Uncategorized

কালো পাথর : মূল : মিলড্রেড কে. বারিয়া

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প

বাংলা ভাষান্তর : এলহাম হোসেন

[জন্ম উগান্ডায়। ১৯৭৬ সালে। স্নাতক সম্পন্ন করেছেন উগান্ডার ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃজনশীল লেখায়। এমএফএ ডিগ্রি লাভ করেন নিউ ইয়র্কের সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কলোরাডোর ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। আফ্রিকান রাইটার্স ট্রাস্টের বোর্ড মেম্বার। ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ায় সৃজনশীল লেখা বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। এরাব Give Me Room to Move My Feet (2009), The Price of Memory : After The Tsunami (2006), Men Love Chocolates but They Don’t Say (2002) তার উল্লেখযোগ্য কবিতার বই।]

খোঁড়া বৃদ্ধ নারীদের কাছ থেকে মাত্র অল্প কয়েক ফুট দূরে অবস্থিত ক্যাম্পের দেয়ালে নেয়না প্রমিজ হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। ওর দু গাল বেয়ে দুটি অশ্রুর ধারা বয়ে যাওয়ার দাগ জ¦লজ¦ল করছে। অশ্রুর ফোঁটা ঠোঁটের ওপর আসা মাত্রই জিহ্বা দিয়ে চেটে সাবাড় করে। নিঃশব্দে। কিন্তু দু চোখ দুটো জলে ছলছল করে। হাতে মুঠো করে ধরে রাখে এক টুকরো কালো পাথর।

অন্য বাচ্চারা নেয়নাকে নাম ধরে ডাকে না। ওরা ওকে দলছুট, নিঃসঙ্গ এরকম কিছু একটা বলে জানে। ওর অবস্থা শ্যাওলা ধরা, পচা গাছের আড়ালে জন্ম নেওয়া একটা ব্যাঙের ছাতার মতো। নারীরা স্যুপে মাশরুম ব্যবহার করতে ভয় পায়। কারণ, ধরে নেওয়া হয় মাশরুম গুচ্ছাকারে জন্মে।

নেয়না বাচ্চাদের কাছে যায়। ভাবে, ওদের আলবিদা বলবে। ও মরতে চায়। সচরাচর যা হয় তাই। ছোট্ট মার্গোর নাক থেকে সর্দি ঝরতে থাকে। ওর নেভি ব্লু রংয়ের জামাটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। তবে পর পর তিনবার ধুতে ধুতে ওটি আর এমন থাকবে না। নেয়না জামার আঁচল ধরে তুলে মার্গোর নাকটা মুছে দেয়। মার্গো ওকে ধন্যবাদ জানায়। নেয়না বলতে চায় যে, এ কাজটা ও নিজেই করতে পারে। এতে তেমন কোনও কসরত নেই। কিন্তু কিচ্ছু বলে না। এছাড়া এ কথা সত্যও নয়। সব কাজ করতেই কমবেশি কসরত করতে হয়। 

জেমস বন্ড নামের বাচ্চাটাকে দেখে নেয়না হেসে ফেলে। ও সবসময় ক্ষেপেই থাকে। ঠোঁটটা চুমু দেওয়ার ভঙ্গিতে পাউট করে থাকে। চোখ দুটো লাল মরিচের মতো। নেয়না উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ওর হাতে হাত চাপড়ে তালি দেয়। বাচ্চাটা ভ্রƒ কোঁচকায়। ফেরার পথে দেখে কিজিতো ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছে। কী যেন ভাবছে। ওকে কী বলবে তা নিয়ে ও ভাবতে থাকে। তবে শেষমেশ ওর মুখ থেকে যা বেরিয়ে আসে তা হলো আদেশ। ‘কথা বলো না।’―এ কথা বলে চলে যায়।

