশিক অফিসে তোমার প্রথম দিন সম্পর্কে যা বলেছিলে তার মধ্যে সত্যের লেশমাত্র ছিল না। এখন তুমি যে চত্বরটির দিকে তাকিয়ে আছো, ঠিক সেখানেই সেদিন শত শত মানুষের ভিড় জমেছিল বিক্ষোভ করার জন্য; ফেডোরা হ্যাট পরা বৃদ্ধ থেকে শুরু করে রঙিন ছাতা হাতে থাকা বারো-তেরো বছরের কিশোরী পর্যন্ত সবাই ছিল সেখানে। সেদিন যখন তারা স্টেশনের সামনে গুলিবিদ্ধ দুই ব্যক্তির মৃতদেহ একটি ঠেলাগাড়িতে তুলে কলামের একদম সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, সেটি জং-দাইয়ের কোনও প্রতিবেশী ছিল না যে তাকে প্রথম দেখেছিল, বরং সেটা ছিলে তুমি নিজে। আর এমনটিও ছিল না যে তুমি দূর থেকে তাকে এক ঝলক দেখেছিলে; তুমি যথেষ্ট কাছে ছিলে দেখার জন্য যে কীভাবে গুলিটি তার শরীরের একপাশে আছড়ে পড়েছিল। শুরুতে তোমরা দুজনে হাতে হাত ধরে উত্তেজিতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলে। তারপর সেই বিকেল জুড়ে চলা গুলির কানফাটা শব্দ শোনা গেল এবং সবাই যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যাওয়ার জন্য একে অপরকে ধাক্কাধাক্কি আর ঠেলাঠেলি শুরু করল। কেউ একজন চিৎকার করে বলল, ‘ঠিক আছে, এগুলো ফাঁকা গুলি!’ একদল মানুষ আবার সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, আর ঠিক তখনই জং-দাইয়ের হাত তোমার হাতের মুঠি থেকে ফসকে গেল। এরপর আরও এক পশলা গুলির শব্দ শোনা গেল এবং জং-দাই ছিটকে একপাশে পড়ে গেল। তুমি জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালালে। একটি ইলেকট্রিক্যাল গুডসের দোকানের দেয়াল এবং তার নামিয়ে রাখা শাটারের সাথে নিজেকে চেপে ধরলে। সেখানে তোমার সাথে আরও তিনজন বৃদ্ধ লোক ছিল। অন্য এক ব্যক্তি, যাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে তাদের দলেরই কেউ, সে দৌড়ে আসছিল তাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য, কিন্তু হঠাৎ তার কাঁধ থেকে রক্তের ফোয়ারা ছুটে এল এবং সে উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।

‘হায় ভগবান, ওরা ছাদের ওপর আছে,’ তোমার পাশের লোকটি বিড়বিড় করে বলল। ‘ওরা ইয়ন-গিউ (ণবড়হ-মুঁ) ভবনের ছাদ থেকে গুলি করছে।’

পাশের ভবনের ছাদ থেকেও গুলির শব্দ ভেসে আসছিল। ইয়ন-গিউ ভবনের লোকটিকে দেখামাত্রই তার পায়ের ওপর থেকে টেনে সরানো হলো, সে পেছন দিকে উলটে পড়ে গেল ঠিক যেন কেউ তাকে ধাক্কা দিয়েছে। তার পেট থেকে রক্ত বের হয়ে তার বুক ভাসিয়ে দিচ্ছিল। তুমি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকালে। কেউ কিছু বলল না। যে লোকটি কথা বলছিল সে তার মুখের ওপর হাত রেখে নিঃশব্দে কাঁপছিল। তুমি এক মুহূর্তের জন্য চোখ খুললে এবং দেখলে রাস্তার মাঝখানে ডজন ডজন মানুষ পড়ে আছে। তোমার মনে হলো তুমি এক জোড়া হালকা নীল ট্র্যাকস্যুট বটম দেখতে পেয়েছো, যা হুবহু তোমার পরা ট্র্যাকস্যুটের মতো। খালি পা, তার স্নিকার্সগুলোর কী হয়েছে ? মনে হলো পা দুটো তখনও কাঁপছে। তুমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলে, ভাবলে ওদিকে ছুটে যাবে কি না, ঠিক তখনই তোমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি তোমার কাঁধ আঁকড়ে ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তে, পাশের গলি থেকে তিনজন লোক দৌড়ে বের হয়ে এল। তারা যখন লুটিয়ে পড়া মানুষগুলোর বগল ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করছিল, তখনই চত্বরের মাঝখানে থাকা সৈন্যদের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ধেয়ে এল। সেই যুবকেরা সুতো কাটা পুতুলের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। রাস্তার উলটো দিকের প্রশস্ত গলির মুখে থাকা অন্য একটি গলির দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছিল প্রায় ত্রিশজন নারী-পুরুষ দেয়ালের সাথে নিজেদের চেপে ধরে আছেন; এক স্থির ও নিথর দৃশ্যের মতো তাদের দৃষ্টি সামনের সেই বীভৎস ঘটনার ওপর নিবদ্ধ।

গুলি থামার কয়েক মিনিট পর, অত্যন্ত ছোটখাটো গড়নের একজন মানুষ কোনও দ্বিধা ছাড়াই দৌড়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। তিনি রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একজনের দিকে যত দ্রুত সম্ভব দৌড়ে যাচ্ছিলেন। যখন পুনরায় গুলির শব্দ শোনা গেল, তখন যে লোকটি তোমার কাঁধ শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন, তিনি তার বড় ও খসখসে হাত দিয়ে তোমার চোখ ঢেকে দিলেন এবং বললেন, ‘তুমি এখন ওখানে গেলে কেবল নিজের জীবনটাই হারাবে।’

তিনি হাত সরিয়ে নেওয়ার পর তুমি দেখলে, বিপরীত গলি থেকে আসা দুজন লোক এক তরুণীর দিকে দৌড়ে গেল, ঠিক যেন কোনও শক্তিশালী চুম্বকের টানে এবং তাকে দুই হাত দিয়ে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। এই সময় ছাদ থেকে গুলির শব্দ ভেসে এল। লোকগুলো ছিটকে পড়ে গেল।

এরপর আর কোনও উদ্ধার তৎপরতা চালানো হয়নি।

প্রায় দশ মিনিটের এক রুদ্ধশ্বাস নিস্তব্ধতার পর প্রায় এক ডজন সৈন্য তাদের কলাম থেকে বেরিয়ে এল এবং জোড়ায় জোড়ায় তাদের সবচেয়ে কাছে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলোর দিকে হেঁটে গেল। তারা অত্যন্ত দ্রুত ও পদ্ধতিগতভাবে কাজ করছিল এবং মৃতদেহগুলো টেনে অন্য সৈন্যদের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল। যেন এটিই ছিল সেই সংকেত যার জন্য তারা অপেক্ষা করছিল; পাশের এবং বিপরীত গলি থেকে আরও এক ডজন লোক বের হয়ে এল যারা আরও দূরে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো তুলে নিতে লাগল। যে মানুষগুলো তোমার সাথে দেয়ালের নিরাপদ আশ্রয়ে ছিল, তারা একটি দলকে উদ্ধারের জন্য বেরিয়ে পড়ল এবং দ্রুত পাশের গলিতে অদৃশ্য হয়ে গেল। তবু তুমি জং-দাইকে সাহায্য করার জন্য এক পা-ও নড়লে না। একা হয়ে যাওয়ায় তুমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলে এবং স্নাইপারদের তীক্ষè নজর এড়িয়ে কেবল দেয়ালের সাথে গা ঘেঁষে আড়াআড়িভাবে পিছিয়ে আসতে লাগলে; তোমার মুখ দেয়ালের ইটের সাথে চেপে ধরা ছিল আর পিঠ ছিল চত্বরের দিকে।

সেই বিকেলে বাড়িটা ছিল একদম নিস্তব্ধ। এত অশান্তি সত্ত্বেও তোমার মা ডেইন (উধবরহ) বাজারে তোমাদের পারিবারিক চামড়ার দোকানটি খুলতে গিয়েছিলেন। আর তোমার বাবা, যিনি কিছুকাল আগে চামড়ার ভারী বাক্স বইতে গিয়ে পিঠে চোট পেয়েছিলেন, তিনি ভেতরের ঘরে শুয়ে ছিলেন। তুমি বাড়ির মূল ফটকটি ঠেলে ভেতরে ঢুকলে যা সবসময় অর্ধেক খোলাই থাকত; পাথরের ওপর ধাতব ঘর্ষণের কর্কশ শব্দ হলো। তুমি যখন উঠানে পা রাখলে, শুনলে তোমার মেজো ভাই উচ্চস্বরে ইংরেজি পড়ছে।

‘ডং-হো ?’

বসার ঘর থেকে তোমার বাবার পরিষ্কার কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘ডং-হো কি ফিরেছো ?’ তুমি কোনও উত্তর দিলে না। ‘ডং-হো, যদি তুমি হও, তবে এদিকে এসো এবং আমার পিঠটা একটু মাড়িয়ে দাও।’

তুমি যে শুনেছো এমন কোনও লক্ষণ না দেখিয়েই ফুলের বাগান মাড়িয়ে পাম্পের হাতলের কাছে গেলে এবং ওটাতে চাপ দিলে। নিকেলের তৈরি ধোয়ার পাত্রে (ধিংযনধংরহ) বরফশীতল পরিষ্কার জল ছিটকে এল। তুমি প্রথমে তোমার হাত দুটো তাতে ডুবালে, তারপর অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে মুখে ঝাপটা দিলে। তুমি যখন মাথা পেছন দিকে হেলিয়ে দিলে, জল তোমার চোয়াল বেয়ে গলার রেখা ধরে নিচে গড়িয়ে পড়ল।

‘ডং-হো, তুমি কি বাইরে ? ভেতরে এসো।’ তোমার ভেজা হাতগুলো চোখের ওপর চেপে ধরে তুমি পাথরের বারান্দায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইলে। কিছুক্ষণ পর তুমি তোমার স্নিকার্স থেকে পা বের করে কাঠের বারান্দায় উঠলে এবং প্রধান ঘরের দরজাটি স্লাইড করে খুলে ফেললে। তোমার বাবা ঘরের মাঝখানে উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলেন, ঘরটি মক্সা থেরাপির (সড়ীধ পধঁঃবৎু) কটু গন্ধে ভরে ছিল।

‘পেশিতে খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল, তাই উঠতে পারছিলাম না। কোমরের নিচের দিকে একটু মাড়িয়ে দাও।’

তুমি তোমার মোজা খুলে ফেললে এবং ডান পা তুলে তোমার বাবার কোমরের নিচের দিকে রাখলে; খেয়াল রাখলে যাতে তোমার শরীরের পুরো ওজন দিয়ে চাপ না পড়ে।

‘কোথায় ঘুরতে গিয়েছিলে ? তোমার মা বারবার ফোন করে জিজ্ঞেস করছিল তুমি ফিরেছো কি না। এই বিক্ষোভের মাঝে এখন পাড়ার ভেতর ঘুরে বেড়ানোও নিরাপদ নয়। গত রাতে স্টেশনের কাছে গুলি চলেছে, কয়েকজন মারাও গেছে… ভাবতে অবাক লাগে, কেউ কীভাবে কেবল খালি হাতে বন্দুকের মোকাবিলা করতে যেতে পারে ?’