ও জানে, ও একটা অকথিত নিয়ম ভঙ্গ করছে। একা চলার কথা কখনও ভাবেনি। তবে বিষয়টাতে গুরুত্ব কম দিতেও পারে না। ভাবে, বিদ্রোহীরা মেরে ফেললে ও বেঁচে যায়। ও জানে, মরে যাওয়া মানে মরে যাওয়া। বেঁচে থাকা একটা কঠিন ব্যাপার। অপহৃত হওয়ার ভয় মৃত্যুভয়ের চাইতেও খারাপ। কারণ, সে-অবস্থাতেও তো ও বেঁচে থাকবে। দরজার কাছে হিলারি। ও দরজার চৌকাঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলা হয়, ওর নাক নাকি সবার থেকে বড়। কিন্তু ওকে দেখতে বারো বছরের মনে হয় না। নিশ্চিতভাবেই ওর শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গর্ভবতী মহিলার মতো ওর পেটটা বেশ বড়। নেয়নার মনে হয়, ওর পেটভর্তি পোকা গিজ গিজ করছে।

‘চল,’ নেয়না বলে।

হিলারি পা টেনে টেনে চলতে থাকে।

নারীরা দেখে, নেয়না চলে যাচ্ছে। কিন্তু ওরা ওকে আটকায় না। যে দেখেনি তাকে দেখানোর জন্য ওরা সবাই বলে, ঐ যে দেখ দেখ, ও আবারও চলে যাচ্ছে। অদূরে মোড়ে চলে যায়। ওখান থেকে একটি দীর্ঘ, বিস্তৃত পথ চলে গেছে। এরপর ঝোপের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ঝরনার পাশে পৌঁছে। থামে। হঠাৎ বসে পড়ে। তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে। একদল অস্ত্রসজ্জিত ক্লান্ত সৈনিক ওর পাশ দিয়ে চলে যায়। কয়েক মিনিট পরে ওঠে দাঁড়ায় কিন্তু ধন্দে পড়ে যায়। গুলু শহরের দিকে যাবে নাকি ক্যাম্পে ফিরে যাবে। দু পা এগিয়ে যেতেই কানে ভেসে আসে: ওদিকে যেও না।

ক্যাম্পে ফিরে আসে। জেমস বন্ডকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একজন বয়স্ক নারী মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ডান হাত দিয়ে নাড়িভুঁড়ি এমন ভাবে চেপে ধরে আছে যেন সেগুলো মাটিতে ময়লা-আবর্জনার মধ্যে না পড়ে যায়। রক্ত একোলির কালো মাটিতে পড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে বয়ে যাচ্ছে।

রাতে নেয়না স্বপ্ন দেখে, বিদ্রোহী নেতা কোনি নিজে ওর পা থেকে পাথর সরিয়ে নিচ্ছে।

‘জারজ কোথাকার,’ ও ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে বলে ওঠে। প্রচণ্ড জোরে লাথি মারে। তারপর মেঝেতে বসে পড়ে।

‘নেয়না,’ অন্ধ মোদেস্তা ওকে ধরে কানে কানে কথা বলে। নেয়নার পিঠ গরমে ঘেমে গেছে। ও এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। জানতে চায়, অন্ধ কীভাবে ওকে দেখল। অন্য বাচ্চাদের থেকে ও নেয়নাকে কি আলাদা মনে করে। নেয়না ফাঁকা সকেটের ভেতরে তাকিয়ে থাকে। শক্ত করে মুঠি পাকিয়ে রাখা হাতের আঙুলগুলো শিথিল করে।

‘আমার লোকদের যা আছে, তা এটুকুই।’ ও ছোট্ট কালো পাথরটা নিয়ে কথা বলে। বয়স্ক নারীর আঙুলটা ধরে পাথরে স্পর্শ করায়।

‘ঠিক আছে।’ বয়স্ক মহিলা বলে। সে হাতটা কাত করে নেয়নার হাতের তালু পাথরের ওপর ধরে। ‘কেউ তোমার লোকজনকে নিয়ে যাবে না। ওরা এখানে আছে, এখানেই থাকবে।’ নেয়নার বুক ও কপাল স্পর্শ করে মহিলাটি এই কথাগুলো বলে ফেলে।