তুমি দক্ষ ভঙ্গিতে পা বদলে তোমার বাবার শিরদাঁড়া এবং স্যাক্রামের (ংধপৎঁস) মাঝখানে সাবধানে চাপ দিলে। ‘আহ, ঠিক ওই জায়গাটাতেই…’

তুমি ভেতরের ঘর ছেড়ে রান্নাঘরের পাশের নিজের ঘরে চলে গেলে। কাগজ দেওয়া মেঝের ওপর তুমি ভ্রƒণ আকৃতির মতো কুঁকড়ে শুয়ে পড়লে। মুহূর্তের মধ্যেই ঘুম তোমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, যেন তুমি জ্ঞান হারিয়েছো; কিন্তু বেশি সময় কাটল না, তুমি এক ভয়াবহ স্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠলে, যার কোনও বিশদ বিবরণ মনে করা অসম্ভব ছিল। যা-ই হোক, তোমার চোখের সামনে এখন যে জাগ্রত সময়গুলো পড়ে ছিল, তা যে কোনও স্বপ্নের চেয়েও বেশি ভয়াবহ ছিল। স্বাভাবিকভাবেই, জং-দাই এবং তার বোনের সেই ছোট অ্যানেক্স রুম থেকে কোনও শব্দ আসছিল না। সন্ধ্যা নামলেও সেখানকার আলো জ্বলে ওঠেনি। প্রধান গেটের চাবিটিও সেখানে থাকত না। পাথরের বারান্দার পাশে রাখা সেই গাঢ় বাদামি বয়ামের নিচে চাবিটি অস্পৃশ্য অবস্থাতেই পড়ে ছিল।

ঘরের নিস্তব্ধতার মাঝে শুয়ে তুমি তোমার মনের আয়নায় জং-দাইয়ের মুখটি দেখতে পেলে। তুমি দেখতে পেলে সেই হালকা নীল ট্র্যাকস্যুট বটমগুলো ছটফট করছে এবং তোমার শ্বাস-প্রশ্বাস, তোমার বুকের ভেতরটা সংকুচিত হয়ে এল, যেন তোমার সৌর স্নায়ুচক্রে (ংড়ষধৎ ঢ়ষবীঁং) আগুনের একটি গোলা আটকে আছে। নিঃশ্বাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে করতে তুমি এই ছবিটিকে জং-দাইয়ের সাধারণ কোনও দিনের ছবি দিয়ে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করলে, সে হয়তো উঠানে হাঁটছে আর ভাবছে কিছুই হয়নি। জং-দাই, যে তখনও মাধ্যমিক স্কুলের মাঝামাঝি সময়ে হওয়া সেই শারীরিক বৃদ্ধির (মৎড়ঃিয ংঢ়ঁৎঃ) ছোঁয়া পায়নি, যার বড় বোন জং-মি তাকে মাঝে মাঝে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরত এই আশায় যে হয়তো এতেই তার উচ্চতা বাড়বে। জং-দাই, যার সাদামাটা চেহারার মাঝেও এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল; তার সেই চ্যাপ্টা নাক আর ছোট চোখের বোতামের মতো চাহনি দিয়ে সে চাইলে যে কোনও গম্ভীর পরিবেশেও হাসির রোল তুলতে পারত। স্কুলের ট্যালেন্ট শো-তে তার সেই ডিস্কো নাচ দেখে তাদের কড়া মেজাজের শিক্ষকও হাসিতে ফেটে পড়েছিলেন। যে কি না পড়াশোনার চেয়ে টাকা উপার্জনের দিকেই বেশি আগ্রহী ছিল। কিন্তু তার বোন তাকে কোনও সুযোগই দেয়নি এবং জোর করে লিবারেল আর্টস কলেজে ভর্তি পরীক্ষার জন্য তাকে প্রস্তুত করতে চেয়েছিল। কনকনে শীতের সন্ধ্যায় যখন তার গাল দুটো লাল হয়ে যেত, তখনও সে কোনও বিরতি ছাড়াই বাড়িতে বাড়িতে পত্রিকা পৌঁছে দিত। উঠানে ব্যাডমিন্টন খেলার সময় যখন তার হাতে একটি বিশ্রী আঁচিল ছিল, তখন সে কেবল একটি ‘স্ম্যাশ’ শট ছাড়া আর কিছুই জানত না; সে সময় তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হতো সে যেন কোনও আন্তর্জাতিক ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া দলের প্রতিনিধিত্ব করছে।

জং-দাই একদিন খুব উদাসীনভাবে একটি ব্ল্যাকবোর্ড ক্লিনার তার স্কুল ব্যাগের ভেতর ভরল।

‘ওটা কেন নিচ্ছ ?’

‘আমার বোনকে দেব।’

‘ও এটা দিয়ে কী করবে ?’

‘উম, সে এটা নিয়ে সবসময় কথা বলে। মাধ্যমিক স্কুলে থাকার সময় এটিই তার প্রধান স্মৃতি।’

‘ব্ল্যাকবোর্ড ক্লিনার ? তার মানে ওই সময়টা বেশ বিরক্তিকর ছিল।’

‘না, আসলে এর সাথে একটা গল্প জড়িয়ে আছে। ওটা ছিল এপ্রিল ফুল দিবস; তার ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে পুরো ব্ল্যাকবোর্ড জুড়ে কিছু না কিছু লিখে ভরে ফেলেছিল যাতে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে শিক্ষককে ওগুলো পরিষ্কার করতে হিমশিম খেতে হয়। কিন্তু শিক্ষক যখন ক্লাসে ঢুকলেন এবং ওটা দেখলেন, তিনি কেবল চিৎকার করে বললেন, ‘এই সপ্তাহের ক্লাসরুম মনিটর কে ?’ আর সেটা ছিল আমার বোন। এরপর পুরো পিরিয়ড জুড়ে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওই কাপড়ের ডাস্টারটা জানলা দিয়ে বের করে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে চকের ধুলো ঝাড়ছিল। ব্যাপারটা মজার হলেও ওর মাধ্যমিক স্কুলের দু বছরের স্মৃতি বলতে এটাই সবচেয়ে বেশি মনে আছে।’

তুমি ধীরে ধীরে মেঝের ঠান্ডা কাগজের ওপর হাত চেপে নিজেকে টেনে তুললে, তুমি দরজার কাছে গেলে, ওটা স্লাইড করে খুললে এবং তোমার চটিজোড়া পরলে। সরু উঠান পেরিয়ে তুমি অ্যানেক্সের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে। সেই মাটির বয়ামের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একেবারে নিচে পর্যন্ত হাতড়ালে এবং মাটির সাথে ঘর্ষণে তোমার আঙুলগুলো আটকে গেল। চাবিটা ঝনঝন করে উঠল এবং তুমি হাতুড়ি ও মালট (সধষষবঃ) সরাবার সময় পাথর আর মাটির ঘষটানি শুনতে পেলে। অ্যানেক্সের দরজার তালাটি একটি ক্লিক শব্দে খুলে গেল। তুমি চটি খুলে ভেতরে পা রাখলে। ঘরটিতে সাম্প্রতিক কোনও বিশৃঙ্খলার চিহ্ন ছিল না। গত রবিবার রাতের সেই নোটবুকটি তখনও টেবিলের ওপর খোলা অবস্থায় ছিল, যখন জং-দাই কান্নায় ভেঙে পড়েছিল এবং তুমি তাকে শান্ত করার জন্য জং-মি কোথায় কোথায় যেতে পারে তার একটি তালিকা তৈরি করতে বলেছিলে। সন্ধ্যার ক্লাসগুলো; যে কারখানায় সে মাঝে মাঝে কাজ করত; ইলগোক-দং-এ (ওষমড়শ-ফড়হম) থাকা তার সেই কাকা যাকে একবার সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরদিন সকালে তোমরা দুজনে মিলে এই সব জায়গায় ফোন করেছিলে, কিন্তু জং-মির কোথাও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। আশেপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল, তুমি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তোমার হাতের উলটো পিঠ দিয়ে শুকনো চোখগুলো ঘষতে লাগলে। তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঘষতে থাকলে যতক্ষণ না চামড়া গরম আর নরম হয়ে উঠল। তুমি জং-দাইয়ের পড়ার টেবিলে বসে থাকার চেষ্টা করলে, তারপর মেঝের ঠান্ডা কাগজের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লে। তোমার বুকের ঠিক মাঝখানে স্টের্নামের (ংঃবৎহঁস) খাঁজে তুমি তোমার মুঠি চেপে ধরলে, যা ধকধক করতে শুরু করেছিল। যদি জং-মি এই মুহূর্তে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে আসত, তবে তুমি দৌড়ে গিয়ে তার পায়ে আছড়ে পড়তে এবং তাকে মিনতি করতে যাতে সে প্রাদেশিক অফিসের সামনে শায়িত মৃতদেহগুলোর মাঝে জং-দাইকে খুঁজে পেতে তোমার সাথে যায়। সে কি তোমার বন্ধু নয় ? তুমি কি একজন মানুষ নও ? হয়তো জং-মি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তোমার ওপর চিৎকার করে এই কথাগুলোই বলত। আর তুমি তার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে করতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে।

তার ভাইয়ের মতোই জং-মি তার বয়সের তুলনায় বেশ ছোটখাটো ছিল। তার ওপর, তার ছোট বব-ছাঁট চুলের কারণে পেছন থেকে তাকে দেখলে মাধ্যমিক স্কুল বা এমনকি প্রাথমিক স্কুলের বড় ক্লাসের ছাত্রীর মতো মনে হতো, যদিও বাস্তবে তার বয়স ছিল মাত্র উনিশ। সামনের দিক থেকেও সে অনায়াসেই হাই স্কুলের প্রথম বর্ষের ছাত্রী হিসেবে পরিচিতি পেতে পারত, যদিও সে সবসময় হালকা মেকআপ করে নিজেকে একটু বড় দেখানোর চেষ্টা করত। সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ করার কারণে তার পা ফুলে গেলেও সে কাজ থেকে ফেরার পথে সবসময় উঁচু হিলওয়ালা জুতো পরার জেদ করত। কাউকে মারধর করার মতো স্বভাব তো দূরের কথা, তার মৃদু পদক্ষেপ আর শান্ত কণ্ঠস্বর শুনে এটা কল্পনা করাই অসম্ভব ছিল যে সে কখনও সঠিকভাবে রাগ করতে পারে। অথচ জং-দাইয়ের মতে, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে তার মতামত ছিল অত্যন্ত দৃঢ় এবং সে যে কোনও বিতর্কে নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখত। আসলে মানুষ জানে না, সে আমার বাবার চেয়েও বেশি একগুঁয়ে।

অ্যানেক্সের এই ঘরে গত দুই বছর ধরে জং-দাই আর সে যে বসবাস করছিল, জং-মির সাথে তোমার কখনওই খুব একটা দীর্ঘ আলাপ হয়নি। সে একটি টেক্সটাইল কারখানায় কাজ করত এবং প্রায়ই তাকে নাইট শিফটে থাকতে হতো। জং-দাইও বাড়িতে খুব একটা থাকত না তার সেই খবরের কাগজ বিলি করার কাজের দোহাই দিয়ে। সে আসলে লাইব্রেরিতে পড়ার ভান করত, তাই শীতকালে অ্যানেক্সের কয়লার আগুন প্রায়ই নিভে যেত। যেদিন সন্ধ্যায় সে তার ভাইয়ের আগে বাড়ি ফিরত, সেদিন সে তোমার দরজায় টোকা দিত। ক্লান্তিতে বসে যাওয়া মুখ, ছোট চুলগুলো কানের পেছনে গোঁজা ‘মাফ করবেন, আগুনটা…’ তাকে কেবল তার ঠোঁট দুটো ফাঁক করতেও অনেক কষ্ট করতে হতো বলে মনে হতো। প্রতিবার এমন হলে তুমি লাফিয়ে উঠতে এবং দ্রুত ফায়ারপ্লেসের কাছে গিয়ে চিমটা দিয়ে কিছু গরম কয়লা তুলে নিয়ে একটি লম্বা হাতলওয়ালা কড়াইয়ে করে জং-মিকে দিতে। সে বলত, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করব।’