‘আর একটু ঘুমাও,’ মোদেস্তা বলে। ও আলতোভাবে নেয়নাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়।

মাতৃগর্ভে সন্তান যেমন ঠিক তেমনি গুটিশুটি মেরে নেয়না শুয়ে থাকে। ভোর চারটার দিকে ছোট ছোট বাচ্চাদের দিক থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসে। মোদেস্তা সন্তর্পণে রান্নাঘরে চলে যায়। চা বানাতে। ‘একবার শুরু হলে তো হয়েই গেল।’ সে তার সহকর্মী এস্তেলিকে কথাগুলো বলে।

‘হুম, হুম,’ এস্তেলি বলতে বলতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে যায়। এই চিৎকার তো এখন রুটিনে পরিণত হয়েছে। চুলো জ¦ালানোর সিগনাল দেওয়া হয়ে গেছে। চা বানানোর। দুজন নারী ছোট ছোট প্লাস্টিকের কাপ একটা ঝুড়িতে রাখে। এস্তেলির সঙ্গে মোদেস্তা ট্রে টেনে নিয়ে যায়। দুজন একসঙ্গে বেলিফুলের সৌরভমাখা লেমন গ্রাস ও মধুমিশ্রিত চা সবার মাঝে বিতরণ করে।

যেদিন বিকেলে নেয়নার বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল সেদিন মোদেস্তা তার বাড়ি ও চোখ দুটোই হারিয়েছিল। নেয়না স্কুল থেকে ফিরে দেখে ওদের ছোট্ট বাড়িটা পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে গেছে। ভাবল, ভুল কোনও স্থানে এসে পড়েছে কি না। কিন্তু গ্রামের এক বৃদ্ধ ওর নাম ধরে ডাকে, তারপর পুরো ঘটনা সবিস্তারে বলে।

‘পূর্বপুুরুষদের আত্মা তোমার উপর সদয় হোক। এখন একমাত্র তুমিই বেঁচে আছো।’ নেয়না ছাই হাতড়াতে শুরু করে। পরিবারের অবশিষ্ট কিছু যদি থেকে থাকে, সে আশায় হাতড়াতে থাকে।

‘সময় নষ্ট করছো, মা। আমার সঙ্গে এসো। তোমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাব যেখানে তোমার মতো আরও অনেকেই আছে।’

নেয়না দু হাতে ছাই হাতড়াতে থাকে। পা দিয়েও। ওর বাম পায়ে শক্ত কিছু একটা ঠেকে। থামে। পুতির মতো। এমন পুতির মালা ওর মা পরত। ওর মার পুত্রসন্তান হলে ওর বাবা এই উপহার দিয়েছিল। ওলগা এই পুতির মালা এতই পছন্দ করত যে ওর মা বলেছিল, ও যখন প্রাইমারি স্কুল পাস করবে তখন সে এটি ওকে উপহার দেবে। নেয়না পুতির মালাটা তুলে নেয়। আগে এর রং সবুজ ছিল। এখন কালো হয়ে গেছে।

‘অন্ধকার হয়ে আসছে। আমাদের অনেক দূর যেতে হবে,’ বৃদ্ধ বলেন। নেয়না নড়ে না। বৃদ্ধ চলতে শুরু করে।

রাত ভোর হলে নারী ও শিশুরা মিলে নীরবে কবর খোঁড়ে। তাসাকে কবর দেয়। ওর নাড়িভুঁড়িগুলো বেরিয়ে পড়েছিল। ভেতরে ঢুকানো যাচ্ছিল না। আর শরীরের সব রক্ত বেরিয়ে মাটি ভিজিয়ে ফেলেছে।