গত বছরের শুরুর দিকের এক শীতের সন্ধ্যায় তোমাদের মধ্যে প্রথম এই সামান্য কয়েকটা কথার চেয়ে বেশি কিছু বিনিময় হয়েছিল। জং-দাই স্কুল থেকে ফিরে তার ব্যাগটি এক কোণে ছুড়ে ফেলেছিল এবং তার খবরের কাগজ বিলির কাজে বের হওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করছিল। তার সেই দরজায় টোকা দেওয়ার পরিচিত শব্দ শুনেও সে যখন ফিরে আসেনি, তুমি নিজেই বুঝতে পারলে সেটা কে হতে পারে। তাই তুমি বেশ দ্বিধাভরে, যেন কাঠের দরজার কোনও ক্ষতি না হয় সেভাবে তোমার আঙুলের ডগা দিয়ে দরজাটি খুললে, যেন তোমার আঙুলগুলো কোনও নরম কাপড়ে মোড়ানো ছিল। তুমি সোজা রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়ালে।

সে প্রশ্ন করল, ‘আমি ভাবছিলাম, আপনার কাছে কি প্রথম বর্ষের কোনও পাঠ্যবই আছে ?’

‘প্রথম বর্ষ ?’ তুমি বেশ নিস্পৃহভাবে তার কথার প্রতিধ্বনি করলে। সে বুঝিয়ে বলল যে সে আগামী ডিসেম্বর থেকে নাইট স্কুলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

‘প্রেসিডেন্ট পার্ককে হত্যার পর পৃথিবীটা বদলে গেছে। শ্রমিক আন্দোলন এখন শক্তি সঞ্চয় করছে এবং আমাদের মালিকরা এখন আর আমাদের ওভারটাইম করতে বাধ্য করতে পারছে না। তারা বলছে আমাদের বেতনও বাড়বে। আমার জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হতে পারে, আমি এটার সদ্ব্যবহার করতে চাই। আমি আবার পড়াশোনা শুরু করতে চাই। কিন্তু আমি অনেক দিন ধরে স্কুলের বাইরে আছি, আমি নিশ্চিত নই যে যেখান থেকে পড়াশোনা ছেড়েছিলাম সেখান থেকেই আবার শুরু করতে পারব কি না। আমি প্রথম বর্ষের বিষয়গুলো আবার দেখে নিতে চাই… তারপর যখন জং-দাইয়ের ছুটি শুরু হবে, ততদিনে হয়তো আমি দ্বিতীয় বর্ষের পড়াশোনায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকব।’

তুমি তাকে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে বললে, তারপর চিলেকোঠায় (ষড়ভঃ) উঠে এক গাদা ধুলোমাখা পাঠ্যবই এবং সহায়িকা বই নিয়ে নিচে নেমে এলে।

‘হায় ভগবান… আপনি কত লক্ষ্মী একটি ছেলে, এই সব বইগুলো এখনও গুছিয়ে রেখেছেন। আমাদের জং-দাই তো পড়া শেষ হওয়ামাত্রই সবকিছু ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল।’ সে বইগুলো গ্রহণ করার সময় বলল, ‘দয়া করে জং-দাইকে এই ব্যাপারে কিছু বলবেন না। সে জানে যে কেবল তার কারণেই আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি, তাই সে ইতিমধ্যেই বেশ অপরাধবোধে ভোগে। সুতরাং দয়া করে ব্যাপারটা গোপনই রাখবেন যতক্ষণ না আমি হাই স্কুল প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করছি।’

তুমি তার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলে; তার এই অপ্রত্যাশিত সাবলীলতা এবং উজ্জ্বল চোখের চাহনি দেখে মনে হচ্ছিল যেন শক্তভাবে বন্ধ থাকা কুঁড়ি থেকে পাপড়িগুলো বিকশিত হচ্ছে।

সে বলেছিল, ‘হয়তো জং-দাই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেছে, আমি হয়তো তার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারব। বিশ্ববিদ্যালয়। এটা সম্ভব, যদি আমি যথেষ্ট কঠোর পরিশ্রম করি। কে জানে ?’

সে সময় তুমি সংশয়ে ছিলে যে সে সত্যিই তার পড়াশোনার বিষয়টি গোপন রাখতে পারবে কি না। যদি জং-দাই বাড়িতে ফিরে দেখত যে তাদের ছোট ঘরটিতে ওই সব পাঠ্যবই ছড়িয়ে রাখা আছে, তবে সে কীভাবে সেগুলো লুকাতে পারত ? আর জং-দাই সাধারণত অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করত, তাই এমনটি ঘটার সুযোগ ছিল না যে সে কেবল জং-দাই ঘুমিয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করবে। কিছুক্ষণ পরই সেই সংশয়গুলো আরও নিবিড় কল্পনায় রূপ নিল। সেই নরম আঙুলগুলো যেগুলো তোমার পাঠ্যবইয়ের পাতা ওলটাত, জং-দাইয়ের ঘুমন্ত মাথার মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। তার ঠোঁটের সেই মৃদু ঊর্ধ্বমুখী ভাঁজ যখন সে বারবার বলত: আমার লক্ষ্মী ছেলে, এই সব কিছু কত যত্ন করে ধরে রেখেছে… সেই অমায়িক চোখগুলো। সেই ক্লান্ত হাসি। সেই মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ। অ্যানেক্সের সেই ঘরে কী কী ঘটছে তা কল্পনা করে তোমার ভেতরটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল, যে ঘরে তুমি বছরের পর বছর রাতগুলো এপিঠ-ওপিঠ করে কাটিয়েছো। খুব ভোরে যখন তুমি তাকে উঠানে বের হয়ে পাম্পের কাছে মুখ ধুতে দেখতে, তখন তুমি নিজেকে লেপের ভেতরে গুটিয়ে নিতে এবং দরজার কাছে হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে ইটের মতো শক্ত কাগজে কান চেপে ধরতে; তোমার চোখ ঘুমে ভারী হয়ে থাকলেও তুমি স্থির হয়ে থাকতে।

কফিনভর্তি দ্বিতীয় ট্রাকটি জিমনেসিয়ামের সামনে এসে থামল। সূর্যের তীব্র আলোর ঝাপটায় চোখ কুঁচকে তুমি জিন-সু-কে দেখতে পেলে, যে সামনের প্যাসেঞ্জার সিট থেকে নেমে আসছে। তার দ্রুত পদক্ষেপগুলো তোমার দিকেই এগিয়ে আসছিল। সে বলল, ‘আমরা ছয়টার সময় এখানকার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি। নিশ্চিত করো যে তুমি তার আগেই বাড়ি ফিরে গেছো।’

তুমি তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করলে, ‘ভেতরের মানুষগুলোর তদারকি করবে কে ?’

‘সৈন্যরা আজ রাতে শহরে আবার ঢুকছে। এমনকি শোকার্ত পরিবারগুলোকেও বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ছয়টার পর এখানে আর কারও থাকা চলবে না।’

‘কিন্তু সৈন্যরা এখানে কেন আসবে ? মৃতরা তাদের কী ক্ষতি করতে পারে ?’

“তাদের মতে, এমনকি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা আহতরাও একদল ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’ যাদের শেষ করে দেওয়া দরকার। তবে কি সত্যিই মনে হয় তারা এই সব লাশ এবং তাদের ওপর নজর রাখা পরিবারগুলোর প্রতি দয়া দেখাবে ?”

জিন-সু তার পরবর্তী কথাগুলো গিলে ফেলল এবং তোমাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত ভেতরে চলে গেল।

তুমি জিমনেসিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করলে। তুমি ভেবেছিলে জিমনেসিয়ামের ভেতরে ঢোকার পর হয়তো জিমনেসিয়ামের দায়িত্বরত ব্যক্তিটি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর উদ্দেশে একই কথাগুলো বলবে। তোমার লেজারটি বুকের কাছে জাপটে ধরে তুমি তার সরে যাওয়া অবয়বের দিকে তাকিয়ে রইলে তার কাঁধ শক্ত হয়ে আছে এবং জিন্সের প্যান্ট ভেজা। তুমি চোখ কুঁচকে জিন-সুর ভেজা চুল আর ভেজা শার্টের দিকে তাকালে, আর সেই শোকাতুর নারীর আর্তনাদ আরও তীক্ষè ও কম্পিত হয়ে উঠল।

‘আমি এক ইঞ্চিও নড়ব না। আমি এখানেই মরব, আমার বাচ্চার পাশে।’

তুমি তোমার দৃষ্টি হলের একেবারে ভেতরের দিকে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে ফেরালে, যাদের শনাক্ত করার জন্য এখনও কেউ আসেনি। তুমি তোমার মনোযোগ বাধ্য করলে কোনায় পড়ে থাকা সেই মানুষটির দিকে নিবদ্ধ করতে, যাকে তুমি প্রথমবার প্রাদেশিক অফিসের করিডোরে দেখেছিলে। তুমি ভেবেছিলে এটিই হয়তো জং-মি। যদিও পচনের ফলে চেহারা তখনও বিকৃত হয়ে যায়নি, কিন্তু গভীর ক্ষতের কারণে তার মুখাবয়ব চেনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবু এটি দেখতে অনেকটা জং-মির মতোই ছিল। আর সেই কুঁচকানো স্কার্ট (ঢ়ষবধঃবফ ংশরৎঃ); হ্যাঁ, ওটা অবশ্যই জং-মির স্কার্টের মতো ছিল। কিন্তু এই ধরনের স্কার্ট তো বেশ সাধারণ, তাই না ? জং-মি কি আসলেই গত রবিবার এই স্কার্টটি পরে বাইরে বেরিয়েছিল ? তার চুলগুলো কি আসলেই একজন মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রীর মতো ছোট ছিল ? আর জং-মি কি এমন অপব্যয়ী ছিল যে গ্রীষ্মকাল না আসতেই পেডিকিউর করবে ? জং-দাই তো জানত যে জং-মির হাঁটুতে গাঢ় নীল রঙের একটি দাগ ছিল, যা দেখতে অনেকটা লাল মটরশুঁটির মতো। তোমার জং-দাইকে প্রয়োজন ছিল যাতে সে নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারে যে এই মৃতদেহটি তার বোনের নয়। অন্যদিকে, তোমার জং-মিকেও প্রয়োজন ছিল তার ভাইকে খুঁজে পেতে সাহায্য করার জন্য। সে যদি তোমার জায়গায় থাকত, তবে সে হয়তো শহরের প্রতিটি হাসপাতাল ঘুরে বেড়াত যতক্ষণ না সে তার জ্ঞান ফিরে আসা ভাইকে খুঁজে পায়। ঠিক যেমন গত ফেব্রুয়ারিতে জং-দাই যখন লিবারেল আর্টস কলেজে পড়ার জেদ করেছিল, তখন জং-মি চিৎকার করে বলেছিল সে মারা যাবে এবং তারপর বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। তখন জং-দাই মাধ্যমিক স্কুলের তৃতীয় বর্ষে পা দিয়েছিল এবং সে ভবিষ্যতের প্রস্তুতির জন্য বৃত্তিমূলক ক্লাস (াড়পধঃরড়হধষ পষধংংবং) নিতে চাইছিল। সেবার জং-মি খুব দ্রুত জং-দাইকে একটি কমিক বুক স্টোর থেকে কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে বের করে এনেছিল। তোমার মা এবং মেজো  ভাই সেই ছোটখাটো মেয়েটির হাতে জং-দাইয়ের এই নাজেহাল অবস্থা দেখে হাসি থামাতে পারেনি। এমনকি তোমার বাবা, যিনি একজন গম্ভীর ও স্বল্পভাষী মানুষ ছিলেন, তিনিও বেশ কয়েকবার গলা পরিষ্কার করেছিলেন (হাসি লুকানোর জন্য)। এরপর সেই দুই ভাই-বোন অ্যানেক্সে ফিরে গিয়েছিল এবং মাঝরাত পর্যন্ত তাদের তর্কের নিচু স্বর এবং দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গিয়েছিল। যখন একজনের নিচু ও বিড়বিড় করা শব্দ শোনা যেত, তখন বোঝা যেত অপরজন তাকে শান্ত করার বা ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছে। বিনিময়ে সেও কথা বলত এবং তার মানে হলো পাশা উলটে গেছে; তখন আগে যে কথা বলছিল সে চুপ হয়ে যেত। এর মাঝে তুমিও গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যতক্ষণ না তর্কের আওয়াজ বা হাসির শব্দের পার্থক্য করতে পারার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে।