কয়েক দিন পরে মোদেস্তা ও এস্তেলি বড় পাথরের উপর বসে গল্প করছিল। ওদের মাথা উজ্জ্বল ওড়নায় ঢাকা। উপহার হিসেবে পেয়েছিল। আস্তে আস্তে কথা বলে। বিস্ময় প্রকাশ করে―নেয়না একেবারে বিপদের মুখ থেকে কীভাবে বেঁচে গেল।

‘ঐ মেয়েটা আমাদের সবাইকে বিপদে ফেলবে,’ এস্তেলি বলে।

‘আমরা একটি পরিবারের মতো,’ মোদেস্তা বলে। ‘ও আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে না।’

‘আমি যা চোখে দেখি তা বিশ্বাস করি না।’

‘নেয়না ওদের দিকে এগিয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে মোদেস্তার স্কার্ফ স্পর্শ করে। নারীটি মাথা সরিয়ে নেয়। এস্তেলি হাসে।

নেয়না ফিসফিস করে বলে, ‘আমি কী করতে যাচ্ছি তা ও জানলো কীভাবে ?’

‘অনুভূতি,’ এস্তেলি বলে। ‘তুমি তো জানো, মাঝে মাঝে আমি হাঁটি কিন্তু আমার তো পা নেই।’

যখন বসতে যাবে ঠিক তখনই নেয়না আশেপাশে বিপদের গন্ধ পায়। প্রথমে চিৎকার, চেঁচামেচি, তারপর লাল, হলুদ শিখা। একজন লোক ছোটাছুটি করতে থাকে।

‘সবাই লুকিয়ে পড়,’ লোকটি চিৎকার করে বলতে থাকে। মোদেস্তা উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে মৃত্তিকাদেবীর সাহায্য প্রার্থনা করে। নেয়না কাদামাটির দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে দেখা যাচ্ছিল। গোলাগুলির শব্দ শুনতে পায়। ক্রমেই এই শব্দ ওদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। নেয়না নিজে নিজেই বলে ওঠে, এটি তো সেই একই ব্যাপার। চারপাশে তাকায়। ঘাসগুলো এত লম্বা নয় যে, সেখানে কেউ লুকিয়ে যেতে পারে। ক্যাকটাসগুলো এত ছোট যে সেগুলো একটা ইঁদুরকেও আড়াল করে বাঁচাতে পারে না। কিন্তু নারী, শিশু সবাই মাটিতে শুয়ে পড়ে। সুরক্ষার জন্য ধরিত্রীদেবীর কাছে প্রার্থনা করতে থাকে।

নেয়না বিদ্রোহীদের অপেক্ষায় থাকে। ওর বুকটা ধুকপুক করতে থাকে। তবে এখন আর ও লুকোতে চায় না। যা ঘটে গেছে তা নিয়ে ও হতাশ। অবশেষে শব্দ থেমে যায়। চারপাশে সুনসান নিস্তব্ধতা নেমে আসে।

‘জারজ কোথাকার,’ নেয়না ক্রোধে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলে। যারা মাটিতে শুয়ে পড়েছিল, তাদের সবাইকে এবার উঠাতে চেষ্টা করে।

মোদেস্তার কাঁধে হাত রাখে। মোদেস্তা ভয়ে কুঁকড়ে যায়।

‘ওরা চলে গেছে,’ নেয়না বলে।

‘হায় যিশু,’ মোদেস্তা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে। উঠে দাঁড়ায়। গা থেকে ধুলো-বালু ঝেড়ে ফেলে।

নেয়না দেখে হিলারি তখনও চিত হয়ে পড়ে আছে। ওর পেটে চাপড় দেয়, ঢোলের মতো ডিপ ডিপ শব্দ হয়। ওর অবশ্য এমনটা হয় না। হিলারি এমন পেট নিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। ও কি কোনও বিদ্রোহীর দ্বারা ধর্ষিত হয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়েছে, না কি ওর পেটে পোকা হয়েছে ? কোনটি অধিকতর বেশি খারাপ ? নেয়না ওর মুখের দিকে তাকায় না। এবার মার্গোর কাছে যায়।

মার্গো কাঁদছে। নেয়না ওকে ধরে দাঁড় করায়। নারীদের কাছে নিয়ে যায়। ওকে যে চাপড় দেওয়া হয়েছে সেটা কিজিতো স্বীকার করতে চায় না। মনে মনে ভাবে, বিদ্রোহীরা অত্যাচার করার জন্য সব কৌশলই ব্যবহার করে। যদি ওরা বুঝে ফেলে যে, খোঁচা দিলে তুমি ভয় পাও তাহলে ওরা তাই করবে। আর চোখ খোলা মাত্রই ওরা তোমার মাথাটা উড়িয়ে দেবে। নেয়না ওকে উলটে  দেয়। ও ভয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।

‘কিজিতো, আমি নেয়না।’

অবশেষে ও উঠে দাঁড়ায়।

সারাদিন নেয়না অস্থির হয়ে এদিক-সেদিক পায়চারি করে। ওর হাত দুটো মুঠো পাকানো। মুখে কোনও কথা নেই। মনে হয়, ওর রিবার যেন ওকে রক্ষা করবে। যেখানেই থাক। ওরা সন্ত। ওর জন্য প্রার্থনা করবে। ও ছোট ছোট পাথর ফুটো করে মালা গাঁথে। তারপর সেই মালা গলায় পরে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। ও এখন ক্যাম্প থেকে বেশ দূরে। বাঁকা চাঁদ আকাশের গায়ে উঁকি দেয়। দেখতে খঞ্জনীর মতো। নেয়না মনে করে, যে নারী গান শুনে আলোড়িত হয় সে চাঁদের নড়াচড়ারও শব্দ শুনতে পায়। চাঁদের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা হাঁটার পর নেয়না কাম্পে পৌঁছে। এরপর বিছানায় শুয়ে পড়ে।

সে রাতে শোরগোল শুরু হবার পূর্বেই নারীরা চা বানানোর পরিকল্পনা করে। আদর করে বাচ্চাদের ঘুম থেকে জাগায়। চায়ের কাপ একে একে ওদের দিকে এগিয়ে দিতে থাকে। নেয়না শুয়ে থাকে।

‘এটা ছেড়ে দে, বাবা,’ মোদেস্তা বলে। ‘একটু সরে যা যাতে লোকজন অনায়াসে চলাফেরা করতে পারে।’

নেয়না মাথা ঝাঁকায়।

মোদেস্তা মুঠি পাকিয়ে হাত ছুড়ে মারে। হাতে আর পাথর ধরে নেই। ওর মুঠিতে ক্রোধ ঝরে। গলায় পাথরের মালা।

‘তোমাকে ওদের মাঝে নিরাপদ ভাবতে হবে। দম বন্ধ করে থাকতে হবে। ওরা তোমার সঙ্গে হাঁটতে বা চলতে পারে। তুমি কি ওদের দম বন্ধ করে মারতে চাও, নাকি বাঁচাতে চাও ?’

‘আমি চাই ওরা বাঁচুক।’

‘তাহলে শান্ত হও। তোমার লোকজন বেঁচে যাবে।’

‘ওরা এখানে, এখানে,’ বুক আর কপাল স্পর্শ করে নেয়না বলে।

‘বেশ,’ মোদেস্তা বলে। তারপর আবার বিছানায় চলে যায়।

নেয়নার নিজেকে হালকা মনে হয়। বাঁকা চাঁদ আর নৃত্যরত নারীদের কথা মনে পড়ে। নারীটি ওর মা। ওর একজন সঙ্গী রয়েছে। কোঙ্গা নৃত্য করছে। ওর সঙ্গে নাচছে ছেলে, বাবা আর ওলগা।

চাঁদের শীর্ণ রেখা ধরে ধরে পুতির মালার মতো ওরা সারিবদ্ধভাবে নাচে। নেয়না হাসতে শুরু করে। প্রথমে আস্তে। তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button