এখন তুমি জিমনেসিয়ামের দরজার কাছের টেবিলে বসে আছো। তোমার লেজারটি টেবিলের বাম পাশে খোলা পড়ে আছে এবং তুমি নাম, নম্বর, ফোন নম্বর এবং ঠিকানার কলামগুলো পরীক্ষা করছো; এরপর সেগুলো বড় বড় অক্ষরে কাগজে লিখছো। জিন-সু বলেছিল তোমাকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে প্রতিটি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা যায়, এমনকি যদি নাগরিক মিলিশিয়া বাহিনীর শেষ সদস্যকেও আজ রাতে মরতে হয় তবু। তোমাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই এবং তোমাকে একা হাতেই কফিনে এই তথ্যগুলো সেঁটে দেওয়ার কাজ শেষ করতে হবে; হাতে সময় খুব কম, কারণ ছটার মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। তুমি শুনতে পেলে কেউ তোমার নাম ধরে ডাকছে। তুমি তাকালে এবং দেখলে দুটি ট্রাকের মাঝখান দিয়ে তোমার মা এগিয়ে আসছেন। তিনি যখন কাছে এলেন, তুমি দেখলে তোমার মেজো ভাই এবার তার সাথে নেই। মায়ের পরনে সেই ধূসর টপস আর ঢিলেঢালা কালো প্যান্ট, যা তিনি দোকানে যাওয়ার সময় পরেন; এটি দেখতে অনেকটা ইউনিফর্মের মতো। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি আগের মতোই আছেন, কেবল তার পরিপাটি আঁচড়ানো চুলগুলো বৃষ্টির কারণে কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছে। তুমি দাঁড়িয়ে পড়লে এবং সামনের দিকে দৌড়ে গেলে; তুমি তাকে দেখে এতটাই খুশি হয়েছিলে যে বুঝতেই পারোনি তুমি সিঁড়ির অর্ধেকটা নেমে এসেছো। কিন্তু হঠাৎ তুমি থমকে দাঁড়ালে; তুমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়লে যখন দেখলে তোমার মা দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছেন তোমার হাত চেপে ধরার জন্য, যাতে তুমি জিমনেসিয়ামের ভেতরে ফিরে যেতে না পারো।

‘চলো বাড়ি যাই,’ তিনি বললেন। তোমার কবজিতে এক হ্যাঁচকা টান দিলেন, যেন তুমি তোমার হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইছো। তার সেই ধরার মাঝে এক অদম্য ও মরিয়া শক্তি ছিল যা আতঙ্কজনক; অনেকটা সেই ডুবন্ত মানুষের শক্তির মতো। তোমাকে তার আঙুলগুলো একে একে ছাড়িয়ে নিতে হলো। ‘সৈন্যরা আসছে। এখনই বাড়ি চলো।’

অবশেষে তুমি তাকে ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হলে এবং দেরি না করে ভেতরে ঢুকে পড়লে। তোমার মা তোমার পিছু পিছু ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেন, কিন্তু শোকাতুর পরিবারগুলোর সেই দীর্ঘ লাইনের কারণে তিনি আটকে গেলেন, যারা তাদের প্রিয়জনদের কফিন বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। তুমি ঘুরে দাঁড়ালে এবং মাকে চিৎকার করে বললে: ‘মা, আমরা ছটার সময় এখানকার কাজ শেষ করে দেব।’

উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি এক পা থেকে অন্য পায়ে ভর দিয়ে কাঁপতে লাগলেন এবং চেষ্টা করছিলেন যাতে তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারেন। তুমি লাইনের ওপাশ থেকে কেবল তার কপালটুকু দেখতে পাচ্ছিলে; সেখানে তার কপালে ফুটে উঠা রেখাগুলো তোমাকে একটি কান্নারত শিশুর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। তুমি আবার ডাকলে, এবার আরও জোরে: ‘একবার কাজ শেষ হয়ে গেলে আমি বাড়ি আসব, কথা দিচ্ছি।’

কেবল তখনই সেই কপালে ফুটে থাকা দুশ্চিন্তার ভাঁজগুলো কিছুটা মসৃণ হলো।

‘অবশ্যই আসবে,’ তিনি বললেন। ‘সূর্য ডোবার আগেই ফিরে এসো। আমরা সবাই একসাথে রাতের খাবার খাব।’

তোমার মা চলে যাওয়ার এক ঘণ্টাও পার হয়নি, এমন সময় তুমি একজন বৃদ্ধকে ধীরে ধীরে তোমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলে। তুমি উঠে দাঁড়ালে, এমনকি এই দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছিল যে তার পুরোনো ধাঁচের বাদামি জ্যাকেটটি অনেক জীর্ণ। তার কুচকুচে কালো টুপির নিচ থেকে ধবধবে সাদা চুল উঁকি দিচ্ছিল এবং তিনি একটি কাঠের লাঠিতে ভর দিয়ে টলমল পায়ে সামনে এগোচ্ছিলেন। ডায়েরি এবং কলম দিয়ে কাগজের টুকরোগুলোকে চাপা দিয়ে রেখে যাতে বাতাসের ঝাপটায় সেগুলো ছড়িয়ে না পড়ে তুমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলে।

‘আপনি কার খোঁজে এসেছেন, স্যার ?’ তুমি জিজ্ঞেস করলে।

‘আমার ছেলে আর নাতনি,’ তিনি বললেন। মনে হচ্ছিল তার বেশ কয়েকটা দাঁত পড়ে গেছে, যা তার আঞ্চলিক টান (ঃযরপশ ধপপবহঃ) বোঝাটা কঠিন করে তুলছিল।

‘আমি হওয়াসুন থেকে একটি চাষের লাঙল গাড়িতে (পঁষঃরাধঃড়ৎ) লিফট নিয়ে এসেছি। তারা আমাদের শহরতলিতে আটকে দিয়েছিল, তাই আমরা শহরে ঢুকতে পারছিলাম না; পরে আমি পাহাড়ের ওপর দিয়ে এমন একটি পথ খুঁজে বের করলাম যা সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছিল না। আমি কোনওমতে পৌঁছাতে পেরেছি।’

তিনি দীর্ঘশ্বাস নিলেন। তার ঠোঁটের চারপাশে লেগে থাকা লালার ফোঁটাগুলোর রং ছিল ছাইয়ের মতো। তুমি কল্পনাও করতে পারবে না যে, এই বৃদ্ধ মানুষটি, যার জন্য সমতলে হাঁটাটাও কষ্টকর, তিনি কীভাবে পাহাড় পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছালেন।

‘আমাদের ছোট ছেলেটা… সে কথা বলতে পারে না (বোবা)… ছোটবেলায় তার একবার জ্বর হয়েছিল, জানেন তো। তারপর থেকে সে আর কখনও কথা বলেনি। কয়েক দিন আগে শহর থেকে পালিয়ে আসা একজন আমাকে বলেছিল যে সৈন্যরা একটি বোবা ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে, বেশ কিছুদিন আগেই।’

তুমি সেই বৃদ্ধের হাত ধরে এবং তাকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে সাহায্য করলে।

‘আমাদের বড় ছেলের মেয়ে জন্নাম ইউনিভার্সিটির কাছে একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকে; সে পড়াশোনা করছে। আমি গত কাল সন্ধ্যায় সেখানে গিয়েছিলাম এবং জানতে পারলাম তার কোনও খোঁজ নেই… বাড়ির মালিকও গত কয়েক দিন ধরে তাকে দেখেনি এবং প্রতিবেশীরাও একই কথা বলছে।’

তুমি জিমনেসিয়াম হলের ভেতরে প্রবেশ করে মাস্কটি মুখে পরে নিলে। শোকাতুর পোশাক পরা নারীরা ড্রিংকসের বোতল, খবরের কাগজ, আইস ব্যাগ আর কাপড়ে মোড়ানো ছবিগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। সেখানেও কিছু পরিবার একে অপরের সাথে তর্ক করছিল; সবচেয়ে কাছের কফিনগুলোর পাশে থাকা পরিবারগুলো একে অপরের সাথে বিবাদ করছিল। কেউ একজন দাবি করছিল যে অন্য একটি পরিবার ভুলবশত তাদের কফিনটি নিয়ে গেছে, আবার কেউ কেউ অভিযোগ করছিল যে মোমবাতিগুলো খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই শোরগোলের মাঝখানে তুমি বৃদ্ধ লোকটিকে নিয়ে হলের একেবারে শেষ প্রান্তে গেলে। সেখানে সাদা কাপড়ে ঢাকা প্রায় বিশটির মতো মৃতদেহ সারিবদ্ধভাবে মেঝের ওপর পড়ে ছিল।

পচন ধরার কারণে বাতাস এতটাই ভারী হয়ে গিয়েছিল যে সেখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব ছিল। তুমি লক্ষ করলে বৃদ্ধ লোকটি তার পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে মুখে চেপে ধরলেন। তুমি এক এক করে কাপড়গুলো সরাতে লাগলে এবং তাকে মৃতদেহগুলোর মুখ দেখালে। প্রথম কয়েকটি ছিল মাঝবয়সী পুরুষদের, যাদের চেহারা যন্ত্রণায় কুঁচকে ছিল। এরপর তুমি একটি ছোট অবয়বের সামনে থামলে। কাপড়টি সরাতেই দেখা গেল সেটি একটি কিশোর ছেলের মৃতদেহ, যার কপালে গুলির চিহ্ন।

বৃদ্ধ লোকটি নিচু হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। তার হাত কাঁপছিল।

‘না, এটা সে নয়,’ তিনি ফিসফিস করে বললেন। ‘আমার নাতির চিবুকে একটি কাটা দাগ ছিল।’

তুমি পরবর্তী মৃতদেহটির দিকে এগিয়ে গেলে। সেটি ছিল একজন তরুণীর, যার লম্বা চুলগুলো রক্তে জট পাকিয়ে গিয়েছিল। তার পরনের নীল টপসটি ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং শরীরের একপাশ বীভৎসভাবে জখম ছিল। বৃদ্ধ লোকটি মাথা নাড়লেন। তিনি প্রতিটি মৃতদেহ দেখার পর বুক চিরে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিলেন, যা হলের নিস্তব্ধতায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

যখন তুমি শেষ মৃতদেহটির কাপড় সরালে, বৃদ্ধ লোকটি দীর্ঘক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। সেটি ছিল একটি ছোট মেয়ের মৃতদেহ, যার বয়স হয়তো দশ কি এগারো হবে। তার চোখ দুটো আধখোলা ছিল, যেন সে এখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে যে তার সাথে কী ঘটেছে। বৃদ্ধ লোকটি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না; তিনি হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়লেন এবং ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন।

‘ওরা শিশুদেরও ছাড়েনি… ও ঈশ্বর, ওরা শিশুদেরও মারল!’

তুমি বৃদ্ধের কাঁধে হাত রাখলে, কিন্তু তোমার নিজের গলাও তখন বুজে আসছিল। তুমি জানতে, একটু পরেই ছটা বাজবে এবং তোমাকে এই হলটি খালি করে দিতে হবে। কিন্তু এই শোকাতুর মানুষগুলোকে তুমি কীভাবে বলবে যে তাদের এখনই এই নরককুণ্ড ছেড়ে চলে যেতে হবে ?

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button